তরল জৈব সার প্রয়োগে ফলন বহুগুণে বেশি হয়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ গবেষণায় আজ প্রতিষ্ঠিত যে, গাছ তার প্রয়োজনীয় মুখ্য ও  গৌণ খাদ্যোপাদান পাতা ও কান্ডের মাধ্যমে একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় সহজেই গ্রহণ করতে পারে, যাকে বলে ফলিয়ার ফিডিং মজার ব্যাপার হচ্ছে এই ফলিয়ার সার প্রয়োগের ফলে গাছের অঙ্গঁজ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিকড়ের মাটি  থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্যোপাদান গ্রহণ ও কার্যক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। গাছ যখন মাটি থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্যোপাদান গ্রহণ করতে পারে না বা পায় না, এমন অবস্থায় বিকল্প হিসেবে ফলিয়ার ফিডিং কার্যকর। মাটিতে প্রয়োগকৃত সারের তুলনায় ফলিয়ার ফিডিং শতকরা ১০০-৫০০ ভাগ বেশি কার্যক্ষমতা দেখায়। গবেষণায় দেখা যায় ফলিয়ার ফিডিংয়ে মাটিতে প্রয়োগকৃত সার ব্যবস্থাপনার তুলনায় অনেক কম পরিমাণে সার প্রয়োগ করতে হয়। গাছে এক বা একাধিক খাদ্যোপাদানের অভাবজনিত লক্ষণ দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফলিয়ার ফিডিংয়ের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট খাদ্যোপাদানের অভাব দূর করা যায়। এতে একদিকে গাছ যেমন প্রয়োজনীয় খাদ্য সরাসরি পায়, অন্যদিকে অপচয় কম হওয়ায় খাদ্যোপাদানের সাশ্রয় হয়। আধুনিক কৃষি এ বিষয়গুলো বিবেচনা করেই এখন গাছের সব খাদ্যোপাদান মাটিতে প্রয়োগ না করে সরাসরি গাছের পাতায় বা কান্ডে অর্থাৎ ফলিয়ার ফিডিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ফলিয়ার ফিডিংয়ের জন্য তরল সার অজৈব (ইনঅর্গানিক) বা জৈব (অর্গানিক) উৎস থেকে প্রস্তুত করা যায়। ফলিয়ার ফিডিংয়ের সার গাছের সঙ্গে মানানসই উপাদান দিয়ে তৈরি করা হয়। যেমন ইউরিয়ার জন্য ইউরিয়ার পলিমার; ইউরিয়া-ফরমালডিহাইড পানিতে নিম্ন ঘনমাত্রায় মিশ্রিত করে প্রয়োগ করা যেতে পারে। তবে ইউরিয়া স্বল্পমাত্রায় সরাসরি পানিতে মিশিয়েও ব্যবহার করা যেতে পারে। এভাবে অন্যান্য সারও এককভাবে অথবা বিভিন্ন সারের মিশ্রণ পানিতে স্বল্প পরিমাণে মিশিয়ে ফলিয়ার ফিডিং তৈরি করা যায়। আবার অর্গানিক উৎস থেকেও তরল জৈব সার  তৈরি করা যেতে পারে। তরল অজৈব সার পাশাপাশি তরল জৈব সারের ব্যবহার আমাদের কৃষি সেক্টরকে আরো সমৃদ্ধ করেছে এবং পরিবেশবান্ধব বলে এর ব্যবহার দ্রুত বেড়ে চলেছে বিশ্বজুড়ে। জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি পাশাপাশি রাসায়নিক সারের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে মাটির উর্ব্বরতা শক্তি দিন দিন কমে আসছে। তরল জৈব সারই পারে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মুখে খাবার তুলে দিতে, তথা কৃষির বিপ্লব ঘটাতে। পাশাপাশি পরিবেশ এটি মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। তরল জৈব সার প্রয়োগে উৎপাদিত ফসলে পুষ্টিমান ও স্বাদ বৃদ্ধি পায়। সমীক্ষায় দেখা  গেছে, তরল জৈব সারের রেসিডুয়াল বা ক্ষতিকর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফসলে  দেখা যায় না। তরল রাসায়নিক সার প্রয়োগে উৎপাদিত ফসলের তুলনায় সমপরিমাণ তরল জৈব সারের ফলন বহুগুণে বেশি হয়। তরল জৈব সারের সুবিধাগুলো হলোথ পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী, এবং সার তৈরি ও প্রয়োগ পদ্ধতি সহজ এবং প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে গাছ বা ফসলের গ্রহণ উপযোগী হয়। তরল  জৈব সারের হরমোন থাকে যা বায়োস্টিমুলেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং ফসলকে পোকামাকড় ও রোগ থেকে আগলে রাখে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তরল জৈব সার থেকে যেমন ফসল সব মেক্রো খাদ্যোপাদান পাচ্ছে সঙ্গে অধিকাংশ মাইক্রো খাদ্যোপাদানগুলোও পাচ্ছে। ফলে ফসলের ফলনের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পুষ্টিমান ও স্বাদ বৃদ্ধি পায়। উন্নত বিশ্বে তরল জৈব সার (লিকুইড অর্গানিক ফার্টিলাইজার) প্লান্ট টি নামে অবিহিত করা হয়ে থাকে। তরল জৈব সার বা প্লান্ট টি সাধারণত কটন সিডমিল, খৈল, বস্নাড মিল, ফিস ইমালশান, এর নির্যাস থেকে তৈরি করা হয়ে থাকে। তুলা উৎপাদনের সময় বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে কটন সিডমিল পাওয়া যায়। যাতে ৭% ঘ, ৩% চ২০৫ এর ২% শ২০ থাকে। আর নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ ব্লড মিল (১০-১২%) যাতে আয়রন প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। খুবই কার্যকরী অর্গানিক পদার্থ যার নির্যাস থেকে অতি কার্যকরী তরল   জৈব সার তৈরি করা যায়। তা ছাড়া খৈল, মোনউর, কম্পোস্ট থেকেও কার্যকরী তরল জৈব সার তৈরি করা যেতে পারে। এ ছাড়া বাজারেও কিছু  তৈরি জৈব তরল সার এসেছে যা ইতোমধ্যেই কর্মাশিয়াল ফুল ও শাক-সবজি উৎপাদনে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। জৈব তরল সার নির্দ্বিধায় আধুনিক পরিবেশবান্ধব ও উপযোগী সার হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। সুস্থ, সুন্দর, অধিক পুষ্টিমানের ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবারের স্বাস্থ্য ও মনের শান্তির নিশ্চয়তা হচ্ছে জৈব তরল সার।

 

পুকুরে হাপাতে কৈ মাছের ব্র“ড মাছকে ইঞ্জেকশন দিয়ে অনায়াসে রেনু এবং  পোনা উতপাদন করা সম্ভব

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কৈ মাছের কৃত্রিম প্রজননের জন্য এমন একটি কৌশলের কথা উল্লেখ করছি যেখানে কৈ মাছের প্রজননের জন্য কোন ওভারহেড ট্যাংক এর প্রয়োজন পড়বে না বা কোন হাউজ বা সিস্টার্নেও প্রয়োজন পড়বে না। শুধুমাত্র একটি হাপা হলেই এই মাছের প্রজনন করা সম্ভব। চাহিদামত বা ইচ্ছানুযায়ী লক্ষ লক্ষ রেনু এবং পোনা উৎপাদন করা যাবে। যার ফলে একজন মৎস্যচাষী অন্ততপক্ষে  পোনা  কেনা থেকে অনেক টাকা বাচাতে পারবেন।  পুকুর প্রস্তুতকরণ ঃ যে পুকুরে কৈ মাছকে ইঞ্জেকশন দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হবে সেই পুকুরটিকে প্রথমেই ভালভাবে শুকিয়ে নিতে হবে। পুকুরের ভেতরের চারপাশের যাবতীয় ঘাস বা ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে। তারপর পুকুরের চারপাশ দিয়ে ভালভাবে জাল দিয়ে বেড়া দিতে হবে যাতে বাইরে থেকে কোন ব্যাঙ বা সাপ পুকুরের ভেতর না ঢুকতে পারে। তারপর যেদিন কৈ মাছকে ইঞ্জেকশন দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হবে ঠিক সেদিনই পুকুরে পানি ঢুকাতে হবে। অন্যথায় পুকুরে পানি  তোলার পর ২/৩ দিন দেরি হয়ে গেলে ওই পানিতে প্রাণী প্লাংটন জন্মাবে। যার কারণে কাঙ্খিত পরিমাণে পোনা উৎপাদন সম্ভব হবে না। অর্থাৎ প্রাণী প্লাংটনে কৈ মাছের রেনু  ছোট হওয়ার কারণে রেনুগুলোকে সহজেই নষ্ট করতে পারে। হাপা সেটিং ও প্রজনন কৌশল ঃ পানি উচ্চতা ২ ফুট হলে ওই দিনই পুকুরে হাপা  সেট করতে হবে। পুকুরে হাপা সেটিং করার পর বিকেলের দিকে অর্থাৎ তিনটা চারটার দিকে হাপা পুকুরে স্থাপন করে কৈ মাছগুলোকে ইঞ্জেকশনের জন্য বড় পাতিল করে পুকুরের কাছে আনতে হবে। এরপর পুকুরে স্থাপিত হাপায় মাছগুলোকে ইঞ্জেকশন করে হাপায় ভরতে হবে। ইঞ্জেকশন প্রয়োগ পদ্ধতি ঃ প্রতি কেজি স্ত্রী কৈ মাছকে ৭/৮ মি:গ্রা: পিজি দিয়ে ইঞ্জেকশন করতে হবে। প্রথমে ১ মি:লি: এর একটি ইনসুলিন সিরিঞ্জ নিতে হবে যে সিরিঞ্জে ৫০টি দাগ থাকতে হবে। বাজারে ১০০ দাগ সম্পন্ন পর্যন্ত ইনসুলিন সিরিঞ্জ পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে ৫০ দাগ মাত্রার সিরিঞ্জ ব্যবহার করতে হবে। সাধারণত কৈ মাছের ক্ষেত্রে ১ কেজি মাছের জন্য ০.৫ মি: লি: পানি ব্যবহার করা যায়। সেক্ষেত্রে প্রথমে ১ কেজি মাছের জন্য ৮ মি: গ্রা: পিজি একটি কাচের বাটিতে ভালভাবে পিষিয়ে তারপর ধীরে ধীরে ওই ১ মি:লি: পানি মেশাতে হবে। এভাবে ১ কেজি স্ত্রী  কৈ মাছের ইঞ্জেকশনের জন্য দ্রবণ প্রস্তুত হয়ে গেল। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি  যে সিরিঞ্জে দাগ থাকবে ৫০টি। তা হলে প্রতিটি দাগের জন্য আমরা ২০ গ্রাম ওজনের মাছকে ইঞ্জেকশন করতে পারবো। যদি কোন মাছের ওজন ১০০ গ্রাম হয় তাহলে ৫ দাগ ওষুধ মিশ্রিত দ্রবণ ব্যবহার করতে হবে। এই হিসেবে সবগুলো স্ত্রী মাছকে ইঞ্জেকশন করে তারপর পুরুষ মাছকে ইঞ্জেকশন করতে হবে। ইঞ্জেকশন করে তারপর পুরুষ মাছকে ইঞ্জেকশন করতে হবে। পুরুষ মাছের ক্ষেত্রে ১ কেজি মাছের জন্য মাত্র ৫ মি: গ্রা: পিজি মিশিয়ে উপরোউল্লেখিতভাবে প্রয়োগ করে সবগুলো স্ত্রী এবং পুরুষ মাছকে একসাথে হাপায় ভরতে হবে। এই পদ্ধতিতে রেনু উৎপাদনের জন্য থাই জাল (পলিথিন জাতীয়) দিয়ে একটি হাপা  তৈরি করতে হবে। হাপার মাফ হবে দৈর্ঘ্যে দেড় মিটার প্রস্থে ছয় মিটার। হাপাটি সব দিক থেকেই একই নেট দিয়ে আবদ্ধ থাকতে হবে। আর তা না হলে প্রজননের সময় মাছ বেরিয়ে যেতে পারে। প্রথমে এই হাপাটি তৈরি করার পর পুকুরে ১.৫/২ ফুট পানিতে করতে হবে। যাতে হাপাতে কমপক্ষে ১ ফুট পানি থাকে। হাপার উপরের অংশের এক কোণায় সামান্য খোলা রেখে মাছগুলোকে পি.জি. হরমোন দিয়ে ইঞ্জেকশন করার পর হাপার এক কোণার খোলা অংশ দিয়ে হাপাতে মাছগুলোকে  ছেড়ে দিতে হবে। সাধারণত বিকেল ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে মাছগুলোকে ইঞ্জেকশন দিয়ে হাপাতে ছাড়তে হবে। অর্থাৎ ৭/৮ঘন্টা পর অর্থাৎ গভীর রাতে মাছগুলো যাতে ডিম পাড়ার সময় হয়। এরপর সন্ধ্যার পর  থেকে পুকুরের পাশে যে কোন শ্যালো দিয়ে ওই হাপার আশপাশ দিয়ে পানির প্রবাহ দিতে হবে। এভাবে ৫/৬ ঘন্টা পানি দিলেই ওই হাপাতে কৈ মাছ ডিম পারবে। কৈ মাছের ডিমগুলো ভাসমান বিধায় ওই ডিমগুলো হাপার জালের ফাঁক দিয়ে অনায়াসে পুকুরে চলে যাবে। সকালের দিকে ডিমপাড়া শেষ হলে কৈ মাছসহ হাপাটিকে পানি থেকে উঠিয়ে ফেলতে হবে। পুকুরে শুধুমাত্র ভাসমান অবস্থায় ডিমগুলো থেকে যাবে। ডিম দেওয়ার ২০ ঘন্টার মধ্যে ডিম  থেকে বাচ্চা বের হবে। বাচ্চা বের হওয়ার ৭২ ঘন্টা পর থেকে ডিম সিদ্ধ করে গ্লাস নাইলন কাপড় দিয়ে ছেঁকে রেনু পোনাকে খাবার দিতে হবে দিনে অন্তত ৩ বার। এবাবে ১ সপ্তাহ ডিমের কুসুম খাওয়ানোর পর নার্সারি ফিড দিতে হবে আরও ১৫ দিন।  রেনু ফোটা থেকে ২২ দিনের মধ্যে পোনা তৈরি হয়ে যাবে। এভাবে পুকুরে হাপাতে কৈ মাছের ব্র“ড মাছকে ইঞ্জেকশন দিয়ে অনায়াসে ইচ্ছানুযায়ী রেনু এবং  পোনা উৎপাদন করা সম্ভব।

 

ব্রি উদ্ভাবিত গুটি ইউরিয়া প্রয়োগযন্ত্রটি একজন শ্রমিকের দ্বারা সহজেই চালানো সম্ভব

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফার্ম  মেশিনারী এন্ড পোষ্ট হারেভষ্ট টেকনোলজি (এফএমপিএইচটি) বিভাগ একটি হস্তচালিত গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্র উদ্ভাবন করেছে যার মাধ্যমে একজন শ্রমিক প্রতি ঘন্টায় একবিঘা জমিতে গুটি ইউরিয়া প্রয়াগ করতে পারে। প্রচলিত পদ্ধতিতে একজন শ্রমিক সারাদিনে দক্ষতাভেদে ২০-৩০ শতাংশ জমিতে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করতে পারে। সুতরাং প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় যন্ত্রের কার্যক্ষমতা ৭-৮ গণ বেশী। উদ্ভিদের জন্য অত্যাবশকীয় পুষ্টি উপাদানগুলির মধ্যে নাইট্রোজেন অন্যতম। দেশে ব্যবহৃত মোট ইউরিয়া সারের প্রায় ৮০ শতাংশ ধান উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। ধানের জমিতে প্রয়োগকৃত ইউরিয়া পর্যায়ক্রমে হাইড্রোলাইসিস, অ্যামোনিফিকেশন, নাট্রিফিকেশন, ডি- নাট্রিফিকেশন,  ভোলাটিলাইজেশন ও পারকোলেশন প্রক্রিয়ায় গ্যাস হয়ে বাতাসে উড়ে যায়, চুইয়ে মাটির নীচে চলে যায় অথবা পানির সাথে অন্য জমি বা খালে ধুয়ে গিয়ে অপচয় হয়। নাইট্রোজেন সার ব্যবস্থাপনায় মাটির ২-৩ ইঞ্চি নীচে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগের মাধ্যমে ইউরিয়া সারের কার্যকারিতা প্রায় ৪০ থেকে ৭০ শতাংশে উন্নিত করা সম্ভব। কিন্তু গুটি ইউরিয়া সঠিক নিয়মে জমিতে প্রয়োগ করা অত্যন্ত শ্রম ও শ্রমিক নির্ভর হওয়ায় কৃষক তা ব্যবহার করতে আগ্রহী নয়। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষে হস্ত চালিত গুটি ইউরিয়া প্রয়োগযন্ত্রটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। ব্রি উদ্ভাবিত গুটি ইউরিয়া প্রয়োগযন্ত্রটি একজন শ্রমিকের দ্বারা সহজেই চালানো সম্ভব। এক সাথে দুই সারিতে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করা যায়। বিধায় যন্ত্রের কার্যকারিতা অনেক বেশী। যন্ত্রের নির্মাণ কৌশল অত্যন্ত  সহজ হওয়ায় এটি তৈরি ক্রটি দূরীকরণ ও সংরক্ষণ করা সহজ। গুটি ইউরিয়া একসারি পরপর নির্দিষ্ট দুরত্বে জমিতে প্রয়োগ করতে হয় বিধায় সারি থেকে সারির দূরত্ব ২ সে.মি এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ২০ সে. মি. বিবেচনা করে যন্ত্রটি তৈরি করা হয়েছে। যন্ত্রাটির মাধমে জমিতে নালা  তৈরি এবং বন্ধ করার ব্যবস্থাসহ ৬-৮ সে. মি. গভীরে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করা যায়। যন্ত্রটি দুটি স্কীডের উপর পদ্ধতিগত ভাবে নির্মিত। দুটি স্কীডের মধ্যে বিদ্যমান চালক চাকার সাথে শ্যাফটের মাধ্যমে দুই পাশের দু’টি মিটারিং ডিভাইস সংযুক্ত। মিটারিং ডিভাইস দুটি গুটি ইউরিয়া ধারক বক্সের মধ্যে এমনভাবে সংযুক্ত করা যাতে চালক চাকাটি একটি ঘূর্ণনের সম্পন্ন করলে মিটারিং ডিভাইসও একটি ঘূর্ণন সম্পন্ন করে। প্রতিটি মিটারিং ডিভাইসে ছয়টি করে কাপ সংযুক্ত আছে। চালক চাকা ঘূর্ণনের সাথে সাথে মিটারিং ডিভাইস ঘুরার গুটি ইউরিয়ার বক্স হতে কাপের মাধ্যমে গুটি সংগ্রহ করে বক্সের সাথে সংযুক্ত নির্গমন পথে ফেলে দেয়। নির্গমন পাইপটি স্কীডের নীচে সংযুক্ত নালা তৈরিকারক ডিভাইসের পিছনে সংযুক্ত থাকায় বক্স হতে সংগৃহীত গুটি নালার মধ্যে নির্গমন হয় যা পুনরায় স্কীডারের পিছনে সংযুক্ত নাল বন্ধকারকের মাধ্যমে ঢেকে দেয়া হয়। উল্লেখ্য যে, দু,টি স্কীডের উপর গুটি ইউরিয়ার ধারক বক্স দুটি মধ্যের চালক চাকা বরাবর স্থাপন করা আছে। চালক চাকার একটি ঘূর্ণনের মাধ্যমে যন্ত্রটি ২৪০ সেমি দূরত্ব অতিক্রম করে  এবং প্রতি প্রতিটি মিটারিং ডিভাইসে ছয়টি করে কাপ সংযুক্ত থাকায় ২৪০ সেমি দূরত্বের মধ্যে ৬ টি গুটি ইউরিয়া প্রতিস্থাপিত হয় ফলে গুটি হতে গুটির দূরত্ব হয় ৪০ সেমি। জমিতে যন্ত্রটি নেয়ার পূর্ব যন্ত্রের বিভিন্ন ঘূর্ণয়মান অংশে মবিল/ গ্রীস দিতে হবে। যন্ত্রটি চালানোর সময় এমনভাবে জমিতে স্থাপন করতে হবে যাতে দুই পাশের দুটি স্কীড ও মধ্যের চালক চাকা সারি বরাবর থাকে। গুটি ইউরিয়া বক্সের ২/৩ অংশ পরিমান গুটি দ্বারা পূর্ন করতে হবে। সামনের দিকে ঠেলার মাধ্যমে যন্ত্রটি চালাতে হবে। জমির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেয়ে পুনরায় যন্ত্রটি এক সারি পর স্থাপন করে পূর্বের মত চালাতে হবে। যন্ত্র চালানোর সময় লক্ষ্য রাখতে হবে। যেন গুটি প্রয়োগ করা সারিতে পা রাখা না হয়। অর্থ্যাৎ মধ্যের সারি বরাবর পা রেখে যন্ত্রটি চালাতে হবে। যেহেতু জমিতে চারা লাগানোর ৮/১০ দির পর গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হয়। তাই সে সময় জমি অত্যন্ত কর্দমাক্ত থাকে। ফলে যন্ত্রটি চালানোর সময় জমিতে ছিপছিপে পানি থাকা অত্যাবশ্যক।

