মটরশুঁটি শীতপ্রধান ও আংশিক আর্দ্র জলবায়ুর উপযোগী ফসল

কৃষি প্রতিবেদক ॥ মটরশুঁটি দেখলে প্রথমেই মনে পড়ে ছোট বেলায় পাঠ্য বইতে পড়া, পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের সেই বিখ্যাত কবিতা ‘নিমন্ত্রণে’র কথা। তখন কবিতা পড়তে পড়তে মনে হতো আমিও সেই নিমন্ত্রণের অংশীদার। কবিতার এই অংশটুকু আমার মতো অনেকেরই হয়তো খুব প্রিয় ছিল- তুমি যদি যাও, দেখিবে সেখানে মটর-লতার সনে/শিম আর শিম, হাত বাড়ালেই মুঠি ভরে সেইক্ষণে। তুমি যদি যাও সেসব কুড়ায়ে, নাড়ার আগুনে পোড়ায়ে পোড়ায়ে/ খাব আর যত গেঁয়ো চাষিদের ডাকিয়া নিমন্ত্রণে, হাসিয়া হাসিয়া মুঠি মুঠি তাহা বিলাইব জনে জনে। মটরশুঁটি আমাদের অনেকেরই খুব প্রিয় সবজি। এটা কাঁচা, পাকা যেমন ইচ্ছা খাওয়া যায়। কচি আর কাঁচাগুলো এমনিতে ছিলে খেতে খুবই মজা আর স্বাদও অতুলনীয়, আবার নাড়ার আগুনে পুড়িয়ে বা সিদ্ধ করে খেতেও ভারী মজা লাগে। বড় যে কোনো ধরনের মাছ বা ছোট মাছ রান্না করার শেষের দিকে কিছু মটরশুঁটি দিয়ে দিলে যেন দিগুণ বেড়ে যায় তরকারির স্বাদ। বিশেষ করে রুই, কাতলা, পাবদা, কই, শোল, শিং, মাগুর ইত্যাদি। এ ছাড়া বিকেলের নাস্তায় মটরশুঁটি ভাজির তুলনা নেই। পাকা শুকানো মটরশুঁটির চটপটি, ফুচকা কার না প্রিয়। বিভিন্ন খাবারের স্বাদ বাড়াতে মটরশুঁটির জুড়ি নেই। মটরশুঁটি হলো লিগিউমিনাস জাতীয় উদ্ভিদ, গোলাকার বীজ। মটরশুঁটি বর্ষজীবী উদ্ভিদ। আমাদের দেশে শীতকালে মটরশুঁটির চাষ করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে মটরশুঁটির চাষ করা হয়ে থাকে। প্রতিটি মটরশুঁটির মধ্যে বেশ কয়েকটি বীজ থাকে, যদিও এটি এক প্রকারের ফল। গড়ে প্রতিটি মটরশুঁটির ওজন ০.১ থেকে ০.৩৬ গ্রাম। মটরশুঁটি লতানো গাছ। এই গাছ দুই থেকে আড়াই ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। মটরশুঁটির পাতা মিষ্টি ঘ্রাণ যুক্ত। ফুল অনেক সুন্দর দেখতে। মটরশুঁটির ক্ষেত যখন ফুলে ফুলে ভরে যায়, তখন সে দৃশ্য দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠে। আমাদের দেশে এখন বিভিন্ন জাতের মটরশুঁটির চাষ আবাদ করা হয়ে থাকে তার মধ্য আরকেল, বনভিল, গ্রিন ফিস্ট, আলাস্কা, স্নো-ফ্লেক, সুগার স্ন্যাপ উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি মটরশুঁটি-১, বারি মটরশুঁটি-২ এবং বারি মটরশুঁটি-৩ নামের ৩টি জাত অবমুক্ত করেছে। মটরশুঁটি শীতপ্রধান ও আংশিক আর্দ্র জলবায়ুর উপযোগী ফসল। মটরশুঁটির জন্য দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি সবচেয়ে ভালো। মাটি অবশ্যই সুনিষ্কাশিত হতে হবে। বাংলাদেশে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে মটরশুঁটির চাষ হয়। প্রতি ১০০ গ্রাম মটরশুঁটি থেকে প্রায় ৮০-১০০ কিলোক্যালোরি শক্তি পাওয়া যায়। এতে কার্বোহাইড্রেট ১৪.৫ গ্রাম, ফ্যাট ০.৫ গ্রাম এবং প্রোটিন ৫.৪ গ্রাম আছে। এ ছাড়া মটরশুঁটিতে আরও আছে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, জিঙ্ক ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন, ভিটামিন সি, ফলিক অ্যাসিড, বিটাক্যারোটিন, ফসফরাস, ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স। সামান্য পরিমাণে ভিটামিন কেও আছে। মটরশুঁটিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আঁশ ও প্রোটিন। ফ্যাটের পরিমাণ খুব কম। এতে প্রোটিন, ফাইবার, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট এবং প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-এ আছে। আমাদের দেশে শুকনো মটরশুঁটি ডাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই ডাল চটপটি এবং বিভিন্নভাবে রান্না করে খাওয়া হয়। এ ছাড়াও কচি মটরশুঁটি সবজি এবং গাছের কচি ডগা শাক হিসেবে খাওয়া হয়। এই শাক খেতে দারুণ সুস্বাদু। আমাদের দেশে মূলত সবজি হিসেবে মটরশুঁটি রান্নায় ব্যবহৃত হয়।

মিরপুরে একযোগে ৪০টি কৃষি ব্লকে আলোক ফাঁদ

আমলা অফিস ॥ নির্বিঘেœ আমন ধান কৃষকের ঘরে তুলতে ক্ষতিকর পোকা বিশেষ করে বাদামী গাছ ফড়িং এর উপস্থিতি নির্ণয়ে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ৪০টি কৃষি ব্লকে একযোগে আলোক ফাঁদ স্থাপন করা হয়েছে। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় উপজেলার সকল ইউনিয়নের সকল কৃষি ব্লকে এ আলোক ফাঁদ স্থাপন করা হয়। মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রমেশ চন্দ্র ঘোষ জানান, ক্ষতিকর পোকা বিশেষ করে বাদামী গাছ ফড়িং এর উপস্থিতি নির্ণয়ে জন্য আমরা উপজেলাব্যাপি এক যোগে আলোক ফাঁদ স্থাপন করেছি। সেই সাথে পোকা ব্যবস্থপনায় কৃষকদের পরামর্শ প্রদান করেছি। তিনি বলেন, রাতের বেলা আলোতে অনেক পোকা আকৃষ্ট হয়। তাই আলো ব্যবহার করে ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আলোর উৎস হিসাবে হ্যাজাক, হারিকেন, মশাল ব্যবহার করে তার নিচে একটি পাত্রে পানি রাখতে হবে এবং পানিতে সাবানের গুঁড়া মিশ্রিত করে দিতে হবে। কেরোসিন মিশ্রিত পানিও ব্যবহার করা যেতে পারে। আলোতে আকৃষ্ট হয়ে পোকা উড়ে আসবে এবং সেখানে ধাক্কা খেয়ে পানির পাত্রে পড়ে মারা যাবে। সন্ধ্যা থেকে শুরু করে ২-৩ ঘণ্টা পর্যন্ত আলোক ফাঁদ কার্যকর থাকে। আলোক ফাঁদ জমির বাইরে ব্যবহার করতে হবে। একা ব্যবহার না করে অনেকে মিলে ব্যবহার করলে ভালো কাজ করবে। জমির আইল থেকে আনুমানিক ৫০ মিটার দূরে স্থান নির্বাচন করতে হবে। প্রথমে বাঁশের তিনটি খুঁটি ত্রিভুজ আকারে মাটিতে পুঁতে মাথার অংশ একত্রে বেঁধে দিতে হয়। এরপর মাটি থেকে আড়াই থেকে তিন ফুট উপরে একটি জলন্তবাল্ব খুঁটির তিন মাথার সংযোগস্থলে রশি সাহায্যে ঝুলিয়ে দিতে হবে। এর নিচে একটি বড় আকারের প্লাস্টিকের গামলা বা পাত্রে ডিটারজেন্ট পাউডার অথবা কেরোসিন মিশ্রিত পানি রেখে এমনভাবে বসাতে হবে, যাতে পোকা এর বাহিরে না পড়ে।

অপুষ্টি কমাতে বাড়াতে হবে ডিম খাওয়ার প্রবণতা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ স্বল্পআয়ের মানুষের মাঝে বেশি করে ডিম খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে দেশের অপুষ্টির চিত্র পাল্টে যাবে। বর্তমানে দেশে দৈনিক ডিম উৎপাদন হয় কম-বেশি ৩ কোটি ৮০ লাখ। পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, সারাদেশে বর্তমানে প্রায় ৬৫-৭০ হাজার ছোট-বড় খামারে প্রতিদিন ডিম উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ থেকে ২৫ লাখ। আগে হ্যাচিং ডিম আমদানি করতে হতো। এখন বাংলাদেশে ৭টি গ্রান্ড প্যারেন্টস্টক (জিপি) ফার্ম আছে। প্যারেন্টস্টক বা পিএস ফার্মের সংখ্যা ছোট-বড় মিলে প্রায় ৮০টি। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দিয়েই দেশের হ্যাচিং ডিমের শতভাগ চাহিদা পূরণ হচ্ছে। ২০১৪ সালে প্রতিদিন ডিম উৎপাদন হতো প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ। বছরে উৎপাদন ছিল প্রায় ৬৩৯ কোটি। মাথাপিছু খাওয়া হতো প্রায় ৪১টি। ২০১৫ সালে ডিম দিনে উৎপাদন হতো প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখ। বছরে উৎপাদন ছিল প্রায় ৭১২ কোটি। মাথাপিছু খাওয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫টি। ২০১৬ সালে দিনে উৎপাদন হয় প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ থেকে ২৫ লাখ। বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ৮২১ কোটি। বর্তমানে মাথাপিছু খাওয়া হয় প্রায় ৫১টি। এই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালে দৈনিক উৎপাদন হবে প্রায় ৪ কোটি ৫ লাখ ডিম। আর তখন মাথাপিছু কনজাম্পশন হবে প্রায় ৮৬টি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০৪১ সাল নাগাদ যে বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন তা বাস্তবায়ন করতে হলে ডিমের মাথাপিছু কনজাম্পশন অন্তত দ্বিগুণ করতে হবে। প্রতিটি মানুষকে দৈনিক অন্তত একটি করে ডিম খাওয়ার অভ্যাস করার মতো আর্থিক সক্ষমতায় উন্নীত করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে মেধাবী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে এবং পুষ্টির ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলছে এই পোল্ট্রি শিল্প। প্রাণিজ প্রোটিনের অন্যতম উৎস হলো ডিম। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, চর্বি একেবারে খাওয়া ভালো নয়, কথাটা সঠিক নয়। যা ভালো নয়, তা হলো সম্পৃক্ত চর্বি এবং ট্রান্সফ্যাট। গরু খাসির মাংসের জমাট চর্বি, ঘি, মাখন, ক্রিম, পেস্ট্রি ও ডিপ-ফ্রাই খাবারে আছে এ ধরনের ক্ষতিকর চর্বি। বাদ দিতে হলে এগুলো বাদ দিন। আর স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মানে কেবল অস্বাস্থ্যকর খাবার বাদ দেয়া নয়। আমরা জানি, প্রাণিজ প্রোটিনের মধ্যে ডিম অন্যতম। ডিমে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা হৃদরোগসহ অনেক রোগের বিরুদ্ধে বেশ কার্যকরী। সাধারণ হিসেবে ১০০ গ্রাম খাসির মাংস থেকে যে প্রোটিন পাওয়া যায়, সেই একই পরিমাণ প্রোটিন মেলে ৪টি ডিম থেকে। হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে, নারীদের অ্যাডোলেশন পিরিয়ডে বা পরবর্তীকালে সপ্তাহে কমপক্ষে ৬টি ডিম খেলে ব্রেস্ট ক্যান্সারের সম্ভাবনা প্রায় ৪৪ ভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিজ্ঞানীরা ডিম কে একটি ‘পরিপূর্ণ খাদ্য’ বা কমপ্লিট ফুড বা সুপার ফুড হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ডিমের মতো এত স্বল্পমূল্যের প্রাণিজ আমিষ দ্বিতীয়টি নেই। কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের পাশাপাশি চাহিদার ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ মাংস ও আমিষের জোগানদাতা হিসেবেও অবদান রাখছে পোল্ট্রি শিল্প। ভুট্টা ও সয়াবিনের সমন্বয়ে অর্গানিক পদ্ধতিতে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে এ শিল্পের খাবার। ফলে আমিষের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে উৎপাদনও। নতুন আশা নিয়ে সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০২১ সালের মধ্যে বছরে ১২০০ কোটি ডিম ও ১০০ কোটি ব্রয়লার উৎপাদনের পোল্ট্রি শিল্প সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, ২০২১ সাল নাগাদ দেশে প্রতিদিন সাড়ে ৪ কোটি ডিম ও প্রায় ৪ হাজার টন মুরগির মাংসের প্রয়োজন হবে। তার মানে অর্থনীতিতে এই শিল্পের অবদান ও ভূমিকা ব্যাপকতর হওয়ার বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে। বিপিআইসিসি সূত্রে জানা গেছে, আগে হ্যাচিং ডিম আমদানি করতে হতো। এখন বাংলাদেশে গ্রান্ড প্যারেন্টস্টক (জিপি) ফার্ম আছে। প্যারেন্টস্টক বা পিএস ফার্মের সংখ্যা ছোট-বড় মিলে প্রায় ৮০টি। আশার খবর হচ্ছে এখন অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দিয়েই দেশের হ্যাচিং ডিমের শতভাগ চাহিদা পূরণ হচ্ছে। আধুনিক হ্যাচারিগুলোতে যান্ত্রিক উপায়ে সপ্তাহে এক কোটি ১০ লাখেরও বেশি ডিম ফোটানো হয়। মুরগি পালনের ক্ষেত্রেও যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। খাবার ও পানি সরবরাহ, ডিম সংগ্রহ সবকিছু স্বয়ংক্রিয় উপায়ে করা হয়। ফলে ভোক্তারা সহজেই স্বাস্থ্যকর ও জীবাণুমুক্ত ডিম ও মুরগির মাংস পাচ্ছেন। পোল্ট্রি শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। জানা গেছে, ১৯৪৭ সালে ছয়টি পোল্ট্রি ফার্ম স্থাপনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে এ শিল্পের যাত্রা শুরু হলেও ১৯৮০ সালের দিকে বাণিজ্যিকভাবে পোল্ট্রি শিল্পের বিকাশ ঘটতে থাকে। গত তিন দশকে তা দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প খাতে রূপ নিয়েছে। প্রায় ৬০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, সুস্থ থাকার জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে বছরে গড়ে ১০৪টি ডিম খাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ বছরে ডিম খায় গড়ে মাত্র ৪৫-৫০টি। তবে আশার খবর হলো ডিম শুধুমাত্র পুষ্টি উপাদেয় খাবার হিসেবে অসুখ অসুস্থতায় অথবা অতিথি আপ্যায়নে নয়- প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ডিমের গুরুত্ব অনেকাংশে বেড়েছে।
লেখক ঃ এস এম মুকুল, কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক।

নভেম্বর মাস স্ট্রবেরি চারা রোপণের উপযুক্ত সময়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ গবেষকদের প্রচেষ্টায় এদেশে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু জাতের স্ট্রবেরি চাষ হচ্ছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের কিছু জেলায় স্ট্রবেরি ফলানো সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে যেসব জেলায় শীত বেশি পড়ে ও বেশিদিন থাকে সেসব এলাকায় স্ট্রবেরি চাষ করা যেতে পারে। মাটি ঃ বেলে ও দোঁ-আশ মাটিতে প্রচুর জৈব সার প্রয়োগ করে স্ট্রবেরি ফলানো যায়। যেসব জমিতে পানি জমে সেখানে স্ট্রবেরি ফলানো সম্ভব নয়। চারা ঃ স্ট্রবেরির চারা এখনও তেমন সহজে পাওয়া যায় না। কোনো কোনো নার্সারি থেকে সংগ্রহ করা যায়। এছাড়া স্ট্রবেরি গাছের গোড়া থেকে বেশকিছু লম্বা লম্বা লতা মাটির উপর দিয়ে লতিয়ে যায়। মাটির সংস্পর্শে লতার গিট থেকে শেকড় গজায়। শেকড়যুক্ত গিট কেটে নিয়ে মাটিতে পুঁতে দিলে নতুন চারা তৈরি হয়। অর্ধেক মাটি অর্ধেক গোবর সার মিশিয়ে পলিব্যাগে ভরে একটি করে শেকড়যুক্ত গিটসহ লতা পুঁতে দিতে হয়। এক্ষেত্রে একটি গাছ থেকে ১৮-২০টি চারা তৈরি করা সম্ভব। জমি ঃ জমি ভালোভাবে চাষ করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে অন্তত ৩০ সেন্টিমিটার গভীর করে জমি চাষ দিতে হয়। যেহেতু স্ট্রবেরি গাছের শেকড় মাটির উপর দিকে থাকে; সেজন্য মাটি ঝুরঝুরা করে নির্ধারিত মাত্রায় সার মাটিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।
রোপণ ঃ স্ট্রবেরির চারা মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য ডিসেম্বর পর্যন্ত রোপণ করা যায়। তবে নভেম্বর মাস স্ট্রবেরি চারা রোপণের জন্য সবচেয়ে ভালো। জমি তৈরির পর লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব হবে ৫০ সেন্টিমিটার ও প্রতি সারিতে ৩০ সেন্টিমিটার দূরে দূরে স্ট্রবেরির চারা লাগাতে হয়। সেচ ঃ বৃষ্টি হলে ক্ষেত থেকে অতিরিক্ত পানি সরিয়ে দিতে হবে। না হলে গাছ পঁচে যাবে। তবে ফল ধরা শুরু হলে ২-৩ দিন পর পরই সেচ দিতে হবে। সার ঃ প্রতি একরে ৫০-৬০ কেজি ইউরিয়া, ৭০ কেজি টিএসপি এবং ৮০ কেজি এমওপি সার প্রয়োগ করতে হবে। এসব সার একভাগ দিতে হয় ফুল আসার একমাস আগে এবং অন্য ভাগ দিতে হয় ফুল ফোটার সময়। যতœ ঃ গাছ লাগানোর পর গোড়া থেকে প্রচুর রানার বা কচুর লতির মতো লতা বের হতে থাকে। এগুলো জমি ঢেকে ফেলায় ফলন ভালো হয় না। সেজন্য গাছের গোড়ায় খড় বা পলিথিন বিছিয়ে দিতে হয়। পলিথিন সিট ৩০ সেন্টিমিটার পর গোলাকার ছিদ্র করে স্ট্রবেরি গাছের ঝোপকে মুঠো করে ঢুকিয়ে দিতে হয়। বেশি ফলন ও তাড়াতাড়ি ফল পেতে হরমোন গাছ পাতায় ¯েপ্র করা যেতে পারে। ফল ঃ ফল পুরো পাকলে লাল হয়ে যায়। বিক্রির জন্য পুরো লাল হওয়ার দরকার নেই। ফলগুলো শক্ত থাকা অবস্থায় তুলতে হবে। ফল তুলতে হবে বোটাসহ। ফল তোলার পর ১০-১২ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে। গড়ে প্রতি গাছে ১৫০-২০০ গ্রাম ফল ধরে।

