ব্যস্ত সূচির বছরেই লম্বা বিরতির ধাক্কা

ক্রীড়া প্রতিবেদক ॥ একের পর এক টেস্ট ম্যাচ, দেশের বাইরে তিন টেস্ট ম্যাচের সিরিজ, বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য রোমাঞ্চের ডালি সাজিয়ে অপেক্ষায় ছিল এ বছরের ক্রিকেট সূচি। কিন্তু করোনাভাইরাসের ছোবলে সব এলোমেলো। ঠাসা সূচির বছরেই এসেছে অনাকাক্সিক্ষত লম্বা বিরতি। ক্রিকেট মাঠের রোমাঞ্চের চেয়ে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপদে থাকা। তাতে ক্রিকেটারদের হতাশা যেমন আছে, তেমনি একদিক থেকে আপাতত আছে কিছুটা স্বস্তিও। ঝুঁকিতে যখন জীবন, বাস্তবতার আঙিনায় তখন ক্রিকেটের ঠাঁই নেই। তাই মঙ্গলবার ও বুধবার, পরপর দুই দিনে এলো বাংলাদেশের দুটি সিরিজ স্থগিত হওয়ার খবর। একটি দেশের মাটিতে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে, আরেকটি শ্রীলঙ্কা সফরে। দুই সিরিজে হওয়ার কথা ছিল ৫টি টেস্ট ম্যাচ। এই দুই সিরিজ পিছিয়ে যাওয়ায় সূচিতে বাংলাদেশের আর কোনো টেস্ট নেই এ বছর। টেস্ট ম্যাচ বেশি খেলতে না পারা নিয়ে বাংলাদেশের হাহাকার বরাবরের। অ্যালেস্টার কুক, কেভিন পিটারসেনরা ৮-১০ বছরে একশর বেশি টেস্ট খেলে ফেলেন, অথচ ১৫ বছর খেলেও মুশফিকুর রহিমের টেস্ট মোটে ৭০টি। এ নিয়ে আক্ষেপের কথা মুশফিক অনেকবারই বলেছেন। টেস্ট বেশি খেলতে না পারার হতাশা নানা সময়ে জানিয়েছেন বাংলাদেশের আরও অনেক ক্রিকেটার। সেই হতাশার ক্ষতে খানিকটা প্রলেপ পড়ার কথা ছিল এ বছর। প্রথমবারের মতো এক বছরে ১০ টেস্ট খেলার কথা ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু হতে যাচ্ছে উল্টো। কেবল জিম্বাবুয়ে ও পাকিস্তানের বিপক্ষে একটি করে টেস্ট খেলতে পেরেছে বাংলাদেশ। কোভিড-১৯ পরিস্থিতির অতি নাটকীয় উন্নতি না হলে এবং নতুন সূচি না হলে আর কোনো টেস্ট খেলার সম্ভাবনা নেই। সেক্ষেত্রে ২০২০ সালের সম্বল মোটে দুই টেস্ট। অভিষেক বছরের পর বাংলাদেশ এত কম টেস্ট খেলেছে কেবল ২০১২ ও ২০১৬ সালে। বাংলাদেশের ক্রিকেটাদের মধ্যে টেস্ট খেলার তাড়না যাদের বেশি, তাদের একজন মুশফিক। এ বছরের দুই টেস্টের একটি তিনি খেলতে পারেননি পাকিস্তান সফরে যাননি বলে। একটি টেস্ট খেলেছেন, সেটিতেই করেছেন অপরাজিত ডাবল সেঞ্চুরি। এ কারণেই তার হতাশাটা বেশি,  জানালেন এই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান। “ খারাপ লাগছে যে সবশেষ টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করলাম, ভালো ছন্দে ছিলাম। প্রস্তুতিও ছিল। আত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে এ বছর টেস্টগুলোয় ভালো খেলব। কিছুই হলো না।” “ তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর তো কারও হাত নেই। এই সময়গুলিই আমাদের চ্যালেঞ্জ, নিজেদের ঠিক রাখা ও প্রস্তুত থাকা। সামনে অনেক টেস্ট ম্যাচ নিশ্চয়ই পাব আমরা। আমি সবসময়ই বিশ্বাস করি, আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন। যখনই সুযোগ আসে, সেভাবেই প্রস্তুত থাকবে হবে যেন নিজেকে ও দলকে আরও ওপরে তুলে নিতে পারি।” বাংলাদেশের আরও বেশি টেস্ট ম্যাচ দাবি করে বরাবরই বেশ উচ্চকিত তামিম ইকবাল। এতগুলি টেস্ট না হওয়ার হতাশা তাকে স্পর্শ করেছে স্বাভাবিকভাবেই। তবে সময়ের থাবায় তার কণ্ঠেও ফুটে উঠল অসহায়ত্ব। “ এই হতাশা তো বলে বোঝানোর নয়। এক বছরে ১০টি টেস্ট খেলার সুযোগ আমাদের খুব বেশি হয় না। আবার কবে হবে, কে জানে। অবশ্যই খারাপ লাগছে। তবে সময়টাই এমন, আমি আসলে ক্রিকেট নিয়ে খুব বেশি ভাবার সুযোগই দেখছি না। নিজের ও পরিবারের নিরাপদে থাকাই এখন আসল। বেঁচে থাকলে ক্রিকেট খেলা যাবে অনেক।” “ একটা ইতিবাচক দিক হলো, কোনো সিরিজই বাতিল হয়নি। পিছিয়ে গেছে। তার মানে, আবার হওয়ার সুযোগ আছে। আমি আশা করব, কোভিড পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে নতুন সূচিতে খেলাগুলি আবার হবে। তখন দেখা যাবে, অনেক বেশি খেলা থাকবে আমাদের।” তামিম যেটি বললেন, সম্ভাব্য এই ছবির দিকে তাকিয়েই নিজেকে প্রবোধ দিচ্ছেন মুমিনুল হক। বাংলাদেশের সবশেষ টেস্টের অধিনায়ক তিনি, সূচিতে থাকা ম্যাচগুলি হলে তিনিই হয়তো নেতৃত্ব দিতেন। এছাড়াও, সীমিত ওভারে সুযোগ মেলে না