স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ ও নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনেই রক্ষা

 ॥ এ কে এম শাহনাওয়াজ ॥

গত সপ্তাহে যুগান্তরে লেখার পর ভেবেছিলাম, আপাতত করোনা প্রসঙ্গে লিখব না। টেলিভিশন দেখা কমিয়ে দিয়েছি। প্রতিদিন আক্রান্ত-মৃত্যু এসব আর শুনতে ভালো লাগছে না। সিদ্ধান্ত নিয়েছি- ক্ষমতার বাইরে শুধু শুধু হাঁটব না। বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা করোনাকালে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দিতে পারবে বলে মনে হয় না। ভ্যাকসিন-ওষুধ না বেরোনো পর্যন্ত অথবা ইতালি ও অক্সফোর্ডের বিজ্ঞানীদের ভাষ্যমতো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই করোনা প্রস্থানের আশায় আছি আমরা। কিন্তু এর পূর্ব পর্যন্ত সারা পৃথিবীই অসহায়। আমাদের দেশে সরকার, চিকিৎসাসেবায় যুক্ত মানুষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য অনেকেই সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করছেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতার ভেতরে থাকা আমরা কতটা এর সুফল পাব, ঠিক বলা যাচ্ছে না। প্রশাসনের নানা স্তরে বিরাজমান দুর্নীতি আর একশ্রেণির মানুষের অসচেতনতার যে স্বরূপ দেখতে পাই, তাতে এদেশ আর কতটা নিজেকে রক্ষা করতে পারবে! যেহেতু বেঁচে থাকা, ভালো থাকার ক্ষমতা আমাদের হাতে নেই, তাই আক্রান্ত আর মৃত্যুর হিসাব কষে কষে শরীর-মন দুর্বল করব  কেন? এজন্যই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে যতটা সতর্ক থাকা যায়; সেভাবেই নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষার চেষ্টা করব। আত্মীয়স্বজন আর বন্ধু-বান্ধবদের তেমন পরামর্শই দিচ্ছি আমি। কিন্তু এরপরও আজ করোনা সংশ্লিষ্ট লেখাই লিখতে হল। একেই আমি বলি দায়বোধ। আমাদের বিচারে করোনা পরিস্থিতির অবনতি আর মৃত্যুর মিছিল বড় হতে থাকার  পেছনে দুটি কারণ সক্রিয়। প্রথমত, মাঝে মাঝে সরকারি নীতিনির্ধারকদের সমন্বয়হীন সিদ্ধান্ত আর দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের একাংশের স্বাস্থ্যবিধি না মানা ও বেপরোয়া আচরণ। ২ জুলাই টিভি খবরে দেখলাম যুক্তরাষ্ট্রে আবার বেড়ে যাচ্ছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা। মৃত্যুর মিছিল আরও বড় হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ অবস্থা সৃষ্টির পেছনে শিথিল লকডাউনকে সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে শক্তিমান দেশের যদি এ অবস্থা হয়, তবে আমরা কোন ছাড়! তারপরও যতদিন আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের একটি অংশ, ব্যবসায়ী, শিল্প মালিক, রাজনৈতিক বণিক আর প্রশাসনের বড় অংশ অসৎ থাকবেন, বিবেকবান ও মানবিক হবেন না; ততদিন ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বুকে শক্তি তৈরি হতে পারে না। অথচ এখনও আমাদের অসততা আর অবিবেচনার অন্ধকারের ঘোর কাটছে না। এখন তো সাধারণ মানুষের ঈশ্বর, ভগবান আর আল্লাহর কৃপাভিক্ষা করা ছাড়া কোনো পথ নেই। কিন্তু কোনো ধর্মেই বলেনি- সততার সঙ্গে চেষ্টা ও পরিশ্রম না করে শুধু হাত-পা  ছেড়ে কৃপাভিক্ষা করলেই বিধাতা কৃপা করবেন। কিন্তু সেই সততা, সেই চেষ্টা আর সেই পরিশ্রম কোথায় আমাদের! এ বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে করোনা সংক্রমণের ভয়ংকর ধাপে এসে আমাদের করণীয় নতুনভাবে ঠিক করা ছাড়া আর  কোনো পথ নেই। এর মধ্যে আসন্ন ঈদুল আজহা আরেকটি আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে করোনা সংকটে আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের ক্রমাগত সমন্বয়হীন ও