দৌলতপুরে মুলকাটা পিয়াঁজ বাজারে : লাভবান চাষীরা

শরীফুল ইসলাম ॥ তরকারী বা বিভিন্ন স্বাদের খাবার রান্নার কাজে পিঁয়াজ অপরিহার্য সবজি মসলা। কিন্তু সেই পিঁয়াজ এখন সর্বসাধারণের ক্রয়সীমার বাইরে। পিঁয়াজের ঝাঁজে সবাই এখন দিশেহারা অবস্থায় রয়েছেন। অনেকে আবার তরকারীতে পিঁয়াজ দেওয়াও বন্ধ করেছেন। তবে পিঁয়াজ কৃষকদের একটি অর্থকরী ফসল হওয়ায় পিঁয়াজ চাষ করে বছরের অর্থনৈতিক চাহিদা মিটিয়ে থাকেন কৃষকরা। তাই বেশী দাম পাওয়ায় কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের কৃষকরা অপরিপক্ক মুলকাটা বা মুড়িকাটা পিঁয়াজ উত্তোলন করে ঢাকাসহ স্থানীয় বাজারে বাজারজাতকরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
চলতি মৌসুমে কুষ্টিয়ায় ১১,২৫০ (এগার হাজার দুইশত পঞ্চাশ) হেক্টর জমিতে পিঁয়াজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে আগামজাতের মুলকাটা পিঁয়াজ চাষ হয়েছে দৌলতপুরে। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় ও বেশী দাম পাওয়ার আশায় এবছর দৌলতপুরে পিঁয়াজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। আরও ক’দিন পরেই স্বপ্নের সোনালী সবজি ফসল পরিপক্ক পিঁয়াজ ঘরে তুলার কথা থাকলেও বাড়তি লাভের আশায় কৃষকরা অপরিপক্ক পিঁয়াজ উত্তোলন করে তা বিক্রয় করে খরচের তিনগুন মূল্যে বিক্রয় করছেন। তবে এবছর বীজের দাম বেশী হওয়ায় প্রতি বিঘা জমিতে পিঁয়াজ চাষে প্রায় ৩৫-৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কোনক্ষেত্রে আরও বেশী। দ্বিগুনের চেয়েও বেশী দামে বিক্রি হবে এমন স্বপ্নে বিভোর পিঁয়াজ চাষীরা। দৌলতপুরের সবজিখ্যাত শশীধরপুর গ্রামের সফল চাষী নাসির উদ্দিন জানান, এবছর পিঁয়াজের বীজের দাম বেশী হওয়ায় বিঘা প্রতি খরচ অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশী পড়েছে। সে ৩ বিঘা জমিতে মুলকাটা পিয়াজ চাষ করেছে। খরচ লক্ষাধিক টাকা ছাড়িয়েছে। তবে একবিঘা জমির মুলকাটা অপরিপক্ক পিঁয়াজ উত্তোলন করে তা বিক্রয় করেছে ১লক্ষ ৮০হাজার টাকায়। পিঁয়াজের বর্তমান বাজার মূল্য থাকলে কোন পিঁয়াজ চাষী লোকসানে পড়বে না বলেও জানান তিনি। পিঁয়াজ চাষে কৃষকদের বীজ, সারসহ প্রয়োজীয় প্রনোদনা ও পরামর্শ দেওয়ায় পিঁয়াজ চাষ ভাল হয়েছে এবং ফলনও ভাল হবে এমন কথা জানিয়েছেন দৌলতপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি সম্প্রসারন কর্মকর্তা সজিব আল মারুফ। তিনি আরও জানিয়েছেন দৌলতপুর এবছর মুলকাটা পিঁয়াজ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশী প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। আর ক’দিন পরেই তা বাজারে পাওয়া যাবে। তবে কৃষকদের উৎপাদিত পিঁয়াজ বাজারে আসলে পিঁয়াজের ঝাঁজও কমবে এবং পিঁয়াজ নিয়ে সবমহলের পেঁয়াজোপনারও অবসান হবে। আর এমনটাই মনে করেন এ অঞ্চলের কৃষকসহ সর্বসাধারণ।

লাউ প্রায় সব ধরনের মাটিতেই জন্মে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ লাউ সাধারণত শীতকালে বসতবাড়ির আশেপাশে চাষ করা হয়ে থাকে। লাউয়ের পাতা ও ডগা শাক হিসেবে এবং ফল তরকারি ও ভাজি হিসেবে খাওয়া যায়। লাউ প্রায় সব ধরনের মাটিতে জন্মে। তবে প্রধানত দোআঁশ থেকে এটেঁল দোআঁশ মাটি লাউ চাষের জন্য উত্তম। লাউ সাধারণত দিবস নিরপেক্ষ লতানো উদ্ভিদ, ফলে বছরের অধিকাংশ সময় চারা লাগিয়ে ফসল উৎপাদন করা যায়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট থেকে উদ্ভাবিত বারি লাউ-১, বারি লাউ-২, বারি লাউ-৩, বারি লাউ-৪ ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির আমদানীকৃত হাইব্রিড জাতের লাউয়ের চাষ আমাদের দেশে হয়ে থাকে। লাউ চায়ের জন্য পলিথিন ব্যাগে চারা তৈরী করাই উত্তম। এতে বীজের খরচ কম পড়ে। পলিথিন ব্যাগে চারা উৎপাদন করে রোপণ করলে হেক্টরপ্রতি ৮০০-১০০০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়। শীতকালীন চাষের জন্য মধ্য-ভাদ্র থেকে মধ্য-কার্তিক (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) মাসে বীজ বপন করা যেতে পারে। তবে আগাম শীতকালীন ফসলের জন্য ভাদ্রের ১ম সপ্তাহে বীজ বুনতে হবে। আমাদের দেশে প্রধানত বসতবাড়ির আশে পাশে যেমন-গোয়াল ঘরের কিনারায় বা পুকুর পাড়ে ২-৩টি লাউ গাছ লাগানো হয়ে থাকে। বেশি পরিমাণ জমিতে লাউয়ের চাষ করতে হলে প্রথমে জমি ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে প্রস্তুত করতে হবে। লাউ চাষের জন্য ২/২ মি. দূরত্বে প্রতি মাদায় ৪-৫টি বীজ বোনা উচিত। রবি মৌসুমে লাউ মাচা বিহীন অবস্থায় ও চাষ করা যায়। তবে মাচায় ফলন বেশী হয়। এছাড়া পানিতে ভাসমান কচুরীপানার স্তুপে মাটি দিয়ে বীজ বুনেও সেখানে লাউ জন্মানো যেতে পারে। পরিচর্যা ঃ নিয়মিত গাছের গোড়ায় পানি সেচ দেওয়া, মাটির চটা ভাঙ্গা, ছাউনী দেওয়া ও অন্যান্য পরিচর্যা করা বাঞ্চনীয়। মাচা শক্ত করে বাধঁতে হবে। রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ঃ কুমড়া জাতীয় বিভিন্ন ফসল যেমন লাউ, কুমড়া, শসা ইত্যাদিতে ফলের মাছি পোকা একটি মারাত্মক সমস্যা। স্ত্রী মাছি তার লম্বা সরু ওভিপজিটরের (ডিম পাড়ার অঙ্গ) সাহায্যে কচি ফলের খোসার নীচে ডিম পারে। ডিম পাড়ার পর ফলের গা থেকে পানির মত তরল বের হয়ে আসে যা শুকিয়ে বাদামী হয়ে যায় এটিই আক্রমণের প্রাথমিক চিহ্ন। ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে ফলের শাঁস খেয়ে বড় হতে থাকে। আক্রান্ত ফল হলুদ হয়, পচে যায় এবং অকালে ঝরে পড়ে। বেঁচে থাকা আক্রান্ত ফল বিকৃত হয় এবং ঠিকমত বাড়তে পারে না। পূর্ণাঙ্গ কীড়া মাটিতে পুত্তলিতে পরিণত হয়। কোন কোন সময় স্ত্রী মাছি ফুলের দলমন্ডল এবং কান্ডে ডিম পাড়ে। দমন ব্যবস্থাপনা ঃ আক্রান্ত ফল ও ফুল গাছে বা নীচে পড়ে থাকা অবস্থায় সংগ্রহ করে মাটিতে পুঁতে বা পিষে মেরে ফেলা। উত্তমরূপে জমি চাষ করলে পুত্তলিগুলো বের হয়ে পড়ে এবং পরভোজী পোকা ও পাখি এদের খেয়ে ফেলে। কচি ফল কাগজ, কাপড় বা পলিব্যাগ দিয়ে ঢেকে রাখা। জমিতে বা মাচাঁয় কাঁঠালের মোথা ঝুলিয়ে রাখলে স্ত্রী পোকা তাতে ডিম পাড়ে। সেক্স ফেরোমোন দ্বারা পুরুষ পোকাকে আকৃষ্ট করে ধ্বংস করা। বিষটোপ ফাঁদ ব্যবহার করা। বিষ টোপ তৈরির জন্য ১০০ গ্রাম থেতলানো কুমড়ার সাথে ০.২৫ গ্রাম ডিপটেরেক্স পাউডার ও ১০০ এমএল পানি মিশিয়ে মাটির পাত্রে জমির বিভিন্ন স্থানে রেখে দিতে হবে। হেক্টর প্রতি এরূপ ৫০-৭৫ টি টোপ প্রয়োগ করা। তিন থেকে চার দিন পর পর বিষটোপ পরিবর্তন করা উচিত। প্রয়োজনে অনুমোদিত কীটনাশক মাত্রানুযায়ী ব্যবহার করা। ফলন বৃদ্ধির উপায় ঃ সবজির মধ্যে লাউ অন্যতম। লাউয়ের বাজারমূল্য এখন অনেক। এর উৎপাদন বাড়ালে কৃষক লাভবান হবে ক্রেতারাও কম দামে লাউ কিনতে পারবে। লাউ গাছে প্রচুর ফুল ধরলেও লাউ ধরে কম। কিছু কৌশল জানা থাকলে অধিকাংশ ফুল থেকেই লাউ ধরানো সম্ভব। লাউ, মিষ্টি কুমড়া, করলা, কাঁকরোল, পেঁপে ইত্যাদি সবজি গাছ একলিঙ্গ এবং ভিন্নবাসী উদ্ভিদ হওয়ায় প্রাকৃতিক পরাগায়ন কম হয়। অর্থাৎ এসব গাছে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল পৃথক পৃথক হয়। পুরুষ ও স্ত্রী গাছও পৃথক হয়। ফলে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল যদি দূরে থাকে তবে কীট-পতঙ্গ, পোকা-মাকড় অথবা অন্য যেকোনো পরাগায়নের মাধ্যমে প্রাকৃতিক পরাগায়ন সম্ভব হয় না। এ জন্য লাউ ধরে না। পুরুষ গাছ বা পুরুষ ফুল থেকে ফল হয় না। লাউয়ের পুরুষ গাছ ও স্ত্রী গাছ পৃথক হওয়ায় কৃত্রিমভাবে পুরুষ ফুল এনে স্ত্রী ফুলের সঙ্গে মিলন ঘটাতে হয়। কৌশল ঃ প্রতিদিন ভোর বেলায় সদ্যফোটা পুরুষ ফুল ছিঁড়ে পুংরেণুসমৃদ্ধ পুংকেশর রেখে পাপড়িগুলো ছিঁড়ে ফেলতে হয়। এরপর পুংরেণু স্ত্রী ফুলের গর্ভমুন্ডে হালকাভাবে সামান্য একটু ঘষে দিতে হয়। এতে স্ত্রী ফুল নিষিক্ত হয়ে ফল ধরে। একটি পুরুষ ফুলের পুংকেশর দিয়ে ৬ থেকে ৭টি স্ত্রী ফুলের গর্ভমুন্ডে পরাগায়ন করা যায়। এ জন্য একটা লাউয়ের মাচায় শতকরা ১০টা পুরুষ ফুল রাখতে হয়। এতে শতকরা ৯৫টি স্ত্রী ফুলে ফল ধরবে। এ জন্য পুরুষ ও স্ত্রী ফুল চেনা প্রয়োজন। ফুল চেনার উপায় ঃ পুরুষ ফুল :ফুলের বোঁটার অগ্রভাগে ফুটে। পাপড়ির গোড়ায় গর্ভাশয় থাকে না। পাপড়ির মাঝখান দিয়ে বেড়ে যাওয়া পুংদন্ডে পাউডারের গুঁড়ার মত পুংরেণু থাকে। পুংদন্ডের শীর্ষভাগে গর্ভমুন্ড থাকে না। শুধু বোঁটার অগ্রভাগে ফুটে থাকা ফুলগুলো পুরুষ ফুল। স্ত্রী ফুল ঃ ক্ষুদ্রাকৃতি লাউয়ের মত গর্ভাশয়ধারী ফুলগুলো স্ত্রী ফুল। গর্ভাশয়ের ওপর থেকে পাপড়ি থাকবে। পুংদন্ড থাকবে না। গর্ভদন্ড ছোট ও মোটা। গর্ভদন্ডে আঠালো পদার্থ থাকবে। পুংরেণু এখানে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আঠায় আটকে যায়। অনেকেরই ধারণা, শুধু স্ত্রী ফুলের এই গর্ভাশয় থাকলেই লাউ ধরবে। গর্ভমুন্ডে পুরুষ ফুলের পুংরেণু না লাগা পর্যন্ত লাউ ধরবে না। অন্যান্য কৌশল ঃ গর্ভাশয় ঝরে পড়াকে অনেকেই মনে করে কচি লাউ ঝরে পড়ে। সত্যিকারে তা নয়। যেসব স্ত্রী ফুল পুংরেণু দ্বারা নিষিক্ত হয় না অর্থাৎ পরাগায়ন হয় না সেগুলো ঝরে পড়ে। এ জন্য উপরোক্ত নিয়মে কৃত্রিম পরাগায়ন করতে হবে। এরপরেও ঝরে পড়লে গাছের গোড়ায় নিয়মিত পানি দিতে হবে। গাছপ্রতি ৫০ গ্রাম করে টিএসপি ও এমপি সার গাছের গোড়া থেকে ৬ ইঞ্চি দূর দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। কচি লাউ পচে যাওয়ার কারণ হচ্ছে ফ্রুট ফ্লাই পোকা কচি লাউয়ে ক্ষত সৃষ্টি করে। এ ক্ষতে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করে লাউ পচিয়ে ফেলে। এ পোকা হাত দ্বারা মারা যায়। ছাই দেয়া যেতে পারে। অথবা ডায়াজিনন/ডাইমেক্রন/নগস দিতে পারেন। লাউ গাছ খুব বড় হয় কিন্তু ফুল কম ধরে। এ জন্য জৈব সার কম দিতে হবে। টিএসপি ও এমপি সার সম্পূর্ণ মাত্রায় দিতে হবে। এছাড়াও গ্রোথ হরমোন ¯েপ্র করতে পারেন। ফুলের মধ্যে পিঁপড়া আক্রমণ করলে ছাই অথবা সেভিন দিতে পারেন। ইঁদুরের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য বিষটোপ অথবা ফাঁদ দিতে পারেন।

কৃত্রিম পরাগায়নে মিষ্টিকুমড়ার ফলন বাড়ে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ মিষ্টিকুমড়ার পরাগায়ন সাধারণত প্রাকৃতিকভাবেই বিভিন্ন পোকার দ্বারা বিশেষ করে মৌমাছি, বোলতার দ্বারা সম্পন্ন হয়ে থাকে। কিন্তু কখনো কখনো পোকার পর্যাপ্ত উপস্থিতি না থাকায় মিষ্টিকুমড়ার পরাগায়ন হয় না এবং কচি ফল হলুদ হয়ে ঝরে যায়। এ ছাড়া পুরুষ ফুলের সংখ্যা কম থাকায় বা না থাকায়, একই সময়ে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল পরিপক্কতালাভ না কারায়, ক্ষতিকর পোকা পুরুষ ফুলের পরাগ দন্ড বা স্ত্রী ফুলের গর্ভমুন্ড খেয়ে ফেললে অথবা বৃষ্টিতে পরাগরেণু ধূয়ে নষ্ট হলেও পরাগায়ন হয় না। এসব কারণে মিষ্টিকুমড়ার ফলন বাড়াতে কৃত্রিম পরাগায়ন প্রয়োজন হয়। কৃত্রিম পরাগায়নের মাধ্যমে ৩০-৩৫ ভাগ পর্যন্ত ফলন বাড়ানো সম্ভব। মিষ্টিকুমড়ার পুরুষ ও স্ত্রী ফুল সংগ্রহ করে কৃত্রিম পরাগায়নের কাজটি করতে হয়। মিষ্টিকুমড়ার একই গাছে স্ত্রী ও পুরুষ ফুল ধরে। পুরুষ ফুলে শুধুমাত্র বোঁটার উপরে ফুলের পরাগদন্ড ও তাতে পরাগ রেণু থাকে। স্ত্রী ফুলের পাপড়ির নিচে সব সময় ছোট আকারের একটি ফল থাকে। পরাগায়নের সময় ও পদ্ধতি ঃ সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত অথবা সকালে যতক্ষণ পর্যন্ত রোদের তাপ কম থাকে (যা শরীর স্বাভাবিকভাবে সহ্য করতে পারে। লাউয়ের ক্ষেত্রে সন্ধ্যার পর আবছা আলো থাকা পর্যন্ত পরাগায়ন করা ভালো। পুরুষ ফুলের পাপড়িগুলো একটি একটি করে গোড়ার দিকে আস্তে করে টেনে টেনে ছিঁড়ে পরাগদন্ডটি উন্মুক্ত করতে হয়। স্ত্রী ফুলের পাপড়িগুলো হাত দিয়ে আলতো করে নিচের দিকে চেপে ধরতে হয়, যাতে পাপড়ির গোড়া ভেঙে না যায় বা পাপড়িগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এরপর পুরুষ ফুলটি স্ত্রী ফুলের গর্ভদন্ডের মাথার কাছাকাছি নিয়ে সংস্পর্শ ছাড়াই পুরুষ ফুলে আস্তে করে টোকা দিতে হয়। এতে পরাগদন্ড থেকে পরাগ রেণু স্ত্রী ফুলের গর্ভমুন্ডে পড়ে। এভাবে কৃত্রিম পরাগায়ন প্রক্রিয়া শেষ হয়। পরাগায়নের সময় বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় ঃ মাটিতে প্রয়োজনীয় রসের জোগান অবশ্যই থাকতে হয়। পুরুষ ফুলের পরাগদন্ড দিয়ে স্ত্রী ফুলের পরাগদন্ড কখনোই ঘষে দেয়া ঠিক নয়। পুরুষ ফুলের পরাগদন্ডে টোকা দিয়ে পরাগ রেণু স্ত্রী ফুলের পরাগদন্ডের উপর ফেলতে হয়। পরাগায়নের সময় সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয়। সকাল থেকে দিনের সময় যত বেশি পেরিয়ে যায়, তাপমাত্রা তত বাড়তে থাকে আর এতে পরাগ রেণু শুকিয়ে পরাগায়নের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। তাই সকালের দিকেই পরাগায়ন করা ভালো। পরাগায়নের সময় কোনোভাবেই যেন পুরুষ ও স্ত্রী ফুল ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হয়। দূর থেকে কোনো পুরুষ ফুল সংগ্রহ করতে হলে, তা পাপড়িসহ সংগ্রহ করতে হয় এবং পলিব্যাগে পরিবহন করতে হয়। দূর থেকে আনা বা কাছাকাছি থেকে সংগ্রহ করা পুরুষ ফুল দিয়ে দ্রুত কৃত্রিম পরাগায়নের কাজ শেষ করতে হয়। পরাগায়নের সুবিধার্থে সুস্থ-সবল গাছ ও ফুল পেতে ক্ষেতে সুষম সার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হয়। পরাগায়ন ও ফল ধারণ ঃ পরিবেশ ও আবহাওয়াগত কারণে পরাগায়ন ও ফল ধারণ প্রভাবিত হয়। শশা, মিষ্টিকুমড়া ও তরমুজে পরাগায়ন সাধারণত সকাল ৮টার মধ্যে এবং লাউয়ের পরাগায়ন শেষ বিকাল থেকে সন্ধ্যার পর পর। করলার পরাগায়ন খুব ভোর থেকে সকাল ১০টার মধ্যে সম্পন্ন হয়। কুমড়া জাতীয় সবজির পরাগায়ন প্রধানত মৌমাছির দ্বারা সম্পন্ন হয়। তবে অনেক সময় কাঙ্খিত কীটপতঙ্গের অভাবে পরাগায় না হওয়ার কারণে ফলন কমে যায়। প্রাকৃতিক পরাগায়নের মাধ্যমে বেশি ফল ধরার জন্য হেক্টর প্রতি ২-৩টি মৌমাছির কলোনি স্থাপন করা প্রয়োজন। হাত দিয়ে পরাগায়ন বা কৃত্রিম পরাগায় করে ফলন শতকরা ৩০-৩৫ ভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়। মৌবাক্স স্থাপন করলে ফুল আসার প্রাথমিক পর্যায়ে বেশি ফল হয় এবং বীজের পরিপক্কতার জন্য প্রচুর সময় পাওয়া যায়। এতে বীজের ফলন ভালো হয়। বীজের ভালো ফলন পেতে হলে কুমড়া ফসলের প্রতি লতায় ৪-৫টি ফল রাখতে হয়। কৃত্রিম পরাগায়নের নিয়ম হলো ফুল ফোটার পর পুরুষ ফুল ছিঁড়ে নিয়ে ফুলের পাপড়ি অপসারণ করা হয় এবং ফুলের পরাগধানী (যার মধ্যে পরাগ রেণু থাকে) আস্তে করে স্ত্রী ফুলের গর্ভমুন্ডে (যেটি স্ত্রী ফুলের পাপড়ির মাঝখানে থাকে) ঘষে দিতে হয়। একটি পুরুষ ফুল দিয়ে ৪-৫টি স্ত্রী ফুলে পরাগায়ন করা যায়। বীজ উৎপাদনের জন্য জমির সবগুলো গাছের মধ্যে সতেজতা, ফলন ক্ষমতা ও সুস্থতা দেখে কয়েকটি গাছ নির্বাচন করতে হয়। এসব গাছে নিয়ন্ত্রিত পরাগায়ন করতে হয়। অর্থাৎ একই জাতের পুরুষ ফুলের পরাগ রেণু দিয়ে একই জাতের গাছের স্ত্রী ফুলের অথবা একই গাছের পুরুষ ফুলের পরাগ রেণু দিয়ে একই গাছের স্ত্রী ফুলে পরাগায়ন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে পুরুষ ফুল ও স্ত্রী ফুল ফোটার আগেই বাটার পেপার দিয়ে বেঁধে রাখাতে হয়। যাতে অন্য জাতের পুরুষ ফুল দ্বারার পরাগায়িত না হয়। ফুল ফুটলে স্ত্রী ফুল পরাগায়িত করে আবার ব্যাগিং করতে হয়। এই ব্যাগ দ্বারা ফল ৩-৪ দিন বেঁধে রাখা ভালো। কুমড়াজাতীয় ফলের ফলন বৃদ্ধিতে পরাগায়ন বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাই, ক্ষেতের গাছে বেশিসংখ্যক ফল ধারণে সঠিক নিয়মে পরাগায়নের বিকল্প নেই। ফুল ফোটার ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে পরাগায়ন করতে পারলে ফল ধারণ অনেকটাই নিশ্চিত হয়।
লেখক ঃ খোন্দকার মো. মেসবাহুল ইসলাম, উদ্যান বিশেষজ্ঞ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রংপুর অঞ্চল, রংপুর।

