মাছ চাষে করোনার প্রভাব কম নয়

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার রিপোর্ট ‘দ্য স্ট্যাট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড একোয়াকালচার-২০২০’ অনুযায়ী ফিশারিজ ও একোয়াকালচার পদ্ধতিতে মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান যথাক্রমে তৃতীয় ও পঞ্চম। ফিশারিজ হচ্ছে প্রাকৃতিক মুক্ত জলাশয়ে (নদী, নালা, খাল, বিল, হাওর, উপসাগর, সাগর) মাছের বিচরণ ক্ষেত্র, খাদ্যাভ্যাস, প্রজনন, ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে একটি টেকসই পন্থায় বছরের পর বছর মৎস্য আহরণ করা। যেমন- পদ্মায় ‘ইলিশ ফিশারিজ’ থেকে ইলিশের আহরণ। অন্যদিকে একোয়াকালচার বলতে বদ্ধ জলাশয়ে (পুকুর, ধানক্ষেত, ঘের) কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা কর্তৃক মাছের পোনা মজুদ, খাদ্য প্রয়োগ, রোগপরিচর্যা ও নির্দিষ্ট সময় পর মৎস্য আহরণ করাকে বোঝায়। যেমন ‘পাঙ্গাশ একোয়াকালচার’- পুকুর থেকে পাঙ্গাশ উৎপাদন। মৎস্য অধিদফতরের ২০১৭-১৮ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের  মোট মৎস্য উৎপাদন ছিল ৪২.৭৬ লাখ টন। মোট উৎপাদনের প্রায় ৫৬ শতাংশ আসে একোয়াকালচার থেকে, বাকি ২৯ ও ১৫ শতাংশ আসে যথাক্রমে অভ্যন্তরীণ স্বাদুপানি ও সামুদ্রিক ফিশারিজ থেকে। এ পরিসংখ্যান থেকে এটি সহজে প্রতীয়মান যে, বাংলাদেশে মাছের চাহিদার বড় অংশ পূরণ হয় একোয়াকালচার পদ্ধতিতে প্রাপ্ত মাছের মাধ্যমে। পরিবেশদূষণ ও নির্বিচারে মৎস্য আহরণ- এসব কারণে প্রাকৃতিক জলাশয় বা ফিশারিজ থেকে মাছের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং একইসঙ্গে বর্ধিত জনসংখ্যার মাছের বিশাল চাহিদা  মেটাতে একোয়াকালচারের ওপর নির্ভরশীলতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ১৯৭১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ফিশারিজে মাছের উৎপাদন বেড়েছে মাত্র দুই গুণ; অন্যদিকে একোয়াকালচারে বেড়েছে ৩৫ গুণ। একোয়াকালচার তথা মৎস্যচাষের ব্যাপক প্রসারের কারণে হ্যাচারির পোনা উৎপাদন থেকে শুরু করে খুচরা বাজারে মাছ বিক্রয় পর্যন্ত বিশাল লম্বা ভ্যালু-চেইনের সৃষ্টি হয়েছে। ভ্যালু- চেইনটি ব্যাকওয়ার্ড সেগমেন্ট, মধ্যবর্তী সেগমেন্ট বা মাছের খামার এবং ফরওয়ার্ড সেগমেন্ট এ তিন অংশে বিভক্ত। একোয়াকালচারের দীর্ঘ ভ্যালু-চেইনের বিভিন্ন অংশে ভিন্ন ভিন্ন ৩০-এরও বেশি ধরনের কর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যারা ব্যাকওয়ার্ড অংশে যুক্ত তারা হচ্ছেন হ্যাচারি মালিক বা পরিচালনাকারী, হ্যাচারি কর্মচারী, পোনা নার্সারি মালিক,  পোনা পরিবহনকারী, পোনা ব্যবসায়ী, খাদ্য ইন্ডাস্ট্রি, খাদ্য উপাদান আমদানিকারক, খাদ্য সরবরাহকারী, খাদ্য বিক্রেতা, ওষুধ কোম্পানি, ওষুধ সরবরাহকারী, ওষুধ বিক্রেতা, মাছের চিকিৎসক, যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী, যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী, যন্ত্রপাতি বিক্রেতা ও  মেরামতকারী। যারা মৎস্য খামারের বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত তারা হচ্ছেন খামারের মালিক, খামার পরিচালনাকারী, পুকুর খননকারী, খাদ্য সরবরাহকারী, মাছ আহরণকারী, ইত্যাদি। ফরওয়ার্ড অংশে যুক্ত অ্যাক্টরের ধরন ও সংখ্যা অনেক। যেমন- জাল সরবরাহকারী, নিকারি, মাছ পরিবহনের ড্রাম সরবরাহকারী, পানি সরবরাহকারী, বরফ উৎপাদন ও সরবরাহকারী, পরিবহন ট্রাক-ভ্যান সরবরাহকারী, আড়তদার, পাইকার, কয়েল, হেলপার, কুলি, সুইপার, খুচরা মাছ বিক্রেতা, মাছ কাটার লোক, ইত্যাদি। করোনার সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মৎস্যচাষীদের ওপর। ময়মনসিংহ অঞ্চলে মাঠ পর্যায়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে, এ বছর চাষীরা তাদের পুকুরের মাছের মাত্র ২০ শতাংশ বিক্রি করতে পেরেছেন। অথচ গত মার্চ-এপ্রিলের মধ্যেই তাদের সব মাছ বিক্রি হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। করোনার প্রভাবে বাজারে ক্রেতার অনুপস্থিতি ও মাছের চাহিদা কমে যাওয়ায় চাষীরা মাছ বিক্রি করতে পারছেন না। বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত মাছগুলোর মধ্যে রয়েছে পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া, দেশি-বিদেশি কার্প জাতীয় মাছ, শিং, মাগুর, কই ইত্যাদি। এসব মাছের মূল ক্রেতা হচ্ছেন রাজধানীর বিশাল জনগোষ্ঠী এবং দেশের অন্যান্য শহরাঞ্চলের মানুষ। করোনার প্রভাবে মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাওয়ায় মাছের নগরকেন্দ্রিক বাজারে চাহিদা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। শহরের খাবার  হোটেল ও রেস্তোরাঁ, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, স্কুল ও কলেজের হোস্টেল এবং কর্মজীবী মানুষের  মেস বা বাসস্থান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাছের চাহিদা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে চাষীরা খামারের কিছু মাছ অল্প দামে বিক্রি করে পুকুরে মজুদকৃত মাছের খাদ্যের চাহিদা  কোনোরকমে পূরণ করে যাচ্ছেন। আগামী শীতের পরে করোনাভাইরাসের প্রভাব থাকবে না, বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে, আগের মতো মাছ স্বাভাবিক দামে বিক্রি হবে- এ প্রত্যাশায় চাষীরা দিন গুনছেন। পুকুরে যেহেতু মাছের আকার বড় হবে, মাছের মোট পরিমাণ বাড়বে, শীতকালে পুকুরে পানির পরিমাণ কমে যাবে, পানির গুণাগুণ নষ্ট হবে, মাছ সহজে রোগে আক্রান্ত হবে; সেহেতু  বেশি পরিমাণে ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। ইতোমধ্যে চাষীরা আগের তুলনায় বেশি পরিমাণে ওষুধ ব্যবহার করছেন। ফলে খরচ আগের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। করোনার আগে এক বিঘা পুকুরে ওষুধের খরচ বছরে ৫ হাজার টাকা ছিল, সেটি এখন দাঁড়াবে ১০ হাজার টাকায়। পুকুরের পানিকে জীবাণুমুক্ত রাখা ও মাছের রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নিয়মিত পানি পরিবর্তন করতে হবে। পুকুরে পানি সেচের জন্য চাষীরা সাধারণত বৈদ্যুতিক পাম্প ব্যবহার করেন। সরকার মৎস্য খাতকে কৃষির উপখাত হিসেবে বিবেচনা করে; কিন্তু মৎস্য খামারের বিদ্যু বিল চাষীকে বাণিজ্যিক হারে পরিশোধ করতে হয়। কৃষি খাতে বিদ্যুৎ খরচ ইউনিট প্রতি ৪.