মনের শক্তিতে জয় করুন করোনার ভয়

॥ আনার কলি ॥

একজন মনোবিদ হিসেবে এই সত্যি ঘটনাটি উপস্থাপন করছি এটা  বোঝাতে যে, আমরা নিজেরাও অনেক সময় জানি না যে আমাদের ভেতর অনেক প্রতিভা আছে, গুণ আছে। অনেক সময়ই আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং নানা নেতিবাচক চিন্তার কারণে নতুন কিছু শিখতে বা নতুন কিছুর উদ্যোগ নিতে আমরা সাহস পাই না। সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের প্রভাবে আমাদের জীবন অনেকটাই বিপর্যস্ত। আমরা নানা রকম শারীরিক ও মানসিক চাপের মুখে পড়েছি। কেউ কেউ অসুস্থও হয়ে যাচ্ছি। তাই করোনা মহামারীর এই কঠিন সময়ে নিজেদের শারীরিক, মানসিক স্বাস্থ্য কীভাবে ঠিক রাখা যায় তার কিছু দিক নির্দেশনা দিচ্ছি- ১. নতুন কিছু  শেখা: আমাদের দৈনন্দিন জীবনের চাপ ও কাজের বোঝার কারণে নতুন কিছু করা বা শেখা হয়ে সাধারণত ওঠে না। আগে হয়তো আপনি অনেক আফসোস করেছেন যে, ‘ইশ, যদি একটু সময় পেতাম তবে এটা করতাম, ওটা শিখতাম…।’ ঘরবন্দি থাকার সময়টাকে বিরক্তিকর না  ভেবে, একটা সুযোগ হিসেবেও ভাবতে পারেন। এই সময়ে নিজেকে আরো জানার চেষ্টা করুন। আপনার শখ বা পছন্দ অনুযায়ী নিজেকে বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ করে তুলতে পারেন। নতুন কিছুর অভিজ্ঞতা নিতে পারেন। প্রত্যেকটি মানুষ আলাদা এবং অনন্য। সবার আলাদা গুণ ও দক্ষতা থাকে। আপনি চাইলেই সীমার মতো নিজের সময়টাকে কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু শিখতে পারেন, বাড়িয়ে তুলতে পারেন নিজের দক্ষতা। ২. লাইফস্টাইল: এই দুঃসময়ে আপনি প্রতিনিয়ত চাপের সম্মুখীন হচ্ছেন, এই চাপকে নিয়ন্ত্রণ করতে আপনাকে কয়েকটি বিষয়ের ওপর মনোযোগ দিতে হবে, যেমন- ক. রুটিন- লকডাউনে অনেকে পুরোপুরি ঘরে বসে আছেন আবার অনেকে হয়তো ঘরে বসে অফিস এবং ঘরের কাজ দুটোই করছেন। এর ফলে ভীষণ চাপবোধ করছেন। এ  ক্ষেত্রে যদি ঠিক করে পরিকল্পনা করে নতুন রুটিন বানান, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছোট ছোট কাজ ভাগ করে দেন তাহলে হয়তো অনেকটা চাপ কমবে। চেষ্টা করবেন এই রুটিনেও বৈচিত্র্য আনার, যাতে একঘেয়েমি না আসে। নতুন কোন সিনেমা দেখতে পারেন পরিবারের সাথে। নতুন কোন খাবার রাঁধতে পারেন, লুডু, কার্ড, ক্যারম খেলতে পারেন অথবা অন্য কোন কাজ করতে পারেন যা সবাইকে আনন্দ দেবে।

