বেহাত রেলওয়ের জমি

রেলওয়ের আড়াই হাজার কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ৩০ একর জমি দখলদারদের হাত থেকে উদ্ধার না হওয়ার সংবাদ অনভিপ্রেত। জানা গেছে, চট্টগ্রামের মতিঝর্ণা ও রাজধানীর ফুলবাড়িয়ায় গড়ে ওঠা স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশনা চেয়ে রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি দফতর থেকে শতাধিকবার রেলওয়ে বিভাগ ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হলেও কোনো চিঠির অনুকূলেই উচ্ছেদের ‘নির্দেশনা’ পাওয়া যায়নি। উলে¬খ্য, সারা দেশে রেলের জমি দখলমুক্ত করতে প্রতিবছর গড়ে কমপক্ষে দেড় হাজারবার অভিযান পরিচালনা করা হলেও আশ্চর্যজনক তথ্য হল, গত ৫০ বছরে ঢাকার ফুলবাড়িয়ায় চার একর এবং চট্টগ্রামের মতিঝর্ণায় ২৬ একর জমি উদ্ধারে রেলওয়ের তরফ থেকে কোনো অভিযান পরিচালিত হয়নি। এর পেছনে কী রহস্য কাজ করছে, তা উদ্ঘাটন করা জরুরি। উদ্বেগজনক হল, কেবল চট্টগ্রামের মতিঝর্ণা ও রাজধানীর ফুলবাড়িয়া এলাকা নয়; দেশজুড়েই রেলওয়ের জমি বেদখল হওয়ার অনন্য নজির সৃষ্টি হয়েছে। সারা দেশে রেলওয়ের মোট ৬১ হাজার ৬০৫ দশমিক ৮৪৯ একর জায়গা-জমি রয়েছে। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলে ২৪ হাজার ৪০১ দশমিক ৬২ একর এবং পশ্চিমাঞ্চলে ৩৭ হাজার ২০৪ দশমিক ২২৯ একর। এ সম্পত্তির মধ্যে উভয় অঞ্চল মিলে অন্তত তিন হাজার একর জমি দীর্ঘদিন ধরে বেদখল হয়ে আছে। জমির পাশাপাশি রেলওয়ের মালিকানাধীন প্রায় ৭ হাজার ২শ’ সরকারি কোয়ার্টারও অবৈধ দখলে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বেহাত হওয়া প্রায় তিন হাজার একর জমি উদ্ধারের ব্যাপারে কোনো মাথাব্যথা নেই কর্তৃপক্ষের। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় প্রভাবশালী মহল রেলওয়ের জমি দখল করে গড়ে তুলেছে দোকানপাট, বস্তি, কাঁচাবাজার এবং বহুতল ভবনসহ বিভিন্ন স্থায়ী অবকাঠামো। এমন কী রেলওয়ের জমিতে ফ্ল্যাট নির্মাণ করে তা বিক্রি পর্যন্ত করছে কিছু ডেভেলপার কোম্পানি। অবৈধ দখল ঠেকাতে ইতিপূর্বে সারা দেশের রেলপথে কাঁটাতারের বেড়া ও স্টেশন এলাকায় প্রাচীর নির্মাণ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। বাস্তবে প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা উপেক্ষিত হতে দেখা যাচ্ছে, যা মোটেই কাম্য নয়। দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষাপটে আলাদা মন্ত্রণালয় করা হলেও এতে রেলওয়ের বিশেষ কোনো লাভ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। সুলভ ও নিরাপদ বাহন হিসেবে মানুষ রেলভ্রমণে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। অথচ লাগামহীন চুরি ও দুর্নীতি ছাড়াও নানা ধরনের অব্যবস্থাপনার আবর্তে আকণ্ঠ নিমজ্জিত রেল বিভাগ এ বিষয়টি আমলেই নিচ্ছে না। বস্তুত তারা গণমানুষের পছন্দ ও চাহিদাকে কাজে লাগাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। অতীতে রেল নিয়ে নানা ধরনের পরিকল্পনা ও উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও আজ পর্যন্ত তার সুফল লক্ষ করা যায়নি; বরং প্রতিবছর রেলওয়েকে লোকসান গুনতে হচ্ছে অন্যূন ৮০০ কোটি টাকা। রেলওয়ের জমি অবৈধভাবে দখল, বিক্রি ও লিজ দেয়াসহ অন্যান্য অনিয়ম এবং চুরি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে লোকসান ও ক্ষতির বোঝা দিন দিন বাড়তেই থাকবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ ক্ষতি এড়াতে বেহাত হওয়া জমি উদ্ধার ও দুর্নীতি বন্ধের পাশাপাশি জনপ্রত্যাশা ও চাহিদা অনুযায়ী জরুরি ভিত্তিতে রেলের আধুনিকায়ন সম্পন্ন করে উন্নত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা হবে, এটাই প্রত্যাশা।

 

আরো খবর...