সবজি বিপ্লবের পথে বাংলাদেশ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ একসময় ভালো স্বাদের সবজির জন্য শীতকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। গ্রীষ্মকাল ছিল সবজির আকালের সময়। এখন প্রায় সারা বছরই ২৫ জাতের সবজি পাওয়া যাচ্ছে। জানা গেছে, দেশে বর্তমানে এক কোটি ৬২ লাখ কৃষক পরিবার প্রায় সবাই কমবেশি সবজি চাষ করেন। জমির পাশের উঁচু স্থান, ক্ষেতের আইল, বাড়ির উঠোন, ঘরের চালা, মাচা কিংবা এখন ভাসমান পদ্ধতিতে পানির ওপর, এমনকি শহরের অট্টালিকায় ছাদে ছাদে সবজির চাষ হচ্ছে। গত এক যুগে দেশে রীতিমতো সবজি বিপ্লব ঘটে গেছে। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশে সবজির উৎপাদন বেড়েছে পাঁচগুণ। সবজি উৎপাদনের বার্ষিক বৃদ্ধির হারের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয়। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার (এফএও) মতে, সবজি উৎপাদনে বার্ষিক বৃদ্ধির এই হার বিশ্বে সর্বোচ্চ বাংলাদেশে। বর্তমানে দেশে বার্ষিক মোট সবজি উৎপাদন হয় ২২ লক্ষ টন, যেখানে ১৯৭০ সালে উৎপাদন হতো মাত্র ৭ লক্ষ টন।

আশাজাগানিয়া খবর হলো, এখন দেশের প্রায় সব এলাকায় সারা বছরই  ৬০ ধরনের ও ২০০টি জাতের সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। এসব সবজির ৯০ শতাংশ বীজই দেশে উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা গ্রীষ্মকালীন টমেটো, পেঁয়াজ, লাউ, করলাসহ বেশ কয়েকটি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ উইংয়ের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে দেশে বছরে বীজের চাহিদা সাড়ে ৪ হাজার টন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ১৯৬০ সালে যেখানে কৃষি পরিবারের সংখ্যা ছিল ৫০ লাখ,  সেখানে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৬২ লাখ। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী দেশে সবজির উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে ভোগের পরিমাণও। গত এক যুগে দেশে মাথাপিছু সবজির ভোগ বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে ২০ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৯৪ সালে দেশে মাথাপিছু দৈনিক সবজি খাওয়া বা ভোগের পরিমাণ ছিল ৪২ গ্রাম। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) হিসাবে গত বছর দেশে মাথাপিছু সবজি  ভোগের পরিমাণ হয়েছে ৭০ গ্রাম। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতানুযায়ী, একজন মানুষের দৈনিক ২২৫ গ্রাম সবজি খেতে হবে এই লক্ষ্যমাত্রা এখনো ছুঁতে পারেনি বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যুবসমাজের মাঝে সবজি চাষ আত্মকর্মসংস্থান প্রকল্পের মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাই পাল্টে যাচ্ছে দৃশ্যপট। খুলছে অফুরন্ত সম্ভাবনার দুয়ার। দেশে  কোটি কৃষকের পাশাপাশি লাখো শিক্ষিত বেকার তরুণ উদ্যোক্তা শাক-সবজি চাষ লাভজনক হওয়ায় নিজেদের জমির পাশাপাশি বর্গা জমি নিয়ে সবজি চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছে। এসব সাফল্য দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছে অনেকেই। যার ফলে চার-পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে এখন আমাদের গ্রামের স্বল্পশিক্ষিত তরুণরা আর বিদেশ যেতে চায় না। তাই শিক্ষিত যুবসমাজ এখন বেশি মনোযোগী হচ্ছে কৃষিভিত্তিক এই লাভজনক প্রকল্পে। ফলে বাড়ছে গ্রামভিত্তিক কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক তৎপরতা।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, একসময় বিশ্বের ২০টি দেশ থেকে বাংলাদেশকে আলু আমদানি করতে হতো। কিন্তু ২০১৩ সালে রাশিয়ায় প্রায় ২৫ হাজার টন আলু রপ্তানি হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশে আলু উৎপাদনের পরিমাণ ৯৬ লাখ টন। দেশের মোট কৃষিজমির পরিমাণ কমলেও সবজি চাষের এলাকা বেড়েছে। কারণ জমির পাশের উঁচু স্থান, আল, বাড়ির উঠান, এমনকি টিনের চালায়ও এ দেশের কৃষকরা সবজির চাষ করছেন। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইয়ার বুক ২০১৩ অনুযায়ী ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বিশ্বে সবচেয়ে বেশি হারে সবজির আবাদি জমির পরিমাণ  বেড়েছে বাংলাদেশে বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ। দেশের চাষযোগ্য জমির মাত্র ১.৮ শতাংশ জমিতে শাকসবজি চাষ হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমানে স্বাভাবিক পর্যায়ে যে পরিমাণ সবজি উৎপাদিত হচ্ছে, শুধু মানসম্মত ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে অতিরিক্ত ৩০ ভাগ সবজি উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব। এজন্য গ্রামে গ্রামে কৃষকদের গ্র“প তৈরি করে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। উন্নত জাতের বীজ উৎপাদনে দেশের হাজার হাজার নার্সারিকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ইরি সূত্রে জানা যায়, দেশের প্রতিটি পরিবার যদি প্রতিদিন এক কেজি করে সবজি উৎপাদন করে, তাহলে দেড় কোটি বসতভিট থেকে বছরে প্রায় ৫৫ লাখ টন সবজি উৎপাদন সম্ভব।