খ. পর্যাপ্ত ঘুম- অন্তত ৭-৮ ঘন্টা ঘুমানোর চেষ্টা করবেন। ঘুমানোর আগে পছন্দ মতো বই পড়তে পারেন, শুনতে পারেন প্রিয় কোন গান।  মেডিটেশনও করতে পারেন। ঘুমানোর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে/ টিভি-পত্রিকায় করোনা মহামারী সংক্রান্ত খবর দেখা কিংবা  পোস্ট দেওয়া/পড়া থেকে বিরত  থাকবেন। অনেকবার খবর না দেখে নিয়ম করে,  সময় নির্দিষ্ট করে দিনে হাতে গোনা কয়েকবার করোনা সংক্রান্ত সার্বিক খবর দেখবেন/ পড়বেন। এতে কম চাপ বোধ করবেন। গ. খাদ্যাভ্যাস- প্রাতিদনের খাদ্যতালিকায় ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট (গাজর, পালংশাক, স্ট্রবেরি, ব্ল্যাকবেরি ), অন্য তাজা   মৌসুমি ফল, শাকসবজি রাখুন। বেশি বেশি পানি পান করুন, অতিরিক্ত  তেল,  চিনিযুক্ত খাবার পরিহার করুন। ঘ. ব্যায়াম-  বিভিন্ন গবেষণায়  দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ব্যায়াম করে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা  বেশি। তাই বাসায় বসে ২০/৩০ মিনিট ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তুলুন। বয়স্করা ঘরে হাটাহাটি বা হালকা ‘ফ্রি হ্যান্ড’ করতে পারেন নিজ নিজ সুবিধা অনুযায়ী। ঙ. প্রার্থনা- যার যার ধর্ম অনুযায়ী প্রার্থনা করুন। এতে দুশ্চিন্তা  কমবে এবং প্রান্তি বৃদ্ধি পাবে।চ. মেডিটেশন- অস্থির মনকে শান্ত রাখা এবং নিজেকে আরো বেশি সক্রিয় করার একটি বড় মাধ্যম হতে পারে মেডিটেশন। সকালে ঘুম  থেকে উঠে অথবা রাতে ঘুমানোর আগের সময় মেডিটেশনের জন্য উত্তম। আপনি খুব সহজেই ‘ব্রেদিং মেডিটেশন’ করতে পারেন। এটি আপনার ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়াবে। ৪-৭-৮ এই সংখ্যাগুলো মনে রাখুন। এবার আরামদায়ক কোথাও শুয়ে কিংবা  পহলান দিয়ে বসে পচাখ বন্ধ করুন। তারপর ১,২,৩,৪ গুনে গভীরভাবে নাক দিয়ে শ্বাস নিন। ৭ পসকেন্ড বা ৭ পর্যন্ত গুনে শ্বাস ধরে রাখুন। এরপর ৮ পর্যন্ত গুনে নিশ্বাস মুখ দিয়ে ছেড়ে দিন। এটাই ‘৪-৭-৮  পটকনিক’। এ সময় চেষ্টা করবেন পুরো মনোযোগ শ্বাস-প্রশ্বাসে দিতে। এই প্রক্রিয়া ৩-৪ মিনিট ধরে করবেন।  এ ছাড়া নিজ সুবিধা অনুযায়ী অন্যান্যে মেডিটেশন (গাইডেড মেডিটেশন, মাস্কুলার প্রগ্রেসিভ রিলাক্সেশন, ভিজ্যুয়ালাইজেশন, মাইন্ড ফুলনেস) করতে পারেন। নিয়মিত  মেডিটেশন করলে আপনার মনোযোগ বাড়বে, রাগ নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং দুশ্চিন্তা কম হবে। পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্যাভ্যাস, প্রার্থনা, মেডিটেশন, ব্যায়াম এই বিষয়গুলোর প্রতি নজর দেওয়া জরুরি, কারণ এগুলো আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে এবং মনকেও শান্ত  রেখে এর কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। ৩. বর্তমান নিয়ে থাকা: খেয়াল করলে দেখবেন আপনার বেশিরভাগ চিন্তা অতীতকেন্দ্রিক, কিংবা ভবিষ্যতে কী হবে এই আশংকা,  অনিশ্চয়তাকে কেন্দ্র করে। বিশেষ করে এই দুঃসময়ে সামনের দিনে কী হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা আসবেই, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভবিষ্যতে কী হবে সেটার চিন্তা বা ফেলে আসা অতীতের ভাবনা নিয়ে বর্তমানকে যেন আমরা নষ্ট না করি। অতীত থেকে শিক্ষা   নেবো, ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করবো এবং আজকের দিনের প্রতি  দেবো পূর্ণ মনোযোগ। দিনের প্রতিটি কাজ পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে করার অভ্যাস করুন, এতে কাজটি ভালো মতো সম্পন্ন হবে, আপনি ভালো  বোধ করবেন, অন্য কাজেও উৎসাহ বাড়বে এবং আগামীকালের দুশ্চিন্তা কমে আসবে। ৪. সম্পর্ক: এখন অনেকেই বাসায় বেশি থাকছেন। পরিবারের সবার সাথে আনন্দদায়ক সময় কাটানোর চেষ্টা করুন। সম্পর্কগুলো যেন মজবুত হয় সেদিকে নজর দিন। নিজেদের মধ্যে ভুল  বোঝাবুঝি ঠিক করা, একে অন্যকে আরও ভালোভাবে বোঝা যায় এমন কাজ করুন। একে অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। ঘরে বসে বন্ধু, আত্মীয় স্বজনদের খোঁজ নিন। ৫. অন্যান্য অভ্যাস: পর্যাপ্ত পানি পান করুন, ধূমপানসহ সব ধরনের তামাকের ব্যবহার বর্জন করুন। প্রাণ খুলে হাসুন, নিজের প্রিয় গান গাইতে পারেন, হোক তা বেসুরো। হাসি এবং গান আপনার ফুসফুসকেও ভালো রাখবে। ৬. ইতিবাচক মনোভাব: আশাবাদী, ইতিবাচক চিন্তা আমাদের শরীর ও মনকে প্রফুল্ল রাখে। তাই  চেষ্টা করবেন এই পরিস্থিতি মেনে নিয়ে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে। সবশেষে বলবো, আমরা যেন সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে সতর্ক থাকি আর বিশ্বাস রাখি সকলের সম্মিলিত চেষ্টায় এই মহামারী থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। লেখক: ক্লিনিক্যাল সাইকোলোজিস্ট, যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল  হেলথ সার্ভিসেস-এ কর্মরত

 

 

 

আরো খবর...