রাসূল (সাঃ) এর মি’রাজ শরীফ

 ॥ নাজীর আহ্মদ জীবন ॥

এ পবিত্র মাস রাসূল (সাঃ) এর মি’রাজ শরীফের মাস। মি’রাজ বা উর্দ্ধারোহন রাসূল (সাঃ) এর জীবনে এক আধ্যাত্মিক ঘটনা। হযরত মু’আয (রাঃ) বলেছেন ঃ রাসূল (সাঃ) বলেন; “আমার রব সর্বোত্তম রূপ নিয়ে আমাকে দর্শণ দিয়েছেন।” (তিরমিযী) প্রশ্ন আসে তাহলে কি প্রভু বিভিন্ন রূপ নেন? মি’রাজ সম্পর্কে মাওলানা রুমী (রঃ) এর অভিমত  এই যে; হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) শরীরী অবস্থায় স্বর্গ লোকে উড্ডীন হন নাই। কেননা  মানুষ উড়িতে পারে না এবং খোদাও স্বর্গে থাকেন না। মি’রাজ আধ্যাত্মিক। নিম্নতর সত্তা বিসর্জনের মধ্যদিয়ে মানুষ  চিরন্তন জগতে অধিষ্ঠিত হতে পারে। দৈহিক মি’রাজ সূফী ধারণার বিরোধী”। বিখ্যাত সূফী সারমাদ বলেন ঃ যিনি নিজ  সত্তার গুপ্ত বিষয় সমূহ বাস্তবায়ন করতে সমর্থ হয়েছেন  তিনি স্বর্গের চেয়ে সম্প্রসারিত। ধর্মতত্ত্ববিদরা বলেন যে; হযরত স্বর্গে আরোহন করেন; কিন্তু সারমাদ বলেন, “স্বর্গ তাঁর নিকট নামিয়া আসিয়াছিল।” (দ্রঃ রুমীর আত্মদর্শন ও মুসলিম দর্শনের ভূমিকা ড. রশীদুল আলম।)

কোন কোন আলেম মি’রাজ  ও ইসরার ঘটনাকে ভিন্নভাবে  ব্যাখ্যা করেছেন। তারা মনে করেন, এটা একটা স্বপ্ন। আবার কারও কারও মতে এটা ঘটেছে আত্মিকভাবে; শারীরিক ভাবে নয়। (দ্রঃ আল খাফাজী; নাসীমুরÑরিযায্-ফি ফারহিশÑশিফা লিলÑকাযী আয়ায)

হযরত ইব্ন আব্বাস (রাঃ) এর সূত্রে বর্ণিত আছে; ঘুমে নয়; জাগ্রতাবস্থায় আত্মীক ও শারীরিকভাবে সংঘটিত চাক্ষুষ একটা বিষয় হলো মি’রাজ। এটাই জমহুর উলামায়ে কেরামের অভিমত। (সহীহ বুখারী; ফতহুল বারীÑ৭ মখন্ড)

বারো শরীফের মহান ইমাম হযরত শাহ্ সূফী মীর মাস্উদ হেলাল (রঃ) তাঁর মুর্শিদ (রঃ) এর কথায় বলেন ঃ আল্লাহ কি দেলে বসে নাই। রাসূল মি’রাজ গেলেন; মা আয়েশা বলেছেন উনি ফিরে এসে দেখলেন যে দরজার শিকল নড়ছে; ওজুর  পানি গড়িয়ে যাচ্ছে। বিষয়টা বুঝতে পারছিস না? বুকের (সিনা) দিকে তাকিয়ে বললেন; এখানেই তো মি’রাজ হয়েছিল। (মোহাম্মদী ডাইরী ২৫Ñ৬Ñ৮৩) ইমাম (রঃ) ১০Ñ০৫Ñ৮৩ মঙ্গলবার মিলাদে বলেন ঃ “২৭Ñএ রজব এর রাত্রি শবে মিরাজ এর রাত্রি। এ রাত্রিতে রাসূল, খোদার দিদার  হাসিল করেন। মারিফাত রাত্রি এটা। এ রাত্রিতে আমরা একটু বেশি এবাদত করবো। এর পরের চাঁদ শাবান এর। এই চাঁদে বরাত লিখা  হয়। আমাদের অভিষেক ও এ চাঁদে। রাসূল বলেছেন, “শাবান আমার রমযান আল্লাহর। শাবান না হলে রমযানই ভাগ্যে জোটবে না।”

শাবান মাসকে প্রিয় নবীজী অত্যাধিক গুরুত্ব দিতেন। শাবান  মানে মধ্যবর্তী। যেহেতু এ মাসটি রজব ও রমযানের মধ্যবর্তী  তাই এ মাসকে শাবান নামকরণ করা হয়েছে। এ মাসটির পূর্ণ নাম হলো Ñ “আশশাবানুল মুআযযম” Ñ অর্থ মহান শাবান মাস।

রাসূল (সাঃ) এর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠের নির্দেশ সম্পর্কিত ব্যতিক্রম ধর্মী আয়াতটি এ মাসেই অবতীর্ণ হয়। মি’রাজ শরীফে যখন তিনি আরশের  লা’মাকামে পৌছলেনÑতখন হঠাৎ একটি আওয়াজ তিনি শুনতে পান ঃ “হে প্রিয় মোহাম্মদ; আপনি থামুন; আপনার রব সালাত পাঠ করছেন।  স্বাক্ষাতে এ বিষয়ে জানতে চাইলে আল¬াহ বলেন ঃ “আমার সালাত অর্থ আপনার ওপর দরুদ পাঠ করা। আল্লাহর অতি নিকটবর্তী হলেন।

তাফসীরে রুহুল বয়ানে বলা হয়েছে Ñ“নবী করীম (সাঃ) এর নূরানী সুরতের বহিঃপ্রকাশ হয়েছিল সে সময়। তাঁর বাশারিয়াত সে সময় উন্নত হয়ে নূরে ওয়াহ্দানিয়াতের মধ্যে মিশে গিয়েছিল; যেমন মিশে যায় পানিতে চিনি। এই মকামকে তাছাওফের ভাষায় ‘ফানা’ বলা হয়।

নূর নবী (সাঃ) লাইলাতুল মেরাজে কোন স্থান বা সৃষ্টি জগতে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। কেননা, তখন তিনি তাঁর জড় অস্তিত্ব ভেদ করে আল্লাহর নূরের অস্তিত্বে অস্তিত্ববান হয়ে আল্লাহর পার্শ্বে বসে আল্লাহর সাথে কথোপকথন  করেছিলেন। এখান থেকেই সৃষ্টি হয়েছে ফানা ও বাকার অস্তিত্ব। সূফী সাধকগণ কঠোর সাধনার মাধ্যমে এ স্তরএ পৌছান।

শবেবরাতের রাত্রি সম্পর্কে হযরত আলী (রাঃ) থেকে বর্নিত; নবী করীম (সাঃ) বলেছেন; চৌদ্দ শাবান দিনগত রাত যখন আসে তখন তোমরা এ রাতটি ইবাদত বন্দিগিতে কাটাও এবং দিনের বেলায় রোজা রাখ; কেননা এ দিন সূর্যাস্তের পর আল্লাহ ত’আলা দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং আহবান করেন ঃ কোন ক্ষমাপ্রার্থী আছ কি? আমি ক্ষমা করব, কোন রিযিক প্রার্থী আছ কি? আমি রিযিক দেব; আছ কি কোন বিপদ গ্রস্থ? আমি উদ্ধার করব। এভাবে ভোর পর্যন্ত আল্লাহ মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনের কথা উলে¬খ করে আহবান করতে থাকেন।  (দ্রঃ ইবনে মাজাহ্)

সব কিছুর মূলে আত্মশুদ্ধি; আত্মচেতনা; বিবেকের দাহন জ্বালা তারপর চাওয়াÑপাওয়া। ১৮Ñ০১Ñ৮১ তে ইমাম (রঃ)  কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম ঃ আল্লাহ যখন সব করছেন বা করতে পারেন, তখন মানুষ, খারাপÑভাল যা করছে তার ইচ্ছায়? বললেন ঃ “এর ব্যাপার হচ্ছে, মানুষ  বিবেকবান জীব। যখন তার  বিবেক জাগ্রত হয়, তখন প্রভু তাকে সাহায্য করেন; যখন  সে খারাপ কাজ করে সড়ে যান।”

আরো খবর...