এ কে এম শহীদুল হক

ভোলার ঘটনা অতীতের ষড়যন্ত্রেরই পুনরাবৃত্তি

ফেসবুক পোস্ট। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত। বিক্ষোভ, মিছিল, প্রতিবাদ, অরাজকতা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আক্রমণ। সংঘর্ষ, অ্যাকশন, গোলাগুলি। হতাহত।

বাংলাদেশে যারা আত্মস্বীকৃত ইসলামের হেফাজতকারী, তারা মাঝে মধ্যে এসব ঘটনায় জ্বালানি ঢেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগ গ্রহণ করে হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়। ২০ অক্টোবর ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় ফেসবুক পোস্টে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে বিক্ষোভ, পুলিশের ওপর হামলা, পুলিশ কর্তৃক আত্মরক্ষার্থে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার, চারজন নিহত ও শতাধিক আহত হওয়ার ঘটনা অতীতের ধারাবাহিক ঘটনারই নিদর্শন।

বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামে জনৈক ব্যক্তির ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ধর্মীয় অবমাননার স্ট্যাটাস দেয়ার অভিযোগ আনা হয়। এদিকে বিপ্লব পূর্বেই থানায় গিয়ে পুলিশকে জানায় তার ফেসবুক হ্যাক করা হয়েছে এবং হ্যাকাররা তার কাছে চাঁদা দাবি করছে।

এ মর্মে সে থানায় জিডি এন্ট্রি করে; কিন্তু পুলিশ বিপ্লবকে ছাড়েনি। পুলিশ বিপ্লবকে গ্রেফতার করে এবং আরও দু’জনকে হ্যাকার সন্দেহে গ্রেফতার করে। তারপরও তৌহিদি জনতার ব্যানারে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া প্রতিবাদ সভা করা হয়।

পুলিশ সভা পন্ড করেনি। শুধু সভা দীর্ঘায়িত না করার অনুরোধ করেছিল। সভার শেষদিকে বিনা উসকানিতে সভা থেকে একদল উচ্ছৃঙ্খল যুবক পুলিশের ওপর ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে।

পুলিশ সভাস্থল সংলগ্ন মসজিদের দোতলায় একটি কক্ষে গিয়ে আশ্রয় নেয়। উচ্ছৃঙ্খল জনতা মসজিদের দোতলায় উঠে পুলিশকে কক্ষ থেকে বের করে আক্রমণ করতে চেষ্টা করে। তারা কক্ষের দরজা শাবল ও অন্যান্য বস্তু দিয়ে ভাঙার চেষ্টা করে। উচ্ছৃঙ্খল যুবকরা অত্যন্ত বেপরোয়া ও মারমুখী ছিল। তাদের আক্রমণে কয়েকজন পুলিশ আহত হয়। একজন বুলেটবিদ্ধ হয়। তাকে ঢাকা সিএমএইচে জরুরি ভিত্তিতে হেলিকপ্টারে স্থানান্তর করা হয়। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে; গুলি চালায়।

ওই ঘটনায় চারজন প্রাণ হারায়। পুলিশসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়। তদন্তে পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার অর্থাৎ গুলি করার যৌক্তিকতা প্রমাণ না হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ থাকবে।

এ ঘটনা কেন ঘটল? যার ফেসবুকে ইসলামের অবমাননামূলক স্ট্যাটাস দেয়া হয়েছিল, সে তো গ্রেফতার হয়েছিল; থানায় ছিল। তারপরও কেন এত অরাজকতা সৃষ্টি করা হল? বিপ্লব ফেসবুকে নিজে লিখেছে, না অন্য কেউ হ্যাক করে লিখেছে, তা তদন্তের জন্য তো তাকে থানা থেকে ছাড়া হয়নি।

সে গ্রেফতার হয়েছে। মামলা রুজু হচ্ছিল। তারপরও ইসলামের আত্মস্বীকৃত হেফাজতকারীরা আর কী চেয়েছিল? তাকে কি মেরে ফেলতে চেয়েছিল? বিচার না করে সঙ্গে সঙ্গে ফাঁসি দিতে চেয়েছিল?

ইসলাম কি তা বলে? কেউ খুন করে পুলিশের কাছে এসে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলে অর্থাৎ সে খুন করেছে এ কথা স্বীকার করলেই তো তদন্ত ও বিচার ছাড়া তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ফাঁসি বা সাজা দেয়া যায় না। আইনেও সে বিধান নেই, ধর্মেও নেই। মামলা করতে হয়। তদন্ত করতে হয়। সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করতে হয়। আদালত বিচারকার্য শেষ করে অভিযোগের পক্ষে সাক্ষ্যপ্রমাণ পেলে তাকে সাজা দিয়ে থাকেন।

হেফাজতিরা কি এটা বোঝেন না? নিশ্চয়ই বোঝেন। তারা বুঝেশুনে পরিকল্পিতভাবে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে এ ধরনের নাশকতামূলক ঘটনা ঘটায় কেবল হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য।

আমি একজন মাওলানা সাহেবের সঙ্গে আলোচনা করছিলাম। তিনি পবিত্র কোরআনের সূত্র উল্লেখ করে বললেন, ‘ইসলাম ও কোরআনের হেফাজত আল্লাহ নিজেই করবেন।’ সূরা হিজরতের ৯নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘অবশ্যই আমি উপদেশ (কোরআন) নাজিল করেছি এবং এর সংরক্ষণকারী আমি নিজেই।’ সূরা ছফ-এর ৮নং আয়াতে মহান আল্লাহ তাআ’লা বলেছেন, ‘এ লোকেরা আল্লাহর নূর (ইসলাম) কে নিভিয়ে দিতে চায়। অথচ আল্লাহ ইসলামকে পরিপূর্ণ করতে চান।’ অর্থাৎ ইসলামকে আল্লাহই টিকিয়ে রাখবেন। আলেম মহোদয়ই এভাবে বললেন। ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম বিশৃঙ্খলা, ফ্যাসাদ ও ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার শিক্ষা দেয় যাতে পৃথিবীতে মনুষ্য সমাজে শান্তি-সম্প্রীতি বজায় থাকে। অথচ একশ্রেণির আলেম সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অরাজকতা সৃষ্টি করেন। এতে তারা ইসলামের হেফাজতের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করেন। মহান আল্লাহ আমাদের প্রিয় নবী (সা.) ও ইসলামের অবমাননা করে কেউ কিছু বললে বা লিখলে তা কোনোক্রমেই আমরা বরদাশত করব না। শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করব। দেশের প্রচলিত আইনে তাদের বিরুদ্ধে সাজা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেব। কিন্তু অরাজকতা নয়। ঘটনার সত্যতাও প্রমাণ করতে হবে। সমাজে দুষ্ট লোকের তো অভাব নেই।

অতীতেও একই কায়দায়, একই অভিযোগে ওই বিশেষ মহল এ ধরনের নাশকতামূলক কর্মকান্ড করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছিল। ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে, ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে এবং ২০১৭ সালে রংপুরে একই কায়দায়, একই অভিযোগে ভিন্নধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘর ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে আক্রমণ করে ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি করে।

রামুতে ১২টি বৌদ্ধ মন্দির এবং ৫০টির বেশি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ব্যাপকভাবে ভাংচুর করে। নাসিরনগরে হিন্দুদের ১৯টি মন্দির এবং তিন শতাধিক বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। রংপুরেও একই কায়দায় হিন্দুদের উপাসনালয় ও বসতবাড়িতে হামলা ও আগুন দিয়ে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালানো হয়।

রামুর ঘটনায় অভিযোগ ছিল এক বৌদ্ধ যুবক তার ফেসবুকে পবিত্র কোরআন শরিফ পায়ের নিচে রেখে দাঁড়িয়ে থাকার ছবি পোস্ট করে ধর্মীয় অবমাননা করেছে।

তদন্তে দেখা যায়, ওই ফেসবুক আইডি ভূয়া ছিল। ওটা ওই যুবকের ফেসবুক নয়। কোনো ষড়যন্ত্রকারী ওই যুবকের নামে ফেসবুক আইডি খুলে মিথ্যা তথ্য প্রচার করে সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করে তুলেছিল।

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার চেয়ারম্যান ও সাবেক শিবির নেতা তোফায়েল ওই ঘটনার নেপথ্যে সক্রিয় ছিলেন। নাসিরনগরেও এক জেলে, যিনি লেখাপড়া জানে না তার নামে ফেসবুক আইডি খুলে ধর্ম অবমাননাকর পোস্ট দিয়ে হিন্দুদের মন্দির ও বাড়িঘর আক্রমণ করে।

রংপুরে যে টিটু রায়ের নামে ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে ধর্ম অবমাননাকর পোস্ট দিয়ে ধর্মপ্রাণ লোকদের উত্তেজিত করে লঙ্কাকান্ড ঘটায় তদন্তে জানা যায়, ওই টিটু এ সংক্রান্ত কিছুই জানে না। সে একজন খেটে খাওয়া গো বেচারা টাইপের সাধারণ লোক। দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জে থাকে। এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ নেই। এ ঘটনায়ও ষড়যন্ত্র ছিল।

২০১৩ সালে ২৮ ফেব্র“য়ারি যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশ হলে চাঁদে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছবি দেখা গেছে- ফেসবুকে এ ধরনের একটি পোস্ট দিয়ে সারা দেশে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড চালানো হয়েছিল। বাড়িঘর ও দোকানপাট ভাংচুর ও আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। যানবাহন ভাংচুরসহ ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড চালিয়ে বগুড়া, চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরা ও অন্যান্য এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল। এ ঘটনায়ও জামায়াত-শিবির মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলাম ঢাকা মহানগরীতে যে তান্ডব চালিয়েছিল, তা মনে হলে এখনও গা শিউরে উঠে। তারা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ করে অনেককে আহত করেছে। একজন এসআইকে হত্যা করেছে। শান্তিনগরে ট্রাফিক অফিসে আগুন দিয়ে পুলিশকে পুড়িয়ে মারার প্রচেষ্টা চালায়। একজন পুলিশ সদস্য আগুনে পুড়ে মৃতপ্রায় ছিল।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার জন্য প্রেরণ করায় আল্লাহর রহমতে তিনি কোনো রকমে বেঁচে আছেন। সংঘর্ষে আরও কয়েকজন নিরীহ ব্যক্তি নিহত হয়। অসংখ্য যানবাহন ভাংচুর ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। দোকানপাট ধ্বংস করে। আইল্যান্ডের গাছগুলো কেটে ফেলে। অনেক কোরআন শরিফ পুড়িয়ে ফেলে। আওয়ামী লীগ অফিস পুড়িয়ে দেয়ার জন্য চেষ্টা চালায়।

পুলিশের বাধা পেয়ে ব্যাপক সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। পরদিন হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় দীর্ঘ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

তার জবানবন্দিতে প্রকাশ পায় বিএনপি-জামায়াতপন্থী মাওলানারা বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের পরিকল্পনা মোতাবেক তান্ডব চালিয়েছিল। তাদের কথায়ই শাপলা চত্বরে অবস্থান অব্যাহত রেখেছিল। পরের দিন বিএনপি-জামায়াত তাদের সঙ্গে এক হয়ে সরকারের পতন ঘটাতে চেয়েছিল। তৎকালীন মেয়র সাদেক হোসেন খোকা আন্দোলনকারীদের খাবার সরবরাহ করেছিলেন এবং পরের দিনের খাবার ও সব ধরনের সহায়তা করার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। বাবুনগরী স্বীকার করেছিলেন, ওই আন্দোলন বিএনপি-জামায়াতপন্থী আলেমদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তাদের কথায় তিনি নিজেও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন। বাবুনগরীর জবানবন্দিতে এসব তথ্য ছিল।

রাতে অবস্থানকারীদের শাপলা চত্বর থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। তাড়িয়ে দেয়ার অভিযানে একটি লোকেরও প্রাণহানি হয়নি। অথচ মিথ্যাচার করা হয়েছিল যে শত শত লোক মারা গিয়েছে। আমি সংবাদ সম্মেলন করে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলাম এই বলে যে, অবস্থানকারীদের তাড়িয়ে দেয়ার সময় একটি লোকও মারা যায়নি। পুলিশ কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেনি। সাউন্ড গান ব্যবহার করে তাদের তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। ওইদিন হেফাজত পুলিশের সঙ্গে ওয়াদা ভঙ্গ করে শাপলা চত্বরে তাদের অবস্থান অব্যাহত রেখেছিল। আল্লাহ ওয়াদা ভঙ্গকারীকে পছন্দ করেন না।

২০১২ সালের রামুতে, ২০১৬ সালে নাসিরনগরে, ২০১৭ সালে রংপুরে এবং ২০১৩ সালে দেশব্যাপী যে ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল তা ছিল জামায়াত-শিবির ও বিএনপির পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। ভালো মন্দ না বুঝে হুজুগে রামু ও নাসিরনগর ঘটনায় কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীও জড়িত ছিল। এ দেশের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে সরকার পতনের আন্দোলন জোরদার করার লক্ষ্য নিয়েই এ ষড়যন্ত্র ছিল। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি সর্বদা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ তথা জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের জন্য এ ন্যক্কারজনক ও ষড়যন্ত্রমূলক কাজ করেছিল। পুলিশি তদন্তে তা প্রমাণিত হয়েছে। তারপরও সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ জামায়াত-শিবির ও বিএনপির একশ্রেণির জামায়াতপন্থী নেতা ও কর্মীর ষড়যন্ত্রে বারবার বিভ্রান্ত হয়ে নাশকতামূলক কাজে সম্পৃক্ত হচ্ছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।

প্রত্যেকটি ঘটনায় পুলিশ একাধিক মামলা করেছে। তদন্ত শেষে অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে; কিন্তু দুঃখের বিষয় কোনো মামলারই বিচারকার্য সম্পন্ন হয়নি। বিচারের মাধ্যমে দোষীদের সাজা দেয়া সম্ভব হলে এ ধরনের ষড়যন্ত্রের প্রবণতা হ্রাস পেতে পারে বলে অনেকের ধারণা।

সাধারণ দেশপ্রেমিক নাগরিকদের উচিত এ ধরনের ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ত না হওয়া। গুজবে কান না দিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে দেশের প্রচলিত আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। গুজবে কান দেয়া যাবে না। ষড়যন্ত্রকারী ও দুষ্কতকারীদের বিরুদ্ধে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে।

সরকার বাংলাদেশকে ডিজিটালাইজড করেছে দেশ ও জনগণের কল্যাণে। তথ্যপ্রযুক্তির সুফল জনগণ পাচ্ছে। সরকারের উন্নয়ন ও কোনো ভালো কাজই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী মহলের চোখে দৃশ্যমান হয় না। অথচ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা সরকারের বিরুদ্ধে নানা রকম মিথ্যা প্রচারণা ও ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। একটির পর একটি ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। মনুষ্যত্ব ও বিবেকসম্পন্ন কোনো ব্যক্তি এহেন জঘন্য কাজ করতে পারে না। যারা করে তাদের হৃদয়ে বিবেক, মনুষ্যত্ব ও  নৈতিকতার দ্বার রুদ্ধ হয়ে গেছে। তারা দেশ ও জনগণের শক্রতে পরিণত হয়েছে। কাজেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও সাধারণ জনগণকে তাদের ব্যাপারে সর্বদা অত্যন্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

লেখক ঃ সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ।

॥ সেলিনা হোসেন ॥

সীমান্ত ছাড়িয়ে বই পৌঁছে যায় মানুষের কাছে

২০১৭ সালের ডিসেম্বরের ২১ তারিখে শুরু হয়েছিল খড়দহ বইমেলা। ১৮ বছর ধরে এই বইমেলা বৎসরে একবার আয়োজিত হচ্ছে। আমার কখনো এই বইমেলায় যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তবে এই বইমেলার খবর পত্রিকায় পড়েছি। যাদের এই বইমেলায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল তাদের কাছে বইমেলা সম্পর্কে গল্প শুনেছি।

তারা ভালোলাগার কথাই বেশি করে বলত। আমার ধারণা হয়েছিল ছোট বইমেলার বড় পরিসর নিয়ে খড়দহ বইমেলা লেখক-পাঠকের প্রাণের বইমেলা হয়েছে। এ বছর মেলা আয়োজক কমিটি সিদ্ধান্ত  নেন যে এখন থেকে বাংলাদেশের একজন লেখককে এই মেলার উদ্বোধনী দিনে আমন্ত্রণ জানানো হবে। বইমেলা কমিটির সিদ্ধান্ত আমার পক্ষে আসে।

বইমেলার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন শ্রী কাজল সিনহা। আমি উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য মানস চক্রবর্তীর কাছ থেকে আমন্ত্রণপত্র পাই। খড়দহ বইমেলা দেখার সুযোগ আমি পাই। সেদিন মঞ্চে অনেকে ছিলেন। ছিলেন কথাসাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী। সবার বক্তৃতার পরে গান গেয়েছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন।

খড়দহ মেলার পরিসর অনেক বড় নয়। চারদিকের বসতির মাঝে একটি মাঠ ব্যবহৃত হয় এই মেলার জন্য। দেখলাম ৪০টি বইয়ের স্টল আছে। মাঠভর্তি মানুষের উপস্থিতি দেখে মনে হয়েছে ছোট বইমেলার বড় দিগন্ত। মেলাজুড়ে মানুষের উপস্থিতি বইয়ের হাত ধরে। এমন দৃশ্যটি আমার মাঝে সীমান্ত পেরিয়ে আসার আনন্দ আকাশ-ছোঁয়া করে ফেলে।

এই বইমেলার যে বিষয়টি আমার আরও ভালো লেগেছে তাহলো ঘনবসতির মাঠে অনুষ্ঠিত মেলা মানুষের দোরগোড়ার আয়োজন। শিশুদের হাত ধরে বাবা-মায়েরা মেলায় আসছে। বই কিনছে। গাড়ি ভাড়া করে দূরে কোথাও যেতে হচ্ছে না।

হাতের কাছে এত বই না কিনে কি উপায় আছে! দুচারটা তো কিনতেই হয়। এভাবে বইমেলার ছোট আয়োজনে মানুষ হাতের কাছে বই পায়। বই পৌঁছে যায় বড়দের কাছে, ছোটদের কাছেও। খড়দহ মেলা প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আমি প্রাণের টান অনুভব করি।

একজন লেখক হিসেবে বইমেলা আমার কাছে আপন অস্তিত্বের মতোই একটি বিষয়। বাংলা একাডেমিতে ৩৪ বছর চাকরি করে অমর একুশে গ্রন্থমেলা আমি দেখেছি খুব কাছে থেকে- প্রতিদিন, প্রতিটি সময়ে। এর চরিত্র শুধু বই প্রকাশ এবং বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

এই বইমেলা ভাষা আন্দোলনের শহীদের রক্তে প্রতিষ্ঠিত বাংলা একাডেমি কর্তৃক আয়োজিত এবং একুশে ফেব্র“য়ারির উপলক্ষ হলেও সারা মাসজুড়ে বইমেলার আবেদন জাতীয় মননের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমি জানি না সারা মাসজুড়ে অন্য কোনো দেশে বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় কিনা।

বাংলা একাডেমি আয়োজিত ফেব্র“য়ারি বইমেলাটি আমাদের একদম নিজস্ব বইমেলা। নিজেদের লেখক, নিজেদের প্রকাশনা এবং নিজেদের ভাষার পাঠকের মহাসম্মেলন এই মেলাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। জাতিসত্তার এমন অসাধারণ রাখিবন্ধন করেছে আমাদের অমর একুশে গ্রন্থমেলা।

এছাড়াও আমি বিভিন্ন সময়ে ভারতের তিনটি প্রদেশের বইমেলায় আমন্ত্রিত হয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। ১৯৯৬ সালে প্রথম যাই দিল্লিতে। ৩ ফেব্র“য়ারি থেকে ১৫ দিন ধরে চলেছিল এই মেলাটি। এটি ছিল দিল্লির দ্বাদশ বিশ্ব বইমেলা। মেলার থিম ছিল ‘সার্ক দেশসমূহ’।

সার্কদেশসমূহের সাতজন লেখক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। মেলার উদ্বোধন করেছিলেন পাকিস্তানের কবি আহমদ ফরাজ। আমাকে দেয়া হয়েছিল ইংরেজি ও হিন্দি বইয়ের তালিকা (ক্যাটালগ) অবমুক্ত করার জন্য। সাতটি দেশের সাতজন লেখকই কিছু না কিছু করেছিলেন।

বইমেলাটির আয়োজন করেছিল ‘ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া’। আমার লিখিত ভাষণে আমি বলেছিলাম, ‘আমি মনে করি বইমেলা এমন সম্মেলনের ও অঙ্গীকারের প্রতীক, যা একটি বিশেষ দেশের সীমানাকে ছাড়িয়ে যায়।

বই যেভাবে দ্বন্দ্ব ও উত্তেজনা হ্রাস করে মানুষকে শান্তি ও সৌহার্দ্যরে পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তেমনটি আর কিছু পারে বলে আমি মনে করি না এবং বইমেলাই আমি বিশ্বাস করি, মারণাস্ত্র, সামরিক শাসন, স্বৈরাচার, অসাম্য এবং অন্য যা কিছু মানুষকে মানুষ হিসেবে খর্ব করে, তার বিরুদ্ধে শপথ উচ্চারণ করার এবং নিজেদের আত্মাকে বিকিয়ে না দেয়ার জন্য অঙ্গীকার ঘোষণার সর্বোত্তম সুযোগ এনে দেয়। এই বিশ্বমেলা আয়োজনের জন্য আমি ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়াকে অভিনন্দন জানাই।’

মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল দিল্লির প্রগতি ময়দানে। পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান। অসংখ্য লেখক, অজস্র বই- আমার জন্য ছিল এক বিপুল অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন দেশ থেকে, বিশেষ করে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লেখক এবং প্রকাশকরা আমার মনোযোগ কেড়েছিল।

তাদের সঙ্গে কথা বলে আমি অনেক কিছু জানতে পারি। মোজাম্বিক থেকে এসেছিলেন একজন নারী, তার নামটা ভুলে গেছি, তিনি অত্যন্ত কর্মনিষ্ঠ মহিলা। তার নিজের প্রকাশনা সংস্থা ছিল এবং আফ্রিকার কোনো একটি বইয়ের সংগঠনের তিন সভাপ্রধান ছিলেন। ওয়াইএমসিএ’র গেস্ট হাউসে আমরা একসঙ্গে ছিলাম। তার প্রকাশনা সংস্থা থেকে বেশ কয়েকটি বই কিনি।

পরিচয় হয়েছিল দিল্লির ‘কালি ফর উইম্যান’-এর স্বত্বাধিকারী উর্বশী বুটালিয়ার সঙ্গে। তার সংস্থাটি সে সময়ে নারী বিষয়ে বই প্রকাশের জন্য বেশ নাম করেছিল। এখন উর্বশী জুবান নামে প্রকাশনা সংস্থা চালায়। প্রগতি ময়দান একটি বিশাল এলাকাজুড়ে, অনেক সময় এই মাথা থেকে ঐ মাথায় যেতে গাড়ি ব্যবহার করছিল মেলা কর্তৃপক্ষের লোকজন।

অন্যথায় সাধারণের জন্য গাড়ি প্রবেশ নিষেধ। ব্যাংক, পোস্ট অফিস, টেলিফোন অফিস ইত্যাদিসহ প্রয়োজনীয় সবকিছুই ছিল সে মেলা প্রাঙ্গণে। পরে শুনেছিলাম এই ময়দানটি বিভিন্ন ধরনের মেলা আয়োজন করার জন্য স্থায়ী স্থাপনা। প্রগতি ময়দানে গিয়ে পরিচিত হওয়ার অসংখ্য মানুষ এখনো আমার স্মৃতির এক গভীর সঞ্চয়। বইমেলা আমার জন্য দেশের সীমানা তুলে দিয়েছিল প্রত্যক্ষভাবে।

পরে যে বইমেলাটি আমাকে টেনেছে সেটি হলো ‘আগরতলা বইমেলা’। ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত হয় অষ্টাদশ আগরতলা বইমেলা। ঐ বইমেলায় উপস্থিত থাকার জন্য আমি নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম ত্রিপুরা সরকারের তথ্য, সংস্কৃতি ও পর্যটনমন্ত্রী জীতেন্দ্র চৌধুরীর কাছ থেকে। বইমেলা আয়োজিত হয়েছিল ‘রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবন’ প্রাঙ্গণে।

বইমেলার উদ্বোধক ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী কবি অনিল সরকার। বিশেষ অতিথি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গ্রন্থাগার মন্ত্রী নিমাই পাল এবং ত্রিপুরার প্রবীণ কথাসাহিত্যিক বিমল চৌধুরী। প্রদীপ জ¦ালিয়ে বইমেলা উদ্বোধন করা হলে সঙ্গে সঙ্গে জ¦লে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণজুড়ে আলোর মালা।

অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলা ও ককবরক ভাষায় রবীন্দ্রনাথ লিখিত জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পীরা। আয়োজনটি ছোট ছিল কিন্তু প্রাণের আবেগে ভরপুর ছিল। স্থানীয় লেখকরা আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। তাদের আলোচনা থেকে ত্রিপুরার সাহিত্যের একটি ধারণা পাওয়া যায়।

কয়েকদিন ত্রিপুরা থেকে তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে বইমেলার আবহকে আমার একটি ভিন্নমাত্রার অনুষঙ্গ মনে হয়েছিল। ছোট আয়োজনটি মাতিয়েছিল অনেক বেশি করে।

কলকাতার বইমেলায় আমি অনেকবার গিয়েছি। এই বইমেলাটিও আমার জন্য অনেক বড় একটা স্মৃতি হয়ে আছে। কারণ, মাতৃভাষায় লেখা বই কিন্তু অন্যদেশ ও সংস্কৃতির মানুষের কথা তাই এই বইমেলায় যেতে তাগিদ অনুভব করি।

১৯৯৯ সালে কলকাতা বইমেলার থিম ছিল ‘বাংলাদেশ’। আমাকেও একটি প্রবন্ধ পড়তে হয়েছিল। সেবার গড়ের মাঝে বইমেলা হয়েছিল। এই মেলায় একটুখানি ধাক্কা খাই, কারণ প্রতিষ্ঠিত লেখকরা ভালো ব্যবহার করেননি। বাংলাদেশ থিম কান্ট্রি হলেও বাংলাদেশের লেখকদের আলোচনা অনুষ্ঠানের সময় তারা মেলায় উপস্থিত থেকেও আড্ডা দিয়েছেন অন্যত্র।

মনে হয়েছিল, লেখকদের সঙ্গের দরকার নেই। বই কেনা হোক আনন্দের। লেখকদের উদাসীনতা দেখে ভেবেছিলাম এই বইয়ের প্রাচুর্য কিন্তু লেখকদের হৃদয় খোলা নয়। বই চাই, লেখকের উষ্ণতা চাই নাÑ এটা তো হয় না, যেটা আমি দিল্লি কিংবা আগরতলায় পাইনি। দিল্লি এবং আগরতলায় যেসব লেখকের সঙ্গে দেখা হয়েছে তারা বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন।

সালটা মনে নেই, মনে আছে কোনো এক সময়ে ঢাকার ‘মুক্তধারা’র স্বত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন সাহা ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজের বইয়ের পসরা বসিয়েছিলেন বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। ঘাসের ওপর চট বিছিয়ে রেখে দেয়া বইগুলো ফুলের মতো ফুটেছিল। পাঠক উবু হয়ে বসে বই দেখেছিলেন। মনে হচ্ছিল এ এক অন্য জগৎ।

এই মেলাকে আস্তে আস্তে বড় হতে দেখেছি। স্টল তৈরি হতে দেখেছি। ছোট পরিসরে মেলার আয়োজন দেখেছি। এসব সত্তর দশকের কথা। মানুষের ভিড় কম ছিল। স্টলের সংখ্যা কম ছিল। ঘুরে ঘুরে বই দেখার আনন্দ ছিল বেশি। বই খুঁজতে ঠেলাঠেলি করতে হয়নি। অনায়াসে পেয়ে যেতাম নিজের পছন্দের বই।

আশির দশকে মেলার বড় পরিবর্তন হয়। ১৯৮৪ সালে বইমেলার আনুষ্ঠানিক নাম রাখ হয় ‘অমর একুশে বইমেলা।’ এ বছর একাডেমি প্রাঙ্গণের বিভিন্ন জায়গায় মাটি ফেলে ভরাট করে মেলার আয়তন বাড়ানো হয়। মাটি ফেলা হয় পুকুরের পশ্চিম পাড়ে। ভরাট করা হয় বর্ধমান ভবনের উত্তর ও ক্যাফেটেরিয়া ভবনের দক্ষিণ দিক।

আশির দশকে এটি একটি দিক ছিল যে মেলার আয়তন বাড়ানো। আরেকটি দিক ছিল এই বছরে মেলার দিনও বাড়ানো হয়- ৭ ফেব্র“য়ারি থেকে ২৮ ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত। আগে একুশের বইমেলার সময় ছিল মাত্র কয়েকদিন। এ সময়ের বইমেলা উদ্বোধন করতেন দেশের বরেণ্য কেউ।

মেলার এমন পরিবেশে বিশ্বাস করতাম বইমেলা মানুষের সাংস্কৃতি চেতনাকে পরিশীলিত করে। তথ্যপ্রযুক্তির এই সময়েও বলতে চাই বইয়ের বিকল্প নেই। বড় করে শ্বাস নিলে একুশের চেতনায় প্লাবিত হয়ে থাকা মেলা প্রাঙ্গণ জাতির ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ জায়গা।

নব্বইয়ের দশকে বইমেলা আরো বড় হয়। বইমেলা উদ্বোধন করতে আসেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। এখন পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। এই অনুষ্ঠান বিভিন্ন চ্যানেলে সরাসরি প্রচারের ব্যবস্থা করার ফলে দেশের দূর অঞ্চলের মানুষ দেখতে পাচ্ছে। প্রতিদিন বইমেলার খবর প্রচারিত হয় দৈনিক পত্রিকা ও ইলেক্ট্রনিক চ্যানেলে।

এভাবে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের নানা কর্মকান্ড একুশের বইমেলাকে সম্প্রসারিত করেছে। ফলে সমস্যা দেখা দিয়েছে জায়গার। তাই প্রশ্ন উঠেছে বইমেলাকে অন্য কোথাও সরিয়ে নেয়া যায় কিনা তা ভেবে দেখার জন্য। বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী ময়দানের বিশাল প্রাঙ্গণজুড়ে বইমেলা আয়োজিত হয়।

আমরা সবাই জানি বইয়ের সীমান্ত নেই। সীমান্ত ছাড়িয়ে বই পৌঁছে যায় মানুষের কাছে। এশিয়ার মানুষ হয়ে জানতে পারি আফ্রিকার সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের রূপরেখা। জানতে পারি ইউরোপ-আমেরিকা-ল্যাটিন আমেরিকার জীবন। বই মানবজাতির অক্ষয় সাধনা।

লেখক ঃ কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।

॥ এস আর সেলিম ॥

আসুন অপসাংবাদিকতার জঞ্জাল দূর করতে সচেষ্ট হই

সেই ১৯৯৪ সালে ছাত্রাবস্থায় স্থানীয় পত্রিকায় টুকটাক খবর লেখালেখি শুরু আমার। অর্থাৎ মফস্বল সংবাদকর্মী হিসেবে কলম ধরার বয়স দাঁড়াল ২৫ বছর। যা একেবারেই কম সময় নয়। বরং নিজ বয়সের অর্ধেকের বেশি সময়ই। শখের বসে এই পথে এসে ধীরে ধীরে নেশায় আসক্ত এবং শেষমেষ এক রকম পেশাতেই পরিণত। তবে শুরু থেকে এ পর্যন্ত কখনোই নিজের ঢোল নিজে পেটানোর প্রয়োজন মনে করিনি। কিন্তু অনিচ্ছা সত্বেও আজ একটু পেটাতে হচ্ছে। অবশ্য সে রকম কোনো অনুষঙ্গও আমার ক্ষেত্রে নেই। শুরুর দিকে খবরের পেছনে প্রচুর ওয়ার্ক করেছি। খবরের প্রয়োজনে দিন-রাত সমানে চষে বেড়িয়েছি এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায়। কিন্তু এখন আর সেই দৌড়ঝাঁপ ভাল লাগে না। ডিজিটাল যুগ ঘরে বসেই সব খবর মেলে। ছুটোছুটি না করলেও চলে। তবু বিশেষ খবরের ক্ষেত্রে ছুটতেই হয়। কিন্তু ব্যাপারটি আসলে তাও নয়। সমস্যা অন্য জায়গায়।

সে যাই হোক, সেই সময়ে দৌলতপুর অঞ্চলে চলতো পাবলিক পরীক্ষায় নকলের মচ্ছব। কুষ্টিয়া শহর ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে অনেকে নকলের সুযোগ নিতে এখানকার বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে এসব পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতেন। নতুন কিংবা শিক্ষানবিশ ‘সংবাদকর্মী’ হিসেবে সে সময় সাধারণের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ বিশেষ জায়গাগুলোতে বিচরণের আগ্রহটা একটু বেশিই ছিল। কৌতূহল মেটাতে সে সব জায়গায় যেতামও। এ রকম প্রবেশ নিষিদ্ধ স্থানগুলোর মধ্যে পরীক্ষা কেন্দ্র এবং ভোট কেন্দ্র ছিল মোটামুটি উল্লেখযোগ্য।

বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্র ঘুরে রাজনৈতিক নেতাদের রক্তচক্ষু ও নানা প্রতিকূল অবস্থা উপেক্ষা করে পাবলিক পরীক্ষায় নকলের বহু এক্সক্লুসিভ ছবি তুলেছি। সেই ছবিসহ স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় রিপোর্ট করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছি। নকল সরবরাহ ও বেঞ্চের ওপর নকল রেখে লেখার ছবি দিয়ে ঢাকার একটি দৈনিকের পেছন পাতায় বক্স আকারে লিড করা হয়েছিল। হেডিং ছিল, ‘দৌলতপুরে এসএসসিতে নকলের হিড়িক, প্রশাসন নীরব’। কুরিয়ার সার্ভিসে পাঠানো ওটা ছিল কোনো জাতীয় দৈনিকে বাই নেমে আমার প্রথম নিউজ। যা দেখে দারুণ পুলকিত হয়েছিলাম। পরে সংশ্লিষ্ট বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শনে আসেন। আলাদাভাবে আসেন জেলা প্রশাসকও। কিন্তু তারা ফিরে যাওয়ার পর আবার সেই হযবরল অবস্থা দেখা দেয়।

তবে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলন আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে নকল প্রবণতার লাগাম টেনে ধরতে সক্ষম হন। প্রতিমন্ত্রী অনেকটা আকস্মিকভাবে দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে নকল বিরোধী অভিযান চালাতেন। একদিন ইউএনও নজরুল ইসলামের কাছে খবর এলো, প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলন মথুরাপুর কেন্দ্রে এসেছেন। আমি তখন ইউএনওর সাথে দৌলতপুর কেন্দ্রে ছিলাম। তিনি প্রতিমন্ত্রীর আসার কথা তাৎক্ষণিক না জানিয়ে কিছুটা মজা করেই বললেন, ‘চলেন মথুরাপুর কেন্দ্রে। আজ আপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর আছে।’ চললাম ইউএনওর সাথে তার তখনকার সবুজ রঙের জিপ গাড়িতে মথুরাপুরের উদ্দেশে। কিন্তু বিধিবাম। সেখানে পৌঁছনোর কিছুক্ষণ আগেই মন্ত্রীর হেলিকপ্টার উড়াল দেয় অন্য কোনো কেন্দ্রে।

পরে ইউএনও নজরুল ইসলাম (বর্তমানে যুগ্ম সচিব) কেন্দ্র সচিবের কাছ থেকে মন্ত্রী কতক্ষণ অবস্থান করেছেন, কী বলেছেন, কজনকে বহিস্কার করেছেন ইত্যাদি বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। আমিও নোটডাউন করছিলাম। ওইদিন পরীক্ষার শেষ পর্যন্ত ইউএনও সেখান থেকে আর নড়লেন না। ততক্ষণে আমি ওখানে একপাশে বসেই ‘প্রতিমন্ত্রী মিলনের আকস্মিক মথুরাপুর কেন্দ্র পরিদর্শন, তল্লাশি করলেন বাথরুমও’ শিরোনামে বিশদ একটি নিউজ রেডি করলাম। কিন্তু উপস্থিত কাউকে বুঝতে দিলাম না। পরের দিন দৈনিক আন্দোলনের বাজার পত্রিকায় গুরুত্ব দিয়ে সেটি প্রকাশিত হয়। নিউজটি দেখে ইউএনও নজরুল ইসলাম বেজায় খুশি হলেন। আমাকে বাহবা দিলেন। তবে কারো বাহবা পেতে কিংবা কাউকে তেল মারার জন্য নয়। কর্তব্যের জায়গা থেকেই গতানুগতিক ধারার বাইরে কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিকে সেই নিউজটি করেছিলাম।

