‘মানবিক বিশ্ব’ ও ‘বিশ্বমানবের ঐক্য’ গড়তে হবে

জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মৃত্যু একেবারে আকস্মিক না হলেও তা ছিল গভীর শোকাবহ। যখন তার মৃত্যু সংবাদ জানা  গেল তখন অথবা তার আগে, কেউ জানতেন না যে তিনি ‘করোনা ভাইরাসে’ আক্রান্ত ছিলেন। তার মৃত্যুর পর, মৃতদেহ পরীক্ষা করে  সে কথা জানা গেছে। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান গত ১৮ দিন ধরে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ছিলেন। তার দেহে করোনা সংক্রমণ কি হাসপাতালে আসার পর ঘটেছিল, নাকি তিনি ভাইরাস সঙ্গে নিয়েই হাসপাতালে এসেছিলেন, সেটি এখনো একটি গুরুতর রহস্য ও জানার বিষয় হয়ে রয়েছে। এ দেশের জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে ‘করোনা’ ছাড়  দেয়নি। বিশ্বের কোথাও কাউকে সে ছাড় দিচ্ছে না। রাজপুত্র, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, জনপ্রতিনিধি, বিলিয়নিয়ার-কোটিপতি, খেলোয়াড়-শিল্পী-অভিনেতা প্রমুখ থেকে শুরু করে শ্রমিক, মজুর, কৃষক, কেরানি, উকিল, ইঞ্জিনিয়ার, ‘দিন আনি দিন খাওয়া’ দরিদ্র মানুষ, পথের ভিখারিÑ কেউই আজ ‘করোনার’ সর্বগ্রাসী হামলার টার্গেটের বাইরে নয়। কেউ নিস্তার পাচ্ছে না। সবার ওপরেই করোনা তার ‘মৃত্যু-আতঙ্কের’ কালো ছায়া বিস্তার করে রেখেছে। এই কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং দিনগুলোতে আমাকে প্রধানত ঘরে আটকে থাকতে হয়েছে। রাত-দিন প্রায় ২৪ ঘণ্টা ‘করোনা’ পরিস্থিতির  খোঁজখবর নেওয়া, ‘ভিডিও কনফারেন্স’ করে দেশব্যাপী তৎপরতা সমন্বয় সাধন করা, লেখালেখি করা, জমে থাকা বইগুলোর পাতা উল্টানো ইত্যাদি হরেকরকম কাজে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। ‘করোনা’ নিয়ে ভাবতে ভাবতে দুদিন আগে অকস্মাৎ আমার স্কুলজীবনে পাঠ করা ‘ডেথ দি লেভেলার’ কবিতাটির কথা আমার ‘মরমে’ জেগে উঠেছিল। জেমস শার্লির লেখা ‘ডেথ দি লেভেলার’ ইংরেজি কবিতাটি আমাদের স্কুলের পাঠ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। কবি সেখানে বলেছেন, একদিন ‘মৃত্যু’ এসে আমির-ফকির, রাজা-প্রজা, সেনাপতি- সৈনিকÑ সবাইকেই ‘এক কাতারে’ নিয়ে এসে একই ধুলোয় একাকার করে দেয়। মানুষের বীরত্ব,  শৌর্য-বীর্য, মান-সম্মান-মহিমা, সবকিছুকেই ধূম্রছায়ার মতো ধূলিকণায় মিলিয়ে দেয়। এটিই নিয়তি। করোনার আচরণও আজ তেমনি। ‘ঘাতক করোনা’ ৫ মাস আগে ‘বিনা নোটিশে’ তার অভাবনীয় ভয়াবহতা নিয়ে হামলে পড়েছিল। এই হানাদার ঘাতক ভাইরাসটি আজ প্রায় একই সঙ্গে সব  দেশের সব মানুষের ওপর ‘মৃত্যুদূতের’ মতো আঘাত হেনেছে। এটি একটি বৈশ্বিক ‘প্যানডেমিক’ অর্থাৎ মহাদুর্যোগে রূপ নিয়েছে। করোনার কারণে মানুষ আজ মরণভয়ে ভীত, জীবন-জীবিকা নিয়ে আতঙ্কিত, ভবিষ্যৎ নিয়ে দিশেহারা, অরক্ষিত ও অসহায় হয়ে আছে। ‘করোনার’ হামলা একটি বৈশ্বিক ‘প্যানডেমিক’, অর্থাৎ বিশ্বের সর্বত্র ব্যাপ্ত একটি মহাদুর্যোগ। ‘মৃত্যু’ যেমন সমতা আনয়নকারী তেমনি, করোনার হামলা