লড়াই তবে স্যান্ডার্স বনাম ট্রাম্প?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

ঢাকা অফিস ॥ নিউ হ্যাম্পশায়ারের প্রাইমারিতে জেতার পর এই মুহূর্তে ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সকেই যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেট দলের প্রার্থী হিসেবে সবচেয়ে সম্ভাবনাময়ী বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, নভেম্বরের নির্বাচনে তিনিই হয়তো রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে হারাতে পারবেন। বিবিসি বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ শেষ পর্যন্ত কাকে বেছে নেবেন, তা তো ভোটেই নির্ধারিত হবে। কিন্ত ৭৮ বছর বয়সী, স্বঘোষিত ‘সোশাল ডেমোক্রেট’ স্যান্ডার্সকে মনোনয়ন দিতে তার নিজের দলই প্রস্তুত কি না, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন জোরেশোরেই এ প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। ভারমন্টের সিনেটর নিজের নির্বাচনী প্রচারণাকে অ্যাখ্যা দিচ্ছেন ‘বিপ্লব’ হিসেবে; এবং এই মুহুর্তে, এটি যেন রক দলগুলোর ঘুরে ঘুরে কনসার্ট করার অনুভূতিই দিচ্ছে। স্যান্ডার্সকে এখন ভ্যাম্পায়ার উইকএন্ড কিংবা দ্য স্ট্রোকসের মতো ব্যান্ডগুলোর ‘অদ্ভূতগোছের শীর্ষ নেতা’ মনে হচ্ছে। দুটো ব্যান্ডই সম্প্রতি স্যান্ডার্সের বিভিন্ন প্রচারণায়, সভা-সমাবেশে বাজিয়েছে। যদিও উপস্থিত হাজার হাজার জনতা তাদের উল্লাস আর সজোরে চিৎকারগুলো সবসময় রেখে দিয়েছিল ব্র“কলিন অঞ্চলের উচ্চারণে কথা বলা পাকা চুলের ডেমোক্রেট সিনেটরের জন্য। প্রায় বছরখানেক ধরে চলা একের পর এক সমাবেশ, বৈঠক, বিতর্ক আর মাঠ পর্যায়ের কাজের পর তার প্রচারণা এখন প্রবেশ করছে লাগামহীন দৌড়ে; এখন থেকে একটার পর একটা অঙ্গরাজ্যে ককাস কিংবা প্রাইমারি হবে। সুপার টুইসডের মতো কিছু কিছু দিনে তো একসঙ্গে হবে কয়েকটি লড়াই। মাত্র কয়েক মাস আগেও হৃদরোগের সমস্যায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৭৮ বছর বয়সী সিনেটরের জন্য যা হবে সত্যিকারের এক অগ্নিপরীক্ষা। “বার্নি স্যান্ডার্সই একমাত্র প্রার্থী যিনি আমাকে এটা বিশ্বাস করার সাহস যুগিয়েছেন যে কেবল সত্যিকারের পরিবর্তনের দাবি জোরে উত্থাপন করাই নয়, সেটা বাস্তবায়ন করাও সম্ভব। যদি জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকে, তাহলে আমরা ফের জনগণের হাতেই ক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে পারবো,” বলেছেন লং আইল্যান্ড থেকে নিউ হ্যাম্পশায়ারে এসে স্যান্ডার্সের প্রচারণায় সহযোগিতা করা আলেথা শাপিরো। সমর্থক ও স্বেচ্ছাসেবকদের এমন চেষ্টার পরও আইওয়াতে কাঙ্খিত ফল মেলেনি। স্যান্ডার্স সেখানে সবচেয়ে বেশি ভোট পেলেও ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের সাউথ বেন্ডের সাবেক মেয়র পিট বুটিগিগ জিতে নিয়েছেন বেশি প্রতিনিধি বা ‘ডেলিগেট’। এমনকী নিউ হ্যাম্পশায়ারের প্রাইমারিতে জেতার পর সেখানেও বুটিগিগ ও স্যান্ডার্সের মুঠোয় সমান সংখ্যক ডেলিগেটই জুটেছে। দুই অঙ্গরাজ্যেই ভোট বেশি পেয়েছেন স্যান্ডার্স; কিন্তু ডেলিগেটে সামান্য এগিয়ে সাউথ বেন্ডের সাবেক মেয়র। ভারমন্টের সিনেটর অবশ্য এই হিসাবকে গণায়ই ধরছেন না। দুই অঙ্গরাজ্যেই নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেছেন তিনি; থামেননি এখানে, তার লক্ষ্য যে আরও সামনে। “যে কারণে আমরা আজ নিউ হ্যাম্পশায়ারে জিতেছি, গত সপ্তাহে আইওয়াতে জিতেছিলাম, তা হচ্ছে অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবকের কঠোর পরিশ্রম। আমি বলছি, আজকের এই জয় দিয়েই ডনাল্ড ট্রাম্পের শেষের শুরু হল,” নিউ হ্যাম্পশায়ারে প্রাইমারির ফল ঘোষণার পর বলেছিলেন স্যান্ডার্স। তার ওই কথার পর কলেজ জিমনেসিয়ামের ভিড় যেন গর্জে উঠেছিল। সমর্থকদের উল্লাসে এত জোর ছিল, যেন তারা মনে করছিলেন, তাদের চিৎকারের শক্তিই ‘সোশাল ডেমোক্রেট’ স্যান্ডার্সকে সামনের ককাস ও প্রাইমারিগুলোতে জেতাতে সাহায্য করবে। “এটা ছিল রোমাঞ্চকর। আমার মনে হয়েছিল নির্বাচনের নখ কামড়ানো উত্তেজনার পর যেন স্বস্তি এল,” বলেছেন বোস্টনের এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গীত শিক্ষক স্কট স্যান্ডভিক। বোঝাই যাচ্ছে, শেষ পর্যন্ত ভারমন্টের সিনেটর যদি ডেমোক্রেট সনাতনী কাঠামোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে তার ‘বিপ্লবকে’ এগিয়ে নিতে পারেন, তাহলে নিউ হ্যাম্পশায়ার ওই অগ্রযাত্রার সূচনাবিন্দু হিসেবে গর্ব করতে পারবে। চার বছর আগেও আইওয়াতে হিলারির সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছিল স্যান্ডার্সের; সেবারও নিউ হ্যাম্পশায়ারে জিতেছিলেন তিনি। এখনকার চেয়ে সেবারের জয়টা তুলনামূলক বড়ই ছিল। এরপর নেভাদা আর সাউথ ক্যারোলাইনার মতো কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত অঙ্গরাজ্যগুলোতে পরাজয়ের পর স্যান্ডার্সের জয় এসেছিল তুলনামূলক বেশি শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত নিউ ইংল্যান্ডে। মিশিগান ও উইসকনসিনে ধরাশায়ী হওয়া হিলারিকে অবশ্য এর পরও কয়েক মাসের মনোনয়ন দৌড়ে স্যান্ডার্সের চাপই মোকাবেলা করতে হয়েছে। ২০১৬ সালে লড়াইটা ছিল মূলত এ দু’জনের। তুলনায় এখন স্যান্ডার্স বেশ শক্ত অবস্থানে। কেননা, তার বিরোধীরা বেশ কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। জো বাইডেন এবং এলিজাবেথ ওয়ারেন- যাদেরকে স্যান্ডার্সের প্রধান প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল, প্রথম দুটি অঙ্গরাজ্যে তাদের আক্ষরিক অর্থেই খাবি খেতে দেখা গেছে। বুটিগিগ কিংবা অ্যামি ক্লবুচারের অবস্থানও অন্যান্য অঙ্গরাজ্যগুলোতে বেশি সুবিধার মনে হচ্ছে না। সাউথ বেন্ডের সাবেক মেয়রের টাকার জোর থাকলেও ডেমোক্রেট পার্টির বিভিন্ন অংশ বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ ও তরুণদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা কম বলে জনমত জরিপগুলো বলছে। অন্যদিকে সিনেটর ক্লবুচার জাতীয় পর্যায়ে অনেকটাই অপরিচিত। একদিকে বাইডেন, ওয়ারেনের জনপ্রিয়তা কমছে, অন্যদিকে প্রায় একই সময়ে স্যান্ডার্সের জনপ্রিয়তা বেড়েই চলছে। তার প্রচার শিবিরে অসংখ্য তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে আছেন অভিজ্ঞরাও; যারা ২০১৫ সাল থেকেই ভারমন্টের সিনেটরের পাশে অবস্থান করছেন। কেবল জানুয়ারি মাসেই তিনি গণচাঁদা তুলেছেন আড়াই কোটি ডলার; যা বোঝাচ্ছে, সব অঙ্গরাজ্যে একযোগে লড়াই করার মতো সম্পদ ও প্রস্তুতি তার রয়েছে। যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির সাংসদ ডায়ানা অ্যাবোট থেকে শুরু করে ইউটিউব স্টার জো রেগান পর্যন্ত তার সমর্থক দল বিস্তৃত। সর্বশেষ এ দলে যুক্ত হয়েছেন নিউ ইয়র্কের মেয়র বিল ডি ব্লাসিয়োও; যাকে ডেমোক্রেটদের ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবেও দেখছেন অনেকে। স্যান্ডার্সের ‘সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা’, ‘চিকিৎসা ও শিক্ষা ঋণ মওকুফ’, ‘আরও বেশি সরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা’, ‘ধনীদের