নারীরা পারিবারিক কাজের পাশাপাশি মাশরুম চাষ করে অনায়াসে কিছু বাড়তি আয় করতে পারে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য মাশরুম একটি অন্যতম ক্ষেত্র হতে পারে। গৃহবধূ থেকে শুরু করে চাকরিজীবীসহ সব শ্রেণী ও বয়সের নারীরা পারিবারিক কাজের পাশাপাশি মাশরুম চাষ করে অনায়াসে কিছু বাড়তি আয় করতে পারে। নারীরা কিভাবে মাসরুম চাষ করে জীবীকা নির্বাহ করতে পারে তার আগে মাসরুম সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেয়া যাক। মাশরুম কি? মাশরুম একটি বিজ্ঞানসম্মত খাবার হলেও বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে বিশেষ করে গ্রাম এলাকায় এটি ব্যাঙের ছাতা নামে পরিচিত। তবে দিন বদলে  গেছে। এখন ব্যাঙের ছাতা ঢাকা শহরের নামিদামি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে পাওয়া যায়। ব্যাঙের ছাতা নামে যেটি পরিচিত সেটি আসলে এক প্রকার বিষাক্ত ছত্রাক যা বন জংগলে স্যাঁতসেঁতে যায়গায় হয়ে থাকে। খাদ্য হিসেবে যে মাশরুম পাওয়া যায় সেটিও দেখতে ব্যাঙের ছাতার মতই। কিন্তু এটি পরিছন্ন পরিবেশে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে চাষ করা সুস্বাদু, পুষ্টিকর এবং ভেষজগুণে ভরপুর  ক্লোরোফিলবিহীন উদ্ভিদ এবং এক প্রকার সবজি। লোকের কাছে এটি অপরিচিত নাম। আমরা মাশরুমকে “ব্যাঙের ছাতা” বলেই চিনি। মূলতঃ মাশরুম গবেষণাগারে উদ্ভাবিত অঙ্কুর বা রেণু দ্বারা পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে চাষ করা, সুস্বাদু পুষ্টিকর ও ঔষধি গুণসম্পন্ন খাওয়ার। প্রতিকেজি শুকনো মাশরুম এক হাজার  থেকে ১২শ’ টাকায় বিক্রি হয়। বর্তমানে উন্নত দেশে মাশরুমের কদর অত্যন্ত  বেশী। মাশরুমের পুষ্টিগুণ ঃ মাশরুম অত্যন্ত পুষ্টিগুণসম্পন্ন একটি খাবার। এতে আছে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন (৩০%)। এ প্রোটিনে আছে মানবদেহের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সব এমাইনো এসিড। যার জন্য এ প্রোটিনটি প্রাণিজ প্রোটিনের মতো একটি সম্পূর্ণ প্রোটিন। কিন্তু প্রাণিজ   প্রোটিনের মতো এতে কোলস্টেরল না থাকায় এবং ফ্যাট কম থাকায় সব বয়সের মানুষের জন্য এবং রোগীদের জন্যও আদর্শ খাবার। মাশরুমে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ই২, নায়াসিন, ফলিক এসিড যার মাত্রা যথাক্রমে ১.৮-৫.১, ৩১-৬৫ ও ০.৩০-০.৬৪ মি. গ্রাম/১০০ গ্রাম। মাশরুম মিনারেলসের ও একটি ভালো উৎস। এতে পটাশিয়াম, ফসফরাস, জিংক ও কপারের পরিমাণ যথাক্রমে ২৬.৭-৪৭.৩ গ্রাম, ৮.৭-১৩.৯ গ্রাম, ৪৭-৯২ মি. গ্রাম ও ৫.২-৩৫ মি. গ্রাম/কেজি (শুকনো ভিত্তিতে) যা মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় অধিকাংশ ভিটামিন এবং সব মিনারেলসের  জোগান দিতে পারে। মাশরুম চাষ পদ্ধতি ঃ বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মাশরুম চাষ করা হয় বলে এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কিন্তু বাংলাদেশে পরিবেশ মাশরুম চাষের জন্য অত্যন্ত অনুকুল। এখানে আংশিক নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সারা বছর দিব্যি মাশরুম চাষ করা যায় যার উৎপাদন খরচ অনেক কম। মাশরুম চাষ করার জন্য কোন কীটনাশক, রোগনাশক এমন কি কোনো রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয় না। এটি চাষের জন্য প্রয়োজন হয় কেবল কৃষিজ বা বনজ বর্জ্য  যেমন- ধানের খড়, গমের খড়, আখের ছোবা, কাঠের গুঁড়া ইত্যাদি যা যত্রতত্র পড়ে  থেকে পরিবেশকে দূষিত করে। মাশরুম চাষ করার জন্য আলোহীন স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ প্রয়োজন, তবে ঘরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মাশরুমের স্পূন রাখার জন্য ছোট ছোট মাচা ব্যবহার করা যেতে পারে।  লোহা, বাঁশ বা কাঠ দিয়ে এগুলো সহজেই তৈরি করা যায়। অতিরিক্ত গরম মাশরুম চাষের জন্য প্রতিকূল। এজন্য প্রয়োজন হলে ফ্যান ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণে পানির ব্যবস্থা রাখতে হবে। হ্যান্ড ¯েপ্র মেশিনের সাহায্যে স্পূনগুলোতে নিয়মিত পানি দিয়ে স্যাঁতসেঁতে করে রাখতে হবে। শীত ও বর্ষাকালে মাশরুম উৎপাদন অধিক পরিমাণে হয়ে থাকে। এ সময় একটি ভালো মানের স্পূন  থেকে প্রতি আড়াই মাসে ২০০-২৫০ গ্রাম মাশরুম উৎপাদন করা যায়। ১০-১২ টাকা মূল্যের এই স্পূনগুলো প্রতি আড়াই মাস পর পর পরিবর্তন করতে হয়। নারীদের কর্মসংস্থান হতে পারে মাশরুম এবার শিরোনাম প্রসঙ্গে আসা যাক। মানে কিভাবে নারীরা মাশরুম চাষ করে আয় করতে পারে এবং সাবলম্বি হতে পারে সে প্রসঙ্গ। উপরের আলোচনা থেকেই জানা  গেছে যে মাশরুম চাষ খুবই সহজ একটি পদ্ধতিতে করা যায়। জায়গা কম লাগে এবং মাত্র আনুমানিক ১৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেই মাশরুম চাষ শুরু করা যেতে পারে। তবে ব্যবসা শুরুর আগে এ  বিষয়ে অবশ্যই প্রশিক্ষন নিতে হবে। নারীদের জন্য সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে প্রশিক্ষন প্রকল্পের মাধ্যমে সহায়তা করা হচ্ছে। গ্রামের বেশিরভাগ নারীই গৃহিনী কেউ কেউ হয়ত হস্তশিল্প বা এ জাতীয় কিছু কাজের সাথে জড়িত। এসব বেকার নারীরা খুব সহজেই মাত্র কিছু দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে মাশরুম চাষের ব্যবসা শুরু করতে পারে। ইতিমধ্যে  দেশের অনেক এলাকায় মাশরুম চাষ একটি জনপ্রিয় ব্যবসা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে মাশরুম চাষ হচ্ছে। এসব জায়গায় পুরুষদের পাশাপশি নারীরাও এগিয়ে। তবে একটি রিপোর্ট থেকে মহিলাদের মাশরুষ চাষের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতার কথা জানা যায়। এগুলো বস্তুত অন্যান্য সমস্যার মত পিছিয়ে থাকা মহিলাদের গতানুগতিক সমস্যার সমরূপ। সমস্যগুলোর দিকে একটু চোখ বুলিয়ে নিন; সমাধানের চেষ্টা করুন। সচেতনতার অভাব। মাশরুম চাষ করে যে নারীরা নিজের পারে দাঁড়াতে পারে সে ব্যাপারে তারা এখনও সচেতন না। আবার এটি যে একটি পুষ্টিকর সবজি সে বিষয়ে অনেকের কোন ধারণাই নাই। মাশরুম চাষের পর একজন নারীর পক্ষে একা সেই পণ্যকে শহরে বিক্রয় করা খুবই দুরুহ ব্যাপার। বাংলাদেশের নারীদের মার্কেট অ্যাক্সেস বা ব্যবসা বাণিজ্যে এদের পদচারণা অনেক কম।         মাশরুম সম্পর্কে নারীদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব। অর্থনৈতিক সহায়তার অভাব। যদিও নারী উদ্যোক্তাদের এখন বিভিন্নভাবে ঋণের আওতায় আনা হচ্ছে। কিন্তু কতজন গ্রামের নারী এ সম্পর্কে সচেতন? । সামাজিক ও ধর্মীয় অজুহাত দেখিয়েও অনেক জায়গায় মহিলাদের এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে রাখা হয়েছে। তবে মাশরুম চাষের ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যাতিক্রম লক্ষ করা যায়। যেহেতু পুরুষরা মাঠে বেশি কাজ করে তাই মহিলারা ঘড়োয়াভাবে খুব সহজেই মাশরুম চাষ করতে পারে। মাশরুম চাষকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং মহিলাদের এক্ষেত্রে জড়িত করার জন্য কি করতে হবে তা আশা করি বুঝতে পেরেছেন। মাশরুম সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্যের জন্য জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কেন্দ্র সাভার, ঢাকা অথবা দেশের বিভিন্ন সাব সেন্টারের সাথে  যোগাযোগ করতে পারেন।

  দেশের সড়ক-মহাসড়কের পাশে সবজি চাষের কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ চলছে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ দেশের সড়ক-মহাসড়কের দু’ধারে বেশিরভাগ পরিত্যক্ত জায়গা ভরে আছে আগাছায়। অন্যদিকে জনবসতি বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কমছে দেশের কৃষি জমি। তাই দেশের এক ইঞ্চি জায়গাও যেন পরিত্যক্ত পড়ে না থাকে সেজন্য সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাচ্ছে। তারা যদি এগিয়ে আসে তবে আমাদের দেশকে আরও সুন্দর ও সমৃদ্ধ করে তোলা যায়। তার ওই নির্দেশনার আলোকে ‘অব্যবহৃত জায়গায় সবজি ও ফলের চাষ, অর্থ-পুষ্টি বারোমাস’ শীর্ষক ইনোভেশন আইডিয়া বাস্তবায়নে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। এই উদ্ভাবনী আইডিয়ার দারুণ ফল মিলছে গাইবান্ধা-সাঘাটা আঞ্চলিক মহাসড়কের দু’ধারে। সড়কটির কয়েক কিলোমিটার এলাকায় অব্যবহৃত জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে সবজি বাগান। চাষ করা হয়েছে শিম, লাউ, করলা, বেগুন, মরিচসহ বিভিন্ন জাতের সবজি। কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় স্থানীয়রা এ সবজি চাষ করে যেমন নিজেরা  খেতে পারছেন, তেমনি বাজারে বেচে করতে পারছেন আয়ও। আগামীতে  দেশের সবজি চাহিদা মেটাতে এই উদ্যোগ সারাদেশে বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানাচ্ছেন কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সূত্র জানায়, দেশে ৩ হাজার ৭৯০ কিলোমিটার জাতীয়, ৪ হাজার ২০৬ কিলোমিটার আঞ্চলিক, ১৩ হাজার ১২১ কিলোমিটার জেলা এবং ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫৮৯ কিলোমিটার স্থানীয় সড়ক আছে। এই সড়কগুলোর দু’ধারে পরিত্যক্ত জায়গা ভরে থাকে আগাছায়। সেজন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে এসব জায়গাও চাষবাসের জন্য কাজে লাগাচ্ছে কৃষি বিভাগ। মহাসড়কের পাশের সবজি চাষি সাঘাটার যাদুরতাইর গ্রামের আসাদুল ইসলাম বলেন, আমরা কখনো ভাবতেও পারিনি যে মহাসড়কের পাশে সবজি চাষ করে নিজেদের পরিবারের চাহিদা মেটানো সম্ভব। কিন্তু কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় তা সম্ভব হয়েছে। একই গ্রামের চাষি আইজ উদ্দিন বলেন, এ বছর শিম, লাউ, করলা,  বেগুন, মরিচসহ হরেক রকমের সবজির চাষ করে নিজেদের পরিবারের চাহিদা মিটিয়েছি। বিক্রি করেছি বাজারেও। আগামীতে আরও মনোযোগ দিয়ে সবজি চাষ করব। সাঘাটা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-সহকারী কৃষি অফিসার  গোলাম মওলা জানান, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে কৃষকদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। ইনোভেশন আইডিয়াদাতা কর্মকর্তা ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ব্লুগোল্ড  প্রোগ্রাম অফিসার রেজওয়ানুল ইসলাম বলেন, দেশের উত্তরের জেলা রংপুরের মিঠাপুর উপজেলার পরে গাইবান্ধার সাঘাটায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পেরে আমি অনেক খুশি। আসলে জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে ঘরবাড়িও বাড়ছে, পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কমে যাচ্ছে দেশের কৃষি জমি। এই পরিস্থিতিতে দেশের এক ইঞ্চি জায়গাও যেন পরিত্যক্ত না থাকে, এমন নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তার নির্দেশনার আলোকেই দেশের সড়ক-মহাসড়কের পাশে সবজি চাষের এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ চলছে।

লেডি বিটল এবং ক্যারাবিড বিটল প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পোকা দমন বেশ কার্যকরী

কৃষি প্রতিবেদক ॥ জমিতে পরভোজী পোকামাকড়কে সহজেই দেখা যায়। কিন্তু অনেকে এদের অনিষ্টকারী পোকা বলে ভুল করেন। এ ধরনের পরভোজী- পোকামাকড়ের মধ্যে কয়েক ধরনের মাকড়সা, লেডি বিটল এবং ক্যারাবিড বিটল প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পোকা দমন বেশ কার্যকরী। এছাড়া পার্চিং করে পোকা দমন ক্রমশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ধানক্ষেতে বহু ধরনের উপকারী পোকা, মাকড়সা ও জীবাণু বাস করে। এসব পোকামাকড় ও জীবাণু অনেক ক্ষেত্রে ধানের অনিষ্টকারী  পোকা দমন করে রাখতে পারে। ধানের বিভিন্ন অনিষ্টকারী পোকার প্রজনন ক্ষমতা অনেক বেশি। একটি স্ত্রী বাদামি গাছফড়িং থেকে এক প্রজন্মেই প্রচুর সংখ্যায় বাচ্চা জন্ম নেয়, কিন্তু ওই প্রজন্মের পর তাদের মধ্যে মাত্র ১-২টা বেঁচে থাকে। কারণ এদের অধিকাংশ পরভোজী পোকামাকড় খেয়ে ফেলে অথবা পরজীবী পোকা ও জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এভাবে পোকা ও জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে ৯৮-৯৯ শতাংশ অনিষ্টকারী পোকা ধ্বংস হয়। এরকম না হলে অনিষ্টকারী পোকার বিস্ফোরণ ঘটত। জমিতে পরভোজী পোকামাকড়কে সহজেই দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু অনেকে এদের অনিষ্টকারী পোকা বলে ভুল করেন। এ ধরনের পরভোজী-পোকামাকড়ের মধ্যে কয়েক ধরনের মাকড়সা, লেডি বিটল এবং ক্যারাবিড বিটল ধানগাছে তাদের শিকার খুঁজে বেড়ায়, ধানগাছের পাতাফড়িং, গাছফড়িং বিভিন্ন ধরনের মথ, মাজরা  পোকার কিড়া এবং বিভিন্ন ধরনের পাতাভূক কিড়া এসব শিকারের অন্তর্ভুক্ত। পরভোজী মাকড়সা চলন্ত ও জীবন্ত পোকা খেতে ভালোবাসে। তবে এরা পোকার ডিমও খায়। অনেক সময় পরভোজী পোকা অনিষ্টকারী পোকার শতকরা ৮০-৯০ ভাগ ডিম খেয়ে এদের বংশ বৃদ্ধিকে রোধ করে দেয়। একটি পূর্ণ বয়স্ক উল্ফ (নেকড়ে) মাকড়সা প্রতিদিন ৫-১৫টি বাদামি গাছছড়িং খেয়ে ফেলতে পারে। পরভোজী পোকামাকড় তাদের নিজেদের দেহের বাড়-বাড়তির জন্য এভাবে অনেক পোকা শিকার করে খায়। কৃত্রিম উপায়ে পরভোজী পোকামাকড়ের বংশ বৃদ্ধি করিয়ে জমিতে ছেড়ে দিতে পারলে পোকা দমন অনেক সহজ হতো। কিন্তু তা করা সম্ভব নয়। কারণ কৃত্রিম উপায়ে এদের বংশ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এজন্য যেসব পরভোজী পোকামাকড় জমিতে সবসময় প্রচুর সংখ্যায় পাওয়া যায় তাদের রক্ষা করাই সবেচেয়ে সহজ ও বাস্তবসম্মত। তাই যখন-তখ ক্ষেতে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার না করে নিতান্ত প্রয়োজনেই এর ব্যবহার করা উচিত। পরভোজী পোকামাকড়দের জীবনধারণের জন্য প্রতিদিন অনেক পোকা শিকার করা প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে পরজীবী পোকা তার জীবনধারণের জন্য সাধারণত একটা  পোকা শিকার করে তা থেকে খাদ্য গ্রহণ করে থাকে। পরজীবী স্ত্রী পোকারা তার  পোষক পোকার ভেতরে বা তার উপরে একটা বা অনেক করে গাদায় ডিম পাড়ে। ওই ডিম থেকে পরজীবী পোকার বাচ্চারা ফোটে যখন পোষক পোকাকে খেতে থাকে তখন পোষক পোকা খাওয়া বন্ধ করে দেয় এবং পরে নিস্তেজ হয়ে মারা যায়। এ দেশ থেকে অন্য দেশে পরজীবী পোকা আমদানি করে এবং সেগুলো ফসলের  ক্ষেতে অনুপ্রবেশ করিয়ে ফসলের অনিষ্টকারী ও ধানের অনিষ্টকারী পোকা দমনের জন্য এ ধরনের প্রচেষ্টা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিফল হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কৃত্রিম উপায়ে পরজীবী পোকায় বংশ বৃদ্ধি করিয়ে তাদের ধানের জমিতে ছেড়ে দেয়া সম্ভব। এজন্য জমিতে যেসব পরজীবী পোকা থাকে তাদের সংরক্ষণ করাই সবচেয়ে ভালো উপায় এবং এটা করতে গেলে খুব বিচার-বিবেচনা করে কীটনাশক ব্যবহার করা উচিত। প্রকৃতিতে অনিষ্টকারী পোকা ও তাদের শক্রদের মধ্যে একটা ভারসাম্য আছে। এর ফলে অনিষ্টকারী পোকা সংখ্যায় বেশি বাড়তে পারে না। কিন্তু বিচার বিবেচনাহীনভাবে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করলে এ প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। কাজেই এসব কীটনাশক খুব সতর্কতার সঙ্গে প্রয়োগ করা উচিত। যাতে অনিষ্টকারী  পোকার প্রাকৃতিক শক্রগুলো ধ্বংস না হয়। কারণ অনিষ্টকারী পোকার এসব প্রাকৃতিক শক্ররাই হচ্ছে আমাদের প্রকৃত বন্ধু। পার্চিং : ধানক্ষেতের ক্ষতিকারক পোকামাকড় দমনে পার্চিং পদ্ধতি কৃষকের মধ্যে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কীটনাশক ছাড়া জৈবিক উপায়ে পোকামাকড় দমন এবং প্রতিরোধে সুফল পাওয়ায় কৃষকরা পার্চিং পদ্ধতির প্রতি ঝুঁকছে। ক্ষেতের ক্ষতিকারক  পোকামাকড় দমনে পার্চিং বা ডাল-পালা পোতা কার্যক্রম ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। দিন দিন এ পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার কমে আসছে। এর সুফলও পাচ্ছেন কৃষক। কৃষকরা তাদের আবাদী জমিতে জৈব বা রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার কমিয়ে প্রাকৃতিক এই পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছে। জমিতে পার্চিং করা বা ডাল-পালা, বাঁশের কঞ্চি পোতা পদ্ধতিটি খুবই সহজ এর  কোনো খরচ নেই, পাখি ডালে বসে মাজরা পোকার মথ, পাতা মোড়ানো পোকা মথ ও ফড়িংজাতীয়  পোকাগুলো সহজেই ধরে খেতে পারে। এতে পোকা আর বংশ বিস্তার করতে পারে না। পার্চিং দুই ধরনের হয়। জীবন্ত ও মৃত। জীবন্ত পার্চিং হলো ধঞ্চে, ছন, পাট এবং মৃত পার্চিং হলো বিভিন্ন ধরনের মৃত ডাল-পালা দিয়ে পাখির জন্য আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে  তোলা। ইতোমধ্যেই মাঠে সবুজের সমারোহ দেখা যাচ্ছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও পোকা-মাকড়  থেকে ফসলকে রক্ষা করতে কৃষকদের রাসায়নিক বালাই-নাশকের পরিবর্তে ধানক্ষেতে পার্চিং করে বা ডাল-পালা পুতে পোকা দমন করা সম্ভব এবং পোকার বংশ বিস্তার রোধ করাও সম্ভব। পার্চিং করা ধান ক্ষেতের ডাল-পালায় পাখিরা বসে ধানের ক্ষতিকর পোকা খেয়ে ফসল রক্ষা করে। আর এ পদ্ধতি গ্রহণ করতে কৃষকদের কৃষি কর্মকর্তারা পরামর্শ ও উৎসাহ দিচ্ছেন। ধানক্ষেতে পার্চিং বা ডাল পোতা জৈবিক পোকা দমন এটি খুবই কার্যকরী পদ্ধতি, ধানক্ষেতে শক্র পোকা যেমন মাজরা, গান্ধি, চুঙ্গি পোকাসহ বাদামি গাছফড়িং নিধনে বিশেষ করে মাজরা পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করতে এটি খুবই কার্যকর পদ্ধতি। একটি মাজরা পোকার মথ ২০০ থেকে আড়াইশ ডিম পাড়ে। ডিম থেকে কিড়া বের হয়ে একটি করে ধানের কুশি কাটে। যা কৃষককে খুব ক্ষতি করে আর এই ক্ষতিকারক পোকার মথ পার্চিং করা ডালে বসে পাখি খেয়ে ফেলে। এটি পরিবেশবান্ধব হওয়ায় কৃষকরা একটু চেষ্টা করে জমিতে ডাল-পালা পুতে দিলেই হলো। পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে ফসলের রোগবালাই দমন যেমন সহজভাবে করা যায়  তেমনি অর্থও সাশ্রয় হয়। পাশাপাশি জমির উর্বরতাও বৃদ্ধি পায়। কেননা কীটনাশক ব্যবহারে জমির উর্বরতা হ্রাসসহ মৎস্য প্রজননে মারাত্মক ক্ষতি করে। এ ছাড়া কীটনাশকের মূল্যও অনেক বেশি। তাই ধান চাষে পার্চিং পদ্ধতির প্রতি কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দেশে পামঅয়েল চাষের সম্ভাবনা উজ্বল