সব মানুষকে আজ একই ‘হানাদার ঘাতকের’ মুখোমুখিতে এনে ‘এক কাতারে’ দাঁড় করিয়েছে। সবারই আজ তাদের সাধারণ বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এ কথা বুঝতে সক্ষম হওয়ার কথা  যে, এরূপ এক ‘সমতা আনয়নকারী’ করোনা-মহাদুর্যোগের মুখে ‘পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে একা একা কেউ বাঁচতে পারবে না। বাঁচতে হলে সবাই মিলে একসঙ্গে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে।’ করোনা  থেকে বাঁচার জন্য দুনিয়ার সব মানুষকে ‘বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধ’, ‘মানবিকতা’, ‘সহমর্মিতা’, ‘সামাজিক দায়িত্ববোধ’ ইত্যাদি অবলম্বন করে একত্রিত হয়ে এই মহাবিপদ মোকাবিলা করতে হবে। করোনা প্রতিরোধের সমবেত প্রয়াসের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্বের সব দেশের সব মানুষকে আগামী দিনের এক নতুন ‘মানবিক বিশ্ব’ নির্মাণের পথরেখা রচনা করতে হবে। পথে কোনো  বৈরী শক্তির বাধা না থাকলে সেটিই হবে স্বাভাবিক। ‘করোনা-মহাপ্রলয়ের’ চ্যালেঞ্জিং অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে ‘সামষ্টিক স্বার্থ’ ও ‘যৌথতার গুরুত্ব’ সম্পর্কে মানুষের নব-উপলব্ধি যে ‘বিশ্বমানবের ঐক্যের’ ভিত্তিতে নতুন এক ‘মানবিক বিশ্ব’ প্রতিষ্ঠা সম্ভব করে তুলবেÑ সেটিই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু একশ্রেণির মানুষ ও একশ্রেণির রাষ্ট্র তা যাতে না হতে পারে সেজন্য মরিয়া। বর্তমানে বিশ্বে একচ্ছত্র প্রাধান্য বিস্তার করে থাকা বুর্জোয়া শাসক- শোষকের আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী চক্র, সেই পথে যাওয়ার ‘মানবিক’ প্রচেষ্টাকে তাদের প্রচন্ড শক্তি ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে রুদ্ধ করতে আজ তৎপর। ‘বিশ্বমানবের ঐক্যের’ দুনিয়া প্রতিষ্ঠা হলে তাদের শোষণ-লুণ্ঠন বরবাদ হয়ে যাবে। সে রকম একটি বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে এই সাম্রাজ্যবাদী লুটেরা শক্তির রয়েছে তীব্র ও  মৌলিক দ্বন্দ্ব। কারণ ‘বিশ্বমানবের ঐক্যের’ দুনিয়া প্রতিষ্ঠা পেলে মানুষে-মানুষে শ্রেণিবিভাজন আর থাকবে না। এবং তা না থাকলে  শ্রেণি-শোষণের বাস্তবতাও আর থাকবে না। এদের ‘বিভাজনমূলক’ চরিত্রের কারণে করোনার হামলা আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারছে। এ যুগে সারাবিশ্বে এবং একই সঙ্গে দেশে-দেশে, শ্রেণিতে- শ্রেণিতে ও জাতিতে-জাতিতে বিভিন্ন ধরনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত বিরাজ করছে।  সেসবের মধ্যে একটি হচ্ছে ‘করোনার’ সঙ্গে ‘সব মানুষের’ বর্তমান যুদ্ধের মতো দ্বন্দ্বের বিষয়গুলো। এ ধরনের দ্বন্দ্বগুলো হলো মানুষের ইচ্ছানিরপেক্ষ। সেগুলো হলো ‘মানব- বৈরী’ শক্তির সঙ্গে ‘মানবিক’ শক্তির মধ্যকার দ্বন্দ্ব। এ ধরনের দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য বিশ্বের সব মানুষই একই পক্ষের পক্ষাবলম্বী হয়ে, সবাই একসঙ্গে লড়বেÑ এ রকম হওয়াটিই হলো স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু তা হতে পারছে না। কারণ এই দ্বন্দ্বের সমান্তরালে সমাজে চলছে ‘মনুষ্যসৃষ্ট’ ভিন্ন ধরনের অন্য একটি দ্বন্দ্ব।  