পেঁয়াজের বিকল্প নতুন মসলা ফসল চিভ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ পেঁয়াজের ঝাঁজে নাকাল ভোক্তাদের জন্য সুখবর দিলেন কৃষি বিজ্ঞানীরা। তারা এমন একটি মসলা ফসল শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন যেটি পেঁয়াজের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আবার দামও কম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, আমাদের দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয় ১৭.৩৫ লাখ মেট্রিক টন, চাহিদা প্রায় ২২ লাখ মেট্রিক টন। এখনো প্রায় ৪.৬৫ লাখ মেট্রিক টন ঘাটতি রয়েছে। নতুন ফসল চিভ পেঁয়াজের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব এবং এটি সারা বছর চাষ করা যায়। কাজেই চিভের প্রসার ও পেঁয়াজের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে পেঁয়াজের ঘাটতি অনেকটা মেটানো সম্ভব। মসলা ফসল চিভের বৈজ্ঞানিক নাম- অষষরঁস :ঁনবৎড়ংঁস। এটি একটি অ্যামারাইলিডেসি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। এর পাতা লিনিয়ার আকৃতির, ফ্ল্যাট, পাতার কিনারা মসৃণ, বাল্ব লম্বা আকৃতির। এর ফুলের রঙ সাদা-পার্পল বর্ণের। পুষ্পমঞ্জরি অম্বেল প্রকৃতির। এর উৎপত্তিস্থল সাইবেরিয়ান-মঙ্গোলিয়ান-নর্থ চাইনা অঞ্চল। আমাদের দেশে এটি পেঁয়াজ ও রসুনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি মসলা ফসল হিসেবে স্যুপ ও সালাত তৈরিসহ বিভিন্ন চাইনিজ ডিসে ব্যবহৃত হয়। এর পাতা, কন্দ ও অপরিপক্ব ফুল সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি হজমে সাহায্য করে এবং ক্যান্সার প্রতিরোধী গুণাগুণ বিদ্যমান। আন্তঃফসল হিসেবে চাষ করার মাধ্যমে এটি কলার পানামা রোগ নিয়ন্ত্রণ সাহায্য করে। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’, ভিটামিন ‘বি’-১, ভিটামিন ‘বি’-২, নায়াসিন, ক্যারোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও খনিজ পদার্থ বিদ্যমান। তুলনামূলকভাবে সিলেট অঞ্চলে এর চাষাবাদ বেশি হয়ে থাকে। তা ছাড়া পেঁয়াজ উৎপাদনকারী এলাকা যেমন- পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, রাজশাহী (দুর্গাপুর ও তাহেরপুর), মাগুরা, বগুড়া, লালমনিরহাট ইত্যাদি অঞ্চলে ব্যাপকভাবে চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। চিভের উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনের উদ্দেশ্যে মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা চিভের বেশ কয়েকটি লাইনের ওপর গবেষণা চালিয়ে বারি চিভ-১ নামে একটি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে যা সারাদেশে সারা বছর চাষ করা সম্ভব। জাতটি ২০১৭ সালে অবমুক্ত হয়। জাতটির বৈশিষ্ট্য ও উৎপাদন প্রযুক্তি নিম্নে বর্ণনা করা হলো। এ জাতের গাছের উচ্চতা ৩০-৪০ সেমি.। পাতার দৈর্ঘ্য ২৩-৩০ সেমি.। বাল্ব লম্বাকৃতির, বাল্বের দৈর্ঘ্য ১.০-১.৪৫ সেমি.। চারা লাগানো থেকে ফসল উত্তোলন পর্যন্ত ৬৫-৭০ দিন সময় লাগে। এটি পোকামাকড় ও রোগ সহনশীল। ফলন হেক্টর প্রতি ১০-১২ টন (গাছ ও পাতাসহ) মাটি ও জলবায়ু : সেচ ও পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত ও জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ বেলে দোআঁশ মাটি চিভ চাষের জন্য উপযোগী। মাটির পিএইচ ৬.৩-৬.৮ হলে চিভের বৃদ্ধি ভালো হয়। চিভের চাষের জন্য বছরে ২৫০০-৩০০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত প্রয়োজন। ১৩-২৫ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রা চিভ চাষের জন্য উপযোগী। জমি তৈরি : জমিতে ৬-৭টি গভীরভাবে (১৫-২০ সেমি.) চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে কারে ও পরে মই দিয়ে সমতল করতে হবে। জমির আগাছা বেছে ফেলতে হবে। মাটির ঢেলা ভেঙে ঝুরঝুরে ও সমান করে জমি তৈরি করতে হবে। চিভ চাষের জন্য ৩.০ মিটার বাই ১.৫ মিটার আকারেরর বেড তৈরি করতে হবে এবং বেডের উচ্চতা ১৫-২০ সেমি. হতে হবে। পানি সেচ ও নিষ্কাশনের সুবিধার জন্য দুই বেডের মাঝে ৫০-৬০ সেমি. প্রশস্ত নালা থাকতে হবে। সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি : ফলন বেশি পেতে হলে সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণে সার প্রয়োগ করতে হবে। জৈব সার প্রয়োগ মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধি পায় ও ফলন বেশি হয়। মাটিতে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদানের ওপর সারের মাত্রা নির্ভর করে। চিভের জন্য প্রতি হেক্টরে নিম্নোক্ত হারে সার প্রয়োগ করতে হবে। শেষ চাষের সময় সবটুকু গোবর/কম্পোস্ট, টিএসপি, অর্ধেক ইউরিয়া ও এমওপি সার জমিতে ছিটিয়ে মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া এবং এমওপি সার সমান ভাগে ভাগ করে যথাক্রমে চারা রোপণের ২৫ এবং ৫০ দিন পর দুই কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। প্রতিবার সার প্রয়োগের আগে জমি আগাছামুক্ত করতে হবে। রোপণ সময় ঃ বাংলাদেশে সারা বছর চিভ চাষ করা সম্ভব। তবে চিভ লাগানোর উপযোগী সময় এপ্রিল-মে মাস পর্যন্ত। বীজ হার ও রোপণ দূরত্ব ঃ প্রতি হেক্টরে ২০০০০০-৩০০০০০ চারা/ক্লাম্প ডিভিশন লাগে। প্রতিটি চারা ২০-২৫ সেন্টিমিটার দূরত্বে ১৫-২০ সেমি. পরপর লাইন করে লাগাতে হবে। আন্তঃপরিচর্যা: চিভের চারা রোপণের পর একটি প্লাবন সেচ দিতে হবে। চারা রোপণ এবং সেচের পর জমিতে প্রচুর আগাছা জন্মাতে পারে। আগাছা জমির রস ও অন্যান্য খাদ্য উপাদান গ্রহণ করে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত করে। এ জন্য ২-৩ বার বা ততধিক নিড়ানি দিয়ে জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে। জমির জো অবস্থা দেখে ২০-২৫ দিন পরপর সেচ দিতে হবে। ফসল সংগ্রহ ঃ চারা লাগানোর ৬৫-৭০ দিন পর থেকে ফসল সংগ্রহ করা যায়। গাছের গোড়া থেকে ২-৩ ইঞ্চি ওপরে পাতা কেটে অথবা পুরো গাছ উঠিয়ে ফসল সংগ্রহ করা যায়। ফসল সংগ্রহের পর বাজারজাতকরণের জন্য পাতা/গাছ ভালোভাবে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিতে হবে এবং গাছের শিকড় কেটে ফেলতে হবে। বছরে ৫-৬ বার ফসল সংগ্রহ করা যায়। ফলন : পাতা ও গাছসহ প্রতি হেক্টরে ১০-১২ টন ফলন পাওয়া যায়। রোগবালাই ঃ চিভে রোগের আক্রমণ খুব কম হয়। তবে জমিতে আর্দ্রতা বেশি থাকলে সেক্লরোসিয়া জাতীয় ছত্রাকের আক্রমণ হয়। এ ছাড়া পার্পল লিফ ব্লচ নামক রোগের আক্রমণ হতে পারে। পার্পল লিফ ব্লচ ঃ অলটারনারিয়া পোরি নামক ছত্রাক দ্বারা এই রোগ হয়ে থাকে। আক্রান্ত বীজ, বায়ু ও গাছের পরিত্যক্ত অংশের মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এ রোগের প্রকোপ বাড়তে থাকে। এই রোগের আক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে গাছের পাতা বা পুষ্পদন্ডে ছোট ছোট পানি ভেজা দাগ দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে দাগগুলো ধীরে ধীরে বড় হয়। অনুকূলে আবহাওয়ায় পাতা বা পুষ্পদন্ডে এক বা একাধিক দাগ পড়ে এবং তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। দাগের মধ্যবর্তী অংশ প্রথমে লালচে ও পরবর্তী সময়ে কালো বর্ণ ধারণ করে এবং দাগের কিনারায় বেগুনি রঙ দেখা যায়। দাগের মধ্যস্থ গাঢ় অংশ ছত্রাকের বীজকণা দিয়ে পূর্ণ থাকে। সাধারণত আক্রান্ত পাতা ৩-৪ সপ্তাহের মধ্যে হলুদ হয়ে মরে যায়। দমন পদ্ধতি : সুস্থ, নীরোগ বীজ ও চারা ব্যবহার করতে হবে। আক্রান্ত গাছের পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে। রোভরাল বা ভিটাভেক্স ২০০ নামক ছত্রাকনাশক কেজি প্রতি ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করে বপন করতে হবে। রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানির সঙ্গে ২ গ্রাম রোভরাল এবং ২ গ্রাম রিডোমিল গোল্ড মিশিয়ে ১০-১২ দিন পর ৩-৪ বার গাছে ¯েপ্র করতে হবে। এ ছাড়া প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার এমিস্টারটপ মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর ৩-৪ বার গাছে ¯েপ্র করলে রোগের প্রকোপ কমে যায়। পোকামাকড় ও দমন পদ্ধতি: চিভে পোকামাকড়ের আক্রমণ খুব কম হয়। তবে মাঝে মধ্যে থ্রিপসের আক্রমণ লক্ষ্য করা যায়। আক্রান্ত পাতায় ক্ষুদ্রাকৃতির বাদামি দাগ দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে পাতা শুকিয়ে যায়। সাবান মিশ্রিত পানি ৪ গ্রাম/লিটার হারে প্রয়োগ করতে হবে। কেরাটে/এডমেয়ার/ গেইন প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে ¯েপ্র করে সহজেই এই পোকা দমন করা যায়। লেখক ঃ ড. মো. নুর আলম চৌধুরী, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মসলা গবেষণা কেন্দ্র, শিবগঞ্জ, বগুড়া।

কৃষিজীবিকায় অধিকতর প্রাণ সঞ্চায়ন

গ্রিনহাউস গ্যাস হ্রাসকরণে গুটি সার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বায়ুমন্ডলে প্রতিনিয়ত গ্রিনহাউস গ্যাস মিশে যাচ্ছে। এতে পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি উৎপাদন ও জীবকুলের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর প্রধান কারণ আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা, নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কালো থাবা। এসব থেকে পৃথিবীকে রক্ষার জন্য পরিবেশ বিজ্ঞানী ও কৃষিবিজ্ঞানীরা নিত্যনতুন বিভিন্ন গবেষণা ও নানাবিধ উপায় খোঁজার চেষ্টা করছেন। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি চাষ হয় ধান। আর ধানের জমিতে সবচেয়ে বেশি গুঁড়া ইউরিয়া সার ব্যবহৃত হয়। ধানের জমিতে গুঁড়া ইউরিয়া উপরিপ্রয়োগ করা হয়, ফলে বিভিন্ন উপায়ে ৬০-৭০% ইউরিয়া সার অপচয় হয়। বাংলাদেশে ধান ক্ষেতে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন নিয়ে সর্বপ্রথম গবেষণা করে গাজীপুরে বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইজজও। ২০১১ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক সার উন্নয়ন কেন্দ্রের (আইএফডিসি) আর্থিক সহযোগিতায় ব্রি’র গবেষণা খামারে ধান ক্ষেতে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন নিয়ে গবেষণা হয়। ওই গবেষণা ব্রি’র দুজন মৃত্তিকাবিজ্ঞানীর নিবিড় তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। বিজ্ঞানীদ্বয় হলেন একজন প্রধান অনুসন্ধানকারী মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ লতিফ শাহ এবং অন্যজন হলেন সহ-অনুসন্ধানকারী বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এসএম মফিজুল ইসলাম। তারা নাইট্রোজেন উৎসের বিভিন্ন সার ধান ক্ষেতের গবেষণা প্লট থেকে কী পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হয় তা নিরূপণ করেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, ছিটানো ইউরিয়া প্লটে প্লাবন সেচ পানিতে অ্যামোনিয়াম নাইট্রোজেনের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। তার মানে হলো ছিটানো ইউরিয়া প্রয়োগের ফলে নাইট্রোজেন বেশি অপচয় হয়েছে। অন্য কথায় এ ক্ষেত্রে নাইট্রোজেনের ব্যবহার কম হয়েছে। পক্ষান্তরে গুটি ইউরিয়া ও নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম (ঘচক) গুটি সার প্রয়োগকৃত ধানের গবেষণা প্লটে প্লাবন সেচ পানিতে অপেক্ষাকৃত কম অ্যামোনিয়াম নাইট্রোজেন পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এখানে নাইট্রোজেনের অপচয় কম হয়েছে এবং ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তা ছাড়া অনুসন্ধানকারীদ্বয় গবেষণায় দেখেন যে, এফডিপি (মাটির গভীরে গুটি সার প্রয়োগ) প্রযুক্তি ব্যবহারে পরোক্ষভাবে নাইট্রাস-অক্সাইড ও নাইট্রিক-অক্সাইডের (এনও) নির্গমন বাহুমন্ডলে অপেক্ষাকৃত কম ছিল। এখানে উল্লেখ্য যে, আপি প্রকল্পের পরিচালনায় ধানের জমিতে বিভিন্ন অবস্থায় কী পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয় তা নিরূপণের জন্য ২০১৩ সালের জুনে মাঠ পর্যায়ে দুটি গ্রিনহাউস গ্যাস ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়। একটি করা হয় ইজজও-এর গবেষণা খামারে এবং অন্যটি স্থাপন করা হয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্লটে। ওই ল্যাবরেটরি স্থাপনের জন্য প্রধান কার্যকর ভূমিকা পালন করেন আইএফডিসির প্রধান মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ড. উপেন্দ্র সিং।
২০১৪ সালের ২৩-২৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক অধিবেশনে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ক্লাইমেট স্মার্ট টেকনোলজি যাত্রা শুরু করে এবং ক্লাইমেট স্মার্ট টেকনোলজির ত্রিমাত্রা লক্ষ্য বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করে; যা হলো- ক. কৃষক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ক্রমোন্নয়ন। খ. বিশ্বব্যাপী মাটির গভীরে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ প্রযুক্তি প্রচার ও সম্প্রসারণ। গ. সর্বোপরি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন প্রশমন। জাতিসংঘের ওই অধিবেশনে যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে কৃষি ক্ষেত্রে ৩টি লক্ষ্য অর্জনের ঘোষণা করা হয়। লক্ষ্য ৩টি হলো ঃ ১. কৃষি উৎপাদন এবং আয়ের টেকসই ও যথার্থ বৃদ্ধি, ২. খাদ্য ব্যবস্থা ও কৃষিজীবিকায় অধিকতর প্রাণ সঞ্চায়ন এবং ৩. গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে কৃষি সংশ্লিষ্টতা হ্রাসকরণ।
তা ছাড়া কৃষি ও পরিবেশের পারস্পরিক নির্ভরতার উন্নয়নও এ লক্ষ্যমাত্রার অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বের সব দেশ ও জাতি যত তাড়াতাড়ি মাটির গভীরে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ প্রযুক্তিকে একটি ক্লাইমেট স্মার্ট টেকনোলজি হিসেবে গ্রহণে এগিয়ে আসবে এবং জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক সম্মেলন, ২০১৪-তে ঘোষিত ত্রিমাত্রা লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে ততই মঙ্গল হবে। কেননা ২০৫০ সালে বিশ্ব জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে খাদ্য নিরাপত্তা যে চাপের মুখে পড়বে তা মোকাবেলায় ক্লাইমেট স্মার্ট টেকনোলজি গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ বেশ সহায়ক হবে।