আশা-নিরাশার দোলাচলে পোল্ট্রি শিল্প

কৃষি প্রতিবেদক ॥ পোল্ট্রি এমন একটি শিল্প যার কারণে দেশের জনগণ সুলভে ও সহজে আমিষ ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে পারছে। তৈরি পোশাক খাতের পর দেশে বিপ্লব ঘটাতে যাচ্ছে শিল্পটি। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নে কৃষির পরই সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে পোল্ট্রি শিল্প। পোল্ট্রি শুধু খাওয়ার ক্ষেত্রেই ভালো তা নয়, পৃথিবীর সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব শিল্প হচ্ছে  পোল্ট্রি। সবচেয়ে কম জমির ব্যবহার, সবচেয়ে কম দূষণ, সবচেয়ে কম পানির খরচ, সব ধরনের বর্জ্যই রিসাইকেল হয়। বেকারত্ব, দারিদ্র্য বিমোচন ও পুষ্টির সহজলভ্যতায় পোল্ট্রির উল্লেখযোগ্য অবদান দিন দিন বাড়লেও স্পর্শকাতর শিল্প হওয়ার কারণে প্রায়ই বড় রকমের ঝুঁকির মোকাবিলা করতে হয় এ শিল্পকে। অতীতে বার্ড ফ্লুর মতো ভয়ানক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে হিমশিম খেতে হয়েছে শিল্পসংশ্লিষ্টদের। ওই ক্ষতির জের এখনো অনেকে কাটিয়ে উঠতে পারেননি। পোল্ট্রি শিল্পকে জলবায়ুর পরিবর্তন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, অর্থনৈতিক মন্দা, উপকরণের উচ্চমূল্য এমনকি রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো নানান প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় প্রতিনিয়ত। এসব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে প্রান্তিক খামারি আর বৃহৎ শিল্পোদ্যোক্তাদের তিল তিল পরিশ্রমের ফলে শিল্পটি খুব দ্রুত বিকশিত হয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই মেধাবী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে এবং পুষ্টির ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই  পোল্ট্রি শিল্প ধীরে ধীরে বিকশিত হলেও অন্তরালে থেকে যাচ্ছে অনেক সমস্যা। খাতসংশ্লিষ্টদের নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকার ফলে  দেশ এখন মুরগির ডিম ও মাংসে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে রপ্তানির বিষয়ে অগ্রসর হলেও সমস্যা যেন এর পিছু ছাড়ছে না। বিভিন্ন কারণের মধ্যে একদিকে পোল্ট্রি ফিডের মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে মুরগি ও ডিমের মূল্য হ্রাসের ফলে বিপর্যয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে পোল্ট্রি খামারগুলো। সমস্যা আর সম্ভাবনার সমন্বয়হীনতায় আশা-নিরাশার দোলাচলে রয়েছে দেশের পোল্ট্রি শিল্প।

এ প্রসঙ্গে ওয়ার্ল্ড পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ বলেন, উন্নয়ন ও সুষম খাবার নিশ্চিত করতে হলে   পোল্ট্রি শিল্পের আরো বিকাশ প্রয়োজন। এই খাতকে বড়  কোম্পানির হাতে সীমাবদ্ধ না রেখে আরো বেশি মানুষকে এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি ডিম-মুরগি যেন সব শ্রেণির মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে সেই লক্ষ্যে কাজ করছেন তারা। পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে এবং  সেইসঙ্গে  বেড়েছে প্রাণিজ আমিষ গ্রহণের পরিমাণ। দেখা গেছে, কয়েক বছর আগেও প্রায় প্রতি বাড়িতে মুরগি পালন করে মাংস ও ডিমের চাহিদা মেটানো হতো। এখন মানুষ চাইলেই মুরগি ও ডিম হাতের নাগালে কিনতে পারছেন। এই পরিবর্তন এসেছে দেশের পোল্ট্রি উদ্যোক্তা আর খামারিদের অক্লান্ত পরিশ্রমে নীরব বিপ্লবের ফলে।

খামারিরা জানান একটি মুরগি ৭৬ সপ্তাহে ৫৬ কেজি খাবার খায়। প্রতি কেজি খাবারের দাম ৩৫ থেকে ৩৮ টাকা। এই হিসাবে একটি মুরগি খাবার খায় এক হাজার ৯৬০ টাকার। এছাড়া বাচ্চার দাম, ওষুধ, লেবারসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে আরো ব্যয় হয় প্রায় ৪৫০ টাকা। এতে একটি মুরগির দাম পড়ে ২ হাজার ৪১০ টাকা। ডিম পাড়া শেষে মুরগিটি বিক্রি করা যায় গড়ে ২১০ টাকায়। এ টাকা বাদ দিলে মুরগির দাম পড়ে প্রায় দুই হাজার ২০০ টাকা। একটি মুরগি গড়ে সর্বোচ্চ ৩০০টি ডিম দিতে পারে। সে হিসাবে প্রতি ডিমের উৎপাদন খরচ পড়ে ৭ টাকা ৩৩ পয়সা। এই অবস্থায় খামারিদের লাভ তো দূরের কথা, ব্যাপক লসে অস্তিত্বে সংকটে পড়তে যাচ্ছে শিল্পটি। অনুসন্ধানে জানা গেছে,  পোল্ট্রি উৎপাদনে যে খরচ হয় তার ৬৮ শতাংশই যায় পোল্ট্রির খাদ্য খরচ বাবদ। ১৮.৫ শতাংশ বাচ্চা কেনার খরচ। ৫ শতাংশ ওষুধের খরচ। ৪ শতাংশ শ্রমিকের মজুরি আর বাকি অন্যান্য খরচ। বর্তমানে এসব খরচ অনেক বেড়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে খাবারের দাম। জানা  গেছে, সারা বিশ্বে পোল্ট্রি খাদ্যের অন্যতম উপকরণ ভুট্টার উৎপাদন কমায় দাম বেড়েছে। আমাদের প্রয়োজনীয় ভুট্টার ৪০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। এর ওপর আবার বসানো হয়েছে অগ্রিম আয়কর। তাছাড়া পোল্ট্রি শিল্পের কাঁচামাল সয়াবিন মিল ও ওয়েল কেকের ওপর যথাক্রমে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে  পোল্ট্রি খাদ্যের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। সরকার কৃষি খাতে শস্য উৎপাদনের অন্যতম উপকরণ রাসায়নিক সারের ওপর যেভাবে ভর্তুকি দেয় তেমনিভাবে পোল্ট্রি খাতে ব্যবহৃত উপকরণ খাবারের ওপর ভর্তুকি দেওয়ার দাবি খাতসংশ্লিষ্টদের। এছাড়াও পোল্ট্রির ওষুধ কেনার ক্ষেত্রেও খামারিদের ভর্তুকি দেওয়া যেতে পারে বলে শিল্প বিশ্লেষকরা মনে করেন।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি দেশের মানুষের মাংস ও ডিমের চাহিদা পূরণের জন্য প্রতিটি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পোল্ট্রি শিল্পনগরী স্থাপন করা প্রয়োজন। তারা বলেন, সরকার কর্তৃক প্রতিটি পোল্ট্রি শিল্পনগরীতে অবকাঠামো, লেয়ার পালনের খাঁচাসহ যন্ত্রপাতি সরবরাহ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, প্রতিটি প্লটকে পোল্ট্রি পালনের উপযোগী করে সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় উদ্যোক্তার হাতে হস্তাস্তর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া  পোল্ট্রি শিল্পনগরীতে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকতে হবে। নগরীতে ফিডমিল উৎপাদনের জন্য উদ্যোক্তাদের মধ্যে একটি প্লট বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। ওষুধ ও যন্ত্রপাতি ক্রয় করার জন্য বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করতে না হয় সে জন্য নগরীর মধ্যে একটি প্লটে পোল্ট্রির ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য বিপণনের জন্য একটি প্লট বরাদ্দ করা প্রয়োজন হবে। অনেক হতাশার মধ্যেও আশার খবর হলো, বীমার আওতায় আসছে  দেশের পোল্ট্রি খাত। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ ব্যাংকও এ বিষয়ে ইতিবাচক মতামত দিয়েছে। এ বিষয়ে ধারণাপত্র  তৈরির পর শস্যবীমার মতো পরীক্ষামূলকভাবে  পোল্ট্রি খাতে বীমা চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। পরে শিল্পে বীমা সুবিধা চালু করা হবে। ধারণা করা হচ্ছে, পোল্ট্রি বীমা চালু করা হলে খামারিদের অনুকূলে বীমা সুবিধাসহ ঋণ বিতরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে পারে। পোল্ট্রি বীমা চালু করা হলে ব্যাংকগুলো এ খাতে ঋণ সুবিধা সম্প্রসারণে বেশি আগ্রহী হবে, যা   পোল্ট্রি খাতের উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এ প্রসঙ্গে বিপিআইসিসির সভাপতি মসিউর রহমান বলেন,  পোল্ট্রি খাতে বীমা সুবিধা না থাকায় কখনো ডিমের দাম বাড়ে, আবার কখনো কমে। বীমা চালু হলে এমনটি হবে না। বীমা না থাকার কারণে ব্যাংকগুলো পোল্ট্রি খাতে ঋণ দিতে আগ্রহী হয় না। ব্যাংকও চিন্তা করে কোনো রোগ-বালাইয়ের কারণে খামারি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন না। বীমা চালু হলে ব্যাংকেরও এ চিন্তা থাকবে না। তখন এ খাতের ব্যবসায়ীদের ঋণ পাওয়া সহজ হবে। তিনি বলেন, খুব দ্রুত পোল্ট্রি বীমা চালু হওয়া দরকার।

লেখক ঃ  এস এম মুকুল।

 

কৃষকের মুখে হাসি এনেছে আগাম জাতের শিম

কৃষি প্রতিবেদক ॥ আগাম জাতের শিম চাষ করে লাভবান হয়েছেন যশোরের কৃষক। চলতি মৌসুমের শুরুতেই এখন শিমে ভরে উঠেছে মাঠজুড়ে। দামটাও ভালো পেয়ে খুশি কৃষক। তেমনি, সড়কের দু’ধারের শত শত জমিতে মাচানের উপর শিম গাছগুলোতে ফুলে ফুলে ভরে গেছে। এতে আবহমান গ্রাম বাংলার অন্যরকম এক দৃশ্য হাতছানি দিচ্ছে।

জেলার অন্তত পাঁচ হাজার কৃষক শিম চাষে লাভবান হচ্ছেন। সবজি চাষের রাজধানীখ্যাত যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের দু’ধারে গ্রাম সদর উপজেলার চুড়ামনকাঠি, বারীনগর, সাতমাইল, বাঘারপাড়ার খাজুরা ও বন্দবিলা এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিটি ক্ষেতেই দোলা দিচ্ছে শিম ফুল, আর শিম।

এখনো বাজারে ভালো দাম থাকায় ক্ষেত পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষক। তবে চলতি  মৌসুমে শুধুমাত্র বাঘারপাড়ার বন্দবিলা গ্রামের শতাধিক কৃষক শিম চাষ করে চমক সৃষ্টি করেছেন। স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জৈষ্ঠ্য মাসের শেষেই আগাম জাতের শিম বীজ বপন করা হয়েছে। ফলে অন্তত আরও আড়াই মাস আগে ভাদ্র মাসের শুরুতেই শিম উঠতে শুরু হয়েছে।

প্রথমদিকে ১১০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে শিম বিক্রি হয়েছে। তবে দিন যতো যাচ্ছে, ততোই একদিকে শিমের ফলন বাড়ছে, তাছাড়া শীত মৌসুমকে টার্গেট করে লাগানো জমির শিম উঠতে শুরু করেছে। এতে দামটা কমে সাধারণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আসছে। কিছুদিন আগেও ৮০ টাকা দরে শিম বিক্রি হলেও বর্তমানে ৪৫থেকে ৫০ টাকা পাইকরি দরে শিম বেচাকেনা হচ্ছে। যশোরাঞ্চলে উৎপাদিত আগাম জাতের শিম ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। গতবারের মতো এবারও আসন্ন জানুয়ারি থেকে তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর,  সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে শিম রফতানি করা হবে আশা প্রকাশ করছেন স্থানীয় কৃষকেরা।

যশোর সদর উপজেলার দৌলতদিহি গ্রামের কৃষক কিবরিয়া এবং শওকত আলী বলেন, একবিঘা জমিতে শিম চাষে খরচ হয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। মাঘ মাস পর্যন্ত কমপক্ষে তিন হাজার কেজি শিম বিক্রি করতে পারবেন। প্রতিকেজি ৪০ টাকা দরে বিক্রি হলেও ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পাবেন। কিন্তু আগের আমলের দেশি শিম যেমন ঘি-কাঞ্চন, হাতিকানি, বানতোড়া, কাকিলা ও পুটুলে প্রভৃতি শিমের চাষ করে এই লাভটা পাওয়া যেতো না।

সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি গ্রামের সবচেয়ে পুরাতন শিমচাষী ওলিয়ার রহমান, জালাল উদ্দিন, হাফেজ বখতিয়ার বলেন, আগাম শিম চাষে কিছুটা প্রযুক্তিগত জ্ঞানের দরকার হয়। পরাগায়ণের পর সৃষ্ট ক্ষুদ্র শিমটি ফুল দিয়ে আবৃত থাকে। ফুল সরিয়ে না দিলে সেটি পূর্ণাঙ্গ শিমে পরিণত হতে পারে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানিতে অথবা শিশিরে ফুল ভিজে পচে যায়। কিন্তু বর্তমানে শিমের উন্নত জাতের উদ্ভাবনের কারণে ওই ধরনের সমস্যা  নেই, এখন কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়াই শিম চাষ করা যাচ্ছে।

যশোর সদর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা বলেন, চলতি মৌসুমে সদর উপজেলাতেই ৬শ’ হেক্টর জমিতে শিম চাষ হয়েছে। এতে ১৫শ’ থেকে ১৬শ’ কৃষক লাভবান হচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় শিম চাষ খুব ভালো হয়েছে।  মৌসুমে শিম চাষের চেয়েও আগাম চাষে বেশি লাভবান হচ্ছেন কৃষক। তবে আসন্ন জানুয়ারিতে গতবছরের মতো কয়েকটি দেশে শিম পাঠানো হলে কৃষক ন্যায্য দাম পাবেন।

যেভাবে চাষ করবেন পানি কচু

কৃষি প্রতিবেদক ॥ যে সব কচু দাঁড়ানো বা স্থির পানিতে চাষ করা যায় তাকে পানি কচু বলে। পানি কচুর বিভিন্ন নাম রয়েছে। কচুতে ভিটামিন এ এবং প্রচুর পরিমাণে লৌহ রয়েছে। তাই সুস্বাদু সবজি হিসেবে চাষ করতে পারেন পানি কচু। মাটি ঃ পলি দো-আঁশ ও এটেল মাটি পানি কচু চাষের জন্য উপযুক্ত। বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই এর চাষাবাদ করা যায়। বৈশিষ্ট্য ঃ কচুর লতি লম্বায় ৯০-১০০ সেন্টিমিটার। এটি সামান্য চেপ্টা ও সবুজ হয়। বোঁটা এবং পাতার সংযোগস্থলের উপরিভাগের রং বেগুনি। জীবনকাল ১৮০-২১০ দিন। চারা ঃ আগাম ফসলের জন্য কার্তিক (মধ্য-অক্টোবর থেকে মধ্য-নভেস্বর), নাবী ফসলের জন্য মধ্য-ফাল্গুন থেকে মধ্য-বৈশাখ (মার্চ-এপ্রিল) মাসে লাগানো যায়। দক্ষিণাঞ্চলে বছরের যে কোনো সময় লাগানো যায়। প্রতি শতকে প্রায় ১৫০টি লতা রোপণ করা যায়। জমি ভালোভাবে তৈরি করে লাইন থেকে লাইন ২ ফুট এবং গাছ থেকে গাছ ১.৫ ফুট দূরত্ব রাখতে হবে। সার ঃ প্রতি শতকে ইউরিয়া ৬০০ গ্রাম, টিএসপি ৫০০ গ্রাম, এমওপি ৭৫০ গ্রাম এবং গোবর ৫০ কেজি দিতে হবে। গোবর, টিএসপি এবং এমওপি সার জমি তৈরির শেষ সময়ে দিতে হবে। ইউরিয়া ২-৩ কিস্তিতে দিতে হয়, তবে প্রথম কিস্তি রোপণের ২০-২৫ দিনের মধ্যে দেওয়া দরকার। সেচ ঃ পানি কচুর গোড়ায় দাঁড়ানো পানি রাখতে হবে এবং দাঁড়ানো পানি মাঝে মাঝে নাড়িয়ে দিতে হবে। লতিরাজ জাতের জন্য দাঁড়ানো পানির গভীরতা ৮-১০ সেন্টিমিটার হওয়া দরকার। রোগ ঃ পাতার উপর বেগুনি থেকে বাদামি রঙের গোলাকার দাগ পড়ে। পরবর্তীতে এ দাগ আকারে বেড়ে একত্রিত হয়ে যায় এবং পাতা ঝলসে যায়। পরে তা কচু ও কন্দে ছড়িয়ে যায়। উচ্চ তাপমাত্রা, আর্দ্র আবহাওয়া ও পরপর ৩-৪ দিন বৃষ্টি হলে এ রোগের মাত্রা খুব বেড়ে যায়। তাই রোগ দেখার সঙ্গে সঙ্গে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম রিডোমিল এমজেড-৭২ ডব্লিউ অথবা ডাইথেন এম ৪৫ মিশিয়ে ১৫ দিন পরপর ৩-৪ বার দিতে হবে। দেওয়ার আগে ট্রিকস মিশিয়ে নিতে হয়। সংগ্রহ ঃ চারা রোপণের ২ মাস পর থেকে ৭ মাস পর্যন্ত লতি হয়ে থাকে।

