ধান ভিত্তিক ফসল পরিক্রমায় তিল চাষে কোন অসুবিধা হয় না

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশে তিল দ্বিতীয় প্রধান তৈল বীজ ফসল হিসেবে পরিগণিত। তিলের তেলের স্বাদ ও গন্ধ সুমিষ্ট এবং পচনরোধী উঁচুমানের ভোজ্য তেল। খাদ্য হিসেবেও তিল বীজ জনপ্রিয়। একক বা মিশ্র ফসল হিসেবেও স্ব-পরাগায়ণ প্রকৃতির উদ্ভিদ। তিল চাষ করে কৃষকের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন তথা পুষ্টি সমস্যা নিরসনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ধান ভিত্তিক ফসল পরিক্রমায় তিল চাষে কোন অসুবিধা হয় না। বিদেশ হতে সংগৃহীত একটি জার্মপ্লাজমে গামারশ্মি প্রয়োগ করে উন্নত লাইন নির্বাচন এবং নির্বাচিত লাইনটিকে দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশে অঞ্চলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিনা তিল-১ নামে নতুন এ জাতটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ জাতটি স্থানীয় আবাদি জাত টি-৬ অপেক্ষা প্রায় দেড়গুণ বেশি ফলন দেয়। বিনা তিল-১ এর গাছ শাখাবিহীন এবং পাতার রঙ ঘন সবুজ। প্রতিটি গিরায় ৩-৬ বড় আকারের লম্বা ফল ধরে। বীজাবরণ পাতলা, নরম ও ক্রীম রঙের বিধায় খোসা না ছড়িয়ে তিলের চাহিদাও প্রচুর। বীজে তেলের পরিমাণ শতকরা ৫০-৫২ ভাগ। জীবনকাল ৮৫-৯০ দিন। গড় ফলন হেক্টর প্রতি ১৩০০ কেজি (একর প্রতি ৫৩০ কেজি বা বিঘা প্রতি ১৭৫ কেজি)। বাংলাদেশের উপকূলীয় বিশাল লবণাক্ত এলাকা বছরের প্রায় ছমাস (ডিসেম্বর থেকে জুন) পতিত থাকে। এ সময়ে অর্থাৎ খরিফ-১ মৌসুমে বিনা তিল-১ এর লবণাক্ততা সহিষ্ণুতার কারণে এর চাষ করে বাংলাদেশে তেলবীজের বিরাট ঘাটতি বহুলাংশে লাঘব করা যেতে পারে। দেশের বৃহত্তম জেলাসমূহ যেমন-ঢাকা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, খুলনা, যশোর, পাবনা, রাজশাহী, দিনাজপুর, জামালপুর ও পার্বত্য জেলাসমূহে বিনা তিল-১ চাষ করে অধিক ফলন পাওয়া যেতে পারে। আউস ধান, আখ ও গ্রীষ্মকালীন মুগের সাথে সাথী ফসল হিসেবেও বিনা তিল-১ চাষ করা যায়। বেলে দো-আঁশ বা দো-আঁশ মাটি বিনা তিল-১ চাষের জন্য উপযোগী। এই ফসল জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। তবে জমি থেকে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকলে সকল প্রকার মাটিতেই জাতটি চাষ করা যেতে পারে। তিল কুয়াশা ও জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না কিন্তু যথেষ্ট খরা সহিঞ্চু। যদি তাপমাত্রা ২৫-৩৫ সেলসিয়াসের নীচে নামে তাহলে বীজ গজাতে দেরী হয় এবং চারাগাছ ঠিকমত বাড়তে পারে না। বাড়ন্ত অবস্থায় অনবরত বৃষ্টিপাত হলে তিল গাছ মরে যায়। খরিপ মৌসুমে বীজ বপনের ৩৫-৩০ দিনের মধ্যে তিল গাছে ফুলের কুঁড়ি আসে এবং ৪০-৪৫ দিনের মধ্যে ফুল ফোটা শুরু হয়। সাধারণত ৩-৪টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ভালভাবে ঝুরঝুরে এবং জমি সমান করে বিনা তিল-১ এর বীজ বপন করতে হয়। মুগসহ অন্যান্য ফসলের সাথে সাথী ফসল হিসেবে আবাদ করলে প্রধান ফসলের জন্য জমি তৈরি করতে হবে। মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ (মধ্য ফাগুন) বিনা তিল-১ এর বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। তবে উঁচু শ্রেণীর জমিতে ভাদ্র/আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি সময়েও বিনা তিল-১ চাষ করা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে পপ্রন্ড শীত শুরুর আগেই ফসল কর্তন করতে হবে। ছিটিয়ে বপনের ক্ষেত্রে হেক্টর প্রতি ৯ কেজি (একর প্রতি ৩-৩.৫ কেজি) এবং সারিতে বপন করার জন্য ৭ কেজি (একর প্রতি ২.৫-৩.০ কেজি) বীজ যথেষ্ট। তবে সাথী ফসল হিসেবে আবাদ করার সময় উভয় ফসল কি হারে বা কত সারি পর পর কোন ফসলের বীজ বপন করা হবে, তার উপর নির্ভর করে বীজের হার নির্ধারণ করতে হবে। জমিতে রস বেশি হলে অল্প গভীরে বীজ বপন করলে বীজ পচে না। মাটি শুষ্ক হলে বপনের পূর্বে একটি হলকা সেচ দিয়ে জমি তৈরি করে বীজ বপন করতে হবে। বিনা তিল-১ এর বীজ ছিটিয়ে বা সারিতে বপন করা যেতে পারে। বীজ ও শুকনো বালু একত্রে মিশিয়ে ছিটিয়ে বপন করলে সমান দূরত্বে বীজ ফেলতে সুবিধে হয়। বিনা তিল-১ এর জন্য সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০-২৫ সেন্টিমিটার এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৫ সেন্টিমিটার দিতে হবে। বীজ বপনের ২ দিনের মধ্যে অংকুরোদগম ঘটে এবং ৩-৪ দিনের মধ্যে মাটির উপর উঠে আসে। জমিতে চারা যদি ঘন হয় তবে ১৫ দিনের মধ্যে গাছ তুলে পাতলা করে দিতে হবে। বিনা তিল-১ চাষে সারের মাত্রা নির্ভর করে জমির ধরণ ও কৃষি পরিবেশ অঞ্চলের উপর। সাধারনত বিনা তিল-১ চাষে একর প্রতি ইউরিয়া- ৪০-৫০ কেজি, টিএসপি- ৩৬-৪৮ কেজি, এমপি- ২০-৩০ কেজি, জিপসাম- ৫০-৬০ কেজি, জিংক সালফেট- ১-২ কেজি ও বোরন- ০.৪-০.৮ কেজি হারে প্রযোগ করতে হবে। বোরন ঘাটতি এলাকায় হেক্টরপ্রতি ১০ কেজি হারে বরিক এসিড প্রয়োগ করে অধিক ফলন পাওয়া যেতে পারে। জমি প্রস্তুতকালে অর্ধেক ইউরিয়া এবং পূর্ণ মাত্রায় অন্যান্য সার মাটির সঙ্গে ভালভাবে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। অবশিষ্ট ইউরিয়া সার বীজ বপনের ২৫-৩০ দিন পর গাছে ফুল আসার সময় উপরি প্রয়োগ করতে হবে। অধিক ফলন পেতে হলে জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে। চারা অবস্থায় প্রায় ২০ দিন পর্যন্ত তিল গাছের বৃদ্ধি ধীর গতিতে হতে থাকে। এ সময় জমির আগাছা দ্রুত বেড়ে তিল গাছ ঢেকে ফেলতে পারে। তাই বীজ বপনের পূর্বেই জমিকে ভালভাবে আগাছা পরিষ্কার করে নিতে হবে। প্রয়োজনে সর্তকতার সাথে নিড়নী দিয়ে আগাছা তুলে ফেলতে হবে। সাধারনত বিনা তিল-১ চাষাবাদে সেচের প্রয়োজন হবে না। বপনের সময় মাটিতে রসের অভাব থাকলে একটি হালকা সেচ দিয়ে বীজ গজানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এর ২৫-৩০ দিন পর ফুল আসার সময় জমি শুষ্ক হলে একবার এবং ভীষণ খরা হলে ৫৫-৬০ দিন পর ফল ধরার সময় আর একবার সেচ দিতে হবে। তিল ফসল জলাবদ্ধতা মোটেই সহ্য করতে পারে না। তাই জমির মধ্যে মাঝে মাঝে নালা কেটে বৃষ্টি বা সেচের অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে ফসলকে রক্ষা করতে হবে । রোগবালাই দমন ঃ কান্ড পচা রোগ এবং বিছা পোকা ও হক মথ তিল ফসলের ক্ষতি করতে পারে। কান্ড পচা রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে বাজারে যেসব ছত্রাকনাশক পাওয়া যায়, যেমন রেভিস্টিন এক গ্রাম বা ডাইথেন এম-৪৫, ২ গ্রাম হারে প্রতি লিটার পানির সাথে মিশিয়ে ৮-১০ দিন পরপর তিনবার দুপুর ২-৩ টার সময় জমিতে ছিটিয়ে রোগটি দমন করা যেতে পারে। বিছাপোকা দমনের জন্য ডিম পাড়ার সাথে সাথে আক্রান্ত পাতা ছিঁড়ে কেরোসিন মিশ্রিত পানিতে ডুবিয়ে কার্যকরভাবে মেরে ফেলা যেতে পারে। সাইথ্রিন-১০ ইসি বা সবিক্রন-৪২৫ ইসি প্রয়োগ করে দমন করা যেতে পারে। ফসল কাটা ঃ বিনাতিল-১ পাকার সময় পাতা, কান্ড ও ফলের রঙ হলুদাভ হয় এবং বীজের খোসা ধূসর বর্ণ ধারণ করে। তিল ফসলের প্রতিটি গাছের সব বীজ এক সঙ্গে পাকে না। গাছের গোড়ার দিকের বীজ আগে পাকে এবং এভাবে ক্রমান্বয়ে উপরের দিকের বীজ পাকাতে শুরু করে । এ সমস্যা থেকে উত্তরণের বাস্তব উপায় হল, গাছের নীচের অংশের বীজ যখন পাকা শুরু করে তখন ফসল কেটে বাড়ির উঠানে কয়েকদিন স্তুপ করে রেখে দিলে উপরের দিকের বীজও পেকে যায়। তারপর তিল গাছ রৌদ্রে শুকিয়ে লাঠির সাহায্যে পিটিয়ে মাড়াই করতে হবে। এরপর বীজ ভালভাবে ৪-৫ দিন টানা রৌদ্রে ৩-৪ ঘন্টা করে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। তিল ফসল কর্তনের ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। বিলম্বে ফসল কাটা হলে বীজ ক্ষেতে ঝরে পড়ে, আবার আগাম কাটা হলে অনেক বীজ অপরিপক্ক থেকে যায়, উভয় ক্ষেত্রেই ফলন হ্রাস পায়। বীজ সংরক্ষণ ঃ বীজের মান ভাল রাখার জন্য পরিষ্কার বীজ পুরু বা শক্ত পলিথিন ব্যাগে ভরে মুখ বেঁধে অপেক্ষাকৃত শীতল স্থানে কম আর্দ্রতায় সংরক্ষণ করতে হবে। সংরক্ষণকালে বীজের আর্দ্রতা অবশ্যই শতকরা ৮ থেকে ৯ ভাগ হতে হবে। আরও ভাল হয় যদি ব্যভিস্টিন (প্রতি কেজি বীজে ২ গ্রাম হারে) দিয়ে বীজ শোধন করে সংরক্ষণ করা যায়। এভাবে সংরক্ষিত বীজের মান ভাল থাকে এবং অংকুরোদগম ক্ষমতা সহজে নষ্ট হয় না।

শহরের বাসা-বাড়িতে টবে ঢেঁড়শ চাষ পদ্ধতি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ শাকসবজি উৎপাদনের জন্য জমি বা বাগানই শ্রেষ্ঠ জায়গা। তবে যারা শহরে বাস করে তাদেরও শাকসবজি উৎপাদনের রয়েছে প্রচুর সুযোগ-সুবিধা। শহরের বাসা-বাড়ির ছাদে বা বারান্দায় বড় বড় টবে, মাটির চাঁড়িতে, ড্রামে কিংবা একমুখ খোলা কাঠের বাক্সে সারমাটি ভরে অনায়াসেই ঢেঁড়শ চাষ করা যায়। ঢেঁড়শে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম রয়েছে, তাছাড়া ভিটামিন -এ সহ অন্যান্য উপাদানও কিছু কিছু রয়েছে। বাংলাদেশে যে কোন সময়  ঢেঁড়শ লাগানো যায়। টবের মাটি ঃ  গাছের বৃদ্ধি এবং ঢেঁড়শের ভাল ফলনের জন্য মাটি অবশ্যই উর্বর, হালকা এবং ঝুরঝুরে হতে হবে। পানি শুকিয়ে গেলে টবের মাটিতে যেন ফেটে না যায়  সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। টবের মাটি ঝুরঝুরা রাখতে হলে সমপরিমাণে  দো-আঁশ মাটি ও জৈব সার একসাথে ভালভাবে মেশাতে হবে। এঁটেল মাটিতে জৈব সারের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে হবে। সাধারণভাবে প্রতি টবের মাটিতে চা চামচের চার চামচ টিএসপি সার ও ৫ থেকে ৬ দিন আগে ভেজানো ১১৬ গ্রাম পরিমাণ সরিষার খৈল মেশানো যেতে পারে। জাত ঃ ঢেঁড়শের নানা জাত রয়েছে। এর মধ্যে পুশা শাওনী, কাবুলী  ডোয়ার্ফ, লক্ষৌ  ডোয়র্ফ, লং গ্রীন, লং হোয়াইট, পেন্টাগ্রীণ-এসব বিদেশী জাত জনপ্রিয়। সময় ঃ গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত অর্থাৎ বছরের সব সময়ই ঢেঁড়শ গাছ লাগানো যায়। তবে  বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শীতের শেষভাগ থেকে বৈশাখ পর্যন্ত ঢেঁড়শ লাগানো যায়। এরপরও লাগানো যায় তবে নাবী ফসলে মোজাইক রোগ হয় বলে ফলন ভাল হয় না। বীজ বপন ঃ  ঢেঁড়শের চারা রোপণকালীণ সময় আঘাত সহ্য করতে পারে না বলে সরাসরি মূল টবে বুনতে হবে। ঢেঁড়শের জন্য মাঝারী ধরণের টব হলেই চলবে। প্রতি টবে ২ থেকে ৩টি বীজ বুনে দিতে হয়। চারা গজানোর পর একটি সবল চারা  রেখে বাকিগুলো ফেলে দিতে হয়। খোসা শক্ত বলে ঢেঁড়শের বীজ দেরীতে গজায়। তাই বুনার আগে ২৮ ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। পরিচর্যা ঃ   ঢেঁড়শ গাছ পানি সহ্য করতে পারে না। গাছের  গোড়ায় দাঁড়ানো পানি তাড়াতাড়ি সরিয়ে দিতে হবে। প্রত্যেকটা টবে পানি যাতে না বেধে থাকে তার ব্যবস্থা করতে হবে। গাছ ১০ থেকে ১২ সেঃ মিঃ বড় হলে টবের কিনার ঘেঁসে ১ চা চামচ ইউরিয়া ও ১ চা-চামচ মিউরেট অব পটাশ মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।  রোগবালাই ঃ শুঁয়া পোকা কচি কান্ড ছিদ্র করে গাছের ক্ষতি করে। ভাইরাস ( মোজাইক) রোগ ঢেঁড়শে প্রায়ই দেখা যায়। এ রোগে পাতা হলদে হয়ে কুঁচকে যায়।  রোগাক্রান্ত গাছ তুলে মাটিতে পুঁতে দিতে হয়। শুঁয়া পোকার আক্রমণ থেকে ঢেঁড়শ গাছকে বাঁচাতে হলে প্রতি লিটার পানিতে ১ মিঃ লিঃ ডায়াজিনন-৮০, নুভাক্রণ-৪০, একালাক্স-২৫ এর যে কোনটি অথবা ১ লিটার পানিতে ১ মিলি লিটার সিমবুশ-১০ মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে। ফসল সংগ্রহ ঃ বীজ বপনের দু’মাস পরেই ফল পাওয়া যায়। কচি অবস্থায় ঢেঁড়শ তুলতে হয়। দেরি হলে ফল শক্ত হয়ে যায় ও সেটা খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে যায়। ঘন ঘন ঢেঁড়শ তুললে গাছে বেশি পরিমাণে ঢেঁড়শ আসে।

