করোনার সংক্রমণ ২ কোটি ছাড়াল

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে বিশ্ব এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মুখোমুখি। এ ক্ষেত্রে বলা দরকার, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ছে। শক্তিধর দেশগুলোকেও বিপর্যস্ত করে তুলেছে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস। ফলে দিনে দিনে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠা প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সংক্রান্ত সামগ্রিক পরিস্থিতি আমলে নিয়ে বিশ্বনেতৃত্ব ও সংশ্লিষ্টদের যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেল, এরই মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ২ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ডোমিটার’-এর এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিশ্বে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ২ কোটি ৪৬ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে মারা গেছে ৭ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ। যদিও এটা আশাব্যঞ্জক বিষয় যে, করোনা থেকে সুস্থতার হারও কম নয়। জানা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই সুস্থ হয়ে উঠেছে। করোনা থেকে সুস্থতার সংখ্যা এক কোটি ২৯ লাখের  বেশি। প্রসঙ্গত বলা দরকার, গত ৩১ ডিসেম্বর চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম করোনার উপস্থিতি ধরা পড়ে। এরপর  থেকে এখন পর্যন্ত ২১৩টি দেশ ও অঞ্চলে তান্ডব চালাচ্ছে এই ভাইরাস। করোনায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিপর্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র।  দেশটির সব অঙ্গরাজ্যেই করোনার প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া সংক্রমণে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ব্রাজিল। অন্যদিকে, তৃতীয় অবস্থানে আছে ভারত। আমরা বলতে চাই, যখন করোনা সংক্রমণ  বেড়েই চলেছে, তখন এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করাসহ বিশ্বের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঠিক রাখতেও উদ্যোগী হতে হবে। কেননা এর আগে এমন বিষয়ও আলোচনায় এসেছিল, মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোও হিমশিম খেয়েছে। ফলে কোথাও যেন দুর্বল স্বাস্থ্য সেবাব্যবস্থা ও নাজুক প্রস্তুতি না থাকে সেই দিকটি আমলে  নেওয়াসহ করোনা রোধে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নিশ্চিত করতে হবে। এ কথা ভুলে যাওয়া যাবে না, মানুষের মধ্য আতঙ্ক আছে যেমন, তেমনিভাবে জীবনযাপনের স্বাভাবিকতা বিঘিœত হয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বের প্রত্যেকটি খাতই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর আগে, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বিশ্ব ব্যাপক দুর্ভিক্ষের ঝুঁকির মুখে আছে বলেও সতর্ক করেছিল জাতিসংঘ। একদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে পুরো বিশ্বই বিপর্যস্ত, অন্যদিকে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি- সঙ্গত কারণেই সামগ্রিকভাবে বিশ্ব এমন এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যাচ্ছে যা মোকাবিলায় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই। আর এ  ক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব বিশ্ব নেতৃত্ব ও সংশ্লিষ্টদের করোনা রোধে  যেমন ভূমিকা রাখতে হবে, তেমনি অভাবী মানুষ বা দুর্ভিক্ষের ঝুঁকির বিষয়টি নিয়েও ভাবতে হবে। বিশ্বে যখন দুই কোটি আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেল তখন আমরা বলতে চাই, শুধু অন্যান্য দেশেই নয়, বাংলাদেশেও দ্রুত বাড়ছে করোনার সংক্রমণ। দেশেও করোনাভাইরাস আর একস্থানে সীমাবদ্ধ নেই। ইতোমধ্যে ২ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এ ছাড়া মারা গেছে ৩ হাজারের বেশি মানুষ। ফলে করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। একদিকে দেশের জনসংখ্যা বেশি, অন্যদিকে প্রস্তুতি কতটা এবং মানুষের সচেতনতার চিত্র আমলে নিয়ে প্রয়োজনে কঠোর পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। বলা দরকার, সারা বিশ্বে যখন সংক্রমণ বাড়ছে তখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে লকডাউন করা হলেও তা শিথিল করা হচ্ছে জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে। করোনা রোধের উপায় খুঁজতে  যেমন নানাধরনের প্রচেষ্টা চলছে, তেমনি এর প্রভাবসংক্রান্ত নানা বিষয়ে গবেষণাও হচ্ছে। আমরা মনে করি এই বিষয়গুলোকে সামনে রেখে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি বলতে চাই, ২১৩টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ২ কোটি ছাড়িয়ে গেছে, ফলে বিষয়টিকে সহজ করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। সারা বিশ্বের করোনা-পরিস্থিতি বিশ্লেষণ সাপেক্ষে বিশ্বনেতৃত্ব এবং সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ জারি রাখতে হবে। পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা, স্বাস্থ্যবিধি  মেনে চলা, অকারণে ঘোরাফেরা না করাসহ প্রয়োজনীয় সচেতনতা এ সময়টা সবচেয়ে বেশি জরুরি। সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন হোক এমনটি প্রত্যাশিত।

 

চাই টেকসই ও উদ্ভাবনীমূলক পদক্ষেপ

নদীভাঙন ও বন্যায় বিলীন হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রতি বছর যেভাবে বাড়ছে, তা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। সোমবার সমকালে প্রকাশিত ২০ বছরে নদীতে আট হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত ও বিলীন হওয়ার খবর বিস্ময়কর। আমরা জানি, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রে কতটা কাঠখড় পোড়াতে হয়। ভবনের জন্য আবেদন, নির্মাণের অনুমোদন, বাজেট বরাদ্দ ও কার্যক্রম শেষ করা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তাতে ব্যয়কৃত অর্থের পরিমাণও কম নয়। এরপরও যদি ভবনটি টেকসই না হয়, সেটি দুঃখজনক। নদীমাতৃক দেশ হিসেবে প্রায় প্রতি বছরই  যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার পরও ঝঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রচলিত ভবন নির্মাণ কেন বন্ধ হচ্ছে না? আমরা  দেখেছি, বিলীন হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য অংশই চরাঞ্চলে অবস্থিত। এ বছর উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা চাঁদপুর সদরের রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের ওমর আলী স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টারটি যেভাবে নদীতে বিলীন হয়, তা ব্যাখ্যাতীত। সোয়া দুই  কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ওই এলাকার বিদ্যালয় এর আগেও একাধিকবার নদীভাঙনের শিকার হয়। চরাঞ্চলে বিলীন হওয়া অন্যান্য বিদ্যালয়ের গল্পও নিশ্চয়ই এর  চেয়ে ভিন্ন নয়। আমরা জানি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শিক্ষার্থীর ওপর। বিদ্যালয় ভবন একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা সংস্কারে দীর্ঘ দিন লেগে যায়, তাতে ঝুঁকি নিয়ে কিংবা  খোলা আকাশের নিচেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা শ্রেণি কার্যক্রমে অংশ নেয়। আর বিদ্যালয় ভবন একেবারে তলিয়ে গেলে তো দুর্ভোগের অন্ত নেই। চরাঞ্চলে এমনিতেই প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অপ্রতুল; তার ওপর এভাবে প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে যাওয়ার প্রভাব যে সেখানকার সার্বিক শিক্ষার ওপর পড়ছে, তা বলাই বাহুল্য। একইভাবে সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাইক্লোন শেল্টার হিসেবে ব্যবহার হয় বলে প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্তের সঙ্গে সঙ্গে দুর্যোগে মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নও সামনে চলে আসে। চলতি বছর দীর্ঘমেয়াদি বন্যার ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্তের হার অন্যান্য বছরের তুলনায়  বেশি। রংপুর বিভাগে সবচেয়ে বেশি বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নষ্ট হয়েছে বলে সমকালের সংশ্নিষ্ট প্রতিবেদনে এসেছে। আমরা মনে করি এ বছর সব মিলিয়ে যে একুশ শতাধিক বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে তালিকা ধরে প্রথমত ক্ষতির পরিমাণ চিহ্নিত করা দরকার। ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংস্কার, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা স্থানান্তরের মাধ্যমে নিরাপদ স্থানে ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। চরাঞ্চলে বারবার প্রতিষ্ঠান স্থাপনের চেয়ে স্থানান্তরযোগ্য বা ভাসমান বিদ্যালয় নির্মাণ করার বিষয়টি ভাবা দরকার। আমরা মনে করি, চরাঞ্চলে কংক্রিটের বদলে কাঠের কাঠামো ব্যবহার করা শ্রেয়। নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন টেকসই করতে নদী খনন ও নদীর তীর বাঁধাইসহ সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে। নদীভাঙন রোধ করতে না পারলে কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, বসতিসহ ফসলের জমি বিলীন হয়ে মানুষ কীভাবে নিঃস্ব হয় তা আমরা দেখেছি। তবে প্রযুক্তির উৎকর্ষের এ সময়ে আমরা মনে করি না এসব সমস্যার সমাধান অসম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যেভাবে আমাদের অভিযোজন হয়েছে একইভাবে চরাঞ্চল ও নদীতীরবর্তী এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে অভিনব ব্যবস্থা গ্রহণ করা চাই। বিষয়টি যে কর্তৃপক্ষ ভাবছে তা সমকালের কাছে দেওয়া প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের বক্তব্যেও উঠে এসেছে, ‘চর এলাকায় নদীর চার কিলোমিটার দূরত্বে ভবন নির্মাণ করার পরও রক্ষা পায়নি। তাই ভবিষ্যতে এসব এলাকায় আর প্রথাগত উপায়ে ভবন নির্মাণ করা হবে না।’ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতি মাথায় রেখেই শিক্ষাসহ সার্বিক পরিকল্পনা জরুরি। সুষম উন্নয়ন যেখানে কাঙ্ক্ষিত, শতভাগ শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করা যেখানে প্রত্যাশিত, সেখানে সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই হবে। এমনিতেই কয়েক মাস ধরে চলমান করোনা দুর্যোগে শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও যেন তাতে অংশ নিতে পারে, সে জন্য ত্বরিত পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।

 

 

 

সড়ক দুর্ঘটনা কি অপ্রতিরোধ্য?