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশে প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থার আলোকে ভোজ্য তেলের (সয়াবিন, সরিষা, তিল, তিসি, সূর্যমুখী, ইত্যাদির) অভ্যন্তরীণ ঘাটতি মেটানো অত্যন্ত দুষ্কর। কেননা, ভোজ্যতেলের উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব নয়। এ জন্য আরো গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। ধরা যাক, যদি বর্তমানে ভোজ্য তেল উৎপাদনের পরিমাণ ৩ গুণ পর্যন্তও বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়, তাহলেও দেশে উৎপাদিত খাবার তেল দ্বারা মোট চাহিদার মাত্র ৪৫ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব। অন্যদিকে প্রচলিত তৈলবীজ চাষাবাদের মাধ্যমে ভোজ্যতেলের বাৎসরিক চাহিদা পূরণ করার জন্য  যে পরিমাণ কৃষি জমির প্রয়োজন তা আমাদের পক্ষে জোগান দেয়া অসম্ভব। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্প-কারখানা স্থাপন এবং নদী ভাঙনের মতো নানাবিধ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশে প্রতিদিন ২২২ হেক্টর আবাদি জমি হ্রাস পাচ্ছে। দেশে জনসংখ্যা বিচারে জনপ্রতি চাষযোগ্য জমির পরিমাণ মাত্র ০.১ হেক্টর। ফলে বছরে ৬৫ হাজার  হেক্টর কৃষি জমি কমে যাচ্ছে। কার্যত খাদ্য শস্য ঘাটতি মেটানোর জন্য বেশিরভাগ কৃষি জমি ব্যবহৃত হচ্ছে। এ অবস্থায় তৈল ফসলের জন্য আবাদী জমির পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব নয়। পাম চাষের গুরুত্ব/উপযোগিতা ঃ  এ প্রেক্ষাপটে খাবার তেল চাহিদা পূরণে পামঅয়েল চাষ বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থায় আনতে পারে যুগান্তকারী পরিবর্তন।  কেননা, পামচাষ খুব লাভজনক। নিম্নে পাম চাষের উপযোগিতা উল্লেখ করা হলো- অল্প জায়গা প্রয়োজন ঃ অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী ফসলের তুলনায় পাম চাষের জন্য খুব অল্প জায়গা প্রয়োজন। বছরে ১ হেক্টর জমিতে ৫ টন থেকে ৮ টন বা তার  বেশি পরিমাণ পাম তেল উৎপন্ন হয়- যা অন্যান্য যে কোনো তেল উৎপাদনকারী ফসলের চেয়ে বেশি লাভজনক। অকৃষি জমিতে পামচাষ ঃ পামচাষ দেশের অকৃষি জমিতেই করা সম্ভব। উঁচু জমির আইল, শিক্ষাঙ্গনের পতিত জমি, ক্যান্টনমেন্ট, রাস্তার দু’ধারে পাহাড়ি অঞ্চলের পাদভূমির বিশাল এলাকা, অন্যান্য অব্যবহৃত জমি এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পতিত জমি এ চাষের আওতায় আনা সম্ভব। পাম চাষের মাধ্যমে দেশে অভ্যন্তরীণ খাবার  তেলের চাহিদা পূরণের জন্য ২ লাখ ৬০ হাজার অকৃষি জমি পাওয়া একটি সহজ লভ্য বিষয়।

উপযোগী আবহাওয়া: বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে যথেষ্ট সামঞ্জস্য রয়েছে বিধায় বাংলাদেশে পাম চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বের ৮০ ভাগ পামঅয়েল মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় উৎপাদিত হয়। গ্রীষ্মমন্ডলীয় গরম ও আদ্র আবহাওয়া পাম চাষের উপযোগী। পাম চাষের জন্য সাধারণত ২৫-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সর্বোত্তম। গাছের পরিপূর্ণ বৃদ্ধি তথা ভালো চাষাবাদের জন্য দিনে অন্তত ৫-৭ ঘণ্টা আলো প্রয়োজন। মালয়েশিয়ায় সর্বাধিক পরিমাণ পাম উৎপাদনকারী অঞ্চলের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১৮৫০ মি.মি এবং খরা মৌসুমে অন্তত মাসিক ১০০ মি.মি। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার আবহাওয়ার মধ্যে যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। দেশের উত্তর-পূর্বাশ ও দক্ষিণ পূর্বাংশের গড় বাৎসরিক বৃষ্টিপাত ৩০০০ মি.মির বেশি। বর্ষাকালে সর্বাধিক পরিমাণে বৃষ্টি হয় এবং বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ ৮০ শতাংশের বেশি থাকে। শীতকালে দেশের তাপমাত্রা সাধারণত ১৫-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং গ্রীষ্মকালে ২৮-৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে যা পাম চাষের জন্য খুবই উপযোগী। সারা বছর কর্মসৃজন ঃ রোপণের ৩য় বছর থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত লাভজনক ফল দেয়। যে কোনো দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য একটি আয় বর্ধক ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পামঅয়েল সারা বছরই ফল দেয় বিধায় এর উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের সারা বছরই কর্মে জড়িত থাকার সুযোগ থাকে। অয়েল পামের তুলনামূলক পুষ্টিমান ঃ বিভিন্ন রকমের উদ্ভিজ্জ  ভোজ্যতেলের মতো পাম কোলেস্টরেল মুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী ভোজ্যতেলের মধ্যে ৫০ পি.পি.এম পর্যন্ত কোলেস্টরেল থাকলে তা  কোলেস্টরেলমুক্ত তেল হিসেবে বিবেচিত হয়। পাম তেলের মধ্যে ১৩-১৯ পি.পি.এম পর্যন্ত কোলেস্টরেল থাকে। অপরদিকে সয়াবিন তেলে ২০-৩৫ পি.পি.এম, সূর্যমুখী  তেলে ০৮-৪৪ পি.পি.এম এবং সরিষার তেলে ২৫-৮০ পি.পি.এম পর্যন্ত  কোলেস্টরেল বিদ্যমান। এই বিবেচনায় পাম তেল অন্যান্য উদ্ভিজ্জ তেলের চেয়ে অতিউত্তম। চীনে পাম তেল, সয়াবিন তেল, পিনাট তেল এবং শুকরের চর্বি নিয়ে তুলনামূলক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এদের মধ্যে পাম তেল দেহে উপকারী এইচ ডি এল কোলেস্টরেলের মাত্রা বাড়ায় এবং ক্ষতিকর এল ডি এল কোলেস্টরেলের মাত্রা কমায়। লাল পাম তেলে প্রচুর পরিমাণে বিটা ক্যারোটিন এবং ভিটামিন ই থাকে। যা গাজরের চেয়ে ১৫ গুণ এবং টমটোর চেয়ে ৩০০ গুণ বেশি। আবাদ করার উপায়: সুনিষ্কাশিত সমতল, ভারী মাটি, পানি ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন পলিমাটি পাম চাষের জন্য আদর্শ জমি। বাংলাদেশের কক্সবাজার, ময়মনসিংহ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিলেট, দিনাজপুর, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ ৩০টি কৃষি জলবায়ু অঞ্চলের মধ্যে ২৭টি কৃষি জলবায়ু অঞ্চলে পাম আবাদ করা যায়।

প্রথমে বীজ থেকে চারা তৈরি করে নিতে হয়। বীজ থেকে চারা তৈরি করে নিতে প্রায় ১ বছর সময় লাগে। চারা তৈরির পর মূল জমিতে ৯.৫ মিটার দূরে দূরে প্রতি হেক্টর জমিতে ১২৮টি চারা রোপণ করতে হবে। চারা রোপণের পূর্বে ৯.৫ মিটার দূরে দূরে ২ ফুট ২ ফুট আকারের গর্ত তৈরি করতে হবে। মূল গর্তে চারা রোপণের পূর্বে প্রায় ১০ কেজি জৈব সার দিয়ে ভালো করে উলট-পালট করে পচিয়ে নিতে হবে। তারপর প্রতি গর্তে ২৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ১ কেজি টিএসপি এবং ৫০০ গ্রাম এমপি সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। এসব সার মাটিতে দিয়ে চারা রোপণ করতে হবে। পরে প্রয়োজন মতো সেচ দিতে হবে। ফসল সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ঃ সারা বছরই পাম গাছ  থেকে ফল সংগ্রহ করা যায়। তবে লাগানোর ২৬-৩০ মাসের মধ্যেই ফসল তোলা যায়। এক হেক্টর জমির পূর্ণ বয়স্ক গাছে গড়ে বছরে কাঁদিসহ প্রায় ১৯ টন ফল পাওয়া যায়। মাসে ৩ বার বা ১০ দিন পরপর ফল সংগ্রহ করা যায়। এরপর ফলগুলোকে পাত্রের মধ্যে পানিসহ ফুটাতে হবে। এতে ফলগুলো নরম হবে। এ নরম ফলগুলোকে চেপে রস বের করে একটি পাত্রে রেখে চুলায় কিছুক্ষণ জ্বাল দিলে রসে বিদ্যমান পানি বাষ্পাকারে বের হয়ে যাবে এবং পাত্রে তেল জমা থাকবে। এভাবে  তেল ছেঁকে বোতলে সংগ্রহ করে ছয় মাস পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়।

লেখক ঃ কৃষিবিদ মো. নুরুল হুদা আল মামুন

 

জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্য নিরাপত্তায় গবেষণা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অসময়ে বৃষ্টি বেড়ে যাওয়ায় হঠাৎ বন্যা দেখা দিচ্ছে। ফলশ্র“তিতে বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ ২০১৭ সালে হাওড়ে মার্চের ২৯ থেকে এপ্রিলের ৪ তারিখ পর্যন্ত ৬২৯ মিলি মিটার বৃষ্টি হয়, যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ফলে বন্যা দেখা দেয়- যার ফলে এক সপ্তাহের মধ্যে ৬টি জেলার হাওড়ের শতভাগ ফসলহানি হয়। ওইসব এলাকার কৃষক সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় কী? প্রথমত, হাওড়ে বাঁধ দেওয়া ও নদী খননের মাধ্যমে পানি ঢুকতে না দেয়া বা অতিদ্রুত পানি বের করে দেওয়া; দ্বিতীয়ত, এমন জাতের ফসল বের করতে হবে যাতে পাহাড়ি ঢল আসার আগেই ফসল হার্ভেস্ট করা যায়। কিন্তু এই দুটি সহজ কাজ নয়। কারণ হাওড়ের বৈশিষ্ট্যই এমন, বাঁধ বা নদী খনন করলেও ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে হাওড়ে পানি ঢুকলে তা আর বের করা সম্ভব নয়। অন্য একটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রজনন পর্যায়ে ঠান্ডা সহ্য করতে পারে এমন স্বল্প জীবনকালের জাত উদ্ভাবন করা। পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় ব্রি এখন পর্যন্ত ১০টি লবণ সহিঞ্চু, ৩টি খরা সহনশীল, ৩টি বন্যা সহনশীল, ২টি ঞরফধষ ঝঁনসবৎমবহপব :ড়ষবৎধহঃ জাত উদ্ভাবন করেছে। এসব জাত মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের মোট লবণাক্ত এলাকার প্রায় ৩৫ ভাগ ধান চাষের আওতায় এসেছে এবং এ থেকে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১০%। খরাপ্রবণ এলাকায় খরাসহিঞ্চু জাতগুলো সম্প্রারণের মাধ্যমে ১২% আবাদ এলাকায় বৃদ্ধি পেয়েছে যেখান থেকে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৮%। জলমগ্নতা সহনশীল জাতগুলো সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২৬% এলাকা চাষের আওতায় এসেছে যেখানে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৯%। উপকূলীয় এলাকায় ধানের আবাদ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে উদ্ভাবিত জোয়ার-ভাটা সহনশীল জাত (ব্রি ধান৭৬, ৭৭) সম্প্রসারণের ফলে প্রায় ৫৭০০০ হেক্টর জমি এই ধান চাষের আওতায় এসেছে। সর্বোপরি, ঘাত সহনশীল ও অনুকূল পরিবেশ উপযোগী জাতগুলোর আবাদ সম্প্রসারণের ফলে ২০১০-১৯ পর্যন্ত গড়ে ৬.০ লাখ টন হারে চালের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং উৎপাদন বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। অথচ আবাদি জমির পরিমাণ প্রতি বছর কমছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রায় ১৬.৫০ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে খাদ্য উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৮৭ লাখ মেট্রিক টন। বিগত ৪৯ বছর ধরে ব্রি এ দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে অসামান্য অবদান রেখে চলছে। ১৯৭০-৭১ সালে দেশের ৭ কোটি ১২ লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে চালের উৎপাদন ছিল এক কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন মাত্র। খাদ্যের জন্য আমরা ঐতিহাসিকভাবে পরনির্ভশীল ছিলাম। ১৯৯৬ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত ‘দিন বদলের সরকার; সার এবং জ্বালানি তেলের দাম কমানো, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, কৃষিতে প্রণোদনা প্রদান, সার বিতরণ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, দেশে হাইব্রিড ধানের প্রবর্তন, ব্রি ধান২৮, ২৯ এর ব্যাপক সম্প্রসারণ, ধানের উন্নতমানের বীজ সরবরাহ, সেচের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থাসহ ইত্যাদি নানামুখী কৃষকবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ফলে ১৯৯৯ সালে দেশ প্রথমবারের মতো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে প্রদান করা হয় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) কর্তৃক মর্যাদাপূর্ণ সেরেস পদক। ২০০১ সালের পর দেশ আবার খাদ্য ঘাটতিতে পড়ে। আবার ২০০৯ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  নেতৃত্বে যখন দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করেন তখন খাদ্য ঘাটতি ছিল ২৬ লাখ মেট্রিক টন। তাই সরকার গঠন করেই তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে। প্রথম ক্যাবিনেট সভায় সারের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নেন।  যেখানে ৮০ টাকার টিএসপির মূল্য ২২ টাকা ও ৭০ টাকার এমওপির মূল্য ১৫ টাকায় নামিয়ে এনে সুষম সার ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর পদক্ষেপ নেন। এ ছাড়া কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকি প্রদান, ১০ টাকায় কৃষকের জন্য ব্যাংক হিসাব চালুকরণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, কৃষিতে প্রণোদনা প্রদান, সার বিতরণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাসহ নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ফলশ্র“তিতে ২০১৩ সালে এসে দেশ শুধু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতাই অর্জনই করেনি, খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত হয়। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) এবং বর্তমান সরকারের ভিশন-২০২১ এবং ২০৪১ এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্রি ইতোমধ্যে রাইস ভিশন-২০৫০ প্রণয়ন করেছে- যা থেকে  দেখা যায়, বর্তমান বৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ  দেশের জনসংখ্যা সাড়ে ২১ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। রাইস ভিশনে বলা হয়েছে, উৎপাদনের গতিশীলতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০, ২০৪১ এবং ২০৫০ সালে চালের উৎপাদন হবে যথাক্রমে ৪০, ৪৪ এবং ৪৭ মিলিয়ন টন। বিপরীতে ২০৩০, ২০৪১ এবং ২০৫০ সালে যথাক্রমে ১৮৬, ২০৩ এবং ২১৫ মিলিয়ন লোকের খাদ্য চাহিদা পূরণে চাল প্রয়োজন হবে যথাক্রমে ৩৮.৫, ৪২.০ এবং ৪৪.৬ মিলিয়ন টন। টষঃরসধঃবষু ২৫ কোটি মানুষকে খাওয়ানোর টার্গেট নিয়ে ব্রি বিজ্ঞানীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। রাইস ভিশন বাস্তবায়নের পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যে একটি স্ট্রাটেজিক প্লান তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণে প্রধান প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, ক্রমহ্রাসমান প্রাকৃতিক সম্পদ (যেমন-কৃষি জমি, পানি, কৃষি শ্রমিক এবং মাটির উর্বরতা) এবং বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিবর্তন। দেশে ধানের জমির পরিমাণ প্রতি বছর ০.৪০% হারে কমে যাওয়ার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্রি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে- প্রতি বছর ৪৪ কেজি/হেক্টর হারে জেনেটিক গেইন বাড়ানো, কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ১% হারে ফলন পার্থক্য ও জাতগুলোর সম্প্রসারণে দীর্ঘসূত্রিতা কমানো, আউশের কভারেজ বৃদ্ধি করে ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদা পূরণ করেও ২০৩০, ২০৪১ এবং ২০৫০ সালে যথাক্রমে ১৯ লাখ, ২১ লাখ এবং ২৬ লাখ টন উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব। সরকারের পরিকল্পনায় আমাদের কৃষি ক্রমশ দেশের উত্তর থেকে দক্ষিণে শিফ্ট হচ্ছে। উৎপাদন বাড়াতে হলে দক্ষিণাঞ্চলের অলবণাক্ত এলাকায় ধান চাষ সম্প্রসারণ করতে হবে। সেই অনুযায়ী দক্ষিণের বিভিন্ন নদী যেমন- তেঁতুলিয়া, পায়রা, কীর্তনখোলার মিষ্টি পানি ব্যবহার করে ধানের আবাদ এলাকা কিভাবে সম্প্রসারণ করা যায় সে ব্যাপারে আমাদের বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছেন। লবণাক্ততা সহনশীল জাতের পাশাপাশি নতুন সেচের উৎস তৈরি হলে দক্ষিণাঞ্চলে ধান চাষের এলাকা সম্প্রসারিত হবে। যেমন- বিআর২৩, ব্রি ধান৩০, ব্রি ধান৫২, ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৭৬, ব্রি ধান৭৭ এবং ব্রি ধান৮৭ দক্ষিণের চর এলাকাসহ বিশাল অনাবাদি এলাকা ধান আবাদের আওতায় এসেছে। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টির অধিকাংশ ক্যালরি,  প্রোটিন ও মিনারেল আসে ভাত থেকে। ভাত তাদের কাছে সহজলভ্য। সাধারণ মানুষ দুধ-ডিম ও মাংসসহ অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার কিনতে না পারলেও ভাত নিয়মিত খেতে পারছে। তাই ভাতের মাধ্যমে কিভাবে পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করা যায় সেই লক্ষ্যে কাজ করছেন আমাদের বিজ্ঞানীরা। চাল ছেঁটে যাতে চালকে অনিরাপদ করতে না হয় সেজন্য ব্রি ইতোমধ্যে প্রিমিয়াম  কোয়ালিটিসম্পন্ন জাত যেমন- ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৬৩, ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭৫, ব্রি ধান৮০, ব্রি ধান৮১, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৬, ব্রি ধান৮৮ এবং ব্রি ধান৯০ উদ্ভাবন করেছে। এসডিজিকে সামনে রেখে ব্রি বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে ৫টি জিংকসমৃদ্ধ জাত উদ্ভাবন করেছে, পাশাপাশি অন্যান্য পুষ্টি উপাদান  যেমন- প্রোটিন, আয়রন, এন্টি-অক্সিডেন্ট, গাবা ও বিটা ক্যারোটিনসমৃদ্ধ জাতসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর ধান উদ্ভাবন করেছে। এ ছাড়া শরীরের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যোপাদানগুলো দেহের প্রয়োজন অনুসারে চালে সংযোজন, সরবরাহ বা পরিমাণে বৃদ্ধি করে উদ্ভাবনকৃত জাতগুলো অবমুক্তকরণের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। কৃষিকে টেকসই ও বহুমাত্রিকীকরণে জাতীয় কৃষি নীতি-২০১৮-তে কৃষি উন্নয়নে ন্যানোপ্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জাত উদ্ভাবন, রোগবালাই দমন, সার ব্যবস্থাপনায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। ধানের উৎপাদন ও রোগ বালাই দমনে ফার্টিলাইজার ও ন্যানোপেস্টিসাইডের প্রভাব নিয়ে ব্রিতে গবেষণা চলছে। লেখক ঃ কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন।

 

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষ করলে একর প্রতি ১০০-১২০ টন ডাটা পাওয়া সম্ভব

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ডাটা বাংলাদেশের অন্যতম গ্রীষ্মকালীন সবজি। ডাটায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন-এ, বি,সি,ডি এবং ক্যালসিয়াম ও লৌহ বিদ্যমান। ডাটার কান্ডের চেয়ে পাতা বেশি পুষ্টিকর। খুব কম সবজিতে এত পরিমাণে বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন ও খনিজ লবণ থাকে। মাটির বৈশিষ্ট্য ডাটার জন্য উর্বর ও গভীর মাটি প্রয়োজন। সুনিষ্কাশিত অথচ ‘জো’ থাকে এমন মাটিতে এটি সবচেয়ে ভাল জন্মে। উৎপাদন কৌশল বাংলাদেশে ডাটার আবাদ খরা মৌসুমেই করা হয়। শীত প্রকট ও দীর্ঘস্থায়ী নয় বলে রবি মৌসুমেও এর চাষ সম্ভব, তবে সেই সময় অন্য অনেক সবজি পাওয়া যায়। জমি তৈরি ডাটার জন্য জমি গভীর করে কর্ষণ ও মিহি করে প্রস্তুত করতে হবে। জমিতে বড় ঢেলা থাকবে না। বাংলাদেশে ডাটা প্রধানত কান্ড উৎপাদনের জন্য চাষ করা হয়। আমাদের বেশি জাতসমূহ কান্ডপ্রধান, এগুলো ডালপালা খুব কম উৎপাদন করে। এসব জাত ৩০ সে.মি. দূরত্বে সারি লাগানো যেতে পারে। চারা গজানোর পর ক্রমান্বয়ে পাতলা করে দিতে হবে। যেন শেষ পর্যন্ত সারিতে পাশাপাশি দুটি গাছ ৮/১২ সে.মি. দূরত্বে থাকে। যেসব জাতের কান্ড অনেক মোটা ও দীর্ঘ হয় এবং দেরিতে ফুল উৎপাদন করে সেগুলো আরও পাতলা করা উচিত। বীজের পরিমাণ ডাটা চাষের জন্য শতাংশ প্রতি ১৫ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়। বীজ বপন জমি গভীরভাবে চাষ দিয়ে বড় ঢেলা ভেঙে মাটি ঝুরঝুরে করতে হবে। সারিতে কাঠির সাহায্যে ১.০-১.৫ সে.মি. গভীর লাইন টানতে হবে। লাইনে বীজ বুনে হাত দিয়ে সমান করে দিতে হবে। ছিটিয়ে বুনলে বীজের সঙ্গে সমপরিমাণ ছাই বা পাতলা বালি মিশিয়ে নিলে সমভাবে বীজ পড়বে। বপনের পর হাল্কাভাবে মই দিয়ে বীজ ঢেকে দিতে হবে। জমিতে পর্যাপ্ত রস না থাকলে ঝাঝরি দিয়ে হাল্কা করে পানি ছিটিয়ে দিতে হবে। তাহলে বীজ দ্রুত এবং সমানভাবে গজাবে। অর্ন্তবতীকালীন পরিচর্যা গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য জমিকে আগাছামুক্ত রাখা আবশ্যক। প্রয়োজনমতো জমিতে সেচ না দিলে কান্ড দ্রুত আঁশমুক্ত হয়ে ডাটার গুণগতমান ও ফলন কমে যাবে। মাটির চটা ভেঙে ঝুরঝুরে করে দিলে গাছের বৃদ্ধির সুবিধা এবং গোড়াপচা রোগও রোধ হয়। চারা গজানোর ৭ দিন পর হতে পর্যায়ক্রমে একাধিকবার গাছ পাতলাকরণের কাজ করতে হবে। জাত ভেদে ৫-১০ সে.মি. অন্তর গাছ রেখে বাকি চারা তুলে শাক হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। যেহেতু দ্রুত বর্ধনশীল ফসল তাই সঠিক সময়ে ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। ফসল তোলা কান্ড প্রধান জাতে ফসল সংগ্রহের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। গাছে ফুল আসার পূর্ব পর্যন্ত যে কোনো সময় ফসল তোলা যেতে পারে। ফুল আসলেই কান্ড আঁশময় হয়ে যায়। ডাটার কান্ডের মাঝামাঝি ভাঙার চেষ্টা করলে যদি সহজে ভেঙে যায় তাহলে বুঝতে হবে আঁশমুক্ত অবস্থায় আছে। তখনই সংগ্রহের উপযুক্ত সময় বলে বিবেচিত হয়। জীবনকাল লাল তীর সীড লিমিটেড উদ্ভাবিত জাতসমূহের জীবনকাল বপন থেকে ৪০-৬০ দিন। ফলন ডাটা একটি উচ্চ ফলনশীল সবজি। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উন্নত জাতের চাষ করলে প্রতি একরে ১০০-১২০ টন ডাটা পাওয়া সম্ভব।

