দৌলতপুরে গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষে ব্যাপক সাফল্য চাষীদের

শরীফুল ইসলাম ॥ গ্রীষ্মকালীন বিভিন্ন প্রকার সবজি চাষ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের সবজি চাষীরা। বিভিন্ন ধরণের সবজি চাষ করে তারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে সবজি’র চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন সবজি বাজারে সরবরাহ করছেন। দৌলতপুরের আদাবাড়িয়া, শশীধরপুর, প্রাগপুর, বিলগাথুয়াসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বিস্তির্ণী মাঠ জুড়ে এখন গ্রীষ্মকালীন সবজির সমারোহ। সিম, বেগুন, টমেটো, কফিসহ নানা ধরনের সবজি চাষ করে কৃষকরা তা বাজারজাতকরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন। চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে দৌলতপুরে ২ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনে সবজি চাষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকুলে থাকার কারনে সবজি চাষীরা সবজি চাষ করে বেশ লাভবান হচ্ছেন। আর তা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বাজারজাতকরণ করা হচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। শশীধরপুর গ্রামের নাসির উদ্দিন নামে একজন সফল সবজি চাষী জানান, চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে সিম চাষ করে সিমের ফলন ভাল হওয়ায় সে সিম চাষে বেশ লাভবান হচ্ছেন। অপরদিকে আদাবাড়িয়া এলকার মমিন নামে আর একজন চাষী জানান, চলতি মৌসুমে টমেটো চাষ করে খরচ বাদ দিয়ে বেশ লাভের মুখ দেখছেন তিনি। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবছর গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষে ফলন ভাল হয়েছে এবং সবজি চাষ করে সবজি চাষীরাও লাভবান হচ্ছেন। আর সবজি চাষে ভাল ফলনের জন্য কৃষি বিভাগও তদারকি ও পরামর্শ দিয়ে থাকেন চাষীদের বলে জানিয়েছেন দৌলতপুর কৃষি সম্প্রসারন কর্মকর্তা সজিব আল মারুফ। কৃষকদের বেশী বেশী সবজি চাষে উৎসাহ ও প্রণোদনা দিলে একদিকে যেমন ক্ষতিকর তামাক চাষ প্রবন এলাকা কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের চাষীদের তামাক চাষ থেকে মুখ ফেরানো সম্ভব, অপরদিকে অর্থকরী ফসল সবজি চাষে তারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হবে।

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজাকরণ অধিক লাভজনক

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশে কোরবানির মূল উপাদান হচ্ছে গরু। আর  সেটা যদি হয়  মোটাতাজা, নাদুস-নুদুস তবে আনন্দের সীমা থাকে না। এ উপলক্ষকে সামনে রেখে যারা গরু মোটাতাজাকরণে আগ্রহী তাদের আগে  থেকেই প্রস্তুতি নেয়া দরকার। এজন্য দরকার গরু মোটাতাজাকরণে সঠিক ব্যবস্থাপনা। এটি কখন ও কিভাবে করলে বেশি লাভবান হওয়া যায় তার বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক পদ্ধতি নিম্নে দেয়া হলো-

অধিক মাংস উৎপাদনের জন্য ২-৩ বছর বয়সের শীর্ণকায় গরুকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় খাদ্য সরবরাহ করে হৃষ্টপুষ্ট গরুতে রূপান্তরিত করাকে গরু মোটাতাজাকরণ বলে আখ্যায়িত করা হয়। এটির গুরুত্ব হচ্ছে- দারিদ্রতা হ্রাসকরণ, অল্প সময়ে কম পুঁজিতে অধিক মুনাফা অর্জন, অল্প সময়ের মধ্যে লাভসহ মূলধন ফেরত পাওয়া, প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি পূরণ, স্বল্পমেয়াদি প্রযুক্তি হওয়ার কারণে পশু মৃত্যুর হার কম, কৃষিকার্য  থেকে উৎপাদিত উপজাত পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে সহজেই মাংস উৎপাদন করা, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে আয় বৃদ্ধি করা।

গরু মোটাতাজাকরণের আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সম্পর্কে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশু পালন অনুষদের পশু বিজ্ঞান বিভাগের বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মুজাফফর হোসেন জানান-

প্রয়োজনীয় উপাদান, পদ্ধতি ও মোটাতাজাকরণের সঠিক সময়: বয়সের ওপর ভিত্তি করে সাধারণত ৩ মাসের মধ্যে গরু মোটাতাজাকরণ করা যায়। অনেক সময় ৪-৬ মাসও লাগতে পারে। গরু মোটাতাজাকরণের জন্য সুবিধাজনক সময় হচ্ছে বর্ষা এবং শরৎকাল যখন প্রচুর পরিমাণ কাঁচা ঘাস পাওয়া যায়। চাহিদার ওপর ভিত্তি করে কোরবানি ঈদের কিছুদিন আগ থেকে গরুকে উন্নত খাদ্য ও ব্যবস্থাপনা দিয়ে মোটাতাজাকরণ লাভজনক।

স্থান নির্বাচন ঃ খামার স্থাপনের জন্য স্থান নির্বাচনে নিম্ন লিখিত বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ শুষ্ক ও উঁচু জায়গা হতে হবে, যাতে খামার প্রাঙ্গণে পানি না জমে থাকে।  খোলামেলা ও প্রচুর আলো-বাতাসের সুযোগ থাকতে হবে। খামারে কাঁচামাল সরবরাহ ও উৎপাদিত দ্রব্যাদি বাজারজাতকরণের জন্য  যোগাযোগ সুবিধা থাকতে হবে। পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সুষ্ঠু ব্যবস্থা থাকতে হবে। সুষ্ঠু নিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকতে হবে, যেমন- পানি, মলমূত্র, আবর্জনা ইত্যাদি। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে সম্প্রসারণের সুযোগ থাকতে হবে।

গরু নির্বাচন ঃ উন্নত দেশের মাংসের গরুর বিশেষ জাত রয়েছে। বিদেশি গরুর জন্য উন্নত খাদ্য ও ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। তাই দেশীয় গরু  মোটাতাজাকরণ অধিক লাভজনক। ২-২.৫ বছরের গরুর শারীরিক বৃদ্ধি ও গঠন মোটাতাজাকরণের জন্য বেশি ভালো। এঁড়ে বাছুরের দৈহিক বৃদ্ধির হার বকনা বাছুরের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। তবে বাছুরের বুক চওড়া ও ভরাট,  পেট চ্যাপ্টা ও বুকের সঙ্গে সমান্তরাল, মাথা ছোট ও কপাল প্রশস্ত, চোখ উজ্জ্বল ও ভিজা ভিজা, পা খাটো প্রকৃতির ও হাড়ের জোড়াগুলো স্ফীত, পাঁজর প্রশস্ত ও বিস্তৃত, শিরদাঁড়া সোজা হতে হবে।

বাসস্থানের গঠন ঃ গরুর বাসস্থান তৈরির জন্য  খোলামেলা উঁচু জায়গায় গরুর ঘর তৈরি, একটি গরুর জন্য মাপ হতে হবে কমপক্ষে ১০-১২ বর্গফুট। ভিটায় ১ ফুট মাটি উঁচু করে এর ওপর ১ ফুট বালু দিয়ে ইট বিছিয়ে মেঝে মসৃণ করার জন্য সিমেন্ট, বালু ও ইটের গুঁড়া দিতে হবে। গরুর সামনের দিকে চাড়ি এবং পেছনের দিকে বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য নালা তৈরি করতে হবে। বাঁশের খুঁটি দিয়ে বেঁধে ওপরে ধারি অথবা খড় ও পলিথিন দিয়ে চালা দিতে হবে, ঘরের পাশে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা দরকার। পাশাপাশি দাঁড়ানো গরুকে বাঁশ দিয়ে আলাদা করতে হবে যাতে একে অন্যকে গুঁতা মারতে না পারে। ঘরের চারপাশ চটের পর্দার ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে অতি বৃষ্টি ও অতি ঠান্ডার সময় ব্যবহার করা যায়।

খাদ্য ঃ খাদ্যে মোট খরচের প্রায় ৬০-৭০ ভাগ ব্যয় হয়। তাই স্থানীয় ভাবে খরচ কমানো সম্ভব। এজন্য গরু মোটাতাজাকরণের একটি সুষম খাদ্য তালিকা নিচে দেয়া হলো-

শুকনা খড় ঃ ২ বছরের গরুর জন্য দৈহিক ওজনের শতকরা ৩ ভাগ এবং এর অধিক বয়সের গরুর জন্য শতকরা ২ ভাগ শুকনা খড় ২-৩ ইঞ্চি করে কেটে এক রাত লালীগুড়-চিটাগুড় মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে প্রতিদিন সরবরাহ করতে হবে। পানিঃ চিটাগুড়=২০:১।

কাঁচা ঘাস ঃ প্রতিদিন ৬-৮ কেজি তাজা ঘাস বা শস্য জাতীয় তাজা উদ্ভিদের উপজাত দ্রব্য যেমন- নেপিয়ার, পারা, জার্মান, দেশজ মাটি কলাই, খেসারি, দুর্বা ইত্যাদি সরবরাহ করতে হবে।

দানাদার খাদ্য ঃ প্রতিদিন কমপক্ষে ১-২ কেজি দানাদার খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। নিচে ১০০ কেজি দানাদার খাদ্যের তালিকা দেয়া হলো-

গম ভাঙা-গমের ভুসি ৪০ কেজি চালের কুঁড়া ২৩.৫ কেজি খেসারি বা যে  কোনো ডালের ভুসি ১৫ কেজি তিলের খৈল-সরিষার খৈল ২০ কেজি লবণ ১.৫ কেজি।

উল্লিখিত তালিকা ছাড়াও বাজারে প্রাপ্ত ভিটামিন মিনারেল মিশ্রণ ১% হারে খাওয়াতে হবে। তাছাড়া বিভিন্ন রকমের ইউরিয়া মোলাসেস বক ব্যবহার করা  যেতে পারে। এটি হচ্ছে ৩৯ ভাগ চিটাগুড়, ২০ ভাগ গমের ভুসি, ২০ ভাগ ধানের কুঁড়া, ১০ ভাগ ইউরিয়া, ৬ ভাগ চুন ও ৫ ভাগ লবণের মিশ্রণ।

রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ঃ  প্রতিদিন নিয়মিতভাবে পশুর গা ধোয়াতে হবে। গোশালা ও পার্শ¦বর্তী স্থান সর্বদা পরিষ্কার রাখতে হবে। নিয়মিতভাবে গরুকে কৃমিনাশক ট্যাবলেট খাওয়াতে হবে। বাসস্থান সর্বদা পরিষ্কার রাখতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পরিমিত পরিমাণে পানি ও সুষম খাদ্য প্রদান করতে হবে।  রোগাক্রান্ত পশুকে অবশ্যই পৃথক করে রাখতে হবে। খাবার পাত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। খামারের সার্বিক জৈব নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। পশু জটিল রোগে আক্রান্ত হলে পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

বাজারজাতকরণ ঃ মোটাতাজাকরণ গরু লাভজনকভাবে সঠিক সময়ে ভালো মূল্যে বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ হচ্ছে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। বাংলাদেশে মাংসের জন্য বিক্রয়যোগ্য গবাদিপশুর বাজার মূল্যেও  মৌসুমভিত্তিক হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। কাজেই একজন প্রতিপালককে গরু  মোটাতাজাকরণের জন্য অবশ্যই গরুর ক্রয় মূল্য যখন কম থাকে তখন গরু ক্রয় করে বিক্রয় মূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে বিক্রয়ের ব্যবস্থা নিতে হবে। সাধারণত কোরবানির ঈদের সময় গরুর মূল্য অত্যাধিক থাকে এবং এর পরের মাসেই বাজার দর হ্রাস পায়। তাই এখন গরু মোটাতাজাকরণের উপযুক্ত সময়। স্বল্প সময়ে অধিক লাভবান হওয়ার সহজ এবং সুবিধাজনক উপায়ের মধ্যে গরু মোটাতাজাকরণ একটি অত্যন্ত যুগোপযোগী পদ্ধতি।

কিন্তু প্রচলিত এবং অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজাকরণের তুলনায় আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজাকরণ অধিক লাভজনক। সুতরাং কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে আমাদের দেশের কৃষকরা যদি ওই পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজাকরণ করতে পারে তাহলে প্রতি বছর কোরবানি ঈদের সময় গরু আমদানি কমানো সম্ভব হবে এবং এর ফলে দেশ আর্থিকভাবে বিরাট সফলতা লাভ করতে সক্ষম হবে।

 

রপ্তানি বেড়েছে চামড়াজাত পণ্যের, কমেছে চামড়ার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়াজাত পণ্যের বিক্রি ও চাহিদা কমে গেছে অজুহাতে দেশের চামড়া ব্যবসায়ীরা কোরবানির মৌসুম এলেই আহাজারি শুরু করেন। অথচ, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ১৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যা  দেশের প্রধান রপ্তানিপণ্য তৈরি পোশাক খাতে প্রবৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ। এ প্রবৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে শুধু চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে। চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি বাড়লেও কমেছে চামড়া রপ্তানি। জুলাই মাসে চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৬১ দশমিক ৭৯ শতাংশ। বিপরীতে চামড়া রপ্তানি কমেছে ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ।  রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। জানা যায়, বিদায়ী (২০১৮-১৯) অর্থবছরে চামড়া রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের (জুলাই) তুলনায় কমলেও বেড়েই চলেছে আমদানি নির্ভর (চামড়া) চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয়। জুলাই মাসে ৬১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে। অর্থাৎ, বাংলাদেশ থেকে চামড়ার বেল্ট, ব্যাগসহ অন্য পণ্য রপ্তানির পরিমাণ গত বছরের জুলাই মাসে ১০০ টাকা হলে এবার হয়েছে ১৬১ টাকা। আর, চামড়ার তৈরি জুতা রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ শতাংশের বেশি। এ বছর দাম না থাকায় নষ্ট হয়েছে অনেক চামড়া। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের (২০১৯-২০) জুলাই মাসে দেশের দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি খাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে আয় হয়েছে ১০ কোটি ৬১ লাখ ডলার। এর মধ্যে ৭ কোটি ২৩ লাখ ডলারের চামড়ার জুতা, ২ কোটি ৪০ লাখ ডলারের চামড়াপণ্য ও ৯০ লাখ ডলারের চামড়া রপ্তানি হয়েছে। সব মিলিয়ে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ১৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যা জুলাই মাসের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ১৫ দশমিক ৪১ শতাংশ বেশি। পণ্য রপ্তানি আয়ের হালনাগাদ তথ্য থেকে জানা যায়, জুলাইয়ে তৈরি পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। জানা গেছে, বাংলাদেশে এখন প্রায় ১৫০ কোটি ডলার চামড়াপণ্যের বাজার রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চামড়া দিয়ে তৈরি জুতা, স্যান্ডেল, ব্যাগ, মানিব্যাগ, বেল্ট, জ্যাকেট ইত্যাদি। কোম্পানি ভেদে পণ্যের মূল্যে রকমফের থাকলেও, তাদের কারো পণ্যেই কাঁচামালের দরপতনের প্রভাব দেখা যায়নি। কাঁচামালের মূল্য কমলে এসব পণ্যের খুচরা বিক্রয় মূল্যও কমার কথা। তা না হওয়ায় অনেকেই সামাজিক  যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন,  কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রিতে একটি চক্র আছে। ট্যানারির মালিকরা দাম কম দিলে অন্যরাও কম দিতে বাধ্য হয়। তবে, ট্যানারি মালিকরা বিশ্ববাজারে ভালো দামে বিক্রি করে মোটা অঙ্কের বাণিজ্য করলেও আড়তদার, চামড়া সংগ্রহকারীদের সে সুযোগ থাকে না। এছাড়া, কাঁচামালের সঙ্গে  তৈরি পণ্যের মূল্য নির্ধারণে সবসময়ই পার্থক্য থাকবে। কিন্তু, সেটা যৌক্তিক হচ্ছে কি-না, বাংলাদেশে সে ধরনের নজরদারি নেই। এজন্য চামড়া শিল্পকে রক্ষা করতে হলে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। চামড়ার দাম নিয়ে সিন্ডিকেটের কারসাজি বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশের ফিনিশড লেদার ও লেদার সামগ্রী প্রস্ততকারক সমিতির সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের দেশের বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) ঠিকভাবে না থাকায় ব্যবসায়ীরা বিদেশি বড় কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে পারছে না। এজন্য অনেক ক্রেতা এ দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ ট্যানারি মালিকদের। কমে গেছে চামড়া রপ্তানি। আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার চাহিদা কমলে দামও কমে, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশেও চামড়াজাত পণ্যের দাম কমার কথা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কাঁচামালের সঙ্গে তৈরি হওয়া পণ্যের দাম  মেলানো যাবে না। চামড়ার মতো কাঁচামাল অনেক হাত ঘুরে আমাদের কাছে আসে। এখন যে চামড়া আপনি তিনশ’ টাকায় বিক্রি হয়েছে বলছেন, আমাদের কাছে তখন সেটার দর অনেক বেড়ে যায়। কারণ, সেটাকে প্রক্রিয়াজাত করার খরচ, কারখানার খরচ, শ্রমিক খরচ যোগ হবে। এরপর  সে চামড়াটা আরেকজন কিনে নিয়ে দেশি-বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার মতো জুতা, স্যান্ডেল বা ব্যাগ তৈরি করবে। তার কাছ থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ড এসব পণ্য কিনে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করে। কারণ, আন্তর্জাতিকভাবেই মনে করা হয়, কয়েকগুণ বেশি দাম না ধরা হলে তারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, বাংলাদেশের বাজারে একবার কোনো পণ্যের দাম বেড়ে  গেলে আর কমে না। যখন কোনো পণ্যের দাম নির্ধারিত হয়, তখন শুধু কাঁচামাল নয়, অনেক বিষয় বিবেচনা করেই সেটির দাম নির্ধারিত হয়।  যেমন- কারখানার ভাড়া, বিদ্যুৎ, পানি, শ্রমিক বেতন ইত্যাদি। কাঁচামালের দাম কমলেও সেগুলো তো কমেনি। আর, এটা সম্ভব হয়েছে আমাদের  ভোক্তাদের অধিকার না থাকার কারণে। ফলে, পণ্যের উৎপাদকরা যে দাম নির্ধারণ করেন, সেটাই গ্রহণ করতে হয়।

তাদের উৎপাদন খরচ কমলো কি-না, সেটা আর যাচাই করা হয় না। সেটা শুধুমাত্র চামড়াজাত পণ্যই নয়, অন্য পণ্যের ক্ষেত্রেও ঘটছে। এজন্য ভোক্তারা তাদের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন হলে আর ভোক্তা অধিকার আইনের বাস্তবায়নের মাধ্যমেই এ পার্থক্য কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। ইপিবির তথ্যমতে, ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে আয় হয় ১১৩ কোটি ডলার। ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১১৬ কোটি ডলারে। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে এ আয়ের পরিমাণ আরও বেড়ে হয় ১২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। কিন্তু, ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে রপ্তানি আয় অস্বাভাবিক কমে ১০৮ কোটি ৫৪ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। ওই অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১২   কোটি ডলার। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আয় কম হয়েছে ৯ দশমিক ২৭ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে আয় কমেছে ৬ দশমিক ০৬ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে চামড়া খাত থেকে ৮৩ কোটি ৭১ লাখ ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ। যদিও এ সময়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯১  কোটি ৯৬ লাখ ডলার। এ হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৯ শতাংশ ও আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ আয় কমেছে।

 