একদিকে করোনাভাইরাসের কারণে মানুষের জীবন বিপর্যস্ত। অন্যদিকে এই পরিস্থিতির ভেতরেও সড়ক দুর্ঘটনা ও দুর্ঘটনায় মৃত্যু থেমে নেই। সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেল, সড়কে মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হয়েছে আরও ২১ জনের নাম। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশের ৮ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় এসব মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় বাস অটোরিকশার সংঘর্ষে একই পরিবারের ৩ জনসহ ৭ জন, চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জে নৈশকোচের ধাক্কায় ৬ জন, মানিকগঞ্জের সিংগাইরে শিশুসহ দুজন এবং রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ধামরাই, খুলনার ডুমুরিয়ায়, রংপুরের কাউনিয়ায়, বগুড়ার শেরপুরে ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় একজন করে নিহত হয়েছেন। প্রসঙ্গত বলা দরকার, সড়ক দুর্ঘটনায় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ  যেমন প্রতিনিয়ত চলে যাচ্ছে না ফেরার দেশে, তেমনি অনেক সম্ভাবনার মৃত্যু হচ্ছে অকালেই। সম্প্রতি রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় কেড়ে নিল সম্ভাবনাময়ী রতœাকে। শুক্রবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে গণভবন সংলগ্ন এলাকায় সাইক্লিং করতে গেলে দুর্ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত  ঘোষণা করেন। জানা যায়, দুর্ঘটনার সময় রতœা সাইক্লিং করছিলেন। তিনি গণভবন সংলগ্ন সড়কের পূর্ব দিক থেকে পশ্চিমে যাচ্ছিলেন। এ সময় একটি গাড়ি পেছন  থেকে ধাক্কা দিলে তিনি গুরুতর আঘাত পান। বলা দরকার, রেশমা নাহার রতœার পর্বতারোহণে ছিল বিপুল উৎসাহ। প্রথমে দার্জিলিংয়ে তেনজিং নরগে মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট থেকে বেসিক কোর্স সম্পন্ন করেন এবং তারপর হিমাচলের মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট থেকে উচ্চতর কোর্সও সম্পন্ন করেছেন। রতœা ছয় হাজার মিটার পর্যন্ত  ট্রেকিং সম্পন্নও করেছিলেন। ধাপে ধাপে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখরে পা রাখার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু এমন সম্ভাবনার অবসান ঘটল দানব চাকার দৌরাত্ম্যে। লক্ষণীয়, আট জেলায় ২১ জনের মৃত্যুর ঘটনা পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে যে, বাস এবং বিপরীতমুখী সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে,  নৈশকোচ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত যান, মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেওয়া, পিকআপভ্যান ও মোটরসাইকেল মুখোমুখি সংঘর্ষ, বাসের মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেওয়াসহ নানাভাবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আমরা বলতে চাই, এভাবে যখন সড়কে একের পর এক মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে তখন সার্বিক পরিস্থিতি আমলে নিতে হবে। সংশ্লিষ্টদের মনে বিবেচনায় নেওয়া দরকার, এর আগে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে নানা ধরনের কারণ চিহ্নিত হয়েছে। রবপরোয়া গতিতে গাড়ি চালনা; বিপজ্জনক অভারটেকিং; রাস্তাঘাটের ক্রটি; ফিটনেসবিহীন যানবাহন; যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা; চালকের অদক্ষতা; চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার; মাদক সেবন করে ড্রাইভিং; রেলক্রসিং ও মহাসড়কে হঠাৎ ফিডার রোড থেকে যানবাহন উঠে আসা; রাস্তায় ফুটপাত না থাকা বা ফুটপাত  বেদখলে থাকা; ট্রাফিক আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং ছোট যানবাহন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণ উঠে এসেছে। আমরা মনে করি, সার্বিক বিষয়গুলো আমলে নিয়ে সর্বাত্মক উদ্যোগ জরুরি। বলার অপেক্ষা রাখে না, সম্প্রতি এমন তথ্যও উঠে এসেছে যে, শুধু জুলাই মাসেই ২৯৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় দেশব্যাপী ৩৫৬ জন নিহত হয়েছেন। সঙ্গত কারণেই সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা অনুধাবন করা অপরিহার্য। প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চলে দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে। বিশেষ করে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর বিভীষিকা  থেকে কিছুতেই যেন রক্ষা পাচ্ছে না মানুষ। ফলে এ থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে হবে এবং দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি আমরা বলতে চাই, একের পর এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা কেন ঘটছে এবং এর জন্য দোষীদের শনাক্ত করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দেশে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই। এই মৃত্যুর বিভীষিকা এমন, যেন সড়ক পথ একটা মৃত্যুর ফাঁদ! সঙ্গত কারণেই সামগ্রিক বাস্তবতা অনুধাবন করে সংশ্লিষ্টদের কর্তব্য হওয়া দরকার দুর্ঘটনার কারণগুলো আমলে নেওয়া এবং সেই মোতাবেক কঠোর পদক্ষেপ নিশ্চিত করা। নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা ও  বেপরোয়া গতির কাছে হারিয়ে যাচ্ছে তরতাজা প্রাণ, গণপরিবহণে অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং রেষারেষির কারণেও দুর্ঘটনাও বাড়ছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি আমলে নিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত হোক এমনটি কাম্য।

হাসপাতালে কেন অভিযান চালাতে হবে

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এককভাবে অভিযান চালানোর বিপক্ষে অবস্থান জানিয়েছেন। কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যে অনিয়ম পেয়ে কয়েকটি হাসপাতাল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান বন্ধ করে দেওয়ার প্রেক্ষাপটে তার অবস্থানের কথা জানান। হাসপাতালগুলো আইন ভাঙলে আইন অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। গতকাল রবিবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নে জাহিদ মালেক বলেন, এটা অভিযান কেন? হাসপাতালে কি অভিযান করে? হাসপাতালে ইনকোয়ারি করে। অভিযান তো করে চিটাগং হিল ট্রাক্টসে। সেখানে সন্ত্রাসী থাকে, সেখানে অভিযান করে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বিশ^ মাতৃদুগ্ধ দিবস উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলন হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার এখন বিশ্বের অন্য  দেশের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বে এখন মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৪০ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানো হার ৬৫ শতাংশ। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে করোনা ও বন্যার দুর্যোগের সময়েও বাংলাদেশে মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে মানুষকে উদ্ধুদ্ধ করতে স্বাস্থ্য খাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের অক্লান্ত শ্রমে বিশ^ আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে ভ্যাকসিন হিরো থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারে পুরস্কৃত করেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এই করোনার মহামারীতে দেশের স্বাস্থ্য খাতের সময়োচিত ভূমিকা গ্রহণের ফলে বিশ্বে করোনা শনাক্ত বিবেচনায় মৃত্যুহার সবচেয়ে কম দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কমেছে। বাসায় বসে রোগীরা চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন, বাসায় থেকে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন প্রায় ৯০ শতাংশ করোনা রোগী। করোনা টেস্ট কিটের অভাব নেই। বন্যার কারণে ও বাসায় বসে চিকিৎসায় সুস্থ হওয়ায় হাসপাতালে রোগী কমছে। তিনি বলেন, আমরা দেখেছি টেস্টের সংখ্যা কমেছে, সেটা হয়তো বন্যার কারণে। টেস্ট করানোর ক্ষেত্রে কিছু মানুষের অনীহাও আছে। বর্তমানে মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। দেশে মৃত্যুর হার আস্তে আস্তে কমে আসছে। মানুষ সেবা পাচ্ছে হাসপাতালে এবং টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে। ৪ থেকে ৫ হাজার ডাক্তার টেলিমেডিসিন সেবা দিচ্ছেন। প্রয়োজনে ওষুধ বাসায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালে প্রায় ৬০ শতাংশ সিট খালি।

শিক্ষায় বিপর্যয়ের মুখে প্রজন্ম

কোভিড ১৯-এর প্রাদুর্ভাব সর্বত্রই এক অচলাবস্থার সৃষ্টি করে। আর এ মহামারীর প্রথম দিকেই বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। শিশু আর বৃদ্ধরা যেহেতু সংক্রমণে সবচেয়ে  বেশি ঝুঁকিতে পড়ে, সেহেতু ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে  দেশে দেশে সবার আগে বন্ধ করা হয়েছে শিক্ষালয়গুলো। এটি একান্ত জরুরি ছিল। কিন্তু ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার গতি  যে কবে কমবে, এর হদিস পাচ্ছেন না বিজ্ঞানীরা। প্রথম দিকে কিছু আশাবাদ শোনানো হলেও তারা এখন বলছেন,  কোভিড ১৯-এর সঙ্গে বহুদিন বসবাস করতে হতে পারে। তবে ভ্যাকসিন আমাদের আশা জাগাচ্ছে। ভ্যাকসিন যত দ্রুত বাজারে আসবে, তত মানুষের জীবনে কোভিডের লাগাম টানা হয়তো সম্ভব হবে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস বলেছেন, করোনার কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় একটি প্রজন্ম বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। বিশ্বে ১০০ কোটি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে। অন্তত চার কোটি শিশুর জীবন  থেকে প্রি-স্কুল হারিয়ে গেছে। আমরা এমন এক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছি যে, তা কয়েক দশকের প্রগতিকে নস্যাৎ করে দিতে পারে। প্রযুক্তির সহায়তায় বিশ্বের অনেক দেশ অবশ্য এই করোনাকালীন সংকট মোকাবিলা ও ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে। কিন্তু আধুনিক যুগে শিক্ষা যত না বইনির্ভরÑ এর  চেয়ে বেশি বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বহিরাঙ্গন কর্মসূচি ও ল্যাবনির্ভর। স্বীকার করতেই হবে, করোনা ভাইরাস ওই ব্যবস্থাটিকে ব্যাপকভাবে ব্যাহত করছে। বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা যে সংকটে পড়েছেÑ তা হলো বর্তমান সংকট মোকাবিলায় অন্যান্য দেশ যেসব সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ নিচ্ছে, দুর্ভাগ্যক্রমে আমরা তা করতে পারছি না। করোনাকালে শিক্ষা সচল রাখতে অনেক দেশই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। দূরশিক্ষণের নানা উপায় এখন মানুষের হাতের নাগালে। এর বেশিরভাগই অনলাইনভিত্তিক। তবে বাংলাদেশে আধুনিক প্রযুক্তি যতখানি বাণিজ্যবান্ধব, ততখানি জনবান্ধব নয়। এদিকে সরকারের মনোযোগী হওয়া উচিত। সরকারের উচিত শিক্ষা বাতায়নকে আরও কার্যকর ও ডিজিটাল কন্টেন্টগুলোর ব্যাপক উন্নতি সাধন করা। সংসদ টেলিভিশনের সম্প্রচার ক্যাবলভিত্তিক না  রেখে তা বিটিভির সঙ্গে টেরিস্টেরিয়াল প্রযুক্তিতে সম্প্রচার করার জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া। শুধু কোভিড-১৯ নয়, যে  কোনো সংকটে অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম যেন চালু রাখা যায়Ñ এ জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে।

গণমাধ্যমের ক্রান্তিকাল

গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। গণমাধ্যমের মাধ্যমেই দেশব্যাপী ঘটা অপরাধজনক কর্মকা  ও সম্ভাবনাসহ সব খবর জানতে পারে নাগরিক সমাজ। সামাজিক অপরাধরোধে গণমাধ্যম সবসময়েই অগ্রণী ভূমিকা  রেখে এসেছে এবং এখনো রাখছে। তবে কোভিড-১৯ এর প্রভাবে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত দেশ, তার প্রভাব পড়েছে গণমাধ্যমেও। ইলেকট্রনিক মিডিয়াতেও করোনার প্রভাবে খারাপ সময় চললেও বিশেষ করে প্রিন্ট মিডিয়া করোনাকালে ক্রান্তিকাল পার করছে। করোনার হানায় স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বহু পত্রিকা তাদের প্রকাশনা বন্ধ রেখেছে। বহুল প্রচারিত অনেক পত্রিকাও নিয়মিত যত পাতায় পত্রিকা প্রকাশ করত, করোনাকালে পাতা কমিয়ে এনে সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশে বাধ্য হয়েছে। সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ অর্থনৈতিক। করোনার ক্রান্তিকালে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বিজ্ঞাপন না পাওয়াই প্রকাশনা বন্ধের অন্যতম কারণ। এই সময়ে হাতেগোনা কয়েকটি পত্রিকা ব্যতীত অন্যান্য পত্রিকার সাংবাদিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাও ঠিকমতো পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। এই অচলাবস্থা এখনো বিদ্যমান আছে। লকডাউন তোলে দেয়ার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে থাকলেও প্রিন্ট মিডিয়ার অচলাবস্থা এখনো কাটেনি। গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবাদপত্র দাঁড়িয়ে আছে নানা সহায়ক শক্তির ওপর। প্রচারসংখ্যা ও বিজ্ঞাপনের ওপরই মূলত নির্ভর করে গণমাধ্যমের উঠে দাঁড়ানো এবং টিকে থাকে। কিন্তু করোনাকালে অর্থনৈতিক মন্দায় সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। গণমাধ্যমের ক্রান্তিকালের সুযোগটা নিচ্ছে অপরাধীরা। বিভাগীয় শহর কিংবা জেলাভিত্তিক পত্রিকাগুলোর প্রকাশনা বন্ধ থাকার কারণে স্বাভাবিকভাবে সেসব পত্রিকায় কাজ করা সাংবাদিকরা সংবাদ সংগ্রহ করছেন না। এছাড়াও বহুল প্রচারিত পত্রিকাগুলোর মধ্যে অনেক পত্রিকা পৃষ্ঠা কমিয়ে প্রকাশ করছে। ফলে সমাজভিত্তিক অপরাধজনক ঘটনাগুলোর অধিকাংশই আড়ালে থাকছে। বাংলাদেশে দৈনন্দিন বহু অপরাধজনক ঘটনা ঘটছে, যেসব মিডিয়ায় প্রকাশের পরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসে। এছাড়াও সমাজে ঘটে যাওয়া ভালো-মন্দ ঘটনা, সম্ভাবনাসহ সব সংবাদই মিডিয়ায় প্রচারের পর আলোচনায় আসে, প্রতিকার পায় ভুক্তভোগী, প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা হয়। প্রতিভাবান ব্যক্তিরাও মিডিয়ার মাধ্যমে তাদের কাজগুলো তুলে ধরতে পারেন। তবে আশার কথা করোনার প্রকোপ এখনো না কমলেও মানুষজন স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হচ্ছে। মহামারির কাছে হেরে না গিয়ে কর্মমুখর হচ্ছে প্রতিটি মাধ্যম। দেশের চতুর্থ স্তম্ভ গণমাধ্যমও ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে মত্ত। সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে গণমাধ্যম এর কার্যক্রম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে এবং দেশের সার্বিক পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি হবে, সেই প্রত্যাশা।

