সবার ভালবাসায় সিক্ত হয়ে শেষ বিদায় নিলেন আবরার ফাহাদ

রায়ডাঙ্গা গোরস্থানে চিরশায়িত
খুনিদের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ আবরার ফাহাদ রাব্বির বাবা-মা দু’জনেই শহরে থাকেন। আর আবরার ফাহাদ ও আবরার ফায়াজ দুই ভাই লেখাপড়ার সুবাদে থাকতেন ঢাকায়। প্রতি শুক্রবার গ্রামের বাড়িতে আবরারের দাদা-দাদিকে দেখতে আসতেন তার বাবা-মা। অন্য চাচারাও আসতেন। আর ছুটি পেলে কুষ্টিয়া আসলেই দাদা-দাদিকে দেখতে গ্রামের বাড়ি রায়ডাঙ্গায় আসতেন দুই ভাই। গ্রামের সবাই আবরারদের দুই ভাইকে চিনতেন ও ভালবাসতেন। তবে আর কখেনো রায়ডাঙ্গায় আসবেন না আবরার ফাহাদ। স্থানীয়রা তাদের প্রিয় আবরারকে ভালবাসা, অশ্র“ বেদনা ভরা হৃদয় নিয়ে শেষ বিদায় জানিয়েছে। আর হত্যাকারিদের প্রতি ছিল তাদের ঘৃণাভরা ক্ষোভ।

তাই জানাযা শেষে এলাকার মানুষ রাস্তায় নেমে তাদের প্রিয় সন্তান আবরার ফাহাদের হত্যাকারিদের ফাঁসি দাবি করেন। তারা মানববন্ধন ও সমাবেশ করে প্রতিবাদ জানান।

এর আগে ভোর সাড়ে ৫টায় শহরের পিটিআই রোডের বাসায় প্রিয় ছেলের মরদেহ নিয়ে ফেরেন বাবা বরকতুল্লাহ। এ সময় লাশবাহি গাড়ির কাছে এসে ছেলের মুখ দেখে আর্তনাতে ভেঙ্গে পড়েন রোকেয়া খাতুন। ছেলের ক্ষত-বিক্ষত শরীর দেখে নিজেকে ঠিক রাখতে পারছিলেনা। প্রিয় ছেলেকে শেষবার দেখে বারবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন মা রোকেয়া। ছেলেকে নির্দয়ভাবে হত্যার বিচার চান মা রোকেয়া। কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, ছেলেকে এভাবে পিটিয়ে মারলো পাষন্ডরা। তাদেরওতো ভাই আছে, স্বজন আছে। একবারও কি তাদের বুক কাঁপলো না।’ আমার সোনাকে যারা মারলো তাদের ফাঁসি চাই।

ফজরের নামাজ শেষে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের বাসার সামনের সড়কে দ্বিতীয় জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতাসহ স্থানীয় রাজনীতিবিদ, এলাকাবাসী ও মুসল্লীরা অংশ নেন।

জানাযার নামাজের আগে আবরার ফাহাদের বাবা বরকতুল্লাহ বলেন,‘ সিসি ফুটেজে দেখা গেছে কারা হত্যার সাথে জড়িত। হত্যার পর আমার ছেলের মরদেহ ফেলার আগে তারা দুই থেকে তিন বার বাইরে আনে, আবার ভিতরে নিয়ে যায়। মামলা হয়েছে, গ্রেফতার হয়েছে খুনিরা। এখন দ্রুত সাজা কার্যকর চাই।  সাংবাদিক ও ছাত্ররা অনেক ভূমিকা রেখেছে। এ জন্য তাদের ধন্যবাদ। তিনি বলেন, পরিকল্পিতভাবে ছেলেকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। তার সারা দেহের সেই চিহৃ বলে দেয় কি নির্মমভাবে তাকে পেটানো হয়েছে। আমার ছেলে বাঁচার আকুতি জানিয়েও রক্ষা পাইনি। ছেলেরা কষ্ট পাবে বলে জীবনে তাদের গায়ে হাত দেয়নি, আর সেই ছেলেকে মরতে হলো এমনভাবে।, এ কষ্ট সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে।’

সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে আবরারের মরদেহ বহনকারি অ্যাম্বুলেন্স আসে তার গ্রামের বাড়িতে।

মরদেহ আবরারের গ্রামের বাড়ি রায়ডাঙ্গা বিশ্বাস বাড়িতে পৌছলে সেখানে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারনা হয়। আত্মীয় স্বজন ও এলাকাবাসীর আহাজারিতে সেখানকার পরিবেশ ভারি হয়ে উঠে। বৃদ্ধ দাদা এবং দাদী তার বড় নাতী আবরারের লাশ দেখে মুর্ছা যান। তারা চিৎকার দিয়ে বিলাপ বকতে থাকেন। সত্তরউর্ধো দাদা আবুল কাশেম বিশ্বাসকে মঙ্গলবার সকালেই নাতীর মৃত্যুর খবর জানানো হয় আর দাদী মৃত্যুর খবর পেয়ে সোমবারই কুষ্টিয়া শহরের বাসায় গিয়েছিল। মঙ্গলবার ভোর থেকেই রায়ডাঙ্গা গ্রামের এই বিশ্বাস বাড়িতে ফাহাদের লাশ দেখার জন্য হাজার হাজার নারী ও পুরষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ফাহাদের লাশ পৌছানোর খবরে মহিলা পুরুষসহ সব বয়সের মানুষেরা সেখানে ভিড় জমায়। সোয়া ১ঘন্টা ফাহাদদের বাগান বাড়িতে লাশবাহি গাড়ি থাকে। সেখানে ফাহাদের লাশ জনগন শেষবারের মত দেখেন। আত্মীয় স্বজনের পাশাপাশি সাধারন মানুষকে চোখের পানি মুছতে দেখা গেছে। বিশেষ করে মহিলাদের বিলাপ করতে দেখা গেছে।