শকুন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, প্রকৃতির ঝাড়ুদার, পরিবেশ রক্ষাকারী পাখি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ পাখি প্রকৃতির এক অপার সৌন্দর্যের প্রতীক। প্রকৃতির অলংকারও বলে থাকে  কেউ কেউ। পাখি শুধু নন্দনতত্ত্বের খোরাকই জোগায় না, প্রকৃতিতে ফুল ও ফসলের পরাগায়ণে অংশ নিয়ে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কয়েক দশক আগে গ্রাম বাংলা সবুজ গাছ-গাছালিতে ভরা ছিল। ঝোপ-ঝাড় ছিল। চারপাশ মুখরিত ছিল পাখির কলকাকলিতে। কিন্তু মানুষের নানাবিধ কর্মকান্ডে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির এই অলংকার। জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির কারণে উজাড় হচ্ছে বিভিন্ন গাছ ও বনাঞ্চল। পরিষ্কার করা হচ্ছে ঝোপ-ঝাড়। মানুষের প্রয়োজনের তাগিদে নির্মাণ করা হচ্ছে রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল-বাজারসহ মানববসতি। ক্রমশ বিপন্ন হয়ে উঠছে প্রকৃতি। আর প্রকৃতি বিপন্ন হবার কারণেই হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র। পাখিদের মধ্যে সবচেয়ে বিপন্নের তালিকায় রয়েছে শকুন। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই আজ শকুন বিপন্ন। একসময় শকুন ছিল গ্রাম বাংলার অতি সাধারণ চিরচেনা পাখি। গরু-ছাগল মারা গেলেই দল বেঁধে হাজির হতো শকুন। দেশের প্রায় সব এলাকাতেই কমবেশি দেখা মিলত এদের। আকাশের অনেক উঁচুতে স্থিরভাবে পাখা মেলে ঘুরে বেড়াত শকুনের ঝাঁক। নিচের মাটিতে  কোনো খাবার দেখলেই তড়িঘড়ি করে নেমে আসত। একটি শকুনকে নিচে নামতে  দেখলেই বাকিগুলো তাকে অনুসরণ করত। শকুনই একমাত্র পাখি যারা গবাদিপশুর মৃতদেহ সতেজ থাকা অবস্থাতেই চামড়া ফুটো করে খেতে পারে। মৃত গবাদিপশুর মাংস খেয়ে শকুন পরিবেশ পরিছন্ন করে। অ্যানথ্রাক্সসহ বিভিন্ন রোগ-জীবাণু হজম করার ক্ষমতা শকুনের আছে। এভাবে শকুন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, প্রকৃতির ঝাড়ুদার, পরিবেশ রক্ষাকারী পাখি নামে পরিচিতি পায়। বিশ্বে ২৩ প্রজাতির শকুন রয়েছে। এর মধ্যে চার প্রজাতির শকুন বাংলাদেশে আসে। এগুলো হচ্ছে হিমালয় গৃধিনী, ইউরেশীয়, ধলা ও কালা শকুন। হিমালয় গৃধিনী ও ইউরেশীয় শকুন প্রায়ই আসে, আবার চলে যায়। তবে পাখি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধলা শকুনকে ৪০ বছর পর গত জুনে কাপ্তাইয়ে দেখা গেছে। কালা শকুন মাঝে মধ্যে দেখা যায়। বন্যপ্রাণী বিশারদরা বলছেন, দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে অধিক ফলনের আশায় কৃষক জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক এবং রাসায়নিক সার ব্যবহারে শকুনসহ অন্যান্য প্রজাতির পাখিদের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি কলকারখানার দূষিত বর্জ্যরে কারণে পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছে শকুনসহ নানা প্রজাতির পাখি। গবাদি পশু ও কৃষি জমিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় কিডনি নষ্ট হয়ে মারাও যাচ্ছে এসব শকুন। শুধু শকুন নয় কীটনাশকের ব্যবহারের ফলে শকুনসহ অনেক প্রজাতির পাখিই হারিয়ে যেতে বসেছে। গবাদি পশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ডাইক্লোফেনাক জাতীয় ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় শকুনের কিডনি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে এর বিলুপ্তি তরান্বিত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, শকুন না থাকার কারনে বাংলাদেশে অ্যানথ্রাক্স, যক্ষা, ক্ষুরা রোগ ইত্যাদি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার এবং জলাত্মঙ্ক রোগ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা  বেড়েছে। শকুন না থাকায় গবাধি পশুর মৃত দেহ এখন শিয়াল, কুকুর, ইঁদুর, কাক, চিলসহ অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণী খাচ্ছে। এদের পেটে রোগ জীবানু নষ্ট না হওয়ায় জঙ্গল ও জনপদে ছড়িয়ে পড়ছে এসব মারাত্মক ব্যাধি। শকুন বাঁচাতে প্রাচীন ও উঁচু বৃক্ষ যেমন- তালগাছ, বটগাছ, আমগাছ, রেইনট্রি, কড়ই গাছ, শিমুল গাছ, শ্যাওড়া গাছ কাটা রোধ করে সেগুলো সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে করে শকুন সেই গাছগুলোতে নির্বিঘেœ বসতে পারে এবং বাসা তৈরির উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তবে প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সর্বস্তরের জনগণের সচেতনতা। প্রত্যেকে যদি তাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হয় এবং পরিবেশ রক্ষার অংশ নেয় তবেই প্রাকৃতির ঝাড়–দার শকুন রক্ষা পাবে।

বীজ সংরক্ষণের লাগসই পদ্ধতি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ফসল উতপাদনে বীজ যত মানসম্মত হয় ফলন ততবেশি হয়, তত ভালো হয়। ভালো মানসম্মত বীজ যতটুকু না উতপাদন কৌশলের ওপর নির্ভর করে তার চেয়ে বেশি নির্ভর করে যথাযথ পদ্ধতিতে বীজ সংরক্ষণের ওপর। সাধারণভাবে লাগসই পদ্ধতিতে, আধুনিক পদ্ধতিতে বীজ সংরক্ষণ করা যায়। সাধারণ পদ্ধতিতে সংরক্ষিত বীজ মানসম্মত থাকে না। আধুনিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করলে খরচ বেশি হয়। সেজন্য কম খরচে মানসম্মত বীজ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা পাওয়া যায় এমন পদ্ধতিই বিশ্লেষণ করা হবে। আমাদের দেশে সাধারণত মাটির পাত্রে বীজ সংরক্ষণ করা হয়। বিশেষ কিছু কৌশল আর পদ্ধতি অবলম্বন করলে সাধারণ পদ্ধতি অসাধারণ পদ্ধতিতে পরিণত হয়। বীজ মাটির পাত্রে, বোতলে, পটে, টিনে, ড্রামে, প্লাস্টিকের ড্রামে, বস্তায় সংরক্ষণ করা হয়। তবে বীজ পাত্রের পছন্দ নির্ভর করে বীজের পরিমাণ, জাতের ওপর। যেমন- শাকসবজির বীজ হলে বোতলে/পটে, ডাল  তেল বীজের জন্য পট বা টিনে আর দানাদার বীজ হলে ড্রাম, মাটির পাত্র, পলিথিনের বস্তায় রাখা যায়। যে কোনো পাত্রেই রাখা হোক না কেন সাধারণ অনুসরণীয় কৌশল হলো বীজপাত্রের তলায় শুকনা/পরিষ্কার/ ঠান্ডা বালি রেখে তার ওপর ১০-১২% আর্দ্রতা সম্পন্ন বীজ রাখতে হবে। বীজ পাত্রের ঠিক মাঝখানে ১/২ খন্ড শুকনা চুন রাখতে হয়। তারপর বীজ পাত্রের মুখ পর্যন্ত বীজ রেখে তার উপরে বিশকাটালী/ নিম/ নিসিন্দা/ ল্যান্টানা/তামাকের শুকনা পাতার গুঁড়া মুখে রেখে বীজপাত্র বায়ুরোধী করে বন্ধ করে দিতে হবে। এভাবে বীজ পাত্রে বীজ একবছর পর্যন্ত ভালো থাকে। বীজ সংরক্ষণের সাথে সংশ্লিষ্ট আরো কিছু আবশ্যকীয় করণীয় হলো- ক. বীজ পাত্র মাটির হলে অগণিত অদৃশ্য ছিদ্রের মাধ্যমে বাতাস মাটির বীজপাত্রের ভেতরে ঢুকে বীজের মান নষ্ট করে দেয়। এ জন্য মাটির বীজপাত্র ভালোভাবে লেপে দিতে হবে। বীজপাত্র প্রলেপ দেয়ার জন্য আলকাতরা, গাবের রস, যে কোনো বাজারি রঙ, রান্নার পুরনো তেল, রেডি/ভেরেন্ডা তেল, পাকা বীচিকলার কাথ, কাঁঠালের খোসার কাথ, পাকা বেল এসব দিয়ে মাটির পাত্র লেপে দিয়ে শুকানো বীজ রাখতে হবে। এতে বীজ শতভাগ ভালো এবং বিশুদ্ধ থাকবে। খ. বীজপাত্রে বীজ যদি কম থাকে তাহলে বিভিন্ন সমস্যা হয়, বীজের মান কমে যায় সেজন্য পারতপক্ষে মুরী, শুকনা পরিষ্কার কাঠের গুঁড়া/ছাই/তুষ দিয়ে বীজপাত্রের খালি অংশ ভরে তারপর বায়ুরোধী করে মুখ বন্ধ করতে হয়। যদি কোনোভাবে বীজপাত্র ভরে দেওয়া সম্ভব না হয় তাহলে খালি জায়গাটিতে একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে আস্তে আস্তে বীজপাত্রের ঢাকনা দিয়ে মুখ বন্ধ করে দিতে হবে। এতে খালি জায়গার জীবাণু মরে গিয়ে বীজপাত্রের পরিবেশ বালাইমুক্ত রেখে বীজ মানসম্মত থাকে। গ. বীজপাত্রে বীজ রাখার কাজ শেষ হলে হয় শিকায় ঝুলিয়ে রাখতে হয় অথবা ওজনে ভারী হলে মাচা করে চাটাই, কাঠের ওপর এমনভাবে রাখতে হবে যেন বীজপাত্র মাটির বা ফ্লোরের সংস্পর্শে না লাগে। এতে মাটির আদ্রতায় বীজের কোনো ক্ষতি হয় না। বীজ সংগ্রহ ঃ মাঠ থেকে জমির সবচেয়ে ভালো ফলন সম্পন্ন অংশ বীজের জন্য নির্বাচন করতে হবে। ৮০ শতাংশের উপর পাকলে বীজ কাটার সময় হয়। রোদ্রউজ্জ্বল দিনে ফসল কেটে পরিষ্কার ভালো স্থানে উপযুক্ত উপকরণে মাচা/টেবিল/গাছের গুড়ি/ড্রাম এসবে আড়াই বাড়ি দিলে যে পরিমাণ বীজ আলাদা হয় সেগুলোই ভালো বীজ হিসেবে সংগ্রহ করতে হবে। আড়াই বাড়ির পর যেসব দানা ফসলের কান্ডের সাথে লেগে থাকে সেগুলো গরু/মহিষ বা পায়ে মুড়িয়ে আলাদা করে খাওয়ার জন্য রাখা যায়। এরপর ভালোভাবে   রোদে শুকিয়ে, নিখুঁতভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে। বীজ শুকানো হলো কিনা তার লাগসই পরীক্ষা হলো দাঁতের মধ্যে দিয়ে চাপ দিলে কটকট আওয়াজ করলে বা ধানের বীজ ডানহাতের বৃদ্ধ ও তর্জনীর মধ্যে দিয়ে কানের কাছে নিয়ে চাপ দিলে কট করে আওয়াজ হয়। এতে বুঝতে হবে ধানের আর্দ্রতা সংরক্ষণের পর্যায়ে এসেছে। তারপর শুকিয়ে ঠান্ডা করে উপযুক্ত পাত্রে সংরক্ষণ করতে হয়। মোটকথা বীজের জন্য সবকিছু আলাদা বিশেষত্ব অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

কুষ্টিয়ায় গেন্ডারী আখ চাষে স্বাবলম্বী হচ্ছেন চাষীরা

শরীফুল ইসলাম ॥ ‘সৃষ্টিকর্তার কুদরত লাঠির ভেতর শরবত’ এই লাঠিই এখন কৃষকসহ বেকার যুবকদের স্বাবলম্বী বা আত্মনির্ভরশীল করে তুলেছে। যাকে বলা হয় গেন্ডারী আখ বা গ্রামে গেন্ডারী কুসর নামে বেশী পরিচিত। অর্থকরী ফসল হওয়ায় তামাক অধ্যুষিত কুষ্টিয়ায় দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে সুগার মিল আখ চাষের পাশাপাশি গেন্ডারী আখ চাষের। নরম ও মিষ্টি রসের গেন্ডারী আখ খেতে সুস্বাদু হওয়ায় সাধারণ ভোক্তাদের কাছেও এর চাহিদা বেশী। কুষ্টিয়ায় ১ হাজার ১১৫ হেক্টর জমিতে মিল আখ চাষের পাশাপাশি ৩১৫ হেক্টর জমিতে গেন্ডারী আখের চাষ হয়েছে। এরমধ্যে মিরপুর উপজেলায় অন্যান্য উপজেলা থেকে বেশী চাষ হয়েছে। গেন্ডারী আখ চাষে ক্ষতিকর দিক কম থাকায় এবং অর্থকরী ফসল হওয়ায় দিন দিন এ চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। করোনার এ দুঃসময়ে গেন্ডারী আখ চাষীরা খুচরা ও পাইকারীভাবে গেন্ডারী আখ বিক্রয় করে করোনা ক্রান্তিকাল পার করছেন। আর্থিকভাবে হয়েছেন অনেকে স্বাবলম্বী। আবার অনেক বেকার যুবক গেন্ডারী আখ চাষেও আগ্রহী হচ্ছেন। খুচরা বাজারে প্রতি পিস গেন্ডারী আখ বিক্রয় হচ্ছে ৩৫-৪০ টাকা করে। আবার কৃষকের জমি থেকে গেন্ডারী আখ সংগ্রহ করে খুচরা ব্যবসায়ীরা বিক্রয় করে করোনার এই দুঃসময়ে সংসার স্বচ্ছলতা ফিরিয়েছেন। দৌলতপুর উপজেলা বাজারের মহিদুল ইসলাম ইসলাম নামে এক খুচরা ব্যবসায়ী বিভিন্ন ধরণের ফল বিক্রির পাশাপাশি গেন্ডারী আখও বিক্রয় থাকেন। গেন্ডারী আখ লাভজনক উল্লেখ করে তিনি খন্ড খন্ড গেন্ডারী আখ বিক্রিয় করে লাভবান হওয়ার জানিয়েছেন। করোনা পরবর্তী সময়ে কৃষিই আশ্রয়স্থ উল্লেখ করে কৃষকরা অর্থকরী ফসল গেন্ডারী আখ চাষে ঝুঁকেছে এবং প্রতি বিঘা জমি থেকে ৫ লক্ষ টাকার গেন্ডারী আখ বিক্রয় করে অনেকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার কথা জানিয়েছেন মিরপুর কৃষি কর্মকর্তা রমেশ চন্দ্র ঘোষ।  মিল আখ চাষের পাশাপাশি গেন্ডারী আখ চাষ বৃদ্ধি পেলে কৃষকদের আর্থিক চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ক্ষতিকর তামাক চাষ হ্রাস পাবে। এমনটাই মনে করেন এ অঞ্চলের কৃষক ও কৃষি বিভাগ।

আয় বৃদ্ধি ও পারিবারিক পুষ্টির নিশ্চয়তা বিধানে

দেশী মুরগী প্রতিপালন বিশেষ অবদান রাখতে পারে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ আয় বৃদ্ধি ও পারিবারিক পুষ্টির নিশ্চয়তা বিধানে দেশী মুরগী প্রতিপালন বিশেষ অবদান রাখতে পারে । আমরা সবাই বলে থাকি দেশী মুরগির উৎপাদন কম। কিন্তু বিভিন্ন পর্যায়ে বিশেষ লক্ষ্য এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করে দেশী মুরগীর উৎপাদন দ্বিগুনের ও বেশী পাওয়া সম্ভব। দেশী মুরগি থেকে লাভজনক উৎপাদন পওয়ায় বিভিন্ন কৌশল এখানে বর্ননা করা হয়েছে। গবেষনায় দেখা গেছে দেশী মুরগির ডিম উৎপাদন বৃদ্ধি করে বাজারে বিক্রি করার চেয়ে ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা তৈরী করে ৮-১২ সপ্তাহ বয়সে বিক্রি করলে লাভ বেশী হয়। এক সঙ্গে ১০-১২ টি মুরগি নিয়ে পালন শুরু করতে হবে। তবে কখনও ১৫-১৬ টির বেশী নেওয়া ঠিক না । তাতে অনেক অসুবিধাই হয় । শুরুতে মুরগিগুলোকে কৃমি নাষক ঔষধ খাওয়ানোর পরে রানীক্ষেত রোগের টীকা দিতে হবে। মুরগির গায়ে উকুন থাকলে তাও মেরে নিতে হবে। প্রতিটি মুরগিকে দিনে ৫০-৬০ গ্রাম হারে সুষম খাদ্য দিতে হবে। আজকাল বাজারে লেয়ার মুরগির সুষম খাদ্য পাওয়া যায় । তা ছাড়া আধা আবদ্ধ এ পদ্ধতিতে পালন করলে লাভ বেশী হয়। মুরগির সাথে অবশ্যই একটি বড় আকারের মোরগ থাকতে হবে। তা না হলে ডিম ফুটানো যাবে না । ডিম পাড়া শেষ হলে মুরগি উমে আসবে। তখন ডিম দিয়ে বাচ্চা ফুটানোর ব্যবস্থা নিতে হয়। এক সঙ্গে একটি মুরগির নীচে ১২-১৪ টি ডিম বসানো যাবে। খামারের আদলে বাঁশ, কাঠ খড়, বিচলী তাল নারকেল সুপারির পাতা দিয়ে যত কম খরচে স্থানান্তর যোগ্য ঘর তৈরী করা সম্ভব তা করা যায়। ঘর তৈরীর সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন সঠিক মাপের হয় এবং পর্যাপ্ত আলো বাতাস চলাচল করতে পারে । বানানোর পর ঘরটিকে বাড়ীর সবচেয়ে নিরিবিলি স্থানে রাখতে হবে । মাটির উপর ইট দিয়ে তার উপর বসাতে হবে। তাহলে ঘর বেশী দিন টিকবে । ফুটানোর ডিম সংগ্রহ ও সংরক্ষন ঃ- আরেকটি প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ন কাজ। ডিম পাড়ার পর ডিম সংগ্রহের সময় পেন্সিল দিয়ে ডিমের গায়ে তারিখ লিখে ঠান্ডা জায়গায় সংরক্ষন করতে হবে। ডিম পাড়া শেষ হলেই মুরগি কুঁচো হবে। গরম কালে ৫-৬ দিন বয়সের ডিম এবং শীতকালে ১০-১২ দিন বয়সের ডিম ফুটানোর জন্য নির্বাচন করতে হবে। দেশী মুরগি পালন কৌশলের বিশেষ নজর দেয়ার ধাপ সমূহঃ- উমে বসানো মুরগির পরিচর্যা করতে হবে। মুরগির সামনে পাত্রে সবসময় খাবার ও পানি দিয়ে রাখতে হবে যাতে সে ইচ্ছে করলেই খেতে পারে । তাহলে মুরগির ওজন হ্রাস পাবেনা এতে বাচ্চা তোলার পর আবার তাড়াতাড়ি ডিম পাড়া আরম্ভ করবে।  ডিম বসানোর ৭-৮ দিন পর আলোতে রাতের বেলা ডিম পরীক্ষা করলে বাচ্চা হয় নাই এমন ডিমগুলো  চেনা যাবে এবং বের করে আনতে হবে। বাচ্চা হওয়া ডিমগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে দিতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন মুরগি বিরক্ত না হয়। প্রতিটি ডিমের গায়ে সমভাবে তাপ লাগার জন্য দিনে কমপেক্ষ ৫-৬ বার ওলট পালট করে দিতে হবে। বাতাসের আর্দ্রতা কম হলে বিশেষ করে খুব গরম ও শীতের সময় ডিম উমে বসানোর ১৮- ২০দিন পর্যন্ত কুসুম গরম পানিতে হাতের আঙ্গুল ভিজিয়ে পানি ¯েপ্র করে দিতে হবে।  ফোটার পর ৫-৬ ঘন্টা পর্যন্ত মাকে দিয়ে বাচ্চাকে উম দিতে হবে। তাতে বাচ্চা শুকিয়ে ঝরঝরে হবে। বাচ্চা ফুটার পর বাচ্চার পরিচর্যা ও ডিম পাড়া মুরগির পরিচর্যা ঃ- গরমকালে বাচ্চার বয়স ৩-৪ দিন এবং শীতকালে ১০-১২ দিন পর্যন্ত বাচ্চার সাথে মাকে থাকতে দিতে হবে। তখন মুরগি নিজেই বাচ্চাকে উম দিবে। এতে কৃত্রিম উমের (ব্র“ডিং ) প্রয়োজন হবে না। এ সময় মা মুরগিকে খাবার দিতে হবে। মা মুরগির খাবারের সাথে বাচ্চার খাবার ও কিছূ আলাদা করে দিতে হবে। বাচ্চাগুলো মায়ের সাথে খাবার খাওয়া শিখবে। উপরোক্ত বর্নিত সময়ের পর মুরগিকে বাচ্চা থেকে আলাদা করতে হবে। এ অবস্থায় বাচ্চাকে কৃত্রিম ভাবে ব্র“ডিং ও খাবার দিতে হবে। তখন  থেকেই বাচ্চা পালনের মত বাচ্চা পালন পদ্ধতির সব কিছুই পালন করতে হবে। মা মুরগিকে আলাদা করে লেয়ার খাদ্য দিতে হবে। এ সময় মা মুরগিকে তাড়াতাড়ি সুস্থ হওয়ার জন্য পানিতে দ্রবনীয় ভিটামিন দিতে হবে। মা মুরগি ও বাচ্চা এমনভাবে আলাদা করতে হবে যেন তারা দৃষ্টির বাহিরে থাকে। এমন কি বাচ্চার চিচি শব্দ যেন মা মুরগি শুনতে না পায়। তা না হলে মা ও বাচ্চার ডাকা ডাকিতে কেউ  কোন খাবার বা পানি কিছুই খাবে না। আলাদা করার পর অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে গেলে আর কোন সমস্য থাকে না। প্রতিটি মুরগিকে এ সময় ৮০-৯০ গ্রাম লেয়ার খাবার দিতে হবে। সাথে সাথে ৫-৭ ঘন্টা চড়ে বেড়াতে দিতে হবে। প্রতি ৩-৪ মাস পর পর কৃমির ঔষধ এবং ৪-৫ মাস পর পর আর. ডি. ভি . টীকা দিতে হবে। দেশে একটি মুরগি ডিম পাড়ার জন্য ২০ -২৪দিন সময় নেয় । ডিম থেকে বাচ্চা ফুটানোর জন্য ২১ দিন সময় নেয় । বাচ্চা লালন পালন করে বড় করে তোলার জন্য ৯০-১১০ দিন সময় নেয় । ডিম থেকে এ ভাবে (৯০-১১০ দিন ) বাচ্চা বড় করা পর্যন্ত একটি  দেশী মুরগির উৎপাদন চক্র শেষ করতে স্বাভাবিক অবস্থায় ১২০- ১৩০ দিন সময় লাগে। কিন্তু মাকে বাচ্চা থেকে আলাদা করার ফলে এই উৎপাদন চক্র ৬০ -৬২ দিনের মধ্যে সমাপ্ত হয়। বাকি সময় মুরগিকে ডিম পাড়ার কাজে ব্যবহার করা যায় । এই পালন পদ্ধতিকে ক্রিপ ফিডিং বলে । ক্রিপ ফিডিং পদ্ধতিতে বাচ্চা পালন করলে মুরগিকে বাচ্চা পালনে  বেশী সময় ব্যায় করতে হয় না। ফলে ডিম পাড়ার জন্য মুরগি বেশী সময় দিতে পারে। এই পদ্ধতিতে বাচ্চা ফুটার সংখ্যা বেশী হয় । দেখা  গেছে বাচ্চার মৃত্যুহারও অনেক কম থাকে। মোট কথা অনেক দিক দিয়েই লাভবান হওয়া যায়। এই পদ্ধতি বর্তমানে অনেকে ব্যবহার করে লাভবান হচ্ছেন।