দুগ্ধশিল্পের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ মানুষসহ পৃথিবীর সব স্তন্যপায়ী প্রাণীই ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর যে খ্যাদ্যটি গ্রহণ করে তা হলো দুধ। মায়ের দুধের পর মানুষ সাধারণত গরু, মহিষ, ছাগল বা ভেড়ার দুধ পান করে থাকে। দুধ সব বয়সের মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। এতে রয়েছে আমিষ, শর্করা, চর্বি, অসংখ্য খনিজ উপাদান এবং ভিটামিনের এক চমৎকার সংমিশ্রণ, যে কারণে দুধকে বলা হয় আদর্শ খাবার। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য মোতাবেক গত এক দশকে দুধের উৎপাদন বেড়েছে সাড়ে তিনগুণ- যা নিকট ভবিষ্যতে দেশকে দুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণকরণের এক বিশাল হাতছানি। কিন্তু নানাবিধ সমস্যার কারণে উদীয়মান দুগ্ধশিল্প আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. আ ব ম ফারুক পাস্তুরিত দুধের ১০টি নমুনা পরীক্ষা করে সিপ্রোফ্লক্সাসিন, এজিথ্রোমাইসিন, এনরোফ্লক্সাসিন এবং লেভোফ্লক্সাসিন অ্যান্টিবায়োটিকের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতির কথা সংবাদ সম্মেলন করে দেশবাসীকে অবগত করেন। অবশ্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) বলছে, দুধে ভারী ক্ষতিকর ধাতুর উপস্থিতির যে খবর সব জায়গায় ছেয়ে গেছে তা সম্পূর্ণ সত্য নয়। যারা এ তথ্য প্রকাশ করেছে তাদের গবেষণার সে সক্ষমতা নেই। তাই দুধের ব্যাপারে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। যে ৮টি দুধের নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণা করেছে এবং নমুনা ভারতের চেন্নাইতে এসজিএস আন্তর্জাতিক মানের ল্যারেটরিতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। পাস্তুরিত ও অপাস্তুরিত যে ৮টি দুধ (মিল্ক ভিটা, আড়ং, ফার্ম ফ্রেশ, ঈগলু, আরডি, সাভার ডেইরি ও প্রাণ) নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে তা মানুষের জন্য ক্ষতিকর কোনো পদার্থ পাওয়া যায়নি। বাকি যে ছোট বড় দুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি রয়েছে তাদের দুধের তেমন ক্ষতিকর কিছু নাও থাকতে পারে, তবে পর্যায়ক্রমে সব দুধের নমুনা পরীক্ষা করে এর ফলাফল সবাইকে জানানো হবে। মাঠপর্যায়ে কর্মরত ভেটেরিনারি ডাক্তারদের ভাষ্যমতে গবাদিপশুর চিকিৎসায় এনরোফ্লক্সাসিন এবং লেভোফ্লক্সাসিন অ্যান্টিবায়োটিক কখনো ব্যবহার করা হয় না; এই ২টি হলো মানুষে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক। কাজেই, প্রশ্ন হলো ওই অ্যান্টিবায়োটিকগুলো দুধে প্রবেশের উৎস কি? পৃথিবীর অনেক দেশের গরুর দুধেই অ্যান্টিবায়োটিক ও ভারী ধাতু পাওয়া যায় এবং একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত এদের উপস্থিতি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়। আর সে জন্যই আন্তর্জাতিকভাবে দুধে অ্যান্টিবায়োটিক ও অন্যান্য ক্ষতিকারক উপাদানের জন্য নির্দিষ্ট গধীরসঁস জবংরফঁব খরসরঃ (গজখ)। হাইর্কোটের আদেশের পর কোম্পানিগুলো তরল দুধ কেনা কমিয়ে দিয়েছে। প্রশ্ন হলো- কৃষকের গাভিগুলো কি দুধ উৎপাদন এবং খাওয়া বন্ধ রাখবে? উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম গাভির দুধ বিক্রি করতে না পেরে আজ খামারিরা ভাষাহীন, প্রতিবাদ জানাচ্ছে সড়কে দুধ ঢেলে। গাভির জীবন বাঁচাতে কৃষক সর্বস্ব হারিয়ে হলেও উচ্চমূল্যের গোখাদ্য খাওয়াবে। অথচ কৃষককে বাঁচিয়ে আমরা দুধের ভেজাল নির্মূলের বিকল্প উপায় পেলাম না! বাজারের দুধে অ্যান্টিবায়োটিকের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতির বিষয়কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলকে সরব মনে হচ্ছে। খবরটি সাধারণ জনমনে এমন প্রভাব ফেলছে যেন দুধে অ্যান্টিবায়োটিক নয়- বিষের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু দুধে ক্ষতিকারক উপাদানের প্রকৃত উৎস এবং সেগুলো প্রবেশ রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ তথা দেশকে দুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে করণীয় সম্পর্কে কথা বলার লোকের বড্ড অভাব। একইভাবে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত নিম্নমানের গুঁড়া দুধের ভেজাল নির্ণয়েও আমাদের আগ্রহ কম। এই সমস্যাটি মোকাবিলা করার লক্ষ্যে ডেইরি শিল্প ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে দুধে অ্যান্টিবায়োটিকের উৎস ও প্রবেশ রোধে করণীয় বিষয়ে আজও কোনো সভা বা সেমিনার জাতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হলো না। আমাদের সমস্যা হলো আমরা কোনো জাতীয় বা জনস্বাস্থ্য বিষয়ে একসঙ্গে বসে সম্মিলিত উদ্যোগ ও করণীয় ঠিক করতে পারি না। দুধের দূষণ সমাধানে যেমন আমরা একসঙ্গে বসতে পারি না- তেমনি বসতে পারি না ডেঙ্গুজ্বর প্রতিরোধের সমাধানেও। আর সে কারণেই দূষণ আজ সমাজের রন্ধেরন্ধে, শুধু গরুর দুধেই নয়। দুগ্ধশিল্প বিকাশে আরেকটি বড় বাধা হলো প্রান্তিক খামারিদের কাছে ভেটেরিনারি সেবার অপ্রতুলতা। বর্তমানে একটি উপজেলার ৭-৮ লাখ গবাদিপশু-পাখির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসার জন্য মাত্র ১ জন ভেটেরিনারি ডাক্তার নিয়োজিত রয়েছেন। ভেটেরিনারি ডাক্তারের অভাবে খামারিরা গবাদিপশু-পাখিতে যাচ্ছেতাই বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহার করছে। এ ছাড়া অনেক সময় পশুপাখির চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পর নির্দিষ্ট রেসিডুয়াল পিরিয়ড না মেনে গাভির দুধ বিক্রি করছেন। পশুতে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কুফল সম্বন্ধে ভেটেরিনারি ডাক্তার কর্তৃক প্রান্তিক খামারিদের সচেতন করার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি কোম্পানিগুলোকে দুধ সংগ্রহের পূর্বে আধুনিক যন্ত্র দ্বারা ক্ষতিকারক পদার্থের অনুপস্থিতি নিশ্চিত করে কেবল নিরাপদ দুধ সংগ্রহ করতে হবে। বর্তমানে হাজার হাজার বেকার ভেটেরিনারি ডাক্তার চাকরি প্রত্যাশায় হতাশ জীবনযাপন করছে। কাজেই, সরকারের উচিত প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে অতিরিক্ত জনবল সংবলিত নতুন অর্গানোগ্রাম পাস করে প্রতি উপজেলায় কমপক্ষে ৬ জন করে ভেটেরিনারি সার্জন নিয়োগ দিয়ে খামারিদের দোরগোড়ায় ভেটেরিনারি সেবা পৌঁছে দেয়া। সম্প্রতি মানুষের চিকিৎসায় রেজিস্টার্ড ডাক্তারের এবং পশু-পাখির চিকিৎসায় রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারি ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ব্যতিত কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যাবে না এই মর্মে মহামান্য হাইকোর্ট ২টি আলাদা আদেশ জারি করেছেন। যাচ্ছেতাই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে ক্ষতিকারক ব্যাক্টেরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক তার কার্যকারিতা হারায়। অধিকন্তু, মানুষ ও পশু-পাখিতে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপায়ে খাদ্য চেইন ও পরস্পরের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। কাজেই, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে অ্যান্টিবায়োটিকের সুনির্দিষ্ট ও সীমিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে হাইকোটের আদেশকে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নসহ আদেশ অমান্যকারীদের শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নিকট ভবিষ্যতে আমরা যদি নিরাপদ দুধ উৎপাদনে স্বনির্ভর হতে চাই- তবে বিদেশি উন্নত দুধাল জাতের ষাঁড়ের বীজ দিয়ে দেশীয় গাভিগুলোকে কৃত্রিম প্রজনন করাতে হবে। ফলস্বরূপ আমাদের দেশীয় গাভির জাত উন্নয়ন ও দুধ উৎপাদন বাড়বে। পাশাপাশি ভ্রুণ স্থানান্তর প্রযুক্তি প্রয়োগ করে অল্প সময়ে অধিকসংখ্যক এই ভালো মানের গাভির সংখ্যা বৃদ্ধি করে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। অধিকন্তু আমাদের পর্বতসম বেকার জনগোষ্ঠীকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে দুগ্ধ উৎপাদনকারী পশুপালনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে তরল দুধের সংরক্ষণ, সরবরাহ ও ন্যায্যমূল্য, পর্যাপ্ত ভেটেরিনারি সেবা ও অ্যান্টিবায়োটিকের যথার্থ ব্যবহার। এতে একদিকে যেমন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আত্মকর্ম সংস্থান হবে, অন্যদিকে দেশের চাহিদার দুধ উৎপাদনসহ বিদেশে আমাদের প্রস্তুতকৃত গুঁড়া দুধ রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রে সৃষ্টি হবে। দুধের সমস্যায় অবশ্যই কথা বলতে হবে এবং সে সমস্যা নিরূপণে সরকারকে কার্যকারী পদক্ষেপ নিতে বাধ্যও করতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে আমাদের সিদ্ধান্তের ক্রটির কারণে যেন দরিদ্র দুগ্ধ খামারিদের পথে বসতে না হয় এবং বিদেশি গুঁড়া দুধ কোম্পানিগুলো দুগ্ধশিল্পের সিংহভাগ দখলে না নিয়ে যায়। কাজেই, দুধ উৎপাদন ও বিপণনে নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং ক্ষতিকারক উপাদানের উৎস নির্ণয় করে তা অনুপ্রবেশের সব রাস্তা বন্ধকরণে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। চলুন নিজেদের মনকে দূষণমুক্ত করি এবং আমাদের সব খাবারকে দূষণমুক্ত করতে পরস্পরকে সহযোগিতা করি। কেবল তাতেই, ভেজালমুক্ত বাংলাদেশে নির্ভেজাল গরুর দুধ পাওয়া যাবে।
লেখক ঃ ড. এম এ হান্নান, পোস্ট-ডক্টরাল গবেষক, অবিহিরো ইউনিভার্সিটি অব এগ্রিকালচার অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন, জাপান।

যান্ত্রিকীকরণ ও সমন্বিত ফসল উৎপাদনে বদলে যাবে কৃষি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ মালিকানা অনুযায়ী খন্ডিতভাবে নয়, সমন্বিতভাবে ফসল উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করতে চায় সরকার। কৃষিযন্ত্রের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এমন বিধান রেখে ‘জাতীয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা-২০১৯’ চূড়ান্ত করা হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রণীত খসড়াটি শিগগির মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র এমন খবর জানিয়েছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে নীতিমালায় বলা হয়, বাংলাদেশে খামারের গড় আয়তন ছোট এবং খন্ডে খন্ডে বিভক্ত। ফলে খন্ডিত জমিতে চাষ, বপন, রোপণ, কর্তন ইত্যাদিতে যন্ত্রের ব্যবহার বেশ কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল। এমনকি ছোট ও মাঝারি আকারের কৃষিযন্ত্রের পূর্ণ ক্ষমতার ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। এতে বলা হয়, ভাড়া ব্যবস্থায় কৃষিযন্ত্র সেবার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে স্থানীয়ভাবে কৃষকদের সংগঠিত করে সমন্বিত ফসল উৎপাদন ব্যবস্থা প্রণয়নে উৎসাহিত করা হবে। এক্ষেত্রে জমি ইজারা ও চুক্তিভিত্তিতে ফসল উৎপাদন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা হবে। বাংলাদেশ কৃষি যান্ত্রিকীকরণে চ্যালেঞ্জ হিসেবে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, কৃষিযন্ত্রের বিক্রয়োত্তর সেবার অপ্রতুলতা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকান্ডের সীমাবদ্ধতা, স্থানীয়ভাবে কৃষিযন্ত্র ও খুচরা যন্ত্রাংশ উৎপাদনে আধুনিক মূলধনী যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের অভাব, আমদানি করা ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষি যন্ত্রপাতির গুণগতমান ঘোষণা ও নির্ধারণ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি, আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহার উপযোগী গ্রামীণ অবকাঠামোর অভাব ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের  নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরা হয় নীতিমালায়। এতে আরো বলা হয়, অঞ্চল ও ফসলভেদে আধুনিক ও লাগসই কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও উন্নয়নের লক্ষ্যে  মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণাকে উৎসাহিত করা হবে। গবেষণার সক্ষমতা বাড়াতে উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হবে। নীতিমালায় বলা হয়, প্রতিকূল পরিস্থিতি (কাদামাটি, জলমগ্নতা ও ফসলের নুয়ে পড়া অবস্থা ইত্যাদি) অনুযায়ী উপযুক্ত যন্ত্র সহজলভ্য করতে উৎসাহ দেওয়া হবে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে সরকারি প্রণোদনা নীতি তুলে ধরে নীতিমালায় বলা হয়, বর্তমানে কৃষিযন্ত্র জনপ্রিয়করণ ও সম্প্রসারণে হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলে সর্বোচ্চ হারে এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরকারি উন্নয়ন সহায়তা (ভর্তুকি)  দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে শুধু কৃষক-পর্যায়ে পরিচিতি ও জনপ্রিয়করণে প্রণোদনা দেওয়া হবে। প্রণোদনা অবশ্যই মানসম্পন্ন বা প্রত্যয়নকৃত কৃষিযন্ত্রের ওপর প্রযোজ্য হবে। বছরে স্বল্প সময়কালে ব্যবহার্য অথচ অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্রের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হবে। বেসরকারি উদ্যোগকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে যন্ত্রের চাহিদা ও সরবরাহ সমন্বয়ের মাধ্যমে কৃষিযন্ত্রের চাহিদা বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতে সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পরবর্তীকালে প্রণোদনার হার ও ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন করা হবে। কৃষক ও যন্ত্রসেবা প্রদানকারী উদ্যোক্তাদের কৃষিযন্ত্র ক্রয়ে উৎসাহিত করতে প্রয়োজন মতো সরকারি বাণিজ্যিক, এনজিও ও অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান থেকে সহজে কৃষি ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা হবে। বছরের স্বল্প সময়ে ব্যবহার্য বপন, রোপণ, কর্তন, শুকানো, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ বিষয়ক কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সহজে বিশেষায়িত দীর্ঘমেয়াদে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে। আমদানি করা এবং স্থানীয়ভাবে প্রস্তুতকৃত কৃষিযন্ত্র বিপণনে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা বজায় রাখা হবে। বর্তমানে কৃষিযন্ত্র আমদানিতে আরোপিত শুল্কহার ন্যূনতম রয়েছে। তবে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের স্বার্থে পোর্ট অব এন্ট্রিতে আমদানি করা যন্ত্রের ওপর আবগারি, বিক্রয় এবং অন্যান্য শুল্ক যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করা হবে। দেশে উৎপাদনের সম্ভাবনা আছে এমনসব যন্ত্রের যুক্তিসঙ্গত প্রতিরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেওয়া হবে। এতে বলা হয়, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ সম্প্রসারণ ও বাস্তবায়নের জন্য কৃষক ও কৃষিযন্ত্রের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ, তথ্য ও সেবাপ্রদান নিশ্চিত করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য সংস্থায় উপজেলা থেকে সব উচ্চতর স্তরে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রকৌশল জ্ঞানসম্পন্ন আলাদা জনবল কাঠামো প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হবে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী শিল্পকে কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে গণ্য করার উদ্যোগ  নেওয়া হবে। কৃষিযন্ত্র ও যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতির ওপর যুক্তিসঙ্গত হারে প্রণোদনামূলক আমদানি কর নির্ধারণ করা হবে। কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী ও সংযোজন শিল্পে ব্যবহূত যন্ত্রাংশের আমদানি শুল্ক  রেয়াতি সুবিধা অব্যাহত রাখা হবে। এ শিল্পের সুষ্ঠু বিকাশের স্বার্থে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনার ভিত্তিতে কর রেয়াত-সংশ্লিষ্ট তালিকার যন্ত্রাংশের সংখ্যা প্রয়োজনের নিরিখে সম্প্রসারণ করা হবে। নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী শিল্পে আমদানি করা কাঁচামালের ওপর বিধিবদ্ধ শুল্ক বিদ্যমান থাকায় কৃষিযন্ত্র ও যন্ত্রাংশ বিক্রয় ও সরবরাহের ক্ষেত্রে ভ্যাট রেয়াতি সুবিধার বিষয় বিবেচনা করা হবে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষি যন্ত্রাংশের উৎপাদন খরচ ও কৃষক উদ্যোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আমদানিকৃত কৃষি যন্ত্রাংশের আমদানি শুল্ক যৌক্তিক-পর্যায়ে নির্ধারণ করা হবে। এতে আরো বলা হয়, দেশে কৃষি যন্ত্রপাতি সংযোজন শিল্পকে উৎসাহিত করা হবে। এক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি যৌথ বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হবে। সংযোজন শিল্পে দেশে উৎপাদিত যন্ত্রাংশের একটি অংশ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। উচ্চ মূল্যের নতুন কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানির পাশাপাশি পুনঃসংযোজিত কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানির সুযোগ থাকবে। কৃষিযন্ত্র ও যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী শিল্পাঞ্চলসমূহে ‘কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী জোন (এএমপিজেড)’ প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ শিল্পের উন্নয়নে বিশেষায়িত উৎপাদন প্রতিষ্ঠানে সরকারি ও  বেসরকারি উদ্যোগে ‘উচ্চতর সেবাকেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠায় উৎসাহিত করা হবে। বিশেষ অঞ্চলভিত্তিক যান্ত্রিকীকরণের আওতায় হাওর অঞ্চল, উপকূলীয় ও চরাঞ্চল, পাহাড়ি ও বরেন্দ্র অঞ্চলে বিশেষ পদক্ষেপ নেবে সরকার। পাশাপাশি গ্রামের শিক্ষিত যুবকদের যন্ত্রসেবা উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি এবং যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণে যুব সম্প্রদায়ের অধিক অংশগ্রহণ নিশ্চিতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া কৃষি যন্ত্রপাতি পরিচালনায় নারীর অংশহগ্রহণ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই নারীদের আরো উৎসাহিত করতে সরকার পদক্ষেপ নেবে বলে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে। কৃষি সচিব মো. নাসিরুজ্জামান বলেন, ‘আমরা কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা করার উদ্যোগ নিয়েছি। কৃষিকে কীভাবে যান্ত্রিকীকরণ করা হবে,  কোন ধরনের মেশিনারি অ্যাডাপ্ট করা হবে,  মেশিনারির মূল্য কী হওয়া উচিত- এসব বিষয়ই নীতিমালায় থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘ভিন্ন ভিন্নভাবে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ হচ্ছে। আমরা মনে করছি, এটি একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনা দরকার। এজন্য নীতিমালা করার উদ্যোগ  নেওয়া হয়েছে।’ কৃষি সচিব আরও বলেন, ‘কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা প্রণয়নে আমরা শেষ পর্যায়ে আছি। শিগগির অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভা  বৈঠকে পাঠানো হবে।’

 

সবজির সব ধরনের সারের প্রয়োজন সমান নয়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশে বেশির ভাগ সবজি চাষ হয় শীত মৌসুমে। এসব সবজির সব ধরনের সারের প্রয়োজন সমান নয়। কোনো কোনো সারের অভাবে অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দেয়। যেসব সার ফসলের জন্য কম লাগে কিন্তু একেবারেই ব্যবহার না করলে বা নির্ধারিত মাত্রায় ব্যবহার না করলে ফসলের জন্য সমস্যার সৃষ্টি হয় সেসব সারের মধ্যে বোরন অন্যতম। শীত মৌসুমে যেসব সবজি চাষ হয় তার মধ্যে কিছু কিছু সবজির বোরনের চাহিদা লক্ষ করা যায়। এসব সবজির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বেগুন, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, বরবটি, মটরশুঁটি, মুলা, আলু, গাজর, শালগম, বীট, সরিষাশাক, পালংশাক, পেঁয়াজ ইত্যাদি।
মাটির ওপরের স্তরের তুলনায় নিচের স্তরে বোরন বেশি থাকে। বিশেষ করে বেলে বা বেলে দো-আঁশ মাটিতে সেচের পানির সাথে বোরন চুঁইয়ে মাটির নিচের দিকে চলে যায়। এ জন্য এ ধরনের মাটিতে বোরন সার প্রয়োগের চেয়ে পাতায় প্রয়োগ বেশি কার্যকরী। তবে অন্য ধরনের মাটিতে বিশেষ করে ভারী মাটি বা চুন মাটিতে বোরন বেশি লাগে। পাতায় প্রয়োগ করলে প্রতি লিটার পানিতে ১.৫ থেকে ২.০ গ্রাম এবং মাটিতে প্রয়োগ করলে তিন থেকে চার কেজি বোরন সার প্রয়োজন হয়। মাটিতে প্রয়োগের বেলায় মূল সারের সাথে বা প্রথমবার উপরি সার প্রয়োগের সময় প্রয়োগ করতে হয়। অন্য দিকে পাতায় ¯েপ্র করলে বীজ বোনার বা চারা রোপণের ২০ থেকে ২৫ দিন এবং ৪০ থেকে ৪৫ দিন পর ¯েপ্র করতে হয়।
বোরন পাতায় ¯েপ্র করার অসুবিধা হলো- অভাবজনিত লক্ষণ দেখা দেয়ার পর এটি যখন প্রয়োগ করা হয় তখন ফসলের বেশ কিছু ক্ষতি হয়। বোরনের অভাবে বাড়ন্ত আলুগাছের ডগার পাতা পুরু হয় ও কিনারা বরাবর ভেতরের দিকে গুটিয়ে কাপের আকৃতি ধারণ করে। আলুগাছের শিকড় ও গুটিয়ে যায়, গাছ দুর্বল হয়। আলু ছোট আকারের হয়। বোরনের অভাবে টমেটোর চারাগাছে সবুজ রঙের পরিবর্তে কিছুটা বেগুনি রঙ লক্ষ করা যায়। বাড়ন্ত টমেটোগাছের ডগার কুঁড়ি শুকিয়ে মরে যায়। পাতা ভঙ্গুর হয়। ফলের খোসা খসখসে হয়ে ফেটে যায়।
বোরনের অভাবে বেগুনগাছের বৃদ্ধি কমে যায়। ফুল সংখ্যায় কম আসে এবং ফুল ঝরা বৃদ্ধি পায়। ফল আকারে ছোট হয় ও ফেটে যায়। বোরনের অভাবে শিম ও বরবটির নতুন বের হওয়া পাতা কিছুটা পুরু ও ভঙ্গুর হয়। পাতার রঙ গাঢ় সবুজ ও শিরাগুলো হলুদ হয়ে যায়। শেষে পাতা শুকাতে শুরু করে, গাছে ফুল দেরিতে আসে ও শুঁটি বীজহীন হয়।
বোরনের অভাবে ফুলকপির চারার পাতা পুরু হয়ে যায় এবং চারা খাটো হয়। ফুল বা কার্ডের ওপরে ভেজা ভেজা দাগ পড়ে। পরে ওই দাগ হালকা গোলাপি এবং শেষে কালচে হয়ে ফুলটিতে পচন ধরে। পাতার কিনারা নিচের দিকে বেঁকে যায় ও ভঙ্গুর প্রকৃতির হয়। পুরনো পাতা প্রথমে সাদাটে এবং পরে বাদামি হয়ে কিছুটা উঁচু খসখসে দাগে পরিণত হয়।
বোরনের অভাবে বাঁধাকপির মাথা বাঁধা শুরু হওয়ার সময় দেখা যায় যে মাথা বাঁধছে না এবং ভেতরটি ফাঁপা হয়ে যায়। একেবারে ভেতরের কচি পাতাগুলো বাদামি রঙের হয় এবং পচন ধরে। কান্ডের ভেতরের মধ্যাংশ ফাঁপা হয় ও পচে যায়। কাটলে তা থেকে দুর্গন্ধ বের হয়।
বোরনের অভাবে বাড়ন্ত মটরশুঁটির কচি পাতা হলুদাভ হয়ে কিছুটা ভেতরের দিকে বেঁকে যায় এবং ডগা শুকিয়ে যায়। অন্যান্য পাতা আকারে ছোট ও পুরু হয়। পাতার শিরা সাদাটে ও শিরার মধ্যবর্তী অংশ হলুদ হয়ে যায়। বোরনের অভাবে গাজরের পাতা ছোট হয়। গাজর আকারে ছোট হয় ও ফেটে যায়। মুলার পাতা বেঁকে যায়, পাতার রঙ প্রথমে বাদামি ও পরে কালো হয়ে শুকিয়ে যায়। মাটির নিচে মুলার স্ফীত অংশের ভেতরের দিকে বাদামি থেকে কালো রঙের পচন ধরে। শিকড়ে ফাটল ধরে ও বৃদ্ধি কমে যায়। বোরনের অভাবে পেঁয়াজ পাতার আগার দিক শুকিয়ে যায়। পরে শুকনো অংশ নিচের দিকে বাড়তে থাকে এবং গোলাকার বা রিংয়ের মতো হয়ে যায়। গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। পেঁয়াজ কন্দের আকারও ছোট হয়। বোরনের অভাবে মরিচ বা মিষ্টিমরিচের কচি পাতা হলুদ হয়ে এবং ফুল বা কচি ফলও ঝরে পড়ে। গাছের বৃদ্ধি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
বোরনের অভাব পূরণে যদি সময়মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তাহলে ফসলের ভালো ফলন পাওয়া যায়। বোরন পরিমাণে যেমন খুব বেশি লাগে না, তেমনি বেশি প্রয়োগ করলেও উল্টা ফল দেয় অর্থাৎ বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা দেয়। ফলন কমে যায়। মাটিতে যদি রকানো কারণে বোরনের পরিমাণ বেড়ে যায়, তাহলে জমিতে চুন প্রয়োগ করে কিংবা সেচ প্রয়োগের মাধ্যমে বোরন মাটির নিচের স্তরের দিকে নামানো যেতে পারে।
লেখক: কৃষিবিদ খোন্দকার মো: মেসবাহুল ইসলাম

