চিকিতসক ও রোগীর সম্পর্ক

দেশের চিকিতসাসেবার মানোন্নয়নে এ পেশাকে আগলে রাখতে হবে- কারণ চিকিতসাসেবা আমাদের জন্য জরুরি বিষয়। চিকিতসকের সেবার সঙ্গে মানুষের জীবন রক্ষার বিষয়টি জড়িত। জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার কোনো অধিকার নেই কারও। চিকিতসকরা প্রায়শই রোগীর স্বজনদের হাতে লাঞ্ছিত হন।  দেশে চিকিতসক হত্যার ঘটনাও ঘটে মাঝেমধ্যে। সর্বশেষ পত্রিকান্তে দেখলাম, ভুল চিকিতসার অভিযোগ এনে ১৬ জুন খুলনায় ডা. রকিব নামে এক চিকিতসককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এক অন্তঃসত্ত্বা মায়ের সন্তান প্রসবে চেষ্টা করেন আনাড়ি দাই। তারপর তাকে নগরীর রাইসা ক্লিনিকে নেওয়া হলে দ্রুত সিজারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করেন শিউলি বেগম রাইসা। শিউলি বেগমের রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় তাকে অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় নেওয়ার পথে ওই প্রসূতির মৃত্যু হয়। ভুল চিকিতসায় শিউলি বেগমের মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ করেন তার পরিবারের লোকজন। এ জন্য ডা. রকিবকে দায়ী করে তার ওপর হামলা চালায় রোগীর স্বজনরা। এ ঘটনায় ডা. রকিব মারা গেলে পরিবারের লোকজন খুলনা সদর থানায় একটি মামলা করেন। বরাবরই লক্ষণীয়, বিলম্বিত চিকিতসা গ্রহণ, আনাড়ি দাইয়ের  দোষের দায় চাপানো হয় চিকিতসকের ওপর। সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থা, চিকিতসা সরঞ্জাম এবং লোকবলের অপ্রতুলতার দ্বায় চাপে চিকিতসকদের ওপর। প্রয়োজনীয় চিকিতসাসামগ্রী না দিয়ে করোনাকালীন চিকিতসা করতে গিয়ে আমাদের অনেক চিকিতসক প্রাণ দিয়েছেন। এরপরও চিকিতসা সংকটের দায় যেন কেবল চিকিতসকের। এ দেশে সাধারণ একটি বিষয় হলো- রোগীর মৃত্যু হলে বলা হয় ভুল চিকিতসার কথা। ভুল চিকিতসার বিষয়টি তাতক্ষণিক নির্ণয় করেন রোগীর স্বজন কিংবা সাংবাদিক সাহেবরা। তারপর যা হওয়ার তাই হয়; চিকিতসক লাঞ্ছনা কিংবা আহত-নিহতের ঘটনা। চিকিতসকদের বিরুদ্ধে অপচিকিতসা আর মানুষ মেরে  ফেলার এমন অভিযোগ ওঠে মাঝেমধ্যেই। হাসপাতালে  রোগী মারা গেলে সোজা খুনের দায় চাপে ডাক্তারের ওপর। কথায় কথায় বলা হয় ভুল চিকিতসার কথা। পত্রিকার পাতায় শিরোনাম হয় ‘অমুক হাসপাতালের অমুক ডাক্তারের ভুল চিকিতসায় রোগীর মৃত্যু’। ভুল চিকিতসার নিশ্চিত কীভাবে হন একজন সাংবাদিক কিংবা রোগীর স্বজন। এটাইতো প্রমাণ সাপেক্ষের বিষয়। অসুস্থ মানুষই ডাক্তারের কাছে কিংবা হাসপাতালে আসেন। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা মুমূর্ষু রোগীদের আনা হয় হাসপাতালে। সৃষ্টিকর্তাই জীবনের মালিক। মানুষ কেবল চেষ্টা করে মাত্র। প্রায় ক্ষেত্রেই অসুস্থ মানুষটি মারা গেলে বলা হয় ভুল চিকিসতসার কথা। ব্রেইন  স্ট্রোক, হৃদরোগে আক্রান্ত মানুষতো সব সময়ই মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকেন। হাজারো সমস্যার বাংলাদেশে ভুল চিকিতসা, অপচিকিতসা নেই তা কিন্তু না। কোনো কোনো ডাক্তারও অবহেলা করেন, রোগীদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করেন। এমন অনেক হচ্ছে। তবে সব ডাক্তার কি এমন বাজে কাজগুলোর সঙ্গে জড়িত? ভালো গুণের এবং মানবিকতা সম্পন্ন ডাক্তারের সংখ্যাই এখনো অনেক বেশি। এ দেশে ভুল চিকিতসায় রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। উন্নত বিশ্বেও ভুল চিকিতসার বহু উদাহরণ রয়েছে। তাই বলে সব ঘটনাকেই ভুল চিকিতসা বলে চিকিতসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা সঠিক নয়। তাতে চিকিতসক রোগীর সম্পর্কের অবনতি ঘটবে বৈকি! চিকিতসকরা এ ক্ষেত্রে  রোগীদের জন্য আর ঝুঁকি নিতে চাইবেন না। চিকিতসায় ঝুঁকি নিতেই হয়, নইলে রোগীর জীবন বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা  তৈরি হয়। কথায় কথায় চিকিতসকের গায়ে হাত তোলা, ভুল চিকিতসার অভিযোগ করা, হত্যা করা এমন ঘটনায় ডাক্তাররা রোগীর চিকিতসা দিতে অনুতসাহিত হবেন। যা রোগীদের জন্য সুখকর সংবাদ নয়। এমন বাজে অভিজ্ঞতা নিয়ে অনেক  মেধাবী চিকিতসক এখন দেশ ছাড়ছেন এমন খবরও আমাদের কাছে আছে। এটাও অনেক বড় দুঃসংবাদ বটে!  সেবার শপথ নিয়েই চিকিতসকদের চিকিতসা পেশায় প্রবেশ করতে হয়। এ পেশাটি রাষ্ট্রের অন্যান্য পেশার তুলনায় অনেক বেশি সম্মানের। এটা পেশা হলেও চিকিতসকরা মানুষের জীবন রক্ষায় কাজ করেন বলে এটি মানবসেবার একটি অংশও। এটা অনেকটা নির্দ্বিধায় বলতে হয়, আজকাল এ পেশার কিছু চিকিতসকের কারণে মানবিক চিকিতসকরাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেন। অনেক চিকিতসক তো যারা কখনো রাজনৈতিক, কখনো বা অমানবিক আচরণও করে গোটা চিকিতসক সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। করোনাভাইরাসের এমন সংকটের মধ্যেও হাসপাতালগুলোতে চিকিতসকরা যাচ্ছেন না, চেম্বার করছেন না এমন অভিযোগ ডাক্তারদের বিরুদ্ধে। যা অমানুষিক বটে! আবার বহু চিকিতসক দেশের এই সংকটময় সময়ে রাত-দিন রোগীদের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়ে চিকিতসাপেশা যে মহান তার স্বাক্ষর রাখছেন। জীবন বাজি রেখে কাজ করতে গিয়ে অনেকেই জীবন বিপন্ন করেছেন। রাত-দিন একজন ডাক্তারকে পরিশ্রম করতে হয়।  রোগীর ডাক পড়লেই তার ঘুম হারাম। আর তাকে যদি কথায় কথায় অপচিকিতসা কিংবা খুনের অপবাদ কাঁধে নিয়ে চলতে হয় তাহলে বিষয়টা কি দাঁড়ায়? ভালো কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে তো মানুষ। প্লিজ অপবাদ দেবেন না। অভিযোগ করতে হলে ভেবে করবেন। সঠিকটা করবেন। এ কথা কিন্তু সত্য; আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ছাড়া আমাদের ডাক্তাররা যে চিকিতসা সেবা দিচ্ছেন তা কম নয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেন। কিন্তু এখনও সেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চিকিতসা নিয়ে ভালো হয়ে ঘরে ফিরছেন। সিট সংকুলান না হলে সেখানে ডাক্তারের দোষ কোথায়। যারা বারান্দায় থাকেন তারাও কিন্তু চিকিতসা পান। এখনো আস্থার জায়গা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। হুজুগে বাঙালি আমরা, বুঝেও লড়ি, না বুঝেও লড়ি। কথা বলতে তো সীমা পরিসীমা হারিয়ে ফেলতে ওস্তাদ সবাই। পাঠক বলেন তো, কত জন মানুষের জন্য কত জন ডাক্তার নিয়োজিত আছেন এ দেশে। কত রোগীর চিকিতসার সঙ্গতি আছে এ দেশের হাসপাতালগুলোর। ঢাল-তলোয়ার (ডাক্তার ওষুধ) না দিয়ে চিকিতসা করতে বলবেন- তা কি করে হয়? এক পরিসংখ্যানে এভাবেই উল্লেখ আছে- ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ডিপার্টমেন্টে প্রায় সব ধরনের সার্জারি হয়। মোট ডাক্তারের সংখ্যা ১০০ জন। গত এক বছরে অপারেশন হয়েছে ৬৮০০০ এর মতো। ছুটি বাদ দিয়ে ২৭০ দিন কর্মদিবস থাকলে প্রতিদিন অপারেশন হয়েছে প্রায় ২৫০টি। তার মানে, প্রতিটা সার্জন দিনে অপারেশন করেছেন ২.৫টার মতো। অন্যদিকে সার্জারির আউটডোরে মোট রোগী  দেখা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ। প্রতিদিন প্রায় ২২০০’র মতো। একজন ডাক্তার দেখেছেন প্রতিদিন ২২টা রোগী। লাখ লাখ গরিব মানুষকে সুচিকিতসা দিয়ে তারা তাদের আয়ের মাত্র ১০ শতাংশ পান বেতন হিসেবে। আর এত ঝুঁকি নিয়ে ইনফেকশনের মধ্যেও কাজ করেন, তবুও তারা ঝুঁকি ভাতা পান না। অথচ লোকজন কিছু ঘটলেই ডাক্তারদের গায়ে হাত  তোলে, হাসপাতাল ভাঙচুর করে। অথচ পরিসংখ্যান বলে  যে, ৯৯% সুচিকিতসা হলেও বছরে প্রায় ১০০০ জন রোগী ভুল চিকিতসায় মারা যাওয়ার কথা। কিন্তু ২-৪ জন মারা  গেলেই শুরু হয়ে যায় আমাদের দানবীয় তান্ডব। অথচ আমরা একবারও ভাবি না যে, একজন ডাক্তার ৭ দিন অসুস্থ থাকলে তিনি প্রায় ১৪০ জন রোগীর চিকিতসা ও ১৫ জন  রোগীর অপারেশন করতে পারবেন না। স্কুল-কলেজে যিনি  মেধাবী ছাত্র ছিলেন তারাই একদিন ডাক্তার হয়ে আসেন। সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রটিই আজ সমাজে সম্মান পাচ্ছেন কম। বিবিএস করা একজন চিকিতসক যে মর্যাদা পান কম  মেধাবীসম্পন্ন বিসিএস অন্য প্রশাসনের লোক অনেক বেশি মর্যাদা পান। ঝুঁকি নিয়ে মানুষের জীবন বাঁচানোর কাজ করেও অসম্মানীত হন একজন ডাক্তার। এভাবে চলতে থাকলে ডাক্তাররা আর ঝুঁকি নিতে চাইবেন না। চিকিতসাসেবায় ঝুঁকি নিতে হয়। ঝুঁকি না নিলে মুমূর্ষু রোগীর জন্য ক্ষতির কারণ হয়। কথায় কথায় গায়ে হাত তুললে, মামলা হামলা করলে, ভুল চিকিতসার অপবাদ দিলে ডাক্তাররা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। এটা রোগী কিংবা রোগীর পরিবারের জন্য দুঃসংবাদ বটে! ডাক্তারদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তা কি সত্যি? কতটা সত্যি? ডাক্তারদের বিরুদ্ধে চিকিতসাসেবা না দেওয়ার যে ঢালাও অভিযোগ, তা ষোলোআনা সত্যি নয়। একেবারেই সত্যতা নেই, তা বলছি না। বলছি, অভিযোগের অনেকটাই অসত্য। তবে রোগীর পেটে ব্যান্ডেজ রেখে সেলাই করে  দেওয়াসহ নানা রকমের ভুল চিকিতসার সংবাদ মাঝেমধ্যেই জানা যায়। সংবাদগুলো মিথ্যা নয়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা  নেওয়া উচিত। দেশে অনেক ডাক্তার আছেন দেবতুল্যের মতো। ডাক্তার ধর্ম পালনের মতো করে মনপ্রাণ দিয়ে রোগীর  সেবা করেন। এমন সব ডাক্তারকেও যখন আশঙ্কায় থাকতে হয়,  রোগী মারা গেলে তার ওপর আক্রমণ হতে পারে, হতে পারে হাসপাতাল ভাঙচুর। মস্তিষ্ক, হৃদরোগসহ জটিল অপারেশনে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, আমেরিকা, ইউরোপ সব জায়গায়  রোগী মারা যায়। আমাদের ডাক্তারদের সাফল্যের হার অন্য  যে কোনো দেশের ডাক্তারের চেয়ে কম নয়। তাহলে আমাদের ডাক্তারের ক্ষেত্রে কেন শারীরিক আক্রমণের আশঙ্কা  তৈরি হবে? ভুল চিকিতসার দায়ে অভিযুক্ত হতে হবে কেন আমাদের চিকিতসকদের? বাংলাদেশে অনেক ডাক্তার ভালো চিকিতসা দিচ্ছেন। তাতে তাদের সুনাম শোনা যায় না কখনো। অনেক ভালো, মানবিক ডাক্তার আছেন সারাদেশে। কিছু খারাপ ডাক্তার যারা অনৈতিক বাণিজ্য করছেন তাদের তুলনায় ভালো ও নৈতিকতাসম্পন্ন ডাক্তারের সংখ্যা অনেক অনেক গুণ বেশি। মন্দের জন্য ঘৃণা করেন, সাজার ব্যবস্থা করেন এটা সমর্থন করি। ভালো যারা করছেন তাদের গুণকীর্তনও কিন্তু করা দরকার। পরিশেষে এটাই বলব, চিকিতসকের এ মহান পেশাটা যেন কোনোভাবে কলুষিত না হয়। দেশের চিকিতসাসেবার মানোন্নয়নে এ পেশাকে আগলে রাখতে হবে- কারণ চিকিতসাসেবা আমাদের জন্য জরুরি বিষয়। চিকিতসকের সেবার সঙ্গে মানুষের জীবন রক্ষার বিষয়টি জড়িত। জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার কোনো অধিকার নেই কারও। চিকিতসকদের মাঝে নীতিনিষ্ঠা, মানবিকতা, সদাচার, কর্তব্যপরায়ণতা- এসবগুণের বেশি পূজারী হওয়ার কথা। অনেক চিকিতসক এমনটাই। এ জন্য অবশ্য আপনাদের ক’জন ডাক্তারকে সম্প্রতি করোনা সংকটকালীন সময়ে জীবনও দিতে হয়েছে। চিকিতসাপেশাটা তো এমনই। আর এমনটা হওয়াই উচিত। রোগী এবং রোগীর স্বজন,  ক্ষেত্রভেদে চিকিতসকদের কারণে ডাক্তার-রোগীর মধ্যে দূরত্ব  তৈরি হয়েছে। এ দূরত্ব কমিয়ে চিকিতসক-রোগীর মাঝে বন্ধুত্বের সম্পর্ক বিদ্যমান রাখা দরকার। চিকিতসক, রাগী এবং রোগীর স্বজনরাই তা করবেন। রোগী-ডাক্তার সম্পর্ক অটুট থাকবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা। লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলাম লেখক

নদী ও বন্যাব্যবস্থাপনায় চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা

নদনদীশূন্য বা পানিশূন্য নদনদীর বাংলাদেশ, চিন্তাই করা যায় না। নদীর দেশ বাংলাদেশ বাঁচাতে হলে আগে নদী বাঁচাতে হবে; বাংলাদেশের উন্নয়ন টেকসই করতে হলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদীভিত্তিক অর্থনীতিতে জোর দিতে হবে। এর জন্যই নদী ও বন্যাব্যবস্থাপনা বাংলাদেশে খুবই প্রয়োজন। বন্যা ও নদীব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ চীন বাংলাদেশকে নদী ও বন্যাব্যবস্থাপনায় আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিতে এগিয়ে এসেছে এটা সুখবর। নদী ও বন্যাব্যবস্থাপনায় চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা বাংলাদেশ চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশে ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার খবর বেরিয়েছে। সংবাদ মাধ্যমের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী তিস্তা প্রকল্পের জন্য ৮৫৩ মিলিয়ন ডলার অর্থসাহায্য চেয়েছিলেন চীনের কাছে। চীন অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবে রাজি হয়েছে। এর ফলে চলতি বছরের ডিসেম্বরে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে তিস্তা অববাহিকায় শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে চাষাবাদ ব্যাহতের, বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙন, বন্যার সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। তিস্তা অববাহিকা অঞ্চলে পর্যটন কেন্দ্র, অর্থনৈতিক জোন গড়ে উঠবে- এতে অত্র অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটবে, ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ছোট-বড় অসংখ্য নদী বাংলাদেশে বহমান সুপ্রাচীনকাল থেকে। বাংলাদেশের মতো নদীবহুল দেশে নদী রক্ষা ও নদীর পানি ব্যবহারের সুপরিকল্পিত পরিকল্পনার আবশ্যকীয়তা বলা প্রয়োজন পড়ে না। শুধু তিস্তা নদীর ক্ষেত্রেই নয়- বাংলাদেশের বড় বড় নদীগুলোর ক্ষেত্রেও অনুরূপ প্রকল্প গ্রহণ করে দ্রম্নত বাস্তবায়ন করা দরকার। দেশে বহমান নদ-নদীগুলো রক্ষা, নদ-নদীগুলোর পানি সারা বছর চাহিদা অনুযায়ী ব্যবহারের জন্য সুপরিকল্পিত পরিকল্পনার আবশ্যকীয়তা বাংলাদেশ বহুদিন ধরে উপলব্ধি করলেও কারিগরি জ্ঞান ও প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সক্ষম হচ্ছে না। শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানি প্রাপ্যতা নিশ্চিত, বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও নদীভাঙন থেকে পদ্মাপারের জনপদ রক্ষার লক্ষ্যে পাকিস্তান আমলে গ্রহণ করা ‘গঙ্গা ব্যারেজ’ প্রকল্প আজও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি কারিগরি সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থানের অভাবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো পরিকল্পিত নদীব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে সক্ষম হওয়ায় বন্যা, নদীভাঙনের ক্ষতি থেকেই রক্ষা শুধু পাচ্ছে না, দেশজুড়ে সাশ্রয়ী যোগাযোগের নৌপথ চালু, শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি চাহিদামতো ব্যবহার করে অধিক শস্য উৎপাদন করতেও সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ নদীবহুল দেশ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই নদীনির্ভর। নদীনির্ভর দেশ হয়েও বাংলাদেশ পরিকল্পিত নদীব্যবস্থাপনা এত দিনেও গড়ে তুলতে না পারা দুর্ভাগ্যই। বাংলাদেশে প্রতি বছরই ছোট-বড় বন্যা হয়। এ সব বন্যায় ফসলহানিসহ সহায়-সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। নদীভাঙন বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা। নদীভাঙনে প্রতি বছর শ শ হেক্টর ভূমি নদীতে বিলীন হয়; এতে প্রতি বছর বিপুল মানুষ ভূমিহীনের তালিকায় যুক্ত হয়। উজানে বাঁধ দিয়ে ভারত বাংলাদেশ অভিমুখী নদ-নদীগুলোর পানি আটকিয়ে রাখার কারণে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ে। এ কারণে বাংলাদেশের বিস্তৃর্ণ অঞ্চলের চাষাবাস, জীববৈচিত্র্য-মৎস্য সম্পদের ক্ষতিসহ নদীর নাব্য হ্রাস, ভূগর্ভের পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, নদীপথ বিলীনজনিত ক্ষতির শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ যুগ যুগ ধরে। বাংলাদেশে বহমান নদীগুলো বাঁচিয়ে রাখা এবং নদীর পানি সারা বছর প্রয়োজনমতো ব্যবহার নিশ্চিত করে- এমন পরিকল্পনা দ্রম্নত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন বাংলাদেশের জন্য জরুরি তা বলা নিষ্প্রয়োজন। দেশে বহমান নদ-নদীগুলোকে রক্ষা, বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহার নিশ্চিতের জন্য কেন্দ্রীয় নদীব্যবস্থাপনা ‘আন্তঃনদীব্যবস্থাপনা’ গড়ে তোলার কথা ভাবতে হবে বাংলাদেশকে। ‘আন্তঃনদীব্যবস্থাপনা’ হলে নদ-নদীর অবদানে বাংলাদেশ অল্প সময়ের মধ্যেই আত্মনির্ভর অর্থনীতির দেশে পরিণত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে বন্যা, নদীভাঙন, শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে শস্য উৎপাদন ব্যাহতের, নৌপথ সংকুচিতের ক্ষতিসহ উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে জলবায়ু, পরিবেশ-প্রতিবেশের যে ক্ষতি হয় তা না হলে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশগুলোর একটি হতো বহু আগেই। যেহেতু বাংলাদেশের আধুনিক নদীব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয় কারিগরি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা নেই সে কারণে বন্ধু দেশ বা দেশগুলোর সাহায্য-সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তিস্তা নদী রক্ষা, তিস্তা নদীর ভাঙন রোধ, তিস্তা অববাহিকায় বর্ষা মৌসুমে ভারত গজলডোবা বাঁধের গেট খুলে দেওয়ার কারণে তিস্তায় দেখা দেয় বন্যা; শুষ্ক মৌসুমে গজলডোবা বাঁধের গেট আটকিয়ে পানি ধরে রাখার কারণে দেখা দেওয়া পানিসংকট থেকে পরিত্রাণের চিন্তাই সরকার তিস্তা নদী কেন্দ্রিক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ এবং এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের সাহায্য-সহযোগিতা চেয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। সরকারের এ সিদ্ধান্ত যথাযথ। নদীব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তার সক্ষমতা চীনের রয়েছে। নদীব্যবস্থাপনায় চীনের সাফল্য বিশ্বে উদাহরণ। হোয়াংহো নদীকে এক সময় বলা হতো চীনের দুঃখ। চীনের দুঃখখ্যাত হোয়াংহো নদীকে আশীর্বাদে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে চীন পরিকল্পনা মাফিক ব্যবহার করার মাধ্যমে। চীনের ওপর দিয়ে বইছে বিশ্বের তৃতীয় দীর্ঘতম নদী ইয়াংজি। চীনের পাঁচটি প্রদেশ ইয়াংজি নদীর পানিতে পস্নাবিত হয়। পরিকল্পনার মাধ্যমে পস্নাবিত এলাকাগুলোর বন্যা নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছে চীন। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম নদ ব্রহ্মপুত্র। এ নদ চীনে ‘ইয়ারলুং সাংপো নামে পরিচিত। পর্বতাঞ্চলে অবস্থিত ‘ইয়ারলুং সাংপো’ নদের উপর বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চীন। নদীব্যবস্থাপনায় চীনের অভিজ্ঞতা ও সাফল্য তাক লাগানো। চীন বন্ধুপ্রতিম বাংলাদেশকে নদীব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে সাহায্য-সহযোগিতা দিলে বাংলাদেশের বহুদিনের আশা পূরণ হবে। চীন বাংলাদেশকে বিভিন্ন খাতে সাহায্য-সহায়তা করছে দীর্ঘদিন ধরে। ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনৈতিক, প্রতিরক্ষা খাতে চীনের সাহায্য-সহযোগিতার সুফল বাংলাদেশ পাচ্ছে। সম্প্রতি চীন বাংলাদেশকে শূন্য শুল্কে ৯৭ শতাংশ পণ্য রপ্তানির সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এ সুযোগ বাংলাদেশ কাজে লাগাতে সক্ষম হলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য কয়েক বছরের মধ্যে কয়েকগুণ বাড়বে। বাংলাদেশের বলা যায় সব মেগাপ্রকল্পই বাস্তবায়ন হচ্ছে চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায়। করোনা সংকটেও বাংলাদেশকে চীন সহায়তা দিয়েছে। নদী রক্ষা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদীর পানি সারা বছর চাহিদামতো ব্যবহারের ব্যবস্থা করে দেওয়ার ক্ষেত্রে নদী ও বন্যাব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ চীনের সাহায্য-সহযোগিতা বাংলাদেশ যদি পায় তাহলে তা হবে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের জন্য গ্রেট অপরচুনিটি। চীন বাংলাদেশকে নদী ও বন্যাব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা দিতে আন্তরিকভাবে আগ্রহীও। গতবছর অনুষ্ঠিত ‘ হ্যান্ডওভার সেরিমনি অব দ্য পস্ন্যানিং ফর ফ্ল্যাড ম্যানেজমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে চীনা অনুদানে সম্পাদিত সমীক্ষাভিত্তিক বাংলাদেশের বন্যাব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত। বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর গতি-প্রকৃতি, অবস্থা, বাংলাদেশের বন্যা নিয়ে চীনের স্ট্যাডি রয়েছে তা প্রমাণ করে বাংলাদেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণের কলা-কৌশল বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তরের ঘটনায়। নদীব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ চীন বাংলাদেশকে নদী ও বন্যাব্যবস্থাপনায় আর্থিক-কারিগরি সাহায্য-সহায়তা দিতে এগিয়ে আসা বাংলাদেশের জন্য দরজায় কড়া নাড়ার মতো। নদ-নদী বাংলাদেশের প্রাণ। নদ-নদী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো একে একে মরে যাচ্ছে, বাংলাদেশ মরুভূমিতে পরিণত হতে যাচ্ছে উজানে বাঁধ দিয়ে পানি আটকিয়ে রাখার কারণে; আবার বর্ষাকালে বাংলাদেশ পানিতে ভাসছে উজানে নির্মিত বাঁধের ফটকগুলো খুলে দেওয়ার কারণে। এর থেকে রক্ষার উপায় বাংলাদেশকে খুঁজতে হবে অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই। বাংলাদেশের নদী ও বন্যাব্যবস্থাপনায় চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা পেলে বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া- হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হওয়া নদ-নদীগুলো আবারও পূর্বাবস্থায় ফিরে আসবে; সেই সঙ্গে নদীভাঙনসহ বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে আসা পানির কারণে দেখা দেওয়া বন্যার ক্ষতি থেকেও বাংলাদেশ রক্ষা পাবে। মানবদেহে শিরা-উপশিরা যেভাবে ছড়িয়ে আছে অনেকটা তেমনিভাবে নদ-নদীগুলো বাংলাদেশের ভূমির ওপর ছড়িয়ে আছে। মানব-দেহের শিরা-উপশিরা শুকিয়ে গেলে মানবের মৃত্যু যেমন অবধারিত হয়ে যায়, তেমনি বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো শুকিয়ে গেলে বাংলাদেশ নামের দেশটির মৃত্যুও অবধারিত হবে। সুপ্রচীনকাল থেকেই বাংলাদেশের মানুষের জীবন-জীবিকা, জীবনাচার, আবহাওয়া-জলবায়ু, জীববৈচিত্র্য, কৃষ্টির সঙ্গে নদ-নদীর ওতপ্রোত সম্পর্ক। নদনদীশূন্য বা পানিশূন্য নদনদীর বাংলাদেশ, চিন্তাই করা যায় না। নদীর দেশ বাংলাদেশ বাঁচাতে হলে আগে নদী বাঁচাতে হবে; বাংলাদেশের উন্নয়ন টেকসই করতে হলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদীভিত্তিক অর্থনীতিতে জোর দিতে হবে। এর জন্যই নদী ও বন্যাব্যবস্থাপনা বাংলাদেশে খুবই প্রয়োজন। বন্যা ও নদীব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ চীন বাংলাদেশকে নদী ও বন্যাব্যবস্থাপনায় আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিতে এগিয়ে এসেছে এটা সুখবর। জহির চৌধুরী : কলাম লেখক

 

 

শিক্ষায় সংখ্যা নয়, মানোন্নয়ন জরুরি

দেশে শিক্ষাব্যবস্থা সামগ্রিক অর্থে নিশানাবিহীন হয়ে পড়েছে। স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন করে স্বাধীন বাংলাদেশের জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু পঁচাত্তরের নরঘাতকদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে জাতির জনকের নিহত হওয়ার পর স্বাধীন বাংলাদেশ উল্টাপথে ধাবিত হতে থাকে। সব কিছুর সঙ্গে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষাব্যবস্থা। তারপর একের পর এক কমিশন গঠিত হয়। শিক্ষাব্যবস্থা সর্বক্ষেত্রে মেধাশূন্য হয়ে পড়ে। প্রাথমিক স্তরে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে। দেশে যার যেমন খুশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করতে থাকে। শিক্ষায় শক্তিশালীভাবে অনুপ্রবেশ করেছে বাণিজ্যিক মনোভাব। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে সরকারের পাশাপাশি ব্যাঙের ছাতার মতো দেশের আনাচে-কানাচে বাংলা, ইংরেজি ও আরবি ভাষায় অগণিত বিদ্যালয়-কলেজ স্থাপিত হয়েছে। আরবি ও ইংরেজি মিডিয়ামে যে কত ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে তার কোনো হিসাব জানা নেই। সেখানেই শেষ নয়, বাসায় বাসায় ব্যবসা-বাণিজ্যের লালসায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে। এযাবৎ ১০৬টির অধিক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। সেখানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুধু সার্টিফিকেট বিক্রি হচ্ছে। এমনকি ঊঊঊ–এর মতো অনেক ডিগ্রি আছে, যা সপ্তাহে শুক্রবার ও শনিবার চার-পাঁচটি ক্লাস নিয়ে কোর্স সম্পন্ন করে সার্টিফিকেট দেওয়া হচ্ছে। দেশে শুধু সার্টিফিকেটধারী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশির ভাগের অবস্থা খুবই নাজুক। শিক্ষার মানোন্নয়ন বা মেধা সৃষ্টি প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। রিজিওনাল বা ইন্টারন্যাশনাল কোনো মাপকাঠিতেই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম এক হাজারের নিচে। যেখানে ভারত, নেপাল, মালয়েশিয়া এমনকি পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যলয় -এ স্থান করে নিচ্ছে। মেধা ও জ্ঞান বিকাশের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না করে ও শিক্ষার মানোন্নয়ন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না করে যেমন খুশি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা বিস্তার সম্প্রসারণ আর মেধা সৃষ্টির বিকাশ একসঙ্গে চলতে পারে না। দেশে বর্তমানে ৫৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে জেনারেল বিশ্ববিদ্যালয় ১৫টি, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আটটি, মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় পাঁচটি, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় পাঁচটি, বিজ্ঞান ও প্রযুুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ১৫টি, স্পেশালাইজড বিশ্ববিদ্যালয় চারটি, অফ ক্যাম্পাস বিশ্ববিদ্যালয় তিনটি। এগুলোর মধ্যে আটটি বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিবিষয়ক ডিগ্রি প্রদান করা হচ্ছে। পত্রপত্রিকার তথ্য মতে, আরো চারটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বছর দুই আগে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হয়েছে, যেখানে কোনো ভৌত অবকাঠামো তৈরির আগেই ছাত্র ভর্তি করা হয়। বাংলাদেশে যেসব পুরনো কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আছে তার মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে পুরনো, যেটি ১৯৬১ সালে স্থাপিত হয়েছে। সেখানেও অদ্যাবধি পর্যাপ্ত আধুনিক গবেষণাগার তৈরি সম্ভব হয়নি। নানা প্রতিবন্ধকতা ও সুযোগের অভাবে মানসম্পন্ন লেখাপড়া নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। উচ্চশিক্ষায় মেধা সৃষ্টি দেশের মূল চালিকাশক্তি। বিজ্ঞানভিত্তিক মেধা সৃষ্টি না হলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকৃত। ক্রমবর্ধমান জ্ঞানচালিত বিশ্ব অর্থনীতিতে টিকে থাকতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা এবং পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির প্রয়োজন। কাজেই এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে উচ্চশিক্ষায় মেধা সৃষ্টিই দেশের সার্বিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। অথচ আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মানোন্নয়নের বাস্তব কোনো পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বিগত প্রায় ছয়-সাত বছর ধরে বিশ্বব্যাংকের ঋণের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে অপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হেকেপ প্রকল্পের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব মেধা সৃষ্টিতে পড়েছে বলে অনেকেই মনে করেন না। আমাদের বড় সমস্যা হলো, কারো কোনো দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহি নেই কোনো ক্ষেত্রেই। নেই ছাত্র-শিক্ষক মূল্যায়নের উপযুক্ত পদ্ধতি। কৃষি একটি উচ্চতর বিজ্ঞান। সাধারণ বিজ্ঞানের মতো নয়। কৃষিশিক্ষায় দক্ষতা বাড়াতে যেমন আন্ত গবেষণাগার প্রয়োজন, তেমনি মাঠ গবেষণাগারও অত্যন্ত জরুরি। বতর্মানে যে আটটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আছে তাতে মেধা সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত জরুরি উপাদানগুলোও নেই। শিক্ষকের অপ্রতুলতা, শিক্ষার আধুনিক টুলসসহ সব ধরনের যন্ত্রপাতির অপ্রাপ্ততা বিরাজমান। এ ছাড়া দেশের সব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েরও মান ও মেধা নিয়ন্ত্রণের জন্য যে বিষয়গুলো বিশ্বের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিংয়ে ব্যবহার করা হয় তার প্রায় সবগুলো ফ্যাক্টরই নিদারুণভাবে উপেক্ষিত, যেমন—একাডেমিক খ্যাতি ৪০, চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের খ্যাতি ১০, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ২০, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক ১০, শিক্ষকদের গবেষণার উদ্ধৃতি ৫, গবেষণার পেপার উদ্ধৃতি ৫, আন্তর্জাতিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ৫+৫=১০, পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক সংখ্যা ৫। বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই এসবের তোয়াক্কা করে না বা চিন্তা-চেতনার মধ্যেও আছে বলে মনে হয় না। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা আরো করুণ। দেশে বর্তমানে আটটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। তাদের মধ্যে বেশির ভাগেই যথেষ্ট গবেষণাগার ও ফিল্ড ল্যাব নেই, লেখাপড়াসংক্রান্ত আধুনিক ডিজিটাল প্রযুুক্তিরও অভাব। বর্তমানে সব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর প্রায় চার হাজার গ্র্যাজুয়েট বের হয়। বিভিন্ন কারণেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন মেধাবী গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা যাচ্ছে না। উচ্চতর শিক্ষায় মেধা সৃষ্টি করতে না পারলে দেশের কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা অগ্রসর হতে পারব না। শোনা যাচ্ছে, আরো চার-পাঁচটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা হবে। সংগত কারণেই নতুন কোনো কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় না খুলে বর্তমানে যা আছে সেগুলো আরো সমৃদ্ধ করা দরকার। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে আগামী ৫০ বছরে দেশের কোথায় কতজন কৃষিবিজ্ঞানী প্রয়োজন হবে তা নির্ধারণ করে সে মোতাবেকই কৃষি গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে হবে। যদি আরো অধিকসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট দরকার হয়, তবে নতুন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় না খুলে নির্বাচিত কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সব সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। তাতে সরকারের যেমন অনেক সাশ্রয় হবে, একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুণগত মানও বাড়বে। এই মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে মেধাসম্পন্ন বিশ্বমানের গ্র্যাজুয়েট তৈরির ওপর জোর দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, এখন বিশ্বে চরম প্রতিযোগিতার সময়, বিশ্ব র্যাংকিংয়ে স্থান করতে না পারলে বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাবে না। কাজেই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে কিউএস র্যাংকিংয়ের জন্য নির্ধারিত যে ফ্যাক্টরগুলো আছে, তা যাতে যথাযথ প্রয়োগ করা যায় সে পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সব স্তরে জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা না গেলে কোথাও কোনো উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। প্রাইভেট সেক্টরে সার্টিফিকেট বিক্রির যে হিড়িক পড়েছে তার লাগাম টেনে ধরতে হবে। কাজেই বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি না করে মেধা ও মান বাড়ানোই সময়ের দাবি। লেখক : সাবেক উপাচার্য, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অধ্যাপক, পশু প্রজনন ও কৌলিবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