 

সরকার দেশের চরগুলোতে কৃষির উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ গত কয়েক দশকে নদীভাঙন ও অন্যান্য কারণে সর্বস্ব হারানো মানুষ অবস্থান নিয়েছেন চরাঞ্চলে। শুধু বেঁচে থাকার জন্যই নির্জন ধু-ধু বালুচরে দলে দলে গড়ে তুলেছেন মাথাগোঁজার ঠাঁই।  সেখানে অনেক প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যদিয়ে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয় তাদের। নেই রাস্তাঘাট, নেই সুপেয় পানি ও সেচের পর্যাপ্ত সুবিধা। পরিবার পরিজন নিয়ে টিকে থাকার সংগ্রামে বসবাসের সুযোগ পেলেও  সেখানে তাদের জীবন যেন দুর্বিষহ সংগ্রামের। এক সময় চরের কৃষকরা মনে করলেন, চরে যদি কাশফুল জন্মে তাহলে শস্যও ফলানো যাবে। শুরু হলো সবজি ও ফসল ফলানোর পরীক্ষা-নীরিক্ষা। পরীক্ষা সফল প্রমাণিত হওয়ার পর প্রথম চরে বোনা হলো সরিষা, পরে ভুট্টা, ধনিয়া ও মরিচসহ বিভিন্ন সবজি শস্য ও মসলা। এভাবে কৃষকের প্রচেষ্টায়  দেশের একেকটি চর এখন যেন একেকটি শস্যভান্ডার। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার দেশের চরগুলোতে কৃষির উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ক্ষুদ্র ঋণ, কৃষিঋণ, বীজ ও সার সহায়তা পাচ্ছেন চরের কৃষকরা। এভাবেই গত প্রায় দুই দশকে সেসব চরাঞ্চলবাসিরা নিজেদের প্রয়োজনে চরের দৃশ্যপট এখন অনেকটাই পাল্টে দিয়েছেন। অথচ একদশক আগেও চরের মানুষ বলতে অতি দরিদ্রদের বোঝাতো। কারণ তখন তারা ছিল রিলিফ নির্ভর। এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে  গেছে। চরাঞ্চলের জমিতে চাষাবাদ হচ্ছে বিভিন্ন জাতের ফসল। জমি  তৈরি, বীজ বপন, পরিচর্যা কিংবা ফসল তোলার ব্যতিব্যস্ততা চরাঞ্চলের  নৈমিত্তিক চিত্র। এর ফলে বেশির ভাগ চরেই দেখা দিয়েছে কর্মচাঞ্চল্য। চরাঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামে শাক সবজির চাষ করে বহু পরিবার সচ্ছলতা এসেছে। শুধু ধান চাষের ওপর নির্ভরশীল কৃষিতে শাক-সবজির চাষ এনে দিয়েছে নতুন গতি। কৃষকদের জীবন-জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে কৃষির এই সফল বিবর্তন। দেশের প্রায় সব চরাঞ্চলেই সবজি ও ফসলের উৎপাদন বেশ ভালো। কিছু ফসলের বাম্পার ফলন এবং প্রচলিত ফসলের বাইরে নতুন ধরনের সবজি যেমন- ক্যাপসিকাম,  স্কোয়াস চাষে ব্যাপক সাফল্যে নতুন আশায় দিনবদলের স্বপ্ন দেখছেন চরাঞ্চলের জনগণ। দেশের সব চরাঞ্চলের উপযোগী ফসল চাষাবাদে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়নের প্রকল্প। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শীত মৌসুমে রংপুরে চরাঞ্চলের ৩৫ থেকে ৫০ ধরনের সবজি চাষ হচ্ছে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, রংপুর অঞ্চলের ৮ জেলায় প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ১৯ লাখ টন সবজি। প্রতি কেজির দাম ২০ টাকা হিসেবে ৪ হাজার কোটি টাকা আয় করবে এখানকার কৃষকরা।

কেঁচো কম্পোস্ট সার ব্যবহারে অধিক ফলন

কৃষি প্রতিবেদক ॥ উর্বর মাটিতে পাঁচ ভাগ জৈব পদার্থ থাকতে হয়। মাটির পানি ধারণক্ষমতা ও বায়ু চলাচল বাড়াতে পাঁচ ভাগ জৈব পদার্থ থাকার কথা থাকলেও বাংলাদেশের মাটিতে রয়েছে এক দশমিক আট থেকে দুই ভাগ। জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়াতে কম্পোস্ট সার, পচা আবর্জনা, সবুজ সারের  যেমন ভূমিকা, কেঁচো সারের ভূমিকাও তেমনি অসামান্য। উর্বর মাটিতে পাঁচ ভাগ জৈব পদার্থ থাকতে হয়। মাটির পানি ধারণক্ষমতা ও বায়ু চলাচল বাড়াতে পাঁচ ভাগ জৈব পদার্থ থাকার কথা থাকলেও বাংলাদেশের মাটিতে রয়েছে এক দশমিক আট থেকে দুই ভাগ। জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়াতে কম্পোস্ট সার, পচা আবর্জনা, সবুজ সারের যেমন ভূমিকা, কেঁচো সারের ভূমিকাও তেমনি অসামান্য। তরিতরকারির ফেলে  দেয়া অংশ, ফলমূলের খোসা, উদ্ভিদের লতাপাতা, পশুপাখির নাড়িভুঁড়ি হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা,  ছোট ছোট করে কাটা খড়কুটো খেয়ে কেঁচো জমির জন্য সার তৈরি করে। এ সার সব ধরনের ফসল ক্ষেতে ব্যবহার করা যায়। কী আছে কেঁচো সারে ঃ ‘ভার্মি কম্পোস্ট’ বা কেঁচোসারে মাটির পানি ধারণ করার ক্ষমতা ও মাটি নরম করার ক্ষমতা তো আছেই, এ ছাড়া আছে আটাশি দশমিক ৩২ ভাগ জৈব পদার্থ, এক দশমিক ৫৭ ভাগ নাইট্রোজেন, এক দশমিক ২৬ ভাগ বোরন-যেগুলো অন্যান্য  জৈব সারে এত বেশি পরিমাণে নেই। কেঁচোসার ব্যবহার করলে চাষের খরচ কম হয়। প্রাকৃতিক লাঙ্গল যে কেঁচো তারও সংখ্যা বাড়ে মাটিতে। উৎপাদিত ফসলের বর্ণ, স্বাদ, গন্ধ হয় আকর্ষণীয়। ফসলের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ে। সহজ উপায়ে কেঁচোসার উৎপাদন ঃ কেঁচোসার উৎপাদন করতে গভীর মাটিতে  যে ছাই রঙের কেঁচো পাওয়া যায় সেগুলো না নিয়ে বরং মাটির ওপর স্তুরে থাকা লাল রঙের কেঁচো খুবই ভালো। এ ছাড়া সার উৎপাদনের আলাদা কেঁচোও পাওয়া যায়। কেঁচো সার উৎপাদনের জন্য ছায়াযুক্ত স্থানে প্রথমে কোমর সমান গর্ত করে তাতে দুটো রিং স্লাব বসায়ে দিতে হয়। গর্তের তলায় শুকানো ঝরা মাটি দিয়ে কিছু অংশ ভরে দিতে হয়। তার ওপর বিছাতে হয় কুচি কুচি করে কাটা খড়কুটো, তার ওপর আবার ঝুরা মাটি। ঝুরা মাটির ওপর পচা আবর্জনার স্তর। আবর্জনার ওপর ঝুরা মাটির স্তুর দিতে হবে আরও একবার। এবার মুরগির বিষ্ঠার একটি স্তুর করে নিতে হয়। বিষ্ঠার ওপর আবার ঝুরা মাটি দিতে হয়। শেষের স্তরে গোবর। ঝড়-বাতাস আর বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচাতে ওপরে দিতে হবে ছাউনি। এভাবে তিন মাস রেখে দিলেই পাওয়া যাবে কেঁচো সার। অন্যভাবেও কেঁচো সার উৎপাদন করা যায়। এ ক্ষেত্রে ছায়াযুক্ত স্থানে পলিথিন ব্যাগে আবর্জনা রেখে দিতে হয়, যাতে আবর্জনা পচতে পারে। সাত-আট দিন পর পলিথিন বিছিয়ে দুটি রিং স্লাব পরপর সাজিয়ে তার ভেতর পচা এই আবর্জনা দ্বিগুণ পরিমাণ গোবরের সঙ্গে মিশিয়ে রেখে দিতে হয়। কেঁচো কম্পোস্ট ঃ মাটির লাল কেঁচো খড়কুটো, ফসলের অবশিষ্টাংশ, রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট এবং মাটির সমন্বয়ে যে জৈব সার তৈরি হয় তাকে বলা হয় কেঁচো কম্পোস্ট সার। এটি সহজ একটি পদ্ধতি যেখানে আবর্জনা দিয়ে ব্যবহার উপযোগী উৎকৃষ্ট জৈব সার তৈরি করা যায়।  কেঁচো কম্পোস্ট সার জমির এক কোণায়, গাছের নিচে এমনকি ঘরের ভেতর বড় বাক্সে তৈরি করা যায়। খোলা জায়গায়  তৈরি করতে হবে। মাটি ও জৈব আবর্জনার স্তুপের সাথে কেঁচো  মেশাতে হবে। এরপর স্তুপ ঢেকে রাখতে হবে। কেঁচো দ্রুত বৃদ্ধি লাভ করে এবং কয়েক মাসেই তা কেঁচো কম্পোস্ট সারে রূপ নেয়। ঘরের ভেতর বাক্সে তৈরি করতে হলে বাক্সের  ভেতর পুরনো খবরের কাগজ বিছিয়ে তা পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিতে হবে। তারপর জৈব মাটি বিছিয়ে দিয়ে কেঁচো ছেড়ে দিতে হবে। মাটি এবং তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে কেঁচো মারা  যেতে পারে এ জন্য বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কেঁচো কম্পোস্ট সারের উপকারিতা ঃ এটি ব্যবহারে উৎপাদন ও ফসলের গুণাগুণ বৃদ্ধি পায়। তুলনামূলকভাবে উৎকৃষ্ট ও বড় আকারের ফল বা সবজি পাওয়া যায়। মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ায়, ফলে কেঁচো সার ব্যবহারে সেচের পানি কম লাগে। ক্ষারীয় লবণাক্ত মাটিতেও চাষাবাদ সম্ভব। রোগ ও পোকা-মাকড়ের উপদ্রব কম হয়। জমিতে আগাছার প্রকোপ কম হয়। ফসলের বীজের অঙ্কুুরোদ্গম ক্ষমতা বাড়ে। অধিক কুশি, অধিক ছড়া ও দানা গঠন হয়। মাটির বুনট উন্নত হয়। রাসায়নিক সারের চেয়ে খরচ অনেক কম হয়। পরিবেশও দূষণমুক্ত থাকে। বৈশিষ্ট্য এ সারে গাছের অত্যাবশ্যকীয় ১৬টি খাদ্য উপাদানের ১০টিই বিদ্যমান। এ ছাড়া এর মধ্যে গাছের অত্যাবশ্যকীয় কয়েকটি হরমোন ও এনজাইম রয়েছে, যা গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও ফলের বর্ণ, গন্ধ, স্বাদসহ অন্যান্য গুণগত মান উন্নত রাখে। কেঁচো সার বীজের অঙ্কুরোদ্গমে সহায়ক। এ সার ব্যবহারে ফসলের উৎপাদন খরচ কমে। সব ফসলেই ব্যবহারযোগ্য। বেলে-দোআঁশ মাটিতে এর কার্যকারিতা বেশি। ফলদ গাছ বা উঁচু জমির ফসলে পর পর তিনবার কেঁচো সার ব্যবহার করলে ডিম থেকে উৎপন্ন কেঁচো ওই স্থানে নিজে থেকেই সার উৎপাদন করতে থাকে। ফলে পরবর্তী দু-তিনটি ফসলে সার ব্যবহার না করলেও চলে। পুষ্টিমান জৈব পদার্থ দিয়ে সাধারণ সার তৈরির পরিবর্তে কেঁচো সার তৈরি করলে এর পুষ্টিমান ৭ থেকে ১০ গুণ বাড়ে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটি, পানি ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের গবেষণাগারে রাসায়নিক বিশ্লেষণে  দেখা যায়, এর মধ্যে জৈব পদার্থ ২৮ দশমিক ৩২ ভাগ, নাইট্রোজেন ১ দশমিক ৫৭ ভাগ, ফসফরাস ১ দশমিক ২৬ ভাগ, পটাশিয়াম ২ দশমিক ৬০ ভাগ, ক্যালসিয়াম ২ ভাগ, ম্যাগনেসিয়াম দশমিক ৬৬ ভাগ, সালফার দশমিক ৭৪ ভাগ, আয়রন ৯৭৫ পিপিএম, ম্যাংগানিজ ৭১২ পিপিএম, বোরন ০.০৬ ভাগ, জিঙ্ক ৪০০ পিপিএম, কপার ২০ পিপিএম রয়েছে। ফসলে কেঁচো সারের ব্যবহার ঃ বৃষ্টিনির্ভর ফসল তিল, মুগ ছোলা, মাষকলাই,  জোয়ার, বাজরা, সরিষা এসব কম পুষ্টি চাহিদাসম্পন্ন ফসলে রাসায়নিক সার ছাড়াই একর প্রতি মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ কেজি কেঁচো কম্পোস্ট সার ব্যবহার করে অধিক ফলন পাওয়া যায়। সূর্যমুখী, বার্লি, ভুট্টা ও গম এসব ফসলে কৃষকরা সাধারণত হালকা সেচ, রাসায়নিক সার ব্যবহার করে থাকে। এ ক্ষেত্রে একরপ্রতি মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ কেজি কেঁচো কম্পোস্ট সার ব্যবহার করে অধিক ফলন পাওয়া যায়। আমাদের দেশের কৃষক ভাইরা কেঁচো কম্পোস্ট সার ব্যবহার করে কম খরচে অধিক ফলন ঘরে তুলতে পারেন। এতে জমি রাসায়নিক সারের হাত থেকে রক্ষা পাবে এবং উর্বরতা বজায় থাকবে। সাবধানতা পিঁপড়া, উইপোকা, তেলাপোকা, গুবরেপোকা, মুরগি ও বিভিন্ন পাখি কেঁচোর শক্র। এগুলো কোনো কীটনাশক দিয়ে মারা যাবে না। তবে হাউসের চারদিকে কীটনাশক  দেয়া যাবে। ব্যবহৃত গোবরের সঙ্গে ছাই, বালু, ভাঙা কাচ ইত্যাদি রাখা যাবে না। মুরগি ও পাখির আক্রমণ থেকে বাঁচানোর জন্য হাউসের ওপর ঢাকনা দিয়ে রাখবেন। কেঁচোকে জীবিত ও সক্রিয় রাখতে হাউসে বেশি পানি দেয়া যাবে না, আবার পানি শুকিয়ে ফেলাও যাবে না। চালনি দিয়ে চালার সময় হাউসে নির্দিষ্ট জাত ছাড়া অন্য জাতের কেঁচো থাকলে তা আর পরে সার তৈরিতে ব্যবহার করা যাবে না। লেখক ঃ ছিদ্দিকুর রহমান শাহীন।

 

