বিধি-নিষেধ শিথিল কতটা যৌক্তিক?

 ॥ ডা. এস এ মালেক  ॥ 

প্রাণঘাতী করোনা প্রতিরোধে সরকার যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল, প্রয়োজনের তাগিদে তা কিছুটা শিথিল করার উদ্যোগ  নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখীশিল্প গার্মেন্ট খাত যাতে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় না পড়ে সেই বিবেচনায় বেশকিছু গার্মেন্ট চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে যেসব শর্তে এ শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে তা শতভাগ নিয়ম মেনে চলা বেশ কঠিন। এ ক্ষেত্রে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনার সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই গেল। কারণ স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মানা শ্রমিকদের ইচ্ছা থাকলেও সম্ভব নয়। আর মালিকরা যে সবকিছু দায়িত্ব নিয়ে দেখবেন এটাও কতদূর নিয়ম মেনে করতে পারবেন। তা আগামীতেই জানা সম্ভব হবে। আমাদের দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান  যেভাবে গড়ে উঠেছে, তাতে আধুনিক, মানসম্মত ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে হাজার হাজার শ্রমিক যেখানে কাজ করেন স্বল্প পরিসরে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব নয়। অন্যান্য বিধিনিষেধ বিবেচনায় নিয়ে বলতে হয়, একটা গৃহে কয়েকজন সদস্য আবদ্ধ থেকে হয়তো নিয়মকানুন কঠোরভাবে মানা যায়। কিন্তু একটা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে তা মানা সম্ভব নয়। কেউ কেউ গার্মেন্ট খুলে দেওয়ার জন্য শ্রমিকদের জীবন বিপন্ন হওয়ার কথাও বলছেন। তবে একথাও ঠিক- কারখানা যদি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকে, তাহলে মালিকরা শ্রমিকদের বেতন দেবেন কোথা থেকে। দুই-এক মাস হয়তো কীভাবে ক্ষতি দিয়ে চালানো যাবে; এরপর কি হবে। এখন গার্মেন্ট  সেক্টরে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। শিল্প বন্ধ থাকলে এই ৪০ লাখ শ্রমিকের বেতন কোথা থেকে আসবে। এটা একটা রপ্তানিমুখী শিল্প। পৃথিবীর অনেক দেশের সঙ্গেই প্রতিযোগিতা করে এই শিল্পকে টিকে থাকতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজার হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এই শিল্পের। ফলে আমাদের আম, ছালা দুটোই  যেতে পারে। বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে- বিদেশিরা বাংলাদেশ থেকে  যে পোশাক ক্রয় করার কার্যাদেশ দিয়েছিল তা ৩ কোটি ডলার। এখন তাদের দেশে করোনার মহাদুর্যোগের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকায় তা স্থগিত করেছে। নতুন কোনো অর্ডার আসছে না। তাহলে বাংলাদেশ তার গার্মেন্টসামগ্রী রপ্তানি করবে কোথায়? ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও আমেরিকায় বাংলাদেশের তৈরি  পোশাকের একচেটিয়া বাজার রয়েছে। সেই আমেরিকার অবস্থাই এখন সংকটাপূর্ণ। ফ্রান্স, জার্মানি, ইটালি, স্পেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রভৃতি দেশে রপ্তানি কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। এটা এক চরম অবস্থা। এ অবস্থা চলতে পারে না। ইউরোপের কোন কোন দেশ করোনা প্রতিরোধের কঠোরতা শিথিল করে কিছু কিছু ব্যবসা-বাণিজ্য চালু করতে চাইছেন। আর এসব ব্যবসা-বাণিজ্য যদি আবার চালু হয় এবং বাংলাদেশ তার রপ্তানি বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তা হলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বড় খাতটি হাতছাড়া হয়ে যাবে। দুর্যোগের কথা যতই বলি না কেন, গার্মেন্টশিল্পে বিশ্বব্যাপী যে প্রতিযোগিতা চলছে বিশেষ করে