শোকাবহ আগস্ট ও বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু ছিলেন এক জ্যোর্তিময় নক্ষত্রÑ যার আলোকচ্ছটায় আলোকিত হয়েছিল বাঙালি। উদ্দীপ্ত হয়েছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। তিনিই হাজার বছরের বঞ্চিত বাঙালির মুখে প্রতিবাদের ভাষা জুগিয়েছিলেন। ঘুমিয়ে পড়া বাঙালিকে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে টেনে নিয়ে এসেছিলেন। নেতৃত্বগুণে সব বাঙালিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন দেশ গড়ার কাজে নিয়োজিত করেছিলেন। দেশজুড়ে শুরু হয়েছিল বিশাল কর্মযজ্ঞ। ফলে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ বিশে^র দরবারে মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। কিন্তু হায়! ওই কর্মযজ্ঞ থেমে গিয়েছিল ভয়াল ১৫ আগস্টে। সেদিন ভোরে পুরো ধরত্রীই থমকে গিয়েছিল, বেদনায় মুষড়ে পড়েছিল বিষম। বাতাস ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল, আকাশ হয়ে গিয়েছিল অধিক শোকে পাথর। সৃষ্টির পর থেকে এমন শোকের ঘটনা বিশ্ব প্রকৃতি আর কখনই বোধহয় প্রত্যক্ষ করেনি। এমন বিশ্বাসঘাতকতাও বোধহয় আর কখনই দেখেনি। তাই পুরো বিশ্ব প্রকৃতিই হয়ে গিয়েছিল নিস্তব্ধ, শোকে মুহ্যমান পাষাণ। যে মহান ব্যক্তি একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিলেন, তাকে তারই দেশের মানুষের হাতে সপরিবারে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয়েছে। এর চেয়ে শোকের, বিস্ময়ের আর কী থাকতে পারে। শুধু তাই নয়, যাদের জন্য তিনি আজীবন মরণপণ লড়াই করে গিয়েছিলেন, যাদের সুখের জন্য, যাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিজের জীবনের সব আরাম-আয়েশ ত্যাগ করেছিলেন, জেলজুলুম-অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছিলেনÑ তারাই তার নির্মম মৃত্যুতে উচ্চৈঃস্বরে কাঁদতে পারেনি। ঘাতকের উদ্ধত সঙ্গিন তাদের কাঁদতে দেয়নি, পিতা হারানোর শোকগাথা তৈরি করতে দেয়নি। ১৫ আগস্টের ওই ভোররাতটি ছিল বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কময়, অশ্র“ভেজা এক ভোররাত। ওই রাতের কথা ৫৬ হাজার বর্গমাইল জনপদের প্রতিটি ধূলিকণা কখনো ভুলতে পারবে না। পারা সম্ভবও নয়। রক্তের কালিতে লেখা ওই রাতের শোকগাথা বীণার করুণ সুর হয়ে বাঙালির হৃদয়ে বেজে চলে অনবরত। আমার হৃদয়ে অহর্নিশ ওই সুর বেজে চলে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একজন কর্মী হওয়ায় সেই মহামানবের, সেই মহান বীরের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়েছিল আমার। সেই অকুতোভয় দেশপ্রেমিক যোদ্ধাকে, তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে খুব কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করেছি, বোঝার ও শেখার চেষ্টা করেছি। তার সান্নিধ্য যতবার পেয়েছি, ততবারই নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছি, নিজের মধ্যে নতুন এক শক্তিকে জেগে উঠতে দেখেছি। তার ডাকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলাম। আমার মতো লাখো তরুণ বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে ধারণ করে জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। বঙ্গবন্ধু নামটি ওই সময় আমাদের ছিল সাহসের উৎস। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরবর্তী সময়ে আমি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম এবং সক্রিয়ভাবে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তার নির্দেশ মোতাবেক আমরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা যার যার অবস্থান থেকে দেশ গড়ার কাজে হাত লাগিয়েছিলাম। তিনি ছিলেন আমাদের কাছে মহানায়ক। আমাদের মহানায়ক আমাদের প্রিয় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আসবেন ১৫ আগস্ট। তাই আমরা পুরো বিশ^বিদ্যালয়কে সুসজ্জিত করে তুলেছিলাম। তাকে সাদরে বরণ করে নিতে সাজিয়েছিলাম ফুলের ঢালি। কিন্তু ভয়াল কালরাত আমাদের ওই সুযোগ দেয়নি। আমরা ছাত্রলীগের ১ হাজার ২০০ কর্মীর সমন্বয়ে বিশাল স্বেচ্ছাসেবক টিম তৈরি করেছিলাম মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলার সবুজ চত্বরে গার্ড অব অনার দেব বলে। আমরা যখন সাজসজ্জার কাজ করছিলাম, তখন আমাদের সঙ্গে সারারাত জেগে থাকার জন্য এসেছিলেন কামাল ভাই। তিনি আমাদের অনুপ্রাণিত করতে জারি গান গাইলেন, অনেক কৌতুক করলেন। তার সান্নিধ্যে আমাদের কাজের গতি অনেক বেড়ে গিয়েছিল। রাত সাড়ে ১১টার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির এক নিরাপত্তাকর্মী এসে কামাল ভাইকে বঙ্গবন্ধু ডেকে পাঠানোর সংবাদ দিলে তিনি আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে বললেন এবং ভোর আসবেনÑ এই কথা দিয়ে চলে যান। ক্লান্তহীনভাবে সব কাজকর্ম সেরে আমরা কয়েকজন বন্ধু মহসিন হলের গেস্টরুমে গিয়ে নানা বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছিলাম। আনুমানিক ভোর পৌনে ৫টার দিকে আমাদের বন্ধু আবু বকর সিদ্দিক দৌড়ে এসে গোলাগুলির আওয়াজ হওয়ার কথা বললে আমরা দৌড়ে হলের ছাদে উঠে যাই ব্যাপার বোঝার জন্য। ধানমন্ডির দিক থেকে আর মিন্টো রোডের দিক থেকে গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পাই। অজান্তেই শরীর হিম হয়ে যায় আমাদের। আমরা বেরিয়ে পড়ি। প্রথমে শাহবাগ এসে দেখি কালো পোশাক পরা ট্যাংক বাহিনী সেখানে অবস্থান নিয়েছে। তখন আব্দুর রব সের নিয়াবাতের বাসায় গুলি হচ্ছিল। আমরা মিন্টো রোডের দিকে যেতে চাইলে ওরা বাধা দেয়। এর পর আমরা নানা উপায়ে কলাবাগান বাসস্ট্যান্ডের কাছে যাই। সেখান থেকে আর সামনের দিকে এগোতে পারি না। বাসস্ট্যান্ডে কিছু লোক দাঁড়িয়ে কানাঘুষা করছিল। তাদের কানাঘুষায় শুনতে পেলাম আমাদের জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়েছে। নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। যে পিতা একটি রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছেন, তাকে ওই রাষ্ট্রেরই কেউ হত্যা করেছে! ভাবতেই পারছিলাম না। আমাদের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। ওই রাতে বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল ও দশ বছরের শিশুপুত্র শেখ রাসেল, দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল এবং ভাই শেখ নাসের ও দুই কর্মকর্তাসহ নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই মর্মান্তিক হত্যাকান্ড ঘটিয়েছিল সেনাবাহিনীর কয়েক বিপথগামী নরকের কীট। আর তাদের মদদদাতা ছিল খন্দকার মোশতাক ও জিয়াউর রহমান। তাই তারা নিক্ষিপ্ত হয়েছে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে। বঙ্গবন্ধুর নির্মম ওই হত্যাকান্ডের খবরে পৃথিবীবাসী শোকে মুহ্যমান হয়ে গিয়েছিল। পত্রিকার পাতাজুড়ে ছিল ওই শোকের সংবাদ। নোবেল জয়ী পশ্চিম জার্মানির নেতা উইলি ব্রানডিট তখন বলেছিলেন, ‘মুজিবকে হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না। যে বাঙালি শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারে, তারা যে কোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।’ ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক নীরদ শ্রী চৌধুরী বাঙালিদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, ‘বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবকে হত্যার মধ্যদিয়ে বাঙালি জাতি বিশ্বের মানুষের কাছে নিজেদের আত্মঘাতী চরিত্রই তুলে ধরেছে। টাইমস অব লন্ডন পত্রিকার ১৬ আগস্টের সংখ্যায় বলা হয়, ‘সবকিছু সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে সব সময় স্মরণ করা হবে। কারণ তাকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই।’ ওইদিন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের লাখ লাখ লোক শেখ মুজিবের জঘন্য হত্যাকান্ডকে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করে যাবে আজীবন।’ কিউবার বিপ¬বী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি। কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্বে, সাহসিকতাই এ মানবই হিমালয়। আর এভাবেই আমি হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।’ ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালামের ভাষায়Ñ বঙ্গবন্ধু নিজেই ছিলেন ‘ঐশ্বরিক আগুন’ এবং তিনি নিজেই ওই আগুনে ডানা যুক্ত করতে পেরেছিলেন। ব্রিটিশ হাউস অব লর্ডসের সদস্য ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শীর্ষস্থানীয় যোদ্ধা ফেনার ব্রকওয়ে বলেছেন, ‘সংগ্রামের ইতিহাসে লেনিন, রোজালিনবার্গ, গান্ধী, নকুমা, লুমুম্বা, ক্যাস্ত্রো ও আলেন্দের সঙ্গে মুজিবের নামও উচ্চারিত হবে। শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা ছিল মানব হত্যার চেয়ে অনেক বড় অপরাধ। শেখ মুজিব শুধু তার জনগণের রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্যই সংগ্রাম করেননি। তিনি তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যও সংগ্রাম করেছিলেন।’ বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু আছে তার আদর্শ। বঙ্গবন্ধুর চিন্তা ও দর্শন তথা আদর্শ বাঙালি জাতির পথ চলার পাথেয়। এর মধ্যে দিয়েই তিনি বাঙালির কাছে চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন। তিনি অনশ্বর প্রতিভাস হয়ে বাংলার মানুষকে তার আদর্শে বলীয়ান করে যাবেন, অনুপ্রাণিত করে যাবেন। আর মানুষ তাকে স্মরণ করে যাবে পরম শ্রদ্ধাভরে। এ জন্যই কবি সুফিয়া কামাল বলেছিলেন, ‘এই বাংলার আকাশ-বাতাস, সাগর-গিরি ও নদী/ডাকিছে তোমারে বঙ্গবন্ধু, ফিরিয়া আসিতে যদি/হেরিতে এখনও মানবহৃদয়ে তোমার আসন পাতা/এখনও মানুষ স্মরিছে তোমারে, মাতা-পিতা-বোন-ভ্রাতা।’ বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে তার কন্যা শেখ হাসিনা দেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে পৌঁছে দিয়েছেন বাংলাদেশকে। উন্নয়নের মহাসড়কে দেশকে নিয়ে গেছেন। যুদ্ধাপরাধী ও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের মাধ্যমে দেশকে কলঙ্কমুক্ত করেছেন। দিগভ্রান্ত প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। তরুণ প্রজন্ম বঙ্গবন্ধু ও মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এবং চেতনা বুকে ধারণ করে দেশের ও দেশের মানুষের জন্য কাজ করবেÑ আগস্টের এ শোক দিবসে এটিই প্রত্যাশা। লেখক ঃ সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

আরো খবর...