বাংলাদেশের আবহাওয়া মাশরুম চাষের জন্য বেশ উপযোগী

কৃষি প্রতিবেদক ॥ পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও ঔষধি গুণ সম্পন্ন মাশরুম। কেউ  কেউ একে ব্যাঙের ছাতাও বলে থাকে। বর্তমানে খাবার হিসেবেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে মাশরুম। রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেল উপাদান। দেহের রোগ- প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি সহায়ক অত্যাবশ্যকীয় ১০টি অ্যামাইনো এসিডও বিদ্যমান। চর্বির পরিমাণ খুবই কম থাকে। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ও ক্যান্সারসহ বেশকিছু মারাত্মক রোগব্যাধি প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে মাশরুম। নানা ধরনের খাবারও তৈরি করা হচ্ছে মাশরুম থেকে। বাংলাদেশের আবহাওয়া মাশরুম চাষের জন্য বেশ উপযোগী। পুষ্টির ঘাটতি পূরণ, দারিদ্র বিমোচন, মাথাপিছু আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে মাশরুম চাষ। বেকার তরুণ -তরুণীদের কর্মসংস্থানেরও দুয়ার খুলে দিতে পারে বিভিন্ন ভালো জাতের মাশরুম চাষ। এছাড়াও অনেকে বাসা বা বাড়ির আনাচে -কানাচে ছোট পরিসরে অনেকটা শখের বশেও মাশরুম চাষ করে থাকে। জানা যায়, সারাবিশ্বে প্রায় ১৪ হাজার প্রজাতির মাশরুম রয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার প্রজাতি খাবার উপযোগী এবং ৭০০ প্রজাতি ঔষধি হিসেবে খ্যাত। বাকিগুলোর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৪০০ প্রজাতির মাশরুমই বিষাক্ত। সম্প্রতি জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কেন্দ্র হতে ৯ প্রজাতির মাশরুম চাষের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। সারা বছরই চাষ করা যায়, এমনকি চাষের ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে কম। এছাড়াও সাভারে অবস্থিত এ মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে বিনামূল্যে মাশরুম চাষের ওপর প্রশিক্ষণও দেয়া হয়। এ কার্যক্রম চলে প্রতিদিন সকাল ৯টা হতে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। প্রতিদিন প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য আগ্রহীরা ভিড় জমান। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সামনেই রয়েছে বাহারি মাশরুম বিক্রির জন্য ছোট একটি হাট। মাশরুম বিক্রেতারা জানান, প্রতিদিন সাধারণত একেকজন প্রায় ১৫-২৫ কেজি মাশরুম বিক্রি করে থাকেন। প্রত্যেকের মাসিক আয় ২৫-৩০ হাজার টাকা। মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের উপ-পরিচালক ড. নিরদ চন্দ্র সরকার বলেন, আমরা বাংলাদেশে চাষের উপযোগী ৯টি জাত অবমুক্ত করেছি। মাশরুম চাষের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। প্রয়োজনীয় পুষ্টি চাহিদা পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে মাশরুম চাষ।

চারা লাগানোর এক মাস পর লেটুস পাতা খাওয়ার উপযুক্ত হয়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ শাকসবজি রান্না করতে গিয়ে আমরা এর পুষ্টি উপাদান নষ্ট করে ফেলি। তবে কোনো কোনো শাকসবজি রয়েছে সেগুলো কাঁচা খাওয়া সম্ভব। লেটুস এমনি একটি শাক, যা সালাদ হিসেবে টমেটো, পেঁয়াজ, মরিচ এসবের সঙ্গে ব্যবহার হয়। ফলে এর পুষ্টি থাকে অটুট। লেটুস বেশ পুষ্টিকর। মুখে রুচিও বাড়ায়। এর প্রতি ১০০ গ্রাম পাতায় ৯৯০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন বিদ্যমান। এ ছাড়া ভিটামিন-বি ০.২২ মিলিগ্রাম, ভিটামিন-সি ১০ মিলিগ্রাম, শর্করা ২.৫ গ্রাম, আমিষ-২.১ গ্রাম, চর্বি ০.৩ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৫০ মিলিগ্রাম এবং লৌহ আছে ২৪ মিলিগ্রাম। এ সত্ত্বেও এ দেশে এর আবাদ খুবই সীমিত। অথচ প্রতিটি বসতবাড়ির আঙ্গিনায় লেটুস চাষের রয়েছে যথেষ্ট সুযোগ। এতে পারিবারিক চাহিদা পূরণ হবে। পাশাপাশি বিক্রি করে পাওয়া যাবে নগদ অর্থ।
চাষের সময় ঃ শীতপ্রধান দেশে সারা বছর এর চাষ হলেও এ দেশে কেবল রবি মৌসুমে অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত দফায় দফায় বীজ বোনা যেতে পারে। জাত ঃ লেটুসের বিভিন্ন জাত রয়েছে। এসবের মধ্যে বারি লেটুস-১, বিগ বোস্টন, হোয়াইট বোস্টন, প্যারিস হোয়াইট, গ্র্যান্ড ব্যাপিড, নিউইয়র্ক-৫১৫, ইম্পিরিয়াল-৫৪, সিম্পসন, কিং ক্রাউন, কুইন ক্রাউন, ডার্ক, গ্রিন, গ্রেটলেক উল্লেখযোগ্য। চাষের নিয়ম ঃ চাষের জন্য জমি ভালোভাবে প্রস্তুত করে নিতে হবে। এসব জমিতে সরাসরি বীজ বোনা যায়। আবার বীজতলায় বপন করে উপযুক্ত বয়সের চারা (এক মাস বয়সের) মূল জমিতে রোপণ করতে হয়। এক্ষেত্রে লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ১২ ইঞ্চি এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব রাখতে হবে ৮ ইঞ্চি। এজন্য শতাংশপ্রতি বীজ দরকার ৪ গ্রাম করে। তবে বীজতলায় বীজ প্রয়োজন হয় ২০ গ্রাম। লেটুসের বীজ খুব ছোট। তাই বপনের সময় বীজের সঙ্গে মাটির কণা বা ছাই ব্যবহার করা উচিত।
সার প্রয়োগ ঃ লেটুস চাষে শতাংশ প্রতি যে পরিমাণ সার প্রয়োজন তা হচ্ছে- গোবর ২০ কেজি খৈল ৮০০ গ্রাম, ইউরিয়া ৪০০ গ্রাম, টিএসপি ১০০ গ্রাম, পটাশ ১০০ গ্রাম। এগুলোর মধ্যে গোবর চাষের প্রথম দিকে এবং শেষ চাষের সময় টিএসপি ও পটাশ সার মাটির সঙ্গে ভালো করে মিশিয়ে দিতে হয়। তবে ইউরিয়াকে সমান দু’ভাবে ভাগ করে দু’কিস্তিতে (চারার বয়স ১০ দিন এবং বয়স ২০ দিন) উপরিপ্রয়োগ করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে।
পরিচর্যা ঃ আশানুরূপ ফলন পেতে জমিকে সর্বদাই আগাছামুক্ত রাখতে হবে। মাটিতে রস না থাকলে সেচ দেয়া জরুরি। তেমনিভাবে পানি জমে থাকলে সঙ্গে সঙ্গে নিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। গাছ বড় হওয়ার সাথে সাথে এর গোড়ায় মাটি তুলে দিতে হয়। প্রয়োজনে চারা পাতলা করা বাঞ্ছনীয়। এতে একদিকে যেমন গাছ ঠিকভাবে বেড়ে উঠবে, পক্ষান্তরে উত্তোলিত সবজি ব্যবহার করা যাবে।
বালাই ব্যবস্থাপনা ঃ লেটুসের পাতায় কখনো কখনো ‘ছাতা’ রোগ দেখা দিতে পারে। এ রোগের লক্ষণ হচ্ছে- গাছের পাতা নুইয়ে পড়া এবং পাতার অগ্রভাগ পুড়ে যাওয়া। এমন হলে আক্রান্ত গাছ অবশ্যই ধ্বংস করে ফেলতে হবে। তবে বীজ ও মাটি শোধন করে এ রোগ থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব। পোকার মধ্যে জাবপোকা খুব ক্ষতিকর। এরা গাছের পাতার রস চুষে খেয়ে ফেলে। এ ছাড় পোকার মলদ্বার থেকে এক ধরনের তরল পদার্থ বের হয়ে, যা পাতায় আটকে ‘সুটি মোল্ড’ নামে এক প্রকার কালো বর্ণের ছত্রাক জন্মায়। ফলে আক্রান্ত অংশের সালোকসংশ্লেষণ ক্রিয়া বিঘিœত হয়। তাই এদের দমন করতেই হবে। তবে পোকার সংখ্যা কম হলে হাত দিয়ে ধরে মেরে ফেলা উত্তম। আক্রমণ বেশি হলে অনুমোদিত কীটনাশক সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ওষুধ ছিটানোর ১৫ দিনের মধ্য সবজি খাওয়া উচিত নয়। এজন্য পারতপক্ষে কীটনাশক ব্যবহার না করাই উচিত।
ফসল সংগ্রহ ঃ চারা লাগানোর এক মাস পর লেটুস পাতা খাওয়ার উপযুক্ত হয়। ওই সময় সম্পূর্ণ গাছ তোলাই উত্তম, তবুও বসতবাড়ির এক একটি গাছ থেকে প্রয়োজনীয় পাতা সংগ্রহ করে ব্যবহার করা যেতে পারে। শতাংশ প্রতি এর গড় ফলন ৪০ কেজি।

অধিক লাভ হওয়ার কারণে থাই পেয়ারার চাষ সারা দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বিভিন্ন ভিটামিন সমৃদ্ধ এবং বহুবিধ গুণের জন্য পেয়ারাকে বলা হয় আপেল। তাছাড়া পেয়ারা খুবই জনপ্রিয় একটি ফল। বাংলাদেশের সর্বত্র কম-বেশি পেয়ারার চাষ হয়। দেশে বর্তমানে কমবেশী ২৫ হাজার হেক্টর জমি থেকে প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন পেয়ারা উত্পন্ন হয়। কয়েক বছর আগেও শীতকালে পেয়ারা পাওয়া যেত না। দেশের কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে এখন শীতকালেও সুস্বাদু পেয়ারা পাওয়া যাচ্ছে। থাইল্যান্ড থেকে আসা থাই পেয়ারা-৫ ও থাই পেয়ারা-৭ অধিকতর গবেষণার পর এখন চাষ হচ্ছে সারা দেশে। বেশি ফলন ও ভালো দামের জন্য এ পেয়ারা এরই মধ্যে দেশের ফল চাষীদের মধ্যে বিপুল আগ্রহ সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছে। বরিশাল, রাজশাহী, নাটোর, বগুড়া ও ঈশ্বরদীর অনেক ফলচাষী থাই পেয়ারা চাষ করে তাদের আর্থ- সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছেন। অধিক লাভ হওয়ার কারণে এ জাতের পেয়ারার চাষ সারা দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। থাই জাতের পেয়ারার মধ্যে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট জাতটি হলো থাই পেয়ারা-৭। এগুলোর আকার গোলাকার, রঙ হলদে সবুজ এবং সাইজে বেশ বড়। প্রতিটি পেয়ারার ওজন গড়ে ৪০০ থেকে ৭০০ গ্রাম। গাছের উচ্চতা ২.৫ থেকে ১০ মিটার। ফুল ফোটা থেকে ফসল সংগ্রহ পর্যন্ত ৯০ দিন সময় লাগে। এ জাতের বড় বৈশিষ্ট্য হলো ঃ বারো মাসই এর গাছ থেকে পেয়ারা পাওয়া যায়, বীজ কম ও নরম, অন্যান্য পেয়ারার থেকে স্বাদেও বেশি মিষ্টি ও কচকচে। বসতবাড়ির আঙিনায়, বাড়ির ছাদে বা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে এ জাতের পেয়ারা চাষ করা যায়। এ জাতের পেয়ারার চাহিদা বেশী থাকায় বর্তমানে দেশের বিভিন্ন শহরে ১২০- ১৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত মানসম্পন্ন উদ্যান প্রকল্প থাই পেয়ারার চারা উৎপাদন করে বিক্রয় করে থাকে। এ জাতটি চাষের জন্য আমাদের দেশের মাটি ও আবহাওয়া খুবই উপযোগী। দেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত সরকারি হার্টিকালচার সেন্টার, ব্র্যাক নার্সারিসহ বিভিন্ন নার্সারিতে এই পেয়ারার চারা পাওয়া যায়। চাষ পদ্ধতি ঃ অন্যান্য জাতের পেয়ারার মতোই জ্যৈষ্ঠ-আশ্বিন মাস পর্যন্ত থাই পেয়ারা-৭ এর চারা রোপণ করা যায়। এ পেয়ারা চাষের জন্য নিকাশযুক্ত বেলে দো-আঁশ মাটিই উত্তম। বংশবৃদ্ধির জন্য বীজ থেকে চারা বা গুটি কলম ব্যবহার করা উচিত। ৪ী৪ বা ৩ী৩ মিটার দূরত্ব ছকে এ জাতের পেয়ারার চারা রোপণ করতে হয়। রোপণের কয়েক সপ্তাহ আগে ৫০ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য, ৫০ সেন্টিমিটার প্রস্থ ও ৫০ সেন্টিমিটার চওড়া গর্ত খনন করতে হবে। চারা রোপণের ১৫-২০ দিন পূর্বে প্রতিটি গর্তের মাটির সঙ্গে চারা ২০-২৫ কেজি পচা গোবর সার, ১৫০ গ্রাম টিএসপি ও ১৫০ গ্রাম এমওপি সার মিশিয়ে দিতে হবে। তার পর সার মিশ্রিত মাটি দ্বারা গর্ত ভরাট করে গর্তের ঠিক মাঝখানে চারাটি রোপণ করতে হবে। চারা রোপণের পর গর্তের চারদিকে মাটি দ্বারা উঁচু করে বেঁধে দিতে হবে, যাতে বাইরের পানি এসে গাছের গোড়ায় না জমে। গাছটি যাতে বাতাসে হেলে না পড়ে সেজন্য বাঁশের খুঁটির সঙ্গে হালকাভাবে বেঁধে দিতে হবে। মাটিতে রসের অভাব হলে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। পেয়ারা গাছ থেকে অধিক ফলন পেতে পাঁচ বছরের নিচের একটি গাছে বছরে পচা গোবর ২০ থেকে ২৫ কেজি, ইউরিয়া ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম, টিএসটি ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ও এমওপি ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম এবং পাঁচ বছরের ওপরের প্রতিটি গাছে প্রতি বছর পচা গোবর ২৫ থেকে ৩০ কেজি, ইউরিয়া ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম, টিএসপি ৪৫০ থেকে ৫৫০ গ্রাম, এমওপি ৪৫০ থেকে ৫৫০ গ্রাম সার ব্যবহার করতে হবে। উল্লিখিত পরিমাণ সার সমান দুইভাগে ভাগ করে বছরের ফেব্র“য়ারি-মার্চ এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে দুই কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। সার প্রয়োগের পর প্রয়োজনে সেচ দিতে হবে। অনেক সময় জিংকের অভাবে পাতার শিরায় ক্লোরোসিস দেখা যায়। সেক্ষেত্রে ৮০ লিটার পানিতে ৪০০ গ্রাম জিঙ্ক ও ৪০০ গ্রাম চুন মিশিয়ে গাছে ¯েপ্র করতে হবে। পেয়ারা সংগ্রহের পর ভাঙা, রোগাক্রান্ত ও মরা শাখা-প্রশাখা ছাঁটাই করে ফেলতে হবে। পেয়ারা গাছ প্রতি বছর প্রচুর সংখ্যক ফল দিয়ে থাকে। গাছের পক্ষে সব ফল ধারণ সম্ভব হয় না। তাই মার্বেল আকৃতির হলেই ঘন সন্নিবিষ্ট ফল ছাঁটাই করতে হবে। গ্রীষ্ম বা বর্ষা মৌসুমে গাছে বেশী ফল না রাখাই ভালো। এ জাতের পেয়ারা যেহেতু পুরো বছর জুড়ে ফল দেয়, তাই শীত মৌসুমের ফলন ভালো হলে চাষী বেশী লাভবান হবে। রোগ বালাই ঃ ছাতরা পোকা, সাদা মাছি পোকা, ফল ছিদ্রকারী পোকা ও মাছি পোকাসহ বিভিন্ন রকমের পোকা দ্বারা পেয়ারার গাছ আক্রান্ত হয়। এসব পোকা-মাকড় দমনের জন্য সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করতে হবে। যেমন-মাটিতে পড়ে থাকা পোকা বা আক্রান্ত ফল কুড়িয়ে ধ্বংস করা, ফেরোমোন ফাঁদ ও বিষ টোপ ব্যবহার করা। মার্বেল আকার হলে পেয়ারা পলি দিয়ে মুড়ে দেয়া ইত্যাদি। সাদা মাছি দমনের জন্য প্রতি লিটার পানিতে পাঁচ গ্রাম ডিটারজেন্ট পাউডার মিশিয়ে গাছে ¯েপ্র করা যেতে পারে। আর অন্যান্য পোকা দমনের জন্য পেয়ারা গাছে ১০ থেকে ১৫ দিন পর পর দুই থেকে তিনবার সিমবুশ বা মেলাথিয়ন জাতীয় কীটনাশকের যে কোনো একটি প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২৫ মিলি মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে। এছাড়া পেয়ারা গাছে অ্যানথ্রাকনোজ রোগ দেখা দিলে প্রথমে পেয়ারার গায়ে ছোট ছোট বাদামি রঙের দাগ দেখা দেয়। দাগগুলো ক্রমান্বয়ে বড় হয়ে পেয়ারার গায়ে ক্ষতের সৃষ্টি করে। আক্রান্ত ফল পরিপক্ব হলে অনেক সময় ফেটে যায়। এ রোগ দমনের জন্য গাছের নিচে ঝরে পড়া পাতা ও ফল সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। গাছে ফুল ধরার পর টপসিন-এম প্রতি লিটার পানিতে দুই গ্রাম মিশিয়ে ১৫ দিন অন্তর ¯েপ্র করতে হবে। ভালোভাবে যতœ নিলে একটি পূর্ণবয়স্ক গাছে গ্রীষ্মকালে ৬০ থেকে ৭০ কেজি এবং হেমন্তকালে ৫০ থেকে ৬০ কেজি ফলন পাওয়া যায়।

