বাংলাদেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণ এবং চিকিতসা ব্যয়

ক. বাংলাদেশে চিকিতসা অপচয়ের মূল কারণগুলো : বাংলাদেশে ব্যক্তি স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যয় হয়Ñ যা পৃথিবীতে সর্বোচ্চ। এত অধিক ব্যয়ের মূল কারণ বাংলাদেশে  কোনো উন্নতমানের বেসরকারি স্বাস্থ্যবীমা কিংবা সরকার নিয়ন্ত্রিত জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা না থাকা। রোগীরা চিকিৎসকদের কাছ থেকে ন্যূনতম ৫ মিনিট পরামর্শ সময় না পাওয়ায় রোগী ও তার আত্মীয়স্বজন চিকিৎসকের ওপর আস্থা হারান, এমনকি নামিদামি চিকিৎসকের ওপরও।  রোগীর উপসর্গগুলোর বর্ণনা শেষ করার আগেই চিকিৎসক রোগীকে একটি ব্যবস্থাপত্র ধরিয়ে দেন। কোন ওষুধ কোন উপসর্গ উপসমের জন্য দিয়েছেন; কখন সেবন করতে হবে; খাবার আগে, না পরেÑ তা চিকিৎসক বুঝিয়ে বলার আগেই পরবর্তী রোগী পরামর্শ কক্ষে প্রবেশ করেন। কোনটি কোন  রোগের ওষুধ এবং এসব ওষুধের সম্ভাব্য পাশর্^প্রতিক্রিয়া, মিথস্ক্রিয়া রোগীরা জানার সময় পান না। তারা চিকিৎসকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দামি ওষুধকে বেশি ভালো ওষুধ মনে করেন। রোগী ও চিকিৎসকÑ উভয়ে জানেন না, দামি ওষুধ  বেশি নকল এবং ভেজাল ও নিম্নমানের হয়। রোগী দামও  বেশি দিলেন আবার অকেজো খারাপ ওষুধও সেবন করলেন। চিকিৎসকরা বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা নিয়ে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন। সোজা কথায়, ঘুষ নিচ্ছেন। তারা আর্থিক বিবেচনায় নির্ধারিত কোম্পানির ওষুধ লেখা ও অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত  রোগ নির্ণয় পরীক্ষা করানোর জন্য ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরি  থেকে ৫০-৬০ শতাংশের বেশি কমিশন বাবদ পেয়ে থাকেন। চিকিৎসকের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রোগীরা নিবিড় পরিচর্যা  কেন্দ্রের (আইসিইউ বা সিসিইউ) সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরে  বেড়াচ্ছেন এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে, এমনকি নাম-গোত্রহীন ক্লিনিকে। অনেক হাসপাতাল বা ক্লিনিকে  ভেন্টিলেটর, সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা, ডিফিব্রিলেটর, কার্ডিয়াক মনিটর, ইসিজি ও ইকো এবং বিবিধ সিরিঞ্জ পাম্প থাকলেও আইসিইউ পরিচালনার জন্য সার্বক্ষণিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ নেই। অথচ হাসপাতালের বিছানার চাদর, মাস্ক, পেপার গাউন, তোয়ালে, জুতার কভার ও বালিশের কভার পরিবর্তন এবং সময়ে-অসময়ে বিভিন্ন চিকিৎসক রোগীকে পরিদর্শন করে রোগীর কাছ থেকে ফি আদায় করছেন। আইসিইউ/সিসিইউয়ে ভর্তি থাকা সময়ে  ভেন্টিলেটর, কার্ডিয়াক মনিটর, পালস অক্সিমিটার, সিরিঞ্জ পাম্প, ওষুধের