সোনালি আঁশের রুপালি কাঠি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ সোনালি আঁশ পাটের সগৌরব প্রত্যাবর্তনের নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে পাটকাঠি। পাটকাঠির ব্যবহার সম্পর্কে আমরা জানি এটি রান্নার জ্বালানি, ঘরের  বেড়া, পানের বরজে ব্যবহৃত হয়। তাই এই পাটকাঠির তেমন কোনো গুরুত্ব ছিল না। যদিও আগে আখের ছোবড়ার সঙ্গে মিশিয়ে পার্টিকেল বোর্ড তৈরির কাঁচামাল হিসেবেও পাটকাঠির ব্যবহার হতো। তবে পাটকাঠি পুড়িয়ে চারকোল তৈরি এই শিল্পে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।  দেশে চারকোল তৈরির মিলে ব্যবহৃত হওয়ায় পাটকাঠির চাহিদা বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। তথ্যানুসনন্ধানে জানা গেছে, পাটকাঠি বা পাটখড়ি বিশেষ ধরনের চুল্লিতে পুড়িয়ে প্রস্তুত হচ্ছে কার্বন। যার আরেক নাম চারকোল। এই কার্বন রপ্তানি হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। আয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। বাংলাদেশে উৎপাদিত কার্বন পাউডার বা চারকোল কিনে নিচ্ছে চীনসহ কয়েকটি দেশ। বিদেশে পাটখড়ির কার্বন থেকে তৈরি হচ্ছে কার্বন পেপার, কম্পিউটার ও ফটোকপিয়ারের কালি, আতশবাজি, ফেসওয়াশের উপকরণ, প্রসাধনপণ্য,   মোবাইলের ব্যাটারি, দাঁত মাজার ওষুধ, পানির ফিল্টার, বিষ ধ্বংসকারী ওষুধ, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও সারসহ নানা পণ্য।

চারকোল  তৈরির মিলে পাটকাঠি ব্যবহৃত হওয়ায় পাটকাঠির চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ। দাম ভালো পেয়ে লাভবান হচ্ছেন কৃষক। পাটের দাম না পাওয়ার চারকোল থেকে ক্ষতি পুষিয়ে নিচ্ছেন কৃষক। একদিকে সোনালি আঁশ, অন্যদিকে রুপালি কাঠি- দুটো মিলে এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে পাট চাষে। অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশে চারকোল শিল্পের যাত্রা শুরু হয় ২০১২ সালে। শুরুর বছরই চীনে চারকোল রপ্তানি শুরু হয়। এরপর থেকে বাণিজ্যিকভাবে পাটকাঠি থেকে কয়লা উৎপাদিত হচ্ছে। বিশেষ চুল্লিতে পাটকাঠি ১০/১২ ঘণ্টা জ্বালানোর পর চুল্লির মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে ভেতরে অক্সিজেন না প্রবেশ করে। এভাবে ৪ দিন রেখে তা ক্রাশিং করে প্যাকেটজাত করে রপ্তানি করা হয়। বর্তমানে দেশে ছোটবড় মিলিয়ে ৪০টির মতো চারকোল ফ্যাক্টরি আছে। কারখানাগুলো অবস্থান জামালপুর, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গাজীপুর  জেলায়। উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- সানবিম করপোরেশন, মাহফুজা অ্যান্ড আহান এন্টারপ্রাইজ, জামালপুর চারকোল লিমিটেড ও রিগারো প্রাইভেট লিমিটেড।  দেশে বাণিজ্যিকভাবে চারকোল উৎপাদন শুরু হয়েছে। ১০-১২টি প্রতিষ্ঠান পাটকাঠি থেকে কয়লা উৎপাদন করছে। সাধারণত এক মণ চারকোল উৎপাদনে গড়ে খরচ হয় ৩০-৩৫ টাকা অথচ বিক্রি করা যায় ৭৫-৯০ টাকায়। বিদেশে বেশি চাহিদা থাকায় চারকোল বানাবার কারখানার চাহিদাও বাড়ছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাটখড়ির কার্বন দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত তৈরি করেছে। এই চারকোল দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে আশু সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করতে যাচ্ছে।

পাট বহুমুখী ব্যবহার্য একটি কৃষি পণ্য। পাটের কোনো অংশই ফেলনা নয়।  সোনালি আঁশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন পণ্য। পাট থেকে সুতার কাঁচামাল ভিসকস তৈরি এবং সেই ভিসকস থেকে তৈরি হচ্ছে ডেনিম কাপড়। বিজেএমসি সূত্রে জানা যায়, পাটের আঁশ থেকে ভিসকস উৎপাদন আমাদের একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার। আমরা পরীক্ষামূলকভাবে কিছু ভিসকস উৎপাদন করেছি। বড় পরিসরে ভিসকস উৎপাদনে একটি প্রকল্প প্রস্তাব একনেকে (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি) অনুমোদনের জন্য  দেওয়া আছে। আগে পাটকাঠির তেমন ব্যবহার ছিল না। এখন সেই পাটকাঠি দিয়ে তৈরি হচ্ছে চারকোল, যা বিদেশে রপ্তানিও শুরু হয়েছে। উদ্ভাবনী পণ্যটিও বিজেএমসি উৎপাদন করতে চায়। এ জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাবও একনেকে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারের (জেডিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, আমাদের দেশে এ শিল্পে জড়িত ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি করলে পণ্য রপ্তানি আরো বেড়ে যাবে।