জঙ্গি হামলার শঙ্কা কার্যকর পদক্ষেপ নিন

জঙ্গিবাদ অন্যতম বৈশ্বিক সংকট। ফলে জঙ্গি হামলার শঙ্কা আলোচনায় আসার অর্থই তা উদ্বেগজনক পরিস্থিতিকে স্পষ্ট করে। সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেল, ঢাকাসহ সারাদেশে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করে মাঠে নামার চেষ্টা করছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) র্দুর্ধর্ষ জঙ্গিরা। পুলিশের  কোনো টিম, স্থাপনা বা যানবাহনকে মূল টার্গেট করেছে তারা। এছাড়া বিমানবন্দর, দূতাবাস, বিশেষ ব্যক্তি, মাজারকেন্দ্রিক মসজিদ, চার্চ ও মন্দিরসহ যে কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ও তাদের হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে-গোয়েন্দাদের কাছ থেকে এমন তথ্য পাওয়ার পর র‌্যাব-পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশব্যাপী সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। আমরা বলতে চাই, হামলার যে শঙ্কার বিষয়টি সামনে আসছে, তা সামগ্রিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নিশ্চিত করতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না- এর আগে এমন বিষয়ও আলোচনায় এসেছে যে, সারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশও জঙ্গিবাদের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিভিন্ন সময়ের ঘটনার মধ্য দিয়ে এটাও সামনে এসেছে যে, দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতার মাধ্যমে জঙ্গিবাদ অনেকটাই দমানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু জঙ্গি তৎপরতা পুরোপুরি নির্মূল করা যায়নি। এ ক্ষেত্রে এটাও বলা দরকার, গত বছরের ২৯ এপ্রিল ঢাকার গুলিস্তানের একটি ট্রাফিক বক্সের পাশে হাতে তৈরি  বোমা বা আইইডির বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ট্রাফিক পুলিশের দুই সদস্য ও একজন কমিউনিটি পুলিশ সদস্য আহত হন। এ ঘটনার ঠিক ২৮ দিন পর ২৬ মে রাত পৌনে ৯টার দিকে মালিবাগের পলওয়েল ফিলিং স্টেশনের বিপরীতে ফ্লাইওভারের নিচে রাখা পুলিশের বিশেষ শাখার একটি পিক-আপ ভ্যানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। এতেও ট্রাফিক পুলিশের এক সহকারী উপ-পরিদর্শকসহ ৩ জন আহত হন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে ফেলে রাখা বোমা উদ্ধারসহ নানা ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনা সামনে এসেছে। আমরা বলতে চাই, এবারের হামলার শঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে এ বিষয়ে  দেশের সব ইউনিটে চিঠি পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। যেখানে বলা হয়েছে, গোয়েন্দা তথ্য পর্যালোচনা করে জানা গেছে, তথাকথিত আইএস আসন্ন ঈদুল আজহা সামনে রেখে কথিত ‘বেঙ্গল উলায়াত’ ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ঘটনাপ্রবাহ বিশে¬ষণ করে দেখা যায়, সাধারণত বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমেই ‘বেঙ্গল উলায়াত’ ঘোষণা করা হয়। এ অবস্থায় আইএসের দেশীয় অনুসারী নব্য জেএমবির সদস্যরা হামলা পরিচালনাসহ যে কোনো জঙ্গি হামলা বা বোমা হামলার মাধ্যমে হত্যাকান্ড সংঘটনসহ নাশকতামূলক কর্মকান্ড করতে পারে। তাই পুলিশের সব ইউনিটকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে যথাযথ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আমরা মনে করি, এর আগে বিভিন্ন সময়ের নাশকতার ঘটনাগুলো  যেমন আমলে নিতে হবে, তেমনিভাবে বর্তমান অবস্থা বিচার বিশে¬ষণ সাপেক্ষে গোয়েন্দাদের তথ্য আমলে নিয়ে সব ধরনের পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে।  আমরা বলতে চাই, দেশ থেকে জঙ্গিবাদ র্নির্মূলে কাজ করতে হবে সংশি¬ষ্টদেরই। এছাড়া মাঝে মধ্যে জঙ্গি সদস্যদের গ্রেপ্তার ঘটনা ঘটে, যার মধ্য দিয়েও তাদের সক্রিয়তা প্রকাশ পায়। ফলে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিশ্চিত করা জরুরি। জানা যাচ্ছে, উগ্রপন্থি বা তাদের সংগঠনের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি, পুলিশের সবাইকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বজায় রাখা, পুলিশের গাড়ি-স্থাপনা খালি বা পরিত্যক্তভাবে ফেলে না রাখা, পুলিশের ভবনগুলোতে প্রবেশের সময় নিরাপত্তা ও পরিচয় নিশ্চিত করা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি করা, চেকপোস্টে তল¬াশি বাড়ানো, সন্দেহ হলে ব্যাগ-দেহ তলস্নাশি করা, সন্দেহজনক এলাকায় বস্নক রেইড করতে সংশি¬ষ্ট ইউনিটগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। ফলে সার্বিক পরিস্থিতি আমলে নিয়ে সব ধরনের উদ্যোগের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন জরুরি। সর্বোপরি আমরা বলতে চাই, দেশকে অস্থিতিশীল করতে কিংবা  যে কোনো ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটাতে যারা তৎপর তাদের রুখে দিতে হবে। জঙ্গিবাদ নির্মূলে করণীয় নির্ধারণ সাপেক্ষে কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। ভুলে যাওয়া যাবে না, এটা সম্প্রীতির দেশ। এ দেশে একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করে। বৈশ্বিক জঙ্গিবাদ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সার্বিকভাবে জঙ্গিবাদের ব্যাপারে সদা-সতর্ক থাকা এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ জারি রাখা আবশ্যক।

 

 

 

চামড়া শিল্পের পতন

তিন বছর আগে, ২০১৭ সালে চামড়াকে  ‘প্রডাক্ট অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করেছিল সরকার। লক্ষ্য ছিল ২০২১ সালের মধ্যে চামড়া শিল্প খাত থেকে বছরে ৫০০ কোটি ডলারের রপ্তানি আয়। কিন্তু বিগত তিন বছরে রপ্তানি আয় যেমন ধারাবাহিকভাবে কমেছে তেমনি অভ্যন্তরীণ বাজারে চামড়ার দাম কমতে কমতে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এমন বাস্তবতায় ঈদুল আজহায় চামড়ার মৌসুম সামনে রেখে আবারও কমানো হয়েছে চামড়ার দাম। বাণিজ্যমন্ত্রী বলছেন, বাজার ছোট হয়ে গেছে। ট্যানারি মালিকরা বলছেন আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা নেই। ব্যবসায়ীরা বলছেন বিক্রি করতে পারেন না বলেই চামড়া কেনেন না তারা। অথচ, সরকার প্রতি বছরই চামড়া কেনার জন্য ট্যানারি মালিকদের স্বল্পসুদে ঋণ দিয়ে যাচ্ছে আর সেই ঋণের বেশিরভাগই অনাদায়ী থেকে যাচ্ছে। সংগত কারণেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, চামড়া শিল্পের উন্নয়ন ও ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরে সরকারের শত শত কোটি টাকার প্রল্পের কোনো সুফল এখনো পাওয়া যাচ্ছে না কেন? সোমবার দেশ রূপান্তরে ‘সাত বছরে দাম কমেছে ৫৬%’ শিরোনামের প্রতিবেদনে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিমুখী এই শিল্প খাতে ধারাবাহিক দরপতনের খবর প্রকাাশিত হয়।  প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েক বছর ধরেই ব্যবসায়ীদের স্বার্থে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার দাম কমাচ্ছে সরকার। গত ঈদে নজিরবিহীন বিপর্যয়ের পর এবার গত বছরের তুলনায় আরও ৩০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে কাঁচা চামড়ার দাম। এবার ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। ঢাকার বাইরে গরুর চামড়া ২৮-৩২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়া ১৩-১৫ আর বকরির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ থেকে ১২ টাকা। রবিবার বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির সঙ্গে চামড়া ব্যবসায়ীদের বৈঠকে এ দাম ঘোষণা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে সাত বছরের ব্যবধানে লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম কমল ৫৬ শতাংশ। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৪ সালে কোরবানির গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭৫  থেকে ৮০ টাকা। পরের বছর একবারে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ কমিয়ে ৫০ টাকায় নামিয়ে আনা হয়। ২০১৬ সালে এই চামড়ার দাম ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় নির্ধারণ করা হয়। ২০১৮ সালে আবারও কমিয়ে তা ৪৫  থেকে ৫০ টাকায় নির্ধারণ করা হয়। ২০১৯ সালের কোরবানির ঈদে ৩১ বছরের মধ্যে কাঁচা চামড়ার দরে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় নেমে আসে। দাম না পেয়ে অনেকেই ক্ষোভে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেন।  বলাবাহুল্য দেশে বার্ষিক চাহিদার ৫০ শতাংশ চামড়াই ঈদুল আজহার সময়ে সংগ্রহ করেন ট্যানারি মালিকরা। কিন্তু রাজধানীর হাজারীবাগ  থেকে ট্যানারি পল্লী সাভারের হেমায়েতপুরে স্থানান্তরের পর থেকেই চামড়ার দাম নিয়ে অরাজকতা চলছে। প্রতি বছরই ব্যবসায়ীদের স্বার্থে চামড়ার দাম কমিয়ে নির্ধারণ করছে সরকার। চামড়ার দাম কমানোর পাশাপাশি চামড়া কিনতে প্রতি বছর ট্যানারি মালিকদের স্বল্পসুদে ঋণও দিচ্ছে সরকার। এবার কোরবানির ঈদে কাঁচা চামড়া কিনতে রাষ্ট্রায়ত্ত  সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক ট্যানারি ব্যবসায়ীদের ঋণ দিতে ৫৮৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। ২০১৯ সালে ২৩ ট্যানারি শিল্পকে রাষ্ট্রায়ত্ত এ চার ব্যাংক মোট ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ সুবিধা দিয়েছিল। কিন্তু ঋণ নিলেও অনেকেই তা পরিশোধ না করায় এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। এদিকে কয়েক বছর ধরেই চামড়া খাতের রপ্তানি আয় একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আর করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী লকডাউনে সর্বশেষ হিসাব বছরে এ খাতের আয় ৭৯ কোটি ৭৬ লাখ ডলারে নেমে আসে। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় চামড়া থেকে রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ার তথ্যটি আসলে অসম্পূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজার ছোট হয়ে যাওয়ার নেপথ্যে বড় কারণটি হলো, দেশের চামড়া শিল্প কারখানাগুলোর পরিবেশগত সনদ বা যথাযথ কমপ্লায়েন্স না থাকা। ফলে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে সরাসরি চামড়া বিক্রি করা যাচ্ছে না। সাভারের  হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। এছাড়া চামড়া কাটার পর বর্জ্য কোথায়  ফেলা হবে, নির্ধারণ হয়নি সেটিও। এসব কারণে এলডব্লিউজি ও আইএসও সার্টিফিকেটও পাওয়া যাচ্ছে না। আর এ কারণেই চামড়া রপ্তানি মূলত চীনভিত্তিক হয়ে পড়েছে। এছাড়া কোরিয়া, হংকং, ভিয়েতনামের বাইরে কিছু চামড়া ইতালিতে রপ্তানি হয়। এ অবস্থায় চামড়া শিল্পের পতন ঠেকাতে চামড়া শিল্পনগরীর সিইটিপি দ্রুত সম্পন্ন করা এবং দেশের বাজারে চামড়ার যৌক্তিক দাম নির্ধারণে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে।

