বরেণ্য বর্ষীয়ান ॥ ওয়ালীউল বারী চৌধুরী

মাহমুদ হাফিজ

ম্যাট্রিকুলেশন স্তরের শিক্ষার্থী। জেলা শহরে থাকি। বেকো সাইকেলে গ্রাম-শহর করি। ছোটবেলা থেকে লেখালেখি করি বলে সাংবাদিকতায় নাম  লেখানোর শখ। জেলা শহর থেকে তিনটি সাপ্তাহিক প্রতাপের সঙ্গে বেরোয়। ইস্পাত, গ্রামের ডাক, জাগরণী। ইস্পাত অফিস মজমপুর গেটের পাশে একতলা দালানে। রাস্তার পাশে হলঘরের মতো ঘরটিতে প্রেস, ছাপানো ও ছাপা-অপেক্ষমান কাগজের স্তূপ। পাশে সম্পাদকের ঢাউস টেবিল। কারুকার্যময় উঁচু চেয়ার উপবিষ্ট সম্পাদক। দীর্ঘদেহী, রাশভারী, গম্ভীর, প্রখর ব্যক্তিত্বময়।

এক সকালে বাইরে সাইকেল হেলান দিয়ে দ্বিধা থরথর হৃদয়ে সম্পাদকের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। পরনে কমদামি প্যান্ট, গায়ে সাদাকালো চেকশার্ট, হাতে নীলরঙা ডায়েরি। শহরে বাস শুরু করলেও ভাবভঙ্গি আর পোশাক-আশাকে গ্রাম্যতা লেপ্টানো। পায়ে নকল চামড়ার চটিতে কাদার দাগ। মুখে হাল্কা মোছ। খোঁচা খোঁচা দাড়ি। সরিষার তেলমাখা মাথাভর্তি চুলে সিঁথি কাটা। সামনের চুলগুলো চিড়ুনি দিয়ে বিশেষ কায়দায় ঘোরানো। খানাপিনা কম  জোটে বলে চোপা ভাঙা। যেন এক তৃণমূললগ্ন তরুণের প্রতিচ্ছবি।

নিউজপ্রিন্টের ওপর লাল রেডলীফ কলমে কাটাকুটি করছিলেন তিনি। বুঝে যাই-এর নাম সম্পাদনা। সালাম ও বান্দা হাজির টের পেলেও তার কোন আগ্রহ, হেলদোল নেই। চোখ না তুলেই বললেন, ‘কী চাই’!

‘সাংবাদিক হবো।‘

এবার নড়েচড়ে বসলেন। কাটাকুটির সময় চশমা চোখের ওপর ছিল। নাকের ডগায় নামিয়ে চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন। দেখলেন আপাদমস্তক। তীক্ষ্মচোখ, গুরুগম্ভীর কন্ঠ। তুমি সম্বোধন না করে ভাববাচ্যে বললেন- ‘কোন  লেখা সঙ্গে আছে? দেয়া হোক’।

সামনে দুটো চেয়ার খালি। বসতে বললেন না। বসার সাহসও হলো না। তিনি সম্পাদক, আমি স্বাপ্নিক। আকাশ-পাতাল ফারাক। গোটা কয় ছড়া ছিল। কম্পিতহস্তে টেবিলে রেখে তার দিকে ঠেলে দিলাম। হস্তাক্ষরে চোখ  বোলালেন। কয়েলাইন পড়ে পাশের একজনকে বললেন, ‘তার হবে’।

বললেন, ‘শহরে লবণের বড় সঙ্কট। মজুতদারদের কারসাজিতে মানুষ লবণ পাচ্ছে না, পেলেও দাম চড়া। অনুসন্ধান করে রিপোর্ট করতে হবে, পারা যাবে  তো?’ ঘাড় ঝাঁকিয়ে সাইকেলে বেরিয়ে পড়লাম। জমা দিলাম রিপোর্ট। পত্রিকা প্রকাশের দিন খোঁজ নিতে গেলে বললেন, ‘শহরজুড়ে তুলকালাম। রিপোর্ট নিয়ে হৈ চৈ। পত্রিকার কাটতিও হচ্ছে দেদার। মজুদদাররা ক্ষিপ্ত। পুলিশের কাছে অভিযোগ হয়েছে। ওয়ারেন্ট নিয়ে পুলিশ রিপোর্টারকে খুজছে। এসব সামাল দেয়ার হিম্মত আছে তো?’ আমি সাহসী না, ভীতুর ডিম । কিন্তু সাহস নিয়ে বললাম, যা হয় হবে। নির্ভীক সাংবাদিকতায় এসব ডালভাত। মজুতদাররা ক্ষেপেছিল বটে, তবে পুলিশ প্রসঙ্গটি তিনি পরখ করার জন্য বলেছিলেন বোঝা গেল। পরক্ষণেই পিঠ চাপড়ে বললেন- ‘এই না হলে সাংবাদিক’।

নিয়মিত কাজ করার সুবিধায় কার্ড ইস্যু করলেন। ৩০ কপি পত্রিকা দিলেন এলাকায় বিতরণের জন্য। গ্রামে এনে আত্মীয়-স্বজন বন্ধুদের মধ্যে বিলি করি আর জনে জনে রিপোর্টে নিজের নামটি দেখাতে থাকি। পরে আর থামা বলে কথা নেই। চিনিকলে দুর্নীতি, জগতি স্টেশনে দূর্ভোগ, কুমারখালীর রাস্তা ঘাটের বেহালদশা, গড়াইগর্ভে বিলীন গ্রাম, যদুবয়রার ঐতিহ্যবাহী লাহিড়ী বিল্ডিং অরক্ষিত, পরীক্ষাহলে নকলের ছড়াছড়ি, খোকসার মেলায় জুয়াড়িদের আধিপত্য এ ধরনের হাজারো সংবাদের লম্বাবগির মাথায় ইঞ্জিন লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি তা বিরামহীন চলতেই থাকলো। নয়া সাংবাদিকের উৎসাহ, উদ্দীপনা, উত্তেজনার আগুনে এমন ঘি পড়লোৃকোন কোন সপ্তাহে ৭/৮টি রিপোর্ট নামসহ প্রকাশিত হতে থাকলো। এই বরেণ্য বর্ষীয়ান অনুজ তরুণকে মানুষ ভালবাসার, সাংবাদিকতায় নির্ভীক হওয়ার সঞ্জীবণীমন্ত্র দিয়ে এমনভাবে সামনে ঠেললেন, তরুণের আর পেছনে তাকাতে হয়নি।

বরেণ্য বর্ষীয়ানের নাম ওয়ালীউল বারী চৌধুরী। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি ও মাগফিরাত কামনা করি।

পাদটীকা : ঘটনা উনিশশ’ আশি-একাশির দিকের। তখন কুষ্টিয়ার সাপ্তাহিক ইস্পাত পত্রিকায় সাংবাদিক আবদুস সালাম খান বার্তা বিভাগে কর্মরত ছিলেন বলে মনে পড়ে।

আরো খবর...