শিক্ষার মানে অধোগতি ও শিশুশিক্ষা

বড় মানুষরা কখনও কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন এবং মানুষের ওপর সেই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন, তারপর ভুল ধরা পড়লেও সেখান থেকে ফিরে আসতে চান না। ভাবেন এতে তাদের সম্মান খাটো হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সংকট ঘোলাটে হলে অনন্যোপায় হয়ে সম্মানজনক নিষ্ক্রমণের পথ খোঁজেন। এখন এমন একটি সুযোগ এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিশেষ করে প্রথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য। প্রথমে গুণীজনরা জেএসসি এবং পরে হুট করে পিইসি পরীক্ষা চাপিয়ে দিয়েছিলেন শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর। শিক্ষা গবেষক থেকে শুরু করে অভিভাবকরা এই তুঘলকি সিদ্ধান্তে হায় হায় করে উঠেছিলেন। কিন্তু বড় মানুষরা নিজেদের আভিজাত্য আর সম্মান রক্ষার্থে পিছু হটতে রাজি হলেন না। সিন্দাবাদের ভূত ঘাড়ে চেপেই বসল। এবার করোনাকাল সম্ভবত সম্মানজনক নিষ্ক্রমণের পথ করে দিয়েছে। যদিও মন্ত্রণালয় এখনো আমাদের ধোঁয়াটে অবস্থায় রেখেছে। তবে অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে না এ-বছর পিইসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হবে। এই প্রেক্ষাপটকে কাজে লাগিয়ে যদি শিশু শিক্ষার্থীদের মুক্তি দেওয়া যায় তবে রক্ষা। দেশের চলমান শিক্ষার মান নিয়ে ইদানীং বেশ কথা হচ্ছে। মানের নিম্নসূচকের কথা বলে হতাশা প্রকাশ করছেন টকশোতে আসা বিশিষ্টজনেরা। পত্রিকায় লেখা হচ্ছে। নানা বক্তৃতায়ও হতাশা প্রকাশ করছেন অনেকে। মান যে নেমে যাচ্ছে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থেকে হতাশার সঙ্গে আমরা লক্ষ করি। এ কারণে একজন শিক্ষক হিসেবে নিজেকেও অপরাধী মনে করি বারবার। শিক্ষার অধোগতির ধারা চলছে অনেক দিন থেকে। আমি বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সহকর্মীদের অনেকের দায়িত্বহীনতা ও নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে একাধিক লেখা কাগজে প্রকাশ করে কারও কারও বিরাগভাজন হয়েছি। শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত অনেক সহকর্মী ক্ষুব্ধ হয়েছেন। বাস্তব অভিজ্ঞতায় মাধ্যমিক ও নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ের কারিকুলাম তৈরি ও বই প্রকাশ নিয়ে নানা অরাজকতার কথা বলে সংশ্লিষ্ট অনেকের মনোকষ্টের কারণ হয়েছি। বিষয়টি নিয়ে ভাবতে গিয়ে এবং নানা পর্যায়ে সামান্য খোঁজ করতে গিয়ে মনে হয়েছে শিক্ষার মান নিম্নমুখী হওয়ার একটি পর্যায়ক্রমিক ধারাবাহিকতা রয়েছে। হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শিক্ষার মান নেমে গেল, বিষয়টি এমন নয়। আর মান নেমে যাওয়ার জন্য কেবল ব্যক্তি শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানই দায়ী নয়; এর নানা অনুষঙ্গও রয়েছে। দেশের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে শিক্ষার ভিত তৈরিতে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে দেখা যায়নি। অনেকে এ জন্য নানা ধারার শিক্ষা প্রচলিত থাকার কথা বলেছেন। গণমানুষের ধারা প্রাইমারি শিক্ষা এবং মাদ্রাসা শিক্ষা। বড়লোক মানুষদের ধারা ইংরেজি মাধ্যম এবং এ লেভেল ও লেভেল। সাধারণভাবে বলা হয় নীতিনির্ধারকদের অধিকাংশের ছেলেমেয়ে, ভাইবোনরা সনাতন প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় পড়ে না। তাই এই সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার ধারা ও চলমান সংকট তাদের কাছে ততটা স্পষ্ট নয়। গুরুত্বপূর্ণ বলেও মনে করেন না। তাছাড়া এ-ধারার ক্ষমতাবানরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পদাধিকার বলে এবং রাজনৈতিক পরিচয় ও জনপরিচিত বুদ্ধিজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রকৃতপক্ষে মাধ্যমিক ও নিম্নমাধ্যমিক পর্বের মাঠ পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা অনেকেরই থাকে না। ফলে লাগসই না হলেও স্ব স্ব পান্ডিত্য অনুযায়ী নীতিনির্ধারণ করেন। তাই ফলাফল দেখতে গিয়ে অমানিশাই দেখতে হয়। বছর কয়েক আগে পিইসি পরীক্ষা বাতিল হওয়া না হওয়া নিয়ে ঘটে যাওয়া নাটকীয়তা দিয়ে শুরু করতে চাই। কিছুকাল আগে প্রধানমন্ত্রী ক্লাস থ্রি পর্যন্ত শিশুদের পরীক্ষা না নেওয়ার কথা বলেছেন। এ অনুরোধটি অনেকদিন থেকে আমরা আমাদের লেখায় করে আসছিলাম। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে আমাদের  দেশ এখন ‘সবাই রাজার দেশ।’ যে যখন ক্ষমতা প্রয়োগ করার সুযোগ পান প্রয়োগ করতে দ্বিধা করেন না। সব বিষয়ে নিজেদের বিশেষজ্ঞ ভাবতে পছন্দ করেন। সম্ভবত ২০০৯ সাল থেকে এসএসসির আগে গণমানুষের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ স্কুল ও মাদ্রাসার কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নতুন উপহার হিসেবে আরও দুটো সার্টিফিকেট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পাবলিক পরীক্ষার আদলে পরীক্ষা হবে। সুতরাং পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা নামে দুটো পরীক্ষার আয়োজন ঢাকঢোল পিটিয়ে শুরু হয়ে যায়। আমাদের দেশের রাজনৈতিক সরকারগুলো যেহেতু ‘জাতি গোল্লায় যাক আমরা কৃতিত্বের ঢাক বাজাব’ নীতিতে বিশ্বাসী তাই আলোচনা-সমালোচনার তোয়াক্কা না করে চালু হয়ে গেল। যাপিত জীবনে এসব সার্টিফিকেটের কী মূল্য তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। আমি ক্ষুদ্র মানুষ। তবুও আমার অনুর্বর মস্তিষ্ক তখন হায় হায় করে উঠেছিল। আমি আমার প্রতিক্রিয়া কাগজে লিখেওছিলাম। কে এসবে পাত্তা দেয়! আমার আতঙ্কের বড় কারণ শিশুদের অনেক জ্ঞানী বানানোর জন্য এমনিতেই বিস্তর বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে শৈশব কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবার এসএসসি এইচএসসির মতো ‘এ প্লাস’-এর মোক্ষ লাভের জন্য নতুন দৌড় শুরু করবে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। শিক্ষা নয় ‘এ প্লাস’-এর লড়াইয়ে টিকে থাকার জন্য কোমর বাঁধবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। প্রশ্নফাঁস আর নকলের রাজ্য সাম্রাজ্যে পরিণত হবে। জীবনের শুরুতে শিক্ষার্থী অপরাধ জগতের সঙ্গে পরিচিত হবে। গাইড বইয়ের প্রকাশক আর কোচিং ব্যবসায়ীরা বিশেষ উৎসব পালন করবে। ‘এ প্লাস’ বিজয়ী শিক্ষার্থীদের বড় অংশ গন্ডিবদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষার  বৈতরণী পাড়ি দেয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হওয়ার পর জানার সীমাবদ্ধতা দেখিয়ে আমাদের হতাশ করে। তখন আতঙ্কিত হয়ে ভাবছিলাম শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চাকে আরও সীমাবদ্ধ করে ফেলতে প্রাইমারি পর্যায় থেকে ফাঁদ পাতা হলো। সে সময় ক্ষুব্ধ অভিভাবকদের কেউ কেউ সংবাদপত্রের চিঠিপত্রের পাতায় লিখেছিলেন এভাবে নীতিনির্ধারণ করে ক্ষমতাবানরা কি ভিন্নধারায় পড়া নিজ পরিজনদেরই ভবিষ্যতে দেশের ক্ষমতা ও প্রশাসনে অধিষ্ঠিত দেখতে চান? পরীক্ষাগারে গিনিপিগই তো ব্যবহার করা হয়। মরলে তো এই নিকৃষ্ট জীবই মরবে। নিজ সন্তান হৃষ্টপুষ্ট থাকুক ইংরেজি মাধ্যমে। ওখানে এ ধারার পরীক্ষা-নিরীক্ষার বালাই নেই। শিক্ষা বিজ্ঞানকে আমলে না এনে এ ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে আমাদের সরকারগুলো পছন্দ করে। পৃথিবীজুড়েই সুস্থধারার শিক্ষা পদ্ধতিতে শিশু শিক্ষার্থীদের প্রথাগত পরীক্ষার শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলে হয় না। বরঞ্চ শিক্ষাকে আনন্দময় করে তোলা হয়। ক্লাসের ভেতর বা ক্লাসের বাইরে মুক্তাঙ্গনে বুদ্ধিমত্তা পাঠপ্রক্রিয়ার পরীক্ষা শিক্ষক খেলার আনন্দেই নিয়ে ফেলেন। পরীক্ষা ভীতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে থাকে না বলে ক্লাস, প্রকৃতি আর ঐতিহ্য দেখতে দেখতে ওদের অনেক কিছু শেখা হয়ে যায়। অথচ আমাদের দেশে শিক্ষাজীবনের শুরুতে শিশু তার শিক্ষাকে প্রীতিকর বিষয় না ভেবে ভীতিকর ভাবতে থাকল। প্রতিযোগিতায় টেকার জন্য অভিভাবক সন্তানকে স্কুল আর কোচিংয়ে বন্দি করে ফেললেন। দুরন্ত শৈশব বলে আর কিছু থাকল