রোগবালাই ও পোকার সংক্রমণ থেকে বেগুন রক্ষায় ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তির ব্যবহার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তির আমাদের দেশে একেবারেই নতুন একটি প্রযুক্তি। ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তির ইতিপূর্বে সফলতা পেয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম চাষী ও বাগান মালিকরা। সেই ধারাবাহিকতায় রোগবালাই ও পোকার সংক্রমণ থেকে বেগুন রক্ষায় শুরু হয়েছে ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তির ব্যবহার। বেগুনে ব্যাগিং করে দেখা গেছে যে, কোন ধরণের বালাইনাশকের ব্যবহার ছাড়াই ভালমানের বেগুন উৎপাদন করা সম্ভব। এই প্রযুক্তিতে বালাইনাশক ¯েপ্র করার প্রয়োজন নেই, ফলে ¯েপ্র খরচ বেঁচে যাচ্ছে। কীটনাশক ব্যবহারের পরিবর্তে বেগুনে চীন থেকে আমদানি করা ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। তিন টাকা দামের এই ব্যাগ চার থেকে পাঁচবার ব্যবহার করা যায়। এতে এক কেজি বেগুনে খরচ হয় দেড় থেকে দুই টাকা। অন্যদিকে কীটনাশক ব্যবহারে খরচ হয় এর দ্বিগুণ। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে বেগুন উৎপাদনে একদিকে যেমন ক্ষতিকারক কীটনাশকের ব্যবহার বন্ধ হচ্ছে, সেই সঙ্গে মানুষ পাচ্ছে নিরাপদ ও বিষমুক্ত সবজি।
দেশে যত সবজি উৎপাদন হয়; তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কীটনাশক প্রয়োগ করা হয় বেগুনে। এরপরও শতকরা ২৫ থেকে ৩০ ভাগ বেগুন নষ্ট হয় পোকার আক্রমণে। তবে কৃষকদের দাবি, এই হার ৫০ শতাংশ। এই সমস্যা থেকে উত্তরণে বিভিন্ন বালাই ব্যবস্থাপনা গ্রহণের পরামর্শ দেয়া হলেও খুব একটা কাজে আসেনি তা। বেগুনের প্রধান শক্র ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনের জন্য কৃষক মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করে থাকেন; যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। শুধু তাই নয়, এতে বেগুনের উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। মানবদেহে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ১৪ গুণ বেশি কুইনালফস বেগুনে পাওয়া গেছে। এই সমস্যাটি সমাধানে ব্যাগিং প্রযুক্তি প্রয়োগ করে রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে বেগুনকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে বেগুনে কাঙ্খিত ফলাফল পাওয়ার জন্য কিছু নিয়ম কানুন অনুসরণ করতে হবে। একটি বেগুনের বয়স দুই থেকে তিন দিন হলেই ব্যাগটি পরানো উচিৎ। বেগুনের বয়স যত বেশি হবে পোকায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা ততই বাড়বে। ব্যাগিং এর নিয়ম আমের মতোই। কুয়াসার পানি শুকিয়ে গেলেই একটি কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক একত্রে মিশিয়ে বেগুনের জমিটি ভালোভাবে ¯েপ্র করতে হবে। বেগুনের গায়ের পানির ফোঁটা না শুকানো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। একটি বিষয় ভালোভাবে খেয়াল করতে হবে যে আজ যে বেগুনগুলি ব্যাগিং করা হয়েছে সেগুলো কতদিন পর সংগ্রহ করা হবে। ধরুন ৮ দিন পর সংগ্রহ করা হবে। এখন প্রথম দিন যতগুলো বেগুনে ব্যাগিং করা হবে সেই ব্যাগগুলিতে একটি সাংকেতিক চিহ্ন যেমন ১ লিখুন। আর এই ১ লিখা ব্যাগগুলি ৮ দিন পর সংগ্রহ করুন। আবার ২ দিন পরে যে বেগুনগুলিতে ব্যাগিং করা হবে সেগুলিতে ২ লিখুন এবং ৮ দিন পর ২ খিলা ব্যাগগুলির বেগুন সংগ্রহ করুন। এইভাবে পর্যায়ক্রমে ব্যাগিং করুন এবং সংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করে নির্দিষ্ট সময়ে সংগ্রহ করুন। তবে জাতভেদে বেগুন সংগ্রহ করার সময় আরও বেশি হতে পারে। ব্যাগ ব্যবহারের ফলে যেকোনো পাখি, ইঁদুর ও প্রতিকূল আবহাওয়া থেকেও বেগুন রক্ষা পাবে। ব্যাগের ব্যবহার শেষ হলে ব্যাগগুলো একসঙ্গে পুুড়িয়ে ফেলতে হবে। ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তির তুলনামুলকভাবে নিরাপদ ও বিষমুক্ত বেগুন উৎপাদন করা সম্ভব। ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি এখন হাতের কাছে। চাইলে যে কেউ অন্যান্য ফল-ফসলে ব্যবহার করতে পারবেন। মাঠ পর্যায়ে প্রথম বারের মত চাঁপাইনবাবগঞ্জে বেগুনে ব্যাগিং প্রযুক্তি সম্প্রসারণে কাজ করছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ব্যাগিং প্রযুক্তির প্রধান গবেষক ড. মো. শরফ উদ্দিন। আগ্রহীগন তার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।

বসতবাড়ির আঙ্গিনায় সহজে করা যায় লেটুস চাষ 

কৃষি প্রতিবেদক ॥ শাকসবজি রান্না করতে গিয়ে আমরা এর পুষ্টি উপাদান নষ্ট করে  ফেলি। তবে কোনো কোনো শাকসবজি রয়েছে সেগুলো কাঁচা খাওয়া সম্ভব। লেটুস এমনি একটি শাক, যা সালাদ হিসেবে টমেটো, পেঁয়াজ, মরিচ এসবের সঙ্গে ব্যবহার হয়। ফলে এর পুষ্টি থাকে অটুট। লেটুস বেশ পুষ্টিকর। মুখে রুচিও বাড়ায়। এর প্রতি ১০০ গ্রাম পাতায় ৯৯০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন বিদ্যমান। এ ছাড়া ভিটামিন-বি ০.২২ মিলিগ্রাম, ভিটামিন-সি ১০ মিলিগ্রাম, শর্করা ২.৫ গ্রাম, আমিষ-২.১ গ্রাম, চর্বি ০.৩ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৫০ মিলিগ্রাম এবং লৌহ আছে ২৪ মিলিগ্রাম। এ সত্ত্বেও এ  দেশে এর আবাদ খুবই সীমিত। অথচ প্রতিটি বসতবাড়ির আঙ্গিনায় লেটুস চাষের রয়েছে যথেষ্ট সুযোগ। এতে পারিবারিক চাহিদা পূরণ হবে। পাশাপাশি বিক্রি করে পাওয়া যাবে নগদ অর্থ। চাষের সময় ঃ শীতপ্রধান দেশে সারা বছর এর চাষ হলেও এ দেশে কেবল রবি মৌসুমে অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত দফায় দফায় বীজ বোনা যেতে পারে। জাত ঃ লেটুসের বিভিন্ন জাত রয়েছে। এসবের মধ্যে বারি লেটুস-১, বিগ বোস্টন,  হোয়াইট বোস্টন, প্যারিস হোয়াইট, গ্র্যান্ড ব্যাপিড, নিউইয়র্ক-৫১৫, ইম্পিরিয়াল-৫৪, সিম্পসন, কিং ক্রাউন, কুইন ক্রাউন, ডার্ক, গ্রিন, গ্রেটলেক উল্লেখযোগ্য। চাষের নিয়ম ঃ চাষের জন্য জমি ভালোভাবে প্রস্তুত করে নিতে হবে। এসব জমিতে সরাসরি বীজ বোনা যায়। আবার বীজতলায় বপন করে উপযুক্ত বয়সের চারা (এক মাস বয়সের) মূল জমিতে রোপণ করতে হয়। এক্ষেত্রে লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ১২ ইঞ্চি এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব রাখতে হবে ৮ ইঞ্চি। এজন্য শতাংশপ্রতি বীজ দরকার ৪ গ্রাম করে। তবে বীজতলায় বীজ প্রয়োজন হয় ২০ গ্রাম। লেটুসের বীজ খুব ছোট। তাই বপনের সময় বীজের সঙ্গে মাটির কণা বা ছাই ব্যবহার করা উচিত। সার প্রয়োগ ঃ  লেটুস চাষে শতাংশ প্রতি যে পরিমাণ সার প্রয়োজন তা হচ্ছে- গোবর ২০ কেজি খৈল ৮০০ গ্রাম, ইউরিয়া ৪০০ গ্রাম, টিএসপি ১০০ গ্রাম, পটাশ ১০০ গ্রাম। এগুলোর মধ্যে গোবর চাষের প্রথম দিকে এবং শেষ চাষের সময় টিএসপি ও পটাশ সার মাটির সঙ্গে ভালো করে মিশিয়ে দিতে হয়। তবে ইউরিয়াকে সমান দু’ভাবে ভাগ করে দু’কিস্তিতে (চারার বয়স ১০ দিন এবং বয়স ২০ দিন) উপরিপ্রয়োগ করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। পরিচর্যা ঃ আশানুরূপ ফলন পেতে জমিকে সর্বদাই আগাছামুক্ত রাখতে হবে। মাটিতে রস না থাকলে সেচ দেয়া জরুরি। তেমনিভাবে পানি জমে থাকলে সঙ্গে সঙ্গে নিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। গাছ বড় হওয়ার সাথে সাথে এর গোড়ায় মাটি তুলে দিতে হয়। প্রয়োজনে চারা পাতলা করা বাঞ্ছনীয়। এতে একদিকে যেমন গাছ ঠিকভাবে বেড়ে উঠবে, পক্ষান্তরে উত্তোলিত সবজি ব্যবহার করা যাবে। বালাই ব্যবস্থাপনা ঃ লেটুসের পাতায় কখনো কখনো ‘ছাতা’ রোগ দেখা দিতে পারে। এ রোগের লক্ষণ হচ্ছে- গাছের পাতা নুইয়ে পড়া এবং পাতার অগ্রভাগ পুড়ে যাওয়া। এমন হলে আক্রান্ত গাছ অবশ্যই ধ্বংস করে ফেলতে হবে। তবে বীজ ও মাটি শোধন করে এ রোগ থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব। পোকার মধ্যে জাবপোকা খুব ক্ষতিকর। এরা গাছের পাতার রস চুষে খেয়ে ফেলে। এ ছাড় পোকার মলদ্বার থেকে এক ধরনের তরল পদার্থ বের হয়ে, যা পাতায় আটকে ‘সুটি মোল্ড’ নামে এক প্রকার কালো বর্ণের ছত্রাক জন্মায়। ফলে আক্রান্ত অংশের সালোকসংশ্লেষণ ক্রিয়া বিঘিœত হয়। তাই এদের দমন করতেই হবে। তবে পোকার সংখ্যা কম হলে হাত দিয়ে ধরে  মেরে ফেলা উত্তম। আক্রমণ বেশি হলে অনুমোদিত কীটনাশক সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ওষুধ ছিটানোর ১৫ দিনের মধ্য সবজি খাওয়া উচিত নয়। এজন্য পারতপক্ষে কীটনাশক ব্যবহার না করাই উচিত। ফসল সংগ্রহ ঃ চারা লাগানোর এক মাস পর লেটুস পাতা খাওয়ার উপযুক্ত হয়। ওই সময় সম্পূর্ণ গাছ তোলাই উত্তম, তবুও বসতবাড়ির এক একটি গাছ থেকে প্রয়োজনীয় পাতা সংগ্রহ করে ব্যবহার করা যেতে পারে। শতাংশ প্রতি এর গড় ফলন ৪০ কেজি।

ব্রোকলি চাষ ও পুষ্টিমান বা উপকারিতা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ব্রোকলি ক্রসিফেরী গোত্রের অন্তর্ভুক্ত শীতকালিন সব্জি। এতে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ফোলেট, আঁশ আছে। এই সবজি হৃদরোগ, বহুমূত্র এবং ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। ব্রকলি জারণরোধী) ভিটামিন এ এবং সি সরবরাহ করে কোষের ক্ষতিরোধ করে।
ব্রোকলি দেখতে ফুলকপির মতো। রঙ হয় গাঢ় সবুজ ফুলকপির মতো দুধ সাদা নয়। ব্রকলী হচ্ছে অনেকটা ফুলকপির মতো দেখতে বেগুনি, হলুদ, পিংক ও সবুজ বর্ণের উদ্ভিদ; যার কুঁড়ি ও কান্ড সবজি হিসাবে খাওয়া হয়। পুষ্টি উপাদানের বিবেচনায় ব্রকলি উচ্চমানের সবজি। এটা ভিটামিন, খনিজ এবং এন্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর। মানুষের শরীরের জন্য ব্রকলি একটি আদর্শ খাবার। এটা হার্টের অসুখ দুর করতে এবং ডায়াবেটিকস রোগ প্রশমনে খুবই সহায়ক।
প্রতি শতক জায়গায় ২৫-৩০ দিন বয়সের ২০০টি চারা রোপণ করে মাত্র ৫০-৬০ দিন পরই ৪০ মণ ব্রকলী উৎপাদন করা সম্ভব। বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকায় প্রতি কেজি ৪০-৪৫ টাকা দামে বিক্রি করে ৭ হাজার টাকা আয় করা যায়। অথচ শতক প্রতি জমি তৈরি, বীজ, সার ও অন্যান্যসহ সর্বোচ্চ মোট খরচ ১ হাজার টাকা। যা অন্যান্য ফসল চাষের তুলনায় লাভজনক। ব্রকলী সাধারণত দো-আঁশ ও এঁটেল দো-আঁশ মাটিতে ভাল হয়। মাটি ভালভাবে চাষ ও মই দিয়ে ঝুরঝুরে করে তৈরি করতে হয়। মধ্য ভাদ্র-মধ্য পৌষ এর মধ্য বীজ বপন ও চারা রোপণ করতে হয়। ২৫-৩০ দিন বয়সের চারা ৫০ সেন্টিমিটার দূরত্বে রোপণ করতে হয়। এরপর একর প্রতি গোবর ৬ টন, ইউরিয়া ১০০ কেজি, টি এস পি ৭০ কেজি ও পটাশ ৫৫ কেজি প্রয়োগ করতে হবে ।
মাটি ও জলবায়ু ঃ ফুলকপি ও ব্রোকলির জলবায়ু প্রায় একই রকম। তবে ব্রোকলির পারিপার্শ্বিক উপযোগিতার সীমা একটু বেশি বিস্তৃত। তবে ফুলকপির তুলনায় এটি উচ্চতাপমাত্রা ও খরা বেশি সহ্য করতে পারে। ব্রোকলি ১৫-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সবচেয়ে ভালো জন্মে। ব্রোকলি এপ্রিল মাসের পরেও ভালো ফলন দিতে পারে। জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ উর্বর দো-আঁশ উঁচু জমি এবং মাটির পিএইচ মান ৬-৭ হওয়া ব্রোকলি চাষের জন্য সর্বোত্তম।
জাত ঃ আমাদের দেশে ব্রোকলির কোনো মুক্তায়িত জাত নেই। তবে বিভিন্ন বীজ কোম্পানি বিদেশ থেকে ব্রোকলির সাধারণ ও শঙ্কর উভয় প্রকার জাত আমদানি করে বাজারজাত করছে। উল্লেখযোগ্য জাতগুলো হচ্ছে- প্রিমিয়াম ক্রপ, গ্রিন কমেট, গ্রিন ডিউক, ক্রুসেডার, ডিসিক্কো, টপার-৪৩, ডান্ডি, ইতালিয়ান গ্রিন, ¯প্রডিটিং টেক্সাস ১০৭, ওয়ালথাম ২৯, গ্রিন মাউন্টেইল, গ্রীন বাড।
বীজ বপনের সময় ঃ আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে বর্ষার পর পরই আগাম জমি প্রস্তুত করতে হয়। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসে (ভাদ্র থেকে কার্তিক) পর্যন্ত বীজতলায় ব্রোকলির বীজ বুনতে হয়। বীজের পরিমাণ ঃ প্রতি হেক্টর আবাদের জন্য ১৫০ গ্রাম বীজ লাগে। চারা উৎপাদন ঃ পাতা পচা সার বা গোবর সার ১ ভাগ, বালু ১ ভাগ ও মাটি ২ ভাগ মিশিয়ে ব্রোকলির বীজতল তৈরি করতে হয়। বীতলার মাপ হচ্ছে ১ মিটার প্রস্থ, ৩ মিটা দৈর্ঘ্য ও ১৫ সেমি. উচ্চতা। ১ হেক্টর জমিতে রোপণের জন্য এরূপ ২০টি বীজতলায় চারা তৈরির প্রয়োজন হবে। বীজতলার উপরিভাগে ৫ সেমি. দূরে দূরে সারি করে ১-২ সেমি. দূরে বীজবপন করা হয়। বীজতলায় চারাকে রোদ বৃষ্টি হতে রক্ষার জন্য আচ্ছাদন বা চাটাইয়ের ব্যবস্থা রাখা উচিত। সকালে-বিকেলে সেচ দেয়ার পর একটি শক্ত কাঠি দ্বারা বীজতলা সাবধানে খুঁচিয়ে নিড়িয়ে দিতে হয়।
জমি তৈরি ঃ সারাদিন রোদ পায় এমন জমি ব্রোকলি চাষের জন্য নির্বাচন করতে হবে। আবাদের জন্য গভীর চাষ দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে। এরপর ২ সারিতে চারা রোপণের জন্য ১ মিটার চওড়া ও ১৫-২০ সেমি. উঁচু মিড়ি বা বেড তৈরি করতে হবে। সেচ ও পানি নিষ্কাশনের সুবিধার জন্য মিড়িতে চারা রোপণ করাই ভালো। মিড়ির দৈর্ঘ্য জমির সাইজ এবং কাজের সুবিধা বিবেচনা করে যত ইচ্ছা করা যেতে পারে। পাশাপাশি দুই মিড়ির মাঝখানে ৩০ সেমি. চওড়া এবং ১৫-২০ সেমি. গভীর নালা থাকবে। নালার মাটি তুলেই মিড়ি তৈরি করা হয়। সেচ দেয়া এবং পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা অত্যন্ত জরুরি।
সার প্রয়োগঃ প্রতি হেক্টরে গোবর ১৫ হাজার কেজি, ইউরিয়া ২৫০ কেজি, এমপি ২০০ কেজি, টিএসপি ১৫০ কেজি এবং প্রতি চারায় পচা খৈল ৫০ গ্রাম হারে প্রয়োগ করতে হয়।
চারা রোপণ ঃ বীজতলায় চারা ৫-৬টি পাতা হলে প্রধান জমিতে রোপণ করতে হয়। সে সময় চারার উচ্চতা ৮-১০ সেমি. হয়। তবে ৪-৬ সপ্তাহ বয়সের চারা রোপণ সবচেয়ে উত্তম। ৬০ সেমি. ব্যবধানে সারি করে সারিতে ৫০ সেমি. দূরত্বে চারা লাগানো হয়। ভালা ফলনের জন্য চারার বয়স কম হওয়া বাঞ্ছনীয়।
পরবর্তী পরিচর্যা ঃ রোপণের পর প্রথম ৪-৫ দিন পর্যন্ত এক দিন পর পর সেচ দিতে হবে। পরবর্তীতে ৮-১০ দিন অন্তর বা প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিলেই চলবে। সেচ পরবর্তী জমিতে ‘জো’ আসলে ব্রোকলির বৃদ্ধির জন্য মাটির চটা ভেঙে দিতে হবে এবং জমি আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। সারের উপরি প্রয়োগ যথাসময়ে করতে হবে। উল্লেখ্য, সারের উপরি প্রয়োগের পর অবশ্যই জমিতে সেচ দিতে হবে। এ ছাড়া পানি সেচ ও নিষ্কাশনের জন্য বেড সর্বদা পরিষ্কার রাখতে হবে।
ফসল সংগ্রহ ও ফলন ঃ ব্রোকলি রোপণের ৬০-৭০ দিনের মধ্যে অগ্রীম পুষ্পমঞ্জরি সংগ্রহের উপযুক্ত সময়। ধারালো ছুরি দ্বারা তিন ইঞ্চি কান্ডসহ পুষ্পমঞ্জরি কেটে সংগ্রহ করতে হয়। এভাবে একই জমি থেকে ১ মাসব্যাপী কয়েকবার ব্রোকলির উৎপাদন পাওয়া যায়। পুষ্পমঞ্জরির রঙ ফ্যাকাশে বা ঢিলা হওয়ার আগে মোটামুটি জমাটবাঁধা অবস্থায় সংগ্রহ করা উচিত। এর বর্ণ তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায় বিধায় পর্যায়ক্রমে সংগ্রহ করে খাওয়া বা দ্রুত বাজারজাত করা উচিত। এজন্য অনেক দেশে পলিথিনের প্যাকেটে একে বাজারজাত করা হয়। ব্রোকলির ফলন প্রতি হেক্টরে ১০-১৫ টন।
পোকামাকড় ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ঃ সরুই পোকা বা ডায়মন্ড ব্যাক মথ : এ পোকার আক্রমণে কচি পাতা, ডগা ও কপি খেয়ে নষ্ট করে। পাতার ওপরের ত্বক বা সবুজ অংশ কুরে কুরে খাওয়ার ফলে সেসব অংশ ঝাঁঝরা হয়ে যায়। আক্রান্ত পাতা সবুজ রঙবিহীন জালের মতো দেখায়। ব্যাপক আক্রমণে পাতা শুকিয়ে মরে যায়। কচি গাছের বর্ধনশীল অংশে এ পোকার আক্রমণ বেশি পরিলক্ষিত হয। আক্রান্ত ব্রোকলি খাওয়ার অনুপযুক্ত হয়ে যায়। এদের ব্যাপক আক্রমণে ব্রকলি উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পেতে পারে।
দমন ব্যবস্থা ঃ ফসল সংগ্রহের পর ফসলের অবশিষ্টাংশ পুড়য়ে ফেলা এবং পরে জমি ভালো করে চাষ করা। আক্রান্ত পাতার পোকা ২-৩ বার হাতে ধরে মেরে ফেললে এ পোকা অনেকাংশে দমন করা যায়। পিঁপড়া এবং মাকড়সা এ পোকার কীড়া খায়। বহু রকমের বোলতা যেমন ট্রাইকোগ্রামা, কোটেসিস ইত্যাদি এ পোকার ডিম কীড়াকে ধ্বংস করে ফেলে। ব্যাসিলাস ফুরিনাজিয়েনসিস (বিটি) প্রয়োগ করে এ পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। জমি জরিপ করে যদি প্রয়োজন হয় তখন সঠিক নিয়মে অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করা প্রয়োজন।
জাব পোকা ঃ জাব পোকা একটি অন্যতম প্রধান ক্ষতিকারক পোকা। অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং প্রাপ্তবয়স্ক উভয় অবস্থাতেই দলবদ্ধভাবে গাছের নতুন ডগা, পাতা, ফুল, ফল ইত্যাদির রস চুষে খায়। ফলে পাতা বিকৃত হয়ে যায়, বৃদ্ধি ব্যাহত হয় ও প্রায়শ নিচের দিকে কুঁকড়ানো দেখায়। জাব পোকা শরীরের পেছন দিকে অবস্থিত দুটি নল দিয়ে মধুর মতো এক প্রকার রস নিঃসৃত করে। এ রসে পাতা ও কান্ডে সুটিমোল্ড নামক এক প্রকার কলো রঙের ছত্রাক জন্মায়। এর ফলে গাছের সবুজ অংশ ঢেকে যায় এবং সালোকসংশে ষণ ক্রিয়া বিঘিœত হয়। মেঘলা, কুয়াশাচ্ছন্ন এবং ঠান্ডা আবহাওয়ায় জাব পোকার বংশ বৃদ্ধি বেশি হয়। তবে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি হলে এদের সংখ্যা কমে যায়।
দমন ব্যবস্থা ঃ প্রাথমিক অবস্থায় আক্রান্ত পাতা ও ডগার জাব পোকা হাত দিয়ে পিষে মেরে ফেলা যায়। নিম বীজের দ্রবণ (১ কেজি পরিমাণ অর্ধভাঙা নিমবীজ ১০ লিটার পানিতে ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে) বা সাবানঘোলা পানি (প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২ চা চামচ গুঁড়া সাবান মেশাতে হবে) ¯েপ্র করেও এ পোকার আক্রমণ অনেকাংশে কমানো যায়। লেডিবার্ড বিটলের পূর্ণাঙ্গ পোকা ও কীড়া এবং সিরফিড ফ্লাইয়ের কীড়া জাব পেকা খেয়ে প্রাকৃতিকভাবে দমন করে। সুতরাং উপরোক্ত বন্ধু পোকাগুলো সংরক্ষণ করলে এ পোকার আক্রমণ অনেকাংশে কম হয়। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে শুধু আক্রান্ত স্থানগুলো কীটনাশক প্রয়োগ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিষক্রিয়াসম্পন্ন কীটনাশক, যেমন- ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি হারে মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে।
কাটুই পোকা ঃ চারা অবস্থায় কাটুই পোকার আক্রমণে ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়ে থাকে। এ পোকা সাধারণত চারা গাছের ক্ষতি করে থাকে। দিনের বেলা কাটুই পোকার কীড়া মাটির ফাটলে, মাটির ঢেলায় এবং আবর্জনার মধ্যে লুকিয়ে থাকে। পোকা রাতের বেলা বের হয়ে ব্রোকলির চারা গাছ কেটে ফেলে। ভোর বেলা ক্ষেতে কাটা গাছের কাছে মাটি খুঁড়লে কাটুই পোকার কীড়া দেখতে পাওয়া যায়। কাটুই পোকার ব্যাপক আক্রমণে জমিতে ব্রোকলির গাছের সংখ্যা কমে যায় বলে ফলনও কম হয়।
দমন ব্যবস্থা ঃ পোকা দমনের জন্য ভোরে কাটা চারার গোড়ার মাটি খুঁড়ে কীড়াগুলো মেরে ফেলা উচিত। টর্চ বা হারিকেন নিয়ে রাতে কাটুইপোকার কীড়া সংগ্রহ করে মেরে ফেলা যায়। ক্ষেতে সেচ দিলে মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা কীড়া মাটির ওপরে উঠে আসে। ফলে সহজে পাখি এদের ধরে খায় এবং হাত দিয়ে মেরে ফেলা যায়। বিষটোপ দিয়ে এ পোকা দমন করা যায়। বিষটোপ হিসেবে শতাংশ প্রতি ২ গ্রাম সেভিন/কার্বোরিল ৮৫ ডবলিউপি অথবা পাদান ৫০ এসপি, ৪০০ গ্রাম গম বা ধানের কুঁড়ার সাথে পরিমাণমতো পানিতে মিশিয়ে এমন একটি বিষটোপ তৈরি করতে হবে যা হাত দিয়ে ছিটানো যায়। এ বিষটোপ সন্ধ্যায় আক্রান্ত ক্ষেতে চারা গাছের গোড়ায় ছিটিয়ে প্রয়োগ করলে কাটুই পোকার কীড়া দমন সহজ হয়। আক্রমণ বেশি হলে অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে।
রোগবালাই : দাগ রোগঃ এ রোগ হলে পাতায় বাদামি রঙের চক্রাকার দাগ পড়ে। দাগগুলো অসম আকারের হয়ে থাকে। দাগ অনেকটা চাক চাক আকারে পর পর সাজানো কতগুলো বলয়ের মতো দেখা যায়। অধিক আক্রান্ত পাতা শুকিয়ে যায়। ফলে অসংখ্য ছোট ছোট কালচে দাগ দেখা যায়। আক্রান্ত ফসলের বীজ পরিপুষ্ট না হয়ে চিটা হয় এবং ফলন কমে যায়।
দমন ব্যবস্থা ঃ রোগ দমনের জন্য সুষম সার ও নিয়মিত সেচের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। উপযুক্ত শস্য পর্যায় করা। সঠিক দূরত্বে চারা রোপণ করতে হবে। অনুমোদিত ছত্রাকনাশক যেমন- ১০ লিটার পানিতে ২০ গ্রাম রোভরাল মিশিয়ে গাছের ১০-১২ দিন অন্তর ¯েপ্র করা উচিত।