প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাবে দেশের কিছু নির্দ্দিষ্ট এলাকায় পটল চাষ সীমাবদ্ধ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ পটল একটি জনপ্রিয় উচ্চমূল্য সবজি। পটল মূলত খরিপ  মৌসুমের ফসল। তবে সারা বছর ধরেই কম-বেশি পাওয়া যায়। অন্যান্য সবজির তুলনায় এর বাজারমূল্য তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে বাজারে যখন সবজির ঘাটতি দেখা দেয় তখন পটল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের মোট সবজির চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ পটল পূরণ করে থাকে। সুস্থ থাকার জন্য একজন মানুষের দৈনিক কমপক্ষে ২৩৫ গ্রাম সবজি খাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে উৎপাদিত সবজির মাথাপিছু দৈনিক গড় প্রাপ্যতা ৮২ গ্রাম। চাহিদার তুলনায় প্রাপ্যতার এই বিশাল ঘাটতি পূরণের জন্য দেশের সবজি উৎপাদন অবশ্যই বাড়ানো প্রয়োজন। বাংলাদেশের জলবায়ু ও আবহাওয়া পটল চাষের উপযোগী। দেশের সকল এলাকাতেই পটল চাষ করা সম্ভব। তবুও প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাবে দেশের কিছু নির্দ্দিষ্ট এলাকায় এর চাষ সীমাবদ্ধ। বৃহত্তর রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া, পাবনা, ফরিদপুর, যশোর ও কুষ্টিয়া জেলায় পটল চাষ বেশি হয়। দেশের অন্যান্য এলাকায় পটল চাষ সম্প্রসারণ করে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করলে একদিকে যেমন  মোট সবজির উৎপাদন বাড়বে অপরদিকে কৃষকদের আর্থিক সচ্ছলতাও বাড়বে।

জলবায়ু ও মাটি ঃ পটল গাছের দৈহিক বৃদ্ধি এবং ফলনের জন্য উষ্ণ এবং আর্দ্র আবহাওয়া দরকার। এ জন্য খরিপ মৌসুম পটল চাষের উপযুক্ত সময়। পানি নিষ্কাশনের সুবিধা আছে এমন উঁচু ও মাঝারী উঁচু জমি এবং বেলে দো-আঁশ থেকে  দো-আঁশ মাটি পটল চাষের জন্য উপযোগী। পটল বেশ খরা সহিষ্ণু। তবে পানির ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে ফলন কমে যায়।

জাত ঃ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় স্থানীয় অনেক জাতের পটল দেখা যায়। যেমন- বালি, মুর্শিদাবাদী, কানাইবাঁশী এসব। জাতগুলোর মধ্যে আকার এবং রংয়ের অনেক  বৈচিত্র লক্ষ্য করা যায়। যেমন- কোনটি লম্বা ও চিকন, কোনটি লম্বা ও মোটা,  কোনটি খাট ও মোটা, কোনটি গাঢ় সবুজ, কোনটি হালকা সবুজ, কোনটি  ডোরাকাটা, কোনটি ডোরাবিহীন, কোনটির পুরু ত্বক আবার কোনটির পাতলা ত্বক। এসব জাতই এতদিন চাষ হয়ে আসছিল। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি পটল-১ ও বারি পটল-২ নামে পটলের দুটি জাত উদ্ভাবন করেছে। জাতগুলো উচ্চ ফলনশীল এবং রোগবালাই সহিষ্ণু। উপযুক্ত পরিচর্যা করলে জাতগুলো প্রতি শতাশে ১২০ থেকে ১৫০ কেজি ফলন দিয়ে থাকে।

বপন সময় ঃ বাংলাদেশে বর্ষার শেষে আশ্বিন-কার্তিক মাস এবং শীতের শেষে ফাল্গুন-চৈত্র মাস পটল লাগানোর উপযুক্ত সময়। আশ্বিন-কার্র্তিক মাসে পটলের কাটিং বা শিকড় লাগালে তীব্র শীত শুরুর আগেই গাছের কিছুটা অংগজ বৃদ্ধি হয়ে থাকে। এতে জীবনকাল কিছুটা দীর্ঘায়িত হলেও ফালগুন-চৈত্র মাসে আগাম ফলন পাওয়া যায় এবং বাজারমূল্য বেশি পাওয়া যায়। বৃষ্টিবহুল এলাকায় বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে অবশ্যই আশ্বিন-কার্তিক মাসে পটল লাগানো উচিত। ফালগুন-চৈত্র মাসে পটল লাগালে গাছ দ্রুত বাড়ে, জীবনকাল কমে যায় এবং জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে ফল আসা শুরু হয়। চট্টগ্রাম অঞ্চলে পানের বরজে ছায়াদানকারী গাছ হিসাবে আশ্বিন-কার্তিক মাসে পটল লাগানো হয়। চরাঞ্চলে বর্ষজীবি ফসল হিসাবে প্রতি বছর আশ্বিন-কার্তিক মাসে পটল চাষ করা হয়। পলিব্যাগে চারা করে মূল জমিতে শ্রাবন-ভাদ্র মাসে লাগানো গেলে অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে ফলন পাওয়া যায়।

বংশ বিস্তার ঃ পটল একটি পরপরাগায়িত উদ্ভিদ। এর স্ত্রী ও পুরুষ ফুল আলাদা গাছে ফোটে। বীজ দ্বারা এর বংশবিস্তার করা হয় না। বীজ থেকে জন্মানো গাছে ফুল আসতে প্রায় দুই বছর সময় লাগে। কন্দমূল অথবা কান্ডের শাখা কলম দিয়ে পটলের বংশবিস্তার করা হয়। শাখা কলমের ক্ষেত্রে পরিপক্ক কান্ড ব্যবহার করা হয়। পটলের কান্ড মরে গেলেও মূল জীবিত থাকে। শীতের শেষে কান্ড থেকে নতুন চারা বের হয়। পটলের শাখা কলম বা লতার কাটিং করার জন্য একাধিক পদ্ধতি রয়েছে।  যেমন- প্রায় এক বছর বয়সের মোটা আকারের লতা ৫০ সে.মি. বা একটু বেশি লম্বা করে কেটে নিয়ে রিংয়ের মত করে পেঁচিয়ে মূল জমিতে বেডে লাগানো যায়। এতে ৪-৫ টি গিট মাটির নিচে থাকে এবং একটি গিট মাটির উপরে থাকে।

মূল জমির বেডে নির্দ্দিষ্ট দূরত্বে লাঙ্গল দিয়ে ১৫ সে.মি. গভীর নালা করে পরিপক্ক লতা লম্বা করে নালায় বিছিয়ে মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। এক্ষেত্রে লতার দুই প্রান্ত মাটির উপরে উন্মুক্ত থাকে। পরিপক্ক লতা কেটে রিংয়ের মতো করে পেঁচিয়ে বাড়িতে বা নার্সারীতে ছায়ায় লাগানো হয়। এক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি গিট মাটি দিয়ে ঢাকা থাকে। এরপর গজানো চারা মুলসহ উঠিয়ে নিয়ে বেডে লাগানো হয়।

শাখাকলম লাগানোর সময় মাটিতে পর্যাপ্ত রস না থাকলে কলম শুকিয়ে মারা যায়। এক্ষেত্রে পরিব্যাগে চারা গজিয়ে নিলে মূল জমিতে সময় মতো লাগানো যায়। এ পদ্ধতিতে খরচ কিছুটা বাড়লেও চারার মৃত্যুর হার অনেক কমে যায় ফলে মোট উৎপাদন বেড়ে যায়। মাটিতে আর্দ্রতা কম থাকলে একটু গভীরে শাখা কলম লাগাতে হয়। তবে বেশি আর্দ্র জমিতে কলম লাগালে তা পচে যেতে পারে।

জমি তৈরি ও রোপণ ঃ পটলের জমি গভীর করে ৪-৫ টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে তৈরি করে নিতে হয়। এতে পটলের মূলের বিস্তার সহজ হয় এবং গাছ সহজেই মাটি থেকে পানি ও পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করতে পারে। জমি চাষ করার পর  বেড তৈরি করে নিতে হয়ে। বেড পদ্ধতিতে পটল চাষ করা ভাল। এতে বর্ষাকালে  ক্ষেত নষ্ট হয় না। রোপণ পদ্ধতির উপর নির্ভর করে বেডের প্রস্থ ও রোপণ দূরত্ব কম-বেশি হয়ে থাকে। জমির দৈর্ঘ বরাবর ২৬০ সে.মি. চওড়া বেড তৈরি করে নিয়ে পাশাপাশি দুটি বেডের মাঝে ৩০-৩৫ সে.মি. প্রস্থ এবং ২০ সে.মি. গভীর নালা রাখতে হয়। এতে সেচ ও নিকাশের সুবিধা হয়।  প্রতি বেডে ২০০ সে.মি. দূরত্বে লাঙ্গল দিয়ে ১০-১৫ সে.মি. গভীর করে দুটি নালা করে নিতে হয়।  প্রতি নালায় ৫০  সে.মি. পর পর ১০-১৫ সে.মি. গভীরে শাখা কলম লাগাতে হয়। দেশের বৃষ্টিবহুল এলাকায়, সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে, চাষের জন্য বেডের প্রস্থ হবে ১৫০ সে.মি.। প্রতি বেডের মাঝ বরাবর এক সারিতে ১৫০ সে.মি. দূরে দূরে  মাদা তৈরি করে মাদায় চারা রোপণ করতে হয়। মাদার আকার হবে যথাক্রমে ৫০ ী  ৫০ ী ৪০  সে.মি.। এক্ষেত্রে সেচনালার প্রস্থ হবে ৪০-৪৫ সে.মি.।  একসঙ্গে চারা লাগালেও স্ত্রী ফুলের ১০-১৫ দিন পরে পটলের পুরুষ ফুল ফোটে। পুরুষ ফুলের অভাবে প্রথম দিকে ফোটা স্ত্রী ফুলগুলিতে ফল হয় না। তাই মূল জমিতে সারিতে বা মাদায় প্রতি ১০ টি স্ত্রী গাছের পর পর একটি পুরুষ গাছ ১০-১৫ দিন আগেই লাগানো উচিত।

সার প্রয়োগ ঃ পটলের ভাল ফলন পাওয়ার জন্য মাঝারী উর্বর জমিতে বিঘাপ্রতি ১৩০০ কেজি গোবর বা কম্পোষ্ট, ৪০ কেজি ইউরিয়া, ২৭ কেজি টিএসপি, ২০  কেজি এমওপি এবং ৮ কেজি জিপসাম সার ব্যবহার করা প্রয়োজন। ইউরিয়া ছাড়া বাকী সব সারের অর্ধেক পরিমাণ জমি তৈরির সময় এবং বাকী অর্ধেক সার মাদায় দিতে হবে। ইউরিয়া সার চারা গজানোর ২০ দিন পর পর সমান ৩ কিস্তিতে মাদার চারপাশে প্রয়োগ করতে হবে। পটলের জমিতে মাচা না দিলে ইউরিয়া সার দেয়া অসুবিধাজনক। সেক্ষেত্রে অর্ধেক ইউরিয়া বেডে এবং বাকী অর্ধেক ইউরিয়া চারা গজানোর ৩০ দিন পর গাছের গোড়ার চারপাশে মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে। পটলের ফলন প্রথম দিকে বাড়তে থাকে পরে আস্তে আস্তে কমতে থাকে। ফলন একেবারে কমে আসলে মাদার চারপাশ পরিষ্কার করে হালকাভাবে মাটি কুপিয়ে মাদাপ্রতি অতিরিক্ত ২০-৩০ গ্রাম ইউরিয়া, ৩০-৩৫ গ্রাম টিএসপি এবং ২০-২৫ গ্রাম এমওপি সার প্রয়োগ করলে গাছে নতুন নতুন ফুল ধরে এবং ফলন অনেক বেড়ে যায়। এভাবে দুবার সার দেয়া যেতে পারে।

পরিচর্যা ঃ ভাল ফলন পাওয়ার জন্যে পটলের জমিতে বিভিন্ন পরিচর্যা করতে হয়।  যেমন- বাউনি বা মাচা দেয়া: পটল একটি লতানো উদ্ভিদ। তাই পটল গাছের সুষ্ঠু বৃদ্ধি এবং ভাল ফলনের জন্য বাউনি বা মাচা দেয়া অবশ্যই দরকার। বাঁশের কাঠির সাহায্যে চারা গাছকে মাচায় তুলে দেয়া হয়। এক মিটার উচ্চতায় মাচা বা বাউনি দিলে পটলের ফলন প্রায় দ্বিগুণ পাওয়া যায়। পটলের মাচা বা বাউনি দু’ভাবে দেয়া যায়। বাঁশের তৈরি আনুভূমিক এবং রশি দ্বারা তৈরি খাড়া বা উল্লম্ব। মাচার দৈর্ঘ ও প্রস্থ হবে বেডের সমান। পটলের আকর্ষি ছোট হওয়ায় বাউনি যত চিকন আকারের  দেয়া যায় ততই ভাল। পটলের মাচা বা বাউনি বেশ খরচ সাপেক্ষ। তাই অনেক এলাকায় পটল চাষীরা বাউনির বদলে মাটির উপর খর-কুটা বা কচুরিপানা দিয়ে তার উপর গাছ তুলে দিয়ে থাকেন। এতেও ভাল ফলন পাওয়া যায় এবং উৎপাদন খরচও কম হয়। তবে পটলের মাটির সংস্পর্শে থাকা অংশ ফ্যাকাশে হলুদ হয়ে যায় এবং বাজারমূল্য কিছুটা কমে যায়। যেসব এলাকায় বৃষ্টিপাত কম হয় সেসব এলাকায় এ পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়। তবে রপ্তানীযোগ্য উচ্চ গুণাগুণসম্পন্ন পটল পেতে হলে অবশ্যই বাউনি বা মাচা দিতে হবে।

আগাছা দমন ঃ পটলের জমিতে সাধারণত: হেলেঞ্চা, দূর্বা, দন্ডকলস এসব আগাছার উপদ্রব দেখা যায়। এসব আগাছা জমি থেকে খাদ্য গ্রহণ করে পটল গাছকে দুর্বল করে দেয় ফলে পটলের ফলন কমে যায়। তাই পটলের জমি সবসময় আগাছামুক্ত রাখা উচিত। অংগ ছাটাই ঃ পটল গাছ মাচার উঠার আগ পর্যন্ত পার্শ¦শাখা ছাটাই করে দিতে হয়। পরবর্তীতে প্রতিবার ফসল সংগ্রহের পর মরা এবং রোগ ও পোকা আক্রান্ত পাতা ও শাখা ছাটাই করে দিতে হয়। এতে ফলধারী নতুন শাখার সংখ্যা  বেড়ে যায় এবং ফলন বেশি হয়।

জাবরা: পটল চারা লাগানো হয় শুকনো মৌসুমে। তাই কলম বা চারা লাগানোর পর মাদায় বা গাছের গোড়ায় জাবরা দেয়া প্রয়োজন। জাবরা মাদায় আর্দ্রতা সংরক্ষণে সহায়তা করে। পটল গাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। তাই বৃষ্টি বা সেচের অতিরিক্ত পানি সময়মতো নালা দিয়ে বের করে দিতে হবে।

পরাগায়ন ঃ চারা লাগানোর ৯০ দিনের মাথায় পটলের ফুল আসতে শুরু করে। পটল একটি পরপরাগায়িত উদ্ভিদ। স্ত্রী ফুল ও পুরুষ ফুল আলাদা গাছে ফোটে। কাজেই পরাগায়ন না হলে পটলের ফলন পাওয়া যাবে না। পটলের পরাগায়ন সাধারণত বাতাস এবং কীটপতঙ্গের দ্বারা হয়ে থাকে। তবে জমিতে পুরুষ ফুলের সংখ্যা খুব কমে গেলে কৃত্রিমভাবে পরাগায়ন করা প্রয়োজন হয়। সকাল ৬টা থেকে ৭টা পটলের পরাগায়ন করার উপযুক্ত সময়। কৃত্রিম পরাগায়ন করার জন্য একটি পুরুষ ফুল তুলে নিয়ে পুংকেশর ঠিক রেখে পাপড়িগুলি ছিড়ে ফেলতে হয়। তারপর পুংকেশর দ্বারা সদ্যফোটা প্রতিটি স্ত্রী ফুলের গর্ভমুন্ডে ২-৩ বার স্পর্শ করতে হবে। এর ফলে গর্ভমুন্ডের মাথায় পরাগরেণু আটকে যাবে এবং পরাগায়ন হবে। একটি পুরুষ ফুল দিয়ে ৮-১০ টি স্ত্রী ফুল পরাগায়ন করা যায়। এছাড়াও পরুষ ফুল সংগ্রহ করে পরাগরেণু আলাদা করে পানিযুক্ত একটি প্লাস্টিকের ব্যাগে নিয়ে হালকা ঝাকি দিয়ে পরাগরেণু পানিতে মিশিয়ে পরাগরেণু মিশ্রিত পানি ড্রপার দিয়ে ১ ফোটা করে প্রতিটি স্ত্রী ফুলের গর্ভমূন্ডে লাগিয়েও পরাগায়ন করা যায়। কৃত্রিম পরাগায়নের ফলে পটলের ফলন অনেক বেড়ে যায়।

মুড়ি ফসল ঃ পটল গাছ থেকে প্রথম বছর ফসল সংগ্রহ করার পর গাছের গোড়া নষ্ট না করে রেখে দিয়ে পরবর্তী বছর পরিচর্যার মাধ্যমে গুড়িচারা থেকে যে ফসল পাওয়া যায় তাকেই মুড়ি ফসল বলে। উঁচু জমিতে পটল চাষ করলে মুড়ি ফসল করা যায়। আশ্বিন-কার্তিক মাসে পুরানো শুকনো লতা কেটে দিতে হয়। তারপর জমির আগাছা পরিষ্কার করে কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে দিতে হয়। এতে গাছ নতুনভাবে উদ্বীপিত হয়। মুড়ি ফসলেও নতুন ফসলের মতো সার প্রয়োগ ও অন্যান্য পরিচর্যা করতে হয়। পটল গাছ একবার লাগালে ৩ বছর পর্যন্ত ফলন দিয়ে থাকে। পটল গাছে ১ম বছর ফলন কম হয়, ২য় বছর ফলন বেশি হয় এবং ৩য় বছর ফলন কমতে থাকে। একবার লাগানো পটল গাছ ৩ বছরের বেশি রাখা উচিত নয়।

বালাই দমন ঃ পটলের গাছ ও ফল বিভিন্ন প্রকার পোকা ও রোগ দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। এদের মধ্যে ফলের মাছি পোকা, কাঁঠালে পোকা এবং পাউডারি মিলডিউ  রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

ফলের মাছিপোকা ঃ এ পোকা পটলের বেশ ক্ষতি করে। স্ত্রীপোকা কচি ফলের ত্বক ছিদ্র করে ভিতরে ডিম পারে। ডিম ফুটে কীড়া বেড় হয়ে ফলের ভিতরের নরম অংশ খায়। এতে পটল খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়ে এবং অনেক সময় ফল ঝরে যায়।

প্রতিকার ঃ জমি পরিষ্কার রাখতে হবে।  আক্রান্ত ফল দেখা মাত্র সংগ্রহ করে মাটিতে পুতে ফেলতে হবে। বিষফাঁদ বা ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে পোকা দমন করতে হবে। প্রতি লিটার পানিতে ১ মি.লি. হারে ডিপটেরেক্স ৮০ এমপি মিশিয়ে ১০-১৫ দিন পর পর ৩-৪ বার ¯েপ্র করলে পোকা নিয়ন্ত্রণে আসে।

কাঁঠালে পোকা ঃ পূর্ণাঙ্গ পোকা ও কীড়া পাতার সবুজ অংশ খেয়ে জালের মতো ঝাঝড়া করে ফেলে। ফলে পাতা শুকিয়ে মরে যায় এবং গাছ আস্তে আস্তে পাতাশূন্য হয়ে পড়ে। আক্রমণ তীব্র হলে গাছ মারা যেতে পারে।

প্রতিকার ঃ আক্রমণ দেখামাত্রই পাতাসহ পোকার ডিম ও কীড়া সংগ্রহ করে নষ্ট করে  ফেলতে হবে। নিম বীজের মিহিগুড়া ৩০-৪০ গ্রাম এক লিটার পানিতে ১২-১৪ ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে পানি ছেকে নিয়ে ঐ পানি আক্রান্ত গাছে ¯েপ্র করলে পোকা দমন হয়। আক্রমণের মাত্রা তীব্র হলে ফেনিট্রোথিয়ন ৫০ ইসি জাতীয় কীটনাশক ১ লিটার পানিতে ২ মি.লি পরিমাণ মিশিয়ে ¯েপ্র করে আক্রান্ত গাছের পাতা ভিজিয়ে দিতে হবে।  পাউডারি মিলডিউ ঃ এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ। প্রথমে বয়ষ্ক পাতায়  রোগের লক্ষণ দেখা যায়। আক্রান্ত পাতার উপরের দিকে এবং কান্ডে সাদা পাউডারের মতো জীবাণুর প্রলেপ পড়ে। আস্তে আস্তে উপরের দিকে কচি পাতাও আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত পাতা ক্রমে ক্রমে হলুদ হয় এবং এক পর্যায়ে সম্পূর্ণ পাতা শুকিয়ে মারা যায়।

প্রতিকার ঃ সুষম সার এবং পরিমিত সেচ দিলে এ রোগের আক্রমণ কম হয়। আক্রমণ দেখা গেলে থিওভিট জাতীয় ছত্রাকনাশক ২ গ্রাম হারে প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর ৩ বার ¯েপ্র করতে হবে।