না। শিক্ষাটা হয়ে গেল ছকবন্দি পরীক্ষা আর গ্রেড নির্ভর। বৈপরীত্য হচ্ছে এরমধ্যে সৃজনশীল প্রশ্ন চাপিয়ে দিয়ে একদিকে শিক্ষার্থীর ভেতরের মৌলিকত্ব আর বুদ্ধিমত্তার কর্ষণ করানোর অভিলাষ প্রকাশ করা হলো আরেক দিকে পিইসি জেএসসির অভিঘাতে রক্তমাংসের শিশুকে রোবট বানানোর পথ পাকা করা হলো। গাইড বই ব্যবসায়ীরা নীতিনির্ধারকদের জয়গান গাইতে গাইতে ছাপাখানর যন্ত্র সচল করল। ম্যানেজ করতে লাগল নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে। আমরা বড় বড় নীতিনির্ধারণের আগে পরিণতি ও প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভাবি না বলে শেষে সব হযবরল হয়ে যায়। আমি জানি না আমাদের বিজ্ঞ নীতিনির্ধারকদের কাছে আমার কথার মূল্য থাকবে কি না। অবশ্য নতুন কোনো কথা আমি বলব না। বহুজনের বলা কথাই। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে গিয়ে যখন অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ভিত্তি মূলে দুর্বলতা দেখি তখন বুঝতে পারি স্কুল পর্যায়ে একটি দুর্বলতা রয়েছে। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষাদানে নানা আধুনিক পদ্ধতি যুক্ত হয়েছে ঠিকই তবে মেধাবী ফলাফল করা গ্রাজুয়েটদের এখানে শিক্ষক হিসেবে আসার পথ তৈরি করা হয়নি। যে শিক্ষকরা আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে এখনো দায়িত্ব পালন করছেন, সমাজে অর্থবিত্ত আর সম্মানে তাদের মাথা উঁচু করে চলার সুযোগ নেই। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও একই মন্তব্য। অস্বচ্ছতার পর্দা টানিয়ে ডিজিটাল আধুনিকতা তৈরির অভিযান চলছে। আমাদের বয়সী সবাই মনে করতে পারবেন এনালগ পদ্ধতিতে পড়া আমদের বানান আর ভাষার শুদ্ধতা শিক্ষকরা স্কুলেই সেরে দিতেন। এই প্রাতঃস্মরণীয় শিক্ষকদের কথা এখনো স্মরণ করি। এখন স্কুল ও কলেজ মাড়িয়ে ঝকঝকে সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও এসব মেধাবীর বড় অংশের ভাষা-বানান শেখাতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের। আসলে এক সময়ের বৃত্ত ভরাটের নিরীক্ষায় দুদ- লেখার সুযোগ পায়নি শিক্ষার্থী। সেই সঙ্গে যুক্ত হয় দুর্বল শিক্ষকদের তত্ত্বাবধান। কোচিং বাণিজ্য আর গাইড সংস্কৃতির কশাঘাত তো আছেই। শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্য এই যে এতসব নিরীক্ষা হচ্ছে সেই সব মহাত্মনদের জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয় তারা প্রত্যেকেই তো সনাতন পদ্ধতিতে পড়ে এসেছেন। তখনো বছর বছর পরীক্ষা হতো। পিইসি জেএসসি না থাকায় নিশ্চয়ই তারা নির্বোধ হয়ে বেড়ে ওঠেননি। এটি ঠিক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব কিছুর আধুনিকায়ন হতে পারে। দেশের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, নানা সংকট সম্ভাবনা আর সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনায় রেখে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে শিক্ষা গবেষণায় যারা নিবেদিত তাদের পরামর্শকে গুরুত্ব দিয়ে কি শিক্ষার মানবৃদ্ধির প্রায়োগিক চিন্তা করা যায় না? আমার একজন অভিজ্ঞ বন্ধু বলেছিলেন, এদেশের সরকারি পর্যায়ে এক অদ্ভুত সুযোগ আছে। শিক্ষা নিয়ে নতুন নীতি আরোপের আগে জ্ঞান নেওয়ার জন্য বিদেশ ভ্রমণ করা হয়। সেখানে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের চেয়ে আমলাদের উপস্থিতি বেশি থাকে। তারা কোনো একটি দেশের মডেল এনে চাপিয়ে দিতে বেশি পছন্দ করেন। এদেশের বাস্তবতায় তা লাগসই হলো কি না তা দেখার দরকার নেই। আর এই সঙ্গে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের জীবাণু তো সক্রিয়ই থাকে। এতসব অসুস্থতা না সারিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী আর অভিভাবকদের গিনিপিগ বানিয়ে শিক্ষার মান উন্নয়নের আশা করব কীভাবে! আর শিক্ষানীতিকে পাশ কাটিয়ে এই অদ্ভুত সব নিরীক্ষার শিকার কেন হবেন লাখ লাখ শির্ক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক? লেখক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরো খবর...