মাদকের বিরুদ্ধে অন্য রকম সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন পুলিশ সুপার তানভীর আরাফাত

৪টি পদক্ষেপে বদলে গেছে মাদকের জেলা কুষ্টিয়ার চিত্র
অনেক মাদক ব্যবসায়ী এখন আলোর পথে

বিশেষ প্রতিনিধি \ সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলে যে কোন ভাল কাজ বা¯Íবায়ন করা যায় তার নজির স্থাপন করেছেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত। আগে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা মাদক নির্মূলের জন্য ঢাকঢোল পিটিয়ে মাঠে নামলেও কাজের কাজ কিছুই করতে পারেননি। ওইসব কর্মকর্তারা যখন ব্যর্থ সেখানে মাত্র দেড় বছরেরও কম সময়ে মাদক প্রবণ কুষ্টিয়া জেলাকে অনেকটা মাদকমুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন এ কর্মকর্তা। তার নেয়া কয়েকটি উদ্যোগের ফলে বদলে গেছে চিত্র। সুযোগ পেয়ে মাদক ব্যবসা ছেড়ে অনেকেই এখন সৎভাবে উপার্জন করছে অন্য পেশায়। শুধু মাদক ব্যবসায়ীদেরই নয় নিজের ঘরকেও পরিশুদ্ধ করতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর উদ্যোগ সাড়া ফেলেছেন জেলা জুড়ে।

মাদকের জেলা ও রুট হিসেবে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের নাম আসে প্রথমেই। দেশের যে কয়েকটি সীমান্তবর্তি জেলা রয়েছে তার অন্যতম কুষ্টিয়া। এখানে জেলার দৌলতপুর উপজেলার সাথে প্রায় ৪৫ কিলোমিটারের বেশি সীমানা রয়েছে পার্শবর্তি দেশ ভারতের। ৮০’র দশক থেকেই দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে মাদক, অস্ত্রসহ চোরাচালান বাড়তে থাকে। বিশেষ করে ফেনসিডিল আসতে থাকে বানের পানির মত। উপজেলার সীমান্তবর্তি তিনটি ইউনিয়নের বেশির ভাগ মানুষ জড়িয়ে পড়ে মাদক কারবারে। উপার্জনের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে মাদক। এ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রতিনিয়িত মাদকের চালান দেশে আসে। এখান থেকে সারা জেলাসহ সবখানে ছড়িয়ে পড়ে। একটা সময় দৌলতপুর থানায় বসেই এক সময় চোরাচালানের জন্য টোকেন দেয়া হতো। থানা পুলিশের আয় ছিল মাসে লাখ লাখ টাকা। এ থানায় ওসির পোষ্টিং পেতে লাখ লাখ টাকার ঘুষ দিয়ে আসতে হতো কয়েক বছর আগেও। তবে গত দেড় বছরে ভিন্ন চিত্র। এখন আর এ থানায় কেউ চাকুরি করতে চাই না। কারন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে মাদক কারবার।

গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয়দের দেয়া তথ্য মতে, এ চিত্র বদলে যেতে শুরু করে ২০১৮ সালের শেষ দিক এসে। ২০১৮ সালে এসএম তানভীর আরাফাত পুলিশ সুপার হিসেবে যোগ দেয়ার পর পরই জেলার মাদক নির্মুলের ওপর বিশেষ নজর দেন। আগে নিজের দপ্তর থেকে শুরু করেন শুদ্ধি অভিযান। দৌলতপুরসহ জেলার ৭টি থানার দুর্নীতিবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের পৃষ্টপোষকতা করেন এমন অফিসার  ও সদস্যদের গোপনে তালিকা করে তাদের একে একে সরিয়ে দেন। অনেকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়। এমনকি ওসিদেরও সরিয়ে দেয়া হয় বেশ কয়েকটি থানা থেকে। এরপর নামেন মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সাড়াশি অভিযানে। দৌলতপুর থেকে শুরু করে ইবি থানা পর্যন্ত মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রস্তুত করেন। এরপর গ্রেফতার হতে থাকে বড় বড় রাঘব বোয়ালরা। এর মধ্যে শীর্ষ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। এরপর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে  জেলার মাদক দুনিয়ায়। পালিয়ে অনেকেই ভারতে চলে যায়। অনেকেই পুলিশের মাধ্যমে আত্মসমর্পন করে।