ফসল তোলা ও ফলন ঃ পটল কচি অবস্থায় সংগ্রহ করা উচিত। ফুল ফোটার ১০-১২ দিন পর পটল সংগ্রহের উপযোগী হয়। পটল এমন পর্যায়ে সংগ্রহ করা উচিত যখন ফলটি পূর্ণ আকার প্রাপ্ত হয়েছে কিন্তু পরিপক্ক হয়নি। বেশি পাকা ফলের বীজ শক্ত হয়ে যায় এবং খাবার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। জাত ও পরিচর্যার উপর পটলের ফলনের তারতম্য হয়। আধুনিক জাতগুলো চাষ করলে এবং সঠিক পরিচর্যা করলে বিঘাপ্রতি ৪০০০ থেকে ৫০০০ কেজি ফলন পাওয়া সম্ভব।

পুষ্টিমান ও ব্যবহার ঃ উচ্চ পুষ্টিমান ও বহুবিধ ব্যবহারের জন্য পটল সবার পছন্দের একটি সবজি। খাবার উপযোগী প্রতি ১০০ গ্রাম পটলে রয়েছে ২.৪ গ্রাম প্রোটিন, ৪.১ গ্রাম শ্বেতসার, ০.৬ গ্রাম চর্বি, ৭৯০ মা.গ্রা. ক্যারোটিন, ০.৩০ মি.গ্রা. ভিটামিন বি-১, ০.০৩ মি.গ্রা. ভিটামিন বি-২, ২৯ মি.গ্রা. ভিটামিন সি, ২০ মি.গ্রা. ক্যালসিয়াম, ১.৭ মি.গ্রা. আয়রণ, এবং ৩১ কিলো ক্যালরি খাদ্যশক্তি। পটলের ব্যবহারেও রয়েছে বৈচিত্র। বিভিন্নভাবে পটল ব্যবহার হয়ে থাকে। যেমন- তেলে ভাজি পটল, পটল মিশ্র সবজি, পটল চিংড়ি, পটল মোরব্বা, আলু-পটলের দোলমা এসব। এছাড়াও বিভিন্ন তরকারীতে পটল ব্যবহার করা হয়। পটল সহজেই হজম হয়। তাই হৃদরোগীদের জন্য পটল উপকারী।

আয় ব্যয় ঃ গবেষণায় দেখা গেছে এক বিঘা জমিতে পটল চাষ করলে প্রায় ৭ হাজার টাকা খরচ হয়। আর এক বিঘা জমির পটল বিক্রি করে আয় হয় কমপক্ষে ২১ হাজার টাকা। খরচ বাদে এক বিঘা জমিতে নীট লাভ হয় ১৪ হাজার টাকা। কাজেই নীট আয় ও আয়-ব্যয়ের অনুপাত বিবেচনায় নি:সন্দেহে বলা যায় পটল একটি লাভজনক সবজি।

ভেষজ ওষুধের বাজার দ্রুতগতিতে প্রসার লাভ করেছে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ চিকিৎসার জন্য ভেষজ উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীলতা চিরায়ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীর প্রায় ৭০ ভাগ লোক রোগের নিরাময়ক হিসেবে ভেষজ উদ্ভিদ ব্যবহার করছে। ইউনানী, আয়ুর্বেদীয়, এলোপ্যাথিক, হোমিওপ্যাথিক, কবিরাজিসহ বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান  ভেষজ উদ্ভিদ দিয়ে ওষুধ তৈরি করে থাকে। বিশ্বব্যাপী ভেষজ ওষুধের বাজার দ্রুতগতিতে প্রসার লাভ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, ২০৫০ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে ভেষজের বাণিজ্য হবে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের। বাংলাদেশও এই বাণিজ্যের অংশীদার। প্রায় শতকোটি টাকার ঔষধি কাঁচামালের স্থানীয় বাজার সৃষ্টি হয়েছে। ভবিষ্যতে এ বাজার বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনাও উঁকি দিচ্ছে। চাহিদা বাড়ছে দেশে  ঃ ভেষজ উৎপাদনে চমৎকার সহায়ক প্রাকৃতিক পরিবেশ বাংলাদেশে বিদ্যমান। দেশে প্রায় ৬০০ প্রজাতির ভেষজ উদ্ভিদ থাকলেও ওষুধ শিল্পে বর্তমানে ১০০ ধরনের উদ্ভিদ থেকে দেড় শতাধিক ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করা হয়। ইউনানী, আয়ুর্বেদ ও হোমিওপ্যাথি ওষুধ উৎপাদনে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি বিউটি পার্লারেও প্রসাধন শিল্পে এখন প্রচুর পরিমাণে ভেষজ উপাদান ব্যবহার হচ্ছে। ফলে ভেষজ উদ্ভিদের চাহিদা বেড়েছে। তাই দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেসরকারী উদ্যোগে  ভেষজ উদ্ভিদের চাষাবাদ ও উৎপাদন শুরু হয়েছে।

ভেষজের আন্তর্জাতিক বাজার ঃ যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, মালয়েশিয়া, সৌদিআরব, কুয়েত, কাতার, পাকিস্তান, কোরিয়া ভেষজ উদ্ভিদের প্রধান আমদানিকারক দেশ । বিশ্ব খাদ্য সংস্থার মতে, বর্তমানে বিশ্বে শুধু ঔষধি উদ্ভিদের বাজার রয়েছে ৬২ বিলিয়ন ডলারের। এই বিশাল বাজারের অধিকাংশই ভারত ও চীনের দখলে। অন্যদিকে ওষুধ ও প্রসাধনসামগ্রী তৈরির কাঁচামাল হিসেবে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০০  কোটি টাকার ভেষজসামগ্রী আমদানি করে থাকে। অথচ দেশের ওষুধ শিল্পে বর্তমানে যে পরিমাণ ভেষজ উদ্ভিদ ব্যবহৃত হয়, তার ৭০ ভাগই স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা সম্ভব। কেবল প্রয়োজন সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ।

ঔষধিগ্রাম ঃ নাটোরের ‘খোলাবাড়িয়া’ একটি গ্রামের নাম। গ্রামের বৃক্ষপ্রেমিক আফাজ পাগলা বাড়ির পাশে ৫টি ঘৃতকুমারীর গাছ রোপণ করেছিলেন বছর ত্রিশেক আগে। সেই ঘৃতকুমারীরর গাছই বদলে দিয়েছে গ্রামটির নাম।  খোলাবাড়িয়া এখন ঔষধি গ্রাম নামেই পরিচিত। গ্রামের প্রায় ষোলশ পরিবারের জীবিকা ঔষধি গাছের ওপর নির্ভর করছে। গ্রামে মোট ২৫ হেক্টর জমিতে ঔষধি গাছের চাষাবাদ করা হচ্ছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ভেষজ উদ্ভিদ বিক্রির দোকান। বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য সেখানে গড়ে উঠেছে ‘ভেষজ বহুমুখী সমবায় সমিতি’। এর মাধ্যমে ক্রেতা-বিক্রেতা আর উৎপাদনকারীর সমন্বয়ে জমে উঠেছে ভেষজ বিপ্লব। আফাজ পাগলের ১৭ কাঠার চাষী জমিতে ৪৫০ প্রজাতির ভেষজ নার্সারি গড়ে তোলা হয়েছে। গ্রামে এ রকম আরও ৮টি নার্সারি আছে। বাসক, সাদা তুলসী, উলটকম্বল, চিরতা, নিম, কৃষ্ণতুলসী, রামতুলসী, ক্যাকটাস, সর্পগন্ধা, মিশ্রিদানা, হরীতকী, লজ্জাবতীসহ হরেক রকমের ঔষধি গাছ এসব নার্সারিতে পাওয়া যায়। ঔষধি গ্রামের এই ভেষজ চাষাবাদ এখন ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী গ্রামগুলোতেও। এ যেন এক ভেষজ বিপ্লব কাহিনী। আফাজ পাগলার দেখানো পথেই ঘটেছে এই ভেষজ বিপ্লব।

গারো পাহাড়ের ২৪ গ্রাম ঃ ‘ঔষধি গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে  শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ের ২৪ গ্রাম। এসব গ্রামের আদিবাসীরা ঔষধি গাছের নার্সারি করে ভাগ্যের পরিবর্তনে দিনরাত খেটে যাচ্ছেন। ‘সোসাইটি ফর বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন’ (এসবিসি) নামের সংগঠনটি ২০০৮ সাল থেকে ঝিনাইগাতী উপজেলার পাহাড়ী গ্রামসহ সীমান্তবর্তী ৪ ইউনিয়ন কাংশা, নলকুড়া, ধানশাইল ও গৌরীপুরের ২৪ গ্রামে ৩৭টি কৃষকমৈত্রী সংগঠনের মাধ্যমে ঔষধি গাছ রোপণ ও পরিচর্যার প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। ভেষজ উদ্ভিদের চাষকে যদি আরো জনপ্রিয় করে তোলা যায় এবং সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে ভেষজ উদ্ভিদ চাষের বিস্তার ঘটানো যায়, তবে  কেবল আমদানী ব্যয় হ্রাসই নয়, বিদেশেও রপ্তানী করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।

উন্নত খাদ্য ও ব্যবস্থাপনা দিয়ে গরুকে মোটাতাজাকরণ লাভজনক

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশে কোরবানির মূল উপাদান হচ্ছে গরু। আর সেটা যদি হয় মোটাতাজা, নাদুস-নুদুস তবে আনন্দের সীমা থাকে না। এ উপলক্ষকে সামনে রেখে যারা গরু মোটাতাজাকরণে আগ্রহী তাদের আগে থেকেই প্রস্তুতি নেয়া দরকার। এজন্য দরকার গরু মোটাতাজাকরণে সঠিক ব্যবস্থাপনা। এটি কখন ও কিভাবে করলে বেশি লাভবান হওয়া যায় তার বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক পদ্ধতি নিম্নে দেয়া হলো- অধিক মাংস উৎপাদনের জন্য ২-৩ বছর বয়সের শীর্ণকায় গরুকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় খাদ্য সরবরাহ করে হৃষ্টপুষ্ট গরুতে রূপান্তরিত করাকে গরু মোটাতাজাকরণ বলে আখ্যায়িত করা হয়। এটির গুরুত্ব হচ্ছে- দরিদ্রতা হ্রাসকরণ, অল্প সময়ে কম পুঁজিতে অধিক মুনাফা অর্জন, অল্প সময়ের মধ্যে লাভসহ মূলধন ফেরত পাওয়া, প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি পূরণ, স্বল্পমেয়াদি প্রযুক্তি হওয়ার কারণে পশু মৃত্যুর হার কম, কৃষিকার্য থেকে উৎপাদিত উপজাত পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে সহজেই মাংস উৎপাদন করা, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে আয় বৃদ্ধি করা। গরু মোটাতাজাকরণের আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সম্পর্কে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশু পালন অনুষদের পশু বিজ্ঞান বিভাগের বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মুজাফফর হোসেন জানান- প্রয়োজনীয় উপাদান, পদ্ধতি ও মোটাতাজাকরণের সঠিক সময় : বয়সের ওপর ভিত্তি করে সাধারণত ৩ মাসের মধ্যে গরু মোটাতাজাকরণ করা যায়। অনেক সময় ৪-৬ মাসও লাগতে পারে। গরু মোটাতাজাকরণের জন্য সুবিধাজনক সময় হচ্ছে বর্ষা এবং শরৎকাল যখন প্রচুর পরিমাণ কাঁচা ঘাস পাওয়া যায়। চাহিদার ওপর ভিত্তি করে কোরবানি ঈদের কিছুদিন আগ থেকে গরুকে উন্নত খাদ্য ও ব্যবস্থাপনা দিয়ে মোটাতাজাকরণ লাভজনক। স্থান নির্বাচন : খামার স্থাপনের জন্য স্থান নির্বাচনে নিম্ন লিখিত বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ শুষ্ক ও উঁচু জায়গা হতে হবে, যাতে খামার প্রাঙ্গণে পানি না জমে থাকে। খোলামেলা ও প্রচুর আলো-বাতাসের সুযোগ থাকতে হবে। খামারে কাঁচামাল সরবরাহ ও উৎপাদিত দ্রব্যাদি বাজারজাতকরণের জন্য যোগাযোগ সুবিধা থাকতে হবে। পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সুষ্ঠু ব্যবস্থা থাকতে হবে। সুষ্ঠু নিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকতে হবে, যেমন- পানি, মলমূত্র, আবর্জনা ইত্যাদি। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে সম্প্রসারণের সুযোগ থাকতে হবে। গরু নির্বাচন : উন্নত দেশের মাংসের গরুর বিশেষ জাত রয়েছে। বিদেশি গরুর জন্য উন্নত খাদ্য ও ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। তাই দেশীয় গরু মোটাতাজাকরণ অধিক লাভজনক। ২-২.৫ বছরের গরুর শারীরিক বৃদ্ধি ও গঠন মোটাতাজাকরণের জন্য বেশি ভালো। এঁড়ে বাছুরের দৈহিক বৃদ্ধির হার বকনা বাছুরের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। তবে বাছুরের বুক চওড়া ও ভরাট, পেট চ্যাপ্টা ও বুকের সঙ্গে সমান্তরাল, মাথা ছোট ও কপাল প্রশস্ত, চোখ উজ্জ্বল ও ভিজা ভিজা, পা খাটো প্রকৃতির ও হাড়ের জোড়াগুলো স্ফীত, পাঁজর প্রশস্ত ও বিস্তৃত, শিরদাঁড়া সোজা হতে হবে। বাসস্থানের গঠন : গরুর বাসস্থান তৈরির জন্য খোলামেলা উঁচু জায়গায় গরুর ঘর তৈরি, একটি গরুর জন্য মাপ হতে হবে কমপক্ষে ১০-১২ বর্গফুট। ভিটায় ১ ফুট মাটি উঁচু করে এর ওপর ১ ফুট বালু দিয়ে ইট বিছিয়ে মেঝে মসৃণ করার জন্য সিমেন্ট, বালু ও ইটের গুঁড়া দিতে হবে। গরুর সামনের দিকে চাড়ি এবং পেছনের দিকে বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য নালা তৈরি করতে হবে। বাঁশের খুঁটি দিয়ে বেঁধে ওপরে ধারি অথবা খড় ও পলিথিন দিয়ে চালা দিতে হবে, ঘরের পাশে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা দরকার। পাশাপাশি দাঁড়ানো গরুকে বাঁশ দিয়ে আলাদা করতে হবে যাতে একে অন্যকে গুঁতা মারতে না পারে। ঘরের চারপাশ চটের পর্দার ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে অতি বৃষ্টি ও অতি ঠান্ডার সময় ব্যবহার করা যায়। খাদ্য : খাদ্যে মোট খরচের প্রায় ৬০-৭০ ভাগ ব্যয় হয়। তাই স্থানীয়ভাবে খরচ কমানো সম্ভব। এজন্য গরু মোটাতাজাকরণের একটি সুষম খাদ্য তালিকা নিচে দেয়া হলো- শুকনা খড়: ২ বছরের গরুর জন্য দৈহিক ওজনের শতকরা ৩ ভাগ এবং এর অধিক বয়সের গরুর জন্য শতকরা ২ ভাগ শুকনা খড় ২-৩ ইঞ্চি করে কেটে এক রাত লালীগুড়-চিটাগুড় মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে প্রতিদিন সরবরাহ করতে হবে। পানিঃচিটাগুড়=২০:১। কাঁচা ঘাস : প্রতিদিন ৬-৮ কেজি তাজা ঘাস বা শস্য জাতীয় তাজা উদ্ভিদের উপজাত দ্রব্য যেমন- নেপিয়ার, পারা, জার্মান, দেশজ মাটি কলাই, খেসারি, দুর্বা ইত্যাদি সরবরাহ করতে হবে। দানাদার খাদ্য : প্রতিদিন কমপক্ষে ১-২ কেজি দানাদার খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। নিচে ১০০ কেজি দানাদার খাদ্যের তালিকা দেয়া হলো- গম ভাঙা-গমের ভুসি ৪০ কেজি চালের কুঁড়া ২৩.৫ কেজি খেসারি বা যে কোনো ডালের ভুসি ১৫ কেজি তিলের খৈল-সরিষার খৈল ২০ কেজি লবণ ১.৫ কেজি। উল্লিখিত তালিকা ছাড়াও বাজারে প্রাপ্ত ভিটামিন মিনারেল মিশ্রণ ১% হারে খাওয়াতে হবে। তাছাড়া বিভিন্ন রকমের ইউরিয়া মোলাসেস বক ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি হচ্ছে ৩৯ ভাগ চিটাগুড়, ২০ ভাগ গমের ভুসি, ২০ ভাগ ধানের কুঁড়া, ১০ ভাগ ইউরিয়া, ৬ ভাগ চুন ও ৫ ভাগ লবণের মিশ্রণ। রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা : প্রতিদিন নিয়মিতভাবে পশুর গা ধোয়াতে হবে। গোশালা ও পার্শ¦বর্তী স্থান সর্বদা পরিষ্কার রাখতে হবে। নিয়মিতভাবে গরুকে কৃমিনাশক ট্যাবলেট খাওয়াতে হবে। বাসস্থান সর্বদা পরিষ্কার রাখতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পরিমিত পরিমাণে পানি ও সুষম খাদ্য প্রদান করতে হবে। রোগাক্রান্ত পশুকে অবশ্যই পৃথক করে রাখতে হবে। খাবার পাত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। খামারের সার্বিক জৈব নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। পশু জটিল রোগে আক্রান্ত হলে পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বাজারজাতকরণ : মোটাতাজাকরণ গরু লাভজনকভাবে সঠিক সময়ে ভালো মূল্যে বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ হচ্ছে আরেকটি উল্লেখ্যযোগ্য বিষয়। বাংলাদেশে মাংসের জন্য বিক্রয়যোগ্য গবাদিপশুর বাজার মূল্যেও মৌসুমভিত্তিক হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। কাজেই একজন প্রতিপালককে গরু মোটাতাজাকরণের জন্য অবশ্যই গরুর ক্রয় মূল্য যখন কম থাকে তখন গরু ক্রয় করে বিক্রয় মূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে বিক্রয়ের ব্যবস্থা নিতে হবে। সাধারণত কোরবানির ঈদের সময় গরুর মূল্য অত্যধিক থাকে এবং এর পরের মাসেই বাজার দর হ্রাস পায়। তাই এখন গরু মোটাতাজাকরণের উপযুক্ত সময়। স্বল্প সময়ে অধিক লাভবান হওয়ার সহজ এবং সুবিধাজনক উপায়ের মধ্যে গরু মোটাতাজাকরণ একটি অত্যন্ত যুগোপযোগী পদ্ধতি। কিন্তু প্রচলিত এবং অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজাকরণের তুলনায় আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজাকরণ অধিক লাভজনক। সুতরাং কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে আমাদের দেশের কৃষকরা যদি ওই পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজাকরণ করতে পারে তাহলে প্রতি বছর কোরবানি ঈদের সময় গরু আমদানি কমানো সম্ভব হবে এবং এর ফলে দেশ আর্থিকভাবে বিরাট সফলতা লাভ করতে সক্ষম হবে।

রাসায়নিক সার ব্যবহারে উতপাদন বাড়লেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে মাটির উতপাদন ক্ষমতা হ্রাস পায়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ রাসায়নিক সার সাশ্রয়ী বায়ো-অর্গানিক সার উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের বিজ্ঞানীরা। রাসায়নিক সার ব্যবহারে উৎপাদন বাড়লেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে মাটির উৎপাদনক্ষমতা হ্রাস পায়। তাই কৃষি বিজ্ঞানীরা মাটির গুণাগুণ ঠিক রাখতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমানো ও জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। আদর্শ ও উর্বর মাটিতে শতকরা ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকার কথা থাকলেও বাংলাদেশের মাটিতে বর্তমানে  জৈব পদার্থের পরিমাণ ১ শতাংশ বা তারও কম। তাই মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ কিভাবে ২% বা তারও বেশি পর্যায়ে উন্নীত করা যায় এ ব্যাপারে বাস্তবসম্মত গবেষণা কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন ব্রির মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের বিজ্ঞানীরা। এ জন্য ইতিমধ্যে তারা গৃহস্থলীর আবর্জনা সংগ্রহ ও রিসাইক্লিং করে বায়ো-অর্গানিক সার ও কম্পোস্ট সার তৈরির পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ কর্তৃক উদ্ভাবিত বায়ো-অর্গানিক ফার্টিলাইজার মাঠ পর্যায়ে দ্রুত সম্প্রসারণ ও উপযোগিতা যাচাইয়ের পাশাপাশি কৃষক পর্যায়ে এই সার সহজলভ্য করতে উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন ব্রির মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের বিজ্ঞানীরা। জানা গেছে, ব্রি নতুন উদ্ভাবিত এবং ধান চাষে ব্যবহারযোগ্য বায়ো-অর্গানিক ফার্টিলাইজার এরই মধ্যে মাঠপর্যায়ে আউশ, বোরো ও আমন মৌসুমে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। আউশ মৌসুমে এ সার হেক্টরপ্রতি এক টন এবং বোরো ও আমন মৌসুমে দুই টন হারে ব্যবহার করা হয়। ফলাফলে দেখা গেছে, এ সার ব্যবহার করলে ধানের জমিতে টিএসপি পূর্ণমাত্রায় ও ইউরিয়া শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ সাশ্রয় করা যায়। এটি ব্যবহার করলে ফলনেও কোনো তারতম্য হয় না। এই সার উদ্ভাবক দলের একজন অন্যতম বিজ্ঞানী ও মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. উম্মে আমিনুন নাহার জানান, পরিবেশবান্ধব ১০টি ব্যাকটেরিয়া, বাজারের কাঁচা শাক সবজির অবশিষ্টাংশ, রান্না ঘরের পচনশীল বর্জ্য পদার্থ, রক ফসফেট (শতকরা ৫ ভাগ) ও বায়োচার (শতকরা ১৫ ভাগ) মিশিয়ে বায়ো-অর্গানিক সার উদ্ভাবন করেছেন। বায়ো-অর্গানিক সারের উদ্ভাবক দলের অন্য সদস্যরা হলেন, ড. যতীশ চন্দ্র বিশ্বাস, মো. ইমরান উল্লাহ সরকার ও আফসানা জাহান। ইউরিয়া ও টিএসপি সারের জন্য সরকারকে প্রতি বছরে বিপুল পরিমাণে অর্থ ভর্তুকি দিতে হয়। তাছাড়া সার উৎপাদনে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক গ্রিনহাউস গ্যাস  তৈরি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি  কেজি ইউরিয়া ও টিএসপি উৎপাদনে প্রায় সাড়ে ছয় কেজি কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাতাসে যুক্ত হয়। টিএসপি অথবা ডিএপি সার তৈরীর প্রধান কাঁচামাল হচ্ছে রক ফসফেট, যার বাজার মূল্য কেজি প্রতি মাত্র পাঁচ টাকা। রক ফসফেট সহজে দ্রবীভূত হয় না বিধায় এটিকে ধানসহ বিভিন্ন স্বল্প মেয়াদি ফসলে সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। মাটিতে বসবাসকারী এক শ্রেণির পরিবেশবান্ধব ব্যাকটেরিয়া যা ফসফেট দ্রবণকারী ব্যাকটেরিয়া নামে পরিচিত এবং খুব সহজেই রক ফসফেটকে স্বল্প সময়ে দ্রবীভূত করে উদ্ভিদের গ্রহণযোগ্য করে তোলে। তাই বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত সার অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখবে। উদ্ভাবিত বায়ো-অর্গানিক সার ধান চাষে ব্যবহারে একদিকে যেমন শতকরা ৩০ ভাগ ইউরিয়া সার ও পূর্ণ মাত্রার টিএসপি সারের ব্যবহার কমাবে, অন্যদিকে কাঁচা বাজারসহ রান্নাঘরের বর্জ্য দ্রব্যকে ধান চাষে জৈব সার রূপে ব্যবহার করে পরিবেশ দূষণ কমিয়ে আনা যাবে। তদুপরি মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ করে মাটির স্বাস্থ্য বজায় রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। এই উদ্ভাবিত সারটির সঙ্গে শতকরা ১৫ ভাগ বায়োচার আছে বিধায় মাটিতে সরাসরি কার্বন যোগ করে মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধি করবে।