আলুর কাঙ্খিত ফলন পাওয়ার উপায়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ আলু বাংলাদেশের একটি অন্যতম জনপ্রিয় সবজি। সেই সাথে অর্থকরী ফসলও। প্রতি বছর এ দেশে আলুর উৎপাদন যে পরিমাণে হিমাগারে রাখা যায় তার চেয়েও বেশি। তারপরও খাদ্য হিসেবে আলুর ব্যবহার দিন দিন এমনভাবে বেড়ে গেছে যে, বাজারে আলুর দাম কখনোই আর কম থাকছে না। সে জন্য প্রতি বছরই আলুর মৌসুম শুরুর আগে শুধু কৃষকরাই নয়, যারা কৃষি কাজের সাথে জড়িত নন এমন অনেকেই আলু চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েন। কারণ আলু চাষে স্বল্প সময়ে লাভ বেশি। কিন্তু কিছু কিছু বিষয়ের প্রতি লক্ষ না রাখায় আলু চাষে অনেকেই কাংক্ষিত ফল বা ফলন পান না। তখন বিভিন্ন জনকে বিভিন্নভাবে দোষারোপ করেন। তাই আলু চাষে নামার আগে থেকেই যদি কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয় তাহলে আলুর কাংক্ষিত ফলন পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
প্রথমেই জমি নির্বাচন। বেলে বা বেলে দো-আঁশ মাটিতে আলু ভালো হয়। সূর্যের আলো প্রচুর পড়ে এমন উঁচু বা মাঝারি উঁচু জমি আলু চাষের জন্য নির্বাচন করা উচিত। জমিতে পানি সেচ দেয়া ও পানি নিষ্কাশনের উপযুক্ত ব্যবস্খা থাকাও প্রয়োজন। এ জন্য জমি সমতল করতে হয়। যেহেতু আলু মাটির নিচের ফসল, তাই জমি গভীর চাষ দিতে হয়। জমি চাষ দেয়ার পর ৭ থেকে ১৫ দিন রোদে ফেলে শুকিয়ে নিতে হয়। এতে মাটির নিচে থাকা বিভিন্ন পোকা, পোকার কিড়া ও পুত্তলী এবং রোগজীবাণু রোদের আলো ও তাপের সংস্পর্শে এসে নষ্ট হয়। আড়াআড়ি চাষ দিয়ে মাটি এমনভাবে চিকন ও ঝুরঝুরে করতে হয় যেন মাটির মধ্যে বাতাস চলাচল ভালোভাবে করতে পারে, যাতে আলুর টিউবার গঠন কাজটি সহজ হয়। চাষের শেষে জমির সব আগাছা ও আগের ফসলের অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করে দূরে কোথাও পুঁতে বা পুড়িয়ে ফেলতে হয়। তবে জমি তৈরির আগে মাটি শোধন করে নিতে পারলে ভালো হয়। এতে আলুর ঢলে পড়া রোগ প্রতিরোধ করা যায়। আগের বছর ঢলে পড়া রোগ হয়নি বা রোগ হয়েছে এমন যেকোনো জমিতেই মাটি শোধন করে নিতে হয়। শেষ চাষের আগে বিঘা প্রতি ৪ থেকে ৫ কেজি ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে চাষ দিয়ে সেচ দিতে হয়। ব্লিচিং পাউডার জমির মাটির সাথে মেশানোর পর জমিতে অবশ্যই জো অবস্থা থাকতে হয়। এভাবে ২৮ থেকে ৩০ দিন জমি ফেলে রাখতে হয়। এতে জমির মাটি শোধন হয় অর্থাৎ মাটির বিশেষ বিশেষ রোগ জীবাণু ধ্বংস হয় বা তাদের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। জানা উৎস বা বিশ্বস্ত কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে আলুবীজ সংগ্রহ করতে হয়। বীজ আলু যদি খারাপ হয় তাহলে আলু চাষের সব আয়োজনই বিফলে যেতে বাধ্য। তাই যেনতেন জায়গা বা যে কারো কাছ থেকে বীজআলু সংগ্রহ না করে এমন উৎস থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হয় যেন আলুর বীজ খারাপ হলে তার জন্য জবাবদিহিতা থাকে। বীজ সংগ্রহের পর বীজ শোধন করতে হয়। এ জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা না করলেও চলে। যেমন কেউ কেউ কার্বেন্ডাজিম জাতীয় ছত্রাকনাশক ব্যবহার করে থাকেন। এ জাতীয় ছত্রাকনাশক বীজ আলু শোধনে ব্যবহার করলে ১ গ্রাম ছত্রাকনাশক ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে ১ কেজি কাটা বীজ আলু ৫ মিনিট ডুবিয়ে রাখলে বীজবাহিত ছত্রাকঘটিত রোগজীবাণু ধ্বংস হয়। আলুর ঢলে পড়া ও গোড়া পচা রোগ প্রতিরোধে প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম হারে স্ট্রেপটোমাইসিন মিশ্রিত করতে হয়। বীজ আলু সংগ্রহের পর কাটার আগে আলো-বাতাস চলাচল করে এমন পরিষ্কার সমতল জায়গায় বস্তা খুলে আলু বের করে এক থেকে দেড় ফুট উঁচু স্তূপ বা হিপ করে ছড়িয়ে রাখতে হয়। মাঝে মধ্যে ওলটপালট করতে হয়। বীজআলু শুধু লম্বালম্বি এমনভাবে দু’ভাগ করে সমভাবে কাটতে হয়, যাতে কর্তিত দু’অংশে কমপক্ষে দুটি করে চোখ থাকে। এই অংশের ওজন ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম এবং ৩ থেকে ৪ সেন্টিমিটার ব্যাসবিশিষ্ট হতে হয়। অনেকেই চোখের সাথে আলুর অংশ কম রেখে বাকিটুকু খাবার হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন, এটা ঠিক নয়। কর্তিত অংশের সাথে যতটুকুই থাকুক সবটুকুই রাখতে হয়। বীজ কাটার সময় চাকু বা বঁটির দুই পাশ জীবাণুনাশকে ভেজানো কাপড়ের টুকরো দিয়ে মাঝে মধ্যে মুছে নিতে হয় যেন রোগজীবাণু এক আলু থেকে অন্য আলুতে ছড়াতে না পারে। আলুর কাটা অংশ উপরের দিকে করে মাটিতে ছড়িয়ে বিছিয়ে রাখতে হয়। কখনোই গাদাগাদি করে রাখা উচিত নয়। রাখার স্থানে আলো এবং বাতাস চলাচল ব্যবস্থা থাকতে হয়। এভাবে ২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টা রেখে দিলে কাটা অংশের ওপরে একটি শক্ত কালচে ধরনের স্তর পড়ে, যাকে সোবারাইজেশন বলে। এই অংশ ভেদ করে কোনো রোগজীবাণু ঢুকতে পারে না। কাটা অংশে ছাই ব্যবহার করা যেতে পারে, তাতে অতিরিক্ত হিসেবে পটাশিয়াম সরবরাহ করা হয়। আবার পোকার বিকর্ষক হিসেবেও এটি কাজ করে। আলু রোপণের উপযুক্ত সময় হলো নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে শেষ পর্যন্ত। দিন পেছালে শীতে গাছের বৃদ্ধি কমে, গাছ খুব বেশি বড় হওয়ার আগেই টিউবার গঠন কাজ শুরু হয়ে যায়। এতে টিউবার সংখ্যা কমে যায়। শীতে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের টিউবার গঠন ভালো হয়। ডিসেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত আলুবীজ রোপণ করা যায়, তবে ফলনও আনুপাতিক হারে কমে যায়। আলু চাষে কম্পোস্ট সার ব্যবহার না করা ভালো। কারণ যেসব কম্পোস্টের উপাদান হিসেবে শাকসবজির উচ্ছিষ্টাংশ বা গাছ-গাছড়ার বা যেকোনো জৈব জিনিসের পচনশীল অংশ ব্যবহার করা হয় সেসবের সাথে ঢলে পড়া রোগের রোগজীবাণু থাকতে পারে, যা এই রোগের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। এ জন্য কম্পোস্টের পরিবর্তে ভালোভাবে পচানো শুকনো গোবর সারই জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা ভালো। সবচেয়ে ভালো হয় বায়োগ্যাস প্লান্ট থেকে সংগ্রহ করা শুকনো সার। আলু চাষে একর প্রতি ইউরিয়া ১১২ কেজি, টিএসপি ৭৫ কেজি, এমওপি ১১২ কেজি, জিপসাম ৪০ কেজি, জিংক সালফেট ৫ কেজি এবং বোরণ সার ৪ কেজি ব্যবহার করতে হয়। অর্ধেক ইউরিয়া, অর্ধেক এমওপি ও সম্পূর্ণ টিএসপি এক সাথে মিশিয়ে বীজ আলু বপনের পাশে সারের নালায় দিতে হয়। বাকি সার রোপণের ৩৫ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে উপরি প্রয়োগ করতে হয়। আর জিপসাম, জিংক সালফেট এবং বোরণ সার শেষ চাষের সময় ছিটিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হয়। যেসব অঞ্চলের মাটিতে ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি আছে সেসব অঞ্চলে ম্যাগনেশিয়াম সার শেষ চাষের সময় প্রয়োগ করতে হয়। উপরি সার প্রয়োগের পর আলুর সারিতে বা গাছের গোড়ায় উঁচু করে (প্রায় ২০ সেন্টিমিটার) মাটি তুলে দিতে হয়। ভেলির গোড়া চওড়া রাখার জন্য ১৫ সেন্টিমিটার প্রস্থের ছোট কোদাল ব্যবহার করতে হয়। মাটি তোলার সময় লক্ষ্য রাখতে হয় যেন কোদালের সাথে প্রয়োগকৃত সার উঠে না আসে। আলু চাষে সেচ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রোপণের সময় জমির জো অবস্থা থাকতে হয় এবং রোপণের পর ১ থেকে ২টি গাছ যখন মাটির ওপরে উঠে আসে তখন প্রথমবার সার উপরি প্রয়োগের পর একটি হালকা সেচ দিতে হয়। এটি সাধারণত রোপণের ৭ দিনের মধ্যে দিতে হয়। এবপর মাটির প্রকার ও প্রয়োজন অনুযায়ী ৩ থেকে ৫ বার সেচ দিতে হয়। তবে টিউবার গঠনের শুরুর সময় অর্থাৎ ৪০ থেকে ৪৫ দিনের সময় মাটিতে রস না থাকলে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে বা ফলন কমে যেতে পারে। সুষম সেচের জন্য তাই নিয়মিত জমি পরিদর্শন করতে হয়। খাবার আলু ৯৮ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে সংগ্রহ করা যায়। আর বীজ আলু ৭২ থেকে ৭৫ দিন পর গাছ তুলে রেখে ৮০ থেকে ৮৫ দিনের মধ্যে ক্ষেত থেকে তুলতে হয়। জাত ভেদে বাংলাদেশে আলুর ফলন একর প্রতি ৭ থেকে ১০ টন পর্যন্ত হয়ে থাকে।

ধানের শততম জাত উদ্ভাবনের মাইলফলক অর্জন

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ধানের উচ্চ ফলনশীল (উফশী) জাত উদ্ভাবনে অনন্য রেকর্ড স্থাপন করল বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) বিজ্ঞানীরা। জাতীয় বীজ বোর্ডের সর্বশেষ সভায় নতুন অনুমোদিত তিনটি ধানের জাতসহ বর্তমানে দেশের শীর্ষস্থানীয় এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবিত ধানের উফশী জাতের সংখ্যা সর্বমোট একশটি। আগে উদ্ভাবিত ৯১টি ইনব্রিড ও ৬টি হাইব্রিড জাতের সঙ্গে ব্রির সাফল্যের পালকে যুক্ত হলো আরো নতুন তিনটি জাত।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নাসিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে জাতীয় বীজ বোর্ডের শততম সভায় অনুমোদিত নতুন তিনটি জাত ব্রি ধান৯৩, ব্রি ধান৯৪ ও এবং ব্রি ধান৯৫ সহজাত উদ্ভাবনে সেঞ্চুরি পূর্ণ করল ব্রি। ১৯৭০ সালের ১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত দেশের খাদ্য নিরাপত্তার অতন্দ্রপ্রহরী এ গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে নতুন নতুন জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে। ধান বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টায় খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে খাদ্য উদ্বৃত্ত দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও গত এক দশকে উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবনে ব্রি অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের নানামুখী উদ্যোগের কারণে গত তিন মেয়াদে ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ব্রি চারটি হাইব্রিডসহ আউশ, আমন ও বোরো ধানের সর্বমোট ৫০টি জাত উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে। যার প্রতিটিই কোনো না কোনো বিশেষ গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। যেমন- খরা, বন্যা, লবণ সহিঞ্চু, জিংকসমৃদ্ধ, প্রিমিয়াম কোয়ালিটি, ডায়াবেটিক রাইসসহ অধিক উচ্চ ফলনশীল। ব্রি উদ্ভাবিত নতুন নতুন জাত ও প্রযুক্তি কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারণের ফলে বর্তমানে চালের উৎপাদন প্রতি বছর গড়ে ৪.৮৮ লাখ টন হারে বাড়েছে এবং উৎপাদন বৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত আছে। বিশ্বে ধানের গড় ফলনের দিক থেকে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে শীর্ষ স্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সত্তরের দশকে এ দেশে ধানের ফলন ছিল হেক্টর প্রতি ২ টনেরও নিচে; বর্তমানে ধানের গড় ফলন প্রায় ৫ টন/হে.। এই ফলন বাৎসরিক উৎপাদনশীলতার দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে এবং বিশ্বমানের কাছাকাছি।
নতুন অনুমোদিত ব্রি ধান৯৩ স্বর্ণা-৫ এর বিশুদ্ধ সারি। এটি রোপা আমন মৌসুমের জাত। এর গাছের উচ্চতা ১২৭ সে.মি. এবং জীবনকাল ১৩৭ দিন। ব্রি ধান৯৩ এর ফলন ৫.৫-৬.৫ টন/হেক্টর। এর ১০০০টি দানার ওজন ১৯.০ গ্রাম। ধানের দানার রং লালচে ও চাল মাঝারি মোটা ও সাদা। নতুন উদ্ভাবিত ব্রি ধান৯৪ রনজিত স্বর্ণা-র বিশুদ্ধ সারি। এটিও রোপা আমন মৌসুমের জাত। এর গাছের উচ্চতা ১১৭ সে.মি.। জীবনকাল ১৩৮ দিন। ফলন ৫.৫-৬.৫ টন/হেক্টর। ১০০০ দানার ওজন ১৮.৬ গ্রাম। ধানের দানার রং লালচে। চাল মাঝারি মোটা ও সাদা। ব্রি ধান৯৫ স্বর্ণা-র সঙ্গে সংকরায়ন করে উদ্ভাবিত বাছাইকৃত সারি। এটিও রোপা আমন মৌসুমের জাত। এর গাছের উচ্চতা ১২০ সে.মি.। জীবনকাল ১২৫ দিন। ফলন ৫.৫-৬.০ টন/হেক্টর। ১০০০ দানার ওজন ২১.৫ গ্রাম। ধানের দানার রং গাঢ় লাল। চাল মাঝারি মোটা ও সাদা। দেশের উত্তরাঞ্চলের স্বর্ণা অধ্যুষিত এলাকায় এই জাতগুলো জনপ্রিয়তা পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা। নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করে পুরাতন জাতগুলোকে প্রতিস্থাপন করার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখা গেলে বাড়তি জনসংখ্যার বিপরীতে বর্ধিত খাদ্য উৎপাদন সম্ভব বলে অভিমত বিজ্ঞানীদের।
লেখক ঃ কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন

বাংলাদেশের ঐতিহ্য, গর্বের স্বাক্ষর হয়ে আছে ইলিশ মাছ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। আবহমানকাল থেকে ইলিশ আমাদের জাতীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রাণিজ আমিষের জোগান এবং দারিদ্র্য বিমোচনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্য, গর্বের স্বাক্ষর হয়ে আছে ইলিশ মাছ। আশার খবরটি হচ্ছে, দেশে ইলিশের উৎপাদন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ ইলিশ মাছ আহরণে বিশ্বে প্রথম। রেকর্ড অনুযায়ী, ২০০৮-০৯ সালে দুই লাখ ৯৯ হাজার টন ইলিশ উৎপাদিত হলেও ২০১৮-১৯ সালে পাঁচ লাখ ১৭ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। আন্তর্জাতিক তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী বিশ্বে আহরিত ইলিশের প্রায় ৭৫ ভাগ আহরণ করে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে মিয়ানমার এবং ৩য় অবস্থানে ভারত। ইলিশের অভ্যন্তরীণ বাজারমূল্য ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ইলিশ উৎপাদনের ক্ষেত্রে রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমান সরকার মা ইলিশ ও জাটকা ধরা নিষিদ্ধকালীন জেলেদের খাদ্য সহায়তা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করায় ইলিশ উৎপাদন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, মৎস্য অধিদপ্তর, প্রশাসন ও বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক ইলিশ ব্যবস্থাপনা কৌশল মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করায় দেশব্যাপী ইলিশের বিস্তৃতি ও উৎপাদন বেড়েছে। জানা গেছে, দেশে মোট মৎস্য উৎপাদনের ১২ শতাংশই ইলিশ। জিডিপিতে ইলিশের অবদান প্রায় ১ শতাংশ। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ বা ৭৬ শতাংশ। বাংলাদেশে ইলিশের গড় উৎপাদন কমবেশি সাড়ে তিন লাখ টন। এ হিসাবে প্রচলিত বাজারমূল্যে ইলিশের সার্বিক বাজারমূল্য দাঁড়ায় ২২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকারও বেশি। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা গেছে, ২০ বছর আগে দেশের ২১টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। বর্তমানে ১২৫টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। উৎপাদিত ইলিশের যেটুকু রপ্তানি হয় তাতে ১৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনের ৭৫ শতাংশই বাংলাদেশে হচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫ লাখ ১৭ হাজার টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিজ্ঞানী এবং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে হারে ইলিশের উৎপাদন বাড়ছে তাতে আগামী কয়েক বছরে উৎপাদন আরো বাড়বে। বিশ্বের প্রা ৮০-৯০ শতাংশ ইলিশ উৎপাদন দেশ হবে বাংলাদেশ। ২০২২ সালে বাংলাদেশ হবে শীর্ষ মাছ উৎপাদনকারী দেশ। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ইলিশ আহরণে রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে ৫ লাখ ১৭ হাজার টন, যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের চেয়ে ২১ হাজার টন বেশি। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা তথ্যের ভিত্তিতে ইলিশ ব্যবস্থাপনা কৌশল মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের ফলে ইলিশের উৎপাদন বাড়ছে। মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে ২০০৯-২০১০ অর্থ বছরে ইলিশ উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার টন। ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ১৭ হাজার টন। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা তথ্যের ভিত্তিতে তা ২২ দিন ইলিশ আহরণ বন্ধ করার পদ্ধতিই ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ সালে ২২ দিন মা ইলিশ সুরক্ষিত হওয়ায় ডিম দেয়া ইলিশের হার ছিল ৪৬.৪৭ ভাগ, যা ২০১৭-১৮ সালে হয়েছে ৪৭.৭৪ ভাগ। ফলে ২০১৭-১৮ সালে ৩৬ হাজার কোটি জাটকা ইলিশ পরিবারে নতুন করে যুক্ত হয়। ইলিশের জীবনচক্র বেশ বৈচিত্র্যময়। ইলিশ মাছ সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে বাস করে। যখন ডিম ছাড়ার সময় হয় তখন তারা সমুদ্রের লোনাপানি ত্যাগ করে নদনদীর মিঠা পানিতে চলে আসে। তার কারণ সমুদ্রের পানিতে প্রচুর লবণ থাকায় এ পানিতে ডিম ছাড়লে লবণের কারণে ডিমগুলো নষ্ট হয়ে যায় এবং কোনো ইলিশের পোনা জন্ম হয় না। তাই ডিমওয়ালা ইলিশগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে ডিম ছাড়ার জন্য নদীতে আসায় প্রজনন ঋতুতে নদীতে প্রচুর ডিমওয়ালা মাছ ধরা পড়ে। একারণেই সরকার ইলিশের প্রজনন ঋতুতে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ইলিশ সারা বছরই ডিম দেয়। তবে বছরের মার্চ-এপ্রিল এবং সেপ্টেম্বর ইলিশের প্রজনন মৌসুম। এ সময় ইলিশ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিশেষ করে আশ্বিন মাসের বড় পূর্ণিমার আগের ৪ দিন এবং পরের ১৭ দিন ইলিশ আহরণ, বিতরণ, বিপণন, পরিবহন, মজুদ ও বিনিময় কার্যক্রম বন্ধ থাকে। ১ অক্টোবর হতে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত দেশব্যাপী মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান পালিত হয়। এ ধারাবাহিকতায় আগামী ২২ দিন ইলিশ ধরা নিষেধ (৯ থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত) বলে জানিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। মাছবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন প্রতিবছর ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। খুশির খবরটি হলো ইলিশ পাওয়া যায় বিশ্বের এমন ১১টি দেশের মধ্যে ১০টিতেই যেখানে ইলিশের উৎপাদন কমছে, সেখানে একমাত্র বাংলাদেশেরই ইলিশের উৎপাদন প্রতিবছর ৮-১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। এমতাবস্থায় বিশ্বের প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থাগুলো বাংলাদেশের ইলিশ রক্ষার এই কৌশল খুবই কার্যকর হয়েছে চিহ্নিত করেছে। ফলে বিশ্বে দেশের ইলিশের নতুন বাজার তৈরির সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। ইলিশ উৎপাদনে নতুন রেকর্ড সৃষ্টির পাশাপাশি বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতিতেও অনুসরণকারী অন্যতম দেশ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়ার কৌশল অনুসরণ করছে ভারত ও মিয়ানমার। বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির কৌশল বুঝতে সুদূর কুয়েত ও বাহরাইনের মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। বাংলাদেশের মতোই ওই দেশগুলো ইলিশের নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র চিহ্নিত করে ডিম পাড়া ও বাচ্চা বড় হওয়ার সময় মাছ ধরা বন্ধ রাখার উদ্যোগ নিয়েছে। ২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল থেকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার বাংলাদেশের পথ অনুসরণ করে ভাগীরথী (গঙ্গা) নদীর ফারাক্কা থেকে মোহনা পর্যন্ত অংশের তিনটি এলাকাকে ইলিশের নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র হিসেবে ঘোষণা করেছে। এসব এলাকায় ১৫ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করেছে পশ্চিমবঙ্গ।
লেখক ঃ এস এম মুকুল।

ফলন বাড়াতে হাইটেক ও সফটওয়্যার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ফসলের ফলন বাড়াতে বিজ্ঞানীরা সব সময়ই গবেষণা করে যাচ্ছেন। ফসলের ফলন বাড়াতে বেশির ভাগ সময়ই উন্নত জাতের কথা ভাবা হয়। কিন্তু তাতে খুব বেশি ফল পাওয়া যায় না। জার্মানির বিজ্ঞানীরা হাইটেক স্ক্যানার ও সফটওয়্যার দিয়ে নতুন পদ্ধতিতে শস্যের প্রজনন ঘটানোর উদ্যোগ শুরু করেছেন। বিশেষজ্ঞ মহল মনে করে, আগামী দশকগুলোয় ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য খাদ্যের সংস্থান করতে হলে কৃষি উৎপাদন আরো অনেক বাড়াতে হবে। কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি করে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো চলবে না। অতএব, চাই এমন শস্য, যার উৎপাদন ক্ষমতা বেশি। জার্মানির বন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হাইনার গন্ডবাখ বলেন, ‘আমাদের ধারণা, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৯০০ কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান দিতে হবে। তার জন্য বছরে গড়ে কমপক্ষে ১ দশমিক ৫ শতাংশ হারে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে।’

উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন উদ্ভিদ প্রজনন করতে আজকাল হাইটেক প্রযুক্তি কাজে লাগানো হয়। কারণ এমন শস্য শনাক্ত করতে হয়, যেগুলো সুস্থ এবং তাদের কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা রয়েছে। শুধু  সেগুলোই বেছে নিয়ে আরো প্রজনন করতে হবে। বন ইউনিভার্সিটির কৃষি বায়োলজিস্ট  হেইনার গোল্ডবাক এ লক্ষ্যে ইঞ্জিনিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও কৃষি বিজ্ঞানীদের নিয়ে একটি দল তৈরি করেছেন। তাদের উদ্দেশ্য এমন এক সেন্সর তৈরি করা, যার সাহায্যে প্ল্যান্ট ব্রিডিং আরো দক্ষ ও দ্রুত করে তোলা সম্ভব। অধ্যাপক গোল্ডবাক বলেন, ‘ প্রজননের সময়  সেন্সর বৈশিষ্ট্যগুলো দ্রুত সঠিকভাবে চিনতে পারে। মানুষও সেটা পারে বটে, কিন্তু ঘণ্টা দু-এক পর সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তখন ভুলের অবকাশ বেড়ে যায়, শস্যগুলোর মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ক্রটি ঘটে। কিন্তু সেন্সর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে সে কাজ সঠিকভাবে করে চলে। ফলে প্রজননের গতি বেড়ে যায়।’

পাতার রোগ যত দ্রুত সম্ভব শনাক্ত করতে গবেষকরা এক হাইপার স্পেকট্রাল ক্যামেরা ব্যবহার করেন। সেটি স্ক্যানারের মতো পাতার ওপর প্রতিফলিত আলো বিশ্লেষণ করে। ২১০টি আলাদা তরঙ্গ দৈর্ঘ্য থেকে তথ্য নিয়ে স্পেকট্রাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট তৈরি করা হয়। কৃষিবিজ্ঞানী ড. আনে-কাটরিন মালাইন পর্দার ডান দিকে হাইপার-স্পেকট্রাল ফলাফল  দেখেন। ফলস কালার ডিসপ্লেতে হলুদ রঙের মাধ্যমে সুস্থ টিস্যু দেখা যায়। অন্যদিকে নীল-সবুজ রঙের অংশে পাতার রোগগ্রস্ত অংশ দেখা যায়। সফটওয়্যারের মাধ্যমে পাতার নানা  রোগ পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা যায়। ভবিষ্যতে মোবাইল ডিভাইসের মাধ্যমে শস্য  ক্ষেতেও তা কাজে লাগানো যাবে। অধ্যাপক গোল্ডবাক বলেন, ‘এ প্রক্রিয়া ব্যবহার করে আমরা প্রজননের অগ্রগতি আরো দ্রুত করে তুলতে পারি। অর্থাৎ এ মুহূর্তে নতুন করে কোনো প্রজাতির প্রজনন যদি ১০-১২ বছর লাগে, সেখানে আমরা সময়টা ২ বছর কমিয়ে দিতে পারি। ফলে আরো দক্ষতার সঙ্গে আমরা কাজ করতে পারব।’

বায়োলজিস্ট বির্গিট ফ্রিকে এক হাইপার স্পেকট্রাল সেন্সর দিয়ে উদ্ভিদের ভেতরের অবস্থাও  দেখতে পারেন এবং সুগার বিটের মেটাবলিজম ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে তথ্য পান। বির্গিট ফ্রিকে বলেন, পরিমাপের পদ্ধতি খুব সহজ। সূর্যের আলো পাতার ওপর পড়ে, তারপর তার প্রতিফলন ঘটে। উদ্ভিদ অসুস্থ হলে তার মেটাবলিজম বদলে যায়, যার ফলে প্রতিফলনের চরিত্রও বদলে যায়। সেন্সর তখন এই পরিবর্তিত প্রতিফলন ধরতে পারে। তখন শুধু সুস্থ উদ্ভিদ নিয়েই প্রজনন চালানো হয়। তাদের সহ্যশক্তি বাড়ানো হয়। বার্লি ও ধানের ক্ষেত্রেও এ প্রযুক্তি প্রয়োগ করা সম্ভব। উদ্ভিদের আকার বা একই জায়গায় কত উদ্ভিদ আছে, এক  টেরেস্ট্রিয়াল লেজার স্ক্যানার তা মেপে দেখে। সেটি ক্ষেতের এক ত্রিমাত্রিক ছবি ফুটিয়ে  তোলে।

কোলোন ইউনিভার্সিটির নোরা টিলি বলেন, বীজ বপনের সময় থেকেই স্ক্যানিং শুরু হয়। তখনো কিন্তু চারা গজায়নি। এর মাধ্যমে গোটা এলাকার একটা হাই-ডেফিনিশন মডেল পাওয়া যায়। প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর স্ক্যান করা হয়। এভাবে বিভিন্ন অবস্থার মধ্যে তুলনা করে উদ্ভিদের বৃদ্ধির হার স্পষ্ট বোঝা যায়। বিষয়টি একেবারে নিখুঁতভাবে মাপা সম্ভব। এর জন্য  ক্ষেতের চারপাশে মাত্র চারটি বিন্দুর প্রয়োজন, যেখান থেকে পরিমাপ চালানো হবে। উচ্চতা বিচার করে সেরা উদ্ভিদ বাছা হবে, যার উৎপাদন ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি।

 

দেশে পুষ্টিকর সবজি মূলার আবাদ দিন দিন বাড়ছে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ মূলা একটি পুষ্টিকর সবজি হলেও অনেকেই মূলা খেতে পছন্দ করেন না। মূলাতে প্রচুর পরিমাণে ক্যারোটিন তথা ভিটামিন এ, ক্যালসিয়াম ও লৌহ রয়েছে। এ দেশে মূলার আবাদ দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে অমৌসুমে মূলা আবাদের দিকে চাষিরা ঝুঁকে পড়েছেন।
উঁচু, মাঝারি উঁচু ও মাঝারি নিচু জমিতে মূলা চাষ করা যায়। সুনিষ্কাশিত বেলে দোয়াশ মাটি মূলা চাষের জন্য ভাল। এটেল মাটিতে মূলার বাড় বাড়তি কম হয়। মূলা চাষের জন্য জমি গভীরভাবে ধুলো ধুলো করে চাষ করতে হয়। ছাই ও জৈব সার বেশী ব্যবহারে মূলার বাড় বাড়তি ভাল হয়।
এক সময় জাপানের বিখ্যাত তাসাকি সান জাতের মূলার মাধ্যমে এ দেশে উচ্চফলনশীল মূলার আবাদ শুরু হলেও এখন মূলার প্রায় ২৫-৩০টি জাত চাষ হচ্ছে। আসছে নিত্য নতুন স্বল্প জীবনকালের অধিক ফলনশীল হাইব্রিড জাত। উল্লেখযোগ্য জাত সমূহ হল বারি মূলা ১, বারি মূলা ২, বারি মূলা ৩, বারি মূলা ৪, এভারেষ্ট, হোয়াইট প্রিন্স, হিমালয় এফ১, সুপার ৪০, মুক্তি এফ১, কুইক ৪০, রকি ৪৫, হোয়াইট রকেট, হোয়াইট ৪০, জি চেটকি, সুফলা ৪০, আনারকলি, দুর্বার, রকেট এফ১, সামার বেষ্ট এফ১, হ্যাভেন এফ১, মিনো আর্লি লং হোয়াই, পাইলট এফ১, সিগমা ৪০ ইত্যাদি।
বীজ হার ও বপন ঃ আশ্বিন থেকে কার্তিক মাসের মধ্যেই অধিকাংশ মূলার বীজ বপন করা হয়। প্রতি হেক্টরে বপনের জন্য ২.৫-৩.০ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। সাধারণত ঃ ছিটিয়ে বীজ বপন করা হয়। তবে সারিতে বপন করলে পরিচর্যার সুবিধে হয়। সারিতে বুনতে হলে এক সারি থেকে আর এক সারির দূরত্ব দিতে হবে ২৫-৩০ সেমি.।
সারের মাত্রা ঃ প্রতি শতকে ইউরিয়া সার ১.২-১.৪ কেজি, টিএসপি সার ১.০-১.২ কেজি, এমওপি সার ৮০০ গ্রাম-১.৪ কেজি, গোবর সার ৩০-৪০ কেজি। জমি তৈরির সময় সবটুকু জৈব সার, টিএসপি ও অর্ধেক এমওপি সার মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। ইউরিয়া ও বাকি অর্ধেক এমওপি সার সমান ২ কিস্তিতে ভাগে ভাগ করে বীজ বপনের পর তৃতীয় ও পঞ্চম সপ্তাহে ছিটিয়ে সেচ দিতে হবে।
পরিচর্যা ঃ বীজ বপনের ৭-১০ দিন পর অতিরিক্ত চারা তুলে পাতলা করে দিতে হবে। ৩০ সেমি. দূরত্বে একটি করে চারা রাখা ভাল। মাটিতে রস কম থাকলে সেচ দিতে হবে। প্রতি কিস্তির সার উপরি প্রয়োগের পর পরই সেচ দিতে হবে। আগাছা পরিষ্কার করে দিতে হবে। মাটি শক্ত হয়ে গেলে নিড়ানী দিয়ে মাটির উপরের চটা ভেঙ্গে দিতে হবে।
পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা ঃ অনেক সময় মূলা পাতার বিট্ল বা ফ্লি বিট্ল পাতা ছোট ছোট ছিদ্র করে খেয়ে ক্ষতি করে। এ ছাড়া করাত মাছি বা মাস্টার্ড স’ ফ্লাই, বিছা পোকা ও ঘোড়া পোকা পাতা খায়। বীজ উৎপাদনের সময় ক্ষতি করে জাব পোকা।
রোগ ব্যবস্থাপনা ঃ মূলা পাতায় অল্টারনারিয়া পাতায় দাগ একটি সাধারণ সমস্যা। এছাড়া হোয়াইট স্পট বা সাদা দাগ রোগও দেখা যায়। মূলা শক্ত হয়ে আঁশ হওয়ার আগেই তুলতে হবে। অবশ্য এখন হাইব্রিড জাতসমূহ আসাতে এ সম্ভাবনা অনেক কমে গেছে। তবুও কচি থাকতেই মূলা তুলে ফেলতে হবে। এতে বাজার দাম ভাল পাওয়া যায় এবং স্বাদও ভাল থাকে। জাতভেদে হেক্টর পপ্রতি ফলন হয় ৪০-৬০ টন।