খাদ্য নিরাপত্তায় আমাদের করণীয়

করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা দেখছে জাতিসংঘ। সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ মাক্সিমো টোরেটো এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে বিভিন্ন দেশের সরকারের নেয়া সংরক্ষণশীল পদক্ষেপের কারণে এ সংকট দেখা দিতে পারে। তিনি বলেছেন, ফলন ভালোই হয়েছে এবং প্রধান খাদ্যশস্যের ফলন বেশ আশাব্যঞ্জক পর্যায়ে ছিল। তবে করোনাভাইরাসজনিত সংকটের কারণে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের স্বল্পতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সংরক্ষণবাদী পদক্ষেপ হিসেবে আমদানি-রফতানি নিষিদ্ধ করায় সামনের দিনগুলোয় সমস্যা দেখা দিতে পারে। তার মতে, এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ যেটা ঘটতে পারে তা হল বিভিন্ন দেশের সরকার কর্তৃক খাদ্য প্রবাহে বিধিনিষেধ আরোপ। তিনি এমন বিধিনিষেধ কিংবা বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা আরোপের বিরোধিতা করে বিশ্বজুড়ে খাদ্য প্রবাহের সুরক্ষা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে সৃষ্ট শঙ্কা এবং এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কী করণীয়, তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য। বিশ্ব যে একটি ‘গে¬াবাল ভিলেজ’- এমন ধারণা এ মুহূর্তে অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। করোনায় আক্রান্ত প্রায় সব দেশই নিজেদের জনগণকে সুরক্ষা দিতে নিয়েছে সংরক্ষণশীল পদক্ষেপ। বেশিরভাগ দেশ ভিসা প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ব্যবস্থা প্রায়ই বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে স্টেডিয়ামের খেলা থেকে শুরু করে বড় বড় সব বৈশ্বিক আয়োজন। অর্থাৎ অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে গোটা বিশ্ব। করোনার প্রভাব পড়েছে বিশ্ব বাণিজ্যে। বিশ্বব্যাপী আমদানি-রফতানি হ্রাস পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক ব্যাংকিং ও হোল্ডিং কোম্পানি জেপি মর্গা বলেছে, পরপর আগামী দুই প্রান্তিকে বিশ্ব অর্থনীতিতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা দেবে করোনাভাইরাসের প্রভাবে। চলতি বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০১৯ সালের চেয়ে অর্ধেক কমে যাবে, জানিয়েছে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সংগঠন ওইসিডি। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে করোনাভাইরাসের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ৩৫টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশকে রাখা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের কারণে চীনের মধ্যবর্তী পণ্য রফতানি দুই শতাংশ কমলে যে ৩৫টি দেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বাংলাদেশ তার একটি। করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাকশিল্প খাত, কাঠ ও আসবাবশিল্প এবং চামড়াশিল্পে ক্ষতির আশঙ্কা করছে জাতিসংঘ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের অর্থনীতি শ¬থ হওয়ায় বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে চামড়াশিল্পে। এ শিল্পে ১৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বস্ত্র ও আসবাবপত্র শিল্পে এক মিলিয়ন ডলার করে ক্ষতি হতে পারে। এদিকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের শিল্প ও বাণিজ্যের ১৪টি খাত করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পোশাক খাতের অ্যাক্সেসরিজ, প্রসাধন, বৈদ্যুতিক পণ্য, পাট সুতা, মুদ্রণ শিল্প, চিকিৎসা সরঞ্জাম, চশমা, কম্পিউটার ও যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক পণ্য, কাঁকড়া ও কুঁচে এবং প¬াস্টিক শিল্প। এখন বৈশ্বিক খাদ্য সংকট প্রসঙ্গে ফেরা যাক। করোনাভাইরাসের শেষ কোথায় এবং মানুষ কবে নাগাদ তাদের স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনে ফিরতে পারবে- এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর এ মুহূর্তে কারও জানা নেই। কেউ বলছেন, আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা কমে এলেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পুরোপুরি শেষ হতে অনেক সময় নেবে। আবার কেউ বলছেন, এ সময় সম্ভবত কয়েক বছর পর্যন্ত হতে পারে। বৈশ্বিক করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব চলাকালে বৈশ্বিক খাদ্যের সরবরাহ ও চাহিদা নিয়ে এফএও’র কিছু ধারণা প্রকাশিত হয়েছে। সরবরাহের দিক থেকে এগুলো হল- ক. এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান না হলেও খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পাওয়া; খ. আগামী এপ্রিল- মে মাসে খাদ্য সরবরাহ চেইন বা প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়া; গ. শ্রমিক স্বল্পতার কারণে খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ, বিশেষ করে শ্রমিকনির্ভর শস্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ ব্যাহত হওয়া। ঘ. গবাদিপশুর খাদ্যের অভাব এবং পর্যাপ্ত শ্রমিকের অভাবে কসাইখানাগুলোর পুরোপুরি সদ্ব্যবহার না হওয়ায় মাংস উৎপাদন কমে যাওয়া; ঙ. যানবাহন নিয়ন্ত্রণ প্রবণতা ও সঙ্গনিরোধ পদক্ষেপগুলোর ফলে বাজারে কৃষকদের আগমনে বাধা সৃষ্টি হওয়া এবং বিক্রয় ব্যবস্থা ভেঙে পড়া; চ. যানবাহন গমনাগমনের পথ বন্ধের ফলে নতুন খাদ্যের সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়াসহ খাদ্যের অপচয় বৃদ্ধি। চাহিদার দিক থেকে এগুলো হল- ক. করোনাভাইরাস বিস্তারের শুরুর দিকে খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধি; খ. অনানুপাতিক হারে মাংসের ব্যবহার কমে যাওয়া; গ. ছোঁয়াচে ভীতিতে খাবার বাজারে ক্রেতাদের যাতায়াত কমে যাওয়ায় খাদ্য ভোগ হ্রাস পাওয়া; ঘ. খাদ্য বিক্রয়ের ধরনে পরিবর্তন আসা। যেমন ই-কমার্সের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ এবং বাড়িতে খাবার খাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে রেস্তোরাঁয় খদ্দের হ্রাস; ঙ. খাদ্য আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য বড় সমস্যা সৃষ্টি হওয়া। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এফএও’র এসব ধারণার কিছু কিছু ইতিমধ্যে বাস্তবরূপ নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কাজাখস্তান ইতিমধ্যেই গমের আটা রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে এবং শাকসবজি রফতানির ওপর সীমা আরোপ করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গম রফতানিকারক রাশিয়া পণ্যটির রফতানিতে সীমা আরোপ করতে পারে।  বৈশ্বিক চাল রফতানিতে শীর্ষ দেশ ভারত এরই মধ্যে তিন সপ্তাহের লকডাউনে চলে গেছে। ফলে ভারত থেকে পণ্যটির সরবরাহ চ্যানেল এখন থমকে দাঁড়িয়েছে। ভিয়েতনাম চাল রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। একই পথে হাঁটতে পারে থাইল্যান্ডও। রফতানি সীমাবদ্ধতার কারণে বাড়ছে চালের দাম। উলে¬খ্য, এর আগে ২০০৮ সালের খাদ্য সংকটকালে চালের মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছিল টনপ্রতি ১ হাজার ডলারের কাছাকাছি। সে সময় রফতানিতে সীমা আরোপ এবং আতঙ্কে ক্রয়প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছিল পণ্যটির মূল্য। রাশিয়ার ভেজিটেবল অয়েল ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে সূর্যমুখীর বীজ রফতানিতে সীমা আরোপের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাম অয়েলের দ্বিতীয় শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশ মালয়েশিয়ায় পণ্যটি উৎপাদনের গতিও এখন বেশ শ¬থ হয়ে এসেছে। বিপরীতে আমদানিকারক দেশগুলোয় খাদ্যপণ্যের চাহিদাও এখন বাড়তির দিকে। ইরাকে গঠিত এক ‘ক্রাইসিস কমিটি’ দেশটিতে কৌশলগত খাদ্য মজুদ গড়ে তোলার সুপারিশ জানিয়েছে। এর ভিত্তিতে দেশটি এরই মধ্যে ১০ লাখ টন গম ও আড়াই লাখ টন চাল আমদানির প্রয়োজনীয়তার কথা ঘোষণা দিয়েছে। চাল আমদানিকারক দেশ ফিলিপাইনে মাত্র দু’মাসের চাল মজুদ আছে। চালের বাণিজ্য দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির হয়ে থাকলে ফিলিপাইনসহ এশিয়া ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশ নাজুক অবস্থায় পড়বে। শীর্ষ আমদানিকারক ইন্দোনেশিয়াসহ এশিয়ার বড় আমদানিকারক দেশগুলোর হাতে জুন পর্যন্ত গমের মজুদ আছে। এখন প্রশ্ন হল, এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কী করণীয়? এটা ঠিক, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে আমাদের প্রধান খাদ্য চালের উৎপাদন সন্তোষজনক হওয়ায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী গত অর্থবছরে সরকারি-বেসরকারি খাতে পণ্যটির আমদানি মাত্র ২ লাখ ৫ হাজার টনে সীমাবদ্ধ থাকে। চলতি অর্থবছরেও চাল উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা আমনের উৎপাদন ভালো হয়েছে। কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাকের মতে সদ্য সমাপ্ত আমনের উৎপাদন গত অর্থছরের উৎপাদনকে (১ কোটি ৫৩ লাখ টন) ছাড়িয়ে যাবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ২৩ মার্চ পর্যন্ত শুধু বেসরকারি খাতে ৪ হাজার ১৮ টন চাল আমদানি হয়েছে। চাল উৎপাদনে শীর্ষস্থানে থাকা আসন্ন বোরো ফসলের উৎপাদন সন্তোষজনক হবে বলে আশা করা যায়, যদি না ২০১৭ সালের মতো আগাম বন্যায় হাওরাঞ্চলের বোরো ফসল অথবা ঘূর্ণিঝড় বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশের অন্যত্র ফসলটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চাল উৎপাদনে আমরা স্বনির্ভরতার কাছাকাছি পৌঁছলেও পণ্যটির আমদানির প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি। করোনাভাইরাসের জন্য শীর্ষ রফতানিকারক দেশগুলো থেকে পণ্যটির রফতানি বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়ার শঙ্কায় চাল আমদানির বর্তমান উচ্চহারের শুল্ক কিছুটা হ্রাস করে বেসরকারি খাতে দুই লাখ টন চাল আমদানির উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। খাদ্যশস্যের চাহিদায় দ্বিতীয় স্থানে আছে গম। পণ্যটির বার্ষিক চাহিদা কমবেশি ৭০ লাখ টন। আমরা উৎপাদন করি ১২ থেকে ১৩ লাখ টন। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ২৩ মার্চ পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি খাতে ৫১ লাখ ৭৮ হাজার টন গম আমদানি করা হয়েছে। রফতানিকারক দেশগুলো থেকে পণ্যটির রফতানি সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং বড় বড় আমদানিকারক দেশগুলোর বাড়তি চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় অবশিষ্ট গম আমদানি ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন। মাংস, ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি, গুঁড়োদুধ, ফলমূল, পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ বিভিন্ন মসলায় আমরা বহুলাংশে আমদানিনির্ভর। এসব খাদ্যপণ্যের নিরাপত্তা মজুদ গড়ে তুলতে এখনই পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। খাদ্যনিরাপত্তার সংজ্ঞানুযায়ী তখনই খাদ্যনিরাপত্তা বিরাজমান যখন সবার কর্মক্ষম, স্বাস্থ্যকর ও উৎপাদনমুখী জীবনযাপনের জন্য সবসময় পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরাপদ এবং পুষ্টি মানসম্পন্ন খাদ্যের লভ্যতা ও প্রাপ্তির ক্ষমতা বিদ্যমান থাকে। এ সংজ্ঞানুযায়ী বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান মোটেই সন্তোষজনক নয়। সবশেষে বলতে চাই, বৈশ্বিক করোনাভাইরাসের কারণে খাদ্য রফতানিকারক দেশগুলোর খাদ্যপণ্য রফতানিতে রক্ষণাত্মক মনোভাবের কারণে কমপক্ষে আগামী ছয় থেকে নয় মাসের জন্য খাদ্যপণ্যের সন্তোষজনক মজুদ গড়ে তুলতে সরকারকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। লেখক ঃ সাবেক খাদ্য সচিব।

 

পেঁয়াজের ঝাঁজ ঃ অভিজ্ঞতা ও অভ্যাস

ভারত কর্তৃক হঠাৎ পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণার পর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অস্থির ও আতঙ্কগ্রস্ত চেহারা এবং বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রপ্তানির পর ভারতের মানুুষের মধ্যে আবেগ-উত্তেজনার যে উৎসাহব্যঞ্জক  চেহারা দেখা গেছে তার তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে ‘রাজনীতির’ (!) পক্ষে আরো একটু মানবিক হয়ে ওঠার পটভূমি তৈরি করে দেয়। আমরা মনে করি, সাধারণের দেহভঙ্গি দেখেও রাজনৈতিক কিংবা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অবকাশ থাকে। গত বছর সর্বোচ্চ মূল্যে পেঁয়াজ কেনার ‘অভিজ্ঞতা’ আমাদের হয়েছিল। এ বছরও পেঁয়াজের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী। তবে কি গত বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের প্রতি বছরের ‘অভ্যাসে’ পরিণত হতে চলেছে! প্রতি বছর বর্ষা আসে, বন্যা হয়। বর্ষা-বন্যার অজুহাতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। বাড়তে বাড়তে সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। গত বছর অন্যান্য নিত্যপণ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাত্রাহীন বেড়ে গিয়েছিল পেঁয়াজের দাম। এবারো বর্ষা এসেছে, বন্যা এসেছে। চারদিকে থৈ থৈ পানি আর পানি দেখেছি। দেখেছি মানুষের অথৈ দুর্ভোগ। চারদিকে পানি কিন্তু এরই মধ্যে পেঁয়াজের বাজারে ক্রমবর্ধনশীল দাউ দাউ ‘আগুন’! প্রতি বছর বন্যার কারণে পেঁয়াজের দাম বাড়ে, এবারো বেড়েছে। এমনকি একদিনেই কয়েক দফা দাম বৃদ্ধির খবরও আমরা শুনেছি! গত বছরও ঠিক এ রকম মৌসুমেই পেঁয়াজ এতই মূল্যবান ও মহার্ঘ্য হয়ে উঠেছিল যে, সাধারণ মানুষ পেঁয়াজের সঙ্গে সহজে সাক্ষাৎ করতে পারেনি। পেঁয়াজকে কেন্দ্র করে আমরাও আবার নানা মাত্রিক ‘ডিসকোর্স’ শুরু করে দিয়েছিলাম। এবারো পেঁয়াজ-আলোচনা, পেঁয়াজ-বিতর্ক অর্থাৎ ‘পেঁয়াজ ডিসকোর্স’ গণমাধ্যমে প্রাণ সঞ্চার করে চলেছে। পেঁয়াজই আমাদের সব গণমাধ্যমকে ব্যস্ত রাখছে। পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের গত কয়েক দিনের অপতৎপরতায় সাধারণ মানুষ দিশাহারা ও বিভ্রান্ত হয়েছে। তারাও ভবিষ্যতের প্রয়োজন মেটানোর তাগিদ থেকে মজুতের প্রতি মনোযোগী হয়ে উঠেছে। গুদামভর্তি পেঁয়াজ থাকা সত্ত্বেও অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কর্পূরের মতো হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে সব পেঁয়াজ! ফলে পেঁয়াজ নিয়ে ব্যস্ততা বেড়ে গেছে ভোক্তা অধিকার সংস্থা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা পর্যন্ত প্রায় সবারই। ব্যস্ততা বেড়ে গেছে গণমাধ্যমকর্মী ও এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবীও। পেঁয়াজ তার ঝাঁজে সবাইকে ত্রস্ত করে তুলেছে! এসব দেখে আমাদের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ ভাষ্য হলো- এখন থেকে প্রতি বছরই ভোক্তা অধিকার সংস্থা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যমকর্মী থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী মহল পর্যন্ত সবারই অন্যান্য কর্মকাণ্ডের মতো পেঁয়াজও এক অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে, পাবেই, পেয়ে গেছেও বলা যায়! ইতোমধ্যে বাণিজ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, আগামী এক মাসের মধ্যেই পেঁয়াজের দাম স্বাভাবিক হবে। আমরা আশাবাদী মানুষ, মন্ত্রীর ঘোষণায় আশাবাদী হয়ে থাকলাম, কিন্তু পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারি না। মনের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা কাজ করে। দ্বিধা এ জন্য যে, গত বছরও আমরা হাতে ‘কড়কড়ে’ ৩০০ টাকা নিয়ে ছুটেছিলাম এক কেজি পেঁয়াজের পেছনে। তবু পেঁয়াজের স্বচ্ছন্দ নাগাল পেতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়েছিলÑ পেঁয়াজ খাওয়া সম্ভব হয়নি! তবে ভরসা একটাই, আমাদের কাছে এবার গত বছরের ‘অভিজ্ঞতা’ আছে। গত বছর আমরা এ বিষয়ে কোনোরূপ অভিজ্ঞ ছিলাম না। বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে আমাদের চাওয়া এইটুকু যে, গত বছরের সেই তিক্ত ‘অভিজ্ঞতা’ যেন এ বছর কিংবা ভবিষ্যৎ বছরগুলোর ‘অভ্যাসে’ পরিণত না হয়, ৩০০ টাকা নিয়ে এক কেজি পেঁয়াজের পেছনে ছুটতে না হয় সে দিকে নজর রাখবেন। আর বাজারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবেন। একদিনের মধ্যে বারবার মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারকে মুহুর্মুহু এতটা অস্থির-চঞ্চল হতে দেবেন না। মূল্যবান ও মহার্ঘ্য পেঁয়াজের ঝাঁজে বাজারের পাশাপাশি গণমাধ্যমও অস্থির। অস্থির হয়ে উঠেছে মধ্যবিত্তের ড্রয়িং রুম। বিগত কয়েক দিন খবরের বিশাল অংশজুড়ে থাকছে পেঁয়াজ ও পেঁয়াজকাণ্ড! আবার টেলিভিশনের টকশোগুলোও পেঁয়াজের কল্যাণে রাত-বিরাতে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। অনলাইন বা অফলাইনের দৈনিক পত্রপত্রিকাগুলো পেঁয়াজের মতিগতি দেখে অস্থির! এসব অস্থিরতা মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রাকেও আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলছে। এই আতঙ্কও যেন করোনার মতোই সংক্রামক! আমাদের এই ‘হুজুগে’ আতঙ্কের কারণেও কোথাও কোথাও লাগামহীন হয়ে পড়েছে পেঁয়াজের বাজার মূল্য! সাধারণের এমন আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার পেছনে পেঁয়াজ, পেঁয়াজ রাজনীতি, পেঁয়াজ ব্যবসায়ী না গণমাধ্যমের অস্থির হৈচৈ কে বেশি সংক্রামক ভূমিকা রাখছে তা খুঁজে বের করার দায়িত্ব বাজার-গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা বাজার বিশ্লেষকদের নিতে হবে। ১৪ সেপ্টেম্বর ভারত হঠাৎ করে তাদের ভাষায় ‘বিদেশে’ পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। ভারতের এই ঘোষণায় বাংলাদেশের পেঁয়াজ বাজার একেবারে অস্থির হয়ে পড়েছে। কিন্তু ভারতের এরূপ তাৎক্ষণিক ঘোষণার নৈতিক ভিত্তি নিয়ে উভয় দেশের বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। কেননা পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণায় দুই দেশের ব্যবসায়ী মহলই ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। ইতোমধ্যে ভারতের ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও প্রকাশ করেছেন। তবে এও ঠিক যে, আমাদের দেশের কোনো কোনো ব্যবসায়ী যেন ভারতের ঠিক এই মহার্ঘ্য ঘোষণাটির জন্যই অপেক্ষা করছিলেন! তা বোঝা যায়, ভারতের ঘোষণার পরই পেঁয়াজ নিয়ে সৃষ্ট তাদের কর্মকাণ্ড দেখেই! ভারতের এই ঘোষণায় তাদের ‘ পোয়াবারো’ অবস্থাও আমরা দেখেছি। পেঁয়াজ বাজার এতটাই অস্থির হয়ে পড়েছিল যে, বাজার বিশেষজ্ঞের পক্ষেও ইতি-নেতি মন্তব্য করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। এরূপ অবস্থায় সাধারণ মানুষ পেঁয়াজ বাজারের গত বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে এবার বাংলাদেশের পূর্ব প্রস্তুতি না থাকায় সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি তীর্যক অঙ্গুলি নির্দেশ করছেন। আমদানি-রপ্তানি নীতিমালা অনুযায়ী ভারত বা অন্য যে কোনো রাষ্ট্রই যখন-তখন যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে কিনা সে প্রশ্নও সাধারণের মনে জেগেছে। ভারতের এই হঠাৎ ঘোষণা অমানবিক তো বটেই, আমরা মনে করি বাণিজ্য চুক্তিরও লঙ্ঘন ছিল। রপ্তানি বন্ধ ঘোষণার আগে কিছুটা সময় উভয় দেশের ব্যবসায়ীদের মানবাধিকারের মধ্যেই পড়ে। আমরা দেখলাম যখন বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে বৈধ উপায়েই পেঁয়াজ বোঝাই কয়েকশ ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছিল ঠিক তখনই ভারতের এই ঘোষণা আসে। ফলে সীমান্তলগ্ন স্থলবন্দরগুলোতে আটকে পড়ে পেঁয়াজ বহনকারী শত শত ট্রাক। আর এই খবরটি যখন গণমাধ্যমে চাউর হয় তখন আমাদের দেশের এক শ্রেণির পেঁয়াজ ব্যবসায়ীর উলঙ্গ উল্লাসে বাজার আরো অস্থির হয়ে ওঠে! মুহুর্মুহু লাফতে লাফাতে বাড়তে থাকে পেঁয়াজের দাম। যা হোক অবশেষে ৬ দিন পর ১৯ সেপ্টেম্বর নানামুখী সমালোচনা ও ভারতীয় ব্যবসায়ী মহলের ক্ষোভের মুখে বন্দরে বন্দরে আটকে থাকা পেঁয়াজ বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি পায়। তারা জানায় ১৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে যারা আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন তাদের পেঁয়াজ বাংলাদেশে আসতে পারবে। এই লেখা (১৯ তারিখ মধ্যরাত) পর্যন্ত সোনা মসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় পেঁয়াজ বাংলাদেশে প্রবেশ শুরু করেছে এবং অন্যান্য বন্দর দিয়েও পেঁয়াজ আসার প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে সেই খবরেই নাকি কোথাও কোথাও কেজিতে পেঁয়াজের মূল্য ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত হ্রাসও পেয়েছে! পেঁয়াজ নিয়ে গত বছরে আমাদের ‘চরম শিক্ষা’ হওয়ার পরও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কেন আগে থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করল না তাও আমাদের বিস্মিত করে! ‘সরকারি প্রেসনোটে’র মতো আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ঘোষণা পাই, ভারত রপ্তানি বন্ধ করলেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির দরজা উন্মুক্ত আছে! কিন্তু সেই দরজা খোলার আগেই এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সাধারণের চোখে ঝাঁজালো পানি ঝরিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েছে, নিচ্ছে। ‘চোর গেলে বুদ্ধি বাড়ে’- এই প্রবাদ কতবার কত মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশে কতভাবেই না প্রযোজ্য ও জীবন্ত অর্থ নিয়ে হাজির হয় তা বলে শেষ করা যায় না! বিগত ছয় মাসের অধিক সময় ধরে সমগ্র বিশ্বের অপরাপর রাষ্ট্রগুলোর মতো বাংলাদেশকেও করোনা ভাইরাস একেবারে স্থবির করে দিয়েছে। আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও তাদের গৃহীত পদক্ষেপ নিয়ে নানাজনের ভাষ্যে উপরোক্ত প্রবাদটি কতবার ব্যবহৃত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। ভারত রপ্তানি বন্ধের ঘোষণার পর বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির দরজা উন্মুক্ত আছে বললে উপরোক্ত প্রবাদটি নিজেই যেন নিজেকে ব্যঙ্গ করে! করোনা মহামারির এই স্থবিরতার মধ্যে পেঁয়াজ, পেঁয়াজ রাজনীতি, পেঁয়াজ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কিছুটা উদাসীনতা এবং সর্বোপরি পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের লোভী মানসিকতা আমাদের ভাবিত করে। নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির প্রবণতায় সাধারণ মানুষের মজুতপ্রীতিও কম চিন্তার বিষয় নয়। অর্থাৎ পেঁয়াজকে কেন্দ্র করে সর্বস্তরেই এক প্রকার অস্বাস্থ্যকর অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রুত পদক্ষেপে অস্বাস্থ্যকর অবস্থা থেকে আমরা মুক্ত হতে চাই। গত বছরের অভিজ্ঞতা এ বছরের অভ্যাসে পরিণত হবে না সে বিষয়েও আশ্বস্ত হতে চাই। পুনশ্চ : ভারত কর্তৃক হঠাৎ পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণার পর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অস্থির ও আতঙ্কগ্রস্ত চেহারা এবং বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রপ্তানির পর ভারতের মানুুষের মধ্যে আবেগ-উত্তেজনার যে উৎসাহব্যঞ্জক চেহারা দেখা গেছে তার তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে ‘রাজনীতির’ (!) পক্ষে আরো একটু মানবিক হয়ে ওঠার পটভূমি তৈরি করে দেয়। আমরা মনে করি, সাধারণের দেহভঙ্গি দেখেও রাজনৈতিক কিংবা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অবকাশ থাকে। সভ্য ও মানবিক রাজনীতির আড়ালে কেবল ‘ব্যবসায়’ যেন বড় হয়ে না ওঠে তাও দেখতে হয়, দেখতে হবে। আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

