হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম লাইলাতুল কদর

আ.ফ.ম নুরুল কাদের ॥ আজ লাইলাতুল কদরের রজনী। এই রাতটি মুসলিম জাহানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহন করে। মুসলিম সমাজ এই পুন্যবান রাতকে স্মরণ করে রাখার জন্য পুর্ন রাত ইবাদত বন্দেগীর মাঝে অতিবাহিত করে। আমরা আজ এই রাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য এবং এই রাতের করনীয় বিষয়ে আলোকপাত করবো। ‘লাইলতুল কদর’ আরবি শব্দ। শবে কদর হলো ‘লাইলাতুল কদর’-এর ফারসি পরিভাষা। কয়েক শতাব্দী মুঘল শাসন এবং উপমহাদেশে ফারসি রাজকীয় ভাষা থাকার কারণে ধর্ম, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বিচার-আচারের বহু ফারসি শব্দ আমাদের সংস্কৃতির সাথে একাকার হয়ে গেছে। ‘সালাতের’ পরিবর্তে নামাজ, ‘সাওমের’ পরিবর্তে রোজার মতো লাইলাতুল কদর এর ফারসি পরিভাষা শবে কদর সাধারণ মানুষের কাছে তাই বেশি পরিচিত। ‘শব’ অর্থ রাত, আর আরবি ‘লাইলাতুন’ শব্দের অর্থও রাত বা রজনী। কদর অর্থ সম্মানিত, মহিমান্বিত। সুতরাং লাইলাতুল কদরের অর্থ সম্মানিত রজনী বা মহিমান্বিত রজনী।

লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব ফজিলত ঃ

পবিত্র কুরআন ও সহিহ-হাদিস দ্বারা লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ‘শব-ই-বরাত’ নিয়ে এবং শব-ই-বরাতের হাদিসগুলোর বর্ণনা নিয়ে হাদিস বিশেষজ্ঞ ও ফকিহ্দের মধ্যে যে সংশয় রয়েছেÑ লাইলাতুল কদরের ব্যাপারে তার কোনো অবকাশ নেই। পবিত্র কুরআন, নির্ভরযোগ্য হাদিস এবং রাসূলুল্লাহ স:-এর লাইলাতুল কদরের জন্য গৃহীত কর্মতৎপরতা লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এ সম্মানিত রজনীর গুরুত্ব সম্পর্কে মহান আল¬াহ বলেন, ‘আমি কুরআনকে কদরের রাতে নাজিল করেছি। তুমি কি জানো, কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাস হতেও উত্তম-কল্যাণময়’ (সূরা আল কদর : ১-৩)। এ রাতটি কোন মাসে? এ ব্যাপারে মহান আল¬াহ বলেন, ‘রমজান এমন মাস যাতে কুরআন নাজিল হয়েছেÑ’ (বাকারা : ১৮৫)। এ রাতটি রমজানের কোন তারিখে? রাসূলুল্লাহ সা: একটি রহস্যময় কারণে তারিখটি সুনির্দিষ্ট করেননি। ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম, ইমাম আহমদ ও ইমাম তিরমিজি কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছেÑ হজরত আয়েশা রা: বর্ণনা করেছেন, নবী করীম সা: বলেছেন, ‘কদরের রাতকে রমজানের শেষ দশ রাতের কোনো বেজোড় রাতে খোঁজ করো’। হজরত আবু বকর রা: ও হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত হাদিস থেকেও এ একই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। অবশ্য কোনো কোনো ইসলামি মনীষী নিজস্ব ইজতিহাদ, গবেষণা, গাণিতিক বিশে¬ষণ ইত্যাদির মাধ্যমে রমজানের ২৭ তারিখের রাতে (অর্থাৎ ২৬ রোজার দিবাগত রাতে) শব-ই-কদর হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা  জোর দিয়ে বলেছেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সা: এটাকে সুনির্দিষ্ট করেননি বরং কষ্ট করে খুঁজে নিতে বলেছেন।