আবরারের লাশের কফিন খুলতেই দাদা আব্দুল গফুর কফিনের ওপরের ডালা মাথায় নিয়ে ঘোরা শুরু করেন। কফিনের এই ডালা তিনি যতœ করে নিজের কাছে রেখে দিবেন বলে জানান। এ সময় এক অন্য রকম পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আবরারের মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তার দাদা-দাদি। প্রতিবেশিরাও অনেকেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তারা প্রিয় আবরারের এ মৃত্যুতে ব্যাথিত।

ফাহাদের গ্রামের বাড়িতে অতিরিক্ত পুলিশ  মোতায়েন ছিল। জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান, সহকারী পুলিশ সুপার দিশা, কুষ্টিয়া ও কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকতা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

সাড়ে ৯টার দিকে আবরারের মরদেহবাহি অ্যাম্বুলেন্স বাড়ি থেকে রওনা দেয় গোরস্থানের দিকে। বিদায় বেলায় পুরো বাড়ি ও আশেপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠে। কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন স্বনজরা। ১০টায় রায়ডাঙ্গায় গোরস্থানে দাফনের জন্য আবরারের মরদেহ রাখা হয়। সেখানে কথা বলেন আবরারের ফুফা ও তার বাবা।  এ সময় সবার কাছে আবরারের জন্য দুআ চাওয়া হয়। পুরো ঈদগাহ ময়দান লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে। অনেকে সড়কে দাঁড়িয়ে জানাযার নামাজ আদায় করেন। পরে আবরারকে শায়িত করা হয় গোরস্থানে। দাফন শেষে আবরারের আত্মার শান্তি কামনা করে দুআ করেন সবাই।

জানাযার নামাজ শেষ হলে এলাকার কয়েক হাজার মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়েন। তাদের হাতে ছিল ব্যানার, ফেষ্টুন ও প্ল্যাকার্ড। ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে, বঙ্গবন্ধুর বাংলায় খুনিদের ঠাঁই নাই, শেখ হাসিনার বাংলায় খুনিদের ঠাঁই নাই, ফাঁসি চাই ফাঁসি চাই, আবরার হত্যার ফাঁসি চাই’ এমন আওয়াজে পুরো এলাকা কম্পিত হয়ে উঠে।

দাফনের কিছু সময় পরই আকাশ জুড়ে মেঘ করে। নেমে আসে বৃষ্টি। সবার সাথে আকাশো কাঁদলো মেধাবী আবরারের জন্য।

জানাযা ও মরদেহ এলাকায় আসাকে ঘিরে আগে থেকে জেলা পুলিশ প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তাই বিপুল সংখ্যাক ফোর্স মোতায়েন করা হয় এলাকায়।

এলাকার মেম্বার রিপন উদ্দিন বলেন, আবরার আমাদের গ্রামের, জেলার এমনকি দেশের সম্পদ ছিল। তাকে কেন কি কারনে হত্যা করা হলো। মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তারা হত্যাকান্ডেকে ধামাচাপা দিতে চাইছিল তারা। সারা দেশের মানুষ দেখেছে কিভাবে আবরারকে হত্যা করা হয়েছে। এরপর আর কোন আবরার যে এমন হত্যা শিকার না হয়।

প্রতিবেশি নজরুল ইসলাম বলেন,‘ খুনিরা কোনদিন ছাত্র হতে পারে না। আববার ছিল মেধাবী ছাত্র। খুনিরা তাকে নিমর্মভাবে হত্যা করেছে। আমরা একজন মেধাবী ছেলে ও স্বজনকে হারালাম। এ হত্যার কঠোর সাজা চাই।

দাদা আব্দুল গফুর বিশ্বাস বলেন, আমার নাতি কি অপরাধ করেছিল, যে তাকে হত্যা করা হলো। আমি এ হত্যার কঠিন বিচার চাই। এমন মৃত্যু কারো কাম্য নয়। তিনি বলেন, আমার নাতিকে যারা শিবির বানাতে চাই তাদের উদ্দেশ্য বলব, ৭০ সাল থেকে আওয়ামী লীগে করে আসছি। আমরা কোন হাইব্রিড আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুকে ভালবাসি, তার পরিবারকে ভালবাসি। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচর এ আসনের সাবেক এমপি গোলাম কিবরিয়ার সাথে রাজনীতি করেছি। তাই কোন অপবাদ দিবেন না। খুনিদের শাস্তির ব্যবস্থা করুণ।’

আরো খবর...