বলে কেবল টেস্ট ক্রিকেটেই তিনি দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন। তার হতাশা বহুমাত্রিক। তবু তিনি চেষ্টা করছেন ইতিবাচক থাকার। “ খুব বেশি টেস্ট খেলার সুযোগ আমরা পাই না। এবার তাই বড় সুযোগ ছিল। আমরা যারা নিয়মিত টেস্ট খেলি, তাদের জন্যও দারুণ সুযোগ ছিল। সেই হতাশা থাকবেই। তবে মহামারী চলছে এখন, কারও কিছুই করার নেই। জীবনের চেয়ে কিছুই বড় নয়। খেলা হচ্ছে না বলে হতাশায় ডুবে থাকার মানুষ আমি নই।” “ আমি বরং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জের জন্য নিজেকে তৈরি রাখা নিয়ে ভাবছি। যখন খেলা শুরু হবে, টানা খেলা থাকবে। একের পর এক ম্যাচ থাকবে। অনেক ধকল যাবে। তখন যেন শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকি, সেটির জন্য নিজেকে তৈরি রাখতে হবে। এই বিরতির সময়টা যত ভালোভাবে সম্ভব কাজে লাগাতে হবে, ইতিবাচক থাকতে হবে।” সিরিজগুলি পিছিয়ে গেলেও সবকটি বাংলাদেশ নতুন সূচিতে খেলার সুযোগ পাবে, সেই নিশ্চয়তা নেই। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের সিরিজ পিছিয়ে গেছে, তাদেরকে আবার বাংলাদেশে আনা যাবে কিনা, সেই শঙ্কা থাকছে। খেলা পিছিয়ে যাচ্ছে সব দলেরই। বড় দলগুলি এমনিতেই বাংলাদেশের সঙ্গে খেলতে খুব আগ্রহী নয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তারা নিজেদের মধ্যে ম্যাচগুলিই আগে খেলতে চাইবে। নতুন সূচিতে তাদের সঙ্গে সময় মেলানো বাংলাদেশের জন্য হবে চ্যালেঞ্জিং। সব বাস্তবতাই ফুটে উঠল বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরির কণ্ঠে। “ আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বর্তমান চক্র যদি বাড়ানো হয়, তাহলে হয়তো সূচি পুনর্বিন্যাস করা যাবে। চক্র না বাড়লে পুনর্বিন্যাস সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। আইসিসির সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে সবকিছু। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চালু হওয়ায় আমাদের ম্যাচ বেড়েছিল, এজন্যই আমরা সমর্থন দিয়েছিলাম। যদি এটার সময় বাড়ানো হয়, আমরাও সময় বের করে নেব।” আর্থিক দিক থেকে বাংলাদেশের খুব বেশি ক্ষতি হবে না, বিসিবি জানিয়েছিল আগেই। পিছিয়ে যাওয়া সিরিজগুলোর মধ্যে ঘরের মাঠে ছিল অস্ট্রেলিয়া ও নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ। বিসিবির প্রধান নির্বাহীর চোখে ক্ষতির জায়গাটি ক্রিকেটীয়। “ আগেই বলেছি যে টেস্ট ম্যাচ থেকে আর্থিক লাভ খুব বেশি হয় না। ক্ষতি তাই খুব বেশি নয়। তবে বড় দলগুলির সঙ্গে ম্যাচ খেলার সুযোগ ছিল, দুটি সিরিজ আয়োজনের সুযোগ ছিল, সেসব আপাতত আর হচ্ছে না।” সীমিত ওভারের ক্রিকেটে পাকিস্তান সফরে হওয়ার কথা ছিল ১টি ওয়ানডে, যুক্তরাজ্য সফরে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ছিল তিন ওয়ানডে, চার টি-টোয়েন্টি। স্থগিত হয়েছে সব। সেপ্টেম্বরে এশিয়া কাপ ও অক্টোবর-নভেম্বরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে পিছিয়ে যায়নি। তবে বিশ্বকাপে এক বছর পিছিয়ে যাওয়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। সেক্ষেত্রে এশিয়া কাপও অনিশ্চয়তায়। এ বছর তাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশকে আবার দেখা যায় কিনা, সংশয় সেটি নিয়েই। বিসিবি অবশ্য ক্রিকেটারদের শারীরিক ও মানসিক ফিটনেসের খোঁজ-খবর রাখছে নিয়মিতই। অনলাইনে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ক্রিকেটাররা নিজেদের মতো ফিটনেস নিয়ে কাজ করে চলেছেন। তাদের স্বাস্থ্যের অবস্থার নিয়মিত খবর রাখার জন্য একটি অ্যাপ চালু করতে যাচ্ছে বোর্ড। প্রতিদিন ৬০-৭০ জন ক্রিকেটারের স্বাস্থ্যের অবস্থা জানা যাবে এই অ্যাপ দিয়ে। পর্যায়ক্রমে আরও ক্রিকেটারকে যুক্ত করা হবে। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো, এভাবে আর কতদিন? সামনে কোনো সিরিজ বা সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য ছাড়া  এই একঘেয়ে ফিটনেস ট্রেনিং ও নিজের সঙ্গে লড়াই করে যাওয়াই এখন ক্রিকেটারদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আরো খবর...