এ রাতের আর একটি গুরুত্ব হলো এ পবিত্র রাতেই কুরআন নাজিল হয়েছে। আর এ কুরআনের সাথেই মানুষের ভাগ্য জড়িয়ে আছে। এ জন্য কদরের আর একটি অর্থ হলো ভাগ্য। তাহলে লাইলাতুল কদরের অর্থ হয় ভাগ্য রজনী। যে মানুষ,  যে সমাজ, যে জাতি, কুরআনকে বাস্তব জীবন বিধান হিসেবে গ্রহণ করবে তারা পার্থিব জীবনে ও পরকালীন জীবনে সম্মানীত হবে। এ রাতে নাজিলকৃত কুরআনকে যারা অবহেলা করবে তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। এ রাতেই মানব কল্যাণে আল¬াহ মানুষের জন্য চূড়ান্তু সিদ্ধান্ত  ফেরেশতাদের জানান। আল্লাহ বলেন, “এ রাতে প্রত্যেকটি ব্যাপারে অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও সুদৃঢ় ফায়সালা জারি করা হয়।” (সূরা দুখান : ৪)। মহান আল্লাহ আরো বলেনÑ ‘ফেরেশতারা ও রূহ (জিব্রাইল আ:) এ রাতে তাদের রবের অনুমতিক্রমে সব হুকুম নিয়ে অবতীর্ণ হয়, সে রাত পুরোপুরি শান্তি ও নিরাপত্তার-ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত।’ (সূরা আল-কদর : ৪-৫)। লাইলাতুল কদরের ফজিলতগুলো সংক্ষেপে নি¤œরূপ :এ রাতটি হাজার মাস হতে উত্তমÑ কল্যাণময় (কুরআন),এ রাতেই পবিত্র কুরআন নাজিল করা হয়েছে। (কুরআন),এ রাতে ফেরেশতা নাজিল হয় এবং আবেদ বান্দার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। ফজর পর্যন্ত এ রাতে পুরোপুরি শান্তি ও নিরাপত্তার (কুরআন) এ রাতে প্রত্যেকটি ব্যাপারে অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও সুদৃঢ় ফায়সালা জারি করা হয়, (কুরআন)। এ রাতে ইবাদতে মশগুল বান্দাদের জন্য অবতরনকৃত ফেরেশতারা দু’আ করেন, (হাদিস)। গুনাহ মাফ: ‘ যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ঈমানসহকারে ও আল¬াহর নিকট হতে বড় শুভফল লাভের আশায় ইবাদতের জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে, তার পেছনের সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।’ (বুখারি-মুসলিম)। এ রাতে কল্যাণ থেকে একমাত্র হতভাগ্য  লোক ছাড়া আর কেউ বঞ্চিত হয় না। (ইবনে মাজাহ-মিশকাত)। কিয়ামুল লাইলঃ ‘কিয়ামুল লাইল’ অর্থ হলো রাত্রী জাগরণ। মহান আল্লাহর জন্য আরামের ঘুম স্বেচ্ছায় হারাম করে রাত জেগে ইবাদত করা আল্লাহর প্রিয় বান্দাহদের একটি গুণ। মহান আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাদের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে ‘তারা রাত যাপন করে রবের উদ্দেশে সিজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে থেকে।’(সূরা ফুরকান : ৬৪)। মুসনাদে আহমাদ গ্রন্থে হজরত ওবায়দা ইবনে সামেত বর্ণিত হাদিসে উদ্ধৃত হয়েছেÑ ‘নবী করীম সা: বলেছেনÑ কদরের রাত রমজান মাসের শেষ দশ রাতে রয়েছে। যে ব্যক্তি উহার শুভফল লাভের উদ্দেশ্যে ইবাদতের জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে, আল্লাহ তার আগের পেছনের গুনাহ মাফ করে  দেবেন।’ রাসূল সা: রমজানের শেষ দশ দিন মসজিদে এ’তেকাফে থাকতেন এবং ইবাদতে গভীর মনোনিবেশ করতেন। কাজেই আমরা কোনো একটা বিশেষ রাতকে নির্দিষ্ট না করে হাদিস অনুযায়ী অন্তত রমজানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদরের সৌভাগ্য লাভের আশায় ইবাদতে মশগুল হই। রাসূল সা: বলেনÑ ‘যে ব্যক্তি এ রাত থেকে বঞ্চিত হবে সে সমগ্র কল্যাণ ও বরকত হতে বঞ্চিত হবে। এর কল্যাণ থেকে একমাত্র হতভাগ্য লোক আর কেউ বঞ্চিত হয় না।’ (মিশকাত)। এ রাতে আমাদের করণীয়ঃ কুরআন অধ্যয়ন : এ রাতে পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে। মানবজাতির এ বিরাট নিয়ামতের কারণেই এ রাতের এত মর্যাদা ও ফজিলত। এ কুরআনকে ধারণ করেলেই মানুষ সম্মানীত হবে, দেশ ও জাতি মর্যাদাবান হবে; গোটা জাতির ভাগ্য বদলে যাবে। কাজেই এ রাতে অর্থ বুঝে কুরআন পড়তে হবে। কুরআনের শিক্ষা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে  প্রতিষ্ঠার শপথ গ্রহণ করতে হবে। বাছাইকৃত কিছু আয়াত এ রাতে মুখস্তও করা যেতে পারে। যাদের কুরআনের ওপর প্রয়োজনীয় জ্ঞান রয়েছে তাঁরা এ রাতে একটি দারসও  প্রস্তুত করতে পারেন। নফল নামাজ : ন্যূনতম ৮ রাকাত থেকে যত সম্ভব পড়া যেতে পারে। এজন্য সাধারণ সুন্নতের নিয়মে ‘দু’রাকাত নফল পড়ছি’ এ নিয়তে নামাজ শুরু করে শেষ করতে হবে। এ জন্য সূরা ফাতিহার সাথে আপনার জানা যেকোনো সূরা মেলালেই চলবে। এ ছাড়া সালাতুল তাওবা, সালাতুল হাজত, সালাতুল তাসবিহ নামাজও আপনি পড়তে পারেন। এগুলোর নিয়ম আপনি মাসয়ালার বইগুলোতে পাবেন। রাতের শেষভাগে কমপক্ষে ৮ রাকাত তাহাজ্জুদ পড়ার চেষ্টা আমরা অবশ্যই করব। কারণ এ নামাজ সর্বশ্রেষ্ঠ নফল নামাজ। আর রাতের এ অংশে দোয়া কবুল হয়। নফল নামাজের সংখ্যার হিসাবের  চেয়ে নামাজের গুণগত দিকটির দিকে আমাদের বেশি লক্ষ্য রাখতে হবে। জিকির ও দোয়া : হাদিসে যে দোয়া ও জিকিরের অধিক ফজিলতের কথা বলা হয়েছে সেগুলো থেকে কয়েকটি নির্বাচিত করে অর্থ বুঝে বার বার পড়া যেতে পারে। ইস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) ও দুরুদ আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয়। কমপক্ষে ১০০ বার ইস্তেগফার ও ১০০ বার দুরুদ পড়া  যেতে পারে। আত্মসমালোচনা : আত্মসমালোচনা অর্থ আত্মবিচার। অর্থাৎ আপনি নিজেই নিজের পর্যালোচনা করুন।। জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোতে আল¬াহর কতগুলো হুকুম অমান্য করেছেন, আল্লাহর ফরজ ও ওয়াজিব গুলো কতটা পালন করেছেন এবং তা কতটা নিষ্ঠার সাথে করেছেন, ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় কী কী বড় গুনাহ আপনি করে  ফেলেছেন, আল¬াহর গোলাম হিসেবে আল¬াহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় আপনি কতটুকু ভূমিকা রেখেছেনÑ এগুলো ভাবুন, যা কিছু ভালো করেছেন তার জন্য আল¬াহর শুকরিয়া আদায় করুন, আর যা হয়নি তার জন্য আল¬াহর ভয় মনে পয়দা করুন, সত্যিকার তওবা করুন। এ রাতে নীরবে নিভৃতে কিছুটা সময় এ আত্মসমালোচনা করুন, দেখবেন আপনি সঠিক পথ খুঁজে পাবেন। আত্মসমালোচনা আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তুলবে। আত্মসমালোচনা আত্মশুদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। মহান আল¬াহ বলেনÑ ‘হে ঈমানদার লোকেরা আল¬াহ তায়ালাকে ভয় কর এবং প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, আগামীকালের জন্য (পরকাল) সে কী প্রেরণ করেছে তা চিন্তা করা’(সূরা হাশর : ১৮)।

