মুক্তির প্রশ্নে সরকারের সঙ্গে  আপস করবেন না খালেদা জিয়া – মওদুদ

ঢাকা অফিস ॥ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেছেন, মুক্তির প্রশ্নে সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করবেন না দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দলীয় প্রধানের কারামুক্তির পথ খুলতে আদালতে জামিন আবেদনের বিরোধিতা না করতে বিএনপির আইনজীবী জয়নুল আবেদীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানানোর পরদিন একথা বললেন তিনি। গতকাল শুক্রবার রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় বিএনপি নেতা মওদুদ বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া কারও সঙ্গে আপস করবেন না, উনি কারও কাছে মাথা নত করবেন না। তিনি বাংলাদেশে এখন ১৬-১৭ কোটি মানুষের নেতা। “প্রয়োজন হলে আরও থাকবেন, কষ্ট সহ্য করবেন কিন্তু খালেদা জিয়া কোনো দিন এই সরকারের সঙ্গে আপস করবেন না।” দুর্নীতির দুই মামলায় দন্ড নিয়ে দেড় বছরের বেশি কারাবন্দি খালেদার সঙ্গে সম্প্রতি বিএনপির সাত সংসদ সদস্য দেখা করে আসার পর তার ছাড়া পাওয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। খালেদা প্যারোলে মুক্তি চান না জানিয়ে ‘রাজনৈতিক বন্দি’ হিসেবে তার জামিনের ব্যবস্থা করতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করেছেন দলটির সংসদ সদস্যরা। তার প্রতিক্রিয়ায় আগের মতোই তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, খালেদা রাজবন্দি নন, ফলে তার জামিনের বিষয়টি পুরোপুরি আদালতের বিষয়। এরপরই বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের নেতা জয়নুল আবেদীন আবারও খালেদা জিয়ার জামিনের আবেদন নিয়ে আদালতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে এক্ষেত্রে সরকারের ‘ছাড়’ চেয়েছেন। সরকারের ‘হস্তক্ষেপের কারণে’ খালেদা জিয়ার জামিন হচ্ছে না অভিযোগ করে তার আইনজীবী মওদুদ আহমদ বলেন, “বেগম জিয়া অবশ্যই জেলখানা থেকে বেরিয়ে আসবেন। হয় তার মুক্তি আইনি প্রক্রিয়ায় হবে, তা না হলে জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে তার মুক্তি হবে। অন্য কোনো পথে তার মুক্তি হবে না।” তবে জনতার ‘স্বতঃস্ফূর্ত গণবিস্ফোরণ’ ছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসনের মুক্তি হবে না বলে মনে করেন দলটির শীর্ষ পর্যায়ের এই নেতা। আগামীতে সেই আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি নিতে নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। গত ছয় মাস ধরে চিকিৎসার জন্য বিএসএমএমইউ হাসপাতালে রয়েছেন খালেদা জিয়া। তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট ও নিম্ন আদালত মিলে এখন ১৭টি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে দুটি মামলায় (জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট ও জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা) জামিন পেলেই তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পেতে পারেন বলে তার আইনজীবীদের ভাষ্য। দুর্নীতি দমন কমিশনের এ দুই মামলায় তার ১৭ বছরের কারাদন্ড হয়েছে। জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ১০ বছরের সাজার রায়ের বিরুদ্ধে খালেদার আবেদন আপিল বিভাগে এবং দাতব্য ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া ৭ বছরের সাজার বিরুদ্ধে করা আপিল হাই কোর্টে বিচারাধীন। এই মামলার খালেদার দন্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলে মওদুদ আহমদ বলেন, “যে মামলায় খালেদা জিয়াকে সাজা দেওয়া হয়েছে দুদক বলল ২ কোটি টাকা এখন ৮ কোটি টাকা হয়ে গেছে। আজকে একটা পয়সাও তিনি স্পর্শ করেন নাই। কোনো কাগজে তার স্বাক্ষর