ভালো লেয়ার চিনবেন যেভাবে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বর্তমানে পোলট্রি শিল্প বেশ জমজমাট। গ্রাম থেকে শুরু করে শহরের কেন্দ্রস্থল কোথাও এর সমাদরের কমতি নেই। এমনকি বড় বড় অট্টালিকার ছাদেও গড়ে ওঠেছে জীবন্ত এ শিল্প; যা থেকে পূরণ হচ্ছে দেশের পুষ্টি, বিশেষ করে আমিষের চাহিদা। পাশাপাশি আত্মকর্ম সংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে বেকারত্বের এক বিরাট অংশ। আর এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য খামারে চাই সুস্থ এবং উৎপাদনশীল মুরগি। তাই বেশি ডিম দেয়া মুরগির আচরণ ও অন্যান্য লক্ষণগুলো সম্পর্কে জানা জরুরি। মুরগির দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং এর আচরণের ওপর শরীরের অবস্থা উপলব্ধি করা যায়। সে কারণেই বেশি ডিম দেয়া মুুরগি কীভাবে চেনা যায় তা একেক করে এবার  জেনে নেয়া দরকার। বেশি ডিম দেয়া মুরগির মাথা হবে ছোট, হালকা এবং মাংসল অংশ থাকবে কম। মাথার ঝুটি ও গলার ফুল হবে উজ্জ্বল লাল রঙ কিংবা গোলাপি বর্ণের। তবে এগুলো অবশ্য নরম, সুগঠিত ও প্রস্ফুটিত হবে। মুরগির চোখের বর্ণ হবে উজ্জ্বল। চোখ সবসময় সতর্ক থাকবে। নাক ও মুখ থাকবে শ্লেষ্মাহীন পরিষ্কার। নাক দিয়ে সর্দিঝরা কিংবা গলার ভেতর ঘড়ঘড় শব্দ হবে না। মুরগির দেহ সুগঠিত হবে। পরিমাণমতো খাদ্য ও পানি পান করবে, সে কারণে খাদ্যথলিতে খাবারে ভর্তি থাকবে। পেটে ডিম অনুভব হলে অবশ্যই ওজনে ভারি হবে। এ ধরনের মুরগির পিঠ হয় লম্বা ও প্রশস্ত। শরীরের কোনো অংশে খুঁত, অপূর্ণতা অথবা বিকলাঙ্গ হবে না। সুস্থ অবস্থায় মুরগির পালক উজ্জ্বল ও সুবিন্যস্ত থাকে। এ ধরনের মুরগি সাধারণত মার্চ মাসের দিকে পালক পাল্টায়। তবে মাথার উপরিভাগের পালক শূন্য হয়ে টাকের সৃষ্টি হয়। মুরগির বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম উৎপাদনের হার তুলনামূলকভাবে কমে যায়। সাধারণত ৫৬০ দিন বয়স পর্যন্ত মুরগি মোট উৎপাদনের শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ ডিম দেয়। তাই বয়স্ক মুরগি খাবারের জন্য বিক্রি করে খামারের নতুন মুরগি তোলা উচিত। স্বাস্থ্যবান মুরগি সবসময় চঞ্চল থাকে এবং খাবার খুঁজতে ব্যস্ত মনে হয়। হঠাৎ কোনো শব্দ হলে অথবা শক্রর উপস্থিত বুঝতে পারলে মুখে এক ধরনের শব্দ করে স্বজাতিকে সতর্ক করে দেয়। কেউ ধরতে গেলে দৌড়ে পালায়। সুস্থ মুরগির পা থাকবে সুন্দর ও সুগঠিত। মুরগির পা’র মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাহাঁটি করবে। ডিম পাড়া মুরগির মলদ্বার হবে প্রশস্ত ও ডিম্বাকৃতি। পরীক্ষা করলে  সেখানে আর্দ্র ও রক্তাভ দেখাবে। মলদ্বারের উভয় পাশে হাত দিলে পাছার হাড় অনুভব করা যায়। উৎপাদনশীল মুরগির দু’হাড়ের মধ্যবর্তী দূরত্ব হবে দু’ইঞ্চি। মুরগির তলপেটে হাত দিয়ে বুঝা যাবে এর ডিম ধারণের ক্ষমতা। ডিম দেয়া অবস্থায় তলপেট প্রশস্ত ও নরম থাকে। মুরগি ডিম পাড়া অবস্থায় বুকের হাড়ের নিম্নভাগ এবং পাছার উভয় হাড়ের মাথা পর্যন্ত দূরত্ব হবে দু’ইঞ্চি। মুরগির তলপেটে মেদ থাকবে না এবং চাপ দিলে পেটের ভেতর ডিম অনুভব হবে। উৎপাদনশীল মুরগির চামড়ার নিচেও কোনো মেদ জমা থাকবে না। চামড়া হবে পাতলা ও নরম। সুস্থ অবস্থায় মুরগির দাঁড়ানোর ভঙ্গি স্বাভাবিক থাকে। দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবে। ডিম পাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মলদ্বার, ঠোঁট, ঝুটি, গলার ফুল ও পায়ের রঙ পরিবর্তন হতে শুরু করে। রঙ পরিবর্তন শেষ হলে বুঝতে হবে ডিম পাড়ার সময় শেষ। বেশি ডিম দেয়া মুরগির আচরণ হবে সতর্কভাব, ভদ্র ও চঞ্চল। ডিম পাড়ার সময় বাসায় ঢুকবে, কোনো সময় অলস বসে থাকবে না। ডিম পাড়া মুরগির পিঠে হাত রাখলে সহজেই বসে পড়বে। সুস্থ এবং বেশি ডিম দেয়া মুরগি চিহ্নিত করে তবেই পালন করা উচিত। এতে একদিকে যেমন রোগবালাইয়ের সম্ভাবনা কম থাকে, তেমনি খামারি হন লাভবান।

লেখক ঃ নাহিদ বিন রফিক, টেকনিক্যাল পার্টিসিপেন্ট, কৃষি তথ্য সার্ভিস, বরিশাল।

দেশে মাছের উৎপাদন বাড়ছে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ মৎস্য উৎপাদনে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে বাংলাদেশে। জানা  গেছে, ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বে যে চারটি দেশ মাছ চাষে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। বাংলাদেশের পরিবেশ মিঠা পানির মাছ চাষের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। দেশের জনগণ নিজেদের প্রয়োজনে মাছ চাষের প্রচলিত ধারণা থেকে সরে এসেছেন। নিজেদের পুকুরের মাছ খাওয়ার পাশাপাশি বাজার থেকে মাছ কেনার প্রবণতা  বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার সরকার মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের আমিষের চাহিদা পূরণে দেশের জলাশয়গুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০১৯’র উদ্বোধনকালে তিনি আরো বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমরা একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি- আমাদের যত জলাশয়, পুকুর, খাল, বিল রয়েছে সেগুলোকে আমরা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনবো, যাতে করে আমাদের মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে পারে।’ একই সঙ্গে বাড়ির আশপাশের ডোবা, পুকুর ও জলাশয়কে ফেলে না রেখে মাছ চাষ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা খাদ্যের চাহিদা পূরণ করেছি। এখন দৃষ্টি পুষ্টির দিকে। বিল, ঝিল, হাওর, বাঁওড়, নদীনালায় পরিকল্পিতভাবে মাছ চাষ করতে হবে। মাছের চাইতে এত নিরাপদ আমিষ আর নেই।’ ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আইএফপিআরআই) সর্বশেষ সমীক্ষায় অনুযায়ী উৎপাদিত মাছের ৭৫ শতাংশই এখন বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করছেন মাছ চাষিরা। সমীক্ষায় আরো বলা হয়েছে, বাড়তি চাহিদা, প্রযুক্তির উন্নয়ন, যোগাযোগ অবকাঠামো, লাখ লাখ পুকুর মালিক এবং ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে বাংলাদেশে মাছের উৎপাদন দ্রুত  বেড়েছে। বাংলাদেশ সরকার ভিশন ২০২১-এ দেশের মাছের উৎপাদন ৪৫ লাখ টন নির্ধারণ করা হয়েছে যা বর্তমান উৎপাদনের চেয়ে ১০ লাখ টন বেশি। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি সামুদ্রিক মাছ আহরণের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সমুদ্রে মাছ আহরণের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ২৫তম। বঙ্গোপসাগরে ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি ছাড়াও প্রায় ৫০০ প্রজাতির অর্থকরি মাছ রয়েছে। এ মাসের অতি সামান্যই মাত্র আহরিত হয়। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রজয়ে এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় মাছ ধরার আইনগত অধিকার পেয়েছে বাংলাদেশ। ফলে বঙ্গোপসাগর থেকে মৎস্য আহরণ পর্যায়ক্রমে বাড়বে। এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতিবছর অব্যবস্থাপনা ও অবহেলায় উৎপাদিত মাছের একটা বড় অংশ, প্রায় ১০ লাখ টন নষ্ট বা অপচয় হয়ে যায়। এটা রোধ করতে পারলে মাছ উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব হবে।

মাছ উৎপাদনে ক্রম সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশে প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ জোগান দেয় মাছ। ২০১৫ ও ২০১৭ সালে বিশ্বে পঞ্চম  থেকে চতুর্থ স্থান অর্জন করে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয়। বাংলাদেশের আগের দুটি অবস্থানে রয়েছে চীন ও ভারত। দেশে মোট কৃষিজ আয়ের ২৩ দশমিক ৮১ শতাংশ আসে মৎস্য খাত  থেকে। জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান এখন তিন দশমিক ৫৭ শতাংশ। কৃষিজ জিডিপিতে এই খাতের অবদান ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ১১ শতাংশের বেশি ১ দশমিক ৮২ কোটি মানুষ মৎস্য আহরণে সম্পৃক্ত। যার মধ্যে প্রায় ১৫ দশমিক ৫ লাখ নারী। দ্য স্টেট অব ফিশ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০১৮ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, চাষের ও প্রাকৃতিক উৎসের মাছ মিলিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন চতুর্থ। চার বছর ধরে বাংলাদেশ এই অবস্থানটি ধরে  রেখেছে। আর শুধু চাষের মাছের হিসাবে বাংলাদেশ পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের সাতটি দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের অর্ধেকেরও বেশি আসে মাছ থেকে। প্রাণিজ আমিষের ৫৮ শতাংশ মাছ দিয়ে মিটিয়ে শীর্ষস্থানীয় দেশের কাতারে এখন বাংলাদেশ।

প্রতিবছরই বাড়ছে ইলিশের উৎপাদন। বিবিএস জরিপ অনুযায়ী, মাছের সামগ্রিক উৎপাদনে দেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়ার প্রভাবও পড়ছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ টন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৮৬-৮৭ সালে দেশে ইলিশ উৎপাদন হতো ১ লাখ ৯৫ হাজার টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সেই সংখ্যা  বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯৫ হাজার টন। দেড় দশকের ব্যবধানে এ সংখ্যা ছাড়িয়ে  গেছে ২ লাখ টনে। ইলিশ রফতানির মাধ্যমে আসে দেড়শ থেকে তিনশ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ইলিশের অবদান ১ দশমিক ১৫ শতাংশ, যার অর্থমূল্য আনুমানিক সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। মাছের উৎপাদন-সাফল্য উৎসাহজনক হলেও উৎপাদন সম্ভাবনা রয়েছে এর  চেয়ে বহুগুণ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে মাছের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫৫ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে লবণাক্ত পানিতে মাছের উৎপাদন ছিল ছয় লাখ ৯৭ হাজার টন, মিঠা পানির মাছের উৎপাদন ছিল ৩৩ লাখ ২০ হাজার টন। আবার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকারের ভিশন ২০২১-এ দেশের মাছের উৎপাদন ৪৫ লাখ টন নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বর্তমান উৎপাদনের চেয়ে ১০ লাখ টন বেশি। বিবিএসের সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী দেশে গড়ে মাছের বার্ষিক উৎপাদন সাড়ে ৩৫ লাখ টন। যার বাজারমূল্য প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে চাষ করা মাছের পরিমাণই প্রায় ২০ লাখ টন। জাটকা সংরক্ষণের ফলে ইলিশের উৎপাদন বেড়ে এখন সাড়ে ৩ লাখ টন।  দেশের প্রায় ১ লাখ হেক্টর জমিতে সামাজিকভাবে প্রচলিত পদ্ধতিতে ৩৫ হাজার টনের চিংড়ি উৎপাদিত হয়। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সঠিকভাবে চিংড়ি চাষ করা সম্ভব হলে দেশের প্রায় ২ লাখ ৩০ হেক্টর জমিতে থাইল্যান্ডের মতো অর্থনৈতিক ও পরিবেশবান্ধব উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে আড়াই লাখ টন চিংড়ি উৎপাদন করা সম্ভব। শুধু ময়মনসিংহ অঞ্চলে প্রতিবছর ৫ হাজার কোটি টাকার চিংড়ি উৎপাদন করা সম্ভব। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট মৎস্যসম্পদের উৎপাদন ও প্রজনন বৃদ্ধির লক্ষ্যে গবেষণায় ১৬ শতাংশ অধিক উৎপাদনশীল রুইজাতীয় মাছের নতুন জাত এবং দেশীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে চাষ ব্যবস্থাপনা ও প্রজননবিষয়ক ৪৯টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে।

মৎস্য উৎপাদন ও রফতানিতে নতুন আশাবাদে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মাছের ফেলে দেওয়া অংশ দিয়ে তৈরি স্যুপ বিক্রি হচ্ছে পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নামিদামি রেস্তোরাঁয়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, অপ্রচলিত এই পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ বছরে আয় করছে শত কোটি টাকা। ইউরোপসহ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এসব অপ্রচলিত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে গড়ে প্রতি মাসে ১০০ টন মাছের ফোৎনা রপ্তানি করে আয় করছে ২০ লাখ ডলার। এ ছাড়া প্রায় ২০০ টন মাছের আঁশ রপ্তানি হচ্ছে ইতালি, জার্মানি,  কোরিয়া, চীন ও ভিয়েতনামে। প্রতিমাসে গড়ে ৮টি কন্টেইনারে প্রায় ৮০ টন হাঙর জাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে আয় হচ্ছে প্রায় ১৫ লাখ ডলার।

লেখক ঃ   এস এম মুকুল, কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক

 

 

ভাসমান বীজতলায় চারা উৎপাদন

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বন্যা ও জলাবদ্ধপ্রবণ এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন কৌশল হিসেবে ভাসমান সবজি ও মসলা উৎপাদন প্রযুক্তি এবং ক্ষেত্র বিশেষে আপদকালীন সময়ে আমন ধানের চারা উৎপাদন সম্প্রসারণে নতুন যুগের সূচনা করেছে। টানা বৃষ্টি ও নদনদীর পানি বৃদ্ধির কারণে দেশের কিছু এলাকা বর্তমানে বন্যায় আক্রান্ত। বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়ে কিছু স্থানে বীজতলায় রোপা আমনের চারা নষ্ট হয়ে গেছে। ফসলহানি থেকে রক্ষার জন্য ভাসমান বীজতলায় রোপা আমনের চারা উৎপাদন করা যেতে পারে। বন্যার পানি নামতে দেরি হলে বা বীজতলা তৈরির উপযোগী জমি না থাকলে নদী, বিল, পুকুর বা জলাবদ্ধ স্থানে পানির উপর কচুরিপানা বা কলাগাছের ভেলা তৈরি করতে হবে। ভেলা বা কচুরিপানার উপর নারিকেল বা সুপারি গাছের শুকনা পাতা অথবা চাটাই বিছিয়ে দিতে হবে। এর ওপর জলাধারের তলদেশের মাটি বা কাদার ৩-৪ সেমি স্তর দিয়ে বীজতলা তৈরি করতে হবে। প্রতি বর্গমিটারে ৮০ থেকে ১০০ গ্রাম জাগ দেয়া রোপা আমনের বীজ ফেলতে হবে। স্বাভাবিক বীজতলার মতোই পরিচর্যা করতে হবে। চারার বয়স ২০-২৫ দিন হলে চারা উঠিয়ে মাঠে রোপণ করা যেতে পারে। সতর্কতা হচ্ছে- বীজ ছিটানোর পর সতর্ক থাকতে হবে যেন হাঁস বা পাখি বীজতলা নষ্ট করতে না পারে। এ জন্য চারিদিক নেট বা জাল দিয়ে ঘেরা দিতে হবে। পানিতে ভাসমান বেড যেন ভেসে না যায় সে জন্য বীজতলার ভেলাকে দড়ি দিয়ে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখতে হবে। চারার বয়স বেশি করা যাবে না। অন্যথায় চারার শিকড় কচুরিপানার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবে এবং তোলার সময় ছিঁড়ে যাবে। বন্যাকবলিত এলাকায় ভাসমান বেডে আমন ধানের বীজতলা করা যায়। ভাসমান বেডে ধানের বীজতলা করলে পানিতে ডুবে থাকা জমি থেকে পানি নেমে যাওয়ার পরপর কিংবা ডুবোজমি জেগে উঠার পর দেরি না করে ২০ থেকে ২৫ দিন বয়সী আমনের চারা মূল জমিতে লাগানো যায়। এতে সময় নষ্ট হয় না, সময়ের সঙ্গে সমন্বয় করে আমন আবাদ করা যায়। আমন ফলনেও তেমন ব্যাঘাত ঘটে না। বৃষ্টি আর বন্যার কারণে যেখানে আমনের বীজতলা করা যায় না সেখানেও বর্ষা বা বন্যার পানি টান দিলে সময় নষ্ট না করে ভাসমান বেডে উৎপাদিত আমন ধানের চারা দিয়ে যথাসময়ে এসব জমিতে আমন আবাদ কর যায়। এতে সময় সাশ্রয় হয়, বহুমুখী লাভ হয়। এ প্রযুক্তিটি ইতোমধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এতে কৃষি আর কৃষকদের বহুমুখী লাভ হচ্ছে। ভাসমান বেড তৈরির প্রধান উপকরণ কচুরিপানা। এ ছাড়া টোপাপানা, শেওলা, বিভিন্ন ধরনের জলজ আগাছা, দুলালিলতা, ধানের খড় বা ফসলের অবশিষ্টাংশ, আখের ছোবড়া, ডাস্ট ব্যবহার করে ভাসমান বেড তৈরি করা যায়। পরিপক্ব গাঢ় সবুজ রঙের বড় ও লম্বা কচুরিপানা দিয়ে বেড তৈরি করলে বেডের স্থায়িত্ব বেশি হয়। যেখানে দুলালিলতা পাওয়া যায় না সেখানে দুলালিলতার পরিবর্তে পাটের তৈরি দড়ি দিয়ে বল মেডা তৈরির করা হয়। এ ছাড়া নারিকেলের ছোবড়ার গুঁড়া চারা তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়। ভাসমান বীজতলার ক্ষেত্রে অন্য স্বাভাবিক বীজতলার মতোই বীজের হার প্রতি বর্গমিটারে ৮০ থেকে ১০০ গ্রাম হবে। এ ক্ষেত্রে এক বিঘা জমি রোপণের জন্য ৩৫ বর্গমিটার বা প্রায় ১ শতক ভাসমান বীজতলার চারা ব্যবহার করা যায়। চারার বয়স ২০ থেকে ২৫ দিনের হলে চারা উঠিয়ে মাঠে রোপণ করা যেতে পারে। এতে দানের চারা উৎপাদনের জন্য আর মূল জমি ব্যবহার করতে হয় না। জমি ব্যবহার সাশ্রয়ী হয়। জেগে উঠা খালি জমিতে তাড়াতাড়ি কাঙ্খিত ফসল উৎপাদন করে বেশি লাভবান হওয়া যায়। এভাবে তৈরি চারা অন্যসব স্বাভাবিক চারার মতোই রোপণ করতে হবে এবং পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনা অন্য স্বাভাবিক বীজতলার চারার মতোই হবে। উৎপাদিত চারা অন্য সব স্বাভাবিক চারার মতোই ফলন দেয়। পানিতে ভাসমান থাকার জন্য এ বীজতলায় সাধারণত সেচের দরকার হয় না, তবে মাঝে মধ্যে প্রয়োজনে ছিটিয়ে পানি দেয়া যেতে পারে।
লেখক ঃ কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন

পোকায় খাওয়া শাকসব্জি নিরাপদ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় শাকসব্জির পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে জনপ্রতি প্রতিদিন গড়পরতা ১৫০ গ্রামের উপরে পৌঁছেছে। সুস্থ ও সবল দেহের জন্য, অতিরিক্ত ওজন ও মেদ কমাতে এবং রোগ প্রতিরোধে প্রতিদিন তরকারী, সালাদ, ভাজি, সস্, স্যুপ বা রস যে ভাবেই হোক না কেন শাকসব্জি খাওয়া বেড়েই চলেছে।