লেখক ঃ এম এ মোমিন।

বিটি বেগুন পাল্টে দেবে কৃষকের দুরবস্থা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কেউ বলে ‘গরিবের সবজি’, কেউ বলে ‘সবজির রাজা’। হ্যা, বাংলাদেশের মানুষের অতি পরিচিত সবজি বেগুনের কথা বলছি। প্রায় সারা বছরই দেশের সব শ্রেণীর ওলাকের কাছে খাদ্য তালিকায় বেগুন থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের বেগুন চাষিদের আজ দুরবস্থা। বেগুন ক্ষেতে ফসলের রোগ, কীটপতঙ্গের আক্রমণ, সার-বীজ-কীটনাশক ব্যবস্থাপনা কৃষকের দুঃশ্চিন্তার অন্যতম কারণ। তবে আশার কথা হচ্ছে, বিটি বেগুন পাল্টে দেবে কৃষকের এই দুরবস্থা। এ বেগুন চাষে লাগবে না কোন কীটনাশক; বাড়তি ফলনের পাশাপাশি আসবে স্বচ্ছলতা। এ বেগুনকে ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী করতে প্রায় এক দশক গবেষণার পর অবশেষে বিজ্ঞানীরা সফল হয়েছেন। গবেষকরা বায়োটেকনোলজি ব্যবহার করে উদ্ভাবন করেছেন বেগুনের ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী বেগুনের জাত এবং এই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ভারতে অবমুক্ত হতে যাচ্ছে এই বেগুন। নাম তার ‘বিটি ব্রিনজেল’ বা বিটি বেগুন। চীনের পর পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম বেগুন উৎপাদনকারী দেশ ভারত প্রায় সাড়ে ৫ লাখ হেক্টর জমিতে বেগুন উৎপাদন করে যা বিশ্বের মোট উৎপাদনের শতকরা ২৬ ভাগ দখল করে আছে। অর্থকরী ফসল হিসেবে ১.৪ মিলিয়ন ছোট, বড় এবং সীমিত সম্পদের কৃষকরা বেগুন উৎপাদন করে। ভারতের প্রধান বেগুন উৎপাদনকারী অঙ্গরাজ্য হচ্ছে পশ্চিম বাংলা (৩০%), উড়িষ্যা (২০%) এবং গুজরাট (প্রায় ১০%)। ২০০৫-২০০৬ সালে গড় ফলন ছিল হেক্টরপ্রতি প্রায় ১৫.৬ টন। বিটি বেগুন কীটপতঙ্গ দমনে কীভাবে কাজ করে এবং তা কৃষকদের জন্য কি ধরনের সুফল বয়ে আনে তা নিয়ে ড. নাসির বলেন, ব্যাসিলাস্ থুরিন্জিয়েন্সিস (বিটি) নামক মাটির একটি ব্যাকটেরিয়ার ক্রাই ওয়ান এসি জিন বেগুনের মাঝে ট্রান্সফার করে বেগুনকে ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধীজাত তৈরি করা হয়েছ। ক্রাই ওয়ান এসি জিনটি লেপিডোপটেরা বা প্রজাপতি পর্বের কীটপতঙ্গ যেমন, ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকার মিডগাট বা মধ্যান্ত্রে ক্ষারীয় মাধ্যমে বিষাক্ত প্রোটিন তৈরি করে যা মধ্যান্ত্রের দেওয়লে ছিদ্র সৃষ্টি করে এবং এই পোকা কিছুদিন পর খাদ্য গ্রহণ না করতে পেরে মারা যায়। এভাবে বিটি বেগুন কীটপতঙ্গ দমন করে। এতে করে কীটনাশক ছাড়াই বেগুনের ক্ষতিকর পোকা দমন করা যায়। ফলে কীটনাশক বাবদ কৃষকের খরচ বাঁচে, পাশাপাশি মাটিতে কোন ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ যেমন কীটনাশক থাকার সম্ভাবনাও থাকে না। মাঠ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে- বিটি বেগুন শতকরা ৯৮ ভাগ ডগা ছিদ্রকারী এবং ১০০ ভাগ ফল ছিদ্রকারী প্রতিরোধী। বিভিন্ন এলাকার মাঠ গবেষণা হতে দেখা যায়, বিটি বেগুন চাষে শতকরা ৪২ ভাগ কম কীটনাশক লাগে অন্যান্য কীটপতঙ্গ দমনে। এছাড়া বিটি বেগুন প্রচলিত বেগুনের হাইব্রিডের তুলনায় গড়ে শতকরা ১১৬ ভাগ বেশি বাজারজাত উপযোগী উৎপাদন বাড়ায়। এমনকি, বেগুনের মুক্ত পরাগায়ণের জাত থেকে গড়ে প্রায় শতকরা ১৬৬ ভাগ বেশি উৎপাদন হয়। গবেষকদের পরিসংখ্যান মতে, ভারতে বিটি বেগুন চাষিরা গড়ে প্রতি একর জমিতে প্রায় ২৩,০০০ টাকা থেকে ২৮,০০০ টাকা মুনাফা অর্জন এবং জাতীয় অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ২৮০ কোটি টাকা যোগ করবে। বিটি বেগুনের উদ্ভাবন বিষয়ে ড. নাসির বলেন, ২০০০ সালে ভারতের মহারাষ্ট্র হাইব্রিড সীড্স কোম্পানি (মাহিকো) সর্বপ্রথম তাদের বেগুনের হাইব্রিড তৈরির প্রোগ্রামের আওতায় ক্রাই ওয়ান এসি জিন ট্রান্সফারের মাধ্যমে বিটি বেগুন উদ্ভাবন করে। মাহিকো কোম্পানি বিটি বেগুন টেকনোলোজি ভারতের তামিল নাডু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কইম্বাটর ও কৃষি বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালযয়ে দান করেছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল- মাহিকো কোম্পানি শর্তবিহীনভাবে এই বিটি বেগুন টেকনোলোজি বাংলাদেশ ও ফিলিপাইন এর সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে দান করেছে । এছাড়া বর্তমানে মাহিকো’র পাশাপাশি আরও কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠানও আলাদা ধরনের জিন ব্যবহার করে বিটি বেগুন উদ্ভাবন করছে। যেমন- ন্যাশনাল সেন্টার অন প্ল্যান্ট বায়োটেকনোলোজি ক্রাই এফএওয়ান জিন ব্যবহার করে বিটি বেগুন তৈরি করছে এবং তারা এই প্রযুক্তি বেজো শীতাল, বিবাহ্ সীডস, নাথ সীডস এবং কৃষিধান সীডস কোম্পানিগুলোকে হস্তান্তর করেছে। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ হর্টিকালচারাল রিসার্চ ক্রাই ওয়ান এবি জিন ট্রান্সফারের মাধ্যমে বিটি বেগুন তৈরি করছে। বর্তমানে একাধিক উপকারী বৈশিষ্ট্যের বিটি বেগুনের জাত তৈরির গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। বিটি বেগুনের খাদ্য নিরাপত্তা ও জীব নিরাপত্তা প্রশ্নে আইসা রিভিউ -এর তথ্য এবং ড. নাসির এর সূত্রে জানা যায়- খরগোশ, ইঁদুর, কার্প জাতীয় মাছ, ব্রয়লার, গরুর উপর বিটি বেগুনের অ্যালার্জি, বিষাক্ততা ও পুষ্টিমান সম্বলিত একাধিক এবং বিভিন্ন ধরনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণে স্বাস্থ্যের জন্য কোন ক্ষতিকর কিছু পাওয়া যায়নি বরং তা নন-বিটি ফসলের মতই নিরাপদ। বিটি বেগুন উপকারী পোকা যেমন- এফিড, লীফ হপার, মাকড়সা, লেডিবার্ড বিটল ইত্যাদি। মাটির উপকারী অণুজীব ও লক্ষ্যহীন অন্যান্য জীবের ক্ষেত্রে কোন ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে না। ভারত ২০০০ সালে বিটি বেগুন উদ্ভাবনের পর একাধিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মানুষ এবং পশুর খাদ্য, পরিবেশ ও জীব নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়ে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করার উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিটি বেগুন কতটুকু কৃষকের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে এই প্রশ্নে ড. নাসির বলেন, বাংলাদেশেও চলছে বিটি বেগুনের মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষামূলক চাষ। দেশের যশোর, হাটহাজারী ও গাজীপুরে বিটি বেগুনের পরীক্ষামূলক চাষে ভাল ফলাফল পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বড় কথা হল, আমাদের দেশে খাদ্য সংকটের পাশাপাশি সবজি ফসলের ফলনও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। ডগা ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী বিটি বেগুন এই সব সমস্যা দূর করে ফোটাতে পারে কৃষকের মুখে হাসি। বেগুনের ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ কমে যাবে, কীটনাশক বাবদ কৃষককে প্রচুর খরচ কমবে, বাড়বে ফলন, লাভবান হবেন বেগুন চাষি। লেখক ঃ গোকুল চন্দ্র বিশ্বাস, বাকৃবি, ময়মনসিংহ

শস্যের ক্ষতিকারক পোকার পাশাপাশি রয়েছে কিছু বন্ধুপোকা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য উন্নত বীজ, রাসায়নিক সারের ব্যবহারে যেমন বহু বছর ধরে বাংলাদেশের কৃষকরা অভ্যস্ত, তেমনি ফসল নিরাপদ রাখার জন্য রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহারও বহুল প্রচলিত। কিন্তু সব রাসায়নিক বস্তুরই ক্ষতিকর দিক আছে, যা আমাদের জমি ও প্রকৃতির যথেষ্ট ক্ষতি করে ফেলেছে এরই মধ্যে। সুতরাং রাসায়নিক কীটনাশকের বিকল্প উপায় যদি উদ্ভাবন করা যায় তাকে বড় সাফল্যই বলতে হবে। সে সাফল্য পেয়েছেন মাগুরার কৃষকরা। কীট কিংবা বালাই নিধনের জন্য এখন কীটনাশকের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন পড়ে না। প্রাকৃতিকভাবেই ফসলি জমির ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ নিধন সম্ভব। মাগুরার বিভিন্ন মাঠে প্রাকৃতিকভাবে বালাই দমনের নানা পদ্ধতি ব্যবহার করে এ রকমই মন্তব্য করছেন কৃষি বিভাগ ও কৃষি উন্নয়নে কর্মরত সংশ্লিষ্টরা। জেলার বিভিন্ন এলাকার ক্ষেত ঘুরে দেখা গেছে, তিন ধরনের প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে বালাই নাশে স্থানীয় কৃষকরা এখন অনেকটাই সফল। যার প্রথম পর্যায়ে রয়েছে মাছিপোকা দমনে ফেরোমন ট্রাপের ব্যবহার। ফেরোমন ট্রাপের পরই রয়েছে ফসলি জমি বিশেষ করে ধানক্ষেতে লাইভ পার্চিং ও ডেথ পার্চিংয়ের ব্যবহার এবং বন্ধু পোকার মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে ক্ষতিকর পোকামাকড় দমন। ফেরোমেন ট্রাপ ঃ মনোসেক্স ফেরোমেন ট্রাপ হচ্ছে মাছি জাতীয় পোকা দমনের এক ধরনের ফাঁদ। সবজিসহ ফসলি ক্ষেতে প্লাস্টিকের বয়াম স্থাপন করে তার মধ্যে ডিটারজেন্ট পাউডার গুলিয়ে স্ত্রী পোকার গায়ের গন্ধযুক্ত ফেরোমেন স্থাপন করা হয়। ফেরোমেনের গন্ধে পুরুষ মাছি বয়ামের মধ্যে গিয়ে ডিটারজেন্ট গোলানো পানিতে পড়ে মারা যায়। ফলে পোকার বংশ বিস্তার বন্ধ হয়ে যায়। কৃষি বিভাগ ও ইসডেফ ফাউন্ডেশন নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গোটা জেলায় পোকা দমনে কৃষকদের মধ্যে এ পদ্ধতি ছড়িয়ে দিতে কাজ করে যাচ্ছে। লাইভ পার্চিং ও ডেথ পার্চিং ঃ লাইভ শব্দের অর্থ জীবন্ত। পার্চ শব্দের অর্থ দাঁড় কিংবা অল্প উঁচু ও নিরাপদ আসন। সেক্ষেত্রে লাইভ পার্চিং অর্থ জীবন্ত দাঁড়। অন্যদিকে একইভাবে ডেথ পার্চিং অর্থ দাঁড়াচ্ছে মৃত কিংবা মরা দাঁড়। দাঁড় শব্দের সঙ্গে উড়ন্ত পাখির সম্পর্ক রয়েছে। এই দাঁড়ের সঙ্গে ধানিজমির পোকা দমনের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। অতীতে কৃষকরা ধানিজমিতে পাখিদের জন্য কৃত্রিম দাঁড় তৈরি করত। তখন যে কোনো ধানক্ষেতের দিকে তাকালে গাছের মরা ডাল দিয়ে পাখিদের দাঁড় স্থাপনের দৃশ্য খুব সহজে চোখে পড়ত। দাঁড় স্থাপনের লক্ষ্য ছিল একটিই, পাখিদের সহজে বসার ব্যবস্থা করা, যাতে মাজরা পোকাসহ অন্যান্য ক্ষতিকর পোকা তারা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। রাসায়নিক কীটনাশকের দাপটে এ প্রাকৃতিক কীট দমন পদ্ধতিটি হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু খুশির সংবাদ হচ্ছে, এখন কৃষি বিভাগের উদ্যোগেই কৃষকদের নতুন করে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে প্রাকৃতিক পোকা দমন পদ্ধতি ব্যবহারে। যে কারণে জেলার সর্বত্র চলতি আউশ-আমন মৌসুমে অধিকাংশ ধানক্ষেতে কৃষকদের এ দাঁড় পাততে দেখা যাচ্ছে। পার্চিং পদ্ধতির দুটি ভাগ রয়েছে। এর একটির নাম দেওয়া হয়েছে লাইভ পার্চিং, অন্যটি ডেথ পার্চিং। লাইভ পার্চিং পদ্ধতিতে ধানক্ষেতে ৩ মিটার দূরত্বে পাখিদের বসার জন্য রোপণ করা হচ্ছে ধনচে গাছ। কৃষি বিভাগের মতে, ধনচে গাছ একটু বড় হলেই সেখানে পাখিরা খুব সহজে বসতে পারে। এটি আগাছা না হওয়ায় ক্ষেতের কোনো ক্ষতি করে না। ধনচে গাছ রাইজোডিয়াম জাতীয় ব্যাকটেরিয়া থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে মাটিতে সরবরাহ করে। ফলে ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয় কম। যেহেতু ধনচে গাছ জীবিত অবস্থায় পাখির মাধ্যমে পোকা দমনে দাঁড় হিসেবে কাজ করছে সুতরাং এর দ্বৈত সুফল পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে ডেথ পার্চিং হচ্ছে মরা গাছের ডাল মাঠের মধ্যে পুঁতে দিয়ে একইভাবে পাখিদের বসার জায়গা করে দেওয়া। এ পদ্ধতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রতি বিঘা জমিতে ১০ থেকে ১২টি ডাল পুঁতে দিলেই হয়। এক্ষেত্রে কেউ কেউ ডালপালার পরিবর্তে শক্ত পাটকাঠি মাঠের মধ্যে পুঁতে দিয়ে পাখি বসার সাময়িক ব্যবস্থা করে দেন। বন্ধুপোকা ঃ সব পোকাই ফসলি ক্ষেতের জন্য ক্ষতিকর নয়। শস্যের ক্ষতিকারক পোকার পাশাপাশি রয়েছে কিছু বন্ধুপোকা। বন্ধুপোকা নানাভাবে শক্র পোকা দমন করে ফসলি ক্ষেতে বন্ধু হিসেবে কাজ করে। যে কারণে এদের বলা হয় বন্ধুপোকা। কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে আমাদের জীববৈচিত্র থেকে ক্ষতিকর পোকার সঙ্গে সঙ্গে দিন দিন বন্ধুপোকাও হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে ফসলের ক্ষেতে এখন বন্ধুপোকার সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আর এ প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় রেখেই মাগুরা সদর উপজেলার শ্রীকুন্ডিী গ্রামে প্রায় ১০০ একর সবজির ক্ষেতে বন্ধুপোকা ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইসডেপ কনসার্ন ফাউন্ডেশন নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। তারা দেড় মাসে এ এলাকার বেগুন, চালকুমড়া, পটল, শসাসহ বিভিন্ন সবজি ক্ষেতে প্রায় ১৪ লাখ বন্ধুপোকা ছেড়েছে। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক গাউছুল আযম স্বাধীন জানান, তারা শ্রীকুন্ডী এলাকার ১০০ একর জমিতে ৫০ হাজার আইব্রাকন ও ১৩ লাখ ট্রাইকোগ্রামাথ এ দুই জাতীয় বন্ধুপোকা ছেড়েছেন। এছাড়া লেডি বার্ড ব্রিটল নামে আরেক জাতীয় পোকা ছাড়া হয়েছে। আইব্রাকন জাতীয় বন্ধুপোকা মাজরা জাতীয় ক্ষতিকর পোকার শরীরে তাদের আল ফুটিয়ে ওই পোকার জীবনশক্তি নিঃশেষ করে দেয়, যা ফসলি জমিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে ট্রাইকোগ্রামা জাতীয় বন্ধুপোকা একই পদ্ধতিতে সবজির ডগা ছিদ্রকারী ক্ষতিকর মাজরা পোকার ডিম নষ্ট করে দেয়। ফলে তাদের বংশ বিস্তার বাধাগ্রস্ত হয়। স্থানীয় কৃষকরা এ পোকা ছাড়ার ফলে উপকৃত হচ্ছেন বলে তিনি জানিয়েছেন। তিনি আরও জানান, এ পদ্ধতিতে পোকা দমন করলে ক্ষেতে কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। এতে খরচ যেমন বাঁচে, তেমনি মৌমাছি জাতীয় পরাগায়ন সহায়ক পতঙ্গ সবজি মাচায় খুব সহজে চাক বাঁধে। আর তার ফলে পরাগায়ন ভালো হওয়ায় ফলনও ভালো হয়। ইসডেপের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের এসপিজিআর প্রকল্পের সহায়তায় তাদের ল্যাব থেকে প্রথমে ডিম সংগ্রহ করে আনছেন। পরে এ ডিম নিজেদের ল্যাবে দু’দিন রেখে পোকার জন্ম হলে পোকাভর্তি বয়ামগুলো কৃষকদের মধ্যে সরবরাহ করছেন। এছাড়া এ বিষয়ে কৃষকদের দিচ্ছেন যথাযথ প্রশিক্ষণ। এ ব্যাপারে মাগুরা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ফসলের ক্ষেতে ফেরোমেন ট্রাপ ও বন্ধুপোকার মাধ্যমে ক্ষতিকর পোকা দমন কার্যক্রম ইসডেপের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। ১০টি প্রদর্শনী খামারে পরীক্ষামূলকভাবে সরকারি পর্যায়ে প্রথমবারের মতো বন্ধুপোকা ছাড়া হয়েছিল, যা থেকে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। সরকারিভাবেই এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক জানান, জেলায় এ বছর ৫৩ হাজার হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষ হয়েছে, যার মধ্যে ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে ডেথ পার্চিং ও লাইভ পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। আগামী মৌসুমে শতভাগ ধানিজমি এ পদ্ধতির আওতায় আনা হবে।

