মুসলিম জনগণের লীগ থেকে জনগণের লীগ

 ॥ মো. আবদুর রহিম ॥

উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ছিল গতকাল ২৩ জুন। বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশ নামক একটি জাতিরাষ্ট্রের জন্ম দেয়া আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। রাজনীতি বিজ্ঞানের ইতিহাসে এরকম কৃতিত্বের অধিকারী রাজনৈতিক দলের সংখ্যা হাতেগোনা। অন্য সব অর্জন বাদ দিলেও ঠিক এ কারণে আওয়ামী লীগকে ইতিহাস স্মরণ করবে যুগ থেকে যুগান্তরে। উপমহাদেশে রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দলগুলোর দৃশ্যমান নীতি-আদর্শের বাইরেও প্রচ্ছন্নভাবে একটি অন্তর্নিহিত ধর্মীয়-রাজনৈতিক দর্শন ছিল। আদর্শগতভাবে অসাম্প্রদায়িক হলেও ধর্মকে কখনও কখনও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। রাজবংশীয় শাসনের ঐতিহ্যমন্ডিত ভারতবর্ষে রাজনৈতিক দলের জন্ম হয় ব্রিটিশ শাসনামলে। এটি ছিল উপনিবেশিত ভারতবর্ষকে নির্বিঘেœ শাসনের জন্য ব্রিটিশ  কৌশল। কয়েক বছরের ব্যবধানে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ গঠনের পেছনে ব্রিটিশদের  প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য অনুপ্রেরণা কাজ করেছিল। একটির পেছনে অন্যটি লাগিয়ে দেয়া তাদের রাজনৈতিক কৌশল ছিল। পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তনের পেছনেও ছিল সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মাধ্যমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের অভিপ্রায়। উভয়  ক্ষেত্রেই ব্রিটিশরা সফল হয়। ভারতবর্ষের অধিবাসীরা ব্রিটিশদের কূটচাল বুঝতে ব্যর্থ হয়। অল্প-বিস্তর কিছু মানুষ বুঝতে পারলেও সাম্প্রদায়িকতার মোহে আচ্ছন্ন অধিকাংশের আওয়াজে তাদের কণ্ঠ চাপা পড়ে যায়। আজও সেই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে জর্জরিত উপমহাদেশের জনগণ। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অদূরদর্শিতা আর মুসলিম লীগের তথাকথিত এলিট নেতাদের ব্যক্তিগত কায়েমি স্বার্থে ভারত ভেঙে দু’ভাগ হলেও মুসলিমদের সাধের ‘পৃথক আবাস ভূমি’ পূর্ব বাংলার অধিবাসীদের জীবনে সূচিত হয় নতুন এক বঞ্চনার। বাঙালির সমর্থনকে পুঁজি করে (১৯৪৬ সালের নির্বাচনের ফল) পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হলেও জাতিগত বিদ্বেষ থেকে রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রতিটি স্তরে বাঙালিদের বঞ্চিত করা হয়। উপরন্তু বাঙালির অস্তিত্ব নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে যায়। বাঙালিকে ‘ভালো মুসলমান’ হওয়ার পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। ‘হিন্দুয়ানি’ বাংলা ভাষা’র পরিবর্তে উর্দু ভাষা ও প্রচলিত বাংলা ভাষাকে পরিবর্তন করে ‘পাক-বাংলা’ প্রবর্তনের চেষ্টা এবং বাঙালির জন্মভূমির পৈতৃক নাম বাংলা অভিধা মুছে ফেলার জন্য ‘পূর্ব বাংলার’ স্থলে পূর্ব-পাকিস্তান হিসেবে নামকরণ করা হয়। কালের পরিক্রমায় গড়ে ওঠা বাঙালির অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিকে বিনষ্ট করে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ানো হয়। সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে বিভক্তির পর ভারতবর্ষের উভয় অংশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উন্মাদনা চলছে। সন্দেহ-অবিশ্বাস আর গুজব হিন্দু-মুসলমানদের বিভাজন রেখাকে আরও স্ফীত করে চলেছে। এমন এক পরিস্থিতিতে পূর্ব বাংলায় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন সত্যিকারের বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয়। পূর্ব বাংলার মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে অসাম্প্রদায়িক মনস্তত্ত্ব লালন করলেও পাকিস্তান আন্দোলন সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মনে ধর্মীয় ভাবাবেগের যে উত্তাল জোয়ার সৃষ্টি করেছিল, তার প্রভাব তখনও মানুষের মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। এ ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির পেছনে কিছু স্বার্থান্বেষী অভিজাত মুসলিমদের হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল, তা বুঝতে পূর্ব বাংলার অধিবাসীদের  দেরি হয়ে যায়। পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র এক বছর দশ মাসের মাথায় আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির মাধ্যমে যে রাষ্ট্রের জন্ম এত অল্প সময়ের ব্যবধানে ইসলামের প্রত্যয় বিযুক্ত কোনো রাজনৈতিক দল জনসমর্থন পাবে কিনা, সে সংশয় উদ্যোক্তাদের মনে ছিল। বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি মনে করেছিলাম পাকিস্তান হয়ে গেছে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার  নেই। একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে, যার একটা সুষ্ঠু ম্যানিফেস্টো থাকবে। ভাবলাম সময় এখনও আসেনি, তাই যারা বাইরে আছেন তারা চিন্তা-ভাবনা করেই করেছেন’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ১২১)। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিন্দু নেতারা বিভক্ত ভারতের পাকিস্তানে তাদের নাগরিক মর্যাদা প্রশ্নে শঙ্কিত হয়ে পড়েন।  দেশভাগের কয়েক মাসের মধ্যে আইনসভার বিরোধীদলীয় নেতা কংগ্রেসের কিরণ শঙ্কর রায়সহ বহু হিন্দু নেতা দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যান। অনেকে এ আশায় বুক বেঁধে ধাতস্থ হওয়ার  চেষ্টা করেছিলেন যে, ‘…স্বাধীন দেশে মানুষের মতো এক ও অভিন্ন মর্যাদা নিয়েই পাকিস্তানে বাস করতে পারব (প্রভাস চন্দ্র লাহিড়ী, পাক-ভারতের রূপরেখা, পৃ. ৫৫)। পূর্ব বাংলা আইনসভার বিরোধীদলীয় উপনেতা ও পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য ডিএন দত্তের নেতৃত্বে হিন্দু নেতারা ১৯৪৮ সালের ১৮ জুলাই পূর্ব বাংলা রাজনৈতিক কনভেনশন ডেকে গণসমিতি নামে একটি অসাম্প্রদায়িক দল গঠন করেন। সবার জন্য উন্মুক্ত থাকলেও দলটি মুসলিমদের সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হয়। ভারতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে একটি সম্মেলনের মাধ্যমে পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেস পুনর্গঠন করা হয়। পাকিস্তানে অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকা এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পাকিস্তান  সোশ্যালিস্ট পার্টি, কংগ্রেস, গণসমিতি, ফরোয়ার্ড ব্লক ইত্যাদি রাজনৈতিক দল ও মোর্চা কমিউনিস্ট বা হিন্দুসমর্থিত দল হিসেবে পরিচিতি পায় এবং এসব দলের কার্যক্রম চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এমনই এক রাজনৈতিক পরিবেশে পূর্ব বাংলায় সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্য ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাভাবিকভাবেই অসাম্প্রদায়িকতার মূল চেতনাকে ধারণ করে ‘সামাজিক অবস্থা মতামত ও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পাকিস্তানের সমগ্র জনসাধারণের ধর্ম সভ্যতা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু জীবনের সমান অধিকার ও সমান সুযোগ প্রতিষ্ঠিত করার’ নীতি গ্রহণ করলেও এ দলের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা মুসলিমদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয় (নূহ-উল-আলম লেনিন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পৃ. ১৩৮ ও ১৪৯)। খিলাফতের নীতিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রে ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠার সংকল্পও গ্রহণ করা হয়। জীবন ও কর্মে সর্বদা অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী নেতারা অধিবাসীদের মধ্যে বিদ্যমান ধর্মীয় ভাবাবেগকে বিবেচনায় নিয়ে সাম্প্রদায়িক নাম ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ (মুসলিম জনগণের