 

 

স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশা, দায় কার?

করোনা সংক্রমণের চারমাস অতিবাহিত হয়ে গেল। দিন দিন আক্রান্তের সংখ্যা, মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলছে। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও প্রিন্ট মিডিয়া থেকে শুরু করে অনলাইন মিডিয়া সবখানেই নেতিবাচক শব্দে সয়লাব। করোনা টেস্ট নিয়ে দুর্নীতি, ভুয়া রিপোর্ট তৈরি, চিকিৎসাসেবার নামে হয়রানি, টাকা আত্মসাৎ এমন সংবাদে সবাই দিশাহারা। দেশের স্বাস্থ্য খাতের এমন বেহাল দশার জন্য দায়ী কে। এমন প্রশ্নের উত্তর কে দেবে। এন ৯৫ মাস্ক ক্রয়ে কেলেঙ্কারি, পিপিইসহ নানান রকম সুরক্ষা সামগ্রীর মান নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ, ভুতুড়ে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বিল, অবকাঠামো দুর্বলতাসহ বিভিন্ন ধরনের বিষয় চলে এসেছে সামনে। স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ এই প্রথম নয়। গত বছরের শেষের দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পর্দা কেনা নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছিল তখন। একটি পর্দা কিনতে দাম দেখানো হয়েছিল ৩৭ লাখ টাকা। টিআইবির মতেও চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনকহারে দুর্নীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই ভয়াবহ দুর্নীতিগুলোর তদন্ত কমিটি  তৈরি আর অনুসন্ধান পর্যন্তই থেমে যায় বারবার। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে আরিফ, সাবরিনা, সাহেদ কিংবা মিঠুর মতো দুর্নীতিবাজদের ধরা হলেও, তাদের আইনের আওতায় আনা হলেও, তাদের যারা মদদ দিয়ে আসছে, রাজনৈতিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে তারা থেকে যাচ্ছে পর্দার আড়ালে। তাদের হাতে আবারও তৈরি হয় নতুন সাহেদ, সাবরিনারা। এসব মানুষরূপী মনুষ্যত্বহীন মুখোশধারী অমানুষ একদিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে তাদের পাপের রাজত্বের বিকাশে বলি হতে হয়েছে দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের। করোনার মতো মরণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য আসা মানুষজন সর্বস্ব হারিয়ে নিদারুণ কষ্টে দিন পার করে পাড়ি জমিয়েছে না ফেরার  দেশে। যার যায় শুধু সেই বোঝে বিচ্ছেদের কি যন্ত্রণা। স্বাস্থ্য খাত দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। করোনা মহামারি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, এ দেশের স্বাস্থ্যসেবার বর্তমান অবস্থা। স্বাস্থ্যসেবার নামে নানান রকম হয়রানির স্বীকার হয়ে দেশের আপামর জনসাধারণ এখন হাসপাতাল বিমুখী। কিন্তু প্রতি বছর বাজেটে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও কিছু দুর্নীতি পরায়ণ মানুষের কারণে প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। প্রসঙ্গত করোনার সংক্রমণের শুরুর দিকে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর যে ভরসা ছিল তা এখন নেই বললেই চলে। একের পর এক দুর্নীতি, অভিযোগের সত্যতা বের হয়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলো এখন মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসা  মৌলিক অধিকার। এ অধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত করার অধিকার কারও নেই। করোনা সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে তিনটি বিষয় খুবই জরুরি। প্রথমে টেস্টের মাধ্যমে শনাক্ত করা, দ্বিতীয়ত করোনা আক্রান্ত রোগীকে আলাদা করা, তৃতীয়ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। কিন্তু প্রত্যেকটি বিষয়েই আমরা শুরু থেকেই ব্যর্থ হয়ে আসছি। তবুও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মুখে তার কোনো ছাপ নেই। তারা  দেখেও যেন না দেখার ভান করছে। স্বাস্থ্য খাতের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে এত এত দুর্নীতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এর দায় সরকারকেই নিতে হবে। তাদের আরও সচেতন হতে হবে, আরও কঠোর হতে হবে। সাহেদ, সাবরিনাদের মতো এরকম দুর্নীতিবাজ মানুষের অভাব নেই আমাদের চারপাশে। এদের এতদিন ধরে যারা পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে, তাদেরও অচিরেই খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে। খাতা-কলমে জিরো টলারেন্স লিখে কখনো অপরাধীকে থামিয়ে রাখা যায় না। এরা মুখোশ পরে ঘুরে  বেড়ায়। এদের কঠোরহস্তে দমন না করতে পারলে চিকিৎসাসেবা কিংবা হাসপাতালগুলোর প্রতি দেশের মানুষের আস্থা কমে যাবে। স্বাস্থ্য খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এসব দুর্নীতিবাজদের দ্রুত অঙ্কুরে বিনষ্ট করে স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে,  দেশকে বাঁচাতে হলে, দেশের মানুষকে বাঁচাতে হবে।  দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে এর বিকল্প নেই।

 

বিদেশি বিনিয়োগ

আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। বিশ্বরাজনীতির নয়া মেরুকরণে চীন থেকে ব্যবসা সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলো। এশিয়ার সবচেয়ে শিল্পসমৃদ্ধ দেশ জাপানও রয়েছে একই কাতারে। জাপানের ৮৭টি কোম্পানি চীন থেকে তাদের বিনিয়োগ ধারেকাছের দেশগুলোয় নিয়ে গেলেও একটিও আকর্ষণ করতে পারেনি বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে জাপানের সঙ্গে বোঝাপড়া সন্তোষজনক হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি ও অনিয়মের বাড়াবাড়িসহ আরও কিছু কারণে জাপানি বিনিয়োগকারীরা আকর্ষণ বোধ করেননি। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, লাওস, মালয়েশিয়া তো বটেই; মিয়ানমারকেও তারা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হওয়ার প্রধান কারণ আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতি-অনিয়মের বাড়াবাড়ি। সভ্য দেশের বিনিয়োগকারীরা চান না কেউ তাদের নাকে দড়ি বেঁধে ঘোরাবে। বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এটি আমলাদের ঐতিহ্যের অংশ হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগ কাক্সিক্ষত মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে না। সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশ, সস্তা শ্রম ও বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য বিদেশিরা বাংলাদেশের প্রতি আকর্ষণ বোধ করলেও আমলাতান্ত্রিকতার ভয়ে প্রায়ই তারা পিছু হটতে বাধ্য হন। বিশেষজ্ঞদের মতে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য আকর্ষণে জটিলতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। বিশ্বব্যাংকের সহজে ব্যবসা করার সূচক বা ইজি অব ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮৯টি দেশের মধ্যে ১৬৮তম। এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম ৭০, থাইল্যান্ড ২১ ও ইন্দোনেশিয়া ৭৩তম স্থানে। মিয়ানমারের অবস্থানও বাংলাদেশের তিন ধাপ আগে, ১৬৫তম। এ সূচকেই বোঝা যায়, বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগ টানার ক্ষেত্রে কতটা প্রস্তুত। দেশের দ্রুত উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে বিদেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা দরকার। এ উদ্দেশ্যে পুরো বিষয়টির নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষকে যতœবান হবে।

মাস্কের ব্যবহার সর্বত্র নিশ্চিত করতে হবে

করোনাভাইরাসে বিশ্বের প্রায় দেড় কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে,  কেড়ে নিয়েছে ৬ লাখের বেশি মানুষের প্রাণ। পুরুষের ক্ষেত্রে এ ভাইরাসে মৃত্যুর হার নারীদের তুলনায় অনেক বেশি। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এখন মাস্ক ব্যবহারের ওপর আগের  চেয়ে অনেক বেশি জোর দিচ্ছেন, কারণ করোনাভাইরাস যে বাতাসের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে, সাম্প্রতিক সে বিষয়ে জোরালো প্রমাণ আসতে শুরু করেছে। অনেক বিশেষজ্ঞ এখন বলছেন, হাঁচি-কাশির এবং বড় আকারের ড্রপলেটের মাধ্যমে যেমন করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে, তেমনি বাতাসে ভেসে ঘরের  ভেতরে বেশ কিছুদূর ছড়িয়ে পড়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাইরাল কণা থেকেও সংক্রমণ ঘটতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শুরুর দিকে মাস্ক ব্যবহারে ততটা জোর দেয়নি। কিন্তু এখন জাতিসংঘের এ সংস্থাও বলছে, বদ্ধ জায়গায় যেখানে বেশি মানুষের সমাগম হয়, অথবা  যেখানে দূরত্বের নিয়ম মেনে চলা সম্ভব না, সেখানে মাস্ক পরা দরকার। অনেক দেশেই এখন দোকানে ও গণপরিবহণে মাস্ক পরে থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, দেশের সর্বস্তরে মাস্কের ব্যবহার নিশ্চিত করতে নির্দেশনা জারি করেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। পরিপত্রে বলা হয়, সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিসে কর্মরত কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সংশি¬ষ্ট অফিসে আগত সেবাগ্রহীতারা বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক ব্যবহার করবেন। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালসহ সব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে আসা সেবাগ্রহীতারা আবশ্যিকভাবে মাস্ক ব্যবহার করবেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির ও গির্জাসহ সব ধর্মীয় উপসনালয়ে মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শপিং মল, বিপণিবিতান ও দোকানের ক্রেতা-বিক্রেতারা আবশ্যিকভাবে মাস্ক ব্যবহার করবেন। হাটবাজারে ক্রেতা-বিক্রেতারা মাস্ক ব্যবহার করবেন। মাস্ক পরিধান ছাড়া ক্রেতা-বিক্রেতারা কোনো পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করবে না। গণপরিবহণের (সড়ক, নৌ, রেল ও আকাশপথ) চালক, চালকের সহকারী ও যাত্রীদের মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পরিবহণে আরোহণের আগে যাত্রীদের মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিসহ সব শিল্প-কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও হকার, রিকশা ও ভ্যানচালকসহ সব পথচারীর মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। হোটেল ও রেস্টুরেন্টে কর্মরত ব্যক্তি এবং জনসমাবেশ চলাকালীন আবশ্যিকভাবে মাস্ক পরিধান করবেন। সবক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করবেন। এটা সত্য, সারা বিশ্বে মহামারি হয়ে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস প্রতিরোধে লকডাউনের চেয়েও সবচেয়ে কার্যকর পন্থা হলো মাস্ক ব্যবহার করা। কারণ করোনাভাইরাস মূলত বাতাসে ড্রপলেটস বা মুখ থেকে নিঃসৃত মিহি জলকণার মাধ্যমে ছড়ায়। আর মাস্ক ব্যবহার করলে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায় বলে এক গবেষণায় বলা হয়েছে। আমরাও তাই মনে করি।  দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের দেশের জনগণ মাস্ক পরার ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন। মাস্ক পরা ছাড়া  যে যার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে, গা ঘেঁষে খোশ গল্পে মেতে উঠছে। রাস্তায় বের হলেই এই ধরনের দৃশ্য চোখে পড়ে। ফলে বিপদ বাড়ছে। আমরা মনে করি, সরকারকে এ ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করা উচিত। যারা মাস্ক না পরে বাইরে বের হবে, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