ইচ্ছাস্বাধীন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি যে কতটা বাড়িয়েছে, তা আর নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। সরকারি শিথিলতার পথ ধরে ঈদুল ফিতরে একবার গ্রামে-গঞ্জে,  জেলা-উপজেলায় করোনা সংক্রমণ ছড়ানো হয়েছে। একশ্রেণির অসচেতন, বিবেকহীন মানুষের স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চলাটা করোনার বিস্তার আরও ব্যাপক করেছে। তাই সময়ের কাজ সময়ে না করে সব হারিয়ে দিশেহারা নাবিকের মতো লাল-হলুদ-আর সবুজ জোনে ভাগ করতে হয়েছে বিভিন্ন নাগরিক অঞ্চলকে। এলাকাভেদে লকডাউন দিতে হচ্ছে। সেখানেও আত্মঘাতী মানুষ কখনও যৌক্তিক কারণে, কখনও যুক্তি ছাড়া লকডাউন উপেক্ষা করে বাইরে বেরোনোর  চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় কোরবানি আসন্ন প্রায়। সরকারি প্রশাসন ইতোমধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পশুর হাট ব্যবস্থাপনার কথা ভাবছে। চলমান বাস্তবতায় তা কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে, বলা কঠিন। এ দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে যেভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করছে। পশুর হাটে সেই তারা দায়িত্বশীল হবে, তা বিশ্বাস করা কঠিন। স্বাস্থ্যবিধি মান্য করার জন্য সরকার যথেষ্ট প্রচার-প্রচারণা করে যাচ্ছে; কিন্তু মানছে কতজন? আর এদেশের মানুষের মধ্যে ধর্মীয় ও সামাজিকতার আবেগ এত বেশি, এবারেও যে পশুর হাটে পশু নিয়ে কাড়াকাড়ি হবে না- এ কথা হলফ করে বলা যাবে না। আর পশুর হাটে সামাজিক দূরত্ব মানাটা কি বর্তমান ব্যবস্থাপনার ধারায় এত সোজা? আমরা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারির কথা স্মরণ করতে পারি। আগের রাতে ঢাকা মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উত্তেজিত ছাত্ররা। বাইরে ১৪৪ ধারা। কর্মসূচি অনুযায়ী সকালে মিছিল  বেরোবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও সিনিয়র শিক্ষকরা ছাত্রদের  বোঝালেন, ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার পরিণতি খারাপ হতে পারে। ছাত্র নেতৃত্ব আশ্বস্ত করলেন, তারা ১৪৪ ধারা ভাঙবেন না। ৫ জন ৫ জন করে বেরোবেন। শুরুও হয়েছিল সেভাবে; কিন্তু বাইরে এসে যখন ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান উঠল, তখন একাকার হয়ে গেল সব। ভেঙে খান খান হয়ে গেল ১৪৪ ধারা। ভাষা আন্দোলন আর কোরবানির পশুর হাট যদিও এক না; তবু বাঙালি মানসিকতার একটি ঐক্য অস্বীকার করা যাবে না। বাস্তব ক্ষেত্রে হাটে এসে ক্রেতা, বিক্রেতা আর দালালগোষ্ঠীর একাকার হয়ে যাওয়াকে আটকাবে কে! আর এক গরু কেনার জন্য উৎসাহী ৫ জন যে সঙ্গে আসবে না, এ নিশ্চয়তা কে দেবে? লকডাউন যারা ভাঙছেন, তাদের মধ্যে একশ্রেণির মানুষের যুক্তি সবল। তারা খেটে খাওয়া মানুষ, ছোটখাটো পুঁজির ব্যবসায়ী। না বেরোলে সংসার চলবে কেমন করে। আরেক  শ্রেণির মানুষ- এরা সবাই যে স্বল্প শিক্ষিত তা নয়; সার্টিফিকেটে শিক্ষিতও আছেন অনেকে। কিছু হবে না বিবেচনায় বেরিয়ে পড়ছেন কারণে-অকারণে। আমি কষ্টের সঙ্গে লক্ষ করেছি, আমাদের কিছুসংখ্যক বর্তমান ও সাবেক ছাত্রছাত্রী, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে পশ্চিমের লোকালয়ে বাসা ভাড়া করে থাকে; প্রিয় ক্যাম্পাস ও নিজ বসতি এলাকার অধিবাসীরা যাতে লকডাউন ও স্বাস্থ্যবিধি মান্য করে এজন্য প্রচার-প্রচারণা চালানোর বদলে এক ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করে যাচ্ছে। আসলে আমরা বুঝতে চাচ্ছি না, এ এক ভিন্নরকম মানবিক বিপর্যয়। আত্মঘাতী হওয়াটাও অন্যায়-অপরাধ। তবুও ধরে নিলাম,  কেউ একজন ‘আমি মরলে মরব’ বলে