১০ কাঠা জমিতে আড়াই লাখ টাকার মাল্টা

মিরপুরে মাল্টা চাষে সাফল্য

হাবিবুর রহমান ॥ চাষের ক্ষেত্রে লসের ঝুঁকি নেই, বাজারে দেশীয় মাল্টার চাহিদাও ভালো,  খেতেও খুব সুস্বাদু হওয়ায় গ্রাম অঞ্চলে জনপ্রিয় হচ্ছে বারি-১ জাতের মালটার চাষ। অনেকেই বাড়ীর ছাদে, বসত বাড়ীর আঙ্গিনায় শখের বসে করছেন এ চাষ। পরিচর্যা নেই বললেই চলে, তাই খরচও কম। তাই কম সময়ে, স্বল্প পুজিতে এ মাল্টা চাষটা বিস্তার করছে কুষ্টিয়ার মিরপুরের যুবকদের মাঝে। শখের বসে মাত্র ১০ কাঠা জমিতে মাল্টা চাষ করে বেশ সাফল্য পেয়েছেন কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার তরুণ কৃষক মারুফ হোসেন। এখন তিনি শুরু করেছেন বাণিজ্যিকভাবে এই মাল্টার চাষ। এখন এলাকার বেকার যুবকদের কাছে মডেল তিনি। তার কাজে অনুপ্রেরণা  পেয়ে অনেকেই মাল্টা চাষে আগ্রহী হয়েছে। করেছেন নতুন করে মাল্টা বাগানও।  কৃষক মারুফ ভালো লাভবান হওয়ায় ১০ কাঠা থেকে আরো তিন বিঘা জমিতে করেছেন মাল্টার বাগান। রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার মালিহাদ ইউনিয়নের আশাননগর এলাকার কৃষক মারুফের মাল্টা বাগানে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি গাছেই থোকায়  থোকায় ধরে আছে মাল্টা, এতে বেশ খুশি তিনি নিজেও। কৃষক মারুফ হোসেন জানান, “মাল্টা চাষ আমাদের এলাকায় করা সম্ভব এটা আশা করিনি। ভাবতাম এই মাল্টার চাষ কিভাবে করা যায়, কিভাবে একটা বাগান করা যায়। ২০১৭ সালে উপজেলা কৃষি অফিস  থেকে বিনামূল্যে ৫০টি বারি-১ জাতের মাল্টার চারা পায়। সেটা নিয়ে এসে এখানে ১০ কাঠা জমিতে রোপন করি। মাল্টা গাছের তেমন একটা পরিচর্যা করিনি। এখানে মাল্টা গাছের সাথি ফসল হিসাবে মরিচ, বেগুন, খেসারী, জব ও কলার চাষ করেছি। মাল্টার জন্য আলাদা কোন পরিচর্যা বা সার দেওয়া লাগেনি। এরপরে দুই বছর পরে লক্ষ্য করি বেশ কয়েটি মাল্টা গাছে মাল্টা ধরেছে। বেশ সুন্দর সুন্দর মাল্টা, খেতে বাজারের মাল্টার চেয়ে সুস্বাদু এবং বেশ রসালো। এরপরে চিন্তা করি মাল্টা গাছগুলোর যতœ নিলে বেশ ভালো কিছু হবে।” তিনি আরো জানান, “বর্তমানে ৪৬টি গাছে মাল্টা এসেছে। একেকটি গাছে প্রায় ১মন করে মাল্টা ধরেছে। কিছু গাছে তার চেয়ে বেশি। মাল্টার সাইজও তুলনামুলকভাবে বড়। ১০০-২৫০ গ্রাম। এবছর প্রায় ৫০মনের মতো মাল্টা পাবো। ইতিমধ্যে বাগান থেকে মাল্টা বিক্রি শুরু করেছি। ১২০-১৩০ টাকা কেজি হিসাবে পাইকারীভাবেই ক্রেতারা মাল্টা কিনে নিয়ে যাচ্ছে। এতে আশা করছি ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার মতো মাল্টা বিক্রি করতে পারবো।” তিনি মাল্টার গাছের পরিচর্যা সম্পর্কে বলেন, “মাল্টা গাছের খুব একটা পরিচর্যা করতে হয় না। বাগানটা পরিষ্কার রাখলে ফল বেশি আসে। আর মাঝে মাঝে মাকড় ও পাতা কুকড়ানো রোগ  দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে কৃষি অফিসের পরামর্শ গ্রহণ করে ভালো ফল পেয়েছি।” মারুফ  হোসেন