চতুর্মুখী সংকটে চামড়াশিল্প

বাংলাদেশের রপ্তানির দ্বিতীয় শীর্ষ খাত হচ্ছে চামড়া, জুতা ও চামড়াজাত পণ্য। এসব পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার হচ্ছে জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, পশ্চিম ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান। কিন্তু কোভিড ১৯-এর প্রভাবে এসব দেশ রীতিমতো কাঁপছে। দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে। অ্যাডিডাস, নাইকি, ক্লার্কসের মতো বড় বড় ব্র্যান্ডের বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। এতে দেশের দ্বিতীয় শীর্ষ রপ্তানি খাত ঝুঁকির মুখে পড়েছে। চার বছর ধরে বাংলাদেশের চামড়া রপ্তানির চিত্র হতাশাজনক। এর মূল কারণ বাংলাদেশি ট্যানারিগুলোয় কমপ¬ায়েন্স অর্থাৎ মানসম্পন্ন ও পরিবেশসম্মত কারখানা না থাকা। শ্রমিকরা কাজ করছে দূষিত পরিবেশে। গত বছর দেশের চামড়া খাতে রপ্তানি কম হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার ২৭ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি কমেছে প্রক্রিয়াজাত চামড়া ও চামড়াজাত জুতার রপ্তানি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ট্যানারিগুলোয় এখনো অবিক্রীত রয়েছে ৭০০  কোটি টাকার চামড়া। তাদের মতে, এবারের কোরবানির কাঁচা চামড়া কেনার বিষয়টি প্রায় পুরোটাই নির্ভর করছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর। বিদায়ী অর্থবছরে ব্যাগ, বেল্ট, জ্যাকেটের মতো পণ্যের রপ্তানি হয়েছে প্রায় ২২ কোটি ৫ লাখ ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১১ শতাংশ কম। সবচেয়ে আশার পথ  দেখানো জুতার রপ্তানি কমেছে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে চামড়া খাতের মূল সমস্যা উৎপাদন প্রক্রিয়ার দূষণ, যার সঙ্গে করোনা বাড়তি সংকট তৈরি করেছে। গেল ঈদুল আজহার সময় যে পশুর চামড়া নিয়ে মহাকেলেঙ্কারি হলো, তার জন্য চামড়াশিল্পের মালিকরা সাভারে স্থাপিত নতুন চামড়া শিল্পনগরীর অবকাঠামোগত সমস্যাকে দায়ী করেছিলেন। প্রতিষ্ঠার পর কয়েক বছর পার হলেও সাভার চামড়াশিল্পের কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) প্রস্তুত না হওয়া এবং কঠিন বর্জ্য  ফেলার জায়গা বা ডাম্পিং ইয়ার্ডের কাজ শুরু না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক। আন্তর্জাতিক বেশ কিছু বড় কোম্পানি আমাদের চামড়াজাতদ্রব্য আমদানি করে না এ কারণে যে, আমাদের ট্যানারিশিল্পগুলো পরিবেশ সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা মেনে চলে না। আমরা যদি দেশি ট্যানারিশিল্পের পরিবেশগত বাধ্যবাধকতা রক্ষা করে গুণগত মানসম্পন্ন চামড়া পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদন করতে পারি, তবে রপ্তানিও বাড়বে এবং দেশে বিদেশ থেকে চামড়া আমদানির প্রয়োজন হবে না। এদিকেই আমাদের মনোযোগী হওয়া উচিত।

এক কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ

মানুষ ও পরিবেশ এই শব্দ দুটোর মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। পরিবেশের মধ্যে প্রাকৃতিক পরিবেশ একটি উজ্জ্বল দিক- যা মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। প্রাকৃতিক পরিবেশের একটি প্রধান দিক বৃক্ষ। জীবন ও পরিবেশ বাঁচানোর ক্ষেত্রে বৃক্ষের ভূমিকা অনস্বীকার্য। অথচ মানুষই এখন বৃক্ষের প্রধান শক্রতে পরিণত হয়েছে। যত্রতত্র বৃক্ষ নিধন করা হচ্ছে। বন উজাড় করে বসতি গড়ে তোলা হচ্ছে। আরও কত কী। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে একটি ইতিবাচক সংবাদ হলো, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সারাদেশে এক কোটি গাছের চারা রোপণ কর্মসূচি বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে। ওই দিন সকালে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিনটি গাছের চারা রোপণ করে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী এই কর্সসূচির উদ্বোধন করার পর প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় স্বাস্থ্য নির্দেশিকা মেনে একটি করে ফলদ ও ঔষধি চারা রোপণ করা হয়েছে। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সারাদেশে এক কোটি গাছের চারা রোপণ শেষ করতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, সরকারের পক্ষ থেকে এসব চারা বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে। উপজেলা পরিবেশ ও বন উন্নয়ন কমিটির মাধ্যমে চারা বিতরণ করা হবে। কে কোথায় গাছ লাগাবেন এবং কারা এসব গাছের চারা পাবেন তা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সভাপতিত্বে সভায় ঠিক করা হয়েছে। এক কোটি গাছের চারার মধ্যে ৫০ শতাংশ ফলজ এবং বাকি ৫০ শতাংশ বনজ, ঔষধি ও শোভাবর্ধনকারী। কোনো বিদেশি প্রজাতির গাছের চারা লাগানো হবে না। দেশের প্রতিটি উপজেলায় ২০ হাজার ৩২৫টি করে বনজ, ফলদ ও ঔষধি গাছ বিতরণ করতে বন বিভাগের নার্সারিগুলোতে সেগুলো উৎপন্ন করা হয়েছে।  আমরা মনে করি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে সরকারের এই উদ্যোগ খুবই প্রশংসনীয়। তবে চারা লাগানোই শেষ নয়, একটি চারাও যাতে নষ্ট না হয় সেদিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। সে জন্য করতে হবে এর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে এটা একটা অনন্য উদ্যোগ। সুস্থ জীবনের জন্য বৃক্ষ সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। নির্মল বায়ু ও অক্সিজেন দান করে বৃক্ষ। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন করি। মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কটা মানব সৃষ্টির শুরু থেকেই। তবে প্রকৃতি বনাম মানুষের লড়াইটা শুরু হয়েছে তখনই, যখন মানুষ নিজেদের নগ্ন স্বার্থ হাসিলের জন্য বৃক্ষ নিধন শুরু করেছে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি যদি সচেতন ও উদ্যোগী না হন, বৃক্ষের মর্ম উপলব্ধি করতে না পারেন, তা হলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষিত হবে কীভাবে, আর কীভাবেই বা মানুষ সুস্থভাবে জীবনযাপন করবে। দেশের জনসাধারণ ও সরকারের পরিকল্পিত উদ্যোগই কেবল পারে  দেশ আবার বৃক্ষ শোভিত হয়ে সমৃদ্ধ হতে। এ ক্ষেত্রে নগরকেও এই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। যে করেই  হোক বৃক্ষ নিধন বন্ধ করতে হবে। আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য ও সমৃদ্ধ দেশ আমাদেরই  রেখে যেতে হবে। সে লক্ষ্য নিয়ে আমাদের অগ্রসর হওয়া উচিত।

 

 

২২

 

 

বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস

প্রাণঘাতী করোনার আক্রমণে লন্ডভন্ড গোটা বিশ্ব। আমাদের  দেশেও করোনার থাবা। ভাইরাসের বিস্তার কমাতে কয়েক মাস ধরে ভার্সিটি বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত হয়তো বন্ধ থাকবে। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে  সেটাও আমরা জানি না। ফলে ছাত্রছাত্রীরা দীর্ঘদিন ধরে বাড়িতে অবসর সময় পার করছে। কিন্তু ছাত্রজীবনে দীর্ঘদিন পড়াশোনার বাইরে থাকা উচিত নয়। তাই ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনায় ফিরিয়ে আনতে অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও সীমিত আকারে অনলাইন ক্লাস চালু হয়েছে। পাশাপাশি আমরা যে সেশনজটে পড়েছি তা কিছুটা হলেও কমার আশা দেখাচ্ছে অনলাইন ক্লাস। দীর্ঘদিন অবসরে থাকার ফলে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিষন্নতা বিরাজ করছে। অনলাইন ক্লাস আমাদের মানসিকভাবে চাঙ্গা করবে। কিন্তু এখানে আছে নানা প্রতিবন্ধকতা। যেমন- অনলাইন ক্লাস করতে সবার বাধ্যাতামূলক অ্যান্ড্রয়েড ফোন বা পিসি লাগবে  সেটা সবার নেই। সাধারণত অনলাইনে ক্লাস নেওয়া হয় স্কাইপি বা জুম অ্যাপের মাধ্যমে। আর এর জন্য দরকার দ্রুতগতির ইন্টারনেট। কিন্তু গ্রাম অঞ্চলে ইন্টারনেট স্পিড কম। অনেক সময় ঘরের বাইরে, ছাদে অথবা ফাঁকা জায়গায়  নেটওয়ার্কের ভালো স্পিড পাওয়া গেলেও বর্তমান আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় তা সম্ভব নয়। ফলে গ্রামের শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে উপস্থিত থাকা অনেকটাই কষ্টসাধ্য। আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থীর বাড়ি গ্রামাঞ্চলে। পাবলিকের বেশির ভাগ ছাত্র মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। অনেকে দরিদ্র পরিবার থেকেও পাবলিকে পড়তে আসে। করোনা পরিস্থিতিতে তাদের পরিবার হাল ধরতে হয়েছে। এমতাবস্থায় তারা অনলাইন ক্লাসকে বিলাসিতা মনে করছেন। অনলাইনে ক্লাস করতে প্রচুর ডেটা প্রয়োজন। তাই শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ইন্টেরনেট সেবা প্রদান না করলে করোনার এ পরিস্থিতিতে এত ডেটা কিনে ক্লাস করা অনেকের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। অনলাইনে ক্লাস হলে  তো পরীক্ষাও হবে। অনলাইন পরীক্ষার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীকে যথাযথ মূল্যায়ন করা অসম্ভব। আর অনলাইন পরীক্ষাও আমাদের কাছে নতুন। নেট বাফারিং বা প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কেউ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে না পারলে তাকে পিছিয়ে পড়তে হবে এবং অনেক শিক্ষার্থী আশানুরূপ রেজাল্ট করতে পারবে না। একজন ছাত্র যে স্বপ্ন নিয়ে ভার্সিটিতে আসছে তা ধূলিসাৎ হবে, নিরাশ হতে হবে তার পরিবারকে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রের আয়ের উৎস টিউশন। টিউশন করিয়ে নিজের খরচ মেটানোর পাশাপাশি পরিবারকে সাহায্য করতে হয়। এখন সেটাও বন্ধ। এমতাবস্থায় তাদের পরিবার নিয়ে কষ্টের দিনযাপন করতে হচ্ছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাসের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। তাদের বিষয়টাও ভাবতে হবে। করোনা দুর্যোগে সরকারি চাকরিজীবী ছাড়া সব পেশাজীবীর আয়- রোজগার সংকুচিত হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস চালু হওয়ায় দিতে হচ্ছে  সেমিস্টার ফি। এ পরিস্থিতিতে সেমিস্টার ফি কমানো না হলে তা অনেকের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। অনেক সাবজেক্টের ব্যবহারিক আছে যা সংশ্লিষ্ট ল্যাব এবং ফিল্ডে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিখতে হয়। অনলাইনে এসব শেখা একদমই অসম্ভব। অনলাইনে ক্লাস নিতে অনেক স্যারের অভিজ্ঞতা এবং প্রশিক্ষণ নেই। পাশাপাশি ছাত্ররাও অনলাইন ক্লাসে অভ্যস্ত নয়। টানা ৫-৬ ঘণ্টা অনলাইন ক্লাসের ফলে একঘেয়েমি পেয়ে বসার সম্ভাবনা বেশি। অনলাইনে দীর্ঘসময় মনোযোগ ধরে রাখা কষ্টসাধ্য। এখানে থাকে না শিক্ষকের মনিটরিং। এসব কারণে অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। অনলাইন ক্লাসের মূল সমস্যা শিক্ষার গুণগত মান ঠিক না থাকা। তাই অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে ডিগ্রি দেওয়া হলে তার প্রভাব পড়বে করোনার পরবর্তী সময়ে যা পুরো জাতির জন্য ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়াবে। সর্বোপরি, এসব সমস্যাকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিয়ে অনলাইন ক্লাস চালু হলে তা সবার জন্য ফলপ্রসূ হবে। অন্যথায় অনলাইন ক্লাস লোক দেখানো এবং বিলাসিতা ছাড়া  কোনো কাজে আসবে না।

 

 

বেড়েছে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা

আমরা কিছুতেই রক্ষা করতে পারছি না আমাদের নারী ও শিশুদের। তারা নানাভাবে অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ধর্ষণ করা হচ্ছে তাদের। এমনকি হত্যার শিকারও হচ্ছে নারী শিশুরা। এই নিষ্ঠুর কাজে স্বজনরাও জড়িয়ে পড়ছে। এটা সামাজিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত নজির। এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) পক্ষ থেকে কর্ম এলাকায় জুন মাসে ৫৩টি জেলার মোট ৫৭ হাজার ৭০৪ জন নারী ও শিশুর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৭৪০ জন নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন। নারীর সংখ্যা ৯ হাজার ৮৪৪ জন আর শিশুর সংখ্যা ২ হাজার ৮৯৬ জন। শিশুদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা ১ হাজার ৬৭৭, অর্থাৎ শতকরা ৫৮ ভাগ, আর ছেলেদের সংখ্যা ১ হাজার ২১৯, অর্থাৎ শতকরা ৪২ ভাগ। এই তথ্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। অভিযোগ রয়েছে, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ করা, বিশেষ করে বাল্যবিয়ে ঠেকানোর কাজটি মাঠপর্যায়ে ঢিমে তালে চলছে। বিচারহীনতার পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন ব্যবস্থা বা প্রতিরোধ কার্যক্রমগুলো পুরোপুরি সক্রিয় না থাকায় পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করছে। এটা  কোনোভাবেই অস্বীকারের উপায় নেই, ঘরে-বাইরে নারী বিভিন্ন অসমতা বা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। নারীকে যথাযথ সম্মান করা হয় না। নারীর কাজের যে অবদান, তার স্বীকৃতি  নেই। এই বিষয়গুলো নারী নির্যাতনকে সব সময় উসকে  দেয়। করোনার সময়ে এসব পরিস্থিতির সঙ্গে মানুষের কাজ না থাকা, অভাব প্রকটতর হওয়াসহ অন্য চ্যালেঞ্জগুলো যোগ হচ্ছে। আর এর ফলে নারী ও শিশুরা বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আর করোনাকাল যত দীর্ঘ হচ্ছে, তত শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। এটা সত্য, সমাজের এক শ্রেণির বর্বর পাষন্ড মানুষের হাতে অনেকের জীবনই বিপন্ন হয়ে পড়ছে, অবলীলায় জীবন চলে যাচ্ছে। এমনকি নারী শিশুর জীবনও চলে যাচ্ছে। ফলে সমাজে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। ঠুনকো কারণে শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে। আপনজনের হাতেও শিশুর জীবন চলে যাচ্ছে। কেবল তাই নয়, আমাদের কোমলমতি শিশুরা অবলীলায় নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। অথচ শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সমাজ তথা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একইভাবে দায়িত্ব নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ কান্ডারি। শিশুর সুস্থ বিকাশ কীভাবে হবে এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের নতুনভাবে ভাবা উচিত। আমরা দীর্ঘদিন থেকে লক্ষ্য করে আসছি, শিশুশ্রম বন্ধের কথা বলা হলেও এ ব্যাপারে  কোনো ধরনের কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না, বরং করোনাকালে তা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে- যা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। যেভাবেই হোক নারী ও শিশু নির্যাতন ও হত্যা বন্ধ করতে হবে। বন্ধ করতে হবে শিশুশ্রম।  এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ না নেয়ার কারণেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এই ধরনের জঘন্য প্রবণতা রোধ করতে না পাড়লে একদিকে  যেমন পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে অন্যদিকে নারী শিশুরাও থাকবে নিরাপত্তাহীন। পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনবে। সুতরাং সময় থাকতেই সাবধান হওয়া সমীচীন।

 

 

সংক্রমণঝুঁকি এড়াতে উদ্যোগ নিন

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে পুরো বিশ্বই ভয়ংকর পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। দেশেও বাড়ছে করোনার সংক্রমণ, বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। আর করোনার কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে প্রতিটা খাত। সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে এমনটিও জানা যাচ্ছে  যে, করোনা মহামারির কারণে পেশায় পরিবর্তন এনেছেন রাজধানীর হকাররা। প্যান্ট, শার্ট, ফল বিক্রি বাদ দিয়ে সুরক্ষাসামগ্রী বিক্রিতে ঝুঁকছেন তারা। নিজ ব্যবসার চরম মন্দা  দেখা দেওয়ায় সুরক্ষাসামগ্রী বিক্রি করে কোনোমতে জীবিকা নির্বাহ করছেন ফুটপাতের হকাররা এমনটি খবরে উঠে এসেছে। তবে এ  ক্ষেত্রে যে বিষয়টি উল্লেখ করা দরকার- তা হলো, সুরক্ষাসামগ্রীর অবাধ বিক্রিতে সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে আমরা মনে করি, যে আশঙ্কার বিষয়টি উঠে আসছে তা আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ সমীচীন। সংশ্লিষ্টদের এটা আমলে  নেওয়া জরুরি যে, ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, জীবনের তাগিদে অনেকটা বাধ্য হয়েই ব্যবসা পরিবর্তন করেছেন তারা। তবে এ ব্যবসায়ও প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো মুনাফা পাচ্ছেন না। এ মহামারির সময় কোনোমতে পরিবার নিয়ে দুবেলা-দুমুঠো খেয়ে বেঁচে আছেন এমনটি জানা যাচ্ছে। আরেকটি বিষয় সামনে আসছে তা হলো, নকলের ছড়াছড়ি থাকায় ফুটপাতের সুরক্ষাসামগ্রীর ওপর অনেকেই আস্থা রাখছেন না।  যেসব হ্যান্ড স্যানিটাইজার তারা বিক্রি করছেন ফুটপাতে, সেসবের মান নিয়েও জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ ফুটপাতে সুরক্ষাসামগ্রীর মান নিয়ে অভিযোগ উঠে আসছে। আমরা মনে করি, সার্বিকভাবে এই বিষয়গুলোকে আমলে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে সংশ্লিষ্টদেরই। প্রসঙ্গত বলা দরকার, একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলছেন যে, ফুটপাতে সুরক্ষাসামগ্রী অনেক আগে থেকেই বিক্রি হয়। সুতরাং সচেতনতা আমাদের মধ্যে আগের থেকেই নেই। তবে এখানে অনেক মানহীনসামগ্রী বিক্রি করা হচ্ছে। এতে করে স্বাস্থ্যঝুঁঁকি বাড়তে পারে। এমন বিষয়ও উঠে আসছে যে, ব্যবহৃত মাস্ক ও গ্লাভস প্যাকেটজাত করে বাজারে চলে আসছে! এতে করে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সংক্রমণ বাড়তে পারে। ফলে এমনটি ঘটলে যে সাধারণ মানুষের জন্য খুবই ভয়ংকর হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কেননা, এতে করে সংক্রমণের মাত্রা অনেক বেড়ে যাবে এমন আশঙ্কার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। আর তাই এ মুহূর্তে সুরক্ষাসাগ্রীর ব্যাপারে সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন বলেও যখন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, তখন বিষয়টি আমলে নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি বলেই আমরা মনে করি।  বলার অপেক্ষা রাখে না, করোনা প্রতিরোধ যখন নানা ধরনের বিধিনিষেধ সামনে আসছে, বিচ্ছিন্নতা, পারস্পরিক দূরত্ব নিশ্চিত করাসহ স্বাস্থ্যবিধি মানতে বলা হচ্ছে- এমন অবস্থায় যদি হকাররা সুরক্ষাসামগ্রী বিক্রিতে ঝুঁকে পড়েন এবং এতে করে সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয় তবে তা কোনোভাবেই এড়ানোর সুযোগ নেই। সঙ্গত কারণেই সংশ্লিষ্টদের কর্তব্য হওয়া দরকার, সার্বিক পরিস্থিতি আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ ও তার যথাযথ বাস্তবায়নে কাজ করা। সর্বোপরি আমরা বলতে চাই, এর আগে ডব্লিউএফপির প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন, সুতার ওপর ঝুলে থাকা কোটি কোটি মানুষের জন্য কোভিড-১৯ ভয়াবহ বিপর্যয় হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। আর এটা লক্ষণীয় যে, দেশে ক্রমাগত সংক্রমণ ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, ফলে হকারদের সুরক্ষাসামগ্রী বিক্রিতে সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধির যে বিষয়টি সামনে আসছে তা কোনোভাবেই এড়ানো যাবে না। এ ক্ষেত্রে করণীয় নির্ধারণ সাপেক্ষে যথাযথ পদক্ষেপ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। পাশাপাশি করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ সার্বিকভাবে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা আমলে নিতে হবে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকি মোকাবিলায় সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা জারি থাকুক এমনটি কাম্য।

 