 মিরপুরে কৃষকদের প্রশিক্ষনকালে কৃষিবিদ চন্ডীদাস কুন্ডু

জৈব কৃষির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে

আমলা অফিস ॥ কুষ্টিয়ার মিরপুরে নিরাপদ উদ্যানতাত্ত্বিক ফসল উৎপাদন ও সংগ্রহত্তোর প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় কৃষক/কৃষানীদের প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল বুধবার সকালে মিরপুর উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্যোগে কৃষি প্রশিক্ষণ হলরুমে “নিরাপদ উদ্যানতাত্ত্বিক ফসল উৎপাদন ও সংগ্রহত্তোর প্রযুক্তি সম্প্রসারণ” প্রকল্পের আওতায় এ প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রমেশ চন্দ্র ঘোষের সভাপতি প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইং এর পরিচালক কৃষিবিদ চন্ডী দাস কুন্ডু। এসময় তিনি বলেন, জমিতে বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, মাটির গুণগতমান নষ্ট হচ্ছে, উদ্ভিদ-ফসলে ব্যাপকভাবে প্রভাব পড়ছে, বাদ যাচ্ছে না জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্যহীনতা। বালাইনাশকের মধ্যে কীটনাশক আবার বেশি ব্যবহৃত হয় কেননা এর প্রাপ্যতা আর পোকার পরিচিতি অনেক বেশি এবং দীর্ঘদিনের। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে  টোটাল কৃষি ব্যবস্থাই পাল্টে গেছে। এ পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশে অঞ্চলভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্প ও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে চাষাবাদ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। অঞ্চলভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষাবাদ প্রযুক্তি কৌশল বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হচ্ছে। কিন্তু এটাতো ঠিক স্থানীয় ও উন্নত চাষাবাদ প্রযুক্তি ও ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা তাপমাত্রার তারতম্য, বৃষ্টিপাতের ধারার পরিবর্তন, দিনের দৈর্ঘ্য মোটকথা প্রকৃতির  হেয়ালিপনা। আবহাওয়া জলবায়ুর তারতম্যের ফলে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর পোকা, পোকা বহনকারী রোগ বিভিন্ন ফসলে আক্রমণ করছে, যার ফলে ফলন কমে যাচ্ছে। চাষিরা ভালো ফলন না পেয়ে অভিযোজন বা খাপ খাওয়ানোর কৌশলসমূহ স্থায়ীভাবে ব্যবহার করছে না। কিছু কিছু এলাকায় বিভিন্ন ধরনের ফসল, ফল, শাকসবজিসহ অন্যান্য ফসল ভালো ফলন দেয়া শুরু করলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে আর তা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, পরিবেশসম্মত বা পরিবেশবান্ধব কৃষি বাস্তবায়ন করতে হলে জৈব কৃষির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।  জৈব কৃষিতে জৈবসার, জৈব বালানাশক, জৈব ব্যবস্থাপনা প্রধান।  জৈবিক বালাই ব্যবস্থাপনার প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে বিভিন্ন পোকামাকড় ও  রোগ দমনের জন্য সমন্বিত বালাই দমনব্যবস্থা, উপকারী বন্ধু পোকার ব্যবহার, পোকার সেক্স ফেরোমন ব্যবহার করা। আইসিএম-আইপিএম পদ্ধতির মাধ্যমে কীটনাশকের ব্যবহারে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেকখানি কমে যাবে এবং পরিবেশ সুরক্ষায় ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশে সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে ফসলে বালাই দমন দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত আছে। জৈবিকভাবে ফসলের বালাই দমন আইপিএমের একটি লাগসই প্রযুক্তি যা সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। জৈবিক পদ্ধতিতে বালাই দমন ব্যবস্থাপনায় যে সব উপাদান-পণ্য রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো উপকারী বন্ধু পোকার লালন ও পোকার সেক্স ফেরোমন ব্যবহার করা। তাই কৃষকভাইদের প্রতি আমাদের আহবান আপনারা নিরাপদ ফসল উৎপাদন করুন। এসময় বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক কৃষিবিদ শ্যামল কুমার বিশ্বাস, জেলা প্রশিক্ষণ অফিসার সুশান্ত কুমার প্রামানিক, কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিষ্ণু পদ সাহা, মিরপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সাবিহা সুলতানা প্রমুখ।

রোগ প্রতিরোধে শীতের সবজি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ এখন শীতের বাজার সবজিতে ভরপুর। এর মধ্যে রয়েছে টমেটো, বাঁধাকপি, মটরশুঁটি, ফুলকপি, গাজর, শিম, বরবটি, করলাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি। এসব সবজি শরীরের বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি  রোগপ্রতিরোধ ও নিরাময়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এবার শীতের কয়েকটি সবজির গুণাগুণ তুলে ধরা হলো ঃ

টমেটো : টমেটো এ সময়ের একটি আলোচিত সবজি। প্রোস্টেট ক্যানসার প্রতিরোধে টমেটো ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। টমেটোর মধ্যে রয়েছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান লাইকোপেন। এ লাইকোপেন দেহকোষ থেকে বিষাক্ত ফ্রিরেডিক্যালকে সরিয়ে প্রোস্টেট ক্যানসারসহ মূত্রথলি, অগ্ন্যাশয় ও অন্ননালির ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়তা করে। গবেষকরা বলেছেন, যারা সপ্তাহে অন্তত চারবার টমেটো খায় তাদের ক্ষেত্রে প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি শতকরা ২০ ভাগ কমে যায়। আর সপ্তাহে ১০ বার খেলে ঝুঁকি ৫০ ভাগ কমে আসে। তবে এ উপকার  পেতে হলে তারা পাকা টমেটো এবং রান্না করা কিংবা সস করা টমেটো খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

ফুলকপি ঃ ফুলকপির উল্লেখযোগ্য পুষ্টি উপাদান হলো ক্যালসিয়াম লৌহ, খনিজসহ ভিটামিন বি-১ ও বি-২। ক্যালসিয়াম হাড়ের গঠনে, মাংসপেশির সংকোচনজনিত ব্যথা দূরীকরণে আর লৌহ রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে। প্রতি ১০০ গ্রাম ফুলকপিতে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ ৪১ আর লৌহ ১.৫ মিলিগ্রাম।

মটরশুঁটি ঃ বাজারে উপস্থিত আরেকটি পছন্দের শস্যদানা-জাতীয় সবজি হলো মটরশুঁটি। মটরশুঁটিতেও রয়েছে ফুলকপির মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান ও ভিটামিন। প্রতি ১০০ গ্রাম মটরশুঁটিতে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ ২৬ আর লৌহ ১.৫ মিলিগ্রাম।

গাজর ঃ রূপে-গুণে অনন্য একটি সবজি খাবার হিসেবে গাজরের ব্যবহারও নানাবিধ। কাঁচা ও রান্না করা উভয় অবস্থায়ই গ্রহণ করা যায়। মূলজাতীয় সবজির মধ্যে গাজরে রয়েছে সর্বোচ্চ পরিমাণ বিটাক্যারোটিন। প্রতি ১০০ গ্রাম গাজরে এই বিটাক্যারোটিনের পরিমাণ প্রায় ১৮৯০ মাইক্রোগ্রাম (সূত্র : বিদেশি ম্যাগাজিন) এবং ক্যালসিয়াম প্রায় ৮০ মিলিগ্রাম। তা ছাড়া গাজরে রয়েছে লাইকোপেন নামক উপাদান যা ক্যানসার প্রতিরোধে বিশেষভাবে সহায়ক। গাজরের গুণ অনেক। গাজর ত্বক ও চুলকে সূর্য্যরশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করে। গাজর মহিলাদের ছত্রাক সংক্রমণের ঝুঁকি কমায়। চোখের ছানি, রাতকানা, হৃদরোগসহ ক্যানসার প্রতিরোধে গাজর অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

শিম ও ঢেঁড়স ঃ শিম ও ঢেঁড়সে অন্যান্য সবজির মতো পুষ্টি উপাদান ও ভিটামিন রয়েছে। তবে শিম ও ঢেঁড়সে রয়েছে প্রচুর ক্যালসিয়াম। প্রতি ১০০ গ্রাম শিম ও  ঢেঁড়সে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ যথাক্রমে ২১০ ও ১১৬ মিলিগ্রাম।

উল্লেখ্য, সবজির মধ্যে সর্বোচ্চ ক্যালসিয়াম রয়েছে ডাঁটায়। প্রতি ১০০ গ্রাম ডাঁটায় ক্যালসিয়াম ২৬০ মিলিগ্রাম।

ধনে ও লেটুস ঃ শীতকালীন পাতার মধ্যে এ দুটি পাতাই সহজে কাঁচা অবস্থায় খাওয়া যায়। ফলে প্রকৃত পুষ্টিগুণ প্রায় পুরোটাই এ ক্ষেত্রে বজায় থাকে। বিশেষ করে ভিটামিন সির গুণাগুণ অক্ষুন্ন থাকে। এ দুটি পাতায়ই রয়েছে প্রচুর বিটাক্যারোটিন, ক্যালসিয়াম, লৌহ ও ভিটামিন বি-১, বি-২ ইত্যাদি।

সবজি ও শাকপাতার একই ধরনের কিছু গুণাগুণ : শাকসবজিতে থাকে প্রচুর পরিমাণে আঁশ। এ আঁশ কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করে।

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে শাকসবজির কোনো বিকল্প নেই। শাকসবজিতে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন-এ, সি, বি-১ ও বি-২; যা শরীরে ভিটামিন চাহিদা মিটিয়ে রাতকানাসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করে। ভিটামিন-এ লিভারে ছয় মাস পর্যন্ত সঞ্চিত থাকে বলে শীতের সময় নিয়মিত শাকসবজি খেলে তা বছরের বাকি সময়ের ভিটামিন-এ’র চাহিদা পূরণে সক্ষম হতে পারে।

এ ছাড়া শাকসবজিতে থাকে প্রচুর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান, যা ত্বকের বার্ধক্যরোধে ভূমিকা রাখে। ত্বক সজীব রাখে। এ ছাড়া শাকসবজির অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হৃদরোগ প্রতিরোধে সহায়ক। শাকসবজির আঁশ ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান অন্ননালির ক্যানসারসহ বিভিন্ন ক্যানসার প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। আঁশজাতীয় খাবার শরীরে খাদ্যের চর্বি শোষণে বাধা প্রদান করে। তাই শাকসবজি গ্রহণে শরীর মুটিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পায়। শাকসবজিতে থাকে ভিটামিন-ই, যা শরীর ঠিক রাখে। ভিটামিন-ই হৃদরোগ প্রতিরোধসহ যৌবন অটুট রাখতে সাহায্য করে।

তামাকের পরিবর্তে চাষীরা ঝুঁকছে পান চাষে

কুষ্টিয়ায় বিষমুক্ত উপায়ে বাংলাপান চাষে লাভবান কৃষক

কাঞ্চন কুমার ॥ বিনাচাষে বরজের মাধ্যমে বিষমুক্ত উপায়ে “বাংলাপান” জাতের পান চাষ করে অধিক লাভবান হচ্ছেন কুষ্টিয়ার কৃষকরা। আধুনিক উপায়ে এ জাতের পান চাষ করে বিঘাপ্রতি এক থেকে দেড় লাখ টাকা লাভ করছেন কৃষকরা। কয়েক বছর পূর্বেও যেখানে অধিক আর্থিক লাভের আশায় কৃষকরা তামাক চাষে ঝুঁকেছিলো, এখন তারা তামাকের পরিবর্তে অধিক লাভবান অর্থকারী ফসল এ পান চাষে ঝুঁকছে। অর্থকারী ফসল ছাড়াও পানের ভেষজ গুণাবলীর কারণে রয়েছে পানের চাহিদা। এছাড়া বাংলার ঐতিহ্যে বিয়ে বাড়ীর অনুষ্ঠানে ও পূজা-পার্বনেও রয়েছে পানের কদর। কুষ্টিয়ার মাটি পান চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় এবং পানের বাজার দর ভালো থাকায় পান চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন কৃষকরা। অন্যান্য ফসলের তুলনায় পানে লাভও বেশি হয়। বাজারের চাহিদার কথা চিন্তা করে, মাটি ও মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকে নজর দিয়ে নিরাপদ পান উৎপাদনে কৃষি অফিস সহায়তা করছেন কৃষকদের। প্রদর্শনী, মাঠ দিবস, প্রশিক্ষনের মাধ্যমে বিষমুক্ত উপায়ে পান চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছে কৃষি অফিস। কুষ্টিয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য মতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কুষ্টিয়ার ছয়টি উপজেলায় ২ হাজার ১শ ৪০ হেক্টর জমিতে পান চাষ করা হয়েছিলো। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পান চাষ হয়েছিলো ভেড়ামারা উপজেলায়। ভেড়ামারা উপজেলায় ৭শ ২০ হেক্টর, দৌলতপুর উপজেলায় ৫শ ৩৬ হেক্টর, কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় ৬শ ২০ হেক্টর, মিরপুর উপজেলায় ১শ ৬০ হেক্টর, খোকসা উপজেলায় ৮২ হেক্টর এবং কুমারখালী উপজেলায় ২২ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়েছিলো। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পান চাষ বৃদ্ধি পেয়ে চাষ হয়েছিলো ২ হাজার ১শ ৬৫ হেক্টর।  এর মধ্যে ভেড়ামারা উপজেলায় ৭শ ৫০ হেক্টর, দৌলতপুর উপজেলায় ৫শ হেক্টর, কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় ৬শ ২০ হেক্টর, মিরপুর উপজেলায় ২শ ১০ হেক্টর, খোকসা উপজেলায় ৭০ হেক্টর এবং কুমারখালী উপজেলায় ২৫ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়েছিলো। বাংলা পান, মিঠা পান, দেশী পান, ঝালি পান, সাচি পান, কর্পূরী পান, গ্যাচ পান, মাঘি পান, উজানী পান, নাতিয়াবাসুত পান, বরিশাল পান, উচ্চ ফলনশীল ও বিভিন্ন গুণাবলী সম্পন্ন এবং রোগ প্রতিরোধে সক্ষম বারিপান-১, বারিপান-২ এবং বারিপান-৩ ছাড়াও বেশ কয়েকটি পান বাংলাদেশে চাষ করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে বাংলা পান ও মিঠা পান জনপ্রিয়। কুষ্টিয়া অঞ্চলে এ বাংলা পান চাষে আগ্রহ বেশি কৃষকদের। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা, দৌলতপুর ও মিরপুরে এ বাংলা পানের চাষ বেশি হয়ে থাকে। স্বাদ ও সুগন্ধিযুক্ত এ জাতের পানের বাজারে রয়েছে বেশ চাহিদা। এছাড়া বাংলাপান পাতা পঁচা, পাতা পোড়া ও অন্যান্য রোগ প্রতিরোধক্ষম হওয়ায় কৃষকরা এ পান চাষে বেশি ঝুঁকছে। ভেড়ামারা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের ঠাকুর দৌলতপুর এলাকার পান চাষী আব্দুর রহমান জানান, আমি দীর্ঘদিন ধরেই পান চাষ করি। তবে পানের বিভিন্ন রোগে পানে খুব একটা লাভ হতো না। পরে আমি উপজেলা কৃষি অফিস থেকে আমি নিরাপদ উপায়ে পান চাষের উপরে প্রশিক্ষন নিয়ে দুই বিঘা জমিতে “বাংলাপান” জাতের পানের চাষ করছি। আমি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নিরাপদ পান উপাদন করছি। দুই বিঘা জমিতে আমার প্রায় দুই লক্ষ টাকা লাভ হবে বলে আশা করছি। মিরপুর উপজেলার বারুইপাড়া ইউনিয়নের ফকিরাবাদ এলাকার পান চাষী শহিদুল ইসলাম জানান, আমি আগে তামাক চাষ করতাম। তবে এখন আর তামাক চাষ করি না। বর্তমানে আমি পান চাষ করি। আমি গত বছর এক বিঘা জমিতে বাংলাপানের চাষ করেছিলাম। সেখানে আমার প্রায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা লাভ হয়েছিলো। প্রথমবার পানের বরজ করতে একটু বেশি খরচ হয়। কিন্তু পরের বার চাষ করতে খরচ কম। এবছর আমি তিন বিঘা জমিতে বাংলাপানের চাষ করেছি। প্রায় দুই লাখ টাকার উপরে পান বিক্রি করেছি। এখনো ২-৩ লাখ টাকার বিক্রি হবে। তিনি আরো জানান, স্থানীয় বাজার, কুষ্টিয়া, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ বাংলাপানের চাহিদা বেশি থাকায় আমরা সেখানে রপ্তানি করি। মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রমেশ চন্দ্র ঘোষ জানান, অর্থকারী ফসলের মধ্যে পান একটি লাভজনক ফসল। ইতিপূর্বে কুষ্টিয়ার পান সারা দেশের মধ্যে বিখ্যাত ছিলো। তবে বিগত কয়েক বছর আগে পানের বিভিন্ন রোগের কারনে পান চাষীদের লোকসান হয়। এতে পান চাষ অনেকটা কমে যায়। পরবর্তীতের আমরা পান উৎপাদন ও সম্প্রসারণ কর্মসূচির আওতায় পান চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করি। সেই সাথে নিরাপদ উপায়ে পান চাষের উপরে আমরা কৃষকদের প্রশিক্ষন প্রদান করি। এতে কৃষকরা পান চাষে লাভবান হয়। ফলে এই এলাকায় এবছর আরো ৩০টি পানের বরজ বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সাথে চাষীরা ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার করে পান চাষীরা লাভবান হচ্ছেন। তিনি আরো জানান, এ উপজেলা থেকে আশা করছি এ বছর দেশের বাইরেও পান রপ্তানি করা হবে। কুষ্টিয়া  জেলা কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) কৃষিবিদ রঞ্জন কুমার জানান, পান চাষ অত্যাধিক লাভজনক। এছাড়া বাজারে বাংলাপানের চাহিদা বেশি। তাই কুষ্টিয়ার কৃষকরা এ বাংলাপানের চাষ করছে। আমরা নিরাপদ পান উৎপাদন প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকদের পান উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করছি। এতে আমরা নিরাপদ পান উৎপাদন করছি। এছাড়া বিষ মুক্ত এ পান আমরা আবারো বিদেশে রপ্তানির চেষ্টা করছি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরোজমিন উইং এর পরিচালক কৃষিবিদ চন্ডীদাস কুন্ডু বলেন, পান একটি অর্থকারী ফসল। পানের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনান্য ফসলের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। দেশে বিদেশে রয়েছে এর ব্যাপক চাহিদা। এছাড়াও এতে অনেক ঔষধি গুণ বিদ্যমান। এক বিঘা জমিতে পান চাষ করে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা লাভ করা যায়। এটা তামাক, পাট এর চেয়ে অধিক লাভবান। আর বিষমুক্ত পান বিদেশে রপ্তানী করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

