সমন্বিত মাছ ও সবজি উৎপাদন কৌশল

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির নানা কৌশলের মধ্যে একটি কৌশল হচ্ছে অ্যাকোয়াপনিক্স। এই পদ্ধতিতে ড্রামে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের চাষ করা হয় আর মাছ চাষের জন্য ব্যবহৃত পানি দিয়েই বিভিন্ন প্রজাতির সবজি চাষ করা হয়। যেখানে শুধু মাছ চাষের জন্য কিছু খাদ্য সরবরাহ করা হয়। মাছের বর্জ্য ও পানির পুষ্টি দিয়েই কোনো রকম রাসায়নিক সার, কীটনাশক, এমনকি মাটি ছাড়াই পাওয়া যায় সতেজ শাক-সবজি। ফলে পুরোপুরি জীববৈচিত্র্যবান্ধব পরিবেশে অল্প জায়গা থেকে বছরব্যাপী শুধু মাছের পানি ব্যবহার করে বাসার ছাদ বা বারান্দায় একই সঙ্গে মাছ ও প্রচুর শাক-সবজি উৎপাদন করা যায়। অ্যাকোয়াপনিক্স পদ্ধতিতে সমন্বিতভাবে মাছ ও শাক-সবজি উৎপাদনের অগ্রপথিক বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের অ্যাকোয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ সালাম। বাসার ছাদজুড়ে গড়ে তুলেছেন অ্যাকোয়াপনিক্স ফার্ম। তিনি অ্যারোপনিক্স পদ্ধতি ব্যবহার করে একই সঙ্গে তেলাপিয়া, কমন কার্প, মাগুর, শিং ও পাঙাসমাছ চাষ এবং টমেটো, কলমি, কচু, ঢেঁড়স, পুদিনা, লালশাক, পুঁইশাক, বরবটি, ধুন্দল, চিচিঙ্গা, স্ট্রবেরি পেঁপে, করলা, ভুট্টা, চালকুমড়া, লেটুস, কাঁকরোল, ওলকপি, বেগুন প্রভৃতি শাক-সবজি উৎপাদন করে সফলতা পেয়েছেন। বাংলাদেশের কৃষি গবেষণায় (অ্যাকোয়াপনিক্সের) অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে চলতি বছরের ১৬ জুলাই তিনি ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার ১৪২২’ অর্জন করেন। এম এ সালামের ছাদটি খুব বড় নয়, তবে সেই বাগানে রোগ ও পোকার আক্রমণের তেমন কোনো সুযোগ নেই। কারণ এখানে মাটির ব্যবহার হচ্ছে না। মাটির জীবাণুগুলো এখানে ফসলে ছড়াতে পারছে না। ব্যবহার হচ্ছে কোকো ডাস্ট। কোনো গাছে মরা, রোদে ঝলসে যাওয়া বা ছত্রাকে আক্রান্ত কোনো পাতা নেই। গাছগুলো একেবারে তরতাজা। এখানে মাটি ও পানিতে গাছবান্ধব অণুজীবের পরিমাণ বাড়াতে নেয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। সারাক্ষণ পানি থেকে মাটি ও ফসলের খাদ্য তৈরির এই কার্যক্রমটি চলছে চালু এক যন্ত্রের মতো। যেন মাছ ও গাছের এক জীবন্ত কারখানা। ড. সালাম জানান, অ্যাকোয়াপনিক্সের সুবিধা হলো, এখানে চাষাবাদ করতে মাটির প্রয়োজন হয় না, তাই মাটিবাহিত রোগ এবং অণুজীবের আক্রমণ হয় না। কোনো প্রকার রাসায়নিক সার, কীটনাশক দিতে হয় না, তুলনামূলকভাবে ভূমির পরিমাণ কম লাগে। তাই প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে কম খরচে অনেক বেশি ফলন পাওয়া যায়। এই পদ্ধতিতে মাছের না খাওয়া খাদ্য ও বর্জ্য থেকে উৎপন্ন অ্যামোনিয়া মাছের ট্যাঙ্কে জমা হয়, যা মাছের জন্য খুবই ক্ষতিকর। অ্যামোনিয়াযুক্ত পানি সবজির মাচায় সরবরাহ করা হয়। সেখানে মিডিয়াম হিসেবে ব্যবহৃত হয় নুড়ি পাথর, বালি বা কাঠের গুঁড়া ইত্যাদি। এসব মিডিয়ামে জমাকৃত নাইঙ্ক্রোসোমোনাস ব্যাকটেরিয়া অ্যামোনিয়াকে ভেঙে নাইট্রাইটে পরিণত করে, পরে নাইট্রোব্যাকটর নাইট্রাইটকে ভেঙে নাইট্রেটে পরিণত করে। এই নাইট্রেট মাছের জন্য ক্ষতিকর নয়, কিন্তু গাছের জন্য মূল্যবান পুষ্টি হিসেবে কাজ করে। অ্যাকোয়াপনিক্সের অনেক ধরন রয়েছে। এটা খুব সহজ পুকুরের