নাই, ব্যাংক একাউন্ট ওপেন করেছেন সেখানেও তার স্বাক্ষর নাই, কোনো খানে তার কোনো সাক্ষী বলতে পারে নাই যে, এই ব্যাপারে উনি জড়িত ছিলেন। “কিন্তু সাজা হয়েছে। কারণ এটা একটা রাজনৈতিক মামলা ছিল, আইনগত মামলা ছিল না, আইন অনুসারে এই মামলা হয় নাই্। এই মামলা হয়েছে রাজনৈতিক ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর জন্যে, প্রতিহিংসার রাজনীতির জন্যে।” এরপরেও এই মামলায় সাত দিনের মধ্যে খালেদা জিয়ার জামিন হওয়ার কথা ছিল বলে মনে করেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। “আজকে বেগম জিয়ার জামিন হয় না। তার কারণ, সরকার চায় না। সেজন্যই হয় না। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই আজকে আইন-আদালত সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত। সেখানে অন্য কোনোভাবে বিচারকদের কোনো মুক্তচিন্তা বা উন্মুক্ত বিবেক দিয়ে তারা এখন আর কাজ করতে পারেন না। তাদের মধ্যে ভয়-আতঙ্ক কাজ করে বেশি।” সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ- টেন্ডারবাজ ও জুয়াড়িদের বিরুদ্ধে সরকার যে ‘শুদ্ধি অভিযান’ চালাচ্ছে তাকে ‘ লোকদেখানো’ মনে করছেন সাবেক মন্ত্রী মওদুদ আহমদ। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের ১০ বছর পরে এই অভিযান এটা চালাকি। এই অভিযান হল একটা ‘আইওয়াশ’। এটার কোনো গুরুত্ব, এটার কোনো তাৎপর্য আমরা দেখি না।” ১০ বছরে ক্ষমতাসীনরা ‘দুর্নীতির পাহাড়’ গড়েছেন মন্তব্য করে সাবেক-বর্তমান সব এমপি ও মন্ত্রীদের সম্পদের হিসাব জনগণের কাছে প্রকাশ করার আহ্বান জানান জানিয়েছেন এই বিএনপি নেতা। “তাহলে আমি বুঝব, আপনি সত্যিকার অর্থে সিরিয়াসলি এই অভিযান চালাতে চান। আর যদি তাদেরকে ঢাকা দিতে চান এবং কিছু শামীম, খালেদ, সম্রাট-এদেরকে স্কেপগোট করবেন? “এদের পেছনে কারা আছে? তাদেরকে যদি ধরতে পারেন তাহলে বলব যে, এই অভিযান সফল হয়েছে বা হতে পারে। আমরা জানি, এগুলো আপনারা কিছুই করবেন না। এটি অল্প সময়ের মধ্যে ধামাচাপা পড়ে যাবে, খবরের কাগজে তখন অন্য ইস্যু চলে আসবে, তখন আর আলোচনা হবে না।” অভিযানে গ্রেপ্তারদের কুকীর্তি প্রকাশের মধ্য দিয়ে সরকারের ‘মুখোশ’ খুলে গেছে বলে মন্তব্য করেন মওদুদ। তিনি বলেন, “এই সরকার দুর্নীতিতে নিমজ্জিত এবং সেটা তারা প্রমাণ করেছে। গত দুই সপ্তাহ যাবত যারা ধরা পড়েছে তারা প্রধানমন্ত্রীর দলেরই মানুষ, তারা তার অনুগত। আমাদের দেশে যারা ব্যাংক লুট করেছেন, যারা শেয়ারবাজার লুট করেছে, যারা আমাদের দেশের গরিব মানুষের অর্থ আত্মসাত করেছেন এবং তাদের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে, মালয়েশিয়াতে সেকেন্ড হোম হয়েছে, নিউ ইয়র্কে সম্পত্তি করেছে- এটা তো দুর্নীতির মাধ্যমেই করেছেন। দুর্নীতির মাধ্যমে ছাড়া এটা কী সম্ভবপর?” ঢাকার ক্লাবগুলোতে ক্যাসিনো পরিচালনার সঙ্গে প্রশাসন, রাজনীতিক, মন্ত্রী-এমপি, আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ও পুলিশ কর্মকর্তারা জড়িত ছিলেন বলেও অভিযোগ করেন মওদুদ আহমদ। জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের উদ্যোগে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এই আলোচনা সভা হয়। সংগঠনের সভাপতি ইশতিয়াজ আজিজ উলফাতের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক সাদেক খানের পরিচালনায় আলোচনা সভায় গণস্বাস্থ্য সংস্থার ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, কল্যাণ পার্টির সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, বিএনপির শওকত মাহমুদ, ফজলুর রহমান, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, শিরিন সুলতানা, রফিক শিকদারসহ মুক্তিযোদ্ধা দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন।

আরো খবর...