বিশ্বে আজ সর্বাজনীন হয়ে উঠেছে লালন সাঁইয়ের বাউল মতবাদ  

ফকির লালন শাহের স্মরণোৎসবের উদ্বোধনীতে প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ

আরিফ মেহমুদ ॥ সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এমপি বলেছেন, আমার প্রথম আসা এই বাউল আখড়াবাড়িতে। এসেই বুঝলাম এই মহাজ্ঞানী লালনের সৃষ্টির কৃর্তি আজ আর কুষ্টিয়ার কুমারখালির ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ীর মধ্যে আবদ্ধ নেই। লালন সাঁইয়ের সৃষ্টি বিশ্বে সর্বাজনীন হয়ে উঠেছে। মানব সেবার ব্রত নিয়ে অসংখ্য গান লিখে গেছেন। তাঁর এই অমর সৃষ্টি সঙ্গীত কোন ধর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এদিকে যেমন তাঁর সৃষ্টি ছড়িয়েছে বিশ্বে তেমনি তাঁকে নিয়ে হচ্ছে উন্নতর গবেষনা। লালন সাঁই জাত-ধর্মের সীমাবদ্ধতার বাইরে মানুষকে সবার উপর তুলে ধরেছেন। লালন সাঁইয়ের বাউল মতবাদ আজ বিশ্বে সর্বাজনীন হয়ে উঠেছে। বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের স্মরণোৎসবে আত্মসুধ্যির উদাসীর টানে দেশ-বিদেশের বাউল-ফকিরবৃন্দরা ছুটে আসে এই আখড়া বাড়ীতে। তাঁর আত্মতত্ব মানুষকে শান্তির পথ দেখায়, সুখের সন্ধ্যান দেয় জাগতিক মোহ থেকে রাখে মুক্ত।

গতকাল রবিবার রাতে ছেঁউড়িয়ার আখড়া বাড়ীতে লালন একাডেমির আয়োজনে ৩ দিনব্যাপী বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের স্মরণোৎসব (দোলপূর্ণিমা) অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনী দিনের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ সব কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, তাঁর কর্মসাধনা দেশের গন্ডি পেরিয়ে বহির্বিশে^ ছড়িয়ে পড়েছে। সাধুরা এই আখড়াবাড়ীতে এসে সত্য পথে চলার মন্ত্রে দিক্ষা নিয়ে নিজেদের আলোকিত করছেন। আজকের আধুনিক পৃথিবীতে যে সব লেখক গবেষক বাউল স¤্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের উপর বই লিখেছেন আমি তাদের প্রত্যেককে আহবান জানাবো তারা যেন নিজ দায়িত্বে কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়াতে লালন একাডেমির লাইব্রেরীতে এক কপি করে জমা দিয়ে যান। এতে করে দেশ-বিদেশের উৎসুক ভক্ত গবেষক ও আজকের প্রজন্ম লালন সাঁই সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানতে পারবে।

বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের অমরত্বের জন্যই কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়া এখন বিশ্ব মরমীর তীর্থ কেন্দ্রে পরিনত হয়েছে। খুব শীঘ্রই ছেউড়িয়ায় সংস্কৃতি বিশ^াবিদ্যালয় প্রতিষ্টা করতে এবং অতিথিদের জন্য আধুনিক মানের রেষ্ট হাউজ নির্মাণ, লালন একাডেমির সার্বিক উন্নয়নে যা যা প্রয়োজন সহ সাধুদের সাধনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষনা দেন তিনি। যেখানে লালনের গানের স্বরোলিপি সহ তাঁর আধ্যাতিকতা সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানা যাবে।  উদ্বোধনী দিনে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মোঃ আসলাম হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কুষ্টিয়া-৪ (খোকসা-কুমারখালী) আসনের এমপি ব্যারিষ্টার সেলিম আলতাফ জর্জ, কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান, কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী রবিউল ইসলাম, কুষ্টিয়া জজকোর্টের পিপি এ্যাড.অনুপ কুমার নন্দী, কুষ্টিয়া জজকোর্টের জিপি এ্যাড. আ. স. ম. আখতারুজ্জামান মাসুম, সাংবাদিক রাশেদুল ইসলাম প্রমুখ। অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে আলোচনা করেন ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্জ প্রফেসর ড. মোঃ শাহিনুর রহমান। লালন সাঁইজির ধ্যান-সাধনা, রচনা ও বাউলতত্ব নিয়ে আলোচক হিসেবে আলোচনা করেন লালন মাজারের খাদেম মোহাম্মদ আলী। শুভেচ্ছ বক্তব্য রাখেন কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ওবাইদুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের এনডিসি ও লালন একাডেমির এ্যাডহক কমিটির সদস্য সচিব মুহাম্মদ মুছাব্বেরুল ইসলাম।

আলোচনা শেষে অতিথিদের কুষ্টিয়া লালন একাডেমীর পক্ষ থেকে ফুলের তোড়া, আত্মসুদ্ধির প্রতীক একতারা ও নবনির্মিত একতারার ক্রেষ্ট উপহার দিয়ে বরণ করে নেন। প্রধান আলোচক ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্জ প্রফেসর ড.মোঃ শাহিনুর রহমান বলেন, বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ বাঙালী সংস্কৃতির এক মহান প্রতিনিধি। বাংলা সংস্কৃতির মূল ধারা লোকসংস্কৃতি। এই ধারাকে যারা পুষ্ট করেছে ফকির লালন তাদেরই একজন। সম্প্রদায় সম্প্রীতি ও ধর্মান্ধ মৌলবাদের বিরুদ্ধে তাঁর ফকিরীবাদ বাউলতত্ব মানুষের প্রধান দর্শন। বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ বাঙালী সংস্কৃতির এক মহান প্রতিনিধি। বাঙালী সংস্কৃতির মহান প্রতিনিধি লালন ফকির, গানে ও সাধনায় তার দর্শণে সেই মানবিক মূল্যবোধে সেই সামাজিক চেতনায় গভীর, লালন ফকির একই সঙ্গে মরমী এবং দ্রোহী, তার গানের ভেতর দিয়ে বাউল সাধনার নানা প্রসঙ্গ অনুসৃত হয়েছে। তার গানের ভেতর দিযে সমাজের অসঙ্গতি, কুপ্রথা সকল জাতপাতের ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।

দ্বিতীয় পর্বের সঙ্গীতানুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত লালন সঙ্গীত শিল্পী উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন লালন একাডেমীর সাবেক সদস্য বাউল আব্দুল কুদ্দুস। সঙ্গীত পরিবেশন করেন সমির বাউল, খুরশিদ আলম, সুফিয়া কাঙালিনী। গভীর রাত পর্যন্ত চলে এই সংগীত পরিবেশন। স্মরণোৎসব অনুষ্ঠানের সার্বিক উপস্থাপনা ও পরিচালনা করেন ফারহানা ইয়াসমিন ও কনক চৌধুরী।

আরো খবর...