আশার খবর হলো, চার দশকে দেশে সবজির উৎপাদন বেড়েছে  কয়েকগুণ। দেশে বর্তমানে প্রায় ৮ লক্ষ হেক্টর জমিতে বছরে ২০ লাখ টনের অধিক সবজি উৎপাদন হচ্ছে। সবজির উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে উন্নত জাতের বীজ উদ্ভাবন এবং আধুনিক প্রযুক্তি মূল ভূমিকা পালন করছে। গবেষণার মাধ্যমে উন্নত বীজ উদ্ভাবন ও কৃষিতে আধুনিক চাষ পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে দিন দিন সবজি উৎপাদন বাড়ছে। বাংলাদেশ এগ্রিকালচার রিসার্চ ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত ৫০ প্রকার সবজির আবিষ্কার করেছে। তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, সারা দেশের তুলনায় রংপুর অঞ্চলের সবজি উৎকৃষ্ট মানের, সুস্বাদু। লালমনিরহাট আদিতমারী উপজেলার প্রায় ২০টি গ্রামের প্রায় ২০ হাজার পরিবার সবজি চাষ করে সুখের ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে। প্রতি বছর এ উপজেলার ৩ হাজারেরও বেশি হেক্টর জমি থেকে প্রায় ৮ হাজার মেট্রিক টন সবজি উৎপন্ন হচ্ছে যার বাজার মূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকারও বেশি। কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়কের ২০ কিলোমিটার রাস্তা পার হতে চোখে পড়বে বিস্তীর্ণ শসার ক্ষেত। এলাকার ১৪টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের মাঠে এখন শসার চাষ করে। স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবমতে, বৃহত্তর রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের ৮ জেলায় মৌসুমে ৫১ হাজার হেক্টর জমিতে ৬ লাখ ১২ হাজার মেট্রিক টন সবজি উৎপাদন হয়।

রপ্তানির ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৭৫ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানি শুরু হলেও ২০০০ সালের পর থেকে বিশ্ববাজারে ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকে বাংলাদেশের সবজির চাহিদা। বর্তমানে নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, মিরসরাই, যশোর, বগুড়া, রাজশাহী, মাগুরা, মৌলভীবাজার, দিনাজপুর, কক্সবাজার, সিলেট ও গাজীপুরের সবজি রপ্তানি হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। দেশের রপ্তানিকৃত সবজির প্রায় ৬০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যে এবং বাকি ৪০ শতাংশ ইউরোপসহ অন্যান্য দেশে যায়। এসব সবজির মধ্যে করলা, কাঁকরোল, টমেটো,  পেঁপে, বেগুন, ঢ্যাঁড়শ, লাউ, কচুরলতি, কচুরমুখি, মিষ্টি কুমড়া, বরবটি, কাঁঠাল, শসা, চিচিঙ্গা, লালশাক, পুঁইশাক, ফুলকপি, বাঁধাকপি, কাঁচামরিচ, পটোল, ঝিঙা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও প্রক্রিয়াজাত সবজির মধ্যে রয়েছে- ডাঁটা, কচুরলতি, শিমের বিচি, কাঁচকলা, কলার ফুল, কচুশাক, কাঁঠাল বিচি প্রভৃতি। পণ্য পরিবহনে নানান অসুবিধা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শাক-সবজি রপ্তানি করে ৬০০ কোটি টাকার  বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে বাংলাদেশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর মতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, ডেনমার্ক, সুইডেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশে বাংলাদেশের ৫০ জাতের সবজি ও ফলমূল রপ্তানি হয়। যেসব দেশে বাংলা ভাষাভাষীরা বসবাস করছে সেসব দেশে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানির চাহিদা বেশি। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রবৃদ্ধির এ হার বজায় থাকলে আগামীতে সবজি রপ্তানি খাতে আয় ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

রপ্তানি আয় বাড়াতে ইউরোপের ২৭টি দেশে শতভাগ স্যালমোনিলামুক্ত পান ও ব্যাকটেরিয়ামুক্ত শাকসবজি রপ্তানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বছরে সবজি রপ্তানি থেকে আয় হবে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। এখন প্রয়োজন, বিদেশের বাজার ধরার ক্ষেত্রে আরো উদ্যোগী হওয়া। সবজি সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, প্যাকেজিং পদ্ধতির আধুনিকায়ন এবং নিরাপদ ও বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। সবজি রপ্তানির খাতকে প্রয়োজনীয় সহায়তাদানের পাশাপাশি সরকারি অংশগ্রহণও বাড়ানো। এ খাতের রপ্তানি আয় বাড়বে, যদি বাংলাদেশের বিমানগুলো তাদের মোট পণ্য পরিবহন ক্ষমতার ৩০ শতাংশ শাক-সবজি পরিবহন করে। স্থানীয়ভাবে পরিবহন সুবিধা বাড়ানো ও অবকাঠামো উন্নয়ন সম্ভব হয়। বিমানবন্দরের কাছাকাছি রপ্তানি প্রক্রিয়াজাত এলাকা স্থাপন করা হয়।

লেখক ঃ এস.এম. মুকুল, উন্নয়ন গবেষক ও প্রাবন্ধিক।

আরো খবর...