৫ টাকা যা মৎস্য খামারে ১১ টাকা। ফলে একজন মৎস্যচাষীকে ধান চাষীর তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বিল পরিশোধ করতে হয়। বিদ্যুৎ বিলের বৈষম্য কমিয়ে এনে মৎস্য খামারে কৃষির মতো বিদ্যুৎ খরচ প্রতি ইউনিট ৪.৫ টাকা করে দিলে পানি সরবরাহ খরচ অনেক সাশ্রয় হবে। এ বিষয়ে সরকারের আশু দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। শীতকালে মাছে নানা রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটবে, সেজন্য মৎস্য অধিদফতর ও অন্যান্য সরকারি- বেসরকারি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে পুকুরের পানির গুণাগুণ পরীক্ষা, মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসার জন্য ট্রিটমেন্ট দেয়ার ক্ষেত্রে নিবিড় সেবা-কার্যক্রম চালু করতে হবে। মাছের বিক্রি কমে যাওয়ার কারণে ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড সেগমেন্টের অ্যাক্টরদের আয় কমে গেছে এবং অনেকের আয় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, হ্যাচারিতে  পোনার চাহিদা না থাকায় পোনা উৎপাদন ও আয় কমে গেছে বহুলাংশে। মাছচাষ এলাকায় একজন জেলে প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০০ টাকা আয় করতে পারত, করোনার প্রভাবে তা ১০০-২০০ টাকায় নেমে এসেছে তা-ও আগের মতো প্রতিদিন আয় হয় না। মাছচাষীদের টিকিয়ে রাখতে পারলে এসব অ্যাক্টরকে নিয়ে সৃষ্ট কর্মসংস্থানে ভরপুর একোয়াকালচার ভ্যালু-চেইন টিকে থাকবে অন্যথায় সামষ্টিক বেকারত্ব আরও বহুগুণে বেড়ে যাবে। মৎস্যচাষে মোট খরচের ৭০-৮০ শতাংশ হল খাদ্যের খরচ। নিজ থেকে এ বিশাল খরচ দীর্ঘদিন পরিচালনা করা চাষীর জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে মৎস্যচাষী, হ্যাচারি মালিক ও অন্যান্য অ্যাক্টরকে সহজশর্তে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। করোনার প্রভাব থেকে আমরা সহসা মুক্ত হব, এরকম আশা করা যাবে না। সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোক্তানির্ভর মৎস্য প্রক্রিয়াজাত কারখানা করে বিভিন্ন ধরনের মৎস্য প্রোডাক্ট যেমন ফিশ বল, ফিশ ফিঙ্গার, ফিশ পিকল ইত্যাদি তৈরি করে ইন্টারনেটভিত্তিক বাজার সৃষ্টি করতে হবে। করোনার প্রভাবে মাছের রফতানি বাজারেও ধস নেমেছে; তাই অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা করতে হবে। এশিয়ার মৎস্য উৎপাদনকারী দেশ যেমন- চীন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ চালু আছে, যে কারণে ওইসব দেশের বাজারে বিভিন্ন মৎস্য প্রোডাক্ট পাওয়া যায়। এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মৎস্য উৎপাদনে করোনার নেতিবাচক প্রভাব নিরসনে সংশি¬ষ্টদের প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখার এখনই গুরুত্বপূর্ণ সময়। লেখক ঃ প্রফেসর, একোয়াকালচার বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

 

আরো খবর...