লাউ প্রায় সব ধরনের মাটিতেই জন্মে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ লাউ সাধারণত শীতকালে বসতবাড়ির আশেপাশে চাষ করা হয়ে থাকে। লাউয়ের পাতা ও ডগা শাক হিসেবে এবং ফল তরকারি ও ভাজি হিসেবে খাওয়া যায়। লাউ প্রায় সব ধরনের মাটিতে জন্মে। তবে প্রধানত দোআঁশ থেকে এটেঁল দোআঁশ মাটি লাউ চাষের জন্য উত্তম। লাউ সাধারণত দিবস নিরপেক্ষ লতানো উদ্ভিদ, ফলে বছরের অধিকাংশ সময় চারা লাগিয়ে ফসল উৎপাদন করা যায়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট থেকে উদ্ভাবিত বারি লাউ-১, বারি লাউ-২, বারি লাউ-৩, বারি লাউ-৪ ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির আমদানীকৃত হাইব্রিড জাতের লাউয়ের চাষ আমাদের দেশে হয়ে থাকে। লাউ চায়ের জন্য পলিথিন ব্যাগে চারা তৈরী করাই উত্তম। এতে বীজের খরচ কম পড়ে। পলিথিন ব্যাগে চারা উৎপাদন করে রোপণ করলে হেক্টরপ্রতি ৮০০-১০০০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়। শীতকালীন চাষের জন্য মধ্য-ভাদ্র থেকে মধ্য-কার্তিক (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) মাসে বীজ বপন করা যেতে পারে। তবে আগাম শীতকালীন ফসলের জন্য ভাদ্রের ১ম সপ্তাহে বীজ বুনতে হবে। আমাদের দেশে প্রধানত বসতবাড়ির আশে পাশে যেমন-গোয়াল ঘরের কিনারায় বা পুকুর পাড়ে ২-৩টি লাউ গাছ লাগানো হয়ে থাকে। বেশি পরিমাণ জমিতে লাউয়ের চাষ করতে হলে প্রথমে জমি ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে প্রস্তুত করতে হবে। লাউ চাষের জন্য ২/২ মি. দূরত্বে প্রতি মাদায় ৪-৫টি বীজ বোনা উচিত। রবি মৌসুমে লাউ মাচা বিহীন অবস্থায় ও চাষ করা যায়। তবে মাচায় ফলন বেশী হয়। এছাড়া পানিতে ভাসমান কচুরীপানার স্তুপে মাটি দিয়ে বীজ বুনেও সেখানে লাউ জন্মানো যেতে পারে। পরিচর্যা ঃ নিয়মিত গাছের গোড়ায় পানি সেচ দেওয়া, মাটির চটা ভাঙ্গা, ছাউনী দেওয়া ও অন্যান্য পরিচর্যা করা বাঞ্চনীয়। মাচা শক্ত করে বাধঁতে হবে। রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ঃ কুমড়া জাতীয় বিভিন্ন ফসল যেমন লাউ, কুমড়া, শসা ইত্যাদিতে ফলের মাছি পোকা একটি মারাত্মক সমস্যা। স্ত্রী মাছি তার লম্বা সরু ওভিপজিটরের (ডিম পাড়ার অঙ্গ) সাহায্যে কচি ফলের খোসার নীচে ডিম পারে। ডিম পাড়ার পর ফলের গা থেকে পানির মত তরল বের হয়ে আসে যা শুকিয়ে বাদামী হয়ে যায় এটিই আক্রমণের প্রাথমিক চিহ্ন। ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে ফলের শাঁস খেয়ে বড় হতে থাকে। আক্রান্ত ফল হলুদ হয়, পচে যায় এবং অকালে ঝরে পড়ে। বেঁচে থাকা আক্রান্ত ফল বিকৃত হয় এবং ঠিকমত বাড়তে পারে না। পূর্ণাঙ্গ কীড়া মাটিতে পুত্তলিতে পরিণত হয়। কোন কোন সময় স্ত্রী মাছি ফুলের দলমন্ডল এবং কান্ডে ডিম পাড়ে। দমন ব্যবস্থাপনা ঃ আক্রান্ত ফল ও ফুল গাছে বা নীচে পড়ে থাকা অবস্থায় সংগ্রহ করে মাটিতে পুঁতে বা পিষে মেরে ফেলা। উত্তমরূপে জমি চাষ করলে পুত্তলিগুলো বের হয়ে পড়ে এবং পরভোজী পোকা ও পাখি এদের খেয়ে ফেলে। কচি ফল কাগজ, কাপড় বা পলিব্যাগ দিয়ে ঢেকে রাখা। জমিতে বা মাচাঁয় কাঁঠালের মোথা ঝুলিয়ে রাখলে স্ত্রী পোকা তাতে ডিম পাড়ে। সেক্স ফেরোমোন দ্বারা পুরুষ পোকাকে আকৃষ্ট করে ধ্বংস করা। বিষটোপ ফাঁদ ব্যবহার করা। বিষ টোপ তৈরির জন্য ১০০ গ্রাম থেতলানো কুমড়ার সাথে ০.২৫ গ্রাম ডিপটেরেক্স পাউডার ও ১০০ এমএল পানি মিশিয়ে মাটির পাত্রে জমির বিভিন্ন স্থানে রেখে দিতে হবে। হেক্টর প্রতি এরূপ ৫০-৭৫ টি টোপ প্রয়োগ করা। তিন থেকে চার দিন পর পর বিষটোপ পরিবর্তন করা উচিত। প্রয়োজনে অনুমোদিত কীটনাশক মাত্রানুযায়ী ব্যবহার করা। ফলন বৃদ্ধির উপায় ঃ সবজির মধ্যে লাউ অন্যতম। লাউয়ের বাজারমূল্য এখন অনেক। এর উৎপাদন বাড়ালে কৃষক লাভবান হবে ক্রেতারাও কম দামে লাউ কিনতে পারবে। লাউ গাছে প্রচুর ফুল ধরলেও লাউ ধরে কম। কিছু কৌশল জানা থাকলে অধিকাংশ ফুল থেকেই লাউ ধরানো সম্ভব। লাউ, মিষ্টি কুমড়া, করলা, কাঁকরোল, পেঁপে ইত্যাদি সবজি গাছ একলিঙ্গ এবং ভিন্নবাসী উদ্ভিদ হওয়ায় প্রাকৃতিক পরাগায়ন কম হয়। অর্থাৎ এসব গাছে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল পৃথক পৃথক হয়। পুরুষ ও স্ত্রী গাছও পৃথক হয়। ফলে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল যদি দূরে থাকে তবে কীট-পতঙ্গ, পোকা-মাকড় অথবা অন্য যেকোনো পরাগায়নের মাধ্যমে প্রাকৃতিক পরাগায়ন সম্ভব হয় না। এ জন্য লাউ ধরে না। পুরুষ গাছ বা পুরুষ ফুল থেকে ফল হয় না। লাউয়ের পুরুষ গাছ ও স্ত্রী গাছ পৃথক হওয়ায় কৃত্রিমভাবে পুরুষ ফুল এনে স্ত্রী ফুলের সঙ্গে মিলন ঘটাতে হয়। কৌশল ঃ প্রতিদিন ভোর বেলায় সদ্যফোটা পুরুষ ফুল ছিঁড়ে পুংরেণুসমৃদ্ধ পুংকেশর রেখে পাপড়িগুলো ছিঁড়ে ফেলতে হয়। এরপর পুংরেণু স্ত্রী ফুলের গর্ভমুন্ডে হালকাভাবে সামান্য একটু ঘষে দিতে হয়। এতে স্ত্রী ফুল নিষিক্ত হয়ে ফল ধরে। একটি পুরুষ ফুলের পুংকেশর দিয়ে ৬ থেকে ৭টি স্ত্রী ফুলের গর্ভমুন্ডে পরাগায়ন করা যায়। এ জন্য একটা লাউয়ের মাচায় শতকরা ১০টা পুরুষ ফুল রাখতে হয়। এতে শতকরা ৯৫টি স্ত্রী ফুলে ফল ধরবে। এ জন্য পুরুষ ও স্ত্রী ফুল চেনা প্রয়োজন। ফুল চেনার উপায় ঃ পুরুষ ফুল :ফুলের বোঁটার অগ্রভাগে ফুটে। পাপড়ির গোড়ায় গর্ভাশয় থাকে না। পাপড়ির মাঝখান দিয়ে বেড়ে যাওয়া পুংদন্ডে পাউডারের গুঁড়ার মত পুংরেণু থাকে। পুংদন্ডের শীর্ষভাগে গর্ভমুন্ড থাকে না। শুধু বোঁটার অগ্রভাগে ফুটে থাকা ফুলগুলো পুরুষ ফুল। স্ত্রী ফুল ঃ ক্ষুদ্রাকৃতি লাউয়ের মত গর্ভাশয়ধারী ফুলগুলো স্ত্রী ফুল। গর্ভাশয়ের ওপর থেকে পাপড়ি থাকবে। পুংদন্ড থাকবে না। গর্ভদন্ড ছোট ও মোটা। গর্ভদন্ডে আঠালো পদার্থ থাকবে। পুংরেণু এখানে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আঠায় আটকে যায়। অনেকেরই ধারণা, শুধু স্ত্রী ফুলের এই গর্ভাশয় থাকলেই লাউ ধরবে। গর্ভমুন্ডে পুরুষ ফুলের পুংরেণু না লাগা পর্যন্ত লাউ ধরবে না। অন্যান্য কৌশল ঃ গর্ভাশয় ঝরে পড়াকে অনেকেই মনে করে কচি লাউ ঝরে পড়ে। সত্যিকারে তা নয়। যেসব স্ত্রী ফুল পুংরেণু দ্বারা নিষিক্ত হয় না অর্থাৎ পরাগায়ন হয় না সেগুলো ঝরে পড়ে। এ জন্য উপরোক্ত নিয়মে কৃত্রিম পরাগায়ন করতে হবে। এরপরেও ঝরে পড়লে গাছের গোড়ায় নিয়মিত পানি দিতে হবে। গাছপ্রতি ৫০ গ্রাম করে টিএসপি ও এমপি সার গাছের গোড়া থেকে ৬ ইঞ্চি দূর দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। কচি লাউ পচে যাওয়ার কারণ হচ্ছে ফ্রুট ফ্লাই পোকা কচি লাউয়ে ক্ষত সৃষ্টি করে। এ ক্ষতে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করে লাউ পচিয়ে ফেলে। এ পোকা হাত দ্বারা মারা যায়। ছাই দেয়া যেতে পারে। অথবা ডায়াজিনন/ডাইমেক্রন/নগস দিতে পারেন। লাউ গাছ খুব বড় হয় কিন্তু ফুল কম ধরে। এ জন্য জৈব সার কম দিতে হবে। টিএসপি ও এমপি সার সম্পূর্ণ মাত্রায় দিতে হবে। এছাড়াও গ্রোথ হরমোন ¯েপ্র করতে পারেন। ফুলের মধ্যে পিঁপড়া আক্রমণ করলে ছাই অথবা সেভিন দিতে পারেন। ইঁদুরের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য বিষটোপ অথবা ফাঁদ দিতে পারেন।

আরো খবর...