করোনায় সংকট বাড়ছে গ্রামেও

সারা বিশ্বই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মুখোমুখি। বলার অপেক্ষা রাখে না, মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিও টালমাটাল হয়ে পড়েছে। দেশেও বাড়ছে করোনার সংক্রমণ ও মৃতের সংখ্যা। নগরজীবন  যেমন বিপর্যস্ত হচ্ছে করোনার থাবায়, তেমনিভাবে সংকট বাড়ছে গ্রামেও। সম্প্রতি প্রকাশিত খবরে জানা গেল, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের থাবায় আয় কম ও কাজ হারিয়ে রাজধানীর অসংখ্য নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ রাজধানী ছেড়ে গ্রামে যাচ্ছেন। কেউ সপরিবারে আবার কেউ স্ত্রী-সন্তানকে পাঠিয়ে শুধু নিজে রয়ে গেছেন ঢাকায়। সঙ্গত কারণেই আমরা বলতে চাই, এমন পরিস্থিতিতে গ্রামীণ জনপদে কর্মসংস্থান হারিয়ে ঘরেফেরা মানুষের সংখ্যা যখন দিন দিন  বেড়েই চলছে- তখন বিষয়টি এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। জানা যাচ্ছে, জীবিকার কোনো উৎস না থাকায় গ্রাম ছেড়ে একদিন রাজধানীতে আসা মানুষের চাপ গ্রামগুলো কতটুকু নিতে পারবে তা কেউই ভাবেনি এবং এর পাশাপাশি করোনা সংক্রামণও গ্রামগুলোতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবমিলিয়ে গ্রামে আয়ের কোনো ব্যবস্থা না থাকার সঙ্গে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, শিক্ষাসহ মৌলিক চাহিদা পূরণ নিয়ে সংকট শুধু বাড়ছেই। সঙ্গত কারণেই সৃষ্ট পরিস্থিতি আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কর্তব্য হওয়া দরকার, করণীয় নির্ধারণ সাপেক্ষে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ ও তার বাস্তবায়নে কাজ করা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে। কোনোটি এখনো বন্ধ, কোনোটি চালু হলেও হয়েছে অনেক  ছোট পরিসরে। ফলে অনেক কর্মীকেই চাকরি হারাতে হয়েছে বা হচ্ছে।  ছোটখাটো ব্যবসা করতেন এমন অনেকে গত তিন মাসের লোকসান সামলে উঠতে পারছেন না- যাদের বড় একটা অংশ শহর ছেড়ে যাচ্ছেন। ফলে সংকট যে ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সংশ্লিষ্টদের এটাও আমলে নেওয়া সমীচীন যে, দেশের বিভিন্ন শ্রেণি- পেশার ২ হাজার ৩৭১ জনের সাক্ষাৎকার নিয়ে সম্প্রতি ব্র্যাক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। তাতে দেখা যায়, ৩৬ শতাংশ লোক চাকরি বা কাজের সুযোগ হারিয়েছেন। ৩ শতাংশ লোক চাকরি থাকলেও বেতন পাননি। আর দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে যারা কাজ করেন, তাদের ৬২ ভাগই কাজের সুযোগ হারিয়েছেন। করোনার কারণে ১০টি জেলার মানুষের আয় কমে গেছে। এ ছাড়া ঢাকা জেলার মানুষের আয় কমেছে ৬০ ভাগ। এই পরিসংখ্যানের বাইরেও বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের বিভিন্ন জরিপে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ রাজধানী ছেড়ে গ্রামে ফিরে গেছেন এমনটিও জানা গেছে। ফলে সামগ্রিক পরিস্থিতি আমলে নিয়ে এই সংকট নিরসনের উপায় খুঁজতে হবে। বলা দরকার, এর আগে এমন বিষয়ও আলোচনায় এসেছিল, করোনা মহামারির মুখে দেশে বেকার হয়ে পড়া নিম্ন-আয়ের অনেক মানুষকেই পথে পথে সাহায্য চাইতে বা ভিক্ষা করতেও দেখা গেছে। আর এখন স্থায়ীভাবে বিভিন্ন গ্রামে থাকা মানুষ বলছেন, গ্রামে এরই মধ্যে সংকট শুরু হয়ে গেছে। স্থায়ীভাবে অসংখ্য মানুষ গ্রামে আসায় নানামুখী নেতিবাচক প্রাভাব রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আয়ের উৎস। আর এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, গ্রামে ব্যয় কম হলেও একেবারে আয় ছাড়া চলা সম্ভব নয়। আমরা বলতে চাই, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সচেতনতা এবং কার্যকর উদ্যেগ হণ অপরিহার্য। পাশাপাশি এর প্রভাব বিবেচনায় রেখে উদ্যোগী হতে হবে। যখন গ্রামেও ক্রমাগত সংকট বাড়ছে, মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরছে এবং আয়ের উৎস নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হচ্ছে- তখন সার্বিক পরিস্থিতি আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যেগ গ্রহণের বিকল্প নেই। মনে রাখা দরকার, কৃষিনির্ভর গ্রামীণ জনপদের মানুষের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি। এরপরই রয়েছে প্রবাসী আয়। যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় অর্ধেক মানুষ। কিন্তু করোনায় চরম বিপাকে পড়েছেন গ্রামাঞ্চলের কৃষক থেকে শুরু করে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। একইসঙ্গে করোনাভাইরাসের চলমান প্রভাবে মানুষ গ্রামমুখী হচ্ছে। ফলে সামগ্রিকভাবে বাড়ছে সংকট। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের জরিপ বলছে, করোনার কারণে দেশের ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। আবার চাকরি হারানো মানুষ গ্রামমুখী হচ্ছেন, ফলে গ্রামে কর্মহীন মানুষের সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। সঙ্গত কারণেই সামগ্রিক পরিস্থিতি আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণও তার বাস্তবায়ন হোক এমনটি কাম্য।

 

 

টেস্ট না করেই  কোভিড-১৯ ‘পজিটিভ’ ও ‘নেগেটিভ’ সনদ

করোনা মহামারীর কারণে দেশ যখন বিপর্যস্ত ঠিক তখনই এই পরিস্থিতিকে সুযোগ নিয়ে একটি চক্র আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। যা লজ্জাজনক ও নিন্দনীয়। বর্তমান সময়ে সাধারণ চিকিৎসার জন্যও হাসপাতালগুলো রোগী ভর্তি হতে গেলেই করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট চায়। এই সার্টিফিকেট ছাড়া রোগী ভর্তি তো দূরের কথা, অনেক সময় চিকিৎসাই দিতে চায় না তারা। এর বাইরে কর্মস্থল, পোশাক কারখানা এবং ভ্রমণের জন্য করোনা  নেগেটিভ সার্টিফিকেট অনেকটা বাধ্যতামূলক হয়েছে। কিন্তু সাধারণভাবে করোনা টেস্ট সময়সাপেক্ষ এবং উপসর্গ ছাড়া পরীক্ষা করানো কঠিন। আর এই সুযোগ নিচ্ছে প্রতারক চক্র। তারা বিভিন্ন হাসপাতাল, করোনা টেস্টিং সেন্টারের সিল, চিকিৎসকের নাম, স্বাক্ষর এবং করোনা সার্টিফিকেটের স্টাইল জাল করে ভুয়া সার্টিফিকেট দিচ্ছে। তারা শুধু নেগেটিভ নয়, পজিটিভ সার্টিফিকেটও দিচ্ছে। সর্বশেষ রাজধানীর উত্তরা ও মিরপুরে রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে কমপক্ষে ৮ জনকে আটক করেছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। র‌্যাব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে র‌্যাব সদস্যরা এ অভিযান পরিচালনা করে। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালটি টেস্ট না করেই  কোভিড-১৯ ‘পজিটিভ’ ও ‘নেগেটিভ’ সনদ দিত বলে জানিয়েছে র‌্যাব। র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট জানান রিজেন্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তিন ধরনের অভিযোগ ও অপরাধের প্রমাণ তারা  পেয়েছেন। প্রথমত, তারা করোনার নমুনা পরীক্ষা না করে ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করত। এ ধরনের ১৪টি অভিযোগ র‌্যাবের কাছে জমা পড়ে, যার পরিপ্রেক্ষিতে এই অভিযান। দ্বিতীয়ত, হাসপাতালটির সঙ্গে সরকারের চুক্তি ছিল ভর্তি রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার। সরকার এই ব্যয় বহন করবে। কিন্তু তারা  রোগী প্রতি লক্ষাধিক টাকা বিল আদায় করেছে (এ সময় সারোয়ার আলম গণমাধ্যমকর্মীদের বিলের নথি দেখান)। পাশাপাশি  রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দিয়েছে এই মর্মে সরকারের কাছে ১  কোটি ৯৬ লাখ টাকার বেশি বিল জমা দেয়। সারোয়ার আলম বলেন, রিজেন্ট হাসপাতাল এ পর্যন্ত শদুয়েক কোভিড রোগীর চিকিৎসা দিয়েছে। তৃতীয় অপরাধ হলো, সরকারের সঙ্গে চুক্তি ছিল ভর্তি রোগীদের তারা কোভিড পরীক্ষা করবে বিনামূল্যে। কিন্তু তারা আইইডিসিআর, আইটিএইচ ও নিপসম থেকে ৪ হাজার ২০০ রোগীর বিনামূল্যে নমুনা পরীক্ষা করিয়ে এনেছে। করোনা দুর্যোগের এ সময়ে কতটা অবিবেচক ও অমানবিক হলে এমনটা হতে পারে! এবং একটি বিষয় পরিষ্কার যে এতদিন এসব হাসপাতাল নিয়ে সরকারের কোনো মনিটরিংই ছিল না, যা ভেবে আমরা আশ্চর্য হই। আমরা চাই এসব জালিয়াতির ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের কঠোর শাস্তি হোক। কারণ তাদের এসব  টেস্টের সঙ্গে মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন জড়িত। অতএব এ রকম অভিযান অব্যাহত থাকুক।

স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত গণপরিবহণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিন

