বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকা

 ॥ স্বপন কুমার সাহা ॥

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের সময় ৭০ কোটি মানুষের দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। তিনি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী প্রন্ডিত জহরলাল নেহরুর কন্যা। এই সম্ভ্রান্ত ও খ্যাতনামা রাজনৈতিক পরিবারে ১৯১৭ সালের ১৭ নভেম্বর শ্রীমতী গান্ধীর জন্ম। তিনি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ও শান্তিনিকেতন নামে খ্যাত কবিগুরুর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন। অনিন্দ্য সৌন্দর্যের জন্য ‘প্রিয়দর্শিনী’ নামে অভিহিত ইন্দিরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন পার্শি ধর্মাবলম্বী তরুণ ফিরোজ গান্ধীর সঙ্গে। ইন্দিরা অল্প বয়সেই স্বামীকে হারান। তার দুই সন্তান রাজীব গান্ধী ও সঞ্জয় গান্ধী। ইন্দিরা নিহত হওয়ার পর তার জ্যেষ্ঠ সন্তান রাজীব গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু তিনিও ১৯৯১ সালের ২১ মে তামিলনাড়–র শ্রীপেরামবুদারে এক নির্বাচনী সফরকালে শ্রীলংকার চরমপন্থি সংগঠন এলএলটিইর কর্মী নলিনী মুরুগানের হাতে নিহত হন। শ্রীমতী গান্ধীর কনিষ্ঠ সন্তান সঞ্জয় গান্ধী ১৯৮০ সালের ২৩ জুন এক বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। রাজনীতির চৌহদ্দিতে বিচরণ থাকলেও ইন্দিরা রাজনীতির পাদপ্রদীপের আলোয় চলে আসেন পিতা জহরলাল নেহরুর মৃত্যুর পর। লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মন্ত্রিসভায় তাকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী করা হয়। ক্রমেই তিনি যোগ্য ভারতীয় রাজনীতিক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন এবং গভীর রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির অধিকারী হন। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দে দুই  দেশের শান্তি আলোচনা চলাকালে প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু হয় ১৯৬৬ সালের ১১ জানুয়ারি। এর পর কংগ্রেস নেতৃত্ব কার্যত ইন্দিরা গান্ধীর হাতে চলে আসে। বাংলাদেশে ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করার পর ২৭ মার্চ সকালে সান্ধ্য আইন কয়েক ঘণ্টার জন্য শিথিল করা হলে মানুষ হেঁটে, দেশীয় নৌকা, ট্রাক ও অন্যান্য ক্ষুদ্র যানবাহনে ঢাকা শহর ছাড়তে শুরু করেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আওয়ামী লীগ নেতারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করার লক্ষ্য নিয়ে ভারতে নিরাপদ স্থানে চলে যান। ইতোমধ্যে আমরা জানতে পারি যে, বিভিন্ন সীমান্তপথে মানুষ ভারতে চলে যাচ্ছেন। ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী (বিএসএফ) তাদের বাধা না দিয়ে বরং স্বাগত জানায়। স্পষ্টই বোঝা যায়, শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর মহানুভবতা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতন থেকে জীবন রক্ষা এবং হত্যাকান্ড ও ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা পেতে শরণার্থীদের সাহায্য করেছে। পূর্ব পাকিস্তানের এই শরণার্থীদের বড় অংশই ছিল ধর্মীয় সংখ্যালঘু। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিশ্বাস করত এই মুক্তিযুদ্ধ ভারতের প্ররোচনায় পরিচালিত। ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত প্রায় এক কোটি (১০ মিলিয়ন) লোক ভারতের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করেন। অত্যন্ত সাহসী এবং রাজনৈতিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ভারতের জনগণের পূর্ণ সহযোগিতা নিয়ে তার সমর্থন ব্যক্ত করেন। তিনি পাকিস্তানি  সেনাবাহিনীর নির্মম হত্যাকান্ড থেকে জীবন বাঁচাতে ভারতে ছুটে আসা শরণার্থীদের মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়ে তাদের সম্মানিত করেন। শ্রীমতী গান্ধী অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শরণার্থীদের জন্য খাদ্য, ওষুধপত্র, বস্ত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবস্থা করেন। শ্রীমতী গান্ধী ছিলেন ভারতে ক্ষমতাসীন জাতীয় কংগ্রেসের  কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মূল অবস্থানে। তিনি লোকসভায় তার চমৎকার ভাষণে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের হাত থেকে জীবন বাঁচাতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে চলে আসা ভাইবোনদের প্রতি সর্বাত্মক সাহায্যদানে এগিয়ে আসার জন্য লোকসভার সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান। শুধু তা-ই নয়, তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বার্থে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের জন্য তার পূর্ণ সমর্থনের কথা জানান। শ্রীমতী গান্ধীর এই বক্তব্যে লোকসভার সদস্যরা দাঁড়িয়ে হর্ষধ্বনিসহকারে তাকে অভিনন্দিত করেন। পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা লাভের জন্য ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধে জয়লাভে বাংলাদেশকে সাহায্য করে। এর অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ব্যাপক