সড়ক দুর্ঘটনা কি অপ্রতিরোধ্য?

একদিকে করোনাভাইরাসের কারণে মানুষের জীবন বিপর্যস্ত। অন্যদিকে এই পরিস্থিতির ভেতরেও সড়ক দুর্ঘটনা ও দুর্ঘটনায় মৃত্যু থেমে নেই। সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেল, সড়কে মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হয়েছে আরও ২১ জনের নাম। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশের ৮ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় এসব মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় বাস অটোরিকশার সংঘর্ষে একই পরিবারের ৩ জনসহ ৭ জন, চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জে নৈশকোচের ধাক্কায় ৬ জন, মানিকগঞ্জের সিংগাইরে শিশুসহ দুজন এবং রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ধামরাই, খুলনার ডুমুরিয়ায়, রংপুরের কাউনিয়ায়, বগুড়ার শেরপুরে ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় একজন করে নিহত হয়েছেন। প্রসঙ্গত বলা দরকার, সড়ক দুর্ঘটনায় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ  যেমন প্রতিনিয়ত চলে যাচ্ছে না ফেরার দেশে, তেমনি অনেক সম্ভাবনার মৃত্যু হচ্ছে অকালেই। সম্প্রতি রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় কেড়ে নিল সম্ভাবনাময়ী রতœাকে। শুক্রবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে গণভবন সংলগ্ন এলাকায় সাইক্লিং করতে গেলে দুর্ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত  ঘোষণা করেন। জানা যায়, দুর্ঘটনার সময় রতœা সাইক্লিং করছিলেন। তিনি গণভবন সংলগ্ন সড়কের পূর্ব দিক থেকে পশ্চিমে যাচ্ছিলেন। এ সময় একটি গাড়ি পেছন  থেকে ধাক্কা দিলে তিনি গুরুতর আঘাত পান। বলা দরকার, রেশমা নাহার রতœার পর্বতারোহণে ছিল বিপুল উৎসাহ। প্রথমে দার্জিলিংয়ে তেনজিং নরগে মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট থেকে বেসিক কোর্স সম্পন্ন করেন এবং তারপর হিমাচলের মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট থেকে উচ্চতর কোর্সও সম্পন্ন করেছেন। রতœা ছয় হাজার মিটার পর্যন্ত  ট্রেকিং সম্পন্নও করেছিলেন। ধাপে ধাপে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখরে পা রাখার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু এমন সম্ভাবনার অবসান ঘটল দানব চাকার দৌরাত্ম্যে। লক্ষণীয়, আট জেলায় ২১ জনের মৃত্যুর ঘটনা পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে যে, বাস এবং বিপরীতমুখী সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে,  নৈশকোচ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত যান, মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেওয়া, পিকআপভ্যান ও মোটরসাইকেল মুখোমুখি সংঘর্ষ, বাসের মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেওয়াসহ নানাভাবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আমরা বলতে চাই, এভাবে যখন সড়কে একের পর এক মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে তখন সার্বিক পরিস্থিতি আমলে নিতে হবে। সংশ্লিষ্টদের মনে বিবেচনায় নেওয়া দরকার, এর আগে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে নানা ধরনের কারণ চিহ্নিত হয়েছে। রবপরোয়া গতিতে গাড়ি চালনা; বিপজ্জনক অভারটেকিং; রাস্তাঘাটের ক্রটি; ফিটনেসবিহীন যানবাহন; যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা; চালকের অদক্ষতা; চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার; মাদক সেবন করে ড্রাইভিং; রেলক্রসিং ও মহাসড়কে হঠাৎ ফিডার রোড থেকে যানবাহন উঠে আসা; রাস্তায় ফুটপাত না থাকা বা ফুটপাত  বেদখলে থাকা; ট্রাফিক আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং ছোট যানবাহন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণ উঠে এসেছে। আমরা মনে করি, সার্বিক বিষয়গুলো আমলে নিয়ে সর্বাত্মক উদ্যোগ জরুরি। বলার অপেক্ষা রাখে না, সম্প্রতি এমন তথ্যও উঠে এসেছে যে, শুধু জুলাই মাসেই ২৯৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় দেশব্যাপী ৩৫৬ জন নিহত হয়েছেন। সঙ্গত কারণেই সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা অনুধাবন করা অপরিহার্য। প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চলে দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে। বিশেষ করে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর বিভীষিকা  থেকে কিছুতেই যেন রক্ষা পাচ্ছে না মানুষ। ফলে এ থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে হবে এবং দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি আমরা বলতে চাই, একের পর এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা কেন ঘটছে এবং এর জন্য দোষীদের শনাক্ত করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দেশে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই। এই মৃত্যুর বিভীষিকা এমন, যেন সড়ক পথ একটা মৃত্যুর ফাঁদ! সঙ্গত কারণেই সামগ্রিক বাস্তবতা অনুধাবন করে সংশ্লিষ্টদের কর্তব্য হওয়া দরকার দুর্ঘটনার কারণগুলো আমলে নেওয়া এবং সেই মোতাবেক কঠোর পদক্ষেপ নিশ্চিত করা। নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা ও  বেপরোয়া গতির কাছে হারিয়ে যাচ্ছে তরতাজা প্রাণ, গণপরিবহণে অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং রেষারেষির কারণেও দুর্ঘটনাও বাড়ছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি আমলে নিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত হোক এমনটি কাম্য।

আরো খবর...