সবজি চাষে বোরন সারের ব্যবহার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশে যত ধরনের সবজি চাষ হয়, এসব সবজির মধ্যে সব সবজিরই সব ধরনের সারের প্রয়োজন সমান নয়। যেসব সার ফসলের জন্য কম লাগে কিন্তু একেবারেই ব্যবহার না করলে বা নিধাির্রত মাত্রায় ব্যবহার না করলে ফসলের জন্য সমস্যার সৃষ্টি হয়। সেই সারগুলোর মধ্যে বোরন অন্যতম। বোরন সার পরিমিত মাত্রায় ব্যবহারে যেমন ফলন বাড়ে তেমনি অতিরিক্ত ব্যবহারে ফসলের ক্ষতি হয় ও ফলন মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। তাই বোরন সার ব্যবহারে খুবই সতকর্ থাকতে হয়। তেল ফসল হিসেবে বাংলাদেশে সরিষার চাষই প্রধান। প্রতি বছর প্রায় সাড়ে তিন লাখ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়ে থাকে। যা থেকে প্রায় সাড়ে চার লাখ মে. টন সরিষা বীজ উৎপাদন হয়। যা থেকে প্রায় পৌনে দুই লাখ মে. টন ভোজ্য তেল পাওয়া যায়। পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, সরিষা চাষে বোরন সার ব্যবহার করলে শতকরা ১৯.৮-২৩.০ ভাগ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধি পায়। এজন্য হেক্টরপ্রতি মাত্র ১৫০-২০০ টাকা খরচ করে অতিরিক্ত প্রায় ৭-৮ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। শীত মৌসুমে যেসব সবজি চাষ করা হয় সেগুলোর মধ্যে কিছু কিছু সবজির বোরনের চাহিদা লক্ষ্য করা যায়। এসব সবজির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ বেগুন, টমেটো, ফুলকফি, বাঁধাকপি, শিম, বরবটি, মটরশুঁটি, মূলা, আলু, গাজর, শালগম, বীট, সরিষা শাক, পালং শাক, পেঁয়াজ ইত্যাদি। জমিতে মাটির উপরের স্তরের তুলনায় নিচের স্তরেই বোরন বেশি থাকে। বিশেষ করে বেলে বা বেলে দো-আঁশ মাটিতে সেচের পানির সঙ্গে বোরন চুঁইয়ে মাটির নিচের দিকে চলে যায়। এজন্য এধরনের মাটিতে বোরন সার প্রয়োগের চেয়ে পাতায় প্রয়োগ বেশি কাযর্কর। তবে অন্য ধরনের মাটিতে বিশেষ করে ভারী মাটি বা চুন মাটিতে বোরন বেশি লাগে। বোরন সার প্রয়োগ করা যায়। পাতায় প্রয়োগ করলে প্রতি লিটার পানিতে ১.৫-২.০ গ্রাম এবং মাটিতে প্রয়োগ করলে ৩-৪ কেজি বোরন সার প্রয়োজন হয়। পাতায় ¯েপ্র করলে বীজ বোনার বা চারা রোপণের ২০-২৫ দিন এবং ৪০-৪৫ দিন পর ¯েপ্র করতে হয়। বোরন পাতায় ¯েপ্র করার অসুবিধা হলোÑ অভাবজনিত লক্ষণ দেখা দেয়ার পর এটি যখন প্রয়োগ করা হয়, তখন ফসলের বেশ কিছু ক্ষতি হয়ে যায়। একটা ফসলে বোরন ব্যবহার করার পরের ফসলে ব্যবহার করতে হয় না। তৃতীয় ফসল চাষের সময় প্রয়োজন বুঝে আবার ব্যবহার করতে হয়।
বোরনের অভাবে বাড়ন্ত আলুগাছের ডগার পাতা পুরু হয় ও কিনারা বরাবর ভিতরের দিকে গুটিয়ে গিয়ে অনেকটা কাপের আকৃতি ধারণ করে। এই সব পাতা ভঙ্গুর হয়। আলুগাছের শিকড়ও গুটিয়ে যায়, গাছ দুবর্ল হয়। আলু ছোট আকারের হয়, খোসা খসখসে ও তাতে ফাটা ফাটা দাগ দেখা যায়। কখনো কখনো আলুর কন্দের ভেতরে বাদামি দাগ দেখা যায়। বোরনের অভাবে টমেটোর চারা গাছে সবুজ রঙের পরিবর্তে কিছুটা বেগুনি রং লক্ষ্য করা যায়। বাড়ন্ত টমেটোগাছের ডগার কুঁড়ি শুকিয়ে মরে যায়। পাতা এবং পাতার বৃন্ত পুরু ও ভঙ্গুর হয়। কান্ড খাটো হয়ে পুরো গাছ ঝোপালো হয়ে যায়। ফল বিকৃত হয় ও খোসা খসখসে হয়ে ফেটে যায়। বোরনের অভাবে বেগুনগাছের বৃদ্ধি কমে যায়। ফুল সংখ্যায় কম আসে এবং ফুল ঝরা বৃদ্ধি পায়। ফল আকারে ছোট হয় ও ফল ফেটে যায়। কখনো কখনো কচি ফল ঝরে পড়ে। বোরনের অভাবে শিম ও বরবটির নতুন বের হওয়া পাতা কিছুটা পুরু ও ভঙ্গুর হয়। পাতার রং গাঢ় সবুজ ও শিরাগুলো হলদে হয়ে যায়। শেষে পাতা শুকাতে শুরু করে, গাছে ফুল দেরিতে আসে ও শুঁটি বীজহীন হয়। বোরনের অভাবে ফুলকপির চারার পাতা পুরু হয়ে যায় এবং চারা খাটো হয়। ফুল বা কাডের্র উপরে ভেজা ভেজা দাগ পড়ে। পরে ওই দাগ হালকা গোলাপি এবং শেষে কালচে হয়ে ফুলটিতে পচন ধরে। পাতার কিনারা নিচের দিকে বেঁকে যায় ও ভঙ্গুর প্রকৃতির হয়। পুরনো পাতা প্রথমে সাদাটে এবং পরে বাদামি হয়ে কিছুটা উঁচু খসখসে দাগে পরিণত হয়। কাটলে আক্রান্ত অংশ থেকে এবং ফুলকপি রান্নার পর এক ধরনের দুগর্ন্ধ বের হয়। বাঁধাকপির মাথা বাঁধা শুরু হওয়ার সময় দেখা যায় যে মাথা বাঁধছে না এবং ভেতরটি ফাঁপা হয়ে যায়। একেবারে ভেতরের কচি পাতাগুলো বাদামি রঙের হয় এবং পচন ধরে। কান্ডের ভেতরের মধ্যাংশ ফাঁপা হয় ও পচে যায়। বোরনের অভাবে মরিচ বা মিষ্টি মরিচের কচি পাতা হলুদ হয়ে এবং ফুল বা কচি ফলও ঝরে পড়ে। গাছের বৃদ্ধি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বোরনের অভাবে সরিষার বীজ গঠন ঠিকভাবে হয় না। হেক্টরপ্রতি ১.৫ কেজি বোরন প্রয়োগ করলে সরিষার বীজ উৎপাদন প্রায় ৫৯% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে (হালদার ও অন্যান্য, ২০০৭)। জাত, মাটি, স্থান (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল) ও মাটিতে রসের তারতম্য অনুসারে বোরন সার হিসেবে পানিতে গুলে নিয়ে ¯েপ্র করতে হয়। পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করলে নিধাির্রত মাত্রার অধের্ক পরিমাণ সার প্রয়োজন হয়। এ জন্য ১০-১৫ দিন পর পর ২-৩ বার বোরন সার ¯েপ্র করা যেতে পারে। জমিতে সরাসরি বোরন সার প্রয়োগ করা যায়। সে ক্ষেত্রে টিএসপি, এমওপি, জিপসাম, জিংক অক্সাইড ও বোরন সারের সবটুকু এবং ইউরিয়ার অধের্ক পরিমাণ শেষ চাষের সময় মাটিতে প্রয়োগ করতে হয়। বাকি ইউরিয়া গাছে ফুল আসার সময় উপরি প্রয়োগ করে একবার পানি সেচ দিতে হয়। বোরন সার হিসেবে ব্যবহারের জন্য ফলিরিয়েল, সলুবোর, লিবরেল বোরন, আলফা বোরন ইত্যাদি পাওয়া যায়। এ ছাড়া দানাদার বোরিক এসিড ও বোরাক্স বা সোহাগা (সোডিয়াম টেট্রাবোরেট) বোরন সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
লেখক ঃ উদ্যান বিষেশজ্ঞ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রংপুর অঞ্চল, রংপুর।

হাইব্রিড ডালিয়ার কাটিং উতপাদন কৌশল

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ডালিয়ার কাটিং তৈরি করার বিষয়ে অনেকেই বর্ণনাসহ প্রকাশ করার জন্য অনুরোধ করেছেন। আজকের এই লেখা তাদের জন্য। এ সময়ে দেশে বেশ বৃষ্টি হচ্ছে। এই বৃষ্টি থেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডালিয়া ফুলের কাটিং তৈরি করে ফেলতে হবে। এসময়ে কাটিং তৈরি করতে পারলে তা আগাম ফুল দেবে। বিষয়টিকে সহজে বোঝার জন্য কয়েকটি ধাপে বর্ণনা করছি। প্রথম ধাপে মাতৃগাছ আগে থেকেই তৈরি করে নিতে হবে। ডালিয়াগাছ মাটির ওপর থেকে ৬-৮ ইঞ্চি রেখে কেটে দিতে হবে এবং ঘন ঘন কেটে কাটিং তৈরির উপযোগী করে নিতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে কাটিং কাটতে হবে ৩ ইঞ্চি বড় করে। কোনো একটা গিঁটের এক সুতো নিচ (৪ মিমি) থেকে বে¬ড দিয়ে কেটে নিতে হবে। এরপর ছোট দুটি পাতা এবং একটু বড় দুটি পাতা রেখে নিচের দিকের সব পাতা গোড়া থেকে কেটে ফেলতে হবে। এই কাটিং ছত্রাকনাশক মিশ্রিত পানিতে কিছুক্ষণ ডুবিয়ে নিতে হবে। দেশীয় ডালিয়ার চারা তৈরি করার জন্য রুমটিং হরমোনের তেমন প্রয়োজন হয় না তবে হরমোন দিতে পারলে বেশি শিকড় আসে ফলে গাছ দ্রুত বাড়ে ও ভালো ফুল দেয়। হাইব্রিড ডেকোরেটিভ ডালিয়া বিশেষ করে কেনিয়া জায়েন্ট গ্র“পের ডালিয়ার কাটিং তৈরি করার সময় রুমট হরমোন খুব জরুরি হয়ে পড়ে। কারণ এসব ডালিয়ার চারায় সহজে শিকড় আসতে চায় না। ভারত থেকে অবৈধ পথে আসা বিভিন্ন রুট হরমোন দেশের বিভিন্ন নার্সারিতে পাওয়া যায় (সুরডেক্স, রুমটেক্স, অরডিক্স ইত্যাদি)। এগুলো পাউডার আকারে থাকে। তৃতীয় ধাপে এই পাউডার এক চামচ নিয়ে তার মধ্যে সমপরিমাণ পানি দিয়ে একটা লেই তৈরি করে সেই লেইয়ের মধ্যে কান্ডের গোড়ার ১/২ (০.৫) ইঞ্চি পরিমাণ ডুবিয়ে নিয়ে শুকিয়ে নিতে হবে। চতুর্থ ধাপে কাটিং বসানোর মিডিয়া ডোমার বা সিলেট বালু হলে সবচেয়ে ভালো হবে। এই বালু টবে দিয়ে পানি দিয়ে ১০০% কমপ্যাকশন করে নিতে হবে। এরপর একটা কাঠি দিয়ে ০.৭৫-১.০ ইঞ্চি পরপর প্রায় ১ ইঞ্চি গভীর করে ছিদ্র করতে হবে। ছিদ্র করতে বলপেনের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। এরপর এই ছিদ্রতে কাটিং বসিয়ে দিতে হবে। পঞ্চম ধাপে কাটিং বসানোর পর পাতায় হালকা করে ¯েপ্র করে পানি দিতে হবে এবং ৬ ঘণ্টা পরে বালু ভাসিয়ে পানি দিয়ে টবটা একটু নাড়াচাড়া দিতে হবে যেন প্রত্যেকটা ডালের গোড়া শক্তভাবে বালুর সঙ্গে লেগে যায়। কাটিং রাখতে হবে ছায়ায়। শুষ্ক আবহাওয়ায় ২ ঘণ্টা পরপর কাটিংয়ে পানি ¯েপ্র করে দিতে হবে এবং দুদিন পরপর বালু ভিজিয়ে পানি দিতে হবে। এভাবে যতœ নিলে সাধারণত জাতভেদে ৮ থেকে ১২ দিনের মধ্যেই কান্ডে ভালোভাবে শিকড় চলে আসে। ষষ্ঠ ধাপে কাটিংয়ে শিকড় চলে এলে প্রথমে ছোট পটে (পোলার আইসক্রিমের বা ওয়ানটাইম কপি পট বা ওয়ানটাইম প¬াস্টিক গ¬াসে) চালুনি করা ৫০% মাটি এবং ৫০% পচা গোবর সারের মিশ্রণে বসিয়ে দিতে হবে। পটটি প্রথম ৩/৪ দিন ছায়ায় রাখতে হবে এরপর ২/৩ ঘণ্টা রোদ পড়ে এমন স্থানে রাখতে হবে। পানি দিতে হবে পরিমিতভাবে। এই পটে ১৫/২০ দিন পর্যন্ত রেখে গাছ একটু বড় করে তারপরে মূল বেড বা টবে লাগিয়ে দিতে হবে। কাটিং পটে পানি দেয়ার বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। বেশি পানি হলে গাছ পচে যাবে। এই কাটিংয়ে ৭ দিন পরপর কোনো ছত্রাকনাশক ¯েপ্র করতে হবে। এই ধাপগুলো অনুসরণ করলে যে কেউ ভালোমানের ডালিয়ার চারা তৈরি করতে পারবেন। লেখক ঃ আরিফ খান

মিরপুর উপজেলা প্রাণি সম্পদ অফিসের পরামর্শে

করোনাকালীন অবসরে হাঁসে সাফল্য যুবকদের

জাহিদ হাসান ॥ “করোনাকালীন কাজ হারানো কুষ্টিয়ার যুবক, ছাত্র, তরুণ উদ্যোতা, ব্যবসায়ী, চাকুরীজীবি, স্কুল শিক্ষক, শ্রমিক ও যুবদের অনেকেই সাফল্য পেয়েছেন হাঁসের খামার পালন করে। খুবই কম সময়ে অধিক লাভ পেয়ে তারা বেশ খুশি।  সেই সাথে করোনায় বাইরে কাজ করতে না পারায় অবসর সময়টুকু নষ্ট না করে বাড়ীতেই খামার করে তারা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। অনেকেই এই সময়টা বাড়ীতে নিরলস বসে কাটাচ্ছেন, আবার অনেকেই নিজেকে প্রতিষ্টিত করছেন নতুন রুপে।  স্থানীয়দের মতে, বেকার অলস সময়কে কাজে লাগাতে পারলে পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ছাড়াও রোধ হবে সামাজিক অবক্ষয়। কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমলা ইউনিয়নের নিমতলা এলাকার জিহাদ আলী। পেশায় একজন কাঠে মিস্ত্রি। করোনা’র শুরুতে অনান্য দোকানের মতো বন্ধ টানা প্রায় ২ মাস বন্ধ ছিলো তার কাঠের দোকানও। অভাবের সংসার, তার উপরে কাজ নেই। একসময় বাড়ী থেকে পরিবার নিয়ে চলে আসে শশুরবাড়ী পাশ্ববর্তী গ্রাম কচুবাড়ীয়াতে। সেখানে এসে হাঁস পালন শুরু করে। মাত্র ২ মাসেই সাফল্য  পেয়েছেন তিনি। ছোট্ট হাঁসের খামারটি এখন বেশ বড় করছেন। তার সাফল্য দেখে আরো দুজন হাঁসের খামার করছেন। জিহাদ আলী বলেন, “করোনার শুরুতে খুব কষ্ট করেছি। কাজ-কাম নেই। বাড়ীতে বসে থাকা। মাঠের কাজও পারিনা। তারপর একদিন ইউটিউব দেখতে দেখতে হাঁস পালন দেখি। সেখানে কিভাবে খামার করতে হয় সেটা দেখলাম। ঠিক করলাম আমিও হাঁসের খামার করবো। তবে হাঁস পালন সম্পর্কে তেমন ধারনা ছিলো না। যেটুকি ছিলো সেটা ইন্টারনেট থেকে নেওয়া। পরে মিরপুর উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা সোহাগ রানার সাথে যোগাযোগ করি। তিনি হাঁস পালন সম্পর্কে বিস্তারিত জানান।” তিনি বলেন, “মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার বামুন্দি থেকে মাত্র ১ দিনের ৪৫০টি খাকি ক্যাম্বেল জাতের নারী (মহিলা) হাঁসের বাচ্চা নিয়ে আসি। যার প্রতিটির দাম নিয়েছিলো ৩৫ টাকা। প্রথমে মাত্র ৫০ হাজার টাকা নিয়ে আমি হাঁসের খামারের শুরু করি। এর মধ্যে হাঁসের ঘর তৈরী করতে খরচ করি ৩৫ হাজার টাকার এবং বাচ্চা কিনে আনতে খরচ হয় ১৬ হাজার টাকা। হাঁসের বাচ্চাকে প্রথমে ফিড খাবার খাওয়াতাম। তারপর দিনে মাঠে চরাতাম যাতে খাবার কম লাগে। এবং দ্রুত বড় হয়। এখন গম, ভুট্টা, ধান, ধানের কুড়া, খুদ এসব খায়।” তিনি বলেন, “মাত্র ২ মাস ৮দিন বয়স এখন আমার খামারের হাঁসের। এখন বাজারে বিক্রি করতে গেলে ২৫০-৩০০ টাকা করে বিক্রি হবে। সাড়ে ৪ মাসে হাঁসগুলো ডিম দেওয়া শুরু করবে। একটি খাকি ক্যাম্বেল জাতের হাঁস প্রায় সারাবছর ডিম  দেয়। হাঁসের পরিচর্যার মধ্যে ৭দিন বয়সে ডাক কলেরা, ২১ এবং ৪৫ দিন বয়সে ডাক প্লেগ রোগের টিকা দিয়েছি। হাঁস পালন খুবই লাভজনক। যে কোন চাকুরী বা ব্যবসার চেয়ে খুবই কম সময়ে লাভবান হওয়া যায়।” জিহাদ বলেন, “খামারটায় এখন হাঁসগুলো খুবই কষ্ট করে। আর ভাবছি আরো হাঁসের বাচ্চা আনবো। কিন্তু টাকার জন্য হয়ে উঠছে না। লোনের জন্য কৃষি ব্যাংকে গিয়েছি। কিন্তু জমির কাগজ না থাকায় লোন দেয়নি। বাড়ীর জমি ছাড়া তো মাঠে কোন জমি নেই। খামার দেখেও লোন দিলো না।” জিহাদের এ সাফল্য দেখে তার কাছ থেকে হাঁস পালন পদ্ধতি জেনে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন নিমতলা এলাকার আরো দুজন বেকার যুবক। তারা হলেন সানারুল ও রিপন। ইতিমধ্যে হাঁসের খামার তৈরী করেছেন তারা। শুরুতে ২০০ করে হাঁসের বাচ্চা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। আমলা ইউনিয়নের খয়েরপুর এলাকার সুমন। তিনি ঢাকাতে একটি বে-সরকারী কোম্পানীতে ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে চাকুরী করতেন। করোনার কারণে বাড়ীতে চলে আসেন। বাড়ীতে বসে না  থেকে হাঁসের খামার করেন বেশ সাফল্য পেয়েছেন তিনি। সুমন জানান, “বাড়ীতে আসার পরে ভাবলাম বসে না থেকে কিছু একটা করি। বাড়ীর পাশে একটা পুকুর রয়েছে, পুকুরের পাড়েই হাঁসের জন্য ঘর করলাম। পুকুরসহ কিছু জমি তারের নেট দিয়ে ঘিরে ৬০০ খাঁকি ক্যাম্বেল জাতের হাস কিনে খামার শুরু করেছি। বর্তমানে আমার খামারে ৪৮ দিনের বয়সের হাঁস রয়েছে ৬০০টি, ১৯ দিনের হাঁস রয়েছে ১২০০টি এবং ৮ দিনের হাঁস রয়েছে ১০০টি। হাঁস পালন খুবই লাভজনক। অল্প দিনেই লাভবান হওয়া যায়।” সদরপুর ইউনিয়নের সদরপুর গ্রামের সাকিব শেখ। অর্থের অভাবে পলিটেনিক্যালের ৪র্থ বর্ষ থেকে সেখানে লেখাপড়া বাদ দেন। এখন তিনি সফল হাঁসের খামারী। সাকিব জানান, “অল্প পুজিতে খুব সহজেই হাঁস পালন করা যায়। আমরা  বেকার চার বন্ধু মিলে এই হাঁস পালন শুরু করেছি। আর এই করোনার সময়ে আমরা ৪শ হাঁস ৩০ টাকা পিচ হিসাবে কিনে ২ মাস পরে ২০০ টাকা হিসাবে বিক্রি করেছি। আবার নতুন করে ১০০ বাচ্চা এনেছি।” একই এলাকার সেলিম হোসেন। পড়াশোনা শেষ করে চাকুরীর আশা না করে হাঁস পালন করে সাবলম্বী হয়েছেন তিনি। সেলিম হোসেন জানান, “আমি হাঁস ও মাছের মিশ্র চাষ করেছি। এতে আমার হাঁসের বেশি খাবার দিতে হয়না, আবার মাছেরও বাড়তি খাবার কম লাগে। বর্তমানে আমি ২০ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে হাঁস-মাছের চাষ করছি। বর্তমানে আমার খামারে ১০৫০টি সাড়ে তিন মাস বয়সী হাঁস রয়েছে। যার প্রতিটির বাজার মুল্য ২-৩শ টাকা করে।” করোনার সময় শিক্ষা প্রতষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এ সুযোগে হাঁসের খামার করেন ঐ এলাকার মাদ্রাসা শিক্ষক হাবিবুর রহমান। শুরুতে দুজন মিলে ৩০০ হাঁসের বাচ্চা নিয়ে খামার করে। বেশ লাভবান হয়েছেন তারা বলেন জানান হাবিবুর রহমান। চিথলিয়া এলাকার যুবক সাগর আহম্মেদ। এইচএসসি পাশ করেছেন। বর্তমানে করোনার কারণে কলেজ বন্ধ রয়েছে। এই সুযোগটা বাড়ীতে বসে না থেকে হাঁসের খামার করে বেশ সাফল্য পেয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, “হাঁস খুবই দ্রুত বাড়ে। আর করোনার এই সময় বাড়ীতে বসে না  থেকে হাঁস পালন করা খুবই লাভজনক। আমি ৩মাস আগে ৩৫ টাকা পিস হিসাবে হাঁসের বাচ্চা কিনেছি। এখন সেগুলো দাম ৫০০ টাকা জোড়া।” তিনি বলেন, “হাঁসের খামারীরা অনেকেই অর্থ সংকটে ভোগেন। সরকারী আর্থিক সহায়তা পেলে বা স্বল্প সুদে ঋণ পেলে আমাদের খুবই ভালো হয়।” মিরপুর উপজেলা প্রাণি সম্পদ অফিস সুত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলায় মোট হাঁসের খামার রয়েছে ৫৭টি। খামার এবং বাড়ীতে প্রায় ৭৬ হাজার হাঁস পালন করা হচ্ছে। ২০১৯ সালে উপজেলায় ৩৩টি হাঁসের খামার ছিলো। যেখানে খামার এবং বাড়ীতে প্রায় ৪১ হাজার হাঁস পালন করা হয়েছিলো। এবছর রেকর্ড পরিমানে হাঁসের খামার বৃদ্ধি  পেয়েছে। উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. সোহাগ রানা জানান, “হাঁস পালন খুবই লাভজনক। মুরগি পালনের চেয়ে হাঁস পালনে সুবিধা অনেক  বেশি। বিশেষ করে খামারীদের পছন্দ খাঁকি ক্যাম্বেল হাঁস। এ জাতের একটি হাঁস বছরে ২৮০-৩০০ ডিম দেয়। বর্তমানে মিরপুর উপজেলার কর্মকহীন যুবক ও  বেকাররা  বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছেন এই হাঁস পালনে। করোনাকালীন সময়ে কর্মহীন ও যুবকরা অনেকেই হাঁসের খামার করে বেশ সাফল্য পেয়েছেন।”  তিনি আরো বলেন, “আমরা উপজেলা প্রাণি সম্পদ অফিস থেকে খামারীদের খামার সার্বক্ষনিক  দেখাশোনা করছি। তাদের পরামর্শ প্রদান করছি। সেই সাথে হাঁসের বিভিন্ন রোগের টিকা সরবরাহ করি।” কর্মক্ষম ছাত্র-যুবক বা করোনাকালীন সংকটে কর্মহীন হয়ে পড়া যুবকরা হতাশ না হয়ে হাঁস ও গবাদীপশু পালন করলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে তারা নিজেরাই স্বাবলম্বি হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম হবেন বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা।