অত্যন্ত সাহসি উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ এই কর্মকর্তা প্রতিদিন রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত উপজেলা ক্যাম্পাসের বাইরে প্রধান সড়কে নিয়মিত হাঁটতে বেরোতেন। বাজারের পাশেই বাড়ি হওয়ায় আমাকে ডেকে নিতেন। দুর্গা পূজার সময় এশার নামাজ পড়ে বিভিন্ন পূজামন্ডপ পরিদর্শনে আমাকে সঙ্গে নিতেন। ব্যক্তিগত কাজ না থাকলে যেতাম। একদিন সবচে’ বড় পূজামন্ডপ আল্লারদর্গায় যাওয়ার সময় ওই বাজারের ঠিক মাঝখানে ইট হাতে একজন মদ্যপ ব্যক্তি আচমকা ইউএনওর গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ইট মারতে উদ্যোত হন। জিন্স প্যান্ট, টিশার্ট ও কেডস পরা দাপুটে ইউএনও নজরুল সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থেকে নেমে ওই মদ্যপ ব্যক্তিকে চড় থাপ্পর মেরে থানায় নেয়ার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন। সে সময় বাজার কমিটির লোকজনের বিশেষ অনুরোধে তাকে ছেড়ে দেন তিনি। ‘ইট হাতে ইউএনওর গাড়ির সামনে মদ্যপ ব্যক্তি’ শিরোনামে এটাও আমার কাছে একটি নিউজের আইটেম হলো। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ইউএনওর গাড়ি যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে সেখানে একটি সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছিল। এ কারণে ওই ব্যক্তি গাড়ি ভাঙতে উদ্যোত হয়েছিলেন।

ইউএনও নজরুল ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রামগুলোতে আমন্ত্রণ করতেন। সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনে সমতা বজায় রাখতেন। এছাড়া প্রতিপক্ষ হয়ে ব্যাডমিন্টন খেলতেন। তিনি আমাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে খেলায় স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন। হাসি আড্ডা ছাড়াও ভীষণ মজার একজন মানুষ তিনি এবং একই সাথে অন্যরকম ব্যক্তিত্ব সম্পন্নও বটে। তার সাথে খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল আমার। এ কারণে বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা আলাপ আলোচনা করতেন। সর্বোপরি তিনি আন্দোলনের বাজারে প্রকাশিত আমার নিউজ এবং পত্রিকাটির আধুনিকায়নের প্রশংসা করতেন। তিনি আগ্রহ দেখানোয় একদিন তাকে সম্পাদক মনজুর এহসান চৌধুরীর সাথে সাক্ষাৎ করিয়েছি। সেদিন মন্ত্রী পরিষদ সচিব আকবর আলি খানের মিটিং শেষ করে ফেরার পথে মজমপুরে পত্রিকা অফিসে গিয়ে ওই সাক্ষাৎ করেন তিনি।

বর্তমানে খুব সম্ভবত বরগুনার জেলা প্রশাসক আনোয়ার হোসেন। এক সময় দৌলতপুরের এসি ল্যা- ছিলেন। নকল প্রবণ পাবলিক পরীক্ষায় তিনি ছিলেন পরীক্ষার্থীদের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক। একবার এইচএসসি পরীক্ষায় আনোয়ার হোসেন শতাধিক পরীক্ষার্থীকে বহিস্কার করেন। সে সময় বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলা চলছিল। তো সেবার ক্রিকেটের ভাষায় নিউজের হেডিং দিলাম, ‘এসি ল্যান্ড আনোয়ারের সেঞ্চুরি!’ আর নিউজের ভেতরে ছিল কীভাবে কিসের সেঞ্চুরি তার বিস্তারিত বর্ণনা।

তখন আজকের মতো অবাধ তথ্য প্রবাহের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা ছিল না। ১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্র“য়ারি সন্ধ্যা। তখনকার ইউএনও জাহাঙ্গীর মোল্লার ছোট ভাই (নাম মনে পড়ছে না) খবর দিলেন, উপজেলার কালিদাসপুরে সন্ত্রাস বিরোধী সমাবেশে দুর্বৃত্তদের ব্রাসফায়ারে জাসদ সভাপতি কাজী আরেফ আহমেদসহ পাঁচ জাসদ নেতা নিহত হওয়ার। তাৎক্ষণিক ছুটে গেলাম থানায়। সেখান থেকে নিশ্চিত হলাম কাজী আরেফের মরদেহ দৌলতপুর হাসপাতালে। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে গিয়ে দেখি বহু মানুষ সেখানে ভিড় করেছে। ভিড় ঠেলে গেটের ভেতরে ঢুকে এসআই লোকমান হোসেনকে কাজী আরেফের সুরতহাল রিপোর্টের প্রস্তুতি নিতে দেখে পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। এসআই লোকমান কাজী আরেফের হাত থেকে সিলভার কালার ডায়ালের হাত ঘড়িটি খুলে আমাকে ধরে রাখতে বললেন। ওনার মাথায় বাঁধা রক্তাক্ত গামছা খুললেন। মাথার এক পাশ থেকে বুলেট ঢুকে অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ায় মাথার ঘিলু দেখা যাচ্ছিল। রক্তে পুরো শরীর ভিজে গিয়েছিল। পরে ওনার গায়ের পাঞ্জাবি খোলার সময়, নিউজ দিতে হবে তাই এসআই লোকমানের কাছে ঘড়িটি জমা দিয়ে বাইরে বেরোলাম।

সেখানে অপেক্ষমান কালিদাসপুরের ঘটনাস্থলের কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে যতদূর সম্ভব জানার চেষ্টা করলাম। জয়রামপুরের জাসদ নেতা খলিল মেম্বার ঘটনা প্রত্যক্ষতার কথা জানালেন। পরে পুনরায় থানা থেকে নিহতদের নাম পরিচয় নিয়ে টিএ্যান্ডটি অফিসে গেলাম। এই প্রথম এতবড় একটি হত্যাকান্ডের ঘটনা নিয়ে নিউজ করতে প্রচন্ড এক্সাইটেড ছিলাম। সেখানে বসে তাড়াহুড়ো করে কোনোমতে একটি নিউজ রেডি করে এনালগ টেলিফোনের মাধ্যমে সেদিন রাত ১০টায় ঢাকায় ওই হত্যাকান্ডের খবর দিয়েছি। পরের দিন ফ্যাক্সে ফলোআপ দেই।

পরে রাতেই আবার থানায় গিয়েছি আপডেট খবর ও মামলা প্রসঙ্গে জানতে। ততক্ষণে নিহত পাঁচজনের মরদেহ থানায় আনা হয় এবং ব্যাডমিন্টন কোটে ভ্যানের ওপর সারিবদ্ধভাবে মৃতদেহগুলো রাখা হয়। সে সময় ওসির কক্ষে গেলাম। ভেতরে ছিলেন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি লুৎফুল কবির। ওসি ইছাহাক আলী উঠে এসে বললেন, ‘ডিআইজি স্যার আছেন। এখন কিছু বলা যাচ্ছে না। আমি মামলার বাদী হচ্ছি। কাল সাংবাদিকদের বিস্তারিত ব্রিফিং করা হবে।’ এরপর আর দেরি না করে উপজেলায় চলে আসলাম।

গভীর রাতে প্রেসক্লাবে এসে সিনিয়র সাংবাদিক শহিদুল ভাইয়ের সাথে দেখা। সে সময় তিনি বিবিসি প্রতিনিধিকে টেলিফোনে এই হত্যাকান্ডের খবর পরিবেশন করছিলেন। খবর দেয়া শেষ হলে শহিদুল ভাইয়ের সাথে এ নিয়ে দীর্ঘ সময় আলাপ করি। দেশজুড়ে আলোচিত এই হত্যাকান্ডের পর চরমপন্থি অধ্যুষিত এ অঞ্চলে কয়েকটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেয় সরকার। সেই মোতাবেক ঘটনাস্থল কালিদাসপুর ও শ্যামপুর পুলিশ ক্যাম্প উদ্বোধন করেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। ওই উদ্বোধন অনুষ্ঠানের নিউজ কভার করতে গিয়ে মন্ত্রী নাসিম ও পুলিশের আইজিপি এওয়াইবি সিদ্দিককে বহনকারী কপ্টারে ওঠার অভিজ্ঞতাও হয়েছিল। (শেষ পর্ব আগামীকাল)

লেখক : এস আর সেলিম, ভোরের কাগজ প্রতিনিধি

॥ শেখর দত্ত ॥

প্রসঙ্গ সংসদে বিরোধী দল!

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসবে আগামী ৩১ জানুয়ারি। বিপুল ভোটে বিজয়ের পর সরকারি দল নিঃসন্দেহে চাইবে ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’- প্রবাদটা প্রমাণ করতে। সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী ইতোমধ্যে মন্ত্রিসভার সভায় রাষ্ট্রপতির বক্তৃতা অনুমোদন করা হয়েছে। সবই চলছে ঠিকঠাক মতো। কিন্তু সংসদের অন্যতম প্রধান প্রয়োজন ও আকর্ষণ বিরোধী দল নিয়েই যত বিপত্তি।

এটা কার না জানা যে, দুই পা, দুই হাত, দুই কান ছাড়া যেমন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয় না, তেমনি বিরোধী দল ছাড়াও সংসদ সর্বাঙ্গীণ হয় না। খুব একটা অতীতে না গিয়ে আমরা যদি ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর থেকে এখন পর্যন্ত সংসদের দিকে তাকিয়ে দেখি, তা হলে দেখা যাবে, নবম জাতীয় সংসদে বিএনপি-জামায়াত জোট সংসদ বয়কট করলেও বিরোধী দল হিসেবে অবস্থান ছিল। কিন্তু বিএনপির বয়কটের কারণে দশম জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টি সরকারেও ছিল, বিরোধী দলেও ছিল।

এটা ছিল সম্পূর্ণ না ঘরকা না ঘাটকা অবস্থা। সংসদীয় গণতন্ত্রে এমনটা অভিনব এবং তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাজাত জাতীয় চার মূলনীতির একনীতি গণতন্ত্রের চেতনার সঙ্গে খাপ খায় না। বিএনপি-জামায়াত জোট যদি ২০১৪ ও ২০১৫ সালে পর পর দুবার আগুন সন্ত্রাসের মাধ্যমে গৃহযুদ্ধ বাঁধাতে তৎপর এবং উগ্র সন্ত্রাসী জঙ্গি তৎপরতার উসকানি না দিত, তবে বিরোধী দলের ওই ধরনের না ঘরকা না ঘাটকা অবস্থান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ গ্রহণ করত বলে মনে করার কোনো কারণ দেখি না।

সময়ের প্রয়োজনে এটা ছিল কৌশলমাত্র। তবে এই কৌশল যেহেতু নীতিকে অনেকাংশেই ছুঁয়ে যায় বা আঘাত করে, সেহেতু সময় হলে ঝরাপাতার মতো এই কৌশল থেকে বের হয়ে আসা গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার জন্য একান্ত প্রয়োজন। প্রসঙ্গত বলতেই হয় যে, বিএনপি দলটির রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে একেবারেই যায় না। বাংলাদেশ জন্মলগ্নের মর্মবাণী ও বাঙালি জাতিসত্তার বিপরীতমুখী দল বিএনপি।

ঠান্ডা যুদ্ধযুগে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে বিশ্ব ও উপমহাদেশীয় রাজনীতির টানাপড়েন, পরাজিত শক্তির প্রতিশোধ স্পৃহা ও ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সীমাবদ্ধতা-দুর্বলতা, হত্যা-ক্যুর ফলে নেতৃত্বের শূন্যতা, অস্ত্রের জোর প্রভৃতি ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপি দলটিকে দেশের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে নিয়ে এসেছিল।

বলার অপেক্ষা রাখে না, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ এই দুই বিপরীতমুখী চেতনাকে ককটেল করে জনমনে বিভ্রান্তি এবং ক্ষমতার ভারসাম্যে একটা ভালো অবস্থান সৃষ্টি করতে পারা সম্ভব হয়েছিল বলেই ক্যান্টনমেন্টে প্রতিষ্ঠিত হওয়া দলটি আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘদিন পাল্লা দিতে সক্ষম হয়েছিল।

প্রসঙ্গত, হাওয়া ভবনের কর্মকান্ড যেমন বাংলাভাই-মুফতি গংদের আশ্রয়-প্রশ্রয়-উসকানি দিয়ে ব্যবহার করা, ১০ ট্রাক অস্ত্র পাচারের প্রচেষ্টা, দেশের মাটিকে পরেশ বড়ুয়া- রাজখোরদের জন্য অভয়ারণ্য করা, ডন ইব্রাহীমের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা প্রভৃতির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন ও পাচার কিংবা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে ক্ষমতায় থাকার প্রচেষ্টা ছিল একটার সঙ্গে অপরটা জড়িত এবং একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

ওই গণবিরোধী দেশবিরোধী কাজগুলোর ধারাবাহিকতার পরিণতিতেই বিএনপি-জামায়াত জোট পরপর দুবার আগুন সন্ত্রাসের মাধ্যমে গৃহযুদ্ধ বাধানোর অপচেষ্টা করেছিল। সার্বিক বিচারে এসব কর্মকান্ডের ভেতর দিয়ে বিএনপি ও জামায়াত দল ও জোট হিসেবে টিকে থাকার উপযোগিতাও হারায়।

রাজনীতি হলো দূরদর্শিতা-সাহস ও নীতি-কৌশলের খেলা। এই খেলায় বিএনপি-জামায়াত জোট সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ ও পরাজিত হয়েছে। যে ব্যর্থ সে টিকে থাকার যোগ্যতা হারায়। বিএনপির তবুও একটা সুযোগ ছিল উঠে দাঁড়ানোর। কারণ গণতন্ত্রে প্রয়োজন বিরোধী দল। নানাবিধ কারণে এখনো বিএনপি দলটির জনসমর্থন রয়েছে এবং জনমনস্তত্ত্বে এখনো বিএনপি আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গেঁথে আছে। এই পরিস্থিতি সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিকভাবে ব্যবহার করে বিএনপি আবারো উঠে দাঁড়াতে পারে।

যদি তা করতে হয় তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় পাঁচটি কাজ করতে হবে বিএনপিকে। এক. জামায়াত থেকে নিজেকে সর্বোতভাবে বিচ্ছিন্ন করা; দুই. তারেক জিয়াকে নেতৃত্ব থেকে অপসারণ করা; তিন. পাকিস্তানি কানেকশন থেকে সর্বোতভাবে মুক্ত হওয়া; চার. আশির দশকে তিন জোটের আন্দোলনের সময় রাজনীতি যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অভিমুখী হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল, সেই সম্ভাবনা কার্যকর করা; পাঁচ. সর্বোপরি বর্তমান শক্তি নিয়েই সংসদে যোগ দেয়া।

কিন্তু বিএনপি এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারবে বলে অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হচ্ছে না। এদিকে বিএনপি-গণফোরামের নির্বাচিত সদস্যরা এখন পর্যন্ত শপথ গ্রহণ করেননি। বিএনপি সম্পূর্ণভাবে সংসদ বয়কটের লাইনে গিয়ে পুনর্নির্বাচন চেয়ে আবারো সেই বস্তাপচা, অগ্রহণযোগ্য ও অকার্যকর নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি তুলছে; যার রূপরেখা বিগত ১০ বছর দিব দিব করেও দিতে পারেনি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হচ্ছে, জেলে থেকে খালেদা জিয়া বলে দিয়েছেন, সংসদের বাইরেও নাকি বিরোধী দল হয়। জেলে থেকে কোন বুঝ-পরামর্শ থেকে তিনি এমনটা বলছেন তা জানার সুযোগ নেই।

স্বাধীনতার তিন বছরের মাথায় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দেশের সর্ববৃহৎ ও সেক্যুলার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বশূন্য হয়ে চরম দমন-পীড়ন ও অপপ্রচারের মধ্যে সংসদের ভেতরে-বাইরে নীতি-কৌশল প্রয়োগ করে কীভাবে বর্তমান বিশ্ব পরিমন্ডলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থানের মধ্যে বর্তমান অবস্থায় উপনীত হয়েছে, সেটা বিএনপি অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা হিসেবে সামনে রাখতে পারে। কিন্তু বিএনপি তা পারবে বলে একেবারেই মনে হচ্ছে না। কারণ কয়লা শত ধুলেও ময়লা যায় না। বিএনপির যে রয়েছে জন্মের দোষ।

এই বাস্তবতায় বলতেই হয়, বিএনপি দলটি যদি উল্লিখিত কাজগুলো না করার ফলে পটল তোলার দিকে যায়, তবে সংসদীয় গণতন্ত্র বিরোধী দল প্রশ্নে অতীত দিনগুলোর মতো সমস্যার মধ্যেই থাকবে। ইশতেহারে আওয়ামী লীগ বলেছে, সংসদকে ‘রাষ্ট্রীয় সকল কাজের কেন্দ্রবিন্দু’ করে ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও চেতনাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা হবে এবং সংবিধান হবে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ দলিল।’

এই অঙ্গীকার যদি রক্ষা করতে হয়, তবে নিঃসন্দেহে প্রয়োজন বিরোধী দল। কেননা এটা সর্বস্বীকৃত যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাষ্ট্র ও সরকারকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও চেতনার বিপরীতে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা জোগায়। ২০০১ সালের ভোট ডাকাতির নির্বাচনের পর তাই ‘ ব্র“ট মেজরিটি’ শব্দটা খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা চাইতে পারেন না।

এই বিবেচনায় আজ সংসদের ভেতরে-বাইরে বিরোধী দলের কার্যক্রম সময়ের দাবি। বলাই বাহুল্য সময়ের দাবি হলেই প্রয়োজন অনুযায়ী সব হয় না। কারো ইচ্ছা-অনিচ্ছা বা পরিকল্পনার ওপর রাজনীতির গতিধারা নির্ভরও করে না। যদি হতো তবে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার পর ইপ্সিত আকাঙ্খা অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণী নিয়ে দেশে সরকারি দল ও বিরোধী দল দাঁড়াতো।

একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, আওয়ামী লীগের বাম দিক থেকে সেই পঞ্চাশের দশক থেকে বাম কমিউনিস্টরা বিরোধী দল দাঁড় করাতে সচেষ্ট থেকেছে। তাদের কেউ নিয়েছে ঐক্য ও সংগ্রামের নীতি আবার কেউ নিয়েছে বিরোধিতার নীতি। অতীতের ভূমিকা উল্টাপাল্টা হয়ে যা এখন নিচ্ছে একদিকে ওয়ার্কার্স পার্টি- জাসদ আর অন্যদিকে সিপিবির বামজোট। কিন্তু তা যে হয়নি এটাই বাস্তব।

ঐক্য-সংগ্রামের নীতি-কৌশল নিলে তা গিয়ে ঢুকে আওয়ামী লীগের পেটে আর কেবল সংগ্রামের নীতি নিলে চলে যায় বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতিতে। তদুপরি আওয়ামী লীগের ডানদিক থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়েও কোনো দল গড়ে উঠতে পারেনি। বিভক্ত হয়ে আওয়ামী লীগের কোনো গ্র“প যেমন টিকে থাকতে পারেনি, তেমনি জেনারেল ওসমানী ও ড. কামালের দল করার প্রচেষ্টাও সফল হয়নি।

এখানেই আসে উপমহাদেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি, যা নিয়তির মতো তিন দেশ ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের রাজনীতিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। সেক্যুলার রাজনীতি ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি প্রায় একশ বছর ধরে আমাদের রাজনীতিকে কখনো তীব্র আবার কখনো ধীর বেগে প্রভাবিত করে চলেছে। অন্য দুটো দেশের কথা এখানে বলা হলো না, তবে প্রশ্ন হলো, এই বাস্তবতা থেকে কি আমাদের পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব? বিএনপি যখন জামায়াতকে নিয়ে মরণদশায় তখন এই প্রশ্নটাই আজ বাংলাদেশের রাজনীতির জ¦লন্ত প্রশ্ন?

ইতোপূর্বে এই কলামেই লেখা হয়েছিল যে, বাংলাদেশের রাজনীতির স্থিতিশীলতা যদি রক্ষা করতে হয়, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন যদি অব্যাহত রাখতে হয়, দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর লক্ষ্যে যদি সামাজিক নিরাপত্তা বলয় সুরক্ষা ও বিস্তৃত করতে হয়, আন্তর্জাতিক ও উপমহাদেশের রাজনীতিতে যদি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবে জাতীয় মূলধারা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রধান দল আওয়ামী লীগকে নিরঙ্কুশভাবে ক্ষমতাসীন করা প্রয়োজন।

আগ্রহোদ্দীপক বিষয় হলো তেমনিটাই হয়েছে। কিন্তু এখন প্রশ্ন বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিরোধী দল কে হবে? এক সমস্যা আপাতত গেছে তো আরেক সমস্যা দাঁড়াচ্ছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেই কথাটা জোরেশোরে উঠছে। এমনকি শ্রদ্ধাভাজন ড. আনিসুজ্জামান পর্যন্ত বলেছেন, সংসদে বিরোধী দল না থাকায় এখন সুশীল সমাজেরই বিরোধী ভূমিকা পালন করতে হবে।

ইতোমধ্যে মন্ত্রিসভা গঠনের ভেতর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কার্যত বলে দিয়েছেন, মহাজোট বা ১৪ দলের যারা নির্বাচনে জিতেছেন তারা বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করুক। এই কথাটি আরো পরিষ্কারভাবে বলেছেন সাধারণ সম্পাদক, সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, ১৪ দল হচ্ছে আদর্শগত এবং বিএনপি হচ্ছে কৌশলগত ঐক্যের অংশীদার।

এখানে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, ১৪ দল যদি আদর্শিক ঐক্য হয়, তবে একসঙ্গে জোটের নির্বাচনী ইশতেহার দেয়া হয় না কেন? ওয়ার্কার্স পার্টি বা জাসদ থেকে মন্ত্রী হয়ে তাদের আওয়ামী লীগের ইশতেহার বাস্তবায়ন করতে হয়। তৃণমূলে খোঁজ নিয়ে যতটুকু জেনেছি মন্ত্রিত্ব সরকারি দলে নাকি বিরোধী দলে থাকবে ১৪ দলের সঙ্গীরা এই প্রশ্নে দুই মত রয়েছে। প্রথম মত বলে, বিগত সময়ে কোন অবস্থায় এসে আওয়ামী লীগ ১৪ দলীয় ঐক্য করেছিল আর পরে ওই দুই দল থেকে মন্ত্রী করেছিল, তা সবারই জানা।

ওই ঐক্য ও ছাড়ে আওয়ামী লীগের লাভ ছাড়া কোনো ক্ষতি হয়নি। রাজনীতিতে সব সময়ই প্রয়োজন হয় বন্ধু ও সাথীর। এই প্রয়োজন এখনো আছে। যদি আওয়ামী লীগ সরকারি দলে না রাখা ও মন্ত্রী না করার অবস্থান নেয়, তবে ভবিষ্যতে অসুবিধা হতে পারে। আর অন্য মত মনে করে, আওয়ামী লীগের ঐক্যের পর্যায় শেষ। পরিস্থিতি অনুকূল। একাই সব সম্ভব। কোন মত শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ গ্রহণ করে, তার জন্য ১৪ দলীয় জোটের সভা বা প্রথম সংসদ অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সাধারণ বিবেচনায়ই মনে হয় অগ্রপশ্চাৎ চিন্তা করেই আওয়ামী লীগ সিদ্ধান্ত নিবে।

নির্বাচনের আগের চাইতে নির্বাচনের পরে জাতীয় পার্টি আছে টালমাটাল অবস্থায়। এরশাদ অসুস্থ, এ নিয়ে চলছে নানা গুজব। রওশন এরশাদসহ গতবারের মন্ত্রীরা নীরব। আর জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের, যিনিও এক সময় ছিলেন না ঘরকা না ঘাটকা সময়ের মন্ত্রী, বলে দিয়েছেন জাপা হবে প্রকৃত বিরোধী দল। প্রসঙ্গত জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের কেবল কৌশলগত মিত্রই নয়, অনির্ভরযোগ্য মিত্রও।

তাই এই দলকে বিরোধী দল হিসেবে ছেড়ে দিলে বর্তমানে আওয়ামী লীগের কোনো ক্ষতি নেই। তবে জাতীয় পার্টি নিজেরা একটি দলকে নিয়ে খেলে ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে চিত্রিত করেছিল, সেই নামে যেন তারা আখ্যায়িত না হয়, রসাত্মবোধক নাটক যাতে সংসদকে ঘিরে সৃষ্টি না করে এটাই দেশবাসীর কাম্য। এখানে বলতেই হয় যে, কোনো কিছুই শূন্য থাকতে পারে না। পক্ষে-বিপক্ষে দুই মেরুতে বিভক্ত হওয়াটা সংসদীয় রাজনীতিতে অপরিহার্য।

সংসদে থাকা এবং বিএনপি না থাকার সুযোগ নিয়ে নতুন নেতৃত্ব এসে জাতীয় পার্টিকে যদি বিরোধী দল হিসেবে যথাযথ ভূমিকায় নামাতে এবং পাঁচ বছর চলাতে পারে, তবে জাতীয় পার্টির ভাগ্য সুপ্রসন্ন হতেও পারে! তবে উপমহাদেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি এবং দেশের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে বলতেই হয় যে, বিএনপি যে আবার জেগে উঠবে না তা একশ পারসেন্ট সন্দেহাতীত হয়ে কে বলতে পারে!

সবশেষে বলতে হয় যে, বিগত ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার স্বার্থে আওয়ামী লীগ ওয়াদাবদ্ধ হয়েছিল এই বলে যে, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কতিপয় সুনির্দিষ্ট বিষয় ছাড়া সংসদ সদস্যদের ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার দেয়া হবে।’ এই কথা পরের দুই ইশতেহারে নেই। ওই ওয়াদা যদি বহাল থাকে তবে তা সংসদে চালু করতে পারে আওয়ামী লীগ। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, গঠনমূলক ভিন্নমত নিয়ে সমালোচনা আর অগঠনমূলক ক্ষতিকর সমালোচনার পার্থক্য রেখা নির্ধারণ করবে কে?

লেখক ঃ রাজনীতিক ও কলাম লেখক।

॥ কামরুল ইসলাম চৌধুরী ॥

জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা নিন

ফসল চক্রের পরিবর্তন কী টের পাচ্ছেন? প্রাণ বৈচিত্র্যের বেশ পরিবর্তন কী দেখতে পাচ্ছেন? শেফালি ফুল কী সময় মতো ফুটছে? শীতের পরিযায়ী পাখি কী একটু আগে পরে আসছে? ষড়ঋতুর দেশে এখন কি শরৎ, হেমন্তকাল ঋতুচক্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে? টের তো পাচ্ছি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপদাহ বাড়ছে। শৈত্যপ্রবাহ বাড়ছে। জল ও বায়ুচক্রে টালমাটাল পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ছে। সাগর-মহাসাগর উত্তপ্ত হচ্ছে, লোনা জল উপকূলে ঢুকছে। ঋতুচক্রে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা সতর্কবাণী দিচ্ছেন, কার্বন নিঃসরণ না কমালে আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা আরও বাড়বে। তাদের কথা হল, জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ পুঁজিবাদী ভোগ ব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে হবে। কিন্তু সেই সতর্কবাণী উপেক্ষিত হয়েই চলছে। কার্বন নিঃসরণ কমছে না, বরং বেড়েই চলেছে। ১৯৯২ সালের গৃহীত জাতিসংঘ জলবায়ু সনদ শিল্পোন্নত ধনী দেশগুলোর অনেকেই মানছে না। ফলে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ঘন ঘন আঘাত হানছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা দেশে। জলবায়ুর অভিঘাতে জাতীয় আয়ের দুই-তিন শতাংশ ফি বছর তলিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু উদ্বাস্তুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে।

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি দেড় ডিগ্রির মধ্যে রাখতে হবে। কে শুনছে কার কথা? খ্রিস্টীয় ২০১৯ সাল শুরু হয়ে গেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ (এসডিজি) অর্জনে সামনে রয়েছে মাত্র এগারো বছর। মনে রাখতে হবে, এসডিজি’র ১৭টি অভীষ্টের ১৩ নম্বর লক্ষ্য হল জলবায়ু। প্যারিস চুক্তির অধীনে অভিযোজন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন লক্ষ্য অর্জনের পথেও রয়েছে কেবল সামনের ১১ বছর। সময় দ্রুত এগোচ্ছে, এর মধ্যে অভীষ্টগুলো অর্জন করতে হবে।

এখন প্রশ্ন হল, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন কেমন হবে? কীভাবে স্বাভাবিক উন্নয়ন থেকে এটি ভিন্ন? জাতিসংঘ জলবায়ু অভিযোজন কমিটির সাবেক সদস্য হিসেবে আমি জানি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে অভিযোজন এখনও সঠিকভাবে পরিমাপ করা কঠিন। অভিযোজন বিজ্ঞান এ পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অভিযোজনের তিনটি পর্যায় চিহ্নিত করেছে। প্রথম পর্যায়টি হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রতিকূল প্রভাবগুলো মূল্যায়ন করা এবং যাচাই করা আমরা এমন কিছু করছি কিনা। যা আমাদের সেই প্রভাবগুলোর জন্য আরও ঝুঁকির সম্মুখীন করে তুলছে। যদি তাই হয়, তাহলে আমাদের নিজেদের আরও ঝুঁকির সম্মুখীন করার প্রয়াস বন্ধ করতে হবে। ভালো হয় যদি আমরা প্লাবন ভূমিতে ভাসমান ভবন নির্মাণ করতে পারি। জলবায়ু ঝুঁকি কমাতে হবে। সে জন্য সুন্দরবনকে যে কোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। কারণ সুন্দরবন বাংলাদেশকে ঘূর্ণিঝড় থেকেই শুধু রক্ষা করে না, কার্বন সিন্কও  তৈরি করে। সুন্দরবন একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমন করে। পরিবেশবিনাশী পদক্ষেপগুলো নেয়া বন্ধ করতে হবে। পানি, বায়ু ও মাটি দূষণ ঠেকাতে হবে।

অভিযোজনের দ্বিতীয় পর্যায়ে আমরা এখন রয়েছি। তাই, আমাদের এখন দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগুলোতে বিনিয়োগ যেমন- সেতু, রাস্তা, বিমানবন্দর এবং নৌবন্দরগুলোর বিষয় বিবেচনা করতে হবে। যাতে সেগুলো ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসহিষ্ণু হয়। এখন সারা বিশ্বে সব বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও আমাদের তা বিবেচনা করতে হবে।

অভিযোজনের তৃতীয় পর্যায়টিকে রূপান্তরমূলক অভিযোজন বলা হয়। যা এখনও কিছুটা তাত্ত্বিক পর্যায়ে রয়েছে। এখনও তেমন কোনো ভালো নজির নেই। কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলোর ঝুঁকি মোকাবেলা নয় বরং অভিযোজন ব্যবস্থার ভালো ফল লাভের জন্যও এটি প্রযোজ্য।

সেই ১৯৯০-এর দশকে জাতিসংঘ জলবায়ু সনদের অধীনে স্বল্পোন্নত ৪৯টি দেশের শীর্ষ অভিযোজন নেগোসিয়েটর হিসেবে আমি বাংলাদেশসহ এ সব দেশে জাতীয় অভিযোজন কর্মপরিকল্পনা (নাপা) প্রণয়নের দাবি তুলেছি। জলবায়ু সনদের অর্থায়নে বাংলাদেশ ২০০৫ সালে নাপা প্রণয়ন করে। স্বল্পোন্নত সব দেশ নাপা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করে। জাতিসংঘ জলবায়ু সনদে নেগোসিয়েটরের পর নাপার ওপর ভিত্তি করে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (নাপ) প্রণয়নের দাবি তুলি ২০০৯ সালে কোপেনহেগেন জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনে। যা পরবর্তী বছর ২০১০ সালে কানকুন এডাপটেশন ফ্রেমওয়ার্কের অংশ হিসেবে গৃহীত হয় আমার প্রস্তাব মোতাবেক। নেপালসহ বেশ কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে এ পরিকল্পনা তৈরিও করে তা বাস্তবায়নে যাচ্ছে। বাংলাদেশও জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার পথ-নকশা ২০১৫ সালে তৈরি করে। সেই পথ-নকশার একজন প্রণেতা হিসেবে এবং জাতিসংঘ অভিযোজন কমিটির সাবেক সদস্য হিসেবে বলতে পারি, অবিলম্বে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা  তৈরির কাজ শুরু করা দরকার। জন অংশগ্রহণের ভিত্তিতে এ দলিলটি তৈরি করা প্রয়োজন। তাহলেই আগামী দশকে রূপান্তরমূলক অভিযোজন গ্রহণ করে বাংলাদেশ ২০৩০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনসহিষ্ণু দেশ হয়ে উঠতে সক্ষম হবে।

বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলো প্রকৃতই রূপান্তরমূলক অভিযোজন অর্জনের লক্ষ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বেশ কিছুটা এগিয়েছে। অভিযোজনকে আরও কার্যকরী করার বিষয়ে আমরা ইতিমধ্যে কিছু শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।

সেই অভিজ্ঞতার আলোকে প্রথম শিক্ষাটি হচ্ছে সত্যিকারের রূপান্তরমূলক অভিযোজন অর্জনের জন্য একদশক বা তারও বেশি সময় লাগবে। অতএব স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি প্রকল্পভিত্তিক বিনিয়োগ এ ক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযুক্ত হবে না। বৈশ্বিক তহবিল যেমন- গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) ব্যবহারের জন্য এটি একটি সমস্যা। যা শুধু প্রকল্পে অর্থায়ন করে থাকে। তারা যদি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় রূপান্তরমূলক অভিযোজন কর্মসূচিতে সহায়তা দিতে চায় তাহলে তাদের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচিভিত্তিক জাতীয় কর্মসূচিতে অর্থায়ন করতে হবে।

দ্বিতীয় শিক্ষাটি হচ্ছে, সরকার ও সরকারের বাইরে বিশেষ করে বেসরকারি খাতসহ সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সম্পৃক্ত করা। অর্থাৎ কেবল সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে গোটা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে সরে আসা। প্রকৃত রূপান্তরমূলক যে কোনো পরিবর্তনে অবশ্যই প্রতিটি দেশের সংশ্লিষ্ট সব অংশীদারকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তৃতীয় শিক্ষা হল রূপান্তরমূলক পরিবর্তনের মাত্রা হতে হবে দেশজুড়ে। তা কেবল কোনো ছোট অঞ্চলে বা খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তাই, এসব দেশে শুধু জাতীয় পর্যায়ে রূপান্তরমূলক অভিযোজন অর্জনের চিন্তা-ভাবনা ও পরিকল্পনা করতে হবে। মোটেও খাত পর্যায়ে নয়। ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবাতে অনুষ্ঠিত স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মন্ত্রীদের সাম্প্রতিক বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তনের রূপান্তরমূলক অভিযোজন অর্জন এবং জলবায়ুসহিষ্ণুতা অর্জনের মাধ্যমে এলডিসি অবস্থান থেকে উত্তরণের চেষ্টা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

২০০৮ সালে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (বিসিসিএসএপি) আমরা তৈরি করি। ২০০৯ সালে তা সংশোধিত হয়। বাংলাদেশ প্রথম দেশ যে এটি করেছে। দশ বছর পর এখন এটি জন অংশগ্রহণের ভিত্তিতে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের দ্বারা হালনাগাদ করা প্রয়োজন। এ দলিলের অন্যতম প্রণেতা হিসেবে এটি আমার দাবি। তা হলে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল এবং কর্মপরিকল্পনার একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন দেখতে পাবে। এটির মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো প্রয়োজন। সব জাতীয় পরিকল্পনার মূলধারায় জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দিতে হবে। এতে বাংলাদেশকে জলবায়ুসহিষ্ণু দেশে পরিণত করার জন্য রূপান্তরমূলক অভিযোজন অর্জনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এসডিজিগুলোর সঙ্গে  ডেল্টা প্ল্যান এবং দেশের ৮ম ও ৯ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজনকে সংযুক্ত করে সমগ্র সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন করা দরকার। ব-দ্বীপ পরিকল্পনাটিকেও জনমতের প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

রূপান্তরমূলক অভিযোজন কেমন হতে পারে তার একটি উদাহরণ দেয়া যায়। উপকূলবর্তী জেলাগুলোর লাখ লাখ মানুষকে অনিবার্য স্থানচ্যুতির বিষয়টি বিবেচনা ও প্রস্তুতির জন্য, আমাদের উপকূল থেকে দূরে একডজন শহরে বিনিয়োগ করতে হবে। যাতে এগুলো জলবায়ুসহিষ্ণু এবং অভিবাসী বন্ধুত্বপূর্ণ শহর হয়ে ওঠে। যেখানে কমপক্ষে এক লাখ অভিবাসীকে স্থান দেয়া যায়। উপকূলীয় এলাকার অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দিতে হবে। দক্ষ করে তুলতে হবে, যাতে তারা তাদের পিতা-মাতার মতো কৃষক হওয়া ও মাছ ধরার পরিবর্তে শহরগুলোতে ভালো বেতনে কাজ করতে পারে।

এই কৌশল রাজধানী ঢাকার ওপর চাপ কমাবে। এই মহানগরী আগামী দশকে আরও ১ কোটি জলবায়ু অভিবাসীদের স্থান দিতে পারবে না। এটি বাংলাদেশকে রূপান্তরমূলক অভিযোজনের উদাহরণ হিসেবে আমাদের সব তরুণ ও ভবিষ্যতের নাগরিকদের অভিযোজন সক্ষমতা তৈরির সাফল্য এনে দেবে।

