শহীদ মিনারে খোকার কফিনে শেষ শ্রদ্ধা

ঢাকা অফিস ॥ বিএনপি নেতা ও ঢাকার সাবেক মেয়র মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছে নানা শ্রেণি পেশার মানুষ। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পাশাপাশি অনেকে ব্যক্তিগতভাবে তার কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। সংগঠনগুলোর মধ্যে সিপিবি, গণফোরাম, এলডিপি, মনোবিজ্ঞান অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জাগপা, জাতীয়তাবাদী মহিলা দল, তাঁতী দল, নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশ জাসদ, বাসদ, জাতীয় হিন্দু মহাজোট, ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী, ছাত্র ইউনিয়ন, গণসংহতি আন্দোলন, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল ও বাংলাদেশ যুব সমিতির নেতারা সেখানে ছিলেন। বিভিন্ন আন্দোলনে ঢাকার রাজপথে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান খোকার বলিষ্ঠ ভূমিকার কথা স্মরণ করেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, “এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় পুলিশের উদ্দেশ্যে বুক পেতে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ’গুলি কর, আমার এখানে গুলি কর।’ তার জোরালো কণ্ঠের ফলে পুলিশ তখন ভয় পেয়ে গিয়েছিল। বাবরি মসজিদ ভাঙার পর পুরান ঢাকায় হিন্দুদের বাড়িঘর, মন্দির রক্ষায়ও তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন। ”আজকে যখন গণতন্ত্রের নামে ফ্যাসিবাদ চলছে, গণতন্ত্রের জন্য মানুষ সংগ্রাম করছে- তখন ঢাকার রাজপথে খোকার মতো সাহসী যোদ্ধার খুব প্রয়োজন ছিল।” এর আগে দুপুর ১২টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা থেকে খোকার মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনা হয়। বিএনপি নেতাদের পাশাপাশি খোকার পরিবারের সদস্যরা সেখানে তার কফিনে পাশে ছিলেন। সাবেক তথ্যমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সায়ীদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের পর মানুষের জন্য কাজ করার ব্রত নিয়ে আজীবন ছিলেন সাদেক খোকা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধরে রেখেছিলেন আজীবন। ”মুক্তিযুদ্ধের মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তিনি গিয়েছিলেন, সেই লড়াই চালু রেখেছেন তিনি। মানুষের প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন তিনি, মানুষও তাকে সেই সম্মান এখন দিচ্ছে।” শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর খোকার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। সেখানে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন। বিএনপিপন্থী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব গাজী মাজহারুল আনোয়ার সাংবাদিকদের বলেন, ”রাজপথের আন্দোলনের সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠনে যুক্ত থাকতে আমরা তাকে দেখেছি। সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একজন রাজনীতিকের যে ভূমিকা থাকা দরকার, আমরা তার মধ্যে সেটা দেখেছি। ”যে কোনো দলেই হই বা যে কোনো মতেই হই, আমরা খোকাকে ভুলতে দিব না, তার কাজ ধরে রেখে তাকে আজীবন মনে রাখব।” গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, “মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে তার প্রাপ্য সম্মান তাকে দেওয়া হয়নি। তার শেষ ইচ্ছা ছিল, যে দেশ তিনি স্বাধীন করেছেন, সে দেশে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবেন। কিন্তু সরকারের সদিচ্ছার অভাবে সেটা হয়নি। “দুটি কারণে ঢাকাবাসী তাকে দীর্ঘদিন মনে রাখবেন। একটি হলো, তার সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ আক্রমণ থাকলেও তিনি অল্প সময়ে ও অল্প খরচে সেটা দূর মোকাবেলা করতে পেরেছেন। আরেকটি হলো- ঢাকার বিভিন্ন সড়ক তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নামে করে দিয়েছেন।” শ্রদ্ধা নিবেদনের শেষ প্রান্তে এসে পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন খোকার ছেলে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন। সাদেক হোসেন খোকা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। “আজকে আমরা ভুক্তভোগী। আমার বাবা রাজনীতির প্রতিহিংসার শিকার হয়েছে। গত পাঁচ বছরে আমি বাবার সঙ্গে অনেক সময় কাটিয়েছি। তার থেকে আমি অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। ”তিনি সব সময় আমাদের বলতেন, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল একটি গণতন্ত্র রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু আজকে আমরা যেটা দেখছি একটি হানাহানির রাজনীতি চলছে দেশে। এই রাজনীতির জন্য আমার বাবারা দেশকে স্বাধীন করেননি।” বিএনপিনেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানান ইশরাক। “দেশের এই অপরাজনীতির চর্চা কত দিন চলবে। আপনারা জানেন, দেশের আছেন দুজন অভিভাবক। একজন হলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যিনি জেলে রয়েছেন, আরেকজন অভিভাবক বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উনি। “আমি এ দুজন অভিভাবকের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই আমাদের তরুণ প্রজন্মর ভবিষ্যৎটা কোথায়? আপনারা দুইজনে কি এ সমাধান করে দেবেন না? আপনারা এই সমস্যার সমাধান করে দিন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।” প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে ইশরাক বলেন, ”আপনি আমাদের দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জামিনের যে বাধাগুলো রয়েছে সেগুলো এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ দূর করেন। “আজকে আমি যেটা দেখলাম, দল-মত-নির্বিশেষে এখানে সবাই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছেন। যেটি আসলে একটি অনুকরণীয় বিষয়।

আরো খবর...