সমাজটা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে

ছেলেটার বয়স কতই-বা হবে, ষোলো কি সতেরো। স্কুলে যায়। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা মারে, গল্প করে, বিকেলে খেলাধুলা করে, সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আসে, সপ্তাহে তিন দিন কোচিং সেন্টারে যায়। যখন বাড়িতে থাকে তখন চুপচাপ পড়ার টেবিলে গিয়ে বসে। মা-বাবাকে কিছুই বলতে হয় না। তারা তো ভীষণ খুশি। পাড়া-প্রতিবেশী আর আত্মীয়স্বজনের কাছে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে ছেলেটাকে নিয়ে তাদের গর্বের কথা। কত বড়ো আশা, একদিন এ ছেলে তাদের সোনার ছেলে হয়ে মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করবে। টানাটানির সংসারেও তারা ছেলের আবদার রক্ষা করেন খেয়ে না খেয়ে। ছেলেকে তা বুঝতে দেন না। কিন্তু তাদের এ সুখ বেশি দিন রইল না। একদিন পুলিশ এসে জানায়, তাদের ছেলে ইয়াবা বিক্রি করে, ইয়াবা খায় আর বখে যাওয়া সমবয়সিদের সঙ্গে জুয়া খেলে, মারপিট করে, মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার পথে উত্ত্যক্ত করে। আজ সে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে এলাকার দক্ষিণ দিকে খেলার মাঠের পাশের রাস্তায় ছিনতাই করার সময়। শুনে মা-বাবার তো আক্কেল গুড়ুম। ছেলেটাকে কয়েক দিন যাবৎ কেমন কেমন মনে হচ্ছিল। তবে এমনটা হবে তা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি! এ কাহিনির মা-বাবার মতো অনেক মা-বাবা আজকাল তাদের উঠতি বয়সি ছেলেদের জন্য সমাজে হেয় হয়ে যাচ্ছে। বখে যাচ্ছে কিশোর বয়সে, সমবয়সি কিংবা দু-এক বছরের সিনিয়র বখাটে-মাদকখোর-ছিনতাইকারী ‘বন্ধুদের’ কবলে পড়ে। কিশোর গ্যাং নামক অপসংস্কৃতি (জুভেনাইল সাবকালচার নামে অন্যান্য দেশে পরিচিত) ইদানীংকালে একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি হয়ে দেখা দিয়েছে শুধু শহর এলাকায় নয়, গ্রামেগঞ্জেও। ভ্রষ্টতার জন্ম হচ্ছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আরো অনেক ভ্রষ্টতার সঙ্গে মিশে ক্ষয়ে যাচ্ছে সমাজ ধীরলয়ে। কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, নিত্য চুরি-ছিনতাই, মেয়েদের উত্ত্যক্তকরণ, নারী-শিশু নিপীড়ন, গণপরিবহনে নারীদের শ্লীলতাহানি, শহরের পার্কে কিংবা গ্রামের পুকুর-নদীর ঘাটে মেয়েদের উত্ত্যক্তকরণ, স্কুল-কলেজে আসা-যাওয়ার পথে মেয়েদের প্রতি কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের হল- হোস্টেলে নবাগত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে র‌্যাগিং, গেস্টরুমে নিয়ে ‘আচরণ শেখানোর’ নামে শারীরিক-মানসিক নির্যাতনসহ অবমাননাকর আচরণ, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-মক্তব-বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়া যৌন হেনস্তা, কর্মস্থলে নারী কর্মীদের সঙ্গে দুর্বৃত্তমনা সহকর্মীদের অশ্লীল আচরণ ইত্যাদি ধরনের সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য কর্মকান্ড সমাজকে নিয়ে যাচ্ছে তলানির দিকে। আর বহুরূপী প্রতারণা তো আছেই নিত্যসঙ্গী হিসেবে। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই এমন একটা সময় আসবে যখন দেখা যাবে নষ্ট সমাজে ভ্রষ্ট লোকজনের ছড়াছড়ি। তখন পারবে না এ সমাজ ধ্বংসের হাত থেকে নিজকে রক্ষা করতে। কিশোরদের মধ্যে যারা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তাদের মধ্যে একটা বড়ো অংশ ব্রোকেন পরিবার আর নিম্নবিত্ত পরিবারের হলেও ধনাঢ্য পরিবারেরও রয়েছে অনেকে। ধনীর ছেলেরা মা-বাবার অগোচরে মাদক সংগ্রহের জন্য, বিলাসিতা করার জন্য ছিনতাইয়ে নেমেছে অনেক জায়গায়, ধরাও পড়েছে অনেকে। অনেক জায়গায় ধনীর ছেলেরাই ‘হিরোইজম’ দেখানোর অভিলাষে নেতৃত্ব দিচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের। এরা গ্র“পের নামে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খুলে অশ্লীল ভাষায় তথ্য আদানপ্রদান করে, দেওয়ালে চিকা মেরে নিজেদের অবস্থান আর শক্তির জানান দেয়, হর্ন বাজিয়ে প্রচন্ড গতিতে কার রেসিং করে, শহরে খেলার মাঠ নিয়ন্ত্রণ করে, মারামারি করে, মাদকের মাদকতায় মাতাল হয়ে ছিনতাই করে, অশ্লীল কাজ করে, এমনকি খুনাখুনিতেও জড়িয়ে পড়ে। কয়েক দিন আগেই তো কিশোর গ্যাংয়ের হাতে খুন হলো চট্টগ্রামের নিরীহ রিকশাচালক রাজু, ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে এক কিশোরের হাতে খুন হয় আরেক কিশোর, নওগাঁর নিয়ামতপুরে ছেলে মেরে ফেলেছে বাবাকে নেশার টাকা না পেয়ে। এমন অসংখ্য ঘটনা। বড়ো ভাইদের দিকনির্দেশনায় এরা খুনোখুনিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। ধরা পড়ছে পুলিশের হাতে, যাচ্ছে শিশুকিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে প্রতিদিন প্রায় ১৩০-১৪০ জন, আবার জামিন নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ১১০-১২০ জন (ইত্তেফাক, ১৭/৮/২০১৯)। আসলে সব শহরের কাহিনিই প্রায় এক। দৈনিক ইত্তেফাকের খবরে (৭/৯/২০১৯; ২১/২/২০২০) দেখা যায়, ২০০১ সালে মূলত শুরু হয়ে গ্যাং কালচারে কিশোর অপরাধ বেড়ে যাওয়ার ফলে বিগত ১৫ বছরে খুন হয়েছে ৮৬ জন কিশোর। শুধু রাজধানীতেই রয়েছে ৮০টি গ্যাং; সব জেলায় তো আছেই আরো অসংখ্য গ্যাং। বিগত বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে প্রায় ৪০০ জন। ভ্রাম্যমাণ আদালত চালিয়েও থামানো যাচ্ছে না এদের অনেক স্থানে। এদের অধিকাংশ নাবালক ক্যাটাগরিতে পড়ায় সৃষ্টি হচ্ছে আইনগত সমস্যা। দেশের অনেক স্থানে কিশোর গ্যাং সক্রিয় হচ্ছে অসৎ মনোবৃত্তির রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে। যেমনটি হয়েছে বরগুনার রিফাত হত্যার সঙ্গে জড়িত সংঘবদ্ধ কিশোর গ্যাং (‘০০৭ বন্ড’) যার প্রধান ছিল নয়ন বন্ড নামে পরিচিত এক বখাটে কিশোর। এ এলাকায় আরো রয়েছে ‘লারেলাপ্পা’ আর ‘হানিবন্ড’-সহ কয়েকটি কিশোর গ্যাং। শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, এসব গ্র“পের সব সদস্যই মাধ্যমিক কিংবা উচ্চমাধ্যমিকে পড়ুয়া ছাত্র। এরা কিশোর অপরাধী। বিভিন্ন উদ্ভট নাম ব্যবহার করে এরা মাদক বিক্রি থেকে শুরু করে ছিনতাই, রাহাজানি, মারপিট, জমি দখল, নদী দখল, মাস্তানি এসব করে বেড়ায়। যেমন, ঢাকার মুগদা আর আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে চান-যাদু, ডেভিড কিং, ভলিয়ম টু, ভান্ডারি গ্র“প ইত্যাদি নাম নিয়ে বেশ কয়েকটি গ্যাং। রাজধানীর অন্যান্য স্থানে আরো আছে ‘লাড়া দে’, ডিসকো বয়েজ, নাইন স্টার, ফিফটিন, ব¬াক রোজ, ক্যাসল বয়েজ, ‘কোপাইয়া দে’, তালাচাবি গ্যাং, কেনাইন, তুফান, থ্রি গোল, লাভলেট, টিকটক, পোঁটলা সিফাত, ভাইপার ইত্যাদি নামে অনেক গ্যাং। এরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে। ভয়ংকর তথ্য হলো এদের বেশির ভাগ কিশোরের বয়স ১০ থেকে ২০-এর মধ্যে। তাজা টগবগে তারুণ্য কীভাবে ক্ষয়ে যাচ্ছে সবার চোখের সামনে! এদের উত্পাতে স্কুলছাত্রীকে আত্মহত্যা করার খবরও আমরা পত্রিকায় দেখেছি। কোথায় নেই কিশোর গ্যাং। রাজধানী ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রায় সর্বত্র। গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা যায়, কুমিল্লা শহরে কিশোর গ্যাংয়ের আক্রমণে নিহত হয়েছে কয়েক জন সাধারণ শিক্ষার্থী, মুরাদনগরে এরা নির্যাতন করেছে অনেক ছাত্রকে গাছে কিংবা ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে মাথায় ডিম-আটা মেখে, সিদ্ধিরগঞ্জে প্রকাশ্যে দিবালোকে স্কুলছাত্রকে বুকে-পিঠে চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছে, ৩৫টির বেশি কিশোর গ্যাং জ্বালিয়ে ছাড়ছে