৭ বছর আগে ২০১২ সালে প্রথম পাটকাঠিকে ছাই বানিয়ে তা রপ্তানির পথ  দেখায় ওয়াং ফেই নামের চীনের এক নাগরিক। এরপর থেকে বাণিজ্যিকভাবে পাটকাঠি থেকে অ্যাকটিভেটেড চারকোল উৎপাদন শুরু হয়। মূলত তার  দেখানো পথ ধরেই বর্তমানে চীন ছাড়াও তাইওয়ান, জাপান, হংকং ও ব্রাজিলে রপ্তানি হচ্ছে। বাংলাদেশ চারকোল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির মতে, এ খাতে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে ১৫০ কোটি টাকা। শিগগিরই তা বেড়ে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত হবে। চারকোল বা পাটকাঠির কার্বনের চাহিদা রয়েছে চীন, মেক্সিকো, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, ব্রাজিল, তাইওয়ান, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানিসহ ইউরোপের দেশগুলোতে। জানা গেছে, ইউরোপে ওয়াটার পিউরিফিকেশন প্ল্যান্টেও রয়েছে পাটখড়ি কার্বনের ব্যাপক ব্যবহার। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা জানান এই শিল্পকে এগিয়ে নিতে সরকারের প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। শিল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, চারকোল শিল্পকে একটি উদীয়মান শিল্প হিসেবে ঘোষণা দিতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও পাটজাত পণ্য হিসেবে ২০ ভাগ ক্যাশ ইনসেনটিভ পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এ শিল্প বিকাশে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত বা সহযোগী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের সুযোগ দিতে হবে। এ শিল্পের জন্য দ্রুত পৃথক নীতিমালা তেরি করতে হবে। এ ছাড়া এ শিল্পের জন্য সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা ও ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রবাদে আছে- ‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পারো মানিক রতন।’ সত্যিই যেন তাই হয়েছে। পাটকাঠি বা পাটখড়ি এখন আর শুধু খড়ি বা লাকড়ি নয়। এর দাম অনেক। এর ছাই বা চারকোল বিদেশে কালো হীরক হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। বলা হচ্ছে পাটকাঠির এই ছাই  যেন হীরার পাউডার। অথচ একসময় ক্রমাগত লোকসানের কারণে এ দেশের বহু পাটকল বন্ধ ছিল। সরকারের নানামুখী তৎপরতা ও প্রণোদনার ফলে বর্তমানে চালু হয়েছেবেশকিছু পাটকল। পরিবেশ বান্ধব হওয়ায় পাটশিল্পকে নিয়ে সারা বিশ্ব এখন গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে পাটের গুরুত্ব বাড়ছে। সেইসঙ্গে পাটশিল্পকেন্দ্রিক বহুমুখী পণ্য এখন বিশ্ব পরিসরে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। পাট থেকে পলিথিন, পাট পাতার চাসহ পাটকেন্দ্রিক পণ্যে বৈচিত্র্য যুক্ত হচ্ছে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এবং আভিজাত্যে। এর ফলে পাটের বাজার ক্রমশ বড় হচ্ছে।  আর এরই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাটগাছের মূল উপাদান পাটকাঠি বা পাটখড়ি। পাটকাঠি থেকে অ্যাকটিভেটেড চারকোল উৎপাদন শুরু হয়েছে। আশা করা হচ্ছে এর মাধ্যমে বদলে যাবে পাটশিল্পের অবয়ব। খুলে যাবে এই শিল্পের সম্ভাবনার দ্বার। ক্লিভল্যান্ডভিত্তিক শিল্প বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফিরডোনিয়া গ্র“প ইনকরপোরেশনের তথ্যমতে, বিশ্বে প্রতি বছর ৮ দশমিক ১ শতাংশ হারে চারকোলের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৪ সালে চারকোলের বৈশ্বিক বাজার হবে ১০ দশমিক ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশকে এ বাজার ধরতে হলে দেশে চারকোল কারখানা বৃদ্ধি করতে হবে। পাট অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, দেশে বছরে পাটখড়ি উৎপন্ন হয় ৩০ লাখ টন। এর অর্ধেকও যদি কার্বন তৈরি করা যায়, তাহলে দেশে বছরে উৎপাদন দাঁড়াবে ২ লাখ ৫০ হাজার টন। এ খাতে বছরে রপ্তানি আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে ৩২ কোটি ২৫ লাখ ডলারের। আর সরকার এ খাতে রাজস্ব পাবে ৪০ কোটি টাকার মতো। অন্যদিকে এ খাতে  প্রত্যক্ষভাবে ও পরোক্ষভাবে ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

লেখক ঃ  এস এম মুকুল, কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক।

আরো খবর...