এক মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে করোনার মধ্যে গণপরিবহণ চলছে। অথচ স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই রাজধানীর গণপরিবহণে। হেলপার, কন্ডাক্টর ও চালক যেমন মাস্ক পরছেন না, যাত্রীদের বেলায়ও তেমনটাই ঘটছে। সিটে পাশাপাশি দুজনও বসতে দেখা গেছে কোনো কোনো বাসে। বাসে ¯েপ্র না করা, জীবাণুনাশক দিয়ে বাস পরিষ্কার না করা এসব তো আছেই। সচেতন যাত্রীরা বলছেন, কিছু মানুষের অসচেতনতায় অন্যরাও ঝুঁকিতে পড়ছেন। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি  বেড়েই চলছে। প্রথম দিকে ¯েপ্র করা হলেও এখন আর বাসে ওঠার সময় ¯েপ্র করা হচ্ছে না। করোনাভাইরাসকে স্বাভাবিকভাবে মনে নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে যাতায়াত করছেন অনেকেই- যা রীতিমতো বিস্ময়কর। অন্যদিকে রাজধানীতে বিশৃঙ্খলভাবে চলছে গণপরিবহণ। অতিরিক্ত যাত্রী, সহকারী দরজায় দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে গণপরিবহণের বিরুদ্ধে। প্রথম দিকে নিয়ম  মেনে চললেও এখন স্বাস্থ্যবিধি মোটেও মানা হচ্ছে না গণপরিবহণে। দরজায় হেলপার গায়ে হাত দিয়ে যাত্রী তোলা করোনার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। গণপরিবহণ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারা স্বাস্থ্যবিধি মানতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। কিন্তু নিয়মিত ¯েপ্র করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও স্বীকার করেন তারা। কেবল তাই নয়, অনেক বাসে দেখা যায় যাত্রীরা দাঁড়িয়ে আছে, করোনাকালে যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সড়কে প্রতিযোগিতা ও পাল্লা দিয়ে চালানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি না মানার পাল্লাও বেশ ভারী। হ্যান্ড স্যানিটাইজারের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন এসব হচ্ছে  লোক দেখানো। অন্যদিকে সরকার গণপরিবহণের ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়ালেও দূর হয়নি অনিয়ম। যাত্রীদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত আদায় করা হচ্ছে। এমন অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ। বাসে আগের চেয়ে দ্বিগুণ ভাড়া বেশি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে দুই মাসেরও বেশি সময় রাজধানীসহ সারাদেশে গণপরিবহণ চলাচল বন্ধ ছিল। সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সুপারিশে ৬০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির প্রজ্ঞাপন জারির পর স্বাস্থ্যবিধি মেনে গত ১ জুন  থেকে আবারও চলছে বাস ও অন্যান্য যানবাহন। চালকদের দাবি, ভাড়া বেশি নেওয়া হচ্ছে না। নিতান্তই খুব বেশি প্রয়োজন না হলে গণপরিবহণ এড়িয়ে চলছে মানুষ। জীবন-জীবিকার প্রশ্নে সরকার সাধারণ ছুটি তুলে দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি  মেনে সব ধরনের কার্যক্রম চালানোর নির্দেশনা দিয়েছে। গণপরিবহণে চলাচলের সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার কথাও তাতে বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এর ফলে চরমভাবে বেড়ে যাচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। কিছু মানুষ গণপরিবহণ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। জরুরি প্রয়োজনে বাধ্য হয়েই তাদের গণপরিবহণে উঠতে হচ্ছে। আমরা মনে করি, গণপরিবহণে যদি স্বাস্থ্যবিধি  মেনে চলা না হয়, তা হলে সামনে বড় ধরনের বিপদ অপেক্ষা করছে। সুতরাং সময় থাকতেই সাবধান হওয়া জরুরি। কারণ দেশে করোনার উচ্চ সংক্রমণ চলছে। এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ ৬৫ হাজার ৬১৮ জন এবং মারা গেছে দুই হাজার ৯৬ জন। এমন অবস্থায় মাস্ক পরিধানসহ স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জারি করা নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে এবং এর কোনো বিকল্প নেই।

সুফল পেতে হলে সঠিক ব্যবস্থা নিতে হবে

করোনা মহামারী প্রতিরোধে সরকার যথাসময়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে সূচনাতেই আমরা রোগের প্রাদুর্ভাব দমাতে পারিনি। প্রথম পর্যায়ে করোনার কারণে স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত বন্ধ ঘোষণায় অন্তত এক সপ্তাহ দেরি হয়েছে এবং এ বন্ধ নিয়েও সঠিক নির্দেশনা ছিল না। যখন উদ্দেশ্য ছিল মানুষজনকে ঘরে বন্দি রাখা, তখন ছুটি ঘোষণায় বিপুলসংখ্যক মানুষ দল বেঁধে শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল। আবার এই সময়ে বিদেশ থেকে আগত যাত্রীদের যথাযথভাবে কোয়ারেন্টিনে নেওয়া হয়নি। এর ফলে প্রথম পর্যায়ে আমরা সংক্রমিত মানুষদের দেশে প্রবেশ ঠেকাতে পারিনি। বর্তমানেও দেখা যাচ্ছে লকডাউন নিয়ে সরকারের চিন্তাভাবনায় স্বচ্ছতা নেই। লকডাউন ঘোষণা দেওয়ার পরও তা কার্যকর করতে অনেক দেরি হচ্ছে, আবার কার্যকর করলেও জনসাধারণের জন্য সঠিক ও স্পষ্ট নির্দেশনা সময়মতো দেওয়া হচ্ছে না। ফলে লকডাউনের সুফল যথাযথভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। আর যেভাবে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন হট স্পটে মাত্র কয়েকটি ছোট ছোট এলাকায় লকডাউন করা হচ্ছে তাতেও সর্বোচ্চ সুফল পাওয়া অসম্ভব বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ধরনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, বিভ্রান্তি এবং অব্যবস্থা চলতে থাকলে লকডাউন বাস্তবায়নকারী সংস্থার সদস্যদের কাজ করা মুশকিল হয়। তাদের পক্ষে কঠোর অবস্থানে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশ করোনা সংক্রমণের শীর্ষ পর্যায় অতিবাহিত করছে। ফলে এই সময়ে সরকারকে পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সব দুর্বলতা কাটিয়ে কার্যকর ব্যবস্থার দিকে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সরকার প্রধান না স্বাস্থ্যমন্ত্রী পাল্টালেন, না সচিব বা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে  কোনো পরিবর্তন আনলেন। সবই একই রকম ঢিমেতালে চলছে।  দেখা যাচ্ছে সংক্রমণের শীর্ষ পর্যায়ে যখন পরীক্ষার হার অনেক বাড়ানো দরকার ছিল, বিপরীতে তা বরং দিনে দিনে কমছে। ঢাকার বাইরে নির্দিষ্ট হাসপাতালের সংখ্যা এত কম যে, অধিকাংশ  রোগী বাসাতেই চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে মৃত্যুহার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বস্তুতপক্ষে মাঠ পর্যায়ে কর্মরত অনেক চিকিৎসক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য ও গণমাধ্যমকর্মী মনে করছেন সরকার ঘোষিত মৃত্যু ও সংক্রমণ হারের তুলনায় বাস্তবে তা অনেক বেশি। একটু খোঁজখবর নিলেই এ ধারণাটির সত্যতা বোঝা যায়। আমরা জানি না কেন বর্তমান সরকার করোনা দমনে কঠোর পদক্ষেপ নিতে ইতস্তত করছে। অথচ সুফল পেতে হলে এর বিকল্প নেই। মানুষের প্রাণ বাঁচাতে এবং জীবিকা রক্ষা করতে হলে করোনা দমন অপরিহার্য। সমাজজীবনে করোনার দৌরাত্ম্য চলতে থাকলে জীবন ও জীবিকা দুটোই রক্ষা করা কঠিন হবে। আমরা মনে করি, সারাদেশে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে একসঙ্গেই উচ্চ সংক্রমণের এলাকাগুলোতে লকডাউন দিতে হবে অথবা বিকল্প হতে পারে সারাদেশেই লকডাউন ঘোষণা করা। এর ১৪ দিন পর গ্রিন, ইয়েলো ও রেড এই তিন ভাগে এলাকাগুলোকে ভাগ করে ধাপে ধাপে লকডাউন খুলতে হবে। বস্তুত রঙের ভিত্তিতে জোন ভাগ করা হয়ে থাকে লকডাউন দেওয়ার জন্য নয় বরং লকডাউন তোলার জন্য। আমাদের সেটাতে যেতে হবে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্যোগ নিতে হবে

সারা বিশ্বই এক ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি। মহামারি করোনাভাইরাসে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতিও টালমাটাল। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে প্রত্যেকটি খাত। অন্যদিকে মানুষের জীবনযাপনের স্বাভাবিকতাও ব্যাহত হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন অচলাবস্থা চলার পর কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে বিশ্ব। অনেক দেশে করোনা সংক্রমণের হার কমতেও শুরু করেছে। কিন্তু উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এরই মধ্যে বিশ্বে ফের আসছে করোনাভাইরাসের আরও একটি প্রবাহ। সম্প্রতি প্রকাশিত খবরে এমনটি উঠে এসেছে যে, এ কারণে বন্ধ হবে উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি। তলানিতে ঠেকবে চাহিদাও। আর কাজ হারিয়ে ফের ঘরে ফিরতে হবে লাখ লাখ শ্রমিককে, যা বিশ্বের অর্থনীতির ওপর তীব্র প্রভাব ফেলতে পারে। আমরা বলতে চাই, এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের আমলে নেওয়া দরকার, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বলছে যে, করোনার দ্বিতীয় প্রবাহের জেরে বিশ্বজুড়ে ৩৪০ মিলিয়ন বা ৩৪  কোটি মানুষ কাজ হারাতে পারেন। আর দারিদ্র্য সীমার নিচে চলে  যেতে পারেন শুধু ভারতেরই ৪০ মিলিয়ন মানুষ। তাদের আশঙ্কা, ২০০৮-২০০৯ সালের আর্থিক সংকটের চেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারে। উল্লেখ্য, গত বছর ডিসেম্বরে আড়াই কোটি মানুষের নতুন করে বেকার হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছিল আইএলও। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় সেই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে জানিয়েছে বিশ্ব শ্রম সংস্থাটি। প্রসঙ্গত বলা দরকার, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বিশ্ব ব্যাপক দুর্ভিক্ষের ঝুঁকির মুখে আছে বলেও এর আগে সতর্ক করেছিল জাতিসংঘ। ফলে একদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে পুরো বিশ্বই বিপর্যস্ত, অন্যদিকে ৩৪ কোটি লোক কাজ হারাতে পারেন, আছে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি- এসব বিষয় আমলে নিলে কতটা ভয়ানক পরিস্থিতির আশঙ্কা আছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সঙ্গত কারণেই যত দ্রুত সম্ভব বিশ্ব নেতৃত্ব ও সংশ্লিষ্টদের এখনই এই বিষয়গুলোকে সামনে রেখে এর পরিপ্রেক্ষিতে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ ও তার সুষ্ঠু বাস্তবায়নে মনোযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশ সংশ্লিষ্টদেরও এটা মনে রাখা দরকার, দেশে করোনার সংক্রমণ বাড়ছে, বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও। ফলে বিশ্বের ভয়াবহ পরিস্থিতি আমলে নেওয়া এবং দেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে উদ্যোগী হতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, করোনাভাইরাসের সংক্রমণে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তা সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পুরো বিশ্বকেই। এরই মধ্যে যে চ্যালেঞ্জের বিষয়গুলো সামনে আসছে তা মোকাবিলা করা সহজ কাজ নয়, তবু তা আমলে নিয়ে সর্বাত্মক প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই। আমরা বলতে চাই, যে সংকট সারা বিশ্বের জন্য হুমকি হয়ে এসেছে তা নিরসনে একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং অর্থনৈতিকসহ যাবতীয় ঝুঁকিকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করত হবে। মনে রাখা জরুরি, এই ভয়াবহ সময়কে  মোকাবিলা করার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন ভিন্ন পথ  নেই। এর আগে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনলাইনে দেওয়া এক ব্রিফিংয়ে ডব্লিউএফপির প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন, সুতার ওপর ঝুলে থাকা কোটি কোটি মানুষের জন্য কোভিড-১৯ ভয়াবহ বিপর্যয় হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। আর পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসার বিষয়টিও তিনি আলোচনায় আনেন। একই সঙ্গে সতর্ক করেন যে, যদি তা না করা হয় তবে ভয়াবহ মূল্য দিতে হবে বিশ্বকে। সঙ্গত কারণেই, যখন করোনার দ্বিতীয় প্রবাহের জেরে বিশ্বজুড়ে ৩৪০ মিলিয়ন বা ৩৪ কোটি মানুষ কাজ হারাতে পারেন এমন আশঙ্কা উঠে আসছে, তখন সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই। সর্বোপরি আমরা বলতে চাই, করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা সার্বিকভাবে আমলে নিতে হবে বিশ্ব সংশ্লিষ্টদের এবং করণীয় নির্ধারণ সাপেক্ষে ঝুঁকি  মোকাবিলায় পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। সৃষ্ট পরিস্থিতি সামাল দিতে সব ধরনের উদ্যোগ জারি থাকুক এমনটি কাম্য।