সেটি আজ সব মানুষকে এক হয়ে লড়ার পথকে অসম্ভব করে  রেখেছে। ‘মনুষ্যসৃষ্ট’ সেই দ্বন্দ্ব হলো সমাজে বিরাজমান শ্রেণি-দ্বন্দ্ব। বিশ্বপরিমন্ডলে শোষক ও শোষিত জাতির মধ্যে বিরাজমান অসম সম্পর্ক ও দ্বন্দ্ব। ‘মনুষ্যসৃষ্ট’ এ ধরনের বিরোধ-বিবাদগুলো হলো পরস্পরবিরোধী ‘বৈরী প্রতিপক্ষগুলোর’ মধ্যে দ্বন্দ্ব। যেমন কিনা গৃহস্থ ও ডাকাতের মধ্যকার পাল্টাপাল্টি দ্বন্দ্ব। এ ক্ষেত্রে দুপক্ষের স্বার্থ হলো মৌলিকভাবে পরস্পরবিরোধী। এখানে দুপক্ষের মধ্যে সমস্বার্থের কোনো মৌলিক উপাদান নেই। পরস্পরের মৌলিক স্বার্থ হলো বিরোধাত্মক। এ ধরনের দ্বন্দ্ব-সংঘাতগুলোর দৃষ্টান্ত হলোÑ কারখানার মালিকদের সঙ্গে শ্রমিকদের দ্বন্দ্ব, সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে সর্বস্তরের দেশবাসীর দ্বন্দ্ব,  শেয়ারবাজারের মাফিয়া চক্রের সঙ্গে সাধারণ খুদে বিনিয়োগকারীর দ্বন্দ্ব, খুনি-ধর্ষকদের বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিকদের দ্বন্দ্ব, সুন্দরবন ধ্বংস করার পাঁয়তারার বিরুদ্ধে সচেতন দেশবাসীর দ্বন্দ্ব ইত্যাদি। ‘মানবিক বিশ্ব’ নির্মাণ ও ‘বিশ্বমানবের ঐক্যের’ দুনিয়া প্রতিষ্ঠা একটি মহৎ লক্ষ্য। তা হলো ইতিহাসের নিয়তি। এটি কোনো অলীক স্বপ্ন বা কল্পস্বর্গসম ‘ইউটোপিয়া’ নয়। ইতিহাসের ধারা সম্পর্কে সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ পাঠ এবং সমাজের গতিধারার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, সে কথাই বলে দেয়। তবে সে রকম ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সহজ কাজ নয়। কারণ সমাজে ও বিশ্বে বিরাজমান ‘ শ্রেণিবিভাজন’ ও ‘শ্রেণি-শোষণের’ অবসান ঘটানো ছাড়া সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে না। নিছক তত্ত্বকথার মতো শোনালেও বর্তমান ‘করোনা’ পরিস্থিতিকালের ঘটনাবলির মধ্যে এসবই আমরা বাস্তবে দেখতে পাচ্ছি। যেখানে পরিস্থিতির চাহিদা হলো বিশ্বব্যাপী সহযোগিতাকে আরও নিবিড় করা, সেখানে আমেরিকার সরকার উল্টাপথে চলছে। আন্তর্জাতিক বৃহৎ পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করতে হলে তাদের এ ছাড়া তার অন্য কোনো উপায় নেই। করোনার হামলা যখন সর্বত্র বাড়ছে, তেমনি এক সাংঘাতিক বিপদের সময়ে আমেরিকা জাতিসংঘের ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার’ বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং সেই সংস্থাকে প্রতিশ্র“ত অনুদান  দেওয়া আকস্মিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। গণচীনের বিরুদ্ধে ‘প্রোপাগান্ডা যুদ্ধ’ আরও জোরদার করেছে এবং তার বিরুদ্ধে বৈরী তৎপরতা বৃদ্ধি করছে। ভেনিজুয়েলার সরকার উৎখাতের জন্য  সেদেশে সশস্ত্র ঘাতকদল পাঠিয়েছে। কিউবার ওপর অবরোধ আরও শক্ত করেছে এবং সে দেশটি