রোগ আর দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বের হয়ে আসার চ্যালেঞ্জ

দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের পক্ষে ঘরে থাকা, নিরাপদ দূরত্বে থাকা, বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া কি আদৌ সম্ভব? ভবঘুরে, সহায়-সম্বলহীন ফুটপাতের বাসিন্দা কিংবা বস্তিতে থাকা মানুষজনকে স্বাস্থ্যবিধি মানানো অসম্ভব। অধিকাংশ বস্তিতে পঞ্চাশ-ষাট মানুষের জন্য একটা পূতিগন্ধময় শৌচাগার, গোটা পঁয়তাল্লিশ কলসি-বালতি টপকে পৌঁছাতে হয় পানির কলে। আটশ স্কয়ার ফুটে একটা ঝুপড়ির সঙ্গে আরও চার-পাঁচটা ঘেঁষাঘেঁষি দাঁড়িয়ে। এঁরা কী করে বাঁচবেন? বাঁচাবেন অন্যকে? বাস্তবতা হচ্ছে, দরিদ্রদের পক্ষে সংক্রমণ এড়ানোর নির্দেশ মানা প্রায় অসম্ভব। তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ শহরে বসবাসে এমন গায়ে গায়ে, হাওয়া চলাচল কিংবা পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এতই খারাপ যে, ঘরবন্দি থাকাও নিরাপদ নয়। ঢাকা বস্তিগুলো শহরে ফ্লুর প্রকোপ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। ঢাকার অনেক গৃহপরিচারিকা সবেতন ছুটি পেলেও কাজে আসতে চান। কারণ কাজের বাড়িতে জলের সহজলভ্যতার জন্য। গরিবের ঝুঁকি বাড়ে রোজগারের তাগিদে। এক অটোসিএনজিচালক  টেলিভিশন চ্যানেলে সেদিন বলেছেন, ‘মালিককে টাকা দিতে হবে, বাড়িভাড়া দিতে হবে, খাবার কিনতে হবে দুই সন্তানের জন্য। কী করে বাড়ি বসে থাকব?’ আমাদের দেশে এমন মানুষের সংখ্যাটা আন্দাজ করা কঠিন। কী করে নিজে নিরাপদ থাকবেন, অন্যকে রাখবেন, কতটা জেনেছেন-বুঝেছেন? যারা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, তাদের কাজের যেমন নিরাপত্তা নেই, স্বাস্থ্যেরও নেই। যতই সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব থাক, কাজে তাদের যেতেই হয়। কারণ অনুপস্থিত থাকলেই কাজ হারানোর শঙ্কা। তাদের ছুটিও নেই। ছুটি চাইলে ছাঁটাইÑ এ অমানবিক নিয়মের জন্য গরিব নিজে বিপন্ন হয়, অজান্তে অন্যকেও বিপন্ন করে। তবে কেবল অতি-দরিদ্রই নয়Ñ নিম্নবিত্ত, স্বল্পবিত্ত মানুষেরও একটা বড় অংশ এমন পেশার সঙ্গে যুক্তÑ যেখানে পরিষেবা দিতে, পণ্য বিক্রি করতে গেলে অন্য মানুষের সংস্পর্শে তাকে আসতেই হবে। তাদের কেউ কেউ দুই-এক সপ্তাহ টেনেটুনে চালাতে পারবেন, কেউ দুই-তিন মাস। তার পর টান পড়ে সঞ্চয়ে, কাজের পুঁজিতে। ছোটখাটো উৎপাদনের সঙ্গে যারা যুক্ত, তারা আবার অন্যদের কাজ দেন। তাদেরও রোজগার বন্ধ হবে। মহামারীর বিস্তার রোধ না হলে দারিদ্র্যসীমার নিচে তলিয়ে যাবে অগণিত মানুষ। রোগ আর দারিদ্র্যের এক দুষ্টচক্র রয়েছে। অপুষ্টির জন্য বেশি  রোগ, রোগের জন্য দারিদ্র্য, দারিদ্র্যের জন্য অপুষ্টিÑ এমন চলতে থাকে। মহামারীর মোকাবিলার সময়ে সেটি কি ভাবা হয়?  বেশিদিন এমন চললে শিশুদের পুষ্টি, রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর কী প্রভাব পড়বে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধনী পরিবারে সত্তর-ঊর্ধ্ব মানুষের যে ঝুঁকি করোনা ভাইরাস থেকে, মন্দ স্বাস্থ্যের কারণে ৫৫ বছরেই ওই ঝুঁকি দারিদ্র্যের। স্বস্তির খবর কোথাও নেই। প্লাস্টিকে নাকি তিন দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকে ভাইরাস। তবে কি মুদির দোকান প্লাস্টিকের ব্যাগ বন্ধ করবে? কার্ডবোর্ডে বাঁচে ২৪ ঘণ্টা, তা হলে কী করে বিপদ এড়াবেন অনলাইন শপিং ডেলিভারি কর্মী? ব্যবসায়ী-মজুর, ট্রাক  লোড করা লেবার, রেশন দোকান বা পেট্রল পাম্পের কর্মী, বাসাবাড়ির কাজের লোক, বস্তি-ফুটপাথবাসী, কাজ অনুসারে ঝুঁকি বদলে যায় তাদের। তাই স্বাস্থ্যের নির্দেশও বদলানো চাই। আর প্রচার চাই এমনÑ যাতে নিরাপত্তার বার্তা পৌঁছায় তাদের কাছে। সরকারের কিন্তু অনেক কাজ। আরেকটি কথা। দেশের শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের একটু শক্ত করেই ধরতে হবে। প্রশ্নটি অনেকই করছেন। দেশে গত প্রায় ত্রিশ বছর ধরে যারা গার্মেন্টস ব্যবসা করছেন, তারা দুই-তিন মাস কেন শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন দিতে পারেন না? তা হলে এতদিন ধরে শত শত কোটি টাকার ব্যবসা করে কী ফল পাওয়া গেল? এখনো অনেক গার্মেন্টকর্মী তাদের বকেয়া বেতন-ভাতার জন্য আন্দোলন করছেন। আর মালিকপক্ষ বলছে, কারখানা বন্ধ থাকার কারণে তারা কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করতে পারছে না। এ  ক্ষেত্রে তারা সরকারি প্রণোদনার ওপর ভরসা করছেন। প্রশ্ন হলো, এতদিন যখন ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো চলেছে, তখন তো কর্মচারীরা  কেবল বেতন ও প্রাপ্য বোনাসই পেয়েছেন। লাভের অংশ গেছে শিল্পপতিদের ঘরে। তা হলে বিপদের সময় কর্মচারীদের বেতনের জন্য সরকারি প্রণোদনার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে কেন? আমাদের দেশে একজন ‘হরিপদ কেরানি’র ঘরে যত সঞ্চিত টাকা আছে, শিল্পপতির সঞ্চয়ের হার এর চেয়ে অনেক বেশি। শেরপুরের একজন ভিক্ষুক যদি জাতীয় বিপদের সময় তার সাকুল্য সঞ্চয় ১০ হাজার টাকা বিলিয়ে দিতে পারেন, তা হলে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা পারবেন না কেন? প্রত্যেক শিল্পপতির কমবেশি ক্ষমতা আছে এই আর্থিক ধাক্কা সামলানোর। তা হলে তারা সেটি করছেন না কেন? সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলোর কী করা উচিত? অত্যন্ত কড়াভাবে বলা উচিত, এই চরম বিপর্যয়ে কারও বেতন-ভাতা বন্ধ করা চলবে না। কারও চাকরি খাওয়া চলবে না! আরেকটি কথা। রাষ্ট্রীয়ভাবেই এখন কৃচ্ছ্রর ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক ও সচেতন করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সবারই একটু সংযত জীবনযাপন করা উচিত। বাজার অর্থনীতি আমাদের সামনে নানা ধরনের প্রলোভনের মুলা ঝোলাবেই, নানা লোভ দেখাবেই। বিজ্ঞাপনের মায়ায় নিজের আর্থিক ক্ষমতা ও ভবিষ্যতের চিন্তা ভুলে  ভেসে যাওয়াটা বন্ধ করতে হবে। নিরাপদ ও নিয়মিত রক্ষণশীল সঞ্চয়ের দিকে ঝুঁকতে হবেÑ যাতে বিপদ এলে নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে পারার কোমরের জোর থাকে। করোনা মহামারীর কারণে সৃষ্টি আর্থিক পরিস্থিতির উন্নয়নে এবং গরিব মানুষের সহায়তায় সরকার যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, এর বেশিরভাগই স্বল্পমেয়াদি। সরকার ধরেই নিয়েছে, তিন মাস পর সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তব হলো, একটা আপাত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারা অন্তত ১৮ থেকে ২৪ মাসের এক যন্ত্রণাদীর্ণ পথ। যতদিন না ওষুধ বা প্রতিষেধক সুলভে বাজারে আসছে, ততদিন প্রয়োজনের বাইরে খরচ করা যাবে না। ইতোমধ্যে প্রায় দুই কোটি মানুষ কাজ হারিয়ে বেকার বসে আছে। যারা বেকার বসে আছে, তাদের অধিকাংশের কাজ ফিরে পাওয়া লকডাউন ওঠার ওপর নির্ভর করছে না, নির্ভর করছে বাজারে চাহিদার ওপরÑ যেখানে মন্দার কালো ছায়া। অনেক অর্থনীতিবিদ বলেছেন, যেভাবেই হোক গরিব মানুষের হাতে কিছু টাকা পৌঁছে দিতে হবে। সরকার ইতোমধ্যে সারাদেশের ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লাখ পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে প্রকৃত অভাবীদের কাছে এই টাকা যাচ্ছে কিনা, এ সংশয় থাকছেই। বাস্তবতা হলো, দেশের অসংগঠিত ক্ষেত্রে মানুষের হাতে টাকা পৌঁছে দেওয়ার নির্ভরযোগ্য কাঠামো এখনো নেই। আর হাতে টাকা গেলেও তার ঠিক ব্যবহার হবে কিনা, এ প্রশ্নও আছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে সহায়তার কথা  শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সেখানেও সমস্যা অনেক। ওই টাকা শ্রমিকের কাছে পৌঁছাবে কি? তা ছাড়া যে শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে ১৮ মাস লাগবে, সেটিকে ছয় মাস আর্থিক সাহায্য দিয়ে লাভ কতটাই বা। ঋণ দিয়ে অনুৎপাদিত সম্পদ হয়ে পড়ার দায় যেভাবে ব্যাংক অফিসারের ঘাড়ে এসে পড়ছে আজকাল, এই সংকটে ঋণ দেওয়ার কতটা আগ্রহ ব্যাংক দেখাবেÑ সন্দেহ আছে। ওএমএসের চাল নিয়েও ভাবতে হবে। শুধু চাল বা গম দিয়ে এত লম্বা পথ চলা যাবে না। আর লড়াইটা দুই-চার মাসের নয়, অন্তত দুই বছরের। তাই বিকল্প পথ ভাবতে হবেÑ এই যুদ্ধে জিততে হলে গরিব, প্রান্তিক ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষকে অন্তত দুই বছর পরিবার নিয়ে জীবন নির্বাহ করার একটা কাঠামো দরকার হবে। সরকারি বণ্টনব্যবস্থার জটিলতা ও সীমাবদ্ধতা কোনো নতুন কথা নয়। অমর্ত্য সেন তো বলেছেন, খাদ্যের অভাবে দুর্ভিক্ষ হয় না। তা হয় বণ্টনের সমস্যায়। আমাদের দেশে সরকারি বণ্টনব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত। এ তুলনায় বেসরকারি সংস্থার বণ্টনব্যবস্থা কিন্তু দক্ষ।  দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে, হাওর, অরণ্যে, পাহাড়েও তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় বস্তু পৌঁছে দিতে পারেন। তাই এই অভূতপূর্ব সংকটে যৌথ উদ্যোগের এক নতুন মডেল তৈরি হতেই পারেÑ যাতে সরকারের আর্থিক সাহায্য আর বেসরকারি বণ্টন দক্ষতা একসঙ্গে কাজ করবে। দুই বছরের সময়সীমা ভেবে একটা উদ্যোগ গ্রহণ করা  যেতে পারে। শুধু শিল্পের ক্ষেত্রে সরকারি অনুদান বাড়িয়ে সমস্যা সমাধানের সম্ভাবনা কম। ব্যবসা তার নিজের গতিতে চলবে, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও চাহিদার পরিবর্তনের ফলে এক বিপুল অংশ ঝাঁপ বন্ধ করবে, আবার নতুন ধরনের চাহিদা অন্য শিল্পের সৃষ্টি করবে। তাই হয়তো মানুষের ওপর সরকারি সহায়তার ছাতাটা দরকার অনেক বেশিÑ মানুষ যাতে অন্য জীবিকা খুঁজে নেওয়ার সময়টা পায়। লেখক ঃ কলাম লেখক

আরো খবর...