তিল দেশের দ্বিতীয় প্রধান তৈল বীজ ফসল

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশে তিল দ্বিতীয় প্রধান তৈল বীজ ফসল হিসেবে পরিগণিত। তিলের তেলের স্বাদ ও গন্ধ সুমিষ্ট এবং পচনরোধী উঁচুমানের ভোজ্য তেল। খাদ্য হিসেবেও তিল বীজ জনপ্রিয়। একক বা মিশ্র ফসল হিসেবেও স্ব-পরাগায়ণ প্রকৃতির উদ্ভিদ। তিল চাষ করে কৃষকের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন তথা পুষ্টি সমস্যা নিরসনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ধান ভিত্তিক ফসল পরিক্রমায় তিল চাষে কোন অসুবিধা হয় না। বিদেশ হতে সংগৃহীত একটি জার্মপ্লাজমে গামারশ্মি প্রয়োগ করে উন্নত লাইন নির্বাচন এবং নির্বাচিত লাইনটিকে দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশে অঞ্চলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিনা তিল-১ নামে নতুন এ জাতটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ জাতটি স্থানীয় আবাদি জাত টি-৬ অপেক্ষা প্রায় দেড়গুণ বেশি ফলন দেয়। বিনা তিল-১ এর গাছ শাখাবিহীন এবং পাতার রঙ ঘন সবুজ। প্রতিটি গিরায় ৩-৬ বড় আকারের লম্বা ফল ধরে। বীজাবরণ পাতলা, নরম ও ক্রীম রঙের বিধায় খোসা না ছড়িয়েও কারখানা বা বেকারিতে সরাসরি ব্যবহার করা যায়। বেকারিতে বিনা তিলের চাহিদাও প্রচুর। বীজে তেলের পরিমাণ শতকরা ৫০-৫২ ভাগ। জীবনকাল ৮৫-৯০ দিন। গড় ফলন হেক্টর প্রতি ১৩০০ কেজি (একর প্রতি ৫৩০ কেজি বা বিঘা প্রতি ১৭৫ কেজি)। বাংলাদেশের উপকূলীয় বিশাল লবণাক্ত এলাকা বছরের প্রায় ছমাস (ডিসেম্বর থেকে জুন) পতিত থাকে। এ সময়ে অর্থাৎ খরিফ-১ মৌসুমে বিনা তিল-১ এর লবণাক্ততা সহিষ্ণুতার কারণে এর চাষ করে বাংলাদেশে তেলবীজের বিরাট ঘাটতি বহুলাংশে লাঘব করা যেতে পারে। দেশের বৃহত্তম জেলাসমূহ যেমন- ঢাকা, ফরিদপুর, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, পাবনা, রাজশাহী, দিনাজপুর, জামালপুর ও পার্বত্য জেলাসমূহে বিনা তিল-১ চাষ করে অধিক ফলন পাওয়া যেতে পারে। আউস ধান, আখ ও গ্রীষ্মকালীন মুগের সাথে সাথী ফসল হিসেবেও বিনা তিল-১ চাষ করা যায়। বেলে দো-আঁশ বা দো-আঁশ মাটি বিনা তিল-১ চাষের জন্য উপযোগী। এই ফসল জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। তবে জমি থেকে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকলে সকল প্রকার মাটিতেই জাতটি চাষ করা যেতে পারে । তিল কুয়াশা ও জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না কিন্তু যথেষ্ট খরা সহিঞ্চু। যদি তাপমাত্রা ২৫-৩৫ সেলসিয়াসের নীচে নামে তাহলে বীজ গজাতে দেরী হয় এবং চারাগাছ ঠিকমত বাড়তে পারে না। বাড়ন্ত অবস্থায় অনবরত বৃষ্টিপাত হলে তিল গাছ মরে যায়। খরিপ মৌসুমে বীজ বপনের ৩৫-৩০ দিনের মধ্যে তিল গাছে ফুলের কুঁড়ি আসে এবং ৪০-৪৫ দিনের মধ্যে ফুল ফোটা শুরু হয়। সাধারণত ৩-৪টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ভালভাবে ঝুরঝুরে এবং জমি সমান করে বিনা তিল-১ এর বীজ বপন করতে হয়। মুগসহ অন্যান্য ফসলের সাথে সাথী ফসল হিসেবে আবাদ করলে প্রধান ফসলের জন্য জমি তৈরি করতে হবে। মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ (মধ্য ফাগুন) বিনা তিল-১ এর বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। তবে উঁচু শ্রেণীর জমিতে ভাদ্র/আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি সময়েও বিনা তিল-১ চাষ করা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে প্রচন্ড শীত শুরুর আগেই ফসল কর্তন করতে হবে। ছিটিয়ে বপনের ক্ষেত্রে হেক্টর প্রতি ৯ কেজি (একর প্রতি ৩-৩.৫ কেজি) এবং সারিতে বপন করার জন্য ৭ কেজি (একর প্রতি ২.৫-৩.০ কেজি) বীজ যথেষ্ট। তবে সাথী ফসল হিসেবে আবাদ করার সময় উভয় ফসল কি হারে বা কত সারি পর পর কোন ফসলের বীজ বপন করা হবে, তার উপর নির্ভর করে বীজের হার নির্ধারণ করতে হবে। জমিতে রস বেশি হলে অল্প গভীরে বীজ বপন করলে বীজ পচে না। মাটি শুষ্ক হলে বপনের পূর্বে একটি হালকা সেচ দিয়ে জমি তৈরি করে বীজ বপন করতে হবে। বিনা তিল-১ এর বীজ ছিটিয়ে বা সারিতে বপন করা যেতে পারে। বীজ ও শুকনো বালু একত্রে মিশিয়ে ছিটিয়ে বপন করলে সমান দূরত্বে বীজ ফেলতে সুবিধে হয়। বিনা তিল-১ এর জন্য সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০-২৫ সেন্টিমিটার এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৫ সেন্টিমিটার দিতে হবে। বীজ বপনের ২ দিনের মধ্যে অংকুরোদগম ঘটে এবং ৩-৪ দিনের মধ্যে মাটির উপর উঠে আসে। জমিতে চারা যদি ঘন হয় তবে ১৫ দিনের মধ্যে গাছ তুলে পাতলা করে দিতে হবে। বিনা তিল-১ চাষে সারের মাত্রা নির্ভর করে জমির ধরণ ও কৃষি পরিবেশ অঞ্চলের উপর। সাধারনত বিনা তিল-১ চাষে একর প্রতি ইউরিয়া- ৪০-৫০ কেজি, টিএসপি- ৩৬-৪৮ কেজি, এমপি- ২০-৩০ কেজি, জিপসাম- ৫০-৬০ কেজি, জিংক সালফেট-১-২ কেজি ও বোরন- ০.৪-০.৮ কেজি হারে প্রয়োগ করতে হবে। বোরন ঘাটতি এলাকায় হেক্টরপ্রতি ১০ কেজি হারে বরিক এসিড প্রয়োগ করে অধিক ফলন পাওয়া যেতে পারে। জমি প্রস্তুতকালে অর্ধেক ইউরিয়া এবং পূর্ণ মাত্রায় অন্যান্য সার মাটির সঙ্গে ভালভাবে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। অবশিষ্ট ইউরিয়া সার বীজ বপনের ২৫-৩০ দিন পর গাছে ফুল আসার সময় উপরি প্রয়োগ করতে হবে। অধিক ফলন পেতে হলে জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে। চারা অবস্থায় প্রায় ২০ দিন পর্যন্ত তিল গাছের বৃদ্ধি ধীর গতিতে হতে থাকে। এ সময় জমির আগাছা দ্রুত বেড়ে তিল গাছ ঢেকে ফেলতে পারে। তাই বীজ বপনের পূর্বেই জমিকে ভালভাবে আগাছা পরিষ্কার করে নিতে হবে। প্রয়োজনে সর্তকতার সাথে নিড়ানী দিয়ে আগাছা তুলে ফেলতে হবে।
সাধারনত বিনা তিল-১ চাষাবাদে সেচের প্রয়োজন হবে না। বপনের সময় মাটিতে রসের অভাব থাকলে একটি হালকা সেচ দিয়ে বীজ গজানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এর ২৫-৩০ দিন পর ফুল আসার সময় জমি শুষ্ক হলে একবার এবং ভীষণ খরা হলে ৫৫-৬০ দিন পর ফল ধরার সময় আর একবার সেচ দিতে হবে। তিল ফসল জলাবদ্ধতা মোটেই সহ্য করতে পারে না। তাই জমির মধ্যে মাঝে মাঝে নালা কেটে বৃষ্টি বা সেচের অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে ফসলকে রক্ষা করতে হবে ।
রোগবালাই দমন ঃ কান্ড পচা রোগ এবং বিছা পোকা ও হক মথ তিল ফসলের ক্ষতি করতে পারে। কান্ড পচা রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে বাজারে যেসব ছত্রাকনাশক পাওয়া যায়, যেমন রেভিস্টিন এক গ্রাম বা ডাইথেন এম-৪৫, ২ গ্রাম হারে প্রতি লিটার পানির সাথে মিশিয়ে ৮-১০ দিন পরপর তিনবার দুপুর ২-৩ টার সময় জমিতে ছিটিয়ে রোগটি দমন করা যেতে পারে। বিছাপোকা দমনের জন্য ডিম পাড়ার সাথে সাথে আক্রান্ত পাতা ছিঁড়ে কেরোসিন মিশ্রিত পানিতে ডুবিয়ে কার্যকরভাবে মেরে ফেলা যেতে পারে। সাইথ্রিন-১০ ইসি বা সবিক্রন-৪২৫ ইসি প্রয়োগ করে দমন করা যেতে পারে।
ফসল কাটা ঃ বিনাতিল-১ পাকার সময় পাতা, কান্ড ও ফলের রঙ হলুদাভ হয় এবং বীজের খোসা ধূসর বর্ণ ধারণ করে। তিল ফসলের প্রতিটি গাছের সব বীজ এক সঙ্গে পাকে না। গাছের গোড়ার দিকের বীজ আগে পাকে এবং এভাবে ক্রমান্বয়ে উপরের দিকের বীজ পাকাতে শুরু করে।
এ সমস্যা থেকে উত্তরণের বাস্তব উপায় হল, গাছের নীচের অংশের বীজ যখন পাকা শুরু করে তখন ফসল কেটে বাড়ির উঠানে কয়েকদিন স্তুপ করে রেখে দিলে উপরের দিকের বীজও পেকে যায়। তারপর তিল গাছ রৌদ্রে শুকিয়ে লাঠির সাহায্যে পিটিয়ে মাড়াই করতে হবে। এরপর বীজ ভালভাবে ৪-৫ দিন টানা রৌদ্রে ৩-৪ ঘন্টা করে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। তিল ফসল কর্তনের ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। বিলম্বে ফসল কাটা হলে বীজ ক্ষেতে ঝরে পড়ে, আবার আগাম কাটা হলে অনেক বীজ অপরিপক্ক থেকে যায়, উভয় ক্ষেত্রেই ফলন হ্রাস পায়।
বীজ সংরক্ষণ ঃ বীজের মান ভাল রাখার জন্য পরিষ্কার বীজ পুরু বা শক্ত পলিথিন ব্যাগে ভরে মুখ বেঁধে অপেক্ষাকৃত শীতল স্থানে কম আর্দ্রতায় সংরক্ষণ করতে হবে। সংরক্ষণকালে বীজের আর্দ্রতা অবশ্যই শতকরা ৮ থেকে ৯ ভাগ হতে হবে। আরও ভাল হয় যদি ব্যভিস্টিন (প্রতি কেজি বীজে ২ গ্রাম হারে) দিয়ে বীজ শোধন করে সংরক্ষণ করা যায়। এভাবে সংরক্ষিত বীজের মান ভাল থাকে এবং অংকুরোদগম ক্ষমতা সহজে নষ্ট হয় না।
লেখক ঃ ড. নিয়াজ পাশা, কৃষি বিজ্ঞানী, বিনা, ময়মনসিংহ।

কালুখালীতে কৃষকের মাঝে শরিষা ভুট্টা বীজ ও সার বিতরণ

ফজলুল হক ॥ রাজবাড়ী জেলাধীন কালুখালীতে উপজেলা কৃষি অফিস কর্তৃক প্রনোদনা কর্মসূচীর আওতায় ক্ষুদ্র প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে শরিষা, ভুট্টা বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে। বেলা ১২ টায় উপজেলা পরিষদ চত্ত্বর থেকে এ বীজ ও সার বিতরণকালে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) শেখ নুরুল আলম এর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলিউজ্জামান চৌধুরী (টিটো)। স্বাগত বক্তব্য রাখেন কৃষি অফিসার মোঃ মাছিদুর রহমান অন্যান্যের মধ্যে ভাইস চেয়ারম্যান শেখ এনায়েত হোসেন, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ডলি পারভীন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নাসরিন সুলতানা, জেলা পরিষদ সদস্য খায়রুল ইসলাম খায়েরসহ অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এ কর্মসূচীর আওতায় উপজেলার ২৫৫জন কৃষকের মাঝে ১ কেজি শরিষা বীজ  ও ১৫৫ জনের মাঝে  কেজি করে ভুট্টা বীজ এছাড়াও প্রত্যেকের ২০ কেজি ডিএপি, ১০ কেজি এমওপি সার বিতরণ করা হয়।

