যখন সবাই ফিরবে কাজে

 ॥ গওহার নঈম ওয়ারা ॥

সবার কাজে ফেরার সঠিক সময়টা হয়তো এখনো বলা যাচ্ছে না। তবে ফিরতে হবে সহসা। করোনার ভয় একেবারেই শেষ হোক বা না হোক কাজে ফেরাটা ক্রমেই জরুরি হয়ে পড়ছে। কমবেশি দ্বিমত থাকলেও বিজ্ঞানীরা মোটামুটি এটা মেনে নিয়েছেন যে, শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি। করোনার প্রভাব কমবেশি থাকবে। করোনা সহজে যাওয়ার জন্য আসেনি। প্রতিষেধক দিয়ে একে কুপোকাত করার চেষ্টা সফল হওয়ার আগেই আমাদের জীবনের তাগিদেই জীবিকায় ফিরতে হচ্ছে। ফিরতে হবে। শুধু জীবিকা নয়, বিকাশমুখী কর্মকান্ড যেমনÑ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, স্বাভাবিক শৈশবকালীন কর্মকান্ড, খেলাধুলা, বিনোদন ইত্যাদির দরজাও আমাদের খুলে দিতেই হবে। আমরা লক্ষ করি বা না করিÑ শিশুরা, শিক্ষার্থীরা যে প্রচন্ড মানসিক উৎকণ্ঠা আর চাপের মধ্যদিয়ে যেতে যেতে একেবারে শেষ সীমায় চলে গেছে। ইউরোপের নানা দেশ শিক্ষার্থী ও শিশুদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মা-বাবা বা অভিভাবকের হাওলায় বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অনেকদিন পর সূর্যের আলোতে আসতে  পেরে তারা বেজায় খুশি। খুশি তাদের দ্বিগুণ কারণ মা-বাবা তাদের সঙ্গে আছে। আবার একটু মন খারাপ বন্ধুরা কাছে আসছে না, দূরে দূরে থাকছে। তবুও ভালো ল্যাপটপ আর মোবাইলের পর্দায় নয়, তাদের জ্যান্ত দেখা যাচ্ছে। মুখে মাস্ক থাকায় সবাইকে ঠিক ঠাহর করা যাচ্ছে না, তাই কেউ রিস্ক না নিয়ে সবাই সবাইকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। এ-ও এক নতুন অভিজ্ঞতা। সবাই দূরে কিন্তু সবাই যেন চেনা। বাইরে যাওয়ার তালাগুলো একে একে খুলে গেলে আমরা যে কাজের জায়গা, পড়ার জায়গা, খেলার জায়গা বা ঘোরার জায়গায় যাব সেটা কিন্তু আর আগের মতো থাকবে না। করোনার ছায়া যতদিন থাকবে ততদিন আমাদের হাটবাজার, স্কুল-মাঠ, রাস্তায়-বাসে-রেস্টুরেন্ট ও যানবাহনে অনেক না হলেও বেশকিছু পরিবর্তন বা নতুন আচরণবিধি মেনে চলতে হবে এবং সেসবের প্রস্তুতি শেষ তালাটা খুলে দেওয়ার আগেই  সেরে ফেলতে হবে। স্কুলের কথাই ধরা যাক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কি আগের মতো গাদাগাদি করে ক্লাসে বসাবে না দল ভাগ করে একদিন পরপর শিক্ষার্থীদের আসতে বলবে, বাড়ির কাজ বেশি দেবে।  ড্রেসকোডে মাস্ক থাকবে কিনা, থাকলে সেগুলো কেমন হবে। বাড়িতে তৈরি তিন স্তরের সুতির মাস্ক ধুয়ে বারবার ব্যবহার করা যায়। আমরা কি  সেই সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনায় যাব না একবারের বেশি ব্যবহার করা উচিত নয়Ñ এমন বাজারি মাস্কের কথা বলব? পড়া ধরার সময় শিক্ষার্থী কি মাস্ক খুলে ফেলবে। মাস্ক খোলা আর লাগানোর নিয়ম কি সব শিক্ষার্থী একইভাবে জানে, একইভাবে মানে। শিক্ষক কি ক্লাস শুরুর আগে সেটা একবার বলে দেবেন? শিক্ষক নিজে জানেন  তো? হাতের দাস্তানাও কি ¯ু‹ল ড্রেসের অংশ হবে সেটাই বা কেমন হবে? স্কুলে হাত ধোয়ার সুবিধা বাড়াতে হবে, কৌশলগুলো মনে করিয়ে দিতে হবে এসব ম্যালা কাজের পরিকল্পনা এবং কিছু কিছুর (হাত ধোয়ার স্থাপনা) বাস্তবায়ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে এখনই সেরে ফেলতে হবে। একটা সাইকেল, রিকশা-ভ্যানে গাদাগাদি করে যেসব শিক্ষার্থী বাড়ি থেকে স্কুল আর ¯ু‹ল থেকে বাড়ি ফিরতেন তাদের কি হবে। একটা ভ্যানে কজন কীভাবে বসবে? কম সাওয়ারি নিয়ে কীভাবে পড়তা ফেলতে পারবে ভ্যানচালক। নিশ্চিতভাবে তাকে বেশি ভাড়া হাঁকতে হবে। খরচ বেড়ে যাবে অভিভাবকের। কেউ হয়তো বাধ্য হবেন ¯ু‹ল  থেকে ছাড়িয়ে নিতে। বেড়ে যাবে কি ড্রপ আউট? তার হাত ধরে বাল্যবিয়ে? শিশুকে কাজে পাঠানোর হার? ভর্তুকি বা প্রণোদনার এটা একটা প্রধান খাত হতে পারে। নজর রাখতে হবে যেভাবেই  হোক করোনা যেন শিক্ষার্থীকে পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য না করে, বাল্য বিবাহকে উৎসাহিত না করে, শিশুশ্রম বাড়িয়ে দেয়। বড় বড় দোকান (শপিংমল) খুলে দেওয়ার কথা হচ্ছে। কেউ হ্যাঁ,  কেউ না। শেষ মুহূর্তে কিছু কিছু মালিক বেঁকে বসেছেন। দুষ্টলোকরা মনে করেন সরকারকে একটা মোচর দিয়ে তারা কিছু টাকা বাগাতে গিয়েছিলেন, ভেবেছিলেন ওরা যদি এক প্যাঁচে পাঁচ হাজার কোটি টাকার তোড়া তুলে নিতে পারে আমরা কেন আড়াই প্যাঁচে আড়াই হাজার উঠাতে পারব না? দোকান খোলার অসিয়ত  পেয়ে যাবেন এটা তাদের ধারণার মধ্যে ছিল না। এখন হিসাব  কোষে দেখছেন ১০-১৫ দিনের জন্য হাফবেলা খুলে তাদের পড়তা হবে না। দোকানকর্মীদের বেতন-বোনাস দিতে পারবে না, তার পর দোকান শ্রমিকরা একাট্টা হয়ে যদি বকেয়া চেয়ে বসেন তখন কী হবে? দোকান মালিক সমিতি কিন্তু মল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল সরকারি লগডাউনের আগে। এমন নয় যে, তারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রেমে কাতর হয়ে সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। গণমাধ্যম সাক্ষী, তারা বলেছিল কাস্টমার নেই। বিদ্যুতের বিল টানা যাচ্ছে না তাই সাটার নামিয়ে দিলাম। এসব মন্দ লোকের কথায় কান না দেওয়াই ভালো। তবে দোকানপাট এক সময় খুলতেই হবে তা করোনার ভাগ্যে যাই ঘটুক না কেন? তবে কি দোকান সব আগের মতো চলবে? কিভাবে ভিড় এড়িয়ে করোনার ঝুঁকি এড়িয়ে তারা ব্যবসা করতে পারবেন? কোন  দোকানগুলো আগে খোলা দরকার। আমরা যেমন ফার্মেসি চালু রেখেছি, তেমনি চালু রাখা প্রয়োজন কম্পিউটার মোবাইলের দোকান। করোনাকালে যেটুকু যোগাযোগ চালু আছে তা ইন্টারনেট পরিসেবার মাধ্যমে চালু আছে। পাড়ায় পাড়ায় পালা করে কম্পিউটার মোবাইলের দোকান চালু রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। কম্পিউটার মার্কেটগুলোতেও ৫০ শতাংশ আজ, ৫০ শতাংশ কাল এভাবে খোলা রাখা যেতে পারে। বহুতল ইমারতের নগরগুলোতে এখন লিফটনির্ভর জীবনব্যবস্থা হাসপাতাল, মল, বাসস্থান, অফিস-কাছারি, হোটেল সবই চলে লিফটে। গত