বন্যায় বিপর্যস্ত জনজীবন

কমবেশি প্রতিবছরই বন্যা হয়। তবে এ বছর বন্যার প্রকোপ অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে মানুষের কষ্ট বাড়ার পাশাপাশি ফসলেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মূলত আমাদের  দেশে কালবৈশাখীর ঝড় দিয়েই বৃষ্টি-বাদলের শুরু হয়। বিশেষ করে আগাম বৃষ্টি ও বন্যার কারণে হাওরখ্যাত অঞ্চলের পাকা ধান নিয়ে ধানচাষিরা চরম উৎকণ্ঠায় থাকেন। কয়েক বছর আগে উজানের ঢলে আগাম বন্যার কবলে ডুবে যায় পাকা ধানের মাঠ।  সে বছর ধানের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় ধান-চালের বাজারও বেড়ে যায়। ফলে ভোক্তার কষ্টও বাড়ে। এবারও আশঙ্কা ছিল। বিশেষ করে বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে গোটা দেশই ছিল লকডাউনের আওতায়। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় মানুষের চলাচলও বন্ধ ছিল। ফলে শ্রমিক সংকটের কারণে পাকা ধান কাটা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল। সে সময় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিশেষ ব্যবস্থায় হাওরাঞ্চলে শ্রমিক পাঠানো এবং যান্ত্রিক মেশিনে ধান কাটা-মাড়াইয়ের ব্যবস্থা করায় সে সংকট সফলভাবেই মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে। শুধু হাওরের ধানই নয়, গোটা দেশের ধানচাষিরা এ বছর নির্বিঘেœই ধান কাটা-মাড়াই করেছেন। আর কৃষক এবার ধানের উপযুক্ত মূল্যও পেয়েছেন। বিশেষ করে খাদ্যভান্ডার খ্যাত উত্তরাঞ্চলের অভিশাপ হচ্ছে উজানের পানির ঢলে আগাম বন্যা। যদি প্রতিবেশী দেশ ভারতে আগাম বৃষ্টি ও বন্যার সৃষ্টি হয়, তা হলে সেই পানির ঢলে আমাদের দেশে বন্যা হয়। এ বছরের চিত্রও ছিল ভয়াবহ। গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে উত্তরবঙ্গসহ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রথম দফার চেয়ে দ্বিতীয় দফায় ভারী বর্ষণ ও উজানের পানির ঢলে দেশের বৃহত্তম  সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ হুমকির মুখে পড়ে। উজানের পানির  তোড়ে তিস্তা ব্যারাজ এলাকায় রেড অ্যালার্ট জারি করেছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ ছিল, ব্যারাজ রক্ষার্থে ফ্লাট বাইপাস কেটে দেওয়ার আশঙ্কা নিয়ে পানি উন্নয়ন  বোর্ড কর্তৃপক্ষ ব্যারাজ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং পর্যন্ত করেছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত ফ্লাট, বাইপাস কাটতে হয়নি। শুধু তিস্তা নদীই নয়, সিলেটের সুরমা, কুশিয়ারা নদীও উজানের পানির ঢলে ব্যাপকভাবে এলাকা প্লাবিত হয়। এ বছর অবিরাম বর্ষণ ও উজানের পানির ঢলে গোটা দেশেই ব্যাপক বন্যা হয়েছে। উপর্যুপরি তিন দফায় বন্যা হওয়ায় বানভাসি মানুষের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হয়েছে। বিশেষ করে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, রংপুর, নীলফামারী জেলার চরাঞ্চলের মানুষকে ভীষণ কষ্টে পড়তে হয়েছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের  কোঅর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটিরিয়ান অ্যাফেয়ার্সের (ওসিএইচএ) পক্ষ থেকে আশঙ্কা করা হয় যে, ১৯৮৮ সালের পর বাংলাদেশে এবারের বন্যা সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হবে। সংস্থাটির মতে, বন্যায় এখন পর্যন্ত দেশের ১৮টি জেলায় ২৪ লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়ে সরকারি আশ্রয় ফিরিয়ে প্রায় ৫৬ হাজার মানুষকে আশ্রয় নিতে হয়েছে। আর বন্যার কারণে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৫৪ জনের। যদিও এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলার সংখ্যা আরও বেশি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী গত ২১ জুলাই পর্যন্ত দেশের ২০টি জেলার ৯৮ উপজেলার ৬০৩টি ইউনিয়ন বন্যার কবলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উল্লেখ্য, এবারের উপর্যুপরি বন্যায় কুড়িগ্রামের অবস্থা খুবই নাজুক। এ জেলার অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। কলকারখানা বলতে তেমন কিছুই  নেই। এ জেলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রুটি-রুজি মূলত কৃষি চাষাবাদ ও শ্রম বিক্রির ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন টানা বন্যার কারণে খেটে খাওয়া মানুষের আয়-রোজগার একেবারে বন্ধ। একমাত্র সরকারি সাহায্য আর বিভিন্ন সংগঠনের ত্রাণ তৎপরতার ওপর জীবন-জীবিকা অনেকাংশেই নির্ভরশীল। আর প্রয়োজনের তুলনায় সরকারি কিংবা বিভিন্ন সংগঠনের তরফে দেওয়া ত্রাণের পরিমাণও অপ্রতুল। ফলে খেটে খাওয়া মানুষজনের কষ্ট অনেক  বেশি। আবার বাড়িঘর বন্যার পানিতে ডুবে থাকায় থাকার কষ্টও অনেক। গবাদি পশুর অবস্থাও তথৈবচ খারাপ। গোখাদ্যের