চীন, ভারত, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বাংলাদেশ যে অবস্থানে আছে; তা যদি ধরে রাখা না যায় তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে আমরা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবো। নিশ্চয় এ শিল্প স্থবির হয়ে থাকবে না। যখনই অবস্থার উন্নতি হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের গতিশীল আসবে, তখনই প্রতিযোগিতার প্রশ্নটি বড় হয়ে দাঁড়াবে। তাই আমাদের গার্মেন্টশিল্প এমন কার্যকর অবস্থায় রাখতে হবে, আগের মতো সফল শক্তি নিয়ে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি। এমনিতেই এই শিল্প সম্প্রতি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। শিল্পের মালিকরা যখন এটা পুশিয়ে নেওয়ার সামর্থ্যবান হলেন, তখনই করোনার মহাবিপদ এসে উপস্থিত। তবে আশার বিষয়- গত কয়েকদিন আগে সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে টেলিফোনের মাধ্যমে জানিয়েছেন দেশটি তৈরি পোশাক কার্যাদেশ বাতিল না করে দেশ থেকে তৈরি পৈাশাক আমদানি অব্যাহত রাখবে। অবশ্যই খবরটি এই মুহূর্তে আশাব্যঞ্জক। এছাড়া ব্রিটিশ এমনটি বাংলাদেশ বংশোদ্ভূত রুশনারা হক সে দেশের অর্থমন্ত্রীর কাছে সুপারিশ করেছেন বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য দেশ থেকে পোশাক আমদানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখার। অবশ্যই এই খবরটিও আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক। অনেকেই বলছেন, পোশাকশিল্পের মালিকরা অমানবিক ও নিষ্ঠুর। শ্রমিকদের প্রতি তাদের কোনো মমত্ববোধ নেই। শ্রমিক মরলে তাদের কিছু যায় আসে না। শিল্পকে বাঁচিয়ে  রেখে মুনাফা ঠিক রাখাই তাদের লক্ষ্য। বিশেষ করে কিছু কিছু শ্রমিক নেতারা এ ধরনের উক্তি প্রায় করে থাকেন। কিন্তু বাস্তবতা তা নয়- এই শিল্প গড়ে ওঠাই আজ ৪০ লক্ষ্য মানুষের কর্মসংস্থান ঘটেছে। যার অধিকাংশই নারী। এ  ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে দেশের বেকারত্বের ভয়াবহতা দেখা দিত। এটা অবশ্যই ঠিক, করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী যে মহাদুর্যোগ সৃষ্টি করেছে; তাতে শুধু শিল্প কল-কারখানা নয়- বহুলোক একসঙ্গে জমায়েত হয়ে কোন কাজ করা সমূচিত নয়। তাতে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি অবশ্যই বাড়তে থাকবে। বিশ্বে এ পর্যন্ত ২১০টি দেশে ও অঞ্চলে যত লোক আক্রান্ত হয়েছে তা ৩৭ লাখের উপরে, আর মারা গেছে ২ লাখ ৬৫ হাজারের মতো মানুষ। ধনী-দরিদ্র কেউ বাদ পড়েননি। সমানভাবে প্রতিদিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত আক্রান্ত সাড়ে ১২ হাজার আর মৃত্যুবরণ করেছে ১৮৬ জন। দেড় মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তবে গতি প্রকৃতি একটু ধীরস্থির। ইটালি, স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, চীন, ইরানের মতো নয়। তবে রোগের বিস্তার এখন সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে তাই অবস্থাটা যে  কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা বলা যাচ্ছে না। এরূপ একটা দুর্যোগ  মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুত ছিল না। তাই প্রথম দিকে বেশ কিছুটা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা পরিলক্ষিত হয়েছে। অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সরকারও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। সীমিত ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তা করা হয়েছে। তাই এখানে-ওখানে ক্রটি-বিচ্যুতি দেখা যাচ্ছে। প্রায় ৫০ দিন অতিবাহিত হলো- সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের আর গৃহে আবদ্ধ থাকার মতো পরিস্থিতি নেই। যারা দিন