সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখির জন্য গাছ লাগানো আমাদের বড় দায়িত্ব

কৃষি প্রতিবেদক ॥ জলবায়ুর তারতম্যের সময়ে দেশের একটা মজবুত অবস্থান দরকার। অন্যদিকে সম্ভব না হলেও সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখির জন্য গাছ লাগানো আমাদের বড় দায়িত্ব। বৃক্ষ রোপণে প্রয়োজন সরকারি কঠোর আন্দোলন। জনগণকে হতে হবে সচেতন। আসুন আমরা সবাই মিলে গাছ লাগাই। বিশ্ব উষ্ণায়নে বাংলাদেশের ভূমিকা আদৌ ভালো নয়, কেননা দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শিল্পোন্নত নয়। কিন্তু কৃষিনির্ভর এই দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে ঘন জনবসতিপূর্ণ আর তাতেই এর দূষণ কমাতে সাহায্য করে যে বৃক্ষরাজি, ক্রমেই তার অনুপাত কমে যাচ্ছে। যেখানে একটি দেশের মোট আয়তনের অন্তত ২৫ শতাংশ বন থাকা উচিত সেখানে আমাদের কাছে মাত্র ১২/১৩ ভাগেরও কম। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এক সময় ছিল গাছপালা-তরুলতায় ঢাকা এক অনন্য জনপদ। সেই জনপদ এখন বৃক্ষশূন্য হতে হতে প্রকৃতির রুদ্রমূর্তির শিকার। প্রশ্ন করলে একবাক্যে বলবেন, পরিবেশের ওপর নিদারুণ অত্যাচার করে মানুষ নামক বুদ্ধিমান প্রাণী এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করে চলেছে। কী অত্যাচার? বন উজাড়, নির্বিচার বৃক্ষনিধন, ফসল ও বাস্তুসংস্থানের ব্যাপক সম্প্রসারণ, নদী হত্যা, অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ, নির্বিচারে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার আরো কত কি? দেশে বৃক্ষনিধনের অতীত ইতিহাসের দিকে একটু তাকালেই দেখতে পাব সুন্দরবন নামক বিশাল প্রাকৃতিক-প্রাচীরে উত্তরের যে বিশাল জনপদ, যাকে আরো সুনির্দিষ্ট করে বলা যায়, সমতট-চন্দ্রদ্বীপ এলাকা, তথাকথিত ‘ল্যান্ড রিক্লামেশন’ বা ‘ভূমি উদ্ধার’ পরিকল্পনার নামে ঔপনিবেশিক শাসক-শোষক ব্রিটিশরাই প্রথম বন উজাড়ে লিপ্ত হয়। ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধেই ব্রিটিশ বেনিয়ারা সুন্দরবন উজাড় শুরু করে। সেই নির্বিচার ও নির্বোধ বন উজাড়ের ফলে বর্তমান যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট সংকুচিত হয়ে সাগর মোহনায় নির্বাসিত হয়েছে। আজও ‘সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে।’ তার আগ পর্যন্ত এই বিশাল বনভূমি সংরক্ষিত বলেই নির্দিষ্ট ছিল। তরুনির্ভরতা মানুষের নিয়তিকল্প। মানুষের আদি সহায় বৃক্ষ। বৃক্ষ আছে বলেই মহাবিশ্বের এই গ্রহে মানুষসহ প্রাণের উদ্ভব ঘটেছে। প্রাণের অস্তিত্ব টিকেও আছে বৃক্ষের অবদানে। আর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবানের কথা বলে শেষ করা যাবে না। আমাদের দেশ নদীমাতৃক একটি দেশ। তাই এখানকার সড়ক ব্যবস্থা কোনোকালে তেমন উন্নত ছিল না। তবু সোনারগাঁও থেকে পাঞ্জাব পর্যন্ত দীর্ঘ গ্রান্ডাট্রাস্ক রোডের যেটুকু আজও অবশিষ্ট আছে সেই সড়কের দুই পাশে টিকে থাকা কিছু প্রবীণ রেইনট্রি, জারুল, নিম, গগণ শিরীষ, কদম, ছাতিম ইত্যাদি বৃক্ষ আমাদের মনে সৃষ্টি করে অপার বিস্ময়। সড়কের দুই পাশে না হলেও আজও কিছু প্রবীণ বট, অশ্বত্থ, তেঁতুল নজরে পড়ে। এসব চন্দ্রাতপ মহীরুহ জানান দেয় পথিকের ক্লান্তি নিবারণে সেকালের রাজন্যবর্গ কতটা যতœবান ছিলেন। সম্রাট অশোক, মোঘল সম্রাট ও পাঠান সম্রাট শেরশাহরা বৃক্ষরোপণে ভারতবর্ষে তো বটেই, সমগ্র পৃথিবীতে আজও আদর্শ। প্রাচীকাল থেকে বাঙালি উপমহাদেশীয় নিজস্ব বৃক্ষরোপণ দর্শন অনুসরণ করে আসছিল। সে দর্শন ভারতীয় উদ্ভিদবিদ্যাচর্চার উৎকষের্র প্রমাণ। বিশেষত গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে উর্বর মাটি আর প্রচুর বৃষ্টিপাত এই অঞ্চলকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান বৃক্ষসম্পদে সমৃদ্ধ জনপদে বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আবার বিদেশাগত অনেক বৃক্ষকেই দীর্ঘদিনে অভিযোজনের পর উপমহাদেশ নিজের প্রিয় তরুর তালিকায় সাদরে স্থান দিয়েছে। আম, জাম, কাঁঠাল, তেঁতুল যেমন- একান্তই ভারতীয়, তেমনি আমাদের অতিপ্রিয় ফল সফেদা এসেছে মেক্সিকো থেকে। এখন কাউকে বিশ্বাস করানো কঠিন যে, আতাফল হাইতি, তাল আফ্রিকা, বাবলা আরব, মেহগনি ব্রাজিল, কৃষ্ণচূড়া, এসেছে মাদাগাস্কা থেকে। এসব গাছ আমাদের পরিবেশে দিব্যি মানিয়ে নিয়েছে। বৃক্ষ রোপণে আমরা লক্ষ্য করেছি দামি কাঠের প্রতি জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা আছে বিস্তর। বৈষয়িক লাভের এই হিসাব প্রকৃতির স্বভাব-বিরুদ্ধ।

আরো খবর...