বিশ্ববাসী পরিচিত হচ্ছে বায়োডিজেলের সঙ্গে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ আমাদের দেশে এখন আমদানি করা জ্বালানি বাবদ প্রতিদিন প্রায় ২৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। সাদা মান্দার গাছ চাষ করে উৎপাদিত বায়োডিজেল যদি দেশের চাহিদার ২৫ ভাগও মেটাতে সক্ষম হয় তবে বছরে ২৫ কোটি ডলার সাশ্রয় হবে। পৃথিবীর সঞ্চিত জ্বালানি একসময় অবশ্যই শেষ হয়ে যাবে। যানবাহনের ওপর এ যুগের মানুষ অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। ‘জ্বালানি ফুরিয়ে যাবে’-ভাবতেও ভয় লাগে। তাহলে কি পৃথিবী আর ঘুরবে না, থেমে থাকবে। তাহলে উপায় কী? উপায় বাতলে দিচ্ছে বরাবরের মতো প্রযুক্তিই। আমাদের চারপাশের প্রাকৃতিক উপাদানগুলোই হয়ে উঠতে যাচ্ছে আগামী দিনের জ্বালানির অফুরন্ত উৎস। সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া অনেক আগেই আমরা জেনেছি। এর সম্ভাবনা ও উন্নতির কাজের মধ্যে অনেক দূর এগিয়েছে। সম্প্রতি বিশ্ববাসী পরিচিত হচ্ছে বায়োডিজেলের সঙ্গে। এই বায়োডিজেলটি সংগ্রহ করা হয় গাছ থেকে এবং এজন্য সবচেয়ে উপযুক্ত গাছ হচ্ছে যাত্রোপা, গম, ভুট্টা, পাম, সাদা মান্দার। এগুলোর ফল ও ফুল থেকে সংগৃহীত তেলকেই বলা হচ্ছে বায়োডিজেল। বাংলাদেশের জন্য বায়োডিজেল উৎপাদন একটি সম্ভাবনার খাত হিসেব আত্মপ্রকাশ করতে পারে। সাদা মান্দার এ ক্ষেত্রে আলোর পথ দেখাচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, সাদা মান্দার গাছ থেকেই ডিজেল পাওয়া যাবে। একসময় সাদা মান্দারের তেল দিয়ে কুপি বাতি জ্বালাতো আদিবাসীরা। পরে বিদ্যুতের আগমনে এর ব্যবহার আর তেমন চোখে পড়ে না। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের প্রফেসর এবং প্রধান গবেষক ড. মো. দৌলত হোসেন ও সহযোগী গবেষক প্রভাষক পারভেজ ইসলাম দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে গবেষণার পর এ তথ্য জানিয়েছেন। জার্মানির বায়োডিজেল বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. কে বেকার এসেছিলেন বাংলাদেশে। তিনিই বায়োডিজেল তৈরির জন্য সম্ভাব্য সাদা মান্দারের সঠিক জাত শনাক্তকরণে সহায়তা করেন। তিন থেকে পাঁচ ফুট উঁচু সাদা মান্দার গাছ এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফুল ও ফল দেয়। গবেষকরা জানার, প্রতি হেক্টর জমি থেকে ১০-১২ টন সাদা মান্দার বীজ পাওয়া সম্ভব। এ থেকে ২৩-২৭ শতাংশ তেল পাওয়া যেতে পারে। প্রতি হেক্টর জমি থেকে প্রতি বছরে দুই-আড়াই হাজার লিটার বায়োডিজেল পাওয়া সম্ভব। বর্তমান সময়ে ডিজেলের দাম বাড়ায় এবং প্রাপ্তির উৎস ধীরে ধীরে কমতে থাকায়  সাদা মান্দার তেলের ব্যবহার ইন্ডিয়া, মাদাগাস্কার, থাইল্যান্ড, ব্রাজিলে বাড়ছে। জার্মানির হোহেনা হাইম বিশ্ববিদ্যালয়ে সাদা মান্দার তেলের (বায়োডিজেল) গুণাগুণ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বায়োডিজেলের মান ফসিল ডিজেলের চেয়ে উন্নত। এর ব্যবহারে ইঞ্জিনের ধোঁয়া কম হয় ও ইঞ্জিনের লাইফ বেড়ে যায়। একটি সাদা মান্দার গাছ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত বায়োডিজেল পাওয়া যেতে পারে। প্রফেসর দৌলত জানান, শুধু এক বিঘা জমিতে সাদা মান্দার চাষ করে এক বছরের কুপি বাতি বা হারিকেন জ্বালানোর তেলের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