ডোজ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র প্রভৃতি ব্যবহারের জন্য আলাদা চার্জ আদায় করা হয়। এটি অনৈতিক ও দুর্নীতির অংশ। দৈনিক কত লিটার অক্সিজেন ব্যবহার করা হয়েছে, এর হিসাব নেই। অথচ আইসিইউ থেকে বিদায়কালে ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা অক্সিজেন চার্জ বাবদ রোগী  থেকে আদায় করা হয়। দিনদুপুরে ডাকাতি। বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ একটিও আন্তর্জাতিক মেডিক্যাল জার্নাল কিনে না পড়ায় তাদের জ্ঞানের পরিধি সীমিত হয়ে যাচ্ছে। সহজে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের মিথ্যাচারে বিভ্রান্ত হচ্ছেন, আস্থাহীনতায় ভুগছেন। চিকিৎসকরা ওষুধের মূল্য জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেন না। খ. গ্রামে প্রথম স্বাস্থ্যবীমার প্রচলন : স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭৩ সালে গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র সাভার এলাকায় একই দরের কিস্তিতে (প্রিমিয়ামে) গণস্বাস্থ্যবীমা চালু করে। স্থানীয় প্রতিটি পরিবার প্রতিমাসে দুই টাকার কিস্তি দিত। পরে এককশ্রেণির স্বাস্থ্যবীমার পরিবর্তে ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার জনসাধারণের সঙ্গে একাধিক আলোচনা সভা করে সাভারসহ গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের সব কর্মএলাকায় সব জনসাধারণকে ৬টি সামাজিক শ্রেণিতে বিন্যাস করে সামাজিক  শ্রেণিভিত্তিক গণস্বাস্থ্যবীমা চালু করা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে পর্যালোচনা বা প্রচারে সরকারি আগ্রহÑ কোনোটিই নেই। গ. কোভিড-১৯ রোগের সংক্রমণ ও চিকিৎসা : চীনের সবচেয়ে বড় শিল্পাঞ্চল উহান প্রদেশে ২০১৯ সালের নভেম্ব^রে নভেল করোনা কোভিড-১৯ ভাইরাস আত্মপ্রকাশ করে এবং দ্রুত বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে কোভিড-১৯ প্রথম ধরা পড়ে গত ৮ মার্চ। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার ২৬ মার্চের সতর্কবাণীকে বাংলাদেশ সরকার গুরুত্ব দেয়নি। ফলে রোগটি বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। করোনা  রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে মাগুরার চিকিৎসক ডা. খলিলুর রহমান (০১৭১২৮১৯৪০৫, ০১৯৬০৪৬৩৭৩৫) তার অভিজ্ঞতার আলোকে তিন পর্যায়ে ভাগ করে করোনা রোগ ও এর চিকিৎসা সম্পর্কে একটি ছোট লেখা লিখেছিলেন। তা শিক্ষণীয় বলে কিছু অংশ পুনরায় উল্লেখ করছি। প্রথম পর্যায় ১-৩ দিন : শুরু হয় সাধারণ জ¦র গায়ে-মাথায় সামান্য ব্যথা ও শুষ্ক কাশি দিয়ে, যোগ হয় নাক দিয়ে হালকা পানি পড়া, হাঁচি-কাশি এবং তৃতীয় দিনে মৃদু শ^াসকষ্ট, চুলকানি ও হাঁচি-কাশি এলার্জির লক্ষণ। দ্বিতীয় পর্যায় ৪-৬ দিন : হঠাৎ জ¦র বেড়ে ১০২ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট ওঠে, শুকনা কাশির সঙ্গে শ্লেষ্মা যুক্ত হয়। সর্বত্র মৃদু ব্যথা, বিশেষত গলায়। শ^াসকষ্ট ক্রমান্বয়ে বেড়ে যায়, শ্লেষ্মাসহ হাঁচি-কাশি বৃদ্ধি এবং খাওয়ায় অরুচি ও অনিদ্রা যোগ হয়। নিউমোনিয়ার লক্ষণ প্রকাশমান এবং  রোগীর অস্বস্তি রোধের সঙ্গে ভীতিসঞ্চারও লক্ষণীয়। তৃতীয় পর্যায় : রক্তে অক্সিজেন সংমিশ্রণ বিভ্রাটে নিউমোনিয়ার সংক্রমণ ও কফ-শ্লেষ্মা বৃদ্ধি, বুকের ভেতর গড়গড় শব্দ শোনা যায় এবং স্বাভাবিকভাবে শুয়ে থাকায় অসুবিধা হয়।  রোগী ক্রমেইতন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ঘ. করোনা রোগীর চিকিৎসা ও ব্যয় : প্রথম পর্যায়ে রোগীকে আলাদা ঘরে রেখে আলাদাভাবে দেখাশোনা করাই মূল কাজ। এলাকার একজন চিকিৎসকের নিয়মিত পরামর্শ নিলে ভালো হয়। প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ রোগী নিরাময় হন নিজ বাড়িতে স্বল্পখরচে, স্বল্পসময়ে ও ¯েœহ-ভালোবাসায়।  বোকামি করতে হবে না একই ওষুধ অকারণে বেশি দামে কিনে। এতে ভালোর চেয়ে অন্য সমস্যাও সৃষ্টি হতে পারে। দিনে একটি বা দুটি করে ৫০০ মিলিগ্রামের প্যারাসিটামল গ্র“পের ট্যাবলেট দিনে এক থেকে তিনবার সেবন যুক্তিসঙ্গত। প্যারাসিটামলের সঙ্গে অন্য উপাদান যেমনÑ ক্যাফেইন বা ঘুমের ওষুধমিশ্রিত না থাকা ভালো। এতে অন্য পাশর্^প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। হাঁচি-কাশি অর্থাৎ এলার্জি নিবারণের অ্যান্টিএলার্জি ওষুধ ৪ মিলিগ্রামের ক্লোরফেনারামিন দিনে একটি করে খেলে ভালো উপকার হয়। প্রতি ট্যাবলেটের মূল্য মাত্র ২৫ পয়সা। গরম চা, মধু ও আদায় গলায় আরাম পাওয়া যায়। চুষে চুষে জি-ভিটামিন সি-২৫০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট দিনে ৩-৪টি খাওয়া  যেতে পারে। প্রত ট্যাবলেট জি-ভিটামিন ‘সি’র মূল্য এক টাকা ৩০ পয়সা (১০টি ট্যাবলেটের মূল্য ১৩ টাকা)। অনেকে প্রতিদিন ২০ মিলিগ্রামের একটি বা দুটি জিংক ট্যাবলেট গ্রহণের পরামর্শ দেন। খরচ প্রতি ট্যাবলেট এক টাকা অর্থাৎ ১০টি জিংক ট্যাবলেটের মূল্য দশ টাকা। কোয়ারেন্টিন রুমে (একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পৃথক থাকা) অবশ্যই এক  বোতল ১০০ মিলিলিটারের জাইনানল বা জি-ক্লোরহেক্সাডিন থাকা দরকার জীবাণুনাশক হিসেবে ব্যবহারের জন্য। ১০০ মিলিলিটারের মূল্য ১০০ টাকা। সাবানও ব্যবহার করবেন। ভালো উপকার পাওয়া যায় গরম পানিতে কয়েক ফোটা টিংচার আয়োডিন কিংবা ইউকেলিপট্যাস তেল মিশিয়ে গরম বাষ্প নিলে। অন্য সমস্যা যেমনÑ পেট বা বুক জ¦ালাপোড়া কিংবা অ্যাসিড ভাব লাগলে দিনে একটি বা দুটি ২০ মিলিগ্রামের জি-ওমিপ্রাজল ক্যাপসুল সেবন করলে নিরাময় নিশ্চিত। খরচ প্রতিক্যাপসুলের মূল্য ৩ (১০টি ক্যাপসুলের মূল্য ৩০ টাকা) টাকা। প্রথম পর্যায়ে নিরাময়ে ব্যর্থ ২০ শতাংশ রোগীকে