পানিতে ভাসমান সবজির মাচা থেকে শুরু করে খুব জটিল অধিক ঘনত্বের মাছের ট্যাঙ্কের পানি ব্যবহার করে সবজির চাষ হতে পারে। সারাক্ষণ পানির প্রবাহপদ্ধতিতেও অ্যাকোয়াপনিক্স সম্ভব, আবার সেচপদ্ধতিতেও তা করা যেতে পারে। সার্বক্ষণিক পানির প্রবাহপদ্ধতিতে পাম্পের সাহায্যে সবজির পাত্রে সব সময় পানি পাম্প করা হয়। এই পানি মিডিয়ার মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ে আবার মাছের ট্যাঙ্কে ফিরে আসে। এটা হচ্ছে অ্যাকোয়াপনিক্সের সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি। ড. সালাম জানান, উলম্ব পদ্ধতিতে ৪ ইঞ্চি ব্যাস ও সাড়ে ৪ ফুট লম্বা একেকটি পস্নাস্টিকের পাইপের মাঝে ১৩-১৫টি ছিদ্র করে তা নারকেলের ছোবড়া দিয়ে ভর্তি করা হয়, যাতে পাইপটি বেশি ভারী না হয় এবং আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে। পাইপের প্রতিটি ছিদ্রের মাঝে একটি করে শাক-সবজির চারা চাষ করেন তিনি। চারাগুলোর শিকড় এমনভাবে পাইপের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়া হয়, যাতে তা নারকেলের ছোবড়ার মাঝে ভালোভাবে ছড়িয়ে থাকে। এরপর পাইপগুলোকে উলম্বভাবে একটি বাঁশের সঙ্গে ঝুলিয়ে দিয়ে নিচের দিকে একটি প্লাস্টিকের মগ যুক্ত করে তাতে একটি চিকন পাইপ লাগিয়ে একটি নির্গমন পাইপের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেয়া হয়। ফলে পাইপের ওপর দিয়ে প্রবাহিত পানি পাইপের মাঝে অবস্থিত নারকেলের ছোবড়া ও গাছের শিকড়ের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ে নির্গমন পাইপের সাহায্যে আবার মাছের ট্যাঙ্কে এসে পড়ে। উলম্ব পদ্ধতির পাশাপাশি আনুভূমিকভাবে দোতলা-তিনতলা পদ্ধতিতে একটি মাচার ওপর কয়েক সারি ছিদ্রযুক্ত পাইপ স্থাপন করে প্রতিটি ছিদ্রের মাঝে একটি করে ছিদ্রযুক্ত প্লাস্টিকের গ্লাসে ইটের খোয়া দিয়ে তাতে সবজির চারা রোপণ করেও ফসল উৎপাদন সম্ভব। এ পদ্ধতিতে পাইপের এক পাশ থেকে মাছের পানি সরবরাহ করা হয় এবং অন্য পাশ দিয়ে পানি মাছের ট্যাঙ্কে ফিরে আসে। ড. সালাম বলেন, একটি ৫০০ লিটারের প্লাস্টিকের পানির ট্যাঙ্কের ওপরের মাথা কেটে পানি দিয়ে পূর্ণ করে তাতে প্রতি ১০ লিটার পানিতে একটি তেলাপিয়া মাছের পোনা ছেড়ে তাদের চাহিদা অনুযায়ী দুই বেলা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত ভাসমান খাবার সরবরাহ করা হয়। মাছের ট্যাঙ্কে যাতে অক্সিজেনের অভাব না হয়, তার জন্য একটি বায়ু পাম্পের সাহায্যে পানিতে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। মাটিতে যে স্থানে একটি মাত্র গাছের চারা লাগানো যায় সে একই পরিমাণ স্থানে এ পদ্ধতিতে ১৩ থেকে ১৫টি চারা লাগানো সম্ভব বলেও ড. সালাম উলেস্নখ করেন। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. এমএ সালাম জানান, ‘বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাকোয়াপনিক্স ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যেখানে প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও প্রদর্শনীর ব্যবস্থা থাকবে। ফলে সারা দেশসহ বিদেশ থেকে লোক এসে এ পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারবে এবং পদ্ধতিটির বিস্তৃতি ঘটবে।’ অ্যাকোয়াপনিক্স ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
লেখক ঃ শাহীন সরদার

আরো খবর...