পথে বেরিয়ে  গেল; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি তো একা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। অনেকের ক্ষতির কারণ হবেন। আবার তিনি অন্যের দ্বারা সংক্রমিতও হতে পারেন। এ প্রক্রিয়ায় কেবল তার মধ্যেই সংক্রমণ আটকে থাকবে না; তিনি সংক্রমণ ছড়িয়ে দেবেন পরিবার ও সমাজে। এভাবে ভয়াবহ মহামারীর বিস্তার ঘটবে। তাই অমন স্বেচ্ছাচারকে বৃহত্তর স্বার্থে কঠোর হাতেই দমন করতে হয়। কারও অধিকার নেই অন্যকে মৃত্যুঝুঁকিতে  ফেলে  দেয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, করোনার হাত থেকে সহজে নিষ্কৃতি নেই। সামনে আরও ভয়াবহ রূপে আবির্ভূত হতে পারে এ ভাইরাস। ফলে কোনোভাবেই শৈথিল্য দেখানোর সুযোগ নেই। গত সপ্তাহের লেখায় ইতিহাস থেকে  দেখিয়েছিলাম- যুগ যুগ ধরে মহামারী থেকে বাঁচার জন্য মানুষ শেষ পর্যন্ত কঠিনভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানার মধ্যদিয়ে নিজেদের রক্ষা করেছে। তাহলে আজ আমরা ভুল পথে হাঁটছি কেন? সরকার আর নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে, মানুষ না বাঁচলে  দেশের উন্নয়ন কোনো কাজে লাগবে না। তাই অগ্রাধিকারের জায়গাটি নির্দিষ্ট করতে হবে। উন্নয়নের কাজ আপাতত কিছুটা কমিয়ে হলেও অসহায় কর্মহীন মানুষের খাওয়া-পরার নিশ্চয়তা দেয়া যেতে পারে। যেহেতু লকডাউনের মাধ্যমে ঘরবন্দি থেকেই করোনাকে পরাজিত করতে হবে, তাই এ  ক্ষেত্রে প্রশাসনের কোনো শৈথিল্য দেখানো অপরাধের পর্যায়ে পড়বে। কোরবানির পশুর হাট নিয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। সবার বাড়ির দোরগোড়ায় হাট বসিয়ে ইজারার রাজস্ব বৃদ্ধির সময় নয় এটি। দূরবর্তী অঞ্চলে উন্মুক্ত মাঠ, নদীর তীর বা সুবিধাজনক পথের পাশে ৫-১০ ফুট দূরে দূরে পশু রাখা  যেতে পারে। যেভাবেই হাটের বন্দোবস্ত করি না কেন, সামাজিক দূরত্ব মান্য করাতে হবে কঠোরভাবে। এজন্য প্রয়োজনে অর্থদন্ড ও বলপ্রয়োগে দ্বিধা থাকলে চলবে না। রাস্তাঘাটে, শহরে-বন্দরে, বাজারে, প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন করা হচ্ছে। অনেকে মাস্ক পরছেন না। রিকশাওয়ালা থেকে রিকশা যাত্রী, বাজারের বিক্রেতা থেকে  ক্রেতা- অনেকেরই মাস্ক থাকলেও তা গলায় ঝুলিয়ে রাখছেন। কথা বলার সময় মাস্ক মুখ থেকে সরিয়ে রাখছেন। সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে না। এসব খামখেয়ালিপনা ঘোর অন্ধকার  তৈরি করছে। মহামারী নিয়ন্ত্রণের বদলে আরও বিস্তার ঘটাচ্ছে। এভাবে দেশের মানুষকে বিপন্ন করে তোলা হচ্ছে। আমরা জানি না, বরাবরের মতো এবারও ঈদ উদযাপনের জন্য মানুষের যাতায়াত উন্মুক্ত করে দেয়া হবে কিনা। তাহলে করোনা বিস্তারের এ তেজী সময়ে আমাদের সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে। করোনা নিয়ন্ত্রণের সুতা আরেকবার ছিঁড়ে যাবে। অবোধ মানুষকে অনেক বোঝানো হয়েছে। ফল খুব একটা মিলেনি। তাই কারও খামখেয়ালির কারণে দেশবাসী বিপন্ন হতে পারে না। এ কারণে আমরা মনে করি, স্বাস্থ্যবিধি মানা, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা এবং লকডাউন কঠোরভাবে কার্যকর করার জন্য প্রশাসনকে অবশ্যই কঠোর হতে হবে। প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করতে কিছুমাত্র ইতস্তত করা যাবে না। আমরা তো বিশ্বাস করি, শুরু থেকে আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করতে পারলে এতদিনে করোনা সংক্রমণ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসত। অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসত আমাদের জীবন। লেখক ঃ অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

 

আরো খবর...