তবে এই শাকসব্জি আমাদের কতটুকু উপকার করছে তা নিয়ে সম্প্রতি শংকার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক খাদ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ বিভিন্ন সময়ে শাকসব্জি কোন কোন ক্ষেত্রে নিরাপদ নয় বলে সাবধান করে আসছেন। অন্যান্য খাদ্যের মত শাকসব্জি উৎপাদনেও রাসায়নিক বালাইনাশক বা কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। তবে শাকসব্জিতে এই রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ জন্য শাকসব্জি ক্রেতা ও উৎপাদনকারী উভয়ই দায়ী। ক্রেতারা শাকসব্জি চকচকে, তাজা ও অক্ষত না হলে উপযুক্ত দাম দিতে ইচ্ছুক থাকেন না। ফলে শাকসব্জি আবাদে চাষি ভায়েরা সার, কীটনাশক ও হরমোন প্রয়োগ করে ক্রেতাদের মন রক্ষা করছেন।  ফলে ক্রেতারা অর্থ খরচ করে শাকসব্জির সাথে হয়তো বা বিষাক্ত দ্রব্যও কিনছেন।

দৈনিক আমরা খাদ্যের সাথে কী পরিমাণে কীটনাশক গ্রহণ করছি এবং কতটুকু শরীরে গ্রহণযোগ্য বা সহনশীল তা আমাদের জানা নেই। অন্যদিকে, শাকসব্জির উৎপাদনে কী পরিমাণ কোন কীটনাশক ব্যবহার করা হয় তাও জানা নেই। তবে কৃষক ভাইদের সাথে আলাপ করে দেখা গেছে যে প্রায় সবরকম সবুজ শাকসব্জিতে কীটপতঙ্গ আক্রমণের ভয়ে কীটনাশক প্রয়োগ করেন। বিশেষ করে শাকসব্জির আবাদ যাদের অন্যতম পেশা। যে সমস্ত কীটনাশক সস্তা ও প্রয়োগ করলে দ্রুত পোকা মরে সেগুলোর চাহিদা  বেশি। ক্রেতার মন রক্ষা করে বেশি দামের আশায় চকচকে শাকসব্জি উৎপাদনের জন্য কৃষকভাইয়েরা কোন কোন ক্ষেত্রে অনুমোদিত হারের তুলনায় অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করে থাকেন। পাইকারী বাজারে বড় বড় সাইজের চকচকে শাকসব্জির চাহিদা বেশি। দেশী জাতের শাকসব্জির  চেহারা ও আকৃতি আকর্ষণীয় নয়। ফলে বাজারে নতুন জাতের বা বিদেশী বীজ থেকে উৎপাদিত শাকসব্জির চাহিদা বেশি। আকারে বড় ও ফলন বেশি হওয়ার কারণে কৃষকভাইয়েরাও এসমস্ত জাতের শাকসব্জি উৎপাদনে আগ্রহী বেশি। অন্যদিকে, দেশী জাতের তুলনায় নতুন জাত বা বিদেশ থেকে আমদানীকৃত বীজ থেকে উৎপাদিত শাকসব্জির জমিতে কীটনাশক প্রয়োগের হার বেশি।

কিছুদিন আগে টেলিভিশনে বাজারে জিনিসপত্রের দাম সংক্রান্ত প্রচারিত এক অনুষ্ঠানে জনৈক ক্রেতা শাকসব্জির দাম বেশি বলে অভিযোগ করতে গিয়ে বললেন “এই দেখুন পোকায় খাওয়া বেগুনও চল্লিশ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।”  তিনি হয়ত জানেন না যে এই বেগুনে রাসায়নিক কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়নি। যার ফলে পোকা আক্রমণ করতে পেরেছে।  তবে এই বেগুন খাওয়া নিরাপদ। খোঁজাখুঁজি করেও বিষমুক্ত পোকায় খাওয়া শাকসব্জি পাওয়া যায় না।

তিনচার দশক আগেও আমরা কীটপতঙ্গ আক্রান্ত শাকসব্জি খেয়েছি। এ ব্যপারে কোন দ্বিধা বা অভিযোগ ছিলো না। বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি কাটার সময়ে সবুজ রং-এর সাদা কীড়া পাওয়া যেত। ডাটা ও লাল শাকে পোকায় খাওয়া জালের মত পাতা পাওয়া যেত।  শাকসব্জি কাটতে গিয়ে পোকা দেখে অনেক সময় গৃহিণীরা আঁতকে উঠতেন। পয়সা খরচ করে  পোকা-খাওয়া সব্জি কেন এনেছো, এই বলে অভিযোগ করতেন। তবে তারা সতর্কতার সাথে  পোকা তুলে ফেলে এবং আক্রান্ত অংশ বাদ দিয়ে রান্না করতেন। তখন রাসায়নিক কীটনাশকের কোন ব্যবহার ছিল না। কেউ এই রাসায়নিক দ্রব্য চিনতোও না।

একই জমিতে একসাথে বিভিন্ন শাকসব্জির আবাদ করে, বেশি দূরত্বে বীজ বপন বা চারা রোপণ করে, জমি পরিষ্কার পরিছন্ন ও আগাছা মুক্ত রেখে, গাছের পাতায় ছাই ছিটিয়ে কীটপতঙ্গের আক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া হত।  তাছাড়া বিটল, উড়চুঙ্গা, মাছি, বোলতা, লাল পিঁপড়া, মাকড়সা, ব্যাঙ, শালিক, ফিংগে, গুইসাপ ও পেঁচা ইত্যাদি প্রাণীর বংশবিস্তার ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা থাকায় কীটপতঙ্গের আক্রমণ কম হতো।  কারণ এ সমস্ত প্রাণী ফসলে আক্রমণকারী কীটপতঙ্গ এবং তাদের ডিম, কীড়া ও পুত্তলি ধরে খায়। এর পরেও শাকসব্জিতে কীটপতঙ্গ পাওয়া গেলে বা আক্রমণের চিহ্ন থাকলে কেউ  খেতে দ্বিধা বোধ করত না।  বাজারে চাহিদারও কমতি ছিলো না।

সম্প্রতি আমরা হঠাৎ করে শাকসব্জিতে কীটপতঙ্গ দেখে আতংকিত হতে শুরু করেছি। ফলে বাজারে চকচকে শাকসব্জির যেমন চাহিদা তেমনি মূল্য বৃদ্ধি  পেয়েছে। কীটপতঙ্গ আক্রান্ত হলে বিক্রি হয় না, দাম কম। খুঁজেও এখন শাকসব্জিতে পোকা পাওয়া যাবে না। ক্রেতাদের মন রক্ষা করতে গিয়ে শাকসব্জিসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদনে বছরে পঁচিশ হাজার টন বা কিলো লিটারের উপরে রাসায়নিক কীটনাশক প্রয়োগ করা হচেছ। এই প্রয়োগের হার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দু’দশক আগেও বছরে পাঁচ হাজার টন প্রয়োগ করা হতো। হিসেব করলে প্রতি একর আবাদি জমিতে ফসল উৎপাদনে বছরে  সোয়া কেজি বা লিটার রাসায়নিক কীটনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে। এর একটা অংশ শাকসব্জি ক্ষেতে প্রয়োগ করা হয়।

কীটনাশকের প্রভাব থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আমাদের কীটপতঙ্গ আক্রাস্ত শাকসব্জি পরিহার করা ঠিক হবে না। কীটপতঙ্গ আক্রান্ত শাকসব্জি নিরাপদ,  খেতে স্বাদ বেশি, উপকারও বেশি। আগের মত এই শাকসব্জির চাহিদা থাকলে কৃষক ভায়েরা রাসায়নিক কীটনাশক প্রয়োগে অনুৎসাহিত হতে থাকবেন। অর্গানিক বা জৈব শাকসব্জি আবাদে আগ্রহী হবেন।  এই ধরনের চাষাবাদে কীটপতঙ্গ দমনে রাসায়নিকের পরিবর্তে জৈব দ্রব্য প্রয়োগ করা হয়।  যেমন নিমের পাতা ও বীজ,  তামাকের সতেজ বা শুকনা পাতা, মরিচের গুঁড়া ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে অথবা পাউডার বা তরল ডিটারজেন্ট সাবানের পানি শাকসব্জির ক্ষেতে ছিটিয়ে, শাকসব্জির বাগানে মাঝে মাঝে তামাকের গাছ লাগিয়ে, ফাঁদ পেতে বা হাত জালে কীটপতঙ্গ ধরে, ইত্যাদি। এই সমস্ত পদ্ধতিতে শাকসব্জির আবাদে ফলন বা উৎপাদন কম হতে পারে।  ফলে মূল্য  বেশি হতে পারে এবং কম করে খাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবুও আমাদের শরীর ও পরিবেশ নিরাপদ থাকবে।

লেখক ঃ কিউ আর ইসলাম, কৃষিবিদ

ভারতীয় গরু না আসায় পশু পালনকারী খুশি

ঈদকে সামনে রেখে জমে উঠেছে দৌলতপুরের পশু হাটগুলো

শরীফুল ইসলাম ॥ আরমাত্র একদিন পরই ঈদ। তাই ঈদকে সামনে রেখে শেষ মুহুর্তে জমে উঠেছে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের পশু হাটগুলো। প্রতিটি হাটে এখন ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় রয়েছে। এবার সীমান্তবর্তী উপজেলা দৌলতপুরের বিভিন্ন পশুহাটে ভারতীয় গরুর আমাদানি না থাকলেও দেশী গরুর আমাদানি রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমানে। তবে সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু না আসায় পশু পালনকারীরা বেশ খুশি। সেই সাথে পশুর দাম নিয়েও ক্রেতা বিক্রেতাদের মাঝে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তারপরও পছন্দের পশুটি ক্রয় করতে পেরে যেমন খুশি ক্রেতারা তেমনি বিক্রয় করতে পেরেও বিক্রেতারা খুশি। তবে পশুর খাদ্য সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির কারন দেখিয়ে বাড়িতে পশু পালনকরা কৃষকরা তাদের পশুর দাম হাকলেও ক্রেতারা সেটাকে মনে করছেন অনেক বেশী। ইব্রাহিম মন্ডল নামে কোরবানীর পশু ক্রেতা জানান, হাটে দেশী গরুর আমাদানি বেশী হলেও তারা দাম হাকাচ্ছেন আকাশ ছোয়া। রুবেল ইসলাম নামে পশু বিক্রেতা জানান, হাটে বেশী পশু উঠলেও ক্রেতার সংখ্যা তুলনামুলক কম। ঈদের এখনও এককদিন সময় আছে। হয়তো কয়েক হাট ঘুরে দেখে শুনে তাদের পছন্দের পশুটি ক্রয় করবেন তারা।
অপরদিকে বিভিন্ন পশু হাটে অসুস্থ কোরবানীর গরু বা মহিষ বা ছাগল ক্রয় বিক্রয় করা হচ্ছে কি না তার তদারকিসহ পশুর চিকিৎসা সেবা, জনসেচেতনতা মূলক বিভিন্ন পরামর্শ ও তদারকি করছেন দৌলতপুর প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. কাজী নজরুল ইসলাম । ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পশু কোরবানী অপরিহার্য্য। তাই সামর্থ্যবান ব্যক্তি পরিবারের সদস্যদের সাথে বিভিন্ন পশু হাটে ঘুরে ফিরে পছন্দের কোরবানীর পশুটি ক্রয় করে বাড়ি ফিরছেন ঈদের বাড়তি আনন্দ নিয়ে। আর কোরবানীর পশু ক্রয় করাও ঈদ আনন্দের একটি অপরিহার্য অংশ।

আধুনিক পদ্ধতিতে পটল চাষ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ পটল একটি জনপ্রিয় উচ্চমূল্য সবজি। পটল মূলত খরিপ  মৌসুমের ফসল। তবে সারা বছর ধরেই কম-বেশি পাওয়া যায়। অন্যান্য সবজির তুলনায় এর বাজারমূল্য তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে বাজারে যখন সবজির ঘাটতি দেখা দেয় তখন পটল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের মোট সবজির চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ পটল পূরণ করে থাকে।

সুস্থ থাকার জন্য একজন মানুষের দৈনিক কমপক্ষে ২৩৫ গ্রাম সবজি খাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বালাদেশে উৎপাদিত সবজির মাথাপিছু দৈনিক গড় প্রাপ্যতা ৮২ গ্রাম। চাহিদার তুলনায় প্রাপ্যতার এই বিশাল ঘাটতি পূরণের জন্য দেশের সবজি উৎপাদন অবশ্যই বাড়ানো প্রয়োজন। বাংলাদেশের জলবায়ু ও আবহাওয়া পটল চাষের উপযোগী। দেশের সকল এলাকাতেই পটল চাষ করা সম্ভব। তবুও প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাবে দেশের কিছু নির্দ্দিষ্ট এলাকায় এর চাষ সীমাবদ্ধ। বৃহত্তর রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া, পাবনা, ফরিদপুর, যশোর ও কুষ্টিয়া জেলায় পটল চাষ বেশি হয়। দেশের অন্যান্য এলাকায় পটল চাষ সম্প্রসারণ করে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করলে একদিকে যেমন  মোট সবজির উৎপাদন বাড়বে অপরদিকে কৃষকদের আর্থিক সচ্ছলতাও বাড়বে।

জলবায়ু ও মাটি ঃ পটল গাছের দৈহিক বৃদ্ধি এবং ফলনের জন্য উষ্ণ এবং আর্দ্র আবহাওয়া দরকার। এ জন্য খরিপ মৌসুম পটল চাষের উপযুক্ত সময়। পানি নিষ্কাশনের সুবিধা আছে এমন উঁচু ও মাঝারী উঁচু জমি এবং বেলে দো-আঁশ থেকে  দো-আঁশ মাটি পটল চাষের জন্য উপযোগী। পটল বেশ খরা সহিষ্ণু। তবে পানির ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে ফলন কমে যায়।

জাত ঃ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় স্থানীয় অনেক জাতের পটল দেখা যায়। যেমন- বালি, মুর্শিদাবাদী, কানাইবাঁশী এসব। জাতগুলোর মধ্যে আকার এবং রংয়ের অনেক  বৈচিত্র লক্ষ্য করা যায়। যেমন- কোনটি লম্বা ও চিকন, কোনটি লম্বা ও মোটা,  কোনটি খাট ও মোটা, কোনটি গাঢ় সবুজ, কোনটি হালকা সবুজ, কোনটি  ডোরাকাটা, কোনটি ডোরাবিহীন, কোনটির পুরু ত্বক আবার কোনটির পাতলা ত্বক। এসব জাতই এতদিন চাষ হয়ে আসছিল। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি পটল-১ ও বারি পটল-২ নামে পটলের দুটি জাত উদ্ভাবন করেছে। জাতগুলো উচ্চ ফলনশীল এবং রোগবালাই সহিষ্ণু। উপযুক্ত পরিচর্যা করলে জাতগুলো প্রতি শতাশে ১২০ থেকে ১৫০ কেজি ফলন দিয়ে থাকে।

বপন সময় ঃ বাংলাদেশে বর্ষার শেষে আশ্বিন-কার্তিক মাস এবং শীতের শেষে ফাল্গুন-চৈত্র মাস পটল লাগানোর উপযুক্ত সময়। আশ্বিন-কার্র্তিক মাসে পটলের কাটিং বা শিকড় লাগালে তীব্র শীত শুরুর আগেই গাছের কিছুটা অংগজ বৃদ্ধি হয়ে থাকে। এতে জীবনকাল কিছুটা দীর্ঘায়িত হলেও ফালগুন-চৈত্র মাসে আগাম ফলন পাওয়া যায় এবং বাজারমূল্য বেশি পাওয়া যায়। বৃষ্টিবহুল এলাকায় বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে অবশ্যই আশ্বিন-কার্তিক মাসে পটল লাগানো উচিত। ফালগুন-চৈত্র মাসে পটল লাগালে গাছ দ্রুত বাড়ে, জীবনকাল কমে যায় এবং জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে ফল আসা শুরু হয়। চট্টগ্রাম অঞ্চলে পানের বরজে ছায়াদানকারী গাছ হিসাবে আশ্বিন-কার্তিক মাসে পটল লাগানো হয়। চরাঞ্চলে বর্ষজীবি ফসল হিসাবে প্রতি বছর আশ্বিন-কার্তিক মাসে পটল চাষ করা হয়। পলিব্যাগে চারা করে মূল জমিতে শ্রাবন-ভাদ্র মাসে লাগানো গেলে অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে ফলন পাওয়া যায়।

বংশ বিস্তার ঃ পটল একটি পরপরাগায়িত উদ্ভিদ। এর স্ত্রী ও পুরুষ ফুল আলাদা গাছে ফোটে। বীজ দ্বারা এর বংশবিস্তার করা হয় না। বীজ থেকে জন্মানো গাছে ফুল আসতে প্রায় দুই বছর সময় লাগে। কন্দমূল অথবা কান্ডের শাখা কলম দিয়ে পটলের বংশবিস্তার করা হয়। শাখা কলমের ক্ষেত্রে পরিপক্ক কান্ড ব্যবহার করা হয়। পটলের কান্ড মরে গেলেও মূল জীবিত থাকে। শীতের শেষে কান্ড থেকে নতুন চারা বের হয়। পটলের শাখা কলম বা লতার কাটিং করার জন্য একাধিক পদ্ধতি রয়েছে।  যেমন- প্রায় এক বছর বয়সের মোটা আকারের লতা ৫০ সে.মি. বা একটু বেশি লম্বা করে কেটে নিয়ে রিংয়ের মত করে পেঁচিয়ে মূল জমিতে বেডে লাগানো যায়। এতে ৪-৫ টি গিট মাটির নিচে থাকে এবং একটি গিট মাটির উপরে থাকে।

মূল জমির বেডে নির্দ্দিষ্ট দূরত্বে লাঙ্গল দিয়ে ১৫ সে.মি. গভীর নালা করে পরিপক্ক লতা লম্বা করে নালায় বিছিয়ে মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। এক্ষেত্রে লতার দুই প্রান্ত মাটির উপরে উন্মুক্ত থাকে। পরিপক্ক লতা কেটে রিংয়ের মতো করে পেঁচিয়ে বাড়িতে বা নার্সারীতে ছায়ায় লাগানো হয়। এক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি গিট মাটি দিয়ে ঢাকা থাকে। এরপর গজানো চারা মুলসহ উঠিয়ে নিয়ে বেডে লাগানো হয়।

শাখাকলম লাগানোর সময় মাটিতে পর্যাপ্ত রস না থাকলে কলম শুকিয়ে মারা যায়। এক্ষেত্রে পরিব্যাগে চারা গজিয়ে নিলে মূল জমিতে সময় মতো লাগানো যায়। এ পদ্ধতিতে খরচ কিছুটা বাড়লেও চারার মৃত্যুর হার অনেক কমে যায় ফলে মোট উৎপাদন বেড়ে যায়। মাটিতে আর্দ্রতা কম থাকলে একটু গভীরে শাখা কলম লাগাতে হয়। তবে বেশি আর্দ্র জমিতে কলম লাগালে তা পচে যেতে পারে।

জমি তৈরি ও রোপণ ঃ পটলের জমি গভীর করে ৪-৫ টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে তৈরি করে নিতে হয়। এতে পটলের মূলের বিস্তার সহজ হয় এবং গাছ সহজেই মাটি থেকে পানি ও পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করতে পারে। জমি চাষ করার পর  বেড তৈরি করে নিতে হয়ে। বেড পদ্ধতিতে পটল চাষ করা ভাল। এতে বর্ষাকালে  ক্ষেত নষ্ট হয় না। রোপণ পদ্ধতির উপর নির্ভর করে বেডের প্রস্থ ও রোপণ দূরত্ব কম-বেশি হয়ে থাকে। জমির দৈর্ঘ বরাবর ২৬০ সে.মি. চওড়া বেড তৈরি করে নিয়ে পাশাপাশি দুটি বেডের মাঝে ৩০-৩৫ সে.মি. প্রস্থ এবং ২০ সে.মি. গভীর নালা রাখতে হয়। এতে সেচ ও নিকাশের সুবিধা হয়।  প্রতি বেডে ২০০ সে.মি. দূরত্বে লাঙ্গল দিয়ে ১০-১৫ সে.মি. গভীর করে দুটি নালা করে নিতে হয়।  প্রতি নালায় ৫০  সে.মি. পর পর ১০-১৫ সে.মি. গভীরে শাখা কলম লাগাতে হয়। দেশের বৃষ্টিবহুল এলাকায়, সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে, চাষের জন্য বেডের প্রস্থ হবে ১৫০ সে.মি.। প্রতি বেডের মাঝ বরাবর এক সারিতে ১৫০ সে.মি. দূরে দূরে  মাদা তৈরি করে মাদায় চারা রোপণ করতে হয়। মাদার আকার হবে যথাক্রমে ৫০ ী  ৫০ ী ৪০  সে.মি.। এক্ষেত্রে সেচনালার প্রস্থ হবে ৪০-৪৫ সে.মি.।  একসঙ্গে চারা লাগালেও স্ত্রী ফুলের ১০-১৫ দিন পরে পটলের পুরুষ ফুল ফোটে। পুরুষ ফুলের অভাবে প্রথম দিকে ফোটা স্ত্রী ফুলগুলিতে ফল হয় না। তাই মূল জমিতে সারিতে বা মাদায় প্রতি ১০ টি স্ত্রী গাছের পর পর একটি পুরুষ গাছ ১০-১৫ দিন আগেই লাগানো উচিত।

সার প্রয়োগ ঃ পটলের ভাল ফলন পাওয়ার জন্য মাঝারী উর্বর জমিতে বিঘাপ্রতি ১৩০০ কেজি গোবর বা কম্পোষ্ট, ৪০ কেজি ইউরিয়া, ২৭ কেজি টিএসপি, ২০  কেজি এমওপি এবং ৮ কেজি জিপসাম সার ব্যবহার করা প্রয়োজন। ইউরিয়া ছাড়া বাকী সব সারের অর্ধেক পরিমাণ জমি তৈরির সময় এবং বাকী অর্ধেক সার মাদায় দিতে হবে। ইউরিয়া সার চারা গজানোর ২০ দিন পর পর সমান ৩ কিস্তিতে মাদার চারপাশে প্রয়োগ করতে হবে। পটলের জমিতে মাচা না দিলে ইউরিয়া সার দেয়া অসুবিধাজনক। সেক্ষেত্রে অর্ধেক ইউরিয়া বেডে এবং বাকী অর্ধেক ইউরিয়া চারা গজানোর ৩০ দিন পর গাছের গোড়ার চারপাশে মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে। পটলের ফলন প্রথম দিকে বাড়তে থাকে পরে আস্তে আস্তে কমতে থাকে। ফলন একেবারে কমে আসলে মাদার চারপাশ পরিষ্কার করে হালকাভাবে মাটি কুপিয়ে মাদাপ্রতি অতিরিক্ত ২০-৩০ গ্রাম ইউরিয়া, ৩০-৩৫ গ্রাম টিএসপি এবং ২০-২৫ গ্রাম এমওপি সার প্রয়োগ করলে গাছে নতুন নতুন ফুল ধরে এবং ফলন অনেক বেড়ে যায়। এভাবে দুবার সার দেয়া যেতে পারে।