দশ বছর আগে বাংলাদেশ নিজস্ব বাজেটে জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিল গঠন করেছে। এ তহবিল থেকে ইতিমধ্যে তিন হাজার কোটি টাকার উপর নানা জলবায়ু কর্মসূচিতে বরাদ্দও দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও যুক্তরাজ্য ও কয়েকটি দেশসহ উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় জলবায়ু রেসাইলিয়েন্ট ফান্ড তৈরি করেছে। এখন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করার জন্য জাতীয় বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কর্মসূচি নিতে হবে। বরাদ্দ দিতে হবে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জেলাগুলোতে। সবুজ জলবায়ু তহবিল বা গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, অ্যাডাপটেশন ফান্ড, এলডিসি ফান্ড এবং অন্যান্য বৈশ্বিক তহবিলগুলো থেকে অর্থায়ন পাওয়ার জন্য অভিযোজন ও প্রশমন কর্মসূচিগুলো প্রণয়ন ও পরিচালনার জন্য দক্ষতা ও সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি প্রয়োজন। জরুরি ভিত্তিতে শুরু করা প্রয়োজন দ্রুপদী গবেষণা ও জ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ কার্যক্রম। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমফিল ও পিএইচডি কর্মসূচি অতি সত্বর চালু করা দরকার। বাংলাদেশ ২০১৯ সালে এভাবেই তার পরিচিতিমূলক বিবরণ পাল্টাতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ  দেশগুলোর একটি থেকে বাংলাদেশ রূপান্তরমূলক অভিযোজন অর্জনের মাধ্যমে সর্বাধিক সহিষ্ণু দেশে রূপান্তরিত হতে পারে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের মতো বাংলাদেশ তাহলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ অর্জনেও সামনের কাতারের দেশে রূপান্তরিত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে নেতৃত্ব দিতে পারবে। সময় এখন আমাদের। সফল আমাদের হতেই হবে।

লেখক ঃ জাতিসংঘ কিয়োটো প্রোটোকলের যুগ্ম-বাস্তবায়ন সুপারভাইজরি কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান

॥ মোঃ আসলাম হোসেন ॥

মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা এবং কিছু কথা

বর্তমান উন্নত বিশ্ব ব্যবস্থায় একথা অস্বীকার করার উপায়  নেই যে,  মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা একটি উন্নত-সমৃদ্ধ ও সুশিক্ষিত জাতি গঠনের অন্যতম হাতিয়ার। মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে চলা প্রায় অসম্ভব। একটি জাতির শিক্ষিত শ্রেণির জনগণই সেই জাতির জীবনমান উন্নয়নে, দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সবচেয়ে বড় অবদান রাখেন। দেশ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিশ্বের দরবারে নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। জাতিকে স্বপ্ন দেখান, পথ দেখান, সামনে এগিয়ে  নেন। আর তাইতো এই শিক্ষিত-উন্নত জাতি গঠনে মানসম্মত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

এক সময়কার অবহেলিত, শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ স্বাধীনতার মাত্র সাতচল্লিশ বছরে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে উন্নতির শিখরে দ্রুত বেগে ধাবমান। বাংলাদেশের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা আজ সারা বিশ্বকে দারুণভাবে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। তবে আমাদের এই অগ্রযাত্রার পথটি কখনোই মসৃণ ছিলো না। সময়ে সময়ে নানান প্রতিবন্ধকতা ও চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আমরা আজ একটি মর্যাদাজনক অবস্থানে এসে পৌঁছেছি। আমরা পর্যায়ক্রমে  মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি, দারিদ্র্যের হার হ্রাস, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হার কমানো, বাল্যবিবাহ নিরোধ, প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়া  রোধসহ জাতিসংঘ ঘোষিত এমডিজি এর অনেক টার্গেট অর্জনে সক্ষম হয়েছি। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও মানসম্মত করার জন্য সরকার নতুন নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

অপার সম্ভাবনার দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার অগণিত নজির আমাদের সামনে আছে। হেনরি কিসিঞ্জারের সেই তলাবিহীন ঝুড়ির যুগ বহু আগেই পিছনে ফেলে এসেছি আমরা। আমাদের এখন আছে শক্তপোক্ত নিরেট ঝুড়ি। আর তার মধ্যে আছে প্রভূত সব অর্জন। আমরা এখন উন্নয়নের পথে বীর দর্পে হাঁটছি। এখানে আমি অর্থনৈতিক সব অর্জন, মানব-উন্নয়ন সূচকে উন্নতিসহ অন্য সবকিছু বাদ দিয়ে শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নতির কথা বলছি। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, প্রাথমিক শিক্ষায় অর্জনের কথা বলছি। বিগত বছরগুলোতে আমরা প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়ে অনেক অনেক দূর এগিয়েছি। প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করে স্বাধীনতার পরপরই প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করা হয় এবং ১৯৮১ সালে প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন করে দেওয়া হয়। এরপর নব্বইতে এসে জমতিয়েনের সবার জন্য শিক্ষা ঘোষণাকে গ্রহণ করে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি বাড়তে থাকে হু হু করে। দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে যায় শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়ে উপচে পড়ে ছাত্র-ছাত্রী। সারা বিশ্ব অবাক হয়ে  দেখে আমাদের সাফল্য। সংখ্যার বিচারে ভর্তির হার ৯৭% শতাংশ ছাড়িয়েছে বলে মত দিয়েছেন কোন কোন গবেষণা প্রতিষ্ঠান। শতভাগ ভর্তি হয়েছে কোন কোন এলাকায়। এ এক বিস্ময়কর অর্জন। আমরা এক্ষেত্রে জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য ধরে ফেলি সময়ের আগেই। আজকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে  ছেলে-মেয়েকে আর আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। সকলেরই রয়েছে সমান অধিকার। এটুকু করতে যেয়ে আমাদের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হয়েছে যথেষ্ট। প্রতিটি বিদ্যালয়ে ছেলে ও মেয়েদের আলাদা শৌচাগার বানানো হয়েছে। পর্যাপ্ত আসবাবপত্র দেয়া হয়েছে শ্রেণিকক্ষে। সেই সাথে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোরও যথেষ্ট শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে। এখন গ্রামের সবচেয়ে সুন্দর ভবনটি হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন। প্রাকৃতিক দুর্যোগেও প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনটি কোথাও কোথাও হয়ে উঠে দুর্গতদের নির্ভয় আশ্রয়স্থল।

সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, সবার জন্য শিক্ষা এসবই ছিল আমাদের মূল চালিকা শক্তি। তাই প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করা হয়েছে। উপরন্তু আমরা শিক্ষার্থীর পরিবারকে বিশেষ উপবৃত্তি দিচ্ছি। একটা সময় শিক্ষার জন্য খাদ্য কর্মসূচীও চালু ছিল। এই প্রকল্পগুলি বিশ্বে অনুকরণীয়। এর সাথে আমরা প্রতিটি শিশুকে বিনামূল্যে পাঠ্যবই দিচ্ছি। এ বছর সাড়ে তিন কোটিরও  বেশি বিনামূল্যের পাঠ্যবই প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে সরবরাহ করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় আমাদের বিনিয়োগ উত্তরোত্তর বাড়ছে। কারণ গবেষণায় বলে শিক্ষায় বিনিয়োগ পাঁচগুণ সাফল্য আসে। অন্য কোন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ এত বেশি রিটার্ন দিতে পারে না।

এত এত সাফল্যের সাথে কিছু ব্যর্থতাও আমাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে আছে। যে বিষয়টা প্রকট হয়ে ধরা দিচ্ছে তা হলো, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা। আমরা জানি যে, আমাদের অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করায় হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ শিশু বিদ্যালয়ে চলে আসে। আমরা ততটা প্রস্তুত ছিলাম না এই বিরাট কর্মযজ্ঞে। ক্ষেত্র পুরোপুরি প্রস্তুত না করেই বীজ লাগানো হয়েছিল। ফলে আমাদের একটা আশংকা রয়ে গেছে যে ফসল ভালো হচ্ছে না। প্রাথমিক শিক্ষা কাঙ্খিত মানের হচ্ছে না। আমরা এলক্ষ্যেও কাজ করে যাচ্ছি নিরলসভাবে। বেশ অনেকগুলো প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে এজন্যে। শুধুমাত্র শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য নেয়া এসব কারিগরি প্রকল্পগুলো কাজ করছে। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প নামে ধাপে ধাপে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় উন্নয়ন প্রকল্প শেষ হয়েছে। চতুর্থটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রকল্পগুলোর মূল লক্ষ্যই হচ্ছে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা।

বর্তমানে আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এসডিজি এর লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনে সফল হওয়া। সেই লক্ষ্যে বর্তমান সরকার ব্যাপক কাজ করে যাচ্ছে। বিভিন্ন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সরকার কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এসডিজি এর সতেরোটি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে চতর্থটি হলো ‘কোয়ালিটি এডুকেশন বা মানসম্মত শিক্ষা’। ‘মানসম্মত শিক্ষা’ কথাটিকে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। একেক শিক্ষাবিদ একেকভাবে নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা এবং দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে সংজ্ঞায়িত করার  চেষ্টা করেছেন। তবে কোনো একটি নির্দিষ্ট মাপকাঠি দিয়ে এটা নিরূপণ করা ঠিক নয়। কেউ অসম্ভব মেধাবী হলে কিংবা পরীক্ষায় ভালো ফল করলে সে মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছে বলা যায় না। মূলত মানসম্মত শিক্ষা অনেকগুলো বিষয়কে একীভূত করে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে আমরা এখনো কিছুটা পিছিয়ে আছি। তবে সরকার প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছে এক্ষেত্রে দৃশ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করে আরো যুগোপযোগী উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার। আর সামগ্রিক বিবেচনায় এক্ষেত্রে সফল হওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি এবং যা ২০৪১ সালের মধ্যে আমাদের উন্নত দেশ হবার স্বপ্ন পূরণে সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। সরকারের চেষ্টা এবং পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগ ছাড়া এক্ষেত্রে সাফল্য আসা কঠিন।

একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শিখন-শেখানো কার্যাবলী পরিচালিত করেন। শিক্ষক নিয়ম-মাফিক পাঠদান করেন। শিক্ষার্থীগণ সেই পাঠ অনুসরণ করে কাঙ্খিত যোগ্যতাটি অর্জন করে। আর এই যোগ্যতা হচ্ছে জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি। তাই প্রাথমিক শিক্ষায় আমরা যতকিছু বিনিয়োগ করি তার মূল লক্ষ্যই এই যোগ্যতা অর্জন বিষয়টি নিশ্চিত করা। ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের রয়েছে একটি বিশাল প্রাথমিক শিক্ষা পরিবার। প্রায় পাঁচ লক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারী-শিক্ষক এই মহান পেশায় নিয়োজিত। এত বড় একটি পরিবারকে সফলভাবে পরিচালনা করা একটি দূরহ কাজ। মহান শিক্ষকদের পাঠদান কার্যক্রম নিবিড় করা তাই একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ।

শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম কার্যকর ও নিরবচ্ছিন্ন করার জন্য আমাদের সকলের সহযোগিতা বাঞ্ছনীয়। প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের সাথে যারা জড়িত আছেন তাদের মূল দায়িত্বই হবে  শ্রেণিকক্ষে শিখন-শেখানো কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা। জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাগণও এ বিষয়টি নিশ্চিতকরণে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেন। কার্যকর এবং টেকসই শ্রেণি পাঠদানের সকল প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে সহযোগিতা করা তাই সকলের দায়িত্ব এবং কর্তব্য। মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের প্রথম এবং প্রধান পদক্ষেপই হবে শ্রেণি পাঠদান নিশ্চিতকরণ।

মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণে সরকারের গৃহীত উদ্যোগসমূহের পাশাপাশি সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে চালুকৃত মিড ডে মিল কার্যক্রম, আনন্দ পাঠের আসর, মেধা পুরস্কার ও সেরা উপস্থিতি পুরস্কারের প্রচলন, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড শিশুদের বিদ্যালয়ের প্রতি আরও বেশি আকৃষ্ট করে তুলছে। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালুকরণ বিদ্যালয়ে শতভাগ শিক্ষার্থী ভর্তির কার্যক্রমকে অনেকখানি সহজ করেছে। শিক্ষক ও কর্মকর্তাবৃন্দের বিভিন্ন ধরণের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান ও দক্ষতা শিশুর পাঠদান কার্যক্রমকে আনন্দদায়ক ও শিশুর  মেধা বিকাশের প্রক্রিয়াকে অধিক ফলপ্রসু ও ত্বরান্বিত করছে। এছাড়া বিদ্যালয়গুলোতে কাবস্কাউট কার্যক্রম, ক্ষুদে ডাক্তার কার্যক্রম, স্টুডেন্ট কাউন্সিল কার্যক্রম ও স্টুডেন্ট ব্রিগেড কার্যক্রম শিশুদের মাঝে নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা, গণতান্ত্রিক মনোভাব, সমাজ সচেতনতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করছে।

মানসম্মত ও যুগোপযোগী শিক্ষাই জাতির ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে পারে। শিক্ষাই হলো সুষম উন্নয়নের পূর্বশর্ত। শিক্ষাটা যদি মানসম্মত হয় তবে এই উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। আমাদের সামনে সুযোগ এসেছে উন্নত জাতি গঠনের। প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করেই সে লক্ষ্যে এগিয়ে যাব আমরা। দেশমাতৃকার কাছে এটা হোক আমাদের দৃপ্ত অঙ্গীকার।

লেখক ঃ জেলা প্রশাসক, কুষ্টিয়া।

॥ এ কে এম শহীদুল হক ॥

একাদশ সংসদ নির্বাচন জয় পরাজয় ও প্রত্যাশা

অনেক জল্পনা, কল্পনা, উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠার যবনিকাপাত করে ৩০ ডিসেম্বর পার্লামেন্ট নির্বাচন অনেকটা শান্তিপূর্ণভাবে সমাপ্ত হলো। নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে। জনগণ রায় দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের শক্তির পক্ষে, উন্নয়ন-অগ্রগতি ও শান্তির পক্ষে। নির্বাচনের পূর্বে সর্বত্র একই আলোচনা ছিল যে, আওয়ামী সরকার পরিবর্তন হলে দেশে প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু হবে, প্রতিপক্ষের উপর হামলা, অরাজকতা ও আইন শৃঙ্খলার অবনতি এবং খুন খারাপি শুরু হবে। সংখ্যালঘুরা ভীতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল। নির্বাচনে মহাজোট তথা আওয়ামী লীগের বিজয় হওয়ায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও ভীতি কেটে গেছে। নিরাপত্তা বোধ সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর প্রতিপক্ষের কারো উপর কোনো আঘাত হয়েছে এ ধরনের সংবাদ বিশেষ একটা পাওয়া যায়নি। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হয়নি, সর্বত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশ অব্যাহত আছে। এমনকি বিজয়ী দলের সমর্থকরা কোনো ধরনের বিজয় মিছিলও বের করেনি। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট বিজয়ী হয়ে সারাদেশে প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সংখ্যালঘুদের উপর হামলা, বাড়িঘর ভাঙা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ইত্যাদি তান্ডব করে মানুষের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল যা এখনো ক্ষতিগ্রস্তদের মনে হলে গা শিউরে উঠে। কিন্তু এবার তো তা হয়নি। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। ঐ সময়ও আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হয়নি।

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছে। আওয়ামী লীগ ২৫৭টি আসনে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে। পক্ষান্তরে অন্যতম বৃহত্তম দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে নির্বাচন করে ৫টি আসনে জয়লাভ করেছে। ড. কামালের গণফোরাম ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ২ টি, ঐক্য প্রক্রিয়া (ধানের শীষ) ১ টি আসনে জয়লাভ করেছে। মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য ধানের শীষ নিয়ে কোনো আসনেই জয়লাভ করতে পারেনি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৮৮ আসনে জয়লাভ করেছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় প্রত্যাশার থেকে বেশি। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি জরিপ এবং প্রচারণা দেখে অনুমান করা হয়েছিল যে, মহাজোট জয়ী হবে। কিন্তু অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে এত অধিক সংখ্যক আসন আওয়ামী লীগ পাবে তা অনেকেই প্রত্যাশা করেনি। জনগণ রায় দিয়েছে উন্নয়ন ও অগ্রগতির পক্ষে, স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তির বিপক্ষে।

ড. কামালের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক মেরুকরণ হয়েছিল তা দেখে অনেকেই মনে করেছিল, তারা নির্বাচনে বিশেষ একটা অবস্থান তৈরি করতে পারবে। কিন্তু যতই দিন গিয়েছে, জনমনে তাদের সম্বন্ধে ততই নেতিবাচক ধারণা জন্মেছে। ঐক্যফ্রন্টের পরাজয়ের কারণ বহুবিধ। ড. কামাল আন্তর্জাতিক খ্যাতিসমপন্ন আইনজ্ঞ হতে পারেন, কিন্তু তিনি কোনো সফল রাজনীতিবিদ নন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি একবার বঙ্গবন্ধুর ছেড়ে দেওয়া আসন থেকে উপ-নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন। তিনি কোনো বৃহত্ রাজনৈতিক দলের কিংবা কোনো আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন নাই। শুধু মিডিয়াতেই তার তাত্ত্বিক কথাবার্তাই দেশবাসী শুনেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও গণতন্ত্রের কথা বলেন। কিন্তু ধানের শীষের পতাকা তলে জামায়াতের সঙ্গে এক হয়ে নির্বাচন করায় তার আদর্শ ও নীতি-নৈতিকতা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। সচেতন নাগরিকরা তার ভূমিকা ভালোভাবে দেখেনি। তার ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও ক্ষন্ন হয়েছে। স্বাধীনতা বিরোধী এবং ২১ শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের রাজনৈতিক প্লাটফর্মের সঙ্গে  জোট বেঁধে নির্বাচন করায় জনগণের কাছে ড. কামালের গ্রহণযোগ্যতা কমেছে। তাছাড়া তার নেতৃত্বের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

বিএনপি ২০০৮ সালে পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। এ নির্বাচন সেনা সমর্থিত কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি সব সময়ই সেনাবাহিনীকে মাঠে রেখে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। ২০০৮-এর নির্বাচনে বিএনপি ৩০ টি আসনে জয়লাভ করে। আওয়ামী লীগ করে ২৩০ টি আসনে জয়লাভ। ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বয়কট করে এবং নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য তথাকথিত আন্দোলনের নামে তারা বোমা, পেট্রোল বোমা হামলা করে, অগ্নিসংযোগ, সরকারি ও বেসরকারি সম্পদ ধ্বংস করে, স্কুল কলেজ মাদ্রাসা পুড়িয়ে দিয়ে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। ১৬ জন পুলিশসহ নিরীহ লোকদের হত্যা করেছিল। বিএনপি নির্বাচন প্রতিহত করতে পারেনি। কিন্তু আন্দোলনের নামে সন্ত্রাস ও নাশকতামূলক কাজ করে দলকে সন্ত্রাসী হিসেবে যে কালিমা লেপন করেছিল তার প্রায়শ্চিত্ত বিএনপি এখনো করছে।

তাছাড়া বিএনপির নেতৃত্ব সংকট বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া সক্ষমতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিতে পারেন নাই। দুর্নীতি মামলার সাজায় তিনি জেলে যাওয়ার পর নেতৃত্বের সংকট আরও প্রকট হয়। সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি তারেক জিয়াকে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করায় দলটি প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। দলের অভ্যন্তরে নেতৃবৃন্দের মধ্যে অনেক বিষয়েই মতানৈক্য ছিল। সমঝোতার অভাব ছিল। দলটি যথাসময়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতেও ব্যর্থ হয়। দেশি-বিদেশি অনেকের পরামর্শে নির্বাচনে আসার সিদ্ধান্ত নিতে অনেক বিলম্ব করেছে। ফলে মাঠ পর্যায়ে নেতা-কর্মীরা নির্বাচনমুখী হতে পারেনি। প্রাথমিক পর্যায়ে অধিকাংশ আসনে তিন/চার জন করে নমিনেশন দেওয়া হয়। কে চূড়ান্ত নমিনেশন পাবে কেউ তা না জানায় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে পারেননি। ৯ ডিসেম্বর চূড়ান্ত নমিনেশন যারা পেয়েছে তারা প্রচার-প্রচারণা ও অন্যান্য প্রস্তুতিও তেমনভাবে নিতে পারেননি। তাই ঐক্যজোটের প্রার্থীরা প্রচারণায় অনেক কম ছিল। প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে জয়লাভ করতে পারবে এমন অনেক যোগ্য প্রার্থীকে নমিনেশন দেওয়া হয়নি। তা নিয়ে দলের মধ্যে অসন্তোষ ছিল এবং সমর্থকদের বিক্ষোভ প্রতিবাদও হয়েছে। অনেকের মতে বিএনপির ভোটারদের মনোভাব বুঝার জন্য কোনো জরিপও ছিল না। নেতারা অনেকটা মরীচিকার পিছনে ধূম্রজালের মধ্যে ছিল। জামায়াতে ইসলামের নেতাদের নমিনেশন দিয়ে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করার সুযোগ করে দেওয়ায় তরুণ সমাজসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কোনো লোক এটা মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ইতিহাস বিকৃতি ও বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার যে অপচেষ্টা হয়েছিল তা জানতে পেরে বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-যুবকরা স্বাধীনতা বিরোধী ও তাদের দোসরদেরকে পছন্দ করে না, এটাও উপলব্ধি করতে পারেনি বিএনপি তথা ঐক্যজোটের নেতৃবৃন্দ।

পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটানা দশ বছর দেশ শাসন করে দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। খাদ্যে  স্বয়ংসমপূর্ণ, বিদ্যুৎ উত্পাদন ছয়গুণ বেড়েছে। দারিদ্র্যের হার ৪২% থেকে ২২% নামিয়ে এনেছে। বৈদেশিক রিজার্ভ এগার গুণ বেড়ে ৩৪ বিলিয়নে উন্নীত হয়েছে। রাস্তা, মহাসড়ক, ব্রিজ, কালভার্ট, ফ্লাইওভার তথা অবকাঠামো উন্নয়নে বিপ্লব ঘটেছে। সমুদ্র জয়, ভারতের সঙ্গে স্থল সীমানা চুক্তির বাস্তবায়ন এবং আকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উতক্ষেপণ করে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর দূরদর্শিতা ও গতিশীল নেতৃত্বেরও পরিচয় দিয়েছেন। শেখ হাসিনার ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা ও জনপ্রিয়তা তার দলের জনপ্রিয়তাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে। শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা এবং তার সরকারের সাফল্য ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার পর্যালোচনা করলেও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দল হিসেবে মুন্সিয়ানা ও প্রজ্ঞা সহজেই বুঝা যায়। আওয়ামী লীগ তাদের ঘোষিত ২০২১ ও ২০৪১ রূপকল্প এবং ২১০০ সালের ডেল্টা প্লান সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন করেছে যাতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা আছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপির ইশতেহার ততটা সুচিন্তিত ও সুপরিকল্পিত মনে হয়নি। বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট প্রথম থেকেই অনেকটা দায়সারা ভাব নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।

অপরপক্ষে বিএনপির নেতৃত্বের সংকট, সাংগঠনিক দুর্বলতা, আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে ব্যর্থ হওয়া, সিদ্ধান্তহীনতা, জনগণের কল্যাণে কাজ করার ক্ষেত্রে জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম না হওয়া, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সাজা হওয়া, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-র সঙ্গে তারেক জিয়ার মিটিং করার সংবাদ, একের পর এক ফোনালাপ ফাঁস, ইত্যাদি কারণে বিএনপির নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে আসন সংখ্যা বৃদ্ধির কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। বিএনপিকে বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। আত্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিজেদের ভুল ত্র“টি শনাক্ত করে সংগঠনকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে। সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র কখনও মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড়াতে পারে না।

আওয়ামী লীগের বড় বিজয় তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জও বটে। জনগণ আশা-ভরসা নিয়ে আওয়ামী লীগের উপর আস্থা এনেছে। জনগণের এ প্রত্যাশা পূরণ করাই এখন আওয়ামী লীগের প্রধান কাজ হবে। জনগণের প্রতি তাদের দায়িত্ব বেড়ে গেছে। আমার বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা এ বিষয়ে সচেতন আছেন । তার প্রজ্ঞা, আত্মবিশ্বাস, দেশপ্রেম ও জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য দৃঢ় সংকল্প সব চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করে আগামী পাঁচ বছরে দেশকে একটি উন্নত মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবেন। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে এটাই সকলের প্রত্যাশা।

লেখক  ঃ সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ

॥ অজয় দাশগুপ্ত ॥

অসাধারণ মানুষদের সাধারণ চাওয়া পূর্ণ হবে কি?

নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা যে দুয়েকটা খারাপ ঘটনার খবর পাচ্ছি তাতে উদ্বেগের কারণ আছে। সবাই জানেন ঐক্যফ্রন্টের পরাজয়ের মূল কারণ মানুষের ভীতি। মানুষ বলতে আমরা যদি সাধারণ বিবেকবোধসম্পন্ন মানুষদের বুঝি তাহলে সবাই ছিল ভয়ে ভয়ে। আমার পরিচিত কট্টর বিএনপি সমর্থকদের মনেও সে ভয় ছিল।

তাদের ভোট ধানের শীষে গেলেও তারা নিশ্চিত ছিল না, কি হতে পারে? দুটো কারণে এই ভয় অমূলক কিছু না। প্রথম কারণ নেতৃত্বের গভীর সংকট। কে হবেন প্রধানমন্ত্রী বা কারা আসবেন সামনে তা নিয়ে ছিল গভীর সংশয়। পরের কারণ লন্ডনের যুবরাজ বা তারেক জিয়া।

এখন অবধি সবাই বলছেন তারেক জিয়ার গোঁয়ার্তুমি আর জেদের কারণেই সর্বনাশ। পলাতক তারেক সেখানে থেকে যা করছে তার নাম প্রতিহিংসা। হিংসা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি মানুষ আর চায় না। তাদের সমানে যে নতুন ভবিষ্যতের হাতছানি সেখান থেকে সরে আসতে না চাওয়াই ছিল মূল ভীতি।

আওয়ামী লীগের কারণে যতটা তারচেয়ে বেশি শেখ হাসিনার কারণেই এই বিজয়। দেশে-বিদেশে বাঙালির আস্থা ও ভরসার প্রতীক তিনি। কষ্ট ত্যাগ আর পরিশ্রমে উঠে আসা জননেত্রীকে মানুষ ভোট দিয়েছে। দেশের তাবৎ বুদ্ধিজীবী সাংস্কৃতিক কর্মী নায়ক গায়ক অভিনেতা খেলোয়াড় কেউ বাদ যায়নি। তাদের মনেও ভয় ছিল।

বিএনপি যদি আবার আসতে পারত তবে কত মানুষ জান হারাত, কত নারী ধর্ষিত হতো আর কত মানুষ দেশান্তরী হতো বলা মুশকিল। এই ভয় তাড়াতে যে ভোট বা সমর্থন তার মানুষরাই যদি ধর্ষণে আগ্রহী হয় ও সংখ্যালঘু নারীদের টার্গেট করে তো আমরা কি ধরে নেব? নোয়াখালীর সুবর্ণচরের ঘটনায় প্রমাণ হয়েছে সরকারি দলেও ঘাপটি মেরে আছে ঘাতক ধর্ষক আর চাটুকারের দল। যতদিন যাবে এবার তারা তত বেপরোয়া হবে।

সরকারের সামনের দিন সহজ কিছু না। মনে রাখতে হবে জনপ্রিয়তার ব্যারোমিটার যাই হোক নির্বাচন ও ফলাফল প্রশ্নহীন নয়। বরং যারা দেশের ভেতর আছেন তারা ভালো জানেন প্রবল সমর্থন বা নীরব সম্মতির পরও অতিউৎসাহীরা অনেক কাজ করে ফেলেছে যার দরকার ছিল না। তাই সাবধানতার মার নেই।

মন্ত্রিসভা থেকে সমাজ সর্বত্র এখন মানুষ জবাবদিহি চাইবে। এ জাতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা একদিকে যেমন শক্তি আরেক দিকে দায়িত্ব ও ঝুঁকি তৈরি করে। ঝুঁকি এ কারণে সুগঠিত শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে গণতন্ত্র এগুতে পারে না। এটা অনেকটা এক চাকার সাইকেলের মতো। যা সার্কাসে ভালো মানায় কিন্তু রাস্তায় বা চলার পথে দুচাকার সাইকেল উত্তম।

এই সত্য মানতে হবে সরকারি দলকে। তাদের নেতাদের অনেকেই প্রগলভ। এই যে দেখলাম কখন মন্ত্রিসভা হবে, কখন শপথ হবে এসব নিয়ে মহাজোটের জাসদ নেতা আগ বাড়িয়ে কথা বলছেন। এটা কি তার দায়িত্বের ভেতর পড়ে? নৌকার আসল মাঝিমাল্লাদের চাইতে অন্যরা বড় হয়ে উঠলে নৌকা ভাসছে বটে কোথায় যাবে বলা দুরূহ।

আওয়ামী লীগে শুধু না দেশের কোনো দলেই আদর্শ নেই। থাকলেও তা টিমটিমে। বেশকিছু মৌলিক বিষয়ে ভোট হয় বা দিতে হয় বলে মানুষ একদিকে ঝুঁকে পড়ে। তা না হলে পার্থক্য আসলে খুব বেশি নেই। এই তফাৎ ঘুচে যাওয়ার কারণে আওয়ামী লীগের নাম ভাঙানো বা তাদের দলের সঙ্গে থাকা ধর্ষকের আসল চেহারা দেখতে পাওয়া যায়।

মনে রাখতে হবে রিজার্ভ ফান্ডের ডলারের হিসাব এখনো মেলেনি। ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ লুণ্ঠনের ব্যাপারেও জবাবদিহি আসেনি। যেসব নারী-পুরুষ নানা কারণে হত্যা গুম বা অপরাধের শিকার তাদের সবগুলোর বিচারও হয়নি। তবু মানুষ আশা রাখে। যে সরকার প্রধান দেশের দুশমন মাটি ও জাতিবিরোধী শক্তিকে সাইজ করতে ভয় পায় না। তাদের চূড়ান্ত শাস্তি দিয়ে ইতিহাসকে কলঙ্কমুক্ত করে তার প্রতি বিশ্বাস আছে বলেই এখনো তারা ধৈর্য ধারণ করে থাকে।

আর একটা কথা বলাই বাহুল্য, এত কিছুর পর আর কি পাওয়ার আছে সরকারি দলের? তিনবার দেশ শাসনের অধিকার পাওয়া নেতারা কত আর ব্যক্তিস্বার্থ বা ভোগবাদী হবেন? এবার তাদের দেয়ার পালা। সে দেয়াটা যেন কথার কথা না হয়। লোক দেখানো বা মনভোলানো কথায় কাজ হবে না।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের পথে। বড় বড় দালান ভাড়া নিবে বিশ্ববিদ্যালয় খুললে লেখাপড়া এগোয় না। অলিতে গলিতে ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল বা ফলাফল বের হওয়ার পর মন্ত্রীর বিগলিত চেহারা কিংবা আঙুল উঁচানো বাচ্চাদের মুখে আনন্দ আছে আশা নেই। একেবারে গোড়া থেকে মাথা অবধি এক ভয়াবহ অসহায়ত্ব আছে এই সেক্টরে।

খোল নলচে পাল্টে দিয়ে কায়মনে দেশপ্রেমী ও আন্তর্জাতিক হওয়ার পাঠ না থাকলে আর যাই হোক সমাজের অন্ধত্ব যাবে না। শেখ হাসিনার কাছে আমাদের প্রত্যাশা তিনি এবার এই দিকটায় চোখ দেবেন। আগামী প্রজন্মে ইতিহাস বিষয়ে অজ্ঞতা দেশ ও জাতি বিষয়ে অস্বচ্ছ ধারণা আর কূপমন্ডুকতা রেখে ভালো জাতি গঠন অসম্ভব। ধর্মীয় পাঠের আধুনিকায়নসহ কারিগরি ও বিজ্ঞান পড়াশোনা কীভাবে আরো ব্যাপক করা যায় সে চ্যালেঞ্জ নিতে হবে।

একটা সাধুবাদ তারা ইতোমধ্যে পাওয়ার মতো কাজ করেছেন। নির্বাচনে বিজয় নিয়ে অতিউৎসাহীদের রাস্তা দখল করতে দেননি। এগুলো বন্ধ করা দরকার। জনমনে অসন্তোষ আর ধূমায়িত ক্রোধ জাগিয়ে এসব কাজ করা আত্মঘাতী। চাটুকার স্তাবক আর মোসাহেবদের সংখ্যা বাড়বেই। বিশেষত দেশের বাইরে থাকা এক শ্রেণির বাঙালি জননেত্রীর ভাষায় রাজনৈতিক দোকান খুলে শাখা খুলে কি চায় সেটা দলের নেতাদের বুঝতে হবে।

দেশের বাইরে যেমন সহাবস্থান আর ঐক্য জরুরি তেমনি দেশের ভেতরও চাই সমঝোতা। বিজয়ী ও বিজিতের ভাষা বা ব্যবহার এক হতে পারে না। বিজিতের জন্য সমবেদনার পাশপাশি ভরসাও থাকতে হবে। যা করতে পারেনি করতে চায়নি বলে এরশাদ থেকে বিএনপি আজ হয় মাজা ভাঙা নয়তো অসহায়। আওয়ামী লীগের এখনো মূলশক্তি তৃণমূল। সেখানে যারা অবহেলিত তাদের দিকে ফিরে তাকানোর রাজনীতি শুরুহোক।

এবারের নির্বাচনে জিতে আসা মাশরাফি মাহী বা তন্ময়দের মতো তরুণরা আসুক পাদপ্রদীপের আলোয়। তাদের নতুন রক্ত নতুন ভাবনা নতুন চিন্তার ঝিলিক লাগুক অচলায়তনে। বাংলাদেশের সৌভাগ্য যেমন শেখ হাসিনার নেতৃত্ব তেমনি দুর্ভাগ্য তার আশপাশের স্বার্থপর নেতাদের কর্মকান্ড। এবার তার অবসান চায় জাতি। এই সে দিনও রাজনীতির প্রতি মানুষের ছিল গভীর আস্থা। ছিল ভরসা। নেতারা ছিলেন পাঞ্জাবি পায়জামা লুঙ্গি বা সহজ পোশাকের সাধারণ মানুষ।

কোনো মাদক ব্যবসায়ী, কোনো কোটিপতি বা হঠাৎ গজানো মানুষ রাজনীতিতে আসতে পারত না। সাইকেল চেপে মৃদু মৃদু ঘণ্টা বাজিয়ে আসা সেসব নেতার ঝোলায় থলিতে থাকত বই। থাকত দল বা আদর্শের পুস্তিকা। সে দিনগুলো আজ ধূসর। চাকচিক্য আর হঠাৎ টাকার ঝাঁঝালো আলোয় ম্লান হয়ে গেছে আদর্শের আকাশ। বঙ্গবন্ধু কন্যার কাছে একটাই চাওয়া আপনি সব সময় বলেন আপনার চাওয়ার কিছু নেই। অনেক হারিয়েছেন আপনি। হারানোরও ভয় নেই আপনার।

এবার বাংলাদেশকে এমন একটি সরকার উপহার দিন যার ভেতরে-বাইরে আদর্শ আর জবাবদিহি। যার কারণে সামাজিক ঐক্য আর দেশজ ভালোবাসায় দেশ হয়ে উঠবে শান্তিময়। এর বাইরে সাধারণ মানুষের আর কি চাওয়ার আছে? তারা নামে সাধারণ হলেও আসলে অসাধারণ। তারাই এই দেশকে ধরে আছে। আপদে-বিপদে সুখে-অসুখে তাদের আস্থা আর ভালোবাসাই আপনার শক্তি। তাদের জয়েই সবার জয়।

অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক।

॥ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ॥

সাম্প্রদায়িকতা কি ও কেন

সাম্প্রদায়িকতা কি সে তো আমরা অবশ্যই জানি। দেখিও। আমরা ভুক্তভোগীও বটে। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার কারণে আমাদের এই দেশে দাঙ্গা হয়েছে। দাঙ্গার পরিণতিতে এক সময়ে অবিভক্ত বঙ্গ দ্বিখন্ডিত হয়ে গেছে, এক খন্ড যুক্ত হয়েছে পাকিস্তানের সঙ্গে অন্য খন্ড ভারতের। কিন্তু তারপরও দাঙ্গা থেমেছে কি? দুই বঙ্গের কোনো বঙ্গেই থামেনি।

সাম্প্রদায়িকতারও অবসান হয়নি। শেষ পর্যন্ত ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বন্ধন ছিন্ন করে আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। তারপরও সাম্প্রদায়িকতার অবসান ঘটেছে কি?

