সাহারা খাতুন আর নেই

ঢাকা অফিস ॥ আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন আর নেই। গত বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ব্যাংকক স্থানীয় সময় রাত ১২টা ২৬ মিনিটে মারা যান তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। সাহারা খাতুনের ব্যক্তিগত সহকারী মজিবুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ব্যাংকক স্থানীয় সময় রাত ১২টা ২৬ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ২৫ মিনিট) বামুনগ্রাদ হাসপাতালে অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন ইন্তেকাল করেন। এর আগে গত সোমবার থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনকে। জ¦র, অ্যালার্জিসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে অসুস্থ অবস্থায় গত ২ জুন সাহারা খাতুন ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হন। এখানে তার অবস্থার অবনতি হলে গত ১৯ জুন সকালে তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। এরপর অবস্থার উন্নতি হলে তাকে গত ২২ জুন দুপুরে আইসিইউ থেকে এইচডিইউতে (হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট) স্থানান্তর করা হয়। পরে ২৬ জুন সকালে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে আবারও তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া: আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বিশেষ করে নিজ দলের নেতারা শোকে মুহ্যমান। তার মৃতুতে শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের মন্ত্রী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা। বিবৃতির মাধ্যমে দেয়া এসব শোকবার্তায় গভীর দুঃখ ও শোক প্রকাশ করেন তারা। এ ছাড়া শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন তারা। পাশাপাশি সাহারা খাতুনের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও বিকাশে তার অবদানের কথা স্মরণ করা হয়। শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, সাহারা খাতুন ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একজন পরীক্ষিত নেতা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে তিনি গণতন্ত্রের বিকাশসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে অপরিসীম অবদান রেখেছেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিককে হারালো। এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে সাহারা খাতুন গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আজীবন কাজ করে গেছেন এবং দলের দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের পাশে থেকে সকল সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করেছেন। তার মৃত্যুতে দেশ ও জাঁতি একজন দক্ষ নারীনেত্রী এবং সৎ জননেতাকে হারালো। আমি হারালাম এক পরীক্ষিত ও বিশ্বস্ত সহযোদ্ধাকে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সাহারা খাতুনের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি সাহারা খাতুনের রুহের মাগফেরাত কামনা এবং তার পরিবার-পরিজন ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। মন্ত্রিসভা সদস্যরা আলাদা আলাদা শোক বাণীতে সাহারা খাতুনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। তারা তার আত্মার মাগফিতার কামনা এবং তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন- মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাছান মাহমুদ, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি, পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, বিজ্ঞান ও প্রযু্ক্িত মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ। এছাড়া শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল, বিদ্যুৎ জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, তথ্য প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য, পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা শোক প্রকাশ করছেন। শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম। এছাড়া সাহারা খাতুনের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হেসেন। পাশাপাশি ঢাকা উত্তরের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম ও দক্ষিণের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসও পৃথকভাবে শোক প্রকাশ করেন। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার সাহারা খাতুনের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন। সাহারা খাতুনের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন: ১৯৪৩ সালের ১ মার্চ তিনি ঢাকার কুর্মিটোলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আবদুল আজিজ ও মাতার নাম টুরজান নেসা। শিক্ষাজীবনে তিনি বিএ এবং এলএলবি ডিগ্রি আর্জন করেন এবং রাজনীতির পাশাপাশি আইনপেশায় নিযুক্ত ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই ছাত্র রাজনীতিতে নাম লেখান। আইনপেশায় আসার পর সক্রিয়ভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৬৯ সালে আওয়ামী লীগের মহিলা শাখা যখন গঠিত হলে তাতে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ শুরু করেন এবং সারা ঢাকা শহরে মহিলাদের আইভি রহমানের নেতৃত্বে সংগঠিত করতে শুরু করেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে জাতীয় নেতা মরহুম তাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগের মহিলা শাখা গঠন করে দিয়েছিলেন। তখন থেকেই মিছিল মিটিং সবকিছুতেই অংশগ্রহণ করেছেন। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের দিনও তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। শেখ হাসিনা তখনকার ছাত্রলীগ নেত্রীর সাথে সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি প্রথমে নগর আওয়ামী লীগের মহিলা সম্পাদিকা নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে মহিলা আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক, পরবর্তীতে সাধারণ সম্পাদিকা এবং একই সাথে নগর আওযামী লীগের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সহ-আইন সম্পাদিকা, পরে তিনি আইন সম্পাদিকা নির্বাচিত হন, তখন তিনি নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি পদ এবং মহিলা আওযামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ আর গ্রহণ করেননি। অতঃপর তিনি পরবর্তী কাউন্সিলে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সভাপতিম-লীর সদস্য নির্বাচিত হন। এখনও তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য হিসেবে আছেন। রাজপথের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন সরব। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, আইয়ুব-ইয়াহিয়া বিরোধী আন্দোলন, দেশ স্বাধীনের আন্দোলন, ৭৫’র পর অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং খালেদা জিয়ার নির্যাতন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলন করেছেন রাজপথে। রাজপথে আন্দোলন করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে হরতাল, সভা-সমাবেশ করতে গিয়ে একাধিকবার গ্রেফতার এবং নির্যাতিত হয়েছেন। আইনপেশায় নিয়োজিত থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের বহ সংখ্যক নেতাকর্মীর মামলা বিনাপয়সায় লড়েছেন। যারা আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছেন তারা জানতেন জামিনের জন্য অ্যাডভোকেট সাহারাসহ আওয়ামী লীগের আইনজীবীরা আছেন। আন্দোলনকারী নেতাকর্মীদের কাছে ভরসার জায়গা ছিলেন অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন। এমনিভাবে সারাজীবনের আইনপেশায় তিনি আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মীর পেছনে লড়েছেন এবং তাদের জেল থেকে মুক্ত করেছেন। বাংলাদেশ সরকারের প্রথম নারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে প্রথমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। এর আগে ফখরুদ্দিন, মঈনুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেফতার করা হয় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তার সঙ্গে আবারও গ্রেফতার হন অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন। তিনি ছিলেন কল্যাণমূলক রাজনীতির অগ্রদূত ও ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনার খুব প্রিয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সাহারা খাতুন নিজে রাজনৈতিক অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ২০০৮ এর নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-১৮ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচিত হওয়ার পর মন্ত্রিসভা গঠনের সময় ডাক পড়ে অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের। তিনি শপথগ্রহণ করেন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। তিনি ৬ জানুয়ারি ২০০৯ সালে তার দফতরে প্রবেশ করেন। ২০১২ সালে মন্ত্রণালয়ের রদবদল ঘটলে তিনি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০৯ সালের অওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার ২৫ ফেব্র“য়ারি বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। এর আগে অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন সদ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহ শুরু হলে তিনি দ্বন্দ্ব সমাধানে নেতৃত্ব প্রদান করেন। বিদ্রোহীদের খারাপ দিকটার সুরাহা করেন। যেটা সৈনিকদের পক্ষে ও বাংলাদেশ রাইফেল অফিসারদের বিরুদ্ধে যায়। যারা বাংলাদেশের আধাসামরিক সীমান্তরক্ষী বাহিনী। তিনি সেখানে বাংলাদেশ রাইফেলের ক্যাম্পাসের কাছে গিয়েছিলেন। তাদের মাঝে আপসের জন্য উদ্দীপনামূলক কথা বলেন এবং বিদ্রোহীদের অস্ত্র জমা দিতে বলেন। এ ঘটনার ফলে ৫৩ জন সেনা কর্মকর্তা ও ৩ জন সেনা পরিবারের সদস্য নিহত হন।

আরো খবর...