দৌলতপুর থানা পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান,‘ বর্তমান পুলিশ সুপারের (তানভীর আরাফাত) নেয়া কয়েকটি পদক্ষেপের ফলে বদলে গেছে চিত্র।

প্রথমত পুলিশ সুপার প্রতিটি এলাকায় সব শ্রেণীর পেশার মানুষদের নিয়ে ধারাবাহিকভাবে মতবিনিময় সভা করেন। সেখানে মাদক কারবারীদের উদ্দেশ্য করে কঠোর হুশিয়ারি দেন। সময় বেঁধে দেন আত্মসমর্পনের। এরপরেই বদলে যেতে শুরু করে চিত্র।

দ্বিতীয়ত, পুলিশের অসৎ কর্মকর্তা যাদের সাথে মাদক কারবারিদের আঁতাত ছিল তাদেরকে চিহিৃত করার ওপর জোর দেন। যাতে অভিযান হলে মাদক ব্যবসায়ীরা খবর না পান। এমন অনেকের নাম আসে তালিকায়।

তৃতীয়ত, যেসব মাদক ব্যবসায়ী আলোর পথে আসতে চাই তাদের তালিকা করে কর্মসংস্থানসহ অন্যান্য কাজের সুযোগ করে দেয়া ছিল অন্যতম।

চতুর্থ, এছাড়া মাদক মামলায় দ্রুত চার্জশীট প্রদান করে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করার ওপর জোর দেন। যাতে ভয়ে মাদক ব্যবসায়ীরা আর ও পথে পা না বাড়ায়। গত এক বছরে মাদক মামলার রায়ে অনেকের যাবজ্জীবন দন্ড হয়েছে। গত এক বছরে দায়ের হওয়া প্রায় সব মামলার চার্জশীট দ্রুত সময়ের মধ্যে দেয়া হয়েছে আদালতে। শুরু হয়েছে এসব মামলার বিচার কাজ। এছাড়াও জনসাধারন ও শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে ধারাবাহিক প্রচার-প্রচারনা অব্যাহত রাখার ফলেই এমন ফল মিলেছে বলে মনে করেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

দৌলতপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এজাজ আহমেদ মামুন বলেন,‘ দৌলতপুর উপজেলার নাম আসতেই মাদকের বিষয়টি চলে আসে। বছর দুয়েক আগেও মাদকের বি¯Íার ছিল। তবে বর্তমান পুলিশ সুপারে সময় শতাধিক মাদক ব্যবসায়ী আত্মসমর্পন করে আলোর পথে ফিরে এসেছে। এরপর দৃশ্যপট বদলে গেছে অনেকখানি। পুলিশ ইচ্ছা করলে যে কোন ভাল কাজ করতে পারে তার নজির স্থ্াপন হয়েছে। এটা ধরে রাখতে হবে।’ দৌলতপুর থানার বর্তমান ওসি আরিফ আহমেদ। তার আগে গত এক বছরে দুইজন ওসিকে বদলি করা হয় এ থানা থেকে। তাদের বিরুদ্ধে ছিল নানা অভিযোগ। এরপর তরুণ অফিসার আরিফকে আনা হয় এ থাকায় মাদক নির্মূল করার জন্য।

গত এক বছরে পুলিশের হিসাব মতে জেলায় মাদক মামলা দায়ের হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪৭টি। এর মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে ১ হাজার ৩৭১জন। উদ্ধার করা হয়েছে ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজাসহ বিপুল সংখ্যক মাদক। এর মধ্যে ৮ শতাধিকের বেশি মামলার চার্জশীট দেয়া হয়েছে আদালতে। তবে গতবছর এক থানা হিসেবে দৌলতপুরে সব থেকে বেশি মাদক মামলা ও গ্রেফতার হয়েছিল আসামী। ৩১০টি মামলা হয় এ থানায়। গ্রেফতার করা হয় ৪০৭জনকে।