চারাকলম লাগানোর নিয়ম

ভালো ও বেশি ফল পেতে হলে দরকার স্বাস্থ্যবান ভালো জাতের চারা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ এখন ফলগাছ লাগানোর সময়। ভালো ও বেশি ফল পেতে হলে প্রথমেই দরকার স্বাস্থ্যবান ভালো জাতের চারা। তারপর চাই সেগুলো সঠিকভাবে লাগানো। যেনতেনভাবে ফলের চারা-কলম লাগালে সেসব গাছ থেকে কখনো খুব ভালো ফল আশা করা যায় না। মানসম্পন্ন ফল পেতে হলে প্রথমেই কাঙ্খিত জাতের চারা বা কলম সংগ্রহ করতে হবে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সিডরের আঘাতে অনেক ফলের গাছ সহজে উপড়ে গেছে। এ সবই অনভিজ্ঞতার ফল। শুধু বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকায় বেশির ভাগ নার্সারিতেই এখন মানসম্পন্ন চারাকলম তৈরি হচ্ছে না,  তৈরি হলেও সেসব কলমের খাসি করা ঠিকভাবে হচ্ছে না। ফলে অল্প শিকড় নিয়ে গাছ বড় হওয়ায় সহজে ঝড়-বাতাসে গাছ পড়ে যাচ্ছে। ফলগাছ রোপণের সময়  যেসব কাজ করা হয় তার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ গাছের বৃদ্ধি। গর্ত খনন থেকে শুরু করে চারাকলম রোপণ পর্যন্ত সকল কাজের ক্ষেত্রে বেশ কিছু নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। এসব নিয়ম ঠিকমতো মানা না হলে গাছের বৃদ্ধিই শুধু নয়, ফলনের ওপরও প্রভাব পড়ে। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেয়ার দরকার আছে।  গর্ত তৈরি ঃ  আমগাছের কলম লাগানোর জন্য যত বড় গর্ত করতে হবে পেয়ারার জন্য তা নয়, কাগজী লেবুর জন্য গর্ত হবে তার চেয়েও ছোট। বড় গাছ যেমন- আম, জাম, কাঁঠাল, ডেওয়া ইত্যাদির জন্যও গর্তের মাপ হবে সব দিকে ৯০ সেন্টিমিটার। মাঝারি গাছ যেমন- পেয়ারা, বাতাবিলেবু, কমলা, তৈকর, জামরুল ইত্যাদির জন্য গর্তের মাপ হবে সব দিকে ৭৫ সেন্টিমিটার। ছোট গাছ যেমন- কাগজী লেবু, করমচা, লুকলুকি, কলা, পেঁপে ইত্যাদির জন্য গর্তের মাপ হবে সব দিকে ৪৫  সেন্টিমিটার। ওপরের মাপে গর্ত খননের সময় ওপরের মাটি গর্তের এক পাশে এবং নিচের মাটি গর্তের আরেক পাশে রেখে প্রথমে জৈব সার মেশাতে হবে। এভাবে  রেখে দেয়ার ৪ থেকে ৫ দিন পর গাছ রোপণের ৩ থেকে ৪ দিন আগে রাসায়নিক সার মেশাতে হবে। এ সময়ে মাঝে মাঝে এই সার মিশ্রিত মাটি ওলট-পালট করে দিতে হবে। রোপণের সময় ঃ বর্ষার আগে (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ) বা বর্ষার শুরুতে (আষাঢ়) এবং বর্ষার  শেষে (ভাদ্র-আশ্বিন) ফলগাছের চারাকলম রোপণ করা যেতে পারে। তবে জমি সুনিষ্কাশিত ও বেলে দো-আঁশ প্রকৃতির হলে বর্ষায় ও (আষাঢ়-শ্রাবণ) বৃষ্টির দিন ছাড়া রোপণ করা যায়। শীতকালে চারাকলমের নতুন শিকড় গজায় না বা শিকড়ের বৃদ্ধি আশানুরূপ হয় না বলে শীতের সময় রোপণ না করা ভালো। বিকেলবেলা চারা বা কলম রোপণের উপযুক্ত সময়। রোপণ পদ্ধতি ঃ চারাকলম লাগানোরও বেশ কিছু নিয়ম আছে যেমন- মাটির মধ্যে কতটুকু পুঁতবেন, লাগানোর সময় কোনো ডাল-পাতা ছেঁটে দেবেন কি না অথবা নার্সারি থেকে কিনে এনেই চারাটি লাগাবেন কি না ইত্যাদি। কিছু সাধারণ নিয়ম  মেনে চারাকলম লাগালে ওগুলো ভালো থাকে। যেমন-কলম করে সাথে সাথেই বাগানে রোপণ করা চলবে না। তা করলে গাছ রোপণজনিত আঘাতে মরে যেতে পারে এবং কলমের জোড়া খুলে যেতে পারে। সে জন্য কলম করার অন্তত কয়েক মাস পরে তা রোপণ করা ভালো। রোপণ করার আগে চাষ ও মই দিয়ে বাগানের মাটি সমতল করে নেয়া উচিত।  রোপণের আগে অবশ্যই দূরত্ব ঠিক করে নকশা করে নেয়া উচিত। গ্রীষ্মেই এ কাজ করে ফেলতে হবে। রোপণের অন্তত ১৫ দিন আগে গর্ত  তৈরি করে সার মাটি ভরে রাখতে হবে। গর্ত প্রতি ৫-১০ কেজি গোবর সার, ১০০-১৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ১৫০-২৫০ গ্রাম টিএসপি এবং ৭৫-১৫০ গ্রাম এমওপি সার মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। রোপণের কয়েক দিন আগে চারা বা কলম সংগ্রহ করে হার্ডেনিং করতে হবে। এ জন্য ছায়াযুক্ত জায়গায় কয়েক দিন চারাকলম শুইয়ে রেখে পাতা ঝরাতে হবে। মাঝে মাঝে গোড়ার মাটির বলে ও গাছে হালকা পানির ছিটা দিতে হবে। এতে গাছের  রোপণোত্তর মৃত্যুঝুঁকি কমে যায়। লাগানোর সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন চারাকলমের গোড়ার মাটির বলটি ভেঙে না যায়। মাটির টবে বা পলিব্যাগে চারাকলম থাকলে কিছুটা পানি দিয়ে মাটি সামান্য নরম করে নিতে হবে। এরপর টব মাটিতে কাত করে গড়িয়ে এবং পলিব্যাগ গড়িয়ে বা দুই হাতের তালু দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চেপে নরম করে নিতে হয়। টব বা পলিব্যাগের চারাকলমের গোড়ায় হাত দিয়ে চেপে ধরে সম্পূর্ণ চারা বা কলমটি উল্টো করে ধরে টব বা পলিব্যাগ ওপরের দিকে টান দিলে বা টবটির কিনারা শক্ত কোনো জায়গায় ধীরে ধীরে টোকা দিলে মাটির বলটি বেরিয়ে আসে এবং সেটি গর্তে স্থাপন করতে হয়। অবশ্য পলিব্যাগের চারাকলমের ক্ষেত্রে চাকু বা ব্লেড দিয়ে পলিব্যাগের এক দিক কেটে অথবা মাটির টবটির চার দিক আস্তে আস্তে ভেঙে দিয়ে মাটির সম্পূর্ণ বলটি বের করে এনেও গর্তে বসানো যায়। গর্তে বসানোর সময় চারাকলমের গোড়া টবে বা পলিব্যাগে যে পর্যন্ত গোড়ায় মাটি ছিল বা বাইরে ছিল সে পর্যন্তই বাইরে রাখতে হয়। এর বেশি পুঁতে দেয়া বা ওপরে রাখা কোনোটাই ঠিক নয়। রোপণের সময় অতিরিক্ত পাতা ছাঁটাই করে দিতে হয়। তবে এটি সতর্কতার সাথে করতে হয়, যেন চারাকলমের গাছটি আঘাতপ্রাপ্ত না হয়। চারা কলম রোপণের পর  গোড়ার মাটি কিছুটা চেপে দিয়ে পানি ছিটিয়ে দিতে হয়। চারাকলম যদি বড় হয় তবে এটিকে সোজা ও শক্ত রাখার জন্য গাছ থেকে ১০-১৫  সেন্টিমিটার দূরে একটি খুঁটি পুঁতে একটু কাত করে সুতলী দিয়ে হালকাভাবে বেঁধে দিতে হয়। শক্ত করে বাঁধলে অনেক সময় চারাকলমের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। ঝড়ো বাতাসে উপড়ে যাওয়া থেকে চারাকলমকে এই খুঁটি রক্ষা করে।  চারাকলমের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন হলে বেড়া বা খাঁচার ব্যবস্থা করতে হয়। নতুন কুড়ি বা পাতা না আসা পর্যন্ত গাছে উপরি সার দেয়ার প্রয়োজন নেই।  তবে এই সময়ে গাছের গোড়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী পানি সেচের ব্যবস্থা করতে হয়।

লাভজনক হওয়ায় অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে হাঁস চাষে এগিয়ে আসছেন

কৃষি প্রতিবেদক ॥ আমাদের দেশের আবহাওয়া হাঁস পালনে খুবই উপযোগী। সমস্যা হচ্ছে হাঁসের মাংস ও ডিম মুরগির মাংসের চেয়ে জনপ্রিয় কম। তবে বর্তমানে এটি অনেক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এখন হাঁস চাষ লাভজনক একটি প্রযুক্তি। অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে হাঁস চাষে এগিয়ে আসছেন এবং প্রধান পেশা হিসেবে  বেছে নিচ্ছেন হাঁস চাষ। মৎস্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের মতে, পুকুরে হাঁস ও মাছের সমন্বিত চাষ পদ্ধতি অবলম্বন করলে খুব সহজে বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব। হাঁস চাষে অনেক সুবিধা রয়েছে যেমন- মাছের জন্য পুকুরে তেমন বাড়তি সার ও খাদ্য দিতে হয় না । হাঁস থাকলে মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। হাঁস পালনে সুবিধা ঃ হাঁসের রোগবালাই তুলনামুলক খুবই কম। তাছাড়া খাবারের  তেমন অভাব হয় না। দেশি মুরগি যেখানে গড়ে বছরে ৫৫টি ডিম দেয়, দেশি হাঁস  সেখানে ৯০টির বেশি ডিম দিয়ে থাকে। আর উন্নত জাত হলে বছরে ২৫০-৩০০টি ডিম দিয়ে থাকে। যেভাবে শুরু করতে পারেন ঃ এ প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে চাইলে আপনার ৪০-৫০ শতাংশ আয়তনের একটি পুকুর লাগবে। ১০০-২০০টি হাঁস এবং হাঁসের ঘর তৈরি করে নিতে হবে। এসব পরিকল্পিতভাবে করলে ভালো হবে। পাহারাদারের ঘরটি হাঁসের ঘরের দক্ষিণ পাশে হলে ভালো হয়। উন্নত হাঁসের জাত ঃ হাঁসের জাত নির্বাচন করার ক্ষেত্রে যে জাতের হাঁস বেশি ডিম  দেয় সে জাতের হাঁস নির্বাচন করতে হবে। এক্ষেত্রে খাকি ক্যাম্পেবেল,  ইন্ডিয়ান রানার, সিলেট মিটি ও নাগেশ্বরী জাত নির্বাচন করা যেতে পারে। এ জাতের হাঁস ৫ মাস বয়স থেকে ২ বছর পর্যন্ত ডিম দেয়।  যেভাবে হাঁস পালন করবেন ঃ হাঁস বিভিন্ন পদ্ধতিতে পালন করা যায়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে মুক্ত জলাশয়ে হাঁস পালন। এ পদ্ধতিতে ২৫-১০০টি হাঁস মুক্ত পুকুরে, লেকে অথবা ধান কাটার পর পরিত্যক্ত জমিতে পালন করা যায়। অপরটি হচ্ছে ইনটেনসিভ হাঁস পালন। এ পদ্ধতিতে ১-১০ লাখ হাঁস পালন করা সম্ভব। দিনের  বেলায় হাঁস পানিতে থাকতে পছন্দ করে। শুধু রাতযাপনের জন্য ঘরের প্রয়োজন। হাঁসের ঘর তৈরি ঃ পুকুরপাড়ে কিংবা পুকুরের ওপর ঘরটি তৈরি করতে হবে। ঘরের উচ্চতা ৫-৬ ফুট হলে ভালো হয়। ঘর তৈরিতে বাঁশ, বেত, টিন, ছন, খড় ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে ইট দিয়ে মজবুত করে ঘর তৈরি করতে পারলে ভালো হবে। ঘরটি খোলামেলা হতে হবে এবং সাপ ও ইঁদুর থেকে মুক্ত রাখতে হবে। শহরে বিভিন্ন মাপের চৌবাচ্চায় হাঁস পালন করা হচ্ছে । এক্ষেত্রে প্রশস্ত ছাদ থাকলে সুবিধা বেশি। ছাদের একপাশে ঘর অপর পাশে চৌবাচ্চা নির্মাণ করতে হবে। প্রজননের জন্য আটটি হাঁসের সঙ্গে একটি পুরুষ হাঁস রাখা দরকার। এরপর  দেশি মুরগির সাহায্যে অথবা ইনকিউবেটরে হাঁসের ডিম ফোটানো যায়। কোথায় পাবেন হাঁসের বাচ্চা ঃ দৌলতপুর হাঁস খামার, নারাণগঞ্জ হাস প্রজনন  কেন্দ্রসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত হাঁস-মুরগির খামার ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের কাছ  থেকে হাঁস বা হাঁসের বাচ্চা সংগ্রহ করতে পারেন। হাঁসের খাদ্য ঃ হাঁস চাষে সুবিধা হলো হাঁস খাল-বিল-পুকুর থেকে তার কিছু খাবার সংগ্রহ করে নেয়। তাছাড়া বাজারে হাঁসের তৈরি খাবার কিনতে পাওয় যায়। শুকনো খাদ্য না দিয়ে হাঁসকে সবসময় ভেজা খাদ্য দেয়া উচিত। খাদ্যে আমিষের পরিমাণ ডিম দেয়া হাঁসের ক্ষেত্রে ১৭-১৮ শতাংশ ও বাচ্চা হাঁসের ক্ষেত্রে ২১ শতাংশ রাখা উচিত। হাঁস দানা, খইল, ভূষি, ঝিনুকের গুঁড়ো, ডিমের খোসা, কেঁচোসহ অন্যান্য খাবার বেশি পছন্দ করে।  মাছের পুকুরেও হাঁস পালন ঃ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মাছের পুকুরে হাঁস পালন করলে কৃষকরা বেশি লাভবান হন। এ চাষে হাঁস বেশি প্রোটিন পায়। মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সম্ভাব্য  আয়-ব্যয় ঃ ২০-৪০ শতাংশের একটি পুকুরে ১০০-২০০টি হাঁসের জন্য এ প্রকল্প শুরু করলে সব মিলে খরচ হবে ৫০-৬০ হাজার টাকা। সঠিক পরিচর্যা আর যতœ নিতে পারলে প্রথম বছরে যাবতীয় খরচ বাদ দিয়ে ২০-৫০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। রোগমুক্ত, উন্নত জাতের হাঁস আধুনিক পদ্ধতি ও সঠিক নিয়ম অনুযায়ী চাষ করুন। যে কোনো পরামর্শের জন্য আপনার উপজেলা বা জেলা মৎস্য ও পশুসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। লেখক ঃ মু. হাসানুর রহমান খান বকুল

বহুগুণে গুণান্বিত সবজির মধ্যে শীর্ষে সজিনা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ সজিনা এক বিশেষ ধরনের সবজি। ইংরেজি নাম ড্রামস্ট্রিক। এ ছাড়া কবিরাজরা বিভিন্ন নামে একে আখ্যায়িত করেন। যেমন- সুপত্রক, সুখামোদ, রুচিরঞ্জন, শোভারঞ্জন, উপদংশ, দংশমূল, মধুশিঘ্রক এবং তীক্ষèগন্ধ। সজিনা গাছ মাঝারি ধরনের বৃক্ষ। সাধারণত ৪০-৫০ ফুট উঁচু হয়। এর কাঠ খুব নরম এবং বাকল আঠাযুক্ত। সজিনা গাছে মাঘ-ফাল্গুনে ফুল আসে। ফুল এর রঙ সাদা। চৈত্র-আষাঢ়ে ফল পাকে। ফলের বীজ ক্রিকোণাকার। আদি নিবাস ভারত ও পাকিস্তান। সজিনার ডাটা উৎকৃষ্ট সবজি আর পাতা হিতকর শাক। ডাটার তৈরি রকমারি খাবার যেমন- ডালসজনা, ভর্তা, সরিষাবাটা সজনা, পাতাভাজি, শাকবড়া এবং ফুলের সঙ্গে ডিম ভাজি দারুণ রেসিপি! সজিনার ডাঁটা খেতে সুস্বাদু, তবে পাতা ও ফুল তিতা হলেও যথেষ্ট পুষ্টিকর। শুধু কী তাই! এতে রয়েছে ভেষজগুণে ভরপুর। সজিনা মুখে রুচি বাড়ায়। তাই রোগীর পথ্য হিসেবে অনন্য। এর বীজ হতে উৎপন্ন তেলের নাম ‘বেন ওয়েল’। মানুষের খাবারের পাশাপাশি পশুখাদ্য, ঘড়ি মেরামত, পানিশোধক, রঙ ও কাগজ তৈরিতে সজিনার ব্যবহার সমাদৃত। বহুগুণে গুণান্বিত সবজির মধ্যে এর স্থান শীর্ষে। এ কারণেই দক্ষিণ আফ্রিকায় সজিনাকে বলা হয় ‘জাদুকর গাছ’। তাই এর গুণাগুণ জেনে নেয়া দরকার। পুষ্টিগুণ : সজিনা কেবল ভিটামিন সি ও ক্যারোটিন সমৃদ্ধ সবজিই নয়, এর অন্য পুষ্টি উপাদানগুলোর পরিমাণও রয়েছে বেশ। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, প্রতি ১০০ গ্রাম ডাঁটায় আহারোপযোগী আমিষ ৩.২ গ্রাম, শর্করা ১১.৪ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ২১ মিলিগ্রাম,  লৌহ ৫.৩ মিলিগ্রাম, চর্বি ০.১ গ্রাম, ভিটামিন এ ৭৫০ মাইক্রোগ্রাম, ভিটামিন বি১ ০.০৪ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি২ ০.০২ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৪৫ মিলিগ্রাম, খনিজ লবণ ১.৯ গ্রাম, আঁশ ৪.৮ গ্রাম এবং খাদ্যশক্তি আছে ৬০ কিলোক্যালরি। আর পাতায় রয়েছে ৬.৭ গ্রাম আমিষ, ১২.৫ গ্রাম শর্করা, ৪৪০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ৭ মিলিগ্রাম লৌহ, ১.৭ গ্রাম চর্বি, ৬৭০০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ, ০.০১ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি১, ০.০৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি২, ২২০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ২.৩ গ্রাম খনিজ লবণ, ০.৯ গ্রাম আঁশ এবং ৯২ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি। শুকনো পাতায় এর পরিমাণ আরও অধিক। সজিনাপাতায় দুধের  চেয়েও বেশি ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও জিংক আছে। পুষ্টির পরিমাণ বেশি থাকার কারণে সজিনাকে ‘পুষ্টির ডিনামাইট’ উপাধি  দেয়া হয়। ভেষজগুণ : সজিনা প্রায় তিনশ’ রোগের প্রতিকার এবং প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনি ও লিভারকে সচল রাখে। পাশাপাশি ডায়াবেটিস এবং শরীরের কোলস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। দেহের অতিরিক্ত ওজন কমানো, মায়ের দুধের পরিমাণ বাড়ানো, হজমে সহায়তাকরণ এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূরীকরণেও রাখে বিরাট ভূমিকা। এ ছাড়া ক্যান্সার, ব্লাডপ্রেসার, অ্যানিমিয়া, কিডনির পাথর, বন্ধ্যত্ব, হার্টের ব্যথা, জয়েন্টের ব্যথাসহ আরও নানা রোগের জন্য বেশ উপকারী। শরীরের রক্তশূন্যতা দূর করতে সজিনার ডাটা সিদ্ধ করে চিবিয়ে খেতে হয়। এ ছাড়া কৃমিনাশক ও জ্বরনাশক হিসেবে কাজ করে। ফলের নির্যাস ধনুস্টংকার, প্যারালাইসিস, যকৃত ও প্লীহাজনিত রোগের উপকার করে। সজিনার পাতা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে। জ্বর ও সর্দি সারাতে সজিনাপাতার কার্যকারিতা বেশ। নিয়মিত পাতার রস  খেলে শ্বাসকষ্ট দূর হয়। পাতা বেটে টিউমার এবং ফোড়ায় ব্যবহার করলে উপকার হয়। দাঁতের মাড়ি ফুলে যাওয়ায় কিংবা রক্ত দেখা দিলে পরিমাণমতো পানি দিয়ে সজিনা পাতা গরম করে নিয়মিত দু’তিনবার কুলকুচা করতে হবে। এভাবে ৭-৮ দিন ব্যবহার করলে প্রতিকার পাওয়া যায়। ৮-১০ ফোঁটা পাতার রস, সেই সঙ্গে এক কাপ পরিমাণ দুধ মিশিয়ে খেলে হেঁচকি ওঠা বন্ধ হয়ে যাবে। পাকা পাতার ২-৩ চামচ রস খাবারের আগে খেলে উচ্চরক্তচাপ কমে যায়। তবে ডায়াবেটিস রোগীকে এ রস খাওয়ানো যাবে না। কুকুরে কামড়ালে সজিনা পাতা পিষে এর সঙ্গে পরিমাণমতো হলুদ, রসুন, গোলমরিচ ও লবণ মিশিয়ে খেলে বিষ নষ্ট হয়ে যায়। সাপেকাটা রোগীর জন্য এর মূল ও বীজ ব্যবহার হয়। কানসহ শরীরের কোনো স্থানে ব্যথা হলে কিংবা ফুলে গেলে সজিনার শিকড় বেটে রস বের করে প্রলেপ দিলে উপকার পাওয়া যায়। কুষ্ঠ  রোগ হলে বীজের তেল বা বীজ বেটে প্রলেপ দিলে ভালো কাজ করে। বাতে আক্রান্ত করলে প্রতিদিন ৪-৫ চা চামচ গাছের ছালের রস খেলে আরাম অনুভব হবে। হাঁপানির জন্য ফুলের রস বেশ উপকারী। এ ছাড়া দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে কিডনির পাথর নির্মূল করে। ফুল ও ডাটা পক্স প্রতিরোধক। মূলের ছাল বেটে প্রলেপ দিলে দাদ (দাউদ) রোগ ভালো হয়। কপালে আঠা মালিশ করলে কিংবা দুধের সাথে মিশিয়ে খেলে মাথাব্যথা দূর হয়। খুসকি দূর করতে পাতার রস মাথায় ভালোভাবে ঘষতে হবে। সজিনার ফল, বিচি, পাতা, ফুল, গাছের বাকল, মূল এবং আঠা প্রতিটি মহামূল্যবান। এসব ব্যবহারে দেহে পুষ্টির অভাব পূরণ হয়। পাশাপাশি শরীরকে রাখে নীরোগ। তাই আসুন, বসতবাড়ির পতিত জায়গায় সজিনা গাছ রোপণ করি। নিজে সুস্থ থাকি। অপরকেও রাখি তরতাজা।

২ মাটি উদ্ভিদ ও মানব স্বাস্থ্যের জন্য জিংক একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান

কৃষি প্রতিবেদক ॥ জিংক মাটি উদ্ভিদ ও মানব স্বাস্থ্যের জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। উদ্ভিদে জিঙ্কের অপরিহার্যতা ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে আবিষ্কৃত হয়। উদ্ভিদ ও প্রাণীর জন্য অপরিহার্য এটি, কারণ সব প্রাণী এবং উদ্ভিদের জৈবিক প্রক্রিয়ায় জিংক বা দস্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফসলের বিভিন্ন অভাবজনিত উপসর্গের সঙ্গে সঙ্গে, বর্তমানে দস্তার অভাবে মানুষের শরীরে বিভিন্ন রোগব্যাধি দেখা দিচ্ছে। এটি ভিটামিন-এ অভাবের সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুপুষ্টি হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। সমগ্র বিশ্বে প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট জিংক পায় না। ফলে জিংকের অভাবে প্রতি বছর ৮ লাখ মানুষ মারা যান এবং শুধু ডায়রিয়াতেই ১.৫ মিলিয়ন শিশু প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী মারা যায়। জিংকের ঘাটতি বিশেষত শিশুদের মধ্যে ব্যাপক এবং বিশ্বের বহু শিশু মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ। বিশ্বজুড়ে ৪.৫ লাখ শিশু জিংকের অভাবে প্রতি বছর মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে। জিংক ঘাটতির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষে অবস্থান করছে। বাংলাদেশের প্রায় ৯৩ ভাগ মাটিতে জিংক ঘাটতি আছে। এ দেশের মানুষের খাদ্য এবং পশুর খাদ্যে যে পরিমাণে জিংক থাকার কথা তার চেয়ে কম বিদ্যমান। ফলে এদেশের ৫৫ ভাগ মানুষ জিংক ঘাটতিতে ভূগছে। জিংক ঘাটতির কারণে ৫০ ভাগ (৫ বছরের নিচে) শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি কম হচ্ছে। মৃত্তিকায় অভাব থাকলে খাদ্যে এর প্রাপ্যতা কমে যায় ফলে প্রাণী তথা মানব  দেহেও অভাবজনিত উপসর্গ দেখা দেয়।

