মুক্তিযুদ্ধে প্রথম পতাকা উড়ালেও আজো পাননি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি

একজন ব্রিটিশ মন্টু’র গল্প

নিজ সংবাদ ॥ আজ ২৩মার্চ কুষ্টিয়া ইসলামীয়া কলেজ মাঠে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়। যে সময়টি পাকিস্তান দিবসের আয়োজন চলমান তখন সেই দিবস বর্জন করে ইসলামীয়া কলেজ মাঠে তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজন করে জনসভার। জনসভায় একে একে হাজারো মুক্তিকামী দামাল ছেলেরা উপস্থিত হতে থাকেন ইসলামীয়া কলেজ মাঠ প্রাঙ্গণে। উপস্থিত হন তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আহসান উল্লাহ এমপিসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। আহসান উল্লার সভাপতিত্বে যথারীতি শুরু হয় জনসভা। তখন পাকিস্তান বিরোধী উত্তপ্ত বক্তব্য চলছিল। এরই মধ্যে মঞ্চের ঠিক পেছনে নেতাকর্মীদের জটলা লক্ষ করা যায়। জটলার কারন জানা গেল। মুক্তিযুদ্ধের পতাকা উত্তোলনের প্রস্তুতি চলছিল। তৎকালীন জেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক শফিউর রহমান মন্টু একটি বাঁশের সাথে পতাকা বাঁধছিলেন। এসময় তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা খন্দকার জুলফিকার আলী আরজু ও জাফর খান পতাকা উত্তোলনে তাগিদ দেন। তারা বলেন তোমরা পতাকা ওড়াও যা হয় হবে। তখন বিকেল ৪টা বাজে। তাদের কথায় ওই জনসভা চলাকালিন সময়ে উত্তোলন করা হয় মুক্তিযুদ্ধের পতাকা। পতাকা উত্তোলনের ছবিও তোলেন আলোকচিত্রী আব্দুল হামিদ রায়হান। যে ছবি আজো কালের স্বাক্ষি হয়ে রয়েছে। আজ ২৩মার্চ মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পতাকা উত্তোলন দিবস। কিন্তু এই পতাকা উত্তোলন নিয়ে আজো প্রশ্ন রয়ে গেছে। প্রশ্ন ২৩ ও ২৫ মার্চ নিয়ে। এ্যাড. আব্দুল জলিল না শফিউর রহমান মন্টু প্রথম পতাকা উত্তোলন করেন। আসলে দু’জনই পতাকা উত্তোলন করেন। তবে একজন আগে আর আরেকজন পরে। শফিউর রহমান মন্টুর হাতেই ওড়ে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা।

এবিষয়ে মু্িক্তযুদ্ধের আলোকচিত্রী আব্দুল হামিদ রায়হান জানান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পতাকা উত্তোলন করা হয় কুষ্টিয়ায় ২৩ মার্চ বিকেল ৪টায়। শফিউর রহমান মন্টুর হাত ধরেই ওই পতাকা উত্তোলন করা হয়। ওই পতাকা উত্তোলনের ছবি আমার হাত দিয়ে উত্তোলন করা হয়।

কুষ্টিয়ার পৌর মেয়র আনোয়ার আলী বলেন ২৩ মার্চ প্রথম কুষ্টিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের পতাকা উত্তোলন করা হয়। আমরা যদ্দুর জানি শফিউর রহমান মন্টুসহ আমরা সবাই উত্তোলনের সময় ছিলাম।