দৌলতপুরে পিয়ারা চাষে আগ্রহ বেড়েছে কৃষকদের

শরীফুল ইসলাম ॥ পিয়ারা ভিটামিন সমৃদ্ধ একটি সুস্বাদু ফল। বছরের সবসময় এই পিয়ারা ফলের চাষ হলেও বর্ষা মৌসুমে এই ফলে পরিপূর্ণ থাকে হাট-বাজার। তাই ক্রেতারা পছন্দের পিয়ারা ফলটি ক্রয় করে বাড়ি নিতে ভুলেন না। পিয়ারা চাষের জন্য কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের মাটি অনুকুল হওয়ায় এখানকার কৃষকদের পিয়ারা চাষে আগ্রহ বেড়েছে। অর্থকরী ফল হওয়ায় স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছেন তারা। জেলায় প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরণের পিয়ারা ফলের চাষ হয়েছে। যার অর্ধেকই দৌলতপুরে। কম খরচে অধিক লাভ হওয়ার পাশাপাশি বছরের সবসময় এই ফলটি মানুষের শরীরের ভিটামিন ও পুষ্টি চাহিদা মিটিয়ে থাকায় বেকার যুবক থেকে শুরু করে কৃষকরাও এই পিয়ারা চাষে ঝুঁকেছেন। আবার কেউ চাকুরীর পাশাপাশি পিয়ারা চাষ করে আর্থিকভাবে হয়েছেন স্বাবলম্বী। দৌলতপুর উপজেলার জয়রামপুর গ্রামের সরকারী চাকুরীজীবী যুবক সামিউর রহমান চাকুরীর পাশাপাশি পিয়ারাফল চাষ করে হয়েছেন আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী। তিনি ১৩ বিঘা জমিতে পেয়ারার বাগান করেছেন। তিনি আরও জমিতে পিয়ারা চাষ সম্প্রসারন করার কথা জানিয়েছেন। আবার বাগান থেকে পিয়ারা ফল সংগ্রহ করে ব্যবসায়ীরাও হচ্ছেন লাভবান। কম পুঁজি বিনিয়োগ করে হাটে বাজারে তা বিক্রয় করে সংসারের স্বচ্ছলতাও ফিরেছে অনেকের। দৌলতপুর উপজেলা বাজারের ফল ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলাম বিভিন্ন ধরনের ফল বিক্রয়ের পাশাপাশি পেয়ারাও বিক্রয় করে থাকে। বর্তমানে তিনি প্রতি কেজি পেয়ারা ৪০ টাকা দরে বিক্রয় করছেন। পিয়ারা চাষে কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি পিয়ারার ফলন বৃদ্ধিতে চাষীদের সার্বিক সহায়তার কথা জানিয়েছেন দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এ কে এম কামরুজ্জামান। ডাক্তারদের পরামর্শ মতে করোনা প্রতিরোধে ও এন্টিবডি তৈরীতে পিয়ারা ফল কার্যকরী। তাই বর্তমান এই দুঃসময়ে পিয়ারা চাষ বৃদ্ধির করে সবার ক্রয় সীমার মধ্যে রাখা জরুরী। এমনটাই মনে করেন এ অঞ্চলের সর্বসাধারণ।

পোল্ট্রি ও মাছের খাদ্য হিসেবে শামুক চাষ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ শিক্ষিত যুবকরা মাছ, হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগল চাষে জড়িত হলে শুধু যে বেকার সমস্যার সমাধান হয় তা নয়, চাষাবাদ পদ্ধতিরও বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। মাছচাষে অনেকেই শুরু করেছেন শামুকের ব্যবহার। নিজ খামারেই তারা শামুক থেকে হাঁস বা মাছের খাদ্য তৈরি করছেন। এতে তার বাজারজাত পোল্ট্রি ও মৎস্য খাদ্য ব্যবহারের পরিমাণ কমেছে। ফলে পোল্ট্রি ও মাছচাষের ব্যয়ও কমে এসেছে। এ ছাড়া শামুকের  তৈরি খাবার খাওয়ালে পোল্ট্রি ও মাছের স্বাদও ভালো হয়। অন্যদিকে বিজ্ঞানীরা  পোল্ট্রি ও মাছচাষে শামুকের ব্যবহার সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। এ ছাড়া পোল্ট্রি ও মাছচাষে শামুকের তৈরি খাবার ব্যবহার বাড়লে দেশে ‘মিট অ্যান্ড বোন’-এর আমদানি অনেকাংশে কমে যাবে, যা  বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একজন মাছচাষি তার ক্ষুদ্র প্রযুক্তির ব্যবহার করে শামুক থেকে মাছের অন্যতম উপকরণ প্রোটিন উৎপাদন করতে পারে। মাছচাষির উৎপাদিত  প্রোটিনে কোনো রাসায়নিক প্রভাব থাকার সুযোগ নেই। আমাদের দেশে মাছচাষে  প্রোটিনের উৎস হিসেবে যে শুঁটকি ব্যবহার করা হয়, তা সংরক্ষণের জন্য প্রচুর পরিমাণে নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হয়, যা মানব শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তবে শামুকে কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে না। ‘সুস্বাস্থ্যের জন্য’ শামুকচাষে গুরুত্ব দেয়া দরকার। কুড়া, খৈল, শামুকের গুঁড়ো, ভিটামিন, লবণ শ্রমিক ও মেশিন চার্জ মিলিয়ে শামুক দিয়ে তৈরি এক কেজি মাছের খাবারের মূল্য সাড়ে ১১ টাকার মতো। অথচ বাজারে মাছের খাবারের মূল্য প্রতি কেজি ১৮ থেকে ২০ টাকা। ৪০-৪৫ দিনে ১২০ শতাংশ পুকুর থেকে সঠিক ব্যবস্থাপনায় দুই হাজার কেজি শামুক আহরণ সম্ভব। প্রতি কেজি শামুকের গড় উৎপাদন ব্যয় হয় মাত্র পাঁচ টাকা মতো। বাংলাদেশে ছোট দেশীয় শামুক চাষ সম্প্রসারণ ও সঠিক বাজারজাতকরণের মধ্যদিয়ে মাছ সম্পদের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। এতে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত মিট অ্যান্ড বোনের ওপর চাপ কমবে। মৎস্য বিজ্ঞানীরা যা বলেন শামুক চাষ এবং এর থেকে মাছের খাবার তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় জড়িত আছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহফুজুল হক রিপন। তিনি বলেন, পুকুরে শামুকচাষ এবং তা থেকে খাবার তৈরি করে অনেকেই সাফল্য পেয়েছেন। তারা দেখেছেন শামুক  থেকে খাদ্য তৈরি করলে মাছের খাবার বাবদ ব্যয় অর্ধেকে নেমে আসে। তিনি বলেন, যদি মাছচাষে ব্যাপকভাবে শামুকের তৈরি খাবার ব্যবহার করা হয়, তাহলে বিদেশ থেকে মাছের খাদ্য ‘মিট অ্যান্ড বোন’ আমদানি অনেকাংশে কমে যাবে। এতে  দেশের লাভ, চাষির লাভ। ড. মাহফুজুল হক রিপন বলেন, তার ধারণা, শামুক  থেকে উৎপাদিত খাদ্য মাছ বেশি খায়। কারণ এ খাবার অনেকটাই প্রাকৃতিক। শামুক চাষ কৌশল ঃ  ১২০ শতাংশের পুকুরে প্রতি শতাংশ হিসেবে এক কেজি  গোবর, এক কেজি  খৈল ও ২৫০ গ্রাম ইউরিয়া পানিতে ভালোভাবে মেশাতে হবে। এ মিশ্রণ সমান চার ভাগে ভাগ করে তিন দিন অন্তর পানিতে ছিটিয়ে দিতে হবে। এতে পুকুরের পানির রং যখন গাঢ় সবুজ হবে, তখন বুঝতে হবে পুকুরটি শামুক চাষের উপযোগী হয়েছে। এরপর খালবিল বা পুকুর থেকে শামুক সংগ্রহ করে প্রতি শতাংশ হিসেবে ২৫০ গ্রাম শামুক পুকুরের চারদিকে ছিটিয়ে দিতে হবে। পরে ১০  থেকে ১৫ দিনের মধ্যে শামুক ব্যাপকভাবে বংশবিস্তার করবে। এরপর ৩৫ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ শামুক পাওয়া যাবে। অর্থাৎ ১২০ শতাংশ পুকুর থেকে ৪০-৪৫ দিনের মধ্যে প্রায় দুই হাজার কেজি ছোট শামুক উৎপাদন সম্ভব। শামুকের খাবার হিসেবে প্রতি শতাংশ হিসেবে ২৫০ গ্রাম গোবর, ২৫০ গ্রাম খৈল এবং ১০০ গ্রাম ইউরিয়া মেশানো কম্পোস্ট তিন দিন পরপর পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে। পুকুর  থেকে শামুক তুলে চালের কুড়ার সঙ্গে মিশিয়ে তাজা শামুককে প্রথমে খাদ্য ভাঙানোর পিলেট মেশিনের মাধ্যমে গুঁড়ো করা হয়। এগুলো পরে রোদে শুকানোর পর খৈল ভাঙানোর মেশিনের মাধ্যমে ভাঙিয়ে মাছের খাবার প্রস্তুত করা হয়।