মুনাজাত : মুনাজাতের মাধ্যমে বান্দার বন্দিগি ও আল¬াহর রবুবিয়াতের প্রকাশ ঘটে। বান্দাহ তার প্রভুর কাছে চায়। প্রভু এতে ভীষণ খুিশ হন। মহন আল্লাহ তার বান্দার প্রতি এতটাই অনুগ্রহশীল যে, তিনি তার কাছে না চাইলে অসন্তুষ্ট হন। ‘ যে আল্লাহর কাছে কিছু চায় না আল¬াহ তার ওপর রাগ করেন’Ñ (তিরমিজি)। ‘দোয়া ইবাদতের মূল’Ñ (আল হাদিস)।’ যার জন্য দোয়ার দরজা খোলা তার জন্য রহমতের দরজাই খোলা রয়েছে’Ñ (তিরমিজি)। কাজেই আমরা কায়মনো বাক্যে আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করব, মা চাইব, রহমত চাইব, জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাইব।

উপরোক্ত আমলের মাধ্যমে আমরা এ পবিত্র রাতগুলো কাটাতে পারি। লাইলাতুল কদর পাওয়ার তামান্না নিয়ে নিষ্ঠার সাথে অনুসন্ধান করলে আল্লাহ আমাদের বঞ্চিত করবেন না ইনশাআল্লাহ। অবশ্য নফল ইবাদত নীরবে নিভৃতে ঘরে আদায় করাই মাসনুন। এতে আমাদের ইবাদত রিয়া (প্রদর্শন ইচ্ছা) দোষে দুষ্ট হওয়ার হাত থেকে রা পাবে। এ পবিত্র রাতে কিছু অনাকাংখিত কাজ হতে দেখা যায়। এগুলো বন্ধ করার জন্য গঠনমূলক পদক্ষেপ নেয়া দরকার।

আরো খবর...