মানবদেহে দস্তার প্রয়োজনীয়তা

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও খাদ্য ও কৃষি সংগঠন (২০০৪) এর মতে, প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির শরীরে ওজন অনুসারে ১০-১৪সম জিংক থাকা বাঞ্ছনীয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক ১২-১৪ মিলিগ্রাম জিংক প্রয়োজন। উদ্ভিদের ভোগ্যঅংশে জিংক এর অভাবজনিত কারণে মানুষের বৃদ্ধি (বিশেষ করে শিশুদের) ব্যাহত হয়। এর অভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, প্রজননে সমস্যা সৃষ্টি হয়, মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হয়। দস্তার অভাব তীব্রতর হলে মানব দেহে গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন- অস্থি সন্ধিতে ব্যথা, অকালে সন্তান প্রসব (অপরিপক্ব শিশু জন্ম), যকৃত বা কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস, গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল রোগ। যারা বিপুল পরিমাণ আয়রন গ্রহণ করে তাদেরও ঝুঁকি রয়েছে। যদিও লক্ষণগুলো পরিবর্তিত হতে পারে, তবে প্রায়ই লক্ষণগুলো জিংকের অভাবের সাথে সম্পর্কিত। যেমন-দুর্বল স্মৃতিশক্তি, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (ইমিউন সিস্টেম), দীর্ঘস্থায়ী ঠান্ডা, খাবারে স্বাদহীনতা বা গন্ধহীনতা, ঘুমের সমস্যা (বিঘিœত ঘুম), প্রয়োজনীয় মেলাটোনিনের অভাব, চুল পরা, ক্ষুধা মান্দ্য, কম কর্মশক্তি, ডায়রিয়া, ক্ষত নিরাময়ে ধীরতা, নখের ওপর সাদা দাগ ( হোয়াইট স্পট) এবং গুরুতর ক্ষেত্রে শিশুদের বৃদ্ধি রোধ ইত্যাদি।

উদ্ভিদ দেহে দস্তার ভূমিকা

উদ্ভিদ দেহে জিঙ্কের স্বাভাবিক ঘনত্ব ২৫-১৫০%। ২০%-১ ঘনত্বের নিচে দস্তা ঘনত্ব পাওয়া গেলে ওই উদ্ভিদ দস্তা অভাবে ভুগছে বলে যায়। জিঙ্ক উদ্ভিদের বিপাকীয় কার্যক্রমের জন্য একটি অপরিহার্য মাইক্রোনিউট্রেন্ট যা ৩০০ টিরও বেশি এনজাইমের অনুঘটকের/প্রভাবকের কাজ করে। সব প্রকারের জীবনের অপরিহার্য এই গৌণ খনিজ পদার্থটি জিন প্রকাশ, কোষ উন্নয়ন ও সংখ্যা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। আপনার শিশুর মতো আপনার ভালো ফসলটিও মুখ্য পুষ্টি উপাদানের পাশাপাশি অত্যাবশকীয় গৌণ পুষ্টি উপাদান চায়। জিংক তেমন একটি অত্যাবশকীয় গৌণ পুষ্টি উপাদান। এই উপাদানটি এনজাইম এক্টিভেশন যেমন আরএনএ পলিমারেস, সুপারঅক্সিড ডিসমিউটেজ, এলকোহল ডিহাইড্রোজিনাজ, কার্বনিক আনহাইডরেজ, প্রোটিন সংশ্লেষণ, কার্বোহাইড্রেড, লিপিড, নিউক্লিক এসিড বিপাক ও ক্লোরোপ্লাস্ট  তৈরিতে সাহায্য করে। জিংক প্রজনন প্রক্রিয়ায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর অভাবে ফসলের ফলন কমে যায় এবং তীব্র ক্ষেত্রে ফসল মারা যায়, যা প্রায় ৩০ ভাগ ফলন কমিয়ে দেয়।

মৃত্তিকায় দস্তা ঘাটতির কারণ

অতিরিক্ত মাত্রায় ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি সার ব্যবহার করা এবং দস্তা সার ব্যবহার না করা। মাটিতে অধিক মাত্রায় ফসফরাস উপস্থিতি দস্তার অভাব ঘটাতে পারে যা অদ্রবণীয় দস্তা-ফসফেট গঠন করে। সারা বছরব্যাপী উচ্চ ফলনশীল জাতের ফসল চাষ করা। মাটিতে অধিক চুন দেওয়া। দস্তা ঘাটতির প্রতি সংবেদনশীল জাত চাষ করা। মৃত্তিকার উপরের স্তর অপসারণ। ফসলের অবশিষ্টাংশ জমি থেকে তুলে নেয়া, জমিতে বিশ্রাম না দেয়া, আবার উদ্ভিদ দেহে অত্যধিক মাত্রায় ফসফরাস থাকলে দস্তার চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে উদ্ভিদ মূলে দস্তা ঘনত্ব বৃদ্ধি পায় অন্যদিকে শীর্ষ অঞ্চলে ঘাটতি দেখা  দেয়।

দস্তা সারের প্রতি সাড়াপ্রদানকারী ফসল

শুকনো ভোজ্য মটরশুটি, ভুট্টা, পেঁয়াজ, জোয়ার, মরিচ এবং ভুট্টা দস্তা সারের প্রতি সবচেয়ে সংবেদনশীল ফসল। ভুট্টা উচ্চ মাত্রায় দস্তা ঘাটতির প্রতি সাড়া প্রধান করলেও, আলু, ধান, তুলা ও গম মধ্যম মাত্রায় সাড়া প্রদান করে।  তৈল ও ডাল জাতীয় ফসলও মধ্যম মাত্রায় সাড়া প্রদান করে। সবজি জাতীয় ফসলের মধ্যে টমেটো, পালং ও লেটুস মধ্যম মাত্রায় সাড়া প্রধান করে। লেবু জাতীয় ফসলের জন্য দস্তা ঘাটতি একটি বৃদ্ধি প্রতিবন্ধক কারণ এই ফসল উচ্চ মাত্রায় দস্তা ঘাটতির প্রতি সংবেদনশীল।

ফসলে দস্তার জৈব সমৃদ্ধকরণ

দস্তা জৈবসমৃদ্ধকরণের লক্ষ্য হচ্ছে এমন ফসল তৈরি করা যাদের ভোজ্য অংশগুলোতে পুষ্টি উপাদানটি সহজলভ্য হবে। দানাশস্য বিশ্বের জনসংখ্যার একটি বৃহৎ অংশের জন্য প্রধান প্রধান খাদ্য হিসেবে কাজ করে কিন্তু এইসব দানাশস্যের ক্রটি হলো দস্তা এবং অন্যান্য অপরিহার্য পুষ্টি উপাদানগুলো কম বিদ্যমান। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায় যে, প্রজনন পদ্ধতির দ্বারা দানাফসল যেমন চাল ও গম দস্তা সমৃদ্ধকরণ করলে ভারতবর্ষে প্রতি বছর ৪৮ হাজার শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব। প্রজনন পদ্ধতির মাধ্যমে উচ্চ সমৃদ্ধ নতুন দানাশস্য  তৈরি/উৎপাদন উচ্চ দস্তা ঘাটতি সমস্যা মোকাবেলার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত এবং খরচ-সাশ্রয়ী কার্যকর কৌশল। যাই হোক, এই কৌশলটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি এবং মৃত্তিকার দস্তা পুল এখানেও নতুন উদ্ভাবিত জাতের দস্তা সংকলনের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে/কমিয়ে দিতে পারে। অতএব, দস্তা সার প্রয়োগ করে ফসল দস্তা সমৃদ্ধ (বায়োফর্টিফিকেশন) করা একটি দ্রুত এবং কার্যকর পদ্ধতি।

দস্তা সার প্রয়োগ পদ্ধতি

দস্তা মৃত্তিকা বীজ এবং পাতা অথবা দস্তা সার দ্রবণে চারা ডুবিয়ে প্রয়োগ করা যায়। সাধারণত, ফসলে প্রয়োগ করা দস্তা মূল বা পাতার মাধ্যমে শোষণ করে কিন্তু ফসলে দস্তা ঘনত্ব মূলত শিকড়ে প্রয়োগ করা দস্তা থেকেই হয়। পাতায় ০.৫-২.০% দ্রবণ প্রয়োগ মৃত্তিকায় দস্তা প্রয়োগের পরিপূূরক হতে পারে। বীজের উপরে দস্তা দিয়ে আবরণ তৈরি করে ২-৪% তরলে চারা ডুবিয়ে দস্তা প্রয়োগ মৃত্তিকায় দস্তা প্রয়োগের পরিপূরক হতে পারে। ফসল দানায় দস্তা আহরণে পাতায় দস্তা প্রয়োগ মাটিতে দস্তা প্রয়োগের চেয়ে বেশি কার্যকর। অন্যদিকে, শস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে মাটিতে দস্তা প্রয়োগ বেশি কার্যকরী। এক গবেষণায় দেখা যায়, ফসলের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী মৃত্তিকায় ও পাতায় জিংক প্রয়োগ পদ্ধতি সমন্বিতভাবে এর অভাব দূর করে ফলন বাড়াতে পারে। জলাবদ্ধ ধানী জমি, বিস্তৃত চা ও ফল বাগানে জিংক দ্রবণ পাতায় প্রয়োগে দস্ত্মার অভাব দূর করে ভালো ফলন দিতে পারে। বিশ্বব্যাপী সুষম সার ব্যবহার করে ফসলের ভোগ্য অংশে দস্তাসহ অন্যান্য অনুপুষ্টি বাড়ানো একটি প্রায়োগিক ও কার্যকরী পদক্ষেপ। তাই মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও আন্তর্জাতিক দস্তা প্রতিষ্ঠান (আইজেডও) খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ফসলে দস্তা সার ব্যবহার বৃদ্ধি করা ও ফসলে দস্তা ঘনত্ব বাড়ানো বিষয়ে গবেষণা করছে। এতদিন বাংলাদেশে এই বিষয়ে গবেষণা কেবলমাত্র দস্তা ব্যবহার করে ফসলের ফলন বৃদ্ধির বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এই গবেষণায় দেখা গেছে, মাটির প্রকারভেদে ৬  কেজি পর্যন্ত সার প্রয়োগে দানা জাতীয় ফসল ফলন ও ভোগ্য অংশে দস্তা ঘনত্ব বাড়ে। আবার ৬ কেজি ও ৯ কেজি প্রয়োগের মধ্যে কোন তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য পাওয়া যায় না। কিন্তু ৯ কেজি পর্যন্ত দস্তা সার প্রয়োগ করলে সবজি জাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

লেখক ঃ কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন।

 

পুকুরে হাঁস ও মাছের সমন্বিত চাষে খুব সহজে বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বর্তমানে পুকুর হচ্ছে মাছের অন্যতম উৎস। বাণিজ্যিকভাবে যারা আমাদের দেশে অনেকে মাছ চাষের সাথে সম্পৃক্ত। আবার অনেকের প্রধান পেশা মাছ চাষ। বর্তমানে মাছ লাভজনক একটি প্রযুক্তি। মৎস্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের মতে, পুকুরে হাঁস ও মাছের সমন্বিত চাষ পদ্ধতি অবলম্বন করলে খুব সহজে বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব। ঢাকার আশপাশের এলাকা- ধামরাই, সাভার, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জসহ  দেশের অনেক স্থানে হাঁস ও মাছের সমন্বিত চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ পদ্ধতিতে অনেক সুবিধা রয়েছে যেমন- এর জন্য পুকুরে তেমন বাড়তি সার ও খাদ্য দিতে হয় না। মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। একই সাথে মাছ, হাঁসও ডিম  থেকে সমানে আয় করা যায়।  যেভাবে শুরু করতে পারেন ঃ- এ প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে চাইলে আপনাকে ৪০-৫০ শতাংশ আয়তনের একটি পুকুর লাগবে। ১০০- ১৫০টি হাঁস, ১৫০০-১৮০০টি মাছের পোনা, হাঁসের ঘর। এসব পরিকল্পিতভাবে করলে ভালো হয়। পাহারাদারের ঘরটি হাঁসের ঘরের দক্ষিণ পাশে হলে ভালো হয়। পুকুর তৈরি করুন নিখুঁতভাবে ঃ- সঠিকভাবে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হলে পুকুরের চারপাশের পাড় ভালোভাবে মাটি দিয়ে উঁচু করে বাঁধতে হবে। পুকুরের তলদেশ সংস্কার করতে হবে। পুকুরে চুন প্রয়োগ করতে হবে প্রতি শতকে ১ কেজি হারে। চুন প্রয়োগের পর পানি সরবরাহ করতে হবে। মনে রাখবেন চুন প্রয়োগের ২-৩ সপ্তাহ পর মাছ ছাড়তে হবে। পুকুরে কোনো আগাছা রাখা যাবে না, এমনকি পানা থাকলেও তা পরিষ্কার করে দিতে হবে। পুকুরে পানি কমানো বা বাড়ানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোন জাতের মাছ নির্বাচন করবেন ঃ হাঁস চাষ করায় পুকুরে মাছের বিভিন্ন প্রকার খাবারের সৃষ্টি হয়। এজন্য ভিন্ন ভিন্ন খাদ্যাভ্যাসের বিভিন্ন জাতের মাছের চাষ করা উচিৎ। তাছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ভিন্ন ভিন্ন স্তরের খাবার খায়। মাছের প্রজাতির মধ্যে সিলভার কার্প ও কাতলা-পানির উপরের স্তরে খাদ্য খায় গ্রাস কার্প-পুকুরের জলজ আগাছা ও ঘাস খায়, কমন কার্প- পুকুরে তলদেশের খাদ্য খায় বলে জানালেন মৎস্য বিশেষজ্ঞরা। এছাড়াও মৃগেল, কালিবাউশ, মিরর কার্প, সরপুঁটিসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের চাষ করতে পারেন। মাছের সম্ভব্য সংখ্যা ঃ- প্রতি শতকের জন্য সিলভার কার্প- ১০-১৫টি, কাতলা/ব্রিগেড- ৬টি, মৃগেল ৬টি, কালিবাউশ ৩টি, গ্রাস কার্প ৩টি, সরপুঁটি ৭-১০টি। হাঁসের ঘর  তৈরি ঃ- পুকুর পাড়ে কিংবা পুকুরের ওপর ঘরটি তৈরি করতে হবে। ঘরের উচ্চতা ৫-৬ ফুট হলে ভালো হয়। ঘর তৈরিতে বাঁশ, বেত, টিন, ছন, খড় ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘরটি খোলামেলা হতে হবে এবং সাপ ও ইঁদুর থেকে মুক্ত রাখতে হবে। উন্নত হাঁসের জাত ঃ- হাঁসের জাত নির্বাচন করার ক্ষেত্রে যে জাতের হাঁস বেশি ডিম দেয় সে জাতের হাঁস নির্বাচন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইন্ডিয়ান রানার ও খাকি ক্যাম্পেবেল নির্বাচন করা যেতে পারে। এ জাতের হাঁস ৫ মাস বয়স থেকে ২ বছর পর্যন্ত ডিম দেয়। বছরে ২৫০- ৩০০টি ডিম দিয়ে থাকে। হাঁসের খাদ্য ঃ- শুকনা খাদ্য না দিয়ে হাঁসকে সবসময় ভেজা খাদ্য দেয়া উচিত। খাদ্যে আমিষের পরিমাণ ডিম দেয়া হাঁসের ক্ষেত্রে ১৭-১৮ শতাংশ ও বাচ্চা হাঁসের ক্ষেত্রে ২১ শতাংশ রাখা উচিত। সম্ভাব্য আয়-ব্যয় ঃ- ৪০-৫০ শতাংশের একটি পুকুরে ১০০টি হাঁসের জন্য এ প্রকল্প শুরু করলে সব মিলে খরচ দাঁড়াবে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। সঠিক পরিচর্যা আর যতœ নিতে পারলে প্রথম বছরে যাবতীয় ব্যয় বাদ দিয়ে ৬০-৯০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব হতে পারে। রোগমুক্ত, উন্নত জাতের হাঁস আধুনিক পদ্ধতি ও সঠিক নিয়ম অনুযায়ী চাষ করুন। যে  কোনো পরামর্শের জন্য আপনার উপজেলা বা জেলা মৎস্য ও পশুসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।

মার্চ-এপ্রিল মাস পুঁই চাষের জন্য উপযুক্ত সময়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশের অন্যতম লতানো ও পাতাজাতীয় সবজি পুঁই। দীর্ঘজীবী তবে সাধারণত বর্ষজীবী হিসেবে জন্মানো পুঁইয়ের পাতা ও কচি ডগা ছাড়াও কিছুটা শক্ত ও আঁশযুক্ত শাখা-প্রশাখাও ডাঁটার মতো খাওয়া যায়। ভিটামিন এ, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ পুঁইশাক লতানো প্রকৃতির হওয়ায় বসতবাড়িতে বেড়া বা দেয়ালঘেঁষা মাচায় সহজেই লাগানো যায়। এমনকি ছাদ বাগানে বা বারান্দার গ্রিলেও পুঁই বেড়ে উঠতে পারে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শীতের দুই-তিন মাস ছাড়া প্রায় সারাবছরই পুঁইশাক পাওয়া যায়। স্বল্প সময়ে একই গাছ থেকে কয়েকবারে শাক ও ডগা সংগ্রহ করা যায় বলে বাণিজ্যিক চাষে পুঁইশাক  বেশ লাভজনক। বিজ্ঞানীদের ধারণা পুঁইশাকের উৎপত্তি দক্ষিণ এশিয়া বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে শ্রীলংকা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকার মধ্যে। তবে বাংলাদেশ ও ভারতেই পুঁইশাকের চাষ বেশি হয়ে থাকে। বর্তমানে আফ্রিকা ও আমেরিকার নিরক্ষীয় অঞ্চলেও সীমিত আকারে পুঁইয়ের চাষ হচ্ছে। আবহাওয়া ও মাটি ও জাত ঃ উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুতে পুঁইশাক ভালো জন্মায়। কষ্টসহিষ্ণু গাছ বলে অতিবৃষ্টিতেও এর খুব একটা ক্ষতি না হলেও জলাবদ্ধতায় গাছের গোড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার আংশিক ছায়াতেও জন্মে এবং বেড়ে ওঠে। সুনিষ্কাষিত এবং দো-আঁশ ও এঁটেল দো-আঁশ ধরনের উর্বর মাটি পুঁইয়ের জন্য উপযোগী। তবে বর্ষার আগেই ফসল সংগ্রহ শেষ করতে হলে বেলে দো-আঁশ মাটিতে চাষ করা ভালো। বাংলাদেশে সবুজ ও লাল কান্ডবিশিষ্ট দুই জাতের পুঁইশাক  দেখা যায়। আবহাওয়া ও সার-পানি ব্যবস্থাপনার ওপর এ জাতগুলোতে কান্ডের ব্যাস, পর্বমধ্যের দৈর্ঘ্য, পাতার আকার ও আকৃতি, লতানো ও ঝোপালো স্বভাব ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। বীজ বপনকাল ঃ  সাধারণত মার্চ-এপ্রিল মাস পুঁই চাষের জন্য উপযুক্ত সময়। আগাম চাষ করতে হলে ফেব্র“য়ারি মাসে বীজ বপন করতে হয়। নাবি চাষে মে মাসে চারা বা ডগা কাটিং লাগাতে হয়। বীজ হার ও বীজতলায় চারা তৈরি ঃ ৩ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১ মিটার প্রস্থের ১২টি বেডের জন্য এক কেজি বীজ প্রয়োজন হয়, যা দিয়ে এক হেক্টর জমিতে পুঁই চারা রোপণ করা যায়। ১২-১৫ ঘণ্টা ছিপছিপানো পানিতে ভিজিয়ে রেখে বীজতলায় ১-২  সেন্টিমিটার মাটির গভীরে বীজ বপন করতে হয়। চারার বয়স ৩০-৪০ দিন হলে বা চারার ৩-৫ পাতা হলে ৬০-৮০ সেন্টিমিটার দূরত্বের সারিতে ৫০ সেন্টিমিটার পর পর চারা রোপণ করতে হয়। সরাসরি বেডে বা ক্ষেতে বীজ বপন করে পুঁই চাষ করলে গাছে বৃদ্ধি তুলনামূলক ধীর হয়। সেজন্য বীজতলায় চারা তৈরি করে বেডে বা  ক্ষেতে রোপণ করলে গাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। শাখা কলম দিয়েও পুঁই চাষ করা যায়। তবে বীজ থেকে উৎপন্ন চারা রোপণ করাই ভালো। বর্ষাকালে পুঁই গাছের ডগা  কেটেও রোপণ করা যায়। জমি তৈরি, সার ও সেচ প্রয়োগ ঃ জমি ২-৩টি চাষ দেয়ার পর মই দিয়ে সমান করে ১ মিটার পর পর ২৫-৩০ সেন্টিমিটার নালা রেখে বেড  তৈরি করতে হয়। পুঁই চাষে শুকনো পচা গোবর বা কম্পোস্ট সার ব্যবহার করা ভালো। তবে মাটিতে জৈব পদার্থের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে জৈব সারের সঙ্গে প্রতি শতকে গোবর বা কম্পোস্ট ৪০ কেজি, ইউরিয়া ১ কেজি, টিএসপি ৫০০ গ্রাম ও এমওপি সার ৫০০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হয়। সম্পূর্ণ গোবর বা কম্পোস্ট, অর্ধেক টিএসপি ও পটাশ সার জমি তৈরির সময় এবং বাকি অর্ধেক টিএসপি ও পটাশ সার চারা রোপণের সময় গর্তে দিতে হয়। ইউরিয়া সার রোপণের ৮-১০ দিন পর অথবা চারায় ১-২টি নতুন পাতা গজালে প্রথমবার এবং এরপর ১০-১২ দিন বিরতি দিয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। সার প্রয়োগের পর হালকা সেচ দিতে হয়। লেখক ঃ কৃষিবিদ খোন্দকার মো. মেসবাহুল ইসলাম