বিল্লাল হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামী পাল্টা মামলার বাদী!

কুমারখালীর সান্দিয়ারায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুন

কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার সান্দিয়ারা গ্রামে দুই পক্ষের সংঘর্ষে বিল্লাল হোসেন নিহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধুম্রজাল সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিল্লাল হোসেন সান্দিয়ারা গ্রামের মৃত মোফাজ্জল হোসেনের ছেলে। তিনি গত ৭ জুলাই সকালে সান্দিয়ারা বাজারে প্রতিপক্ষ খোরশেদ আলম মামুন ও তার লোকজনের অস্ত্রের আঘাতে মারাত্মক আহত হন পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এ ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই হেলাল উদ্দিন স্বপন ৪১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরো ৩০/৪০ নামে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এদিকে এই ন্যাক্কারজনক হত্যাকান্ডকে ভিন্নখাতে প্রভাবিত করতে প্রতিপক্ষের লোকজন পাল্টা মামলা দায়েরসহ বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী অনেকেই জানিয়েছেন ডাসা মধ্যপাড়া গ্রামের শরিফুল ইসলামের ছেলে খোরশেদ আলম মামুনের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে বিল্লাল হোসেনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। প্রকাশ্যে দিবালোকে জনসমক্ষে এই হত্যাকান্ড সংঘটিত হলেও হত্যাকারী এবং তাদের সহযোগীরা পুরো ঘটনাকে উল্টো খাতে প্রবাহিত করতে হত্যাকান্ডের শিকার ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন এবং শুভাকাঙ্খীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করেছে। সান্দিয়ারা গ্রামের এসএম শাজাহান নামে এক ব্যক্তি জানান, খোরশেদ আলম মামুন, শরিফুল ইসলাম, সবুজ হসেন, তৈবুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বিল্লাল হোসেনসহ নিরীহ ব্যক্তিদের উপরে হামলা চালায়। হামলায় বিল্লাল হোসেন মারাত্মকভাবে আহত হন। তিনি বলেন এই হত্যাকান্ডের পিছনের কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ যে ব্যক্তি নিহত হয়েছে তার আত্মীয়-স্বজনের নামে উল্টো মামলা দিয়েছে প্রতিপক্ষরা। এখানে কার স্বার্থ রক্ষা হয়েছে সে বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি।

স্থানীয় আরো অনেকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে খোরশেদ আলম মামুন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম করে আসছেন। মামলার নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, গত ৭ জুলাই সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ঘটনায় ওই দিন রাত সাড়ে ১২টায় নিহতের ছোট ভাই হেলাল উদ্দিন স্বপন বাদী হয়ে কুমারখালি থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর ০৬/১৫২। এর ঠিক ১৫ মিনিট পর একই থানায় রাত ১২:৪৫ মিনিটে শরিফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি আরেকটি পাল্টা মামলা করেন। মামলা নম্বর ০৭/১৫৩। ১৫ মিনিটের ব্যবধানে দায়ের হওয়া দুটি মামলার নথিপত্র ঘাটতে গিয়ে এবং ঐদিন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলে লোমহর্ষক ঘটনা উঠে আসছে। নিহতের ছোট ভাই হেলাল উদ্দিন স্বপনের দায়ের করা মামলার এজাহারভুক্ত ২ নং আসামী শরিফুল ইসলাম থানায় গিয়ে কিভাবে মামলা দায়ের করলেন এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা চলছে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী অনেকে বলছেন নিহত বিল্লাল হোসেনের শরীরে কিসের আঘাতের চিহ্ন ছিল, কিসের আঘাত সে মৃত্যুবরণ করেছে এই বিষয়গুলা নিশ্চিত হওয়া এখন খুব জরুরী। এছাড়াও নিহতের পরিবারের অভিযোগ পোস্টমর্টেম রিপোর্ট যাতে কোনোভাবে প্রভাবিত না হয়, কারণ আমাদের মনে অনেক প্রশ্ন এবং সংশয় রয়ে গেছে। সবার আগে নিশ্চিত হতে হবে বিল্লাল হোসেনের মৃত্যু হল কিভাবে। পান্টি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং এলাকায় জনপ্রিয় মুখ সামিউর রহমান সুমন এর সাথে কথা বলে জানা গেছে, মূলত যে ব্যক্তি নিহত হয়েছে তিনি তার খুব কাছের একজন শুভাকাঙ্খী। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকা বিল্লাল হোসেন প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে তার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন। এই কারণে প্রতিপক্ষরা বিল্লালকে হত্যা করেছে। সুমন জানান, এরকম ন্যক্কারজনক একটি হত্যাকান্ডের পর প্রতিপক্ষরা আমাকেই এক নম্বর আসামি করে একটা মিথ্যা মামলা দায়ের করেছেন। শুধু তাই নয় এই চক্রান্তের সাথে আরও অনেকে জড়িত যাদের নাম এই মুহূর্তে আমি প্রকাশ করতে চাই না। আমার কাছে সকল তথ্য প্রমাণ রয়েছে। বিল্লালকে কিভাবে হত্যা করা হয়েছে, কারা হত্যা করেছে, কাদের সহযোগিতা এই হত্যাকান্ড ঘটেছে আমি সব কিছুর খোলস উন্মোচন করব।

বিষয়টি নিয়ে কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মজিবুর রহমান জানান, কুমারখালীর রাজাপুর এবং ডাসা গ্রামের লোকজনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে উত্তেজনা বিরাজ করে আসছিল। এর সূত্র ধরে গত ৬ জুলাই সকালে দুই গ্রামের লোকজন সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ঘটনাটি জানার পর এলাকায় গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলে উভয়পক্ষের লোকজন পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পুলিশ ফাঁকা রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষ চলাকালে বিল্লাল হোসেন নামে একজন মারাত্মক আহত হন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নিহতের ময়নাতদন্ত হয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন আসলে আমরা প্রকৃত ঘটনাটা জানতে পারবো।

নিহত বিল্লাল হোসেনের ভাই হেলাল উদ্দিন স্বপন বাদী হয়েছে মামলা করেছেন সেই মামলার এজাহারভুক্ত দুই নম্বর আসামি শরিফুল ইসলাম। নিহতের ভাই মামলা দায়ের করেছে রাত সাড়ে বারোটার সময় তার ১৫ মিনিট পর আসামি শরিফুল ইসলাম বাদী হয়ে আরও একটি মামলা দায়ের করেছেন আপনার থানায়। থানা পুলিশ এই বিষয়গুলো জানতো কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মজিবুর রহমান জানান, এই বিষয়গুলো তো মামলার নথিতেই উল্লেখ রয়েছে। কোন ব্যক্তি নিজে উপস্থিত না হয় অন্য কোন বাহকের মাধ্যমে তার অভিযোগ তিনি থানায় জমা দিতে পারেন। এখানে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে তিনি এটা স্বীকার করেন শরিফুল ইসলাম তার ভাগিনাকে না পাঠিয়ে যদি নিজে এসে থানায় অভিযোগ দিতেন অবশ্যই থানা পুলিশ তাকে আটক করতো। কারণ নিহতের ভাই বাদী হয়ে যে মামলাটি করেছিলেন সেই মামলার এজাহারভুক্ত দুই নম্বর আসামি শরিফুল ইসলাম। এলাকায় খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, বিল্লাল হত্যাকান্ডের পর এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

 

আরো খবর...