না, ঘটেনি। কেবল যে মানসিক সাম্প্রদায়িকতা রয়ে গেছে তা নয়, সাম্প্রদায়িক নির্যাতনও ঘটেছে। গত ২০০১-এর সাধারণ নির্বাচনের পর সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর বহু স্থানে নানারকম নিপীড়নের খবর আমাদের লজ্জিত করেছে। সম্পত্তি দখল, নারী ধর্ষণ সবকিছুই ঘটেছে। কাজেই সাম্প্রদায়িকতা জিনিসটা যে কেমন নির্মম, কদর্য ও ক্ষতিকারক সেটা আমরা অবশ্যই জানি। না জানার কারণ নেই। সাম্প্রদায়িকতাকে চিনিও বটে। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে যে কি তা সব সময়ে খেয়াল করি না। কেন ঘটছে তাও বুঝি না। আমরা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার কথাই বলছি। এই সাম্প্রদায়িকতার কারণে দুটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর মানুষ পরস্পরকে ঘৃণা করে। ঘৃণা পারস্পরিক সংঘর্ষেরও জন্ম দেয়। রক্তপাত ঘটে। আমাদের দেশে যেমনটা ঘটেছে।

কিন্তু আমাদের দেশে তো বিভিন্ন ধর্মের মানুষ যুগ যুগ ধরে একত্রে বসবাস করেও এসেছে। হিন্দু কৃষক ও মুসলমান কৃষকের মধ্যে সংঘর্ষ বাধেনি। তার একে অপরকে উৎখাত করতে চায়নি। নদীতে হিন্দু জেলে ও মুসলমান জেলে এক সঙ্গে মাছ ধরেছে। তাঁতিরা তাঁত বুনেছে। সাধারণ মানুষ একে অপরের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছে। মন্দিরের ঘণ্টা ধ্বনি ও মসজিদের আজান এক সঙ্গে মিশে গেছে। মানুষ একই পথ ধরে হেঁটেছে, একই বাজার হাটে গিয়ে কেনাবেচা করেছে, থেকেছে একই আকাশের নিচে। কে হিন্দু কে মুসলমান তা নিয়ে খোঁজাখুঁজি করেনি, নাক সিঁটকায়নি। তাহলে? সাম্প্রদায়িকতা তৈরি করল কারা? তৈরি হলো কি ভাবে? কেন?

শুধু করল দুদিকের দুই মধ্যবিত্ত- হিন্দু মধ্যবিত্ত এবং মুসলিম মধ্যবিত্ত। ব্রিটিশ যুগেই এ ঘটনার সূচনা। তার আগে সম্প্রদায় ছিল, কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা ছিল না। ব্রিটিশ আমলে হিন্দু মধ্যবিত্ত শিক্ষায় ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠায় উঠতি মুসলিম মধ্যবিত্তের তুলনায় অন্তত পঞ্চাশ বছর এগিয়ে ছিল। মুসলিম মধ্যবিত্ত দেখল জায়গা তেমন খোলা নেই, অন্যরা দখল করে নিয়েছে। শুরু হলো দুপক্ষের প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা। যারা দখল করে রেখেছে তারা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক। শাসক ব্রিটিশরা এ ব্যাপারে দুপক্ষকেই উস্কানি দিল যাতে তাদের রেষারেষিটা আরো বাড়ে। বাড়লে ব্রিটিশের সুবিধা, কেন না ঝগড়াটা তখন শাসক-শাসিতের থাকবে না, হয়ে দাঁড়াবে হিন্দু-মুসলমানের।

ব্রিটিশ আমলে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম হয়েছে। কিন্তু সেই সংগ্রামে হিন্দু ও মুসলিম ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারেনি, পারেনি ওই সাম্প্রদায়িক বিরোধের কারণে। অবিভক্ত বঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে দুই সম্প্রদায়কে কাছে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। চিত্তরঞ্জন দাশ কিছুটা এগিয়েছিলেন। তাঁর উদ্যোগে দুই সম্প্রদায়ের নেতাদের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যাতে চাকরির সুযোগ-সুবিধা অর্ধেক অর্ধেক ভাগাভাগিতে তাঁরা সম্মত হন।

এই চুক্তি তৈরি হয় ১৯২৩-এ, এর দুবছর পর চিত্তরঞ্জন পরলোক গমন করেন এবং বলাই বাহুল্য ওই চুক্তি মোটেই বাস্তবায়িত হয়নি, বরঞ্চ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে, একের পর এক দাঙ্গা ঘটেছে এবং শেষ পর্যন্ত বাংলা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। মূল কারণ দুই মধ্যবিত্তের দ্বন্দ্ব, যাতে ব্রিটিশের উস্কানি খুব কাজে দিয়েছে। সাম্প্রদায়িকতা ওপর থেকে নিচে নেমেছে। নিচ থেকে ওপরে ওঠেনি।

চিত্তরঞ্জনের মৃত্যুর পর বাংলায় সর্বভারতীয় রাজনীতির অবাধ প্রবেশ ঘটে। ভারতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয়েই অত্যন্ত তৎপর হয়ে ওঠে। কংগ্রেস নিজেকে অসাম্প্রদায়িক বলত, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে  সেটি ছিল হিন্দু-প্রধান প্রতিষ্ঠান। গান্ধী নিজে অত্যন্ত অসাম্প্রদায়িক ছিলেন, কিন্তু তিনি ধর্ম ও রাজনীতিকে আলাদা করতে চাননি, ফলে ধর্মীয় ধ্বনি তুলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধির কাজটা মোটেই বাধাপ্রাপ্ত হয়নি। কংগ্রেসে কট্টর সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন লোকেরা ছিল এবং তারাই শেষ পর্যন্ত মূল শক্তি হয়ে ওঠে, পরে তারা গান্ধীকে পর্যন্ত হত্যা করে।

ওদিকে মুসলিম লীগ তো মুসলিমদের প্রতিষ্ঠান হিসেবেই গড়ে উঠেছে, তার নেতা জিন্নাহ দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে, অর্থাৎ ভারতে হিন্দু ও মুসলমান দুটি ভিন্ন ভিন্ন জাতি এই মতবাদের ওপর তাঁর রাজনীতিকে দাঁড় করিয়েছিলেন। কংগ্রেস ও লীগ উভয়ের রাজনীতিই হয়ে দাঁড়াল সাম্প্রদায়িক রাজনীতি।

ভারতবর্ষ ভাঙল, বাংলাও দুটুকরো হলো, মূল কারণ ওই সাম্প্রদায়িক বিরোধ এবং সেই সঙ্গে ব্রিটিশের উস্কানি। কিন্তু তারপরও সাম্প্রদায়িকতার অবসান ঘটল না। অবসান হবে বলে অনেকে আশা করেছিলেন। কেননা ভারত হয়ে দাঁড়াল হিন্দুপ্রধান এবং পাকিস্তান মুসলিমপ্রধান। দুই রাষ্ট্রে দুই সম্প্রদায়ের প্রাধান্য এমন প্রবল যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যে সংখ্যাগুরুর সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত হবে এটা মোটেই সম্ভব ছিল না।

অর্থাৎ সাম্প্রদায়িকতার পূর্বতন যে ভিত্তি ছিল সেটা আর রইল না। দ্বন্দ্বের শেষ হলো। কিন্তু তবু যে সাম্প্রায়িকতা শেষ হয়ে গেল না তার কারণ কি? কারণটা হলো বৈষয়িক লালসা। আরো স্পষ্ট করে বললে সম্পত্তির লোভ। সম্পত্তি বলতে এ ক্ষেত্রে জমি, বাড়িঘর, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি, সুযোগ-সুবিধা সব কিছুই বোঝাবে। সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের লোকেরা সংখ্যালঘুদের উৎখাত করে তাদের সম্পত্তি দখল করতে তৎপর হয়ে উঠল। আসলে এ হচ্ছে দুর্বলের ওপর প্রবলের অত্যাচার। প্রবল অর্থাৎ সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়ের লোকেরা, দুর্বলের অর্থাৎ সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়ের সম্পত্তি কেড়ে নিতে থাকল। ব্যাপারটি ছিল লুণ্ঠন, কিন্তু তার ওপর একটা আচ্ছাদন দেয়া হলো, সেটা ধর্মীয়। ধর্মীয় আচ্ছাদনে দুটো সুবিধা। এক. এতে লুটপাটের ব্যাপারটাকে পবিত্র কর্তব্য বলে সাজানো যায়। দুই. ধর্মের জিকির তুললে মানুষের মধ্যে উন্মাদনাও তৈরি করা সম্ভব হয়।

পাকিস্তান রাষ্ট্রকে আমরা মানিনি। আমরা তার জিঞ্জির ছিঁড়ে বের হয়ে এসেছি। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। দ্বিজাতিতত্ত্ব পরিত্যক্ত হয়েছে। ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের জায়গায় এসেছে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। কিন্তু তবু সাম্প্রদায়িকতা শেষ হয়নি। না হওয়ার কারণ অন্যকিছু নয়, ওই যে সম্পত্তি দখল করা সেটাই। সংখ্যালঘু হিন্দুরা এখানে দুর্বল, সংখ্যাগুরু মুসলমানরা তাই তাদের সম্পত্তি কব্জা করতে তৎপর। কেবল যে হিন্দু সম্পত্তি লুণ্ঠিত হচ্ছে তা নয়, মুসলমানদের সম্পত্তিও চলে যাচ্ছে ধনীদের হাতে। কিন্তু হিন্দুদের সম্পত্তি বিশেষভাবে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। প্রথমত. অধিকাংশ হিন্দুই দরিদ্র; দুই. তারা আবার সংখ্যায় কম। তিন. তাদের সম্পত্তি দখল করার সময় ধর্মকে ব্যবহার করা যায়।

সাম্প্রদায়িকতা তাই ধর্মের ব্যাপার নয়, ধর্মব্যবসায়ীদের ব্যাপার বটে। ধর্মব্যবসায়ীরা ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল এবং বর্তমান আমলেও ধর্মকে ব্যবহার করে লুণ্ঠনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে অবাধে। যে জন্য সাম্প্রদায়িকতার অবসান ঘটছে না।

সাম্প্রদায়িকতার ব্যাপারটা বোঝা গেল। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এর প্রতিকার কী? প্রতিকার খোঁজার আগে রাষ্ট্রের ভূমিকাটার দিকে তাকানো দরকার। ব্রিটিশ আমলে রাষ্ট্র সাম্প্রদায়িক বিরোধকে উস্কানি দিয়েছে। পাকিস্তানের কালে রাষ্ট্র হিন্দুদের শক্র বলে বিবেচনা করতে চেয়েছে এবং স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রও যে ধর্মনিরপেক্ষ তা বলা যাবে না। এ রাষ্ট্রের পক্ষে ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার কথা ছিল। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবেই এর অভ্যুদয় ঘটেছে। কিন্তু সংবিধানে এখন ধর্মনিরপেক্ষতা আর নেই।

আমেরিকানরা আমাদের রাষ্ট্রকে মুসলিম রাষ্ট্র বলছে, আমরা প্রতিবাদ করছি না। বলছি না যে আমাদের রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক। এখানে সব নাগরিকের রয়েছে সমান অধিকার। আমরা প্রতিবাদ করছি না কথাটার অর্থ হলো আমাদের যারা শাসন করে তারা প্রতিবাদ করছে না। বড় দুই দলের কেউই এ ব্যাপারে উৎসাহী নয়, সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে কোনো দলেরই উদ্যোগ নেই, বরঞ্চ উভয় দলই ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে। আর তারাই হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে আমাদের মুখপাত্র।

সংখ্যালঘুরা নিরাপদ বোধ করে না। নীরবে তাদের দেশত্যাগ যে ঘটছে এটা মিথ্যা নয়। আমাদের রাষ্ট্রে বলতে গেলে কোনো নাগরিকেরই জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নেই। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ বিশেষভাবে বিপন্ন। মূল কারণ হলো রাষ্ট্রের চরিত্র। যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, যার জন্য সংগ্রাম করেছি, সেই রাষ্ট্র আমরা পাইনি। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এখানে মানুষে মানুষে বৈষম্য রয়েছে। ধনী-দরিদ্র বৈষম্যই প্রধান, সেই সঙ্গে নারী-পুরুষের বৈষম্যও স্পষ্ট এবং সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুর মধ্যকার পুরাতন  বৈষম্য  শেষ হয়ে যায়নি।

রাষ্ট্রকে তাই গণতান্ত্রিক করা চাই। শ্রেণি, ধর্ম, নারী-পুরুষ, জাতিসত্তা নির্বিশেষে সব মানুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা দরকার। তা না হলে শোষণ, লুণ্ঠন, সাম্প্রদায়িকতা, জাতিসত্তার নিপীড়ন কোনো ব্যাধিরই শেষ হবে না। আমরা ভুগতে থাকব এবং ভুগতে ভুগতে কেবলি দুর্বল হবো। কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্রে কাঙ্খিত পরিবর্তনটা কীভাবে আসবে? নির্বাচনের মধ্য দিয়ে? সে সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কেননা নির্বাচনে বড় দুই দলের একটি কিংবা অপরটি ক্ষমতায় আসবে। তারা রাষ্ট্রের চরিত্রে বদল আনতে চাইবে না, চাইবে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে অক্ষুন্ন রেখে লুণ্ঠন করতে। সে জন্য যারা দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক তাদেরই কর্তব্য হবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করা। আন্দোলন ছাড়া মুক্তির অন্য কোনো উপায় নেই।

এ ব্যাপারটা আমাদের বুঝতে হবে। আমরা সামরিক শাসন দেখেছি, নির্বাচনও দেখেছি এবং দেখব। সামরিক সরকার অবৈধ, নির্বাচিত সরকার  বৈধ। কিন্তু বৈধ-অবৈধ যে সরকারই ক্ষমতায় আসে দুর্বল মানুষের ভাগ্যে পরিবর্তন আসে না। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একদল ক্ষমতায় যায়, আরেক দল ক্ষমতা ছাড়ে। কিন্তু দুর্বলের ভাগ্য প্রসন্ন হয় না। তাই সাধারণ মানুষের স্বার্থ যারা দেখবে তাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অবস্থা এই কথাই বলছে।

লেখক ঃ ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

॥ এ কে এম শাহনাওয়াজ ॥

ভোটারের লক্ষ্য স্থির করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে

নির্বাচন এখন দোরগোড়ায়। জাতীয় নির্বাচনে ভোটারের নানা রকমফের থাকে। যারা দল অন্তঃপ্রাণ, তারা দলের মার্কায় কলাগাছ দাঁড়ালেও সেদিকে তাকান না। তাকান মার্কার দিকে। সেখানেই ছাপ মারেন। যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, তাহলে এসব ভোট দিয়ে চূড়ান্ত জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় না।

কোনো দলের প্রতি মোহগ্রস্ত নয়, তবে আদর্শ ও ঐতিহ্যের বিচারে কোনো কোনো দলকে একশ্রেণীর ভোটার ভোট প্রদান করেন। অমন দল কিছুটা এগিয়ে থাকে। প্রাচীনত্বের বিচারে ঐতিহ্যিক না হলে নতুন কোনো দল যে ভোটারের আস্থা অর্জন করতে পারে না, এমন নয়।

কতটা সততা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে দল নিজেকে উপস্থাপন করেছে, সেটিই বড় কথা। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের প্রথম প্রাদেশিক নির্বাচনের সময় শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের কৃষক-শ্রমিক পার্টি (কেএসপি) তো নবীন দল ছিল। তবুও বাংলার কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের ভালোবাসা পেয়ে অল্প সময়েই জনপ্রিয় দলে পরিণত হয়েছিল কেএসপি।

আবার ঐতিহ্যবাহী দলও নিজ আচরণে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে নিমিষেই অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে। এভাবে দীর্ঘ ঐতিহ্যে লালিত জনপ্রিয় মুসলিম লীগের পতন আমাদের দেখতে হয়েছে।

তবে বর্তমান সময়ের রাজনীতিতে অধিক জনসংখ্যার বাংলাদেশে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার পর একটি বড় সংখ্যক নবীন ভোটার যুক্ত হয়েছে। এ নবীনরা বয়সের ধর্ম অনুযায়ী স্বার্থবাজ আর দলবাজ বড়দের মতো দলীয় বলয়ে আটকে যায় না বলে মুক্তচিন্তায় ভোট দেয়।

যে দলের আদর্শ আর নির্বাচনী ইশতেহার আকৃষ্ট করে এবং নিজেদের স্বপ্নপূরণের অঙ্গীকার দেখতে পায়, সেদিকে ঝুঁকে পড়ে। এ ভোটাররাই হল জয়-পরাজয়ের আসল নির্ধারক।

আমরা ২০০৮-এর নির্বাচনের কথা মনে করতে পারি। আওয়ামী লীগের দিন বদলের কথা, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্র“তি আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অঙ্গীকার নতুন ভোটারদের আকৃষ্ট করেছিল। অন্যদিকে বিএনপির ইশতেহার ছিল অনেকটাই গতানুগতিক।

উপরন্তু যুদ্ধাপরাধীদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা নির্বাচনের মাঠে ছিল। এর সঙ্গে ছিল সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ। তাই নতুন ভোটারদের পাশাপাশি নারী ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট কেন্দ্রে এসেছিল। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার তাদেরও আকৃষ্ট করেছিল। এ কারণে নেতাদের ধারণার চেয়েও বেশি ভোট ও আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছিল আওয়ামী লীগ।

এবারও নতুন ভোটাররা একই ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। কিন্তু এ শক্তিকে নিজেদের আস্থায় রাখার জন্য তেমন পরিকল্পনা কি বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো নিতে পেরেছে? বড় দলগুলো মার্কা দিয়ে নিজেদের পরিচিত করাতে এতটাই ব্যস্ত যে, মার্কা তরুণ ভোটারদের জন্য কতটা জরুরি; তা বিবেচনা করছে না।

পরিচয়ের তিলক হিসেবে মার্কা তো লাগবেই। এর চেয়ে বেশি প্রয়োজন মার্কাধারীর পরিচয়। প্রথমবার ভোট দিতে গিয়ে এ নবীন ভোটারের বড় অংশ কিন্তু তার প্রার্থীকে বিচার করবে। রাজনীতি অঞ্চলের মানুষরা এ সত্যটিকে মানতে চান না যে, মার্কা দেখে অন্ধের মতো সবাই এখন আর ভোট দেয় না; নবীন ভোটাররা তো নয়ই।

এ সত্যটি অনেক ভোটারকে পীড়া দেয় যে, বড় দলগুলোর সামনের সারির ব্যক্তি পূজারি নেতাদের দাপটে দলের ত্যাগী নেতারা নিজ দলে যোগ্য জায়গা পাননি বহুদিন। দলের ভেতর ‘গণতন্ত্র চর্চার’ পরিবেশ থাকে না বলে দলীয় কর্মীদের ভোটাধিকারের সুযোগও থাকে না। তাই সুবিধাবাদী আর সুবিধাভোগীরাই দাপটে নিয়ন্ত্রণ করে দল। এ কারণে আমাদের বড় দলগুলো জনগণের মনোরঞ্জনের বদলে ক্ষমতার লক্ষে পৌঁছার জন্য নানা কূটকৌশল গ্রহণে সিদ্ধহস্ত হন বেশি।

ক্ষমতা দখলের জন্য তথাকথিত নির্বাচনের বৈতরণী পাড়ি দিতে টাকার খেলা একটি বড় জায়গা করে নেয়। আর একে ঘিরেই দলীয় দুর্নীতি বিস্তার লাভ করে; নির্বাচনী খেলা খেলতে বিশাল বাজেট করতে হয়। আর সে অর্থ সংগ্রহের জন্য হাঁটতে হয় ঘাট-আঘাটায়। ফখরুদ্দিন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুদকের অভিযোগে প্রকাশিত বড় নেতানেত্রীদের অপ্রদর্শিত বিশাল আয় তো অনেক ক্ষেত্রে দলীয় ফান্ড তৈরিরই কার্যক্রম ছিল।

এভাবেই প্রকৃত রাজনীতিবিদদের বদলে বণিক আর আমলারা মনোনয়ন পেয়ে থাকেন। একই কারণে পেশিশক্তির মর্যাদা বৃদ্ধি পেতে থাকে দলে। পাঁচমিশালি হয়ে যেতে থাকে দল। এমপি হয়ে যাওয়া বণিক রাজনীতিকদের অনেকেই সংসদ আলোকিত না করে সুদে-আসলে নির্বাচনী ব্যয় আর দলীয় চাঁদা উশুল করতে ব্যক্তিগত বাণিজ্য এবং তদবির বাণিজ্যে ব্যস্ত থাকেন।

বড় মুনাফার দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন তারা। জনগণের জন্য আইন প্রণয়নের ভূমিকা রাখার সময় কোথায় তাদের! এমপির রাবার স্ট্যাম্পটি বাণিজ্যের পুঁজি হিসেবে অনেক যতেœ তুলে রাখেন স্যুটের পকেটে। প্রশাসনিক কূটকৌশল আর দুর্নীতির মারপ্যাঁচ জানা আমলা এমপির অনেকে নিজ প্রতিভা প্রয়োগ করেন দলে ও এমপি হিসেবে ব্যক্তিগত জীবনে।

নির্বাচন সমাগত। কিন্তু শহর থেকে গ্রাম- কোথাও তেমন উৎসবের আমেজ নেই। সব দলের স্লোগানে জনপদগুলো মুখরিত হতে দেখছি না। জানিনা, এ অসুস্থ বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত শাসক দলকে স্বস্তি দেবে কিনা! মানুষের প্রত্যাশা ছিল দলগুলো ঘোষণা দেবে এখন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সবসময় নির্বাচনী এলাকার মানুষ কাছে থেকে দেখতে পাবে।

তাদের কাছে পৌঁছতে চেলা-চামুন্ডার কাছে ধরনা দিতে হবে না। সংসদ সদস্যরা এখন থেকে পদবি আর ক্ষমতা দিয়ে বিত্ত বানানোর যন্ত্র তৈরি না করে নিজেদের সমাজকল্যাণের কর্মী হিসেবে আত্মনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেবেন। তারা প্রতিশ্র“তি দেবেন প্রভাব প্রয়োগ করে এখন থেকে স্থানীয় শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতর ‘কূটরাজনীতি’ প্রবেশ করিয়ে পরিবেশ বিষময় করে তুলবেন না।

তিক্ত অভিজ্ঞতার পথ মাড়িয়ে মানুষ এমন আশাও করেছিল, দলগুলো থেকে ঘোষণা আসবে- তারা আর কোনো ছুতোনাতায় সংসদ অকার্যকর করবেন না; বিরোধী দলে থাকলেই সংসদ লাগাতার বর্জনের উৎসবে মেতে উঠবেন না। সংসদীয় যুদ্ধ যা করার তা সংসদের ভেতরেই করবেন।

রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য জনস্বার্থবিরোধী কর্মসূচি গ্রহণ করবেন না। প্রকৃত অর্থে জনস্বার্থের বিষয়টি নিশ্চিত করার প্রশ্ন না থাকলে জাতীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয়- এমন কর্মসূচি গ্রহণ না করার ঘোষণা আসবে দলগুলো থেকে।

এবার বড় দলগুলোর ইশতেহার খুব যে চমক দিতে পেরেছে তেমন নয়। যেমনটি মহাজোট পেরেছিল ২০০৮ সালে। আমাদের মনে হচ্ছে, পাঁড় দলীয় ভোটার ছাড়া সাধারণ ভোটাররা এখনও লক্ষ্য স্থির করতে পারছে না। মনোনয়নপত্র বিক্রির পর থেকে এখনও বিএনপি নেতাদের মুখে একটি কথা প্রায়ই শোনা যাচ্ছে, তারা নির্বাচন করছেন- নির্বাচনে জিতে তাদের নেত্রী বেগম জিয়াকে আর দন্ডিত প্রবাসী নেতা তারেক রহমানকে মুক্ত করতে। সাধারণ মানুষের কথা ততটা বলছেন না।

সাধারণ ও নবীন ভোটাররা কি কোনো দলের নেতানেত্রীদের মুক্ত করার দায় নিয়ে ভোট দেবেন! তা-ও এসব নেতানেত্রী যদি রাজনৈতিক মামলায় দন্ডিত হতেন। এরা সবাই দুর্নীতির মামলায় দন্ডিত। এদের ভাষ্যে আরও একটি ঔদ্ধত্য রয়েছে। আদালতের দীর্ঘ বিচার সূত্রে এরা দন্ডিত।

এখন নির্বাচনে জিতে এসব নেতাকে মুক্ত করার অর্থ হচ্ছে, আইনের শাসনকে ঘোষণা দিয়ে অবজ্ঞা করা। দলমুক্ত ভোটারদের কাছে এমন দম্ভ ভালো লাগার কথা নয়। অন্যদিকে নিবন্ধন হারানো ও আদালতে যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে ঘোষিত জামায়াতে ইসলামীকে ধানের শীষে নির্বাচন করতে দিয়ে ভোটারের সামনে নিজেদের স্বরূপ প্রকাশ করেছে।

অন্যদিকে একদা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ হিসেবে দাবিদার সাবেক কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা ক্ষমতার আস্বাদ পাওয়ার আকাঙ্খায় জামায়াত-বিএনপি প্রযোজিত ধানের শীষ মার্কায় নির্বাচন করে ধানের শীষের বিএনপি দলটিকে বারোমিশালি বানিয়ে ছেড়েছে। সাধারণ এবং নতুন ভোটাররা এদিকে আকৃষ্ট হবে কিনা, সে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

এসব বিচারে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের কিছুটা এগিয়ে থাকার কথা। কিন্তু এখানেও ভোটার দ্বিধাগ্রস্ত থাকবে। আওয়ামী লীগের শাসনের বিগত দশ বছরে তারা দৃশ্যমান অনেক উন্নয়ন করেছে। উন্নয়নের গতি এখনও সচল। তবুও তারা স্বস্তি পাচ্ছে না। টাকার পাহাড় গড়া দুর্নীতিবাজ নেতানেত্রীদের চারপাশে দেখতে পাচ্ছে। গুম-খুন আর বিরোধীদল দমনের কু-রাজনীতির চর্চা এরা দেখছে। অতি দলীয়করণ ও দলীয় সন্ত্রাস দেখে সাধারণ ভোটাররা আতঙ্কিত হয়েছে। এসব কারণে ভোটের মাঠে ভোটারের লক্ষ্য স্থির করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

এসব বাস্তবতার কারণে অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাফল্য দেখানোর পরও নির্বাচনের মাঠে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের শারীরিক ভাষায় শঙ্কাগ্রস্ত দেখা যাচ্ছে। এটি এসব নেতিবাচক বাস্তবতার পীড়ন। নির্বাচনের মাঠে দাঁড়ানোর আগে এ সত্যটি নিয়ে কেউ ভাবেন না। ক্ষমতায় আসার পর একেকজন লাগাম ছাড়া হয়ে পড়েন।

ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। পাঁচ বছর পর যে আবার জনগণের কাছে আসতে হবে, এ সত্যটি বিবেচনায় রাখেন না। না হলে একজন ভোটারকে যদি প্রশ্ন করা হয়, বিএনপি জোটকে কি গুণের কারণে ভোট দেবেন? অর্থাৎ বিএনপির দীর্ঘ শাসনামলে জনগণের স্বার্থে মহৎ কাজ ক’টি করেছেন, এর কি তেমন পরিসংখ্যান দিতে পারবেন কেউ? অন্ধকার হাতড়েও কি কোনো মুক্তা খোঁজা যাবে!

আওয়ামী লীগ সরকারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নতি, ডিজিটাল অগ্রগতি, সামাজিক উন্নয়নের নানা পরিকল্পনা ও এসবের বাস্তবায়ন- এ ধারার জনকল্যাণমুখী কাজে কি বিএনপি তুলনায় আসতে পারবে? গুম, খুন, দলীয় সন্ত্রাস আর দুর্নীতি বিএনপি আমলে কি কম হয়েছে?

দুই বৃহৎ দলের এ ধারার অন্যায়গুলো কাটাকাটি করলে আওয়ামী লীগ তো এগিয়েই থাকে। তবুও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের ভেতরে ভোটের মাঠে এক ধরনের আতঙ্ক প্রকাশ পাচ্ছে কেন? এটিই হচ্ছে মনোজগতে আত্মপীড়নের কষাঘাত।

সুশাসনের পথ তৈরি করার পরিবেশ ও যোগত্যা এবারের আওয়ামী লীগ সরকারের মধ্যে থাকলেও দুর্নীতিবাজ-দাম্ভিক নেতাকর্মীদের সহযোগিতার অভাবে শেখ হাসিনার সরকার সে পথে হাঁটতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ ক্ষতটিই ভোটের মাঠে পীড়িত করছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে।

ইশতেহারে এবার আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দুর্নীতি কমিয়ে আনার অঙ্গীকার রয়েছে। গত নির্বাচনের ইশতেহারে রাখা প্রতিশ্র“তির অনেকটা পালন করে দলটি কিছুটা বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছে। একইসঙ্গে আমরা চাইব একটি ভারসাম্যমূলক সংসদ হোক। ক্ষমতার দাপটে স্বেচ্ছাচারী হয়ে যাওয়াটা যে কতটা দুর্ভাগ্যজনক, তাতো এদেশের মানুষ কম দেখেনি!

লেখক ঃ অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

॥ মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী ॥

অর্জন বিসর্জনের মুখোমুখি বাংলাদেশ

আর চারদিন পর ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই প্রথম দলীয় সরকারের অধীনে কোনো সংসদ নির্বাচন দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। যদিও তফসিল ঘোষণার আগে দলীয় সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিরোধী দলসমূহ অংশগ্রহণ করবে কি করবে না- এ নিয়ে দেশে ব্যাপক মানুষের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার ঐকান্তিকতা, চেষ্টা এবং দলসমূহের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এক ধরনের সমঝোতা ঘটে।

নির্বাচনের হাওয়া অনেকটাই বইতে শুরু করে, কোনো বিদেশি মহলের তৎপরতা বা মধ্যস্থতার প্রয়োজন পড়েনি। ফলে রাজনীতি সচেতন মহল মনে করছে অতীতের রাজনৈতিক অবিশ্বাসের অবস্থান থেকে দলগুলো কিছুটা হলেও সরে আসার যে নজির স্থাপন করেছে সেটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচনকালীন জটিলতার অবসানে মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।

মাঠের বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং এর সহযোগী ২০ দলীয় ঐক্যজোট এবং নবগঠিত ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও তাদের প্রস্তুতিতে বড় ধরনের সংকট ছিল। বিশেষত বিএনপি এবং জামায়াত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন প্রতিহত করতে গিয়ে সাংগঠনিকভাবে বড় ধরনের সংকটে পড়ে। এটি আরো গভীরতর হয় ২০১৫ সালের শুরুতে ৯৩ দিনের অবরোধ হরতালের মতো কর্মসূচি প্রদানের ফলে। এরপর থেকে দল দুটো আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারেনি, অনেক নেতাকর্মী নানা ধরনের মামলায় জড়িয়ে পড়ে। দলের মধ্যে নেতৃত্বের আন্দোলন সংগ্রামের কৌশল নিয়ে অনাস্থা তৈরি হয়, সৃষ্টি হয় বিপর্যয়কর অবস্থা।

বিএনপি যদিও ২০১৫ সাল থেকে সংগঠন ও আন্দোলন সংঘটিত করার নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু বিএনপি বা ২০ দলীয় জোট এর কোনোটিই রক্ষা করতে পারেনি। ফলে নির্বাচনের আগে সরকার বা আওয়ামী লীগের ওপর কার্যকর কোনো চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি বিএনপি ও জামায়াত। জামায়াত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে শীর্ষ নেতাদের কয়েকজনকেই হারিয়ে বড় ধরনের সাংগঠনিক সংকটে পড়ে।

এরই মধ্যে বিএনপির চেয়ারপারসন এবং দলের দ্বিতীয় নেতা তারেক রহমান মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার ফলে দল নির্বাচনের আগে নেতৃত্বের সংকটে পড়ে। এসব কারণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি তথা ২০ দলীয় ঐক্যজোট দেশে কার্যত নির্বাচনে যাওয়ার সুবিধাজনক কোনো অবস্থায় ছিল না।

সেই অবস্থাতে গণফোরাম, জাসদ (রব), নাগরিক ঐক্য এবং কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত ঐক্যফ্রন্টের মাধ্যমে নির্বাচনে যাওয়ার একটি সুযোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। এটি বিএনপির জন্য একটি উত্তরণের সুযোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিএনপি সাংগঠনিক নানা অব্যবস্থাপনার মধ্যেও ঐক্যফ্রন্টের জোটগত অবস্থানে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের জামায়াত-বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনীয় ঐক্য নিয়ে দেশে বিরূপ সমালোচনা রয়েছে। তারপরও নাগরিক সমাজের একটি অংশ ঐক্যফ্রন্টের জোটগত অবস্থানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ঐক্যফ্রন্ট শুরুতে যে ধরনের প্রতিশ্র“তি দিয়েছিল নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের পর অনেক কিছুর সঙ্গেই আপস করতে তাদের দেখা যায়।

বিশেষত স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না এমন প্রতিশ্র“তি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট ধরে রাখতে পারেনি। বিএনপি বরং ঐক্যফ্রন্টকে তাদের ২০ দলীয় জোটের চিন্তাধারার কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছে। এর ফলে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট কার্যত জামায়াত ও বিএনপির ক্রিড়নকে পরিণত হয়েছে বলে রাজনীতি সচেতন মহল মনে করছে।

ফলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০ দলীয় ঐক্যজোটের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের বৃহত্তর ঐক্য বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির একটি প্লাটফর্ম এবং অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের আরেকটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্লাটফর্ম হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছে।

এ পর্যন্ত ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনী রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর সব চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে বিএনপির প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে দলের অভ্যন্তরে শুরু থেকে বেশকিছু সংকট তৈরি হয়। এর ফলে দলের অভ্যন্তরে মনোনয়ন পাওয়ার দ্বন্দ্ব ভেতরে ভেতরে ব্যাপক হতে থাকে, আবার নানা মামলায় জড়িয়ে থাকা কিছু নেতা প্রার্থিতা পাওয়ায় নির্বাচনে সক্রিয় হওয়া নিয়ে বেশকিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে জামায়াতের নিবন্ধন না থাকার পরও ২২ জন জামায়াতের নেতাকে বিএনপির সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেয়া নিয়ে আইনত জটিলতার সম্মুখীন হয়েছে ঐক্যজোট। নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে এ ধরনের নানামুখী বিপর্যয় বিএনপি, জামায়াত এবং ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী আশাবাদকে বেশ বিপদেই ফেলেছে। বেশকিছু প্রার্থী নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত লড়তে পারছেন না, আবার কেউ কেউ মামলার কারণে নির্বাচনী মাঠে সময় দিতে পারছেন না। কর্মীদের মধ্যেও অনেকেই ২০১৩ ও ১৫ সালের পেট্রলবোমার মামলায় আসামি হিসেবে রয়েছে। তারাও খুব একটা মাঠে আসতে পারছে না। তারপরেও বেশকিছু আসনে বিএনপির প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত আছেন।

প্রথমদিকে প্রার্থীদের অনেকের মধ্যে আতঙ্ক, অপ্রস্তুতি এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয়হীনতার সংকট ব্যাপকভাবে ছিল। বেশকিছু আসনে কোনো কোনো প্রার্থী তা এসব সমস্যা অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন বলে মনে হচ্ছে। তবে জামায়াতের প্রার্থীরা অনেকটাই গোপনে তাদের প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ঐক্যফ্রন্টের বাকি দলগুলোর প্রার্থীদের সাংগঠনিক দুর্বলতা এতটাই প্রকট যে বিএনপির সমর্থন ছাড়া প্রচার-প্রচারণায় তাদের খুব একটা দেখা যায় না। এ ধরনের পরিস্থিতিতেও বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্টের নেতারা ভোটারদের আবেগ, অনুভূতি এবং সহানুভূতি পাওয়ার জন্য নানা কৌশলে কাজ করছেন, প্রচার-প্রচারণায় চালিয়ে যাচ্ছেন। ঐক্যফ্রন্টের নেতারা শুরু থেকেই বেশকিছু অভিযোগ ক্রমাগত করেই যাচ্ছেন।

বিশেষত তাদের কোনো কোনো প্রার্থীর পোস্টার ও লিফলেট না দেখা যাওয়ার কারণ হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাধাদানের কথা বারবার বলে যাচ্ছেন। এমনকি তারা প্রেসে পোস্টার ছাপাতে পারছেন না বলেও অভিযোগ করছেন। এসব অভিযোগের সত্যাসত্য কেবলমাত্র তদন্তের মাধ্যমেই নিরূপণ করা যেতে পারে।

তবে তাদের এসব দাবির প্রতি কিছু মানুষের হয়তো বিশ্বাস সৃষ্টি হতেও পারে। কিন্তু সব আসনে পরিস্থিত একই কারণে নিরুত্তাপ, প্রচার-প্রচারণাবিহীন এবং পোস্টারবিহীন অবস্থায় চলছে- তা ভাবা কষ্টকর। রাজনৈতিক অভিজ্ঞ মহলের ধারণা বেশকিছু আসনে যেসব প্রার্থীকে মনোনয়ন দান করা হয়েছে তাদের সঙ্গে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সমঝোতা না হওয়ায় অনেকেই সীমিত আকারে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন, ভোটারদের সহানুভূতি পাওয়ার জন্য অভিযোগ করছেন। ফলে বেশকিছু আসনে প্রচার-প্রচারণা সেভাবে না জমলেও বিএনপির মনোনীত কয়েকজন প্রার্থীর আসনে প্রচার-প্রচারণা বেশ তুঙ্গে আছে।

বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে বারবার বলা হচ্ছে যে ভোটাররা ভোট দিতে কেন্দ্রে গেলে দেশে একটি ‘ভোট বিপ্লব’ হয়ে যাবে! তাদের এ ধরনের দাবির বাস্তবতা কতখানি রয়েছে সেটি ৩০ তারিখ বুঝা যাবে। তবে ভোটাররা ভোট দিতে পারবেন না, কেন্দ্রে যেতে নিষেধ করা হচ্ছে এমন কথা কেউ প্রমাণ দিয়ে এ পর্যন্ত দেখাতে পারছেন না। ফলে এটি তাদের প্রচারণার একটি কৌশল হিসেবে ধরে নিতে হচ্ছে। ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের ধারণা যে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মাঠে নামার পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণরুপে তাদের ভোটারদের অনুকূলে এসে যাবে- এটি ২/১ দিনের মধ্যেই বুঝা যাবে।

তবে ঐক্যফ্রন্টের প্রচার-প্রচারণা, কথাবার্তা এবং নির্বাচনী কৌশলের কিছু কিছু দিক আঁচ করে কোনো কোনো পর্যবেক্ষক আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, ৩০ তারিখের আগে জামায়াত এবং বিএনপির কোনো কোনো নেতাকর্মী অস্বাভাবিক কোনো পরিস্থিতি হয়তো সৃষ্টি করতে পারে। এটি আদৌ করা সম্ভব কিনা তাও ২/১ দিনের মধ্যেই বুঝা যেতে পারে। তবে উগ্র জঙ্গিবাদী কোনো কোনো গোষ্ঠী নির্বাচন উপলক্ষে কিছু দুর্ঘটনা ঘটালে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। কেননা জঙ্গিবাদী বিভিন্ন গোষ্ঠী হলি আর্টিজানের হত্যাকান্ডের পর কোণঠাসা অবস্থায় পড়েছে, অনেক জঙ্গি এরই মধ্যে নিহত কিংবা গ্রেপ্তার হয়েছে। ফলে ওইসব শক্তির দৃষ্টিতে বর্তমান সরকার তাদের জন্যে সম্পূর্ণরূপে বৈরী।

সুতরাং সরকারকে বেকায়দায় ফেলার মতো কিছু নাশকতামূলক কর্মকান্ড তারা করতেই পারে। অন্যদিকে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে দেশের প্রচার মাধ্যমের যেসব তথ্য-উপাত্ত প্রকাশিত হয়েছে তার ফলে যে ধারণাটি করা যেতে পারে তা হচ্ছে নির্বাচনের আগে কিংবা পড়ে দেশে ওইসব গোষ্ঠী প্রতিহিংসামূলক কোনো ঘটনা ঘটাতেই পারে। দেশের রাজনীতি এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে আগামী কয়েকটি দিন খুব অনুকূল পরিবেশ নাও থাকতে পারে। এমন আশঙ্কাকে একেবারে উড়িয়ে না দিলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সেগুলো মোকাবেলা করতে সচেষ্ট আছেন- এমনটির প্রতি বেশিরভাগ মানুষের আস্থা রয়েছে।

নির্বাচনটি নানা চড়াই-উৎরাই পার হয়ে এ পর্যন্ত  যে পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে তাতে একেবারে হতাশ হওয়ার মতো পরিস্থিতি বলা যাবে না বরং দুই মাস আগে যে ধরনের হতাশা ও আতঙ্ক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের ব্যবসায়ী, কর্মজীবী, বিদেশি কূটনৈতিক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়েছিল সেটি ধাপে ধাপে দূর হয়ে এখন নির্বাচনের একেবারেই ধারপ্রান্তে আমরা উপনীত হয়েছি। ৩০ তারিখ দেশব্যাপী ব্যাপক মানুষের অংশগ্রহণে একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে- এটি নিয়ে আর কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব কারো মধ্যে নেই। নির্বাচন কমিশন নানা সীমাবদ্ধতার পরও এ পর্যন্ত নির্বাচনী কার্যক্রম ঘুরিয়ে আনতে পেরেছে।

যদিও জোটসমূহের পক্ষ থেকে নানা বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, নির্বাচন কমিশন কিছু কিছু ব্যাপারে ত্বরিত সিদ্ধান্ত দিয়েছে আবার অনেক অভিযোগের ব্যাপারে তেমন কিছু করতে পারেনি, অভিযোগের জটলায় নিজেদের আবদ্ধ রাখেনি বরং কমিশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তাদের মনোযোগকে প্রাধান্য দিয়েছে- সেটি অনেকটা সঙ্গত হয়েছে বলে আমাদের কাছে মনে হয়। একটি কথা না বললেই নয় অতীতের সব ক’টি নির্বাচনের আগে দেশে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ ও হানাহানি ঘটেছে। এই নির্বাচনে এ পর্যন্ত দুজনের মৃত্যু ছাড়া আর তেমন কারো মৃত্যু ঘটেনি। তবে হামলার অভিযোগ ঘটনাবলির খবরাখবর মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে যা অনাকাঙ্খিত ছিল। আমরা আশা করব বাকি দিনগুলোতে হামলা ও সংঘর্ষের পরিস্থিতি ঘটবে না, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে, ভোটাররা ভোটদান করবেন।

তবে এবারের নির্বাচনে মহাজোট বনাম ঐক্যজোটের মধ্যে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে যাচ্ছে তার ফলে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অর্জনের ধারাবাহিকতার পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রের পথ সুগম হবে নাকি বিপরীত পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে সেটি নির্ভর করবে নির্বাচনে কোনো শক্তির জয় বা পরাজয় ঘটবে তার ওপর। এই রাজনৈতিক বোধ ও বিবেচনাটি সম্পূর্ণরুপেই ভোটারদের একান্ত ব্যাপার।

লেখক ঃ অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

॥ মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন ॥

বুদ্ধি-বিবেক-যুক্তি জাগ্রত হোক

আর মাত্র সপ্তাহ দুয়েক পরই দেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ভোটার থেকে শুরু করে প্রার্থী এবং রাজনৈতিক দলগুলো বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা সহকারে দিনটির অপেক্ষায় আছে। নির্বাচন কমিশনেরও চোখে ঘুম নেই। এ ক’দিন তারা ঘুমাতে পারবেনও না।

কারণ প্রার্থিতা যাচাই-বাছাই থেকে শুরু করে নির্বাচনের পরদিন পর্যন্ত তাদের নিঃশ্বাস ফেলার সময় মিলবে না। এরই মধ্যে যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে কমিশনকে বেশ সমালোচনা ও ঝক্কি-ঝামেলা সহ্য করতে হয়েছে। শত শত প্রার্থী প্রার্থিতা বাতিলের কবলে পড়ায় বিভিন্ন মহল থেকে নানা কথা উঠেছে এবং ওইসব প্রার্থীর প্রায় সবাই আপিল করায় তা নিষ্পত্তি করতেও কমিশনকে হিমশিম খেতে হয়েছে।

ইংরেজিতে থ্যাংকলেস জব বলে যে কথাটি আছে, আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রে তা কতটা প্রযোজ্য তা জানি না। তবে তারা যে কস্মিনকালেও সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পারবেন না, সে কথা বলাই বাহুল্য। ইতঃপূর্বেও প্রতিটি নির্বাচনের আগে বা পড়ে কোনো না কোনো দল বা গোষ্ঠী নির্বাচন কমিশনের ওপর কুপিত হয়েছে! এ অবস্থায় কমিশন যে সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পারবে, সে আশা করাটাও বৃথা। তবে কাজের মাধমে কমিশনকে অবশ্যই দল বা গোষ্ঠী নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে।

অন্যথায় দেশের মানুষের এত উৎসাহ-উদ্দীপনার নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও নির্বাচন কমিশনের প্রতি কথাবার্তা, আচার-আচরণে সহনশীল হতে হবে। কমিশনের দায়িত্ব পালনে রাজনৈতিক দলগুলোকে সহায়তা প্রদান করতে হবে।

কথায় কথায় তীব্র সমালোচনা বা আক্রমণাত্মক কথাবার্তা নির্বাচন কমিশনের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। তাই একতরফা সমালোচনাও এক্ষেত্রে কাম্য নয়। মনে রাখা প্রয়োজন, নির্বাচন কমিশনকেও দেশের আইন ও নিয়মাচার মেনেই কাজ করতে হয় এবং তাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। কারণ আইন ও নিয়মের বাইরে তাদের কিছু করার নেই।

একেকটি দলের একেকজন প্রার্থী ব্যাংক ঋণ নিয়ে তা পরিশোধের কথা না ভেবে নির্বাচনের সময় হলেই নমিনেশনের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বেন, আবার কেউ কেউ অন্ধের মতো ফরম পূরণ করে কমিশনে দাখিল করবেন আর সেসব কারণে তাদের প্রার্থিতা বাতিল হলে ‘কিয়া হুয়া কিয়া হুয়া’ জিকির শুরু করবেন, তেমনটিও হওয়া উচিত নয়।

সারা জীবন, সারা বছর নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করবেন না, জীবনের কোনো ক্ষেত্রে শুদ্ধাচারের ধারে কাছে যাবেন না, ব্যাংকে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে, ইউটিলিটি বিলে বকেয়া পরিশোধের কথা না ভেবেই নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাইবেন আর এসব কারণে প্রার্থিতা বাতিল হলে হইচই-চিৎকার শুরু করে দেবেন, দেশ ও জাতির জন্য এমন সংসদ সদস্যও কাম্য নয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে যারা সংসদ সদস্য হতে চাইবেন, তাদের এসব বিষয়ে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।

অন্যথায় নির্বাচন কমিশন যদি এসব সঙ্গত কারণে প্রার্থিতা বাতিল করে, সেক্ষেত্রে কারও কিছু বলার থাকবে বলে মনে হয় না। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতি তুচ্ছ কারণে যেসব প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছিল, সেটাও কাম্য ছিল না। এসব ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন আরও সহনশীল হলে এসব নিয়ে এতটা হইচই হতো বলে মনে হয় না।

যদিও পরবর্তী সময়ে সেসব বিষয় সুরাহা করে অনেকের প্রার্থিতা ফেরত দেয়ায় নির্বাচন কমিশন প্রশংসার দাবিদার হয়েছে। অনেকে আবার আদালতের দ্বারস্থ হয়ে তাদের প্রার্থিতা ফেরত পেয়েছেন। যাক সে কথা। এখন অন্য কথায় আসা যাক।

আমাদের দেশে নির্বাচনের সময়কে একটি উৎসব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময় সব শ্রেণী-পেশার মানুষই কমবেশি নির্বাচনী দোলায় আন্দোলিত হন। যিনি নির্বাচন করেন, তার পরিবার, আত্মীয়পরিজন, সমাজ ও দল যেমন বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন, তেমনি নির্বাচনে অংশগ্রহণের বাইরে থাকা দেশের সাধারণ মানুষও বিষয়টিকে একধরনের আনন্দানুভূতি সহকারে গ্রহণ করেন।

জাতীয় নির্বাচনের এ সময়ে চায়ের দোকানে যেমন আড্ডা জমে ওঠে, তেমনি শহরে-বন্দরে, পাড়া-মহল্লায় এসব নিয়ে শুরু হয়ে যায় আলোচনা, সমালোচনা, গুঞ্জন। আর সেই ফাঁকে চারদিকে নানা ধরনের গুজবও ছড়িয়ে পড়ে।

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থী ও দলের বিরুদ্ধেও নানা গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়। ফলে অনেক প্রার্থীর জন্য তা হরিষে বিষাদ হয়ে দাঁড়ায়। আবার অনেক প্রার্থীও একে অপরের প্রতি কাদা ছোড়াছুড়ি থেকে শুরু করে মারামারি, হানাহানি পর্যন্ত শুরু করে দেন। যুগ যুগ ধরে দেশ ও জাতিকে এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে! এবারের নির্বাচনে এসব ঘটনার প্রাধান্য থাকবে কি না জানি না, তবে স্বাধীনতার এত বছর পর এসবের অবসান হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

সাধারণ মানুষ যেমন জাতীয় নির্বাচনকে গুরুত্ব ও আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দল ও প্রার্থীরও মানুষের সে আনন্দঘন পরিবেশ নষ্ট করা উচিত নয়। সেই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও সাধারণ ভোটারদের সেন্টিমেন্টকে গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা উচিত।

মোট কথা, নির্বাচনের সময়ে কেউ যাতে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে না পারেন, ভোট ডাকাতি, ভোট চুরি করতে না পারেন, সে দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ পালন করতে পারলে কেবল তখনই আসন্ন নির্বাচন দেশ ও জাতির জন্য শুভবার্তা নিয়ে আসতে পারবে। আর ভোট চুরি, ভোট ডাকাতি, হানাহানি বন্ধ করতে না পারলে নির্বাচন যে অর্থবহ বা গ্রহণযোগ্য হবে না, সে কথাও অনস্বীকার্য।

এবার লক্ষ করা গেল, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আমলা থেকে শুরু করে গ্ল্যামার জগৎ, ক্রীড়াজগৎ, শিল্পী, ব্যবসায়ী মহলের লোকজন অধিক সংখ্যায় বিভিন্ন দলে ভিড়ে মনোনয়ন প্রত্যাশা করেছেন। বিষয়টি নিয়ে অনেকে অনেক রকম মন্তব্য করলেও ব্যক্তিগতভাবে আমি এতে দোষের কিছু দেখি না। কারণ এতকাল রাজনৈতিক ক্ষেত্রটি একচেটিয়া যাদের দখলে ছিল, তাদের অনেকেই মেধাহীন, মতলববাজ এবং কায়েমি স্বার্থবাদী। তাই দেশ ও জাতির জন্য সেটা তেমন সুখকর ছিল বলে মনে হয় না।

কারণ রাজনীতিকে লাভজনক ব্যবসা হিসেবে গ্রহণ করে একশ্রেণীর রাজনীতিক শুধু নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করে চলেছিলেন। দলীয় নামাবলি গায়ে চাপিয়ে, দলের নামে, নেতার নামে স্লোগান দিয়ে মুখে ফেনা তুললেও তাদের অনেকেই দলীয় আদর্শ ও নীতির ধারেকাছে না থেকে রাজনীতিকে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

গুন্ডামি, মাস্তানি ইত্যাদির মাধ্যমে চর দখলের মতো নির্বাচনী ময়দান দখল করে নির্বাচনে জিতে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, এমনকি ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত হয়ে তাদের অনেকে নিজেরা যেমন কলঙ্কিত হয়েছেন, তেমনি রাজনীতির ময়দানকেও ভালো মানুষের জায়গা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছেন।

এ অবস্থায় যেহেতু একশ্রেণীর রাজনৈতিক নেতা বা ব্যক্তি রাজনৈতিক অঙ্গনকে নষ্ট করে দিচ্ছিলেন, তাই অন্য  পেশার মানুষজন- হোন তিনি ব্যবসায়ী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, ক্রীড়াবিদ, শিল্পী বা অন্য পেশার কেউ- তারা যদি এসে রাজনৈতিক অঙ্গনকে কিছুটা হলেও পরিচ্ছন্ন করতে পারেন, তাহলে দোষের কিছু আছে বলে মনে হয় না।

কারণ রাজনীতি করে খাওয়া লোকজন- যারা উন্নয়ন কর্মকান্ডের টাকা, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, বাঁধ নির্মাণের টাকা গিলে খাচ্ছিলেন- তাদের হাত থেকেও রাজনীতিকে মুক্ত করা দরকার। অতএব, জনসাধারণ যদি অন্য ট্র্যাকের কিছু প্রার্থীকে নির্বাচন করেন এবং তারা যদি উন্নয়ন কর্মকান্ডের টাকা আত্মসাৎ না করেন, তাহলে রাস্তাখেকো, ব্রিজখেকো রাজনীতিকদের চেয়ে তা ভালো বলেই বিবেচিত হবে। আর এভাবে রাজনীতিতে যদি গুণগত কিছু পরিবর্তন আসে, আসুক না!

কারণ একজন ধনী ব্যবসায়ী, শিল্পী, ক্রীড়াবিদ বা এই শ্রেণীর সুশীল চিন্তাধারার সৃজনশীল ব্যক্তি যদি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন, তাহলে তাতে দোষের কিছু নেই। যদিও প্রশ্ন থাকে, তারাও আবার একই পথের পথিক হবেন কি না? যদি তা-ই হয়, তাহলে ভবিষ্যতে জনগণই তাদের রাজনীতি থেকে বিদায় করবেন। কিন্তু এরই মধ্যে আমরা যেসব ধনী ব্যবসায়ী, শিল্পী বা এ জাতীয় সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী পেয়েছি, তারা এসব করেছেন বলে দেখা যায়নি।

এক্ষেত্রে দু-একজন মন্ত্রীর নামও উল্লেখ করা যেত, যারা এসব করেননি। তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে অন্তত এই শ্রেণীর নবাগতদের স্বাগত জানানোর পক্ষে। আর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবার সেই কাজটিই বোধহয় একটু জোর দিয়ে করেছে। এখন দেখা যাক ভবিষ্যতে কী ঘটে।

পরিশেষে যেসব প্রার্থী, দল ও জোট নির্বাচনে যাচ্ছে এবং যারা নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকছেন, তাদের সবার প্রতি একটি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই আর তা হল : ‘আপনারা সংশ্লিষ্ট সবাই চিন্তা-চেতনায়, মননে-দর্শনে সৎ ও সঠিক পথে থাকুন।’ কারণ এই দেশ, এই মাটি, এই মানুষ অনেক কিছু সহ্য করেছে, করছে!

একজন কৃষক মাটিতে পাটের বীজ রোপণ করে পরিচর্যার মাধ্যমে তা বড় করে আবার পানিতে পচিয়ে রোদে শুকিয়ে পাটকে ব্যবহার উপযোগী করে তোলার পর সেই পাট ও পাটজাত দ্রব্য বিদেশে রফতানি হয়। একজন পোশাক শ্রমিক সকাল-দুপুর-রাতে খেয়ে, না খেয়ে কারখানায় শ্রম দিয়ে পোশাক প্রস্তুত করেন এবং সেই পোশাক রফতানি হয়।

একজন ট্যানারি শ্রমিক দুর্গন্ধময় পরিবেশে কাজ করে হাতে-পায়ে-নখে কেমিক্যাল মেখে চামড়ার গন্ধ দূর করে প্রক্রিয়াজাত করার পর তা রফতানি হয়। দেশের যুবক-যুবতীরা পরিবারের সান্নিধ্য ত্যাগ করে বিদেশের মাটিতে, মরুভূমিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে বিদেশিদের মন জুগিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশে পাঠান।

আর আমরা তাদের সেই সব অর্জিত অর্থ দিয়ে সংসদ চালাই, ট্যাক্স ফ্রি গাড়িতে চড়ি, আবার কেউ কেউ উন্নয়ন কর্মকান্ডের অর্থ পকেটে ঢুকাই, ব্যাংকের শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করি।

অথচ এসব করতে আমরা বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ করি না। আপনারা জানেন, নতুন প্রজন্মের যুবক-যুবতী সওদাগরি অফিসে দিনরাত পরিশ্রম করে একটু ভালো বেতন পেলেই তারা স্বেচ্ছায় সেই বেতনের অর্থ থেকে আয়কর দিচ্ছেন। একজন রিকশাচালক, ঠেলাগাড়িচালক, দিনমজুর সারাদিন ঘাম ঝরিয়ে কয়টি টাকা রোজগার করে তার শিশুসন্তানকে যখন একটি লজেন্স কিনে দিচ্ছেন, সেক্ষেত্রে তারাও ভ্যাট প্রদান করছেন। হয়তো জানেন বা জানেন না।

কিন্তু তাদের প্রদানকৃত আয়কর ও ভ্যাটের টাকা দিয়েও কিন্তু সংসদ চলে, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন-ভাতা পান। অতএব, এসব সাধারণ শ্রেণীর মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা ভাবলে কিন্তু ‘যিনি বা যারা নিঃস্বার্থভাবে অপরকে সুখ দিতে নিজে আনন্দবোধ করেন, কেবল তারাই আসন্ন নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে আসার হকদার।’

আমি এ লেখাটির মাধ্যমে সেই কথাটিই বলার চেষ্টা করছি মাত্র। আর সে অবস্থায় নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবাই নীতিপরায়ণ ও ন্যায়নিষ্ঠ না হলে সুন্দর, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন কিন্তু কথার কথাই থেকে যাবে!

পাদটীকায় তাই আবারও বলি, ‘নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবারই বুদ্ধি, বিবেক আর যুক্তি জাগ্রহ হোক।’

লেখক ঃ কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

॥ মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী ॥

জামায়াত-বিএনপিকে নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দিবাস্বপ্ন!

৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন উপলক্ষে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, জাসদ, নাগরিক ঐক্য এবং কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের সমন্বয়ে গঠিত ঐক্যফ্রন্ট, বিএনপি, জামায়াত এবং ২০ দলের সঙ্গে যে জোট গঠিত হয়েছে তা নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে এবং দেশের বাইরের বিভিন্ন দেশে বেশ আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং নাগরিক সমাজের সচেতন মহল বেশ আগেই ড. কামাল হোসেন এবং তার ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনীয় ঐক্য গঠনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। বিশেষত বিএনপি এবং জামায়াতের সাম্প্রদায়িক, রাজনৈতিক মতাদর্শের বিষয়টি গত প্রায় চার দশক ধরে বাংলাদেশে সবারই জানা রয়েছে।

সাম্প্রদায়িক কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সহায়ক রাজনীতি ও দর্শন হতে পারে না। এটি রাজনীতির সাধারণ পাঠ নেয়া যে কোনো সচেতন মানুষই জানেন। বাংলাদেশে বিএনপি এবং জামায়াতের রাজনৈতিক ঐক্য সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শের উত্থানকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হয়েছে।

ফলে বাংলাদেশে বিএনপির যে কোনো শাসনামলে অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে দুর্বল করা হয়েছে কিংবা কখনো কখনো নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হতে পারেনি, পদে পদে বাধার সম্মুখীন হয়েছে।

বিশেষত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিয়ে বিএনপি-জামায়াত সাধারণ ধর্মীয় বিশ্বাসী মানুষকে রাজনীতিতে বিভ্রান্ত ও বিভক্ত করেছে, গণতন্ত্র সম্পর্কে সঠিক ধারণা ও চেতনা লাভের সময়ে ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজনের রাজনীতি আমাদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে পশ্চাৎপদ রাজনৈতিক চিন্তায় আবদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে  দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে বিএনপি ও জামায়াত যে বিকৃত ইতিহাস শিক্ষা ব্যবস্থায় ও রাজনীতিতে প্রচার করেছে তার ফলে মুক্তিযুদ্ধের মহান আদর্শের মূল চেতনা থেকে নতুন প্রজন্মের বিস্মৃত হওয়ার সুযোগ ঘটেছে।

জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরির মাধ্যমে গোটা জাতিসত্তাকে বিভক্ত করা হয়েছে, নাগরিকতাকে জাতীয়তাবাদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। একই সঙ্গে ধর্ম নিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতার মতাদর্শ হিসেবে প্রচার করে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। অর্থনীতিতে শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থার ধারণাকে তুলে দেয়া হয়েছে। রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে সাম্প্রদায়িকতা, বিকৃত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং জাতিগত সংকীর্ণ ভাবাদর্শ।

এভাবেই বাংলাদেশে ১৯৭৫-এর পর থেকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠনের রাজনৈতিক সংগ্রামকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়েছে, আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি, প্রশাসনসহ সর্বত্র মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত শক্তিদের প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, সুবিধাবাদকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির নৈকট্য আদর্শগতভাবে দৃশ্যমান থেকেছে শুরু থেকেই, এমনকি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে জোটগতভাবে তাদের অবস্থান একত্রে ছিল, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে গোপন আঁতাতের মাধ্যমে উভয় দল আসন ভাগাভাগি করেছে। ঘাতক, গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে আন্দোলন ও গণআদালত প্রতিষ্ঠিত হলে বিএনপি গোলাম আযমের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিয়েছে। মধ্যখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন নিয়ে জামায়াত এবং বিএনপির সম্পর্কে চিড় ধরলেও ১৯৯৬-এর নির্বাচনের পর জামায়াত এবং বিএনপি পুনরায় কাছাকাছি অবস্থান নেয়।

এর ফলে ১৯৯৯ সালে গঠিত হয় চার দলীয় আদর্শিক জোট। এই জোট গঠনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাতে অসাম্প্রদায়িক ধারার রাজনৈতিক দল নির্বাচিত হয়ে না আসতে পারে, চার দলীয় ঐক্যজোটের ঘোষণাপত্রে তেমন অঙ্গীকার ব্যক্ত করা ছিল।

২০০১ সালে নির্বাচনের আগে জামায়াত এবং বিএনপি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অপশক্তির সহযোগিতা নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণায় অংশ নিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক, প্রশাসনিক এবং প্রচার মাধ্যমসমূহ বিএনপি জামায়াতের রাজনৈতিক প্রস্তুতি, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য সম্পর্কে আগাম কোনো সুস্পষ্ট ধারণা নিতে পারেনি, তারা বরং বিষয়টিকে গণতন্ত্রে পরস্পরবিরোধী দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের ভোট লড়াই হিসেবে দেখেছে। আওয়ামী লীগের চাইতে চার দলীয় জোটকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। কিন্তু চারদলীয় জোটের আদর্শগত অবস্থানকে তলিয়ে দেখেনি।

বিষয়টি পরিষ্কার হলো ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের পর মুহূর্ত থেকেই- যখন গোটা দেশব্যাপী জামায়াত ও বিএনপি হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটিয়ে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়ার প্রতিশোধ নেয়।

একইভাবে পরাজিত আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার নীলনকশা বাস্তবায়ন করতে থাকে, দেশে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীকে সরকার পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে। দেশে অসংখ্য রাজনৈতিক-সামাজিক ব্যক্তিকে হামলা, মামলায় জড়িয়ে এক ভীতিকর অবস্থা তৈরি করে, আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের গ্রেনেড হামলায় হত্যা করার নজির স্থাপন করতে থাকে, আদালত পর্যন্ত এ সব মামলা গড়ায়, ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়, ১৭ আগস্টের দেশব্যাপী ৫০০-এর অধিক স্থানে একসঙ্গে বোমা হামলা করা হয়। একইসঙ্গে  দেশে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও গণতন্ত্রের চর্চাকে সম্পূর্ণরূপে সঙ্কুচিত করা হয়। বিএনপি এবং জামায়াতের ঐক্য বাংলাদেশ রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে কতটা সাম্প্রদায়িক, জঙ্গিবাদী, ভারত বিরোধী এবং পাকিস্তানপন্থি করতে পারে তার নজির সেই সময়ের পাঁচ বছরের শাসনামলে রয়েছে।

এই জোট দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে কতটা অকার্যকর করেছিল, নির্বাচন কমিশনকে কতটা অথর্ব ও জামায়াত-বিএনপির দলীয় আজ্ঞাবহ করেছিল- সেটি সবারই স্মৃতিতে এখনো থাকার কথা। চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রিপরিষদে জামায়াতের আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল মন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের পতাকাই শুধু গাড়িতে বহন করেনি, রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বত্র জামায়াতের ক্যাডারদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সে সময়ে দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ছাত্র শিবিরের দুর্দান্ত প্রতাপ, অসাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠনকে বিদ্যাপীঠ থেকে বিতাড়ন, ছাত্র-শিক্ষকদের ওপর নির্যাতন এবং প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভাবাদর্শে গড়ে তোলা, সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিশ্বাসী করায় প্রচার-প্রচারণা ব্যাপকভাবে পরিচালনা করেছিল।

বিএনপি-জামায়াত দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য ২০০৭ সালের নির্বাচনকে সম্পূর্ণরূপে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় নেয়া। তাদের লক্ষ্য ছিল ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে অসাম্প্রদায়িক সব শক্তিকে নির্মূল করা।

কিন্তু ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি তাদের পূর্ব পরিকল্পিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা যায়নি, ১/১১ তাতে বাদ সেধেছিল। ড. কামাল হোসেনসহ অন্য নেতারা এই ইতিহাস জানেন না-বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু দুঃখ হয় এখন, যখন ড. কামাল হোসেনের মুখ থেকে বিএনপি ও জামায়াতকে নিয়ে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলতে শোনা যায়।

একইভাবে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, আ স ম আব্দুর রব ও মাহমুদুর রহমান মান্নাদের মতো নেতাদের মুখে মুক্তিযুদ্ধে ও গণতন্ত্রের জন্য বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে এত গাঁটছড়াভাবে নির্বাচন করতে দেখা যায়- তখন আমাদের ভাবতে বেশ কষ্ট হয় যে এ সব নেতা আমাদের কি মনে করেন যে আমরা গণতন্ত্র এবং মুক্তিযুদ্ধের কোনো ইতিহাস জানি না কিংবা বইপুস্তক পড়েনি! এসব নেতা এক সময় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তাদের প্রত্যেকের অবদানকে আমরা সব সময়ই স্বীকার করি।

কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তাদের কারো কারো ভূমিকা উগ্র হঠকারী রাজনীতিতে ছিল- যা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাস্তবায়নে খুব একটা ফল দেয়নি, তারা নিজেরাই দল গড়েছেন, ভেঙেছেন, জনবিচ্ছিন্নও হয়েছেন। কিন্তু তাদের একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক পরিচয় রাজনীতিতে ছিল। ড. কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন কিন্তু শেখ হাসিনার সঙ্গে তার মতবিরোধ ঘটায় তিনি গণফোরাম নামক আলাদা রাজনৈতিক দল গড়েছেন।

অনেকেরই ধারণা ছিল ড. কামাল হোসেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন শক্তিকে নিয়ে আরেকটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল বা শক্তির উন্মেষ দেশে ঘটাতে সক্ষম হবেন, সেটি ঘটলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ রাজনীতি অনেকটা সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত হতে পারত। বিএনপির প্রয়োজনীয়তা হয়তো ফুরিয়ে যেতে পারত, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিকশিত ও উন্নত হওয়ার সুযোগ পেত।

এমন ভাবনাটি নব্বইয়ের দশকে অনেকের মধ্যেই ছিল। কিন্তু কামাল হোসেন তেমন কোনো প¬্যাটফর্ম তৈরি করতে সক্ষম হননি। ফলে তার রাজনৈতিক জীবনের অবস্থান খুব নিভৃতেই ছিল, তিনি ব্যক্তিগতভাবে দেশে অসাম্প্রদায়িক একজন রাজনীতিবিদ এবং প্রাজ্ঞ আইনজ্ঞ হিসেবে সব মহলের কাছে শ্রদ্ধার আসন নিয়ে জীবনযাপন করছিলেন।

কিন্তু সম্প্রতি ড. কামাল হোসেন ঐক্যফ্রন্ট গঠনের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক ঐক্যের নেতৃত্ব দিয়েছেন তার সঙ্গে এতদিনের রাজনীতি ও বিশ্বাসের কোনো মিল সচেতন কোনো মানুষ খুঁজে পায়নি। তিনি বরং বিএনপি ও জামায়াতকে নিয়ে যে ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছেন, নির্বাচনী ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেটি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরুদ্ধের রাজনৈতিক শক্তিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার একটি পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে কোনো বিবেকবান মানুষ বিশ্বাস করেন না যে বিএনপি ও জামায়াতকে নিয়ে ড. কামাল হোসেন এবং তার বর্তমান মিত্র নেতারা দেশে অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সামান্যতম সফল হবেন, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়নে একবিন্দু সফল হবেন। কেননা এই জোটের সবচাইতে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং দ্বিতীয় বড় দল হচ্ছে জামায়াতে ইসলাম- যারা গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধ অসাম্প্রদায়িকতা নিয়ে যে রাজনীতি বাংলাদেশে গত ৪০ বছর চর্চা করেছে তার সঙ্গে  কোনোভাবেই মেলানো যায় না।

জামায়াত আন্তর্জাতিকভাবেই একটি জঙ্গিবাদী স্বীকৃত দল, বিএনপি সেই জামায়াতের দীর্ঘদিনের মিত্র দল, বিএনপির অভ্যন্তরেও জামায়াত ঘেঁষা নেতাকর্মীর সংখ্যা রয়েছে, এছাড়া রয়েছে অতি ডান, অতি বাম, ভারত বিদ্বেষী, সাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাসে বিশ্বাসী নেতাকর্মী। যারা বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনে কোনোভাবেই অসাম্প্রদায়িকতার ভাবাদর্শকে প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে না। এমন শক্তিসমূহকে নিয়ে ড. কামাল হোসেন নির্বাচনে খুব চমৎকার ভালো কথায় ভরপুর ইশতেহার দিতে পারেন, গণতন্ত্রের প্রতিশ্র“তি শোনাতে পারেন, সংবিধান মানবাধিকার ইত্যাদি নিয়েও অনেক আকর্ষণীয় বক্তব্য দিতে পারেন।

কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার প্রভাবিত রাজনৈতিক জোট দিয়ে কোনোভাবেই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, ১৯৭২-এর সংবিধান মোতাবেক রাষ্ট্র পরিচালনা করা সম্ভব নয়। কেননা এসব ভালো কাজ করার জন্য যে রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন তা জামায়াত-বিএনপি দিয়ে সংঘটিত করা দিবাস্বপ্নের চাইতেও অকল্পনীয় বিষয়।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আধুনিকায়ন, মানবিক মর্যাদাবোধ, নাগরিক অধিকার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এক দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঘটানো যেতে পারে। সেটি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী, অংশগ্রহণকারী, নতুন প্রজন্মে বিশ্বাসী মেধাবী দেশপ্রেমিক তরুণদের অংশগ্রহণে ঘটানো সম্ভব। এর জন্য চাই সেই দৃঢ় নেতা যা বঙ্গবন্ধু, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদসহ সেই প্রজন্মের অনেকের মধ্যেই ছিল।

কিন্তু পঁচাত্তরের হত্যাকান্ড পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের হাতে খন্ড-বিখন্ডিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গড়ে তোলা স্বাধীনতাবিরোধীদের আশ্রয় শিবির বলে খ্যাত বিএনপি এবং এর সহায়ক শক্তির জামায়াতকে দিয়ে কোনোভাবেই বাংলাদেশে অখন্ড গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি।

তবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত প্রায় চার দশকের লড়াই-সংগ্রামে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রাসঙ্গিকতা ফিরে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রভাব পড়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধারা সম্মান ও মর্যাদায় বেঁচে থাকার সুযোগ পেয়েছেন, বাংলাদেশ আর্থসামাজিকভাবে গত দশ বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়ানোর চমৎকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রের ধারায় বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা একমাত্র শেখ হাসিনার কাছ থেকেই পেতে পারে। অন্য কোনো বিকল্প নেতা সেই প্রতিশ্র“তি ও স্বপ্ন এখনো দেখাতে পারেনি।

সুতরাং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত রাজনৈতিক জোট নানা সীমাবদ্ধতার পরও বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এখনো যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। ড. কামাল হোসেন এবং তার সহযোগীরা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে নির্বাচনী ঐক্যজোট গড়েছেন সেটি বিজয়ী হলে বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনীতি টিকে থাকতে পারবে না যে তার প্রমাণ ড. কামাল হোসেনের বেশকিছু বেসামাল বক্তব্য এবং তার সঙ্গে থাকা ঐক্যফ্রন্টের কোনো কোনো নেতার ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যে প্রচ্ছন্নভাবে পাওয়া যাচ্ছে।

যেখানে ৩০ ডিসেম্বরের পর খালেদা জিয়া মুক্ত হয়ে আসবেন, তারেক রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করবেন, নির্বাচন কমিশনসহ সব প্রতিষ্ঠান থেকে ঐক্যফ্রন্টবিরোধী শক্তিকে বিতাড়ন করা হবে, আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মী হয় দেশ ছাড়তে বাধ্য হবেন নতুবা তাদের হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয়া হয়েছে। এর সবই গণতন্ত্রবিরোধী শক্তির আস্ফালন মাত্র।

দেশে নির্বাচনের আগে এ ধরনের আস্ফালন ও আলামত যদি দেখতে হয় তাহলে নির্বাচনের পর ২০০১-২০০৬ সময়ের চাইতেও ভয়াবহ কিছু ঘটতে যাচ্ছে বলে অনুমান করা যাচ্ছে। দেশের মানুষ এসব বিষয় নিয়ে ভাববে এবং সিদ্ধান্ত নেবে।