থেকে অন্যান্য দেশে করোনা  মোকাবিলায় সহায়তাদানকারী ‘চিকিৎসক টিম’ পাঠানোর ক্ষেত্রে বিঘœ সৃষ্টি করছে। ইয়েমেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ও ইসরায়েলের আগ্রাসন-ষড়যন্ত্রে নতুন করে মদদ দেওয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়াতে উসকানি দিয়ে চলেছে। সাম্রাজ্যবাদ দুনিয়ার বিভাজন টিকিয়ে  রেখে সে তার লুণ্ঠন জোরদার করতে এখনো তৎপর রয়েছে। আমেরিকা চীন, কিউবা, ইরানসহ বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে তার বাণিজ্য যুদ্ধের হুঙ্কার বৃদ্ধি করেছে। তারই মদদে বহুজাতিক বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে বিশাল মুনাফা লুটে  নেওয়ার পাঁয়তারায় লিপ্ত রয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে ‘মানবিকতার’ চেয়ে ‘মুনাফার’ মূল্য বেশি। দেখা যাচ্ছে যে, ‘করোনা পানডেমিকের’ বৈশ্বিক মানবিক বিপর্যয়ের এই কঠিন সময়েও তার মুনাফার লালসা ও দানবীয় লুণ্ঠন চরিত্রের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি। আমাদের দেশেও আজ করোনার আক্রমণের ভয়াবহ বিপর্যয় চলছে। ‘মুনাফার’ লালসার উর্ধ্বে উঠে জাতির সব শক্তি-সামর্থ্য সমবেত করে সমষ্টিগতভাবে ‘বেঁচে থাকার’ মানবিক কর্তব্য পালনে এগিয়ে আসা আজ সবার কর্তব্য হওয়ার কথা। কিন্তু তা ঘটছে না।  দেশের লুটেরা শোষক-শ্রেণির কাছে ‘মানবিক’ কর্তব্য পালনের  চেয়ে ‘মুনাফা ও লুটপাটের’ মূল্য অনেক বেশি। তাদের কারণেই ‘মুনাফা ও লুটপাটের’ স্বার্থ আর দেশবাসীকে বাঁচানোর ‘মানবিক কর্তব্যের’ মধ্যে কুৎসিত দ্বন্দ্ব-বিরোধের চিত্র উলঙ্গভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। আমাদের দেশেও শোষণ-বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে। এটি ‘লুটেরা পুঁজিবাদী’ ব্যবস্থার স্বাভাবিক ফলাফল। ‘লুটেরা পুঁজিবাদের’  শোষণ প্রক্রিয়ায় দেশের সম্পদ পুনর্বণ্টিত হয়ে ক্রমাগতভাবে ‘যার কম আছে’ তার হাত থেকে ‘যার বেশি আছে’ তার পকেটে স্থানান্তরিত হয়ে থাকে। এই মহাদুর্যোগের কালে লুটেরা শোষকগোষ্ঠী পাঁয়তারা করছে যেন সেই ধনী-অভিমুখী সম্পদ-স্থানান্তর আরও  বেশি পরিমাণে হয়। সম্পদের পুনর্বণ্টনের গতিমুখ ও তার মাত্রা কী হবে তা প্রধানত সমাজের চলমান শ্রেণি-সংগ্রামের বাস্তবতার মাপকাঠি দ্বারা নির্ধারিত হয়। এটি নির্ণয়ের জন্য দেশের ১ শতাংশ লুটেরার সঙ্গে প্রতিনিয়ত শোষিত-বঞ্চিত ৯৯ শতাংশ মানুষের দ্বন্দ্ব চলছে। করোনার আঘাতে শ্রেণি-ধর্ম-বর্ণ-বিত্ত নির্বিশেষে সব মানুষের অস্তিত্বই যখন সমভাবে বিপদগ্রস্ত, সেই দুর্যোগকালেও লুটেরা শোষকরা  সেই শ্রেণি-দ্বন্দ্ব অব্যাহত রেখে তাদের মুনাফা ও লুটপাট বৃদ্ধি করার ধান্ধায় ব্যস্ত রয়েছে। বর্তমানে  দেশ ও জনগণের স্বার্থের ক্ষেত্রে মূল বিপদের মৌলিক উৎস হলো লুটপাটতন্ত্র, গণতন্ত্রহীনতা, সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ। এসব ‘গণদুশমনের’ প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কী, সেই