বাংলাদেশের ঐতিহ্য, গর্বের স্বাক্ষর হয়ে আছে ইলিশ মাছ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। আবহমানকাল থেকে ইলিশ আমাদের জাতীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রাণিজ আমিষের জোগান এবং দারিদ্র্য বিমোচনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্য, গর্বের স্বাক্ষর হয়ে আছে ইলিশ মাছ। আশার খবরটি হচ্ছে, দেশে ইলিশের উৎপাদন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ ইলিশ মাছ আহরণে বিশ্বে প্রথম। রেকর্ড অনুযায়ী, ২০০৮-০৯ সালে দুই লাখ ৯৯ হাজার টন ইলিশ উৎপাদিত হলেও ২০১৮-১৯ সালে পাঁচ লাখ ১৭ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। আন্তর্জাতিক তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী বিশ্বে আহরিত ইলিশের প্রায় ৭৫ ভাগ আহরণ করে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে মিয়ানমার এবং ৩য় অবস্থানে ভারত। ইলিশের অভ্যন্তরীণ বাজারমূল্য ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ইলিশ উৎপাদনের ক্ষেত্রে রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমান সরকার মা ইলিশ ও জাটকা ধরা নিষিদ্ধকালীন জেলেদের খাদ্য সহায়তা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করায় ইলিশ উৎপাদন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, মৎস্য অধিদপ্তর, প্রশাসন ও বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক ইলিশ ব্যবস্থাপনা কৌশল মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করায় দেশব্যাপী ইলিশের বিস্তৃতি ও উৎপাদন বেড়েছে। জানা গেছে, দেশে মোট মৎস্য উৎপাদনের ১২ শতাংশই ইলিশ। জিডিপিতে ইলিশের অবদান প্রায় ১ শতাংশ। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ বা ৭৬ শতাংশ। বাংলাদেশে ইলিশের গড় উৎপাদন কমবেশি সাড়ে তিন লাখ টন। এ হিসাবে প্রচলিত বাজারমূল্যে ইলিশের সার্বিক বাজারমূল্য দাঁড়ায় ২২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকারও বেশি। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা গেছে, ২০ বছর আগে দেশের ২১টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। বর্তমানে ১২৫টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। উৎপাদিত ইলিশের যেটুকু রপ্তানি হয় তাতে ১৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনের ৭৫ শতাংশই বাংলাদেশে হচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫ লাখ ১৭ হাজার টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিজ্ঞানী এবং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে হারে ইলিশের উৎপাদন বাড়ছে তাতে আগামী কয়েক বছরে উৎপাদন আরো বাড়বে। বিশ্বের প্রা ৮০-৯০ শতাংশ ইলিশ উৎপাদন দেশ হবে বাংলাদেশ। ২০২২ সালে বাংলাদেশ হবে শীর্ষ মাছ উৎপাদনকারী দেশ। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ইলিশ আহরণে রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে ৫ লাখ ১৭ হাজার টন, যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের চেয়ে ২১ হাজার টন বেশি। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা তথ্যের ভিত্তিতে ইলিশ ব্যবস্থাপনা কৌশল মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের ফলে ইলিশের উৎপাদন বাড়ছে। মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে ২০০৯-২০১০ অর্থ বছরে ইলিশ উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার টন। ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ১৭ হাজার টন। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা তথ্যের ভিত্তিতে তা ২২ দিন ইলিশ আহরণ বন্ধ করার পদ্ধতিই ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ সালে ২২ দিন মা ইলিশ সুরক্ষিত হওয়ায় ডিম দেয়া ইলিশের হার ছিল ৪৬.৪৭ ভাগ, যা ২০১৭-১৮ সালে হয়েছে ৪৭.৭৪ ভাগ। ফলে ২০১৭-১৮ সালে ৩৬ হাজার কোটি জাটকা ইলিশ পরিবারে নতুন করে যুক্ত হয়। ইলিশের জীবনচক্র বেশ বৈচিত্র্যময়। ইলিশ মাছ সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে বাস করে। যখন ডিম ছাড়ার সময় হয় তখন তারা সমুদ্রের লোনাপানি ত্যাগ করে নদনদীর মিঠা পানিতে চলে আসে। তার কারণ সমুদ্রের পানিতে প্রচুর লবণ থাকায় এ পানিতে ডিম ছাড়লে লবণের কারণে ডিমগুলো নষ্ট হয়ে যায় এবং কোনো ইলিশের পোনা জন্ম হয় না। তাই ডিমওয়ালা ইলিশগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে ডিম ছাড়ার জন্য নদীতে আসায় প্রজনন ঋতুতে নদীতে প্রচুর ডিমওয়ালা মাছ ধরা পড়ে। একারণেই সরকার ইলিশের প্রজনন ঋতুতে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ইলিশ সারা বছরই ডিম দেয়। তবে বছরের মার্চ-এপ্রিল এবং সেপ্টেম্বর ইলিশের প্রজনন মৌসুম। এ সময় ইলিশ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিশেষ করে আশ্বিন মাসের বড় পূর্ণিমার আগের ৪ দিন এবং পরের ১৭ দিন ইলিশ আহরণ, বিতরণ, বিপণন, পরিবহন, মজুদ ও বিনিময় কার্যক্রম বন্ধ থাকে। ১ অক্টোবর হতে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত দেশব্যাপী মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান পালিত হয়। এ ধারাবাহিকতায় আগামী ২২ দিন ইলিশ ধরা নিষেধ (৯ থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত) বলে জানিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। মাছবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন প্রতিবছর ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। খুশির খবরটি হলো ইলিশ পাওয়া যায় বিশ্বের এমন ১১টি দেশের মধ্যে ১০টিতেই যেখানে ইলিশের উৎপাদন কমছে, সেখানে একমাত্র বাংলাদেশেরই ইলিশের উৎপাদন প্রতিবছর ৮-১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। এমতাবস্থায় বিশ্বের প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থাগুলো বাংলাদেশের ইলিশ রক্ষার এই কৌশল খুবই কার্যকর হয়েছে চিহ্নিত করেছে। ফলে বিশ্বে দেশের ইলিশের নতুন বাজার তৈরির সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। ইলিশ উৎপাদনে নতুন রেকর্ড সৃষ্টির পাশাপাশি বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতিতেও অনুসরণকারী অন্যতম দেশ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়ার কৌশল অনুসরণ করছে ভারত ও মিয়ানমার। বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির কৌশল বুঝতে সুদূর কুয়েত ও বাহরাইনের মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। বাংলাদেশের মতোই ওই দেশগুলো ইলিশের নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র চিহ্নিত করে ডিম পাড়া ও বাচ্চা বড় হওয়ার সময় মাছ ধরা বন্ধ রাখার উদ্যোগ নিয়েছে। ২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল থেকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার বাংলাদেশের পথ অনুসরণ করে ভাগীরথী (গঙ্গা) নদীর ফারাক্কা থেকে মোহনা পর্যন্ত অংশের তিনটি এলাকাকে ইলিশের নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র হিসেবে ঘোষণা করেছে। এসব এলাকায় ১৫ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করেছে পশ্চিমবঙ্গ।
লেখক ঃ এস এম মুকুল।

আরো খবর...