লেখক ঃ অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

॥ বিভুরঞ্জন সরকার ॥

নির্বাচন কতটুকু অবাধ হবে

নির্বাচনের আর মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি। নির্বাচনী প্রচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে ১০ ডিসেম্বর। শুরুটা খুব ভালো হয়েছে বলা যাচ্ছে না। নোয়াখালী এবং ফরিদপুরে প্রতিপক্ষের হামলায় আওয়ামী লীগের দুজন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের গাড়িবহরে হামলা হয়েছে ঠাকুগাঁওয়ে। নোয়াখালীতে মওদুদ আহমদের নির্বাচনী সভা পন্ড করে দেয়া হয়েছে। এ রকম ঘটনা না কমে বরং বাড়ছে। উৎসবমুখর পরিবেশ দেশের কোথাও কোথাও আছে। অনেক জায়গায় নেই।  বিএনপি প্রার্থীরা সেভাবে মাঠে নামতে পারছেন না। কোনো কোনো এলাকায় আওয়ামী লীগের বাধার কারণে, কোথাও বাধা দিচ্ছে পুলিশ। গ্রেপ্তার-হামলা-বাধা ভাঙচুরের কারণে বিএনপি এবং তার মিত্ররা ঘরে বসে আছে। নির্বাচনী মাঠ পুরো আওয়ামী লীগের দখলে। এবার নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে। বাধা-প্রতিবন্ধকতার মুখেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। কিন্তু নির্বাচন কতটুকু অবাধ ও সুষ্ঠু হবে সে প্রশ্ন অনেকের মধ্যেই দেখা দিচ্ছে। হামলা-মামলার ঘটনা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি সংঘাতময় হয়ে ওঠার আশঙ্কাই বেশি। আর ভোটের দিনের আগেই যদি পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে ওঠে তাহলে ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে না-ও যেতে পারেন। ভোটার উপস্থিতি কম হলে নানা ধরনের অনিয়মের সুযোগ তৈরি হবে। সেই জন্যই পরিস্থিতির যেন আরো অবনতি না ঘটে সেদিকে নির্বাচন কমিশনের সতর্ক হওয়া উচিত। যারা পানি ঘোলা করতে চাইছে তাদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। বিএনপি এবং তার সঙ্গী ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা মিডিয়ার সামনে বড় বড় কথা বলছেন। তাদের পক্ষে গণজোয়ার তৈরি হওয়ার দাবি করছেন। সরকারের সময় শেষ বলে মুখরোচক বক্তৃতা করছেন। কিন্তু সবাই সমানভাবে উদ্যোগী হয়ে মাঠে নামছেন না। রাজধানী ঢাকাতে বিএনপি প্রার্থীদের খুঁজে পাওয়া যায় না। রাজধানীতে নৌকার পক্ষে স্লোগান শোনা গেলেও ধানের শীষের পক্ষে কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। ঢাকার পনেরো আসনে প্রার্থী মনোনয়নেও বিএনপি খুব দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে বলে মনে হয় না। ঢাকায় বেশ কজন প্রার্থী আছেন যাদের সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন পরিচিতি নেই। তারপরও আশার কথা এটাই যে বিএনপি নির্বাচনে আছে। নির্বাচন কতটুকু অবাধ ও সুষ্ঠু হবে সেটা অনেকাংশে নির্ভর করে নির্বাচন কমিশনের ওপর। কিন্তু কমিশনের ওপর অনেকেরই আস্থা নেই। কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক প্রার্থিতা বাতিল হওয়া অনেক বিএনপি প্রার্থী কমিশনে আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। সে জন্য বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল কমিশনকে ধন্যবাদও জানিয়েছেন। এই ধন্যবাদ আবার ফিরিয়ে নেয়ার পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না তা নির্ভর করবে কমিশনের ওপরই। হামলা-আক্রমণের ঘটনায় কমিশনের ভূমিকায় বিএনপির সন্তুষ্ট হওয়ার কারণ দেখা যায় না। নির্বাচন নিয়ে মানুষের মন থেকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দূর করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। সরকারের উচিত কমিশনকে সর্বোতভাবে সহযোগিতা করা। নির্বাচনের ফলাফল অনেকটা পূর্বনির্ধারিত বলে মনে করা হচ্ছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগই আবার বিজয়ী হবে, শেখ হাসিনাই প্রধানমন্ত্রী হবেন- এটা অনেকেই বিশ্বাস করেন। বিএনপিও সম্ভবত এটাই মনে করে। এবারের নির্বাচনে তাদের লক্ষ্য জয়লাভ নয়, তাদের লক্ষ্য অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং নির্বাচনকে যতভাবে পারা যায় বিতর্কিত করা। একটি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হলে তার বিরুদ্ধ আন্দোলন করা সহজ হবে মনে করেই বিএনপি অগ্রসর হচ্ছে। তবে বিএনপির সবাই একমত একপথ হয়ে চলছেন মনে করারও কোনো কারণ নেই। বিএনপিতে নির্বাচনে অংশ না নেয়ার পক্ষে শক্তিশালী মতো আছে। পরাজিত হওয়ার জন্য নির্বাচনে গিয়ে নির্বাচনকে বৈধতা দেয়া ঠিক না বলে বিএনপির যারা মনে করেন, তারা এখন নানাভাবে চেষ্টা করবেন নির্বাচন ভুল করতে। এই ব্যাপারটিকেও বিবেচনায় রাখতে হবে। বিএনপিকে স্বাভাবিক প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিতে না দিলে দলের ভেতরের নির্বাচনবিরোধী অংশ তার সুযোগ নিতে পারে। কাজেই নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার দায়িত্ব নিতে হবে অবশ্যই নির্বাচন কমিশনকে। সব বিবেচনাতেই আগামী নির্বাচনে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে আওয়ামী লীগ। বিভিন্ন জনমত জরিপেও দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগই এগিয়ে আছে। আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসছে এ নিয়ে সন্দেহ কেবল বিএনপির সমর্থক-প্রচারকদের মধ্যে। অন্য কারো তেমন সংশয় আছে বলে মনে হয় না। সে জন্যই আওয়ামী লীগের উচিত হবে নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করা। বিএনপিকে মাঠছাড়া করে যেনতেন উপায়ে জয় ছিনিয়ে আনার কোনো প্রয়োজন নেই। মানুষের বিবেচনাবোধের ওপর আস্থা রাখতে হবে। শক্তি প্রয়োগ করে বিএনপিকে বাধা দিতে গেলে তাতে বরং বিএনপির প্রতি মানুষের সহানুভূতি তৈরি হবে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভোটারদের বাড়ি বাড়ি যেতে হবে। একদিকে সরকারের সাফল্যের কথা যেমন তুলে ধরতে হবে, অন্যদিকে তেমনি দলের কারো আচার-আচরণের কারণে মানুষ কষ্ট পেয়ে থাকলে, রুষ্ট হলে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। মানুষকে জয় করতে হবে বিনয় ও শিষ্টাচারের মাধ্যমে, ভয় দেখিয়ে নয়। বিএনপিকে কেন ভোট দেয়া উচিত নয় তা তথ্য ও যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে বলতে হবে। বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশের অবস্থা কেমন হয় তা তাদের বিগত শাসনামলের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেই ব্যাখ্যা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামীকে এবার বিএনপি দলীয় প্রতীক দিয়ে নির্বাচন করার বৈধতা দিয়েছে। বিএনপি একদিকে দাবি করে তারা মুক্তিযোদ্ধার দল, অন্যদিকে জামায়াতের জন্য তাদের অপরিসীম দরদ। বিএনপি গণতন্ত্রের কথা বলে কিন্তু ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনাও ঘটায়। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ দলের নেতাদের হত্যার এমন জঘন্য পরিকল্পনাকারী হিসেবে বিএনপিকে যতটা প্রশ্ন ও ঘৃণার মুখে পড়া উচিত ছিল তা তারা পরেনি। বিএনপি দুর্নীতির বিরুদ্ধ বলে। কিন্তু তাদের শাসনামলে সংঘটিত দুর্নীতির ব্যাপারে মুখ খোলে না। বিদ্যুৎ না দিয়ে খাম্বা বাণিজ্য করেছে। হাওয়া ভবনের লুটপাটের কাহিনী সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। বইও বেরিয়েছে। আওয়ামী লীগের কর্মীদের চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে। নির্বাচনকে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করার লক্ষ্য নিয়েই বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। তারা নানা ধরনের উসকানিমূলক কথা বলবে, অসত্য প্রচারণা চালিয়ে উত্তেজনা ছড়াতে চাইলেও তাদের ফাঁদে পা দেয়া চলবে না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা নির্বাচন নিয়ে তৃতীয় কোনো শক্তির ষড়যন্ত্র আছে কিনা তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের অবস্থা ভুলে গেলে চলবে না। তখন ভয়ঙ্কর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। তখন মাঠে সব বাহিনী ছিল। সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ছিল। তবু শত শত মানুষ নিহত হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভস্মীভূত হয়েছে। সেই ঘটনা আলোকে এবারের নির্বাচন প্রস্তুতি রূপরেখা ও কৌশল অবলম্বল করা প্রয়োজন। নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পর মুখোমুখি অবস্থান মানুষকে আশাবাদী করে না।

বিভুরঞ্জন সরকার : সাংবাদিক ও লেখক।

 

 

 

॥ মেজর জেনারেল মো. আব্দুর রশীদ (অব) ॥

রোহিঙ্গা সংকট বনাম আঞ্চলিক সহযোগিতা

আগস্টের ২৫ তারিখ থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গা জনগ্রোত বাংলাদেশের দিকে সুনামির মত ধেয়ে আসতে শুরু করে। আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) নামের একটি সংগঠন ৩০ টি পুলিশ ফাঁড়ি ও একটি সেনা চৌকিতে ভোর রাতে একযোগে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ১২ নিরাপত্তা সদস্যকে হত্যা করে এবং নিজেদের ৭০ জন নিহত হয়। পাল্টা নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসাবে মিয়ানমার সেনাবাহিনী সন্ত্রাস দমন অভিযানের নামে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে অমানবিক নির্যাতন শুরু করে। গণহারে নিরীহ মানুষ নিধন করে, ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, নারী ধর্ষণ, শিশু হত্যা থেকে শুরু করে রোহিঙ্গাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন ধ্বংস করে তাদের বাংলাদেশে তাড়িয়ে দেয়। সীমান্তে তারকাঁটার বেড়া মেরামত ও এলোপাতাড়ি স্থল মাইন বসিয়ে রোহিঙ্গাদের ফেরত আসার সুযোগ বন্ধ করার চেষ্টা করে। মানবিক বিপর্যয়ের পেছনে বর্মী সেনাদের গোপন পরিকল্পনার অস্তিত্ব প্রকাশ পেতে শুরু করে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। আরসা সন্ত্রাসীদের হামলা সম্পর্কে তারা পূর্বেই অবহিত হয়ে প্রস্তুত ছিল। এমনকি জাতিসংঘের কাছেও খবর ছিল রাখাইনের সহিংসতার পরিকল্পনার কথা যা চেপে রেখেছিল আবাসিক সমন্বয়কারী। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিধন ও বিতাড়নের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করার বর্মীদের পরিকল্পিত কৌশল বিশ্বের কাছে আড়াল করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়, যখন ৫ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। চলমান কূটনীতি থেকে সৃষ্ট আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতির কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবার প্রতিশ্রুতি স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি দিলেও বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আগমন থামছে না। সীমান্তে এখনো অনেক রোহিঙ্গা সীমানা অতিক্রমের জন্য অপেক্ষায় আছে। রোহিঙ্গা সংকট তৈরির পেছনে সন্ত্রাস দমনের নামে চালানো মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অনিয়ন্ত্রিত শক্তি প্রয়োগ ও পাশবিক নির্যাতনকে সংকটের সূচনা মনে করা হলেও অন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির গতি প্রবাহ দেখে অনুমান করতে কষ্ট হয় না যে, সংকট সৃষ্টির পেছনে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা তৈরি হয়েছিল অনেক আগেই। আরসার হামলার ধরন ও কৌশল থেকে বোঝা যায়, তড়িঘড়ি করে প্রস্তুতি ছাড়াই হামলা করা হয়েছে। কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট পেশের সঙ্গে হামলার সময় নির্ধারিত হয়েছে। উত্তর রাখাইনে সেনা মোতায়েন আগে থেকেই করা হয়েছিল। আরসা হামলাকে উপলক্ষ হিসাবে নিয়ে নিধনযজ্ঞ চালানো হয়েছে। প্রাণঘাতী সেনা অভিযান মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গণতান্ত্রিক প্রবাহকে বিনষ্ট করেছে, অপরদিকে বাংলাদেশের ঘরোয়া রাজনীতিতে ঘূর্ণিপাক তৈরি করেছে। সমাধানের উপায় খুঁজতে গিয়ে আঞ্চলিক রাজনীতিকে ঘোরপ্যাঁচে ফেলেছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক ও অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্দেশ্যে দশক ধরে গড়ে ওঠা বিসিআইএম ও বিমস্টেকের মত সহযোগিতার কাঠামোতে হঠাত ধাক্কা এসেছে। চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত সহযোগিতা হোঁচট খেয়েছে। সংকট থেকে উত্তরণের পথ ও মত নিয়ে  ভিন্নতা আঞ্চলিক সংহতিকে ঢিলা করেছে অনেকাংশে। বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু দেশ চীন, রাশিয়া ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ধাঁধার মধ্যে পড়েছে। রাখাইনে সেনা অভিযানের যথার্থতা প্রমাণের উদ্দেশ্যে আরসাকে হামলা ও রাখাইনদের উপর নির্যাতনকারী বানিয়ে সহিংসতার হোতা হিসাবে দমনে সেনা নামাতে বাধ্য হয়েছে মিয়ানমার সরকার। রাজনৈতিক সরকার ও সেনা আধিপত্যের দ্বন্দ্ব থেকে রোহিঙ্গা নিধনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছে সেটা সুস্পষ্ট। কফি আনান রিপোর্টের উপর রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রকাশ হবার আগেই  রোহিঙ্গাদের উপর সহিংসতা সৃষ্টি করে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি করা করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী দ্বারা। মিয়ানমারের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর মনে রোহিঙ্গা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক পুষ্টি নিয়েছে। অচলাবস্থা তৈরিতে ক্রীড়নক হিসাবে ব্যবহূত হয়েছে আরসা। মিয়ানমার সেনা আধিকারীকদের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনা গোয়েন্দাদের গোপন সমঝোতার সম্ভাবনার বিষয়টি চিন্তার খোরাক হিসাবে দেখা দিয়েছে। গণতন্ত্রের বিকাশ ও রাজনৈতিক শক্তিকে রুখতে মিয়ানমার সেনাশাসকদের পরিকল্পিত সহিংসতা অং সান সু চিকে বিশ্বের কাছে নিদারুণভাবে ক্ষত বিক্ষত করেছে। অর্ধ শতাব্দী ধরে চলা সেনা শাসনের আমলে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় কট্টরতা বেড়েছে রাষ্ট্রের মদদে। বহু জাতিসত্তার বর্মী রাষ্ট্রের সংহতি ধরে রাখতে সামরিক শক্তির অনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ, বাক স্বাধীনতা হরণ এবং  বার্মা শুধু বর্মীদের এক ভাষা ও এক ধর্মের রাষ্ট্র তৈরিতে জনগণের মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তন করে মানবতার মূল্যবোধে হিংসা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মূল জনগ্রোতের রোহিঙ্গা বিদ্বেষী মনোভাব অং সান সু চিকে মানবতার মৌলিক নীতি থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করেছে। গণতন্ত্র ও সেনা আধিপত্যের সমঝোতা কোনো দেশেই জনকল্যাণমুখী হতে পারেনি। ক্ষমতায় টিকে থাকার পথ হিসাবে অং সান সু চির সেনাদের সঙ্গে সমঝোতা তাকে বেশি ভঙ্গুর করে রেখেছে। বিশ্বের অব্যাহত চাপের মুখে  সু চির রাজনীতি সেনা নির্ভরতা কাটাতে  প্রত্যয়ী নয়। সেনাদের সম্মতি ছাড়া রোহিঙ্গা সংকট উত্তরণে তাঁর ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ব্রিটেন রোহিঙ্গা  সংকট উত্তরণে বেশি তত্পর ও উচ্চকণ্ঠ। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক চাপ জোরাল করতে নিরাপত্তা পরিষদকে উন্মুক্ত আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছে দুবার। স্থায়ী সদস্য দেশ হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ব্রিটেন একাট্টা হলেও অপর দুই স্থায়ী সদস্য রাশিয়া এবং চীন মিয়ানমারের  পক্ষে অবস্থান নিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুকে মিয়ানমারের আভ্যন্তরীণ বিষয় বানিয়ে ধৈর্য সহকারে সমস্যা সমাধান খুঁজতে পরামর্শ দিয়েছে। সহিংসতার দায় আরসা জঙ্গিদের ঘাড়ে চাপাতেও দ্বিধা করেনি। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান রোহিঙ্গা নির্যাতনকে জাতিগত নিধনের পুঁথিগত উদাহরণ হিসাবে চিহ্নিত করে সহিংসতা অনতিবিলম্বে বন্ধ করতে আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব সোচ্চার হয়েছেন মিয়ানমারকে সহিংসতা বন্ধ করার জন্য। অপরদিকে সামরিক জান্তার সঙ্গে পুরোন সম্পর্কে থাকা ভারত, চীন ও রাশিয়া গণতন্ত্রের বিকাশে অং সান সু চিকে শক্তি জোগানোর চেয়ে সামরিক জান্তার সঙ্গে সম্পর্ক গাঢ় করে নিজস্ব  স্বার্থ উদ্ধারে বেশি মনোযোগী। আশঙ্কা রয়েছে, সামরিক আধিপত্য বিলীন হলে পশ্চিমা দেশের স্বার্থ মিয়ানমারে বেশি জায়গা করে নেবে। মিয়ানমার দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সেতু এবং ভারত মহাসাগরের উপকূলবর্তী দেশ হিসাবে অধিক গুরুত্বের অধিকারী। চীন এবং ভারতের কাছে সমান আকর্ষণীয়। সংকটের প্রকৃতি ও প্রকার দেখে এটা সবার কাছে সুস্পষ্ট যে, রোহিঙ্গা সংকট সৃষ্টির পেছনে মিয়ানমারের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদ্যমান সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির বিভাজন সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে আনার বদলে অং সান সু চি সমঝোতার রাস্তা বেছে নিয়ে অবশেষে গোলক ধাঁধায় নিপতিত হয়েছে। মিয়ানমারের প্রতিবেশী প্রভাবশালী দেশ চীন, ভারত ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার জোট আশিয়ানের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও উদ্যোগ ছাড়া রোহিঙ্গাদের দ্রুত সম্মানজনকভাবে প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে পশ্চিমা বিশ্বের উৎসাহী তৎপরতা ও তুরস্কের অতি সংবেদনশীলতাকে চীন ও ভারত সন্দেহমুক্ত ভাবে দেখছে না। দ্বিপাক্ষিক ভাবে সমাধান খুঁজে বের করার নীতি অনুসরণের পক্ষে অবিচল। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পর্ষদের মাধ্যমে বহুপাক্ষিক সমাধানে আগ্রহী নয়।  শরণার্থী সংকটের বাস্তবতা অস্বীকার না করে মানবিক ত্রাণ সহায়তা দিয়ে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে। অপরদিকে নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক শাস্তিমূলক পদক্ষেপে সম্মত হচ্ছে না এবং মিয়ানমারের সপক্ষে যুক্তি তৈরি করে চলেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন শক্ত অবস্থান বজায় রেখেছে। বাণিজ্য অবরোধের হুমকি দিয়ে সেনা জেনারেলদের প্রবেশে অবরোধ দিয়ে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের প্রতি তাদের অবস্থান দৃঢ়। জাতিসংঘ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সমানভাবে তত্পর থাকলেও মিয়ানমার তার অবস্থান থেকে নড়ছে না। বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক উদ্যোগে রয়েছে সমানভাবে। রোহিঙ্গাদের জিহাদি মতাদর্শে অনুরুক্তি রয়েছে বলে ভারত ঝুঁকি এড়াতে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে অনাগ্রহী। অতীতের ৪০ হাজার রোহিঙ্গা বিতাড়িত করার উদ্যোগে এখনো অবিচল। মিয়ানমারের বাসিন্দাদের নিজ বাস্তুভিটাতে ফেরত পাঠানো সমস্যা সমাধানের মূল লক্ষ্য হলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার গতি ফেরত আসবে। রোহিঙ্গা সংকট অঞ্চলের কৌশলগত বন্ধুদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে এবং অনেক দিন ধরে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামোকে ধাক্কা দিয়েছে। ফলে অঞ্চলের ভূ রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের অবকাশ সৃষ্টি করেছে। পুরনো সমীকরণে পাকিস্তান একা হয়ে পড়েছিল, মিয়ানমারকে ঘিরে নতুন সমীকরণে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় চীনা আধিপত্য বাড়বে এবং ভারত কোনঠাসা হয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের হারানোর কিছু না থাকায় জন্ম নেওয়া প্রতিশোধের আকাঙ্খার তীব্রতাকে  কাজে লাগিয়ে জিহাদী যুদ্ধে নামানো অনেকটাই সহজ। আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেট রোহিঙ্গাদের প্রতি তাদের নজর ঘুরিয়েছে ইতোমধ্যেই। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও অধিকারসহ স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন অত্যাবশ্যকীয়। বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি ধরে রাখায় অপশক্তি জায়গা করে নিতে পারছে না। তবুও বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকিতে রয়েছে সমানভাবে। ঝুঁকি সুদূর চীন পর্যন্ত বিস্তৃত হতে সময় নেবে না বেশি। ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের খাতিরে নিরাপত্তা ঝুঁকিকে খাটো করে দেখলে অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। চীন, ভারত ও আসিয়ান জোটের ইতিবাচক উদ্যোগ রোহিঙ্গা সংকট সমাধান দ্রুত বয়ে আনতে সমর্থ হবে, কোশলগত সম্পর্ক অটুট রাখবে এবং উন্নয়ন সহযোগিতাকে গতিশীল করবে।

লেখক : স্ট্রাটেজি ও নিরাপত্তা বিশে¬ষক। ইন্সটিটিউট অফ কনফ্লিক্ট, ল এন্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিস (আই ক্লাডস) এর নির্বাহী পরিচালক

॥ ড. আর এম দেবনাথ ॥

অর্থনীতি কারো কথা শোনে না

চালে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, ক্রমবর্ধিষ্ণু রপ্তানি এবং ক্রমবর্ধিষ্ণু রেমিটেন্স আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি। প্রথমটা আমাদের একান্ত নিজস্ব। দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসবের ওপর খবর সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কয়েকদিন আগে তেমনই একটি খবর একটি দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। খবরটির অনেক গুরুত্ব, তাই এর উল্লেখ করছি। এতে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা ১০ লাখ। অথচ বছরে মাত্র ১১০ কোটি ডলারের মতো রেমিটেন্স আসে মালয়েশিয়া থেকে। ২০১৬-১৭ এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। প্রায় সমপরিমাণ রেমিটেন্সই এসেছে মালয়েশিয়া থেকে। কিন্তু হিসাব বলে আরও অনেক বেশি রেমিটেন্স আসার কথা ঐ দেশ থেকে। রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে, এই মুহূর্তে মালয়েশিয়া থেকে মাত্র ২০ শতাংশ রেমিটেন্স আসে বৈধ পথে অর্থাৎ ব্যাংকিং চ্যানেলে। বাকি ৮০ শতাংশ আসে অবৈধ পথে অর্থাৎ ‘হুন্ডির’ মাধ্যমে। কী মারাত্মক কথা। সিংহভাগ রেমিটেন্স মালয়েশিয়া থেকে আসছে অবৈধ পথে। এর কারণ কী? কারণ হিসেবে রিপোর্টটিতে দুটো বিষয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি হচ্ছে ১০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের মধ্যে মাত্র ৪ লাখ বৈধ এবং ৬ লাখ অবৈধ। দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে অবৈধ পথে ‘রেমিটেন্স’ পাঠালে ডলারপ্রতি বেশি টাকা পাওয়া যায়। অবৈধ বাংলাদেশি শ্রমিকদের সমস্যা অনেক। তারা বৈধ পথে দেশে টাকা পাঠাতে পারে না। কারণ বৈধ পথে দেশে টাকা পাঠাতে হলে কাগজপত্র, ডকুমেন্ট লাগে। তাদের নেই। এমতাবস্থায় বাধ্য হয়েই তারা অবৈধ পথে দেশে টাকা পাঠায়। আর হুন্ডিতে ডলারের বিপরীতে বেশি টাকা পাওয়া যায় এটি একটি পুরনো, অনেক পুরনো সমস্যা। মোদ্দাকথা এই ক্ষেত্রে কয়েকটি। প্রথমত, এত অবৈধ শ্রমিক কী করে মালয়েশিয়ায় গেল? গেলই যখন তাদেরকে বৈধ করার চেষ্টা কি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ/মন্ত্রণালয় নিয়েছে? মনে হয় না। যদি বৈধ করার উদ্যোগ নেওয়া হতো তাহলে বিপুল পরিমাণ রেমিটেন্স থেকে সরকার বঞ্চিত হতো না। কত রেমিটেন্স থেকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে বছরে? ‘হিউজ’ অঙ্কের রেমিটেন্স থেকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে আর পাশাপাশি গড়ে উঠেছে বিশাল হুন্ডি নেটওয়ার্কÑযা দেশের অর্থনীতির শত্র“। হিসাবে দেখা যাচ্ছে, মালয়েশিয়া থেকে মাত্র ৯ হাজার কোটি টাকা আসছে বৈধ পথে ব্যাংকিং চ্যানেলে এবং ৩৬ হাজার কোটি টাকা আসছে অবৈধ পথে হুন্ডিতে। ভাবা যায় কত বিশাল অঙ্কের টাকা! অথচ এই হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকের। প্রশ্ন এই সমস্যা কি শুধু মালয়েশিয়ার সঙ্গে? মনে হয় না। কয়েকদিন পরপরই কাগজে রেমিটেন্সের ওপর খবর ছাপা হয়। তাতে দেখা যায়, পৃথিবীর বহু দেশেই বৈধ এবং অবৈধভাবে বহু বাংলাদেশি কাজ করছেন। এটা নানাভাবে ঘটছে, নানা কারণে ঘটছে, নানা অবস্থায় পড়ে ঘটছে। এখন মুশকিল হচ্ছে  বৈধরা যেমন দেশে টাকা পাঠায়, অবৈধরাও তাদের রোজগারের টাকা দেশে পাঠায়। দেখা যাচ্ছে, উভয় উত্স থেকেই যে টাকা দেশে আসে তার একটা বিরাট অংশ আসে অবৈধ পথে। হুন্ডিতে যা আইনত নিষিদ্ধ। মানি লন্ডারিং প্রিভেনশন অ্যাক্ট বলে একটা কঠিন আইন আছে। এতে হুন্ডি নিষিদ্ধ একটি কাজ এবং দন্ডনীয় একটি কাজ। অথচ এই কাজটি ঘটে চলেছে। মালয়েশিয়া থেকে যেমন বাংলাদেশে হুন্ডিতে টাকা আসছে, তেমনি আমাদের কাগজের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকেও প্রচুর টাকা হুন্ডিতে বিদেশে চলে যাচ্ছে। পোশাক শিল্প খাতে প্রচুরসংখ্যক বিদেশি অবৈধভাবে কাজ করে। এতে চীন, ভিয়েতনাম, ভারত, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কার কর্মীরা আছে। তারা একশ্রেণির মালিকের প্রশ্রয়ে পোশাক খাতে কাজ করে প্রতি বছর। তারাও ‘হিউজ’ অঙ্কের টাকা বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ হুন্ডিতে টাকা আসছে, আবার হুন্ডিতেই বহু টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। দুইয়ের যোগ-বিয়োগে আমরা কি হুন্ডিতে বেশি টাকা পাচ্ছি? এর হিসাব করা কঠিন। তবে দৃশ্যত যে ঘটনাটি ঘটছে তা বোঝা দরকার। অনেকের মনেই প্রশ্ন বাংলাদেশের একশ্রেণির লোক কীভাবে বিদেশে টাকা নেয়, কীভাবে তারা বিদেশে ঘর-বাড়ি করে, ব্যবসা করে, সহায়-সম্পদ করে? দেশ থেকে তো  বৈধভাবে বিদেশে ব্যবসা করার জন্য অবাধে টাকা নেওয়া যায় না। ভ্রমণ, চিকিৎসা, অধ্যয়ন ইত্যাদি কিছু কাজে সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ডলার বিদেশে নিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু ঘরবাড়ি, বিনিয়োগ ইত্যাদি করার জন্য কোনো টাকা বিদেশে নেওয়া যায় না। তাহলে কীভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাঠানো হচ্ছে? মালয়েশিয়ার বিষয়টা বিশ্লেষণ করলে একটা পথের সন্ধান পাওয়া যায়। সেখানে বাংলাদেশি অবৈধ ও বৈধ শ্রমিকের ডলারটা কী হচ্ছে? বাংলাদেশি ‘হুন্ডিওয়ালারা’ শ্রমিকদের কাছ থেকে ডলারটা নিয়ে নিচ্ছে। সেই ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশে হুন্ডিওয়ালারা তাদের লোকের মারফত রেমিটেন্স প্রাপককে টাকাটা দিয়ে দিচ্ছে। এই পদ্ধতিটি খুব সহজ। খুবই গোপনীয় এবং দক্ষ ব্যবস্থা। অবশ্যই ব্যাংকের চেয়ে নিরাপদ ব্যবস্থা। হুন্ডিওয়ালারা ডলার রেখে দিচ্ছে মালয়েশিয়ায়। এবার বাংলাদেশিদের মধ্যে যাদের ডলার দরকার মালয়েশিয়ায় তারা ঐ হুন্ডিওয়ালার কাছ থেকে ডলার নেবে। বিপরীতে বাংলাদেশে তারা তাদের লোকের মারফত টাকা নিয়ে নেবে। মজা হচ্ছে এই টাকা দিয়েই রেমিটেন্স প্রাপককে তার পাওনা পরিশোধ করা হবে। এর চেয়ে সুন্দর ব্যবস্থা আর কী হয়? এই ব্যবস্থাই সারা দুনিয়ায় চালু আছে। অথচ তা অবৈধ, দন্ডনীয় অপরাধমূলক কাজ। চোখের সামনেই তা ঘটছে। এর নামই অর্থনীতি। অর্থনীতি কারো কথা শোনে না। যেখানে যা প্রয়োজন সেখানে তা সে করে। চলে চাহিদা এবং সরবরাহের ভিত্তিতে। দেশপ্রেমের ভিত্তিতে নয়। যদি দেশপ্রেমের ভিত্তিতে ঘটত, যদি সবাই বৈধ পথে দেশে টাকা পাঠাত, পাঠাতে পারতÑ তাহলে বাংলাদেশের অনেক উপকার হতো, অনেক সমস্যার সমাধান হতো। সরকারের অবস্থা আরও মজবুত হতো। অর্থনীতি আরও মজবুত হতো। আমার ধারণা হুন্ডিতে টাকা পাঠানো এবং হুন্ডিতে টাকা বিদেশে নিয়ে যাওয়ার ফলে ইদানীং আমাদের একটা সমস্যা হচ্ছে। সমস্যাটা আমাদের জানা অর্থনীতির বাইরে। অর্থাত্ লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গেছে সমস্যাটা। কী সেই সমস্যা? সমস্যাটা হচ্ছে রেমিটেন্সের অবদান-সম্পর্কিত। আমরা জানি রেমিটেন্স আমাদের অর্থনীতির অন্যতম ‘লাইফলাইন’। এটা আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিকে উজ্জীবিত রেখেছে। আমাদের ‘ভোগস্তর’ ঠিক রেখেছে। গ্রামে ‘ক্যাশ’ সরবরাহ করছে। কোটি কোটি মানুষ খেয়ে পরে আছে। দারিদ্র্যসীমার ওপরে আছে মানুষ রেমিটেন্সের কারণে। এই রেমিটেন্সের অবদান তিনভাবে হিসাব করা যায়। আমাদের মোট জিডিপিতে (গ্রস ডমেসটিক প্রডাকশন) রেমিটেন্সের অবদান কত? অথবা প্রশ্নটা করা যায় অন্যভাবে। রেমিটেন্স ‘জিডিপির’ কত শতাংশ? একইভাবে রেমিটেন্স মোট আমদানি বা রপ্তানির কত শতাংশ? এইভাবে শতাংশের নিরিখে বিচার করলে দেখা যাবে রেমিটেন্সের অবদান ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। এটা শুভ লক্ষণ নয়। আমার মনে হয় সমস্যাটা আমাদের গোচরে আনা হচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ‘জিডিপি’র প্রায় ১০ শতাংশের সমপরিমাণ ডলার দেশে রেমিটেন্স হিসেবে এসেছে। অথচ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল মাত্র সাড়ে পাঁচ শতাংশ। একইভাবে দেখা যাচ্ছে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে মোট রপ্তানির ৬২ শতাংশ ছিল রেমিটেন্সের পরিমাণ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তার পরিমাণ ছিল মাত্র ৪০ শতাংশ। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে আমদানির ৪৭ শতাংশ পরিশোধিত হয়েছে রেমিটেন্সের ডলার দ্বারা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৭ শতাংশ। এই তথ্য দ্বারা কী বোঝা যায়? বোঝা যাচ্ছে বৈধ পথে আমাদেরকে রেমিটেন্স আরও বাড়াতে হবে। অবৈধ পথে রেমিটেন্স আসা যাতে বন্ধ হয়, তার সমুদয় ব্যবস্থা করতে হবে। ‘অবৈধ’ শ্রমিকদেরকে বৈধ করার ব্যবস্থা করে বৈধপথে দেশে রেমিটেন্স পাঠানো নিশ্চিত করতে হবে। ডলারপ্রতি বিদেশে কর্মরত শ্রমিকরা যাতে ‘উচিত’ মূল্য পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এর পাশাপাশি রপ্তানি এবং আমদানি ক্ষেত্রেও আমাদের অনেক পদক্ষেপ নিতে হবে। বহু বছর যাবত্ আমরা বলে আসছি আমাদের রপ্তানিকে বহুমুখী করতে হবে। অথচ বাস্তবে ঘটছে উল্টোটি। আমরা পোশাক শিল্পনির্ভর রপ্তানি খাত করে ফেলেছি। এর থেকে মুক্তি দরকার। দ্বিতীয়ত, আমদানির পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। অনেকের মতে, আমদানির পরিমাণের সঙ্গে ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির হারের কোনো সম্পর্ক নেই। আমদানি যেভাবে বাড়ছে, সেভাবে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ছে না। আমদানির মাধ্যমে বহু টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’, ‘ওভার ইনয়েসিং’ হচ্ছে। এসব বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অথচ এসব বন্ধ না হলে অর্থনীতি প্রকৃত অর্থে উপকৃত হবে না।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