বিবেচনা  থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শক্তিকে মোটা দাগে তিন ধারায় ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগে রয়েছে সেসব দল যারা দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থার কাঠামোকে বহাল রেখে চলতে চায়। এসব দলকে ডানপন্থি, রক্ষণশীল ইত্যাদি রূপে আখ্যায়িত করা হয়। এসব দল ও শক্তিই গত প্রায় ৫ দশক ধরে দেশ শাসন করছে। দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে  সেসব দল যারা প্রচলিত অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থা বদল করে তাকে আরও পেছন দিকে তথা মধ্যযুগীয় ধারার দিকে নিয়ে যেতে চায়। এসব দলকে প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধ ইত্যাদি বলে চিত্রায়িত করা হয়। তৃতীয় ভাগে রয়েছে সেসব দল যারা প্রচলিত অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে তাকে প্রগতিমুখী সম্মুখ দিকে নিয়ে যেতে চায়। এসব দল প্রগতিশীল, বামপন্থি ইত্যাদি বলে পরিচয় বহন করে। অন্যদিকে রাজনীতি এখন দুধরনের হয়ে গেছে। একটি হলো ‘নীতি-আদর্শকেন্দ্রিক’ ধারা। এই ধারাটিকে সুপরিকল্পিতভাবে  পেছনে ঠেলে দিয়ে সাময়িকভাবে দুর্বল করে রাখা হয়েছে। দেশের রাজনীতিতে এখন প্রাধান্য বিস্তার করে রয়েছে ‘গদি দখলকেন্দ্রিক’ ও ‘বাণিজ্যিক’ অপরাজনীতির শক্তি। লুটপাটের ‘বড় ভাগ’ পাওয়ার জন্য চাই ক্ষমতা, আর সেই ক্ষমতার জন্য নীতি-আদর্শ বিসর্জনসহ  যে কোনো পন্থা অবলম্বনÑ এটিই এখন আওয়ামী লীগ, বিএনপির প্রভৃতি তথাকথিত ‘মূলধারার’ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকৃত স্বরূপ হয়ে উঠেছে। এর ফলে দেশের সর্বনাশ ঘটে চলেছে। তারই প্রকাশ ঘটছে করোনা মোকাবিলায় সরকার ও রাষ্ট্রের দায়িত্বহীন, খামখেয়ালিপূর্ণ কার্যকলাপে। এ কারণে অন্য সব কাজের পাশাপাশি, দেশের রাজনীতির বর্তমান চরিত্র ও চেহারাকে বামপন্থা ও সৎ-আদর্শবাদী ধারার অনুকূলে রূপান্তরিত করা এখন একটি অপরিহার্য কর্তব্যে পরিণত হয়েছে। করোনা মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন ‘বিশ্বমানবের ঐক্যের’ চিন্তা ও ‘মানবিকতার’ উত্থান। ‘মানবিকতার’ আদর্শিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে  দেশপ্রেমিক-প্রগতিশীল-মানবদরদি মানুষকে ‘সবাই মিলে বাঁচার’ জন্য করোনাবিরোধী যুদ্ধে সমবেতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য একতাবদ্ধ করা, এ ক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য কাজ। কিন্তু এ ক্ষেত্রে একটি প্রধান বাধা হলো ‘লুটেরা শ্রেণির’ মুনাফার লালসা। তাই সমবেতভাবে বাঁচতে হলে এই বাধা অপসারণ করতে হবে। সেটি একটি ‘বিপ্লবী’ কাজ। তাই সাধারণ বুর্জোয়া অথবা সংস্কারবাদী ‘মানবিকতা’ নয়, আমাকে-আপনাকে আজ ‘বিপ্লবী মানবিকতায়’ চিন্তা ও আদর্শের ধারায় পরিচালিত হয়ে করোনা মোকাবিলার এই যুদ্ধে লড়তে হবে। লেখক ঃ সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি

আরো খবর...