খাদ্য নিরাপত্তায় আমাদের করণীয়

করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা দেখছে জাতিসংঘ। সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ মাক্সিমো টোরেটো এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে বিভিন্ন দেশের সরকারের নেয়া সংরক্ষণশীল পদক্ষেপের কারণে এ সংকট দেখা দিতে পারে। তিনি বলেছেন, ফলন ভালোই হয়েছে এবং প্রধান খাদ্যশস্যের ফলন বেশ আশাব্যঞ্জক পর্যায়ে ছিল। তবে করোনাভাইরাসজনিত সংকটের কারণে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের স্বল্পতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সংরক্ষণবাদী পদক্ষেপ হিসেবে আমদানি-রফতানি নিষিদ্ধ করায় সামনের দিনগুলোয় সমস্যা দেখা দিতে পারে। তার মতে, এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ যেটা ঘটতে পারে তা হল বিভিন্ন দেশের সরকার কর্তৃক খাদ্য প্রবাহে বিধিনিষেধ আরোপ। তিনি এমন বিধিনিষেধ কিংবা বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা আরোপের বিরোধিতা করে বিশ্বজুড়ে খাদ্য প্রবাহের সুরক্ষা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে সৃষ্ট শঙ্কা এবং এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কী করণীয়, তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য। বিশ্ব যে একটি ‘গে¬াবাল ভিলেজ’- এমন ধারণা এ মুহূর্তে অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। করোনায় আক্রান্ত প্রায় সব দেশই নিজেদের জনগণকে সুরক্ষা দিতে নিয়েছে সংরক্ষণশীল পদক্ষেপ। বেশিরভাগ দেশ ভিসা প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ব্যবস্থা প্রায়ই বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে স্টেডিয়ামের খেলা থেকে শুরু করে বড় বড় সব বৈশ্বিক আয়োজন। অর্থাৎ অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে গোটা বিশ্ব। করোনার প্রভাব পড়েছে বিশ্ব বাণিজ্যে। বিশ্বব্যাপী আমদানি-রফতানি হ্রাস পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক ব্যাংকিং ও হোল্ডিং কোম্পানি জেপি মর্গা বলেছে, পরপর আগামী দুই প্রান্তিকে বিশ্ব অর্থনীতিতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা দেবে করোনাভাইরাসের প্রভাবে। চলতি বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০১৯ সালের চেয়ে অর্ধেক কমে যাবে, জানিয়েছে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সংগঠন ওইসিডি। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে করোনাভাইরাসের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ৩৫টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশকে রাখা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের কারণে চীনের মধ্যবর্তী পণ্য রফতানি দুই শতাংশ কমলে যে ৩৫টি দেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বাংলাদেশ তার একটি। করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাকশিল্প খাত, কাঠ ও আসবাবশিল্প এবং চামড়াশিল্পে ক্ষতির আশঙ্কা করছে জাতিসংঘ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের অর্থনীতি শ¬থ হওয়ায় বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে চামড়াশিল্পে। এ শিল্পে ১৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বস্ত্র ও আসবাবপত্র শিল্পে এক মিলিয়ন ডলার করে ক্ষতি হতে পারে। এদিকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের শিল্প ও বাণিজ্যের ১৪টি খাত করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পোশাক খাতের অ্যাক্সেসরিজ, প্রসাধন, বৈদ্যুতিক পণ্য, পাট সুতা, মুদ্রণ শিল্প, চিকিৎসা সরঞ্জাম, চশমা, কম্পিউটার ও যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক পণ্য, কাঁকড়া ও কুঁচে এবং প¬াস্টিক শিল্প। এখন বৈশ্বিক খাদ্য সংকট প্রসঙ্গে ফেরা যাক। করোনাভাইরাসের শেষ কোথায় এবং মানুষ কবে নাগাদ তাদের স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনে ফিরতে পারবে- এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর এ মুহূর্তে কারও জানা নেই। কেউ বলছেন, আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা কমে এলেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পুরোপুরি শেষ হতে অনেক সময় নেবে। আবার কেউ বলছেন, এ সময় সম্ভবত কয়েক বছর পর্যন্ত হতে পারে। বৈশ্বিক করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব চলাকালে বৈশ্বিক খাদ্যের সরবরাহ ও চাহিদা নিয়ে এফএও’র কিছু ধারণা প্রকাশিত হয়েছে। সরবরাহের দিক থেকে এগুলো হল- ক. এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান না হলেও খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পাওয়া; খ. আগামী এপ্রিল- মে মাসে খাদ্য সরবরাহ চেইন বা প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়া; গ. শ্রমিক স্বল্পতার কারণে খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ, বিশেষ করে শ্রমিকনির্ভর শস্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ ব্যাহত হওয়া। ঘ. গবাদিপশুর খাদ্যের অভাব এবং পর্যাপ্ত শ্রমিকের অভাবে কসাইখানাগুলোর পুরোপুরি সদ্ব্যবহার না হওয়ায় মাংস উৎপাদন কমে যাওয়া; ঙ. যানবাহন নিয়ন্ত্রণ প্রবণতা ও সঙ্গনিরোধ পদক্ষেপগুলোর ফলে বাজারে কৃষকদের আগমনে বাধা সৃষ্টি হওয়া এবং বিক্রয় ব্যবস্থা ভেঙে পড়া; চ. যানবাহন গমনাগমনের পথ বন্ধের ফলে নতুন খাদ্যের সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়াসহ খাদ্যের অপচয় বৃদ্ধি। চাহিদার দিক থেকে এগুলো হল- ক. করোনাভাইরাস বিস্তারের শুরুর দিকে খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধি; খ. অনানুপাতিক হারে মাংসের ব্যবহার কমে যাওয়া; গ. ছোঁয়াচে ভীতিতে খাবার বাজারে ক্রেতাদের যাতায়াত কমে যাওয়ায় খাদ্য ভোগ হ্রাস পাওয়া; ঘ. খাদ্য বিক্রয়ের ধরনে পরিবর্তন আসা। যেমন ই-কমার্সের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ এবং বাড়িতে খাবার খাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে রেস্তোরাঁয় খদ্দের হ্রাস; ঙ. খাদ্য আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য বড় সমস্যা সৃষ্টি হওয়া। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এফএও’র এসব ধারণার কিছু কিছু ইতিমধ্যে বাস্তবরূপ নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কাজাখস্তান ইতিমধ্যেই গমের আটা রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে এবং শাকসবজি রফতানির ওপর সীমা আরোপ করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গম রফতানিকারক রাশিয়া পণ্যটির রফতানিতে সীমা আরোপ করতে পারে।  বৈশ্বিক চাল রফতানিতে শীর্ষ দেশ ভারত এরই মধ্যে তিন সপ্তাহের লকডাউনে চলে গেছে। ফলে ভারত থেকে পণ্যটির সরবরাহ চ্যানেল এখন থমকে দাঁড়িয়েছে। ভিয়েতনাম চাল রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। একই পথে হাঁটতে পারে থাইল্যান্ডও। রফতানি সীমাবদ্ধতার কারণে বাড়ছে চালের দাম। উলে¬খ্য, এর আগে ২০০৮ সালের খাদ্য সংকটকালে চালের মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছিল টনপ্রতি ১ হাজার ডলারের কাছাকাছি। সে সময় রফতানিতে সীমা আরোপ এবং আতঙ্কে ক্রয়প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছিল পণ্যটির মূল্য। রাশিয়ার ভেজিটেবল অয়েল ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে সূর্যমুখীর বীজ রফতানিতে সীমা আরোপের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাম অয়েলের দ্বিতীয় শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশ মালয়েশিয়ায় পণ্যটি উৎপাদনের গতিও এখন বেশ শ¬থ হয়ে এসেছে। বিপরীতে আমদানিকারক দেশগুলোয় খাদ্যপণ্যের চাহিদাও এখন বাড়তির দিকে। ইরাকে গঠিত এক ‘ক্রাইসিস কমিটি’ দেশটিতে কৌশলগত খাদ্য মজুদ গড়ে তোলার সুপারিশ জানিয়েছে। এর ভিত্তিতে দেশটি এরই মধ্যে ১০ লাখ টন গম ও আড়াই লাখ টন চাল আমদানির প্রয়োজনীয়তার কথা ঘোষণা দিয়েছে। চাল আমদানিকারক দেশ ফিলিপাইনে মাত্র দু’মাসের চাল মজুদ আছে। চালের বাণিজ্য দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির হয়ে থাকলে ফিলিপাইনসহ এশিয়া ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশ নাজুক অবস্থায় পড়বে। শীর্ষ আমদানিকারক ইন্দোনেশিয়াসহ এশিয়ার বড় আমদানিকারক দেশগুলোর হাতে জুন পর্যন্ত গমের মজুদ আছে। এখন প্রশ্ন হল, এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কী করণীয়? এটা ঠিক, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে আমাদের প্রধান খাদ্য চালের উৎপাদন সন্তোষজনক হওয়ায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী গত অর্থবছরে সরকারি-বেসরকারি খাতে পণ্যটির আমদানি মাত্র ২ লাখ ৫ হাজার টনে সীমাবদ্ধ থাকে। চলতি অর্থবছরেও চাল উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা আমনের উৎপাদন ভালো হয়েছে। কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাকের মতে সদ্য সমাপ্ত আমনের উৎপাদন গত অর্থছরের উৎপাদনকে (১ কোটি ৫৩ লাখ টন) ছাড়িয়ে যাবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ২৩ মার্চ পর্যন্ত শুধু বেসরকারি খাতে ৪ হাজার ১৮ টন চাল আমদানি হয়েছে। চাল উৎপাদনে শীর্ষস্থানে থাকা আসন্ন বোরো ফসলের উৎপাদন সন্তোষজনক হবে বলে আশা করা যায়, যদি না ২০১৭ সালের মতো আগাম বন্যায় হাওরাঞ্চলের বোরো ফসল অথবা ঘূর্ণিঝড় বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশের অন্যত্র ফসলটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চাল উৎপাদনে আমরা স্বনির্ভরতার কাছাকাছি পৌঁছলেও পণ্যটির আমদানির প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি। করোনাভাইরাসের জন্য শীর্ষ রফতানিকারক দেশগুলো থেকে পণ্যটির রফতানি বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়ার শঙ্কায় চাল আমদানির বর্তমান উচ্চহারের শুল্ক কিছুটা হ্রাস করে বেসরকারি খাতে দুই লাখ টন চাল আমদানির উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। খাদ্যশস্যের চাহিদায় দ্বিতীয় স্থানে আছে গম। পণ্যটির বার্ষিক চাহিদা কমবেশি ৭০ লাখ টন। আমরা উৎপাদন করি ১২ থেকে ১৩ লাখ টন। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ২৩ মার্চ পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি খাতে ৫১ লাখ ৭৮ হাজার টন গম আমদানি করা হয়েছে। রফতানিকারক দেশগুলো থেকে পণ্যটির রফতানি সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং বড় বড় আমদানিকারক দেশগুলোর বাড়তি চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় অবশিষ্ট গম আমদানি ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন। মাংস, ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি, গুঁড়োদুধ, ফলমূল, পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ বিভিন্ন মসলায় আমরা বহুলাংশে আমদানিনির্ভর। এসব খাদ্যপণ্যের নিরাপত্তা মজুদ গড়ে তুলতে এখনই পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। খাদ্যনিরাপত্তার সংজ্ঞানুযায়ী তখনই খাদ্যনিরাপত্তা বিরাজমান যখন সবার কর্মক্ষম, স্বাস্থ্যকর ও উৎপাদনমুখী জীবনযাপনের জন্য সবসময় পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরাপদ এবং পুষ্টি মানসম্পন্ন খাদ্যের লভ্যতা ও প্রাপ্তির ক্ষমতা বিদ্যমান থাকে। এ সংজ্ঞানুযায়ী বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান মোটেই সন্তোষজনক নয়। সবশেষে বলতে চাই, বৈশ্বিক করোনাভাইরাসের কারণে খাদ্য রফতানিকারক দেশগুলোর খাদ্যপণ্য রফতানিতে রক্ষণাত্মক মনোভাবের কারণে কমপক্ষে আগামী ছয় থেকে নয় মাসের জন্য খাদ্যপণ্যের সন্তোষজনক মজুদ গড়ে তুলতে সরকারকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। লেখক ঃ সাবেক খাদ্য সচিব।

 

 

 

॥ কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ ॥

করোনা জয় ও মানবতা

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বা কোভিড-১৯ থেকে নিজে বাঁচতে এবং অন্যদের বাঁচাতে, সবাইকে অন্য সব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। কিন্তু কিছু মানুষকে এ বিষয়ে মোটা বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে উদাসীন থাকতে দেখা যায়। তবে অসংখ্য মানুষ আছে যারা আলাদা থাকতে পারে না, কেননা তাদের পেটের তাগিদে কাজ করতে হয় অথবা বিভিন্ন সেবাব্যবস্থা চালু রাখতে তাদের কাজ করতে হয় বা কাজ করতে বাধ্য করা হয়। এছাড়াও এসব মানুষ চাইলেও আলাদা থাকতে পারে না। তাদের সেরকম বসবাসের ব্যবস্থা নাই। ছোটো ঘর থাকে অনেকে। উদাহরণ বাংলাদেশের গ্রাম এলাকায় এরকম অসংখ্য খানা আছে আর ঢাকা এবং অন্যান্য শহরে বস্তির কথা বলাই বাহুল্য। করোনার রোধকল্পে সামাজিক/শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা একটি অতি জরুরি শর্ত, তাই এসব দরিদ্র ও পিছিয়ে থাকা মানুষের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। এ ছাড়া সাধারণত এসব মানুষ অহরহ নানা রোগ ও পুষ্টির অভাবে শারীরিক দুর্বলতায় ভোগে, ফলে করোনা ধরলে তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা স্বল্পই থাকে। আর করোনাকালে তাদের খাদ্য প্রাপ্তি আরো দুর্লভ হয়ে পড়ে। অন্যদিকে অর্থ-সম্পদে, সামাজিক অবস্থানে এবং ক্ষমতায় যারা এগিয়ে তারা নিজেদেরকে যথাযথভাবে আলাদা রাখা ও করোনা থেকে বাঁচাতে অন্যান্য করণীয় ও বর্জনীয় পালন করতে পারেন এবং করছেনও। করোনাকালে তাদের পুষ্টিকর খাবার প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। অনেকে এই সময় খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বেশি পরিমাণে সংগ্রহ করে রেখেছেন অন্যায়ভাবে। যদিও করোনা যাকে পায় তাকে ধরে কোনো বিচার ছাড়াই। আর্থসামাজিক দুর্বলতার শিকার যারা, তারাই উপর্যুক্ত বিভিন্ন কারণে ভাইরাসটির সামনে পড়েন বেশি। ফলে আক্রান্ত হন বেশি, মৃত্যুবরণ করেন বেশি। এই উপসংহার বিভিন্ন দেশ থেকে প্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে উঠে এসেছে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আর্থসামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা আফ্রিকান-আমেরিকান, ল্যাটিনো এবং অন্যান্য অভিবাসী মানুষ দেশের মোট জনসংখ্যায় তাদের অনুপাতের চেয়ে অনেক বশি হারে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মৃত্যুবরণ করছেন। এরাই স্বাস্থ্যসেবা (বিশেষ করে নার্স ও অন্যান্য সহকারী) এবং পরিবহনসেবাসহ দেশের সব সেবাব্যবস্থায় ব্যাপকভাবে কর্মরত এসব কাজ করোনাকালে চালু রাখা জরুরি এবং স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বিশেষ করে অধিক করোনা আক্রান্ত এলাকায় (যেমন নিউ ইয়র্ক) সংশ্লিষ্টদেরকে এখন সম্মুখসমরে আরো বেশি পরিশ্রম করেতে হচ্ছে; তাদের অনেকে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। বৈষম্যের যে বাস্তবতা বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে ছিল তা এখন নগ্নভাবে উন্মোচিত। যুক্তরাজ্যে একই রকম কারণে একই রকম ঘটছে বলে প্রাপ্ত তথ্যে প্রকাশ। এখানে দুর্ভাগাদের মধ্যে প্রথম সারিতে আছেন স্বল্পোন্নত এবং উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশ থেকে ভাগ্য গড়ার লক্ষ্যে আসা মানুষ। আসি বাংলাদেশের কথায়। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত বাড়লেও এখনো অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র বা স্বল্প আয়ের। এসব মানুষের ব্যাপক অংশের পারিবারিক অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে করোনার আগ্রাসনের কারণে। অসংখ্য পিছিয়ে থাকা ও খেটে খাওয়া মানুষের এখন কর্মসংস্থান নাই, আয়ের অন্য কোনো উত্স নাই। এদের মধ্যে আছেন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক, কৃষি-শ্রমিক, গ্রাম ও শহরের দিনমজুর, গ্রাম ও শহরের রিকশাচালক, মৎস্যজীবী, প্রতিবন্ধী, দলিত, উপকূল ও হাওরে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ, অনানুষ্ঠানিক খাতে কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্প এবং ব্যবসায়-বাণিজ্যে নিয়োজিত উদ্যোক্তা ও কর্মীবৃন্দ, বেসরকারি খাতের চাকরিচ্যুত নিম্নবেতনভুক্ত মানুষ। মোট সংখ্যা এক কথায় বিশাল। সবার কাছে প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য জরুরি ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো এক দুরূহ কর্মযজ্ঞ। এর জন্য প্রয়োজন বিরাট কলেবরের অর্থ ও ত্রাণসামগ্রী এবং তা বিতরণের জন্য যথোপযুক্ত দক্ষ জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। বস্তুত কর্মহীনতা ও সামাজিক সুরক্ষা ভাতার এবং জনসাধারণের জন্য স্বাস্থ্যসেবার ব্যাপক কার্যকর ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ উন্নত দেশসমূহ দুর্দশায় নিপতিত মানুষদের যথাযথ সহায়তা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী সম্প্রসারিত করছে এবং নতুন অর্থায়নের মাধ্যমে ত্রাণ (খাদ্য ও অন্যান্য জরুরি জীবন রক্ষা সামগ্রী) বিতরণ করছে। তবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ এখনো তা পাচ্ছেন না বলে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়। খাদ্যের দাবিতে জনগণ একসঙ্গে রাস্তায়ও নেমেছ। এ রকম চলতে থাকলে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়বে। অবশ্য এত এত মানুষকে ত্রাণ প্রদান করে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা একা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে সরকারি বিতরণ আরো সমন্বিত, কার্যকর এবং দ্রুততর করার সুযোগ রয়েছে। অবশ্য মানুষকে এই জীবন ধারণ সংকট থেকে উদ্ধার করতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও সম্পন্ন ব্যক্তিদের মুক্তহস্তে এগিয়ে আসতে হবে। ইতিমধ্যে অনেকেই এক্ষেত্রে কর্মকান্ড শুরু করেছেনÑএটি আরো অনেক ব্যাপক হতে পারে, যদি সম্পন্ন সব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি তাদের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ অবদান রাখেন। যে দেশের মানুষ এককাট্টা হয়ে অসীম সাহসে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জন করেছে, সেই জাতি নিশ্চয় আবারও সবাই মিলে করোনা জয় করতে নিশ্চয়ই পারবে এবং করবে, ইনশাআল্লাহ। এখানে দুর্নীতিবাজ ও ধান্দাবাজদের কোনো স্থান নেই। যদি কেউ সেই পথ অবলম্বন করে তবে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী তাদেরকে কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। করোনা-পরবর্তী সময়ে বিশ্বের সর্বত্র জাতীয় ব্যবস্থা এবং সার্বিকভাবে বিশ্বব্যবস্থা একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করবে তাতে আমার সন্দেহ নেই। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই রূপান্তর কাদের স্বার্থের অনুকূলে এবং কাদের স্বার্থের বিপক্ষে যাবে। নিম্নোক্ত দুইভাবে দেশে দেশে এবং বিশ্ব পর্যায়ে বিবর্তন ঘটতে পারে। করোনাকালে বিশ্বব্যাপী আর্থসামাজিকভাবে বিধ্বস্ত দরিদ্র, পিছিয়ে থাকা এবং স্বল্প আয়ের বিশাল জনসংখ্যা আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে আরো অনেক দুর্বল হয়ে পড়বেন। ধনী ও ক্ষমতাবানরা সুযোগ তৈরি করে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবেন এবং ক্রমে আরো বিত্তবান ও ক্ষমতাবান হয়ে উঠবেন। তদুপরি তাদের নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ তাদের আরো অপ্রতিরোধ্য করে তুলতে পারে। আর্থসামাজিক এবং সম্পদ ও ক্ষমতাবৈষম্য প্রকটভাবে বাড়বে আন্তর্জাতিকভাবে এবং দেশে দেশে। টেকসই উন্নয়ন কেতাবেই থেকে যাবে, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের চিন্তা উবে যাবে। জলবায়ু পরিবর্তন আরো প্রকট আকার ধারণ করে মানবসমাজ এবং গোটা পৃথিবীকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। অন্য ধারা এমন হতে পারে। করোনা ভাইরাস বিশ্বের সব মানুষকে এমনভাবে নাড়া দিয়েছে এবং সর্বত্র ত্রাহি-ত্রাহি অবস্থা বিরাজ করছে। অতীতে সময় সময় মহামারি হয়েছে। তবে সেগুলো বিশ্বের সর্বত্র ব্যাপ্ত ছিল না, বিভিন্ন অঞ্চলে ছিল। সারা বিশ্বে এবারের মতো আন্তর্জাতিক ভ্রমণে বিঘœ ঘটে নাই এবং উত্পাদন ও বণ্টনে বিশৃঙ্খলতা সৃষ্টি হয় নাই। অবশ্য বিভিন্ন মহামারিতে মৃত্যু ঘটেছে ব্যাপক। উদাহরণ :১৯৮১ সালে শুরু হওয়া এইচআইভি/এইডসের কারণে এ পর্যন্ত সাড়ে ৩ কোটির মতো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। করোনার মতো আর কোনোটা ছিল না। করোনায় সারা বিশ্বের সর্বত্র সব মানুষ উৎকণ্ঠিত। আবার সব মানুষ (যে কোনো দেশের বা এলাকার, ধনী বা গরিব, ক্ষমতাবান বা ক্ষমতাহীন, জ্ঞানী বা শিক্ষা-দীক্ষাহীন, উদ্যোক্তা বা শ্রমিক, পুঁজির মালিক বা পুঁজিহীন, নারী বা পুরুষ, রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বা সাধারণ নাগরিক) মানবতার নিরিখে সমান। এই বোধ সব মানুষের মধ্যে যদি করোনা আগ্রাসন জাগিয়ে তোলে, তাহলে দেশে দেশে, বিশ্ব মাঝারে মানবিকতা ও মানবতার জয় প্রতিষ্ঠিত হবে। টেকসই উন্নয়নের ধারা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্যে সব দেশ কার্যকরভাবে নিজ নিজ এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালাবে এবং প্রয়োজনমাফিক জোরদার করবে। উপর্যুক্ত দুই ধারার কোনটি বাস্তবে রূপ পরিগ্রহ করে তা সময়ে জানা যাবে। আমি আশা করব, দ্বিতীয় ধারাটি যেন প্রবর্তিত হবে, কিন্তু সংকট কাটলেই বিরাজমান বৈষম্য যারা সৃষ্টি করেছেন এবং প্রকট থেকে প্রকট করে তুলেছেন তারা স্বরূপে আবির্ভূত হবেন, এমনকি আরো আগ্রাসি হয়ে সব দিক থেকে নিজের আরো আরো উদ্বোধনে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। কাজেই প্রথম ধারার জয় হবে বলে মনে হয়। শেষ করি মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার এক বক্তব্য উল্লেখ করে। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি লিখছিলেন উদারতাবাদের চূড়ান্ত বিজয় ঘটে গেছে, আর কোনো আর্থসামাজিক ব্যবস্থা এই ব্যবস্থাকে হটাতে পারবে না। বেসরকারি খাতই আর্থসামাজিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক থাকবে, সরকার হবে একবারেই ছোটো এবং নিয়মনীতি সব শিথিল করে দিয়ে সরকার অর্থনীতিতে কোনো ভূমিকায় থাকবে না। কিন্তু বৈষম্য প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে এবং ক্রমবর্ধমান বিপুলসংখ্যক মানুষ দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন দেখে তিনি মত পালটিয়ে ২০০৪ সালে সরকারকে ফিরিয়ে আনতে বলেন। তবে, এখানে প্রশ্ন হচ্ছ যে, সরকারের হাত সম্প্রসারিত হলেই কি বাস্তবতার পরিবর্তন হবে? আসলে দরকার মানবহিতৈষী মানুষের সরকার। যা-ই হোক, বাস্তবতা হচ্ছে, অন্য কার কী হচ্ছে তার কোনো বিবেচনা না রেখে ব্যক্তিপর্যায়ে আরো আরো উচ্চতায় যেতে হবে এই ধারণায় নিবিষ্ট নব্য উদারতাবাদ শনৈ শনৈ করে এগিয়ে চলে। এই প্রক্রিয়ার আগ্রাসি কর্মকান্ডের ফলে ২০০৮ সালে বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থায় ধস নামে এবং বিশ্বমন্দা সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেই অবস্থা সত্ত্বেও নব্য উদারতাবাদ সাময়িক সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ায় এবং এগিয়ে চলে। পাশাপাশি, কোনো কোনো দেশেকে সময় সময় বাম রাজনীতির দিকে ঝুঁকতে দেখা গেলেও, অগ্রগতি হয়নি। নব্য উদারতাবাদের ধারক ও বাহকদের মানসিকতায় পরিবর্তন আসবে কি? লেখক ঃ অর্থনীতিবিদ

 

 

করোনা সচেতনতায় হেলাফেলার পরিণতি মারাত্মক হতে পারে

বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের মারাত্মক অবস্থান আমরা প্রতিদিনই দেখছি। আমাদের দেশেও করোনার সংক্রমণ ঘটায় সরকার জনসাধারণকে ঘরে থাকার জন্য সরকারি-বেসরকারি অফিস ছুটি দিয়েছে। শহরগুলোতে সেনা টহল চলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাত-দিন মানুষকে ঘরে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে ততই ঘরে থাকা মানুষের সংখ্যা কমে আসছে। বিশেষত স্বল্প আয় ও হতদরিদ্র মানুষ খাদ্য ও অতীব প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর জন্য ঘরের বাইরে চলে আসছে। তাদের খাদ্যের সঞ্চয় নেই, হাতে টাকা নেই, বাইরে কাজও নেই। ফলে বিপুলসংখ্যক বিত্তহীন ও স্বল্প আয়ের মানুষের পক্ষে রুজি ছাড়া বেঁচে থাকা কষ্টকর। ঢাকা শহরে বিভিন্ন বস্তিতে বসবাসকারী এমন মানুষের সংখ্যা মোটেও কম নয়। এছাড়া বস্তিতে এদের থাকার ঘর এবং পরিবেশ একেবারেই অস্বাস্থ্যকর, করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার অনুকূল পরিবেশ এগুলোতে বিরাজ করছে। এই মুহূর্তে ঢাকা শহরে অবস্থানকারী এসব মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা এবং জীবনের ঝুঁকি কতটা প্রকট হয়ে উঠছে সেটি সবাইকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া জরুরি মনে করছি। এই মানুষরা যদি ব্যাপকভাবে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয় তাহলে অন্যরাও মুক্ত থাকার তেমন কোনো কারণ থাকবে না। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। তবে গ্রাম এবং উপজেলা ও জেলা শহরগুলোতে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকার নিয়মাবলি অনেকেই অনুসরণ করছেন না এটি প্রতিদিনই গণমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে। বেশিরভাগ মানুষই হাটবাজার, ধর্মীয় সমাবেশ এবং সামাজিক যোগাযোগ পুরোপুরি পরিহার না করে নির্বিঘেœ চলাফেরা করছে। গণমাধ্যমগুলো যতই গুরুত্ব দিয়ে নির্দেশনাসমূহ অন্তত দুই সপ্তাহের জন্য পালন করা প্রচার করুক না কেন একটা বিরাটসংখ্যক মানুষ সেগুলো খুব একটা অনুসরণ করার তাগিদ অনুভব করছেন না- এটি সহজেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। খোদ ঢাকা শহরেও অলিগলির ভেতরে কারণে-অকারণে ঘোরাফেরা করছে। কোনো বাহিনী এদের এভাবে চলাফেরা করা থেকে নিবৃত্ত করতে পারছে না। বিষয়টি সচেতন মহলকে বেশ অবাক করছে। এটি শুধু অবাক করার বিষয় নয়, আত্মঘাতীও হওয়ার মতো বলে অনেকেরই ধারণা। যারা এভাবে বের হয়ে আসছেন তারা করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতা সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারছেন না, তাদের মধ্যে হেলাফেলার মনোবৃত্তি কতটা কাজ করছে সেটি সহজেই বোধগম্য। অথচ গণমাধ্যমে তারাই প্রতিদিন অন্যান্য দেশে কত কড়াকড়িভাবে জনসাধারণকে ঘরে থাকার নির্দেশনা মানতে হচ্ছে সেটি দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে এসব খবরাখবর প্রচারিত হলেও মেনে চলার প্রবণতা মনে হচ্ছে খুব একটা অনুসৃত হচ্ছে না। এর পরিণতি যদি সত্যি সত্যি আমাদের ভোগ করতে হয় তাহলে দেখার সৌভাগ্য কতজনের হবে বলা মুশকিল। আমাদের হতদরিদ্র মানুষদের বেঁচে থাকার উপায় আমাদের বের করতেই হবে। তাদের খাদ্যের চাহিদা পূরণ করা জরুরি। সরকার বলছে, সরকারের হাতে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত আছে। দেড়-দুই কোটি মানুষের খাদ্যের সংস্থান করা সরকারের পক্ষে সাময়িকভাবে হয়তো করা সম্ভব। তবে এই পরিস্থিতি বেশিদিন চললে সরকারের একার পক্ষে হতদরিদ্র মানুষদের দায়িত্ব নেয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এছাড়া করোনা ভাইরাস উপেক্ষা করে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। এক্ষেত্রে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা। ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি এবং উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সরকারের খাদ্য সহযোগিতার সমন্বয় সাধন করে হতদরিদ্র এবং কর্মহীনদের খাদ্য সাহায্য দেয়া গেলে এক্ষেত্রে অপচয় যেমন রোধ করা সম্ভব হবে, একইভাবে বণ্টন সুষ্ঠু ও নিরবচ্ছিন্ন করা সম্ভব হতে পারে। প্রকৃত অভাবীদের খাদ্যের সামগ্রী পৌঁছে দেয়ার সহজ ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে বস্তিবাসীসহ হতদরিদ্র মানুষদের বসবাসের বর্তমান ঘিঞ্জি পরিবেশকে কীভাবে স্বাস্থ্যসম্মত ও করোনা সংক্রমণমুক্ত করা যাবে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। সেটি করতে দেরি হলে করোনার প্রাদুর্ভাব কতটা শহর এবং গ্রামে ঠেকানো যাবে সেটি নিয়ে আমার গভীর সন্দেহ আছে। উন্নত দেশগুলোতে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের অবস্থা এখন আমরা যেমন দেখছি সেটি বিবেচনায় নিয়ে আমাদের জনঘনত্ব অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কী রূপ হতে পারে- সেটি ভাবতেই আঁতকে উঠতে হয়। আমাদের এখানে ঘন জনবসতিপূর্ণ শহর এবং গ্রামগুলোতে যেসব অব্যবস্থা, অসচেতনতা, হেলাফেলা, অন্ধত্ব, অজ্ঞতা, কুসংস্কার, অজ্ঞানতা ও নিয়তিবাদিতা বিরাজ করছে তার পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে সেটি সবাইকে ভেবে দেখার অনুরোধ করব। আমাদের বেশিরভাগ মানুষই ভাইরাস সংক্রমণের পূর্ব ইতিহাস খুব একটা জানেন না। ভাইরাস সম্পর্কেও বেশিরভাগ মানুষেরই কিটতাত্ত্বিক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞানগত ধারণা নেই। ফলে অনেক কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস তাদের মধ্যে বাসা বেঁধে আছে। চার-পাঁচ দশক আগে কলেরা, ডায়রিয়া মহামারিতে যখন বিনা চিকিৎসায় হাজার হাজার মানুষ মারা যেত তখন এটিকে মানুষের পাপের পরিণতি হিসেবে বিশ্বাস করা হতো। অথচ এসব সংক্রমণ ব্যাধিতে অসংখ্য শিশু মারা যায়। শিশুদের এভাবে মৃত্যুর কোনো জুৎসই জবাব কেউ খুঁজতো বলে মনে হয় না। সেই কলেরা, ডায়রিয়া, স্যালাইন উদ্ভাবনের পর আর কোনো অতি প্রাকৃতিক শক্তির প্রতিশোধের গল্প কলেরাকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে এখন কেউ বিশ্বাস করাতে পারছে না। এই দেশেই এক সময় যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, গুটিবসন্ত ইত্যাদি মহামারিতে অসংখ্য মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল। যে কোনো মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটলে মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে নিকটবর্তী আত্মীয় স্বজন এর কাছে আশ্রয় নিত। সেখানেও মহামারিটি ছড়িয়ে পড়ত। তারা জানত না তারা সংক্রামক রোগ বহন করছে। ফলে একেকটি রোগ মানুষের মাধ্যমেই ছড়িয়ে পড়ত এবং বিনা চিকিৎসায় অসংখ্য মানুষ মৃত্যুবরণ করত। এসব মহামারি তাদের কাছে ছিল প্রকৃতির নির্দয় অভিশাপ আর মানুষের প্রতি প্রতিশোধ নেয়ার এক স্বাভাবিক নিয়ম- যা মানুষের নিয়তিতে পূর্বনির্ধারিত বলে বিশ্বাস করা হতো। এটি শুধু আমাদের দেশেই নয়, পৃথিবীর সর্বত্র সংক্রমণজনিত কারণ ও চিকিৎসা জানা না থাকার কারণে মানুষ সামাজিকভাবে বিশ্বাস করে এসেছিল। আদিম গোত্রীয় সমাজে সংক্রমণজনিত রোগের প্রাদুর্ভাবে অনেক মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল, অনেক গোত্রই প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছিল। সভ্যতায় উত্তরণের পরও মহামারির প্রাদুর্ভাব অব্যাহত ছিল। প্রাচীন সভ্যতার সবক’টিতেই মহামারিতে অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর ঘটনা স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবেই ছিল। কারণ প্রতিরোধ করার মতো ওষুধ তখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তবে এখন থেকে ৫-৬ হাজার বছর আগে পূর্ব আফ্রিকায় এক ধরনের প্রতিষেধক ভেষজ উপায়ে গোত্রীয় চিকিৎসকরা উদ্ভাবন করেছিলেন। অন্য অঞ্চলের মানুষ সেসব সম্পর্কে অনেক পরে কিছু কিছু জেনেছে। কিন্তু ততদিনে মহামারির বিষয়টি আগের মতোই মানুষের সংক্রমিত মৃত্যুর ভাইরাস হিসেবে চলে আসছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে এ ধরনের সংক্রমণজনিত রোগের বিস্তারে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু যেন এক নিয়তির বিষয় হিসেবে চলে এসেছিল। সবচাইতে বড় ধরনের মহামারি সংঘটিত হয় ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ায় যখন অপরিকল্পিতভাবে নগর গড়ে উঠছিল। ১৩৪৬-১৩৫৩ সালে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও পূর্ব এশিয়া, মিসর, চীনসহ বিশাল এই অঞ্চলে কালো মড়ক তথা ব¬াক ডেথ মহামারিতে সেই সময়ের পৃথিবীর জনসংখ্যার প্রায় তিন ভাগের এক ভাগের বেশি তথা ২০০ মিলিয়ন মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল। ইউরোপের কোনো কোনো অঞ্চলের ৬০ শতাংশ মানুষ অকালে মৃত্যুবরণ করেছিল। মধ্যপ্রাচ্যে জেরুসালেম, দামাস্ক, মক্কা, মউসি, বাগদাদসহ অন্যান্য শহর এবং জনবসতি প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছিল। মিসর, মধ্য এশিয়া, মঙ্গোলিয়া, চীন এই মরণ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিল। পৃথিবীর ইতিহাস কালো মড়ককে ভুলতে পারেনি। লাতিন আমেরিকায় ইউরোপীয়দের নেয়া সংক্রমক ব্যাধিতে আদিবাসীদের বড় অংশই নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। পৃথিবীর অনেক শাসক, রাজা-বাদশাও এসব সংক্রমক ব্যাধিতে মৃত্যুবরণ করেছেন। পর্তুগিজ রাজপুত্র ডম পেদ্রো ছিলেন ব্রাজিলের প্রথম সম্রাট। পর্তুগালের সিংহাসনে বসার জন্য ফিরে এলেন কিন্তু মরণ ব্যাধি যক্ষ্মা তার সেই স্বাদ পূরণ করতে দেয়নি (১৮৩৫ খ্রি.)। ইতিহাসে এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যা খুব বেশি দিন আগের ঘটনা নয়। আমি এই মহামারিগুলোর ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়ার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে মহামারি সম্পর্কে ঐতিহাসিক ধারণা লাভ করে সবাই যেন সচেতন হওয়ার চেষ্টা করেন। সম্প্রতি করোনায় আক্রান্তদের তালিকায় অনেক দেশেরই শাসক, প্রশাসক এবং প্রভাবশালীদের নাম উঠে এসেছে। এখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের এমন উন্নতির যুগেও আমাদের করোনা ভাইরাসের মতো সংক্রমণ ব্যাধির এমন আলামত দেখতে হচ্ছে যা ভাবতেও বেশ কষ্ট হয়। সুতরাং করোনা ভাইরাসকে নিয়ে হেলাফেলা কিংবা কম গুরুত্ব দেয়ার পরিণতি আমাদের জন্য কি হতে পারে আমরা তা নিশ্চিত করে বলতে পারব না। তবে আগামী কয়েকটি দিন আমাদের অবশ্যই ধৈর্য ধরতেই হবে, করোনা ভাইরাসের বিধিনিষেধ মেনে চলতেই হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে জনবহুল এই দেশে মারাত্মক কোনো বিপর্যয় ঘটা খুব বেশি অস্বাভাবিক হওয়ার বিষয় নয়। কারণ সংক্রমণ ব্যাধির বিস্তার যত বেশি ঘটবে এর আর্থসামাজিক প্রতিক্রিয়াও তত বেশি ঘটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাবে না। সে কারণে এখনই সবকিছুকে টেনে ধরতে হবে, মানুষকে সচেতন করতে হবে, হতদরিদ্রদের খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে।

