হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে নিশ্চিহ্ন হতে চাই না – ফখরুল

ঢাকা অফিস ॥ দশম সংসদ নির্বাচন ও এর বর্ষপূর্তি ঘিরে ধারাবাহিক অবরোধ-আন্দোলনে বিএনপির যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে উঠতে এখনও বেগ পেতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এখন হঠাৎ করে আর কোনো ‘হঠকারী’ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিশ্চিহ্ন হতে চান না বলে জানিয়েছেন তিনি। গতকাল শুক্রবার ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে ‘নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার: বর্তমান প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে সিটি নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচকদের নানা আশঙ্কার জবাবে একথা বলেন বিএনপি মহাসচিব। দলের বর্তমান অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা যখন কোর্টে যাই সেটা আন্দোলনের একটা অংশ, আমরা যখন আলোচনা সভা করি সেটাও আন্দোলনের অংশ, আমরা যখন নির্বাচনে অংশ নেই সেটাও আন্দোলনের অংশ। আমরা এই আন্দোলনগুলোকে এক সাথে করে নিয়ে বড় একটা আন্দোলনের চেষ্টা করছি।” এক দশকের বেশি সময় ধরে বিরোধী দলে থাকা বিএনপি নেতাকর্মীদের যে বৈরিতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তা তুলে ধরে ফখরুল বলেন, “আমাদের ৩৬ লাখ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, এক লাখের বেশি মামলা হয়েছে, ৫০০ এর বেশি মানুষ গুম হয়ে গেছে, খুন হয়েছে, প্রতিদিন গ্রেপ্তার হচ্ছে। ছোট-খাটো বিষয়েও মামলা হয়ে যাচ্ছে। এই সেদিনও আমার বিরুদ্ধে তিনটা মামলা হয়েছে। এগুলোকে ফেইস করে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।” সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হেরে ক্ষমতার বাইরে যাওয়া বিএনপি এখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এর পাঁচ বছরের মাথায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে তার প্রতিরোধের ডাক দেয় দলটি। ওই নির্বাচনে জয়ী হয়ে টানা দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ জোট। এরপর ওই নির্বাচনে প্রথম বর্ষপূর্তি ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যে টানা তিন মাস অবরোধ-হরতাল চালিয়ে যান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এই দুই আন্দোলনের মধ্যে গাড়িতে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ, অগ্নিসংযোগসহ নাশকতার নানা ঘটনায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়, আহত হন কয়েকশ মানুষ। ওই আন্দোলন যে বিএনপির জন্য ভালো ফল বয়ে আনেনি তা স্বীকার করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “আমাদের ভুল-ত্রুটি হয়েছে, সেই ভুল-ত্রুটি নিয়ে আমরা কিন্তু সরে দাঁড়াইনি। বিশ্ব রাজনীতির যে পরিবর্তন হয়েছে, সেই পরিবর্তনগুলোকে সামনে নিয়ে সেগুলোকে পাশে রেখে আমাদের এগোতে হবে। আমরা আজকে হঠাৎ করে হঠকারী কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে চাই না। “আমাদের অভিজ্ঞতা আছে ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময়ে এবং ২০১৫ সালের আন্দোলনের সময়ে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে এখনও আমাদের অনেক বেগ পেতে হচ্ছে।” তবে এখনও আত্মবিশ্বাস হারাননি জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, “আমরা ভীষণভাবে বিশ্বাস করি, আমরা সফল হব। আমরা একটা বৃহত্তর ঐক্যের কথা বলছি যে, একটা বৃহত্তর ঐক্য সৃষ্টি করে যে দানব আমাদের সমস্ত অর্জনগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছে তাকে পরাজিত করতে হবে।” জনগণকে একত্রিত করতে পারলে এই সিটি করপোরেশন নির্বাচনেই কাঙিক্ষত জয় ধরা দেবে বলে আশাবাদী বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, “আমরা যদি জনগণকে একত্রিত করতে পারি তাহলে তাদের (সরকার) সমস্ত ষড়যন্ত্রকে ব্যর্থ করে দিয়ে আমরা এই নির্বাচনে জয়ী হতে পারব ইনশাল্লাহ। যদি বলেন, তাহলে বলতে হয়, জয়ের জন্যই আমরা নির্বাচনে গেছি, পরাজয়ের জন্য যাইনি। “আগে থেকে আমরা কখনোই বলতে রাজি নই যে, এখানে আমরা হেরে যাব। আমরা হারব না, অবশ্যই আমরা জয়লাভ করব। আমরা তরুণদের নিয়েছি, তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে নিশ্চয়ই আমরা জয়লাভ করব।” তবে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ভোট হওয়া সম্ভব নয় মন্তব্য করে ফখরুল বলেন, “বাংলাদেশে একটি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের সমস্ত সুযোগ নষ্ট হয়ে গেছে সেই দিন যেদিন বিচারপতি খায়রুল হক সাহেব যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করে দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের রায় প্রদান করেছিলেন। এই কথাটা আমরা অনেকেই বলি না। সেই দিন থেকে বাংলাদেশে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।” তাছাড়া ‘দলীয় দৃষ্টিকোণ’ থেকে নির্বাচন কমিশনকে গঠন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, “অনেকের মনে থাকার কথা তখন আমরা রাষ্ট্রপতির কাছে নির্বাচন কমিশন গঠনের একটা প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু সঙ্গতকারণেই যেহেতু তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকতে হবে, রাষ্ট্রপতিও সেদিন সেটার প্রতি গুররুত্বারোপ করেনি।” এই সভায় আলোচনায় ইভিএমে ভোট কারচুপির শঙ্কা জানিয়ে নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর জয় নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। “যতই চিৎকার করেন, যা- ই করেন ৩০ তারিখের ভোট কোনো ভোট নয়। ওই ভোটে ধানের শীষ জিততে পারবে না। ওরা জিততে দেবে না,” বলেন তিনি। সভায় মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. আখতার হোসেন। অনুষ্ঠানে তথ্যচিত্রের মাধ্যমে ত্রুটিযুক্ত ইভিএমে ‘ভোট কারচুপির’ বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। আয়োজক সংগঠন পেশাজীবী পরিষদের সভাপতি শওকত মাহমুদ ও সদস্য সচিব অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেনের পরিচালনায় আলোচনায় অংশ নেন বিএনপির হাবিবুর রহমান হাবিব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, আইন বিভাগের অধ্যাপক এ বি এম বোরহানউদ্দিন, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক এ কে এম আমিনুল হক, সাংবাদিক এম এ আজিজ, শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের অধ্যক্ষ সেলিম ভুঁইয়া, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের কাদের গনি চৌধুরী।

আরো খবর...