॥ শেখর দত্ত ॥

শেখ হাসিনার কৃতিত্ব নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপর্ব শেষ। শুরু হয়েছে প্রচারপর্ব। ৩০ ডিসেম্বর ভোটপর্বে অংশ নেয়ার জন্য দেশবাসী উন্মুখ হয়ে আছে। এই অবস্থায় দুটো দিক খুবই তাৎপর্যপূর্ণ প্রথমত, সামরিক শাসন নেই, নেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার, দলীয় সরকার ক্ষমতায়, সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে দেশে ভোট হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের আগে কোনো আন্দোলন নেই, শান্তিপূর্ণভাবে সংলাপ হয়েছে, স্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই দুই অবস্থায় নির্বাচন ১৯৭৩ সালের পর আর হয়নি। বিষয়টি দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও অগ্রযাত্রার ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ এবং একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। প্রসঙ্গত, ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল এবং সব দলের অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে নির্বাচন হয়েছিল। তারপর ১৯৭৯ ও ১৯৮৬ সালের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংসদ নির্বাচন সামরিক আইনের মধ্যে যথাক্রমে সেনাশাসক জিয়া ও এরশাদের আমলে সংঘটিত হয়েছিল। দুই নির্বাচনের আগেই কমবেশি আন্দোলন হয়েছিল এবং এর মধ্যে এরশাদের আমলের নির্বাচন বিএনপি নির্বাচন বয়কট করেছিল। ১৯৮৮ সালে এরশাদ আমলের চতুর্থ সংসদ নির্বাচন হয়েছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮ দল, বিএনপির নেতৃত্বে ৭ দল ও বামপন্থীদের ৫ দলের আন্দোলন ও নির্বাচন বয়কটের ভেতর দিয়ে। অন্দোলনের পটভূমিতে ১৯৯১ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল সব দলের অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দলীয় সরকার বিএনপি ও জিয়ার অধীনে আন্দোলন বয়কট ও ভোটারবিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। চার মাস পর জুনে আন্দোলনের পটভূমিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে এবং আন্দোলন ছাড়া স্বাভাবিক অবস্থায় ২০০১ সালে সব দলের অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৮ সালে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট ও আগুন সন্ত্রাসের ভেতর দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। সংসদ নির্বাচনের এই ইতিহাস দেখিয়ে দিচ্ছে, ৪৫ বছর তথা ১৯৭৩ সালের পর এই প্রথম সংবিধানের ভিত্তিতে দলীয় সরকারের অধীনে আন্দোলন না থাকা অবস্থায় স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রথমে সেনাশাসক এরশাদ ও পরবর্তী সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোট নেতা খালেদা জিয়ার পক্ষে সম্ভব হয়নি, শান্তিপূর্ণভাবে সংবিধানের ভিত্তিতে সব দলের অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের।  তারা দুজন অবশ্য সরকারপ্রধান হিসেবে সব দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে চেষ্টা করেননি কিংবা করার মতো ইচ্ছা বা অবস্থানও তাদের ছিল না। কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ হাসিনা অনেক চেষ্টা করেছিলেন সব দলকে নির্বাচনে আনতে। কিন্তু সম্ভব হয়নি। পুরো নির্বাচন পর্বই তখন ছিল দুঃস্বপ্নের মতো, নাশকতামূলক আগুন সন্ত্রাস নির্বাচারে চালিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোটের ক্যাডার-সন্ত্রাসীরা নিরীহ মানুষ-পুলিশ হত্যা ও বাস-ট্রাক পুড়িয়ে তান্ডব চালিয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম বর্ষপূর্তিতে একইভাবে যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে রাস্তায় নেমে আগুন সন্ত্রাস চালিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট নীলনকশা করেছিল যে, শেখ হাসিনা সরকারকে এখনই ক্ষমতা থেকে নামতে হবে এবং ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ কোনো ক্রমেই দেয়া হবে না। নির্বাচন বয়কট করা, সরকার পতন ইত্যাদি কত বড় বড় কথাই না খালেদা জিয়া বাইরে থাকতে তিনি নিজে আর দোষী সাব্যস্ত হয়ে জেলে যাওয়ার পর বিএনপি নেতারা বলেছেন।কিন্তু বাস্তবে এর উল্টোটাই ঘটেছে। বিএনপি-জামায়াত জোট আদালতের রায়ে নেত্রী খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পরও আন্দোলন কিংবা আগুন সন্ত্রাসের পথে না গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সংলাপের ভেতর দিয়ে সংবিধানের ভিত্তিতেই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এই উল্টো ঘটনা একটা বিষয়কে সুদীর্ঘ বছর পর সোজাভাবে সুস্পষ্ট করেছে। তা হলো শেখ হাসিনাই এখন দেশের একমাত্র নেতা যিনি দেশে আন্দোলনের নামে যে কোনো যড়যন্ত্র-চক্রান্ত ও অরাজকতা-অস্থিরতা-অস্থিতিশীলতার পাঁয়তারা বন্ধ করতে পারেন এবং সংবিধান অনুযায়ী দেশকে পরিচালিত করতে পারেন। প্রসঙ্গত, এটা কার না জানা এবং স্বতঃসিদ্ধ যে, প্রথমত অর্থনীতি ও রাজনীতি একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত ও পরিপূরক, প্রথমটা বেসিক স্ট্রাকচার আর দ্বিতীয়টা সুপার স্ট্রাকচার। দ্বিতীয়ত, আমাদের মতো দেশগুলোর পক্ষে বর্তমান দুনিয়ায় নানামুখী ঝড়ঝাপ্টা ও চাপের মধ্যেও উন্নতি-সমৃদ্ধি এবং জনগণের জীবন-জীবিকার মানোন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন টেকসই উন্নয়নমুখী ও জনকল্যাণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপযোগী স্থায়ী রাজনৈতিক ব্যবস্থা। এটা বোধকরি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সংসদীয় গণতন্ত্র আমাদের জাতীয় পছন্দ এবং জাতীয় চার মূলনীতির এক নীতি। সংসদ ও সংসদ নির্বাচনের বাইরে গিয়ে স্থায়ী রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো পথ খোলা নেই। উল্লেখ্য, ইতোপূর্বে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় সেনাশাসক এরশাদ ৯ বছর দেশ চালিয়েছিলেন এবং তখন দুর্নীতি-লুটপাটের মধ্যেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কিছু উন্নয়ন হয়েছিল। কিন্তু গণরোষ ও আন্দোলন ধাক্কা দিতেই ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল এরশাদ। কারণ তখন আমাদের জাতীয় পছন্দ, জাতীয় চার মূলনীতির এক নীতি আর সেই সঙ্গে উন্নয়নের উপযোগী রাজনৈতিক ব্যবস্থা তথা সংসদীয় গণতন্ত্র ছিল না। একই সঙ্গে জাতীয় চার নীতির আরো দুই নীতি জাতিসত্তার স্মারক জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার নামগন্ধ তখন যেমন ছিল না, তেমনি অপর জাতীয় নীতি বঙ্গবন্ধু যাকে বলতেন দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর (সমাজতন্ত্র শব্দটি হচ্ছে ক্ষুধা দারিদ্র্য শোষণ বঞ্চনা থেকে মুক্তির অভিব্যক্তি) বিষয়টিও তখন এরশাদের কাছে কোনো বিষয় ছিল না। বলাই বাহুল্য, জাতীয় চার নীতির যে কোনো এক বা একাধিককে আলাদা করে কিংবা এই চারের মধ্যে ভারসাম্য বিনষ্ট করে আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা স্থায়ী ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা টেকসই হতে পারে না। এই বিচারে রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভঙ্গুর হওয়াটা ছিল নিয়তির মতোই এরশাদের ললাটের লিখন।

এখানে বলতেই হয় যে, দুই পর্যায়ে খালেদা জিয়ার দশ বছরের শাসনামলে লুণ্ঠন ও সন্ত্রাসের মধ্যে উল্লেখ করার মতো তেমন উন্নয়নই হয়নি। বরং এই দুই আমলে গণতন্ত্রসহ জাতীয় চারনীতির বিপরীতমুখী কর্মকা-ই সংঘটিত হয়েছিল। তাই ক্ষুদ্র কলামে ওই দুই আমল সম্পর্কে এখানে কিছু বলার সুযোগ নেই। বলাই বাহুল্য, পঁচাত্তরে সপরিবারে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর পরাজিত শক্তি সুপরিকল্পিতভাবে দেশের অবস্থানকে ক্রমাগত পাকিস্তানি আমলের মতো প্রতিক্রিয়ামুখী করেছে। পরবর্তী সময়ে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ক্রমেই আরো দক্ষিণমুখী হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত সরকার উন্নয়নের উপযোগী গণতন্ত্রসহ জাতীয় চার নীতিতে যথাসম্ভব ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। আর তা পেরেছেন বলেই আন্দোলন বা অস্থিরতা-অরাজকতা ছাড়াই যেমন দশ বছর ধারাবাহিকভাবে দেশ ও জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে, ঠিক তেমনি সংবিধান অনুযায়ী সব দলের অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানও সম্ভব করে তুলছে। বাংলাদেশ এখন কেবল সহস্রাব্দ উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন তথা প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়ন সূচক বৃদ্ধি করে বিশ্ব  প্রেক্ষাপটে বিস্ময় বা উন্নয়নের রোল মডেলই নয়; উগ্র সন্ত্রাস দমন, আইনসম্মতভাবে সমুদ্র বিজয়, আলোচনার মাধ্যমে সীমান্তবিরোধ নিষ্পত্তি ও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে শান্তি সমৃদ্ধি ও মানবতার দেশ হিসেবে বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। দেশের ইতিহাসে এই অবস্থা ব্যতিক্রমী এবং অনন্য। দেশকে এমন এক ভারসাম্যমূলক অবস্থান ও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিঃসন্দেহে কৃতিত্বের দাবিদার। এত বছর পর বিশ্ব সমাজের রীতি ও সংবিধান অনুযায়ী আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা স্বাভাবিকতা বজায় রেখে সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনী মাঠে নামিয়ে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার ইতিহাসে যে উদাহরণ সৃষ্টি করলেন, তা দেশের রাজনীতির ইতিহাসে অমোচনীয় কালিতে লিপিবদ্ধ থাকবে। এই কথাগুলো যখন বলা হচ্ছে, তখন আত্মসন্তুষ্টির কোনো অবকাশ নেই। সামনে অগ্রসর হওয়ার সময়ই আরো বেশি করে সীমাবদ্ধতা দুর্বলতা ও অপারগতাকে বিবেচনায় নিতে হয়। তাতে গতি বাড়ে, লক্ষ্যাভিমুখী পথ বন্ধুর না হয়ে প্রশস্ত ও আলোকিত হয়। বলাই বাহুল্য, বিগত দিনগুলোতে বাক-ব্যক্তি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কার্যকর থাকলেও বিএনপি-জামায়াত জোটের তথাকথিত জনসমর্থনহীন আন্দোলনে বাধাবিঘ্ন কিছু ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো গণতন্ত্র কি আইনের ঊর্ধ্বে! আগুন সন্ত্রাস করতে যেমন রাস্তায় নামতে দেয়া যায় না, তেমনি যারা আগুন সন্ত্রাস করেছে কিংবা লুটপাট করেছে তাদের গ্রেপ্তার করাটাও আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য একান্ত প্রয়োজন এবং তা সরকারের কর্তব্য। যদি বিএনপি-জামায়াত জোটকে ২০১৪ ও ২০১৫ সালের মতো রাস্তায় নামতে দেয়া হতো তবে কি বর্তমানে সব দলের অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে সংলাপ এবং নির্বাচন হতো? নিশ্চয়ই হতো না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দরজা সংলাপের জন্য এখনো খোলা।আর নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর তো দেখা যাচ্ছে, আইনের প্রয়োগ ছাড়া যেমন নির্বাচনে প্রার্থী হতে কারো বাধা থাকছে না, তেমনি নির্বাচন প্রচারণায়ও সব দল একইভাবে নামতে সক্ষম হচ্ছে। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন এখন হাত ধরাধরি করে অগ্রসর হচ্ছে। এ দুই ফ্যাক্টর অবারিত থাকার অর্থটাই কিন্তু তাই! বিজয়ের মাস ডিসেম্বর এখন চলছে। বিজয়ের ৪৭ বছর কয়েকদিন পরই জাতি পালন করবে। দেখতে দেখতে অনেক সময় আমরা পার হয়ে এসেছি। স্বাধীনতার ৫০ বছর রজতজয়ন্তী সামনে। নির্বাচন সামনে রেখে তাই আজ প্রশ্ন আমরা কি জাতীয় চারনীতিকে বর্তমানের ভারসাম্যমূলক অবস্থায় রেখে চলব নাকি ভারসাম্য বিনষ্ট করব? উন্নয়ন ও অগ্রগতির স্বার্থে স্থিতিশীলতা বজায় রাখব নাকি অরাজকতা-অস্থিতিশীলতার দিকে দেশকে ঠেলে দিব? এসব প্রশ্নের সমাধান হবে আগামী ৩০ ডিসেম্বর ভোটপর্বে। সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করা ভিন্ন বিকল্প নেই।

শেখর দত্ত : রাজনীতিক ও কলাম লেখক।

॥ মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী ॥

বিজয়ের মাসে সংসদ নির্বাচন ভাবনা

ডিসেম্বর, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাস। মাসটি শুধু ১৯৭১ সালেই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, স্বাধীনতার পর থেকে প্রতি বছরই বিজয়ের মাসটিকে আমরা একদিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি, অন্যদিকে নতুন প্রজন্ম এই মাসে মহান মুক্তিযুদ্ধের শৌর্যবীর্য থেকে প্রেরণা নেয়ার চেষ্টা করে থাকে। ডিসেম্বরকে তাই আমাদের জাতীয় জীবনের এক অনন্য প্রেরণা সৃষ্টিকারী মাস হিসেবে আমরা পালন করে থাকি। ডিসেম্বর মাসে যা কিছু আমরা করি আমাদের বিবেচনায় মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার চিন্তা কার্যকর থাকে- অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতি নয় এমন কোনো কাজ করা থেকে আমরা বিরত থাকার চেষ্টা করি। সেই বিবেচনা থেকে এবার ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদের একাদশ নির্বাচন। এর আগে ২০০৮ সালেও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৯ ডিসেম্বর। জনগণ সে দিন মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্বস্ত  থেকে যে রায় প্রদান করেছিল তাতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিজয়ী দল ও জোট নতুন সরকার গঠন করে দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে দৃঢ়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচার এতদিন ঝুলেছিল সেটি শুধু শুরুই করেনি অনেকটা সম্পন্ন করেছে, পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংযোজনের মাধ্যমে আগামী প্রজন্মকে দেশ ও জাতির ইতিহাসের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার পাঠক্রম অন্তর্ভুক্ত করেছে। একই সঙ্গে দিনবদলের সনদ রূপকল্প উপস্থাপনের মাধ্যমে সরকার দেশ ও জাতির আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধনের চেষ্টা করেছে। নির্বাচনের আগে সেক্টর কমান্ডার্স  ফোরাম এবং তরুণ সমাজ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি উত্থাপন করেছিল। আওয়ামী লীগ সেই দাবি রূপকল্পে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। ফলে ব্যাপক সংখ্যক মানুষ মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতি সমর্থন জানাতে থাকে। এর নজির ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দেখা যায়। আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারে থাকার কারণে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে, বাংলাদেশে ১৯৭৫-পরবর্তী সময় থেকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক শক্তিসমূহ প্রায় সাড়ে তিন দশক কমবেশি প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে ছিল। সেখান থেকে ১৯৯৬-২০০১ সময়ে অনুকূল অবস্থায় থাকলেও ২০০১-২০০৬ সময়ে চরম প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে পড়েছিল। রাষ্ট্রশক্তি ১৯৭৫-পরবর্তী সময় থেকে ২০০৮ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনুকূলে খুব একটা ছিল না। রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি প্রবলভাবে শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ যে একটি মুক্তিযুদ্ধের স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশ হিসেবে দাবি করত সেটি অনেকটাই পরিহাসমূলক ছিল। ১৯৭৫-পরবর্তী সামরিক, বেসামরিক এমনকি নির্বাচিত ‘গণতান্ত্রিক সরকার’ (১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬)-এর শাসনকালেও বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে অনেক দূরে ছিটকে পড়েছিল, সরকারগুলো মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিসমূহকে রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষার সংস্কৃতি এবং সমাজের সর্বত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। এমনকি স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে সরকার গঠনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভাবাদর্শে দেশ পরিচালনা করেছিল, মুক্তিযুদ্ধের নাম উচ্চারণ করলেও বিকৃত ইতিহাস পাঠ্যপুস্তক ও রাজনীতিতে ভরিয়ে দেয়া হয়েছিল, তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ধারণায় বেড়ে উঠতে রণকৌশল বাস্তবায়ন করেছিল। ফলে বাংলাদেশে তরুণ সমাজের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বাধা ব্যাপকভাবে ছিল। তরুণরা জানতেই পারেনি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব  কোন রাজনৈতিক শক্তি কীভাবে দিয়েছিল। বাংলাদেশের শত্রু-মিত্র  দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কারা ছিল, শত্রু-মিত্র  দেশগুলোর ভূমিকা কি ছিল তা বিকৃতভাবে জানা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। সে কারণে দীর্ঘ সময় ধরে এ দেশের তরুণদের একটি বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিকৃতি ইতিহাস জানা, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত নেতৃত্বের চরিত্র হননের ধারণা পাওয়া ছাড়া সঠিক ইতিহাস জানার সুযোগ পায়নি। এই তরুণরাই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিকে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা (!) জানাতে দেখেছে। ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যার বিকৃত ইতিহাস প্রচার মাধ্যমে শুনেছে, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনীর গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা জানতে পারেনি, পাকিস্তানিদের গণহত্যাকে ‘শত্রু’ বাহিনীর অত্যাচার হিসেবে জেনেছে। ভারতসহ মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী দেশসমূহ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকায় বেশকিছু সরকার প্রচার করেছিল। মূলত এই সরকারগুলো ধরেই নিয়েছিল এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের প্রতি প্রতারণার মাধ্যমে তারা দেশ ও জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ  থেকে চিরকাল দূরে রাখতে সক্ষম হবে। কিন্তু ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এবং মুক্তিযোদ্ধারা নতুনভাবে জেগে উঠেছিল, তারা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার এমন রাজনীতি আর দেখতে চায়নি, দাবি করেছিলেন একাত্তরের ঘাতকদের বিচার। যদিও এই দাবি বহু আগে থেকেই ধীরে ধীরে উচ্চারিত হয়েছিল, ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে দেশব্যাপী গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল, দেশে প্রতীকী গণআদালতে যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির বিচার দেয়া হয়েছিল এবং দাবি করা হয়েছিল এই বিচার যেন দেশের আদালতে অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু তৎকালীন সরকার শুধু এই বিচারকে এড়িয়েই যায়নি যুদ্ধাপরাধীদের দলকে জোটে অন্তর্ভুক্ত করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছিল ২০০১ সালের নির্বাচনে। নির্বাচনে বিজয়ী জোট সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে দেশে অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে নির্মূল করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছিল, দেশে জঙ্গিগোষ্ঠীকে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সুযোগ করে দিয়েছিল। দেশব্যাপী জঙ্গিবাদের চরম উত্থান, বোমাবাজি, হত্যা, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, রাজনৈতিক নেতাদের মেরে ফেলা এবং দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িকতার উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়ার যে আবহ তৈরি করেছিল সেটি কোনো অবস্থাতেই মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে বাস্তবতার সঙ্গে মিল খায়নি। এর ফলে দেশব্যাপী নীরবে সেই সরকার এবং সাম্প্রদায়িক ও স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীর প্রতি চরম ঘৃণা জেগে উঠতে থাকে। সেটিরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম গঠন এবং দেশব্যাপী একাত্তরের ঘাতকদের বিচারের দাবির মাধ্যমে। বলা যায় ২০০৮ সালে বিজয়ের মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তরুণ সমাজ এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্বস্ত জনগোষ্ঠী তাদের মত প্রকাশে সুযোগটি গ্রহণ করেছিল, ভোটযুদ্ধে বেশিরভাগ ভোটারই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ভোটদানের মাধ্যমে বিজয়ের মাসের চেতনার প্রতিফলন ঘটিয়েছিল। এটিকে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের প্রতি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অন্তরের লালিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনারই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখতে হবে। বলা চলে জনগণের এই ভোট ও রায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে দেশ পরিচালনায় এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে অসীম প্রেরণা দিয়েছিল। এর ফলে গত ১০ বছর সরকার বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক শিক্ষার সংস্কৃতি এবং পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে যে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে সেটি বাংলাদেশকে গৌরবের নতুন উচ্চতায় নিতে সাহায্য করেছে। এবার কাকতালীয়ভাবে একাদশ নির্বাচনটিও ডিসেম্বর মাসে ৩০ তারিখ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং প্রশাসনসহ সমাজের সর্বত্র পরিপূর্ণভাবে এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে মুক্তিযুদ্ধের ধারার অনুকূলে রাষ্ট্র যেহেতু গত ১০ বছর পরিচালিত হয়েছে ফলে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তির বিকাশ উল্লেখযোগ্যভাবে ঘটেছে, তরুণদের একটি বড় অংশ এখন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি তাদের বিশ্বাস ও অবস্থান সংহত করতে পেরেছে, দেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংবলিত বই-পুস্তক প্রচার-প্রচারণা এখন সর্বত্র অবারিত। সামাজিক গণমাধ্যমে তরুণদের একটি বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাদের অবস্থান দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করছে, বিরোধীদের কূটকৌশল, অপপ্রচার, মিথ্যাচার, বিকৃত ইতিহাসের জবাব তারাই দিচ্ছে। বলা চলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক তরুণ প্রজন্মের এই অংশ দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর ফলে সময়ের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তারা আবির্ভূত হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ যে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল তার ঝা-া তুলে নেয়ার নতুন প্রজন্ম তৈরি হয়েছে। এরা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির রাজনীতি, দর্শন, কূটকৌশল এবং প্রচার-প্রচারণার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সক্ষম হবে বলে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে। তবে দীর্ঘদিন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একটি গোষ্ঠী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সর্বত্র ঘাপটি মেরে থাকার কারণে নিরন্তর আদর্শিক লড়াই চালিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনোভাবেই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিরাপদ হওয়ার নয়। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদীর এবং মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস ধারণা পোষণকারী রাজনৈতিক শক্তি এখনো বিদ্যমান রয়েছে। এই শক্তি এবারের নির্বাচনে নতুন কৌশলে অংশ নিতে যাচ্ছে। এক সময়ের কিছু আওয়ামী লীগ এবং বামপন্থি নেতা বেশ কয়েক বছর আগে দলছুট অবস্থায় ছিলেন। তারা এবার নির্বাচনে একটি ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। বলা চলে নির্বাচনে জয়লাভের জন্য তারা দ্বারস্থ হয়েছেন বিএনপি-জামায়াতের বিশ দলীয় ঐক্যজোটের কাছে। যদিও সমান্তরাল আরেকটি জোট গঠনের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নাম ধারণ করে এই জোট গঠিত হয়েছে কিন্তু নির্বাচনে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ গ্রহণ করে ঐক্যফ্রন্টের নেতারা বিএনপির আদর্শকেই অনেকটা ধারণ করেছেন। এই প্রতীকটি এখন জামায়াত-বিএনপির সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের এককালের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী নেতারাও নিয়েছেন। ফলে নির্বাচনী এই লড়াইটি হতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি তথা নৌকা বনাম ধানের শীষ তথা আওয়ামী বিরোধী গোষ্ঠীসমূহের লড়াইয়ের মধ্যে। ঐক্যফ্রন্ট দাবি করেছে তারা জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেÑ যেখানে জামায়াত এবং বিএনপি তাদের কাছে মিত্রশক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অথচ জামায়াত এবং বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি কতটা বিশ্বস্ত নাকি অবিশ্বস্ত সেটি তাদের অতীত রাজনৈতিক কর্মকা- থেকে স্পষ্ট ধারণা রয়েছে। মূলত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে জামায়াত ও বিএনপি প্রতিহত করতে গিয়ে দেশব্যাপী যে তান্ডব, অগ্নিসংযোগ, হরতাল, অবরোধ, পোড়াপুড়ি ইত্যাদি সংঘটিত করেছিল সেটি ছিল নজিরবিহীন বীভৎস ঘটনা, জনগণ ভোট দেয়ার সুযোগ সে কারণেই তখন পায়নি, নির্বাচনটি অবাধ ও সুষ্ঠু হতে পারেনি। কিন্তু এখন ওই নির্বাচনটি অবাধ ও সুষ্ঠু না হওয়ার দায় সরকারের ওপর চাপানো হচ্ছে, দায়মুক্তি দেয়া হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতকে। এই কৌশলটি জামায়াত এবং বিএনপির তৎকালীন ভূমিকাকে আড়াল করার একটি অপকৌশল মাত্র। বিএনপি এবং জামায়াত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন পন্ড করতে গিয়ে দেশে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত করতে সক্ষম হলেও নির্বাচনটি সম্পূর্ণরূপে পন্ড করতে পারেনি। ফলে সরকার দৃঢ়ভাবে সেই ষড়যন্ত্র মোকাবেলার মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে দেশকে রূপকল্প-২০০৮ ইশতেহার মোতাবেক ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত করেছে। এর ফলে রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে বিএনপি এবং জামায়াত। বিশেষত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং অন্যান্য বিচার সম্পন্ন করার ফলে এই দুটো দল সাংগঠনিকভাবেই শুধু সংকটে পড়েনি, রাজনৈতিকভাবেও দেশে এবং বিদেশে বেশ শক্তভাবে সমালোচনার মুখে পড়েছে। যে রাষ্ট্রগুলো আগে এই দুটো দলের মিত্র ছিল তারাও এদের ভূমিকায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি। জামায়াত এবং বিএনপি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি যে বিরূপ অবস্থান নিয়েছিল সেটিও অনেক দেশ জানতে পেরেছে। বিশেষত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকালে জামায়াত এবং বিএনপির বিদেশে বিচার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা প্রচার করেছিল, বিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। এসব কারণে অনেক মিত্র তারা হারিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে। বলা চলে জামায়াত এবং বিএনপি রাজনৈতিকভাবে একটি চরম সংকট ও দেউলিয়াপনায় পড়েছে, ঘুরে দাঁড়ানোর অবস্থা দল দুটো হারিয়ে ফেলেছে, জামায়াতের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা যুদ্ধাপরাধী বিচারে দন্ডিত হয়েছে। ফলে দলটির নেতৃত্বে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন অর্থ কেলেঙ্কারির মামলায় দন্ডিত হয়ে জেলে গেছেন। দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা এক দশক আগেই দেশের বাইরে চলে গেছেন। ফলে দলটি নেতৃত্বের সংকটে আছে। বিএনপি এবং জামায়াত সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যে ধারায় ইতোপূর্বে বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল ২০০৮ সাল পরবর্তী সময় থেকে তাতে অবনতি ঘটতে থাকে। বিশেষত বিএনপির মতো দলটি নতুন বাস্তবতায় দলের আদর্শ, উদ্দেশ্য এবং রাজনীতিকে পুনর্মূল্যায়ন না করে জামায়াত তথা সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার কারণে আরো বেশি জনবিচ্ছিন্নতায় পড়তে থাকে এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকট বাড়তে থাকে। এটিই মূলত বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০০৮ পরবর্তী সময়ে যে মুক্তিযুদ্ধের ধারার উত্থান ঘটেছিল তারই প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখার বিষয়। এক সময় যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে অপরাজেয় ভাবা হতো সেটি ২০০৮-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের ফলে দুর্বলতর হতে থাকে। বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে একটি অসাম্প্রদায়িক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ধারায় বিকশিত হওয়ার পর্বে অবতীর্ণ হয়েছিল। এরই বহিঃপ্রকাশ ভবিষ্যতে ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।

বলা হয়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে সরকারি ও বিরোধী দল- উভয়েই হবে অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী গণতান্ত্রিক দল। কিন্তু দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হলো বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের দল হিসেবে দাবি করলেও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে এর আদর্শগত সম্পর্ক ও গাঁটছড়া অবস্থান থাকার কারণে কোনোকালেই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য দল হতে পারেনি। বর্তমান সংকটকালে দলটি হয়তো পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারত। কিন্তু সেই ধারা দলের মধ্যে দেখা যায়নি। অধিকন্তু ঐক্যফ্রন্টের আদলে একটি জোটের নেতৃত্ব বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্যের মাধ্যমে যেই ধারণাটি দেয়ার চেষ্টা করেছে তাতে বিএনপির আদর্শগত পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ আশা করা যায় না। বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্ট একটি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর নির্বাচনী জোট হিসেবে প্রার্থী ও প্রতীক বরাদ্দ করেছে। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আওয়ামী লীগ ঐক্যফ্রন্টের বিরুদ্ধে ১৪ দলীয় জোট যুক্তফ্রন্ট এবং জাতীয় পার্টির সঙ্গে মহাজোটগতভাবে অবতীর্ণ হয়েছে। উভয় জোটের লড়াইটি আদর্শগতভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ বনাম বিপক্ষ, অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষ বনাম সাম্প্রদায়িকতার শক্তিতে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় এই দুই পরস্পরবিরোধী আদর্শের দ্বন্দ্ব নিরসন সহজে হওয়ার নয়, নির্বাচনে পরস্পরবিরোধী যেই লড়াই চলছে তাতে নৌকা প্রতীকে যেই মহাজোট অবতীর্ণ হয়েছে সেটির বিজয় নিশ্চিত হলে মুক্তিযুদ্ধের ধারার বিকাশ রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনে অব্যাহত থাকবে, অপরদিকে ঐক্যফ্রন্টের প্রতীকে যে শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে সেটির বিজয় ঘটলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যতটুকু অর্জিত হয়েছিল তার তেমন কিছু অবশিষ্ট থাকবে বলে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। কেননা এই নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট নামে একটি জোট হলেও কার্যত এটি জামায়াত-বিএনপির ২০ দলীয় জোটের কাছেই আত্মসমর্পণ করে আছে। ফলে নির্বাচনে তাদের বিজয় ঘটলে ঐক্যফ্রন্টও থাকবে না, মহাজোটেরও অস্তিত্ব বিপন্ন করার চেষ্টা রোধ করা খুব সহজ হবে না। বাংলাদেশ এমনি এক আদর্শিক দ্বন্দ্বের উত্তপ্ত বাস্তবতায় এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের এই মাসে রাজনীতির এমন বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনটিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বাসী শক্তিকে দাঁড়াতে হবে, নতুবা বিপর্যয় রোধ করা খুব সহজ হবে না।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

॥ মোস্তাফা জব্বার ॥

বিজয়ের মাসে প্রত্যাশা

নভেম্বরের একুশ তারিখে যখন সশস্ত্রবাহিনী দিবস পালিত হয় তখনই পুরো জাতি একাত্তরের বিজয়ের স্মৃতিতে আপ্লুত হয়। এবারো এই দিনটির অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে আমি নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলাম। আমি বুঝি, পুরো জাতির মনে পড়ে যায় আমরা সে দিন আমাদের জাতীয় সামরিক বাহিনী গড়ে তুলি। বস্তুত পুরো একাত্তর জুড়েই তো ধীরে ধীরে স্বাধীনতার পথে যাত্রা আমাদের।

সেই ২৬ মার্চের পর মুজিবনগর সরকার গড়ে তোলা এবং তারপর মুক্তিফৌজ, মুজিব বাহিনীর জন্ম থেকে প্রতিটি মুহূর্তে আমরা ১৬ ডিসেম্বরের দিকে ধাবিত হয়েছি। যার জীবনে একাত্তর ছিল তার পক্ষেও সেই সময়টাকে কলমে উপস্থাপন করা কঠিন। অন্তত এখনো আমি আমার নিজের অনুভবকে প্রকাশ করতে পারিনি। কেউ সেভাবে প্রকাশ করতে পেরেছেন বলেও মনে হয় না। আমি নিশ্চিতভাবেই এটি বিশ্বাস করি, আমরা আমাদের একাত্তর-পরবর্তী প্রজন্মকে কেবল একাত্তর নয়- একাত্তর যেসব সিঁড়ি বেয়ে তৈরি হয়েছে, যেমন ৪৮, ৫২, ৬২, ৬৬, ৬৮ বা ৭০-এর বিবরণও তুলে ধরতে পারিনি।এসবের খন্ড খন্ড চিত্রই কেবল হয়তো আমরা উপস্থাপন করতে পেরেছি। এ জন্য আমি আমাদের নতুন প্রজন্মকে কেবল বলতে পারি যে, নিজের দেশের ওই নয় মাসের প্রতিটি মুহূর্ত যেখানে যেখানে বর্ণিত হবে সেটাই পড়বে-দেখবে-শুনবে ও জানবে। বাঙালির জীবনে এমন সময় এর আগে কখনো আসেনি- আগামীতেও আসবে না।২১ নভেম্বর সশস্ত্র দিবসের দিনটি ঠিক সেভাবে প্রচারিত হয়নি এবং আমাদের সন্তানদের কাছে সেটির গুরুত্ব  তেমনভাবে তুলে ধরা হয়নি বলে সেটি সেনানিবাসের ভেতরেই সীমিত থেকে যায়। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর জন্মটা ও তার গুরুত্বটা আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে আরো বিস্তারিত জানা দরকার। কেবল তাই নয়, আমাদের নতুন প্রজন্ম স্বাধীনতার আগের মাসের উত্তাপটা অনুভবই করতে পারে না। বস্তুত সাধারণ মানুষ ডিসেম্বরের ৬ তারিখটিতেই বাঙালির বিজয়ের আনুষ্ঠানিক উদযাপনের প্রথম স্মৃতিটা খুঁজে পায়।সে দিন স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পাশাপাশি ভারত কর্তৃক আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি যুক্ত হওয়ায় বিজয়ের বিপুল আনন্দ অনুভব করি আমরা। অন্যদিকে নভেম্বরেই বাংলাদেশের সুনিশ্চিত বিজয়ের আভাস পাওয়া গেলেও দেশটিতে ডিসেম্বরে শুরুতেই মুক্তাঞ্চল গড়ে ওঠা শুরু করে। কিছু এলাকা ১৬ ডিসেম্বরের পর শক্রমুক্ত হলেও বস্তুত ১৬ ডিসেম্বরর আগেই পুরো দেশটাই প্রায় হানাদারমুক্ত হয়। নভেম্বরে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর আনুষ্ঠানিক জন্ম, মুক্তি বাহিনী-মুজিব বাহিনীর তীব্র গেরিলা হামলা ও ডিসেম্বরের শুরুতে ভারতের অংশগ্রহণ পাকিস্তানি হানাদারদের মনোবল গুঁড়িয়ে দেয়। বস্তুত ডিসেম্বর মাসটির সূচনার সঙ্গে সঙ্গে দেশের অনেক এলাকা শক্রমুক্তও হতে থাকে। ফলে প্রতিটি দিনেই আমার মতো লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধার ব্যক্তিগত স্মৃতি অনেক বেশি জেগে ওঠে। আমরা অনুভব করি যে, জীবনের সেই শ্রেষ্ঠতম সময় এই জীবনে আর কখনো ফিরে আসবে না। নিজেকে ভাগ্যবান মনে হয় যে, জাতির এত বড় একটি ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল আমাদের। কৈশোর-তারণ্য থেকে স্বাধীন বাংলার স্বপ্নের লড়াই, স্বাধীন বাংলাদেশ ধারণা ও বাঙালি জাতিসত্তার জন্মের লড়াই এবং একাত্তরের মার্চ থেকে সশস্ত্র লড়াই ও জীবন নিয়ে যুদ্ধ করতে করতে সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে আলো দেখে এই ডিসেম্বর মাসে আনন্দ, শঙ্কা আর ভয় নিয়ে কাটছিল পুরো জাতির সময়।১৯৭১ সালে আমাদের মতো বিশের কোঠা অতিক্রমকারী যুবকদের জন্য সময়গুলো ছিল টান টান উত্তেজনা আর নানামুখী ঘটনায় ভরা।আমার রাজনীতির সূচনা ১৯৬৬ সালে। ঢাকা কলেজে ভর্তি হওয়ার মধ্যদিয়ে একদিকে ঢাকা শহরে প্রবেশ করি অন্যদিকে রাজনীতিতে যোগ দিই। যারা সেই সময়ে ঢাকা কলেজে পড়েছেন তারা জানেন যে সরকারি সেই কলেজটিতে রাজনীতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। কলেজের অধ্যক্ষ জালালউদ্দিন আহমেদ আমাদের কলেজের ভেতরে একটি লিফলেটও বিতরণ করতে দেননি।১৯৬৭ সালে বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। আমরা সেই বছর থেকে নিজেদের একটু বেশি শক্তিশালী ভাবতে থাকি। ধীরে ধীরে দেশের অবস্থাও বদলাতে থাকে। ঢাকা কলেজে ছাত্রলীগের শাখা থাকলেও আমরা কলেজের ভেতরে কোনো রাজনীতি করতে পারতাম না।১৯৬৮ সালে যে দিন ঢাকার রাজপথে প্রথম স্লোগান দিয়েছিলাম, বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর, সে দিন থেকেই ভালো কিছুর জন্য লড়াই করছি, ভালো কিছুর জন্য অপেক্ষা করছি। বড় কিছুর জন্য লড়াই করছি- বড় কিছু করার চেষ্টা করছি। একাত্তরে বিজয়ের জন্য লড়াই করেছি। বস্তুত একাত্তরে আগেও বিজয়ের জন্য লড়াই করেছি। বিজয়ের জন্য সেটিই সম্ভবত প্রথম বড় লড়াই। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ তৈরির প্রথম লড়াইটা ছিল নির্বাচনকে ঘিরে। একাত্তরের পরও বিজয়ের জন্য লড়াই করছি। ব্যক্তিগতভাবে এই লড়াই আমার জীবনব্যাপী লড়াই। এবার ২০১৮ সালেও সেই ১৯৭০-এর মতো একটি নির্বাচনী লড়াই উপস্থিত হয়েছে।১৯৮৮ সালের বিজয় দিবসে বিজয় বাংলা কিবোর্ড প্রকাশ করেছি। সেই বিজয়ের এবার তিন দশক পার হচ্ছে। ২০০৮ সালের ৬ ডিসেম্বরই আমি আওয়ামী লীগের ধানমন্ডি অফিসের দোতালায় বসে দিন বদলের ইশতেহারের রূপকল্প ২০২১ সংবলিত নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশের শব্দটি লিখেছিলাম। ১১ ডিসেম্বর ২০০৮ সেটি আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির অনুমোদন পেয়েছিল। ১১ ডিসেম্বর ২০০৮ আমি এসোসিওর হংকং সম্মেলনে ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণাকে প্রথম আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশ করেছিলাম।তার আগের বছর স্বাধীনতা দিবসে ডিজিটাল বাংলাদেশ নামক একটি নিবন্ধ প্রথম ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়। মাসিক কম্পিউটার জগৎ পত্রিকার এপ্রিল সংখ্যায়ও সেই নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়। ১২ ডিসেম্বর ২০০৮ জননেত্রী শেখ হাসিনা সেটি ঘোষণা করেন। ২৩ ডিসেম্বর ২০০৮ ডিজিটাল বাংলাদেশ বিষয়ক প্রথম সেমিনার করেছিলাম। ২৫ ডিসেম্বর ১৯৯৯ আমি প্রথম আনন্দ মাল্টিমিডিয়া স্কুল প্রতিষ্ঠা করি। ২৮ ডিসেম্বর ২০১৫ দেশের প্রথম ডিজিটাল স্কুল চালু করি। এই মাসে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি আরো অনেক বড়। ৯ ডিসেম্বর আমি প্রথম বাবা হই। আমার বড় মেয়ে সাবরিনা শারমিনের জন্ম সে দিন।প্রতি বছর যখন ডিসেম্বর মাস আসে তখন আমার ছেলে, যার নাম বিজয়, সে প্রায় প্রতিদিন তার বাবা-মার সঙ্গে ইতিহাস নিয়ে কথা বলে। কয়েক বছর আগে সে মায়ের সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে গিয়েছিল। তার মা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলে মুজিব বাহিনীর অনেকের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। সে দিন সন্ধ্যায় আমিও গিয়েছিলাম সেই অনুষ্ঠানে। ওখানে সে তার বাবা-মায়ের বন্ধুদের কাছে গল্প  শুনেছে তার ১৮ বছর বয়সী মা কেমন করে বাঞ্ছারামপুরের গ্রাম থেকে পালিয়ে ভারত গিয়েছিল, কেমন করে মুক্তিযুদ্ধ করার জন্য সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়েছিল এবং তারও পরে দেশে ফিরে কেমন করে রাজনীতি করেছে। বাবার কথা বেশি শুনেছে সাংবাদিক হিসেবে। বাবার যুদ্ধক্ষেত্রটা হাওরে এবং সেখানে সে প্রায় যায়ইনি বলে বাবার যুদ্ধের কথা সে খুব একটা জানে না। এখন সে প্রায় প্রতিদিনই প্রশ্ন করে, তোমরা কেমন করে মার্চ মাস তৈরি করলে, কি করলে তখন, নয় মাসে তোমাদের কি কি অভিজ্ঞতা রয়েছে এসব নিয়ে।এতদিন তার মাঝে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে কোনো কৌতূহল ছিল না, পাকিস্তান কেন ভাঙা হলো এবং পাকিস্তানের জাতীয়তার সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয়তার কি কি পার্থক্য আছে, মুসলিমপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও মৌলবাদ কেন আমাদের চালিকাশক্তি হতে পারে না এসব বিষয় নিয়ে তার ব্যাপক আগ্রহ। আমি খুব অবাক হয়েছি যখন দেখলাম সে নিজেই বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের বর্তমান নিয়ে একটি তুলনামূলক চিত্র তৈরি করেছে। পাকিস্তানে জঙ্গিবাদের বিকাশ, অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব, মৌলবাদ এবং ক্রমশ পেছনে পড়ার বিষয়টি এখন সে মিডিয়ায় পায়।ক’দিন আগে এক টকশোতে একজন পাকিস্তানি যখন পাকিস্তানকে বাংলাদেশ বানানোর কথা বলেছে তখন সে নিজেই গর্বিত হয়েছে। আমার কাছে ওর যে বাক্যটি সবচেয়ে ভালো লেগেছে সেটি হলো; তোমরা পাকিস্তান ভেঙে আমাদের একটি জগদ্দল পাথরের নিচ থেকে রক্ষা করেছো। যদি তোমরা তা না করতে তবে আমরা এখন তালেবান থাকতাম এবং সারা দুনিয়ায় মুখ দেখাতে পারতাম না। সে তার মাকে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখিয়েছে বাংলাদেশ কোন কোন সূচকে পাকিস্তানের চাইতে এগিয়ে আছে।ওদের মাঝে সবচেয়ে বড় যে জিনিসটা লক্ষ করেছি সেটি হলো, কাজটি কেন এখনই হচ্ছে না তাতে অস্থিরতা কাজ করে। ইন্টারনেটের গতি নেই কেন বা দাম কেন বেশি সেটি যেমন করে ওদের ভাবায়, তেমনি করে পেপাল নেই কেন বা ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলে সচিবালয় এখনো এনালগ কেন, সেটিও এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের বিশাল প্রশ্ন।আমি মাত্র ক’দিন আগে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের দেয়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচকটি আমার ছেলেকে বলছিলাম। তাকে জানিয়েছিলাম বাংলাদেশের নারীশিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ক তথ্যগুলো। আমাদের মেয়েরা যে বিশ্বের অন্যতম সেরা ওয়ার্কফোর্স  সেটি ওকে বোঝাতে হলো না। আমাদের মা ও শিশুর স্বাস্থ্যবিষয়ক অগ্রগতি ছাড়াও কৃষক, প্রবাসী বাংলাদেশি ও গার্মেন্টস শ্রমিকদের অর্জন নিয়ে ওকে নিজেকেই গর্ব বোধ করতে দেখলাম।স্বাধীনতার পরপর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের তলাহীন ঝুড়ির গল্পটা সে জানে। সে এটিও জানে যে, মাত্র ৭০০ কোটি টাকার বাজেট দিয়ে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু এবং এখন আমরা সাড়ে চার লাখ কোটি টাকার বাজেটের মাঝে পৌঁছেছি। ওর নিজের কাছে অবাক লেগেছে যে হাতির ঝিল-বেগুন বাড়ি খালের জন্য বরাদ্দ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা হতে পারে।বাংলাদেশের ক্রিকেটের জয়যাত্রা থেকে শুরু করে আউটসোর্সিংয়ে ওর প্রজন্মের সফলতাসহ আমাদের সব অর্জনকে আমাদের সন্তানের প্রজন্ম ইতিবাচক হিসেবেই দেখে। নিজের টাকায় পদ্মা সেতু বানাতে পারি এ জন্য গর্ব করে। ২০০৮ সালে ৫৫০ ডলারের মাথাপিছু আয় ১৭৫৩ ডলার হয়েছে এটি ওর কাছে বিস্ময় মনে হয়। যে দিন আমাদের সন্তান এমন সব বাক্য উচ্চারণ করেছে সে দিন আমার কাছে মনে হয়েছে আমরা একাত্তর ভুল করিনি এবং মুক্তিযুদ্ধ করেও কোনো ভুল করিনি। স্বাধীনতার এত বছর পর যাদের জন্য বাংলাদেশ গড়েছিলাম তাদের মাঝে আশার আলো দেখলে ভালো লাগে। এটিও ভাবতে ভালো লাগে যে, কেবলমাত্র একটি দক্ষ, দুর্নীতিহীন প্রশাসন ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো মীমাংসা করা গেলে সামনের এক দশকে বাংলাদেশ বিশ্বের একটি সেরা দেশে পরিণত হতে পারে। আর সেই লক্ষ্যটি পূর্ণ হবে যখন আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে পারব এবং এর পরের স্তরে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ব। আমার বিশ্বাস ১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরে ওরা আমাদের ১৯৭০-এর বিজয়ের মতো বাংলাদেশকে বিপুলভাবে বিজয়ী করবে।