পতাকা উত্তোলন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে ভুল তথ্য দিয়ে ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে বলে দাবী করে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরে শফিউর রহমান মন্টু বলেন, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের কুষ্টিয়া জেলার ভুমিকা ছিল অপরিসীম। আমরাই যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যে কুষ্টিয়াকে হানাদারমুক্ত করেছিলাম। যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই এজেলার মুক্তিকামী মানুষের কর্মকান্ড ছিল অগ্রগামী। এই জেলার আনাচে কানাচে মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্মৃতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তিনি বলেন, যুদ্ধে আমরা অগ্রগামী হলেও আমাদের জেলার মুক্তিযোদ্ধার ইতিহাস প্রচারের ক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এই জেলার যুদ্ধকালীন ইতিহাস তুলে ধরতে তেমন কোন উদ্যোগ আজো গ্রহন করা হয়নি। যে যার মত পেরেছে বই প্রকাশ করেছে। আর করেছে কিছু লেখালেখি। যেকারনে অনেক ইতিহাস সঠিকভাবে উঠে আসেনি। তিনি আরো বলেন, ৭১’র মার্চ মাসের প্রথম দিকেই সারা দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। ২মার্চ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মানচিত্রখন্ডিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। মন্টু আরো আরো বলেন কুষ্টিয়ায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। আসলে প্রকৃত সত্য তথ্য হলো ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসেই আমরা কুষ্টিয়ায় ইসলামীয়া কলেজ মাঠে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি। তিনি আরো বলেন সকলের জানা প্রয়োজন তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগ দু’ভাগে বিভক্ত ছিল। কেন্দ্র অনুমোদিত কমিটির সভাপতি ছিলেন আব্দুল জলিল (বর্তমান আইন পেশায় নিয়োজিত), আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আব্দুল হাদী(স্বাধীনতা পরবর্তি রক্ষিবাহিনীর হাতে নিহত হন) এবং সাধারণ ছাত্রদের সমর্থিত জেলা ছাত্রলীগের আরো একটি কমিটি ছিল, যার সভাপতি ছিলেন মনোয়ার হোসেন(পরবর্তিতে তিনি সরকারী কলেজের ভিপি ছিলেন), সাধারণ সম্পাদক ছিলেন চিত্রাভিনেতা রাজু আহমেদ’র ছোট ভাই ওবায়দুল হক সেলিম (বর্তমানে মৃত), আর আমি শফিউর রহমান মন্টু (পরবর্তিতে আমার পরিচয় ব্রিটিশ মন্টু) এই কমিটির প্রচার সম্পাদক ছিলাম। তিনি আরো বলেন তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন এমএনএ ব্যারিষ্টার এম আমীর-উল-ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক ও এমএনএ এ্যাড. আজিজুর রহমান আক্কাস, সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন এ্যাড. শামসুল আলম দুদু, শ্রম সম্পাদক ছিলেন আনোয়ার আলী (বর্তমান পৌর মেয়র)সহ বিভিন্ন থানা ও মহকুমার নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ ছাত্রদের মনোনীত, আমাদের এই কমিটিকে সমর্থন ও সহযোগিতা করতেন। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় অনুমোদিত জলিল হাদী কমিটিকে সমর্থন করতেন আব্দুর রউফ চৌধুরীসহ কিছু নেতা। ২৩ মার্চের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শফিউর রহমান মন্টু বলেন ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস বর্জন করে বাংলাদেশ দিবস ঘোষণার উদ্দেশ্যে ঐদিন বিকেল ৩টায় কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ ইসলামীয়া কলেজ মাঠে জনসভার আয়োজন করে। জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এ্যাড. আহসান উল্লাহ এমপি’র সভাপতিত্বে জনসভা শুরু হলে হাজার হাজার জনতার সমাগম ঘটে জনসভাস্থলে। পাকিস্তান বিরোধী শ্লোগান দিয়ে  নেতা-কর্মীরা সমবেত হতে থাকে। সেদিন কলেজের একাডেমিক ভবনের সীড়ির সামনেই উত্তর দিক মুখ করে মঞ্চ তৈরী করা হয়। দুপুরে আমাদের কমিটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক আমাকে ও ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আবু জাফর খানকে তাঁর কোর্টপাড়ার বাসায় ডেকে পাঠান। আমরা উপস্থিত হলে তিনি আমাদেরকে জানান, ঢাকা থেকে শহীদ ভাই স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা পাঠিয়েছেন। পতাকাটিবের করে আমাদের দেখান এবং বলেন এটা আজকের জনসভায় উত্তোলন করতে হবে। তাঁর নিকট থেকে পতাকাটি নিয়ে আমি পকেটের মধ্যে ভরে চলে আসি। এর পর আমরা পতাকাটি উত্তোলনের প্রস্তুতি নিতে থাকি। তবে প্রচন্ড ভয় কাজ করছিল। ৩টায় জনসভা শুরু হলে তৎকালীন ছাত্রলীগ ে জুলফিকার আলী আরজু ও জাফর খান বারবার তাগাদা দিতে থাকে। তারা আমাকে বলে, যা হয় হবে পতাকা উড়িয়ে দে। পাকিস্তান দিবসকে লাথি মেরে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার মঞ্চে তখন গরম বক্তব্য চলছিল। আমি আগেই বক্তব্য দিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে এসেছি। কলেজের পূর্ব দিকের একটি ভবনের রিপিয়ারিং কাজ চলছিল। সেখানে পড়ে থাকা একটি লম্বা বাঁশ নিয়ে আনুমানিক বিকেল ৪টার দিকে মঞ্চের পিছনের দিকে তার সাথে পতাকাটি বাধলাম। হাফিজ বুক ডিপোর মালিক হাফিজ আবুল কালাম আজাদ তখন একটি মিছিল নিয়ে নিজের বন্দুক দিয়ে ফায়ার করতে করতে সভাস্থলে আসে। এরপরই আমি পতাকা বাঁধা বাঁশ নিয়ে জয়বাংলা শ্লোগান দিতে দিতে মঞ্চের সামনে আসি। তখন উপস্থিত জনতা জয়বাংলা শ্লোগান দিয়ে মুখরিত করে তোলে জনসভাস্থল। নেতারা সবাই ছুটে এসে পতাকা লাগানো বাঁশে হাত লাগিয়ে শ্লোগান দিতে থাকে। সেসময় বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আলোকচিত্রী আব্দুল হামিদ রায়হান ভাই ছুটে এসে বলেন ঠিকমত ধর আমি ছবি তুলব। রায়হান ভায়ের সেই তোলা ছবিটিই ২৩ মার্চের পতাকা উত্তোলনের সাক্ষি হয়ে আছে। এর পর আমি মঞ্চের সামনে পতাকা বাঁধা বাঁশটি পুতে দিই। আমার স্পষ্ট মনে আছে সে সময় দুদু ভাই বক্তব্য রাখছিলেন। তিনি বললেন আজ থেকেই এই পতাকাই বাংলাদেশের পতাকা। জীবনের ক্রান্তিলগ্নে মুক্তিযুদ্ধের এইঅগ্রনায়ক মনে করেন আর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি নয়, সঠিক ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানাতে হবে।

আরো খবর...