শকুন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, প্রকৃতির ঝাড়ুদার, পরিবেশ রক্ষাকারী পাখি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ পাখি প্রকৃতির এক অপার সৌন্দর্যের প্রতীক। প্রকৃতির অলংকারও বলে থাকে  কেউ কেউ। পাখি শুধু নন্দনতত্ত্বের খোরাকই জোগায় না, প্রকৃতিতে ফুল ও ফসলের পরাগায়ণে অংশ নিয়ে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কয়েক দশক আগে গ্রাম বাংলা সবুজ গাছ-গাছালিতে ভরা ছিল। ঝোপ-ঝাড় ছিল। চারপাশ মুখরিত ছিল পাখির কলকাকলিতে। কিন্তু মানুষের নানাবিধ কর্মকান্ডে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির এই অলংকার। জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির কারণে উজাড় হচ্ছে বিভিন্ন গাছ ও বনাঞ্চল। পরিষ্কার করা হচ্ছে ঝোপ-ঝাড়। মানুষের প্রয়োজনের তাগিদে নির্মাণ করা হচ্ছে রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল-বাজারসহ মানববসতি। ক্রমশ বিপন্ন হয়ে উঠছে প্রকৃতি। আর প্রকৃতি বিপন্ন হবার কারণেই হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র। পাখিদের মধ্যে সবচেয়ে বিপন্নের তালিকায় রয়েছে শকুন। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই আজ শকুন বিপন্ন। একসময় শকুন ছিল গ্রাম বাংলার অতি সাধারণ চিরচেনা পাখি। গরু-ছাগল মারা গেলেই দল বেঁধে হাজির হতো শকুন। দেশের প্রায় সব এলাকাতেই কমবেশি দেখা মিলত এদের। আকাশের অনেক উঁচুতে স্থিরভাবে পাখা মেলে ঘুরে বেড়াত শকুনের ঝাঁক। নিচের মাটিতে  কোনো খাবার দেখলেই তড়িঘড়ি করে নেমে আসত। একটি শকুনকে নিচে নামতে  দেখলেই বাকিগুলো তাকে অনুসরণ করত। শকুনই একমাত্র পাখি যারা গবাদিপশুর মৃতদেহ সতেজ থাকা অবস্থাতেই চামড়া ফুটো করে খেতে পারে। মৃত গবাদিপশুর মাংস খেয়ে শকুন পরিবেশ পরিছন্ন করে। অ্যানথ্রাক্সসহ বিভিন্ন রোগ-জীবাণু হজম করার ক্ষমতা শকুনের আছে। এভাবে শকুন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, প্রকৃতির ঝাড়ুদার, পরিবেশ রক্ষাকারী পাখি নামে পরিচিতি পায়। বিশ্বে ২৩ প্রজাতির শকুন রয়েছে। এর মধ্যে চার প্রজাতির শকুন বাংলাদেশে আসে। এগুলো হচ্ছে হিমালয় গৃধিনী, ইউরেশীয়, ধলা ও কালা শকুন। হিমালয় গৃধিনী ও ইউরেশীয় শকুন প্রায়ই আসে, আবার চলে যায়। তবে পাখি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধলা শকুনকে ৪০ বছর পর গত জুনে কাপ্তাইয়ে দেখা গেছে। কালা শকুন মাঝে মধ্যে দেখা যায়। বন্যপ্রাণী বিশারদরা বলছেন, দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে অধিক ফলনের আশায় কৃষক জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক এবং রাসায়নিক সার ব্যবহারে শকুনসহ অন্যান্য প্রজাতির পাখিদের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি কলকারখানার দূষিত বর্জ্যরে কারণে পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছে শকুনসহ নানা প্রজাতির পাখি। গবাদি পশু ও কৃষি জমিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় কিডনি নষ্ট হয়ে মারাও যাচ্ছে এসব শকুন। শুধু শকুন নয় কীটনাশকের ব্যবহারের ফলে শকুনসহ অনেক প্রজাতির পাখিই হারিয়ে যেতে বসেছে। গবাদি পশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ডাইক্লোফেনাক জাতীয় ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় শকুনের কিডনি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে এর বিলুপ্তি তরান্বিত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, শকুন না থাকার কারনে বাংলাদেশে অ্যানথ্রাক্স, যক্ষা, ক্ষুরা রোগ ইত্যাদি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার এবং জলাত্মঙ্ক রোগ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা  বেড়েছে। শকুন না থাকায় গবাধি পশুর মৃত দেহ এখন শিয়াল, কুকুর, ইঁদুর, কাক, চিলসহ অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণী খাচ্ছে। এদের পেটে রোগ জীবানু নষ্ট না হওয়ায় জঙ্গল ও জনপদে ছড়িয়ে পড়ছে এসব মারাত্মক ব্যাধি। শকুন বাঁচাতে প্রাচীন ও উঁচু বৃক্ষ যেমন- তালগাছ, বটগাছ, আমগাছ, রেইনট্রি, কড়ই গাছ, শিমুল গাছ, শ্যাওড়া গাছ কাটা রোধ করে সেগুলো সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে করে শকুন সেই গাছগুলোতে নির্বিঘেœ বসতে পারে এবং বাসা তৈরির উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তবে প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সর্বস্তরের জনগণের সচেতনতা। প্রত্যেকে যদি তাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হয় এবং পরিবেশ রক্ষার অংশ নেয় তবেই প্রাকৃতির ঝাড়–দার শকুন রক্ষা পাবে।

আরো খবর...