এনে দিন খায়, তারা হয়তো ভাবছে যখন মরতে হবেই ঘরে বসে না খেয়ে থাকলেও  তো মৃত্যুবরণ করতে হবে। আর ৭ কোটি মানুষের ঘরে খাবার  পৌঁছে দেওয়ার মতো সামর্থ্য যে আমাদের নেই, তাই প্রকৃত বাস্তবতা। খাবার মজুত আছে। সরকার জনদরদি, একটা মানুষও যাতে না খেয়ে মারা যায়,  শেখ হাসিনার সরকার তা চান না। তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলা করার। কিন্তু ৭  কোটি মানুষের ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়া কোনো সহজসাধ্য কাজ নয়। অন্যদিকে এরকম একটা নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়ে জনগণও বিভ্রান্ত। লকডাউনের যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থা অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস আদালত, পরিবহন ও যোগাযোগ সব যদি বন্ধ থাকে, তাহলে অর্থনীতির যে অচল অবস্থা হবে- শুধু গার্মেন্টশিল্প নয়; সব ক্ষেত্রেই তা এক মহাভয়াবহ বিপর্যয় আসতে পারে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর অনেক দেশ যেখানে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা অস্বাভাবিক, তারাও চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছে, আস্তে আস্তে সবকিছু সচল করার। জীবনঘাতী ও ছোঁয়াচে এই রোগটি যদি সুদীর্ঘকাল এ সংক্রমণ অব্যাহত রাখে ও সে কারণে বিশ্ব কর্মতৎপরতা যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হতে হবে। এই ধারণা মাথায় রেখে রাষ্ট্রনায়করা, অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বিষয়টি নিয়ে বিকল্প চিন্তা-ভাবনা করছেন। উন্নত দেশগুলোয় লাখ লাখ মানুষ বেকার-ভাতার দাবি তুলেছে। কর্মহারানোর সম্ভাবনায় অগণিত মানুষ। বাংলাদেশ প্রায় ১০ বছর উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার ধরে রেখেছে। এবার তো ৮.২ ভাগে উন্নীত হয়েছিল। প্রচুর সম্ভাবনা ছিল এটা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার। এই দুর্যোগের কারণে প্রায় বাংলাদেশের বাৎসরিক বাজেটের এক-পঞ্চামাংশ প্রণোদনা হিসেবে দিতে হচ্ছে। এরূপ অবস্থায় জাতীয় অর্থনীতিকে সচল করার কৌশলের পথ ধরেই এগোতে হবে। উন্নয়নের যে অগ্রযাত্রার ধারাই শেখ হাসিনার সরকার জনগণকে  যেভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, তাতে হয়তো কিছু ভাটা পড়বে। তবে আইএমএফ প্রবৃদ্ধির গড়কে দুই-তিন শতাংশে নেমে আসার যে আশংখা ব্যক্ত করেছেন, অবস্থা এত খারাপ হবে বলে মনে হয় না। কৃষি আমাদের অর্থনীতির প্রাণ ও চালিকাশক্তি। সরকার কৃষি খাত সচল রাখতে ও কৃষির ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। আগামী বাজেটে এই খাতের বাজেট বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত  নেওয়া হয়েছে।

কৃষি খাতের আধুনিকায়ন ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ বৃদ্ধির মাধ্যমে উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা হবে। এতে জনগণের খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা মিটবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী করোনা মোকাবিলায় সঠিক নির্দেশনা প্রদান করেছেন এবং পরিস্থিতির সার্বক্ষণিক মূল্যায়ন করছেন। তিনিও লকডাউন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে  দেয়ার চিন্তা করছেন। এই লক্ষে মসজিদ ও শপিংমল খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশ্বের যেসব দেশ করোনার মহাবিপর্যয়ের মুখে আছে, তারাও সবকিছুই স্বাভাবিক করার চিন্তা-ভাবনা করছে। আমাদেরও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড স্বাভাবিক রাখার স্বার্থেই  যৌক্তিপর্যায়ে পরিস্থিতি শিথিল করা উচিত বলে আমি মনে করি। লেখক ঃ কলাম লেখক।

 

 

আরো খবর...