অবশ্যই নিকটবর্তী সরকারি বা বেসরকারি ক্লিনিক হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি হতে হবে। তবে ভর্তির আগে নিশ্চিত হতে হবে, সেখানে ছোট অক্সিজেন পালস অক্সিমিটার যন্ত্র এবং রোগীকে প্রয়োজনমাফিক সরাসরি অক্সিজেন  দেওয়ার সুবিধা আছে কিনা। রক্তে পরিমিত অক্সিজেন সংমিশ্রিত না হলে রোগীকে মুখ বা নাক দিয়ে অক্সিজেন কিছুক্ষণ দিতে হয়। দেখতে হবে অক্সিজেন সংমিশ্রণ ৯২-৯৫ শতাংশ মধ্যে যেন থাকে। অতিরিক্ত অক্সিজেন দেওয়া অপচয়  তো বটে, অনেক সময় ক্ষতিকরও। বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিনের অধ্যাপক তারিক আলম করোনা পজিটিভ দ্বিতীয় পর্যায়ের রোগীদের প্রতিদিন একটি অ্যান্টিহেলমিনথিক আইভারম্যাকটিনÑ যার প্রতি ট্যাবলেটের মূল্য ৫ টাকা এবং ১০০ মিলিগ্রামের ডক্সিসাইক্লিন হাইড্রোক্লোরাইড ট্যাবলেট দিনে দুইবার পাঁচ দিন সেবন করিয়ে রোগ নিরাময় দেখেছেন। হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তির প্রথম দিনে ইনজেকশন মিথাইল  প্রেডনিশোলন ২৫০ মিলিগ্রাম ২টি কিংবা ইনজেকশন ডেক্সামেথাসন ৪ মিলিগ্রাম মূল্য প্রতিইনজেকশন মাত্র ১৫ টাকা। দিনে দুইবার ৩ দিন। খরচ ৯০ টাকা। নিউমোনিয়ার চিকিৎসার জন্য কো-এমক্সিক্লেভ ১-২ গ্রাম দিনে তিনবার কিংবা এরিত্রোমাইসিন/এজিথ্রোমাইসিন অথবা ক্যাপসুল সেফেক্সিম (এ-ঈবভরীরসব ২০ সম, মূল্য ২০ টাকা) ৫ দিন সেবনের জন্য দেওয়া হয়। দিনে কয়েকবার গরম পানির বাষ্প বা মেশিনের মাধ্যমে সালবুটামল, মূল্য প্রতিভায়াল ৮০ টাকা কিংবা বুডিসোনাইড অথবা এন-এসিটিল সংমিশ্রণে নেবুলাইজার ব্যবহারে শ্লেষ্মা  বের করায় খুব উপকার পাওয়া যায়। ব্যয়বহুল অ্যান্টিভাইরাল রেমডিসিভির ব্যবহারে নিরাময়ে তিন দিন সাশ্রয় করায়। অন্য অ্যান্টিভাইরালের ব্যবহারে সুফলের প্রমাণ নেই। অর্থের অপচয় মাত্র। শিক্ষিত  পেশাজীবীও প্রতারিত হচ্ছেন অপ্রমাণিত বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকায় কিনে। তাদের জ্ঞানচক্ষু কবে উন্মেচিত হবে? আইসোলেশন ওয়ার্ডে ৮-১০ দিন ভালো নাসিংসেবা ও নিয়মিত চিকিৎসা পেলে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রায় সব রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যান। অনধিক ১০ শতাংশ রোগী বিভিন্ন জটিলতা ও একাধিক বিকলাঙ্গের সমস্যা নিয়ে তৃতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করেন। তৃতীয় পর্যায়ের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং মূলত আইসিইউয়ে চিকিৎসা করাতে হয়। করোনা রোগে মৃত্যুহার ২-৩ শতাংশ সীমিত। ঙ. অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন : পুরো পৃথিবীতে, এমনকি উন্নতবিশে^র চিকিৎসকরা সহজে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সুলভ ওষুধ থাকা সত্ত্বেও অযাচিতভাবে অধিকতর মূল্যের ওষুধ লেখেন। নতুন ওষুধের ভুল প্রয়োগ প্রায়ই লক্ষণীয় ঘটনা। এ সমস্যা রহিত করার জন্য প্রায়ই পরামর্শ প্রকাশ করে থাকে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিষয়ক পরামর্শক কমিটি। সময়মতো চিকিৎসা না হলে বা চিকিৎসা বিভ্রাট হলে কোভিড-১৯  রোগের মূল সমস্যা হাসপাতালে ভর্তির সময় বা ভর্তির ৪৮ ঘণ্টা আগে বাড়ি ও এলাকার পরিবেশ থেকে অর্জিত নিউমোনিয়া অথবা হাসপাতালে অন্য কারণে আসা রোগীদের হাসপাতালের পরিবেশ থেকে অর্জিত সংক্রমণ দ্রুত ফুসফুসের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। ওই সমস্যার দ্রুত চিকিৎসার জন্য গত মে মাসে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিষয়ক পরামর্শ কমিটির সুপারিশগুলো বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। অ্যান্টিবায়োটিক সাধারণত ৫ দিন সেব্য। তবে ক্ষেত্রবিশেষে বিশেষত ফুসফুসের সমস্যায় ২-৩ সপ্তাহ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। চ. স্বাভাবিক পরিবেশ থেকে অর্জিত পরিমিত ও তীব্র নিউমোনিয়ার চিকিৎসা : মুখে ডক্সিসাইক্লিন ২০০ মিলিগ্রাম প্রথম দিন এবং দ্বিতীয় দিন থেকে ১০০ মিলিগ্রাম করে বা  কো-এমক্সিক্লেব ৫০০ মিলিগ্রাম দিনে তিনবার, সঙ্গে  ক্লেরিথ্রোমাইসিন ৫০০ মিলিগ্রাম দিনে দুইবার সেবন করতে হবে। রোগের তীব্রতা বেড়ে গেলে লেভোফোক্লাসিন ৫০০ মিলিগ্রাম দিনে একবার বা দুইবার ৫ দিন সেব্য। মুখে সেব্য অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য আন্তঃশিরা পদ্ধতিতে ওপরে উল্লেখিত অ্যান্টিবায়োটিকগুলো ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ছ. মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরে আসা এক আইসিইউ রোগীর চিকিৎসা ব্যয় : শরীরে করোনা রোগের প্রাথমিক উপসর্গ  দেখা দিলে গত ২৩ মে গণস্বাস্থ্য  কেন্দ্রের ট্রাস্টি ৭৮ বছর বয়স্ক, বিকল কিডনি রোগী জাফরুল্লাহ চৌধুরী ২৪ মে গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের জিআর-রেপিড এন্ট্রিবডি পরীক্ষায় কোভিড-১৯ পজিটিভ প্রমাণিত হন। পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব  মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয় হাসপাতালে রিয়াল টাইমে পিসিআর করোনা পজিটিভ প্রমাণিত হয়। ৩০ মে রোগীর শ^াসকষ্ট বাড়ে, মানসিক আচরণে বিশৃঙ্খলা ও আচ্ছন্ন ভাব দেখা যায়। রক্তে অক্সিজেন মিশ্রণ ৮৫ শতাংশ নেমে এলে রোগী তন্দ্রাছন্ন হয়ে পড়েন। তাকে এই অবস্থায় গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে করোনা নির্ধারিত আইসিইউয়ে ভর্তি করা হয়। দুই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার মামুন মুস্তাফী ও আইসিইউ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজীব মোহাম্মদ সার্বক্ষণিকভাবে দৈনিক ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা রোগীর পাশে বসে থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। অক্সিজেন সংমিশ্রণ ৯৪-৯৬ শতাংশ নিশ্চিত করার জন্য প্রতিমিনিটে ন্যূনতম ৬ লিটার অক্সিজেন সরবরাহ এবং তারা ৯ রকমের অ্যান্টিবায়োটিক ১০ দিনে বিধিব্যবস্থা দিয়েছেন। এত ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার অবশ্য প্রশ্নসাপেক্ষ। সম্ভবত নিজেদের ওপর আস্থার অভাব ও গুরুত্বপূর্ণ (?) বয়স্ক রোগী বিধায় অবস্থার দ্রুত উন্নতির জন্য বিশেষজ্ঞরা ঘন ঘন অ্যান্টিবায়োটিক বদল করেছেন,  স্টেরয়েড ব্যবহার করেছেন। তার বুকের এক্স-রেতে উভয়দিকে নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। তার রক্তের মৌলিক পরীক্ষা স্বাভাবিক ছিল। তবে সি রি-অ্যাক্টিভ প্রোটিন সিআরপি ও ডি-টাইমার বৃদ্ধি পায়। সালবুটামল ও বুডেসোনাইড দিয়ে নেবুলাইজার শুরু করা হয়। অধ্যাপক তারিক আলমের পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় অ্যান্টিহেলমিনথিক ইভারম্যাকটিন ও অ্যান্টিবায়োটিক ডক্সিসাইক্লিন হাইড্রোক্লোরাইড দিয়ে। স্লেড পদ্ধতিতে প্রতিদিন ডায়ালাইসিস করানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের হেমোটোলজির অধ্যাপক মহিউদ্দিন আহমদ খানের পরামর্শে তিনবার প্লাজমা ট্রান্সফিউশন দেওয়া হয়। প্লাজমা ট্রান্সফিউশনে রোগী উজ্জীবিত হন, প্রাণশক্তি বৃদ্ধি পায়। জাফরুল্লাহ চৌধুরী সপ্তাহে তিনবার হেমোডায়ালাইসিস নিচ্ছেন ৪ বছর ধরে। এর সঙ্গে পাচ্ছেন উচ্চরক্তচাপের চিকিৎসা। গত বছর তিনি হেপাটাইটিস-সির জন্য ঝড়ভড়ংনাঁরৎ ও উধপষধঃধংারৎ দিয়ে ৩ মাস চিকিৎসা করিয়ে হেপাটাইটিস-সিমুক্ত হয়েছেন। তার একটা পুরনো মাইয়োকার্ডিয়াল ইনফার্কসন রয়েছে। ৫৩ দিনে (নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র ও ক্যাবিনে) তার মোট ব্যয় হয় ৫ লাখ ৩৫ হাজার ২৩ টাকা। ছক-১ : সামাজিক শ্রেণিভিত্তিক গণস্বাস্থ্য আইসিইউয়ে প্রতিদিনের সর্বমোট চার্জ এই প্যাকেজে সব ওষুধের মূল্য, অক্সিজেন, রোগ নির্ণয় বিল, আইসিইউ ভাড়া, যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ফি ধরা আছে। অতিরিক্ত কোনো খরচ নেই। বিশেষজ্ঞরা দিন-রাতে যতবারই রোগীকে পরিদর্শন করবেন ও পরীক্ষা করবেন, অতিরিক্ত কোনো ফি চার্জ হবে না। শেষের কথা সরল কথা : সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে সব নাগরিকের সুলভ ও সহজে উন্নতমানের চিকিৎসা সেবাপ্রাপ্যতা। বাংলাদেশে সামাজিক  শ্রেণিভিত্তিক জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা বিবেচনার সময় এসেছে। জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী : ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র ও শরিফুল হক রুমি : মেডিক্যাল অফিসার, গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল

 

আরো খবর...