ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষ দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানিও সম্ভব

কৃষি প্রতিবেদক ॥ গাজীপুরে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা কম খরচে ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। বিজ্ঞানীরা জানান, বন্যাপ্রবণ ও জলাবদ্ধ পরিবেশে তথা পরিত্যক্ত জলাশয়ে সারা বছর ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষ করে দেশের পুষ্টি চাহিদা মেটায়ে বছরে প্রায় ১৩ মিলিয়ন টনের মতো অতিরিক্ত সবজি উৎপাদন করা সম্ভব, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় চারশ’ কোটি টাকার মতো। বারির ‘উদ্যানতাত্ত্বিক ফসলের গবেষণা জোরদারকরণ এবং চর এলাকায় উদ্যান ও মাঠ ফসলের প্রযুক্তি বিস্তার’ শীর্ষক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ আবু তাহের মাসুদ জানান, আমাদের দেশের প্রায় ১৬ কোটি মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয়, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও নানা জাতের সবজি থেকে। তবে তুলনামূলক কম খরচে সিংহভাগ পুষ্টির জোগান দেয়া সম্ভব হয় সবজি থেকে। দেশে বর্তমানে বছরে সবজির চাহিদা প্রায় ১১.২৪ মিলিয়ন টন। বর্তমানে উৎপাদন হয় প্রায় ৩.১৩ মিলিয়ন টন। বর্ষাকালে অতিবর্ষণে বা বন্যাজনিত কারণে যেসব এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় সেসব অঞ্চলের মাটিতে সবজি চাষ করা সম্ভব হয় না। এ সময় দেশে সবজির ঘাটতি দেখা দেয় এবং আমাদের চড়া মূল্যে সবজি কিনতে হয়। এ সমস্যা দূর করতে বারির মহাপরিচালকের পরামর্শে জলাশয়ে স্বল্প খরচে অধিক সবজি উৎপাদনের গবেষণা হাতে নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের(৩ পৃষ্ঠা ঃ ১ কলামে)
ভাসমান পদ্ধতিতে
(৪র্থ পৃঃ পর) প্রকল্প এলাকায় এর প্রয়োগ শুরু হয়েছে। বারির গাজীপুরস্থ উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের জলাশয়েও (খালে) এ পদ্ধতিতে সবজি চাষের ওপর গবেষণা চলছে। এ পদ্ধতিতে পানির উপরে বাঁশ-পিভিসি পাইপ, কচুরিপানা ও টোপা পানা দিয়ে ভাসমান বেড ও মাদা তৈরি করে তাতে বিশেষ পদ্ধতিতে সবজি চারা উৎপাদন ও রোপণ করা হয়। এতে পচনশীল কচুরি ও টোপা পানাই জৈব সারের যোগান দেয়, ফলে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার বা কীটনাশকেরও প্রয়োজন হয় না। কাজেই জৈব সার ব্যবহার হওয়ায় এই পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব সবজি পাওয়া যায়। এ পদ্ধতিতে সবজি চাষের খরচ সমভূমিতে চাষাবাদের চেয়ে প্রায় দুইগুণ কম। দেশের মধ্যম নিচু থেকে খুব নিচু জলাশয়/জমির পরিমাণ প্রায় ৩০ লাখ হেক্টর। যাতে প্রায় সারা বছরই পানি থাকে। সারা বছর পনির নিচে থাকে এসব জমিতে ভাসমান পদ্ধতি সবজি চাষ করা সম্ভব। বর্তমানে ০.৩৭৪মিলিয়ন হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হচ্ছে। জলাশয়ে ভাসমান পদ্ধতিতে ৩০ লাখ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ করা গেলে ২৪.৮৬ মিলিয়ন টন সবজি উৎপাদন করা যাবে। তাহলে আমাদের চাহিদার চেয়ে ১৩.৬২ মিলিয়ন টন বেশি উৎপাদন করা সম্ভব। ত্রিশ টাকা কেজি দরে যার মূল্য প্রায় ৪০০ কোটি টাকা হয়। এ পরিমাণ সবজি রপ্তানি করে দেশে বিরাট অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।বারির উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. তৌহিদুর রহমান জানান, বাঁশ/পিভিসি পাইপ ব্যবহার করে মইয়ের মতো অবকাঠামো তৈরি করে পানিতে রেখেই তাতে জাল ও জালের ওপর তিন ফুট উচ্চতায় কচুরিপানা ও টোপাপানা বিছিয়ে ২০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩ ফুট প্রস্থের বেড বানাতে হবে। এর এক সপ্তাহ পরে সবজির চারা রোপণ করতে হবে। চারা উৎপাদন ও রোপণ : প্রথমে সবজি বীজকে নারিকেলের আঁশের গুঁড়া কিংবা ভিজা বালিতে চারা গজিয়ে নিতে হবে। এরপর চারাটি টোপা পানা এবং দোদলী লতা দিয়ে তৈরি বিশেষ ধরনের বলের মধ্যে স্থাপন করে রোদ-আলো পায় এমন স্থানে ১০-১৫ দিন রাখতে হবে।
পরে বলসহ চারাটি মাদায় নির্দিষ্ট দূরত্বে রোপণ করতে হবে এবং কয়েকদিন সকাল ও বিকেলে পরিমিত পানি দিতে হবে। বারির উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা একেএম সেলিম রেজা মল্লিক বলেন, লতাজাতীয় উদ্ভিদ যেমন- লাউ, শসা, কুমড়া, মিষ্টি কুমড়ার জন্য ভাসমান বেডের দুইপাশে বিশেষ পদ্ধতিতে মাচা তৈরি করতে হবে। যাতে সবজিগাছ সহজেই বেড়ে মাচায় উঠতে পারে। তবে অন্যান্য সবজি যেমন- টমেটো, বেগুন, কাঁচামরিচ, ফুলকপি, বাঁধা কপি, লালশাক, ডাটা ইত্যাদির জন্য কোনো মাচার প্রয়োজন পড়ে না। লেখক ঃ আবুল হোসেন

আরো খবর...