বাজেটে চিকিতসা খাতে গুরুত্ব দিন

 ॥ এম এ খালেক ॥

মানুষের পাঁচটি অত্যাবশ্যক মৌলিক চাহিদার অন্যতম হচ্ছে চিকিৎসা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা। রাষ্ট্র তার প্রত্যেক নাগরিকের জন্য চিকিৎসাসেবা প্রদানে অঙ্গীকারবদ্ধ। কোনোভাবেই রাষ্ট্র তার এ দায় অস্বীকার করতে পারে না। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে সাম্প্রতিক সময়ে অনেকটাই এগিয়ে গেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু নাগরিকদের উপযুক্ত চিকিৎসাসেবা প্রদানে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা চোখে পড়ার মতো। ইতোমধ্যে বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসা খাতের দুর্বলতা ফুটে উঠলেও তা নিরসনে তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অন্যান্য সেক্টরের উন্নয়নের ডামাডোলে চিকিৎসা খাতের দুর্বলতা অনেকটাই চোখের আড়ালে থেকে গেছে। দিন দিন এ খাত অবহেলার শিকার হয়ে এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস সংক্রমণ আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। করোনা সংক্রমিত রোগীদের চিকিৎসা প্রদানের ক্ষেত্রে দেশের হাসপাতালগুলো মোটেও প্রস্তুত ছিল না। চিকিৎসা একটি মানবিক সেবা খাত হলেও দেশে তা সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়া যায় না। যে ডাক্তার সরকারি হাসপাতালে চাকরি করেন, তিনি কর্মস্থলে রোগী দেখার ক্ষেত্রে তেমন একটা আগ্রহী নন। কিন্তু প্রাইভেট ক্লিনিকে উচ্চহারে ফি প্রদান করলে সেই ডাক্তারই যতœ নিয়ে রোগীর সেবা করে থাকেন। অধিকাংশ পেশায় সরকারি চাকরি করার পাশাপাশি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে কাজ করা যায় না। কিন্তু ডাক্তাররা সরকারি হাসপাতালে চাকরি করলেও তারা বেসরকারি ক্লিনিকে খন্ডকালীন চাকরি করে থাকেন। মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হল পূর্ণকালীন মূল  পেশার তুলনায় খন্ডকালীন পেশায় বেশি আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করা। অন্য যে কোনো পেশার তুলনায় চিকিৎসা পেশায় ডাক্তারদের সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে খন্ডকালীন চাকরি করতে  বেশি দেখা যায়। দীর্ঘদিন ধরে এটা প্রকাশ্যেই চলছে। কিন্তু কোনো প্রতিকার করা হচ্ছে না। প্রাইভেট ক্লিনিকে খন্ডকালীন চাকরি করার সময় তারা সরকারি হাসপাতালের পদবি ব্যবহার করতেও দ্বিধা করেন না। এখন সময় এসেছে স্বাস্থ্য খাতকে সময়োপযোগী করে ঢেলে সাজানোর। একজন ডাক্তার পাস করে বেরুনোর পর যদি বেসরকারি ক্লিনিকে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে চান তিনি তা করতেই পারেন। কিন্তু সরকারি হাসপাতালের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের পরও কেন প্রাইভেট ক্লিনিকে তারা খন্ডকালীন চাকরি করবেন? বিশ্বের অনেক দেশই তাদের নাগরিকদের বিনামূল্যে উন্নত মানের চিকিৎসা প্রদান করে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশের নাগরিকরা উন্নত মান  তো দূরে থাক, সরকারি হাসপাতালে ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন অনেকে। উন্নত দেশগুলো তাদের জাতীয় বাজেটের ৩০  থেকে ৩৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ দিয়ে থাকে। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দের পরিমাণ খুবই অপ্রতুল। ২০২০-২১ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) স্বাস্থ্য খাতের জন্য ১৩ হাজার ৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। ফলে  মোট এডিপি বরাদ্দ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাতের অবস্থান দাঁড়ায় ৭ম। অথচ এ মুহূর্তে স্বাস্থ্য খাত আরও অনেক বেশি অর্থ বরাদ্দ প্রাপ্তির দাবিদার। উন্নত দেশগুলোতে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় বরাদ্দের পরিমাণ অনেক বেশি। ফলে সাধারণ মানুষ সুলভ মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে থাকেন। কিন্তু আমাদের দেশের স্বাস্থ্য খাতের মোট ব্যয়ের ৭০ শতাংশই নাগরিকরা বহন করে থাকেন। স্বাস্থ্য খাতে যে ব্যয় বরাদ্দ দেয়া হয় তার একটি বড় অংশই অবকাঠামোগত নির্মাণ কাজ এবং অন্যান্য সামগ্রী ক্রয়ে ব্যয়িত হয়। ফলে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও গবেষণার কাজে অর্থ ব্যয় হয় সামান্যই। স্বাস্থ্য খাত অনেক দিন ধরেই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে আছে। বালিশ কান্ড, মশারি কান্ড এখানেই ঘটে। বর্তমানে দেশে স্পেশালাইজড ফিজিশিয়ানের ঘাটতি রয়েছে ৭২ শতাংশ। সাধারণ চিকিৎসকের ঘাটতি ৪০ শতাংশ এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্সের স্বল্পতা রয়েছে ২০ শতাংশ। পরিকল্পিভাবে উদ্যোগ নিলেই স্পেশালাইজড ফিজিশিয়ানের অভাব পূরণ করা যেতে পারে। বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবেই স্বাস্থ্য সংকটে ভুগছে। সরকারের একার পক্ষে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য ব্যক্তিপর্যায়ের উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। আমরা যদি ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে  দেখব,  দেশে অতীতে যেভাবে স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে  সেভাবে হাসপাতাল তৈরি হয়নি। হিন্দু জমিদাররা তাদের নিজেদের  ছেলেমেয়ের পড়াশোনা নিশ্চিত করার জন্য স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছে।  সেসব স্কুল-কলেজে স্থানীয়রাও পড়াশোনার সুযোগ পেত। এমনকি তারা পুকুর-দিঘি খনন করতেও কার্পণ্য করতেন না। কিন্তু হাসপাতাল নির্মাণ করতেন না। জটিল রোগে চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তারা বড় শহরে  যেতেন। ফলে স্থানীয়ভাবে তারা হাসপাতাল নির্মাণ করতে তেমন একটা উতসাহী হতেন না। মুসলমান জমিদার ও উচ্চবিত্তরা সাধারণত মাদ্রাসা-মসজিদ তৈরি করতেন। ফলে হাসপাতাল বা চিকিতসাকেন্দ্র নির্মাণের বিষয়টি উপেক্ষিতই থেকে যেত। বর্তমানে কোনো কোনো ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান জনস্বার্থে হাসপাতাল নির্মাণ করছে ঠিকই; কিন্তু  সেখানে চিকিতসা ব্যয় এত বেশি যে দরিদ্র রোগীদের পক্ষে সেখানে ভর্তি হওয়া এবং চিকিতসা গ্রহণের বিষয়টি চিন্তাও করা যায় না। শুধু তাই নয়, মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষও এসব হাসপাতালে চিকিতসা নিতে পারেন না। দেশের যেসব প্রতিষ্ঠান ব্যবসা-বাণিজ্য করছে তাদের অনেকেই সিএসআর খাতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে। কিন্তু এ ব্যয়িত অর্থের  বেশিরভাগই অন্য সেক্টরে গেলেও স্বাস্থ্য খাতে তেমন একটা আসে না। যেসব প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর সিএসআর খাতে অর্থ ব্যয় করে তাদের একটি অংশ চিকিৎসা খাতে ব্যয় করার জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা  যেতে পারে। এছাড়া স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বাজেট বরাদ্দের পরিমাণ বিপুলভাবে বাড়ানো যেতে পারে। প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত একটি করে ৫০ বেডের আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এসব হাসপাতালে দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেয়া যেতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের মহাসড়কে ধাবিত হচ্ছে। আগামীতে আমাদের আরও বেশি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। ভবিষ্যতের সুকঠিন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে একটি সুস্থ জাতি গঠন একান্ত আবশ্যক। কোনো জাতি যদি স্বাস্থ্যগতভাবে দুর্বল হয় তাহলে সেই জাতির পক্ষে  কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। কোনো জাতিকে উন্নত করতে হলে লাগসই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার  কোনো বিকল্প নেই। কারণ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষাই একটি জাতিকে অধিকতর উৎপাদনশীল করে গড়ে তুলতে পারে। এছাড়া শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হলেই স্বাস্থ্য খাতের প্রকৃত উন্নয়ন হবে না। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ঘটাতে হলে এ খাতে গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য আরও বেশি পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে বিদ্যমান দুর্নীতি ও অনিয়ম কঠোরভাবে দমন করতে হবে। দেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। তারা সুযোগ পেলে যে কোনো অসাধ্য সাধন করতে পারেন। তাদের গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়ে প্রতিভা বিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতের পাশাপাশি চিকিৎসা খাতের ওপর জোর দিতে হবে। উলে¬খযোগ্যসংখ্যক মানুষের বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের পেছনে প্রতি বছর প্রচুর অর্থ ব্যয় হচ্ছে। দেশে চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে বিদেশ গমন প্রবণতা অনেকটাই কমিয়ে আনা যেতে পারে। লেখক ঃ অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক।

 

 

আরো খবর...