 

বারোমাসি তরমুজ ‘ব্ল্যাকবেরি’ চাষে সফলতা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ প্রথমবারের মতো মাচায় বারোমাসি তরমুজের চাষ করে সফলতা অর্জন করেছেন জয়পুরহাটের কৃষকরা। জেলার পাঁচবিবি উপজেলার ভারাহুত গ্রামে প্রায় ২ হেক্টর জমিতে এবার কালচে রঙের তাইওয়ান ব্ল্যাকবেরি ও হলুদ রঙের মধুমালা জাতের বারোমাসি তরমুজসহ পরীক্ষামূলক ভাবে চাষ হচ্ছে ভারতীয় জেসমিন-১ ও ২ জাতের তরমুজ।

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, ভারাহুত গ্রামের মুছা মিয়া ২০১৮ সালে আড়াই শতাংশ জমিতে ৪ হাজার ৭শ টাকা খরচ করে পরীক্ষামূলক ভাবে চাষ করেণ ব্ল্যাকবেরি জাতের ওই তরমুজ। ২ মাসেই তিনি ২৪ হাজার টাকার তরমুজ বিক্রি করেণ। এ সাফল্য দেখে পাশবর্তী এলাকার অনেকেই তাইওয়ান জাতের এ ব্ল্যাকবেরি তরমুজ চাষে এগিয়ে আসেন। এখন চাষ হচ্ছে প্রায় ২  হেক্টর জমিতে। ভারাহুত, কয়তাহার, কুসুমসারা, দাউসারা, মাহমুদপুর গ্রামের জমি তরমুজ চাষের উপযোগী হওয়ায় ওই এলাকা তরমুজ চাষের জন্য বেছে  নেয়া হয় বলে জানান বে-সরকারি উন্নয়ন সংস্থা ’এসো’র কৃষিবিদ  মোজাফফর রহমান। ব্ল্যাকবেরি ও মধুমালা জাতের তরমুজ শীতকাল ছাড়া বছরের সব সময় চাষ করা যায়। মাচা পদ্ধতিতে এ তরমুজের চাষ হওয়ায় উৎপাদন খরচ কম, বাজারে দামও ভালো। মালচিং পেপার বেডে সেটিং ও  নেটিংয়ের ফলে বৃষ্টি, পোকামাকড়, ইঁদুরের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। মাচা ও মালচিং পেপার তিনবার ব্যবহার করতে পারায় ২য় ও ৩য় ধাপে তরমুজের উৎপাদন খরচ কম হয়। কীটনাশক ছাড়া বিষমুক্তভাবে কেঁচো সার, কম্পোষ্ট, বায়োনিম, ফেরোম্যান ফাঁদ ব্যবহারের কারণে রোগবালাইয়ের প্রকোপও কম। ভারাহুত গামের কৃষক রেজুয়ান এবার ৪৭ হাজার টাকা খরচ করে ৫৫ শতাংশ জমিতে তরমুজ চাষ করে খরচ বাদে লাভ করেন ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। পার্শ্ববর্তী বাবু নামে অপর কৃষক ৪২ হাজার টাকা খরচ করে ৩০ শতাংশ জমিতে তরমুজ চাষ করে লাভ করেছেন ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা। ২২ হাজার টাকা খরচ করে ১৫ শতাংশ জমিতে তরমুজ চাষ করে ১ লাখ ৩ হাজার টাকা লাভ করেছেন বলে জানান পাশের চাষী রবিউল ইসলাম। কৃষকদের উন্নত জাতের বারোমাসি ওই তরমুজ চাষে উদ্বুদ্ধ করাসহ আর্থিক ভাবে সহযোগিতা করছেন স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এ্যাহেড  স্যোশাল অর্গানাইজেশন (এসো)। তরমুজ চাষ করা কৃষকদের সঙ্গে আলাপ কালে জানা যায়, প্রতিবিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করতে খরচ পড়ে ৩৫/৪০ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় তরমুজের উৎপাদন হয়ে থাকে ৪ থেকে ৫ হাজার  কেজি। বীজ লাগানোর দিন থেকে ৬৫/৭০ দিনের মধ্যে বিক্রি উপযোগী হয়। বাজারে দাম বেশি হওয়ায় এক বিঘা জমিতে উন্নত জাতের ওই তরমুজ চাষ করে খরচ বাদে লাভ থাকছে ১ লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত। বর্তমান বাজারে ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে এ তরমুজ। একদিকে যেমন ফলন ভালো অন্যদিকে উৎপাদন খরচও কম সবমিলে ভালো লাভ থাকার কারণে আশ পাশের কৃষকরাও উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন তাইওয়ান জাতের এ তরমুজ চাষে। ফলন কিভাবে আরও বৃদ্ধি করা যায় এ ব্যপারে প্রয়োজনীয় পরামর্শ  দেয়া হচ্ছে বলে জানান জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ সুধেন্দ্র নাথ রায়।

কৃষি বিভাগের নানান প্রচেষ্টা আর কৃষকের পরিশ্রম

কুষ্টিয়ায় বাড়ছে ফসলের হেক্টরপ্রতি ফলন

কাঞ্চন কুমার ॥ মাটির ধরণ ও পরিবেশ অনুযায়ী বাংলাদেশের মাটিকে ৩০টি কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। স্বল্প বৃষ্টিপাত সম্পন্ন এলাকায় অবস্থিত কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-১১। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা কুষ্টিয়া এই অঞ্চলে অবস্থিত। গঙ্গাবাহিত পলি মাটি কারণে এই অঞ্চলের প্রধান ফসল ধান। কুষ্টিয়া অঞ্চলের মাটি উঁচু এবং মাঝারী উচুঁ জমিতে হালকা বুনটের বেলে দোআশ হতে দোআশ এবং নিচু ও মাঝারী নিচু জমিতে পলি দোআশ হতে এটেল দোআশ বুনট বিশিষ্ট। তাই ধান ভিত্তিক দুই ফসলী ও তিন ফসলী জমি এ এলাকার প্রধান শস্য বিন্যাস। ধান ছাড়াও এ জেলায় গম, ভুট্টা, সরিষা, তিল, চিনাবাদাম, ছোলা, মটর, খেসারী, মাসকলাই, মুগ, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, ধনিয়া, আলু, পটল, বেগুনসহ বিভিন্ন প্রকার সবজি ছাড়াও আখ, পাট তামাক চাষ হয়ে থাকে। জেলা কৃষি অফিসের দেওয়া তথ্য মতে, বিগত কয়েক বছরের তুলনায় কুষ্টিয়ায় প্রায় সকল ধরনের কৃষি পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৮-০৯ সালে কুষ্টিয়ায় ধানের হেক্টরপ্রতি ফলন ছিলো ২ দশমিক ৫৭ মেট্রিকটন। যা ২০১৬-১৭ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৩৮ মেট্রিকটন। যা শতকরা ৩১ দশমিক ৫০% বেশি। ২০১৮-১৯ সালে আবাদ হয়েছিলো ১ লক্ষ ৪৮ হাজার ৪শ ৩৫ হেক্টর, উৎপাদন হয়েছিলো ৫ লক্ষ ৮শ ৫৯ মেট্রিকটন।  ২০০৮-০৯ সালে গমের হেক্টরপ্রতি ফলন ছিলো ২ দশমিক ৩৮ মেট্রিকটন। যা ২০১৬-১৭ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাড়ায় ৩ দশমিক ৬০ মেট্রিকটন। যা শতকরা ৫১% বেশি। ২০১৮-১৯ সালে আবাদ হয়েছিলো ৯ হাজার ২শ ৯৫ হেক্টর, উৎপাদন হয়েছিলো ৩৬ হাজার ২শ ৫০ মেট্রিকটন।  ২০০৮-০৯ সালে ভুট্টার হেক্টরপ্রতি ফলন ছিলো ৬ দশমিক ০৩ মেট্রিক টন। যা ২০১৬-১৭ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাড়ায় ১০ দশমিক ৬০ মেট্রিকটন। যা শতকরা ৭৬% বেশি। ২০১৮-১৯ সালে আবাদ হয়েছিলো ৮ হাজার ৪শ ৭৫ হেক্টর, উৎপাদন হয়েছিলো ৯০ হাজার ৩শ ৭০ মেট্রিকটন।  ২০০৮-০৯ সালে সরিষার হেক্টরপ্রতি ফলন ছিলো ১ দশমিক ২৬ মেট্রিকটন। যা ২০১৬-১৭ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৫০ মেট্রিকটন। যা শতকরা ১৯% বেশি। এছাড়া ৫৩৭ টি মৌ বাক্স সরিষা ক্ষেতে স্থাপনের মাধ্যমে ৬৫২০ মধু আহরণ করা হয়। ২০১৮-১৯ সালে আবাদ হয়েছিলো ৬ হাজার ৭শ ৫০ হেক্টর, উৎপাদন হয়েছিলো ৯ হাজার ৭শ ৮৮ মেট্রিকটন।  ২০০৮-০৯ সালে ডাল জাতীয় ফসলের গড় হেক্টরপ্রতি ফলন ছিলো ১ দশমিক ২৪ মেট্রিকটন। যা ২০১৬-১৭ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাড়ায় ১ দশমিক ৫৭ মেট্রিকটন। যা শতকরা ২৭% বেশি। ২০১৮-১৯ সালে আবাদ হয়েছিলো ১৮ হাজার ৯৫ হেক্টর, উৎপাদন হয়েছিলো ২৬ হাজার ৬শ ৫১ মেট্রিকটন।  ২০০৮-০৯ সালে মসলা জাতীয় (মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, ধনিয়া) চাষ হয়েছিলো ৫ হাজার ৯শ ১৫ হেক্টর। হেক্টরপ্রতি ফলন ছিলো ৮ দশমিক ৬০ মেট্রিকটন। যা ২০১৬-১৭ সালে বৃদ্ধি পেয়ে চাষ হয় ১১হাজার ২০ হেক্টর। ফলন ১২ দশমিক ৩৯ মেট্রিকটন। ২০১৮-১৯ সালে আবাদ হয়েছিলো ১৫ হাজার ৯শ ৯৮ হেক্টর, উৎপাদন হয়েছিলো ১ লক্ষ ৭৮ হাজার ১ মেট্রিকটন।

২০০৮-০৯ সালে সবজি আবাদ হয়েছিলো ৮ হাজার ৮শ ৭৫ হেক্টর। উৎপাদন ছিলো ১ লক্ষ ৩৩ হাজার ১শ ৬৮ মেট্রিকটন। যা ২০১৬-১৭ সালে বৃদ্ধি পেয়ে আবাদ হয় ৯ হাজার ৩শ ৮৫ হেক্টর। ফলন হয় ২ লক্ষ ৩৪ হাজার ৫শ ২৫ মেট্রিকটন। যা শতকরা ৩৬% বেশি। ২০১৮-১৯ সালে আবাদ হয়েছিলো ৮ হাজার ৩শ হেক্টর, উৎপাদন হয়েছিলো ২ লক্ষ ৪ হাজার মেট্রিকটন।  ২০০৮-০৯ সালে পাটের আবাদ হয়েছিলো ২৫ হাজার ২শ ৬০ হেক্টরপ্রতি ফলন ছিলো ১১ দশমিক ৫০ মেট্রিকটন। যা ২০১৬-১৭ সালে বৃদ্ধি পেয়ে আবাদ হয় ৪২ হাজার ৩শ ৮০ হেক্টর। হেক্টর প্রতি ফলন হয় ১২ মেট্রিকটন। যা শতকরা ১২% বেশি।

কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) কৃষিবিদ রঞ্জন কুমার জানান, কুষ্টিয়ার মাটি কৃষি কাজের জন্য উপযোগী। এছাড়া বর্তমানে নতুন নতুন ফসলের জাত, বিভিন্ন সময়ে সরকারী দেওয়া প্রনোদনা, ফসল উৎপাদনে বিভিন্ন কর্মসূচি, প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে উদপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া কৃষি পরামর্শের জন্য আমরা কৃষি অফিসের মাধ্যমে কৃষকের দোড় গোড়ায় সেবা পৌঁছে দিচ্ছি। এছাড়া বর্তমানে কৃষি বান্ধব সরকারের নীতিমালাও বড় ধরনের অগ্রনী ভূমিকা পাচ্ছে। বর্তমানে প্রনোদনার মাধ্যমে কৃষক বিনামূল্যে সার, বীজ, পাচ্ছে। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত শস্য বাজারে বিক্রি করতে পাচ্ছে। তাই তারা ফসল উৎপাদনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এছাড়া আমরা জেলা কৃষি অফিস থেকে প্রশিক্ষনের মাধ্যমে আধুনিক চাষাবাদ, নিরাপদ উপায়ে ফসল উৎপাদনে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি। আইপিএম কৃষক মাঠ স্কুল, মাঠ দিবস, কৃষক প্রশিক্ষনের মাধ্যমে কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করা, সহজ কৃষি উপকরণ প্রাপ্তির কারনেই উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামীতেও এ জেলায় সকল ধরনের কৃষি পন্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে বলে আমরা আশা করছি।

 

 

 

 

 

আধুনিক নিয়মে শিম চাষে লাভ বেশি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ শিমের সবচেয়ে ক্ষতিকর পোকা হলো ফল ছিদ্রকারী পোকা ও জাব পোকা। শিমের ফলছিদ্রকারী পোকা নিয়ন্ত্রণের জন্য আক্রান্ত ফল তুলে ধ্বংস করতে হবে, শিমগাছের ডগার প্যাঁচ খুলে ছাড়িয়ে দিতে হবে ও এসব করার পর প্রোক্লেম কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম গুলে ক্ষেতে ¯েপ্র করতে হবে। চারা অবস্থায় পাতা সুড়ঙ্গকারী  পোকা মহাক্ষতিকর। লাল ক্ষুদ্র মাকড়ও অনেক সময়  বেশ ক্ষতি করে থাকে। ফুল ফুটলে থ্রিপস ক্ষতি করতে পারে। ফল পেকে এলে বিন পড বাগ বা শিমের গান্ধি পোকা ক্ষতি করে। শিমের সবচেয়ে মারাত্মক রোগ দুটি- মোজেইক ও অ্যানথ্রাকনোজ। আইপিএম পদ্ধতি অনুসরণ করে এসব  পোকামাকড় ও রোগ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে হবে। মৃত্যুঞ্জয় রায় শিম মানে  দেশি শিম। শিম একটি প্রোটিনসমৃদ্ধ সবজি। এর সবুজ বিচিও পুষ্টিকর হিসেবে খাওয়া হয়। এটি জমি ছাড়াও রাস্তার ধারে, আইলে, ঘরের চালে, গাছেও ফলানো যায়। শিম এ দেশে একটি জনপ্রিয় শীতকালের সবজি। এখন আধুনিক জাতের কল্যাণে অসময়েও শিম চাষ করা হচ্ছে। শিম বা ফল সবজি হিসেবে রেঁধে খাওয়া হয়। সবজি হিসেবেই শিম প্রধানত চাষ করা হয়। তবে এর পাতা উত্তম পশুখাদ্য।  কেউ  কেউ সবুজ সার ফসল ও  শোভাবর্ধক ফুলের গাছ হিসেবেও চাষ করেন। ভারতের মহারাষ্ট্রে শ্রাবণ মাসে এক বিশেষ উপবাসে শিম দিয়ে এক মসলা তরকারি রান্না করা হয় যাকে বলে ‘বালা ছে বারডে’। কর্নাটকে সালাদে শিম ব্যবহার করা হয়। তেলেঙ্গানায়  পোঙ্গাল উৎসব উপলক্ষে শিমের ফলকে কুচি কুচি করে কেটে এক বিশেষ ধরনের তরকারি রান্না করা হয়। বাজরার রুটি দিয়ে সেই তরকারি খাওয়া হয়। শত বছরের এই ঐতিহ্য সেখানে চলে আসছে। পাকা শিমের বিচি  ভেজে বাদামের মতো খাওয়া হয়। শিমের বিচির ডাল একটি উপাদেয় খাবার। পার্বত্য চট্টগ্রামে শিমের কাঁচা বিচি আলু ও অন্যান্য সবজির সঙ্গে বা শুধু বিচি দিয়ে তরকারি রেঁধে খাওয়া হয়। কেনিয়ায় প্রসূতি মায়ের বুকের দুধ বাড়ানোর জন্য শিম খাওয়ানো হয়। ফল সিদ্ধ করে ভর্তা বানিয়ে খাওয়া হয়।  কেনিয়া ও এ দেশে শিমের ভর্তা একটি জনপ্রিয় খাবার। কোনো কোনো  দেশে শিমের কচি পাতা পালংশাকের মতো ভেজে খাওয়া হয়।