জানান, “মাল্টা চাষটা খুবই লাভজনক। এবছর আমি আরো তিন বিঘা জমিতে মাল্টার চারারোপন করেছি। আশা করছি এক বছর পরেই ফল আশা শুরু করবে। সেই সাথে কৃষি অফিস থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন মাল্টার চারা উৎপাদন করি। এখান থেকে চারা বিভিন্ন এলাকার  লোকজন নিয়ে যায়। আগামীতে নিজে আরো বেশি বাণিজ্যিকভাবে মাল্টার বাগান করবো বলে মনে করছি।” কৃষক মারুফের সাথে মাল্টার চারা উৎপাদনে সহযোগি সিহাব উদ্দিন জানান, “আমরা দেশি বাদামের চারার সাথে মাল্টা গাছের কলম করি। এতে উৎকৃষ্ট মানের চারা উৎপাদন করা সম্ভব। প্রতিটি কলমের চারা আমরা ১০০-১২০ টাকা দরে বিক্রি করি। এবছর এখানে ১ হাজার মাল্টার চারা তৈরী করা হয়েছে। যা ইতিমধ্যে বিক্রি শুরু করেছি।” মারুফের সাফল্য দেখে উক্ত এলাকার অনেকেই মাল্টা চাষে আগ্রহ দেখিয়ে শুরু করেছেন এই মাল্টার চাষ। একই জিয়াউর রহমান নামের এক নতুন মাল্টা চাষী বলেন, “আমি গত বছর ২০ বিঘা জমিতে প্রাথমিকভাবে মাল্টার বাগান করেছি। এখনো জমিতে ফল আসেনি। মাল্টার সাথী ফসল হিসাবে আমি পেঁয়ারার চারারোপন করেছি। আসা করছি আগামী বছর থেকে মাল্টা পাবো।” স্থানীয় যুবক শহিদুল ইসলাম জানান, “মাল্টা চাষ এই অঞ্চলে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মারুফের বাগান দেখে আমিও মাল্টার বাগান করেছি। মারুফের মাল্টা বাগান থেকে চারা নিয়ে লাগিয়েছি। মাল্টা বাগানে লস হওয়ার সম্ভাবনা নেই।” সম্ভাবনাময় এ মাল্টা চাষ বৃদ্ধির জন্য এবং আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে যুবকদের ও আগ্রহীদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি এ চাষে উদ্বুদ্ধ করছেন কৃষি বিভাগ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়ার  জেলায় এবছর ১১ হেক্টর জমিতে বারি-১ জাতের মাল্টার চাষ করা হয়েছে। মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রমেশ চন্দ্র ঘোষ জানান, “আমাদের এই কুষ্টিয়া অঞ্চলের মাটিতে মাল্টা চাষ করা সম্ভব। বারি-১ জাতের মাল্টা চাষ করে অনেকেই বেশ সাফল্য পেয়েছেন। আমরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে কৃষকদের এ মাল্টা চাষে উদ্বুদ্ধ করছি।” তিনি আরো বলেন, “অনান্য ফসলের চাষাবাদের তুলনায় মালটা চাষ খুবই লাভজনক। মাল্টা চাষে কৃষকদের খরচ কম এবং লাভ বেশি। এছাড়া মাল্টার জমিতে সাথি ফসল হিসাবে অনান্য স্বল্প মেয়াদী ফসল চাষ করা যায়। তাছাড়া পুষ্টি গুনাগুন এবং স্বাদ ভালো হওয়ায় বাজারে দেশীয় এ মাল্টার চাহিদা বেশ ভালো। আমরা মাল্টা চাষের জন্য কৃষক মারুফকে উৎসাহ প্রদান করেছিলাম, বিনামুল্যে চারা দিয়েছিলাম। তার সাফল্য দেখে অনেকেই মাল্টা চাষে আগ্রহ  দেখিয়েছে। আশা করছি আগামীতে মাল্টা চাষ এই অঞ্চলে ব্যাপকভাবে বিস্তার করবে। এতে অনেক বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি অনেকেই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবে।”

 

আরো খবর...