তুলা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ আঁশ জাতীয় ফসল

কৃষি প্রতিবেদক ॥ সারা বিশ্বে তুলা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ আঁশ জাতীয় ফসল। এদেশে তুলা উৎপাদনের যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও এখন পর্যন্ত এদেশে তুলা উৎপাদনের পরিমান তেমন বেশি নয়। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের সক্রিয়তায় বর্তমানে তুলা উৎপাদনের জমির পরিমান বৃদ্ধি পাচ্ছে। তুলা চাষের উপযোগী জমি ঃ তুলা চাষের জন্য উৎকৃষ্ট মাটি হল দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ। তবে পর্যাপ্ত জৈবপদার্থ সমৃদ্ধ যেকোন মাটিতেই তুলার চাষ করা যায়। খুব বেশি বেলে বা কর্দমকণা সমৃদ্ধ মাটি তুলা চাষের জন্য উপযুক্ত নয়। যেসব জমিতে বৃষ্টির পানি দাঁড়িয়ে থাকে না বা স্বাভাবিক বন্যার পানি উঠে না এরূপ জমি তুলা চাষের জন্য নির্বাচন করতে হবে। যে জমি স্যাঁতসেঁতে, ছায়াযুক্ত এবং যেখানে বৃষ্টির পানি ২-৬ ঘন্টার মধ্যে নেমে যায় না সেরূপ জমি তুলা চাষের জন্য নির্বাচন করা উচিত নয়। মাটির পিএইচ মান ৬.০-৭.৫ হওয়া উত্তম। মাটি বেশি অম্লীয় হলে জমিতে চুন প্রয়োগ করতে হবে। জমি তৈরি ঃ আমাদের দেশে বর্তমানে উন্নত পদ্ধতিতে তুলা চাষ করা হচ্ছে এবং এই সময়কাল হল বর্ষাকাল। বর্ষার অবস্থা বুঝে মাটিতে ‘জো’ থাকা অবস্থায় ৩-৪টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরা ও সমতল করে জমি তৈরি করতে হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পাহাড়িয়া অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে তুলা চাষ করা হয়। পক্ষান্তরে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে তুলার চাষ করা হয়। দেশের যে সমস্ত অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমান কম, সে সমস্ত অঞ্চলে শ্রাবণের মাঝামাঝি থেকে ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে জমি চাষ করে বীজ বপন করা হয়। এদেশের রংপুর-দিনাজপুর এলাকায় শ্রাবণ মাসের মধ্যেই বীজ বপন করা হয় এবং অন্যান্য সমতল অঞ্চলে ভাদ্র মাসে জমি তৈরি করে বীজ বপনের উপযুক্ত করা হয়। বীজ বপনের সময় আগাম শীত এলাকায় ( বিশেষ করে রংপুর দিনাজপুর এলাকা) শ্রাবণ মাস হতে ভাদ্রের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে অবশ্যই বীজ বপনের কাজ শেষ করতে হবে। পাহাড়িয়া এলাকায় বর্ষা তীব্র আকারে শুরুর ১৫/২০ দিন পূর্বে (জমিতে ‘ জো’ থাকা অবস্থায়) বীজ বপন করা উত্তম। অর্থাৎ খরা মৌসুমে তুলা আবাদের জন্য জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে বীজ বপন করতে হবে। উত্তরবঙ্গ ও পাহাড়িয়া এলাকা ছাড়া অন্যান্য এলাকায় শ্রাবণের মাঝামাঝি হতে ভাদ্রের মাঝামাঝি পর্যন্ত বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। তবে মধ্য শ্রাবণের দিকে বীজ বপন উত্তম। যদি কোথাও বিশেষ কারনে বীজ বুনতে দেরি হয় তবে তা অবশ্যই ভাদ্রের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। জাত ঃ তুলা চাষের জন্য আমেরিকান জাতের নিম্নবর্ণিত জাতসমূহ বেশি চাষাবাদ হয়ে থাকে: সিবি-৫: জাতটির পাতা কিছুটা শুয়াযুক্ত বিধায় জ্যাসিড পোকার আক্রমণ প্রতিরোধী। তবে বোলওয়ার্ম ও ব্লাইট রোগের প্রতি সংবেদনশীল। জাতটি উচচ জিওটি সম্পন্ন। এ জাতটি যশোর অঞ্চলের বৃহত্তর যশোর ও কুষ্টিয়া জেলায় চাষাবাদের উপযোগী। সিবি-৯: জাতটি কিছুটা শুয়াযুক্ত বিধায় জ্যাসিড প্রতিরোধী। বোল সাইজ বড় এবং উচচ ফলনশীল। তুলা চাষের আওতাধীন অধিকাংশ জেলায় চাষের জন্য উপযোগী। জাতটি অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ মেয়াদী। গাছের গঠন দূর্বল প্রকৃতির হয়ে থাকে, ফলে অধিক ঝড়ে গাছ ভেঙ্গে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। সিবি-১০: জাতটি অপেক্ষাকৃত আগাম। এ জাতটি অন্যান্য ফসল অর্থাৎ সাথী ফসলের সাথে চাষাবাদ সুবিধাজনক। আগাম বপন করলে এ জাতের তুলা ফসল উঠিয়ে নাবী গম, ভূট্টা, আলু প্রভৃতি রবি ফসল চাষ করা যায়। যশোর ও রংপুর অঞ্চলের জেলা সমুহে চাষের উপযোগী। সিবি-১১: জাতটি আগাম। এ জাতের পাতা ওকরা জাতীয় এবং লিফ এরিয়া কম। পোকা মাকড়ের আক্রমণ প্রতিরোধী হওয়ায় ফসল উৎপাদন খরচ কম, ফলন বেশি। জাতটি উত্তরাঞ্চলে চাষাবাদের জন্য উপযোগী। সিবি-১২: জাতটি আগাম, রোগ প্রতিরোধী তবে বোল রটের আক্রমণ কিছুটা হতে পারে। জ্যাসিড ও এফিডের আক্রমণ হলেও চর্বনকারী পোকা ( যেমনঃ বোলওয়ার্ম, স্পটেড বোলওয়ার্ম এবং স্পোডোপটেরা) এর আক্রমণ প্রতিহত করতে পারে। জাতটি উচচ ফলনশীল। ফলন বেশি (৩.৩-৪.৫) যশোর অঞ্চলে চাষাবাদের জন্য উপযোগী। রূপালী-১ হাইব্রিডঃ গণচীনে উদ্ভাবিত হীরা হাইব্রিড রূপালী-১ এর জীবনকাল ১৬৫-১৭০ দিন, জিওটি ৪১%, আঁশ মিহি ,লম্বা ও মজবুত, অগাম জাত, ডাল ভেঙ্গে পড়ে না, স্পটেড বোলওয়ার্ম এর আক্রমন খুব একটা পরিলক্ষিত হয় না, ১০০% বোল থেকে তুলা পাওয়া যায়। সুপ্রিম সীড কোম্পানী লিমিটেড কর্তৃক এই জাতটি বাজারজাত হচ্ছে। বিঘা প্রতি ফলন ১৪-১৫ মণ। ডি.এম-১ হাইব্রিডঃ জাতটি গণচীন থেকে আমদানী করা হয়েছে। জীবনকাল ১৫০-১৫ দিন, জিওটি ৪২% এর বেশী, ডাল ভেঙ্গে পড়ে না, আঁশ মিহি, লম্বা ও মজবুত স্পটেড বোলওয়ার্ম এর আক্রমন তেমন একটা পরিলক্ষিত হয় না? জাতটি লালতীর কোম্পানী কর্তৃক বাজারজাত করা হচ্ছে। ফলন বিঘা প্রতি ১৪-১৫ মণ। এছাড়াও পাহাড়ী অঞ্চলে পাহাড়ী তুলা-১ ও পাহাড়ী তুলা-২ নামে উচ্চ ফলনশীল তুলার চাষ হয়ে থাকে। বীজ প্রক্রিয়াজাতকরন ঃ বপনের সুবিধার জন্য তুলাবীজ ৩-৪ ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে নিয়ে তা ঝুরঝুরে মাটি বা শুকনো গোবর অথবা ছাই দিয়ে এমনভাবে ঘষে নিতে হবে যেন আঁশগুলো (ফাঁজ) বীজের গায়ে লেগে না থাকে এবং বীজ একটা হতে অন্যটা আলাদা হয়ে যায়। এছাড়া লঘু সালফিউরিক এসিড দিয়ে বীজ আঁশ মুক্ত করেও বপন করা যায়। এতে বীজের গায়ে লেগে থাকা রোগ জীবানু ও পোকার ডিম নষ্ট হয়ে যায়। বীজের হার ও বপনের পদ্ধতি ঃ বীজের হার: তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব ওপি জাতের ক্ষেত্রে প্রতি একরে প্রায় ৩ কেজি এবং হাইব্রিড বীজের ক্ষেত্রে প্রতি একরে ১.৫-১.৮ কেজি বীজ দরকার হয়। বপন পদ্ধতি ঃ উত্তর-দক্ষিন লাইন করে সারিতে বীজ বপন করা উত্তম। হাত লাঙল দিয়ে হালকাভাবে সারি টেনে অনুমোদিত সার প্রতি সারিতে ভাল করে নিয়ে তা প্রয়োগ করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। এরপর নির্ধারিত দূরত্ব ১.২৫ সেঃ মিঃ থেকে ২.৫ সেঃ মিঃ গভীরে ৩/৪টি বীজ বুনে তা ঢেকে দিতে হবে। সিবি – ১ সারির দূরত্ব – ১০০ সেঃ মিঃ ও গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৫০-৬০ সেঃ মিঃ। অন্য সকল জাত সারির দূরত্ব – ৯০-১০০ সেঃ মিঃ ও গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৪৫-৫০ সেঃ মিঃ। অতিবৃষ্টিজনিত কারন বা অন্য প্রতিকূল আবহাওয়ায় জমি চাষ করা সম্ভব না হলে এবং মাটি খুব ভিজে থাকলে ডিবলিং পদ্ধতিতে সারিতে বীজ পুঁতে দিতে হবে। এই পদ্ধতিতে অনুমোদিত সার গর্তে প্রয়োগ করে ৩/৪টি বীজ নির্ধারিত দূরত্বে বপন করতে হবে। অনেক সময় শ্রাবন-ভাদ্র মাসে জমিতে আউশ ধান বা পাট থাকে কিংবা প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারনে জমি পানিতে প্লাবিত থাকে, যে অবস্থায় বীজ বপন সম্ভব নয়। এরূপ অবস্থায় পলিব্যাগে চারা উৎপন্ন করে ২০-৩০ দিন বয়সের চারা রোপণ করতে হবে। সার প্রয়োগঃ তুলা চাষের জমি উর্বর হওয়া বাঞ্ছনীয়। উর্বরতা মান কম হলে জমিতে হেক্টর প্রতি ৫-৬ টন গোবর সার বা কম্পোস্ট সার প্রয়োগ করতে হবে। এরূপে জৈব সার প্রয়োগ করা হলে জমিতে তুলনামূলকভাবে কম রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হয়। এছাড়া জৈব সার প্রয়োগে জমিতে গৌণ পুষ্টি উপাদানের চাহিদাও পূরন হয়। মাটির পিএইচ মান ৬.৫-এর কম হলে জমিতে হেক্টর প্রতি ২ টন চুন প্রয়োগ করতে হবে (বীপ বপনের ১ মাস পূর্বে বপন করতে হবে)। জৈব সার জমি তৈরির প্রথম দিকে প্রয়োগ করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। জমির মাটি যদি এঁটেল প্রকৃতির বা লাল মাটি হয় তবে উক্ত ০.৭৫ অংশ সমান দু’ভাগে ভাগ করে চারার বয়স ২০-২৫ দিন ও ৫০-৬০ দিন এর সময় পার্শ্ব প্রয়োগ ভিত্তিতে প্রয়োগ করা উত্তম। সার পার্শ্ব প্রয়োগের পূর্বে তুলা গাছের সারির পার্শ্বে (৫/৭ সেঃমিঃ দূরে) হাত লাঙল দিয়ে হালকা নালা কাটতে হবে। এই নালায় টানাভাবে সার প্রয়োগ করার পর মাটি দ্বারা নালা পুনরায় ঢেকে দিতে হবে। পরিচর্যা (ক) পাতলাকরণ ঃ চারা গজানোর ১০ দিন পর প্রথমবার প্রতিগর্তে ২টা ভাল চারা রেখে অবশিষ্ট চারাগুলো তুলে ফেলতে হবে। চারার বয়স ২০/২৫ দিন হলে দ্বিতীয়বার প্রতিগর্তে একটি সুস্থসবল মোটা চারা রেখে বাকিগুলো তুলে ফেলতে হবে। (খ) নিড়ানিঃ প্রতিবার চারা পাতলা করার সময় আগাছা নিড়িয়ে ফেলতে হবে। গাছের গোড়ার মাটির উপরের স্তরে যদি শক্ত আস্তরন হয় তবে তা আগাছা নিড়ানোর সময় ভেঙ্গে দিতে হবে। আগাছা বেশি হলে সর্বাধিক ৩ বার আগাছা নিড়িয়ে দিতে হবে। (গ) সেচ-নিষ্কাশনঃ রবি মৌসুমে মাটির আদ্রতা কম থাকতে পারে। মাটির রস আছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করে ২-৩ বার সেচ দিতে হবে। বর্ষা মৌসুমে তুলা চাষ করলে কখনো কখনো জলাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে। এরূপ অবস্থা দেখা দিলে দ্রুত জলাবদ্ধতার অবসান ঘটাতে হবে।(ঘ) পোকামাকড় দমন ও রোগ দমনঃ পোকামাকড়ের মধ্যে বোল ওয়ার্ম তুলার প্রধান শক্র। গাছের বয়স ৩/৪ সপ্তাহ হলে এই পোকার কীড়া গাছর কান্ড (উপরের দিকের অংশ) ছিদ্র করে ঢুকে পড়ে ও কচি অংশ খেতে থাকে। সেজন্য ডগা নিস্তেজ হয়ে পড়ে ও পরে শুকিয়ে যায়। পোকার উপদ্রব বেশি হলে এরা ফুল ও ফল আক্রমন করে। ফলে ফুল-ফল ঝরে পড়তে থাকে। পোকার আক্রমণের শুরুতে আক্রান্ত ডগা, কুঁড়ি বা ফল হাত দ্বারা কীড়া সমেত বেছে নিরাপদ দূরত্বে মাটির নিচে পুঁতে বা পুড়িয়ে এর উপদ্রব কমানো যায়। হাত বাছাইয়ের পর কীটনাশক ঔষধ ব্যবহার করা যেতে পারে। হেক্টর প্রতি ৩০০ মিঃ লিঃ রিপকর্ড/সুমিসাইডিন/সিমবুশ/ডেসিস২০-২৫ লিটার পানির সাথে মিশিয়ে (প্রতি ¯েপ্র মেশিনে ১২-১৫ মিঃলি ঔষধ) ভালভাবে পুরো গাছে ছিটিয়ে দিতে হবে। এই পোকা দমন করার জন্য আক্রমনের তীব্রতা অনুযায়ী ১৫-২০ দিন পর পর ৩-৪ বার ঔষধ ছিটানোর প্রয়োজন হতে পারে। তুলা ফসলের অন্যান্য পোকামাকড়ের মধ্যে জ্যাসিড, জাব পোকা ও তুলার পাতা মোড়ানো পোকার উপদ্রব দেখা যেতে পারে। এসব পোকার আক্রমন সহজভাবে নিয়ন্ত্রন করতে না পারলে অনুমোদিত ঔষধ মাত্রানুযায়ী প্রয়োগ করতে হবে। তুলা গাছে বেশ কয়েকটি রোগের প্রার্দুর্ভাব দেখা দিতে পারে; যথা- পাতা ঝলসানো, এনথ্রাকনোজ, নেতিয়ে পড়া, চারা ধসা ইত্যাদি। বীজবাহিত রোগের জন্য বীজ শোধন করে বীজ বপন করতে হবে। রোগাক্রান্ত চারা তুলে পুড়িয়ে ফেলা উত্তম। জমিতে পানিবদ্ধতা থাকতে দেয়া যাবে না। রোগাক্রমণের সম্ভবনা আছে এমন ক্ষেতে ৫% কপার অক্সিক্লোরাইড বা ২.৫% ডাইথেন-এমএ ৪৫ প্রয়োগ করা যেতে পারে।তুলা সংগ্রহ ঃ তুলা গাছের বোল ভালভাবে ফেটে বের হলে পরিষ্কার শুকনা দিনে বীজতুলা উঠাতে হয়। সাধারণত ৩ বারে ক্ষেতের তুলা উঠাতে হয়। প্রথমবার এমন সময় তুলা উঠাতে হবে যেন মোট ফলনের ৪০%-৫০% তুলা উঠানো যায়। দ্বিতীয় কিস্তি ও তৃতীয় কিস্তিতে যথাক্রমে ২৫% বা ৩০% এবং অবশিষ্ট তুলা উঠাতে হয়। সাধারণত প্রথমবারের তুলা ভাল হয়। তাই প্রথমবারের তুলা আলাদা রাখতে হয়। তুলা উঠানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে ময়লা, মরা পাতা ও পোকায় আক্রান্ত খারাপ অপুষ্ট তুলা যেন ভাল তুলার সাথে মিশে না যায়। ভাল তুলা পৃথক করে তা ৩/৪ দিন ভাল করে শুকিয়ে গুদামজাত করতে হবে। ফলন ঃ স্বভাবিক অবস্থায় কৃষকের সক্রিয়তা থাকলে হেক্টর প্রতি ১২-১৫ কুইন্টাল বীজ তুলা উৎপন্ন হয়। তবে যথাযথ উন্নত প্রযুক্তি অবলম্বনে তুলা চাষ করলে ফলন এর দ্বিগুন পাওয়া যায় বলে জানা গেছে। তুলা বলতে বীজ হতে উৎপন্ন আঁশকে বুঝায়। বীজের বহিঃত্বকের কিছু কোষের বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে এই আঁশের জন্ম হয়। আঁশগুলো এককোষ বিশিষ্ট এবং দু’ধরনের- ছোটগুলো ঋধুু এবং বড়গুলো লিন্ট নামে পরিচিত। এই লিন্ট ও ফাজসহ বীজকে বীজতুলা বলে। এটিই ফসল হিসেবে গাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় এবং রোদে শুকিয়ে বাজারজাত করা হয়। বস্ত্র শিল্পের প্রয়োজনে ক্ষেতের উৎপাদিত বীজতুলাকে জিনিং করা হয়। (জিনিং-এর অর্থ বয়ন কাজে ব্যবহৃতব্য লিন্টকে বীজতুলা থেকে আলাদা করা)। সাধারণভাবে জাত ও মানের বিভিন্নতায় বীজতুলা হতে ৩০%-৪০% লিন্ট সংগৃহীত হয় এবং এই হারকে জিনিং শতাংশ বা বলে। তুলা উৎপাদন করার জন্য ব্যবহৃত (বপন করা) বীজকে তুলা বীজ বলে যাতে লিন্ট থাকে না, ফাজ থাকে।

চাষ রোপণ মাড়াই সবই হচ্ছে যন্ত্রের সাহায্যে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ সময় আসে, সময় যায়। আর এই সময়ের পরিক্রমায় পরিবর্তন হয় অনেক কিছুই। সেই সাথে হারিয়ে যায় নিজস্ব কিছু ঐতিহ্য। সময় পরিবর্তনের পালাক্রমে গ্রাম বাংলার কৃষকের ঘরে ঘরে থাকা লাঙ্গল-জোয়াল, মই ও হালের গরু আজ বিলুপ্তির পথে। বর্তমান এই যান্ত্রিক যুগে পরিবর্তন এসেছে সব কিছুতেই। আর এই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বাদ পড়েনি কৃষি কাজও। প্রযুক্তির কল্যাণে কাঠের লাঙ্গলের জায়গায় এখন স্থান করে নিয়েছে ‘কলের লাঙ্গল’। কেবল জমি চাষই নয়, জমিতে ধানের চারা রোপণ থেকে শুরু করে জমিতে নিড়ানি, সার দেয়া, কিটনাশক ছিটানো, ধান কাটা, মাড়াইসহ শুকানোর কাজও হচ্ছে আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে। জানা যায়, আশির দশকের শুরু থেকে দেশের কৃষি কাজে ধীরে ধীরে আধুনিক সব যন্ত্রপাতির ব্যবহার শুরু হয়। বর্তমানে কৃষি কাজে প্রায় ৩০ প্রকারের আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানান মহাদেবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা একেএম মফিদুল ইসলাম। এসব যন্ত্রপাতির মধ্যে অন্যতম কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার। এই যন্ত্রের মাধ্যমে ফসল কাটা, খোসা থেকে ফসলের দানা আলাদা করার কাজ করা যায়। এছাড়া জমি চাষের জন্য পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর বা হুইল ট্রাক্টর, সার প্রয়োগ ও কিটনাশক ছিটানোর জন্য ব্রডকাস্ট সিডার, বীজ বপনের জন্য সিড ড্রিল, ধান/বীজ শুকানোর যন্ত্র ড্রায়ার, ধান, গম, ভুট্টা শুকানোর যন্ত্র ব্যাচ ড্রায়ার, শস্য কাটার যন্ত্র পাওয়ার রিপার মেশিন, ঝাড়ার যন্ত্র ইউনারসহ নানান যন্ত্রপাতি কৃষি কাজকে সহজ করে উন্নতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর এই উন্নতির ধারা অব্যাহত রাখতে বর্তমানে দেশীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশেই শুরু হয়েছে পাওয়ার টিলার, পাওয়ার রিপার, ইউনার, ইউডারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তৈরির কাজ। আর এই উন্নতির কারণে উপকৃত হচ্ছেন কৃষকরা। এ ব্যপারে স্থানীয় একাধিক কৃষক জানান, এক সময় চাষাবাদের প্রধান উপকরণ ছিল কাঠের লাঙ্গল-জোয়াল। এতে সময় ও খরচ উভয়ই বেশি হতো। এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে তা কমে এসেছে। আগে কৃষাণ দিয়ে এক বিঘা জমির ধান কাটতে খরচ হতো ২৫শ থেকে ৩ হাজার টাকা। আর আধুনিক যন্ত্র রিপার দিয়ে ধান কাটতে প্রতি বিঘায় খরচ হয় ৫-৭শ টাকা। এতে করে সময়ও কম লাগে। ফলে সঠিক সময়ে ধান বিক্রি করে প্রত্যাশিত মূল্য পাওয়া যাচ্ছে। তারা আরো জানান, গরু দিয়ে জমি চাষ করতে আগে বিঘা প্রতি ৭-৮শ টাকা লাগত যা আজ পাওয়ার টিলারের মাধ্যমে চাষ করে খরচ হচ্ছে ৪-৫শ টাকা। তাই সময় ও খরচ কম হওয়ায় আধুনিক এসব যন্ত্র ব্যবহারের দিকেই ঝুঁকছেন কৃষকরা। এ সময় তারা এসব আধুনিক যন্ত্রপাতির দাম কমানো দরকার বলেও জানান। লেখক ঃ বাবুল আখতার রানা