জলবায়ু ও মাটি  ঃ শিম ঠান্ডা ও শুষ্ক জলবায়ুতে ভালো হয়। এটি একটি হ্রস্ব দিবসী উদ্ভিদ। তবে গাছের দৈহিক বৃদ্ধির জন্য উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু এবং দীর্ঘ দিবসের দরকার হয়। গাছ যখনই লাগানো হোক না কেন দিনের দৈর্ঘ্য একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে না পৌঁছা পর্যন্ত ফুল ও ফল ধরে না। অতীতে এ দেশে  যেসব জাত ছিল সেসব জাতে কোনোভাবেই মধ্য অক্টোবরের আগে ফুল আসত না। এখন গ্রীষ্মকালীন জাত উদ্ভাবিত হওয়ায় গ্রীষ্মকালেও (জুন-জুলাই) ফল ধরছে। এসব জাতের শিমগাছ তাপমাত্রা ও দিবস নিরপেক্ষ হওয়ায় এখন বছরের যে কোনো সময় লাগালে শিম হচ্ছে। দোঁ-আশ ও  বেলে দোঁ-আশ মাটিতে শিম ভালো ফলন হয়। নদী তীরের উর্বর পলিমাটিতেও শিম ভালো হয়।

উল্লেখযোগ্য জাত  ঃ দেশে ৫০টিরও বেশি স্থানীয় শিমের জাত আছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাইনতারা, হাতিকান, চ্যাপ্টা শিম, ধলা শিম, পুঁটি শিম, ঘৃত কাঞ্চন, সীতাকুন্ডু, নলডক ইত্যাদি। বারি শিম ১, বারিশিম ২, বারি শিম ৫, বারি শিম ৬, বিইউ শিম ৩, ইপসা শিম ১, ইপসা শিম ২, একস্ট্রা আর্লি, আইরেট ইত্যাদি আধুনিক উচ্চফলনশীল জাত। নিচে কয়েকটি আধুনিক জাতের শিমের পরিচয় দেয়া হলো-

বারি শিম-১ মাঝারি আগাম জাত। আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাসে বীজ বপন করতে হয়। প্রতিটি শিমের ওজন ১০-১১ গ্রাম, শিমে ৪-৫ টি বীজ হয়, গাছপ্রতি ৪৫০-৫০০টি শিম ধরে। জীবনকাল ২০০-২২০ দিন। হেক্টর প্রতি ফলন ২০-২২ টন।

বারি শিম-২ আগাম জাত। আষাঢ়  থেকে ভাদ্র মাসে বীজ বপন করতে হয়। প্রতিটি শিমের ওজন ১০-১৩ গ্রাম, শিমে ৪-৫টি বীজ হয়, গাছপ্রতি ৩৮০-৪০০টি শিম ধরে। জীবনকাল ১৯০-২১০ দিন। হেক্টরপ্রতি ফলন ১০-১২ টন।

বারি শিম-৫ শীতকালে হয়। গাছ খাটো, লতায় না বলে এ গাছে মাচার দরকার হয় না। বীজ বোনার ৩৫ থেকে ৪৫ দিন পর  থেকেই শিম তোলা শুরু করা যায়। প্রতি গাছে ৫০ থেকে ৭০টি ফল ধরে। এ জাতের জীবনকাল ৭৫ থেকে ৮০ দিন, হেক্টরপ্রতি ফলন ১২.১৩ টন।

বারি শিম-৬ ফল কম আঁশযুক্ত, লম্বাটে, দেখতে অনেকটা নলডক শিমের মতো। গাছপ্রতি ৩০০ থেকে ৩৫০টি শিম ধরে। রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয়। ফলন হেক্টরপ্রতি ১৭ থেকে ২০ টন। জীবনকাল ২২০  থেকে ২২৫ দিন। বিইউ শিম-৩ সারা বছর চাষ করা যায়। গ্রীষ্ম মৌসুমেও চাষের উপযোগী। শিমের রঙ বেগুনি। প্রতিটি শিমে গড়ে ৫টি বীজ হয়।  হেক্টরপ্রতি ফলন ৭-৮ টন। ইপসা শিম-১ সারা বছর চাষ করা যায়। গ্রীষ্ম  মৌসুমেও চাষের উপযোগী। শিমের রঙ বেগুনি। প্রতিটি শিমে গড়ে ৫টি বীজ হয়। হেক্টরপ্রতি ফলন ৫-১০ টন। ইপসা শিম-২ সারা বছর চাষ করা যায়। গ্রীষ্ম মৌসুমেও চাষের উপযোগী। শিমের রঙ সাদাটে সবুজ। প্রতিটি শিমে গড়ে ৪টি বীজ হয়। হেক্টর প্রতি ফলন ৭-৮ টন।

চারা তৈরি ঃ বর্ষাকালে যদি প্রচুর বৃষ্টি হয় তাহলে মাদায় বোনা বীজ পচে যেতে পারে বা মাদার মাটি ধুয়ে বীজ সরে যেতে পারে। এ জন্য ঝুঁকি না নিয়ে এ সময় অনেকে বাড়িতে নিরাপদ স্থানে পলিব্যাগে চারা তৈরি করে নিতে হবে। শ্রাবণের শেষের দিকে বা ভাদ্র মাসে ১০ থেকে ১৫ দিন বয়সী  সেসব চারা মাদায়  রোপণ করতে হবে।

জমি তৈরি, বীজ বপন ও চারা রোপণ ঃ  বেশি জমিতে আবাদ করা হলে সে জমিতে কয়েকটি চাষ ও মই দেয়া ভালো। চাষের পর ২.৫ মিটার চওড়া করে  বেড তৈরি করতে হবে। প্রতি বেডের মধ্যে ৫০ সেন্টিমিটার চওড়া ও ১৫  সেন্টিমিটার গভীর নালা রাখতে হবে। প্রতি বেডের কিনার থেকে ৫০  সেন্টিমিটার বাদ দিয়ে সারি করে মাদার জায়গা ঠিক করতে হবে। একটি  বেডের উভয় পাশ থেকে এভাবে ৫০ সেন্টিমিটার বাদ দিলে একটি  বেডে দুটি সারির মধ্যে দূরত্ব থাকবে ১.৫ মিটার।  জোড়া সারি পদ্ধতিতে প্রতি সারিতে ১.৫ মিটার পর পর মাদা তৈরি করতে হবে। মাদার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতার আকার ৪০ সেন্টিমিটার রাখতে হবে। এখন অনেকে বেড ২.৫ মিটার চওড়া না করে ১ মিটার চওড়া করে বেড তৈরি করছেন ও সে বেডের মাঝখানে একটি সারিতে ১ থেকে ১.৫ মিটার পর পর মাদা তৈরি করে বীজ বুনছেন। এতে পরিচর্যা ও ফল তুলতে সুবিধে হয়। ঈশ্বরদী বা পাবনা ও যশোরে অনেকে মাঝারি নিচু জমিতেও শিম চাষ করছেন।  সে ক্ষেত্রে মাদা  তৈরির আগে মাদার চিহ্নিত স্থানে মাটি তুলে ঢিবির মতো উঁচু করে কয়েকদিন  রেখে দিয়ে তারপর সেই ঢিবিতে মাদা তৈরি করে বীজ বুনছেন। খুলনা ও যশোরের কোনো কোনো এলাকায় নিচু জমিতেও শিম চাষ করা হচ্ছে। সে  ক্ষেত্রে সরজান বা কান্দিবেড় পদ্ধতিতে ০.৫ থেকে ১ মিটার গভীর ও ১ মিটার চওড়া করে নালা বা পরিখা খুঁড়ে সেই মাটি দুপাশে উঁচু বেডের মতো তুলে দেয়া হচ্ছে। এসব বেডে শিমের মাদা করে শিম চাষ করা হচ্ছে। নালার ওপরে থাকছে মাচা ও নিচে পানিতে দ্রুত বর্ধনশীল মাছের চাষ করা হচ্ছে।

আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত বীজ বোনার উপযুক্ত সময়। প্রতি মাদায় ৩  থেকে ৪টি বীজ বুনতে হবে। মাদায় সার মেশানোর ৪ থেকে ৫ দিন পর বীজ বুনতে হবে। বীজ বপনের আগে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বীজ ভিজিয়ে নিতে হবে। বীজ গজানোর পর ৮  থেকে ১০ দিনের মধ্যে প্রতিটি মাদায় ১টি করে সুস্থ চারা রেখে বাকি চারা তুলে ফেলতে হবে। সাধারণত হেক্টরে ৭.৫ কেজি বীজ লাগে (শতকে ৩০ গ্রাম)। জুন মাসে বা আষাঢ় মাসের মাঝামাঝি সময়  থেকে বীজ বপন করা যেতে পারে। আগাম শিমের জন্য এ সময়টা উত্তম। গ্রীষ্মকালীন জাতের জন্য বছরের যে কোনো সময় বীজ বোনা যায়।

রোপণ দূরত্ব ঃ একটি মাদা থেকে অন্য মাদার দূরত্ব ১ থেকে ১.৫ মিটার দিলে ভালো হয়।  সেচ ও পানি নিকাশ ঃ কোন অবস্থাতেই গাছের গোড়ায় পানি যাতে না জমে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। শুষ্ক মৌসুমে জমিতে প্রয়োজন মতো সেচ দিতে হবে। আগাছা পরিষ্কার ঃ মাঝেমধ্যে মাটি নিড়ানি দিয়ে মাদার মাটি আলগা করে দিতে হবে। মাচা বা বাউনি দেয়া ঃ শিম গাছ যখন ১৫  থেকে ২০ সেন্টিমিটার লম্বা হবে তখন মাদার গাছের গোড়ার পাশে বাঁশের ডগা মাটিতে পুঁতে বাউনির ব্যবস্থা করতে হবে।

শাখা ছাঁটাই ঃ পুরনো ও মরা শাখা, ডগা ছাঁটাই করে পরিষ্কার করে দিতে হবে। যেসব ডগায় ফুল ফোটে না সেসব ডগা ছেঁটে পরিষ্কার করে দিলে গাছে  বেশি ফুল আসে। ডগার প্যাঁচ খোলা ঃ শিমের ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ কমাতে ও বেশি ফুল ধরাতে জড়াজড়ি করে থাকা ডগাগুলোর প্যাঁচ খুলে দিতে হবে। ফসল তোলা ও ফলন ঃ জাতভেদে বীজ বোনার ৯৫ থেকে ১৪৫ দিন পর শিম তোলা যায়। সাধারণত আশ্বিন-কার্তিক মাসে ফুল ধরে। ফুল ফোটার ২০ থেকে ২৫ দিন পর ফসল সংগ্রহ করা যায়। শিমগাছ ৪ মাসেরও বেশি সময় ধরে ফল দেয়। ফলনপ্রতি শতকে ৬০ থেকে ৮০ কেজি, হেক্টরপ্রতি ১৫  থেকে ২০ টন।

দেশীয় মেশিনেই প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে পামঅয়েল

কৃষি প্রতিবেদক ॥ পামঅয়েল বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় ভোগ্য ভোজ্যতেল। আর প্রতি হেক্টর জমিতে পামঅয়েলের উৎপাদন সয়াবিনের থেকে প্রায় ১০ গুণ বেশি। পৃথিবীতে বর্ধিত জনসংখ্যার ভোজ্যতেলের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে পামঅয়েল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। আবার পুষ্টির চাহিদা পূরণেও পামঅয়েলের ভূমিকা অনেক। আর এসব কারণেই সয়াবিনের স্থান দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছে পামঅয়েল। কেবল আমাদের দেশেই নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই পামঅয়েল খাওয়ার প্রবণতা কয়েকগুণ বেড়েছে। এ জন্য বাংলাদেশে কয়েক বছর আগে সরকারি উদ্যোগে পাম গাছ থেকে তেল পাওয়ার জন্য ২০ লাখের অধিক পামঅয়েল চারা রোপণ করা হয়েছিল। এ ছাড়াও ব্যক্তিগত উদ্যোগে- সিলেট, দিনাজপুর, পার্বত্য অঞ্চলেও লাগানো হয়েছিল প্রচুর পামগাছ। কিন্তু যন্ত্রের অভাবে গাছ থেকে তেল প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হচ্ছিল না। এর প্রধান কারণ ছিল বিদেশ থেকে আমদানিকৃত  মেশিনের দাম ছিল অনেক বেশি। যা ছোট কৃষকের একার পক্ষে কেনা  কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। অন্যদিকে দেশের বাহির থেকে মেশিন কেনা হলেও তা এ দেশের কৃষকের জন্য উপযোগী ছিল না। এতে আগ্রহ হারিয়ে  ফেলেছিলেন পামচাষিরা। এসব বিষয়কে মাথায় রেখে পামঅয়েল প্রক্রিয়াজাতকরণ মেশিন উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবদুল আওয়াল। আর এ দেশীয় প্রযুক্তি ও কাঁচামাল দিয়ে উদ্ভাবিত এই মেশিন দিয়েই প্রক্রিয়াজাত শুরু হয়েছে পামঅয়েলের। এতে করে পামচাষিদের মধ্যে নতুন করে পাম চাষে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সারাদেশে  মেশিনটি ছড়িয়ে দিতে পারলে পামঅয়েল উৎপাদনে বিপ্লব সাধিত হবে। রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ভূমিকা রাখতে পারবে পামঅয়েল বলেও জানিয়েছেন এই উদ্ভাবক। মেশিনটি সম্পর্কে জানতে চাইলে উদ্ভাবক বলেন, এটি তৈরি করা অনেকটা চ্যালেঞ্জিং বিষয় ছিল। কারণ মেশিনের একটু এদিক  সেদিক হলে তেল প্রক্রিয়াজাতকরণে অনেক সমস্যা হতো। প্রথমে ডিজাইন থিউরির ওপরে ভিত্তি করে মেশিনটির অটোক্যাড ডিজাইন করা হয়।  মেশিনের জন্য স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য ও গুণগতমান সম্পন্ন কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়েছে। যাতে করে মেশিনটি টেকসই ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পায়। সহজে  যেন কৃষকরা এটি ব্যবহার করতে পারে সেটির দিকেও যথেষ্ট নজর ছিল আমার। পামঅয়েলের ব্যাঞ্চ কাটা থেকে ক্রুড ওয়েল তৈরি করতে যত কম সময় লাগে, ততই তেলের উৎপাদন বেশি হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সময়োপযোগী মেশিনের অভাবে এটি করা যাচ্ছিল না। এতে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতেন এমনকি এটি চাষের আগ্রহও হারিয়ে  ফেলেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে মেশিনটি উদ্ভাবিত হওয়ায় নতুনভাবে এটির সুযোগ তৈরি হলো। এখন থেকে ছোট ছোট পামচাষিরাও এটি ব্যবহার করে সুফল পাবেন। সারাদেশে এটি পৌঁছাতে পারলে বাহির থেকে পামঅয়েল আমদানি তো বন্ধ হবেই এমনকি বিদেশেও রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিত্যক্ত সমুদ্র অঞ্চলে ও পার্বত্য অঞ্চলের পরিত্যক্ত জমিতে পাম গাছ রোপণ করা গেলে পামঅয়েলের চাহিদা মেটানো সম্ভব। এ  ক্ষেত্রে লাখ লাখ বেকারের কর্মস্থানও হবে বলে মনে করেন এই উদ্ভাবক। তিনি আরো জানান, পাম ফলকে প্রক্রিয়াজাত করে দুধরনের তেল পাওয়া যায়। ফলটির মাংসল অংশ (মেসোকার্প) থেকে পামঅয়েল আহরণ করা হয়, আর বীজ বা শাঁস থেকে পাওয়া যায় পাম কার্নেল তেল। প্রতিটি ফল থেকে ৯ ভাগ পাম তেল ও ১ ভাগ পাম কার্নেল তেল পাওয়া যায়। সংগৃহীত তাজা ফলকে দ্রুত কারখানায় নিয়ে স্টেরিলাইজ ও গুচ্ছবিহীন করার পর মাড়াই করে অপরিশোধিত তেল আহরণ করা হয়। চূড়ান্ত পরিশোধনের পর তেল খাদ্যে ব্যবহার উপযোগী স্বর্ণাভ তেলে পরিণত হয়। একটি সরল পৃথকীকরণ প্রক্রিয়ায় তরল পাম অলিন ও জমাট পাম স্টিয়ারিনকে পৃথক করা যায়।  কোনো দ্রাবক ছাড়াই শুধুমাত্র যান্ত্রিক ও ভৌত প্রক্রিয়ায় পাম তেল আহরণ করা হয় বলে পাম তেল একান্তভাবেই প্রাকৃতিক। আর এ মেশিনটি উদ্ভাবন করার মাধ্যমে পামঅয়েল প্রাপ্তি আরো সহজ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

লেখক ঃ আবুল বাশার মিরাজ

 

 