দৌলতপুরে কৃষকদের মাঝে বিনামুল্যে বীজ ও সার বিতরণ

দৌলতপুর প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে বিনামূল্যে কৃষকদের মাঝে বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুরে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে চলতি মৌসুমে প্রণোদনা কর্মসূচীর আওতায় ভূট্টা, সরিষা, পিয়াঁজ, শীতকালীন মুগ, গ্রীস্মকালীন মুগ ও তীল উৎপাদন বৃৃদ্ধির লক্ষ্যে উপজেলার ৫৯৭৫ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে এসব বীজ ও সার বিতরন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে কৃষকদের হাতে সার-বীজ তুলে দেন দৌলতপুর আসনের সাংসদ এ্যাড. আ, কা ম সরওয়ার জাহান বাদশাহ। দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শারমিন আক্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন উপজেলা কৃষি অফিসার একেএম কামরুজ্জামান, হোগলবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান সেলিম চৌধুরী, মরিচা ইউপি চেয়ারম্যান শাহ আলমগীর, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন কর্মকর্তা সজীব আল মারুফ, উপজেলা কৃষকলীগের সভাপতি শরীফ উদ্দীন ও সাধারন সম্পাদক আব্দুল বাঁকী প্রমুখ।

পোলট্রি খামারে বায়ো সিকিউরিটি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ শীতের আগেই হাঁস-মুরগি, কবুতর ও কোয়েলের খামারগুলোতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হয়। কারণ বার্ডফ্লু, রানিক্ষেত ও গামবোরো রোগের ভাইরাস কম তাপমাত্রায় অর্থাৎ শীতের আগে, শীতের সময় ও শীতের পরপরই সক্রিয় হয়ে মুরগিতে আক্রমণ করে। এ জন্য হাঁস-মুরগির খামারগুলোতে জৈব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনোভাবেই জীবাণু খামারে ঢুকতে না পারে এবং মুরগিতে সংক্রমিত না হয়। খামারে ভাইরাস জীবাণু সংক্রমিত হলে মুরগির মৃত্যু নিশ্চিত। তাই প্রতিরোধকমূলক বায়ো সিকিউরিটি অর্থাৎ জৈব নিরাপত্তা ব্যবস্থাই পোলট্রি শিল্পকে রক্ষা করার একমাত্র উপায়। খামারে জৈব নিরাপত্তা ব্যবস্থা করার জন্য সরকার, খামারের মালিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, পোলট্রিসামগ্রী আমদানি, রপ্তানিকারক, ক্রেতা-বিক্রেতাসহ পোল্ট্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন হতে হবে। বার্ডফ্লু রোগ নিয়ে চিন্তার কারণ- এর ভাইরাস (এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা এইচএন) মানুষকেও আক্রান্ত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এ জন্য দেশের সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। হাঁস-মুরগি, কবুতর ও কোয়েলের খামারে জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। খামারের প্রধান গেট তালা দিয়ে রাখতে হবে। “জৈব নিরাপত্তা চালু আছে, প্রবেশ নিষেধ” সাইনবোর্ড লাগাতে হবে। খামারের চারপাশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। খামারের শেডের পাশে খাদ্যদ্রব্য ফেলা যাবে না, এতে বন্য পাখি আসবে। দর্শনার্থী/বহিরাগতদের প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না। খামারের ভেতরে নিয়োজিত কর্মীদের খামার কর্তৃক প্রদত্ত জীবাণুমুক্ত পোশাক, জুতা, টুপি ইত্যাদি পরিধান করতে হবে। খামারের ভেতরে প্রবেশের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, ভ্যান, গাড়িসহ সবকিছু জীবাণুমুক্ত করে প্রবেশ করাতে হবে। খামারের মালিক, ম্যানেজার ও অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারির পরিধেয় সবকিছু জীবাণুমুক্ত হতে হবে। মুরগির ঘরের দরজা বন্ধ রাখতে হবে, যাতে বিড়াল, কুকুর, ইঁদুর, সাপ, বেজি ইত্যাদি প্রবেশ না করতে পারে। এক খামারের লোক অন্য খামারে জীবাণুমুক্ত হয়ে প্রবেশ করতে হবে। মুরগির খামারের কর্মীদের বন্য পাখির দোকানে যাওয়া যাবে না। খামার পরিত্যাগের সময় খামারের বস্ত্রাদি পরিবর্তন করে হাত-পা ভালোভাবে ধুতে হবে। প্রতিটি শেডের সামনে পা ডোবানোর সলিউশন রাখতে হবে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া বিদেশ থেকে মুরগির বাচ্চা, ডিম, খাদ্য, সরঞ্জামাদি আমদানি নিষেধ। দেশের ভেতর থেকে বাচ্চা সংগ্রহের আগে নিশ্চিত হতে হবে যে, ঐ খামারে গত এক বছরে কোনো রোগ দেখা দেয়নি। অতিথি পাখি খামারের আশপাশে বা ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না। খামারের কর্মীদেরও অতিথি পাখির কাছে যাওয়া যাবে না। কারণ শীতকালে বিভিন্ন দেশ থেকে এ দেশে অতিথি পাখি আসে। পাখিগুলো বিভিন্ন রোগের জীবাণু বহন করতে পারে। কোনো মুরগি অসুস্থ হলে বা মারা গেলে সঙ্গে সঙ্গে জেলা বা উপজেলা পশু চিকিৎসা কেন্দ্রে জানাতে হবে এবং মৃত মুরগি মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। খামারে প্রবেশ ও বাইরে যাওয়ার জন্য একটি পথ চালু থাকবে। দূষণ প্রতিরোধে ফগিং চালু রাখতে হবে। মুরগি ও ডিম বিক্রি করে খাঁচা, সরঞ্জামাদি ও যানবাহন পরিষ্কার করে জীবাণুমুক্ত করাতে হবে। অবিক্রিত মুরগি ও ডিম খামারের ভেতর দেয়া যাবে না। মুরগিকে সময়মতো সব রোগের টিকা দিতে হবে। মুরগি, হাঁস, কবুতর ও অন্যান্য পাখি একত্রে পালন করা যাবে না। খামারে অল-ইন-অল-আউট পদ্ধতিতে মুরগি পালন করা। অতিথি পাখি শিকার বন্ধ করা। বাড়িতে পালার জন্য বাজার থেকে কেনা মুরগি অন্তত ১৫ দিন আলাদা রেখে তারপর বাড়ির মুরগির সঙ্গে রাখতে হবে। খামারের ভেতরে প্রবেশের সময় জীবাণুমুক্ত গ্লাভস, গ্যামবুট, মাস্ক, টুপি, এপ্রোন ব্যবহার করতে হবে। এক শেডের যন্ত্রপাতি বা ব্যবহার্য জিনিসপত্র অন্য শেডে ব্যবহার করা যাবে না। আক্রান্ত মুরগির বিষ্ঠা, ময়লা, বর্জ্য মাটির গভীরে পুঁতে  ফেলতে হবে। জীবাণুনাশক হিসেবে সাবান, ডিটারজেন্ট, ভারকন, ফার্মফ্লুইড, হাইপেরক্স, লংলাইফ ২৫০ ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। মুরগির মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিলে পশু হাসপাতালে জানাতে হবে। অস্বাভাবিক আচরণের মধ্যে রয়েছে মুরগি পর পর ২ দিন ২০% হারে পানি ও খাদ্য কম খেলে এবং ডিম উৎপাদন পর পর ২ দিন ২০% হারে কমলে পশু হাসপাতালে নিতে হবে।

লেখক ঃ কৃষিবিদ ফরহাদ আহাম্মেদ, সহকারী অধ্যাপক, কৃষিশিক্ষা, শহীদ জিয়া মহিলা কলেজ, ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল।

পিরামিড পদ্ধতিতে শিম চাষ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ দেশি শিম একটি গুরুত্বপূর্ণ শীতকালীন সবজি। যা বাংলাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং দেশের সর্বত্রই বসতবাড়িতে ও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ হচ্ছে। এ সবজিটি ভাজি, ভর্তা, তরকারি হিসেবে খাওয়া যায়। শিমের ভ্রণযোগ্য অংশ হলো কচি শুটি বা পড এবং পরিপক্ব বীজ যার উভয় অংশেই উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ক্যালসিয়াম, ভিটামিন-সি, ক্যারোটিন বিদ্যমান বিশেষত প্রোটিনের সমৃদ্ধতা এবং আঁশজাতীয় উপাদান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত শীতকালীন সবজি তবে ইদানীং গ্রীষ্মকালে এর চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে। শিমের অঙ্গজ বৃদ্ধি ও প্রজনন পর্যায়ের জন্য তাপমাত্রা ও দিবস দৈর্ঘ্য যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। এ সবজির অঙ্গজ বৃদ্ধির জন্য উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু এবং দীর্ঘ দিবস প্রয়োজন। আবার প্রজনন ধাপের জন্য নিম্ন তাপমাত্রা সংবলিত জলবায়ু এর সঙ্গে ছোট দিবস প্রয়োজন। লক্ষ্য করা যায় যে, শিম যখনই বপন করা হউক না কেন শীতের প্রভাব না পড়লে পুষ্পায়ন ঘটে না। তবে গ্রীষ্মকালীন জাত তাপ ও দিবস নিরপেক্ষ হওয়ায় বছরের যে কোনো সময় বপন/রোপণ করলে পুষ্পায়ন ঘটে। সব ধরনের মাটিতেই শিম জন্মে। তবে সুনিষ্কাশিত দোঁ-আশ ও বেলে দোঁ-আশ মাটি ভালো ফলনের জন্য উপযুক্ত।
বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন পন্থায় শিমের চাষ হয়। বৃহত্তর বরিশাল এলাকায় সর্জান ও ভাসমান পদ্ধতিতে শিমের চাষ হয়। যশোর এলাকায় গ্রীষ্মকালে শিমের বেড উঁচু করে, চট্টগ্রামে মাঠে ও জমির আইলে এবং রাস্তার পার্শ্বে বাঁশের কঞ্চি পুঁতে এর ওপর গাছ উঠিয়ে শিমের চাষাবাদ করা হয়। কিন্তু পাবনা জেলার ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া ও চাটমোহর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় পিরামিড পদ্ধতিতে শিমের চাষাবাদ হয়। চাষিরা সাধারণত এপ্রিল মাসে (বৈশাখ) জমির মাটি কোদাল দিয়ে কেটে পিরামিড আকৃতির ঢিবি তৈরি করে। এরপর মৌসুমের প্রথম বৃষ্টি হলে অথবা বৃষ্টি হওয়া দেরি হলে চাষিরা কৃত্রিম উপায়ে ঢিবির ওপরের মাটি ভিজিয়ে ‘ ‘জো’ অবস্থায় এনে প্রতিটি ঢিবিতে ৭-৮টি করে বীজ বপন করেন। জাত হিসেবে ব্যবহার করে ‘রহিম’ (সবুজ) ও রূপবান (রঙিন)। চারা একটু বড় হলে ঢিবিতে ‘ডিবিং’ পদ্ধতিতে সার প্রয়োগ করে। গাছ যখন মাটির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শুরু করে তখন মাচার ব্যবস্থা করা হয়। তবে চারাগাছ মাচায় ওঠা পর্যন্ত গোড়ার দিকে যেন না পেঁচাতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। গোড়া পেঁচাতে না দিলে গাছের বৃদ্ধি ও ফলন প্রায় ১০-১৫% বেশি হয়। শিমচাষের জন্য শতক প্রতি ৪০ কেজি গোবর সার, ১০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৩৫০ গ্রাম টিএসপি, ২৫০ গ্রাম এমপি, ২০ গ্রাম জিপসাম এবং ২০ গ্রাম বোরিক সার প্রয়োজন হয়। লিগুমিনোসি পরিবারভুক্ত বিধায় এতে ইউরিয়া সার কম লাগে। কারণ লিগুমোনাস ব্যাকটেরিয়া প্রাকৃতিকভাবে শিমের শিকড়ে নাইট্রোজেন নিবন্ধন করে থাকে। বীজ বপন বা চারা রোপণের ৪-৫ দিন আগেই জমিতে সম্পূর্ণ গোবর সার ও টিএসপি, ইউরিয়া ও এমপি সারের অর্ধেক মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হয়। বীজ বপন বা চারা রোপণের ২৫-৩০ দিন পর বাকি অর্ধেক ইউরিয়া ও এমপি সার উপরি প্রয়োগ করতে হয়। এতে সর্বদা আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। মাটির রস যাচাই করে ১০-১৫ দিন পর সেচ দিতে হবে। পুরাতন পাতা ও ফুলবিহীন ডগা/শাখা কেটে ফেলতে হবে।
ক্ষতিকর রোগ-বালাই ও প্রতিকার ঃ জাব পোকা :- জাব পোকা শিমের একটি প্রধান ক্ষতিকারক পোকা। অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং প্রাপ্তবয়স্ক উভয় অবস্থাতেই গাছের নতুন ডগা, পাতা, ফুল, ফল ইত্যাদির রস চুষে খায় এবং গাছের বৃদ্ধি এবং ফলনে মারাত্মক ক্ষতি করে। সরাসরি ক্ষতি করা ছাড়াও এ পোকা মোজাইকজাতীয় ভাইরাস রোগ ছড়িয়ে রোগের বিস্তার ঘটিয়ে থাকে। দমন ব্যবস্থাপনা ঃ প্রাথমিক অবস্থায় আক্রান্ত পাতা ও ডগার জাব পোকা হাত দিয়ে পিষে মেরে ফেলা যায়। নিম বীজের দ্রবণ (১ কেজি পরিমাণ অর্ধভাঙ্গা নিম বীজ ১০ লিটার পানিতে ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে) বা সাবান গোলানো পানি (প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২ চা চামচ গুঁড়া সাবান মেশাতে হবে) ¯েপ্র করেও এ পোকার আক্রমণ অনেকাংশে কমানো যায়। লেডিবার্ড বিটলের পূর্ণাঙ্গ পোকা ও কীড়া জাব পোকা খেয়ে প্রাকৃতিকভাবে দমন করে। সুতরাং উপরোক্ত বন্ধু পোকাগুলো সংরক্ষণ করলে এ পোকার আক্রমণ অনেকাংশে কম হয়। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে শুধু আক্রান্ত স্থানগুলোয় কীটনাশক প্রয়োগ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি বিষ ক্রিয়া সম্পন্ন কীটনাশক, যেমন- ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ২.০ মিলি হারে অথবা পিরিমর ৫০ ডিপি প্রতি লিটার পানিতে ১.০ গ্রাম হারে মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে। ফল ছিদ্রকারী পোকা ঃ ডিম থেকে বের হয়ে কীড়া ফুল, ফুলের কুঁড়ি, কচি ফল ছিদ্র করে ভিতরে ঢোকে এবং ভিতরের শাঁস খেয়ে নষ্ট করে। ফলে এগুলো ঝরে পড়ে। আক্রান্ত শিম অনেক সময় কুঁকড়ে যায় এবং অসময়েই ঝরে পড়ে। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে শিমের ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পেতে পারে। দমন ব্যবস্থাপনা ঃ প্রতি একদিন পর পর আক্রান্ত ফুল ও ফল হাত দিয়ে সংগ্রহ করে কমপক্ষে একহাত গভীর গর্ত করে পুঁতে ফেলতে হবে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ করা ও ঝরা ফুল, ফল ইত্যাদি সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলা। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে কীটনাশক প্রয়োগ করা যেতে পারে। তবে বিষ প্রয়োগের দুই সপ্তাহের মধ্যে খাওয়ার জন্য কোনো শিম সংগ্রহ করা যাবে না।
এনথ্রাকনোজ বা ফলপচা রোগ ঃ পাতায় বৃত্তাকার বাদামি দাগ ও তার চারপাশে হলুদাভ বলয় দেখা যায়। পরিণত ফলে প্রথমে ছোট গোলাকার পানি ভেজা কালো দাগ পড়ে এবং দাগ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ফলে দাগের কিনারা বরাবর চারপাশে কালো রঙের বেষ্টনী দেখা যায়। কাঁচা অবস্থায় এ রোগের সংক্রমণ শুরু হয় এবং পাকার সময় ফলে বসানো দাগ দেখা যায়। পাকা ফল বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আক্রান্ত বীজ থেকে গজানো চারায় এ রোগ দেখা যায়। শুকানোর সময় শিমের খোসা কালচে দেখা যায়। বীজ মরিচা রং ধারণ করে। দমন ব্যবস্থাপনা ঃ রোগমুক্ত ভালো বীজ ব্যবহার করতে হবে। রোগে আক্রমণের শুরুতে ব্যাভিস্টিন/নোইন বা একোনাজল প্রতি লিটার পানির সঙ্গে ২.০ গ্রাম হারে প্রয়োগ করতে হবে।
ফসল সংগ্রহ ঃ জাতভেদে বীজ বপনের ৯৫-১৪৫ দিন পর শিমগাছ থেকে উঠিয়ে বাজার জাত করা যেতে পারে। ফুল ফোটার ২৫-৩০ দিনের মধ্যে শিম তোলার উপযুক্ত সময়। পাঁচ থেকে সাতদিন অন্তর গাছ থেকে শিম ওঠালে গুণগতমানসম্পন্ন শিম সংগ্রহ করা যায়।
লেখক ঃ প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, ঈশ্বরদী, পাবনা।

কৃষকের জ্ঞানের স্বীকৃতি চাই

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কৃষিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন গ্রামবাংলার কৃষক। কৃষকরা স্বভাবগতভাবে প্রকৃতির উদ্ভাবক। তারা অসীম সৃজনীক্ষমতার অধিকারী। খাঁটি ও সাদা মনের মানুষ। কৃষকরাই প্রকৃত দেশপ্রেমিক। কবি যথার্থই বলেছেন- সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা। কি বন্যা, কি খরা, কত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ধুয়ে-মুছে নিয়ে যায় কত স্বপ্নমিশ্রিত ঘাম ঝরানো সোনার ফসল। তবু দমে যাননি বাংলার কৃষক। কোনো বিপর্যয়ই তাদের দমাতে পারেনি। বন্যার পর দেখা যায় বন্যার জল সরতে না সরতেই নতুন ফসল বোনার জন্য আবারো মাঠে নামেন তারা। খরার সময় ক্ষেতে পানি দেন ঘাম ঝরানো পরিশ্রমে। ফসল রক্ষায় তারা বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করেন মসজিদে, মন্দিরে। নিঃস্ব, শূন্য অবস্থান থেকেও বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন বাংলার কৃষক। ফলিয়েছেন সোনার ফসল। হাড়ভাঙা পরিশ্রমে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম নেই। এক মণ ধান বেচে একটি ইলিশ খাওয়ার সাধ্য নেই। তবু তারা অভিযোগহীন। নিজেদের অভাব-অনটন, দুর্গতি ভুলে তারা নতুন করে কাজে নামেন। আবাদের জমি কমছে, দ্রুত বাড়ছে জনসংখ্যা; তারপরও খাদ্য সংকটে পড়েনি বাংলাদেশ। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সবরকম দুর্যোগ, দুর্গতি মোকাবেলা করে বাংলার কৃষকরা কৃষি উৎপাদনে ফুলে, ফলে, ফসলে সর্বক্ষেত্রেই বিশ্ব সূচকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশকে। কৃষকদের কল্যাণে খাদ্য ও পুষ্টি ঘাটতির বাংলাদেশ আজ খাদ্যে কেবল স্বয়ংসম্পূর্ণই নয় উদ্বৃত্ত উৎপাদনের সাফল্য দেখিয়েছে এবং এরই পাশাপাশি পুষ্টি ঘাটতি অনেকাংশে কমিয়ে সহনীয় মাত্রায় নিয়ে এসেছে। এই কৃষকরাই রক্ষা করছেন আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা। বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখছেন কৃষকরা। এ কারণে বলা যায় অকৃত্রিম ভালোবাসা আর দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে কৃষকের জুড়ি নেই। তারপরও কৃষকের মূল্যায়ন হয় না।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)-এর কৃষি শুমারি-১৯-এর প্রাথমিক রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, দেশে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক কোটি ৬৫ লাখ ৬২ হাজার ৯৭৪ পরিবার। এ ক্ষেত্রে শহরে ৬ লাখ ১৭ হাজার ৮৫৫ পরিবার এবং গ্রামে এক কোটি ৫৯ লাখ ৪৫ হাজার ১১৯ পরিবার কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। আমাদের দেশে কৃষকের জ্ঞানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না বলেই অনেক সম্ভাবনা মাঠে মারা যায়। কোনো সূত্র বা পরীক্ষার সুযোগ ছাড়াই যুগের তালে অনাদিকাল থেকে এই কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বাংলা কৃষক। আমরা জানি ঝিনাইদহের সাধারণ কৃষক হরিপদ কাপালির অবিস্মরণীয় ধান আবিষ্কার দেশজুড়ে সুনাম কুড়িয়েছে। এজন্য হরিপদ কাপালি পেয়েছেন চ্যানেল আই কৃষিপদক। আরো বলা যেতে পারে, রাজশাহীর নাটোরের খোলাবাড়িয়ার ভেষজ কৃষক আফাজ পাগলার কথা। বাড়ির পাশে ঘৃতকুমারীর গাছ রোপণ করে বদলে দিয়েছেন তার গ্রামের নাম ‘ঔষধি গ্রাম’। এভাবে বাংলাদেশের কৃষকরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে আহরিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে উদ্ভাবন করছেন নতুন নতুন পদ্ধতি, এমনকি নতুন জাতের ফসল। তাদের উদ্ভাবিত পদ্ধতিগুলো কৃষি সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য এনে দিয়েছে। তবে তাদের উদ্ভাবিত নতুন জাতের ফসলের জন্য তাদেরকে স্বীকৃতি দেওয়া বা সন্মানিত করা হচ্ছে না এটা খুবই দুঃখজনক। একথা সত্যি, কৃষি সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে দেশের কৃষিবিজ্ঞানীদের অবিস্মরণীয় অবদান রয়েছে। তারা গবেষণাগারে দিবারাত্রি অকাতরে শ্রম দিয়ে নতুন নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবন করছেন এবং সেগুলো মাঠ পর্যায়ে চাষাবাদে সফলতা দেখিয়েছেন। আমার আজকের প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য আমাদের সন্মানীয় কৃষিবিজ্ঞানীদের সঙ্গে স্বশিক্ষিত কৃষকদের অভিজ্ঞতার সেতুবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে সদাশয় সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি গবেষণা কাউন্সিলসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করা। আমরা এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে কৃষকরা প্রকৃতির খেয়ালকে কাজে লাগিয়ে, তাদের আহরিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে যেসব ফসলে নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে তাদের স্বীকৃতি দেওয়া বা সন্মানিত করার দাবি জানাই।
লেখক : এস এম মুকুল, উন্নয়ন গবেষক ও বিশ্লেষক।