লেখক ঃ অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।

সমাজটা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে

ছেলেটার বয়স কতই-বা হবে, ষোলো কি সতেরো। স্কুলে যায়। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা মারে, গল্প করে, বিকেলে খেলাধুলা করে, সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আসে, সপ্তাহে তিন দিন কোচিং সেন্টারে যায়। যখন বাড়িতে থাকে তখন চুপচাপ পড়ার টেবিলে গিয়ে বসে। মা-বাবাকে কিছুই বলতে হয় না। তারা তো ভীষণ খুশি। পাড়া-প্রতিবেশী আর আত্মীয়স্বজনের কাছে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে ছেলেটাকে নিয়ে তাদের গর্বের কথা। কত বড়ো আশা, একদিন এ ছেলে তাদের সোনার ছেলে হয়ে মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করবে। টানাটানির সংসারেও তারা ছেলের আবদার রক্ষা করেন খেয়ে না খেয়ে। ছেলেকে তা বুঝতে দেন না। কিন্তু তাদের এ সুখ বেশি দিন রইল না। একদিন পুলিশ এসে জানায়, তাদের ছেলে ইয়াবা বিক্রি করে, ইয়াবা খায় আর বখে যাওয়া সমবয়সিদের সঙ্গে জুয়া খেলে, মারপিট করে, মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার পথে উত্ত্যক্ত করে। আজ সে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে এলাকার দক্ষিণ দিকে খেলার মাঠের পাশের রাস্তায় ছিনতাই করার সময়। শুনে মা-বাবার তো আক্কেল গুড়ুম। ছেলেটাকে কয়েক দিন যাবৎ কেমন কেমন মনে হচ্ছিল। তবে এমনটা হবে তা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি! এ কাহিনির মা-বাবার মতো অনেক মা-বাবা আজকাল তাদের উঠতি বয়সি ছেলেদের জন্য সমাজে হেয় হয়ে যাচ্ছে। বখে যাচ্ছে কিশোর বয়সে, সমবয়সি কিংবা দু-এক বছরের সিনিয়র বখাটে-মাদকখোর-ছিনতাইকারী ‘বন্ধুদের’ কবলে পড়ে। কিশোর গ্যাং নামক অপসংস্কৃতি (জুভেনাইল সাবকালচার নামে অন্যান্য দেশে পরিচিত) ইদানীংকালে একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি হয়ে দেখা দিয়েছে শুধু শহর এলাকায় নয়, গ্রামেগঞ্জেও। ভ্রষ্টতার জন্ম হচ্ছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আরো অনেক ভ্রষ্টতার সঙ্গে মিশে ক্ষয়ে যাচ্ছে সমাজ ধীরলয়ে। কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, নিত্য চুরি-ছিনতাই, মেয়েদের উত্ত্যক্তকরণ, নারী-শিশু নিপীড়ন, গণপরিবহনে নারীদের শ্লীলতাহানি, শহরের পার্কে কিংবা গ্রামের পুকুর-নদীর ঘাটে মেয়েদের উত্ত্যক্তকরণ, স্কুল-কলেজে আসা-যাওয়ার পথে মেয়েদের প্রতি কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের হল- হোস্টেলে নবাগত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে র‌্যাগিং, গেস্টরুমে নিয়ে ‘আচরণ শেখানোর’ নামে শারীরিক-মানসিক নির্যাতনসহ অবমাননাকর আচরণ, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-মক্তব-বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়া যৌন হেনস্তা, কর্মস্থলে নারী কর্মীদের সঙ্গে দুর্বৃত্তমনা সহকর্মীদের অশ্লীল আচরণ ইত্যাদি ধরনের সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য কর্মকান্ড সমাজকে নিয়ে যাচ্ছে তলানির দিকে। আর বহুরূপী প্রতারণা তো আছেই নিত্যসঙ্গী হিসেবে। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই এমন একটা সময় আসবে যখন দেখা যাবে নষ্ট সমাজে ভ্রষ্ট লোকজনের ছড়াছড়ি। তখন পারবে না এ সমাজ ধ্বংসের হাত থেকে নিজকে রক্ষা করতে। কিশোরদের মধ্যে যারা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তাদের মধ্যে একটা বড়ো অংশ ব্রোকেন পরিবার আর নিম্নবিত্ত পরিবারের হলেও ধনাঢ্য পরিবারেরও রয়েছে অনেকে। ধনীর ছেলেরা মা-বাবার অগোচরে মাদক সংগ্রহের জন্য, বিলাসিতা করার জন্য ছিনতাইয়ে নেমেছে অনেক জায়গায়, ধরাও পড়েছে অনেকে। অনেক জায়গায় ধনীর ছেলেরাই ‘হিরোইজম’ দেখানোর অভিলাষে নেতৃত্ব দিচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের। এরা গ্র“পের নামে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খুলে অশ্লীল ভাষায় তথ্য আদানপ্রদান করে, দেওয়ালে চিকা মেরে নিজেদের অবস্থান আর শক্তির জানান দেয়, হর্ন বাজিয়ে প্রচন্ড গতিতে কার রেসিং করে, শহরে খেলার মাঠ নিয়ন্ত্রণ করে, মারামারি করে, মাদকের মাদকতায় মাতাল হয়ে ছিনতাই করে, অশ্লীল কাজ করে, এমনকি খুনাখুনিতেও জড়িয়ে পড়ে। কয়েক দিন আগেই তো কিশোর গ্যাংয়ের হাতে খুন হলো চট্টগ্রামের নিরীহ রিকশাচালক রাজু, ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে এক কিশোরের হাতে খুন হয় আরেক কিশোর, নওগাঁর নিয়ামতপুরে ছেলে মেরে ফেলেছে বাবাকে নেশার টাকা না পেয়ে। এমন অসংখ্য ঘটনা। বড়ো ভাইদের দিকনির্দেশনায় এরা খুনোখুনিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। ধরা পড়ছে পুলিশের হাতে, যাচ্ছে শিশুকিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে প্রতিদিন প্রায় ১৩০-১৪০ জন, আবার জামিন নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ১১০-১২০ জন (ইত্তেফাক, ১৭/৮/২০১৯)। আসলে সব শহরের কাহিনিই প্রায় এক। দৈনিক ইত্তেফাকের খবরে (৭/৯/২০১৯; ২১/২/২০২০) দেখা যায়, ২০০১ সালে মূলত শুরু হয়ে গ্যাং কালচারে কিশোর অপরাধ বেড়ে যাওয়ার ফলে বিগত ১৫ বছরে খুন হয়েছে ৮৬ জন কিশোর। শুধু রাজধানীতেই রয়েছে ৮০টি গ্যাং; সব জেলায় তো আছেই আরো অসংখ্য গ্যাং। বিগত বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে প্রায় ৪০০ জন। ভ্রাম্যমাণ আদালত চালিয়েও থামানো যাচ্ছে না এদের অনেক স্থানে। এদের অধিকাংশ নাবালক ক্যাটাগরিতে পড়ায় সৃষ্টি হচ্ছে আইনগত সমস্যা। দেশের অনেক স্থানে কিশোর গ্যাং সক্রিয় হচ্ছে অসৎ মনোবৃত্তির রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে। যেমনটি হয়েছে বরগুনার রিফাত হত্যার সঙ্গে জড়িত সংঘবদ্ধ কিশোর গ্যাং (‘০০৭ বন্ড’) যার প্রধান ছিল নয়ন বন্ড নামে পরিচিত এক বখাটে কিশোর। এ এলাকায় আরো রয়েছে ‘লারেলাপ্পা’ আর ‘হানিবন্ড’-সহ কয়েকটি কিশোর গ্যাং। শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, এসব গ্র“পের সব সদস্যই মাধ্যমিক কিংবা উচ্চমাধ্যমিকে পড়ুয়া ছাত্র। এরা কিশোর অপরাধী। বিভিন্ন উদ্ভট নাম ব্যবহার করে এরা মাদক বিক্রি থেকে শুরু করে ছিনতাই, রাহাজানি, মারপিট, জমি দখল, নদী দখল, মাস্তানি এসব করে বেড়ায়। যেমন, ঢাকার মুগদা আর আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে চান-যাদু, ডেভিড কিং, ভলিয়ম টু, ভান্ডারি গ্র“প ইত্যাদি নাম নিয়ে বেশ কয়েকটি গ্যাং। রাজধানীর অন্যান্য স্থানে আরো আছে ‘লাড়া দে’, ডিসকো বয়েজ, নাইন স্টার, ফিফটিন, ব¬াক রোজ, ক্যাসল বয়েজ, ‘কোপাইয়া দে’, তালাচাবি গ্যাং, কেনাইন, তুফান, থ্রি গোল, লাভলেট, টিকটক, পোঁটলা সিফাত, ভাইপার ইত্যাদি নামে অনেক গ্যাং। এরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে। ভয়ংকর তথ্য হলো এদের বেশির ভাগ কিশোরের বয়স ১০ থেকে ২০-এর মধ্যে। তাজা টগবগে তারুণ্য কীভাবে ক্ষয়ে যাচ্ছে সবার চোখের সামনে! এদের উত্পাতে স্কুলছাত্রীকে আত্মহত্যা করার খবরও আমরা পত্রিকায় দেখেছি। কোথায় নেই কিশোর গ্যাং। রাজধানী ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রায় সর্বত্র। গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা যায়, কুমিল্লা শহরে কিশোর গ্যাংয়ের আক্রমণে নিহত হয়েছে কয়েক জন সাধারণ শিক্ষার্থী, মুরাদনগরে এরা নির্যাতন করেছে অনেক ছাত্রকে গাছে কিংবা ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে মাথায় ডিম-আটা মেখে, সিদ্ধিরগঞ্জে প্রকাশ্যে দিবালোকে স্কুলছাত্রকে বুকে-পিঠে চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছে, ৩৫টির বেশি কিশোর গ্যাং জ্বালিয়ে ছাড়ছে রংপুর শহরের অধিবাসীদের। ৬৪টি জেলা শহরসহ গ্রামেগঞ্জে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে এদের উৎপাত। নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বেও খুনাখুনি হচ্ছে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে বাধা হয়ে দাঁড়ালেই হামলা করছে একে অপরের ওপর। পাড়া-মহল্লায় এরা নিজেরাই সন্ত্রাসের প্রতিবিম্ব। নিরীহ প্রতিবেশী আর কিশোরী-যুবতি মেয়েদের মা-বাবা থাকেন নিত্য শঙ্কায়। কিশোর-তরুণ অপরাধ বেড়ে গেলে মেয়েদের শিক্ষাও অনেক জায়গায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে; স্তব্ধ হয়ে যাবে সারা বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টিকরা নারী শিক্ষার অগ্রগতি। কিশোর গ্যাংয়ের উৎপত্তির কারণ বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন রকম। স্কুল ড্রপআউট, মা-বাবাসহ পারিবারিক অবহেলা, ঘুণপোকায় ধরা সামাজিক বিচারব্যবস্থা, মাদক আর অস্ত্রের প্রভাব, রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে কিশোরদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার, আকাশ-সংস্কৃতির কুপ্রভাব, ভার্চুয়াল পরিসর বৃদ্ধি, সঠিক ধর্মীয় শিক্ষা এবং ধর্মচর্চার অভাব ইত্যাদি। তবে কারণ যা-ই হোক না কেন, তাদের পরিণতি এক। এরা প্রভাবশালীদের হাতের ক্রীড়নকে পরিণত হয়ে তাদের মাদক আর অস্ত্রের বাহক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হয়। চূড়ান্ত পরিণতি, অকালে ধরাধাম থেকে বিদায়। গ্যাং কালচারকে এখনই থামানো না হলে ছোঁয়াচে রোগের মতো সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়বে এর বিষবাষ্প। করোনা ভাইরাসের চেয়েও কম ভয়ংকর নয় এসব অপসংস্কৃতি আর বেলেল্লাপনা। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে অনুসন্ধানের মাধ্যমে বের করে আনতে হবে মূল কারণগুলো, যদিও অনেক কারণ ইতিমধ্যেই জানা হয়ে গেছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে এগিয়ে আসতে হবে এবং থাকতে হবে অগ্রভাগে; গবেষণা চালিয়ে, অপরাধবিজ্ঞানীদের সঙ্গে মতবিনিময় করে, পরিবার-অভিভাবকসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও সুশীলসমাজ/ জনগণের সঙ্গে আলোচনা করে, শান্তিশৃঙ্খলা বাহিনীর যারা কিশোর গ্যাং নিয়ে কাজ করেছেন তাদের অভিজ্ঞতাসঞ্জাত মতামত বিবেচনায় নিয়ে মন্ত্রণালয়কে সঠিক, কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি করে গ্যাং কালচার নির্মূলে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু আইনগত ব্যবস্থার ওপর ভরসা করে বসে থাকলে এ ধরনের দুরারোগ্য সামাজিক ব্যাধি সারানো যাবে না। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এককভাবে কাজটি করলেই যে প্রত্যাশিত সুফল আসবে তা ভাবারও কোনো কারণ নেই। এ মন্ত্রণালয়টি কেন্দ্রীয়ভাবে ‘লিড’ ভূমিকায় থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সাহায্য নিলে তিন মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে সারা দেশে একটি সরব সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে একক উদ্যোগে সঠিক ফল পাওয়া খুবই কঠিন। একাধিক মন্ত্রণালয় জড়িত থাকার কারণে একটি কেন্দ্রীয় কো-অর্ডিনেশন সেল থাকতে হবে। ভুলে যাওয়ার কোনো কারণ নেই যে, আমাদের দেশেই শুধু নয়, প্রায় সব দেশেই যথাবিহিত ব্যবস্থাপনা, মনিটরিং এবং ফলোআপ না থাকার কারণেই অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগের পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটে ‘ব্যর্থ উদ্যোগ’ হিসেবে। সর্বশেষে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, অচিরেই অবসান হোক কিশোর অপরাধ এবং একই সঙ্গে সব ধরনের সামাজিক অনাচার। লেখক  ঃ উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

কেশ জটিলতা!

একশ্রেণির যুবক চুল এমনভাবে কাটেন যে তাদের দুই কানের ওপরের অংশে চুল থাকেই না। কিন্তু মাথার ওপরের অংশে ঘন চুল থাকে। এই চুল বেশ দীর্ঘ হয়। হাঁটার সময় কিংবা মোটরসাইকেল চালানোর সময় এই চুল বাতাসে দুলতে থাকে। এভাবে চুল কাটানোকে ‘বখাটে কাটিং’ বলছে মাগুরা জেলার পুলিশ। এই স্টাইলে চুল না কাটতে সেলুনমালিক ও নরসুন্দরদের লিখিত নির্দেশনা দিয়েছে মাগুরা সদর থানা-পুলিশ। আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে এ বিষয়ে ব্যাপক মাইকিং, সেলুন কর্মীদের নিয়ে বৈঠকসহ নানা রকম প্রচারণা চালানো হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে সেলুন মালিকদের জানানো হচ্ছে, কোনো সেলুনকর্মী কারো চুল কিংবা দাড়ি যেন মডেলিং ও বখাটে স্টাইলে না কাটেন। তবে বিষয়টি নিয়ে নাগরিকরা নানা রকম প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। সম্প্রতি মাগুরায় কিশোর ও উঠতি বয়সের যুবকদের হাতে খুনসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, যেটির পেছনে তাদের অস্বাভাবিক জীবনযাপন ও আচরণের যোগসূত্র পেয়েছে পুলিশ। এ কারণে নতুন প্রজন্মকে সচেতন করতে এ প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, ‘মানুষের লাইফস্টাইলের সঙ্গে তার আচরণের নানা যোগসূত্র রয়েছে। অনেকে উদ্ভট পোশাক পরে এবং উদ্ভট স্টাইলে চুল কাটে, যা দৃষ্টিকটু ও অস্বাভাবিক। সেটি তার জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব অবশ্যই ফেলবে। এ কারণে এটি প্রতিরোধ করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে সবার আগে জরুরি সচেতনতা। সে কাজটিই আমরা করছি। এরই মধ্যে এর ইতিবাচক ফলও পাচ্ছে শহরবাসী।’ কিন্তু কোনো কোনো নাগরিক ভিন্ন কথা বলছেন। তাদের মতে, চুল কাটার সঙ্গে অপরাধের কোনো সংযোগ নেই। এভাবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। চুলের ছাঁট দেখে একজন অপরাধী কি না, তা কীভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব, তা মাথায় আসে না। তাছাড়া এটা নাগরিকের একদম ব্যক্তিগত ব্যাপার। আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আছে, যেগুলোতে পুলিশের নজর নেই। এতে অনেক নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার হতে পারে। আবার অনেকে পুলিশের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবেও দেখেছেন। উঠতি বয়সি অনেক ছেলেকে পরিবার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তাদের কাছে মা-বাবা অসহায়। পুলিশের এই পদক্ষেপ তাদের কাছে একটি বার্তা দিচ্ছে যে প্রশাসনের নজর তাদের ওপর আছে। এতে তাদের অপরাধপ্রবণতা কিছুটা হলেও কমবে বলে বিশ্বাস। একজন তো দেখলাম এই পুলিশ-নির্ধারিত ‘বখাটে কাটের’ বিরুদ্ধে একটি দৈনিক পত্রিকায় রীতিমতো ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। তার মতে, চুলের কোন ধরনের ‘কাট’কে ‘বখাটে কাট’ বলা হয়ে থাকে? এই ‘কাটটি’ যে ‘বখাটে কাট’ সেটি রাষ্ট্রের কোন বিধিতে কোন কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করেছে? কোনো আইনে, কোনো কর্তৃপক্ষীয় সিদ্ধান্তেÑ চুলের কোনো বিশেষ কাটকে নিষিদ্ধ ঘোষণা না করা হলে পুলিশ সেই ‘কাট’-এর বিরুদ্ধে অভিযান চালায় কীভাবে? চুলের ‘বখাটে কাট’-এর ব্যাপারটাকে প্রথমে আমার কাছে হাস্যরস মনে হয়েছিল। পত্রিকায় খবর পড়ে এখন দেখছি সেটি মোটেও হাস্যরস নয়। পুলিশ খুবই সিরিয়াস। মাগুরার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কি এতটাই ভালো যে পুলিশ কোনো কাজ না পেয়ে তরুণদের চুলের কাটের পেছনে দৌড়ঝাঁপ করছে! ডিজিটাল যুগে বাংলাদেশের যে-কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছেলেমেয়েরা বিশ্বের হালনাগাদ ফ্যাশনের খবর পেয়ে যায়। সেগুলো তারা অনুসরণ করতে চাইতেই পারে। আর চুলের কাট দিয়ে, পোশাকের স্টাইল দিয়ে কি বিশেষ কিছু ইঙ্গিত করার সুযোগ আছে? আমার তো মনে হয় না। চুলের তথাকথিত ‘বখাটে কাট’ নিয়ে পুলিশের ভূমিকার ব্যাপারে আমার প্রবল আপত্তি আছে। আজ পুলিশ চুল কাটা নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করছে, কাল পোশাক নিয়ে করবে, পরশু হাঁটার ভঙ্গি নিয়ে করবে। আমাদের তরুণরা কি পুলিশি খবরদারির মধ্যে তাদের দৈনন্দিন জীবন-যাপন করবে? পুলিশের উচিত তথাকথিত ‘চুলের বখাটে কাট নিয়ে’ ‘পুলিশি বখাটেপনা’ থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখা। আসলে চুল নিয়ে অনেকেরই অনেক রকম ‘স্পর্শকাতরতা’ আছে। এর কারণও আছে। চুল যে মানুষের শরীরের কত প্রয়োজনীয় একটি অংশ তা কেবল যার মাথায় চুল নেই, সে-ই জানে। কচ, কুন্তল, কেশÑ চুলেরই ভিন্ন ভিন্ন নাম। এই চুল নিয়ে কত কবিতা-গান-সাহিত্য হয়েছে। ঘন কালো চুল সবার নজর কাড়ে। কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায় ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা’। নন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদের লেখা গানের ভাষায়Ñ ‘একটা ছিল সোনার কন্যা/ মেঘবরণ কেশ/ভাটি অঞ্চলে ছিল সেই কন্যার দেশ’, ‘খায়রুন লো তোর লাম্বা মাথার কেশ চিরল দাঁতে হাসি দিয়া পাগল করলি দেশ’ মমতাজের এই গান তো একসময় বাংলাদেশের মানুষের মুখে মুখে ফিরত। চুল নিয়ে কার যেন এক অবিস্মরণীয় রচনা পড়েছিলাম। লেখকের নাম মনে নেই, কিন্তু রচনাটি মনে আছে : ‘কেশের সহিত আমাদিগের দৈহিক ও মানসিক, এক বাক্যে আত্মিক সম্পর্ক অতি প্রাচীন। অদ্য হইতে বহু বত্সর পূর্বে, যে সময়ে আমাদিগের পরম শ্রদ্ধেয় আদি পিতামহ/মহীগণ প্রকৃতির বুকে সদর্পে বিরাজমান ছিলেন, তৎকালে তাঁহাদের কলেবর-স্থিত কেশের প্রতুলতা বহুলাংশে তাঁহাদের কীটপতঙ্গ, আবহাওয়ার খামখেয়ালীপনা হইতে রক্ষণ করিত এবং তাঁহাদের ‘বন্য-মানব’ পরিচয়ের যথার্থতা বহন করিত। অতঃপর ‘বিবর্তন’ নাম্নী মহা ক্ষৌরকার আসিয়া আমাদিগের কলেবরে হস্তশিল্পের অদ্ভুত নমুনা প্রদর্শন করিলে, আমাদিগের কলেবরে কেশ দুর্লভ হইয়া আসিল। এই দুর্লভতার কারণেই হয়তো মানবসমাজে বর্তমানে ইহার কদর এত অধিক। মানবদেহ হইতে কেশ ব্যবচ্ছেদের মুহূর্তে প্রকৃতি দেবী ও বন্য মানব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধির কোনো কথোপকথন হইয়াছিল কি না, সে বিষয়ে কোনো প্রামাণ্য নথি উপলব্ধ নয়। উপরন্তু এই বিষয়ে কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাইবার আশাও বর্তমানে রহিয়াছে বলিয়া মনে হইতেছে না। তবে যদি কদাচিত্ এরূপ কথোপকথন সম্পন্ন হইয়া থাকে, তবে তাহা নিশ্চিত রূপে এমনতর হইবে বলিয়া মনে হয়Ñ প্রকৃতি : ওহে ধরিত্রীবাসী বর্বর সম্প্রদায়, তোমরা প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ বুদ্ধি প্রাপ্ত হইয়াছ। কিন্তু প্রকৃতি ধারে কিছু প্রদান করেন না। অতএব ‘বিনিময় প্রথা’ অনুযায়ী তোমাদিগের কলেবরস্থিত কেশ বহুলাংশে বিলুপ্ত হইবে। বন্যমানব প্রতিনিধি :যদি আপনার এ নির্ণয় অটল হইয়া থাকে, তবে মানব সমাজ যেন এই কেশের অসীম গুরুত্ব ইহাকে ‘শিরোমণি’ হিসাবে বহন করিয়া, যুগ-যুগান্তর ধরিয়া উপলব্ধি করিতে পারে। অতঃপর প্রকৃতির আশীর্বাদের ফল বর্তমানে প্রতিটি মানবের মস্তকে অতিমাত্রায় প্রকট ও বাস্তব। অতঃপর নানা কারণে বাঙালি জাতির মাঝে শেষ রজনীতে দুঃস্বপ্ন দেখিবার প্রবণতা বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। পূর্বে কেবল কন্যা দায়ভারগ্রস্ত পিতারাই মস্তকের কেশ ছিন্নবিচ্ছিন্ন করিবার অধিকার প্রাপ্ত হইতেন। বর্তমানে পিতারূপে প্রতিপন্ন হইবার বহু পূর্বেই, যুবাবস্থাতেই সেই অধিকার প্রাপ্ত হইতেছেন। প্রকৃতি দেবী কোন অপরাধের শোধ লইতেছেন, সেই চিন্তায় নিমগ্ন রহিয়া অবশিষ্ট কেশগুচ্ছকেও ঝরানো বাঙালির ধ্যান-জ্ঞান হইয়া উঠিয়াছে। অবশ্য বাঙালি মাত্রেই যেহেতু, ‘গোঁফের আমি, গোঁফের তুমি, গোঁফ দিয়ে যায় চেনা’ আদর্শে দীক্ষিত এবং গোঁফ ও কেশ যখন প্রায় সমার্থক, এমত পরিস্থিতিতে এরূপ গুরুতর সমস্যায় চিন্তামগ্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক। ‘কেশ লইয়া মানবসমাজের এই দুশ্চিন্তা অমূলক নহে, কেশ কেবলমাত্র সৌন্দর্য নহে, পরাভবের ও প্রতীক। প্রাচীনকাল হইতে বর্তমান পর্যন্ত রচিত বিবিধ পুস্তকে কেশের মাহাত্ম্য বিদ্যমান। স্মরণ করিয়ে দেখ, মহাদেব তাহার কেশের জটাজালেই দেবী গঙ্গাকে ধারণ করিয়াছিলেন। বিদেশি উপকথায়ও কেশের মাহাত্ম্য বর্ণিত রহিয়াছে। রাজতনয়া রাপুঞ্জেল তাঁহার কেশের সহায়তায় যে অসাধ্য সাধন করিয়াছিলেন, তাহা সর্বজনবিদিত। বাস্তবের প্রেক্ষাপটেও পরিলক্ষিত হয়, বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানবিদ আইনস্টাইন, কবিশ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রনাথ, তাঁহাদের কেশসজ্জা তাহাদেরই ন্যায় দুর্লভ।’ ‘বলাবাহুল্য, বর্তমান মানবসমাজ তাহাদের কেশের (অবশিষ্ট) গুরুত্ব বুঝিয়াছে। এই বোধগম্যতার সূত্র ধরিয়াই বিভিন্ন কেশতৈল ও অন্যান্য কেশসংক্রান্ত প্রসাধন দ্রব্যের উদ্ভব ঘটাইয়া মানবসমাজ তাহাদের দুর্মূল্য সময় ও অমূল্য মস্তিষ্কের ক্ষয়সাধন করিয়া চলিতেছে। তবে বিশেষ আশার কোনো কারণ অবশিষ্ট নাই। পৃথিবী টিকিয়া থাকিলে, বিবর্তনের ধারায় আমাদিগের অবশিষ্ট কেশগুচ্ছও যে কেবলই জাদুঘরের শোভাবর্ধন করিবে, তাহার পূর্বাভাস আমরা প্রাণী তত্ত্ববিদদের নিকট হইতে প্রাপ্ত হইয়াছি।’ ছোটোবেলায় আমরা গ্রামে দেখেছি, মাঝে মাঝে ফেরিওয়ালার আগমন ঘটত। ছেঁড়া স্যান্ডেল, জুতা, বোতল ভাঙা, চিমনি ভাঙা, লোহা লক্কর দিয়ে ‘কটকটি’ নামক আজব এক জিনিস খেতাম। এখন সময় বদলেছে। কেশের বিনিময়ে এখন ফেরিওয়ালারা অনেক জায়গায় চুল সংগ্রহ করেন। কোনো রকম জিলেপি কিংবা কটকটির বিনিময়ে নয়, নগদ টাকার বিনিময়ে তা কিনে নেন। তবে বখাটে ছাঁট, এই ছাঁট, ঐ ছাঁট বন্ধ না করে সবার জন্য চুল রাখা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে এবং প্রতি দুই বছর পরপর সেই চুল বিক্রি করার একটা বিধানও চালু করা যেতে পারে। এতে ‘বখাটে ছাঁট’ যেমন বন্ধ হবে, চুল বিক্রি করে কিছু আয়-রোজগারেরও একটা ব্যবস্থাও হতে পারে। জাতীয় প্রবৃদ্ধিতেও তা অবদান রাখতে পারে। বিষয়টি সংশি¬ষ্টরা ভেবে দেখতে পারেন। লেখক ঃ রম্যরচয়িতা

 

 

করোনাকালে কেমন আছেন ইউরোপ প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা?

