লকডাউন সংক্রমণ প্রতিরোধে বাংলাদেশে কতটুকু কার্যকর

 ॥ গোলাম মোহাম্মদ কাদের ॥

রোগ যদি সংক্রামক হয়, প্রাণঘাতী হয় ও প্রতিষেধক আবিষ্কার না হয় তবে মহামারী রূপে আবির্ভূত হয়। বর্তমানে করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ এ ধরনের একটি রোগ।  কোয়ারেন্টিন করে এ ধরনের রোগ বিস্তার ঠেকানো হল আদিকাল থেকে প্রচলিত বিজ্ঞানসম্মত বিশ্বস্বীকৃত পদ্ধতি।  রোগী/সম্ভাব্য রোগীকে আলাদা রেখে রোগকে একটি নির্ধারিত সময় পর্যন্ত জায়গায় স্থির রাখা; চিকিৎসায় রোগকে ধ্বংস করা অথবা রোগের কারণে রোগীর মৃত্যু হলে তাতেও  রোগের বিনাশ হয়, সংক্রমণ থেমে যায়- এটাই হল  কোয়ারেন্টিন পদ্ধতিতে সংক্রমণ বিস্তার রোধের কৌশল।

রোগীর সঙ্গে রোগকে এক স্থানে আটকে রেখে বিনাশ করার জন্য, রোগীর সঙ্গে সম্ভাব্য রোগী হিসেবে একত্রে বসবাসরত  রোগীর পরিবার ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার জন্য রোগী যে মহল¬ায় বসবাস করেন সেখানকার বাসিন্দাদেরও একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়। তাদের সঙ্গে অন্যান্য এলাকার ব্যক্তিগত পর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা আবশ্যক হয়। সে উদ্দেশ্যে লকডাউন করা হয়। এর অর্থ হল ওই চিহ্নিত এলাকার কোনো ব্যক্তি বাইরের অন্য কোনো এলাকায়  যেতে পারবে না। বাইরের কেউ চিহ্নিত এলাকায় প্রবেশ করতে পারবে না।

আমাদের দেশে এ পদ্ধতি বা কৌশল সফল হওয়া প্রায় অসম্ভব। সফল না হওয়ার কিছু আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা আছে। আর্থ-সামাজিক কারণগুলো ছাড়া আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে আর একটি বিষয় উলে¬খ করা বাঞ্ছনীয়, যা লকডাউন ব্যর্থতায় কাজ করছে। বিষয়টি হল যথেষ্ট পরিমাণ ‘রোগ নির্ণয় পরীক্ষা’ না হওয়া।

পরীক্ষা করে রোগী শনাক্ত করা, এরপর তাকে ও তার মাধ্যমে পারিপার্শ্বিক সম্ভাব্য রোগ বিস্তার এলাকা নির্ণয় করে লকডাউন করা জরুরি। যত বেশি রোগী শনাক্ত করা যায় ও সে হিসাবে তাদের ঘিরে লকডাউন দেয়া যায়, তত বেশি তা রোগ বিস্তার রোধে সহায়ক হয়। রোগ বিস্তারের গতি শ¬থ হয়। উলে¬খযোগ্যসংখ্যক রোগী যদি শনাক্তকরণের বাইরে থাকে তারা রোগ বিস্তার করতে থাকবে ও সে ক্ষেত্রে লকডাউন কার্যকর হবে না। বাংলাদেশের রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষার সংখ্যা বাড়াতে হবে। দ্রুততম সময়ে পরীক্ষা ও ফলাফল পাওয়ার জন্য ‘কুইক টেস্টিং কিট’-এর অধিকতর ব্যবহার জরুরি। এতে শতকরা ১০০ শতাংশ নিশ্চিত ফলাফল হয়তো না-ও আসতে পারে। তবে, আমাদের বুঝতে হবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শতভাগ নিশ্চিত শনাক্তকরণ পদ্ধতি, নমুনা সংগ্রহ ও ল্যাব  টেকনিশিয়ানদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার অভাবে বা মনুষ্যজনিত স্বাভাবিক ভুলের কারণে শতভাগ সঠিক ফলাফল আসে না। ফলে, অন্তত বিকল্প পদ্ধতি হিসাবে ক্রস চেকের জন্য হলেও কুইক টেস্টিং কিটের ব্যবহার অত্যাবশ্যক। তাছাড়া, দ্রুততার সঙ্গে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্তকরণ বিভিন্ন কারণে জরুরি, যেমন- রোগীকে পরিবারের সদস্যদের  থেকে আলাদা করে আইসোলেশন/কোয়ারেন্টিনে (এমনকি দরকার হলে এলাকাটি লকডাউন) রাখা, হাসপাতালে ভর্তি প্রয়োজনে করোনা হাসপাতাল/ইউনিটে ভর্তি ইত্যাদি। সে জন্য কুইক টেস্টিং কিটের ব্যবহার সুবিধাজনক। তাছাড়া বিমান ভ্রমণ, গণপরিবহন ও বিশেষ কোনো সমাবেশস্থলে  যোগদানের জন্য এই টেস্ট কিটের ব্যবহার অনেক সমস্যাকে সহজতর করতে সাহায্য করবে। আমাদের দেশে লকডাউন সফল না হওয়ার আর্থ-সামাজিক বাস্তবতাগুলো নিম্নরূপ-

(ক) বিশাল জনসংখ্যা/ঘনবসতির দেশ; একই ঘরে অনেকের বসবাস, একই টয়লেট ও রান্নাঘর বহু মানুষের জন্য ব্যবহার হওয়া। পরিবারগুলোর খুব কাছাকাছি অবস্থান। জনসংখ্যার তুলনায় সুবিধাদি অপ্রতুল সে কারণে রাস্তাঘাট, ফেরি, যানবাহন, দোকানপাটে সবসময় উপচেপড়া ভিড় থাকে।

লকডাউনের মধ্যেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা বা ঘনিষ্ঠ  যোগাযোগ এড়িয়ে চলার উপায় থাকে না। (খ) বিশাল জনগোষ্ঠীর দরিদ্র ও অর্থনৈতিকভাবে অনিশ্চিত অবস্থান; অপ্রাতিষ্ঠানিক সেক্টরে চাকরির উপর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের সঙ্গে বিশাল সংখ্যার মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল। তাদের আয় যথেষ্ট নয় ও চাকরির/জীবিকার নিশ্চয়তা থাকে না। জীবিকা হারালে, অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটাতে হয়। এমন মানুষের সংখ্যা প্রায় পাঁচ কোটির মতো। লকডাউনের ফলে এদের প্রায় সবারই জীবিকা বঞ্চিত হয় ও যে  কোনোভাবে  বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়। সে কারণে লকডাউন করে তাদের ঘরে ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে, বাংলাদেশে লকডাউন কঠোর থেকে কঠোরতর করেও মানুষকে ঘরে ধরে রাখা ও মানুষে মানুষে সামাজিক  যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হয় না, এটাই বাস্তবতা। লকডাউনের কারণে, জীবিকা হারিয়ে বিশাল সংখ্যার সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা বৃদ্ধি হয় নিশ্চিতভাবে। দেশের অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, সেটা বলাই বাহুল্য। তবে রোগ সংক্রমণের গতিরোধে এ কৌশল তেমন  কোনো ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে নিশ্চিত করে বলা যায় না। সেকারণে, আমাদের উচিত অসম্ভবের পেছনে না ছুটে, বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করা। লকডাউন করে সংক্রমণের গতিরোধ করার প্রচেষ্টার চেয়ে রোগাক্রান্তদের চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়নের দিকে অগ্রাধিকার দেয়া জরুরি। ধারণা করা হয়, এ উদ্যোগ তুলনামূলকভাবে জীবন রক্ষায় অধিক ফলপ্রসূ হবে। সে লক্ষ্যে, সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে, প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে, যতটা সম্ভব সম্পূর্ণ সুবিধাসহ আলাদা করোনা বিভাগ স্থাপন করতে হবে। প্রতিটি বেসরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আলাদা করোনা বিভাগ চালু করতে নির্দেশ দিতে হবে। না করতে পারলে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান রেখে প্রয়োজনে অধ্যাদেশ/আইন তৈরি করতে হবে। বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞের নিশ্চিত বিশ্বাস, লকডাউন শিথিল করলে করোন সংক্রমণ হুলস্থূলভাবে বাড়তে থাকবে। হয়তো কথাটা সত্যিও হতে পারে। কেননা বিশ্বের অনেক দেশে এটা ঘটেছে। তবে, লকডাউনের ভেতর যে সংক্রমণ তীব্র গতিতে বাড়ছে না সেটা কি আমরা নিশ্চিত? স্বাস্থ্য অধিদফতরের  ঘোষণায় আক্রান্তের যে হিসাব দেয়া হচ্ছে প্রতিদিন সেটা  মোট জনসংখ্যার খুব সামান্য একটি ভগ্নাংশের পরীক্ষার হিসাব। ১৬ থেকে ১৭ কোটি জনসংখ্যার দেশে এখন পর্যন্ত (১৯ মে, ২০২০) আমরা মোট শনাক্তকরণ পরীক্ষা করেছি ১,৯৩,৬৪৫ সংখ্যক। দৈনিক সর্বোচ্চ ১০২০৭ সংখ্যক পরীক্ষা করা হয়েছে এখন পর্যন্ত (২০ মে, ২০২০ তারিখে)। কোভিড-১৯ উপসর্গসহ মৃত্যুর খবর প্রতিদিন সংবাদ মাধ্যমে আসছে। ফলে, শনাক্ত হয়নি কিন্তু উপসর্গ নিয়ে ভুগছেন নিশ্চিতভাবে অনেক। তাদের হিসাবে বিশেষ করে এ ধরনের রোগীর প্রতিদিনের বৃদ্ধির হিসাব কি আমরা জানতে পারছি? লকডাউনের মধ্যে যেদিন পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ছে  সেদিন আক্রান্তের সংখ্যাও বেশি দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, লকডাউন থাকা অবস্থায় আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। বাস্তবে কতটা বাড়ছে তা নিশ্চিত নয়। কেননা যথেষ্ট পরিমাণ শনাক্তকরণ পরীক্ষা করা যাচ্ছে না। লকডাউন তুলে নিলেও পরিস্থিতি একই ধরনের হতে পারে। অর্থাৎ রোগের বিস্তার একই পর্যায়ে থাকতে পারে। কেননা লকডাউন বাংলাদেশে সঠিকভাবে পালন করা সম্ভব হচ্ছে না এটা সুস্পষ্ট। ফলে লকডাউন কার্যকর ভূমিকা রাখছে না বলা যায়। তাছাড়া আর একটি ঘটনার দিকেও আমি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, তা হল- ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আল¬ামা জুবায়ের আহমদ আনসারীর জানাজায় বিশাল সংখ্যক মানুষের ঢল। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, সামাজিক দূরত্ব ও অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি তোয়াক্কা না করে, এ সমাবেশে যোগদানের ফলে, দেশে নতুন করে হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হবে। বাস্তবে তা ঘটেনি। লেখক ঃ এমপি, চেয়ারম্যান, জাতীয় পার্টি।

 

আরো খবর...