মিরপুরে ব্রিধান-৭১’র মাঠ দিবস অনুষ্ঠানে বক্তারা

আগামীতে চাষীদের ভাগ্য বদলাবে ব্রিধান৭১

আমলা অফিস ॥ কুষ্টিয়ার মিরপুরে ব্রি উদ্ভাবিত নতুন ধানের জাত ব্রিধান-৭১’র কৃষক পর্যায়ে চাষ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নমুনা শস্য কর্তন ও মাঠ দিবস অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে মিরপুর উপজেলার ফুলবাড়ীয়া ইউনিয়নের কামিরহাট মাঠে উপজেলা কৃষি অফিসের আয়োজনে রাজস্ব খাতের আওতায় রোপা আমন ধানের প্রদর্শনীর উপর এ নমুনা শস্য কর্তন করা হয়। নমুনা শস্য কর্তন করে উদ্বোধন করেন কুষ্টিয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ সুশান্ত কুমার প্রামানিক, মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রমেশ চন্দ্র ঘোষ সহ আরো অনেকে। পরে কামিরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে ব্রিধান-৭১ এর উপরে মাঠ দিবস অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। মাঠ দিবস অনুষ্ঠানে মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রমেশ চন্দ্র ঘোষের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ সুশান্ত কুমার প্রামানিক। এসময় তিনি বলেন, জলবাড পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় খরাসহিষ্ণ প্রোটিন সমৃদ্ধ ব্রিধান-৭১ কুষ্টিয়ার চাষিদের ভাগ্য বদলাবে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট হতে উদ্ভাবিত এই ধান চাষে সময় ও খরচ দুটোই কম লাগে, আবার ফলন বেশি পাওয়া যায়। এ জাতের ধান চাষ ছাড়াই পাট কর্তনের আগে ওই জমিতে ছিটিয়ে বপন করা যায়। এতে চাষ ও সেচ বাবদ বিঘা প্রতি প্রায় তিন হাজার টাকা কম খরচ হয়। আবার প্রচলিত অন্যান্য ধানের চেয়ে এটি প্রায় ১ মাস আগে কাটা যায়। ফলে রবি ফসলে বেশী সময় ও আগাম আবাদ করা যায়। বিশেষ করে ওই জমিতে গম আবাদ করলে ভাল হবে। তিনি আরো বলেন, বিশেষ করে ব্রিধান-৭১ জাতের গাছ বড় ও শক্ত হওয়ায় একদিকে যেমন প্রতিকুল আবহাওয়ায় গাছ পড়ে যায়না, অন্যদিকে ভাল খড়ও পাওয়া যায়। কৃষক পর্যায়ে বিধান-৭১ এর চাষ সম্প্রসারণের উপরে গুরুত্বারোপ করে সভাপতির বক্তব্যে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রমেশ চন্দ্র ঘোষ বলেন, ব্রিধান৭১ খুবই ভালো একটি ধানের জাত। কৃষকরা এই ধান চাষে আগ্রহী হলে বিঘা প্রতি প্রায় ৫ হাজার টাকা সাশ্রয় হবে। ব্রি ধান ৭১ এর জীবনকাল ব্রি ধান ৩৯ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান ৪ এর চেয়ে আগাম। এ ধান আবাদ করার পর সহজেই কৃষকরা মসুর, ছোলাসহ ইত্যাদি রবিশস্য আবাদ করতে পারবেন। তিনি আরো বলেন, আমরা মিরপুর উপজেলায় প্রদর্শনীর মাধ্যমে ১০ বিঘা জমিতে এ ধানের চাষ করেছি। প্রদর্শনীর মাধ্যমে এলাকার অনেক কৃষক এ ধানের জাত সম্পর্কে জানতে পেরেছে। আগামীতে ব্যপক হারে এ উপজেলায় ব্রিধান৭১ চাষ হবে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ পারভেজ এর পরিচালনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন কামিরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান, সিআইজি সভাপতি শুকুর আলী, সাধারন সম্পাদক শহিদুল ইসলাম প্রমুখ। এসময় কামিরহাট এলাকার প্রায় দুই শতাধিক কৃষক/কৃষানী উপস্থিত ছিলেন। এবছর মিরপুর উপজেলায় ১০ বিঘা জমিতে জমিতে প্রদর্শনীর মাধ্যমে ব্রিধান-৭১ এর চাষ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

কুষ্টিয়ায় সৌর পাম্প থেকে উতপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুত সংযোজন হচ্ছে জাতীয় গ্রীডে

নিয়ামুল হক ॥ বাংলাদেশে সর্বপ্রথম কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ছাতিয়ান ইউনিয়নের কালিনাথপুর গ্রামে অবস্থিত সৌর সেচ পাম্পটি এখন একটি ছোটখাটো বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। যার উৎপাদন ক্ষমতা ২৫ কিলোওয়াট। এতদিন সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ শুধুমাত্র সেচের কাজে ব্যবহৃত হতো। এখন সেচ  বন্ধ থাকলেই উৎপাদিত সৌর বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে সংযুক্ত হচ্ছে। এতে করে সৌর  সেচ পাম্পগুলির অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুতের মূল্যে সেচ খরচে যোগ হওয়ায় কৃষির উৎপাদন ব্যয় কমছে, ফলে লাভবান হচ্ছেন কৃষক। কুষ্টিয়ার ছাতিয়ান ইউনিয়নের কালিনাথপুর গ্রামে আনুষ্ঠানিকভাবে গত শনিবার বেলা ১২টায় সৌর পাম্প থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে সংযোজন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন অতিরিক্ত সচিব টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) এর চেয়ারম্যান মো. হেলাল উদ্দিন। এ সময় প্রতিষ্ঠাতা ব্রাইট গ্রীণ এনার্জি ফাউন্ডেশন (বিজিইএফ) প্রেসিডেন্ট, বিএসআরইএ’র দিপাল বড়–য়া, সমন্বয়কারী সোলার-ই- টেকনোলজি বাংলাদেশ আহমেদুল কবির উপল মিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার লিংকন বিশ্বাস, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান কাশেম যোয়ার্দারসহ স্থানীয় দুই শতাধিক কৃষক কৃষাণী উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ সরকারের টেকসই ও নবায়যোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) এর তত্ত্বাবধানে এবং ইউএনডিপির অর্থায়নে ও সোলার ই টেকনোলজি এর কারিগরি সহায়তায় শুরু  হলো এই যাত্রা। বর্তমানে ইডকল এর মাধ্যমে স্থাপিত প্রায় দুই হাজার একশত সৌর পাম্প সারাদেশে সেচের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে পানির প্রয়োজন না থাকায় এই পাম্পগুলি অব্যবহৃত থাকলেও সৌরশক্তির উৎপাদন অব্যাহত থাকে। সৌর শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে স্রেডা এর নির্দেশনায় এই পাইলট প্রকল্পটি হাতে  নেয় সরকার। যাতে করে সৌর বিদ্যুতের পরিপূর্ণ ব্যবহার করা যায়। সমন্বয়কারি সোলার-ই- টেকনোলজি বাংলাদেশ এর আহমেদুল কবির উপল বলেন- দূরবর্তী স্থান  থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য এই প্রকল্পে স্থাপন করা হয়েছে। ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক সংযুক্ত ডাটা লগার যার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক তথ্য সংরক্ষণ এবং সংগ্রহ করা সম্ভব। স্থানীয় কৃষক জানান, তেলে ইঞ্জিন চালিত পাম্পে বিঘা প্রতি সেচে খরচ হতো ২ হাজার টাকা কিন্তু সোলার পাম্পের সেচ বাবদ খরচ হচ্ছে ১২শত টাকা। এতে করে উৎপাদন খরচ অনেকটাই কমে গেছে। এখন যদি সোলারের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে যোগ হয় বিনিময়ে সেখানকার অর্থটা এই প্রকল্পে যোগ হলে কৃষকের পানির খরচ কমে আসবে। কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের বেশী লাভ করতে পারবে। অতিরিক্ত সচিব টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কতৃপক্ষ (স্রেডা) এর চেয়ারম্যান মো. হেলাল উদ্দিন বলেন- পাইলট প্রকল্পটি ১৯লক্ষ টাকা ব্যয়ে বর্তমানে সৌর সেচ প্রকল্পগুলি সর্বাধিক তিনটি ফসলের চাষ করতে পারছে। ৫০% এর বেশি সৌর শক্তি অব্যবহৃত থেকে যায়। কৃষকের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে অব্যবহৃত সৌর শক্তির বিকল্প ব্যবহার খুঁজে বের করার একটি দুর্দান্ত প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এই পদ্ধতির ফলে  কেবল সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারকেই বাড়ানো হচ্ছে না এটি কৃষক এবং জামানতকারী উভয়ের উপর আর্থিক চাপ হ্রাস করবে, কারণ এটি অতিরিক্ত রাজস্ব অর্জন করতে পারবে।

 

দেশেই করা যাবে প্রাণিজ খাদ্যের মাননিয়ন্ত্রণ গবেষণা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ দিন যত যাচ্ছে আমাদের চারপাশে ভেজাল খাদ্যে সয়লাব হচ্ছে। এতে করে ভোক্তারা নানান মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। তাই সরকার জনসাধারণের জীবনকে নিরাপদ রাখতে প্রাণিসম্পদ উৎপাদন, উপকরণ ও প্রাণিজাত খাদ্যের মাননিয়ন্ত্রণে সর্বাধুনিক গবেষণাগার স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এতে করে একদিকে দেশের মানুষের জীবন যেমন রক্ষা পাবে, অন্যদিকে মানুষ নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ জাতীয় খাদ্যের নিশ্চয়তা পাবে।

জানা যায়, কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রাণিসম্পদের ওপর নিভরশীল। বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশে কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও খাদ্য নিরাপত্তায় প্রাণিসম্পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও গুণগতমান সম্পন্ন প্রাণিজাত খাদ্যের উৎপাদন আজ হুমকির সম্মুখীন। এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণ ও উৎপাদিত দ্রব্যাদির মাননিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদের উৎপাদনকে ত্বরান্বিত করা এবং সর্বোপরি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘প্রাণিসম্পদ উৎপাদন উপকরণ ও প্রাণিজাত খাদ্যের মাননিয়ন্ত্রণ গবেষণাগার স্থাপন প্রকল্প’ হাতে নিয়েছে সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি ২০১৬ সালের ১ জুলাই শুরু হলেও এর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরের ৩০ জুন এবং এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৬ কোটি ১৩ লাখ টাকা। পরবর্তী সময়ে এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে এবং প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ১০৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা করা হয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, সর্বাধুনিক এ গবেষণাগারের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ খাদ্য ও ফিড এডিটিভসের গুণগত মাননিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হবে। এ ছাড়া প্রাণিজাত খাদ্য তথা মাংস, ডিম ও দুধের নমুনায় ক্ষতিকর এন্টিবায়োটিক ওষুধ, হরমোন, স্টেরয়েড ইত্যাদির রেসিডিউ পরীক্ষা করার পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ হতে উৎপাদিত পণ্য ও উপজাতের রুটিন এনালাইসিস পরিচালনা করবে। অন্যদিকে আধুনিক গবেষণাগারটি প্রাণিসম্পদের খাদ্য ও অন্যান্য উপকরণ এবং প্রাণিজাত পণ্যের গুণগতমানের সনদ প্রদান করবে। তা ছাড়া খাদ্য নিরাপত্তায় কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করবে।

প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৬তলা বিশিষ্ট একটি মাননিয়ন্ত্রণ ল্যাব, ৪ তলা বিশিষ্ট একটি ডরমিটরি ভবন, ডিপটিউবওয়েল, গবেষণাগারের যন্ত্রপাতি চালানোর জন্য গ্যাসের সংরক্ষণাগার তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। গবেষণাগারটিতে ক্রমান্বয়ে স্থাপিত হচ্ছে ২৩০টি সর্বাধুনিক মেশিন। ইতোমধ্যে গবেষণাগারে এইচপিএলসি মেশিন স্থাপন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে খুব অল্প সময়ে পশুপাখির খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা করে তার মধ্যকার পুষ্টিমান সহজেই নির্ণয় করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া রয়েছে এইচপিএলসি মেশিন, যার মাধ্যমে অধিক মুনাফার আশায় খামারিরা পশুপাখির খাদ্যে এন্টিবায়োটিক, গ্রোথ প্রোমোটার ব্যবহার করলে খাদ্যের নমুনা এইচপি এলসি যন্ত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা করে তা শনাক্ত করা যাবে।

এই গবেষণাগারে থাকছে এলসিএমএস পশুপাখি থেকে উৎপাদিত দুধ, ডিম, মাংসে  কোন এন্টিবায়োটিক রেসিডিউ খুব অল্প পরিমাই থাকলেও তা শনাক্ত করা যাবে এলসি এম এস যন্ত্রের মাধ্যমে। এ ছাড়াও পশুপাখির খাদ্য ও পশুপাখি থেকে উৎপাদিত দুধ, ডিম ও মাংসে কোনো ক্ষতিকর ধাতব পদার্থ থাকলেও তা এএএস এএএস যন্ত্রের মাধ্যমে জানা যাবে। আগামী জানুয়ারি থেকে ল্যাবরেটরিতে কিছু কিছু পরীক্ষার কাজ শুরু হবে। তবে জুলাই ২০২০ থেকে পূর্ণাঙ্গরূপে সব পরীক্ষার কাজ শুরু হবে। এই ল্যাবরেটরি থেকে স্বল্পমূল্যের নির্ধারিত ফি’র মাধ্যমে খামারিরা এসব পরীক্ষা করাতে পারবেন।

এ ছাড়া এ প্রকল্পের আওতায় ল্যাবে গবেষণাধর্মী বইয়ের একটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মূল ভবনের পাশে একটি ইটিটি (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) স্থাপন করা হয়েছে। এই প্লান্টের মাধ্যমে ল্যাবে গবেষণার ফলে উৎপন্ন বর্জ্য পানি পরিশোধিত হয়ে পরবর্তী সময়ে পার্শ্ববর্তী বাগানে ব্যবহৃত হবে। এ ছাড়া অটোমেটেড ল্যাব, কনফারেন্স সিস্টেম ও সৌর প্যানেল স্থাপন করা হবে। এ প্রকল্পের আওতায় ৫০০ জন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও ৫০০ জন কর্মচারীকে ২ দিনের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়াও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে বিদেশে মাননিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণও প্রদান করা হয়েছে এ প্রকল্পের আওতায়।

প্রকল্পটির পরিচালক ড. মো. মোস্তাফা কামাল বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রাণিসম্পদের সব উপকরণের মাননিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অনাকাঙ্খিত রোগজীবাণু, ক্ষতিকর রাসায়নিক ও জৈব রাসায়নিক পদার্থের অনুপ্রবেশকে রোধ করা যাবে। প্রাণিসম্পদ খাতের উপকরণ আমদানি, রপ্তানি, বিপণন বাজারজাতকরণসহ অন্যান্য  ক্ষেত্রে এই গবেষণাগারের প্রত্যয়নপত্রকে বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে উপকরণের গুণগত ও পুষ্টিগত মাননিয়ন্ত্রণ করা যাবে। পশুপাখির উৎপাদন ব্যয় হ্রাস ও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রাণিসম্পদের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। ফলে কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র হ্রাসকরণ ঘটবে।

লেখক ঃ কৃষিবিদ সামছুল আলম

 

উচ্চ ফ্যাট এবং প্রচুর ভিটামিনসমৃদ্ধ ফল অ্যাভোকাডো

কৃষি প্রতিবেদক ॥ অ্যাভোকাডো একটি ফলের নাম। এটি একটি উচ্চ ফ্যাট এবং প্রচুর ভিটামিনসমৃদ্ধ ফল। এই গাছ আমেরিকা ও মেক্সিকোতে বেশি জন্মায়। প্রায় ১০ হাজার বছর আগে মেক্সিকোতে এই ফলের উদ্ভাবন হয়। এই ফল পারসে আমেরিকা হিসেবেও পরিচিত। পুষ্টিবিদদের মতে, প্রাকৃতিক স্বাস্থ্যকর উপাদানসমৃদ্ধ ফলগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে অ্যাভোকাডো। এতে রয়েছে ভিটামিন এ, বি, সি, ই এবং কে। এ ছাড়া এতে আছে প্রচুর পরিমাণে কপার, পটাশিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম ও ফসফরাসের মতো খনিজ উপাদান।
ফলটির চেহারা দেখে তেমন লোভনীয় মনে না হলেও কিন্তু এর রয়েছে অনেক গুণ মাখনের মতো নরম অ্যাভোকাডো ফল বিভিন্ন রোগ সারাতে যেমন সহায়তা করে, তেমনি খেতেও খুব সুস্বাদু।
অ্যাভোকাডোর স্বাস্থ্য উপকারিতা অনেকগুলো। প্রতি আউন্স অ্যাভোকাডোতে ২৫ মিলিগ্রাম বিটা সাইটোস্টেরল থাকে। নিয়মিত বিটা সাইটোস্টেরল ও অন্য উদ্ভিজ স্টেরল গ্রহণ করলে কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাস্থ্যকর পর্যায়ে থাকে। দৃষ্টিশক্তির জন্য এটি একটি ভালো ফল। অ্যাভোকাডোতে চোখের স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় দুটি ফাইটোকেমিক্যাল লুটেইন ও জেনান্থিন থাকে। এই দুটি উপাদান চোখে অ্যান্টি অক্সিডেন্টের কাজ করে- যা চোখের ক্ষতি কমাতে পারে এবং বয়সজনিত চোখের সমস্যা ম্যাকুলার ডিজেনারেশন হওয়ার ঝুঁকি কমায়।
মুখ, ত্বক ও প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় অ্যাভোকাডো। অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি উপাদানের মিশ্র ক্রিয়ার জন্য এবং অ্যাভোকাডোর ফাইটোকেমিক্যাল ক্যান্সার কোষ উৎপন্ন হওয়া বন্ধ করে এবং মেরে ফেলে। অ্যাভোকাডোতে অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি উপাদান, ক্যারোটিনয়েড অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিড এবং পলিহাইড্রক্সিলেটেড ফ্যাটি অ্যালকোহল আছে- যা রিউম্যাটয়েড ও অস্টিও আরথ্রাইটিসের নিরাময়ে সহায়তা করে। অ্যাভোকাডোর মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্টকে বন্ধ করে এবং অ্যাভোকাডোর দ্রবণীয় ফাইবার রক্তের সুগার লেভেলকে সুস্থিত করে। অন্য ফলের তুলনায় অ্যাভোকাডোতে চিনি ও শর্করার পরিমাণ কম থাকে বলে রক্তের সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। অ্যাভোকাডোতে গস্নুটাথায়ন নামের শক্তিশালী অ্যান্টি অক্সিডেন্ট থাকে যা ইমিউন সিস্টেমের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাভোকাডো কমিশনের মতে, হবু মায়েদের জন্য অ্যাভোকাডো অনেক ভালো। অ্যাভোকাডোতে পর্যাপ্ত ফলিকএসিড থাকে- যা জন্মগত ক্রটি যেমন- স্পিনা বিফিডা, নিউরাল টিউব ডিফেক্ট ইত্যাদি প্রতিরোধ করে।

নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য মাশরুম একটি অন্যতম ক্ষেত্র

কৃষি প্রতিবেদক ॥ নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য মাশরুম একটি অন্যতম ক্ষেত্র হতে পারে। গৃহবধূ থেকে শুরু করে চাকরিজীবীসহ সব শ্রেণী ও বয়সের নারীরা পারিবারিক কাজের পাশাপাশি মাশরুম চাষ করে অনায়াসে কিছু বাড়তি আয় করতে পারে। নারীরা কিভাবে মাসরুম চাষ করে জীবীকা নির্বাহ করতে পারে তার আগে মাসরুম সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেয়া যাক।
মাশরুম কি?
মাশরুম একটি বিজ্ঞানসম্মত খাবার হলেও বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে বিশেষ করে গ্রাম এলাকায় এটি ব্যাঙের ছাতা নামে পরিচিত। তবে দিন বদলে গেছে। এখন ব্যাঙের ছাতা ঢাকা শহরের নামিদামি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে পাওয়া যায়। ব্যাঙের ছাতা নামে যেটি পরিচিত সেটি আসলে এক প্রকার বিষাক্ত ছত্রাক যা বন জংগলে স্যাঁতসেঁতে যায়গায় হয়ে থাকে। খাদ্য হিসেবে যে মাশরুম পাওয়া যায় সেটিও দেখতে ব্যাঙের ছাতার মতই। কিন্তু এটি পরিছন্ন পরিবেশে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে চাষ করা সুস্বাদু, পুষ্টিকর এবং ভেষজগুণে ভরপুর ক্লোরোফিলবিহীন উদ্ভিদ এবং এক প্রকার সবজি। লোকের কাছে এটি অপরিচিত নাম। আমরা মাশরুমকে “ব্যাঙের ছাতা” বলেই চিনি। মূলতঃ মাশরুম গবেষণাগারে উদ্ভাবিত অঙ্কুর বা রেণু দ্বারা পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে চাষ করা, সুস্বাদু পুষ্টিকর ও ঔষধি গুণসম্পন্ন খাওয়ার। প্রতিকেজি শুকনো মাশরুম এক হাজার থেকে ১২শ’ টাকায় বিক্রি হয়। বর্তমানে উন্নত দেশে মাশরুমের কদর অত্যন্ত বেশী।
মাশরুমের পুষ্টিগুণ ঃ
মাশরুম অত্যন্ত পুষ্টিগুণসম্পন্ন একটি খাবার। এতে আছে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন (৩০%)। এ প্রোটিনে আছে মানবদেহের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সব এমাইনো এসিড। যার জন্য এ প্রোটিনটি প্রাণিজ প্রোটিনের মতো একটি সম্পূর্ণ প্রোটিন। কিন্তু প্রাণিজ প্রোটিনের মতো এতে কোলস্টেরল না থাকায় এবং ফ্যাট কম থাকায় সব বয়সের মানুষের জন্য এবং রোগীদের জন্যও আদর্শ খাবার। মাশরুমে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ই২, নায়াসিন, ফলিক এসিড যার মাত্রা যথাক্রমে ১.৮-৫.১, ৩১-৬৫ ও ০.৩০-০.৬৪ মি. গ্রাম/১০০ গ্রাম। মাশরুম মিনারেলসের ও একটি ভালো উৎস। এতে পটাশিয়াম, ফসফরাস, জিংক ও কপারের পরিমাণ যথাক্রমে ২৬.৭-৪৭.৩ গ্রাম, ৮.৭-১৩.৯ গ্রাম, ৪৭-৯২ মি. গ্রাম ও ৫.২-৩৫ মি. গ্রাম/কেজি (শুকনো ভিত্তিতে) যা মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় অধিকাংশ ভিটামিন এবং সব মিনারেলসের জোগান দিতে পারে।
মাশরুম চাষ পদ্ধতি ঃ
বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মাশরুম চাষ করা হয় বলে এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কিন্তু বাংলাদেশে পরিবেশ মাশরুম চাষের জন্য অত্যন্ত অনুকুল। এখানে আংশিক নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সারা বছর দিব্যি মাশরুম চাষ করা যায় যার উৎপাদন খরচ অনেক কম।
মাশরুম চাষ করার জন্য কোন কীটনাশক, রোগনাশক এমন কি কোনো রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয় না। এটি চাষের জন্য প্রয়োজন হয় কেবল কৃষিজ বা বনজ বর্জ্য যেমন- ধানের খড়, গমের খড়, আখের ছোবা, কাঠের গুঁড়া ইত্যাদি যা যত্রতত্র পড়ে থেকে পরিবেশকে দূষিত করে। মাশরুম চাষ করার জন্য আলোহীন স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ প্রয়োজন, তবে ঘরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মাশরুমের স্পূন রাখার জন্য ছোট ছোট মাচা ব্যবহার করা যেতে পারে। লোহা, বাঁশ বা কাঠ দিয়ে এগুলো সহজেই তৈরি করা যায়। অতিরিক্ত গরম মাশরুম চাষের জন্য প্রতিকূল। এজন্য প্রয়োজন হলে ফ্যান ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণে পানির ব্যবস্থা রাখতে হবে। হ্যান্ড ¯েপ্র মেশিনের সাহায্যে স্পূনগুলোতে নিয়মিত পানি দিয়ে স্যাঁতসেঁতে করে রাখতে হবে। শীত ও বর্ষাকালে মাশরুম উৎপাদন অধিক পরিমাণে হয়ে থাকে। এ সময় একটি ভালো মানের স্পূন থেকে প্রতি আড়াই মাসে ২০০-২৫০ গ্রাম মাশরুম উৎপাদন করা যায়। ১০-১২ টাকা মূল্যের এই স্পূনগুলো প্রতি আড়াই মাস পর পর পরিবর্তন করতে হয়।
নারীদের কর্মসংস্থান হতে পারে মাশরুম
এবার শিরোনাম প্রসঙ্গে আসা যাক। মানে কিভাবে নারীরা মাশরুম চাষ করে আয় করতে পারে এবং সাবলম্বি হতে পারে সে প্রসঙ্গ। উপরের আলোচনা থেকেই জানা গেছে যে মাশরুম চাষ খুবই সহজ একটি পদ্ধতিতে করা যায়। জায়গা কম লাগে এবং মাত্র আনুমানিক ১৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেই মাশরুম চাষ শুরু করা যেতে পারে। তবে ব্যবসা শুরুর আগে এ বিষয়ে অবশ্যই প্রশিক্ষন নিতে হবে। নারীদের জন্য সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে প্রশিক্ষন প্রকল্পের মাধ্যমে সহায়তা করা হচ্ছে। গ্রামের বেশিরভাগ নারীই গৃহিনী কেউ কেউ হয়ত হস্তশিল্প বা এ জাতীয় কিছু কাজের সাথে জড়িত। এসব বেকার নারীরা খুব সহজেই মাত্র কিছু দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে মাশরুম চাষের ব্যবসা শুরু করতে পারে। ইতিমধ্যে দেশের অনেক এলাকায় মাশরুম চাষ একটি জনপ্রিয় ব্যবসা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে মাশরুম চাষ হচ্ছে। এসব জায়গায় পুরুষদের পাশাপশি নারীরাও এগিয়ে। তবে একটি রিপোর্ট থেকে মহিলাদের মাশরুষ চাষের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতার কথা জানা যায়। এগুলো বস্তুত অন্যান্য সমস্যার মত পিছিয়ে থাকা মহিলাদের গতানুগতিক সমস্যার সমরূপ। সমস্যগুলোর দিকে একটু চোখ বুলিয়ে নিন; সমাধানের চেষ্টা করুন।
সচেতনতার অভাব। মাশরুম চাষ করে যে নারীরা নিজের পারে দাঁড়াতে পারে সে ব্যাপারে তারা এখনও সচেতন না। আবার এটি যে একটি পুষ্টিকর সবজি সে বিষয়ে অনেকের কোন ধারণাই নাই। মাশরুম চাষের পর একজন নারীর পক্ষে একা সেই পণ্যকে শহরে বিক্রয় করা খুবই দুরুহ ব্যাপার। বাংলাদেশের নারীদের মার্কেট অ্যাক্সেস বা ব্যবসা বাণিজ্যে এদের পদচারণা অনেক কম। মাশরুম সম্পর্কে নারীদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব। অর্থনৈতিক সহায়তার অভাব। যদিও নারী উদ্যোক্তাদের এখন বিভিন্নভাবে ঋণের আওতায় আনা হচ্ছে। কিন্তু কতজন গ্রামের নারী এ সম্পর্কে সচেতন? । সামাজিক ও ধর্মীয় অজুহাত দেখিয়েও অনেক জায়গায় মহিলাদের এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে রাখা হয়েছে। তবে মাশরুম চাষের ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যাতিক্রম লক্ষ করা যায়। যেহেতু পুরুষরা মাঠে বেশি কাজ করে তাই মহিলারা ঘড়োয়াভাবে খুব সহজেই মাশরুম চাষ করতে পারে। মাশরুম চাষকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং মহিলাদের এক্ষেত্রে জড়িত করার জন্য কি করতে হবে তা আশা করি বুঝতে পেরেছেন। মাশরুম সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্যের জন্য জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কেন্দ্র সাভার, ঢাকা অথবা দেশের বিভিন্ন সাব সেন্টারের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।

তুলা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ আঁশ জাতীয় ফসল

কৃষি প্রতিবেদক ॥ সারা বিশ্বে তুলা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ আঁশ জাতীয় ফসল। এদেশে তুলা উৎপাদনের যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও এখন পর্যন্ত এদেশে তুলা উৎপাদনের পরিমান তেমন বেশি নয়। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের সক্রিয়তায় বর্তমানে তুলা উৎপাদনের জমির পরিমান বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তুলা চাষের উপযোগী জমি ঃ তুলা চাষের জন্য উৎকৃষ্ট মাটি হল দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ। তবে পর্যাপ্ত জৈবপদার্থ সমৃদ্ধ যেকোন মাটিতেই তুলার চাষ করা যায়। খুব বেশি বেলে বা কর্দমকণা সমৃদ্ধ মাটি তুলা চাষের জন্য উপযুক্ত নয়। যেসব জমিতে বৃষ্টির পানি দাঁড়িয়ে থাকে না বা স্বাভাবিক বন্যার পানি উঠে না এরূপ জমি তুলা চাষের জন্য নির্বাচন করতে হবে। যে জমি স্যাঁতসেঁতে, ছায়াযুক্ত এবং যেখানে বৃষ্টির পানি ২-৬ ঘন্টার মধ্যে নেমে যায় না সেরূপ জমি তুলা চাষের জন্য নির্বাচন করা উচিত নয়। মাটির পিএইচ মান ৬.০-৭.৫ হওয়া উত্তম। মাটি বেশি অম্লীয় হলে জমিতে চুন প্রয়োগ করতে হবে।
জমি তৈরি ঃ আমাদের দেশে বর্তমানে উন্নত পদ্ধতিতে তুলা চাষ করা হচ্ছে এবং এই সময়কাল হল বর্ষাকাল। বর্ষার অবস্থা বুঝে মাটিতে ‘জো’ থাকা অবস্থায় ৩-৪টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরা ও সমতল করে জমি তৈরি করতে হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পাহাড়িয়া অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে তুলা চাষ করা হয়। পক্ষান্তরে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে তুলার চাষ করা হয়। দেশের যে সমস্ত অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমান কম, সে সমস্ত অঞ্চলে শ্রাবণের মাঝামাঝি থেকে ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে জমি চাষ করে বীজ বপন করা হয়। এদেশের রংপুর-দিনাজপুর এলাকায় শ্রাবণ মাসের মধ্যেই বীজ বপন করা হয় এবং অন্যান্য সমতল অঞ্চলে ভাদ্র মাসে জমি তৈরি করে বীজ বপনের উপযুক্ত করা হয়।
বীজ বপনের সময় ঃ আগাম শীত এলাকায় ( বিশেষ করে রংপুর দিনাজপুর এলাকা) শ্রাবণ মাস হতে ভাদ্রের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে অবশ্যই বীজ বপনের কাজ শেষ করতে হবে। পাহাড়িয়া এলাকায় বর্ষা তীব্র আকারে শুরুর ১৫/২০ দিন পূর্বে (জমিতে ‘ জো’ থাকা অবস্থায়) বীজ বপন করা উত্তম। অর্থাৎ খরা মৌসুমে তুলা আবাদের জন্য জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে বীজ বপন করতে হবে।
উত্তরবঙ্গ ও পাহাড়িয়া এলাকা ছাড়া অন্যান্য এলাকায় শ্রাবণের মাঝামাঝি হতে ভাদ্রের মাঝামাঝি পর্যন্ত বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। তবে মধ্য শ্রাবণের দিকে বীজ বপন উত্তম। যদি কোথাও বিশেষ কারনে বীজ বুনতে দেরি হয় তবে তা অবশ্যই ভাদ্রের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।
জাত ঃ তুলা চাষের জন্য আমেরিকান জাতের নিম্নবর্ণিত জাতসমূহ বেশি চাষাবাদ হয়ে থাকে:
সিবি-৫: জাতটির পাতা কিছুটা শুয়াযুক্ত বিধায় জ্যাসিড পোকার আক্রমণ প্রতিরোধী। তবে বোলওয়ার্ম ও ব্লাইট রোগের প্রতি সংবেদনশীল। জাতটি উচচ জিওটি সম্পন্ন। এ জাতটি যশোর অঞ্চলের বৃহত্তর যশোর ও কুষ্টিয়া জেলায় চাষাবাদের উপযোগী।
সিবি-৯: জাতটি কিছুটা শুয়াযুক্ত বিধায় জ্যাসিড প্রতিরোধী। বোল সাইজ বড় এবং উচচ ফলনশীল। তুলা চাষের আওতাধীন অধিকাংশ জেলায় চাষের জন্য উপযোগী। জাতটি অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ মেয়াদী। গাছের গঠন দূর্বল প্রকৃতির হয়ে থাকে, ফলে অধিক ঝড়ে গাছ ভেঙ্গে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
সিবি-১০: জাতটি অপেক্ষাকৃত আগাম। এ জাতটি অন্যান্য ফসল অর্থাৎ সাথী ফসলের সাথে চাষাবাদ সুবিধাজনক। আগাম বপন করলে এ জাতের তুলা ফসল উঠিয়ে নাবী গম, ভূট্টা, আলু প্রভৃতি রবি ফসল চাষ করা যায়। যশোর ও রংপুর অঞ্চলের জেলা সমুহে চাষের উপযোগী।
সিবি-১১: জাতটি আগাম। এ জাতের পাতা ওকরা জাতীয় এবং লিফ এরিয়া কম। পোকা মাকড়ের আক্রমণ প্রতিরোধী হওয়ায় ফসল উৎপাদন খরচ কম, ফলন বেশি। জাতটি উত্তরাঞ্চলে চাষাবাদের জন্য উপযোগী।
সিবি-১২: জাতটি আগাম, রোগ প্রতিরোধী তবে বোল রটের আক্রমণ কিছুটা হতে পারে। জ্যাসিড ও এফিডের আক্রমণ হলেও চর্বনকারী পোকা ( যেমনঃ বোলওয়ার্ম, স্পটেড বোলওয়ার্ম এবং স্পোডোপটেরা) এর আক্রমণ প্রতিহত করতে পারে। জাতটি উচচ ফলনশীল। ফলন বেশি (৩.৩-৪.৫) যশোর অঞ্চলে চাষাবাদের জন্য উপযোগী।
রূপালী-১ হাইব্রিডঃ গণচীনে উদ্ভাবিত হীরা হাইব্রিড রূপালী-১ এর জীবনকাল ১৬৫-১৭০ দিন, জিওটি ৪১%, আঁশ মিহি ,লম্বা ও মজবুত, অগাম জাত, ডাল ভেঙ্গে পড়ে না, স্পটেড বোলওয়ার্ম এর আক্রমন খুব একটা পরিলক্ষিত হয় না, ১০০% বোল থেকে তুলা পাওয়া যায়। সুপ্রিম সীড কোম্পানী লিমিটেড কর্তৃক এই জাতটি বাজারজাত হচ্ছে। বিঘা প্রতি ফলন ১৪-১৫ মণ।
ডি.এম-১ হাইব্রিডঃ জাতটি গণচীন থেকে আমদানী করা হয়েছে। জীবনকাল ১৫০-১৫৫ দিন, জিওটি ৪২% এর বেশী, ডাল ভেঙ্গে পড়ে না, আঁশ মিহি, লম্বা ও মজবুত স্পটেড বোলওয়ার্ম এর আক্রমন তেমন একটা পরিলক্ষিত হয় না৷ জাতটি লালতীর কোম্পানী কর্তৃক বাজারজাত করা হচ্ছে। ফলন বিঘা প্রতি ১৪-১৫ মণ।
এছাড়াও পাহাড়ী অঞ্চলে পাহাড়ী তুলা-১ ও পাহাড়ী তুলা-২ নামে উচ্চ ফলনশীল তুলার চাষ হয়ে থাকে।
বীজ প্রক্রিয়াজাতকরন ঃ বপনের সুবিধার জন্য তুলাবীজ ৩-৪ ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে নিয়ে তা ঝুরঝুরে মাটি বা শুকনো গোবর অথবা ছাই দিয়ে এমনভাবে ঘষে নিতে হবে যেন আঁশগুলো (ফাঁজ) বীজের গায়ে লেগে না থাকে এবং বীজ একটা হতে অন্যটা আলাদা হয়ে যায়। এছাড়া লঘু সালফিউরিক এসিড দিয়ে বীজ আঁশ মুক্ত করেও বপন করা যায়। এতে বীজের গায়ে লেগে থাকা রোগ জীবানু ও পোকার ডিম নষ্ট হয়ে যায়।
বীজের হার ও বপনের পদ্ধতি ঃ বীজের হার: তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব ওপি জাতের ক্ষেত্রে প্রতি একরে প্রায় ৩ কেজি এবং হাইব্রিড বীজের ক্ষেত্রে প্রতি একরে ১.৫-১.৮ কেজি বীজ দরকার হয়।
বপন পদ্ধতি ঃ উত্তর-দক্ষিন লাইন করে সারিতে বীজ বপন করা উত্তম। হাত লাঙল দিয়ে হালকাভাবে সারি টেনে অনুমোদিত সার প্রতি সারিতে ভাল করে নিয়ে তা প্রয়োগ করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। এরপর নির্ধারিত দূরত্ব ১.২৫ সেঃ মিঃ থেকে ২.৫ সেঃ মিঃ গভীরে ৩/৪টি বীজ বুনে তা ঢেকে দিতে হবে।
সিবি – ১ সারির দূরত্ব – ১০০ সেঃ মিঃ ও গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৫০-৬০ সেঃ মিঃ। অন্য সকল জাত সারির দূরত্ব – ৯০-১০০ সেঃ মিঃ ও গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৪৫-৫০ সেঃ মিঃ।
অতিবৃষ্টিজনিত কারন বা অন্য প্রতিকূল আবহাওয়ায় জমি চাষ করা সম্ভব না হলে এবং মাটি খুব ভিজে থাকলে ডিবলিং পদ্ধতিতে সারিতে বীজ পুঁতে দিতে হবে। এই পদ্ধতিতে অনুমোদিত সার গর্তে প্রয়োগ করে ৩/৪টি বীজ নির্ধারিত দূরত্বে বপন করতে হবে।
অনেক সময় শ্রাবন-ভাদ্র মাসে জমিতে আউশ ধান বা পাট থাকে কিংবা প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারনে জমি পানিতে প্লাবিত থাকে, যে অবস্থায় বীজ বপন সম্ভব নয়। এরূপ অবস্থায় পলিব্যাগে চারা উৎপন্ন করে ২০-৩০ দিন বয়সের চারা রোপণ করতে হবে।
সার প্রয়োগঃ তুলা চাষের জমি উর্বর হওয়া বাঞ্ছনীয়। উর্বরতা মান কম হলে জমিতে হেক্টর প্রতি ৫-৬ টন গোবর সার বা কম্পোস্ট সার প্রয়োগ করতে হবে। এরূপে জৈব সার প্রয়োগ করা হলে জমিতে তুলনামূলকভাবে কম রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হয়। এছাড়া জৈব সার প্রয়োগে জমিতে গৌণ পুষ্টি উপাদানের চাহিদাও পূরন হয়।
মাটির পিএইচ মান ৬.৫-এর কম হলে জমিতে হেক্টর প্রতি ২ টন চুন প্রয়োগ করতে হবে (বীপ বপনের ১ মাস পূর্বে বপন করতে হবে)। জৈব সার জমি তৈরির প্রথম দিকে প্রয়োগ করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।
জমির মাটি যদি এঁটেল প্রকৃতির বা লাল মাটি হয় তবে উক্ত ০.৭৫ অংশ সমান দু’ভাগে ভাগ করে চারার বয়স ২০-২৫ দিন ও ৫০-৬০ দিন এর সময় পার্শ্ব প্রয়োগ ভিত্তিতে প্রয়োগ করা উত্তম। সার পার্শ্ব প্রয়োগের পূর্বে তুলা গাছের সারির পার্শ্বে (৫/৭ সেঃমিঃ দূরে) হাত লাঙল দিয়ে হালকা নালা কাটতে হবে। এই নালায় টানাভাবে সার প্রয়োগ করার পর মাটি দ্বারা নালা পুনরায় ঢেকে দিতে হবে।
পরিচর্যা
(ক) পাতলাকরণ ঃ চারা গজানোর ১০ দিন পর প্রথমবার প্রতিগর্তে ২টা ভাল চারা রেখে অবশিষ্ট চারাগুলো তুলে ফেলতে হবে। চারার বয়স ২০/২৫ দিন হলে দ্বিতীয়বার প্রতিগর্তে একটি সুস্থসবল মোটা চারা রেখে বাকিগুলো তুলে ফেলতে হবে।
(খ) নিড়ানিঃ প্রতিবার চারা পাতলা করার সময় আগাছা নিড়িয়ে ফেলতে হবে। গাছের গোড়ার মাটির উপরের স্তরে যদি শক্ত আস্তরন হয় তবে তা আগাছা নিড়ানোর সময় ভেঙ্গে দিতে হবে। আগাছা বেশি হলে সর্বাধিক ৩ বার আগাছা নিড়িয়ে দিতে হবে।
(গ) সেচ-নিষ্কাশনঃ রবি মৌসুমে মাটির আদ্রতা কম থাকতে পারে। মাটির রস আছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করে ২-৩ বার সেচ দিতে হবে। বর্ষা মৌসুমে তুলা চাষ করলে কখনো কখনো জলাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে। এরূপ অবস্থা দেখা দিলে দ্রুত জলাবদ্ধতার অবসান ঘটাতে হবে।
(ঘ) পোকামাকড় দমন ও রোগ দমনঃ পোকামাকড়ের মধ্যে বোল ওয়ার্ম তুলার প্রধান শক্র। গাছের বয়স ৩/৪ সপ্তাহ হলে এই পোকার কীড়া গাছর কান্ড (উপরের দিকের অংশ) ছিদ্র করে ঢুকে পড়ে ও কচি অংশ খেতে থাকে। সেজন্য ডগা নিস্তেজ হয়ে পড়ে ও পরে শুকিয়ে যায়। পোকার উপদ্রব বেশি হলে এরা ফুল ও ফল আক্রমন করে। ফলে ফুল-ফল ঝরে পড়তে থাকে। পোকার আক্রমণের শুরুতে আক্রান্ত ডগা, কুঁড়ি বা ফল হাত দ্বারা কীড়া সমেত বেছে নিরাপদ দূরত্বে মাটির নিচে পুঁতে বা পুড়িয়ে এর উপদ্রব কমানো যায়। হাত বাছাইয়ের পর কীটনাশক ঔষধ ব্যবহার করা যেতে পারে। হেক্টর প্রতি ৩০০ মিঃ লিঃ রিপকর্ড/সুমিসাইডিন/সিমবুশ/ডেসিস২০-২৫ লিটার পানির সাথে মিশিয়ে (প্রতি ¯েপ্র মেশিনে ১২-১৫ মিঃলি ঔষধ) ভালভাবে পুরো গাছে ছিটিয়ে দিতে হবে। এই পোকা দমন করার জন্য আক্রমনের তীব্রতা অনুযায়ী ১৫-২০ দিন পর পর ৩-৪ বার ঔষধ ছিটানোর প্রয়োজন হতে পারে।
তুলা ফসলের অন্যান্য পোকামাকড়ের মধ্যে জ্যাসিড, জাব পোকা ও তুলার পাতা মোড়ানো পোকার উপদ্রব দেখা যেতে পারে। এসব পোকার আক্রমন সহজভাবে নিয়ন্ত্রন করতে না পারলে অনুমোদিত ঔষধ মাত্রানুযায়ী প্রয়োগ করতে হবে।
তুলা গাছে বেশ কয়েকটি রোগের প্রার্দুর্ভাব দেখা দিতে পারে; যথা- পাতা ঝলসানো, এনথ্রাকনোজ, নেতিয়ে পড়া, চারা ধসা ইত্যাদি। বীজবাহিত রোগের জন্য বীজ শোধন করে বীজ বপন করতে হবে। রোগাক্রান্ত চারা তুলে পুড়িয়ে ফেলা উত্তম। জমিতে পানিবদ্ধতা থাকতে দেয়া যাবে না। রোগাক্রমণের সম্ভবনা আছে এমন ক্ষেতে ৫% কপার অক্সিক্লোরাইড বা ২.৫% ডাইথেন-এমএ ৪৫ প্রয়োগ করা যেতে পারে।
তুলা সংগ্রহ ঃ তুলা গাছের বোল ভালভাবে ফেটে বের হলে পরিষ্কার শুকনা দিনে বীজতুলা উঠাতে হয়। সাধারণত ৩ বারে ক্ষেতের তুলা উঠাতে হয়। প্রথমবার এমন সময় তুলা উঠাতে হবে যেন মোট ফলনের ৪০%-৫০% তুলা উঠানো যায়। দ্বিতীয় কিস্তি ও তৃতীয় কিস্তিতে যথাক্রমে ২৫% বা ৩০% এবং অবশিষ্ট তুলা উঠাতে হয়। সাধারণত প্রথমবারের তুলা ভাল হয়। তাই প্রথমবারের তুলা আলাদা রাখতে হয়। তুলা উঠানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে ময়লা, মরা পাতা ও পোকায় আক্রান্ত খারাপ অপুষ্ট তুলা যেন ভাল তুলার সাথে মিশে না যায়। ভাল তুলা পৃথক করে তা ৩/৪ দিন ভাল করে শুকিয়ে গুদামজাত করতে হবে।
ফলন ঃ স্বভাবিক অবস্থায় কৃষকের সক্রিয়তা থাকলে হেক্টর প্রতি ১২-১৫ কুইন্টাল বীজ তুলা উৎপন্ন হয়। তবে যথাযথ উন্নত প্রযুক্তি অবলম্বনে তুলা চাষ করলে ফলন এর দ্বিগুন পাওয়া যায় বলে জানা গেছে।
তুলা বলতে বীজ হতে উৎপন্ন আঁশকে বুঝায়। বীজের বহিঃত্বকের কিছু কোষের বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে এই আঁশের জন্ম হয়। আঁশগুলো এককোষ বিশিষ্ট এবং দু’ধরনের- ছোটগুলো ঋধুু এবং বড়গুলো লিন্ট নামে পরিচিত। এই লিন্ট ও ফাজসহ বীজকে বীজতুলা বলে। এটিই ফসল হিসেবে গাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় এবং রোদে শুকিয়ে বাজারজাত করা হয়। বস্ত্র শিল্পের প্রয়োজনে ক্ষেতের উৎপাদিত বীজতুলাকে জিনিং করা হয়। (জিনিং-এর অর্থ বয়ন কাজে ব্যবহৃতব্য লিন্টকে বীজতুলা থেকে আলাদা করা)। সাধারণভাবে জাত ও মানের বিভিন্নতায় বীজতুলা হতে ৩০%-৪০% লিন্ট সংগৃহীত হয় এবং এই হারকে জিনিং শতাংশ বা বলে। তুলা উৎপাদন করার জন্য ব্যবহৃত (বপন করা) বীজকে তুলা বীজ বলে যাতে লিন্ট থাকে না, ফাজ থাকে।