পরিচর্যা ঃ ভাল ফলন পাওয়ার জন্যে পটলের জমিতে বিভিন্ন পরিচর্যা করতে হয়।  যেমন- বাউনি বা মাচা দেয়া: পটল একটি লতানো উদ্ভিদ। তাই পটল গাছের সুষ্ঠু বৃদ্ধি এবং ভাল ফলনের জন্য বাউনি বা মাচা দেয়া অবশ্যই দরকার। বাঁশের কাঠির সাহায্যে চারা গাছকে মাচায় তুলে দেয়া হয়। এক মিটার উচ্চতায় মাচা বা বাউনি দিলে পটলের ফলন প্রায় দ্বিগুণ পাওয়া যায়। পটলের মাচা বা বাউনি দু’ভাবে দেয়া যায়। বাঁশের তৈরি আনুভূমিক এবং রশি দ্বারা তৈরি খাড়া বা উল্লম্ব। মাচার দৈর্ঘ ও প্রস্থ হবে বেডের সমান। পটলের আকর্ষি ছোট হওয়ায় বাউনি যত চিকন আকারের  দেয়া যায় ততই ভাল। পটলের মাচা বা বাউনি বেশ খরচ সাপেক্ষ। তাই অনেক এলাকায় পটল চাষীরা বাউনির বদলে মাটির উপর খর-কুটা বা কচুরিপানা দিয়ে তার উপর গাছ তুলে দিয়ে থাকেন। এতেও ভাল ফলন পাওয়া যায় এবং উৎপাদন খরচও কম হয়। তবে পটলের মাটির সংস্পর্শে থাকা অংশ ফ্যাকাশে হলুদ হয়ে যায় এবং বাজারমূল্য কিছুটা কমে যায়। যেসব এলাকায় বৃষ্টিপাত কম হয় সেসব এলাকায় এ পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়। তবে রপ্তানীযোগ্য উচ্চ গুণাগুণসম্পন্ন পটল পেতে হলে অবশ্যই বাউনি বা মাচা দিতে হবে।

আগাছা দমন ঃ পটলের জমিতে সাধারণত: হেলেঞ্চা, দূর্বা, দন্ডকলস এসব আগাছার উপদ্রব দেখা যায়। এসব আগাছা জমি থেকে খাদ্য গ্রহণ করে পটল গাছকে দুর্বল করে দেয় ফলে পটলের ফলন কমে যায়। তাই পটলের জমি সবসময় আগাছামুক্ত রাখা উচিত। অংগ ছাটাই ঃ পটল গাছ মাচার উঠার আগ পর্যন্ত পার্শ¦শাখা ছাটাই করে দিতে হয়। পরবর্তীতে প্রতিবার ফসল সংগ্রহের পর মরা এবং রোগ ও পোকা আক্রান্ত পাতা ও শাখা ছাটাই করে দিতে হয়। এতে ফলধারী নতুন শাখার সংখ্যা  বেড়ে যায় এবং ফলন বেশি হয়।

জাবরা: পটল চারা লাগানো হয় শুকনো মৌসুমে। তাই কলম বা চারা লাগানোর পর মাদায় বা গাছের গোড়ায় জাবরা দেয়া প্রয়োজন। জাবরা মাদায় আর্দ্রতা সংরক্ষণে সহায়তা করে। পটল গাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। তাই বৃষ্টি বা সেচের অতিরিক্ত পানি সময়মতো নালা দিয়ে বের করে দিতে হবে।

পরাগায়ন ঃ চারা লাগানোর ৯০ দিনের মাথায় পটলের ফুল আসতে শুরু করে। পটল একটি পরপরাগায়িত উদ্ভিদ। স্ত্রী ফুল ও পুরুষ ফুল আলাদা গাছে ফোটে। কাজেই পরাগায়ন না হলে পটলের ফলন পাওয়া যাবে না। পটলের পরাগায়ন সাধারণত বাতাস এবং কীটপতঙ্গের দ্বারা হয়ে থাকে। তবে জমিতে পুরুষ ফুলের সংখ্যা খুব কমে গেলে কৃত্রিমভাবে পরাগায়ন করা প্রয়োজন হয়। সকাল ৬টা থেকে ৭টা পটলের পরাগায়ন করার উপযুক্ত সময়। কৃত্রিম পরাগায়ন করার জন্য একটি পুরুষ ফুল তুলে নিয়ে পুংকেশর ঠিক রেখে পাপড়িগুলি ছিড়ে ফেলতে হয়। তারপর পুংকেশর দ্বারা সদ্যফোটা প্রতিটি স্ত্রী ফুলের গর্ভমুন্ডে ২-৩ বার স্পর্শ করতে হবে। এর ফলে গর্ভমুন্ডের মাথায় পরাগরেণু আটকে যাবে এবং পরাগায়ন হবে। একটি পুরুষ ফুল দিয়ে ৮-১০ টি স্ত্রী ফুল পরাগায়ন করা যায়। এছাড়াও পরুষ ফুল সংগ্রহ করে পরাগরেণু আলাদা করে পানিযুক্ত একটি প্লাস্টিকের ব্যাগে নিয়ে হালকা ঝাকি দিয়ে পরাগরেণু পানিতে মিশিয়ে পরাগরেণু মিশ্রিত পানি ড্রপার দিয়ে ১ ফোটা করে প্রতিটি স্ত্রী ফুলের গর্ভমূন্ডে লাগিয়েও পরাগায়ন করা যায়। কৃত্রিম পরাগায়নের ফলে পটলের ফলন অনেক বেড়ে যায়।

মুড়ি ফসল ঃ পটল গাছ থেকে প্রথম বছর ফসল সংগ্রহ করার পর গাছের গোড়া নষ্ট না করে রেখে দিয়ে পরবর্তী বছর পরিচর্যার মাধ্যমে গুড়িচারা থেকে যে ফসল পাওয়া যায় তাকেই মুড়ি ফসল বলে। উঁচু জমিতে পটল চাষ করলে মুড়ি ফসল করা যায়। আশ্বিন-কার্তিক মাসে পুরানো শুকনো লতা কেটে দিতে হয়। তারপর জমির আগাছা পরিষ্কার করে কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে দিতে হয়। এতে গাছ নতুনভাবে উদ্বীপিত হয়। মুড়ি ফসলেও নতুন ফসলের মতো সার প্রয়োগ ও অন্যান্য পরিচর্যা করতে হয়। পটল গাছ একবার লাগালে ৩ বছর পর্যন্ত ফলন দিয়ে থাকে। পটল গাছে ১ম বছর ফলন কম হয়, ২য় বছর ফলন বেশি হয় এবং ৩য় বছর ফলন কমতে থাকে। একবার লাগানো পটল গাছ ৩ বছরের বেশি রাখা উচিত নয়।

বালাই দমন ঃ পটলের গাছ ও ফল বিভিন্ন প্রকার পোকা ও রোগ দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। এদের মধ্যে ফলের মাছি পোকা, কাঁঠালে পোকা এবং পাউডারি মিলডিউ  রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

ফলের মাছিপোকা ঃ এ পোকা পটলের বেশ ক্ষতি করে। স্ত্রীপোকা কচি ফলের ত্বক ছিদ্র করে ভিতরে ডিম পারে। ডিম ফুটে কীড়া বেড় হয়ে ফলের ভিতরের নরম অংশ খায়। এতে পটল খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়ে এবং অনেক সময় ফল ঝরে যায়।

প্রতিকার ঃ জমি পরিষ্কার রাখতে হবে।  আক্রান্ত ফল দেখা মাত্র সংগ্রহ করে মাটিতে পুতে ফেলতে হবে। বিষফাঁদ বা ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে পোকা দমন করতে হবে। প্রতি লিটার পানিতে ১ মি.লি. হারে ডিপটেরেক্স ৮০ এমপি মিশিয়ে ১০-১৫ দিন পর পর ৩-৪ বার ¯েপ্র করলে পোকা নিয়ন্ত্রণে আসে।

কাঁঠালে পোকা ঃ পূর্ণাঙ্গ পোকা ও কীড়া পাতার সবুজ অংশ খেয়ে জালের মতো ঝাঝড়া করে ফেলে। ফলে পাতা শুকিয়ে মরে যায় এবং গাছ আস্তে আস্তে পাতাশূন্য হয়ে পড়ে। আক্রমণ তীব্র হলে গাছ মারা যেতে পারে।

প্রতিকার ঃ আক্রমণ দেখামাত্রই পাতাসহ পোকার ডিম ও কীড়া সংগ্রহ করে নষ্ট করে  ফেলতে হবে। নিম বীজের মিহিগুড়া ৩০-৪০ গ্রাম এক লিটার পানিতে ১২-১৪ ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে পানি ছেকে নিয়ে ঐ পানি আক্রান্ত গাছে ¯েপ্র করলে পোকা দমন হয়। আক্রমণের মাত্রা তীব্র হলে ফেনিট্রোথিয়ন ৫০ ইসি জাতীয় কীটনাশক ১ লিটার পানিতে ২ মি.লি পরিমাণ মিশিয়ে ¯েপ্র করে আক্রান্ত গাছের পাতা ভিজিয়ে দিতে হবে।  পাউডারি মিলডিউ ঃ এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ। প্রথমে বয়ষ্ক পাতায়  রোগের লক্ষণ দেখা যায়। আক্রান্ত পাতার উপরের দিকে এবং কান্ডে সাদা পাউডারের মতো জীবাণুর প্রলেপ পড়ে। আস্তে আস্তে উপরের দিকে কচি পাতাও আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত পাতা ক্রমে ক্রমে হলুদ হয় এবং এক পর্যায়ে সম্পূর্ণ পাতা শুকিয়ে মারা যায়।

প্রতিকার ঃ সুষম সার এবং পরিমিত সেচ দিলে এ রোগের আক্রমণ কম হয়। আক্রমণ দেখা গেলে থিওভিট জাতীয় ছত্রাকনাশক ২ গ্রাম হারে প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর ৩ বার ¯েপ্র করতে হবে।

ফসল তোলা ও ফলন ঃ পটল কচি অবস্থায় সংগ্রহ করা উচিত। ফুল ফোটার ১০-১২ দিন পর পটল সংগ্রহের উপযোগী হয়। পটল এমন পর্যায়ে সংগ্রহ করা উচিত যখন ফলটি পূর্ণ আকার প্রাপ্ত হয়েছে কিন্তু পরিপক্ক হয়নি। বেশি পাকা ফলের বীজ শক্ত হয়ে যায় এবং খাবার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। জাত ও পরিচর্যার উপর পটলের ফলনের তারতম্য হয়। আধুনিক জাতগুলো চাষ করলে এবং সঠিক পরিচর্যা করলে বিঘাপ্রতি ৪০০০ থেকে ৫০০০ কেজি ফলন পাওয়া সম্ভব।

পুষ্টিমান ও ব্যবহার ঃ উচ্চ পুষ্টিমান ও বহুবিধ ব্যবহারের জন্য পটল সবার পছন্দের একটি সবজি। খাবার উপযোগী প্রতি ১০০ গ্রাম পটলে রয়েছে ২.৪ গ্রাম প্রোটিন, ৪.১ গ্রাম শ্বেতসার, ০.৬ গ্রাম চর্বি, ৭৯০ মা.গ্রা. ক্যারোটিন, ০.৩০ মি.গ্রা. ভিটামিন বি-১, ০.০৩ মি.গ্রা. ভিটামিন বি-২, ২৯ মি.গ্রা. ভিটামিন সি, ২০ মি.গ্রা. ক্যালসিয়াম, ১.৭ মি.গ্রা. আয়রণ, এবং ৩১ কিলো ক্যালরি খাদ্যশক্তি। পটলের ব্যবহারেও রয়েছে বৈচিত্র। বিভিন্নভাবে পটল ব্যবহার হয়ে থাকে। যেমন- তেলে ভাজি পটল, পটল মিশ্র সবজি, পটল চিংড়ি, পটল মোরব্বা, আলু-পটলের দোলমা এসব। এছাড়াও বিভিন্ন তরকারীতে পটল ব্যবহার করা হয়। পটল সহজেই হজম হয়। তাই হৃদরোগীদের জন্য পটল উপকারী।

আয় ব্যয় ঃ গবেষণায় দেখা গেছে এক বিঘা জমিতে পটল চাষ করলে প্রায় ৭ হাজার টাকা খরচ হয়। আর এক বিঘা জমির পটল বিক্রি করে আয় হয় কমপক্ষে ২১ হাজার টাকা। খরচ বাদে এক বিঘা জমিতে নীট লাভ হয় ১৪ হাজার টাকা। কাজেই নীট আয় ও আয়-ব্যয়ের অনুপাত বিবেচনায় নি:সন্দেহে বলা যায় পটল একটি লাভজনক সবজি।

লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হবে স্ট্রবেরীর চাষ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ সূচনা কথা স্ট্রবেরী একটি অত্যন্ত রসালো ও সুস্বাদু ফল। স্ট্রবেরী গাছ দেখতে অনেকটা থানকুনি অথবা আলুর গাছের মত, তবে পাতা আরো বড় এবং চওড়া। এটি থানকুনি গাছের মতই রানারের মাধ্যমে চারা চারদিকে ছড়াতে থাকে। পাশ থেকে বের হওয়া পরিণত রানার কেটে আলাদা লাগিয়ে এর চাষ করা সম্ভব। তবে এর বীজ বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে। একটি স্ট্রবেরী গাছ থেকে রানারের মাধ্যমে বংশ বৃদ্ধি করলে বছরে কয়েকশত চারা উৎপাদন করা সম্ভব। স্ট্রবেরী শীত প্রধান দেশের ফল তাই বেশি তাপমাত্রার কারণে বাংলাদেশে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এ গাছ বাঁচিয়ে রাখা খুব কষ্টসাধ্য। স্ট্রবেরী ফল কাঁচা অবস্থায় সবুজ এবং পাকা অবস্থায় টকটকে লাল রঙের হয়। ফলটি দেখতে অনেকটা লিচুর মত। স্ট্রবেরী জীবন রক্ষাকারী নানা পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ। এতে আছে ভিটামিন এ, সি, ই, ফলিক এসিড, সেলেনিয়াম, ক্যালসিয়াম, পলিফেনল, এলাজিক এসিড, ফেরালিক এসিড, কুমারিক এসিড, কুয়েরসিটিন, জ্যান্থোমাইসিন ও ফাইটোস্টেরল। এদের মধ্যে এলাজিক এসিড ক্যান্সার, বার্ধক্য, যৌনরোগ প্রতিরোধের গুণাগুণ আছে বলে জানা গেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এম. মনজুর হোসেন ১৯৯৬ সালে জাপান থেকে একটি স্বল্প দিবা দৈর্ঘ্য জাতের স্ট্রবেরী বাংলাদেশে আবাদের চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি প্রথমে দেখতে পান যে, এই জাতটি রানারের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি হচ্ছে না। এমনকি ফলের আকার অনেক ছোট হচ্ছে। যা বাণিজ্যিকভাবে চাষের উপযোগী নয়। পরে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত টিস্যু কালচার ল্যাবে গত কয়েক বছর গবেষণার মাধ্যমে একটি জাত উদ্ভাবনে সক্ষম হন। যা বাংলাদেশের আবহাওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা সম্ভব। তার জাতটির নাম এস.টি -৩। এটি অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে মাঠে লাগালে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ফলন দেবে বলে তিনি জানান। তিনি আরও জানান প্রতি গাছ থেকে উক্ত চার মাসে ২৫০-৩০০ গ্রাম পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব। প্রতিটি স্ট্রবেরী গড় ওজন ১০ থেকে ১৫ গ্রাম। অধ্যাপক ড. এম. মনজুর হোসেন গত ৩ বছর ধরে রাজশাহী মহানগীর পদ্মা আবাসিক এলাকার ভদ্রায় আকাফুজি নার্সারীতে এটি সফলভাবে চাষ করে আসছেন। এ বছর তিনি বাংলাদেশ স্ট্রবেরী এ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় চারা সরবরাহ করছেন। বাংলাদেশের সব এলাকার সব মাটিতেই স্ট্রবেরী চাষ সম্ভব বলে প্রমাণিত হয়েছে। তবে বেলে দো-আঁশ মাটি সর্বোত্তম। উজ্জ্বল সূর্যালোকিত খোলামেলা ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাযুক্ত জমি নির্বাচন করতে হবে। মাটির অম্লতা বা ক্ষারতা হতে হবে ৬.০ থেকে ৬.৫-এর মধ্যে। এজন্য স্ট্রবেরী চাষের আগে মাটির অম্লতা বা ক্ষারতা এবং পুষ্টিমাত্রা পরীক্ষা করে সে অনুযায়ী চাষ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়। উঁচু মান ও ফলন পাওয়ার জন্য দিনের তাপমাত্রা ২০-২৬ সে. এবং রাতের তাপমাত্রা ১২-১৬ সে. হলে ভাল হয়। দিনে কমপক্ষে ৮ ঘন্টা সূর্যালোকের উপস্থিতি স্ট্রবেরীর বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে ভাল। দিনের দৈর্ঘ্য ১৪ ঘন্টার কম হলে স্ট্রবেরীর ফুল আসতে শুরু করে। তাপমাত্রা ৩৮ সে. এর বেশি হলে স্ট্রবেরীর গাছ মারা যায়।

এক প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে যে ১ বিঘা জমিতে স্ট্রবেরী চাষ করলে খরচ হয় প্রায় দেড় লাখ টাকা এবং ছয় মাসে আয় হয়  প্রায় ৪ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে ১ বিঘা জমিতে প্রয়োজনীয় ৬ হাজার চারার মূল্য ধরা হয়েছে ১লাখ ২০হাজার টাকা এবং উৎপাদিত দেড় হাজার কেজি স্ট্রবেরীর প্রতি কেজির মূল্য ধরা হয়েছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। ঢাকার বিভিন্ন সুপার মার্কেটগুলোতে বিদেশ থেকে আমদানি হয়ে আসা স্ট্রবেরী পাওয়া যায় বর্তমানে যার প্রতি কেজির মূল্য ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা।

স্ট্রবেরি চাষের এলাকা ঃ শীতের দেশে স্ট্রবেরি ভালো হয়। গরমের দেশে গাছ হয় কিন্তু সহজে ফল হতে চায় না। কিন্ত গবেষকদের প্রচেষ্টায় এদেশে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু জাতের চাষ হচ্ছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের কিছু জেলায় স্ট্রবেরি ফলানো সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে যেসব জেলায় শীত  বেশি পড়ে ও বেশিদিন থাকে সেসব এলাকায় স্ট্রবেরি চাষ করা যেতে পারে। পঞ্চগড়, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও এমনকি পাবনা, নাটোরেও চাষ করা যায়।

উপযুক্ত মাটি ঃ বেলে দোঁআশ ও মাটিতে প্রচুর জৈব সার প্রয়োগ করে স্ট্রবেরি ফলানো যায়।  যেসব জমিতে পানি জমে সেখানে স্ট্রবেরি ফলানো যাবে না।

চারা তৈরি ঃ স্ট্রবেরির চারা এখনও তেমন সহজে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে কাঙ্খিত চারা অবশ্যই বিশ্বস্ত কোনো নার্সারি থেকে সংগ্রহ করা দরকার। স্ট্রবেরি গাছগুলো গুল্ম ও লতা জাতীয় গাছ বলে গাছের গোড়া থেকে বেশ কিছু লম্বা লম্বা লতা মাটির উপর দিয়ে লতিয়ে যায়। মাটির সংস্পর্শে লতার গিট থেকে শিকড় গজায়। শিকড়যুক্ত গিট কেটে নিয়ে মাটিতে পুতে দিলে নতুন চারা তৈরি হবে। অর্ধেক মাটি অর্ধেক গোবর সার মিশিয়ে পলিব্যাগে ভরে একটি করে শিকড়যুক্ত গিটসহ লতা পুঁতে দিতে হয়। এক্ষেত্রে একটি গাছ  থেকে ১৮-২০ টি চারা তৈরি করা সম্ভব।

জমি তৈরি ঃ জমি ভালভাবে চাষ করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে অন্তত ৩০  সেন্টিমিটার গভীর করে জমি চাষ দিতে হবে। যেহেতু স্ট্রবেরি গাছের শিকড় মাটির উপর দিকে থাকে সেজন্য মাটি ঝুরঝুরা করে নির্ধারিত মাত্রায় সার মাটিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।

চারা রোপণ ঃ স্ট্রবেরির চারা মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য ডিসেম্বর পর্যন্ত  রোপণ করা যায়। তবে নভেম্বর মাস স্ট্রবেরি চারা রোপণের জন্য সবচে ভাল। জমি  তৈরির পর লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব হবে ৫০ সেন্টিমিটার ও প্রতি সারিতে ৩০ সেন্টিমিটার দূরে দূরে স্ট্রবেরির চারা লাগাতে হয়। বৃষ্টি হলে ক্ষেত থেকে অতিরিক্ত পানি সরিয়ে দিতে হবে না হলে গাছ পঁচে যাবে।

সার প্রয়োগ ও সেচ ঃ স্ট্রবেরির জন্য দরকার প্রচুর জৈব সার। এজন্য প্রতি একরে ৫০-৬০ কেজি ইউরিয়া সার, ৭০ কেজি টিএসপি সার এবং ৮০  কেজি এমওপি সার প্রয়োগ করতে হবে। এসব সারকে সমান দুভাগে ভাগ করে একভাগ দিতে হয় ফুল আসার একমাস আগে এবং অন্য ভাগ দিতে হবে ফুল ফোটার সময়। ফল ধরা শুরু হলে ২-৩ দিন পর পরই সেচ দিতে হবে।

অন্যান্য যতœ ঃ স্ট্রবেরি গাছে ফুল ধরাতে চাইলে বিশেষ যতœ নিতে হবে। গাছ লাগানোর পর তার গোড়া থেকে প্রচুর রানার বা কচুর লতির মতো লতা বের হতে থাকে। এগুলো জমি ঢেকে ফেলে। এতে ফলন ভাল হয় না। এসব লতা যাতে কম বের হয় সেজন্য গাছের গোড়ায় খড় বা পলিথিন বিছিয়ে দিতে হয়। পলিথিন সিট ৩০ সেন্টিমিটার পর গোলাকার ছিদ্র করে স্ট্রবেরি গাছের  ঝোপকে মুঠো করে ঢুকিয়ে দিতে হয়। বেশি ফলন ও তাড়াতাড়ি ফল পেতে হরমোন গাছ পাতায় ¯েপ্র করা যেতে পারে।