সংখ্যায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভারতীয় ভূখন্ডে চলে আসার ফলে সীমান্ত এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। অন্য প্রধান কারণ হচ্ছেÑ সরকার পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত ও বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণকারী প্রায় এক কোটি (১০ মিলিয়ন) শরণার্থীর বাড়তি বোঝা নেওয়ায় ভারতের অর্থনীতির ওপর প্রচন্ড চাপ পড়ে। আরও কারণ ছিল যেমন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ভারত সরকারের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র। যেসব বাংলাদেশি শরণার্থী স্বজন হারিয়ে ভারতের মাটিতে আশ্রয় গ্রহণ করে দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করছিলেন, শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং ব্যক্তিগত প্রজ্ঞা তাদের প্রতি গভীর মহানুভবতার পরিচয় বহন করে। তাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জনগণের লড়াইয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বিভিন্ন কূটনৈতিক বাধার কারণে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধের  গোড়া থেকেই বাংলাদেশের জনগণের পাশে ছিলেন। তিনি মানুষের দুঃখ-দুর্দশা স্বচক্ষে দেখার জন্য বিভিন্ন শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন, তাদের সান্ত্বনা দেন এবং মনোবল না হারানোর জন্য সাহস জোগান। শ্রীমতী গান্ধী শরণার্থীদের প্রতি তার ব্যক্তিত্ব ও মানবিক গুণাবলির সর্বোচ্চ সদিচ্ছার পরিচয় দেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্বাঞ্চলে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা যুদ্ধ থেকে দৃষ্টি ফেরাতে প্রথমেই ভারত আক্রমণ করে। পাকিস্তানের নিয়মিত সেনাদের ওপর আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে পালিয়ে যাওয়া ছিল গেরিলা যুদ্ধের কৌশল। বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক এমআর আখতার স্বাধীন বাংলা বেতারে ‘চরমপত্র’ নামে একটি হাস্যরসাত্মক অনুষ্ঠান উপস্থাপন করতেন। তার এই হাস্যরসসমৃদ্ধ উপস্থাপনা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মুক্তিবাহিনী ও স্বাধীনতাকামী মানুষকে উৎসাহ জোগাত, অনুপ্রাণিত করত। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী যখন পার্লামেন্টে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন, পাকিস্তানি  সেনাবাহিনী ভারত আক্রমণ করেছে, বিরোধী দলসহ সব পার্লামেন্ট সদস্য ‘জয় বাংলা, জয় ইন্দিরা গান্ধী, বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী দীর্ঘজীবী হোক এবং ইন্দিরাজি দীর্ঘজীবী হউন’ ধ্বনি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি তাদের সর্বাত্মক সমর্থন ব্যক্ত করেন। ভারত ৩ ডিসেম্বরই আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ১৩ দিনের যুদ্ধশেষে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল নিয়াজি ৯০ হাজার দখলদার সেনা নিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অপরাহ্নে রেসকোর্স ময়দানে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক  লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ও জেনারেল নিয়াজি আত্মসমর্পণ দলিলে সই করেন। এয়ার ভাইস মার্শাল একে খন্দকার বাংলাদেশের পক্ষে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানি কারাগার থেকে আমাদের প্রিয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত করতে অচিন্তনীয় প্রচেষ্টা চালান। এ উদ্দেশ্যে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক সফর করেন। পাকিস্তানি কারাগার  থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিশ্বনেতাদের বোঝানোই ছিল তার এই সফরের উদ্দেশ্য। বিশ্ব জনমতের চাপে পাকিস্তানি শাসকরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি মুক্তি দিতে বাধ্য হন। মুক্তির পর বঙ্গবন্ধু প্রথমে লন্ডন যান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নায়ক লন্ডন থেকে নয়াদিল্লি হয়ে ১০ জানুয়ারি মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন। নয়াদিল্লিতে এই বাঙালি বীরকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান ভারতের রাষ্ট্রপতি শ্রী ভি ভি গিরি এবং অদম্য সাহসী ও জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। বঙ্গবন্ধুকে আনুষ্ঠানিভাবে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। শ্রীমতী গান্ধী বঙ্গবন্ধুর সম্মানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন। বঙ্গবন্ধুও বক্তব্য রাখেন। বাংলাদেশের জনগণ সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে শ্রীমতী গান্ধীকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবেন। মুক্তিযুদ্ধের মহান বীর নয়াদিল্লি থেকে তেজগাঁও পুরনো বিমানবন্দরে এসে পৌঁছলে আওয়ামী লীগ নেতা, ছাত্রনেতা ও মুক্তিযোদ্ধারা তাকে স্বাগত জানান। এখান থেকে বঙ্গবন্ধুকে রেসকোর্স ময়দানে নিয়ে গিয়ে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। লেখক ঃ সিনিয়র সাংবাদিক

 

আরো খবর...