দামি মসলা জাফরান চাষ করে হোন লাভবান

কৃষি প্রতিবেদক ॥ জাফরান পৃথিবীর অন্যতম দামি মসলা, ইহা ‘রেড গোল্ড’ নামেও পরিচিত। প্রাচীন যুগে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জাফরানের সুগন্ধ ও উজ্জ্বল রঙের গুরুত্ব অনুধাবন করে এ জাফরান ব্যবহার সম্ভ্রান্ত পরিবারের মধ্যে ব্যাপক প্রচলন ছিল। আফগানিস্তান, ইরান, তুরস্ক, গ্রিস, মিসর, চীন এসব দেশে কম বেশি জাফরানের চাষ হয়ে থাকে। স্পেন ও ভারতের কোনো কোনো অংশে বিশেষ করে কাশ্মীরে এ ফসলের চাষ অনেক বেশি। তবে অন্য দেশের তুলনায়  স্পেনে জাফরান উৎপাদন পরিমাণে অত্যাধিক। রপ্তানিকারক অন্যতম দেশ হিসেবেও স্পেন সুপরিচিত। বিশ্বের মোট চাহিদার প্রায় শতকরা ৭০ ভাগ জাফরান স্পেনে রপ্তানি করে থাকে। ফুটন্ত ফুলের গর্ভদন্ড (স্টিগমা) সংগ্রহ করে তা থেকে জাফরান প্রাপ্তি একটা ব্যয় বহুল ও বেশ শ্রম সাপেক্ষ (লেবার ইনটেনসিভ) কাজ বিধায় দামি মসলা হলেও জাফরান চাষে অনেকেই আগ্রহী হন না। তা ছাড়া প্রথম বছর রোপিত সব গাছে ফুল আসে না, এ সময় প্রায় শতকরা ৪০-৬০ ভাগ গাছে ফুল আসতে পারে। এক গ্রাম জাফরান পেতে প্রায় ১৫০টা ফুটন্ত ফুলের প্রয়োজন হয়। পরের বছর একেক গাছ থেকে প্রায় ২-৩টা করে ফুল পাওয়া যায়। তবে তৃতীয় বছর থেকে প্রতি বছরে জাফরান গাছ ৫-৭টা করে ফুল দিতে সক্ষম।

জাফরানের ইংরেজি নাম ‘সাফরন’, ক্রোকোআইডি পরিবারভুক্ত। এ গাছ লম্বায় প্রায় ৩০ সে. মিটার হয়। খাবার সু-স্বাদু করার জন্য বিশেষ করে বিরিয়ানী, কাচ্চি, জর্দা ও কালিয়াসহ নানা পদের দামি খাবার তৈরিতে জাফরান ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়াও বিয়ের অনুষ্ঠানে জর্দা তৈরিতে প্রাকৃতিক আকর্ষণীয় রং আনতে এবং দামি বাহারি পান বিপণনে জাফরান অন্যতম উপাদান। মুখমন্ডল আকর্ষণীয় করতে ও ত্বকের উজ্জ্বল রং আনার জন্য স্বচ্ছল সচেতন রমণীরা প্রাচীন কাল থেকে জাফরান ব্যবহার করে থাকেন। বিউটি পার্লারে রূপচর্চায় জাফরান অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আশার খবর হলো- ভারত, ইরানের মতো এবার বাংলাদেশের মাটিতে চাষ হচ্ছে রেড গোল্ড বা জাফরান। এর এই চাষ শুরু করেছেন শাহানাজ শায়লা নামের জবির শিক্ষার্থী। গেল বছর থেকে জাফরান বিক্রয় শুরু করেছেন নরসিংদী শাহানাজ শায়লা। শায়লা প্রাথমিকভাবে এই চাষ শুরু করলেও সরকারের সহযোগিতা পেলে সে বাণিজ্যিকভাবে জাফরান চাষ শুরু করবেন। বাংলাদেশে সীমিত পরিসরে এই মসলা র বালব বা কন্দ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এ এফ এম জামাল উদ্দিন।

বংশ বিস্তার : গাছের মুথা বা বালব (অনেকটা পেঁয়াজের মতো) সংগ্রহ করে তা বংশ বিস্তারের কাজে ব্যবহার করা হয়। এক বছর বয়স্ক গাছ থেকে রোপন উপযোগী মাত্র দুটা মুথা পাওয়া যায়। তবে ৩-৪ বছর পর একেক গাছ থেকে ৫-৭টা মুথা পাওয়া  যেতে পারে। নতুন জমিতে রোপণ করতে হলে ৩-৪ বছর বয়স্ক গাছ থেকে মুথা সংগ্রহ করে তা জমিতে রোপণ করতে হবে। একই জমিতে ৩-৪ বছরের বেশি ফসল রাখা ঠিক নয়। মুথা বা বালব উঠিয়ে নতুনভাবে চাষের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। জমি নির্বাচন : সব ধরনের জমিতে জাফরান ফলানো যায়। তবে বেলেদোআঁশ মাটি এ ফসল চাষে বেশি উপযোগী। এঁটেল মাটিতে জাফরানের বাড়-বাড়ন্তি ভালো হয় না, তবে এ ধরনের মাটিতে কিছু পরিমাণ বালু ও বেশি পরিমাণ জৈব সার মিশিয়ে এ মাটিকে উপযোগী করা যায়। জলাবদ্ধ সহনশীলতা এ ফসলের একেবারেই নেই। এ জন্য পানি নিষ্কাশন সুবিধাযুক্ত উঁচু বা মাঝারি উঁচু জমি এ ফসল চাষের জন্য নির্বাচনে প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন। মাটির পিএইচ ৬-৮ হলে বেশি ভালো হয়। ছায়া বা আধা ছায়ায় এ ফসল ভালো হয় না। পর্যাপ্ত রোদ ও আলো-বাতাস প্রাপ্তি সুবিধা আছে এমন স্থানে এ ফসল আবাদে ব্যবস্থা নিতে হবে। অনেকে ছাদে, পটে বা ছোট ‘বেড’ তৈরি করে নিয়েও সেখানে সীমিত আকারে জাফরান চাষ করে পরিবারের চাহিদা পূরণ করে থাকে। চাষ পদ্ধতি : চারা তৈরির জন্য বীজ তলা প্রায় ১৫ সে. মিটার উঁচু হতে হবে। প্রতিটা জাফরানের বালব বা মুথা ১০-১২ সে. মিটার দূরত্বে  ছোট গর্ত তৈরি করে তা ১২-১৫ সে. মিটার গভীরতায় রোপন করতে হবে। তাতে এ মাপের বীজ তলার জন্য প্রায় ১৫০টা জাফরানের মোথার প্রয়োজন হয়। বর্ষা শেষ হওয়ার পূর্বক্ষণে জুলাই-আগস্ট মাসে এ ফসলের মুথা বা বালব রোপণ করা হয়। শুরুতে বেশি গভীরভাবে জমি চাষ করে বা কোদাল দিয়ে কুপিয়ে জমি আগাছামুক্ত ও  লেবেল করে নেয়া প্রয়োজন। জমি তৈরি কালে প্রতিশতক জমিতে পচা  গোবর/আবর্জনা পচা সার ৩০০ কেজি, টিএসপি ৩ কেজি এবং এমওপি ৪ কেজি প্রয়োগ করে ভালোভাবে মাটির সঙ্গে সমস্ত সার মিশিয়ে হালকা সেচ দিয়ে রেখে দিয়ে দু’সপ্তাহ পর জাফরান বালব রোপন উপযোগী হবে। বসতবাড়ি এলাকায় এ ফসল চাষের জন্য বেশি উপযোগী। এ ফসল একবার রোপন করা হলে ৩-৪ বছর পর্যন্ত ফুল দেয়া অব্যাহত থাকে। বর্ষার শেষে আগস্ট মাসে মাটি থেকে গাছ গজিয়ে  ফেব্র“য়ারি মাস পর্যন্ত গাছের বৃদ্ধি ও ফুল দেয়া অব্যাহত থাকে। মে মাসের মধ্যে গাছের উপরিভাগ হলুদ হয়ে মরে যায়। মুথা মাটির নিচে তাজা অবস্থায় বর্ষাকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকে। এ সময় গাছের অবস্থিতি উপরি ভাগ থেকে দেখা যায় না। গাছের বৃদ্ধি ও ফুল : গাছে শীতের প্রারম্ভে অর্থাৎ অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ফুল আসে। বড় আকারের মুথা লাগানো হলে সে বছরই গাছে কিছু ফুল ফুটতে পারে। শীতকালে গাছের বাড়-বাড়তি ভালো হয়। শীত শেষে এ বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। গাছের বয়স এক বছর হলে অতিরিক্ত ১টা বা ২টা মুথা পাওয়া যায়। তিন বছর পর রোপিত গাছ থেকে প্রায় ৫টা অতিরিক্ত মোথা পাওয়া যাবে, যা আলাদা করে নিয়ে নতুনভাবে চাষের জন্য ব্যবহার উপযোগী হবে। পরিচর্যা ঃ এ ফসল আবাদ করতে হলে সব সময় জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে। মাঝে মাঝে নিড়ানি দিয়ে হালকাভাবে মাটি আলগা করে দেয়া হলে মাটিতে বাতাস চলাচলের সুবিধা হবে এবং গাছ ভালোভাবে বাড়বে। শুকনো মৌসুমে হালকা সেচ দেয়া যাবে। তবে অন্য ফসলের তুলনায়  সেচের প্রয়োজনীয়তা অনেক কম। বর্ষায় পানি যেন কোনো মতেই জমিতে না জমে  সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পানি জমে থাকলে রোপিত বালব পচে যাবে।

জাফরান সংগ্রহ : রোপণের প্রথম বছর সাধারণত ফুল আসে না। তবে জাফরানের  রোপিত বালব আকারে বেশ বড় হলে সে বছরই জাফরান গাছ থেকে মাত্র একটা ফুল ফুটতে পারে। পরের বছর প্রতি গাছে পর্যায়ক্রমে ২-৩টা ফুল আসবে। দু’বছরের গাছে ৪-৫টা এবং তিন বছরের গাছে ৭-৮টা ফুল দেবে। জাফরানের স্ত্রী অঙ্গ ৩টা থাকে এবং পুরুষ অঙ্গও ৩টা থাকে। গাছে অক্টোবর মাস থেকে ফুল দেয়া আরম্ভ করে এবং নভেম্বর মাস পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। তবে এ ফুলফোটা মৌসুমি তাপমাত্রার ওপর অনেকটা নির্ভর করে। ফুটন্ত ফুলের গন্ধের মাত্রা তীব্র। ফুলফোটার সঙ্গে সঙ্গে গর্ভদন্ড গাছ থেকে ছেঁটে সংগ্রহ করা প্রয়োজন। এ দন্ডের অগ্রভাগের অংশ তুলনায় চওড়া বেশি বা মোটা হয়। এ অংশের রং গাঢ় লালচে হয়। নীচের অংশ অনেকটা সুতার মতো চিকন এবং হালকা হলুদ রঙের হয়। উপরের অংশ জাফরান হিসেবে ব্যবহৃত হয়, নিচের চিকন অংশের গুণাগুণ তেমন ভালো হয় না। সংরক্ষণের আগে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে যেন তা ভালোভাবে শুকানো হয়। অন্যথায় জাফরান বেশি দিন রাখা যাবে না, প্রাকৃতিক গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ফুলফোটার সঙ্গে সঙ্গে পুলের স্টিগমার বা গর্ভদন্ডের প্রয়োজনীয় অংশ কেঁচি দিয়ে বা অন্যভাবে ছেঁটে নিয়ে তা চওড়া একটা পাত্রে পরিষ্কার কাগজ বিছিয়ে নিয়ে তার ওপর সংগৃহীত জাফরান রোদে শুকানোর ব্যবস্থা নেয়া হয়। এ সময় রোদে দেয়ার জন্য জাফরান সংরক্ষিত পাত্রটা কিছু উঁচু স্থানে টেবিল/টুলে রাখতে হবে এবং কোনো মতেই যেন বাতাস বা অন্য কোন প্রাণির উপদ্রপে পড়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। জাফরান শুকানোর জন্য এক ধরনের যন্ত্র (ডেসিকেটর বা ড্রায়ার) ব্যবহার করা হয়। জাফরান দু-তিন দিন পড়ন্ত রোদে শুকানোর পর তা আর্দ্রতা  রোধক পাত্রে সংরক্ষণ করতে হবে। কড়া রোদে বা বৃষ্টিতে ভেজার আশঙ্কা থাকলে বাড়ির বারান্দায় বা জানালার ধারে সুরিক্ষত স্থানে এ মূল্যবান জাফরান শুকানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। জাফরান চাষে করণীয় : প্রত্যেক হর্টিকালচার সেন্টারে সুবিধামত স্থানে ২-৩টা স্থায়ী বীজ তলায় এ দামি গুরুত্বপূর্ণ হাইভ্যালু ফসলের আবাদ ব্যবস্থা  নেয়া অত্যাবশ্যক। পার্শ্ববর্তী যে কোনো দেশ থেকে দু-একশত জাফরান বালব সংগ্রহ করে চাষের উদ্যোগ নেয়া জরুরি।

লেখক ঃ কৃষিবিদ এম এনামুল হক, সাবেক মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ঢাকা।

মিরপুরে আগাম ফুলকপি চাষ করে লাভবান হচ্ছে কৃষকরা

কাঞ্চন কুমার ॥ আগাম জাতের ফুলকপি চাষ করে লাভবান হচ্ছেন কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার কৃষকরা। তারা বছরে সারাবছর চাষ করছেন এ ফুলকপি। ফুলকপির ভরা মৌসুমে তারা দাম ভালো না পেলেও অসময়ে ফুলকপির দামে পুষিয়ে যাচ্ছে তাদের। তাই আগাম জাতের ফুলকপির দিকেই ঝুঁকছে চাষীরা। ধানসহ অনান্য ফসলে চাষীরা যখন লাভের পরিবর্তে লোকসানের মুখ দেখছেন তখনই আগাম এ ফুলকপি চাষ করে লাভবান হচ্ছেন মিরপুর উপজেলার কৃষকরা। উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে ও সহায়তায় উপজেলার কৃষকরা আগাম জাতের এ ফুলকপি চাষ করে ভালো দাম পাচ্ছেন। মিরপুর উপজেলার মালিহাদ ইউনিয়নের আবুরী এলাকার কৃষক বাদল মিয়া জানান, ধান, গম করে আমরা খুব একটা লাভবান হতে পারিনি। ধান চাষ করে লোকসান গুনতে হয় আমাদের। তাই আমরা ফুলকপি চাষ করছি। শীতকালে ফুলকপির ভরা মৌসুমে দাম একটি কম হয়। তবে অন্যান্য সময় আমরা বেশ ভালো দাম পায়। তাই আমরা সারা বছরই এখন ফুলকপি চাষ করছি। তিনি আরো জানান, এছর আমি আমার দুই বিঘা জমিতে আগাম লিডার জাতের ফুলকপির চাষ করেছি। বিঘায় প্রায় ৬ হাজারের মতো গাছ রয়েছে। খরচ হয়েছে বিঘাপ্রতি ৮-১০ হাজার টাকা। বাজারে এখন যে দাম রয়েছে তাতে আমি বিঘাপ্রতি ৬০-৭০ হাজার টাকা পাবো। আরেক চাষী আসাদুল হক জানান, অন্য ফসলের তুলনায় ফুলকপি চাষ অধিক লাভজনক। আমি দেড় বিঘা জমিতে আগাম ফুলকপি চাষ করেছি। জমি থেকেই পাইকারী ক্রেতারা ফুলকপি কিনে নিয়ে যাচ্ছে ৩০-৩৫ টাকা কেজি। প্রায় এক বিঘা জমিতে ৫০-৬০ হাজার টাকা লাভ হচ্ছে। সিদ্দিক আলী নামের আরেক কৃষক জানান, ইতিপূর্বে দেখা যেত শীতকালে জমিতে ফুলকপির চাষ হতো। সে সময় ভালো দাম পাওয়া যেতো না। কৃষি অফিসের পরামর্শে আমরা এখন সারা বছর ফুলকপির চাষ করি। তিনি আরো জানান, আমাদের এখানের ফুলকপি ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, গোপালগঞ্জ, সিলেটে রপ্তানি করি। এছাড়া স্থানীয় হাট-বাজার ও কুষ্টিয়া শহরেও আমরা বিক্রি করি। ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজের তুলনায় অধিক লাভ এই আগাম ফুলকপিতে। তাই এই অঞ্চলের মানুষ এখন ফুলকপি চাষে ঝুঁকছে। একই এলাকার কৃষক মারুফ আহম্মেদ জানান, আমরা স্থানীয় বাজারের চেয়ে বাইরে রপ্তানি করলে ভালো দাম পায়। এজন্য কৃষি অফিসের সহায়তায় আমরা  আগাম ফুলকপি উৎপাদন করে বাজারজাত করছি। এছাড়া কৃষি বিপনন কেন্দ্রের মাধ্যমে আমরা ন্যায্য মুল্যে ফসল বিক্রি করতে পারছি। এছাড়া সমবায় ভিত্তিকভাবেও ফুলকপিসহ অনান্য সবজি চাষাবাদ করে অন্য জেলায় বিক্রি করি। এতে আমরা সবজির ন্যায্য মুল্য পেয়ে লাভবান হচ্ছি। মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রমেশ চন্দ্র ঘোষ জানান, এই অঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটি সবজি জাষের জন্য খুবই উপযোগী। এছাড়া কৃষি বিভাগের পরামর্শে এই অঞ্চলের মানুষ আধুনিক চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে। চাষীরা আগাম জাতের ফুলকপি চাষ করে বেশ লাভবান হচ্ছেন। ফলে তারা ফুলকপি চাষের দিকে ঝুঁকছেন।তিনি আরো জানান, শীতকালেই আগাম, মধ্যম ও নাবী মৌসুমে বিভিন্ন জাতের ফুলকপি আবাদ করা যায়। এ ছাড়া গ্রীষ্মকালেও চাষের উপযোগী জাত রয়েছে। তিনি আরো জানান, মালিহাদ ইউনিয়নের বিশেষ করে সবজি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত এবং বাজারজাত করনের জন্য আমরা কৃষি বিপনন কেন্দ্র স্থাপন করি এবং এফএমএ কমিটির গঠন করি। এর ফলে উক্ত এলাকার কৃষকরা তাদের উৎপাদিত সবজির ভালো দাম পাচ্ছে। বর্তমানে কৃষি অফিসের পরামর্শে আগাম জাতের ফুলকপি চাষ করে তারা লাভবান হচ্ছেন।