১৫ দিনের টানা লকডাউনেও কুষ্টিয়ায় রেডজোন এলাকাগুলোতে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি

লকডাউনের মধ্যেই কুষ্টিয়া পৌর এলাকায় রোগী বেড়েছে প্রায় দেড় শতাধিক
একদিনে ৪ জনের মৃত্যু  ॥ জুলাইয়ের ৯ দিনে ১০ জনের প্রাণহানী

নিজ সংবাদ ॥ ১৫ দিনের টানা লকডাউনেও কুষ্টিয়ায় রেডজোন এলাকাগুলোতে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। ভেড়ামারা পৌর এলাকার ৮টি ওয়ার্ডে আক্রান্ত কিছুটা কমলেও কুষ্টিয়া সদর পৌরসভায় এলাকায় পরিস্থিতি আরো জটিল ও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। লকডাউনের মধ্যেই রোগী আগের থেকে বেড়েছে প্রায় দেড় শতাধিক। আর গত ২৪ ঘন্টায় মারা গেছে ৪জন। এর মধ্যে তিনজন নারী ও একজন পুরুষ। এদিকে রোগী বাড়তে থাকলে হাসপাতালের চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আইনোলেশন ওয়ার্ডে বেড ও রোগীর সংখ্যা সমান। রোগী বাড়লে অতিরিক্ত বেডের প্রয়োজন হবে।

হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, কুষ্টিয়া পৌর এলাকায় প্রতিদিন রোগী বাড়ছে। গত ২৫ জুন থেকে লকডাউন শুরুর পর ৭ জুলাই অর্থাৎ লকডাউনের শেষ দিনে রোগী বেড়েছে ১৫৩ জন। পৌর এলাকায় এই মুহুর্তে রোগী সংখ্যা প্রায় আড়াই শতাধিক। আর জেলায় রোগীর সংখ্যা ৯শ ধর ধর। এর মধ্যে জুন ও জুলাই মাসের রোগী বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত জেলায় ১৮ জন কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। গত ২৪ ঘন্টায় মারা গেছেন ৪ জন। এটাই একদিনে সর্বোচ্চ। রোগী বাড়তে থাকায় হাসপাতালে বেড ও অক্সিজেন সংকট দেখা দিয়েছে।

সিভিল সার্জন ও হাসপাতালের দেয়া তথ্য মতে গত ২৪ ঘন্টায় পৌর এলাকায় ৪ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে নারী তিন জন ও পুরুষ একজন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শহরের ১নং ওয়ার্ড কমলাপুর এলাকার বাসিন্দা গোলাম রসুল নামের একজন মারা গেছেন। তার বয়স ৭০ বছর। এছাড়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চৌড়হাস স্টেডিয়ামপাড়ার বাসিন্দা আলেয়া বেগম (৫৮) মারা গেছেন। আলেয়ার সন্তান  বিআরবি কর্মকর্তা আলি আহম্মেদ লিটন মারা যান এক সপ্তাহ আগে। ২৪ ঘন্টায় মারা যাওয়া অন্যরা হলেন হাসপাতালের চিকিৎসক হোসেন ইমামের মা ফাতেমা বেগম (৫৮)। ফাতেমা শহরের কালিশঙ্করপুর এলাকার বাসিন্দা। আর বারখাদা এলাকার বাসিন্দা মিনুকা বেগম (৩০) নামের এক নারী।

এর আগে গত পরশু দিন পল্লী চিকিৎসক বাদল মুখার্জি (৭৫) করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তিনি ১৩দিন আগে করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসাপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যান। এছাড়া বিআরবির আরেক কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন জুয়েল (৩৫) করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। সব মিলিয়ে চলতি জুলাই মাসের গত ৯ দিনেই মারা গেছেন ১০ জনের বেশি।  এ পর্যন্ত জেলায় সুস্থ হয়েছে ৩৮৩জন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ৩৩জন।

করোনা রোগি আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকলেও তুলে নেওয়া হল কুষ্টিয়া শহরের লকডাউন। টানা ১৫ দিন পর এ লকডাউন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। গতকাল বুধবার থেকে শহরের সমস্ত দোকানপাট-বিপনী বিতান সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

কুষ্টিয়া শহরের করোনা রোগির সংখ্যা মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ার ফলে গত ২৪ জুন গোটা পৌর এলাকাকে রেডজোন ঘোষণা করে রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে জেলা প্রশাসনকে চিঠি পাঠানো হয়। পরদিন ২৫ জুন থেকে কুষ্টিয়া শহর তথা পৌরসভার ২১টি ওয়ার্ডে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। বিধি অনুযায়ী ওষুধসহ কিছু নিত্যপণ্যের দোকান সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হয়। অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া হয়। শহরের মোড়ে মোড়ে চেকপোষ্ট বসিয়ে পুলিশ প্রশাসন শহরে যানবাহন প্রবেশ সীমিত করে দেয়। টানা ১৫ দিন লকডাউন চলার পর মঙ্গলবার বেলা ১১টায় ভার্চ্যুয়াল জরুরী বৈঠক করে জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটি। কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক মোঃ আসলাম হোসেনের সভাপতিত্বে ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে বক্তব্য রাখেন কমিটির সদস্য সচিব সিভিল সার্জন ডা. এইচ এম আনোয়ারুল ইসলাম, পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত, কুষ্টিয়া চেম্বারের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী রবিউল ইসলাম, সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা ও কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ড. মুসা কবির।

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শহরের লকডাউন তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় প্রশাসন। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জুবায়ের হোসেন চৌধুরী এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত গতকাল বুধবার থেকে শহরের দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে। তবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা দোকানপাটে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। এছাড়া যেসব বাড়িতে করোনা রোগি রয়েছে  শুধুমাত্র সেসব বাড়ি আগের মতই লকডাউন থাকবে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। তবে ১৫ দিন ধরে চলা এ লকডাউন কার্যত ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ লকডাউন চলাকালে করোনা রোগি কমার চেয়ে বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। গত ২৫ জুন থেকে গতকাল ৭ জুলা পর্যন্ত কুষ্টিয়া শহরে ১৫৩ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ হার লকডাউন শুরুর আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ড এখন রোগিতে ঠাসা। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, করোনা ওয়ার্ডে আর মাত্র ৩টি শয্যা খালি আছে। যে হারে রোগির সংখ্যা বাড়ছে তাতে আগামীতে তাদের চিকিৎসা দেওয়ায় মুসকিল হয়ে পড়বে।

সিভিল সার্জন ডা, এইচএম আনোয়ারুল ইসলাম বলেন,‘ লকডাউন দিলেও সাধারন মানুষ সচেতন না হওয়ায় প্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়া যায়নি। বরং রোগীর সংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে মৃত্যু। বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। প্রশাসনের সাথেও আলোচনা চলছে। পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জেলা করোনা প্রতিকার কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক মোঃ আসলাম হোসেন বলেন, লকডাউন দিয়েও প্রত্যাশিত ফলাফল আসেনি। তাই ঈদ সামনে রেখে মার্কেট খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে বিশেষ করে কুষ্টিয়া পৌর এলাকা ও সদরের বিভিন্ন গ্রামে আক্রান্ত বেড়েছে। মানুষকে সচেতন করলেও কথা শুনছে না। আমরা তদারকিতে মাঠে আছি। পুলিশ প্রশাসন সব সময় মাঠে কাজ করছে। তারপরও রোগী কমছে না। বিষয়টি চিন্তার।’

 

আরো খবর...