লালন সাঁই ছিলেন লোক বাংলার প্রধানতম দার্শনিক কবি

স্মরণোৎসবের ২য় দিনের আলোচনায় ডিসি আসলাম হোসেন

আরিফ মেহমুদ ॥ কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মোঃ আসলাম হোসেন বলেছেন, বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁই তাঁর সারাটি জীবন কাটিয়েছেন মানব মুক্তির সাধনায়। ধর্ম, জাত-পাতের উর্ধ্বে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদহীন সার্বজনীন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা ছিল লালন সাঁইজির স্বপ্ন। পল্লীবাংলার নিভৃতে নিগুঢ় সাধনায় নিমগ্ন থেকেও তিনি যেভাবে মানবতার সুমহান  বাণী উচ্চারণ করেছেন, সামজিক সংস্কারেও সক্রিয় হয়েছেন, তা বিষ্ময়কর। লালন সাঁই  লোক বাংলার প্রধানতম দার্শনিক কবি। তাঁর বিচিত্র রহস্যে মোড়া জীবন, আধ্যাতিক মতবাদ ও দর্শনে আকৃষ্ট হবেন না এমন মানুষ খুজে পাওয়ায় কঠিন। মানব জীবনকে তিনি উপলব্ধি করেছেন গভীরভাবে। নিজের ভিতরে অনুসন্ধ্যান করে পরম জ্ঞান প্রাপ্তিই তাঁর দর্শনের মুল কথা। লালন সত্য ও সুন্দরের সমন্বয়ে জীবনকে দিতে চেয়েছিলেন এক নতুন তাৎপর্য।

গতকাল সোমবার রাতে ছেঁউড়িয়ার আখড়া বাড়ীতে লালন একাডেমির আয়োজনে বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের স্মরণোৎসব (দোলপূর্ণিমা বা দোলউৎসব) উপলক্ষ্যে ৩ দিনব্যাপী আয়োজিত অনুষ্ঠানমালার ২য় দিনের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন আরো বলেন, আমরা যদি মানুষের মত মানুষ হতে চাই তাহলে লালন সাঁইয়ের আদর্শকে বুকে ধারন ও লালন করতে হবে।  তাঁর সৃষ্টি গানে গভীর জ্ঞান আমাকে সত্যিকার অর্থে বিমোহীত করেছে। কারো কারো মতে নিরক্ষর হয়েও তিনি জ্ঞানভান্ডারে এক অনাবিস্কার পৃথিবী। তাঁকে চিনতে অনেক দেশ বহুভাবে উপস্থাপন করেছেন। আধ্যাত্মিক সিদ্ধ পুরুষ হিসেবে সত্য ও জাতহীন সমাজ গড়তে আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনি। লালন সাঁই এক বিশ্ব মানব। লালন সাঁই ছিলেন বাঙালি জাতিসত্বার বোধের প্রবাদ পুরুষ। আজকের যুগেও তিনি মানুষের হৃদয়ের মাঝখানটা দখল করে আছেন। তাঁকে ও তাঁর গান নিয়ে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষায় গবেষনা হচ্ছে। লালনের দর্শনের উপর গবেষনা করে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করছেন অনেকেই। হচ্ছে তাঁর গানের ভাষান্তর। তিনি বলেন, যুগে যুগে মানুষের কল্যাণে জ্ঞানী-গুণী ও পথ প্রদর্শকদের জন্ম। তেমনি কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ার পবিত্র মাটিতে লালন সাঁইয়ের মত মহাত্মা মহাজ্ঞানীর আর্বিভাব হয়েছে। এসব জ্ঞানী-গুনি মণিষীদের চিন্তা-ভাবনা প্রায় একই সুত্রে গাঁথা। মানবজনমের পূর্নজন্মে লালন কোন ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন না। লালন সাঁই সকল ধর্মের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে সদা সত্য পথে চলতে মানুষকে মানতাবাদীর পথে ডাক দিয়ে ছিলেন। প্রধান অতিথি  আসলাম হোসেন আগামী দিনের নেতৃত্বদানকারী যুব সমাজের প্রতি আহবান রেখে বলেন, মাদকের ভয়াবহতা থেকে নিজেদের সন্তানকে রক্ষা করতে আপনার সন্তানের প্রতি খেয়াল রাখুন। সময় এসেছে লালন সাঁইয়ের আদর্শ অনুপ্রাণীত হয়ে আমাদের সন্তানকে সুপথে পরিচালিত করার। দেশ ও জাতির কল্যাণে তাদেরকে গঠনমূলক কাজে সম্পৃক্ত করুন।  তিনি বলেন, বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁই ছিলেন বাঙালীর আধুনিক সমাজ বিন্যাসের রূপকার। লালনের এই পূণ্য ভূমিতে তাঁকে স্মরণ করতে তিনি তাঁর যোগ্য শিষ্যদের রেখে গেছেন। যুগে যুগে তাঁর ভাবধারাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন তারা। তাঁর মানবতার ভাবধারা কুষ্টিয়াকে ভাববাদের রাজধানীতে পরিণত করেছেন। সভ্যতার এই যুগে মানুষ মানুষে হিংসা বিদ্বেষ ভূলে বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের গান, ধর্ম দর্শনের চিরাচরিত ‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন এই শ্লোগানকে বাস্তবায়নে সদা সত্য ও সঠিক পথে চলে দেশ ও জাতির উন্নয়নে নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখার আহবান জানান তিনি। কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো: ওবাইদুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন কুষ্টিয়া পৌরসভার মেয়র আনোয়ার আলী, কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার  গোলাম সবুর, জেলা জাসদের সভাপতি গোলাম মহসিন, কুষ্টিয়া শহর আওয়ামীলীগের সভাপতি ও লালন একাডেমির এ্যাডহক কমিটির সদস্য তাইজাল আলী খান, বিশিষ্ট লেখক ও কলামিষ্ট শেখ গিয়াস উদ্দিন আহমেদ মিন্টু, কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সভাপতি গাজী মাহবুবুর রহমান, জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম ও জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ কুষ্টিয়ার সভাপতি আলম আরা জুঁই, বিশিষ্ট লালন গবেষক গাজী মঞ্জুরুল ইসলাম প্রমুখ।

