সুন্দরবন রক্ষায় বাঘ সংরক্ষণের বিকল্প নেই – পরিবেশমন্ত্রী

ঢাকা অফিস ॥ পরিবেশমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন বলেছেন, বাঘ সুন্দরবনের রক্ষক। এই বাঘের উপস্থিতির কারণেই সুন্দরবন এত বৈচিত্র্যময় ও আকর্ষণীয়। সুন্দরবনে বাঘ না থাকলে সেখানকার সামগ্রিক ইকোসিস্টেম ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা তথা ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে দেশকে বাঁচাতে সুন্দরবনের বিকল্প নেই। কাজেই সুন্দরবন তথা বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে বাঘ সংরক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য সুন্দরবনে বাঘের পরিমাণ দ্বিগুণ করতে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। গতকাল বুধবার ‘বাঘ বাড়াতে করি পণ, রক্ষা করি সুন্দরবন’ প্রতিপাদ্য ধারণ করে বিশ্ব বাঘ দিবস-২০২০ উপলক্ষে অনলাইন আলোচনা সভায় সরকারি বাসভবন হতে সংযুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে সুন্দরবনে প্রায় ১১৪টি বাঘ রয়েছে। বন উজাড় ও অবৈধ শিকারের ফলে বাঘ বিশ্বে ‘বিপদাপন্ন’ প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বর্তমানে সারাবিশ্বে প্রকৃতিতে বিদ্যমান বাঘের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৮৯০টি। বাঘ বিশেষজ্ঞদেরর মতে, বাঘের সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়ার এই প্রবণতা চলমান থাকলে আগামী কয়েক দশকে পৃথিবী থেকে বাঘ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আবাসস্থলের উন্নয়ন ও নিয়মিত টহল প্রদান করে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য যথোপযুক্ত উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকার বাঘের আবাসস্থল উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বর্তমানে সুন্দরবনের প্রায় ৫২% এলাকা অভয়ারণ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে উভয় সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ, বাঘ ও শিকারী প্রাণী পাচার বন্ধ, দক্ষতা বৃদ্ধি, মনিটরিং ইত্যাদির জন্য ২০১১ সালে একটি সমঝোতা স্মারক এবং একটি প্রোটোকল স্বাক্ষরিত হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করে সংবিধানে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ অনুযায়ী বাঘ ও হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর শিকারীদের শাস্তি প্রদান করা হচ্ছে। সুন্দরবনের বাঘ রক্ষার লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে টাইগার কোঅর্ডিনেশন কমিটি গঠন করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর আক্রমণে জানমালের ক্ষতিগ্রস্ত ৫৯টি পরিবারের মধ্যে ৫১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়েছে। শাহাব উদ্দিন বলেন, বাঘ সংরক্ষণের জন্য দ্বিতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশ টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান ২০১৮-২০২৭ প্রণয়ন করেছে। লোকালয়ে বাঘ আসামাত্র খবরাখবর আদান-প্রদান ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুন্দরবনের চারপাশের গ্রামগুলোতে বনবিভাগ ও স্থানীয় জনসাধারনের সমন্বয়ে টাইগার রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। সুন্দরবন ও বাঘ সংরক্ষণের জন্য সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জে নিয়মিত স্মার্ট প্যাট্রোলিং কার্যক্রম চলছে। বন অধিদফতরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমির হোসাইন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অনলাইন সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপ-মন্ত্রী হাবিবুন নাহার, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব জিয়াউল হাসান এবং অতিরিক্ত সচিব ড. মো. বিল্লাল হোসেন। উল্লেখ্য, বাঘ টিকে আছে বিশ্বে এমন ১৩টি দেশে ২০১০ সাল থেকে প্রতি বছর ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশের সুন্দরবন অংশে গত ৩ বছরে বাঘের সংখ্যা ১০৬ থেকে বেড়ে বর্তমানে ১১৪টি হয়েছে। অর্থাৎ ৩ বছরে সুন্দরবনের বাঘ বেড়েছে ৮টি। গত বছরের ২২ মে সর্বশেষ বাঘ জরিপে সুন্দরবনে ১১৪টি বাঘ রয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়। সুন্দরবনে ক্যামেরা ট্র্যাকিং জরিপের মাধ্যমে এ তথ্য নিশ্চিত হয় বন বিভাগ। বিগত সময়ের থেকে বর্তমানে সুন্দরবনে চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্য কমে যাওয়ায় রয়েল বেঙ্গল টাইগার বা বাঘের সংখ্যা বেড়েছে বলে দাবি তাদের। বাংলাদেশে বাঘের একমাত্র আবাসস্থল সুন্দরবনকে দিনের পর দিন অরক্ষিত করে ফেলায় চরম হুমকির মধ্যে ছিল দেশের জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগার। যদিও বর্তমানে এই অবস্থার উন্নতি হয়েছে। অথচ রাশিয়ার সেন্টপিটার্সবার্গ শহরে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব বাঘ সম্মেলনে ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সে প্রেক্ষিতে সুন্দরবন সন্নিহিত জেলা বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার অন্তর্গত সুন্দরবনে বসবাসকারী রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা তেমনটি বাড়েনি। সর্বশেষ বাঘ জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের সুন্দরবন অংশে ১১৪টি বাঘ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সুন্দরবনের ঘনত্ব অনুযায়ী কমপক্ষে ২০০টি বাঘ থাকার কথা। মানুষের তৎপরতা তথা অবৈধ শিকার, খাবারের অভাব ও প্রাকৃতিক বিভিন্ন দুর্যোগসহ সুন্দরবনের ভেতরে নদীতে নৌযান চলাচল এবং বনের পাশে শিল্প অবকাঠামো নির্মাণ বাঘের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে ‘বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘের ঘনত্ব’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। ২০১৫ সালের ২৬ জুলাই প্রকাশিত ক্যামেরা পদ্ধতীতে বাঘ গণনার জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। ওই সময় ভারত-বাংলাদেশ মিলে পুরো সুন্দরবন জুড়ে বাঘের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছিল ১৭০টি যা এর আগের শুমারি থেকে ২৭০টি কম। অথচ ২০০৪ সালে বন বিভাগ এনএনডিপির সহায়তায় প্রথমবারের মতো বাঘের পায়ের ছাপ গুণে বাঘের সংখ্যা নির্ধারণ করেছিল ৪৪০টি। দু’বছর পর ২০০৬ সালে ক্যামেরা পদ্ধতিতে বাঘ গণনা করে এর সংখ্যা নির্ধারণ করে ২০০টি। ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইট সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। গত বছরের ২২ মে সর্বশেষ বাঘ জরিপে সুন্দরবনে ১০৬ থেকে বেড়ে বর্তমানে বাঘের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৪টিতে। ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত বন বিভাগের হিসেবে ৫৩টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে স্বাভাবিকভাবে মারা গেছে মাত্র ১৫টি। লোকালয়ে ঢুকে পড়া ১৪টি বাঘকে পিটিয়ে মেরেছে স্থানীয় জনতা, একটি নিহত হয়েছে ২০০৭ সালের সুপার সাইক্লোন সিডরে ও বাকি ২৫টি বাঘ হত্যা করেছে চোরা শিকারিরা। অধিক মুনাফার আশায় বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, চামড়া, হাড়, দাঁত, নখ পাচার ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। আর এটি দেশ ও দেশের বাইরে চলে যেত চোরকারবারি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। তবে আশার খবর হচ্ছে সুন্দরবনে একের পর এক বনদস্যুদের আত্মসমর্পণে বাঘ নিধন কমে এসেছে। সুন্দরবনে চোরা শিকারির পাশাপাশি বাঘের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে হুমকির মুখে রয়েছে বাঘ। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। এ অবস্থায় হারিয়ে যেতে পারে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার। ২০৭০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে বাঘের জন্য কোনো উপযুক্ত জায়গা থাকবে না। কেননা বিশ্বের তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধিসহ উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সুন্দরবনে টিকে থাকা কয়েকশ বাঘ বিলীন হওয়ার জন্য যথেষ্ট। এই অবস্থায় সুন্দরবনে বাঘের আবাসভূমি এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

আরো খবর...