বাংলাদেশের আবহাওয়ায় বছরের যে কোনো সময় মিষ্টি কুমড়া বোনা যায়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশের আবহাওয়ায় বছরের যে কোনো সময় মিষ্টিকুমড়া বোনা যায়, তবে কৃষকরা সাধারণত রবি মৌসুমে অর্থাৎ নভেম্বর থেকে জানুয়ারি এবং খরিফ মৌসুমে ফেব্র“য়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত সময়ে মিষ্টিকুমড়া চাষ করে থাকেন। জমি তৈরি ও বীজ বপন : অল্প পরিমাণে মিষ্টিকুমড়া উৎপাদন করতে হলে বাসগৃহের আশপাশে ছায়াহীন স্থানে মাচা করে বীজ বোনা যেতে পারে। ব্যবসাভিত্তিক চাষের ক্ষেত্রে প্রথমে চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করে নির্দিষ্ট দূরত্বে মাচা অথবা সারিতে বীজ বুনতে হয়। ঝোপালো জাতের ক্ষেত্রে পাশাপাশি দুটি মাচার মধ্যে ২ মিটার দূরত্ব রাখা যেতে পারে। লতানো জাতে এটি ৩ থেকে ৪ মিটার হওয়া বাঞ্ছনীয়। বীজ রোপণ ঃ বৈশাখী কুমড়ার জন্য ২ দশমিক ৪ থেকে ২ দশমিক ৭ মিটার পরপর এবং অন্যান্য কুমড়ার জন্য ৩ থেকে ৩ দশমিক ৬ মিটার পরপর মাচা তৈরি করা যেতে পারে। মাচা তৈরি করতে (৮০ দ্ধ ৮০ দ্ধ ৮০ ঘন সেন্টিমিটার) গর্ত করলে ভালো হয়। একেকটি মাচায় প্রথমে ছয় থেকে সাতটি বীজ বুনতে হয়। পরে চারা অবস্থায় দুটি করে ভালো চারা রাখলেই চলে। হেক্টরপ্রতি ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৯ কেজি বীজের প্রয়োজন। বৈশাখী কুমড়ার লতা ভূমিতে বাইতে দেয়া যেতে পারে। অন্যান্য কুমড়ার জন্য মাচার আবশ্যক হয়। সার প্রয়োগ ঃ কুমড়ার জন্য হেক্টরপ্রতি ৫ টন গোবর সার, ৩৫০ থেকে ৪০০ কেজি খৈল, ১২০ থেকে ১৩০ কেজি ইউরিয়া, ১৫০ থেকে ১৭৫ কেজি টিএসপি এবং ১২০ থেকে ১৩০ কেজি এমপি দরকার। গোবর সার, ছাই, খৈল ও ট্রিপল সুপার ফসফেট গর্তের মাটির সঙ্গে মিশিয়ে গর্ত ভর্তি করে ১০ থেকে ১২ দিন পর মাচায় বীজ বপন করতে হয়। চারা ২৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার দীর্ঘ হওয়ার পর মাচার চতুর্দিক দিয়ে একটি অগভীর নালা কেটে নালার মাটির সঙ্গে ইউরিয়া সার মিশিয়ে নালা ভর্তি করে দিতে হয়। মিউরেট অব পটাশ সার ইউরিয়ার সঙ্গে প্রয়োগ করতে হয়। অর্ন্তবতীকালীন পরিচর্যা ঃ শুষ্ক মৌসুমে মিষ্টিকুমড়ার চাষ করা হলে অধিকাংশ স্থানে সেচের প্রয়োজন হয়। বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাউনির ওপর কান্ড তুলে দিলে ফলন বেশি ও ফুলের গুণ ভালো হয় ; কিন্তু বাউনির খরচ বেড়ে যাওয়াতে এর অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করতে হয়। জমির ফসল হিসেবে লতানো জাতের চাষ করা হলে ফল ধরার সময় ফলের নিচে কিছু খড় কুটো বিছিয়ে দেয়া ভালো যাতে মাটির সংস্পর্শে এসে ফল রোগাক্রান্ত না হয়। কৃত্রিম পরাগায়নের জন্য ভোরে পুরুষ ফুলের পরাগধানী হাতে নিয়ে স্ত্রী ফুলের গর্ভমুন্ডে আস্তে করে ঘষে দিতে হয়। কোনো কোনো সময় ফ্রুট ফ্লাই নামক পোকা ফল ধারণে সমস্যা সৃষ্টি করে। ওষুধ দিয়ে এ পোকা দমন করতে না পারলে ফোটার আগ থেকে ফল অনেকটা বড় না হওয়া পর্যন্ত কাপড় অথবা পলিথিনের পোঁটলা দিয়ে ঢেকে রাখলে উপকার পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম পরাগায়নের প্রয়োজন হয়। গাছ ছাঁটাই ঃ অনেক সময় গাছের অতিরিক্ত বৃদ্ধির জন্য কুমড়ার ফলন কম হয়। এরূপ অবস্থায় গাছের কিছু লতাপাতা কেটে দেয়া যেতে পারে। পরাগায়ন সমস্যা ঃ কখনো কখনো ফুল থেকে কুমড়া বের হওয়ার পর শুকিয়ে যায়, কিংবা ঝরে যায়। মাটিতে টিএসপি সার প্রয়োগ করা এবং প্রত্যুষে ফুল ফোটার পর পুংজাতীয় ফুলের মুন্ড ফল প্রদানকারী পুষ্পের গর্ভকেশরের গায়ে বুলিয়ে দেয়া যেতে পারে। পোকা দমন ঃ কুমড়া জাতীয় গাছের বিভিন্ন পোকার মধ্যে লালপোকা, কাটালে পোকা এবং ফলের মাছি উল্লেখযোগ্য। এ পোকা দমনের জন্য সেভিন (১০ শতাংশ), ডাস্টিং কিংবা নেক্সিয়ান (শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ) এবং ডায়াজিননের (শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ) ¯েপ্র প্রয়োগ করা যেতে পারে। ফলের মাছির কিড়া কচি ফলে ছিদ্র করে প্রবেশ করে। এতে আক্রান্ত স্থান পচে যায় কিংবা সে অংশের বৃদ্ধি থেমে যায়। এ পোকা দমনের জন্য মাঝে মধ্যে ডিপ্টারেক্স, নেক্সিয়ন বা ডাইব্রেম ব্যবহার করা যেতে পারে। রোগ দমন ঃ কুমড়াজাতীয় গাছের রোগের মধ্যে পাউডারি মিলডিউ, ডাউনি মিলডিড ও অ্যানথ্রোকনোজ প্রধান। দুই সপ্তাহ পরপর ডায়াথেন বা পার্জেট ¯েপ্র করা যেতে পারে। প্রতিষেধকরূপে ১০০ গ্যালন গরম পানিতে ১ কেজি জাইনের মিশ্রিত করে বীজ শোধন করা উত্তম।

অধিক উতপাদন পেতে হলে একক পদ্ধতিতে পাঙ্গাশ চাষ করা উত্তম

কৃষি প্রতিবেদক ॥ এক সময় বাংলাদেশের নদ-নদীতে প্রচুর পরিমাণে পাঙ্গাশ মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট নানা কারণে বর্তমানে এ মাছের মজুদ প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে। দেশীয় প্রজাতির এই পাঙ্গাশ মাছ খেতে অত্যন্ত সুস্বাদু, তাই চাহিদাও ব্যাপক। কিন্তু প্রাকৃতিক উৎসের দেশি পাঙ্গাশ মাছ পুকুরে চাষের প্রসার ঘটেনি। তবে ১৯৯০ সালে থাইল্যান্ড থেকে থাই পাঙ্গাশের পোনা এনে পুকুরে চাষ করা হয়, যা এদেশে মৎস্য সম্পদের নতুন সংযোজন। এদেশে ক্ষুদ্রায়তন পুকুরের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বৃহদায়তন জলাশয়ে থাই পাঙ্গাশ চাষের সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। উল্লেখ্য, ১৯৯৩ সালে বিদেশি প্রজাতির এ মাছের কৃত্রিম প্রজনন সম্ভব হয়েছে। লক্ষণীয় যে, থাই পাঙ্গাশ বর্তমানে দেশের বর্ধিত জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। প্রাণীজ আমিষের শতকরা ৬৩ ভাগ আসে মাছ  থেকে, যার অধিকাংশই পূরণ হয় পাঙ্গাশ দ্বারা। বর্তমানে বাচ্চাদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় মাছ হচ্ছে পাঙ্গাশ। কেননা, এ মাছ কাঁটাবিহীন ও সুস্বাদু। অত্যন্ত আশার কথা, বাংলাদেশের আবহাওয়া ও পানির পরিবেশ থাই পাঙ্গাশ চাষের জন্য যথার্থই অনুকূল।

পাঙ্গাশ চাষের সুবিধা : ১. পাঙ্গাশ মাছ সর্বভুক হওয়ায় তৈরি খাদ্য দিয়ে চাষ করা সম্ভব। ২. এ মাছ দ্রুত বর্ধনশীল, উচ্চফলনশীল ও বিদেশে রফতানিযোগ্য। ৩. যে কোনো ধরনের জলাশয় অর্থাৎ পুকুর-দিঘিতে চাষ করা যায়। ৪. অতিরিক্ত শ্বাসযন্ত্র থাকায় প্রতিকূল পরিবেশেও বেঁচে থাকতে পারে। ৫. মিঠা ও স্বল্প নোনা পানিতে চাষ করা যেতে পারে। ৬. জীবিত অবস্থায় বাজারজাত করা সম্ভব। ৭. সুস্বাদু, প্রচুর চাহিদা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বেশি। ৮. হ্যাচারিতে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে সহজেই থাই পাঙ্গাশের পোনা উৎপাদন করা যায়।

পুকুর নির্বাচন ঃ পুকুরের আয়তন ৬০ থেকে ১০০ শতাংশ এবং গভীরতা ৫ থেকে ৭ ফুট হওয়া বাঞ্চনীয়। দোআঁশ ও পলিযুক্ত এটেল মাটি পাঙ্গাশ চাষের জন্য সর্বোত্তম। পুকুরে পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকা অত্যাবশ্যক। পুকুর প্রস্তুতকরণ : পুকুর পাড়ের ঝোঁপঝাড় পরিষ্কার রাখতে হবে। পুকুরে জলজ আগাছা, রাক্ষুসে মাছ ও অবাঞ্ছিত প্রাণী রাখা যাবে না। পুকুর শুকানো সম্ভব না হলে রাক্ষুসে মাছ ও অনাকাঙ্খিত পানি দূর করার পর প্রতি শতাংশে এক কেজি হারে এবং পুকুরের মাটি লাল অমস্নীয় হলে ২ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করা অতীব জরুরি। শুকনো পুকুরে চুন  দেয়ার পর প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করতে হবে। পুকুর প্রস্তুতির সময় প্রতি শতাংশে ৮ থেকে ১০ কেজি গোবর, ২০০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ১৫০ গ্রাম টিএসপি সার প্রয়োগ করা অত্যাবশ্যক। সার প্রয়োগের ৫ থেকে ৬ দিন পর পানিতে প্রাকৃতিক খাদ্য (প্লাংটন) তৈরি হলে পুকুরে মাছের পোনা ছাড়তে হবে।

পোনা মজুদকরণ ঃ অধিক উৎপাদন পেতে হলে একক পদ্ধতিতে পাঙ্গাশ চাষ করা উত্তম। একক চাষের ক্ষেত্রে প্রতি শতাংশে ৫ থেকে ৭ ইঞ্চি আকারের পাঙ্গাশের  পোনা ১২৫ থেকে ১৫০টি এবং মিশ্র চাষের ক্ষেত্রে প্রতি শতাংশে ৫০ থেকে ৬০টি পাঙ্গাশের পোনা ৫ থেকে ১০টি কাতলের পোনা, ২৫ থেকে ৩০টি বিগহেড বা সিলভার কার্পের পোনা এবং ২০ থেকে ২৫টি রুইয়ের পোনা ছাড়া যেতে পারে। তৈরি খাবার সরবরাহ ঃ পাঙ্গাশ মাছের একক চাষের ক্ষেত্রে তৈরি খাদ্য সরবরাহ করা একান্তই অপরিহার্য। এ মাছ চাষে আমিষযুক্ত সুষম খাদ্য অত্যাবশ্যক। খাবার দানাদার হওয়া বাঞ্ছনীয়। এক্ষেত্রে ফিশমিল ২০ শতাংশ, সরিষার খৈল ৪৫ শতাংশ এবং গমের ভুসি ৩৫ শতাংশ একত্র করে সামান্য পানি মিশিয়ে দানাদার খাদ্য তৈরি করে রোদে শুকাতে হবে। মাছের খাবার চাষকৃত মাছের দেহের ওজনের শতকরা ৮  থেকে ৩ ভাগ হারে সরবরাহ করা অত্যাবশ্যক। পর্যায়ক্রমে খাদ্যের পরিমাণ হ্রাস করতে হবে। এছাড়া শামুক, ঝিনুক, হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশুর নাড়িভুঁড়ি টুকরো করে কেটে পাঙ্গাশ মাছকে লোভনীয় খাবার হিসেবে দেয়া যেতে পারে। পোনা মজুদের পর দিন থেকে নিয়মিত সকাল ও বিকাল দু’বার খাবার সরবরাহ করা জরুরি। শীতকালে মাছের খাবার কমাতে হবে।

রোগ ব্যবস্থাপনা ঃ পানির গুণাগুণ নষ্ট হলে মাছে ঘা দেখা দিতে পারে। পানির গুণাগুণ মাছ চাষের অনুকূলে আনার জন্য চুন, লবণ বা জিওলইট প্রয়োগ করতে হবে। মাছে ক্ষত রোগ দেখা দিলে মাছের খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়াতে হবে। প্রয়োজনে দূষিত পানি বের করে পরিষ্কার, ঠান্ডা ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে হবে। রোগবালাই থেকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনে নিয়মিত পানি পরিবর্তন করতে হবে।

পরামর্শ : ১. পোনা মজুদের আগে পানির বিষাক্ততা পরীক্ষা করতে হবে, ২. নার্সারি পুকুরে রেণু বা ধানি পোনা ছাড়ার আগে ক্ষতিকর হাঁসপোকা বা ব্যাঙাচি ইত্যাদি সরিয়ে ফেলতে হবে। ৩. মজুদকৃত মাছকে নিয়মিত সুষম খাবার সরবরাহ করতে হবে। ৪. সুস্থ-সবল পোনা মজুদ করতে হবে। ৫. পোনা ছাড়ার উপযোগী সময় সকাল-বিকালের মৃদু ঠান্ডা আবহাওয়া। দুপুরের রোদ, মেঘলা ও নিম্নচাপের দিনে  পোনা ছাড়া সমীচীন নয়।

মাছ আহরণ ও বাজারজাতকরণ ঃ সঠিক চাষ ব্যবস্থাপনা, উন্নতমানের পোনা মজুদ ও যথানিয়মে সুষম খাবার প্রয়োগ করা সম্ভব হলে মাত্র ৬-৭ মাসে পাঙ্গাশ মাছের গড় ওজন ৯০০ থেকে ১০০০ গ্রাম হয়ে থাকে। বারবার আহরণ করে মাছ বাজারজাত করা হলে মাছের উৎপাদন সন্তোষজনক হয়। এক্ষেত্রে মাত্র ৬ মাসে একটি ভালো ফলন আশা করা যায়। অর্থাৎ একই পুকুরে বছরে দু’বার পাঙ্গাশ মাছের ফলন পাওয়া সম্ভব।

বন্যা পরবর্তী কৃষক ভাইদের করণীয়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে প্রতিবছরই দেশের কোথাও না  কোথাও বন্যা দেখা দেয়। প্রতিরোধ-প্রতিকার করা সম্ভব না হলেও কিছু বিশেষ প্রযুক্তি পদ্ধতি অনুসরণ করলে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি অনেকটা পুষিয়ে নেয়া যায়। কৃষি মন্ত্রণালয় ও এর অধীন বিভিন্ন সংস্থা বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এখানে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের করণীয় কৌশল তুলে ধরা হলোথ বন্যার পানিতে ভেসে আসা কচুরিপানা, পলি, বালি এবং আবর্জনা যত দ্রুত সম্ভব পরিষ্কার করতে হবে। বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর ৫ থেকে ৭ দিন কাদাযুক্ত ধানগাছ পরিষ্কার পানি দিয়ে প্রয়োজনে ¯েপ্র মেশিন দিয়ে ধুয়ে দিতে হবে; পানি নেমে যাওয়ার পর পরই সার প্রয়োগ করা ঠিক না এতে ধানগাছ পচে যেতে পারে। পানি নেমে যাওয়ার ১০ দিন পর ধানের চারায় নতুন পাতা গজানো শুরু হলে বিঘাপ্রতি ৮ কেজি ইউরিয়া ও ৮ কেজি পটাশ সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। উঁচু জমিতে যেখানে বন্যার পানি ওঠেনি সেখানে রোপণকৃত বাড়ন্ত আমন ধানের গাছ (রোপণের ৩০ থেকে ৪০ দিন পর) থেকে ২ থেকে ৩টি কুশি রেখে বাকি কুশি সযতেœ শিকড়সহ তুলে নিয়ে অনতিবিলম্বে অন্য ক্ষেতে রোপণ করা যেতে পারে। যেসব এলাকায় বন্যায় উঁচু জমি তলিয়ে যাওয়ার কারণে বীজতলা করা সম্ভব নয় সে  ক্ষেত্রে ভাসমান অথবা দাপোগ বীজতলা তৈরি করে চারা উৎপাদন করা যেতে পারে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ব্রি উদ্ভাবিত আলোকসংবেদনশীল উফশী ধানের জাত  যেমন- বিআর-৫, বিআর-২২, বিআর-২৩, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৪৬, ব্রি ধান৫৪ এবং নাজিরশাইলসহ স্থানীয় জাতগুলো রোপণ করতে হবে। এ ছাড়া ব্রি উদ্ভাবিত স্বল্প জীবনকালীন জাত ব্রি ধান৫৭ ও ব্রি ধান৬২ রোপণ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত বীজতলা করা যাবে। তবে উল্লিখিত জাতগুলো নাবিতে রোপণের  ক্ষেত্রে প্রতি গোছায় চারার সংখ্যা ৪ থেকে ৫টি এবং রোপণ দূরত্ব ২০ঢ১৫   সেন্টিমিটিার; বিলম্বে রোপণের ফলে দ্রুত কুশি উৎপাদনের জন্য সুপারিশকৃত টিএসপি, জিপসাম ও জিংকসহ ৩ ভাগের ২ ভাগ ইউরিয়া জমি তৈরির সময় প্রয়োগ করতে হবে। অবশিষ্ট ইউরিয়া রোপণের ২৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োগ করতে হবে। যেসব এলাকায় পুনরায় বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম (উঁচু ও মধ্যম উঁচু) সেসব জমিতে অংকুরিত বীজ সরাসরি জমিতে ছিটিয়ে বপন করা যায়।  সে ক্ষেত্রে রোপণ পদ্ধতির চেয়ে  ৫ থেকে ৭ দিন আগে ফলন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া ধানগাছের যাবতীয় পরিচর্যা যেমন- আগাছা দমন, পোকামাকড় ও রোগাক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা, সুষম পরিমাণে সার প্রয়োগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পূরক সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। বন্যা পরবর্তীতে চারাগাছ সম্পূূর্ণভাবে মাটিতে লেগে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা  পোড়া রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। সে  ক্ষেত্রে ৬০ গ্রাম থিওভিট ও ৬০ গ্রাম পটাশ সার ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে ¯েপ্র করতে হবে। বন্যার পরবর্তী সময়ে ধানগাছে মাজরা, বাদামি ও সাদা পিঠ গাছ ফড়িং, পাতা  মোড়ানো এবং পামরি পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য পোকা বিশেষে হাত জাল, পার্চিং এবং প্রয়োজন হলে অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করা যায়; দেশের উত্তরাঞ্চলে আগাম শীত আসার কারণে ১৫ সেপ্টেম্বর এবং মধ্য ও দক্ষিণ অঞ্চলে ২০ সেপ্টেম্বরের পর আমন ধান রোপণ করা উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে আগাম রবি ফসলের আবাদ করা যায়। আরও বিস্তারিত তথ্যের জন্য আপনার কাছের কৃষি অফিসে যোগাযোগ করুন। তাছাড়া কৃষিবিষয়ক তথ্য পেতে যে কোনো  মোবাইল অপারেটর থেকে কৃষি কল সেন্টারে ১৬১২৩ নাম্বারে ফোন করুন।