জন্য কর’, ‘পরিবেশবান্ধব চুক্তির’ মতো প্রতিশ্র“তি কেবল দলীয় সমর্থকদেরই টানছে না, রাজনীতিবিমুখ তরুণদের বিরাট অংশকেও আকৃষ্ট করছে। তবে ৭৮ বছর বয়সী এ রাজনীতিককে তার দলের ভেতরেই আসল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। স্যান্ডার্সের এই উত্থান ও প্রচারণাকে মধ্য ও ডানপন্থি ডেমোক্রেটরা ভালো চোখে দেখছেন না। হিলারি ক্লিনটন তো বটেই, এমনকী যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের অনেক ডেমোক্রেট আইনপ্রণেতাও তাদের স্যান্ডার্সবিরোধীতার কথা গোপন রাখেননি। অবশ্য, এ ধরনের বিরোধিতা ভারমন্টের সিনেটরের জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলেও অনুমান অনেকের। গতবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলের ভেতর এমন বিরোধীতার মুখোমুখি হয়েছিলেন ডনাল্ড ট্রাম্পও, সেটি তার জন্য শাপেবর হয়েছিল বলেই দেখা গেছে। “অন্য ডেমোক্রেট প্রার্থীরা সবসময় তাকেই (স্যান্ডার্স) লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। যতক্ষণ না তারা পরাজিত হচ্ছে, ততক্ষণ তারা থামবে বলে মনেও হচ্ছে না। ঠিক আছে, আমরাও প্রস্তুত,” বলেছেন স্যান্ডার্সের প্রচার শিবিরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জেফ ওয়েবার। আইওয়াতে স্যান্ডার্সকে থামাতে বিরোধীরা টেলিভিশনে নানান কদর্য বিজ্ঞাপনও দিয়েছিল। রক্ষণশীলদের ক্লাব ফর গ্রোথের বিজ্ঞাপনে স্যান্ডার্সকে উপস্থাপন করা হয়েছিল ‘উগ্রপন্থি’ হিসেবে। অন্যদিকে ইসরায়েলপন্থি ডেমোক্রেটদের একটি গ্র“প প্রচার চালিয়েছিল- স্যান্ডার্স প্রার্থী হলে তিনি ট্রাম্পকে হারাতে পারবেন না। নেভাদায় ককাসের আগেও তার বিরুদ্ধে নানান প্রচার চলছে। সেসব প্রচারকে অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ঢালও বানিয়েছেন। স্যান্ডার্সকে অবশ্য এতে দমতে দেখা যাচ্ছে না। উল্টো এসব অপপ্রচার যেন তার স্পৃহা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। “এটা গোপন নয় যে আমাদের প্রচার শিবির বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো এবং ধনীদের স্বার্থরক্ষায় নিয়োজিতদের বিরুদ্ধে; তারা আইওয়ায় আমাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচার চালিয়েছে। ধনীক শ্রেণি নার্ভাস হয়ে পড়েছে, তাদেরকে হতেই হবে,” নিউ হ্যাম্পশায়ারে জয়ের পর বলেছিলেন স্যান্ডার্স। সর্বশেষ বিতর্কগুলোতে বুটিগিগ এবং বাইডেনকে স্যান্ডার্সের নাম ধরে আক্রমণ করতে দেখা গেছে। শুধু ডেমোক্রেট মনোনয়নপ্রত্যাশীরাই নন, স্যান্ডার্সের বিরুদ্ধে তোপ দাগছেন ট্রাম্পও। বারবার বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো সমাজতন্ত্রীকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেনে নেবে না। তবে কি তিনিও স্যান্ডার্সকেই তার প্রতিদ্বন্দ্বী ধরে নিয়েছেন? পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নেভাদা এবং সাউথ ক্যারোলাইনার পর সুপার টুইসডের ফলের পর স্যান্ডার্সের জনপ্রিয়তার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। তবে কেবল দলীয় মনোনয়ন পেলেই তো আর দৌড় শেষ হচ্ছে না। ভারমন্টের সিনেটরের ‘বিপ্লব’ সম্পন্ন করতে হলে, তাকে যে হোয়াইট হাউসেরও দখল নিতে হবে। সেই ফল জানতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কয়েক মাস। আপাতত স্যান্ডার্সশিবিরের লক্ষ্য সব ককাস ও প্রাইমারি থেকে ১৯৯১ ডেলিগেটের সমর্থন লাভ। জুলাইয়ের কনভেনশনে মনোনয়ন পেতে যে এ সংখ্যাই লাগছে।

আরো খবর...