চলি¬শ দিনে এসব লিফটের কোনো সার্ভিসিং নেই। অনেক বাড়িতেই ঝুলছে লিফট বন্ধের নোটিশ। প্রবীণরা পড়েছেন বিপাকে। প্রতিদিন বাজার নিষিদ্ধ তাই সপ্তাহের ভারী বাজার টেনে উঠানো যাচ্ছে না আটতলায়। লিফট সার্ভিসিংয়ের দোকান, অফিসগুলোকে আগে খুলে দিতে হবে। শপিংমলের সেই  দোকানকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে যিনি অনলাইনে বেচাকেনা করতে রাজি হবেন। ঢাকার রাস্তায় বসে থাকা পাঠাও ভাইবোনদের একটা দিশা মিলবে। ঢাকা শহরের মতো শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে যানবাহন চালু করার সুযোগ পৃথিবীর আর কোনো শহরে নেই। অ্যাম্বুলেন্স, দমকল ছাড়া সব গাড়ি বন্ধ করে শুধু রিকশা চলতে দিলেই হবে। যানজটের দোলায় দুলতে দুলতে সায়েন্স ল্যাব থেকে মতিঝিল গাড়িতে যেতে যে সময় লাগত তার অর্ধেকের কম সময়ে রিকশায় সেখানে পৌঁছানো সম্ভব। শুধু এক রিকশা এক যাত্রী নিয়ম চালু করলেই চলবে। দুই-তিন সপ্তাহ এটা চালু রাখলেই এর সুফল  দেখা যাবে। রিকশা ছেড়ে দিলে কমপক্ষে পাঁচ লাখ পরিবারের  খোরাকি নিয়ে আর ভাবতে হবে না। রিকশার আয় সরাসরি গ্রামে যায়, কৃষিতে বিনিয়োগ হয়। ঢাকায় রিকশার প্যাডেল যত ঘুরবে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা ততই মজবুত হবে। এটা অর্থনীতিবিদরা যত আমলে নেবেন ততই আমাদের মঙ্গলের গাড়িটা হাওয়া পাবে। এ তো গেল নগর-শহরের কথা, গ্রামবাংলার কী হবে। সুনামগঞ্জ প্রশাসন একটা চেষ্টা করেছে। সেটা মূল্যায়ন করে একটা মডেল দাঁড় করানো যায়। পশ্চিমবঙ্গে ইতোমধ্যেই কাজের বিনিময়ে অর্থ কর্মসূচি চালু করেছে। ওরা বলছে ১০০ দিনের কাজ। চলতি মাস  থেকে শুরু একশ দিনের কাজের তালিকায় আছে পুকুর কাটা, জমি সমতল করার কাজ, গৃহনির্মাণ ইত্যাদি। ‘একশ দিনের প্রকল্পে শ্রমিকরা বিধি মেনেই কাজ করছেন, কারও মুখে মাস্ক, কারও আবার গামছাতেই নাক-মুখ ঢাকা। কোদাল হাতে নেওয়ার আগে সাবান-পানি দিয়ে হাত কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নিচ্ছেন তারা। আবার কাজের বিরতিতে জিরিয়ে নেওয়ার সময়ও ফের হাত ধোয়া, নয়তো স্যানিটাইজার নিয়ে হাতের তালু থেকে কনুই পর্যন্ত মেখে  নেওয়া। একশ দিনের কাজে শামিল মানুষরা জানাচ্ছেন, ‘এখন করোনার জন্য সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। প্রশাসন থেকে আমাদের মুখ ঢেকে দূরত্ব বজায় রেখে কাজ করতে বলা হয়েছে। মাঝে মধ্যেই সাবান, হ্যান্ডওয়াশ, স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধুচ্ছি।’ অনেকটাই আমাদের সুনামগঞ্জের ধান কাটা আয়োজনের মতো। নিয়ত থাকলে পথ আছে তবে পথের ব্যাপারে পথিকদের সঙ্গে নিয়েই তাদের মতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এটা সবাইকে নিয়ে সবার সঙ্গে থাকার সময়। ‘ন্যায্য কথা যদি কেউ বলে সে যদি একজনও হয় তার কথা আমরা মেনে নেব’ বঙ্গবন্ধুর এ কথার ওপর আর কোনো কথা চলে? সংকট উতরানোর সেটাই হোক মূল চাবি। লেখক ঃ গবেষক।

আরো খবর...