ফল সংগ্রহ ও বিক্রি ঃ কাঁচা ফল যখন হলদে বা লালচে রঙের হতে শুরু করে তখন বুঝা যাবে ফল পাকা শুরু হয়েছে। ফল পুরো পাকলে লাল হয়ে যায়। তবে বিক্রির জন্য ফল পুরো লাল হওয়ার দরকার নেই। সেক্ষেত্রে ফলগুলো শক্ত থাকা অবস্থায় তুলতে হবে। আর ফল তুলতে হবে বোটা সমেত। পরে কাগজের প্যাকেটে করে বাজারজাত করতে হবে। ফল তোলার পর ১০-১২ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে। গড়ে প্রতি গাছে ১৫০-২০০ গ্রাম ফল ধরে। ফলটি এদেশে নতুন তাই ঝুঁকিও বেশি। তবুও মেধা ও বুদ্ধি প্রয়োগ করে স্ট্রবেরি চাষ একদিন লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হবে সে কথা বলা যায়।

স্ট্রবেরি চাষের এলাকা ঃ শীতের দেশে স্ট্রবেরি ভালো হয়। গরমের দেশে গাছ হয় কিন্তু সহজে ফল হতে চায় না। কিন্তু গবেষকদের প্রচেষ্টায় এদেশে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু জাতের চাষ হচ্ছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের কিছু জেলায় স্ট্রবেরি ফলানো সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে যেসব জেলায় শীত বেশি পড়ে ও  বেশিদিন থাকে সেসব এলাকায় স্ট্রবেরি চাষ করা যেতে পারে। পঞ্চগড়, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও এমনকি পাবনা, নাটোরেও চাষ করা যায়।

উপযুক্ত মাটি ঃ বেলে দোঁআশ ও মাটিতে প্রচুর জৈব সার প্রয়োগ করে স্ট্রবেরি ফলানো যায়। যেসব জমিতে পানি জমে সেখানে স্ট্রবেরি ফলানো যাবে না।

চারা তৈরি ঃ স্ট্রবেরির চারা এখনও তেমন সহজে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে কাঙ্খিত চারা অবশ্যই বিশ্বস্ত কোনো নার্সারি থেকে সংগ্রহ করা দরকার। স্ট্রবেরি গাছগুলো গুল্ম ও লতা জাতীয় গাছ বলে গাছের গোড়া থেকে বেশ কিছু লম্বা লম্বা লতা মাটির উপর দিয়ে লতিয়ে যায়। মাটির সংস্পর্শে লতার গিট থেকে শিকড় গজায়। শিকড়যুক্ত গিট কেটে নিয়ে মাটিতে পুতে দিলে নতুন চারা তৈরি হবে। অর্ধেক মাটি অর্ধেক গোবর সার মিশিয়ে পলিব্যাগে ভরে একটি করে শিকড়যুক্ত গিটসহ লতা পুঁতে দিতে হয়। এক্ষেত্রে একটি গাছ থেকে ১৮-২০ টি চারা তৈরি করা সম্ভব।

জমি তৈরি ঃ জমি ভালভাবে চাষ করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে অন্তত ৩০  সেন্টিমিটার গভীর করে জমি চাষ দিতে হবে। যেহেতু স্ট্রবেরি গাছের শিকড় মাটির উপর দিকে থাকে সেজন্য মাটি ঝুরঝুরা করে নির্ধারিত মাত্রায় সার মাটিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।

চারা রোপণ ঃ স্ট্রবেরির চারা মধ্যঅক্টোবর থেকে মধ্যডিসেম্বর পর্যন্ত রোপণ করা যায়। তবে নভেম্বর মাস স্ট্রবেরি চারা রোপণের জন্য সবচে ভাল। জমি  তৈরির পর লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব হবে ৫০ সেন্টিমিটার ও প্রতি সারিতে ৩০ সেন্টিমিটার দূরে দূরে স্ট্রবেরির চারা লাগাতে হয়। বৃষ্টি হলে ক্ষেত থেকে অতিরিক্ত পানি সরিয়ে দিতে হবে না হলে গাছ পঁচে যাবে।

ফল সংগ্রহ ও বিক্রি ঃ কাঁচা ফল যখন হলদে বা লালচে রঙের হতে শুরু করে তখন বুঝা যাবে ফল পাকা শুরু হয়েছে। ফল পুরো পাকলে লাল হয়ে যায়। তবে বিক্রির জন্য ফল পুরো লাল হওয়ার দরকার নেই। সেক্ষেত্রে ফলগুলো শক্ত থাকা অবস্থায় তুলতে হবে। আর ফল তুলতে হবে বোটা সমেত। পরে কাগজের প্যাকেটে করে বাজারজাত করতে হবে। ফল তোলার পর ১০-১২ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে। গড়ে প্রতি গাছে ১৫০-২০০ গ্রাম ফল ধরে। ফলটি এদেশে নতুন তাই ঝুঁকিও বেশি। তবুও মেধা ও বুদ্ধি প্রয়োগ করে স্ট্রবেরি চাষ একদিন লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হবে সে কথা বলা যায়।

স্বাভাবিক ও জৈব পদ্ধতিতেই গরু মোটাতাজাকরণ সম্ভব

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কোনোভাবেই ইনজেকশন বা কোনো গ্রোথ হরমোন ব্যবহার করে গবাদিপশু মোটাতাজাকরণের উদ্যোগ নেওয়া যাবে না। এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার ছাড়াও স্বাভাবিক ও জৈব পদ্ধতিতেই গরু মোটাতাজাকরণ সম্ভব। এজন্য দরকার শুধু কিছু নিয়ম-কানুন মেনে চলা। কোনো গ্রোথ হরমোন ব্যবহার ছাড়াই যেভাবে গবাদিপশুর বেশি মাংস নিশ্চিত করা যায়, সে সম্পর্কে কিছু পদ্ধতি স্বল্প পরিসরে আলোকপাত করা হল: অধিক মাংস উৎপাদনের জন্য ২ থেকে ৩ বছর বয়সের শীর্ণকায় গরুকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় খাদ্য সরবরাহ করে হৃষ্টপুষ্ট গরুতে রূপান্তরিত করাকে গরু  মোটাতাজাকরণ বলে। এটির গুরুত্ব হচ্ছে- দারিদ্রতা হ্রাসকরণ, অল্প সময়ে কম পুঁজিতে অধিক মুনাফা অর্জন, অল্প সময়ের মধ্যে লাভসহ মূলধন ফেরত পাওয়া, প্রাণীজ আমিষের ঘাটতি পূরণ, স্বল্পমেয়াদি প্রযুক্তি হওয়ার কারণে পশু মৃত্যুর হার কম, কৃষিকার্য হতে উৎপাদিত উপজাত পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে সহজেই মাংস উৎপাদন করা, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে আয় বৃদ্ধি করা প্রভৃতি।

মোটাতাজাকরণের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান পদ্ধতি ঃ মোটাতাজাকরণের সঠিক সময়: বয়সের উপর ভিত্তি করে সাধারণত ৩ থেকে ৪ মাসের মধ্যে গরু মোটাতাজাকরণ করা যায়। অনেক সময় ৫ থেকে ৬ মাসও সময় লাগতে পারে। গরু মোটাতাজাকরণের জন্য সুবিধাজনক সময় হচ্ছে বর্ষা এবং শরৎকাল যখন প্রচুর পরিমাণ কাঁচাঘাস পাওয়া যায়। চাহিদার উপর ভিত্তি করে কোরবানী ঈদের ৫ থেকে ৬ মাস পূর্ব থেকে গরুকে উন্নত খাদ্য ও ব্যবস্থাপনা দিয়ে মোটাতাজাকরণ লাভজনক।

স্থান নির্বাচন ঃ গরু রাখার স্থান নির্বাচনে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে: ১. শুষ্ক ও উঁচু জায়গা হতে হবে, যাতে খামার প্রাঙ্গণে পানি না জমে থাকে। ২.  খোলামেলা ও প্রচুর আলো বাতাসের সুযোগ থাকতে হবে। ৩.খামারে কাঁচামাল সরবরাহ ও উৎপাদিত দ্রব্যাদি বাজারজাতকরণের জন্য যোগাযোগ সুবিধা থাকতে হবে। ৪. পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সুষ্ঠু ব্যবস্থা থাকতে হবে; ৫. সুষ্ঠু পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকতে হবে। গরু নির্বাচন: উন্নত দেশের মাংসের গরুর বিশেষ জাত রয়েছে। বিদেশি গরুর জন্য উন্নত খাদ্য ও ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। তাই দেশীয় গরু মোটাতাজাকরণ অলাভজনক। ২ থেকে ২.৫ বছরের গরুর শারীরিক বৃদ্ধি ও গঠন মোটাতাজাকরণের জন্য বেশি ভাল। এঁড়ে বাছুরের দৈহিক বৃদ্ধির হার বকনা বাছুরের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। তবে বাছুরের বুক চওড়া ও ভরাট, পেট চ্যাপ্টা ও বুকের সাথে সমান্তরাল, মাথা ছোট ও কপাল প্রশস্ত,  চোখ উজ্জ্বল ও ভেজা ভেজা, পা খাটো প্রকৃতির ও হাড়ের জোড়াগুলো স্ফীত, পাজর প্রশস্ত ও বিস্তৃত, শিরদাড়া সোজা হতে হবে। গরুর খাদ্যের ধরণ: খাদ্যে মোট খরচের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ভাগ ব্যয় হয়। তাই স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত খাদ্য দ্বারা খরচ কমানো সম্ভব।

এজন্য গরু মোটাতাজাকরণের একটি সুষম খাদ্য তালিকা নিচে দেওয়া হল: ক) শুকনো খড়: দুই বছরের গরুর জন্য দৈহিক ওজনের শতকরা ৩ ভাগ এবং এর অধিক বয়সের গরুর জন্য শতকরা ২ ভাগ শুকনো খড় ২ থেকে ৩ ইঞ্চি করে কেটে একরাত লালীগুড়/চিটাগুড় মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে প্রতিদিন সরবরাহ করতে হবে। পানি: চিটাগুড় = ২০ : ১। খ) কাঁচাঘাস: প্রতিদিন ৬ থেকে ৮ কেজি তাজা ঘাস বা শস্যজাতীয় তাজা উদ্ভিদের উপজাত দ্রব্য যেমন- নেপিয়ার, পারা, জার্মান, দেশজ মাটি কালাই, খেসারি, দুর্বা ইত্যাদি সরবরাহ করতে হবে। গ) দানাদার খাদ্য: প্রতিদিন কমপক্ষে ১ থেকে ২ কেজি দানাদার খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। নিচে ১০০ কেজি দানাদার খাদ্যে তালিকা দেওয়া হল: ১. গম ভাঙা/গমের ভূসি-৪০  কেজি; ২. চালের কুঁড়া-২৩.৫ কেজি; ৩. খেসারি বা যেকোনো ডালের ভূসি-১৫ কেজি:

৪. তিলের খৈল/সরিষার খৈল-২০ কেজি; লবণ-১.৫ কেজি। তাছাড়াও বিভিন্ন রকমের ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি হচ্ছে ৩৯ ভাগ চিটাগুড়, ২০ ভাগ গমের ভূসি, ২০ ভাগ ধানের কুঁড়াা, ১০ ভাগ ইউরিয়া৬ ভাগ চুন ও ৫ ভাগ লবণের মিশ্রণ।

রোগপ্রতিরোধ ও চিকিৎসা: ক. প্রতিদিন নিয়মিতভাবে পশুর গা ধোয়াতে হবে; খ.  গো-শালা ও পার্শ্ববর্তী স্থান সর্বদা পরিস্কার রাখতে হবে: গ. নিয়মিতভাবে গরুকে কৃমিনাশক ট্যাবলেট খাওয়াতে হবে; ঘ. বাসস্থান সর্বদা পরিস্কার রাখতে হবে। ঙ. স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পরিমিত পরিমাণে পানি ও সুষম খাদ্য প্রদান করতে হবে। চ. রোগাক্রান্ত পশুকে অবশ্যই পৃথক করে রাখতে হবে। ছ. খাবার পাত্র পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। জ. খামারের সার্বিক জৈব নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। ঝ. পশু জটিল রোগে আক্রান্ত হলে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বাজারজাতকরণ ঃ মোটাতাজাকরণ গরু লাভজনকভাবে সঠিক সময়ে ভাল মূল্যে বাজারজাতকরণের ব্যবস্থাগ্রহণ হচ্ছে আরেকটি উল্লেখ্যযোগ্য বিষয়। বাংলাদেশে মাংসের জন্য বিক্রয়যোগ্য গবাদিপশুর বাজারমূল্যেও মৌসুমভিত্তিক হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। কাজেই একজন প্রতিপালককে গরু মোটাতাজাকরণের জন্য অবশ্যই গরুর ক্রয়মূল্য যখন কম থাকে তখন গরু ক্রয় করে বিক্রয় মূল্যের উর্ধ্বগতির সময়ে বিক্রয়ের ব্যবস্থা নিতে হবে। সাধারণত  কোরবানীর ঈদের সময়ে গরুর মূল্য অত্যাধিক থাকে এবং এর পরের মাসেই বাজার দর হ্রাস পায়। তাই এখন গরু মোটাতাজাকরণের উপযুক্ত সময় এবং কোরবানীর সময় তা বিক্রি করে  দেওয়া ভাল।

লেখক ঃ আব্দুস সালাম সাগর, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

হঠাৎ বেড়েছে গো-খাদ্যের দাম

লোকসান কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াবার আশা কুষ্টিয়ার খামার মালিকদের

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে কুষ্টিয়ার খামার মালিকরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। গরু পরিচর্যায় সময় পার করছেন তারা। তবে গত বছরে বেশির ভাগ খামার মালিক লোকসানে পড়ায় এবার গরুর সংখ্যা কিছুটা কমেছে। গরু ও ছাগল মিলে সংখ্যা বেড়েছে। গত বছরের লোকসান কাটিয়ে এবার ঘুঁরে দাঁড়ানোর আশা করছেন বেশির ভাগ খামার মালিকরা। প্রায় খামারেই দেশি ছোট ও মাঝারি সাইজের গরু লালন পালন করা হয়েছে। এসব গরুর দাম ৭০ থেকে ১ লাখের মধ্যে থাকবে বলে জানান খামার মালিকরা। ৩৯ লক্ষ টাকার গরু আছে। এছাড়া প্রতিটি গরুর পিছনে দিনে ১৬৫ টাকার খাদ্য লাগে। সরেজমিন কুষ্টিয়া সদর উপজেলার দহকুলা গ্রামে মোল্লা কৃষি ফার্মে গিয়ে দেখা গেছে খামারে ১০৬টি গরু আছে। ১০জন  শ্রমিক গরু পরিচর্যা করছেন। এসব দেশি জাতের গরু স্থানীয় আলামপুর বাজার থেকে ২ থেকে ৩ মাস আগে কেনা। খামার মালিক সেলিম হোসেন বলেন,‘ দেড় বছর আগে খামারটি করেছে দুই বন্ধু মিলে। এক বন্ধু সৌদি থাকে। তিনিও সৌদি থেকে দেশে এসে আর যাননি। গরুর ফার্ম করেছেন। তিনি বলেন, গত বছর ১০০টি দেশি গরু ঢাকার বাজারে নিয়ে গিয়েছিলাম। প্রথম দিকে প্রতিটি গরুতে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা করে লাভ হয়েছিল। পরের দিকে লোকসান হয়। এতে অনেক টাকা ধরা খেয়ে যায়। এবছরও ১০৬টি গরু আছে। কয়েকটি বিক্রি করেছি। স্থানীয় বাজারেই বিক্রি করার চেষ্টা করছি। এখানে সব বিক্রি না হলে ঢাকায় নিয়ে যাব মনে করছি। ছোট ও মাঝারি সাইজের প্রতিটি গরু ৭০ থেকে ১লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজারের মধ্যে বিক্রি হরে বলে আশা করছি। সেলিম উদ্দীন বলেন, গো-খাদ্যের দাম কিছুটা বেড়েছে। এতে খরচ বাড়ছে। তবে গত বছরের লোকসান কাটিয়ে এবার লাভ হবে বলে আশা করছি। একই গ্রামের শফির ৪টি গরু আছে। গত বছর কোরবানি ঈদের মাস খানেক পর ৪টি গরু কেনা হয়। নিন্মবিত্ত শফি পরিবার গরু লালন পালন করে সংসারের যাবতীয় খরচ মেটান। বাড়িতে পাকা ঘর তুলেছেন। এ বছর ৪টি গরু ঢাকার বাজারে তুলবেন। ৪টি গরু বিক্রি করে ৬ লক্ষ টাকার বেশি হবে বলে তিনি মনে করছেন। শফির পুত্রবধূ আলিয়া বলেন, প্রতি বছরই তারা গরু পালেন। গত বছরও অনেক টাকা লাভ হয়েছিল। এ বছর লাভ হবে বলে আশা করছেন। জেলা প্রাণী সম্পদ অফিস সুত্র জানিয়েছে, গত বছর অনেক খামার মালিক গরু বিক্রি করে লোকসান দেয়। এ কারনে এবার জেলায় গরুর সংখ্যা কমেছে। গত বছর জেলায় গরুর সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার। এবার কমে ৬৫ হাজারে দাঁড়িয়েছে। তবে গরু ও ছাগল মিলে ১লাখ ৩৩ হাজারের বেশি এবার বাজারে উঠবে। গত বছর সব মিলিয়ে ১ লাখ ৪৫ হাজার ছিল। বাজারঘুরে দেখা গেছে, গোখাদ্যের দাম কিছুটা বেড়েছে। ঈদ সামনে ব্যবসায়ীরা খাদ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। ১০৫০ টাকার ভূষি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ১৫০ টাকায়। গমের ছাল বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকায়। আগের তুলনা ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেড়েছে। জেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সিদ্দিকুর রহমান বলেন,‘ গতবারের তুলনায় গরু কিছুটা কমেছে। খামারিদের গরু পালন ও বর্ষায় যাতে রোগ বালায় না হয় সে জন্য নানা পরামর্শ দিচ্ছে। আর গরু মোটাতাজা করতে গিয়ে যাতে অবৈধ পন্থা অবলম্বন না করে সেদিকে লক্ষ্য রাখা হচ্ছে। আমাদের মাঠ কর্মীরা মনিটরিং বাড়িয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. আসলাম হোসেন বলেন,‘ কুষ্টিয়ার গরুর আলাদা চাহিদা রয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাজারে। প্রচুর গরু খামারিদের খামারে আছে। তাই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খামারিদের সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে।  কেউ যদি অসাধু পন্থায় গরু মোটাতাজা করার চেষ্টা করেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায় তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

 

 

 

 