শরীরের সুস্থতা ও সচেতনতাবোধ সৃষ্টিসহ উদ্দীপক ও কান্তিনাশক হিসেবে স্টিভিয়ার ব্যবহার অদ্বিতীয়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ মানুষের জীবনে মেধার বিকাশ এবং শারীরবৃত্তীয় পরিপক্বতা আসতে সাধারণত সময় লাগে ৪০ বছর। এ বয়সে সুস্থ ও ভালো থাকা বিষয়টি যত না অনুভূত হয় তার চেয়ে অনেক বেশি ভুক্তভোগী হতে হয় বয়স ৪০ এর কোঠা পার হতে না হতেই। ইতোমধ্যে চোখে কম দেখা, স্মরণশক্তি কমে যাওয়া, চুল পাকা, ইন্দ্রিয় শৈথিল্যতা, ব্লাড প্রেসার, ডায়াবেটিকস, বাত, গ্যাস্টিক, আলসার, ক্যান্সার ইত্যাদি অসুস্থতার উপসর্গগুলো  দেখা দিতে থাকে। এমতাবস্থায় ভালো থাকা ও সুস্থ থাকা একদিকে যেমন ওষুধনিভর্র হয়ে পড়ে অপরদিকে তেমন কমতে থাকে খাওয়া-পরার উৎকর্ষতা এবং অন্যান্য ভোগবিলাসের কৃচ্ছ্রতা কিংবা স্বাধীনতা। আর আমাদের দেশে এ বয়সে অসুস্থতার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হলো-হাইপারটেনশন বা ব্লাডপ্রেসার এবং ডায়াবেটিস রোগ। এমতাবস্থায় দেহের  কোলস্টেরল কমাতে চর্বি জাতীয় সুস্বাদু উন্নত খাবার খাওয়া যেমন নিষিদ্ধ হয়ে যায় ডায়াবেটিস থেকে রেহাই পেতেও তেমনি ক্যালরিযুক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার পরিহার করতে হয়। কিন্তু আকর্ষণীয় খাবার টেবিলে বসে জিহবার চাহিদা, চোখের ক্ষুধা ও মনের ক্ষুধা তো আর সহজে দমন করা যায় না। কিন্তু ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন হলো জীবনধারণের জন্য শাকসবজি জাতীয় ভেষজ ও নিরামিষ খাবার খাওয়া। তবে  ভেষজ খাবার কেবল পরিহারযোগ্য খাবারের বিকল্পই নয় বরং মনের ক্ষুধা, চোখের ক্ষুধা, জিহবার চাহিদা এমনকি ঔষধির চাহিদা পূরণ করে থাকে। ঠিক এমনি এক  ভেষজগুণে সমৃদ্ধ গুল্মজাতীয় মিষ্টি গাছ স্টিভিয়া। অবিশ্বাস্য হলেও আমাদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুখবর বৈকি। এ যেন সৃষ্টিকর্তার এক অলৌকিক সৃষ্টি রহস্য।

স্টিভিয়ার পরিচিতি এবং উদ্ভিদ প্রকৃতি ঃ স্টিভিয়া মূলত অনেক আগে থেকেই প্যারাগুয়ের পাহাড়ি অঞ্চলে শত শত বছর ধরে চাষাবাদ করা হতো তবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সেখানে চাষাবাদ শুরু হয় ১৯৬৮ সনে। অতপর ব্রাজিল, চীন, কোরিয়া, কানাডা, আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে ফসল হিসেবে গাছটির চাষ প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

বর্তমানে চীনে ব্যাপকভাবে স্টিভিয়ার চাষ হয়ে থাকলেও বাণিজ্যিক ব্যবহারের দিক দিয়ে জাপান অনেক অগ্রসর। জাপানে প্রায় ৪০% চিনির চাহিদা মেটানো হয়ে থাকে স্টিভিয়া দিয়ে। অতি আনন্দের বিষয় স্টিভিয়া পার্শ্ববর্তী দেশসহ বর্তমানে আমাদের  দেশেও দিন দিন ব্যাপক পরিচিতি লাভ করছে। সৃষ্টিকর্তার অলৌকিক সৃষ্টি রহস্য অস্বাভাবিক মিষ্টি এবং ভেষজগুণ সম্পন্ন এ স্টিভিয়া গাছটির উদ্ভিদতাত্ত্বিক সংক্ষিপ্ত পরিচিতি হলো-স্টিভিয়া কম্পোজিট ফ্যামিলির অন্তর্ভুক্ত বহু বর্ষজীবী গুল্মজাতীয় একটি ভেষজ উদ্ভিদ। স্টিভিয়া সর্বোচ্চ ৬০-৭০ সেন্টিমিটার উচ্চতা বিশিষ্ট হয়। সবুজ রঙের পাতাগুলো কান্ডের সাথে বিপরীতমুখী বিন্যাসে থাকে এবং পাতার কিনারা খাঁজ কাটা ও বর্শাকৃতির। উদ্ভিদটি অনেকটাই এ্যাস্টার ফুল গাছের মতো। এর ফুল ছোট ও সাদা রঙের এবং কীটপতঙ্গ দ্বারা পরাগায়িত। বীজ এন্ডোস্পারম যুক্ত ক্ষুদ্রাকৃতির। স্টিভিয়া সাধারণত রৌদ্র পছন্দের এবং ছোট দিনের উদ্ভিদ। তবে  রৌদ্র পছন্দের হলেও দিনের ভাগ ১৩ ঘণ্টার বেশি অপছন্দনীয়। স্টিভিয়া গাছটির সবুজ পাতাই মূলত কার্যকরী মিষ্টি উপাদানের প্রধান উৎস।

স্টিভিয়ার গুণাগুণ ঃ স্টিভিয়ার অতি গুরুত্বপূর্ণ গুণ বৈশিষ্ট্য হলো এর মিষ্টতায় কোনো ক্যালোরি কিংবা কার্বোহাইড্রেট নেই। ফলে দেহে কখনো শোষিত হয় না কিংবা  কোনো তাপ উৎপাদন করে না। শুধু মিষ্টি ও চর্বিযুক্ত খাবারের চাহিদাই পূরণ করে থাকে যা ডায়াবেটিস ও ব্লাড প্রেসার রোগীদের জন্য মিষ্টির বিকল্প হিসেবে এক মহা সুখবর বৈকি। এ যেন সৃষ্টিকর্তার এক অলৌকিক নিদর্শন। কারণ এটি অকল্পনীয়ভাবে মানুষের দেহে অগ্ন্যাশয় হতে ইনসুলিন নিঃসরণে সহায়তা করে এবং ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখে। ফলে স্টিভিয়া হাইপারটেনশন রোগীদেরও উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ করে। শুধু তাই নয়, শরীরের সুস্থতা ও সচেতনতাবোধ সৃষ্টিসহ উদ্দীপক ও কান্তিনাশক হিসেবে স্টিভিয়ার ব্যবহার অদ্বিতীয়। এ ছাড়াও দাঁতে ব্যাকটেরিয়াজনিত তি ও য় রোধে স্টিভিয়া যেমন অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে তেমনি পাকস্থলিতে হজমে সহায়তা করে। যকৃত, অগ্ন্যাশয় ও প্লীহায় পুষ্টি সরবরাহ করে এবং ত্বকের য় নিরাময় করে।

চাষ পদ্ধতি ঃ জৈব সারযুক্ত ও নিষ্কাশনযুক্ত দো-আঁশ মাটি এবং সাধারণত ১৫-৩০  সেলিসিয়াস তাপমাত্রা স্টিভিয়া চাষের জন্য খুবই উপযোগী। এ কারণে আমাদের  দেশে প্রায় সারা বছরই মাঠ ফসল হিসেবে স্টিভিয়ার চাষ করা যায়। বাড়ির বারান্দায় রৌদ্রযুক্ত স্থানে কিংবা বাড়ির ছাদে ৫-৬ ইঞ্চি টবে কিংবা পলিথিনে চারা  রোপণের মাধ্যমে ইতোমধ্যে স্টিভিয়ার চাষ ব্যাপকতা লাভ করেছে। মাঠ ফসল হিসেবে স্টিভিয়ার চাষ এত লাভজনক যে একজন চাষি প্রতি বছর বিঘাপ্রতি কয়েক লাখ টাকা অনায়াসে আয় করতে পারেন। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে গাছটি চাষ করে ইতোমধ্যে একর প্রতি ২.০-২.৫ লাখ রুপি মুনাফা অর্জন করছে।

আমাদের দেশেও সংশ্লিষ্ট কৃষি বিজ্ঞানীরা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গাছটির চাষাবাদ নিয়ে মাঠ পর্যায়ে গবেষণা কার্যক্রম চালালে কৃষক পর্যায়ে আরো ব্যাপকতা লাভ করতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে ব্যাপক হারে চাষের জন্য বীজ একটি বড় সমস্যা। বীজ সমস্যার কারণে আমাদের দেশে গাছটি আপাতত টিস্যু কালচারের মাধ্যমে ব্যাপকতা লাভ করেছে। ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্র, ঈশ্বরদী এবং ব্র্যাক টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি, গাজীপুর এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। পলিথিনে এবং টবে করে বিক্রি হচ্ছে স্টিভিয়ার চারা। আগ্রহী ক্রেতাদের ভিড় দিন দিন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

স্টিভিয়ার ব্যবহার ঃ যাদের ডায়াবেটিস কিংবা ব্লাড প্রেসার আছে তারা নিজ বসতবাড়িতে মাত্র দু-একটি টবে বহু বর্ষজীবী এ গাছ যতœ সহকারে চাষ করলে পরিবারে চিনির চাহিদা পূরণ করা কোনো ব্যাপারই নয়। প্রতি ১ কেজি খাবার মিষ্টিকরণের জন্য মাত্র ৭.৯ মিলিগ্রাম স্টিভিয়া যথেষ্ট। এক গ্লাস পানিতে ১-২টি কাঁচা পাতার রস মিশিয়ে দিলেও অনেক মিষ্টি পাওয়া যায়। তাই সরবত, চা, কফি,   সেমাই এবং অন্যান্য পানীয় দ্রব্যে ব্যবহার্য মিষ্টি উপাদান হিসেবে স্টিভিয়া ব্যবহার করা যেতে পারে।

স্টিভিয়ার পাতা গুঁড়া করে পাউডার, ট্যাবলেট কিংবা তরল প্যাকেজে বাজারজাত করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, এক কেজি কাঁচা পাতা শুকিয়ে প্রায় ২০০-৩০০ গ্রাম পাউডার পাওয়া যেতে পারে। এসব তরল কিংবা পাউডার অথবা স্টিভিয়া হতে উৎপাদিত চিনি পাউরুটি এবং বিস্কুট তৈরির কারখানাগুলোতে ডায়াবেটিক্স্ ও ব্লাড  প্রেসার রোগীদের জন্য বিশেষ রুটি ও বিস্কুট তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক।

বাংলাদেশে ডায়াবেটিস ও ব্লাড প্রেসার রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে এবং এ দেশ স্টিভিয়া চাষের জন্য খুবই উপযোগী প্রোপটে কৃষি বিজ্ঞানী, চাষি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যাপক হারে স্টিভিয়া চাষের ব্যাপারে উদ্যোগী হলে এ উদ্ভিদটি এ দেশের কৃষি সেক্টরে তো বটেই জাতীয় রাজস্ব খাতেও ব্যাপক সাড়া জাগাতে পারে। এ ছাড়াও হোমিও, সাধনা, আয়ুর্বেদিক এবং কবিরাজিসহ ভেষজ গাছ-গাছড়া নিয়ে যারা গবেষণা করেন তারাও স্টিভিয়া থেকে ব্যাপকভাবে লাভবান হতে পারেন। কৃষি প্রধান এবং চাষ উপযোগী বাংলাদেশে স্টিভিয়ার ব্যাপক চাষ, গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট শিল্প কারখানা চালু করতে পারলে এ দেশের আর্থ-সামাজিকসহ জাতীয় উন্নয়ন খাতে কাঙ্খিত প্রবৃদ্ধি অতি সম্ভাবনাময়।