সর্বশেষ গত বছরের মাঝামাঝি পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাতের আহবানে সাড়া দিয়ে জেলার প্রায় ২ শতাধিক মাদক কারকারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পন করে শপথ পাঠ করেন। এর মধ্যে ২৫ নারী মাদক ব্যবসায়ী ছিল। মাদক নির্মুলে ভূমিকা রাখায় স¤প্রতি রেঞ্জে শ্রেষ্ঠ হয়েছে কুষ্টিয়া।

দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের পাকুড়িয়া গ্রামের সাজিদ মালিথা ও একই ইউনিয়নের ময়রামপুর গ্রামের রবিউল ইসলাম ছিলেন এলাকার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। এসপির আহবানে সাড়া দিয়ে তারা গত বছর আত্মসমর্পন করেন। এরপর সাজিদ কৃষি কাজ ও রবিউল মুদি দোকান পরিচালনা করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের মত অনেকেই এখন আলোর পথে এসেছেন।

রবিউল ও সাজিদ বলেন,‘ তারা দীর্ঘ সময় ধরে মাদকের কারবারে ছিলেন। এ কারনে সমাজের মানুষের কাছে ঘৃর্ণীত হয়ে থাকতে হয়েছে। তাই পুলিশ সুপারের আহবানে আমরা সাড়া দিয়ে শপথ নিয়ে এখন সৎভাবে উপার্জন করে সংসার চালাচ্ছি। আমরাও এখন মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছি। সমাজ থেকে মাদক নির্মুল না হলে আমাদের ছেলে-মেয়েরাও ধবংস হয়ে যাবে, এটা বুঝতে পেরেছি।’

প্রাগপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম বলেন,‘ মাদক আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। যারা ব্যবসা করতো তারাও এখন পেশা বদল করেছে পুলিশের আহবানে সাড়া দিয়ে। দু’একজন যারা পলাতক আছে তারাও ভাল রা¯Íায় আসার চেষ্টা করছে।’

সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম টুকু বলেন,‘ কুষ্টিয়া তথা এ অঞ্চলে মাদকের একটি রুট রয়েছে। সহজলভ্য হওয়ায় অনেকেই এ কারবারে জড়িয়ে পড়েছেন। আগে হাত বাড়ালেই পাড়ায় পাড়ায় ফেনসিডিল ও হেরোইন পাওয়া যেত। তবে সেই চিত্র এখন নেই বললেই চলে। এটা পুলিশের কঠোর পদক্ষেপ ও জনসচেতনতার ফলেই সম্ভব হয়েছে। তবে এখনো শতভাগ সাফল্য আসেনি। তাই কাজ এখনো অনেক বাকি।’

পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত বলেন,‘ জেলায় যোগ দেয়ার পর থেকে মাদকের বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ ঘোষনা করি। আমার নিজের ঘর থেকেই সেই অভিযান শুরু করেছিলাম। অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল, বাঁধা এসেছে। তবে কোন আপোষ করিনি। অভিযানের পাশাপাশি মাদক ব্যবসায়ীদের আলোর পথে আনার চেষ্টা করেছি। অনেকেই সেই আহবানে সাড়া দিয়ে ভাল পথে এসেছে। আবার মাদক মামলায় যাতে দ্রুত সাজা হয় সেই লক্ষ্যে চার্জশীট দিতে কাজ করেছি। সাধারন মানুষসহ সংবাদকর্মিদের ব্যাপক সহযোগিতা পেয়েছি বলেই অনেকটা সফল হতে পেরেছি। পুরোপুরি মাদক নির্মুল করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। যতদিন এ জেলায় থাকবো মাদক নির্মুলে কাজ করে যাব।’

আরো খবর...