কোভিড-১৯ নিঃসন্দেহে বর্তমান শতাব্দীর সবচেয়ে বড় দুর্যোগের নাম। কোনও ধরণের অস্ত্র নয়, নয় কোনও ধরণের পারমাণবিক যুদ্ধ; সামান্য কয়েক ন্যানোমিটারের এক ক্ষুদ্র আলোক আণুবীক্ষণিক বস্তুর কাছে গোটা পৃথিবীর মানুষ আজ অসহায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত গোটা বিশ্বের ২১৩টি দেশ ও অঞ্চলে নিষ্ঠুর থাবা বসিয়েছে এ করোনা ভাইরাস। একদিকে প্রতিনিয়ত যেখানে নতুন করে গোটা পৃথিবীতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিনিয়ত ঝরে যাচ্ছে অসংখ্য প্রাণ। এছাড়াও কোভিড-১৯ পরিস্থিতি গোটা পৃথিবীকে এক বিশাল অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে যা আগামী দিনগুলোতে আমাদের সকলের জন্য হতে চলেছে এক বিশাল অর্থনৈতিক বিপর্যয়। গত ৩১শে জানুয়ারি ইউরোপে প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়। ইতালির রাজধানী রোমে সর্বপ্রথম এক চীনা পর্যটকের শরীরে এ ভাইরাসের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। দুই মাসের ব্যবধানে পুরো ইতালির চিত্র সম্পূর্ণরূপে বদলে যায়। মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় গোটা ইতালি এবং এক সময় প্রতিবেশি ফ্রান্স, স্পেন, অস্ট্রিয়াসহ ধীরে ধীরে সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে ইউরোপে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসলেও গত জুনের শেষ সপ্তাহ থেকে ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে আবারও করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরু হতে থাকে। অনেকে একে করোনার সেকেন্ড ওয়েভ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, গ্রিস, মন্টিনিগ্রো, অস্ট্রিয়া এ সকল দেশ প্রথম ধাপে করোনা মোকাবেলায় যেখানে ছিলো অনেকটা সফল দ্বিতীয় ধাপে এ সকল দেশকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে। ইউরোপে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটা বড় অংশ শিক্ষার্থী। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি বলতে গেলে তাদের গলায় ফাঁসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও যারা বিভিন্ন স্কলারশিপ প্রোগ্রামের অধীনে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশুনা করছেন, তারা তুলনামূলক স্বস্তিতে আছেন। প্রথমত করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধ করার জন্য ইউরোপের দেশগুলো লকডাউন কিংবা জরুরি অবস্থা জারি করে যার পরিপ্রেক্ষিতে পাবলিক প্লেসগুলোতে মানুষের যাতায়াতের ওপর এক ধরণের বিধিনিষেধ আরোপিত হয়। ইউরোপে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটা বড় অংশ নিজের খরচে পড়াশুনা করেন যাদেরকে আমরা সেলফ ফাইন্যান্সিং স্টুডেন্ট হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকি। এদের অনেকে লেখাপড়ার পাশাপাশি পার্টটাইম কাজ করেন। মূলত নিজেদের থাকা-খাওয়ার খরচ মেটানোর জন্য তারা অবসর সময়ে বিভিন্ন ধরণের পেশাভিত্তিক কাজের সন্ধান করে থাকেন ইউরোপে আসার পর। অনেকে আবার পার্টটাইম কাজের মাধ্যমে নিজেদের টিউশন ফি জোগাড়ের এক প্রচেষ্টা চালান। ইউরোপে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের বড় অংশ কাজের জন্য বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট কিংবা কফিশপ অথবা পানশালাকে বেছে নেন। কেননা রেস্টুরেন্ট কিংবা কফিশপ অথবা পানশালায় কাজ করতে হলে তেমন কোনও শারীরিক পরিশ্রমের প্রয়োজন পড়ে না এবং ওয়েটার ছাড়া অন্য কোনও পদে কাজ করতে হলে স্থানীয় ভাষা কিংবা বিশেষ কোনো দক্ষতার প্রয়োজন পড়ে না। লকডাউন কিংবা জরুরি অবস্থার কারণে বেশিরভাগ রেস্টুরেন্ট, কফিশপ এবং পানশালাগুলো বন্ধ থাকায় তাদের অনেকে বলতে গেলে একটা দীর্ঘ সময় কর্মহীন অবস্থার মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করেছেন। যদিও করোনা পরিস্থিতিতে ইউরোপের অনেক দেশের সরকার ঘোষণা দেয় যাদের বৈধ ওয়ার্ক পারমিট রয়েছে এবং কোনও একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তিবদ্ধভাবে যারা কাজ করেন তাদেরকে এ লক ডাউন পরিস্থিতির মাঝেও বেতনের একটা নির্দিষ্ট অংশ পরিশোধ করার জন্য যদিও সে সময় কারো কাজ না থাকে। তবে তা শিক্ষার্থীদের জন্য তেমন একটা আশার খবর বয়ে আনতে পারেনি কেননা তারা কেউই ফুলটাইম ওয়ার্কার না এবং বেশিরভাগ দেশগুলোতে তাই এরা কোনও ধরণের চুক্তি ছাড়াই কাজ করে থাকে। ইউরোপের কিছু দেশ সরকারিভাবে সে দেশে অবস্থানরত সকল শিক্ষার্থীদেরকে আর্থিকভাবে সহায়তার সিদ্ধান্ত নেয় কিন্তু সেটা উল্লেখযোগ্য কোনও কিছু নয় সে অর্থে। যেমন- স্লোভেনিয়ার বর্তমান সরকার করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে সে দেশে বসবাসরত শিক্ষার্থী যাদের স্লোভেনিয়ার পার্মানেন্ট রেডিসেন্ট কার্ড রয়েছে তাদের সবাইকে এপ্রিল এবং মে এ দুই মাস ১৫০ ইউরো করে আর্থিক অনুদানের ঘোষণা দেয় কিন্তু ১৫০ ইউরো বলতে গেলে স্লোভেনিয়াতে কারও এক মাস চলার জন্য খুব একটি বড় অ্যামাউন্ট না। অনেক দেশের সরকারের পক্ষ থেকে সে দেশের স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক সুবিধা দেওয়া হলেও ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদের জন সে রকম আর্থিক সহায়তা ছিলো না বললেই চলে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো একককালীন যে অর্থ সহায়তা প্রদান করে সেটাও তেমনভাবে উল্লেখ করার মতো কোনও বড় একটি অ্যামাউন্ট ছিলো না। অন্যদিকে বাংলাদেশের ব্যাকিং পলিসির কারণে সরাসরি বিদেশ থেকে বাংলাদেশে টাকা পাঠানো সম্ভব হলেও বাংলাদেশ থেকে বিদেশে চাইলে কেউ টাকা পাঠাতে পারেন না। তাই এ পরিস্থিতিতে অনেকে বাধ্য হয়ে হুন্ডির আশ্রয় নেন। সেক্ষেত্রে যে বিষয়টি উঠে আসে তা হলো নিকটস্থ কারও সন্ধান করা যিনি বাংলাদেশে টাকা পাঠাবেন। তিনি সে টাকা বাংলাদেশে না পাঠিয়ে সরাসরি তার হাতে তুলে দেন এবং বাংলাদেশে থেকে তার পরিবারের কোনও সদস্য ঐ লোকের বিশ্বস্ত কারও কাছে এর সমপরিমাণ অর্থ (বাংলাদেশের টাকায় যেটা হয় তা) পৌঁছে দেন। এতে সরকারের রেমিট্যান্স প্রবাহে ঘাটতি তৈরি হয়। কিন্তু কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে যেহেতু দীর্ঘদিন অনেকের কাজ ছিলো না এবং একই সাথে আমাদের দেশের ব্যাংকিং পলিসির কারণে অনেকের পক্ষে বাংলাদেশ থেকে টাকা আনা সম্ভব হয় নি। অনেকের পরিবারের আবার সে সামর্থ্যটুকু নেই। এখন ইউরোপে গ্রীষ্মকাল চলছে। ইউরোপের অর্থনীতির একটা বড় অংশ আসে ট্যুরিজম থেকে। বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় ইউরোপে এ সময় ট্যুরিজম সেক্টরটি সবচেয়ে বেশি চাঙ্গা থাকে। তবে এ বছর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন, ফলে লকডাউন কিংবা জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার পরও অনেকে কাজে ফিরতে পারছেন না। অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে তাদের অনেক কর্মীকে ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছেন। এমন একটা পরিস্থিতির মাঝখানে যখন আমরা দাঁড়িয়ে তখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দ্বিতীয় ধাপে করোনার সংক্রমণ যেনও মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। আগামী সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবরে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে চলেছে। যেহেতু ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ফের করোনার আঘাত এসেছে এবং প্রতিনিয়ত নতুন করে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তাই বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর মনে একটা প্রশ্ন আগামী সেমিস্টারের শিক্ষা কার্যক্রমও কী অনলাইনে পরিচালিত হবে? যদি গেলো সেমিস্টারের মতো আগামী সেমিস্টারের শিক্ষা কার্যক্রম অনলাইনে পরিচালিত হয় সে ক্ষেত্রে তাহলে বিদেশে অবস্থান করার যৌক্তিকতা কতোটুকু? কিংবা সে ক্ষেত্রে কেন বা পুরো টিউশন ফি প্রদান করতে হবে? কিংবা করোনা পরিস্থিতিতে যে কোনও সময় যদি কোনও দেশের দরকার বলে বসে এখনই সে দেশে অবস্থানরত বিদেশি শিক্ষার্থীদেরকে সে দেশ থেকে চলে যেতে হবে? জেরিন ফাতেমা, একজন প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যিনি বর্তমানে হাঙ্গেরিতে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব ডেব্রেসেন থেকে ডেটা সায়েন্সের ওপর ব্যাচেলর সম্পন্ন করছেন। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি অন্যান্য অনেকের মতো তার জীবনকে অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়েছে। ইউনিভার্সিটিকে তিনি আবেদনে জানিয়েছেন, এ পরিস্থিতি বিবেচনায় তাকে যেনও টিউশন ফি এর ব্যাপারে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়। কিন্তু ইউনিভার্সিটি তার এ আবেদনে সাড়া দেয়নি। ফলে এক ধরণের হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন তিনি। ইকরাম হোসাইন একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, যিনি বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি দি লিব্রে ব্রাসেলস থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করছেন মাইগ্রেশন, রাইটস অ্যান্ড পলিসি বিষয়ে। তার সাথে কথা বলে জানা গেলো যে, বেলজিয়ামের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশুনা করতে হলে কোনও ধরণের টিউশন ফি প্রদান করতে হয় না। তবে প্রত্যেক বছর টেম্পোরারি রেসিডেন্ট রিনিউ করার ক্ষেত্রে বেলজিয়ামের কোনও ব্যাংকে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা করতে হয়, যেটাকে আমরা অনেকে সচরাচর ব্লক অ্যাকাউন্ট বলে থাকি। করোনা পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন তিনি কাজে যেতে পারেন নি, এমনকি এখনও যে তিনি স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরে আসতে পেরেছেন এমনটি নয়। অন্যদিকে, এ মুহূর্তে তার পরিবারের অবস্থা তেমন একটা আশানুরূপ নয়। ফলে ব্লক অ্যাকাউন্টের জন্য যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন সেটা জোগাড় করতে এখন তিনি হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে টেম্পোরারি রেসিডেন্ট পারমিট রিনিউ করতে পারার বিষয়টি নিয়ে তিনি এক ধরণের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। জেরিন ফাতেমা এবং ইকরাম হোসাইনের মতো অনিশ্চয়তায় ইউরোপে বসবাসরত অসংখ্য প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যারা মূলত নিজ খরচে পড়াশুনা করার জন্য ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কেউ রীতিমতো চিন্তিত পরবর্তী সেমিস্টারের টিউশন ফি পরিশোধ নিয়ে, কেউবা আবার চিন্তিত টেম্পোরারি রেসিডেন্ট পারমিট রিনিউ করা নিয়ে। আবার যেহেতু এখনও অনেকে পুরোভাবে পার্টটাইম চাকরিতে ফিরতে পারেননি এবং বাংলাদেশের ব্যাংকিং পলিসির কারণে দেশের থেকেও সেভাবে টাকা আনা সম্ভব হয় না, তাই অনেকে অর্থনৈতিকভাবে চরম দুর্দশার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাদের ভবিষ্যৎ, অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে ইউরোপে তাদের টিকে থাকা। কেউ আবার দেশে ফিরে যেতে চাইছেন। এ অবস্থায় অনেকে আমাদের দেশের সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন যাতে বাংলাদেশ সরকার ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারের সাথে আলোচনার মাধ্যমে এ সকল বিষয়ে একটা কার্যকরী সমাধানের পথ বের করতে পারে। লেখক: রাকিব হাসান রাফি, শিক্ষার্থী দ্বিতীয় বর্ষ, ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিক্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া।

চীনা শিল্পপণ্য ও যুদ্ধাস্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ

বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স সরঞ্জামের ক্ষেত্রে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার বাজার চীনা পণ্যের দখলে। তবে দু’দেশের সীমান্তে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার পর চীনা পণ্য বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত চীনা পণ্যের একচেটিয়া বাজার। এর আগে জাপান, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ  কোরিয়ার পণ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল বাংলাদেশ। গত এক দশক তা এখন চীনের দখলে। এর প্রধান কারণ- দেখতে একই রকম পণ্য তারা অনেক সাশ্রয়ী মূল্যে বিক্রি করে। এতে ক্রেতার চেয়ে অবশ্য ব্যবসায়ীরা অনেক বেশি লাভবান হচ্ছেন। একই পণ্য কম দামে তারা চীন থেকে  তৈরি করিয়ে এনে বিরাট মুনাফা করছেন। তবে এতদিনে ক্রেতা সাধারণ একটা জিনিস বুঝে গেছে- চীনা পণ্য মানেই স্বল্প স্থায়ী বা ঠুনকো। এটা শুধু ইলেকট্রনিক্স সরঞ্জামের বেলায় প্রযোজ্য নয়, অস্ত্র এবং গোলা বারুদের বেলায়ও সমানভাবে প্রযোজ্য। এমনকি গন্তব্যে পৌঁছাবার আগেই তা বিকল হওয়ার নজির আছে। ২০০১ সাল পর্যন্ত চীন বাংলাদেশে একপ্রকার পরিতাজ্য ছিল। একই বছরের ১ অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট নির্বাচনে জয়লাভ এবং ১০ অক্টোবর সরকার গঠন করে। এরপরই চীনের বরাত খুলে যায়। খালেদা জিয়ার সরকার চীনের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করতে সময় নেয়নি। দীর্ঘ পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে তারা দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সরঞ্জামের জন্য চীনের সঙ্গে বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। পরবর্তীতে এসব চুক্তির দায় আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর বর্তায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে চীন পাকিস্তানের পক্ষ নেয়ায় তাদের ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধে  নেতৃত্বদানকারি দলটির নেতিবাচক মনোভাব ছিল। কিন্তু পূর্ববর্তী সরকারের বোঝা টানতে গিয়ে চীনের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। পরবর্তীতে নিজেরাও চীনের কাছ থেকে দুটি সাবমেরিন ও একাধিক যুদ্ধজাহাজ ক্রয় করে। এ ক্ষেত্রে ক্রয়ের চেয়ে ক্রয় করতে বাধ্য হয় বলা ভালো। কারণ ইতিমধ্যে মায়ানমার চীনের কাছ  থেকে দুটি সাবমেরিন ও অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র লাভ করে। একে হুমকি হিসেবে  দেখে বাংলাদেশ। এ ব্যাপারে আপত্তি জানালে চীন বাংলাদেশের কাছেও সাবমেরিন বিক্রির প্রস্তাব দেয়। এক প্রকার বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ ওই প্রস্তাব গ্রহণ করে। চীনের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সম্পর্কে তারা ওয়াকিবহাল। কিন্তু সংযুক্ত সীমানা না থাকায় সম্প্রসারণবাদী দেশটি বাংলাদেশের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করতে পারে না। তবে তাদের এ সমস্যার সমাধান করে দিয়েছে দু’দেশের সীমান্তবর্তী রাষ্ট্র মিয়ানমার। চীন এখন মিয়ানমারকে ব্যবহার করে বাংলাদেশকে বশে রাখার চেষ্টা করছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। এ কারণে ধারণা করা হয় মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা বিতাড়নের ব্যাপারে চীনের সমর্থন ছিল। তাছাড়া যে অঞ্চল থেকে রোহিঙ্গাদের উৎখাত করা হয়েছে তার কাছাকাছি এলাকায় চীন দূর সমুদ্র বন্দর তৈরি করছে। বাস্তবে চীনের অস্ত্র বা সরঞ্জাম কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা হচ্ছে গুণগত মান। একেতো চীন বাংলাদেশের কাছে বহুল ব্যবহৃত যুদ্ধ সরঞ্জামও বিক্রি করছে, অপরদিকে কোন কোন অস্ত্র নাকি চালু করার আগেই বিগড়ে যাচ্ছে। এরপরও চীন তাদের পণ্য ক্রয়ের জন্য নানারকম লোভনীয় শর্তের পাশাপাশি জুজুর ভয় দেখাচ্ছে। শুধু পুরনো নয়, চীনে তৈরি নতুন সরঞ্জাম নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে চীনা নৌবাহিনীর সর্বাধুনিক যুদ্ধজাহাজে কোন কারণ ছাড়া ভয়াবহ আগুন লেগে যাওয়ার পর থেকে সন্দেহের তীর শাণিত হচ্ছে। ২০২০ সালের ১১ এপ্রিল সকালে, সাংহাই ডকইয়ার্ডে পিএলএ নেভির এলএইচডি’তে আগুন লাগে। প্রথমে রিয়ার হ্যাঙ্গার খোলার পরে ধোয়া বেরিয়ে আসতে দেখা যায় এবং দ্বীপের সুপার স্ট্রাকচারের কাছ দিয়ে তা উপরে উঠতে থাকে। এরপর আগুন নিভে গেলেও শিপইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে কিছু বলেনি। দশ দিনের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজটির সুপার স্ট্রাকচারের কালো চিহ্নগুলি মুছে  ফেলা হয় এবং গত ২২ এপ্রিল পিএলএ নেভির নতুন মডেলের যুদ্ধ জাহাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য তা পুরোপুরি প্রস্তুত করা হয়। তবে  ধোঁয়ার তীব্রতা একটি বড় অগ্নিকাণ্ডের ইঙ্গিত দেয় যা উল্লেখযোগ্য ক্ষতিসাধন করে থাকতে পারে। অগ্নিকাণ্ডটি নির্বাপিত হওয়ার পর চীনা শিপইয়ার্ডগুলির উপাদান, কারিগরির গুণগতমান, শিল্প সুরক্ষা রীতি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের প্রতি তাদের আনুগত্য নিয়ে প্রশ্নগুলি পুনরায় জাগ্রত হয়েছে। নব্বয়ের দশকে একপ্রকার খালি হাতে শুরু করে চীনের আজ শীর্ষস্থানীয় শিল্প নির্মাতা হওয়ার পিছনে দেশটির জাহাজ নির্মাণ শিল্পের ব্যাপক অবদান রয়েছে। জাহাজ নির্মাণ শিল্পটি বেসামরিক অর্থনীতি এবং চীনের প্রতিরক্ষা শিল্প কমপ্লেক্সের মধ্যে যোগসূত্র গড়ে তুলেছে। জাহাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে চীন আজ বিশ্ববাজারে আধিপত্য বিস্তার করেছে। চীনের শিপইয়ার্ডগুলো দ্রুততর সময়ে যুদ্ধ ও বাণিজ্যিক উভয় জাহাজ বিনির্মাণের যোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এ ব্যাপারে বেশ কয়েক বছর ধরে, বিশ্বব্যাপী বিশেষজ্ঞদের মনে বিভিন্ন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। যদিও চীনারা তাদের শিপইয়ার্ডের দুর্বল উপাদান এবং কারিগারি অদক্ষতার অভিযোগ জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা আন্তর্জাতিক মান লঙ্ঘনের অভিযোগও কঠোরভাবে খণ্ডন করে। তবে অতি অল্প সময়ে তাদের এই অর্জন সম্পর্কে সন্দেহ (বিশেষত যুদ্ধজাহাজের নকশা ও নির্মাণের মত জটিল ক্ষেত্রে) যায়নি। একাধিক সংস্থা দেশীয়ভাবে নির্মিত পিএলএ নৌবাহিনীর জাহাজগুলির নির্মাণ ও যুদ্ধ দক্ষতা বিশ্লেষণ করার জন্য নানারকম প্রচেষ্টা চালিয়েছে। তবে চীনে সরকারী-সামরিক-শিল্প জটিল জটিল কাজগুলি অস্বচ্ছভাবে করায় সঠিক মূল্যায়ন করা যায় না। এ কারণে চীনা শিপইয়ার্ডগুলোতে আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের জন্য যে যুদ্ধজাহাজ তৈরি করা হচ্ছে তার সামর্থ্য যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতা দেশ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। পাকিস্তান সম্প্রতি চীন থেকে ৮টি ইউয়ান শ্রেণির সাবমেরিন সংগ্রহের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়। প্রথম চারটি সাবমেরিন চীনের শিপবিল্ডিং ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশনের (সিএসওসি) অধীনে নির্মাণ করা হবে। অপর চারটি সাবমেরিন করাচি শিপইয়ার্ড এ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস ( কেএসএইডব্লিউ)’তে সংযোজন করার কথা। কিন্তু করাচিতে সাবমেরিন সংযোজনের ব্যাপারে আপত্তি তুলেছে জার্মানির এমটিইউ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। কারণ, এই কোম্পানির উদ্ভাবিত ডিজেল ইঞ্জিনই চীনের সাবমেরিনে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ২০০২ সালে জার্মানির এমটিইউ’র সঙ্গে চীনের নরিনকো কোম্পানি সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী চীন কেবল অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য এই মডেলের ইঞ্জিন ব্যবহার করতে পারবে। তাই জার্মানি পাকিস্তানের কাছে এই ইঞ্জিন বিক্রির ব্যাপারে আপত্তি জানাচ্ছে। কেননা তা চুক্তি লঙ্ঘনের সামিল। বিপদ বুঝে পাকিস্তান এখন জার্মানিকে তাদের ৮টি সাবমেরিনের ইঞ্জিন রফতানির ওপর বিধিনেষেধ শিথিল করার অনুরোধ জানাচ্ছে। চীন ও পাকিস্তান উভয়ই তাদের মধ্যে ইস্পাতের মত কঠিন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের দাবি করে। তবে  এই সম্পর্ক যে মোটেই স্বার্থবিহীন নয়, চীনা নির্মিত এফ ২২ পি ফ্রিগেটগুলির পুননির্মাণের অনুরোধ জানানোর সময় সেটা পরিষ্কার হয়। এই জাহাজগুলি বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ত্রুটিযুক্ত। এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠার জন্য পাকিস্তান নৌবাহিনী ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে জাহাজগুলির মিড-লাইফ আপগ্রেড বা পুননির্মাণের জন্য চীনের সিএসটিএসকে অনুরোধ করে। কোন লাভ না থাকায় তারা এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি। ফলে পাকিস্তান তুরস্কের সাহায্য নিতে বাধ্য হয়। ২০১৯ সালের জুনে চীন শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীকে (এসএলএন) একটি যুদ্ধ জাহাজ উপহার দেয়। ২,৩০০ টনের প্রথম শ্রেণির ডিকমিনেশনড ফ্রিগেটটি শ্রীলঙ্কার কাছে হস্তান্তর করার আগে এর মিসাইল এবং সিআইডব্লিউএস সিস্টেমটি খুলে নেয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালের ২৫ জুন জাহাজটি (এসএলএনএস পরক্রমবাহু) সাংহাই থেকে যাত্রা করে। তবে এতে বড় ধরনের অপারেশনাল ত্রুটি থাকায় এটি বন্দর দিয়ে প্রবেশের আগে জরুরি মেরামতের কাজ শুরু করতে হয়েছিল। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ ছিল, এই সময়ে বাংলাদেশ আমদানি করা মোট অস্ত্রের ৮২% ছিল চীন থেকে সংগ্রহ করা। স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই) জানায়, চীন ৩৫টি  দেশে অস্ত্র রফতানি করেছে এবং এরমধ্যে বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক। চীন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী। তাদের বেশিরভাগ অস্ত্র সশস্ত্র বাহিনী ব্যবহার করে। এর পাশাপাশি কিছু যুদ্ধবিমানও চীন থেকে কেনা হয়। চীন থেকে অস্ত্র কেনার মূল দুটি কারণ হচ্ছে লাভজনক ঋণ ব্যবস্থা এবং সাশ্রয়ী মূল্য। জানা যায়, উদার ঋণ ব্যবস্থা এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্য ছাড়ের কারণে গত এক দশকে চীন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান অস্ত্রদাতায় পরিণত হয়ে ছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে চীন থেকে রেয়াতি মূল্যে কেনা দুটি ০৩৫ জি মিং ক্লাস সাবমেরিন (বিএনএস নবজাত্রা এবং বিএনএস জয়যাত্রা) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যার প্রতিটি ১০০ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি করা হয়েছিল। ২০০৩ সালের এপ্রিলে পিএলএ নেভি মিং ক্লাস সাবমেরিন ৩৬১ পীত সাগরে যান্ত্রিক গোলযোগে পড়ে বলে জানা যায়। এছাড়া বাংলাদেশ  নৌবাহিনী (বিএন) চীন থেকে ২০টিরও বেশি যুদ্ধ জাহাজ সংগ্রহ করেছে। এর কয়েকটিতেও ত্রুটি ধরা পড়েছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী সম্প্রতি শেনজিয়া শিপইয়ার্ড থেকে দুটি চীনা যুদ্ধ জাহাজের  (বিএনএস উমর ফারুক এবং বিএনএস আবু উবাইদাহ) ডেলিভারি নিয়েছে। উভয় জাহাজ একাধিক ত্রুটি নিয়ে ২০২০ সালে মংলা বন্দর পৌঁছায়। সমুদ্রে পরীক্ষার সময়, জাহাজ দুটির নেভিগেশন রাডারে ত্রুটি ধরা পড়ে। এসব র‌্যাডার প্রয়াজনীয় উপদান সনাক্ত করতে সক্ষম নয়। এসব কারণে চীনে তৈরি পণ্য দিন দিন বিতর্কিত হচ্ছে। কোভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে অনেক ক্লায়েন্ট দেশ চীন সফর বাতিল এবং তাদের দেশে চীনা নাগরিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। যথাসময়ে উৎপাদন এখন চীনের জন্য দুঃস্বপ্ন। উহানের উচাং শিপইয়ার্ডের কাছাকাছি মিলিটারি ডিজাইন ইনস্টিটিউটের অবস্থান হওয়ায় নৌ প্রকল্পগুলি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাস্তবায়নের আওতাধীন প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে কেবল মালয়েশিয়া এবং বাংলাদেশ  নৌবাহিনীর জন্য রফতানি প্রকল্পে আনুমানিক ৮০০ মিলিয়ন ডলার  লোকসান হয়েছে। কোভিড-১৯-এর কারণে থাইল্যান্ড চীন থেকে ২২ বিলিয়ন ডলারের ইউয়ান ক্লাসের (টাইপ ০৪১) দুটি সাবমেরিন কেনার পরিকল্পনা বাতিল করেছে। সাম্প্রতিক একটি সিএসআইসি প্রতিবেদনে বলা হয়, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে চীনের নতুন আন্তর্জাতিক শিপিং চুক্তি বাতিলেরও সম্ভাবনা রয়েছে। অবশ্যই ধোঁয়াশা কেটে গেলে একটি পরিষ্কার চিত্র ফুটে উঠবে। কিন্তু ততদিন চীনের ভাবমূর্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে বাধ্য ।

৫০ বছর ধরে গণহত্যার ক্ষত বাংলাদেশে, ক্ষমা চায়নি পাকিস্তান

বাংলাদেশের মানুষের কাছে বেশ পরিচিত একটি নাম ‘অপারেশন সার্চলাইট’। ২৫ মার্চ রাতে পাক হানাদার বাহিনী ভারি অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরীহ-নিরস্ত্র বাংলাদেশের মানুষের উপর। পরবর্তী ৯ মাস ধরে চলে এই হত্যাযজ্ঞ, যার জন্য আজও ক্ষমা চায়নি পাকিস্তান। বাংলাদেশে সংগঠিত নৃশংসতম এই হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার না করে উল্টো বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার কথা বলে দেশটি। ৫০ বছর ধরে জ্বলতে থাকা ছেলে হারা মায়ের হৃদয়ের জ্বালা না মিটিয়ে বর্বর এই গণহত্যাকে ভুলে কিভাবে তা সম্ভব! ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ ঢাকা-সহ বর্তমান বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রাম ও শহরে চালানো ধ্বংসযজ্ঞকে আজও স্বীকৃতি দিলো না জাতিসংঘ। চীন ও আমেরিকার সক্রিয় বিরোধিতাই অগণিত মানুষের নৃশংস হত্যাকাণ্ডতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বড় বাধা। অথচ বাংলাদেশের তরফ থেকে বারবার দাবি তোলা হয়েছে পাক-বাহিনীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের স্বীকৃতির জন্য। কিন্তু ৫০ বছরেও তা মেলেনি। জাতিসংঘ কোন এক অজানা প্রভাবে আজও গণহত্যা বা জেনোসাইড না মানলেও খোদ পাকিস্তানি সাংবাদিকের বিবরণেই ধরা পড়ে সেদিনের গণহত্যার বিবরণ। পশ্চিমা দুনিয়ার গণমাধ্যমে ফুটে ওঠে সেই নৃশংস গণহত্যার ছবি। ডেইলি টেলিগ্রাফে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গণহত্যা বা জেনোসাইডের প্রতিবেদন স্পষ্ট করে উপস্থাপন করেন সাইমন ড্রিং। রাত ১০-টা নাগাদ শুরু হয় পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ। ঢাকার পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশলাইন, নীলক্ষেত এলাকায় ব্যাপক আক্রমণ চালায় পাক-হানাদাররা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। জহুরুল হক হলের প্রায় ২০০ ছাত্রকে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে হত্যাকরে পাকবাহিনী।  রাতভর চলে গণহত্যা। আর্চার কে ব্লাড এর বই ‘দ্য ক্রুয়েল বার্থ অফ বাংলাদেশ’ বইটিতে বলা হয়েছ, ছাত্রীনিবাস রোকেয়া হলে আগুন ধরিয়ে শ-তিনেক ছাত্রীকে সে রাতে হত্যা করা হয়।  রাজারবাগে গ্যাসোলিন ছিটিয়ে ভস্মীভূত করা হয় পুলিশ সদর দফতর। এক রাতে খুন করা হয় ১১০০ বাঙালি পুলিশকে। শুধু ঢাকাই নয়, রাতভর গণহত্যা চলে গোটা পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান সরকারের  শ্বেতপত্রেই স্বীকার করা হয়েছে ‘১৯৭১ সালের ১লা মার্চ থেকে ২৫শে মার্চ রাত পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি মানুষের জীবননাশ হয়েছিল।’ ২৫ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় গণহত্যা। অবশ্য এর আগেও চলেছে পাক-বাহিনীর বর্বরতা । পরেও চলে। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি  সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত পদ্মা-মেঘনার পানি রক্তবর্ণ ধারণ করে বাঙালির রক্তে। পাক-বাহিনীর স্থানীয় সহোদর আলবদর ও রাজাকারদের চক্রান্তে বাংলা মায়ের কোল খালি হতে থাকে। আত্মসমর্পণের আগ-মুহূর্তেও বন্ধ হয়নি হত্যাযজ্ঞ। ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের দুদিন আগে বুড়িগঙ্গার পারে শ-দুয়েক বুদ্ধিজীবীকে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানিরা।  মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ওপর ৯ মাস ধরে চলে নির্মম আক্রমণ। পাকিস্তানের এই কর্মকাণ্ডে আমেরিকা ও চীন সমভাবে মদত দিয়েছে। বাঙালির কোল খালি করতে ব্যবহৃত হয়েছে মার্কিন ও চীনা সমরাস্ত্র। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বৈশ্বিক শতবিরোধিতার মধ্যেও মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থন ও সহযোগিতা জুগিয়েছে। রুশ সংবাদমাধ্যমেই বলা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পূর্ব পাকিস্তানে ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ধর্ষিতার সংখ্যা চার লাখ। ২৫ মার্চের গণহত্যার বিষয়ে বহুদিন অন্ধকারে ছিলেন পশ্চিমা দুনিয়ার মানুষ। পাকিস্তানি সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের একটি প্রতিবেদন সানডে টাইমস-এ প্রকাাশিত হতেই দুনিয়ার মানুষের কাছে ফুটে ওঠে ভয়ঙ্কর নৃশংসতার ছবি। বিবিসি-র সাংবাদিক মার্ক ডুম্মেটের মতে, এই প্রতিবেদনই বদলে দেয় ইতিহাসের গতিধারা। ১৯৭১ সালে ১৩ জুন প্রকাশিত লন্ডনের সানডে টাইমস-কে হাতিয়ার করে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি বিশ্ব নেতৃত্বের সামনে তুলে ধরেন গণহত্যার বিবরণ। সানডে টাইমস-এ জেনোসাইড বা গণহত্যা নামেই প্রকাশিত হয়েছিল ঐতিহাসিক প্রতিবেদনটি। পাকিস্তানি নাগরিক হয়েও তিনি অবাধে পাক-সেনাদের হত্যাকাণ্ড দেখে নিজেকে সামলাতে পারেননি। ধ্বংসলীলার ছবি তুলে ধরেন পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমে। আর সেই বিবরণকে হাতিয়ার করে ইন্দিরা গান্ধি বিশ্বনেতাদের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ছাড়া কোনও বিশ্বনেতাই পাকিস্তানের বিরোধিতায় তেমন একটা আগ্রহ  দেখাননি। কয়েক বছর আগে ওয়াশিংটনের স্মিথোনিয়ান্মাগ-এ লরিন বইসোনাল্টের একটি গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি  ১৯৭১-এর ৬ এপ্রিল মার্কিন কূটনীতিক আর্চার ব্লাডের একটি মন্তব্যের উল্লেখ করেন। পাকিস্তানি বর্ববতার বিরুদ্ধে মার্কিনী নীরবতা প্রসঙ্গে তিনি  বলেছিলেন, ‘হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধে আমরা ব্যর্থ। আমাদের সরকার (আমেরিকা) নৃশংসতার নিন্দা করতে ভুলে গিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের নৈতিক দৈন্যতায় অমি লজ্জিত।’ ফরাসি সাংবাদিক পল ড্রেফুস অবশ্য মনে করেন অপারেশন সার্চ লাইট ২৫ মার্চ হলেও পাকিস্তানি হিংসা চলছিল বহুকাল ধরেই। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পরই পাক-অত্যাচার বাড়তে থাকে।  বাড়তে থাকে হত্যার মাত্রাও। খোদ বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন পাকিস্তানি বর্বরতায়। আলবদর ও রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানি জল্লাদেরা কতো মানুষ খুন করেছেন তার কোনও ইয়ত্তা নেই।  আবার নিহতের সংখ্যা নিয়েও রাজনীতি রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধীরা আজও ৩০ লাখ শহিদকে অমর্যাদা করে চলেছে। অথচ রুশ সংবাদ মাধ্যম প্রভড়া-র প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে ৩০ লাখ নরহত্যার কথা। তদন্তকারী সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান নিউ ইয়র্ক টাইমসের উত্তর সম্পাদকীয়তে একই তথ্য প্রকাশ করেন। হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের এশিয়ান স্টাডিজ সেন্টারের গবেষক লিজা কার্টিস মনে করেন, গণহত্যায় নিহতদের সংখ্যা নিয়েও এখন রাজনীতি হচ্ছে। তাঁর সাফকথা, সংখ্যা যাইহোক না কেন, ৭১-এ বাঙালিদের ওপর ব্যাপক হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে। পাক-সেনারা অবাধে নিরীহ মানুষদের খুন করেছেন। শুধু কি খুন, অবাধে ধর্ষণ ও লুটপাটও চালায় পাক হানাদারেরা।  অন্তত ১ কোটি বাঙালি দেশ ছাড়া হতে বাধ্য হয়েছিলেন সেদিন। স্মিথোনিয়ান্মাগ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধর্ষিতা মায়েদের গর্ভপাত করানোর জন্য অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসক জিওফ্রে ডেভিসকে ঢাকায় পাঠিয়েছিল জাতিসংঘ। লক্ষাধিক ধর্ষিতার গর্ভপাত করাতে হয়। ধর্ষিতার সংখ্যা পাঁচ লাখের কাছাকাছি। পাকিস্তানের এই বর্বরতা থামাতে বিন্দুমাত্র উদ্যোগী হয়নি আমেরিকা।  বরং মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড এম. নিক্সন ও একান্ত আস্থাভাজন হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তানকে মদত দিয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিকামী-নিরীহ জনগণের সমর্থনের বদলে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে রাজনৈতিক ও বস্তুগত উভয়ভাবেই সহায়তা করেছে। মুক্তিযুদ্ধকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে ভারতের ভূমিকার বিরোধিতাও করেছে আমেরিকা। একই পথের পথিক ছিলো চীন। মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতের সাহায্য করাটাকেও বিরোধিতা করেছে বেইজিং। পাকিস্তানকে মদতও দিয়েছে দেশটি। সে সময় পাকিস্তানের সৈন্যদের হাতে ছিলো চাইনিজ রাইফেল। এমনকি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পরও চীন বহুবছর পর স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয়। চীন ও আমেরিকা পাকিস্তানকে মদত দিলেও ভারতকে সমর্থন করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। গণহত্যা প্রতিরোধে মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতের সার্বিক সহযোগিতার কথা সকলেই জানেন। সেদিনের গণহত্যাকে প্রথম স্বীকৃতিও দিয়েছিল ভারত। কিন্তু আজও মেলেনি জাতিসংঘের স্বীকৃতি। গতবছর  বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের উপ-মহাসচিব তথা গণহত্যা প্রতিরোধ বিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা আডামা ডিয়েং-এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। সেই সাক্ষাতের পর ডিয়েং বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত হওয়া গণহত্যার বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরবেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি শুনিয়েছিলেন আশঙ্কার কথাও। তিনি বলেছিলেন, ‘কিছু দেশ এর বিরোধিতা করতে পারে। কিন্তু আমরা পাকিস্তানিদের দ্বারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় চালানো গণহত্যার বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতের সামনে উপস্থাপন করবো।’ জাতিসংঘ স্বীকৃতি না দিলেও আগেই উল্লেখ করা হয়েছে খোদ পাকিস্তানি সাংবাদিক গণহত্যার কথা পশ্চিমা দুনিয়ার নজরে আনেন প্রথম। এরপর বহু আন্তর্জাতিক গবেষক ও গবেষণাধর্মী প্রতিবেদনেও উঠে আসে ৭১-এর ভয়াবহ বর্বতার ছবি। জার্মানির হাইডেলব্যার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. ভল্ফগাঙ পেটার সিঙ্গেল দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, তিনি নিশ্চিত, বাংলাদেশে গণহত্যা হয়েছে। তাঁর এ বিষয়ে কোনো সংশয় নেই। তবু বাংলাদেশ জাতিসংঘের স্বীকৃতি না পাওয়ায় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। তবে জাতিসংঘ এখনও স্বীকৃতি না দিলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ২০১৭ সালে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখন প্রতিবছরই দিনটি পালিত হয় গণহত্যা দিবস হিসাবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার এই আন্দোলনের আগে ও পরে সর্বদা চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন লাভ করেছে পাকিস্তান। এমনকি স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও গণহত্যার স্বীকৃতি না পাওয়ার জন্য প্রচ্ছন্নভাবে দায়ী করা হচ্ছে দেশ দুটিকে। মুক্তিযুদ্ধকালে ক্ষমতার ব্যাল্যান্স রক্ষার খেলায় এই দুই দেশই বাংলাদেশের মাটিতে মানবতার চরম বিপর্যয় দেখেও পাকিস্তানকে মদত দিতে ভোলেনি। আজও সেই নীতির পরিবর্তন হয়নি। তাই গণহত্যার ৫০ বছর পার হয়ে এলেও জাতিসংঘ নীরব। বাংলার মাটিতে লাখ-লাখ মানুষের মৃত্যু মিছিল, নারীর সম্ভ্রমহানি, অবাধ লুট-ছিনতাই, অগ্নিসংযোগ এবং সেনাবাহিনীর চরম বর্বরতার অসংখ্য প্রমাণ থাকার পরও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নীরবতা কষ্ট দেয় এ দেশের সন্তানহারা মায়েদের। পাক-প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ফোন করে এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে  সৌজন্য দেখানোর চেষ্টা করছেন। অথচ, আজও সেই হত্যাকাণ্ডের জন্য ক্ষম চায়নি ইসলামাবাদ। বাংলাদেশের মানুষ সব জানে। সব জানেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। তাই যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি দিতে ভুল করেননি তিনি। গণহত্যাকারী ও তাঁদের মদতদাতাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ আজও সতর্ক। কারণ স্বজনহারার কান্নায় সিক্ত বাংলাদেশের মাটি কখনই ভুলতে পারেনা পাকিস্তানের সামরিক জান্তাদের  সেই গণহত্যার দিনগুলো। লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