লীগ) রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন। ধারণা করা হয় বঙ্গবন্ধু জেলের বাইরে থাকলে সাম্প্রদায়িক নাম রাখার বিরোধিতা করতেন, যেমন বিরোধিতা তিনি যুক্তফ্রন্ট গঠনের সময় করেছিলেন। আওয়ামী মুসলিম লীগ হিন্দু নেতাদের কাছে খুব একটা আশার সঞ্চার করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পরিণাম সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন। দেশভাগের পূর্বাপর তিনি নিজের জীবনকে বিপন্ন করে সাম্প্রদায়িকতার হিংসা থেকে মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করার জন্য কলকাতা, বিহার এবং পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ছুটে বেড়িয়েছেন। তার রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ  সোহরাওয়ার্দীও একই কাজ করেছেন। মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে মোকাবেলার জন্য  কৌশলগত কারণে সংগঠনের সাম্প্রদায়িক নাম গ্রহণ করতে হলেও  সেটি পরিবর্তনের জন্য অনুকূল সময়ের অপেক্ষায় ছিল দলটি। ১৯৫৩ সালে অনুষ্ঠিত দলের দ্বিতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে অসাম্প্রদায়িকীকরণের দাবি জোরালো হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আওয়ামী মুসলিম লীগের ১৯৫৩ সালের কাউন্সিলের সাংগঠনিক রিপোর্টে বলেন, ‘১৯৪৯ সালের স্বাধীনতা লুপ্তির আশঙ্কা, সরকারের প্রতি মোহ, পাক-ভারত তিক্ত সম্পর্ক, হিন্দু-মুসলমানে একটা সন্দেহের ভাব ও আন্দোলনে অভিজ্ঞতার অভাব ও সাংগঠনিক পরিবেশ আজ চিরবিদায় নিয়াছে’ (লেনিন, পৃ ১৬৪)। প্রস্তাবনা তৈরির জন্য ১৯৫৪ সালের ৫ এপ্রিল ওয়ার্কিং কমিটি এবং জেলা কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের এক সভায় গঠনতন্ত্র সাব কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটি মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে সংগঠনের নাম আওয়ামী লীগ রাখার প্রস্তাব করেন (লেনিন, ১৭০, ৭১)। ১৯৫৫ সালের কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদকের বার্ষিক প্রতিবেদনে  শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, মুসলিম লীগ পাকিস্তানের জনগণের ধর্মানুরাগের সুযোগে ইসলামকে হাতিয়ার করেই তার শাসন অব্যাহত রেখেছিল। জনগণও তখন লীগ সরকারের বিভ্রান্তি থেকে নিজেদের সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করতে সক্ষম হয়নি। এ অবস্থায় আমাদের সংগঠনকে অসাম্প্রদায়িক করা সম্ভব হলেও মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল প্রভাবের মোকাবেলা করার কাজে তা ব্যর্থ হতো; কিন্তু বর্তমানে সে অবস্থা আর নেই। মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আজ অবসান ঘটেছে। ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সব পাকিস্তানবাসীর নিজস্ব রাজনৈতিক ঐক্যজোট হিসেবে গণআন্দোলনে  নেতৃত্ব করার মহান দায়িত্ব আজ আওয়ামী লীগ গ্রহণ করতে পারে (লেনিন, পৃ. ১৯৯)। এ অধিবেশনে সংগঠনের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে ‘আওয়ামী লীগ’ (জনগণের লীগ) রাখা হয়। বর্তমান সময়ের নিরিখে বিচার করলে এ পরিবর্তন একটি মামুলি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে; কিন্তু তৎকালীন ধর্মীয় রাজনীতির উন্মাদনার যে জোয়ার চলছিল সে প্রেক্ষাপটে বিচার করলে বলা যায়, এটি সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। বিশেষ করে অধুনা অনেক গবেষক দেখিয়েছেন, ভারতবর্ষে ধর্মের প্রতি গভীর ও সক্রিয় বিশ্বাস সম্পন্ন অঞ্চলে অসাম্প্রদায়িকতা জীবন-দর্শনের অংশ হওয়া অসম্ভব ব্যাপার। এতদসত্ত্বেও কিছু ক্রটি-বিচ্যুতি থাকলেও আওয়ামী লীগ তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পথযাত্রায় সব ধর্ম-বর্ণ-মত ও পথের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। লেখক ঃ সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী প্রক্টর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

আরো খবর...