মূল্য অনেক চড়া। ফলে মানুষের ও পাশাপাশি গবাদি পশুর কষ্ট  বেড়েছে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও বাসদের তরফ থেকেও সাধ্যমতো ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি জেলা আওয়ামী লীগ ও জেলা পরিষদ কুড়িগ্রামের তরফেও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে এবার এনজিওদের তৎপরতা তেমন চোখে পড়েনি। যদি বন্যার পানি দ্রুত নেমে যায়, তা হলে হয়তো বানভাসি মানুষজন আবার জীবন-জীবিকাযুদ্ধে নিজেদের নিয়োগ করতে পারবে। আর কোনো কারণে যদি বন্যার পানি নামতে দেরি হয়, তা হলে বন্যার কষ্ট যে আরও বাড়বে, যা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু কুড়িগ্রামই নয়, পার্শ্ববর্তী লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী, রংপুর জেলার বানভাসি মানুষের কষ্টও অনেক বেশি। বিশেষ করে বন্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নদীভাঙনও তীব্র হয়েছে। কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ এলাকায় তিস্তার ভাঙনের মুখে পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্পারও অনেক দূর ভেঙে গেছে। তবে জিআই ব্যাগে বালু ভর্তি করে ফেলা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বন্যার পানি কমে গেলে নদীভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ হবে। কুড়িগ্রামের অধীন রৌমারী, রাজীবপুর ও চিলমারী উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। এখানকার হাট-বাজারগুলো থেকে পুরো পানি এখনো নামা শেষ হয়নি। অতিরিক্ত এবং দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কারণে রাস্তাঘাটেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত এসব রাস্তাও সংস্কার করতে হবে। এমনিতেই বৈশ্বিক মহামারী করোনার ছোবলে কুড়িগ্রাম জেলার প্রতিটি উপজেলার কমবেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। এর ওপর আবার ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’-এর মতো বন্যার প্রকোপে জনগণের দুর্ভোগ বেড়েছে। তবে বন্যার পানি এখন ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও হয়তো কিছু সময় লাগবে। বিশেষ করে বড় সমস্যা হচ্ছে, আমন ধানের চাষাবাদ নিয়ে। মূলত এই সময়টায় আমনের চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। অথচ উপর্যুপরি বন্যায় আমনের চারা নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে চারার অভাবে আমনের চাষাবাদ বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও কৃষি বিভাগ থেকে পানি নেমে যাওয়ার পর বীজতলা শুরু করার কথা বলা হচ্ছে। অবশ্য বীজ ফেলে চাষের উপযোগী চারা থেকে কিছুটা সময়ও লাগবে। এর পরও যদি কৃষি বিভাগের বীজতলা প্রস্তুতের পাশাপাশি চাষিপর্যায়েও বীজতলা তৈরি করতে হবে, না হলে চারার সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। আর ব্যাপক বন্যার কারণে এবার সবজির ক্ষেতও নষ্ট হয়েছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অনুকূল নয়। এমতাবস্থায় খাদ্যনিরাপত্তা কিছুটা হলেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। আবার আমন মৌসুমে ঠিকমতো কৃষক আবাদ করতে না পারলে সামনের বোরো মৌসুমের চাষাবাদের ব্যয় সংকুলান করাও চাষিদের পক্ষে দুরূহ হবে। সে কারণে চলতি আমন মৌসুম ও সামনের বোরো চাষ নির্বিঘœ করতে বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্পসুদে কৃষিঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি সরকারকে কৃষি খাতে ভর্তুকি দিয়ে বিশেষ অর্থ বরাদ্দ করে কৃষি খাতকে গতিশীল করতে হবে। কারণ কৃষিই আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এই শক্তিকে কাজে লাগিয়েই আমাদের বিপর্যস্ত পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। পাশাপাশি বন্যা-উত্তর কৃষি শ্রমিক ও কর্মহীন নারী শ্রমিকদের কাজের গ্যারান্টি নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কিংবা টাকা এবং কর্মসৃজন নানা প্রকল্পে বরাদ্দ দিয়ে কর্মহীন নারী-পুরুষের কাজের ব্যবস্থা করতে হবে।  যেন খেটে খাওয়া মানুষজন বন্যার পর কাজকর্ম করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। মূলত আমাদের দেশটি প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ। বিপদ যেন পিছু ছাড়তেই চায় না। বৈশ্বিক মহামারী করোনা, তার পর আম্পান, টানা বর্ষণ, উজানের পানির ঢল, উপর্যুপরি বন্যার মতো বিপর্যস্ত পরিস্থিতি সামাল দিয়েই আমাদের টিকে থাকতে হয়। সঙ্গত কারণেই গ্রামীণ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে এবং কর্মজীবী মানুষের রুটি-রুজির গ্যারান্টি নিশ্চিত করতে সরকারকে সময়োচিত সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে, যার কোনো বিকল্প নেই।

 

আরো খবর...