সংকটের আশঙ্কা কম

দেশীয় পশুতেই মিটবে কোরবানির চাহিদা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কোরবানিতে যত পশুর চাহিদা হওয়ার কথা, এই মুহূর্তে তার  চেয়ে বেশি পশু রয়েছে বলে হিসাব কষেছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। আবার অবৈধ হলেও নানা কৌশলে ভারত থেকে পশু আমদানিও বন্ধ নেই। ফলে কোরবানিতে পশুর সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই বলেই মনে করছেন কর্মকর্তারা। ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে গরু আসা বন্ধে তারা তৎপর হয়। এতে সাময়িক সংকটে পড়লেও আখেরে লাভ হয়েছে বাংলাদেশের। গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক খামার। আর পশু পালন বাড়ায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গেছে দেশ। গত কয়েক বছর ধরেই নিজেদের পশু দিয়েই কোরবানির শতভাগ চাহিদা পূরণ হচ্ছে। দেশের খামারি ও ব্যক্তি পর্যায় থেকে এসব পশুর জোগান আসছে। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, মিয়ানমার, নেপাল থেকেও চোরাচালানের মাধ্যমে প্রতি বছরই গবাদি পশু এসে থাকে। এবার সে রকম হলে জোগান আরও বেশি হবে। ফলে এবার দাম কম বা সহনীয় পর্যায়ে থাকবে ধারণা করা হচ্ছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (খামার) এবিএম খালেদুজ্জামান বলেন, ‘গত বছর এক কোটি ১৫ লাখ পশু জবাই হয়েছে। আমাদের ছিল এক কোটি ১৫ লাখ কোরবানিযোগ্য পশু। এবার আমরা গতবারের তুলনায় পাঁচ শতাংশ চাহিদা বেশি ধরেছি। তাতে এক কোটি ১১ লাখ থেকে এক কোটি সাড়ে এগারো লাখ হবে। কিন্তু আমাদের আছে তার চেয়ে  বেশি।’ বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে এক কোটি ১৭ লাখ ৮৮ হাজার ৫৬৩টি গবাদি পশু। গত বছর কোরবানি দেয়া হয়েছিল এক  কোটি পাঁচ লাখ ৬৯ হাজার ৭০টি পশু। তবে প্রতি বছরই কোরবানির সংখ্যা বাড়ে। গতবারের চেয়ে ১০ লাখ বেশি কোরবানি হলেও এবার পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাবে বলেই মনে করছেন কর্মকর্তারা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে দেশে বর্তমানে খামারির সংখ্যা পাঁচ লাখ ৭৭ হাজার ৪১৬টি। আর বর্তমানে দেশে যত পশু আছে, তার  কোনগুলো কি অবস্থায় আছে, তারও একটি হিসাব আছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এই মুহূর্তে স্বাস্থ্যবান গরু আছে ২৭ লাখ ৩৩ হাজার ৬৫৬টি। মহিষ আছে ৮৮ হাজার ৪৪৮টি। আর কিছুটা বয়স্ক এবং অনুৎপাদনশীল গরু ও মহিষ আছে ১৬ লাখ ৯৬ হাজার ৮৫৬টি। এগুলো প্রধানত জবাই করে খাওয়ার কাজেই ব্যবহার করা হয়। স্বাস্থ্যবান ছাগল আছে ১৭ লাখ ৫৩ হাজার ৬৭২, ভেড়া দুই লাখ ৫৬ হাজার ৩৮টি। বিদেশ থেকে আনা দুম্বা বা এই ধরনের প্রাণী আছে আরও ছয় হাজার ৫৬৩। এগুলোও প্রধানত মানুষের খাবার হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। কোবরানির পশুর দিক থেকে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রাজশাহী বিভাগ। সেখানে আছে ১০ লাখের বেশি পশু। আর চার জেলা নিয়ে গঠিত বিভাগ সিলেট কোরবানির পশুর সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে। সব মিলিয়ে  সেখানে ছয় হাজারের কিছু বেশি পশু আছে। চাহিদার চেয়ে পশুর মজুদ বেশি হওয়ায় ভারত থেকে গরু আসা বন্ধে তৎপর হওয়ারও নির্দেশ নিয়েছে সরকার। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (খামার) এ বি এম খালেদুজ্জামান বলেন, ‘সরকার ঈদুল আজহা পর্যন্ত ভারত থেকে সব ধরনের গরু আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। এ ব্যাপারে বিজিবিকে পদক্ষেপ নিতে বলেছে সরকার।’ ‘বাংলাদেশে খামারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আমরা আত্মবিশ্বাস পাচ্ছি যে, গবাদি পশুর চাহিদায় আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। ফলে ভারত থেকে গরু আসা কমে আসছে। আমরা আশা করছি, অচিরেই ভারত থেকে গরু আসার সংখ্যা শূন্যের কোঠায় আসবে।’ ২০১৩ সালে ভারত থেকে অবৈধ পথে ২০ থেকে ২৫ লাখ গরু আসত। এখন এই সংখ্যাটি কমে ৯২ হাজারে নেমেছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক জানান, গত ৩ বছর ভারত  থেকে গরু আমদানি কম হচ্ছে। এ ৩ বছর দেশীয় উৎস থেকেই কোরবানির পশু ও  দৈনন্দিন মাংসের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। এ ছাড়াও বাজারে দেশি গরুর চাহিদাও অনেক বেড়েছে। এবারের কোরবানির ঈদ ঘিরে দেশীয় গরু-ছাগল উৎপাদনে  ছোট-বড় প্রকল্পের মাধ্যমে অনেক খামারি কাজ করেছেন। এ ছাড়া ব্যক্তি উদ্যোগে আরও অনেক ছোট-বড় খামার গড়ে উঠেছে। এগুলো থেকে কোরবানির পশুর  জোগান আসবে। আশা করছি, এবারের কোরবানির ঈদ ঘিরে দেশে গবাদি পশুর  কোনো ধরনের সংকট হবে না। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্র আরও জানায়,  দেশে এখন ৫ লাখ ৭৭ হাজার ৪১৬টি বড় খামার রয়েছে। এর বাইরে ছোট ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খামারও রয়েছে। এ ছাড়া ব্যক্তি পর্যায়েও গবাদি পশু পালনের সংখ্যাও বাড়ছে। বিশেষ করে চর ও উপকূলীয় এলাকায় গরু, ছাগল ও মহিষ পালনের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। তাদের অনেকে কোরবানির ঈদ সামনে রেখে গবাদিপশু লালন-পালন করেন। সব মিলে দেশে গবাদি পশুর সংখ্যা বেড়েছে। এর একটি বড় অংশই কোরবানির ঈদে বাজারে আসে। রাজধানীর গাবতলী পশুর হাটের ব্যবসায়ী মোবারক আলী বলেন, দেশের খামারগুলোতে বর্তমানে পর্যাপ্ত গরু, ছাগল ও মহিষ রয়েছে। চাহিদার তুলনায় সেটা যথেষ্ট। এ জন্য মনে হচ্ছে এ বছর  কোরবানির পশুর দাম তুলনামূলকভাবে কম থাকবে। তিনি আরও বলেন, ‘প্রতি বছর ঈদ ঘিরে ভারত থেকে নানাভাবে গরু আসে। এতে করে দাম কমে যায়। এমনিতেই এবার ধারণা করা হচ্ছে পশুর দাম কম হবে, এর মধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে পশু এলে দেশীয় ব্যবসায়ীদের লোকসানের মুখে পড়তে হবে। এবার যাতে তেমনটি না হয়  সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।’ বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম জানান, এবারের কোরবানিতে পশুর চাহিদা যতই হোক না কেন, তাতে সংকট তৈরি করবে না। কেননা, দেশের খামারগুলোতে পর্যাপ্ত পশু রয়েছে। তিনি বলেন, সরকারের বিশেষ উদ্যোগে গবাদিপশুর উৎপাদন বেড়েছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বড় বড় খামার বেড়ে উঠেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ কোরবানির পশু নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই, ১০ লাখ পশু অতিরিক্ত আছে।’ ২০১৪ সালে ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের (বর্তমানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী) ‘গোরক্ষা নীতি’র ধারাবাহিকতায় দেশটি থেকে গরু আমদানিতে ভাটা পড়ে। এর পর গরু-ছাগল পালনে স্বয়সম্পূর্ণতার ওপর জোর দেয় সরকার। স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন বাড়ায় বর্তমানে আমদানি নির্ভরতা কাটিয়ে ওঠে বাংলাদেশ।

লেখক ঃ কৃষিবিদ রাকিব খান

 

ভার্মি কম্পোস্ট সার ব্যবহারে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে অনেক গুণ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ভার্মি কম্পোস্টের অন্যতম প্রধান উপাদান হলো গরুর গোবর ও কেঁচো। প্রথমে কাঁচা গোবর একটি চারকোণা বিশিষ্ট শেড তৈরি করে সেখানে রাখতে হবে। এরপর হলুদ, মরিচের গুঁড়া এবং থিয়োডিন নামক একটি ওষুধ মিশ্রিত করে শেডের চারপাশে ছড়িয়ে দিতে হবে যাতে কোনো কীটপতঙ্গ সেখানে না আসে। ওই শেডে ১৫ দিন গোবর রেখে টকটিসিটি গ্যাস দূর করে নিয়ে একই ধরনের অন্য একটি শেডে গোবরগুলো স্থানান্তর করে তার ভেতরে কেঁচো ছেড়ে দিতে হবে। উল্লেখ্য, এক ধরনের লালচে কেঁচো ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির জন্য উপযোগী। এরপর আড়াই থেকে তিন মাসের মধ্যে ওই শেডে যে জৈব সার তৈরি হবে তা জমিতে ব্যবহারের উপযোগী হবে। ভার্মি কম্পোস্ট সার কৃষক নাসির উদ্দিন ধান, পাট, কচু, কলা, পেঁপে, পেঁয়াজ, আলু ও পানবরজে ব্যবহার করে দারুণ সাফল্য পেয়েছেন। এই জৈব সার ব্যবহারে জমির হারানো জীবন ফিরে এসেছে, ফসলের উৎপাদন অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তার এই সাফল্য দেখে অন্য চাষিরাও এ সার তৈরিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে এবং কোনো প্রকার রাসায়নিক সারের ব্যবহার ছাড়াই ভালো ফসল উৎপাদন করায় এলাকায় ব্যাপক সাড়া পড়ে গেছে। অন্যদিকে রাসায়নিক সারের অর্ধেকেরও কম খরচ হয়েছে এই ভার্মি কম্পোস্ট তৈরিতে। রাসায়নিক সারের অগ্নিমূল্য ও এর পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার কারণে এই কম্পোস্ট হতে পারে কৃষকের জন্য একটি আশীর্বাদ, একটি নিয়ামক যা সবুজ বিপ্লবের জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। এ ব্যাপারে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বকুল হোসেন জানান, ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার একটি সম্পূর্ণ জৈব সার। এই সার পরিবেশ সহায়ক ও মাটির স্বাস্থ্য ভালো করে ও মাটিকে উর্বরা করে তোলে। এই সার ফসলের বর্ণ, গন্ধ, স্বাদ ও অন্যান্য গুণগতমান উন্নয়নে সহায়তা করে ও রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। কেঁচো সার ব্যবহারে ফসলের উৎপাদন খরচ কম হয়। এই সারে জৈব পদার্থ, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, ম্যাগনেশিয়াম, বোরণসহ অসংখ্য গুণ থাকায় রাসায়নিক সার ব্যবহারের কোনো প্রয়োজন হয় না। কৃষকের প্রাকৃতিক লাঙ্গল কেঁচো দিন দিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক যথেচ্ছা ব্যবহারের ফলে বিলীন হতে চলেছে কেঁচো। সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে তার বংশবিস্তার। যে জৈব পদার্থ মাটিকে উর্বর রাখে, মাটিকে নরম রাখে, মাটিতে বায়ু চলাচলে সুবিধা ঘটায়, পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায় ও ফসলের পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি করে সেই জৈব পদার্থ আমাদের মাটি থেকে হারিয়ে গেলে যে বিপর্যয় ঘটবে তার লক্ষণগুলো ইতোমধ্যে আমাদের কৃষিতে দৃশ্যমান। তাই মানুষের কল্যাণের জন্যই যে মাটি সেই মাটির প্রতি আমাদের যতœবান, এর সঠিক ব্যবহার ও পরিচর্যা এবং সুসম জৈব প্রযুক্তির চাষাবাদ আমাদের মাটির এবং আমাদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারে। ভার্মি কম্পোস্ট কেঁচো সার আমাদের সেই চাহিদা ও প্রত্যাশা পূরণে রাখতে পারে উল্লেখযোগ্য অবদান। মাটির উর্বরা শক্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে রাসায়নিক সার আমদানি ও ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার জন্য সরকার তথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সারের ব্যবহারের প্রতি কৃষককে উদ্বুদ্ধ ও উজ্জীবিত করে তুলতে হবে।

কচুরিপানা কৃষির এক মহাসম্পদ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকায় এই কচুরিপানাকে শুকিয়ে মাল্চ হিসেবে ব্যবহার করে লবণাক্ততা কমিয়ে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। সংগঠিত হয়ে দলবদ্ধভাবে কচুরিপানা সংগ্রহ করে জৈব সার তৈরি, মাল্্চ হিসেবে ব্যবহার, ফলগাছের গোড়ায় মাল্্চ হিসেবে ব্যবহার করে মাটির ক্ষয়রোধ করে মাটিতে জৈব সার সংযুক্ত করে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি করে দেশকে সমৃদ্ধ করতে পারেন…

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ মহীউদ্দীন চৌধুরী দীর্ঘদিন কচুরিপানা নিয়ে গবেষণা করেন এবং কৃষকের জমিতে প্রয়োগ করে ব্যাপক ফলপ্রসূ হয়েছেন। তার গবেষণার কিছু বর্ণনা এখানে উল্লেখ করা হলোথ কচুরিপানা হলো ভাসমান এমন একটি প্রাকৃতিক জলজ উদ্ভিদ যার উৎপত্তিস্থল ব্রাজিল (আমাজন), এর ৭টি প্রজাতি রয়েছে। গ্রীষ্মমন্ডলীয় এলাকায় এটি খুব দ্রুত বংশবিস্তার করে, এমনকি ৬ দিনেরও কম সময়ে সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। দ্রুত বংশবিস্তারের জন্য কচুরিপানার বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। শাখা ও লতানো কান্ড এবং বীজের মাধ্যমে এর বংশবৃদ্ধি ঘটে, যা পাখির মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। অক্টোবরের প্রথমেই গাছে ফুল আসা শুরু হয় এবং সম্পূর্ণ গ্রীষ্মকাল চলতে থাকে। ফুল ফোটার ১-২ দিন পর শুকিয়ে যায়। সব ফুল শুকিয়ে যাওয়ার ১৮ দিন পর বীজগুলো বিমুক্ত হয়। গ্রীষ্মকালে অঙ্গজ বিস্তার খুব দ্রুত ঘটে। ৫০ দিনের মধ্যে প্রতিটি ফুল থেকে প্রায় ১ হাজার নতুন কচুরিপানার জন্ম হয়। একটি গাছ থেকে ৫ হাজারের অধিক বীজ উৎপন্ন হয়, এ বীজ ৩০ বছর পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে।

কচুরিপানা যে কোনো পরিবেশেই জন্মাতে পারে, এমনকি বিষাক্ত পানিতেও এরা জন্মায়। কচুরিপানা অতিমাত্রার দূষণ ও বিষাক্ততা সহ্য করতে পারে। মার্কারি ও  লেডের মতো বিষাক্ত পদার্থ এরা শিকড়ের মাধ্যমে পানি থেকে শুষে নেয়। তাই পানির বিষাক্ততা ও দূষণ কমাতে কচুরিপানার চাষ অত্যন্ত উপকারী। পূর্ব এশিয়ার কিছু অংশে কচুরিপানা মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভেষজ চিকিৎসার  ক্ষেত্রেও এর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। গবাদিপশুর খাদ্য ও বায়োগ্যাস উৎপাদনের জন্য এটি চমৎকার একটি উৎস। ক্ষেত্রবিশেষে কচুরিপানা থেকে গোবরের চেয়েও বেশি বায়োগ্যাস উৎপাদন করা যায়। পূর্ব এশিয়ায় শুকনো কচুরিপানা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং এর ছাই কৃষকরা সার হিসেবে জমিতে ব্যবহার করে। সবুজ কচুরিপানা জৈব সার হিসেবেও জমিতে ব্যবহার করা যায় (সরাসরি অথবা মালচ্ হিসেবে)। বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কচুরিপানা থেকে কাগজ ও আসবাবপত্রও তৈরি করা যায়। কচুরিপানা কেঁচো উৎপাদন বৃদ্ধিতেও সহায়ক। কচুরিপানার বৃদ্ধি এতটাই তাৎক্ষণিক যে, কোনো জলাশয়ের ওপর কার্পেটের মতো স্তর তৈরি করা মাত্র এক দিনের ব্যাপার। হেক্টরপ্রতি প্রতিদিন এদের বৃদ্ধি প্রায় ১৭ টনের ওপরে এবং ১ সপ্তাহের মধ্যেই এ সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। কচুরিপানায় খুব দ্রুত ও প্রচুর পরিমাণে ফুল ফোটে। তাই কচুরিপানা এখন কৃষির এক মহাসম্পদ। সম্প্রতি ভার্মিকম্পোস্ট (কেচোঁ সার) তৈরিতে কচুরিপানা একটি উত্তম উপকরণ হিসেবে নানা  দেশে প্রমাণিত হয়েছে। কচুরিপানা থেকে তৈরি জৈব সার ব্যবহার করে জমির উর্বরতা এবং ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির সাফল্য পাওয়া গেছে। ১৮০ টন কাঁচা কচুরিপানা থেকে প্রায় ৬০ টন জৈব সার উৎপাদন হতে পারে। আমাদের দেশে দিন দিন গোবরের প্রাপ্যতা কমে আসছে, কারণ এখন আর কৃষকের গোয়ালে গরু নেই, আছে পাওয়ার টিলার। কচুরিপানা প্রাকৃতিকভাবে পানি থেকে বেশ ভালোভাবেই নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাসিয়াম পুষ্টি উপাদান পরিশোষণ করতে পারে। ফলে কচুরিপানা পচিয়ে জৈব সার তৈরি করে জমিতে ব্যবহার করলে এসব উপাদান মাটিকে সমৃদ্ধ করে তোলে। ভারতের তামিলনাড়ুর গবেষক সেলভারাজ এক পরীক্ষায় প্রমাণ পেয়েছেন, ভার্মিকম্পোস্টের জন্য যেখানে অন্যান্য কৃষিবর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরিতে ৭০ দিন লাগে সে ক্ষেত্রে কচুরিপানা থেকে জৈব সার তৈরিতে লাগে মাত্র ৫৫ দিন। ওই বিজ্ঞানীর মতে, বিভিন্ন উদ্যান ফসল চাষের জন্য যেখানে হেক্টরপ্রতি ১০-১৫ টন জৈব সার লাগে সেখানে কচুরিপানা থেকে তৈরি করা জৈব সার লাগে মাত্র ২.৫-৩.০ টন। এ পরিমাণ জৈব সার ব্যবহার করেই ফলন ২০-২৫ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব। অথচ এ বিষয়ে কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো একেবারে নীরব। বিভিন্ন পত্রিকায় কচুরিপানাকে নিয়ে যেসব খবর পরিবেশিত হয়েছিল তা এরূপ : বদ্ধ নদীতে কচুরিপানা জট, কাপ্তাই হ্রদে আবারো কচুরিপানার জট : নৌযান চলাচল ব্যাহত, গতিহীন সতী নদীতে কচুরিপানার জট, সাঁথিয়ায় ইছামতি নদী কচুরিপানায় পরিপূর্ণ এবং আমতলীর সুগন্ধি খালে কচুরিপানা জট : নৌচলাচল বন্ধ ইত্যাদি। অর্থাৎ সারা বাংলাদেশে কচুরিপানা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকায় এ কচুরিপানাকে শুকিয়ে মাল্চ হিসেবে ব্যবহার করে লবণাক্ততা কমিয়ে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। কচুরিপানার এত কৃষিতাত্ত্বিক গুরুত্ব থাকার পরও বাংলার কৃষকরা কচুরিপানার ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন। তাই পরিশেষে বলব, কৃষক ভাইয়েরা! সংগঠিত হয়ে দলবদ্ধভাবে কচুরিপানা সংগ্রহ করে জৈব সার তৈরি, মাল্্চ হিসেবে ব্যবহার, ফল গাছের গোড়ায় মাল্্চ হিসেবে ব্যবহার করে মাটির ক্ষয়রোধ করে মাটিতে জৈব সার সংযুক্ত করে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি করে দেশকে সমৃদ্ধ করতে পারেন। দেশে কচুরিপানার ব্যবহার না হওয়ায় বিজ্ঞানী ড. মহীউদ্দীনের আক্ষেপথ ‘হায়রে কচুরিপানা! বাংলার কৃষক তোরে চিনল না’।

 

ডাটা অন্যতম গ্রীষ্মকালীন সবজি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ডাটা বাংলাদেশের অন্যতম গ্রীষ্মকালীন সবজি। ডাটায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন-এ, বি, সি, ডি এবং ক্যালসিয়াম ও লৌহ বিদ্যমান। ডাটার কান্ডের চেয়ে পাতা বেশি পুষ্টিকর। খুব কম সবজিতে এত পরিমাণে বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন ও খনিজ লবণ থাকে। মাটির বৈশিষ্ট্য : ডাটার জন্য উর্বর ও গভীর মাটি প্রয়োজন। সুনিষ্কাশিত অথচ ‘জো’ থাকে এমন মাটিতে এটি সবচেয়ে ভাল জন্মে। উৎপাদন কৌশল : বাংলাদেশে ডাটার আবাদ খরা মৌসুমেই করা হয়। শীত প্রকট ও দীর্ঘস্থায়ী নয় বলে রবি মৌসুমেও এর চাষ সম্ভব, তবে সেই সময় অন্য অনেক সবজি পাওয়া যায়।

জমি তৈরি ডাটার জন্য জমি গভীর করে কর্ষণ ও মিহি করে প্রস্তুত করতে হবে। জমিতে বড় ঢেলা থাকবে না। বাংলাদেশে ডাটা প্রধানত কান্ড উৎপাদনের জন্য চাষ করা হয়। আমাদের বেশি জাতসমূহ কান্ডপ্রধান, এগুলো ডালপালা খুব কম উৎপাদন করে। এসব জাত ৩০ সে.মি. দূরত্বে সারি লাগানো  যেতে পারে। চারা গজানোর পর ক্রমান্বয়ে পাতলা করে দিতে হবে। যেন শেষ পর্যন্ত সারিতে পাশাপাশি দুটি গাছ ৮/১২ সে.মি. দূরত্বে থাকে।  যেসব জাতের কান্ড অনেক মোটা ও দীর্ঘ হয় এবং দেরিতে ফুল উৎপাদন করে সেগুলো আরও পাতলা করা উচিত। বীজের পরিমাণ ডাটা চাষের জন্য শতাংশ প্রতি ১৫ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়। বীজ বপন জমি গভীরভাবে চাষ দিয়ে বড় ঢেলা ভেঙে মাটি ঝুরঝুরে করতে হবে। সারিতে কাঠির সাহায্যে ১.০-১.৫ সে.মি. গভীর লাইন টানতে হবে। লাইনে বীজ বুনে হাত দিয়ে সমান করে দিতে হবে। ছিটিয়ে বুনলে বীজের সঙ্গে সমপরিমাণ ছাই বা পাতলা বালি মিশিয়ে নিলে সমভাবে বীজ পড়বে। বপনের পর হাল্কাভাবে মই দিয়ে বীজ ঢেকে দিতে হবে। জমিতে পর্যাপ্ত রস না থাকলে ঝাঝরি দিয়ে হাল্কা করে পানি ছিটিয়ে দিতে হবে। তাহলে বীজ দ্রুত এবং সমানভাবে গজাবে।

অন্তবর্তীকালীন পরিচর্যা গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য জমিকে আগাছামুক্ত রাখা আবশ্যক। প্রয়োজনমতো জমিতে সেচ না দিলে কান্ড দ্রুত আঁশমুক্ত হয়ে ডাটার গুণগতমান ও ফলন কমে যাবে। মাটির চটা ভেঙে ঝুরঝুরে করে দিলে গাছের বৃদ্ধির সুবিধা এবং গোড়াপচা রোগও রোধ হয়। চারা গজানোর ৭ দিন পর হতে পর্যায়ক্রমে একাধিকবার গাছ পাতলাকরণের কাজ করতে হবে। জাত ভেদে ৫-১০ সে.মি. অন্তর গাছ রেখে বাকি চারা তুলে শাক হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। যেহেতু দ্রুত বর্ধনশীল ফসল তাই সঠিক সময়ে ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে।

ফসল তোলা কান্ডপ্রধান জাতে ফসল সংগ্রহের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। গাছে ফুল আসার পূর্ব পর্যন্ত যে কোনো সময় ফসল তোলা যেতে পারে। ফুল আসলেই কান্ড আঁশময় হয়ে যায়। ডাটার কান্ডের মাঝামাঝি ভাঙার চেষ্টা করলে যদি সহজে ভেঙে যায় তাহলে বুঝতে হবে আঁশমুক্ত অবস্থায় আছে। তখনই সংগ্রহের উপযুক্ত সময় বলে বিবেচিত হয়।

জীবনকাল লাল তীর সীড লিমিটেড উদ্ভাবিত জাতসমূহের জীবনকাল বপন  থেকে ৪০-৬০ দিন। ফলন ডাটা একটি উচ্চ ফলনশীল সবজি। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উন্নত জাতের চাষ করলে প্রতি একরে ১০০-১২০ টন ডাটা পাওয়া সম্ভব।

 

উন্নত জাতের করলা চাষ পদ্ধতি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ উচ্ছে ও করলা তিতা বলে অনেকেই খেতে পছন্দ করেন না। তবে এর ঔষধিগুণ অনেক বেশি। ডায়াবেটিস, চর্মরোগ ও কৃমি সারাতে এগুলো ওস্তাদসবজি। ভিটামিন ও আয়রন-সমৃদ্ধ এই সবজির অন্যান্য পুষ্টিমূল্যও কম নয়।