সাদা মান্দার থেকে বায়োডিজেল ঃ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। ফলে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে। এর বিকল্প কি নেই? এ দেশেই বহু বছর আগে একটি অতি পরিচিত গাছের বীজ থেকে জ্বালানি তেল তৈরি হতো গাছটির নাম সাদা মান্দার। বৈজ্ঞানিক নাম যাত্রোপা কারকাস। এ দেশের আদিবাসী ও গ্রামের মানুষ সাদা মান্দারের বীজ থেকে তেল সংগ্রহ করে কুপি বাতি জ্বালাতো। কেরোসিন আর বিদ্যুতের আগমন সে বৃক্ষ-জ্বালানির কবর রচনা করেছে। এখন ২০০ কোটি ডলারের আমদানিকৃত জ্বালানির ব্যয় মেটাতে হিমশিম অবস্থায় আবারও বৃক্ষ-জ্বালানির খোঁজ পড়েছে। সাদা মান্দার বা যাত্রোকা গাছের পরিকল্পিত আবাদ ও এর বীজ থেকে বায়োডিজেল উৎপাদন ত্বরান্বিত করতে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাদা মান্দার গাছের ফলের বীজ থেকে বায়োডিজেল পাওয়া যায়। সাধারণত এ গাছ আট ফুটের মতো লম্বা হয়। এতে প্রচুর ফল হয়। গাছ লাগানোর নয় মাস পর থেকে ফুল ধরে। একটি গাছে বছরে প্রায় ২৫ কেজি ফল ধরে। এ গাছ ৩০-৪০ বছর বাঁচে। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়কালে সাদা মান্দার ফুল ও ফল দেয়।
ফলের প্রতিটি বীজের ওজন ০.৮ থেকে এক গ্রাম হয়ে থাকে। এক হেক্টর জমিতে প্রায় আড়াই হাজার গাছ লাগানো যায় যা থেকে ১০-১২ টন পর্যন্ত বীজ পাওয়া সম্ভব। এক টন বীজ থেকে ২৪৫ কেজি পর্যন্ত তেল পাওয়া যায়। এ তেল সংগ্রহ করাও তেমন কঠিন কিছু নয়। সরিষা ঘানি বা ধান ভাঙার কলে সামান্য রদবদল করে সাদা মান্দার বীজ থেকে তেল সংগ্রহ করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, শুধু এক বিঘা জমিতে সাদা মান্দার চাষ করে এক বছরের কুপিবাতি বা হ্যারিকেন জ্বালানোর তেলের চাহিদা পূরণ সম্ভব। মান্দার বীজে তেলের পরিমাণ ২৩-৩৭ শতাংশ। সে হিসেবে এক হেক্টর জমি থেকে পাওয়া ১০-১২ টন বীজ থেকে প্রতি বছরে দুই থেকে আড়াই হাজার লিটার বায়োডিজেল পাওয়া যেতে পারে। জার্মানির হোহেনা হাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারে সাদা মান্দার তেলের গুণাগুণ পরীক্ষা করে দেখা গেছে এই বায়োডিজেলের গুণাগুণ ফসিল ডিজেল (আমদানিকৃত জ্বালানি) থেকে উন্নতমানের এবং এর ব্যবহারে ইঞ্জিনের ধোঁয়া কম হয়, ইঞ্জিনের আয়ু বাড়ে। ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন শে এ গাছের ফল থেকে বায়োডিজেল উৎপাদন করা হচ্ছে। ভারতের ঝাড়খন্ডসহ বিভিন্ন রাজ্যের আবাদ অযোগ্য জমিতে বিদেশি কোম্পানিরা এ গাছ চাষ করছে। সেখানে এ গাছের ফল থেকে এক লিটার ডিজেল উৎপাদনের খরচ পড়ছে মাত্র ২১ রুপি। সাদা মান্দার বা যাত্রোপা গাছ সর্বত্রই জন্মে। দেশের পাহাড়ি এলাকা, চরাঞ্চল, রাস্তা ও রেললাইনের দুই পাশ, বরেন্দ্র অঞ্চল ও অন্যান্য এলাকার অনাবাদী পতিত জমিতে এ গাছ ব্যাপকভাবে লাগানো যেতে পারে। প্রথম দিকে উৎপাদন কম হলেও পঞ্চম বছর থেকে উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আমাদের দেশে এখন আমদানি করা জ্বালানি বাবদ প্রতিদিন প্রায় ২৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। সাদা মান্দার গাছ চাষ করে উৎপাদিত বায়োডিজেল যদি দেশের চাহিদার ২৫ ভাগও মেটাতে সক্ষম হয় তবে বছরে ২৫ কোটি ডলার সাশ্রয় হবে। অতএব জ্বালানি বহুমুখীকরণে অবহেলিত প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে পরিকল্পিত পদক্ষেপের বিকল্প নেই। সম্প্রতি বিশ্বের কয়েকটি দেশ ব্যাপকভাবে বায়োডিজেলের উৎপাদন শুরু করেছে। এর উৎপাদনের প্রায় পুরোটাই নেতৃত্ব দিচ্ছে ইউরোপিয়ান দেশগুলো। বিশেষভাবে জার্মানির নাম বলা যেতে পারে। ২০০৩ সালের মে মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সব ফসিল ডিজেল চালিত যানগুলোয় বায়োডিজেল ব্যবহারের ঘোষণা দিয়েছে। তারা বছরে তিন মিলিয়ন টন বায়োডিজেল উৎপাদন করছে। তাদের ধারাবাহিকতায় এখন অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ইন্ডিয়া, মালয়েশিয়া এবং আমেরিকা এই খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। আফ্রিকা ও এশিয়ার কয়েকটি দেশে ব্যাপক পরিমাণে বায়োডিজেল উৎপাদন করতে সক্ষম শুধু যাত্রোপা গাছের ওপর ভিত্তি করে। এই সম্ভাবনা নিরূপণ করে দশটি উন্নয়নশীল দেশে যাত্রোপা উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। দেশগুলো হচ্ছে বারকিনা ফাসো, চায়না, ঘানা, ইন্ডিয়া, লেসোথো, মাদাগাস্কার, মালাবি, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইজারল্যান্ড ও জাম্বিয়া। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় বায়োডিজেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ক্রমেই এটি বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হচ্ছে। দিন দিন বেড়ে চলেছে বায়োডিজেলের গুরুত্ব। বায়োডিজেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন। পৃথিবীতে উৎপাদিত মোট বায়োডিজেলের ৮৫ ভাগ ব্যবহৃত হয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন অধিভুক্ত দেশগুলোয়। সেখানে বায়োডিজেলের সহজপ্রাপ্যতা, ট্যাক্স কম, দাম কম হওয়ার কারণে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সাধারণ পেট্রোলিয়াম ডিজেলের চেয়ে বায়োডিজেলের দাম কম এবং এটি পরিবেশবান্ধব। তাই ইউরোপিয়নরা বায়োডিজেল ব্যবহারে অতিমাত্রায় আগ্রহী। ইউরোপের ভেজিটেবল ফেডারেশন ফিডিয়লের ভাষ্য মতে, ইইউর ধারণা অনুযায়ী এশিয়ার পাম অয়েল ২০ ভাগ বায়োডিজেল জোগান দিতে সক্ষম। মালয়েশিয়ান পাম অয়েল বোর্ড ঘোষণা দিয়েছে যে, যৌথ মালিকানার ভিত্তিতে তারা তিনটি বায়োডিজেল প্ল্যান্ট তৈরি করবে এবং এর প্রতিটি থেকে পাওয়া যাবে বছরে ৬০ হাজার টন যার পুরোটাই বিক্রি হবে ইউরোপে। বায়োডিজেল হিসেবে করচের তেল ব্যবহার ঃ দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকিতে রয়েছে অসংখ্য করচগাছ। দেশের জ্বালানি তেলের এ চরম সংকটকালে নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে করচগাছ। করচের তেল বায়োডিজেল হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব বলে জানা গেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এ তেল কেরোসিনের পরিবর্তে কুপি জ্বালানো, রান্না-বান্না, পাম্প মেশিন চালানো, পাওয়ার ট্রিলার ও ট্রাক্টর চালানো; বাস, ট্রাক ও জেনারেটর চালানো ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে। করচ ঘন ডাল-পালা সমৃদ্ধ একটি বৃক্ষ। দেখতে অনেকটা বটগাছের মতোই ঝোপালো। হাওর পারের মানুষ না জেনে অনেকে এটাকে বটগাছ বলেও মনে করে থাকেন। এর বৈজ্ঞানিক নাম পনগামিয়া পিন্নাটা, ইংরেজি নাম পনগাম। নানা দিক দিয়ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও মূলত অজ্ঞতাবশত আমাদের দেশে এ উদ্ভিদটির তেমন কদর নেই। উদ্ভিদের সাধারণ গুরুত্ব ছাড়াও এটির রয়েছে কিছু বিশেষ গুরুত্ব। করচ হাকালুকি হাওরের একটি ঐতিহ্যবাহী উদ্ভিদ। শুধু হাকালুকি হাওর নয় দেশের উত্তর-পূর্বাংশের সমগ্র হাওর অঞ্চলে এ প্রজাতিটির আধিক্য রয়েছে। জানা যায় হাওর এলাকার প্লাবনভূমি, খাল-বিল-নদীর পাশে এবং বসতবাড়ির আশপাশে প্রচুর পরিমাণে করচের গাছ ছিল। করচের তেল বায়োডিজেল হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। ভারতে এ তেল কেরোসিনের পরিবর্তে কুপি জ্বালানো, রান্না-বান্না, পাম্প মেশিন চালানো, পাওয়ার ট্রিলার ও ট্রাক্টর চালানো, বাস, ট্রাক ও জেনারেটর চালানো ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে। হিন্দু সনাতন ধর্মে পূজা-পার্বণে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালাতে করচের তেল ব্যবহৃত হয়।

আরো খবর...