প্রধান আলোচক হিসেবে আলোচনা করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের  ট্রেজারার প্র্রফেসর ড. সেলিম তোহা। ফকির লালন সাঁইয়ের আধ্যাত্মিকতা তুলে ধরে আলোচনা করেন এ্যাভোকেট লালিম হক, শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন লালন একাডেমির এ্যাডহক কমিটির সদস্য সেলিম হক। স্বাগত বক্তব্য রাখেন কুষ্টিয়া জজকোর্টের অতিরিক্ত পিপি ও লালন একাডেমির এ্যাডহক কমিটির সদস্য এ্যাড. শহিদুল ইসলাম।

আলোচক এ্যাড.লালিম হক বলেন, বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ বাঙালী সংস্কৃতির এক মহান প্রতিনিধি। বাংলা সংস্কৃতির মূল ধারা লোকসংস্কৃতি। এই ধারাকে যারা পুষ্ট করেছে ফকির লালন তাদেরই একজন। সম্প্রদায় সম্প্রীতি ও ধর্মান্ধ মৌলবাদের বিরুদ্ধে তাঁর ফকিরীবাদ বাউলতত্ব মানুষের প্রধান দর্শন। বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ বাঙালী সংস্কৃতির এক মহান প্রতিনিধি। বাঙালী সংস্কৃতির মহান প্রতিনিধি লালন ফকির, গানে ও সাধনায় তার দর্শণে সেই মানবিক মূল্যবোধে সেই সামাজিক চেতনায় গভীর, লালন ফকির একই সঙ্গে মরমী এবং দ্রোহী, তার গানের ভেতর দিয়ে বাউল সাধনার নানা প্রসঙ্গ অনুসৃত হয়েছে। তার গানের ভেতর দিযে সমাজের অসঙ্গতি, কুপ্রথা সকল জাতপাতের ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।

আলোচনা শেষে অতিথিদের কুষ্টিয়া লালন একাডেমীর পক্ষ থেকে ফুলের তোড়া, আত্মসুদ্ধির প্রতীক একতারা ও নবনির্মিত একতারার ক্রেষ্ট উপহার দিয়ে বরণ করে নেন।

দ্বিতীয় পর্বের সঙ্গীতানুষ্ঠানে উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত লালন সঙ্গীত শিল্পী বাউল টুনটুন শাহ, সঙ্গীত পরিবেশন করেন লালন একাডেমীর সাবেক সদস্য বাউল আব্দুল কুদ্দুস, সমির বাউল, সুফিয়া কাঙালিনী। গভীর রাত পর্যন্ত চলে এই সংগীত পরিবেশন। স্মরণোৎসব অনুষ্ঠানের সার্বিক উপস্থাপনা ও পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট মনিরা পারভিন, এসডিসি মুছাব্বেরুল ইসলাম ও কনক চৌধুরী।

আরো খবর...