রংপুর শহরের অধিবাসীদের। ৬৪টি জেলা শহরসহ গ্রামেগঞ্জে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে এদের উৎপাত। নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বেও খুনাখুনি হচ্ছে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে বাধা হয়ে দাঁড়ালেই হামলা করছে একে অপরের ওপর। পাড়া-মহল্লায় এরা নিজেরাই সন্ত্রাসের প্রতিবিম্ব। নিরীহ প্রতিবেশী আর কিশোরী-যুবতি মেয়েদের মা-বাবা থাকেন নিত্য শঙ্কায়। কিশোর-তরুণ অপরাধ বেড়ে গেলে মেয়েদের শিক্ষাও অনেক জায়গায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে; স্তব্ধ হয়ে যাবে সারা বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টিকরা নারী শিক্ষার অগ্রগতি। কিশোর গ্যাংয়ের উৎপত্তির কারণ বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন রকম। স্কুল ড্রপআউট, মা-বাবাসহ পারিবারিক অবহেলা, ঘুণপোকায় ধরা সামাজিক বিচারব্যবস্থা, মাদক আর অস্ত্রের প্রভাব, রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে কিশোরদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার, আকাশ-সংস্কৃতির কুপ্রভাব, ভার্চুয়াল পরিসর বৃদ্ধি, সঠিক ধর্মীয় শিক্ষা এবং ধর্মচর্চার অভাব ইত্যাদি। তবে কারণ যা-ই হোক না কেন, তাদের পরিণতি এক। এরা প্রভাবশালীদের হাতের ক্রীড়নকে পরিণত হয়ে তাদের মাদক আর অস্ত্রের বাহক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হয়। চূড়ান্ত পরিণতি, অকালে ধরাধাম থেকে বিদায়। গ্যাং কালচারকে এখনই থামানো না হলে ছোঁয়াচে রোগের মতো সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়বে এর বিষবাষ্প। করোনা ভাইরাসের চেয়েও কম ভয়ংকর নয় এসব অপসংস্কৃতি আর বেলেল্লাপনা। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে অনুসন্ধানের মাধ্যমে বের করে আনতে হবে মূল কারণগুলো, যদিও অনেক কারণ ইতিমধ্যেই জানা হয়ে গেছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে এগিয়ে আসতে হবে এবং থাকতে হবে অগ্রভাগে; গবেষণা চালিয়ে, অপরাধবিজ্ঞানীদের সঙ্গে মতবিনিময় করে, পরিবার-অভিভাবকসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও সুশীলসমাজ/ জনগণের সঙ্গে আলোচনা করে, শান্তিশৃঙ্খলা বাহিনীর যারা কিশোর গ্যাং নিয়ে কাজ করেছেন তাদের অভিজ্ঞতাসঞ্জাত মতামত বিবেচনায় নিয়ে মন্ত্রণালয়কে সঠিক, কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি করে গ্যাং কালচার নির্মূলে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু আইনগত ব্যবস্থার ওপর ভরসা করে বসে থাকলে এ ধরনের দুরারোগ্য সামাজিক ব্যাধি সারানো যাবে না। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এককভাবে কাজটি করলেই যে প্রত্যাশিত সুফল আসবে তা ভাবারও কোনো কারণ নেই। এ মন্ত্রণালয়টি কেন্দ্রীয়ভাবে ‘লিড’ ভূমিকায় থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সাহায্য নিলে তিন মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে সারা দেশে একটি সরব সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে একক উদ্যোগে সঠিক ফল পাওয়া খুবই কঠিন। একাধিক মন্ত্রণালয় জড়িত থাকার কারণে একটি কেন্দ্রীয় কো-অর্ডিনেশন সেল থাকতে হবে। ভুলে যাওয়ার কোনো কারণ নেই যে, আমাদের দেশেই শুধু নয়, প্রায় সব দেশেই যথাবিহিত ব্যবস্থাপনা, মনিটরিং এবং ফলোআপ না থাকার কারণেই অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগের পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটে ‘ব্যর্থ উদ্যোগ’ হিসেবে। সর্বশেষে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, অচিরেই অবসান হোক কিশোর অপরাধ এবং একই সঙ্গে সব ধরনের সামাজিক অনাচার। লেখক  ঃ উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

আরো খবর...