 

 

রোহিঙ্গা সমস্যার তিন বছর প্রত্যাবাসন ভাবনা ও অন্যান্য

মিয়ানমারে ২৫ আগস্ট, ২০১৭ সালের সেনা অভিযান ও রাখাইন প্রদেশে গণহত্যার পরিপ্রেক্ষিতে ১০ লক্ষাধিক  রোহিঙ্গা প্রাণভয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এ ঘটনার তিন বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে। এই বিশাল নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি। ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রথম সময়সীমা ঠিক হয়েছিল। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রস্তুত ছিল কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রাখাইনে প্রত্যাবাসনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি বলে ঘোষণা দেয়ায় প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়। এর প্রায় এক বছর পর ২২ আগস্ট, ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে সহায়তার জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুতি নেয়। মিয়ানমার ৩ হাজার ৫৪০ জন রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়। তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের এই উদ্যোগও সফলতার মুখ দেখেনি। এ সময় ইচ্ছার বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের  ফেরত পাঠানো হতে পারে বলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যেকার প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং সম্মানজনকভাবে এবং রোহিঙ্গাদের প্রমাণ করতে হবে তারা রাখাইনের বাসিন্দা ছিল। প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা  রোহিঙ্গাদের পক্ষে এটা প্রমাণ করা কঠিন- কারণ বহু বছর তারা নাগরিক অধিকার বঞ্চিত ছিল। যে সব রোহিঙ্গার  কোনো না কোনো সনদ ছিল- তা তাদের জমা দিয়ে নতুন নাগরিকত্ব সনদ দেয়ার কথা বলা হলেও কখনো তা দেয়া হয়নি। বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থানকারী রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব, ক্ষতিপূরণ ও নির্যাতনের সুষ্ঠু বিচার ছাড়া মিয়ানমারে ফিরে যেতে আগ্রহী না। এ সব দাবি পূরণে মিয়ানমার এখন পর্যন্ত কোনো প্রচেষ্টা নেয়নি। ফলশ্র“তিতে  রোহিঙ্গা সমস্যা তৃতীয় বছরে পদার্পণ করল। ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর গণহত্যার অপরাধ, প্রতিরোধ ও সাজাবিষয়ক সনদ লঙ্ঘিত হয়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করে গাম্বিয়া ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) আদালতের রেজিস্ট্রারের কাছে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার আবেদন জানায়। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দেশটির চলমান নিপীড়নমূলক আচরণ বন্ধে গাম্বিয়ার মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আইসিজে ২৩ জানুয়ারি, ২০২০ একটি জরুরি ‘সাময়িক পদক্ষেপ’ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। এই আদেশ জারির দিন থেকে চার মাসের মধ্যে মিয়ানমার আদালতের আদেশ অনুযায়ী যেসব ব্যবস্থা নিয়েছে, সেগুলো আদালতকে জানানো এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রতি ছয় মাস পরপর এ বিষয়ে প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ ছিল। গণহত্যা সনদ মেনে চলা এবং রাখাইন রাজ্যে সংঘটিত সব সহিংসতার সাক্ষ্য প্রমাণ সংরক্ষণের জন্য মিয়ানমার সরকার গত ৮ এপ্রিল, ২০২০ তারিখে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে দুটো আলাদা আদেশে এ নির্দেশনা দেয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় মিয়ানমার গত মে মাসের শেষে আইসিজেকে প্রথমবারের মতো প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ‘মাদার অব হিউমিনিটি’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ সালে জাতিসংঘে ৫ দফা প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার এ দূরদর্শী দিক নির্দেশনার বাস্তবায়নেই একমাত্র রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সম্ভব। রোহিঙ্গা সমস্যা সরেজমিন প্রত্যক্ষ করার জন্য ২০১৭ সালের আগস্ট মাসের পর সারাবিশ্ব থেকে রাষ্ট্রপ্রধান এবং তাদের পাঠানো প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে এসেছে এবং আসছে। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাসমূহ, আন্তর্জাতিক এনজিও এবং দেশি এনজিওগুলো নানা বিষয় নিয়ে এই পরিস্থিতিতে কাজ করছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশ এই সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছে। অনেক দেশ এই অমানবিক আক্রমণ এবং নৃশংসতাকে নিন্দা করেছে এবং নৃশংসতা বন্ধের দাবি জানিয়েছে। রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগে বাধ্য করার জন্য অনেকে তাদের উদ্বেগ জানিয়েছে। কিছু কিছু দেশ জাতিসংঘকে তদন্ত কমিশনের জন্য আহ্বান জানিয়েছে। অনেক দেশ রোহিঙ্গা সমস্যার ব্যাপারে অর্থনৈতিক সাহায্য সহযোগিতা দিয়েছে। কিছু কিছু  দেশ মিয়ানমারে সমস্যাসংকুল এলাকায় মানবিক সাহায্য পাঠানোর জন্য অনুমতির চেষ্টা চালাচ্ছে। কেউ মানবিক সাহায্যের পাশাপাশি ত্রাণ নিয়ে এগিয়ে এসেছে। কয়েকটা দেশ একটা স্থায়ী সমাধানের জন্য রেজুলিউশন বানানোর ব্যাপারে জোরালো সমর্থন দিয়েছে। কেউ কেউ মানবতার বিরুদ্ধে অবরোধ এবং গণহত্যার কথা জানিয়ে তাদের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। অনেক দেশ কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য তাদের জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করেছে। অনেক দেশ এই সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে আঞ্চলিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতে পারে বলে মত পোষণ করেছে। বর্তমানে সারা বিশ্ব রোহিঙ্গা সমস্যার বিষয়ে অবহিত। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মানবতার জননী সারা বিশ্বকে এই নৃশংস ঘটনা জানানোর ব্যাপারে কূটনৈতিক ও মানবিক ভূমিকা রাখার জন্য আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে প্রশংসিত হয়েছেন। তিনি এই সমস্যা সমাধানে তার প্রচেষ্টা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন। জাতিসংঘ, দাতা সংস্থা, আঞ্চলিক দেশগুলো সবাই এই সমস্যার ব্যাপারে ভালোভাবে অবহিত- তবে সমাধানের ব্যাপারে তাদের আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে না এবং বাংলাদেশ এখনো এই সমস্যা নিয়ে চলছে। জুলাই ২০১৯ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেইজিং সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিন পিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি কিকিয়াং বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। সে সময় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীনের ভূমিকার কথা প্রথমবারের মতো এসেছে- যা একটা বড় কূটনৈতিক সাফল্য। সেখানে রোহিঙ্গা শব্দটি উহ্য রেখে বলা হয়েছে ‘মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী’। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অব্যাহত রাখার পাশাপাশি রাখাইন প্রত্যাবাসনের সহায়ক পরিবেশ  তৈরিতে কাজ করে যাওয়ার কথা বলেছে চীন। চীন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়া বিভাগের মহাপরিচালক উ জিং হাউ বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের জানিয়েছে যে, চীন মিয়ানমারকে রাখাইনে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে বলেছে।

জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কোনো আগস্ট ২০১৭ এর পর তিনবার বাংলাদেশ সফর করেছে। তিনি নেপিডোতে অং সান সুকির সঙ্গে দেখা করে এ সমস্যা সমাধানে যা কিছু সম্ভব তার সবই করার আশ্বাস দিয়েছেন। জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী  রোহিঙ্গাদের সম্মানের সঙ্গে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের সঙ্গে থাকার প্রতিশ্র“তি দেন। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে আগ্রহী তবে তাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দিতে হবে। রাখাইনে তাদের স্বাধীনভাবে চলাচলের নিশ্চয়তা দিতে হবে। আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা মানবাধিকার ও সংবাদকর্মীদের অবারিতভাবে চলাফেরার সুযোগ দিয়ে সহায়ক পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে নিরাপদে স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণভাবে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার সরকারকে বারবার বলে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ভারত মিয়ানমারের ওপর চাপ দেবে বলে আশ্বাস দিয়েছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ নিন্দা প্রস্তাব পাস করেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে মিয়ানমারের প্রতি  রোহিঙ্গা ও অন্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা, বিদ্বেষমূলক উত্তেজনা সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবটির পক্ষে  ভোট দেয় ১৩৪টি দেশ। বিপক্ষে ভোট দেয় ৯টি দেশ। আর ২৮টি দেশ ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে। মিয়ানমারের রাজনীতিতে অং সান সুকি এখনো বৌদ্ধভিক্ষু এবং সেনাবাহিনীর প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারে আশানুরূপ অগ্রগতি লাভ করতে সমর্থ হয়নি। গত নির্বাচনে ২৫  ফেব্র“য়ারি, ২০২০ থেকে ৫ মার্চ, ২০২০ পর্যন্ত মিয়ানমার পার্লামেন্টে সংবিধান সংশোধনের বেশ কিছু প্রস্তাব নিয়ে চূড়ান্ত বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। ১৪৯ জন সদস্য এই বিতর্কে অংশগ্রহণ করে। প্রধান প্রধান সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ছিল পার্লামেন্ট থেকে সশস্ত্রবাহিনীর কোটা অপসারণ, সংবিধান সংশোধনে তাদের ভেটো ক্ষমতা রদ, যে কোনো সংস্কার প্রস্তাব অনুমোদনে ৭৫ ভাগ পার্লামেন্ট সদস্যের সমর্থনের নিয়মকে দুই-তৃতীয়াংশ নামিয়ে আনা ইত্যাদি। বিতর্ক শেষে ভোটাভুটি শুরু হয়। ১০ মার্চ, ২০২০ থেকে তা শুরু হয় এবং কয়েকদিন ধরে এই ভোট চলে। ভোটের ফলাফলে দেখা যায় প্রায় সব সংস্কার প্রস্তাবই একে একে পার্লামেন্টে বাতিল হয়ে যায়।

২০২০ সালের পার্লামেন্টের ভোটাভুটির ফলাফল ছিল মিয়ানমারের ছোট জাতিসত্তাগুলোর জন্য একটা বড় ধাক্কা। এসব জাতিসত্তা মিয়ানমারের জন্য এমন এক সংবিধান চাইছে, যেখানে দেশটি সত্যিকারের এক ইউনিয়ন হয়ে উঠবে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না- কারণ পার্লামেন্টে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩০ ভাগ আসন সেনাবাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, এ কারণে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে, সাংবিধানিক পথে সংবিধান সংশোধন এবং ভবিষ্যতেও গণতান্ত্রিক একটা সংবিধান প্রণয়ন করা সহজেই সম্ভব হবে না। এতে রোহিঙ্গাদের সাংবিধানিকভাবে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা হিসেবে গণ্য করা সম্ভব হবে না এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। রাখাইন স্টেট নিরাপদ না হলে  রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এ সব বিষয় সামনে রেখেই বাংলাদেশকে এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে চলতে হবে সমাধানের পূর্ব পর্যন্ত। রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবর্তন এখনো অনিশ্চিত,  কেননা, মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে এসব  রোহিঙ্গাদের ফেরার জন্য যে ধরনের অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন তা সৃষ্টিতে মিয়ানমার তার প্রতিশ্র“তি রক্ষায় ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে (হাসিনা, ২০১৯)। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সব দেশ সম্মত হলেও মিয়ানমারের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের সহায়তাকারী আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোও এ বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে না (হাসিনা, ২০১৯)। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজন মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি, সমস্যার মূলে গিয়ে সমাধান খোঁজার প্রচেষ্টা এবং মানসিকতার পরিবর্তন।  রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের পক্ষ  থেকে এখনো কোনো উদ্যোগ কিংবা ইতিবাচক পদক্ষেপ  নেয়া হয়নি। রাখাইন প্রদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো প্রত্যাবাসনের অনুকূলে হয়নি। রোহিঙ্গাদের বিষয়ে স্থানীয় জনগণ এবং বৌদ্ধ সংগঠনগুলোর ইতিবাচক মনোভাব বা  কোনো পরিবর্তন হয়নি এবং এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ  নেয়ার কথাও জানা যায়নি। মিয়ানমার এখনো এসব পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে কোনরূপ অগ্রগতি দেখাতে পারছে না। রোহিঙ্গা সমস্যার মতো একটা জটিল এবং চলমান সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ানো প্রয়োজন। এর পাশাপাশি দুদেশের নাগরিক সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে আস্থার অবস্থা সৃষ্টি করা দরকার। মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত চীন, ভারত ও জাপান এই তিনটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশেরও সুসম্পর্ক রয়েছে তাই মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে কাজ করতে হবে (আহমেদ ২০১৯)। রোহিঙ্গা সমস্যার মূল সমাধান অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের কোনো প্রচেষ্টা সফলতার মুখ দেখেনি। প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আস্থা ফেরানোর ওপর মূল মনোযোগ দেয়া উচিত। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়সহ সবার উপস্থিতি আছে, অথচ মিয়ানমারের রাখাইনে কারও উপস্থিতি নেই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রাখাইনে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়তা জোরদার করতে হবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে চীন, ভারত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০ দেশের আঞ্চলিক  জোট আসিয়ানসহ বিভিন্ন দেশ ও পক্ষকে যুক্ত করে তাদের সবার সমর্থন নিয়ে বাংলাদেশকে এগুতে হবে এবং যথাযথ ক্ষমতা দিয়ে রাখাইনে পাঠানো নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের মতো মূল দুটি বিষয়ে সুরাহা হলেই অনেক সমস্যার সমাধান হবে (ফয়েজ আহমেদ)। এখনো দাতা সংস্থাগুলো তাদের সাহায্য অব্যাহত রেখেছে বলে এই সমস্যা আরো বিশাল আকার ধারণ করতে পারছে না। বর্তমানে বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ এর ছোবলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সমস্যা ভারাক্রান্ত, সে সব দেশ তাদের নিজস্ব সমস্যা সমাধান করে এই দূর দেশের রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে কতদিন তাদের সাহায্য অব্যাহত রাখবে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। মিয়ানমার সৃষ্ট এই সমস্যা বাংলাদেশকেই আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সমাধানের পূর্ব পর্যন্ত জাগিয়ে রাখতে হবে।  রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের সমান অধিকার প্রাপ্ত নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য বিশ্ববাসীর নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া উচিত। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান দ্রুত থেকে দ্রুততর হোক বাংলাদেশসহ সারাবিশ্ব এবং রোহিঙ্গারা সেই আশার পথে তাকিয়ে আছে। লেখক ঃ ডেপুটি কমান্ডান্ট, বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা, গাজীপুর।

 

মৃত্যুর মুখোমুখি ১৯ বার যেভাবে বেঁচে যান শেখ হাসিনা!

টানা একযুগের বেশি সময় ধরে যাঁর হাত ধরে হাঁটছে বাংলাদেশ, সেই বিদগ্ধ ব্যক্তিটিকেই ঘাতকরা হত্যার চেষ্টা করেছে ১৯ বার। নিক্ষিপ্ত হয়েছে বিধ্বংসী গ্রেনেড। বিস্ফোরণ ঘটেছে বোমার। আর ছোঁড়া হয়েছে মুহূর্মুহু গুলি। সেই প্রাণে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিটি আর কেউ নন, জাতির জনক কন্যা শেখ হাসিনা। ‘৯৬-‘০১ প্রথম ক্ষমতায় আসা শেখ হাসিনার বর্তমান মেয়াদ পূর্ণ হলে তাদের প্রধানমন্ত্রীত্বের ২০ বছর হবে। শেখ হাসিনা অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়াকে আল্লাহর অসীম কৃপা মনে করেন। ‘৮৮-তে চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে ২০০৪-এ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর গ্রেনেড হামলাকে বলা হয় রাষ্ট্রকল্পিত গণহত্যা। প্রথমটি এরশাদের শাসনামলে দ্বিতীয়টি খালেদা-নিজামীর শাসনকালে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ সামরিক  বেসামরিক বহু কর্মকর্তা অভিযুক্ত। ১৯টি হামলার মধ্যে ১৭টি সংঘটিত হয় শেখ হাসিনা যখন প্রধানমন্ত্রী কিংবা বিরোধী দলের নেতা। ‘৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পশ্চিম জার্মানিতে থাকার সুবাদে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধু কন্যাকে হত্যার উদ্দেশ্যে পরিচালিত ১৯টি হামলাই হয় ‘৮৭ সালের পরে। ‘৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে বুলেট-বোমা হামলাই প্রথম হামলা। সেই হামলায় তিনি ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও ৭ নেতাকর্মী প্রাণ হারায়। আহতের সংখ্যা ছিল তিন শতাধিক। রাষ্ট্রীয় মদদে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে শেখ হাসিনাকে হত্যার সেই প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। জেনারেল এরশাদের শাসনামলে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আরও একটি হামলা হয়। এই হামলাটি হয় ‘৮৯ সালের ১১ আগস্ট। বঙ্গবন্ধুর বত্রিশ নম্বর সড়কের বাসভবনে এ হামলাটি হয় সরকারের মদদে। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের নীলনকশা অনুযায়ী। খুনি ফারুক-রশীদের ফ্রিডম পার্টির চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা শোকাবহ আগস্টের ১১ তারিখ দিবাগত রাত ১২টার সেই হামলা চালায়। মুহূর্মুহু গুলি ছুঁড়ে তারা। নিক্ষিপ্ত বিধ্বংসী একটি গ্রেনেড বিস্ফোরিত না হওয়ায় শেখ হাসিনা রক্ষা পান। উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধুকে প্রায় সপরিবারে ওই বাসভবনেই হত্যা করে ফারুক-রশীদ চক্র। শেখ হাসিনার সঙ্গে বিদেশে থাকার কারণে বেঁচে যান শেখ রেহানাও। আত্মস্বীকৃত খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আওয়ামী লীগকে নির্মূল করতে ফ্রিডম পার্টি গঠনের সুযোগ দেয়া হয়। ফাঁসিতে ঝুলছে যে কর্নেল ফারুক সেই তাকেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন এরশাদ। এরশাদের ‘৮৮ প্রহসনের নির্বাচনে ফ্রিডম পার্টির নামে সংসদ সদস্য হয় বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্নেল রশীদ ও মেজর বজলুল হুদা। মেজর হুদা ফাঁসিতে ঝুললেও বিদেশে পলাতক রয়েছে কর্নেল রশীদ। ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। অথচ, ওদিনটাকে ফ্রিডম পার্টি ‘জাতীয় মুক্তি দিবস’ হিসাবে পালনের ঔদ্ধত্য ও ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল সরকারি মদদে। ‘৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে অকল্পনীয়ভাবে আওয়ামী লীগের পরাজয় ঘটে। উত্থান ঘটে বিএনপির।  বেগম খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে কয়েকটি আসনে উপনির্বাচন হয়। ‘৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সেই নির্বাচনে বেগম জিয়ার ছেড়ে দেয়া আসন ছিল ধানমন্ডি- মোঃপুর আসন। সেই নির্বাচনে বিরোধী দলীয়  নেত্রী শেখ হাসিনা ভোটদান শেষে গাড়িতে করে গ্রীনরোড অতিক্রম করছিলেন। ঠিক সেই মূহুর্তে তাঁকে হত্যার জন্য গাড়িতে করা হয় গুলিবর্ষণ। নিক্ষেপ করা হয় বোমা অলৌকিকভাবে প্রাণে রক্ষা হয় শেখ হাসিনার। এটি ছিল তৃতীয় হামলা। চতুর্থ হামলাটি হয় ‘৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ঈশ্বরদী রেলস্টেশনে। শেখ হাসিনাকে বহনকারী বগিটিতে গুলিবর্ষণ করা হলেও অল্পের জন্যে বেঁচে যান। ‘৯৫ সালের ৭ ডিসেম্বর রাজধানীর শেখ রাসেল স্কোয়ারে হয় ৫ম হামলাটি। সমাবেশে ভাষণদানকালে অতর্কিত গুলি ছুঁড়ে সন্ত্রাসীরা। গুলি লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়। ‘৯৬ সালের ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে ছিল আওয়ামী লীগের জনসভা। হত্যার উদ্দেশ্যে চালানো হয় বোমা হামলা। এ যাত্রাও বেঁচে যান বিরোধী দলের নেতা। ‘৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় শেখ হাসিনাকে বেশ কয়েকবার হত্যার চেষ্টা করা হয়। ইন্টার এশিয়া টিভির মালিক শোয়েব চৌধুরী ইমেইলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, সজিব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুলসহ ৩১ জনকে হত্যার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে। ২০০০ সালের ২০ জুলাই  গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায় জনসভাস্থলে ৮৪ কেজি এবং হ্যালিপ্যাডের কাছে ৭৬ কেজি ওজনের দুটি বোমা পুঁতে রাখা হয় হয়েছিল শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে। ২০০১ সালের ২৯ মে খুলনার রূপসা সেতুর উদ্বোধন করার কথা ছিল শেখ হাসিনার। সেই স্থানেও বোমা পুঁতে রাখা হয় হত্যার লক্ষ্যে। বোমা পুঁতে রাখার খবরে কর্মসূচি বাতিল করা হয়। ২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গনের সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে পৌঁছার আগেই মাদ্রাসাস্থ একটি ভবনে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে এবং দুজন হুজি নিহত হয়।  ২০০২ সালের ৪ মার্চ শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে নওগাঁয় বিএমসি মহিলা কলেজের সামনে গাড়ী বহরে হামলা চালানো হয়। সন্ত্রাসীরা গুলি ছুঁড়লেও লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা সবচেয়ে নৃশংস ও বর্বরোচিত হামলা। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে সন্ত্রাস বিরোধী সমাবেশে ভাষণ দিচ্ছিলেন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা। মুহূর্মুহু গ্রেনেড গুলি বর্ষণ যেনো রোজ কেয়ামত হানা দিয়েছিল। গ্রেনেড বিস্ফোরণের মুখে বুলেট প্রুফ গাড়িতে উঠিয়ে দিলেও ঘাতকরা বৃষ্টির মতো গুলি ছুঁড়ে। গ্রেনেড হামলায় ছাত্রলীগের অকুতোভয় যোদ্ধা মোস্তাক আহমেদ সেন্টুসহ ঝরে পড়ে ২৪ নেতাকর্মীর প্রাণ। ক্ষত-বিক্ষত হন শীর্ষ  নেতারা। আর হামলার শিকার হয় চারশত নেতাকর্মী। ২৪ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন গ্রেনেড হামলায় আহত মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী বেগম আইভি রহমান (প্রায়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের পতœী)। হামলায় আহত অনেকে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। ২০০৭-২০০৮  সেনাসমর্থিত ফখরুদ্দিন সরকারের সময়ে কারাবন্দী অবস্থায় বিষ মেশানো খাবার খাইয়েও শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। এর পর ২০০২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার কলারোয়ায়। এটি ছিল গাড়িবহরে হামলা। এটাও শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে। এর আগে ২০০২ সালের ২ এপ্রিল বরিশালের গৌরনদীতে গাড়িবহরে গুলিবর্ষণের ঘটনা ছিল শেখ হাসিনা হত্যাচেষ্টায় বারোতম হামলা। ২০১১ সালে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানি সন্ত্রাসী চক্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। তারা একটি সুইসাইড স্কোয়াড গঠন করে। কিন্তু ঘাতকচক্রটি কলকাতা বিমানবন্দর অভিমুখে যাত্রার প্রাক্কালে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এতে চারজন নিহত হয়। এ হত্যাচেষ্টার খবর প্রকাশ করে উইকিলিকস। বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারে দন্ডপ্রাপ্ত ফাঁসির আসামী মেজর ডালিম হংকং বসবাসকারী বাংলাদেশী ব্যবসায়ী ইসরাক আহমেদের অর্থায়নে এই হত্যা পরিকল্পনা করে। ২০১৪ সালে নারী জঙ্গিদল দিয়েও প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ষড়যন্ত্র হয় “মানব বোমা” বিস্ফোরণ ঘটিয়ে। পশ্চিম বাংলার বর্ধমানে ১৫০ জন নারী এবং ১৫০ জন পুরুষ যুবক প্রশিক্ষণ  নেয়। কিন্তু প্রশিক্ষণ অবস্থায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলে ঘটনা ফাঁস হয়ে যায়। সর্বশেষ ১৯তম হামলাটি হয় কাওরানবাজারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে। জমাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) এই হত্যাচেষ্টা চালায়। কিন্তু এ যাত্রাও শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে যান। লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

 

আগস্ট শত্রু-মিত্র চিনিয়ে দিল

শৈশবে কুফা নামে একটি গ্রামীণ শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। শব্দটির অর্থ অমঙ্গলকর। সম্ভবত ‘কু’ অর্থাৎ অমঙ্গলকর থেকেই এ শব্দের উৎপত্তি। আগস্ট মাসটির বেলায় এই কুফা শব্দটি খুবই প্রযোজ্য। এ মাসেই আমাদের জাতির জনক, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালিকে হত্যা করেছিল একাত্তরের পরাজিত স্বাধীনতাবিরোধীরা। এ মাসেই একই পরাজিত অপশক্তি গ্রেনেড ছুড়ে চেষ্টা করেছিল বঙ্গবন্ধুকন্যা বিশ্বনন্দিত  নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে। তিনি সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায়ত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানের মতো নিবেদিত মানুষসহ মোট ২৪ জন নিরপরাধ মানব সন্তান। এ মাসেরই ৬ ও ৯ তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলে লাখ লাখ নিরীহ মানুষ হত্যা করেছিল। এই অমঙ্গলকর আগস্ট মাসের শেষ দিনটি, অর্থাৎ ৩১ তারিখটিও আমাদের জাতীয় জীবনে একটি কালো দিবস, কেননা বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ১৬ দিনের মাথায় এই দিনে চীন প্রথমবারের মতো বঙ্গবন্ধুর খুনি তথাকথিত সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল পাকিস্তানের কথায়। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম বিরোধী শক্তি চীন বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর অনেকটা তড়িঘড়ি করে খুনিদের স্বীকৃতি দেওয়া থেকে আঁচ করা স্বাভাবিক যে, চীন সম্ভবত বঙ্গবন্ধুর হত্যা এবং পরবর্তী সময়ে একটি পাকিস্তানি সৃষ্ট সরকারের জন্যই অপেক্ষা করছিল। মুক্তিযুুদ্ধের সময় চীন ভারতীয় সীমান্তে প্রচুর সৈন্য মোতায়েন করেছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নস্যাৎ করার জন্য। কিন্তু চীন তা পারেনি, কারণ তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন চীন সীমানায় কয়েক হাজার সেনা পাঠিয়ে চীনকে রুখে ছিল। ইয়াহিয়া, ভুট্টো চীনের আশায়ই ছিল এবং প্রকাশ্যেও তাই বলত। কিন্তু সোভিয়েতরা সে গুড়ে বালি ঢেলেছিল। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান চীনে তৈরি বুলেট দিয়েই আমাদের ৩০ লাখ শহীদকে হত্যা করেছে। শুধু তা-ই নয়, আমাদের স্বাধীনতার পরও চীন নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হয়ে তার নব্য প্রাপ্ত  ভেটো ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে বাংলাদেশের জাতিসংঘে প্রবেশের পথ রুদ্ধ করে রেখেছিল। আজও চীন বিশ্বময় একটি আগ্রাসী জাতি হিসেবে পরিচিত। সমুদ্রসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো লঙ্ঘন করে সে দক্ষিণ চীন সাগর এবং সেখানকার কয়েকটি দ্বীপ দখলের চেষ্টায় লিপ্ত, যার জন্য ওই অঞ্চলের ২০টি দেশের সঙ্গে তার যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে আর এসব  দেশের মধ্যে রয়েছে সমাজতান্ত্রিক ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, অস্ট্রেলিয়া প্রমুখ। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এ সাগর এবং সাগরতলের সম্পদ সব দেশের সম্পদ হওয়ায়ও বিশ্বের সব দেশ চীনের এই আগ্রাসী ভূমিকার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। চীন, তাইওয়ান, কমিউনিস্ট রাষ্ট্র ভিয়েতনাম ও ভুটানের অংশবিশেষ দখলেরও পাঁয়তারা করছে বিধায় এই দেশগুলো শঙ্কিত। অতীতে বেআইনিভাবে তিব্বত দখল করেছে। ১৯১৪ সালে সিমলা চুক্তির সৃষ্টি ম্যাকমোহন লাইন ভঙ্গ করে সম্প্রতি ভারত আক্রমণ করে কয়েকজন ভারতীয় সৈন্য হত্যা করেছে। তদুপরি করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে, যেটি তাদের দেশেই শুরু, বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে এ রোগে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এসব কারণে চীন আজ বন্ধুবিহীন একটি দেশ। এক পাকিস্তান ছাড়া এর কোনো মিত্র নেই। গ্রাম্য মহাজনদের মতো চীন গরিব দেশগুলোকে ঋণজালে জর্জরিত করে, এমনকি ঋণগ্রস্ত দেশের ভূমি পর্যন্ত নিয়ে নিচ্ছে। শ্রীলংকার হাম্বানটোটা বন্দর ৯৯ বছর লিজে দখল নেওয়া তারই উদাহরণ। এভাবে আফ্রিকান রাষ্ট্র জিবুতিতে গড়ে তুলেছে সামরিক ঘাঁটি। সম্প্রতি শ্রীলংকার নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশ্যেই বলেছেন, হাম্বানটোটা বন্দর চীনের কাছে ইজারা দেওয়া ছিল একটি ভুল সিদ্ধান্ত। যদিও নামে কমিউনিস্ট, এটিকে বর্তমানে মার্কসবাদের কোনো সংজ্ঞায়ই ফেলা যায় না। এটি আজ বিশ্বের শীর্ষ পুঁজিবাদী দেশগুলোর অন্যতম। সেখানে রয়েছে আলিবাবা, হোয়াওয়ে প্রভৃতি বিশ্বের শীর্ষ ব্যক্তিমালিকানা কোম্পানি এবং জ্যাক মা, মা স্টোটেনের মতো বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবের। এটি সাবেক সোভিয়েতের মতো আদর্শবাদী দেশ নয়, বরং একটি আগ্রাসী দেশ, যে দেশটি ১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামের মতো দেশ আক্রমণ করেছিল, যে দেশ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং রক্ষার জন্য বহু বছর সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়ী হয়েছিল। চীন-পাকিস্তান করিডোরের নামে পাকিস্তানের গিলগিট ও গুয়েদার এলাকার বহু জায়গা তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, যার জন্য পাকিস্তান পার্লামেন্টের উচ্চ পরিষদ, সিনেটের একটি কমিটির চেয়ারম্যান চীনকে নতুন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বলে আখ্যায়িত করেছেন। বাংলাদেশের বিষয়ে চীন যে সত্তরের দশকের নীতি থেকে সরে যায়নি তার এক সাম্প্রতিক প্রমাণ মিলল গত ১৫ আগস্ট। দিনটি জাতীয় শোক দিবস। অথচ সেই দিনের পবিত্রতা লঙ্ঘন করে চীন খালেদা জিয়ার তথাকথিত জন্মদিবসে উপহার পাঠিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকে অবমাননা করেছে। চীন একটি বিতর্কিত তথাকথিত জন্মদিন হিসেবে উপহার পাঠানোর মাধ্যমে স্বীকৃতি দিয়ে কূটনৈতিক সুবিধাসংক্রান্ত ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে। তা ছাড়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে পাকিস্তানপ্রেমী দলগুলোই যে এখনো চীনের প্রিয়, তা প্রমাণ করছে। আজ আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা রোহিঙ্গাদের নিয়ে। অথচ এই সমস্যা জিইয়ে রাখছে চীন। বিষয়টি যতবার নিরাপত্তা পরিষদে উঠেছে, ততবারই চীন মিয়ানমারের পক্ষে ভেটো দিয়ে সমাধানের পথ রুদ্ধ করেছে। আজও চীন যদি রোহিঙ্গা বিষয়ে মিয়ানমারকে সমর্থন বন্ধ করে, তা হলে কালই মিয়ানমার বাধ্য হবে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে। এখানে চীনের বিরাট স্বার্থ কাজ করছে। রাখাইন এলাকা, যেটি  রোহিঙ্গাদের আবাসভূমি, চীন সেখানে তার ‘ রোড অ্যান্ড ওয়ান বেল্ট’  প্রোগ্রামের জন্য ঘাঁটি তৈরি করছে বিধায় তার চাই জনশূন্য রাখাইন। চীন  যে আমাদের দেশে ঘুষ বাণিজ্যে প্রসারিত করছে, তারও প্রমাণ সম্প্রতি মিলেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন রাস্তার জন্য যে চীনা কোম্পানিকে চুক্তি  দেওয়া হয়েছিল (চায়না হারবাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি), ওই কোম্পানির সংশ্লিষ্ট সচিবকে কয়েক হাজার ডলার ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করলে বিরল সততার সেই সচিব বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের নজরে আনেন। অতঃপর সেই  কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। গত ১৯ আগস্ট মার্কিন সরকার বাংলাদেশের চীনের এই ঘুষ বাণিজ্যের কথা উল্লেখ করেছেন এবং সেই সঙ্গে এ কথাও উল্লেখ করেছেন যে, চীনা কোম্পানিগুলো  কোকোর সঙ্গেও ঘুষ বাণিজ্য করেছে। মার্কিন সরকার আরও অভিযোগ করেছে যে, চীনা কোম্পানিগুলো শ্রীলংকা, কেনিয়া ও ফিলিপাইনেও ঘুষ বাণিজ্য ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে এবং শ্রীলংকার হাম্বানটোটা বন্দর প্রকল্পের কাজও তারা ঘুষ ও প্রতারণার মাধ্যমেই পেয়েছিল। চীন ও পাকিস্তান কৌশলে এখন বাংলাদেশের বন্ধু সাজার চেষ্টা করছে। যারা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অপশক্তি, তারা আনন্দিত হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের চেতনার ধারক, মুজিব আদর্শের সৈনিক তাদের কিন্তু সাবধান থাকতে হবে। চীন-পাকিস্তানের আসল উদ্দেশ্য জেনে নিতে হবে। বিজ্ঞজনেরা বলেন, ইতিহাস বিচার করেই ভবিষ্যতের পথ ধরতে হয়। এ কথা চীনের ব্যাপারে বিশেষভাবে প্রযোজ্য, কেননা চীনে সত্তরের দশকে যারা শাসক ছিল এখনো তারাই ক্ষমতায়। তাদের নীতি অপরিবর্তিত রয়েছে। বরং মাও সে তুংয়ের মৃত্যুর পর চীন সমাজতান্ত্রিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। সুতরাং ৩১ আগস্টকে আমাদের কালো ও ঘৃণ্য দিবস হিসেবেই মনে রাখতে হবে। আর একটি কৌতূহলী ব্যাপার হলো- ‘যারা মুসলমানদের স্বার্থ কোথাও বিঘিœত হলে সরবে ফেটে পড়েন, তারা কিন্তু চীন সরকারের দ্বারা উইঘুর মুসলমানদের গণহত্যার ব্যাপারে নীরব।’ শুধু মুসলিম নিধনই নয়, বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর ও তথ্য অনুযায়ী সেখানে ২০ লাখ উইঘুর মুসলমানকে অন্তরীণ করে রাখা হয়েছে, চালানো হচ্ছে বহু ধরনের নির্যাতন। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্ববাসীর সময়ক্ষেপণ না করে চীনের মতলব জানতে হবে, যাতে আমরাও শ্রীলংকা, জিবুতির মতো চীনের ফাঁদে না পড়ি। বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ঃ সুপ্রিমকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি

ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়

ধর্মনিরপেক্ষতা এমন একটি চশমা যা পরিধান করলে শাসকদের চোখে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ কেবল একজন মানুষ হিসেবেই ধরা  দেয়। তখন সে সবাইকে আল¬াহর এক সম্মানিত সৃষ্টি হিসেবে মনে করে। সম্প্রতি সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা চালু করার দাবিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশি¬ষ্ট ১০ জনকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। ১৬ আগস্ট নোটিশটি পাঠান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অশোক কুমার ঘোষ। তিনি নিজেই সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। নোটিশে বলা হয়েছে, ১৯৪৭ সালের পর পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণ, নির্যাতন এবং বেআইনি কার্যকলাপের প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে আমরা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ অন্য নাগরিকরা এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ভারত-রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশের সার্বিক সহযোগিতায় স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আমাদের ১৯৭২ সালের পবিত্র সংবিধানে স্বাধীনতার চেতনাসহ রাষ্ট্র পরিচালনায় মূলনীতি ছিল জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। আমরা জানি, ‘৭২-এর সংবিধানে উলে¬খ ছিল ‘মানুষের ওপর মানুষের  শোষণ হতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।’ (অনুচ্ছেদ ১০) এখানে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চিন্তার প্রাধান্য পাওয়া যায়। এবং ১২ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার ১২ (গ)’ বন্ধ করার কথা বলা হয়েছিল। ৪১ অনুচ্ছেদে সব ধর্ম পালন ও প্রচারের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। অনুচ্ছেদ ২৭-এ ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী’। এ দুটি অনুচ্ছেদ অর্থাৎ ২৭ এবং ৪১ মৌলিক অধিকার এখন পর্যন্ত বলবৎ রয়েছে। কিন্তু ১২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ করার কথা বলা হয়েছিল তা এতদিন সংবিধান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। যার ফলে এ  দেশে শত শত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের উদ্ভব হয়েছে। আবারও বাংলাদেশ ‘৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাচ্ছে এটা দেশবাসীর জন্য অনেক আসার কারণ। ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্ব হলো- এটা প্রত্যেক মানুষকে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করে। এই স্বাধীনতা কেবল ধর্ম-বিশ্বাস লালন-পালন করার স্বাধীনতা নয় বরং ধর্ম না করার বা ধর্ম বর্জন করার স্বাধীনতাও এই ধর্মীয় স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কোরআনে আল¬াহতায়ালা বলেছেন, ‘তুমি বলো, তোমার প্রতিপালক-প্রভুর পক্ষ থেকে পূর্ণ সত্য সমাগত, অতএব যার ইচ্ছা সে ইমান আনুক আর যার ইচ্ছা সে অস্বীকার করুক’ (সুরা কাহাফ: ২৮ আয়াত)। সত্য ও সুন্দর নিজ সত্তায় এত আকর্ষণীয় হয়ে থাকে যার কারণে মানুষ নিজে নিজেই এর দিকে আকৃষ্ট হয়। বলপ্রয়োগ বা রাষ্ট্রশক্তি নিয়োগ করে সত্যকে সত্য আর সুন্দরকে সুন্দর ঘোষণা করানো অজ্ঞতার পরিচায়ক। ফার্সিতে বলা হয়, ‘আফতাব আমাদ্ দালিলে আফতাব’ অর্থাৎ সূর্যোদয়ই সূর্যের অস্তিত্বের প্রমাণ। এই নিয়ে গায়ের জোর খাটানোর বা বিতন্ডার অবকাশ নেই। সূর্যোদয় সত্ত্বেও কেউ যদি সূর্যের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে তাকে বোকা বলা যেতে পারে কিন্তু তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা  নেওয়ার কিছুই নেই। ঠিক তেমনি কে আল¬াহকে মানল বা মানল না, কে ধর্ম পালন করল বা করল না এটা নিয়ে এ জগতে বিচার বসানোর কোনো শিক্ষা ইসলাম ধর্মে নেই। বরং এর বিচার পরকালে আল¬াহ নিজে করবেন বলে তার শেষ শরিয়ত গ্রন্থ আল কোরআনে বারবার জানিয়েছেন। এ স্বাধীনতা কাজে লাগিয়ে সমাজে আস্তিকও থাকবে, নাস্তিকও থাকবে। মুসলমানও থাকবে হিন্দুও থাকবে এবং অন্যান্য মতাবলম্বীরাও থাকবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র পরিচালনা করার ইসলামী শিক্ষা কি আর ধর্মনিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে ইসলাম কি বলে তাও জানা প্রয়োজন।

ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্র পরিচালনার একটি নীতি। এর অর্থ ধর্মহীনতা বা ধর্ম বিমুখতা নয়। এর অর্থ হচ্ছে, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নায়করা নাগরিকদের ধর্ম বা বিশ্বাসের বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবেন। কে  কোন ধর্মে বিশ্বাসী বা কে অবিশ্বাসী অথবা নাস্তিক এ বিষয়ে রাষ্ট্র-যন্ত্র  কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার, সবাই রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সমান- এই হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা। অথচ না বোঝার কারণে অনেকেই ধর্মনিরপেক্ষতার বিপক্ষে কথা বলছেন। আসলে পূর্ণ নিরপেক্ষতা ছাড়া পক্ষপাতহীন ন্যায়-বিচার সম্ভব নয়। ইসলাম ধর্মের এই অমোঘ শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবনে। মক্কার নির্যাতিত অবস্থা থেকে মুক্তি চেয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা লাভের প্রত্যাশায় তিনি মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় পৌঁছানোর পর মদিনার ইহুদি ও অন্যান্য ধর্মগোষ্ঠী ও গোত্রের সঙ্গে তিনি একটি ‘সন্ধি’ করেন। এই সন্ধি ‘মদিনা সনদ’ নামে বিখ্যাত। ‘মদিনা সনদের’  প্রতিটি ছত্রে সকল ধর্মের ও বর্ণের মানুষের সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। মদিনা রাষ্ট্রের সকল নাগরিককে এক জাতিভুক্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। মদিনা সনদের ২৫ নম্বর ধারায় ধর্মনিরপেক্ষতার একটি বিরল উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এতে বলা হয় : ২৫. বনু আওফ গোত্রের ইহুদিরা মুমিনদের সাথে একই উম্মতভুক্ত বলে গণ্য হবে। ইহুদিদের জন্য ইহুদিদের ধর্ম, মুসলমানদের জন্য মুসলমানদের ধর্ম। একই কথা এদের মিত্রদের এবং এদের নিজেদের জন্য প্রযোজ্য। তবে যে অত্যাচার করবে এবং অপরাধ করবে সে কেবল নিজেকে এবং নিজ পরিবারকেই বিপদগ্রস্ত করবে। একটু ভেবে দেখুন, কি চমৎকার শিক্ষা! বিশ্বনবী, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, যে যে ধর্মেরই হোক না কেন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তাদের জাগতিক অবস্থান সমান। এটি নিছক একটি ঘোষণাই ছিল না। বরং মহানবী (সা.) মদিনার শাসনকাজ পরিচালনাকালে এর সুষ্ঠু বাস্তবায়নও করেছিলেন। একবার মহানবীর (সা.) শ্রেষ্ঠত্বের বিষয় নিয়ে একজন মুসলমান ও একজন ইহুদির মধ্যে বাক-বিতন্ডা হয়। একপর্যায়ে বিতন্ডা তিক্ততার স্তরে উপনীত হলে সেই ইহুদি মহানবীর (সা.) কাছে বিচারপ্রার্থী হয়। মহানবী (সা.) নিরপেক্ষ শাসক হিসেবে রায় দিয়ে বলেন, তোমরা আমাকে মুসার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করো না’ (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া লে ইবনে কাসির, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা-২৩৭)। এর অর্থ হচ্ছে, আধ্যাত্মিক জগতে কে শ্রেষ্ঠ আর কে  শ্রেষ্ঠ না এটা মানুষের সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। অতএব এ নিয়ে সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি করতে যেও না। ধর্ম বিষয়ে নিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা ইসলামের শিক্ষানুযায়ী দ্ব্যর্থহীনভাবে সাব্যস্ত। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালির ইতিহাসে প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রীয়ভাবে সব মানুষের স্ব-স্ব ধর্ম পালনের অধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার উৎস ছিল রাসুলুল¬াহ (সা.) প্রবর্তিত মদিনা সনদের সেই মহান অতুলনীয় শিক্ষা, যেখানে উলে¬খযোগ্য শর্ত ছিল- ‘মদিনায় ইহুদি-খ্রিস্টান, পৌত্তলিক এবং মুসলমান সকলেই নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে।’ ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর খসড়া সংবিধান প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দেন তাতেও ছিল ধর্মনিরপেক্ষতার বাণী। তিনি বলেছিলেন- ‘…আর হবে ধর্মনিরপেক্ষতা। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। হিন্দু তার ধর্ম পালন করবে; মুসলমান তার ধর্ম পালন করবে; খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ- যে যার ধর্ম পালন করবে। কেউ কারও ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, বাংলার মানুষ ধর্মের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ চায় না। রাজনৈতিক কারণে ধর্মকে ব্যবহার করা যাবে না। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ধর্মকে বাংলার বুকে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। যদি  কেউ ব্যবহার করে, তাহলে বাংলার মানুষ যে তাকে প্রত্যাঘাত করবে, এ আমি বিশ্বাস করি।’ ১৯৭২ সালে ৪ নভেম্বর আবার জাতীয় সংসদে তিনি বলেন: ‘জনাব স্পিকার সাহেব, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। বাংলার সাড়ে সাত  কোটি মানুষের ধর্মকর্ম করার অধিকার থাকবে। আমরা আইন করে ধর্মকে বন্ধ করতে চাই না এবং করবও না। ২৫ বছর আমরা দেখেছি, ধর্মের নামে জুয়াচুরি, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেইমানি, ধর্মের নামে খুন, ধর্মের নামে ব্যভিচার- এই বাংলাদেশের মাটিতে এ সব চলেছে। ধর্ম অতি পবিত্র জিনিস। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না। যদি কেউ বলে, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে, আমি বলব, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়নি। সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করার ব্যবস্থা করেছি।’ আমরা বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধু নির্দিষ্ট কোনো দল বা গোষ্ঠীর নন, তিনি ছিলেন সবার জন্য। তার জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা যদি কাজ করি তবেই বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার স্বপ্ন পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত করা সম্ভব হবে আর রাষ্ট্র ও দেশ হবে সুখী, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ। তাই ধর্মনিরপেক্ষতার যারা বিরোধিতা করে তারা মূলত ইসলামের শিক্ষা এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বিরোধিতা করছে। ধর্মনিরপেক্ষতা এমন একটি চশমা যা পরিধান করলে শাসকদের চোখে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ কেবল একজন মানুষ হিসেবেই ধরা  দেয়। তখন সে সবাইকে আল¬াহর এক সম্মানিত সৃষ্টি হিসেবে মনে করে। এই শিক্ষা আমরা মহান আল¬াহর ব্যবহার থেকেও গ্রহণ করতে পারি। তিনি যেমন মুসলমান-অমুসলমান, আস্তিক-নাস্তিক, পুণ্যবান-পাপী নির্বিশেষে সবার প্রতি অনুগ্রহ করেন, তাদের সৎকর্মের প্রতিদান দেন, সবাইকে সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত করেন, সবাইকে তার দয়ার বৃষ্টি বর্ষণ করেন ঠিক তেমনি জাগতিক সরকার বা রাষ্ট্র নায়কদেরও ধর্মনিরপেক্ষতার এই গুণটি অবলম্বন করা উচিত। লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়

ধর্মনিরপেক্ষতা এমন একটি চশমা যা পরিধান করলে শাসকদের চোখে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ কেবল একজন মানুষ হিসেবেই ধরা  দেয়। তখন সে সবাইকে আল¬াহর এক সম্মানিত সৃষ্টি হিসেবে মনে করে। সম্প্রতি সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা চালু করার দাবিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশি¬ষ্ট ১০ জনকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। ১৬ আগস্ট নোটিশটি পাঠান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অশোক কুমার ঘোষ। তিনি নিজেই সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। নোটিশে বলা হয়েছে, ১৯৪৭ সালের পর পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণ, নির্যাতন এবং বেআইনি কার্যকলাপের প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে আমরা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ অন্য নাগরিকরা এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ভারত-রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশের সার্বিক সহযোগিতায় স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আমাদের ১৯৭২ সালের পবিত্র সংবিধানে স্বাধীনতার চেতনাসহ রাষ্ট্র পরিচালনায় মূলনীতি ছিল জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। আমরা জানি, ‘৭২-এর সংবিধানে উলে¬খ ছিল ‘মানুষের ওপর মানুষের  শোষণ হতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।’ (অনুচ্ছেদ ১০) এখানে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চিন্তার প্রাধান্য পাওয়া যায়। এবং ১২ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার ১২ (গ)’ বন্ধ করার কথা বলা হয়েছিল। ৪১ অনুচ্ছেদে সব ধর্ম পালন ও প্রচারের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। অনুচ্ছেদ ২৭-এ ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী’। এ দুটি অনুচ্ছেদ অর্থাৎ ২৭ এবং ৪১ মৌলিক অধিকার এখন পর্যন্ত বলবৎ রয়েছে। কিন্তু ১২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ করার কথা বলা হয়েছিল তা এতদিন সংবিধান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। যার ফলে এ  দেশে শত শত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের উদ্ভব হয়েছে। আবারও বাংলাদেশ ‘৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাচ্ছে এটা দেশবাসীর জন্য অনেক আসার কারণ। ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্ব হলো- এটা প্রত্যেক মানুষকে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করে। এই স্বাধীনতা কেবল ধর্ম-বিশ্বাস লালন-পালন করার স্বাধীনতা নয় বরং ধর্ম না করার বা ধর্ম বর্জন করার স্বাধীনতাও এই ধর্মীয় স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কোরআনে আল¬াহতায়ালা বলেছেন, ‘তুমি বলো, তোমার প্রতিপালক-প্রভুর পক্ষ থেকে পূর্ণ সত্য সমাগত, অতএব যার ইচ্ছা সে ইমান আনুক আর যার ইচ্ছা সে অস্বীকার করুক’ (সুরা কাহাফ: ২৮ আয়াত)। সত্য ও সুন্দর নিজ সত্তায় এত আকর্ষণীয় হয়ে থাকে যার কারণে মানুষ নিজে নিজেই এর দিকে আকৃষ্ট হয়। বলপ্রয়োগ বা রাষ্ট্রশক্তি নিয়োগ করে সত্যকে সত্য আর সুন্দরকে সুন্দর ঘোষণা করানো অজ্ঞতার পরিচায়ক। ফার্সিতে বলা হয়, ‘আফতাব আমাদ্ দালিলে আফতাব’ অর্থাৎ সূর্যোদয়ই সূর্যের অস্তিত্বের প্রমাণ। এই নিয়ে গায়ের জোর খাটানোর বা বিতন্ডার অবকাশ নেই। সূর্যোদয় সত্ত্বেও কেউ যদি সূর্যের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে তাকে বোকা বলা যেতে পারে কিন্তু তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা  নেওয়ার কিছুই নেই। ঠিক তেমনি কে আল¬াহকে মানল বা মানল না, কে ধর্ম পালন করল বা করল না এটা নিয়ে এ জগতে বিচার বসানোর কোনো শিক্ষা ইসলাম ধর্মে নেই। বরং এর বিচার পরকালে আল¬াহ নিজে করবেন বলে তার শেষ শরিয়ত গ্রন্থ আল কোরআনে বারবার জানিয়েছেন। এ স্বাধীনতা কাজে লাগিয়ে সমাজে আস্তিকও থাকবে, নাস্তিকও থাকবে। মুসলমানও থাকবে হিন্দুও থাকবে এবং অন্যান্য মতাবলম্বীরাও থাকবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র পরিচালনা করার ইসলামী শিক্ষা কি আর ধর্মনিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে ইসলাম কি বলে তাও জানা প্রয়োজন।

ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্র পরিচালনার একটি নীতি। এর অর্থ ধর্মহীনতা বা ধর্ম বিমুখতা নয়। এর অর্থ হচ্ছে, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নায়করা নাগরিকদের ধর্ম বা বিশ্বাসের বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবেন। কে  কোন ধর্মে বিশ্বাসী বা কে অবিশ্বাসী অথবা নাস্তিক এ বিষয়ে রাষ্ট্র-যন্ত্র  কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার, সবাই রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সমান- এই হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা। অথচ না বোঝার কারণে অনেকেই ধর্মনিরপেক্ষতার বিপক্ষে কথা বলছেন। আসলে পূর্ণ নিরপেক্ষতা ছাড়া পক্ষপাতহীন ন্যায়-বিচার সম্ভব নয়। ইসলাম ধর্মের এই অমোঘ শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবনে। মক্কার নির্যাতিত অবস্থা থেকে মুক্তি চেয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা লাভের প্রত্যাশায় তিনি মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় পৌঁছানোর পর মদিনার ইহুদি ও অন্যান্য ধর্মগোষ্ঠী ও গোত্রের সঙ্গে তিনি একটি ‘সন্ধি’ করেন। এই সন্ধি ‘মদিনা সনদ’ নামে বিখ্যাত। ‘মদিনা সনদের’  প্রতিটি ছত্রে সকল ধর্মের ও বর্ণের মানুষের সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। মদিনা রাষ্ট্রের সকল নাগরিককে এক জাতিভুক্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। মদিনা সনদের ২৫ নম্বর ধারায় ধর্মনিরপেক্ষতার একটি বিরল উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এতে বলা হয় : ২৫. বনু আওফ গোত্রের ইহুদিরা মুমিনদের সাথে একই উম্মতভুক্ত বলে গণ্য হবে। ইহুদিদের জন্য ইহুদিদের ধর্ম, মুসলমানদের জন্য মুসলমানদের ধর্ম। একই কথা এদের মিত্রদের এবং এদের নিজেদের জন্য প্রযোজ্য। তবে যে অত্যাচার করবে এবং অপরাধ করবে সে কেবল নিজেকে এবং নিজ পরিবারকেই বিপদগ্রস্ত করবে। একটু ভেবে দেখুন, কি চমৎকার শিক্ষা! বিশ্বনবী, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, যে যে ধর্মেরই হোক না কেন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তাদের জাগতিক অবস্থান সমান। এটি নিছক একটি ঘোষণাই ছিল না। বরং মহানবী (সা.) মদিনার শাসনকাজ পরিচালনাকালে এর সুষ্ঠু বাস্তবায়নও করেছিলেন। একবার মহানবীর (সা.) শ্রেষ্ঠত্বের বিষয় নিয়ে একজন মুসলমান ও একজন ইহুদির মধ্যে বাক-বিতন্ডা হয়। একপর্যায়ে বিতন্ডা তিক্ততার স্তরে উপনীত হলে সেই ইহুদি মহানবীর (সা.) কাছে বিচারপ্রার্থী হয়। মহানবী (সা.) নিরপেক্ষ শাসক হিসেবে রায় দিয়ে বলেন, তোমরা আমাকে মুসার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করো না’ (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া লে ইবনে কাসির, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা-২৩৭)। এর অর্থ হচ্ছে, আধ্যাত্মিক জগতে কে শ্রেষ্ঠ আর কে  শ্রেষ্ঠ না এটা মানুষের সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। অতএব এ নিয়ে সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি করতে যেও না। ধর্ম বিষয়ে নিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা ইসলামের শিক্ষানুযায়ী দ্ব্যর্থহীনভাবে সাব্যস্ত। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালির ইতিহাসে প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রীয়ভাবে সব মানুষের স্ব-স্ব ধর্ম পালনের অধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার উৎস ছিল রাসুলুল¬াহ (সা.) প্রবর্তিত মদিনা সনদের সেই মহান অতুলনীয় শিক্ষা, যেখানে উলে¬খযোগ্য শর্ত ছিল- ‘মদিনায় ইহুদি-খ্রিস্টান, পৌত্তলিক এবং মুসলমান সকলেই নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে।’ ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর খসড়া সংবিধান প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দেন তাতেও ছিল ধর্মনিরপেক্ষতার বাণী। তিনি বলেছিলেন- ‘…আর হবে ধর্মনিরপেক্ষতা। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। হিন্দু তার ধর্ম পালন করবে; মুসলমান তার ধর্ম পালন করবে; খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ- যে যার ধর্ম পালন করবে। কেউ কারও ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, বাংলার মানুষ ধর্মের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ চায় না। রাজনৈতিক কারণে ধর্মকে ব্যবহার করা যাবে না। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ধর্মকে বাংলার বুকে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। যদি  কেউ ব্যবহার করে, তাহলে বাংলার মানুষ যে তাকে প্রত্যাঘাত করবে, এ আমি বিশ্বাস করি।’ ১৯৭২ সালে ৪ নভেম্বর আবার জাতীয় সংসদে তিনি বলেন: ‘জনাব স্পিকার সাহেব, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। বাংলার সাড়ে সাত  কোটি মানুষের ধর্মকর্ম করার অধিকার থাকবে। আমরা আইন করে ধর্মকে বন্ধ করতে চাই না এবং করবও না। ২৫ বছর আমরা দেখেছি, ধর্মের নামে জুয়াচুরি, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেইমানি, ধর্মের নামে খুন, ধর্মের নামে ব্যভিচার- এই বাংলাদেশের মাটিতে এ সব চলেছে। ধর্ম অতি পবিত্র জিনিস। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না। যদি কেউ বলে, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে, আমি বলব, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়নি। সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করার ব্যবস্থা করেছি।’ আমরা বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধু নির্দিষ্ট কোনো দল বা গোষ্ঠীর নন, তিনি ছিলেন সবার জন্য। তার জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা যদি কাজ করি তবেই বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার স্বপ্ন পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত করা সম্ভব হবে আর রাষ্ট্র ও দেশ হবে সুখী, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ। তাই ধর্মনিরপেক্ষতার যারা বিরোধিতা করে তারা মূলত ইসলামের শিক্ষা এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বিরোধিতা করছে। ধর্মনিরপেক্ষতা এমন একটি চশমা যা পরিধান করলে শাসকদের চোখে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ কেবল একজন মানুষ হিসেবেই ধরা  দেয়। তখন সে সবাইকে আল¬াহর এক সম্মানিত সৃষ্টি হিসেবে মনে করে। এই শিক্ষা আমরা মহান আল¬াহর ব্যবহার থেকেও গ্রহণ করতে পারি। তিনি যেমন মুসলমান-অমুসলমান, আস্তিক-নাস্তিক, পুণ্যবান-পাপী নির্বিশেষে সবার প্রতি অনুগ্রহ করেন, তাদের সৎকর্মের প্রতিদান দেন, সবাইকে সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত করেন, সবাইকে তার দয়ার বৃষ্টি বর্ষণ করেন ঠিক তেমনি জাগতিক সরকার বা রাষ্ট্র নায়কদেরও ধর্মনিরপেক্ষতার এই গুণটি অবলম্বন করা উচিত। লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

করোনা টিকা আর অগ্রাধিকারের প্রতিশ্র“তি

করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তির উপায় কী? আপাতত সর্বজনগ্রাহ্য উত্তরÑ ভ্যাকসিন। যার পরিভাষা- টিকা। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের ঘাম ঝরে যাচ্ছে সেই ভ্যাকসিন আবিষ্কারে। উহানে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিষেধক হিসেবে টিকা, ওষুধ, প্লাজমা থেরাপি, হার্ড ইমিউনিটি অনেক কিছুর কথা শোনা গেছে। টানা সাত মাস চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের প্রাণপাত করা চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত মুক্তির আলো হিসেবে দেখা যাচ্ছে ভ্যাকসিনকে। আর সেই ভ্যাকসিন  তৈরির দৌড় শুরু করছে অনেক দেশ। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষও করেছে কয়েকটা  দেশ। তবে সবার আগে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ করে সাফল্য দাবির ঘোষণা দিয়েছে রাশিয়া। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের মেয়ে শরীরে ভ্যাকসিন নিয়েছেন।  তেমন ঘোষণাও এসেছে। তবে ভ্যাকসিন তৈরির দৌড়ে এগিয়ে থাকার ঘোষণাটা মূলত রাজনৈতিক এবং অবশ্যই বাণিজ্যিক। ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তেমনটা মনে করছেন অনেকে। রুশ ভ্যাকসিন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে কতটা সফল তার অনেক কিছুই অজানা খোদ বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার। তবে করোনা মহামারীর এই সংকটকালে রুশ ভ্যাকসিন সত্যি মানুষের মনে স্বস্তি আর আশার আলো নিয়ে এসেছে। তবে করোনা নিয়ে এখনো অস্বস্তিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষ। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা সেটা আবারও বলল, করোনা সংক্রমণ কমলেও ব্যতিক্রম এই অঞ্চল। আতঙ্ক আর হতাশার মাঝে এ অঞ্চলের মানুষ তাকিয়ে আছে কবে ভ্যাকসিন পাবে তারা। বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষ থামছেই না। পাশাপাশি বইছে ভ্যাকসিন নিয়ে আশা আর প্রতিশ্র“তির বন্যা। যে উহান এই করোনা ভাইরাসের জন্মভূমি সেই চীনা বিশেষজ্ঞরাও এসে গেছেন বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পথ বাতলে দিতে! এ দেশের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে চীনা বিশেষজ্ঞরা যা বলে গেছেন তার সঙ্গে এখনো বাস্তবতার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে তারা প্রতিশ্র“তি দিয়ে গেছেন, চীনে ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার পাবে। কেউ  কেউ এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, চীনা ভ্যাকসিনের কিছু ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বাংলাদেশে হবে। কিন্তু কবে? এর সান্তনাসূচক উত্তরÑ ‘না হওয়ার চেয়ে বিলম্বে হওয়া ভালো।’ তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রাণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে মনে হয়, ওই কথাটাও বলা এখন আর সহজ নয়। তবে প্রতিশ্র“তি শুধু চীন নয়। দিনকয়েক আগে ভারতও দিল। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা খুব নীরবে ঢাকা সফরে এসে সরবে বলে গেলেন, ভারতের করোনা ভ্যাকসিনে অগ্রাধিকার পাবে বাংলাদেশ। মহামারী বিধ্বস্ত এই সময়ে, তুমুল অনিশ্চয়তা  যেখানে চিকিৎসা নিয়ে, সেখানে কার সঙ্গে কার রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, সেই দ্বন্দ্বে কার কী লাভ-ক্ষতি হবে, সেটা দূরে সরিয়ে রেখে এসব প্রতিশ্র“তি এখন আমাদের আশার মন্ত্র। প্রতিষেধক টিকার দুনিয়ার পরশমণি হলো হার্ড ইমিউনিটি বা গোষ্ঠী প্রতিরোধ ক্ষমতাÑ এমন একটা অবস্থায় পৌঁছানো, যেখানে জনগোষ্ঠীর অধিকাংশের ক্ষমতার মধ্যেই সংক্রমণটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গোষ্ঠী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে জনগোষ্ঠীর ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ লোককে টিকা দেওয়া প্রয়োজন। পৃথিবীর সব দেশে, সব সমাজে এমন কিছু মানুষ থাকে যাদের সব ধরনের টিকা দেওয়া সম্ভব নয়। যেমনÑ সদ্যোজাত শিশু, কম বয়সী শিশু, নির্দিষ্ট কিছু রোগে ভোগা মানুষ। তবে গোষ্ঠী প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হলে এদেরও সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। দুনিয়াজুড়ে বিজ্ঞানী আর বিশেষজ্ঞরা কোভিড-১৯ এর প্রতিষেধকের জন্য প্রাণপাত চেষ্টা চালাচ্ছেন। আর মানুষ ব্যাকুল হয়ে পড়েছে করোনা ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য। তবে এই তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে আবার বড় বিপদকে ডেকে আনা না হয়! শঙ্কা কিন্তু থাকছে। ইতিহাসে তেমন নজিরও আছে। ১৯৫৫ সালে  পোলিও নিয়ে সে রকম বিপত্তি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। সে বছর এপ্রিলে দুলাখের  বেশি শিশুকে পোলিও টিকা দেওয়া হয়েছিল। তাতে বড় একটা গন্ডগোল হয়েছিল। যে পদ্ধতিতে টিকা তৈরি হয়েছিল তাতে লাইভ ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করার পদ্ধতিটি কাজ করেনি। এর পরই আসতে শুরু করে দুঃসংবাদ। একের পর এক শিশু পঙ্গু হতে শুরু করে। এখন করোনা ভাইরাসের টিকা বাজারজাতকরণ নিয়ে যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তাতে টিকা যে বাজারে আসছে তাতে সন্দেহ  নেই। তবে সেটা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে কতটা সফল তা নিয়ে সংশয় থাকতেই পারে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রাথমিক পর্যায়ে সফল টিকা আবিষ্কারের দৌড়ে থাকা প্রায় সব দেশ। তবে গবেষণার কোনো একটা ধাপে সাফল্যের খবর আর কার্যকর প্রতিষেধক তৈরির মাঝে বড় ফারাক। ট্রায়াল হয় সুস্থ স্বেচ্ছাসেবীদের শরীরে। আর টিকা প্রয়োগ করা হবে সুস্থ, অসুস্থ সবার শরীরে। আবার আবিষ্কারে সফল হবে যে টিকা, তা কতদিন কার্যকর থাকবে, বিশ^জুড়ে কতশত কোটি ডোজ প্রয়োজন হবে, প্রতিবছর কত টিকা তৈরি করতে হবে, এ রকম জটিল অনেক সমীকরণের মধ্যদিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে করোনা টিকা আবিষ্কার প্রক্রিয়া। তা ছাড়া এসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপুল অঙ্কের খরচ। তাই আমরা যদি ভাবি করোনা ভাইরাস টিকা বাজারে এলেই যুদ্ধ জয় সম্ভব হবে, সেটা ভিত্তিহীন আশাবাদ। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশের মানুষের জন্য। সবাই আমাদের প্রতিশ্র“তি দিচ্ছে, টিকা আবিষ্কার হলে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার পাবে। হ্যাঁ, পাবে। কিন্তু তাতে সাধারণ মানুষ বা রোগীরা কতটা লাভবান হবেন? টিকা আবিষ্কারের পর তা  জোগাড়ে আমরা কি প্রস্তুত? সবশেষ প্রতিশ্র“তি দিয়েছে ভারত। তারা এরই মধ্যে অক্সফোর্ডের অ্যাস্টাজেনের সঙ্গে চুক্তি করেছে। তারা যদি টিকা আবিষ্কারে সফল হয়, তা হলে ২০২১-এর মধ্যে ভারতে তারা ১শ কোটি টিকা রপ্তানি করবে। ভারত পেল। ভারতীয়  কোম্পানি টিকা আবিষ্কারও করল। কিন্তু যতই অগ্রাধিকার দেওয়া হোক বাংলাদেশকে, ভারত কেন, অন্য কোনো দেশই কি নিজের দেশের মানুষকে টিকা না দিয়ে অন্য দেশের জনগণের জন্য টিকা পাঠাবে? কারও অগ্রাধিকারের প্রতিশ্র“তির ওপর বিশ^াস রেখে বসে না থেকে বাংলাদেশ যদি টিকা আমদানি করতে যায়, সেখানে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক বাধা তৈরি হতে পারে। সে আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। চীন-ভারত সম্পর্ক, ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বাজারে করোনা টিকার জোগান কীভাবে হবে সেটাও বড় এক প্রশ্ন। তার চেয়ে বড় প্রশ্ন সব বাধা-বিপত্তি  পেরিয়ে যদি করোনা টিকা বাংলাদেশের বাজারে ঢুকে পড়ে, তা হলে  সেটা গরিব মানুষের থাকবে? আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় আশাবাদী হওয়ার মতো কিছু নেই। গরিবের জন্য আর পাঁচটা অসুবিধার মতো এই করোনা টিকা পাওয়াও বড় একটা অসুবিধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এটা বড়লোকদের টিকা হয়ে যাবে না তো? করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে সংক্রমিত হতে শুরু করার পর থেকে বিলাপে-দৈব্য-বিশ^াসী বাঙালি জনমানসে আত্মনিয়ন্ত্রণহীন কপাল-চাপড়ানো রূপ কিন্তু দেখা  গেছে। করোনা টেস্ট করাতেই অনীহা গরিব সাধারণ মানুষের। তাদের অনেকের বিশ^াস, করোনা তাদের করুণা করছে। এই রোগটা বড়লোকদের। বিত্তবানরাই মরছেন বেশি। কৃষক-শ্রমিক-খেটে খাওয়া মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে না। এ রকম একটা ধারণা নিয়ে জীবনযাপনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলারও তোয়াক্কা করছেন না তারা। আক্রান্ত হলে হাসপাতালমুখী হচ্ছেন না! কারণ তারা বিশ^াস করতে শুরু করেছেন, করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে গেলে কেউ জীবিত ফিরছেন না! করোনা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিন সরকার কেন বন্ধ করে দিল তাও পরিষ্কার বোঝা গেল না! বরং জনমানসে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, সরকার  বোধহয় তথ্য লুকাতে করোনা বুলেটিন বন্ধ করেছে! সেই বিশ^াস আরও দৃঢ় ভিত্তি  পেয়ে যায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বদলে, স্বাস্থ্য খাত নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির রোজকার খবরে। করোনা মহামারীগ্রস্ত নগর, শহর, গঞ্জ, জনপদের মানুষ বিভ্রান্ত নাকি ভাগ্যে বিশ^াসী হয়ে নেতিয়ে পড়েছেন! এদের মনে সাহস আর বিশ^াসের আপাতত একটাই ওষুধ। ভ্যাকসিন বা টিকা। কবে বাংলাদেশের জনগণ পাবেন সেই টিকা? আবিষ্কারের পর হাত পাতলেই টিকা পাওয়া যাবে না। প্রক্রিয়াটা দীর্ঘসূত্র। ভ্যাকসিন পাওয়ার ব্যাপারে রাজনৈতিক-কূটনৈতিক-বাণিজ্যিক চাপান-উতোরের উপাদান আছে। কিন্তু বহু কাঙ্খিত সেই ভ্যাকসিন পেতে যদি অতিবিলম্ব হয় তা হবে বঞ্চনার শামিল। তাতে ঝরে যেতে পারে আরও অনেক প্রাণ। করোনা ভাইরাসের টিকা তৈরির সাধ্য আমাদের আছে কি না সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। তবে টিকা পাওয়া আমাদের সাধ্যায়াত্ত কিনা সে ব্যাপারেও পরিষ্কার কোনো বক্তব্য নেই। বরং বিভ্রান্তি ছড়ানো বক্তব্য আসছে  খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে। ‘করোনা এমনিই চলে যাবে। ভ্যাকসিন লাগবে কি না বলা যাচ্ছে না।’ অদৃশ্য ঘাতক করোনা কীভাবে দাঁত বসিয়েছে সুস্থ সমাজে  সেটা মনে হয় মন্ত্রী বুঝতে পারছেন না! সংক্রমণের এই মহামারীকালে জনস্বাস্থ্যবান্ধব মন্ত্রীর মতো কর্মতৎপরতা না দেখাতে পারেন, গণপরিসরে নিজেকে দায়িত্বহীন ব্যক্তি হিসেবে হাজির করবেন না। তাতে করোনাকালে আর্তের অবহেলার দায়টা সরকারের ওপর চেপে বসবে, যা কোনোভাবে কাম্য হতে পারে না। লেখক ঃ সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক

 

 

 

আসুন লজ্জিত হই

ভিরমি খাওয়ার উপক্রম হয়েছে নিশ্চয়। ভাবছেন, এ আবার  কেমন কথা আর কেমন আহ্বান? ‘আসুন লজ্জিত হই’- এ কথা কেউ কখনো বলে কাউকে কস্মিনকালে বলেছে কী? শল্যবিদ্যা মতে, হাসি মানুষের জন্য বেশ উপকারী। নিয়মিত হাসি সুস্থ স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক। এ কারণে স্বাস্থ্যসচেতন ব্যক্তিরা এখন সংঘবদ্ধভাবে নিয়মিত হাসির  রেওয়াজ করেন। তাই কোথাও কোথাও বড় করে লেখা থাকে, ‘আসুন হাসি’। হাসির ক্লাব রয়েছে বিদেশে। হাসি-সংস্কৃত সমাদৃতও সেখানে। কিন্তু ‘আসুন লজ্জিত হই’- এমনটি শোনা যায়নি কখনো। অথচ তা থাকাটি খুব জরুরি ছিল, বিশেষ করে আমাদের সমাজবাস্তবতা ও ব্যক্তিমানুষের চর্চায়। এই নষ্ট সময়ে ও বৈরী প্রতিবেশ-পরিবেশে লজ্জার চর্চাটা থাকলে বোধহয় অনৈতিকতার বিষবৃক্ষ এভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারত না। আমাদের আশপাশের মানুষজন এতটা দুর্বিনীত ও দুর্নীতির রাঘববোয়াল হয়ে ওঠার সুযোগ পেত না। করোনাকালে আমাদের অসাধুতা, কপটতা, দুর্নীতি যেভাবে উদোম হয়ে গেছে, এতে মনে হয় না এই সমাজের মানুষের  ভেতর লজ্জা বলে কিছু আছে কিংবা ছিল। এই সমাজ-রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকারক মানুষজন বরং সব অপকর্ম করেও কোনো অপরাধবোধে ভোগে না। নিজেকে একঘরে মনে করে না। উল্টো তারা গ্রামবাংলায় দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত ওই কথাটিকেই প্রকৃষ্ট সত্যরূপে পরিগণিত করে তোলে- ‘যার একবার নাক কাটে, সেই যায় গ্রামের বাইরে দিয়ে আর যার সাতবার নাক কাটে, সেই যায় গ্রামের ভেতর দিয়ে।’ এই অবস্থায় লজ্জাহীন, অরুচিকর, ইতর প্রাণীর মতো ন্যায়-অন্যায় বোধহীন মানুষের কর্মকান্ডে আমাদেরই লজ্জিত হওয়া যুক্তিযুক্ত নয় কী? আসুন, আমরা বিষয়টি একটু খোলসাই করতে করতে  ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করি এবং এই লেখার উপর্যুক্ত শিরোনামের সুলুকসন্ধান করি। দেশে করোনার রোগী প্রথম শনাক্ত হয় চলতি বছরের ৮ মার্চ। এর পর যতই দিন  পেরিয়েছে, আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত রিজেন্টের সাহেদের প্রতারণা। তার প্রতারণার কারণে বিদেশে আমাদের  দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে। সাহেদের প্রতারণার জাল কতটা বিস্তৃত, ভয়ঙ্কর ও সর্বগ্রাসী- এর কিছুটা হলেও ইতোমধ্যে আঁচ করা গেছে। সাহেদ গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাকে নানা মেয়াদ ও অভিযোগে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। সাহেদ এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার অধীন। তাকে নিয়ে আপাতত  কোনো প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, প্রতারক সাহেদকে ঘিরে নির্মিত পার্শ্বচরিত্রগুলো নিয়ে। আচ্ছা, সাহেদ কি মধ্যাহ্ন সূর্যের মতো একা? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ নাটকের একটি সংলাপ বেশ আলোচিত- ‘মধ্যাহ্ন সূর্যের কোনো সঙ্গী থাকে না।’ সূর্য যখন ঠিক মধ্যাহ্নে থাকে, এর কোনো ছায়াও থাকে না। সাহেদ নিশ্চয় অতটা একা নন। আর একা এত বড় প্রতারণা কখনো করাও যায় না, সম্ভব নয়। মিডিয়ার কল্যাণে আমরা জেনে গিয়েছি, সে একা নয় এবং তার ছবি-সংস্কৃতিও সেটিই বলে। অথচ এখন পর্যন্ত সাহেদের পার্শ্বচরিত্ররা অধরাই রয়ে গেছে। কাউকেই আইনের আওতায় আনা হয়নি। যাদের নিয়ে, যাদের সহযোগিতায়, যাদের সঙ্গে উপঢৌকন বিনিময়ের মধ্য দিয়ে সাহেদ হয়ে উঠেছেন এই সময়ের আনপ্যারালাল ভন্ড, প্রতারক- তারা তো মনে হয় ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে। দেশবাসীর কি জানার অধিকার নেই তারা কারা? সাহেদের একটি পরিচয়- তিনি ‘নতুন কাগজ’ নামের একটি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক। এমনকি তার অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড পর্যন্ত রয়েছে। লক্ষ্য করুন, কাছাকাছি সময়ে ফরিদপুরের দুই ভাই সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও ইমতিয়াজ হাসান রুবেলের দুর্নীতি এবং দখলের খবর গণমাধ্যমে এসেছে। উল্লেখ্য, তারাও একটি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক। অন্যদিকে নাটোরেও এমন এক ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গেছে- যিনি একাই ৫০টি অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক-প্রকাশক। একটি পত্রিকার ডিক্লারেশন নিতে হলে কত রকমের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অথচ সেখানে সাহেদের মতো ফেরারি আসামিরাও কায়দা করে হয়ে যাচ্ছেন সম্পাদক-প্রকাশক। তাদের কথা তো জানা হলো। তার পর যে উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা ছিল, তা কি নেওয়া হয়েছে? সাহেদের মতো প্রতারক সম্পাদক-প্রকাশক কি এখনো এই সমাজ-রাষ্ট্রে ঘাপটি মেরে থেকে তাদের অসাধু-অনৈতিক কাজ করে যাচ্ছে না? নাকি সাহেদ শুধু একা একজন ছিলেন? নিশ্চয় নয়। তা হলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে কবে? হাইকোর্ট যথার্থই বলেছেন, গণমাধ্যমে না এলে সাহেদের প্রতারণা অজানাই থেকে যেত। এর পর তো প্রশাসনের টনক নড়া উচিত। চিরুনি অভিযানের মধ্য দিয়ে খুঁজে বের করা উচিত সাহেদের পার্শ্বচরিত্রগুলো ও বর্ণচোরা সাহেদদের। এবার সাহেদ থেকে বিদ্যুতে আসি। যারা প্রমাণ করে দিল একবিংশ শতাব্দীর এই মঙ্গল গ্রহজয়ী বিজ্ঞাননির্ভর পৃথিবীর  কোথাও ভূত না থাকলেও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে ভূত আছে। ভুতুড়ে বিল দিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ এই করোনাকালে জনগণের সঙ্গে গর্হিত অপরাধ করেছে। তা ক্ষমার অযোগ্য, নিন্দারও অধিক নিন্দনীয়। আমাদের বিদ্যুৎ খাত কখনই প্রত্যাশিত গ্রাহকবান্ধব হয়ে উঠতে পারিনি। তাদের নানাবিধ ব্যর্থতা উসুল করা হয় গ্রাহকের ওপর প্রতিবছর বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে। এর পর রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকির অগণন উদাহরণ। তবুও এসব মন্দের ভালো হিসেবে জনগণ সয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ভুতুড়ে বিল যেন সেখানে মরণদূত হয়ে ঠুকে দিয়েছে সর্বশেষ পেরেক। জনগণের যেহেতু বিকল্প নেই,  সেহেতু তাদের দশা হয়েছে- না পারছে সইতে, না পারছে কইতে। আমাদের পাশের দেশের সবচেয়ে নিকটবর্তী ভারতের প্রদেশ পশ্চিমবঙ্গে করোনাকালে বিদ্যুৎ বিল মওকুফ, অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত, কিস্তিতে প্রদানের সুবিধাদিসহ নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পৃথিবীর কোনো দেশে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে এ রকম ভুতুড়ে কান্ড ঘটানো হয়নি- যেটি আমাদের দেশে ঘটেছে। অথচ এত বড় ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নেই, শাস্তির নামে নামকাওয়াস্তে কয়েকজনের ওপর যে অ্যাকশন নেওয়া হয়েছে- তা পর্বতের মূষিক প্রসবতুল্য। ডা. আবুল কালাম আজাদের কথায় আসায় যাক। সদ্য চুক্তি বাতিল হওয়া স্বাস্থ্য অধিদফতরের এই মহাপরিচালকের (ডিজি) অফিস ফটকের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ চাউর হয়েছে। সেখানে বড় করে লেখা রয়েছে, ‘আমি ও আমার প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিমুক্ত’। সাধে কি আর গুণীজনরা বলেছেন, ‘ নৈতিকতা এত সহজ জিনিস নয়- যে কারও কাছ থেকে তুমি এটি প্রত্যাশা করবে।’ স্বাস্থ্যের একজন ডিজিও কি যে কেউ- তার কাছ থেকে আমরা ন্যূনতম নৈতিকতাও প্রত্যাশা করতে পারব না? জেকেজির সাবরিনা-আরিফ দম্পতির করোনা শনাক্তকরণে জালিয়াতির খবরটি ছিল দেশব্যাপী বেশ আলোচিত। তারা আইনের আওতায় এসেছে। কিন্তু এখানেও পার্শ্বচরিত্রগুলোর কোনো হদিস নেই। তাদের পৃষ্ঠপোষক কারা, কাদের  যোগসাজশে তারা হয়ে উঠলেন এ রকম খলচরিত্র- তা হয়তো জানার সুযোগ হবে কখনই। এভাবে বিষবৃক্ষের শিকড়-বাকড় রেখে এক-দুটি গাছ কেটে যদি আমরা মনে করি দুর্নীতির মূলোৎপাটন সম্ভব, তা হলে  সেটি স্ফ্রে রসিকতা ছাড়া অন্য কিছু নয়। আর এই রসিকতা যখন সমাজ-রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গেড়ে বসে, তখন স্বাভাবিক সময়ের পাশাপাশি বিপদাপন্ন অবস্থাও মানুষের জীবন-জীবিকা ও বেঁচে থাকার মৌল শর্তগুলোয় কেবলই শয়তানের পাশা খেলার দৃশ্য রচিত হয়। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, এসব দেখার পরও আমাদের হেলদোলের কোঠা শূন্যপ্রায়। কারণ ব্রিটিশ তাড়ানো বাঙালি, ক্ষুদিরামের উত্তরাধিকারে স্নাত বাঙালি ধরেই নিয়েছে ‘ক্ষুদিরাম হবে পাশের বাড়ির ছেলে।’সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ ও  দোর্দন্ড প্রতাপের যুগে আমরা এটিকে কি ন্যূনতম ইতিবাচক কাজে লাগাতে পারছি? যদি পারতাম, তা হলে শয়তানের পাশা খেলা এভাবে চলতে পারত না। বোবা হয়ে থাকলে দুর্বৃত্তরাই সুবিধা নেবে। তাই অনৈতিকতা, অসাধুতা ও অন্যায্যতায় যে বা যারা যুক্ত থাকবে- তাদের বয়কট, ঘৃণা ও সুযোগ-সুবিধাকে উপেক্ষা করতে হবে এবং তাদের দেখানো ভয়-ভীতিকে থোড়াই কেয়ার করতে হবে। সেটি শুরু করতে হবে নিজ নিজ জায়গা থেকে। আর এটিও যদি না পারি, তা হলে নিদেনপক্ষে লজ্জিত হই আসুন। লজ্জাটিও যদি ভুলতে বসেন, তা হলে আপনার-আপনাদের ভূগোলটি সাহেদময় হয়ে যেতে পারে। এ কারণে লজ্জিত হই এবং লজ্জিত হতে হতে খুঁজে ফিরি কী করণীয়।

লেখক ঃ সাংবাদিক ও গবেষক

 

ফেসবুক সব প্রাচীর ভেঙে দিয়েছে এর বিপদও কম নয়!

মানুষ যাই আবিষ্কার করেছে তার ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটো দিকই লক্ষ্য করা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো মানব সভ্যতার  যোগাযোগকে অনেক বেশি সহজতর করেছে, ভেঙে দিয়েছে মনুষ্যসৃষ্ট  ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক দেয়াল- তবে এর ক্ষতিকর দিকও কম নয়। বর্তমান যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে আমাদের জাতীয় জীবনে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের  ক্ষেত্রে যথেষ্ট ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে- এটি  যেমন সত্য তেমনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে ফেসবুক সামাজিক সম্পর্ক, সমাজ জীবন ও মননশীলতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। গোটা পৃথিবীতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৭০ শতাংশ মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংযুক্ত রয়েছে। তরুণদের মধ্যে এ হার আরও বেশি, প্রায় ৯০ শতাংশ। বাংলাদেশে যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ মানুষের রয়েছে  ফেসবুক অ্যাকাউন্ট। ১৩ থেকে ১৭ বছরের ছেলেমেয়েদের মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি অন্তত একটি সামাজিক যোগাযোগ  প্রোফাইল রয়েছে। তারা দিনে দুঘণ্টার বেশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যয় করে। ছাত্র-শিক্ষক, চিকিৎক, প্রকৌশলী, শিশু-কিশোর, গৃহিণী, পেশাজীবী এদের  বেশির ভাগেরই এখন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসের জরিপ অনুযায়ী ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চল মিলিয়ে প্রায় ২  কোটি ২০ লাখ মানুষ সক্রিয়ভাবে ফেসবুক ব্যবহার করছে ( বণিক বার্তা ১৯  সেপ্টেম্বর, ২০১৭) বিশ্বব্যাপী ইউটিউব ব্যবহারকারী মানুষের সংখ্যা ১৫০  কোটি, হোয়াটসঅ্যাপ ১২০ কোটি, ফেসবুক মেসেঞ্জার ১২০ কোটি ও উইচ্যাট ব্যবহারকারী ৯৩ কোটি ৮০ লাখ (আগস্ট ২০১৭ সূত্র ইন্টারনেট)। আমরা জানি, মার্ক জাকারবার্গ নামের এক যুবক ২০০৪ সালের  ফেব্র“য়ারি মাসে ফেসবুকের যাত্রা শুরু করান। তিনি হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ কক্ষে এটি চালু করেছিলেন এবং তখন এটি কেবল ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্যই সীমিত ছিল। ইন্টারনেটভিত্তিক এই সামাজিক চ্যানেল এত দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, চালু হওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী এর সদস্য হয়। আরো কিছু দিনের মধ্যে কয়েক মিলিয়ন মানুষ ফেসবুকের গ্রাহক তালিকায় যুক্ত হন। এভাবে এ চ্যানেল পারস্পরিক যোগাযোগের এক শক্তিশালী মাধ্যমে পরিণত হয়। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৮০০ মিলিয়ন মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করছে। এর ৫০ শতাংশ প্রতিদিন এ সাইটটি ব্যবহার করছে। গড়ে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারীর ১৩০ জন বন্ধ রয়েছে। ২১৩টি ফেসবুক ব্যবহারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৫৬। ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইন্দোনেশিয়ার পরে ভারতের অবস্থান। আমরা ফেসবুবক ব্যবহার করছি কেন? এর উত্তর খুব সহজ কিংবা বহুবিধ উত্তর রয়েছে। অলস দেহে সোফায় বসে কিংবা বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে, শীতের রাতে কাঁথা কম্বলের মধ্যে লুকিয়ে ফেসবুকে চাপ দিয়ে  দেখতে পাচ্ছি কানাডা কিংবা অষ্ট্রেলিয়ার কোন বন্ধু কি করছেন,  সেখানকার আবহাওয়া, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আমেরিকায় রাস্তায় কি হচ্ছে ইত্যাদি থেকে শুরু করে দেশের কোন জেলায় কি হচ্ছে, রাজধানীর  কোন এলাকায় কি হচ্ছে, কোন সন্ত্রাসী ধরা পড়েছে- কেন পড়েছে, কীভাবে পড়েছে, কোন আত্মীয় বা বন্ধু-বান্ধবের কি কি সুসংবাদ হলো, কি কি দুঃসংবাদ হলো- সবই এই হাতের মুঠোয় দেখতে পাচ্ছি। এমন আর কোন মাধ্যমে আছে যে, এসব দেশ-বিদেশের সব ভালো-খারাপ, রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত সংবাদ আমাদের আঙুলের চাপের অপেক্ষায় থাকে আমাদের সন্মুখে উপস্থিত হওযার জন্য? টিভিতে তো এত সহজে এতকিছু জানা যায় না। এছাড়াও তো বিনোদনের বিভিন্ন ব্যবস্থা আছে, গান, নাটক, সিনেমার অংশবিশেষ, সাহিত্য, রস, ছবি, সবই পাওয়া যায় ফেসবুকে। ফেসবুকের মাধ্যমে অনেক দিন আগের কোনো বন্ধু বা আত্মীয়কে খুঁজে পাওয়া কিংবা নতুন কারো সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা আমাদের অনেকের ক্ষেত্রে ঘটেছে।  ফেসবুকের মাধ্যমে তথ্যের আদান-প্রদান খবর পাওয়া ইত্যাদি কিংবা অনেকে  ফেসবুকের মাধ্যমে বাণিজ্য প্রসার করেছেন। বর্তমানের  কোভিডকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সব বন্ধ। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া, শিক্ষক ও সহপাঠী ও বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই কিন্তু ফেসবুক  সেই শূন্যস্থানগুলো পূরণ করছে। দেশের বহু শিক্ষক এটিকে এখন পাঠশালা বানিয়েছেন। আমরা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করছি ঢাকা সিটি থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা কীভাবে তাদের পাঠ নিয়ে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থিত হচ্ছেন, ফেসবুককে শ্রেণিকক্ষ বানিয়ে  ফেলছে। চমৎকার উদ্ভাবন বটে! অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারীদের দেখেছি নিয়মিত নিজের মতামত, পছন্দ, অপছন্দ নিয়ে গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতা লেখেন। পত্রিকার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছেন ফেসবুক পেইজ। এটিও এক ধরনের সৃজনশীলতা! অনেকেই আবার এগুলোতে কমেন্ট করছেন, পাল্টা লেখা লিখছেন।  যেন এক সাহিত্যের আসর! অনেকে এটিকে প্রচার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন,  কেউ কেউ সমাজের কানায় কানায়, অলিতে গলিতে লুকিয়ে থাকা, ঘটে যাওয়া অসঙ্গতি ছবিসহ তুলে এনে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। সমাজের নিষ্ঠুরতার ছবি, যৌন হয়রানির ছবি ও সংবাদ, প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য যেগুলো সাধারণভাবে জনসমক্ষে নিয়ে আসা সম্ভব ছিল না সেগুলোর সচিত্র প্রতিবেদন দেখা যায় ফেসবুকে।  কেউ  কেউ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে, উদ্দেশ্য ছাড়া, নিজ ইচ্ছায়, অভ্যাসবশত কিংবা শখের বসবর্তী হয়ে এগুলো করে থাকেন। যে  যেভাবেই করুন না কেন, এতে সমাজ, দেশ ও মানবতা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হয় এবং হচ্ছে। আমরা দেখেছি, আট বছরের শিশু জাহিদ কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের মাথা মালিশ আর নানারকম গান শুনিয়ে দিন চালাতো। তারই একটি গান ‘মধু হই হই——বিষ হাওয়াইলা’ পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ার পর ইমরান হোসেন ও তার পাঁচ বন্ধুর করা ভিডিওর কল্যাণে সে পৌঁছে গেল লাখো মানুষের কাছে। এখন সে একটা হোটেলে চাকরি করে, গান শোনায় ও স্কুলে যায়। তার জীবনে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। বগুড়ার হিরো আলম জাতীয়ভাবে পরিচিত, কারণ এই ফেসবুক। অর্থাৎ সমাজ ও দেশের অপরিচিত কোনো ব্যক্তি বা ঘটনাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে আসে ফেসবুক। অস্যংখ্য ধরনের ব্যবহার ফেসবুককে অনেকটা নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় নিয়ে এসেছে। আর তাই এর যথেচ্ছ ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিপদও ডেকে আনছে। একজন ফেসবুক ব্যবহারকারীর রয়েছে কয়েক হাজার বন্ধুবান্ধব, বান্ধবী। তাদের সঙ্গে বায়বীয় যোগাযোগ বেড়েছে কিন্তু বিপদে পড়লে তাদের কাউকেই পাওয়া যায় না অনন্য দুয়েকটি নাটকীয় ঘটনা ছাড়া। কেউ কেউ শুধু একটি লাইক দিয়ে, দুঃখ প্রকাশ করে বন্ধুত্বের পাওনা মিটিয়ে  দেন। এটি হয়েছে এক ধরনের ফ্যাশন, মানুষ প্রকৃত বন্ধুত্ব যাদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা চলে, গল্প করা হয়, চা পান করা, খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি হয় আবার এক টেবিলে বসে খাওয়া হয়। কারুর  কোনো বিপদ এলে সবাই ঝাঁপ দিয়ে পড়ে, বন্ধুর পাশে দাঁড়ায়, বন্ধুকে বিপদ থেকে উদ্ধার করে। এগুলো তো আর ফেসবুক বন্ধুর মাধ্যমে সম্ভব নয়, এজন্য আমরা ফেসবুককে দায়ী করতেও পারছি না। আমরা এটিকে যেভাবে ব্যবহার করি। এভাবে ব্যবহার করে করে অনেকেই এক সময়  ফেসবুক অ্যাডিকটেড হয়ে পড়েন। নিজের দৈনন্দিন জীবন ও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণও কেউ কেউ হারিয়ে ফেলেন। পারিবারিক সময় দেয়া  থেকে শুরু করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজেও ফাঁকি দিয়ে থাকেন যারা  ফেসবুক অ্যাডিকটেব হয়েছেন। এসব ব্যক্তি সমাজ ও পরিবার থেকে এক ধরনের বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করেন। তাদের দাম্পত্য জীবনও থাকে ভাঙা। সন্দেহ প্রবণতা কাজ করে তাদের মধ্যে। এছাড়াও নিজেরা নানা ধরনের শারীরিক সমস্যায় ভুগে থাকেন যেমন ওজন বেড়ে যাওয়া, ঘুম না হওয়া, মেরুদন্ড ও পিঠে ব্যথা ও চোখের ক্ষতি। দেহ ও পেশির পর্যাপ্ত সঞ্চালন না থাকার ফলে এই সমস্যগুলোতে তারা ভুগে থাকেন। এজন্য কি আমরা ফেসবুককে দায়ী করব, ফেসুবক আবিষ্কারককে দায়ী করব, না যারা ব্যবহার করছি তারাই দায়ী? এসব কারণে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠেছে ফেসবুক নিয়ন্ত্রণের।  ফেসবুক নিয়ন্ত্রণ মানে অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। সোশ্যাল মিডিয়া অবদমন বা সেন্সরশিপের ক্ষেত্রে চীনই চ্যম্পিয়ন। তারা চায় তারা ভেতের যাই করুক বিশ্ব যেন সেগুলো না জানে। গোটা পৃথিবীর শাসক শ্রেণি তা  সে ধনতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক বা অন্য যে কোনো তান্ত্রিকই  হোক না কেন, সবার একটিই কাজ- সেটি হচ্ছে জনগণকে, ভিন্নমতকে কঠোরহস্তে নিষ্ঠুরভাবে দমন করা। আমরা যা চাই, তাই হতে হবে, আমরা যা ভাবি এর বাইরে কোনো ভাবনা নেই। আর আমরা এগুলো  যেভাবে ম্যানেজ করি, নিয়ন্ত্রণ করি সেগুলো যেন আর কেউ জানতে না পারে, দেশের বাইরে জানতে না পারে। তাই তারা আবার বিভিন্ন ধরনের আইন তৈরি করেন। সমাজতন্ত্র রক্ষার নামে ১৯৮৯ সালে চীনের তিয়ানানমেন স্কোয়ারে বিক্ষোভে অংশ নেয়া গণতন্ত্রকামীদের ওপর ২০০৯ সালের ৪ মে চীন সরকার কি নিষ্ঠুর অপারেশন চালিয়ে ছিল তা পৃথিবী ভুলে যায়নি! বিক্ষোভে অংশ নেয়া নিষিদ্ধ ঔপন্যাসিক মা জিয়ান ২০০৯ সালে, বেইজিং কোমা’ বইয়ে লিখেছেন, বিশ বছর আগে তিয়ানানমেন হত্যাকান্ড বেইজিংকে ছারখার করে দিয়েছিল। হাজার হাজার নিরস্ত্র নাগিরক খুন হয়েছিল। লাখ লাখ মানুষের জীবনধারা উল্টে গিয়েছিল। তিয়ানানমেন বসন্তের ২০ বছর পূর্তির ঠিক দুদিন আগে চীন টুইটার পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়; কারণ তারা মনে করেছিল তিয়ানানমেন কান্ড নিয়ে সমালোচনা দমন করা কঠিন হবে। তারা সামাজিক  যোগাযোগ মাধ্যম ঠিকই বন্ধ করে দিয়েছিল, এখনো সেখানকার জনগণ সহজে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করতে পারে না কিন্তু তাদের নিষ্ঠুরতা কি পৃথিবীর অজানা থেকে গেছে? তাই পাল্টা প্রশ্ন জাগে ফেসবুকের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলেই কী এসব বন্ধ হবে? আমরা সিনেমায় দেখি সমাজপতিদের বিরুদ্ধে  কেউ টু শব্দটি করতে পারে না, সব মানুষ তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ, সবার প্রাণ ওষ্ঠাগত। সবশেষে দেখা যায়, তাদের চরম পরিণতি যেটি বাস্তব জীবনে খুব একটা হয় না কিন্তু মানুষ ওইসব দৃশ্য দেখে ক্ষণিকের জন্য হলেও এক ধরনের তৃপ্তি পায়। ফেসবুকেও দেখছি সে রকম একটি ভূমিকা আছে। দুর্নীতিতে হাবুডুবু খাওয়া সমাজে সাধারণ মানুষ কোনো কথা বলতে পারে না, কিন্তু ফেসবুকের আশ্রয়ে তারা অনেকে অনেক কথাই বলে ফেলেন। যেটি বিভিন্নকালের সাহিত্য করেছে। তবে, এই বলাটার মধ্যে সহনশীলতা, মাত্রাবোধ, শালীনতা থাকতে হয়। সেটি অনেকেই রক্ষা করেন না। কারণ এটি যে, একেবারে সাধারণের কাছে চলে গেছে। এটিও একটি বাস্তবতা। এটি নিয়ন্ত্রণ করার অর্থাৎ সবাই এটি ব্যবহার করবে তা নিয়ন্ত্রণ করার কোনো পথ বোধ হয় নেই। আবার এটিও তো সত্য যে, মোবাইল ট্রাকিং করে বড় বড় অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের ধরা হয়- যা সাধারণভাবে সম্ভব ছিল না। কাজেই এটি নীরবে এক ধরনের আর্শীবাদও বটে, সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রে। তাই মোটাদাগে বলা যায় না যে, মোবাইল নিষিদ্ধ করা বা এর ওপর কঠোরতা আরোপ করা হলে সমাজ অনেক উন্নত হবে, সমাজ মানবিক হবে। লেখক ঃ শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক