স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশা, দায় কার?

করোনা সংক্রমণের চারমাস অতিবাহিত হয়ে গেল। দিন দিন আক্রান্তের সংখ্যা, মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলছে। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও প্রিন্ট মিডিয়া থেকে শুরু করে অনলাইন মিডিয়া সবখানেই নেতিবাচক শব্দে সয়লাব। করোনা টেস্ট নিয়ে দুর্নীতি, ভুয়া রিপোর্ট তৈরি, চিকিৎসাসেবার নামে হয়রানি, টাকা আত্মসাৎ এমন সংবাদে সবাই দিশাহারা। দেশের স্বাস্থ্য খাতের এমন বেহাল দশার জন্য দায়ী কে। এমন প্রশ্নের উত্তর কে দেবে। এন ৯৫ মাস্ক ক্রয়ে কেলেঙ্কারি, পিপিইসহ নানান রকম সুরক্ষা সামগ্রীর মান নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ, ভুতুড়ে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বিল, অবকাঠামো দুর্বলতাসহ বিভিন্ন ধরনের বিষয় চলে এসেছে সামনে। স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ এই প্রথম নয়। গত বছরের শেষের দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পর্দা কেনা নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছিল তখন। একটি পর্দা কিনতে দাম দেখানো হয়েছিল ৩৭ লাখ টাকা। টিআইবির মতেও চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনকহারে দুর্নীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই ভয়াবহ দুর্নীতিগুলোর তদন্ত কমিটি  তৈরি আর অনুসন্ধান পর্যন্তই থেমে যায় বারবার। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে আরিফ, সাবরিনা, সাহেদ কিংবা মিঠুর মতো দুর্নীতিবাজদের ধরা হলেও, তাদের আইনের আওতায় আনা হলেও, তাদের যারা মদদ দিয়ে আসছে, রাজনৈতিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে তারা থেকে যাচ্ছে পর্দার আড়ালে। তাদের হাতে আবারও তৈরি হয় নতুন সাহেদ, সাবরিনারা। এসব মানুষরূপী মনুষ্যত্বহীন মুখোশধারী অমানুষ একদিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে তাদের পাপের রাজত্বের বিকাশে বলি হতে হয়েছে দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের। করোনার মতো মরণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য আসা মানুষজন সর্বস্ব হারিয়ে নিদারুণ কষ্টে দিন পার করে পাড়ি জমিয়েছে না ফেরার  দেশে। যার যায় শুধু সেই বোঝে বিচ্ছেদের কি যন্ত্রণা। স্বাস্থ্য খাত দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। করোনা মহামারি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, এ দেশের স্বাস্থ্যসেবার বর্তমান অবস্থা। স্বাস্থ্যসেবার নামে নানান রকম হয়রানির স্বীকার হয়ে দেশের আপামর জনসাধারণ এখন হাসপাতাল বিমুখী। কিন্তু প্রতি বছর বাজেটে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও কিছু দুর্নীতি পরায়ণ মানুষের কারণে প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। প্রসঙ্গত করোনার সংক্রমণের শুরুর দিকে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর যে ভরসা ছিল তা এখন নেই বললেই চলে। একের পর এক দুর্নীতি, অভিযোগের সত্যতা বের হয়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলো এখন মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসা  মৌলিক অধিকার। এ অধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত করার অধিকার কারও নেই। করোনা সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে তিনটি বিষয় খুবই জরুরি। প্রথমে টেস্টের মাধ্যমে শনাক্ত করা, দ্বিতীয়ত করোনা আক্রান্ত রোগীকে আলাদা করা, তৃতীয়ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। কিন্তু প্রত্যেকটি বিষয়েই আমরা শুরু থেকেই ব্যর্থ হয়ে আসছি। তবুও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মুখে তার কোনো ছাপ নেই। তারা  দেখেও যেন না দেখার ভান করছে। স্বাস্থ্য খাতের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে এত এত দুর্নীতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এর দায় সরকারকেই নিতে হবে। তাদের আরও সচেতন হতে হবে, আরও কঠোর হতে হবে। সাহেদ, সাবরিনাদের মতো এরকম দুর্নীতিবাজ মানুষের অভাব নেই আমাদের চারপাশে। এদের এতদিন ধরে যারা পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে, তাদেরও অচিরেই খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে। খাতা-কলমে জিরো টলারেন্স লিখে কখনো অপরাধীকে থামিয়ে রাখা যায় না। এরা মুখোশ পরে ঘুরে  বেড়ায়। এদের কঠোরহস্তে দমন না করতে পারলে চিকিৎসাসেবা কিংবা হাসপাতালগুলোর প্রতি দেশের মানুষের আস্থা কমে যাবে। স্বাস্থ্য খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এসব দুর্নীতিবাজদের দ্রুত অঙ্কুরে বিনষ্ট করে স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে,  দেশকে বাঁচাতে হলে, দেশের মানুষকে বাঁচাতে হবে।  দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে এর বিকল্প নেই।

 

আরো খবর...