বড় পুকুরিয়া থেকে কয়লা লোপাট হয়েছে সাড়ে ৫ লাখ টন – ক্যাব

ঢাকা অফিস ॥ এতদিন দেড় লাখ টনের কথা বলা হলেও বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি (বিসিএমসিএল) থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টন কয়লা লোপাট হয়েছে বলে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) গঠিত তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করে ক্যাবের ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অভিযোগ অনুসন্ধান ও গবেষণা কমিশন’র সভাপতি সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, তাদের তদন্তে কয়লা চুরি সংক্রান্ত ২৭টি অসংগতি উঠে এসেছে। “বাংলাদেশের দুর্নীতি ও জাতীয় সম্পদ নষ্ট করার বড় উদাহরণ বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি। এজন্য দোষীদের আমরা শাস্তি চাই। এই চুরির বিচার না করা আরেকটা অন্যায় হবে,” বলেন তিনি। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে কয়লা সরবরাহ না পাওয়ায় বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে কয়লা উধাওয়ের ঘটনাটি আলোচনায় আসে। সরকারের তরফ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত এবং দুজনকে বদলি করা হয়। এরপর এ ঘটনায় একটি মামলা হলে তা তদন্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।  এ মামলায় গত বছরের ২১ জুলাই প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন কয়লা চুরির অভিযোগে খনি কোম্পানির সাবেক সাত এমডিসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। ১৯৯৪ সালে বিসিএমসিএলে উৎপাদনের শুরু থেকে ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত সময়ে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়েছে জানিয়ে ক্যাবের তদন্ত কমিশনের সদস্য বদরুল ইমাম বলেন, বিসিএমসিএল চীনা কন্সোর্টিয়ামকে চুক্তি অনুসারে ৫ দশমিক ১ শতাংশ ‘ময়েশ্চার’ ধরে ওই সময় পর্যন্ত ১০১ দশমিক ৬৬ লাখ টন কয়লার বিল পরিশোধ করে। কিন্তু তদন্ত কমিশনের হিসাবে ময়েশ্চার ছিল ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। সেই হিসাবে কয়লার পরিমাণ হয় ১০৭ দশমিক ৩১ লাখ টন। বিসিএমসিএল কয়লা ব্যবহার ও বিক্রি করেছে ১০০ দশমিক ২২ লাখ টন। “সেই অনুযায়ী কয়লার ঘাটতি দেখানো হয়েছে এক দশমিক ৪৪ লাখ টন। আমাদের তদন্ত কমিশনের হিসাবে ঘাটতি রয়েছে ৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ, বা আত্মসাৎ করা হয়েছে। পেট্রোবাংলার প্রস্তাব মতে কয়লা সরবরাহে সিস্টেম লস গড়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ। সেই হিসাব ধরে নিলেও ৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ কয়লার ঘাটতি রয়েছে বা আত্মসাৎ করা হয়েছে।” তদন্ত কমিশনের আরেক সদস্য শামসুল আলম বলেন, “দুদকের অভিযোগপত্রে সাতজন এমডিসহ ২৩ জন কর্মকর্তা অভিযুক্ত। তবে আমাদের তদন্ত কমিশনের মতে কেবল ২৩ জনই নন, পরিচালনা বোর্ডের সদস্যবৃন্দ, বিসিএমসিএলের শেয়ার হোল্ডার এবং পেট্রোবাংলাসহ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলার কারণে কয়লা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।” জনস্বার্থে বিসিএমসিএলসহ সরকারি মালিকানাধীন সকল কোম্পানির পরিচালনা নীতি ও আইনী কাঠামোর সংস্কার জরুরি বলে মনে করেন তিনি। বিসিএমসিএলের কয়লা চুরির ঘটনায় ২৭টি অসংগতি পাওয়া গেছে বলে তদন্ত কমিশনের সদস্য সুশান্ত কুমার দাস জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “তদন্তে উঠে এসেছে পর্যাপ্ত কয়লা না থাকা সত্বেও এবং নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে খোলা বাজারে কয়লা বিক্রি অব্যাহত রাখা হয়। ফলে কয়লার অভাবে বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়।” এর আগে ৩০০ টন কয়লা আত্মসাতের অভিযোগ দুদকের তদন্তে প্রমাণিত হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলাটি প্রত্যাহার করা হয় বলে জানান তিনি। লিয়াঁজো অফিসের নামে ঢাকায় অতিরিক্ত জনবল ও গাড়ি ব্যবহার করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, কয়লায় ময়েশ্চার পরিমাপে কারচুপি, একাধিক কমিটি করা হলেও সিস্টেম লস নির্ধারণ পদ্ধতি তৈরি না করা, এখতিয়ারবিহীন সুপারিশের ভিত্তিতে ডিওর মাধ্যমে কয়লা খনি এলাকায় কালোবাজার সৃষ্টি করাসহ অন্যান্য অসংগতি পাওয়া যায় বলে জানান অধ্যাপক সুশান্ত। সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিশনের সদস্য এম এম আকাশ বলেন, “এখানে রক্ষক ভক্ষক হয়েছে, এটাই মূল বিষয়। একদম ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সবার দায়িত্ব ছিল এটি সঠিকভাবে দেখা, কিন্তু সেটা এখানে করা হয়নি।” সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, তদন্ত কমিশনের ৭৯ পৃষ্ঠার মূল প্রতিবেদন ক্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এরপর ক্যাব সেটি তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করবে। পাশাপাশি সরকারের কাছে তা উপস্থাপন করা হবে।

আরো খবর...