উচ্ছে ও করলা এ দেশের প্রায় সব জেলাতেই চাষ হয়। আগে শুধু গরমকালে উচ্ছে-করলা উৎপাদিত হলেও এখন জাতের গুণে প্রায় সারা বছরই চাষ করা যায়। যেগুলো অপেক্ষাকৃত ছোট, গোলাকার, বেশি তিতা, সেগুলোকে বলা হয় উচ্ছে। বড়, লম্বা ও কিছুটা কম তিতা স্বাদের ফলকে বলা হয় করলা। উচ্ছেগাছ ছোট ও কম লতানো হয়। করলাগাছ বেশি লতানো ও লম্বা লতাবিশিষ্ট, পাতাও বড়। উচ্ছে ও করলা তিতা বলে অনেকেই খেতে পছন্দ করেন না। তবে এর ঔষধিমূল্য অনেক বেশি। ডায়াবেটিস, চর্মরোগ ও কৃমি সারাতে এগুলো এক ওস্তাদসবজি। ভিটামিন ও আয়রন-সমৃদ্ধ এই সবজির অন্যান্য পুষ্টিমূল্যও কম নয়।

মাটি ঃ প্রায় সব রকমের মাটিতে ও পানি জমে না এমন জায়গায় উচ্ছে-করলার চাষ করা যায়। তবে জৈব পদার্থসমৃদ্ধ দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটিতে ভালো হয়। ছায়া জায়গায় ভালো হয় না।

জাত ঃ উচ্ছে ও করলা পরপরাগায়িত সবজি হওয়ায় এর জাত বৈচিত্রের শেষ নেই। এক জাত লাগালেও পরের বছর সে জাত থেকে রাখা বীজ লাগিয়ে হুবহু একই বৈশিষ্ট্যের ফল পাওয়া যায় না। তাই প্রতি মৌসুমেই বিশ্বস্ত উৎস থেকে ভালো জাতের ভালো বীজ সংগ্রহ করে এর চাষ করা উচিত। উচ্ছের প্রায় সব জাতই দেশী বা স্থানীয় । চাষিরাই এগুলোর বীজ রাখেন ও লাগান। এ দেশে করলার যেসব জাত রয়েছে সেগুলো হলো-

উচ্চফলনশীল জাত বারি করলা ১। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ জাত উদ্ভাবন করেছে। এ জাতের একটি গাছে ২৫ থেকে ৩০টি করলা ধরে। হেক্টরপ্রতি ফলন ২৫ থেকে ৩০ টন (প্রতি শতকে ১০০ থেকে ১২০ কেজি)।

বিএডিসির ‘গজ করলা’ নামে আর একটি জাত আছে। এ জাতও ভালো, গাছপ্রতি ১৫  থেকে ২০টি করলা ধরে। ফলন ২০  থেকে ২৫ টন (প্রতি শতকে ৮০ থেকে ১০০  কেজি)। হাইব্রিড জাত বুলবুলি, টিয়া, প্যারট, কাকলি, প্রাইম-এক্সএল, টাইড, গ্রিন স্টার, গৌরব, প্রাইড ১, প্রাইড ২, গ্রিন রকেট, হীরা ৩০৪, মিনি, গুডবয়, ওয়াইজম্যান, জাম্বো, গজনি, ইউরেকা, হীরক, মানিক, মণি, জয়, কোড-বিএসবিডি ২০০২, কোড-বিএসবিডি ২০০৫, পেন্টাগ্রিন, ভিভাক, পিয়া, এনএসসি ৫, এনএসসি ৬, রাজা, প্রাচী ইত্যাদি।

জমি ও মাদা তৈরি ঃ জমি ভালোভাবে চাষ দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করে প্রতি শতাংশে জমি তৈরির সময় ৪০ কেজি পচা গোবর সার মিশিয়ে দিতে হবে। মই দিয়ে সমান করার পর ১ মিটার চওড়া বেড করে তার মাঝে ৩০  সেন্টিমিটার চওড়া করে নালা কাটতে হবে। জমি যতটুকু লম্বা ততটুকুই লম্বা বেড হতে পারে। খুব  বেশি লম্বা হলে মাঝখানে খন্ড করা যেতে পারে। উচ্ছের ক্ষেত্রে ১ মিটার ও করলা ক্ষেত্রে ১.৫ মিটার দূরে দূরে মাদা তৈরি করতে হবে। সব দিকে ৪০ সেন্টিমিটার করে মাদা তৈরি করতে হবে। বীজ  বোনার ৭ থেকে ১০ দিন আগে মাদায় পচা গোবর ও সার মাদার মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।

বীজ বোনা ঃ বছরের যেকোনো সময় এখন করলা লাগানো যায়। তবে খরিপ বা গ্রীষ্ম-বর্ষা মৌসুমে সবচেয়ে ভালো হয়। এ মৌসুমে চাষ করতে হলে ফেব্র“য়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে বীজ বুনতে হবে। আগাম ফলন পেতে চাইলে ফেব্র“য়ারির মাঝামাঝি সময়ে বীজ বোনা ভালো। তবে উচ্ছে বসন্ত-গ্রীষ্মেই ভালো হয়। উচ্ছে চাষ করতে চাইলে জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে বীজ বুনতে হবে। করলার বীজ মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত  বোনা যেতে পারে। প্রতি মাদায় দু’টি করে বীজ বুনতে হবে। বীজের খোসা শক্ত বলে বোনার আগের দিন রাতে পানিতে বীজ ভিজিয়ে রাখতে হবে, তাহলে ভালো গজাবে। তবে মাদায় সরাসরি বীজ না বুনে কলার ঠোঙা বা পলিব্যাগেও চারা তৈরি করে সেসব চারা মাদায় রোপণ করা যেতে পারে। সাধারণত ১০০ গ্রাম বীজে ৬০০ থেকে ৭০০টি চারা হয়। প্রতি শতকে ১২-১৫ গ্রাম উচ্ছে ও ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম করলার বীজ লাগে।

সারের পরিমাণ ঃ করলা চাষে জৈবসার খুব দরকার। মোট জৈবসারের অর্ধেক জমি চাষের সময় ও বাকি অর্ধেক বীজ বোনা বা চারা লাগানোর ১০ দিন আগে মাদায় দিতে হবে। অন্যান্য সার নিচের ছক অনুযায়ী দিতে হবে।

 

বাউনি দেয়া ঃ চারা ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়ে গেলে চারার সাথে কাঠি পুঁতে বাউনি দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি মাটি থেকে এক থেকে দেড় মিটার উঁচু করে মাচা তৈরি করতে হবে। যেহেতু বেড ১ মিটার চওড়া, সে জন্য মাচাও অনুরূপ চওড়া রাখলে ভালো হয়। এতে করলা তোলা ও পরিচর্যার কাজ সহজ হয়। বাঁশের শক্ত খুঁটি পুঁতে তার মাথায় জিআই তার, রশি ইত্যাদি বেঁধে খাঁচা তৈরি করে তার উপর দিয়ে পাটকাঠি বা বাঁশের সরু কাঠি ফাঁকা করে বিছিয়ে মাচা তৈরি করা যেতে পারে। মাটিতে লতিয়ে দেয়ার চেয়ে  মাচায় লতিয়ে দিলে করলার ফলন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি হয়।

সেচ ও আগাছা পরিষ্কার  ঃ মাদায় জো রেখে বীজ বুনতে হবে। চারা গজানোর পর মাদা শুকিয়ে গেলে সেচ দিতে হবে। সেচ দেয়ার পর মাটি চটা বেঁধে  গেলে তা নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করে  ভেঙে দিতে হবে। পানির অভাবে গাছের বাড়বাড়তি কমে যায়, ফুল ও কচি ফল ঝরে যায়, ফল ছোট হয়। সে জন্য খরা হলে বা জমি শুকিয়ে গেলে  সেচ দিতে হবে। প্রতিবার সার প্রয়োগের পর সেচ দিতে হবে। গাছের গোড়া থেকে ছোট  ছোট কিছু ডগা বের হয়।  সেগুলো ছেঁটে দিলে ফলন ভালো হয়। জমিতে যেন পানি জমতে না পারে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

করলা তোলা ঃ চারা গজানোর ৪০ থেকে ৫০ দিন পর থেকেই উচ্ছেগাছ ফল দেয়া শুরু করে। করলাগাছ ফল দেয়া শুরু করে ৬০ দিন পর। ফল আসা শুরু হলে গাছ থেকে প্রায় দু’মাস ফল তোলা যায়।

বিশ্ববাসী পরিচিত হচ্ছে বায়োডিজেলের সঙ্গে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ আমাদের দেশে এখন আমদানি করা জ্বালানি বাবদ প্রতিদিন প্রায় ২৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। সাদা মান্দার গাছ চাষ করে উৎপাদিত বায়োডিজেল যদি দেশের চাহিদার ২৫ ভাগও মেটাতে সক্ষম হয় তবে বছরে ২৫ কোটি ডলার সাশ্রয় হবে। পৃথিবীর সঞ্চিত জ্বালানি একসময় অবশ্যই শেষ হয়ে যাবে। যানবাহনের ওপর এ যুগের মানুষ অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। ‘জ্বালানি ফুরিয়ে যাবে’-ভাবতেও ভয় লাগে। তাহলে কি পৃথিবী আর ঘুরবে না, থেমে থাকবে। তাহলে উপায় কী? উপায় বাতলে দিচ্ছে বরাবরের মতো প্রযুক্তিই। আমাদের চারপাশের প্রাকৃতিক উপাদানগুলোই হয়ে উঠতে যাচ্ছে আগামী দিনের জ্বালানির অফুরন্ত উৎস। সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া অনেক আগেই আমরা জেনেছি। এর সম্ভাবনা ও উন্নতির কাজের মধ্যে অনেক দূর এগিয়েছে। সম্প্রতি বিশ্ববাসী পরিচিত হচ্ছে বায়োডিজেলের সঙ্গে। এই বায়োডিজেলটি সংগ্রহ করা হয় গাছ থেকে এবং এজন্য সবচেয়ে উপযুক্ত গাছ হচ্ছে যাত্রোপা, গম, ভুট্টা, পাম, সাদা মান্দার। এগুলোর ফল ও ফুল থেকে সংগৃহীত তেলকেই বলা হচ্ছে বায়োডিজেল। বাংলাদেশের জন্য বায়োডিজেল উৎপাদন একটি সম্ভাবনার খাত হিসেব আত্মপ্রকাশ করতে পারে। সাদা মান্দার এ ক্ষেত্রে আলোর পথ দেখাচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, সাদা মান্দার গাছ থেকেই ডিজেল পাওয়া যাবে। একসময় সাদা মান্দারের তেল দিয়ে কুপি বাতি জ্বালাতো আদিবাসীরা। পরে বিদ্যুতের আগমনে এর ব্যবহার আর তেমন চোখে পড়ে না। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের প্রফেসর এবং প্রধান গবেষক ড. মো. দৌলত হোসেন ও সহযোগী গবেষক প্রভাষক পারভেজ ইসলাম দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে গবেষণার পর এ তথ্য জানিয়েছেন। জার্মানির বায়োডিজেল বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. কে বেকার এসেছিলেন বাংলাদেশে। তিনিই বায়োডিজেল তৈরির জন্য সম্ভাব্য সাদা মান্দারের সঠিক জাত শনাক্তকরণে সহায়তা করেন। তিন থেকে পাঁচ ফুট উঁচু সাদা মান্দার গাছ এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফুল ও ফল দেয়। গবেষকরা জানার, প্রতি হেক্টর জমি থেকে ১০-১২ টন সাদা মান্দার বীজ পাওয়া সম্ভব। এ থেকে ২৩-২৭ শতাংশ তেল পাওয়া যেতে পারে। প্রতি হেক্টর জমি থেকে প্রতি বছরে দুই-আড়াই হাজার লিটার বায়োডিজেল পাওয়া সম্ভব। বর্তমান সময়ে ডিজেলের দাম বাড়ায় এবং প্রাপ্তির উৎস ধীরে ধীরে কমতে থাকায়  সাদা মান্দার তেলের ব্যবহার ইন্ডিয়া, মাদাগাস্কার, থাইল্যান্ড, ব্রাজিলে বাড়ছে। জার্মানির হোহেনা হাইম বিশ্ববিদ্যালয়ে সাদা মান্দার তেলের (বায়োডিজেল) গুণাগুণ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বায়োডিজেলের মান ফসিল ডিজেলের চেয়ে উন্নত। এর ব্যবহারে ইঞ্জিনের ধোঁয়া কম হয় ও ইঞ্জিনের লাইফ বেড়ে যায়। একটি সাদা মান্দার গাছ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত বায়োডিজেল পাওয়া যেতে পারে। প্রফেসর দৌলত জানান, শুধু এক বিঘা জমিতে সাদা মান্দার চাষ করে এক বছরের কুপি বাতি বা হারিকেন জ্বালানোর তেলের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
সাদা মান্দার থেকে বায়োডিজেল ঃ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। ফলে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে। এর বিকল্প কি নেই? এ দেশেই বহু বছর আগে একটি অতি পরিচিত গাছের বীজ থেকে জ্বালানি তেল তৈরি হতো গাছটির নাম সাদা মান্দার। বৈজ্ঞানিক নাম যাত্রোপা কারকাস। এ দেশের আদিবাসী ও গ্রামের মানুষ সাদা মান্দারের বীজ থেকে তেল সংগ্রহ করে কুপি বাতি জ্বালাতো। কেরোসিন আর বিদ্যুতের আগমন সে বৃক্ষ-জ্বালানির কবর রচনা করেছে। এখন ২০০ কোটি ডলারের আমদানিকৃত জ্বালানির ব্যয় মেটাতে হিমশিম অবস্থায় আবারও বৃক্ষ-জ্বালানির খোঁজ পড়েছে। সাদা মান্দার বা যাত্রোকা গাছের পরিকল্পিত আবাদ ও এর বীজ থেকে বায়োডিজেল উৎপাদন ত্বরান্বিত করতে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাদা মান্দার গাছের ফলের বীজ থেকে বায়োডিজেল পাওয়া যায়। সাধারণত এ গাছ আট ফুটের মতো লম্বা হয়। এতে প্রচুর ফল হয়। গাছ লাগানোর নয় মাস পর থেকে ফুল ধরে। একটি গাছে বছরে প্রায় ২৫ কেজি ফল ধরে। এ গাছ ৩০-৪০ বছর বাঁচে। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়কালে সাদা মান্দার ফুল ও ফল দেয়।
ফলের প্রতিটি বীজের ওজন ০.৮ থেকে এক গ্রাম হয়ে থাকে। এক হেক্টর জমিতে প্রায় আড়াই হাজার গাছ লাগানো যায় যা থেকে ১০-১২ টন পর্যন্ত বীজ পাওয়া সম্ভব। এক টন বীজ থেকে ২৪৫ কেজি পর্যন্ত তেল পাওয়া যায়। এ তেল সংগ্রহ করাও তেমন কঠিন কিছু নয়। সরিষা ঘানি বা ধান ভাঙার কলে সামান্য রদবদল করে সাদা মান্দার বীজ থেকে তেল সংগ্রহ করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, শুধু এক বিঘা জমিতে সাদা মান্দার চাষ করে এক বছরের কুপিবাতি বা হ্যারিকেন জ্বালানোর তেলের চাহিদা পূরণ সম্ভব। মান্দার বীজে তেলের পরিমাণ ২৩-৩৭ শতাংশ। সে হিসেবে এক হেক্টর জমি থেকে পাওয়া ১০-১২ টন বীজ থেকে প্রতি বছরে দুই থেকে আড়াই হাজার লিটার বায়োডিজেল পাওয়া যেতে পারে। জার্মানির হোহেনা হাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারে সাদা মান্দার তেলের গুণাগুণ পরীক্ষা করে দেখা গেছে এই বায়োডিজেলের গুণাগুণ ফসিল ডিজেল (আমদানিকৃত জ্বালানি) থেকে উন্নতমানের এবং এর ব্যবহারে ইঞ্জিনের ধোঁয়া কম হয়, ইঞ্জিনের আয়ু বাড়ে। ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন শে এ গাছের ফল থেকে বায়োডিজেল উৎপাদন করা হচ্ছে। ভারতের ঝাড়খন্ডসহ বিভিন্ন রাজ্যের আবাদ অযোগ্য জমিতে বিদেশি কোম্পানিরা এ গাছ চাষ করছে। সেখানে এ গাছের ফল থেকে এক লিটার ডিজেল উৎপাদনের খরচ পড়ছে মাত্র ২১ রুপি। সাদা মান্দার বা যাত্রোপা গাছ সর্বত্রই জন্মে। দেশের পাহাড়ি এলাকা, চরাঞ্চল, রাস্তা ও রেললাইনের দুই পাশ, বরেন্দ্র অঞ্চল ও অন্যান্য এলাকার অনাবাদী পতিত জমিতে এ গাছ ব্যাপকভাবে লাগানো যেতে পারে। প্রথম দিকে উৎপাদন কম হলেও পঞ্চম বছর থেকে উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আমাদের দেশে এখন আমদানি করা জ্বালানি বাবদ প্রতিদিন প্রায় ২৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। সাদা মান্দার গাছ চাষ করে উৎপাদিত বায়োডিজেল যদি দেশের চাহিদার ২৫ ভাগও মেটাতে সক্ষম হয় তবে বছরে ২৫ কোটি ডলার সাশ্রয় হবে। অতএব জ্বালানি বহুমুখীকরণে অবহেলিত প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে পরিকল্পিত পদক্ষেপের বিকল্প নেই। সম্প্রতি বিশ্বের কয়েকটি দেশ ব্যাপকভাবে বায়োডিজেলের উৎপাদন শুরু করেছে। এর উৎপাদনের প্রায় পুরোটাই নেতৃত্ব দিচ্ছে ইউরোপিয়ান দেশগুলো। বিশেষভাবে জার্মানির নাম বলা যেতে পারে। ২০০৩ সালের মে মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সব ফসিল ডিজেল চালিত যানগুলোয় বায়োডিজেল ব্যবহারের ঘোষণা দিয়েছে। তারা বছরে তিন মিলিয়ন টন বায়োডিজেল উৎপাদন করছে। তাদের ধারাবাহিকতায় এখন অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ইন্ডিয়া, মালয়েশিয়া এবং আমেরিকা এই খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। আফ্রিকা ও এশিয়ার কয়েকটি দেশে ব্যাপক পরিমাণে বায়োডিজেল উৎপাদন করতে সক্ষম শুধু যাত্রোপা গাছের ওপর ভিত্তি করে। এই সম্ভাবনা নিরূপণ করে দশটি উন্নয়নশীল দেশে যাত্রোপা উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। দেশগুলো হচ্ছে বারকিনা ফাসো, চায়না, ঘানা, ইন্ডিয়া, লেসোথো, মাদাগাস্কার, মালাবি, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইজারল্যান্ড ও জাম্বিয়া। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় বায়োডিজেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ক্রমেই এটি বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হচ্ছে। দিন দিন বেড়ে চলেছে বায়োডিজেলের গুরুত্ব। বায়োডিজেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন। পৃথিবীতে উৎপাদিত মোট বায়োডিজেলের ৮৫ ভাগ ব্যবহৃত হয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন অধিভুক্ত দেশগুলোয়। সেখানে বায়োডিজেলের সহজপ্রাপ্যতা, ট্যাক্স কম, দাম কম হওয়ার কারণে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সাধারণ পেট্রোলিয়াম ডিজেলের চেয়ে বায়োডিজেলের দাম কম এবং এটি পরিবেশবান্ধব। তাই ইউরোপিয়নরা বায়োডিজেল ব্যবহারে অতিমাত্রায় আগ্রহী। ইউরোপের ভেজিটেবল ফেডারেশন ফিডিয়লের ভাষ্য মতে, ইইউর ধারণা অনুযায়ী এশিয়ার পাম অয়েল ২০ ভাগ বায়োডিজেল জোগান দিতে সক্ষম। মালয়েশিয়ান পাম অয়েল বোর্ড ঘোষণা দিয়েছে যে, যৌথ মালিকানার ভিত্তিতে তারা তিনটি বায়োডিজেল প্ল্যান্ট তৈরি করবে এবং এর প্রতিটি থেকে পাওয়া যাবে বছরে ৬০ হাজার টন যার পুরোটাই বিক্রি হবে ইউরোপে। বায়োডিজেল হিসেবে করচের তেল ব্যবহার ঃ দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকিতে রয়েছে অসংখ্য করচগাছ। দেশের জ্বালানি তেলের এ চরম সংকটকালে নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে করচগাছ। করচের তেল বায়োডিজেল হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব বলে জানা গেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এ তেল কেরোসিনের পরিবর্তে কুপি জ্বালানো, রান্না-বান্না, পাম্প মেশিন চালানো, পাওয়ার ট্রিলার ও ট্রাক্টর চালানো; বাস, ট্রাক ও জেনারেটর চালানো ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে। করচ ঘন ডাল-পালা সমৃদ্ধ একটি বৃক্ষ। দেখতে অনেকটা বটগাছের মতোই ঝোপালো। হাওর পারের মানুষ না জেনে অনেকে এটাকে বটগাছ বলেও মনে করে থাকেন। এর বৈজ্ঞানিক নাম পনগামিয়া পিন্নাটা, ইংরেজি নাম পনগাম। নানা দিক দিয়ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও মূলত অজ্ঞতাবশত আমাদের দেশে এ উদ্ভিদটির তেমন কদর নেই। উদ্ভিদের সাধারণ গুরুত্ব ছাড়াও এটির রয়েছে কিছু বিশেষ গুরুত্ব। করচ হাকালুকি হাওরের একটি ঐতিহ্যবাহী উদ্ভিদ। শুধু হাকালুকি হাওর নয় দেশের উত্তর-পূর্বাংশের সমগ্র হাওর অঞ্চলে এ প্রজাতিটির আধিক্য রয়েছে। জানা যায় হাওর এলাকার প্লাবনভূমি, খাল-বিল-নদীর পাশে এবং বসতবাড়ির আশপাশে প্রচুর পরিমাণে করচের গাছ ছিল। করচের তেল বায়োডিজেল হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। ভারতে এ তেল কেরোসিনের পরিবর্তে কুপি জ্বালানো, রান্না-বান্না, পাম্প মেশিন চালানো, পাওয়ার ট্রিলার ও ট্রাক্টর চালানো, বাস, ট্রাক ও জেনারেটর চালানো ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে। হিন্দু সনাতন ধর্মে পূজা-পার্বণে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালাতে করচের তেল ব্যবহৃত হয়।