লেখক ঃ তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ।

॥ অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান ॥

খেলাপি ভোটাররাও নন-খেলাপি প্রার্থী চান

সব রাজনৈতিক দল এবং জনগণের সমন্বয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রেখেছি। বর্তমানে নানা ক্রটিবিচ্যুতি, একে অপরের বিরুদ্ধে বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগসহ নানা অসঙ্গতিপূর্ণ বিষয় থাকা সত্ত্বেও আমরা একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথেই হাঁটছি। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচনের মূল সুবিধাভোগী রাজনৈতিক দল এবং রাজনীতিবিদরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন।

আমি মনে করি, দিনশেষে এই অংশগ্রহণমূলক উপস্থিতি নির্বাচনের ইতিবাচক লক্ষণ। ইতোমধ্যে মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। নির্বাচনে প্রার্থীর মনোনয়ন যাচাই-বাছাই করা লোয়ার লেভেলের কাজ। অর্থাৎ রিটার্নিং কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তা প্রার্থীদের মনোনয়ন বাছাই করে থাকেন। এই কাজটি করার ক্ষেত্রে তাদের পক্ষে কোনো ধরনের  বৈষম্যমূলক আচরণ করার সুযোগ নেই। নিজ বুদ্ধি, বিবেক, বিবেচনা মতো অর্থাৎ ‘মনে হয় এ রকম হতে পারত’, এমন কোনো কিছু করার সুযোগ নির্বাচন কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্টদের দেয়া হয় না। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য তাদের একটি ফরমেট নির্ধারণ করে দেয়া আছে।

ঋণখেলাপির বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়ে থাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকা অনুযায়ী। এ ক্ষেত্রে যদি কোনো প্রার্থীর নাম বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাঠানো ঋণখেলাপিদের তালিকায় থাকে সে ক্ষেত্রে বিষয়টি সঠিক অথবা ঠিক নয়, এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার কোনো এখতিয়ার লোয়ার লেভেলের কারো নেই। কাজেই ঋণখেলাপির বিষয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে প্রার্থিতা বাতিল ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এমনকি তথাকথিত হেভিওয়েট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল ছাড়া আর কিছু করার নেই।

আর মামলা-মোকদ্দমায় যারা সাজাপ্রাপ্ত, তাদেরও প্রার্থিতা বাতিল হচ্ছে। কারণ হাইকোর্টের আপিল বিভাগ থেকে বিষয়টি নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ যারা কোনো কারণে দন্ডিত, তারা দন্ডভোগের ৫ বছর আগে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। কোনো প্রার্থী যদি দন্ডপ্রাপ্ত এবং ঋণখেলাপি হয়ে থাকেন, তাহলে তার মনোনয়ন বাতিল হবেই। ঋণখেলাপির ক্ষেত্রে পরিমাণের বিষয়টি রয়েছে। অর্থাৎ কে কত টাকা ঋণখেলাপি? কোনো পদ্ধতিগত কারণে ঋণখেলাপি কিনা? তার জন্য প্রার্থীর আপিল করার সুযোগ রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে গত তিনদিনে প্রার্থীরা আবেদন করেছেন। কেবল তাই নয়, যদি প্রতিপক্ষ কোনো ব্যক্তি মনে করেন চূড়ান্তভাবে নির্বাচনে টিকে যাওয়া ব্যক্তিটি প্রার্থী হওয়ার যোগ্য নয়, তাহলে প্রতিপক্ষ সেই প্রার্থীর বিরুদ্ধেও আপিল করতে পারেন। আবার মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ে যারা বাদ পড়ছেন, তারা পুনরায় প্রতিকারের জন্য উচ্চ আদালতে যেতে পারবেন। বিবাদমান পক্ষগুলোর মধ্যে  থেকে কেউ যদি মনে করেন, তাকে বাদ দেয়া হয়েছে কিন্তু ঋণখেলাপিভুক্ত কেউ একজন টিকে গেলেন, তাকে বাদ দেয়া হয়নি, তাহলে টিকে যাওয়া ব্যক্তির বিরুদ্ধেও আপিল করার সুযোগেটি রয়েছে।

বর্তমানে নানা দিক বিবেচনা করে ৭৮৬ জনকে বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু এদের মধ্যে অনেকে আবার আইনি লড়াই করবেন। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে টিকে যাবেন। আর যারা ইতোমধ্যে টিকে গেছেন, ২২৮৯ জন, তাদের মধ্যে থেকে অনেকে আবার বাদ পড়বেন। প্রথম ধাপে তারা হয়তো অনেক ফাঁকফোকর দিয়ে পার হয়ে গেছেন। কিন্তু তাদের প্রতিপক্ষরা নির্বাচন কমিশনে নানা তথ্য, মামলার ডকুমেন্ট জমা দিবেন। এতে করে প্রথমদিন টিকে যাওয়া অনেকের প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যাবে।

আবার বাদ পড়া ৭৮৬ জনের মধ্য থেকে অনেকে আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবেন। প্রতি বছর এমন হয়ে থাকে, এবারো তাই হচ্ছে। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নির্বাচনী হলফনামায় দেয়া অর্থ সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

তবে আমি মনে করি, তাদের হিসাব নিয়ে ন্যূনতম সন্দেহ থাকার কোনো কারণ থাকা উচিত নয়। কারণ বিষয়গুলো হাইলি সেনসিটিভ। বিষয়টি তারা ভালোভাবে জানেন এবং সঠিক হিসাবই দেয়া আছে। তাদের বিষয়ে কেউ যদি সন্দেহ প্রকাশ করে থাকেন, তাহলে তিনি ভুল করছেন এটা বলা যাবে না। মনে রাখতে হবে, ওয়ান-ইলেভেনের পর খালেদা জিয়া অতিরিক্ত জরিমানা দিয়ে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করেছেন। মূল্যস্ফীতির কারণে ১০ বছর আগে সম্পদের মূল্য আগে যা ছিল, বর্তমানে ওই দাম তিনগুণে গিয়ে পৌঁছেছে। কাজেই যারা রাজনীতির উচ্চ পর্যায়ে আছেন, তাদের এ বিষয়ে সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকার চেষ্টা করবেন। অন্তত আমি সন্দেহ করি না। বর্তমানে অনেকে এখন বড় বড় ঋণখেলাপি রি-শিডিউল করে নিয়েছেন।

এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের একটি নীতিমালা অবশ্যই রয়েছে। ঋণখেলাপি দুই-তিন ধরনের হয়ে থাকে। একটি হচ্ছে ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি। কারো কারো ক্ষেত্রে আবার সিস্টেমের কারণে ঋণখেলাপি হয়। যেমন- শিল্পকারখানা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পরে গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংযোগের অনুমতি পাননি। ফলে ঋণের কিস্তি দিতে পারছেন না।

তবে খেলাপি ঋণ রি-শিডিউল করা আইনসম্মত ব্যাপার। কেবল বড় ব্যবসায়ীরা খেলাপি ঋণ রিসিডিউল করতে পারবেন, এমন নয়। ছোটদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। অন্তত এ ক্ষেত্রে আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। ছোট-বড় সবাই খেলাপি ঋণ রি-শিডিউল করতে পারে। এতে কোনো অসুবিধা নেই। পানি, বিদ্যুৎ, টেলিফোন বিল না দেয়া, ঋণখেলাপি কিংবা মামলা ইত্যাদি ছোট ছোট বিষয়গুলো আমাদের রাজনীতিবিদদের মনে রাখতে হবে।

বাস্তবতা হচ্ছে নির্বাচনের প্রার্থীরা কেবল এগুলো নিয়মিত পরিশোধ করেন না, এমন নয়। সমাজের অনেকেই এসব বিল দেন না। সমাজের যারা ‘সাধারণ জনগণ’ আছেন, তারাও অনেক কিছুরই বিল দেন না। কিন্তু যে ব্যক্তি পানি, বিদ্যুৎ, টেলিফোন বিল দেন না কিংবা ঋণখেলাপি, তারও চাওয়া হচ্ছে নেতা হবেন শতভাগ স্বচ্ছ। তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকা যাবে না। নেতা হবেন শতভাগ ক্রটিমুক্ত। আমেরিকায় বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, কিংবা ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশা কোনো ব্যাপার নয়। সেখানে অবাধ স্বাধীনতা। কিন্তু যখন কেউ নির্বাচনে দাঁড়ায়, তখন সবাই চান প্রার্থীর বা নেতার কোনো নৈতিক স্খলন আছে কিনা? যে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন তোলা যায়।

অর্থাৎ আমাদের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের স্কুলজীবন থেকে শুরু করে কোনো ক্ষেত্রে কোনো রকমের আচরণের মধ্যে সামান্যতম ক্রটি থাকা উচিত নয়। বর্তমানে বাংলাদেশে আয়কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী লোকের সংখ্যা মাত্র ৩০ লাখ। কিন্তু আয়কর দেয় মাত্র ১২ লাখ লোক। যারা জনগণ অর্থাৎ ভোটার, তারা সবাই ভালো, আর যারা নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন তারা খারাপ হয়ে গেছেন, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।

১৬ কোটি মানুষের দেশে আয়কর দেন মাত্র ১২ লাখ। এর অর্থ হচ্ছে, দেশে প্রচুর লোক আছেন, যারা কর বা ঋণের টাকা দিচ্ছেন না। তারা ভোটে দাঁড়াননি। পানি, বিদ্যুৎ, টেলিফোন বিল দিচ্ছেন না এমন লোকের সংখ্যাও সমাজে অনেক। প্রার্থীদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আসছে কারণ একটিই, তারা ভোটে দাঁড়িয়েছেন অর্থাৎ নির্বাচন করছেন। তা না হলে খেলাপিদের তালিকায় তাদের নামই আসত না, জনগণও জানতে পারত না। নির্বাচনে প্রার্থীদের চেয়ে বড় বড় বিল বা ঋণখেলাপি শত শত আছে। আর একটি বিষয় হলফনামায় তথ্যের সত্যতা গুরুত্বপূর্ণ। যদি হলফনামায় তথ্যের কোনো গড়মিল থাকে, সেটা দেখার জন্য আলাদা কমিশন রয়েছে।

বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের সক্ষমতা অনেকাংশে বেড়েছে। তারা বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজনদের ডেকে পাঠাচ্ছে। মন্ত্রী-এমপিকে সমন দিচ্ছে, চিঠি দেয়া, ডেকে পাঠানো এই কাজগুলো এখন বেশ ভালোভাবেই হচ্ছে। এতটুকু দুদকের কর্মকান্ডও আগে ছিল না। তবে আমাদের মতো ‘জনগণ’ যখন নির্বাচনের প্রার্থীদের ঋণখেলাপিসহ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি, তখন এ থেকে রাজনীতিবিদদের জন্য এক ধরনের শিক্ষা হওয়া দরকার। কাজেই যেসব প্রার্থী বিল না দেয়ার কারণে বাদ পড়ছেন, তারা এক সময় মনে করতেন বিল দেয়া কোনো ব্যাপারই নয়।

বর্তমানে অনেকে ক্ষমতায় আছেন, যারাও বিল ও ঋণখেলাপি হচ্ছেন, বিল দিচ্ছেন না। দিনশেষে তাদের পরিণতিই এমনই হবে। কাজেই এটি আমাদের রাজনীতিবিদদের জন্য একটি বার্তা যে, ছোট হোক বড় হোক সব ঋণ কিংবা বিল খেলাপিই বড় কাজের স্বপ্নভঙ্গের অন্তরায়। আমার বক্তব্য হচ্ছে, নানা কারণে প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার বিষয়টি গণতান্ত্রিক চর্চারই একটি অংশ। এ নিয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে এক ধরনের সচেতনতা তৈরি হচ্ছে।

আগের প্রজন্ম যাই করুন না কেন, বর্তমান প্রজন্ম ‘টিন’ নাম্বার সংগ্রহ, আয়কর জমা দেয়া ইত্যাদি কাজে ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলেছে। করমেলায় আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার কোটি টাকা কর আদায় হয়েছে। যখন আয়কর মেলা শুরু হয়, তখন আদায়ের পরিমাণ ছিল তিনশ থেকে চারশ কোটি টাকা।

এদিক থেকে বিল ও ঋণখেলাপিদের সতর্ক করা নির্বাচনের আরেকটি সুফল। আমরা যদি খেলাপিদের নাম ধরে বলতে পারতাম, তাহলে গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যমে বিল ও খেলাপি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে  গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করত। নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলের অভিযোগের বিষয়গুলোর মধ্যে কিছু আছে কথার লড়াই। এগুলো চলতেই থাকবে। প্রতিদিন কিছু কিছু লোক নির্বাচনের অসঙ্গতি নিয়ে অভিযোগ দিবেন। আর এর মধ্যদিয়ে একটি ভালো নির্বাচন হয়ে যাবে।

অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ আসবে। নির্বাচন কমিশন সমাধান করবে, ব্যবস্থা নিবেন। এগুলো চলবেই। মূল বিষয় হচ্ছে জনগণ। নির্বাচনে জনগণই সব কিছু বিবেচনা করবে এবং তারাই স্বাধীন ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। নির্বাচন কলুষিত হবে, টাকা-পয়সা ব্যয় হবে, মাস্তানিসহ বহু কিছু হবে। আমি বলি শেষ বিচারে জনগণই ভোট দিবেন। কোনো ব্যক্তি কথা দিয়ে কথা রাখেননি, ঋণখেলাপি, সেসবের অনেক কিছুই জনগণ জানেন। তাহলে জনগণ কেন তাকে ভোট দেয়? কেন্দ্রে যাওয়ার পরে জনগণকে কেউ বাধ্য করছে না। কাজেই আমাদের নৈতিক স্খলন কেবল ৭৮৬ জনের মধ্যে হয়েছে, এমন নয়।

জনগণের মধ্যেও সমস্যা রয়েছে। আমরা ছোটবেলা থেকে ছাত্ররাজনীতি করেছি। সে সময় নির্বাচনী পোস্টার আসত, বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে পোস্টার লাগানো বিলি করা ইত্যাদি কাজ করেছি। কেবল একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে।

কিন্তু এখন টাকা ছাড়া কোনো প্রার্থীর পোস্টার কেউ লাগাবে না। গুনেগুনে টাকা নিবেন কর্মীরা। ২০০টি পোস্টারের জন্য ২০ হাজার টাকা দিতে হবে। তা না দিলে পোস্টার মুখে ছুড়ে ফেলে চলে যাবে কর্মী। কাজেই জনগণ বলতে যাদের বোঝানো হয়, তারাও এত নিষ্পাপ নয়।

লেখক ঃ উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

সামনে নির্বাচন

॥ কামাল লোহানী ॥

বুক বাঁধছে জনগণ

সামনে যে একাদশ জাতীয় নির্বাচন, তাই নিয়ে কথা বলছিলাম, নির্বাচনকে উপলক্ষ করে যেসব রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করেনি এমনকি বিএনপিও পর্যন্ত তাদের বিশ দল নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন সৃষ্টি করতে পারেনি কেবলই ঘরে বসে হুমকি-ধমকি দিয়েছে এবং মাঝেমধ্যে মানববন্ধন করেছে কিংবা প্রেসক্লাবের ব্যয়বহুল মিলনায়তনে বসে তত্ত্ব আওড়েছে, তাতে সরকারের কিচ্ছু আসে যায়নি, এরা ভবিষ্যতে তাহলে কী করবে? অথচ আজ কেন গণফোরাম জাসদ রব আর মান্নার নাগরিক ঐক্য আর বি চৌধুরীর বিকল্পধারা এক হয়ে ‘রা’ করে উঠল। আবার এদের মধ্যেই ভাঙন দেখা দিল বি চৌধুরী চলে গেলেন, কাদের সিদ্দিকী এসে যোগ দিলেন কামাল হোসেনদের সঙ্গে।

এখন প্রশ্ন হলো- গত দশ বছরে এরা যাই করুক না কেন এখন অন্তত জেগে উঠেছেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে, তাতে তাদের সাধুবাদ জানাই। কিন্তু আপনাদের দলে ক’জন লোক আছেন আর ক’টাই বা আসন পেতে পারবেন? আবার তাই নিয়ে আসন ভাগাভাগির লড়াই চলছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের একজন হিসেবে বিএনপি সবচেয়ে বড় দল। স্বাভাবিকভাবেই তারাই বৃহদাংশ দাবি করবেন, করছেনও। বিএনপির ভেতর নানা অন্তর্দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে জামায়াতকে নিয়ে এবং সংগঠনহীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অংশীদারদের নিয়ে।

এ কথা ঠিক নাগরিক ঐক্য, জাসদ রব, কাদের সিদ্দিকীর কৃষক-জনতা লীগ এবং কামাল হোসেনের গণফোরাম, যারা যে ক’টা আসনই পান না কেন তাদের বিএনপি-জামায়াতের সমর্থন নিয়েই শেয়ালের মতো আঙ্গুর ফলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।

নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে অনেকে অনেক কথা বলছেন। দক্ষতা, যোগ্যতা, পারদর্শিতা ইত্যাদি নিয়ে নানা সময়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপন করছেন।

আর নির্বাচন কমিশনও মাঝেমধ্যে অদ্ভুত আচরণ করে মানুষের মনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক করছেন। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান হয়ে নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ ব্যক্তি যদি মাঝেমধ্যেই কথার ব্যত্যয় ঘটান তাহলে তো প্রশ্ন উঠতেই থাকবে। তিনি এমন একটি অবস্থানে রয়েছেন যেখানে থেকে তাকে ভেবেচিন্তে প্রতিটি শব্দ ব্যবহার এবং বাক্য নির্মাণ করতে হবে।

যদিও এ পর্যন্ত আমাদের দেশে নির্বাচন কমিশন একটি সুস্থ ও সুষ্ঠু প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারেনি, তাতে নির্বাচনে যারা অংশগ্রহণ করছেন তাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না, দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে দেশের নাগরিক এবং ভোটারদের। দলীয় সরকারের প্রাসঙ্গিকতা থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশনই দেশের প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলাসহ প্রাসঙ্গিক সব বিষয়ের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করার কথা।

কিন্তু আমার মনে হয়, বর্তমান নির্বাচন কমিশন কি সে দায়িত্বটি গ্রহণ করতে পেরেছেন? মনে হয় না। যার কারণে বিএনপির মতো দল হরহামেশাই গ্রেপ্তারের কথা বলছে, মুখে লাখ লাখ বললেও কাগজে কলমে শত শত গ্রেপ্তার হওয়ার খবর নির্বাচন কমিশনকে জানাচ্ছে। আজো পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন তাদের কর্তৃত্ব পুলিশ প্রশাসনের ওপর ফলাতে পারেনি বলেই মনে হচ্ছে।

আমার আরেকটি কথা মনে হচ্ছে, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত বা তাদের নির্বাচনী সময়সূচি নির্বাচনের তারিখ ইত্যাদি সম্পর্কে সবার সঙ্গে আলোচনা করেই তারা তারিখ ঘোষণা করবেন। কিন্তু তাদের প্রতিনিধি না করে আমরা প্রায়ই দেখছি একটি দলীয় কর্মকর্তা এ জাতীয় কথাগুলো আগাম বলে ফেলছেন।

এতে করে নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে মানুষের সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে। আবার ইলেকশন কমিশন নিজেদের মধ্যেও ঐকমত্য হতে পারছেন না কখনো কখনো। তারও যে বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে জনসাধারণ্যে, তাতে করেও মানুষ অনেকটা নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। কমিশনের নিজেদের মধ্যে বিরোধ থাকলে তা প্রকাশ্যে আসা উচিত নয়, এই নীতি তাদেরও মানতে হবে। নীতিমালা ভঙ্গ করার বিষয়ে অন্যদের সতর্ক করে যদি নিজেরাই সেই অপরাধ করেন, তাহলে কি প্রার্থীদের মধ্যে নীতিমালা ভঙ্গের প্রবণতা বেড়ে যাবে না।

নির্বাচন কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অথবা অন্য  কোনো কমিশনার অথবা সচিব যখন কথা বলবেন তাদের উচিত একমত হওয়ার পর সেই বিষয়টি প্রয়োজন হলে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করবেন। এর ব্যত্যয় ঘটলে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সন্দিহান হয়ে পড়েন যে জাতীয় নির্বাচনের মতন এত বড় একটি ঘটনা আদৌ কি তারা পরিচালনা করতে পারবেন? এটা হতে দেয়া কোনোক্রমেই কমিশনের জন্য ভালো নয়। ইভিএম ও সেনাবাহিনী তলব করার ব্যাপারে দীর্ঘদিন থেকে তর্ক-বিতর্ক শেষে এতদিনে কমিশন সিদ্ধান্ত নিলেন সীমিত আকারে কয়েকটি জায়গায় এটি পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হবে। আর সেনাবাহিনী মোতায়েন করার ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্ত নিলেন স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নির্বাচনের ১৫ দিন আগে এবং নির্বাচনের ১৫ দিন পর পর্যন্ত তারা দেশ ও জনগণের নিরাপত্তা সম্পর্কে দেখভাল করবেন। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে নির্বাচন কমিশন দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে থাকার কারণে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছিলেন না, তাই তাদের মধ্যে হয়তো টানাপড়েন ছিল।

অবশেষে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন এটি রাজনৈতিক দল ও নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর তাদের অধিকারকে ব্যবহার করে, তারা মাত্র পাঁচজন একমত হতে নিশ্চয়ই পারতেন কিন্তু  যে সিদ্ধান্তহীনতা আমরা লক্ষ করলাম তাতে মনে হলো নির্বাচন কমিশন কারো দিকে তাকিয়ে ছিল। নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা নিয়েও অস্থিরতা দেখা গেল। একটা শিডিউল ঘোষণা করলেন, তারপর বিএনপি তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ঘোরতর আপত্তি জানিয়ে এক মাস পেছানোর সোচ্চার দাবি উত্থাপন করলেন। কমিশন তাকেও মেনে নিয়ে এক মাসের পরিবর্তে এক সপ্তাহ সময় বাড়িয়ে দিলেন। বিরোধীদের একগুয়ে কতগুলো দাবি, যা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয় তাও কমিশন দেখলাম শেষ পর্যন্ত ভেবেচিন্তে সাশ্রয় করলেন। তাতেও অবশ্য বিএনপি এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতার বেশ গর্জন করলেন।

অবশেষে ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ জাতীয় নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হলো। শিডিউল অনুযায়ী সবাই মনোনয়নপত্র কেনা, জমা দেয়া এবং অপেক্ষা করা, সবই করলেন কিন্তু দেখা গেল বিএনপি তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়নপত্র অনেক বাতিল হয়ে গেল। সে জন্য আপিলও করা যাবে কিন্তু কতটা ফল হবে আর কেনইবা এতগুলো বাতিল হলো সাধারণ্যে এ নিয়ে কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে। যাকগে সেসব কথা, ফয়সালা তো হবেই এবং নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে। অবশ্য এসব অনাচারের জন্য বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বর্জনের হুমকি দিয়েছে, আমার মনে হয়, অসাড়ের তর্জন-গর্জনই সার এ কথা তো বলা যাবে না তবে এটুকু বলতে পারি এ ধরনের রাজনীতিতে অবস্থার উত্থান-পতন অথবা দলগুলোর ভূমিকায় হেরফের তো হয়ই।

অবশ্য বিএনপি যতই তর্জন-গর্জন করুক না কেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কারণেই নয় নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্নে এবং জামায়াতকে খুশি রাখার কারণে তারা নির্বাচন অবশ্যই করবে। বিএনপি অবশ্য আগাগোড়াই স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে বলে আসছিল এবং যে দফাওয়ারি দাবি উত্থাপন করেছিল, তার মধ্যে দলীয় চেয়ারম্যান খালেদা জিয়ার মুক্তি ও তারেক জিয়ার দন্ড মওকুফের দাবিও উত্থাপন করেছিল।

এ ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবেন না নেতারা সেটাও বলেছিলেন। কিন্তু কি জানি কোনো জাদুতে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে ওই দাবিগুলো আপাতত বিসর্জন দিয়ে শেখ হাসিনার সংলাপের মাধ্যমে কথোপকথন শেষে নির্বাচনে আসতে রাজি হয়েছেন। এখান থেকে ওরা ফিরতে পারবেন না। যদি ফেরেন তবে ভোটার তথা সাধারণ মানুষের কাছে বিএনপির চরিত্র উন্মোচিত হয়ে যাবে অর্থাৎ তারা নিশ্চয়ই কোনো চক্রান্তের জাল ফেঁদেছিলেন কামাল হোসেনদের নিয়ে সেটি কার্যকর হচ্ছে না। বলতে গেলে অনেক কথাই আসবে কারণ বিএনপি ইতোমধ্যে কত যে ভোল পাল্টেছে তার কোনো হিসাব আমার কাছে নেই। এদিকে নির্বাচনে থাকলে বিএনপির মতো বড় একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনাকে নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় আসন সংখ্যা নিজেদের হাতে রাখা উচিত। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করার কারণে তা কতটা পারবেন সেটাও বিবেচ্য। অবশ্য জামায়াতের সঙ্গে তাদের যে গাটছড়া তা বজায় রাখার জন্য নিবন্ধনহীন জামায়াতের প্রার্থীদের বিএনপির টোপর পরিয়ে ধানের শীষে নির্বাচনের সুযোগ করে দিচ্ছে মোট ২৫ জনকে।

আর ২২ জনকে স্বতন্ত্র দাঁড় করিয়ে তাদের সমর্থন দেয়ার ব্যবস্থা করছে। সাধারণ মানুষ এই হিসাব-নিকাশগুলো ভালোভাবেই জানেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ তার চৌদ্দ দল ও জাতীয় পার্টিকে নিয়ে মহাজোট প্রার্থিতা নির্ধারণ প্রায় ঠিক করে ফেলেছে। আওয়ামী লীগ কিন্তু তার শরিকদের এবং জাতীয় পার্টিকে হিসাব করেই আসন দিয়েছে কারণ নিজের আসন সংখ্যা এমনভাবে নির্ধারণ করেছে, যাতে অন্য  কেউ জিতুক না জিতুক তার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাখতে পারে।

অবশ্য জাতীয় পার্টি স্থানীয়ভাবে এরশাদের যে জনপ্রিয়তা তা থেকে রংপুরে এবং সিলেটে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর শরিক যারা রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, দিলীপ বড়–য়া এরাও দু-চারটি করে আসন পেয়েছেন, এই আসনগুলোর পরিণতি কি হবে বলা মুশকিল।

ওদিকে গণতান্ত্রিক বাম জোট প্রায় দেড়শ আসনে প্রার্থী নির্বাচন করেছে। এদের মধ্যে দুয়েকজন যদি ঘটনাচক্রে জিতেই যান তবে সবাই বিস্মিত হবে। জনগণের সঙ্গে যাদের সম্পর্ক থাকে না তারা নির্বাচনের সময় যতই ভালো কথা বলুন না কেন, ভোটার তাকে কেন জানি না নির্বাচিত করতে চান না।

তবে হ্যাঁ ইতোপূর্বে নির্বাচনে দাঁড়ানো বাম প্রার্থীদের দুয়েকজনের ব্যাপারে জানি, তাদের ভোটাররা বলেছেন, ‘আপনারা ভালো মানুষ, আপনাদের নির্বাচিত করলে ওই নষ্ট রাজনীতির কুশীলবদের সঙ্গে অগণতান্ত্রিক, দুর্নীতিবাজ তথা এ ধরনের নানা কাজ কি করতে পারবেন? লোকে জানে আপনারা সেটা করতে পারবেন না। তাই আপনাদের কেউ ভোট দেবে না’।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হঠাৎ যে সংলাপ করলেন তা থেকে কিন্তু তারা অনেক ছাড় পেয়েছেন। যেমন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান খুলে দিয়েছেন এবং বলেছেন, ‘প্রয়োজন হলে আমি ওখানে একটি মঞ্চ তৈরি করে দেব যার জন্য সামান্য ভাড়াও দিতে হবে’।

অথচ এই ছাড় পাওয়ার পর বিএনপি এককভাবে নয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে একটি জনসমাবেশ করেছে। তাতে ওনারা বলছেন লাখেরও বেশি মানুষ হয়েছিল কিন্তু সাংবাদিক বা সাধারণ শ্রোতা যারা তারা বিশ-পঁচিশ হাজারের ওপরে বলতে চান না। যাকগে সেগুলো ওদের মাথাব্যথা।

আমাদের মাথাব্যথা একটাই যেন নির্বাচনটা স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য এবং অংশগ্রহণমূলক হয়। বিদেশিদের চাহিদা পূরণের জন্য নয়, কোনো প্রভুকে খুশি করার জন্যও নয়, এটি প্রয়োজন আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ চলার পথকে সুগম করার জন্য। সে জন্য আমাদের সজাগ থাকতে হবে যেন নির্বাচন বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকে। আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন কমিশন তাদের জেলা-উপজেলা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। শুনেছি পুলিশ প্রশাসনও নিয়মানুযায়ী নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। আর্মি এলেও তারা তাদের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। এত শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে লেজেগোবরে না করে ফেলেন সেই ভয়টা আমাদের শঙ্কিত করছে বৈকি। তবে আশা তো থাকবে ভালো নির্বাচন হবে। আমরা সবাই সাধারণ মানুষ দিন গুনছি কবে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে আদতেই নিজের ভোটটা দিতে পারব।

আবার গিয়ে না দেখি আমার ভোট দেয়া হয়ে গেছে। এই শঙ্কাতেই বুঝি ড. কামাল হোসেন নেতাকর্মীদের কেন্দ্র পাহারা দিতে বলেছেন। যেখানে সামরিক বাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ, আনসার ইত্যাদি সবাই থাকবে, তারপরও ড. কামাল হোসেন নেতাকর্মীদের কেন্দ্র পাহারা দেয়ার কথা বললেন কেন? তবে কি তিনি বুথ দখল, ছাপ্পা ভোট বা এ ধরনের ভোট জালিয়াতির কথা চিন্তা করছেন? ড. কামাল হোসেন যাদের সঙ্গে গাটছড়া বেঁধেছেন, জানেন কি তাদের চরিত্র? ড. কামালদের নয়া দোস্ত বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকাকালে কি সব কান্ড করে ভোটে জেতে এবং জেতার পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কি ধরনের নির্যাতন, নিপীড়ন চলে। বলছি না আওয়ামী লীগ এ ধরনের আচরণ করে না। কিন্তু এত হুমকি-ধমকি, আলাপ-আলোচনা, জোট বাঁধা, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপ করা এত কিছুর পর ভোট বর্জনের কথা কেন তার দোসররা বলছেন।

তবে কি সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পার থেকে আসা চক্রান্তের বলির পাঁঠা বানিয়ে ড. কামাল, রব, মান্নাকে জলে ভাসিয়ে বিএনপি কোনো নয়া ফাঁদ ভাবছে? বিরোধীরা যেমন জনগণের দোহাই দিচ্ছে সব কথাতেই কিন্তু ময়দানে দেখাতে পারছে না, সে দিক থেকে আওয়ামী জোট অনেকটাই পরিপুষ্ট। আর তাদের আমলে এই দশ বছরে উন্নয়ন যে হয়েছে সে কথা অস্বীকার করা যাবে না। তাই যাদের সঙ্গে কেয়ামত পর্যন্ত সংলাপের কোনো সুযোগ ছিল না, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হঠাৎ করেই তাদের সঙ্গে সংলাপে বসলেন।

তবে কি তিনি আশ্বস্ত না হয়েই এমন বাজি ধরলেন? আমরা জনগণ ভোটার মাত্রই আশাবাদী। দেশে ভালো নির্বাচন হবে, প্রতিনিধিরা সবাই জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত সমর্থনে বিজয়ী হবেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ যারা তারা সরকার বাঁধবেন। আর তারপর আমরা আশা করব দুর্নীতি ও দুঃশাসন ব্যতিরেকে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।…আমাদের এ আশা কি পূরণ হবে? এটাই দেখব নতুন ইংরেজি বছরে।

তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত থাকুক এই শুভ কামনা রইল। কারণ যুদ্ধাপরাধী প্রভাবিত রাজনৈতিক শক্তির হাতে ক্ষমতা গেলে যে কি হয় তার হদিস এ দেশের মানুষ খুব ভালো করেই জানেন।

লেখক ঃ বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।